০৫. খারিজম রওয়ানা

পাঁচ

সারা থেকে আমরা খারিজম রওয়ানা হলাম। রাজধানী সারা থেকে খারিজম যাবার পথ। মরুভূমির ভেতর দিয়ে। চল্লিশ দিন লাগে সেখানে যেতে। পথে ঘোড়ার খাদ্যের উপযোগী ঘাস পাতা পাওয়া যায় না বলে ঘোড় নিয়ে এ-পথে অগ্রসর হওয়া যায় না। গাড়ী টানার জন্য এ-পথে উট ব্যবহার করা হয়। সারা ত্যাগের দশদিন পরে আমরা সারাচাকে পৌঁছি। সারাচাকের অর্থ ছোট সারা। শহরটি উসুল(উরাল) নামক একটি বেগবতী নদীর তীরে অবস্থিত। বাগদাদ শহরের সেতুর মতো এ-নদীটির পারাপার ব্যবস্থাও নৌকোর তৈরী সেতুর সাহায্যে। এখানে লটবহর সহ আমরা পৌঁছেছিলাম ঘোড়ার সাহায্যে। এবার ঘোড়ার স্থান দখল করবার জন্য উট ভাড়া করতে হলো। ঘোড়াগুলো অত্যন্ত পথক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। ঘোড়ার দামও এখানে অত্যন্ত সস্তা। এজন্য মাত্র চার রৌপ্য দিনার বা তারও কমে প্রতিটি ঘোড় বিক্রী করতে হলো। এখান থেকে শুরু করে চল্লিশ দিন অবধি আমাদের চলতে হলো খুবই দ্রুতগতিতে। এ সময়ে শুধু দ্বিপ্রহরের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পরে দু’ঘন্টার জন্য রান্না ও জোয়ারের (millet) তৈরী সুরুয়া খাওয়ার জন্য আমরা থেমেছি। প্রত্যেকের সঙ্গেই শুষ্ক মাংস থাকে। সুরুয়ার উপরে মাংস দিয়ে সবটার উপরে দৈ ঢেলে দেওয়া হয়। গাড়ী চলতে থাকা অবস্থায় প্রত্যেকেই নিজের-নিজের গাড়ীতে বসে খায় ও ঘুমায়। পথে গবাদি পশুর খাদ্যেপযোগী ঘাস-পাতার অভাব বলে এ-পথে পথিককে চলতে হয় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। এ কঠিন পথ অতিক্রম করবার পরে অধিকাংশ উটই মরে যায়। মরে যেগুলো অবশিষ্ট থাকে সেগুলোকেও এক বছরের আগে অর্থাৎ মোটা-তাজা না হলে কাজে লাগানো সম্ভব হয় না। দু’তিন দিনের পথ অতিক্রম করবার পর-পর বৃষ্টির দরুণ সঞ্চিত বা অগভীর কূপে পানির ব্যবস্থা আছে।

মরুভূমি পার হয়ে আমরা খারিজম শহরে এসে পৌঁছলাম।২ খারিজম তুর্কীদের সবচেয়ে সুন্দর বড় ও প্রসিদ্ধ শহর। এ-শহরের অধিবাসীদের সংখ্যা এতো বেশি যে তাদের চলাচল দেখে তরঙ্গসঙ্কুল সমুদ্রের কথা মনে পড়ে। একদিন ঘোড়ায় চড়ে বাজারের মধ্য দিয়ে যেতে আমি ভিড়ের মধ্যে আটকা পড়ে গেলাম। তখন আর সামনেও যেতে পারি না, পিছিয়েও আসতে পারি না। এ অবস্থায় কি করা উচিৎ বুঝতে না পেরে আমি অতি কষ্টে পিছিয়ে এলাম। শহরটি সুলতান উজবেগের রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। এখানে সুলতানের প্রতিনিধিত্ব করেন কুতলুডামুর (Qutludumur) নামক একজন ক্ষমতাশালী আমীর। খারিজমিয়ানদের মতো তেমন বন্ধুভাবাপন্ন ও অতিথি পরায়ন উত্তম লোক আমি দুনিয়ার আর কোথাও দেখিনি। উপাসনা সম্বন্ধেও তাদের মধ্যে যে প্রশংসনীয় রীতির প্রচলন দেখেছি তা আর কোথাও দেখিনি। প্রত্যেক মোয়াজ্জিন তার মসজিদের আশেপাশের প্রতি গৃহে গিয়ে নামাজ সম্বন্ধে তাদের সজাগ করে দিয়ে আসেন। যদি কেউ সামাজিক অর্থাৎ জামাতের নামাজে অনুপস্থিত থাকে তবে কাজী তাকে প্রকাশ্যে প্রহার করেন। এজন্য প্রত্যেক মসজিদেই একটি চাবুক ঝোলানো আছে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও দোষী ব্যক্তিকে পাঁচ দিনার জরিমানা করা যায়। জরিমানার টাকা ব্যয় করা হয় মসজিদের কাজে অথবা দান খয়রাতে। তাদের কাছে শোনা যায়, অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ রীতি নাকি তাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। শহরের বাইরে দিয়ে জয়হুন (Oxus) নদী প্রবাহিত। স্বর্গের চারটি নদীর মধ্যে জয়হুন একটি। ইটিল (ভগা) নদীর মতো এ নদীটির পানিও শীতকালে পাঁচ মাস জমাট বেঁধে থাকে। গ্রীষ্মকালে নদী তিরমি (Termez) অবধি জাহাজ চলাচলের উপযোগী হয়। নদীর অনুকুল স্রোতে জাহাজে তিরমি যেতে দশ দিন লেগে যায়। খারিজম পৌঁছে আমি শহরের উপকণ্ঠে তাবু ফেললাম। খবর পেয়ে কাজী তার একদল অনুসারীসহ আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। এসে বললেন, “আমাদের এ-জনবহুল শহরে দিনের বেলা ঢুকতে হলে আপনাকে বিশেষ বেগ পেতে হবে। কাজেই শেষ রাত্রের দিকে আমার সহকারী এসে আপনাকে শহরে নিয়ে যাবে। তার পরামর্শই আমরা মেনে নিলাম। আমাদের নিয়ে থাকতে দেওয়া হলো নতুন একটি স্কুলে (Academy)। তখনও সেটি কাজে লাগানো হয়নি। শুক্রবার নামাজের পরে আমি কাজীর সঙ্গে তার গৃহে গেলাম। মসজিদের নিকটেই তার গৃহ। অতি জাঁকজমকশালী একটি কোঠায় নিয়ে আমাকে বসানো হলো। মূল্যবান কাপের্ট এবং দেওয়ালে কাপড় লাগিয়ে সাজানো এ কোঠাটি। কোঠার একাধিক তাকের উপর সজ্জিত রূপার, গিটি করাও ইরাকী কাঁচের তৈজসপত্র। এ-দেশের লোকেরা এ-রীতিটি সবাই মেনে চলে।

কাজীকে সঙ্গে নিয়েই আমি আমীর কুতডামুরের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম পা বাঁধা অবস্থায় একখানা রেশমী কার্পেটের উপর তিনি শুয়ে আছেন। কারণ, তিনি তখন বাতরোগে ভুগছেন। তুর্কীদের মধ্যে বাত রোগটি খুব বেশি দেখা যায়। তিনি নিজের রাজ্য, খাতুন বায়ালুন, তাঁর পিতা এবং কনষ্টান্টিনোপল সম্বন্ধে নানা কিছু। জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আমাদের.আহারের ব্যবস্থা করা হলো। মুরগীর রোষ্ট, সারস পাখী ও বাচ্চা কবুতরের মাংস, ঘৃতে ভাজা রুটি, বিস্কুট ও মিষ্টি এসে হাজির হলো। তারপরে এলো ফলমুল, ডালিম প্রভৃতি। কোনো-কোনো খাদ্য পরিবেশন করা হলো স্বর্ণ বা রৌপ্য পাত্রে সোনালী চামচের সাহায্যে। বাকি খাদ্য কাঁচপাত্রে কাঠনির্মিত৩ চামচ দিয়ে। পরে খাওয়ালো চমৎকার তরমুজ। স্কুলে ফিরে এসে আমীর আমাদের জন্য চাউল, ময়দা, ভেড়া, মাখন, মসলাপাতি ও জ্বালানী কাঠ পাঠিয়ে দিলেন। এ-সব দেশে কাঠ-কয়লার ব্যবহার প্রচলিত নেই। ভারতে এবং পারস্যেও তাই। চীন দেশে জ্বালায় এক রকম পাথর। কাঠ-কয়লার মতোই তা জ্বলে। একবার সেগুলো জ্বালানোর পরে। ছাইগুলো পানি দিয়ে মাখানো হয়। তারপর রৌদ্রে শুকিয়ে পুনরায় জ্বালানো হয়। আমীরের একটি অভ্যাসের কথা এখানে বলছি। প্রতিদিন কাজী তার আইন সম্বন্ধে। পরামর্শ দাতা ও লেখকদের নিয়ে আমীরের দরবারে হাজির হন এবং প্রধান আমীরদের কোনো একজনের সম্মুখে তার জন্য নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করেন। প্রধান আমীরের সঙ্গে থাকে আরও আটজন তুর্কী আমীর ও শেখ। তখন জনসাধারণ আসে তাদের মামলার বিচারের জন্য। যে সব মামলা পবিত্র আইনের আওতায় আসে সেগুলির বিচার করেন স্বয়ং কাজী বাকিগুলি বিচারের ভার উপস্থিত আমীরদের উপর। তারা পক্ষপাতিত্ব করেন না বা উৎকোচ গ্রহণ করে না বলে সূক্ষ্ম ও ন্যায় বিচার করে থাকেন। একদিন জুমার নামাজের পরে কাজী আমাকে বললেন, “আমীর আদেশ করেছিলেন আমাকে পাঁচশ দিরহাম উপহার দিতে এবং আরও পাঁচ শ দিরহাম ব্যয় করে একটি ভোজের আয়োজন। করে শেখ, চিকিৎসক এবং প্রধান-প্রধান ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করতে। তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনি যে ভোজের আয়োজন করতে চাইছেন তাতে অতিথিরা দু’এক গ্রাস খেতে পারেন কিন্তু সম্পূর্ণ টাকা মেহমানকে দিলে তিনি বেশি উপকৃত হবেন। তিনি তাতেই রাজী হয়ে আপনাকে এক হাজার দিরহামই দিতে বলেছেন। একটি বালক ভৃত্য এক হাজার দিরহামের (মরক্কোর তিনশ দিনারের সমতুল্য) একটি তোড়া এনে আমার হাতে দিল সেই দিনই পঁয়ত্রিশ রৌপ্য দিনার মূল্যে কালো রংয়ের একটি ঘোড়া কিনে সেই ঘোড়ায় চড়ে আমি মসজিদে গেলাম। ঘোড়াটির দাম পরিশোধ করলাম সেই হাজার দিরহাম থেকে। তারপরে আমার নিজস্ব ঘোড়ার সংখ্যা এতো বেড়ে গেলো যে তার সংখ্যা উল্লেখ করলে কোনো-কোনো সংশয়াকুল লোকের পক্ষে আমাকে মিথ্যাবাদী বলা অসম্ভব নয়। অতঃপর ভারতে পৌঁছা অবধি আমার দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই কাটতে লাগলো। আমার অনেকগুলো ঘোড়া ছিল কিন্তু এ কালো ঘোড়াটিকেই আমি বেশি পছন্দ করতাম। আর সব ঘোড়ার সামনে একটি ঘেরাও করা জায়গায় এ ঘোড়াটি রাখা হতো। তিন বছরকাল এটি আমার সঙ্গে ছিলো। ঘোড়াটির মৃত্যুর পর আমার ভাগ্য পরিবর্তন হল খারাপের দিকে।

খারিজম আসতে আমি সঙ্গী পেয়েছিলাম আলী নামে কারবালার একজন সওদাগরকে। তিনি ছিলেন একজন শরীফ ব্যক্তি। আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম। আমাকে কিছু কাপড় জামা ও অন্যান্য জিনিষ কিনে দিতে। তিনি আমার একটি জামা দশ দিনারে খরিদ করে আমার থেকে নিলেন আট দিনার এবং বাকি দু’ দিনার দিলেন নিজের পকেট থেকে। প্রথমে আমি এর কিছুই জানতাম না। পরে ঘটনা পরম্পরায় কথাটা আমার কানে এলো। শুধু তাই নয়, তিনি আমাকে কিছু টাকাও ধার দিয়েছিলেন। আমীরের উপহারের টাকা পেয়ে আমি তার পাওনা পরিশোধ করবার পর তার দয়ার জন্য কিছু একটা উপহার দিতে চাইলাম কিন্তু তিনি কিছুতেই তা গ্রহণ করলেন না। এমনকি তার একটি বালক ভৃত্যকে সে উপহার দিতে চাইলেও তিনি রাজি হলেন না। তার মতো একজন মুক্তহস্ত ইরাকী আমি আর কোথাও দেখিনি। আমার সঙ্গে তিনিও ভারত সফরে আসবেন বলে স্থির করেছিলেন। এমন সময় তাদের শহরের একজন সওদাগর চীন যাবার পথে খারিজমে এসে পৌঁছলো। তখন তিনি ভয় করলেন, হয়তো সওদাগরেরা দেশে ফিরে বদনাম করবে যে আলী ভিক্ষে করতে ভারতে গেছে। সে-জন্য তিনি স্বদেশের সওদাগরদের সঙ্গে চীন যাত্রা করলেন।

পরে ভারতে থাকাকালে শুনেছি, চীন, ও তুর্কীস্তানের সীমান্তে আল মালীক নামক জায়গায় পৌঁছে আলী সেখানেই থেকে যান এবং বালক-ভৃত্যকে আগে-আগে পাঠিয়ে দেন মালপত্রসহ। কিন্তু বালকটির ফিরে আসতে অনেকদিন লেগে গেলো। ইত্যবসরে তাদের শহরের অপর একজন সওদাগর এসে একই সরাইখানায় আলীর সঙ্গেই বাস করতে লাগলেন। আলী বালক-ভৃত্যর ফিরে আসার সময় অবধি কিছু টাকা ধার চাইলেন সেই সওদাগরের কাছে। কিন্তু সওদাগর টাকা ধার দিতে অস্বীকার করলেন। পরে অবশ্যি আলীকে সাহায্য না করাটা অন্যায় হয়েছে বলে সওদাগর বুঝতে পারলেন। তাই তিনি আলীর সরাইখানায় থাকা-খাওয়া খরচ নিজেই জমা দিতে চেষ্টা করলেন। আলী এ-কথা শুনতে পেয়ে এতটা দুঃখিত হয়ে পড়েন যে, নিজের কামরায় ঢুকে তিনি নিজের গলা কেটে ফেলেন। পরে তার যখন খোঁজ হলো তখন আলীর মুমূর্ষ অবস্থা। একজন ক্রীতদাসকে তার হত্যার জন্যে সন্দেহ করা হয়। আলী তা জানতে পেরে বললেন, “এর প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ করো না। আমি নিজেই নিজের গলায়। ছুরি দিয়েছি।” অতঃপর সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করলেন। আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করুন।

খারিজম থেকে যাত্রা করার সময় আমি উট ভাড়া করলাম এবং উটের একটি শিবিকাও কিনে নিলাম। কিছু সংখ্যক ঘোড়ায় চড়ে ভৃত্যেরা এলো, শীতের জন্য বাকি ঘোড়াগুলোকে কম্বল গায়ে জড়িয়ে আনতে হলো। আমরা খারিজম ও বুখারার মধ্যবর্তী মরুভূমিতে প্রবেশ করলাম। খারিজম থেকে বুখারা অবধি আঠারো দিনের বালুকাময়। পথে একমাত্র ছোট শহর কাট ৫ ছাড়া আর কিছুই নেই। চারদিন পর আমরা এসে কাট পৌঁছলাম এবং শহরের বাইরে তাবু ফেললাম। পাশেই একটি হ্রদের পানি ঠাণ্ডায় জমে গেছে এবং বালকেরা তার উপর খেলা করছে। কাজী আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এলেন। তার ঘন্টাখানেক পরে এলেন সেখানকার শাসনকর্তা এবং তার পরিষদবর্গ। তারা আমাদের থাকতে অনুরোধ জানালেন এবং আমাদের সম্মানার্থে এক ভোজের আয়োজন করলেন। এ মরুভূমিতে পানি ছাড়া ছয় রাত্রি চলার পরে আমরা ওয়াকান (Wafkend) শহর পৌঁছলাম। সেখানে থেকে পুরো একদিন ফলের বাগান, নদী, গাছপালা ও বাড়ি ঘরের ভেতর দিয়ে পথ চলে এসে পৌঁছলাম বুখারা শহরে। পূর্বে এ শহর অাস নদীর অপর পারের দেশসমূহের রাজধানী ছিল। অভিশপ্ত তাতার টিঙ্কিজ (চেঙ্গিজ) এ শহর ধ্বংস করেন। তিনি ইরাকের রাজাদের পূর্বপুরুষ। মসজিদ স্কুল ও বাজারের সামান্য কয়েকটি ধ্বংসাবশেষ এখন এখানে দেখা যায়। এখানকার অধিবাসীদের অত্যন্ত হীন চক্ষে দেখা হয় এবং খারিভমে তাদের কোনো সাক্ষ্য আইনে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না। কারণ ধর্মান্ধতা, মিথ্যা ভাষণ প্রভৃতির জন্য এদের যথেষ্ট কুখ্যাতি আছে। অধিবাসীদের ভেতর এমন একটি লোকও আজ নেই যার ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে ভালো জ্ঞান আছে বা জ্ঞান লাভ ৬ করতে ইচ্ছুক। বুখারার উপকণ্ঠে ফাতেহাবাদ নামক একটি সরাই আমরা আশ্রয় গ্রহণ করলাম। সেখানকার শেখ আমাকে নিজের গৃহে নিয়ে প্রধান অধিবাসীদের নিমন্ত্রণ করলেন। বিশেষ আনন্দে একটি রাত সেখানে কাটানো হলো। সুললিত স্বরে সেখানে কোরআন পাঠ হলো। একজন ইমাম বক্তৃতা দিলেন, পরে তুর্কী ও পার্শী ভাষায় গান করা হলো।

বুখারা থেকে আমরা রওয়ানা হলাম ধর্মপ্রাণ সুলতান তারমা শিরিনের তাবুর উদ্দেশ্যে। বাগান ও খাল দ্বারা পরিবেষ্টিত নাখশাব (garshi) নামক শহরের পাশ দিয়ে ছিল আমাদের পথ। পরদিন অপরাহে আমরা সুলতানের তাবুতে পৌঁছলাম। একজন সওদাগর আমাদের একটি তাবু ধার দিলেন রাত কাটানোর জন্যে। সুলতান শিকারের উদ্দেশ্য বাইরে গেছেন বলে আমি তার প্রতিনিধি আমীর তাবুঘার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তার সমজিদের নিকটে আমার বাসস্থান নির্দেশ করে দিলেন এবং পূর্ববর্ণিত তুর্কী তাবুর মতো একটি তাবুও আমাকে দিলেন। সেই রাত্রেই আমার এক ক্রীতদাসী বালিকা একটি সন্তান প্রসব করলো। প্রথমে শুনেছিলাম সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেছে কিন্তু পরে দেখলাম পুত্র নয় কন্যা। কন্যা হলেও তার জন্ম হয়েছিলো শুভ মুহূর্তে কারণ তার জন্মের পর আমার যা কিছু ঘটেছে সবই আনন্দের ও সন্তুষ্টির। ভারতে পৌঁছবার দু’মাস পরে তার মৃত্যু হয়। যথাস্থানে তার বর্ণনা দেওয়া আছে।

তুর্কীস্তানের সুলতান তারমাশিরিন একজন শক্তিশালী বাদশাহ। তিনি শাসনকার্যে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং তার রাজ্য ও সৈন্যসংখ্যা বিশাল। তার রাজ্য চীন ভারত ইরাক ও সুলতান উজবেগের রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত। এ-সব রাজ্যের অধিপতিরা সবাই তাকে উপঢৌকন পাঠাতেন ও সম্মান করতেন। তার পূর্ববর্তী দুটি ভাই-ই কাফের(Infidel) ছিলেন। একদিন মসজিদে আমরা রীতি অনুসারে ফজরের নামাজ শেষ করতেই শুনতে পেলাম সুলতান সেখানে উপস্থিত আছেন। তিনি জায়নামাজ থেকে উঠতেই আমি তাকে ছালাম করতে এগিয়ে গেলাম। তিনি আমাকে তুকী ভাষায় অভ্যর্থনা জানালেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে তিনি তার দরবার কক্ষে হাজির হতেই নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে জনসাধারণ এসে হাজির হলো নিজের নিজের নালিশ জানাতে। অতঃপর তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি দেখতে পেলাম তাবুর ভেতরে সোনালী কাজ করা রেশমী কাপড়ে আবৃত একখানা আসনে তিনি বসে আছেন। তাবুর ভিতরে সোনালী জরির কাজ করা রেশমী আস্তর লাগানো। মূল্যবান মণিমুক্তা খচিত একটি মুকুট ঝুলানো রয়েছে সুলতানের মাথার একহাত উপরে। প্রধান আমীররা আসন গ্রহণ করেছেন তার ডাইনে ও বামে। মাছি তাড়াবার ক্ষুদ্র পাখা হাতে সামনে বসেছেন শাহজাদারা। আমার সফর সম্বন্ধে নানা প্রশ্নাদি করলেন। দোভাষীর কাজ করলেন তার প্রধান বিচারক (chancellor)। আমরা তার সঙ্গে গিয়ে নামাজে যোগদান করতাম। (তখন ছিল অসহ্য শীতের সময়)। তিনি কখনও ফজর ও রাত্রের নামাজের জামাতে অনুপস্থিত থাকতেন না। একদিন আসরের নামাজের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। তখন সুলতানের একজন ভূত্য এসে নির্দিষ্ট জায়গায় সুলতানের জায়নামাজখানা বিছিয়ে ইমামকে বললো, “হুজুর আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে বলেছেন। তিনি অজু করে এক্ষুণি আসছেন।” ইমাম তার উত্তরে পার্সীতে বললেন, “নামাজ খোদার জন্য না তারমাশিরিনের জন্য।” এই বলে তিনি মোয়াজ্জিনকে তকবির পড়তে বললেন। নামাজ অর্ধেক শেষ হবার পরে সুলতান এলেন। তিনি এসে বাকী দু’রাকাত নামাজ শেষ করলেন মসজিদের দরজার কাছে পাদুকা রাখবার জায়গায়। দাঁড়িয়ে। তারপরে প্রথম দু’রাকাত নামাজ পড়ে হাসতে-হাসতে তিনি ইমামের সঙ্গে মোসাফাহ্ করতে এগিয়ে এলেন। নিজের জায়গায় বসে পরে সুলতান আমার দিকে। ফিরে বললেন, “তুর্কীর সুলতানের সঙ্গে একজন পার্সী দরবেশ কি রকম ব্যবহার করলেন, দেশে ফিরে আপনার দেশবাসীকে তা বলবেন।” এ শেখ প্রতি শুক্রবার খোবা পড়তেন সুলতানকে সত্ত্বার্যে উৎসাহ দিয়ে এবং অসৎ ও অত্যাচারমূলক কার্যে কঠোর ভাষায় নিষেধ জানিয়ে সুলতান নীরবে তা শুনতেন ও অবর্ষণ করতেন। ইমাম সুলতানের দেওয়া কোনো উপহার কখনো গ্রহণ করতেন না, তার সঙ্গে একত্র বসে খেতেন না বা তার দেওয়া পোশাক-আশাকও পরতেন না। তিনি একজন খাঁটি ধর্মপ্রাণ খোদার বান্দা ছিলেন। সুলতানের সঙ্গে চুয়ান্ন দিন কাটিয়ে আমি আমার যাত্রা পুণরায় শুরু করতে মনস্থ করলাম। তখন তিনি আমাকে সাতশ রৌপ্য, দিনার নকুল জাতীয় জীবের লোমবিশিষ্ট একটি কোট দিলেন। শীতের জন্য একশ দিনার মূল্যের এ কোটটি আমি চেয়েছিলাম। তাছাড়া দুটি ঘোড়া ও দু’টি উটও তিনি আমাকে দিলেন। তার কাছে বিদায় নিয়ে সমরকন্দে এসে পৌঁছলাম। সমরকন্দ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও সুন্দর শহর। শহরটি একটি নদীর তীরে নির্মিত। আসরের নামাজের পরে অধিবাসীদের সবাই নদীর তীরে ভ্রমণের জন্য আসে। এক সময়ে নদীর পারে বড়-বড় প্রাসাদ ছিল। এখন তার অধিকাংশই ধ্বংসের কবলে। শহরেরও সেই একই অবস্থা। তার না আহে প্রবেশ দ্বারা না আছে কোনো প্রাচীর। শহরের বাইরে রয়েছে কুতাম ইব্‌নে আব্বাসের মাজার। সমরকন্দ বিজয়ের সময় তিনি শহীদ ৮ হন। আদিবাসীরা প্রতি রবিবার এবং বৃহস্পতিবার রাত্রে এ মাজার জেয়ারত করতে আসে। তাতারারও অনেক গরু, ভেড়া ও অর্থ মানস্বরূপ নিয়ে মাজার জেয়ারতে আসে। সে সব ব্যয় করা হয় মুসাফের ও সরাইখানার জন্য।

সমরকন্দ থেকে আমরা তিরমিধ (তিরমিজ) পৌঁছি। এ-বড় শহরটিতে সুন্দর-সুন্দর অট্টালিকা ও বাজার আছে। এবং মধ্য দিয়ে একটি খাল প্রবাহিত হয়ে গেছে। এখানে সুস্বাদু আঙ্গুর ও নাশপাতি পাওয়া যায় প্রচুর। তাছাড়া পাওয়া যায় মাংস ও দুধ। সোডা সাজিমাটির পরিবর্তে এখানকার লোকেরা দুধ দিয়ে মাথা ঘোয়। এখানকার স্নানাগারে একটি প্রকাণ্ড জালা ভরতি দুধ রয়েছে। আগন্তুকদের প্রত্যেকেই এক পেয়ালা করে দুধ নিয়ে নিজের মাথা ধোয়। তাতে চুল তাজা ও চকচকে হয়ে উঠে। ভারতের লোকেরা তিলতেল মাথায় দেয় এবং পরে সাজিমাটি দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলে। তাতে শরীর সিন্ধু থাকে, চুল চকচকে ও লম্বা হয়। সেজন্যই ভারতবাসীদের এবং সেখানে যারা বাস করে তাদের দাড়ি লম্বা হয়। তিরমিজের পুরাতন শহরটি নির্মিত হয়েছিল অকসা নদীর তীরে। অতঃপর চেঙ্গিজ যখন সে-শহর ধ্বংস করেন তখন পুনরায় এ-শহরটি নির্মিত। হয় নদীর তীর থেকে দু’মাইল দূরে। শহরে পৌঁছবার আগেই ঘটনাক্রমে আমার সঙ্গে এখানকার শাসনকর্তা আলা আল-মুক খোদাওজাদার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাদিগকে মেহমান হিসাবে গণ্য করবার হুকুম দেন এবং প্রত্যহ আমাদের জন্য খাদ্যবস্তু পাঠান।

অস্‌সাস্‌  নদী পার হয়ে আমরা খোরাসানে প্রবেশ করি। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে বালুকাময় অনুর্বর জনমানবহীন পথে দেড় দিন চলার পরে বলখে উপস্থিত হই। সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও শহরটি জনমানবহীন হয়ে গেছে। কিন্তু এ-শহর খুব মজবুত করে তৈরী বলে এখনও জনহীন বলে মনে হয় না। অভিশপ্ত চেঙ্গিজ এ-শহর ধ্বংস করেন এবং শহরের মসজিদটির এক-তৃতীয়াংশ ভেঙ্গে ফেলেন। তিনি শুনেছিলেন মসজিদের একটি স্তম্ভের নিচে ধনরত্ন লুক্কায়িত আছে। সেজন্য স্তগুলোর প্রায় এক তৃতীয়াংশ তিনি ভেঙে ফেলেন। অবশেষে কিছুই না পেয়ে সেগুলো ভগ্নাবস্থায় পরিত্যাগ করে যান। বলখ থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা কুহিস্তানের পাবর্ত্যপথে সাতদিন চলি। পথে অনেক গ্রাম, স্রোতস্বিনী ও ডুমুর জাতীয় গাছ আছে। অনেকগুলো সরাইখানায় ধর্মনিষ্ট লোকেরা বাস করেন। তারপর আমরা উপস্থিত হই খোরাসানের বৃহত্তম শহর হিরাতে। এ-প্রদেশে বৃহৎ শহর চারটি। তার ভেতর হিরাত ও নায়াসাবুর (নিশাপুর) বসতিপূর্ণ এবং বলখ ও মারুভ (Merv) ধ্বংস কবলিত।

হিরাতের সুলতান প্রসিদ্ধ হোসায়েন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আলঘোরীর পুত্র। সুলতান গিয়াসউদ্দিন তার দুঃসাহসের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। খোদার অনুগ্রহে (by the Divine favour) তিনি দুটি যুদ্ধে জয়লাভ করেন। নিজামউদ্দিন মাওলানা নামে একজন প্রসিদ্ধ আওলিয়া যৌবন হিরাতে বাস করতেন। তার খোতবা ও ধর্মোপদেশ শুনবার জন্য বহুলোক তার কাছে সমবেত হতো। তারা সবাই তাকে ভালবাসত ও শ্রদ্ধা। করতো। দুর্নীতি দমনের জন্য তাকে নিয়ে তারা একটি সঙ্ গঠন করেছিল। সুলতানের জ্ঞাতিভ্রাতা ইমাম মালিক ওয়ারানা সঙ্ঘের সভ্য ছিলেন। যেখানেই তারা কোন দুঙ্কার্যের খবর পেতো, এমন কি দুষ্কার্যকারী স্বয়ং সুলতান হলেও সেখানেই তারা গিয়ে দুস্কার্য বন্ধের চেষ্টা করতো। শোনা যায়, একবার তারা খবর পেলো, সুলতানের। প্রাসাদেই একটি অন্যায় কার্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কাজেই তারা সে কাজ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে হাজির হলো। তখন সুলতান তাদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য প্রাসাদের মধ্যে আত্মগোপন করলেন। কিন্তু দেখতে-দেখতে প্রাসাদের প্রবেশ পথে প্রায় ছয় হাজার লোক এসে সমবেত হলো। তাদের ভয়ে ভীত হয়ে সুলতান নিজামউদ্দিনকে এ-শহরের অপরাপর প্রধান ব্যক্তিদের ডেকে পাঠালেন। সুলতান মদ্যপান করছিলেন। জনতা প্রাসাদের ভেতরেই তাকে ইসলামের শরিয়ত অনুসারে শাস্তি ১০ দিয়ে শান্ত হলো। পরে একজন তুর্কী আমীরের দ্বারা নিজামউদ্দিন নিহত হন। কোনো ব্যাপারে আমীর তার উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। সুলতানের জ্ঞাতিভ্রাতা মালিক ওয়ারমা নিজামউদ্দিন সংস্কারমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ-ঘটনার পর সুলতান মালিক ওয়ারনাকে রাজদূত হিসাবে সিজিস্তানের রাজদরবারে প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি সিজিস্তানে গিয়ে পৌঁছলে সুলতান তাকে ফিরে আসতে বারণ করেন। অবশেষে মালিক ওয়ারনা ভারতে চলে যান। সিন্ধু ত্যাগ করে আসার সময় আমার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি একজন অমায়িক লোক ছিলেন। তাছাড়া তিনি ক্ষমতাপ্রিয় ছিলেন। এবং শিকার করতে ক্রীতদাস ও ভৃত্য রাখতে এবং জাঁকজমকশালী পোষাক পরিধান করতে ভালবাসতেন। কিন্তু এ-প্রকৃতির লোকের জন্য ভারত উপযোগী দেশ নয়। ভারতের বাদশাহ্ তাকে ছোট একটি শহরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। কিন্তু সেখানেই হিরাতের একজন লোকের হস্তে তিনি নিহত হন। হিরাত থেকে এসে এ লোকটি তখন ভারতে বসবাস করছিলো না যায়। ভারতের বাদশাই সুলতান। হোসায়েনের অনুরোধে আততায়ীকে এ-ব্যাপারে প্ররোচনা দেন। সে-কারণে মালিক ওয়ারনার মৃত্যুর পরে সুলতান হোসায়েন ভারত সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করেন।

হিরাত ছেড়ে আমরা যাই জাম শহরে। উর্বর অঞ্চলে অবস্থিত জাম’ মাঝামাঝি আকারের একটি শহর।১১ এখানকার গাছপালার মধ্যে অধিকাংশই উঁত গাছ। কাজেই এখানে প্রচুর রেশম উৎপাদন হয়। প্রসিদ্ধ তাপস ও দরবেশ আহমদ-উল-জামের নামানুসারে এ-শহরের নামকরণ হয়েছে। তার বংশধরেরাই এখন এ-শহরের মালিক।

জাম শহর সুলতানের অধিকারভুক্ত নয়। দরবেশ জামের বংশধরগণ বিত্তশালী বলে। খ্যাত। অতঃপর আমরা খোরাসানের অন্যতম বৃহৎ শহর তুস্ নগরে হাজির হই। সেখান থেকে যাই মাশাদ-আর-রিদা (মেসেদ)। এটিও বহু ফলগাছ, নদীনালা ও কারখানা যুক্ত১২ একটি বড় শহর। এখানকার প্রসিদ্ধ সমাধিস্তম্ভের শীর্ষে একটি সুদৃশ্য। গুম্বুজ আছে। সমাধির দেওয়ালগুলি রঙীন টালিদ্বারা নির্মিত। ইমামের সমাধিস্তম্ভের উলটোদিকেই খলিফা হারু-অর-রশিদের সমাধি। সমাধির উপরস্থ মঞ্চে আলোকাধার রয়েছে। কোনো শিয়া মতাবলম্বী এখানে জিয়ারতের জন্য এলে হারুণ-আর-রশিদের সমাধির উপর পদাঘাত করে এবং আর-রিদার জন্য দোয়া করে।

সেখান থেকে আমরা সারাখের মধ্য দিয়ে যাওয়ার (Zawa) উপস্থিত হই। যাওয়া ধর্মপ্রাণ শেখ কুতুবউদ্দিন হায়দারের ১৩ শহর। তিনি নিজের নামানুসারে দরবেশদের। জামাতের নাম হায়দারী জামাত রেখেছেন। এ-সব দরবেশ হাতে, কানে ও শরীরের অন্যান্য অংশে লোহার আংটি ব্যবহার করেন। যাওয়া থেকে আমরা নায়াসাবুর গিয়ে। হাজির হই। খোরাসানের চারটি রাজধানীর ভেতর নায়াসাবুর অন্যতম। এ-শহরের। সৌন্দর্য ফলগাছ, ফলের বাগান, নদী-নালার জন্য একে ছোট দামেস্ক নাম দেওয়া। হয়েছে। এখানে রেশম ও মখমলের পোষাক তৈরী হয়ে ভারতে রপ্তানী হয়। আমি প্রসিদ্ধ জ্ঞানী শেখ কুতুবউদ্দিনের আস্তানায় কিছুকাল বাসের সুযোগ লাভ করেছিলাম। তিনি আমার প্রতি যথেষ্ট আতিথেয়তা প্রদর্শন করেন। আমি তার আশ্চর্যজনক কিছু কিছু অলৌকিক কার্যকলাপ স্বচক্ষে দেখেছি। এ-শহরে আমি একজন অল্পবয়সী তুকী ক্রীতদাস খরিদ করেছিলাম। তিনি সেই ক্রীতদাসকে আমার সঙ্গে দেখেই বলে উঠলেন, “এ ছেলেটি তোমার জন্য ভাল হবে না। একে বিক্রি করে ফেলে। তার উপদেশানুসারে আমি তাই করলাম, পরের দিনই এক সওদাগরের কাছে তাকে বিক্রি করে দিলাম। তারপর যথারীতি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। অতঃপর যখন আমি বিস্তামে এসে পৌঁছি তখন নায়াসাবুরের এক বন্ধু পত্র লিখে জানালেন যে, সেই ক্রীতদাস একটি তুর্কী বালককে হত্যা করেছে এবং সে জন্য তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। শেখের অলৌকিক কার্যের এটি চাক্ষুস্ প্রমাণ।

নায়াসাবুর থেকে আমরা আসি বিস্তাম।১৪ বিস্তাম থেকে কান্দুস (gundus) ও বাগলান।১৫ দুটিই গ্রাম এবং শেখ ও ধার্মিক লোকদের বাসস্থান। কানদুসে একটি খালের পাশে আমরা তাবু ফেলেছিলাম। এখানে শের-ই-শিয়া (কালো সিংহ) নামক একজন মিশরীয় শেখের একটি অতিথিশালা আছে। এখানকার শাসনকর্তা মসুলের অধিবাসী। তিনি বিশেষ যত্নে আমাদের মেহমানদারী করেন। এখানকার একটি বাগানের ভিতরে তার বাসস্থান। আমাদের সঙ্গের ঘোড়া ও উটগুলোকে চরানোর সুবিধা পেয়ে সে গ্রামের বাইরে আমরা প্রায় চল্লিশ দিন কাটালাম। কারণ, এখানে অতি উত্তম গো-চারণ ভূমি রয়েছে। তা ছাড়া ইতিপূর্বে ঘোড় চুরির ব্যাপারে তুকী আইনের যে বিধানের কথা আগেই আমি বলেছি, এখানকার আমীরও সে আইন এখানে বলবৎ রেখেছেন বলে ঘোড়া চুরি যাবারও কোনো আশঙ্কা নেই। আমাদের ওখানে দশদিন অবস্থানের পরেই তিনটি ঘোড়া হারিয়ে যায়। তখন প্রায় পক্ষকালের মধ্যেই স্থানীয় তাতাররা, তাদের মধ্যে আমীর কর্তৃক ঐ আইন প্রয়োগ হবে আশঙ্কায় ঘোড় তিনটি উদ্ধার করে দিয়ে যায়।

এখানে দীর্ঘদিন অবস্থানের আরেকটি কারণ তুষারপাত। কারণ, পথে হিন্দুকুষ নামক একটি পর্বত আছে। হিন্দুকুষ নামের অর্থ হইল হিন্দু বা ভারতীয়দের হত্যাকারী। কারণ, ভারতবর্ষ থেকে ক্রীতদাস বালক-বালিকা আনবার সময় অত্যধিক শীত ও তুষারপাতের ফলে বহু সংখ্যক এখানেই মৃত্যুবরণ করে। সে-পথ পার হতে পূর্ণ একটি দিন লাগে।১৬ গ্রীষ্মকাল পুরোপুরি আরম্ভ না-হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানেই রয়ে গেলাম। তারপর একদিন প্রত্যূষে চলতে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ক্রমাগত চলে এ পর্বতটি অতিক্রম করে এলাম। উটগুলো তুষারের ভেতরে ডুবে যাবে ভয়ে আমরা পথে উটের পা ফেলার জন্য সামনে কম্বল বিছিয়ে দিতে লাগলাম। বাগোন থেকে যাত্রা করে আমরা। যেখানে এলাম সে জায়গাটির নাম আন্দার (Andarab)। এক সময়ে এখানে একটি শহর ছিল কিন্তু তার চিহ্নও আজ লোপ পেয়েছে। একটি বড় গ্রামের কাছে এসে আমরা আস্তানা ফেললাম। মোহাম্মদ আল-মাহ্রাবি নামে একজন সৎলোকের একটি সরাইখানা এখানে আছে। আমরা তাঁর সঙ্গেই ছিলাম এবং তিনি আমাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেছেন। তিনি আমাদের এতটা সম্মান করেছেন যে, খাওয়ার পরে আমরা যখন হাত ধুয়ে ফেলতাম তিনি তখন সেই হাত ধোয়া পানি পান করতেন। পূর্বোক্ত হিন্দুকুষ পর্বতে আরোহণ করার আগে পর্যন্ত তিনি আমাদের অনুগমন করেন। এ পর্বতের উপর আমরা একটি উষ্ণ প্রস্রবণ দেখতে পাই। আমরা তাতে মুখ ধুয়েছিলাম। তার ফলে আমাদের মুখের ত্বক ঝলসে যায় এবং আমাদের কিছু কষ্ট ভোগ করতে হয়।

অতঃপর আমরা যেখানে এসে থামলাম সে জায়গাটির নাম বাহির (Panjshir) যার অর্থ পাঁচ পর্বত। এক সময়ে সমুদ্রের মতো নীল পানি বিশিষ্ট এই নদীর বড় পাড়ে এখানে একটি জন বহুল সুন্দর শহর গড়ে উঠেছিল। তাতার সুলতান চেংগিজ-এ দেশটিও ধ্বংস করেন এবং তারপরে এ-শহরের আর আবাদ হয়নি। আমরা ‘পাশে নামীয় একটি পর্বতে এসে হাজির হলাম। এখানে আতা আউলিয়া অর্থাৎ আউলিয়াদের পিতা নামক একজন শেখের একটি দরগাহ আছে। তাকে সিসাদ সালাহ’ নামেও ডাকা হয়। কারণ, কথিত আছে, তার বয়স সাড়ে তিনশত বছর। তার সম্বন্ধে লোকে উচ্চ ধারণা পোষণ করে এবং শহর ও গ্রাম থেকে বহুলোক তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। এমন কি সুলতান ও শাহজাদীরা পর্যন্ত আসেন। তিনি আমাদের সসম্মানেই তার মেহমানরূপে গ্রহণ করেন। আমরা তার দরগার কাছে নদীর কিনারে তাবু ফেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমি তাঁকে ছালাম করতেই তিনি আমাকে আলিঙ্গণ দান করলেন। তার গায়ের চামড়া কোমল ও মসৃণ। তাকে দেখলে যে কেউ পঞ্চাশ বছর বয়সী বলে মনে করবে। তিনি আমাকে বললেন, প্রতি একশ বছর পরে তাঁর চুল ও দাঁত নতুন করে গজায়। তার বিষয়ে আমার মনে কিছুটা সন্দেহের উদ্রেক হয়। একমাত্র খোদাই জানেন, তার কথায় কতটা সত্যতা আছে।

সেখান থেকে আমরা এলাম পারওয়ান। এখানে আমীর বুরুনতাইর (Buruntayh) সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। তিনি আমার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করেন এবং গজনাতে তার প্রতিনিধির কাছে আমাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতে উপদেশ দিয়ে পত্র লেখেন। আমরা চারক (চারিকর) গ্রাম অবধি পৌঁছলাম। তখন গ্রীষ্মকাল। সেখান থেকে আমরা গজনা পৌঁছলাম। খ্যাতনামা যোদ্ধা সুলতান মাহমুদ ইব্‌নে সবুক্তগীনের শহর এই গজনা। প্রবল পরাক্রমশালী বাদশাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। তিনি বহুবার ভারত আক্রমন করেন এবং একাধিক নগর ও দূর্গ অধিকার১৭ করেন। এ শহরেই তার সমাধি রয়েছে। সমাধির উপরে একটি (Hospice) নির্মিত হয়ে আছে। শহরের বৃহত্তর অংশ ধ্বংস কবলিত হয়ে সামান্য মাত্র অবশিষ্ট আছে। কিন্তু এক সময়ে এটি বড় শহর ছিল। এখানে অত্যন্ত বেশি শীত অনুভূত হয়। সেজন্য শীতকালে এ-শহরের বাসিন্দারা কান্দাহার শহরে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। গজনা থেকে কান্দাহার নামে এ বড় ও সমৃদ্ধিশালী শহর তিন রাত্রির পথ। কিন্তু আমার সেখানে যাবার সুযোগ হয়নি। আমরা কাবুলে এসে পৌঁছলাম। পূর্বে কাবুল একটি প্রকাণ্ড শহর ছিল। এখন তার স্থান দখল করেছে আফগান নামক ইরানীদের বসতিপূর্ণ একটি গ্রাম। এদের দখলে কয়েকটি পর্বত ও গিরিবর্ত আছে। আফগানরা বিশেষ শক্তিশালী এবং তাদের অধিকাংশই দস্যু প্রকৃতির লোক। তাদের প্রধান পর্বতটির নাম কুহুসোলেমান। কথিত আছে, পয়গম্বর। সোলেমান এ পর্বতে আরোহন করে ভারতের দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং ভারতে প্রবেশ না করে ফিরে আসেন। কারণ, ভারত তখন অন্ধকারাবৃত ছিল।

কাবুল থেকে অশ্বারোহণে আমরা কারমাশ পৌঁছলাম। আফগানদের অধিকারে কারমাশ দুটি পাহাড়ের মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি দূর্গ। এখানে পৌঁছলে পথিকদের তারা বাধা দেয়। সে-পথে আসবার সময় আমাদের সঙ্গেও তাদের একবার সংঘর্ষ বেধেছিল। পর্বতের নিম্নে ঢালু জায়গায় ছিল তাদের অবস্থান। আমরা তীর ছুঁড়তেই তারা পালিয়ে যায়। আমরা হালকা জিনিষপত্র সহ পথ চলছিলাম এবং আমাদের সঙ্গে ঘোড়া ছিল প্রায়। চার হাজার। আমার ছিল উট। তার ফলে আমাকে কাফেলা থেকে পৃথক হয়ে পড়তে হলো। আমি যে দলে তখন যুক্ত হলাম সে দলে কয়েকজন আফগানও ছিল। মোট বহরের ভার কমানোর উদ্দেশ্যে আমরা পথের পাশে কিছু খাদ্যবস্তু ফেলে গেলাম। উটগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বলে তাদের বোঝাও কমিয়ে দিলাম। পরের দিন আমাদের ঘোড়াগুলো ফিরে এসে সে-সব জিনিস নিয়ে যায়। আমরা সন্ধ্যার পরে কাফেলার সঙ্গে মিলিত হলাম এবং শাশ নগরে রাত কাটালাম। তুর্কীদের দেশের সীমান্তে এটি জনঅধ্যুষিত শেষ শহর। এখান থেকে রওয়ানা হয়েই আমরা বিশাল মরুভূমিতে প্রবেশ করলাম। এ মরুভূমি পনরো দিনের পথ অবধি বিস্তৃত। এ মরুভূমি বছরে শুধু একবারই অতিক্রম করা যায় যখন ভারতে ও সিন্ধুদেশে বৃষ্টিপাত হয় অর্থাৎ জুলাই মাসের১৮ প্রারম্ভে। এ মরুভূমিতেই মারাত্মক সাইমুম বায়ু প্রবাহিত হয়। আমাদের অগ্রবর্তী একটি কাফেলা এখানে এলে অনেক উট ও ঘোড় প্রাণ হারায়। খোদাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমরা নিরাপদেই পাঞ্জাব অর্থাৎ পঞ্চনদী (সিন্ধুনদী) নামক সিন্ধুদেশের নদীর কাছে এসে পৌঁছলাম। এ নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে বড় একটি নদীতে পড়ে এবং দেশে জল সেচনের কাজ করে। আমরা যখন এ নদীর কাছে এসে পৌঁছি তখন ৭৩৪ হিজরীর মহরম মাসের নতুন চাঁদ (১২ই সেপ্টেম্বর ১৩৩৩) আমাদের মাথার উপরে উঠেছে। এখানে পৌঁছবার পর গোয়েন্দা কর্মচারীগণ আমাদের সম্বন্ধে সকল বিবরণ ভারত সম্রাটের কাছে লিখে পাঠালেন।

এ সফরের কাহিনী এখানেই সমাপ্ত। সমস্ত প্রশংসা সর্বশক্তিমান ও দয়ালু খোদার।

টিকা

পরিচ্ছেদ ৫

১। সারাচুক বা সারাইজিকের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে উরাল নদীর মুখে গুরিয়েভের নিকট কাসৃপিয়ান সমুদ্রের কিছু দূরে।

২। খাওয়ারিজম নামটি ব্যবহৃত হতো সমস্ত মধ্যযুগ ব্যাপী কিছু সময়ের জন্য খোরেজমিয়ার প্রধান শহরের ব্যাপারে। এ জেলাটি এখন খিভা নামে পরিচিত। এ সময়ে সেটা ছিল কুলিয়া উরগেঞ্চের শহর।

৩। কাঁচের পাত্র এবং কাঠের চামচ তারাই ব্যবহার করতেন, যাদের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা নিরত করতে সোনার পাত্রাদি ব্যবহারে। এটা নিষ্ঠাবান মুসলিম কর্তৃক নিষিদ্ধ।

৪। আলমালিক বা আলমালিগ তেরো শতাব্দীর প্রারম্ভে হঠাৎ প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং তারমার্শিরিনদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গৃহ যুদ্ধের সময় জামাতেখানাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় (টীকা ৭ দ্রষ্টব্য)- এটা তার রাজধানী ছিল। এ স্থানটি অবস্থিত ছিল আইলী নদীর উপত্যাকায়–আধুনিক কুনজা শহরের কিছু দূর উত্তর-পশ্চিমে এটা অবস্থিত ছিল।

৫। কাত্ বা কাথ খোরেজমিয়ার পূর্বতন রাজধানী আধুনিক শেখ আব্বাস ওয়ালী শহরের নিকট অবস্থিত ছিল।

৬। এই অভিযোগ-পত্রের গুরুত্ব এখানে নিহিত যে মুসলিম জগতে বুখারা ছিল পূর্বের অন্যতম একটি ধর্মতন্ত্র অধ্যায়নের ক্ষেত্র।

৭। তুর্কিস্তান এবং অক্সাসের ওপারের দেশগুলির সুলতানকে পূর্ববর্তী লেখাতে পৃথিবীর সাতজন মহা নরপতির অন্যতম বলে ধরা হয়েছে-ইনি চারজন মোগল খানাতের একজন ছিলেন-এতে চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এর শাসকগণ জামাতে-খাস নামে পরিচিত ছিলেন-জামাতের নামানুসারে। ইনি ছিলেন চেঙ্গিস খানের পুত্র। একে এ দেশটি দেওয়া হয়েছিল। তারমাশারিনের ভাগ্য সম্বন্ধে ইব্‌নে বতুতা একটি কৌতূহলপূর্ণ গল্প বলেন। ইসলামে তার ধর্মান্তরিত হওয়ায় সম্ভ্রান্ত প্রধানগণ তার উপর বিরূপ হয়ে উঠেন। চেঙ্গিস খানের নীতি ভঙ্গের জন্য তারা তাকে অভিযুক্ত করেন এবং ১৩৩৫ কি ৩৬ খ্রীষ্টাব্দে তারা বিদ্রোহ করেন। তারমাশিরিন অকপাসের ওপারে পালিয়ে যান–কিন্তু ধরা পড়েন এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন বলে প্রচারিত হয়। অতঃপর একজন ব্যক্তি ভারতে এসে উপনিত হন এবং নিজকে তারমাশিরিন বলে পরিচয় দেন–যদিও তার দাবী সমর্থিত হয়, তথাপি রাজনৈতিক কারণে তিনি সুলতান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন এবং বিতারিত হন। ভাগ্যক্রমে তিনি শিরাজে আশ্রয় পান এবং ইব্‌নে বতুতা তার সঙ্গে ১৩৪৭ সালে তার পূর্ণ সিরাজ ভ্রমণের সময় সাক্ষাৎ করেন। তখন তিনি সেখানে সম্মানিত বন্দীর জীবন যাপন করেছিলেন।

৮। এখন শা-জিন্দা’নামে পরিচিত। এ সমাধি বন্দিরটি এখাননা সমরকন্দের একটি প্রধান হ্য।

৯। ১২৪৫ খ্রীষ্টাব্দ থেকে স্থানীয় কার্ট বংশীয় রাজাগণ হিরাতে রাজত্ব করতেন। এই নরপতি হোসেনের অধীনে (সাধারণভাবে মইজউদ্দিন নামে কথিত। রাজত্ব কাল ১৩৩১-৭০) খোরাশানের মধ্যে এ রাজত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ইব্‌নে বতুতার পরিদর্শন কালে তিনি বাল্যাবস্থায় ছিলেন–সুতরাং নিম্নোক্ত কাহিনীটি হচ্ছে তার নয় দশ বছর পরের। হোসেনের পুত্র গিয়াস উদ্দীন পীর শা ১৩৮১ খ্রীষ্টাব্দে তৈমুর লংয়ের অধীনস্থ হন–এবং ১৩৮৯ সালে তার মৃত্যুতে রাজবংশটি লুপ্ত হয়।

১০। শারাব পানের জন্য ইসলামী আইন অনুসারে চল্লিশটি বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে।

১১। মেশহেডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত শহরটি শেখ জাম্ নামে পরিচিত। ইব্‌নে বতুতা যখন খোরাশান প্রদেশে প্রবেশ করেন তখন সেটা পারশ্য এবং ইরাকের মোঙ্গল সুলতান কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল, অন্ততঃ নামে।

১২। মাশহাদ নামের অর্থ হচ্ছে আর-রিদের সমাধি মন্দির। আর-রিদ পদবীতে শিয়া ইমামগণ পরিচিত। এটা যে ইমামের সমাধি তিনি ছিলেন অষ্টম ইমাম আলী ইব্‌নে মুসা। ৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে এঁর মৃত্যু হয়। খলিফা হারুণ অর-রশিদ ৮০৯ খ্রীষ্টাব্দে তুষে মৃত্যু বরণ করেন, যখন খোরাশানের সীমান্তে একটি অভিযান চালনা করছিলেন।

১৩। এখন তুরাবাত-ই হায়দরী, মেশহেদের দক্ষিণে অবস্থিত। যে ভাবে এ শহর দুটির উল্লেখ করা হয়েছে তাতে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ জটিল বলে মনে হয় এবং বিশেষ করে সারাখুসের অবস্থান জাম্ এবং তুষের মাঝখানে হওয়া চাই–কিম্বা বিস্তাম থেকে ফিরবার পথে এটা হওয়া চাই।

১৪। ক্যাপিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আস্তানাবাদের দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তাম অবস্থিত।

১৫। এখানে পুনরায় বর্ণনার মধ্যে একটি ফাঁক দেখা যায়। ক্যাপিয়ান থেকে ইনে বতুতা আঙ্গানিস্তানের উপর দিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে একই নামের নদীর তীরে কুন্দুজ অবস্থিত এবং কিছু দূরে দক্ষিণে একই নদীর তীরে অবস্থিত বাঘলান। আফগানিস্থানের পূর্ব অঞ্চলের অর্ধেক গজনী পর্যন্ত এ সময়ে জামাতে খানের অধীনে ছিল।

১৬। ইব্‌নে বতুতা খাওয়া গিরিপথের রাস্তা অনুসরণ করেছিলেন (১৩,০০০ ফিট উঁচু)। এটা কাবুলের উত্তর-পূর্বে।

১৭। গজনীর মাহমুদ, যিনি ৯৯৮ থেকে ১০৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন তিনি উত্তর ভারতে মুসলিম রাজ্য স্থাপনের পথ রচনা করেন সিন্ধু পাঞ্জাব, এবং নিকটবর্তী প্রদেশসমূহে নির্মম আক্ৰমণ দ্বারা।

১৮। বিবরণের ভিত্তিতে একথা স্থির করা কঠিন যে ইব্‌নে বতুতা প্রকৃতভাবে কোন্ পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। আফগান রাহাজান দস্যুদের সম্বন্ধে গল্পটি একটা নিয়মিত পথের নির্দেশ দিচ্ছে–এবং শাশনগর হস্তিনা নগর বলে স্থির করা হয়েছে। এটা পেশোয়ারের নিকটে। এ সব উক্তি একত্রে নির্দেশ করছে খাইবার গিরিপথ। অন্যদিকে পনের দিনের পথে বিস্তৃত একটি মরুভূমির উল্লেখ এবং সে সঙ্গে ইব্‌নে বতুতার গজনী পরিদর্শন (ভুলভাবে কাবুলের পূর্বে স্থাপন করা হয়েছে) নিদের্শ করছে সুলেমান পর্বতমালার ভিতর দিয়ে কোনো প্রচ্ছন্ন পথের সেটা সিন্ধু নদীর নিম্নভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *