হলাহল বিষভাণ্ড – ৩

।। ৩।।

কর্কটের এক নাতি বিবস্বান। গবেষণাগারে বৃশ্চিকের পর সেকেন্ড কমান্ড। বিবস্বান কৈটভের বিশ্বাসঘাতকতার পর থেকে কিছু বিষয়ে খুব চিন্তায় আছে। কর্কটের সঙ্গে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়েছে।

“ঠাকুরদা, ব্যাপারটা জরুরি। আপনি একবার বসুন আমার সঙ্গে। আমি বুঝিয়ে বলছি।”

কর্কট হাত নেড়ে বলেছে, “তোরা দেখে নে। আমার এসবে মন নেই। শুধু দেখিস বেশি কিছু করতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনিস না।”

বিবস্বান বলে, “ঠাকুরদা, আমাদের মধ্যেই বিশ্বাসঘাতক ছিল।”

কর্কট ভাবে হয়তো কৈটভের কথাই বলা হচ্ছে। তিনি তার কক্ষে চলে গেলেন। বাকি কথা শুনলেনও না। বিবস্বান কর্কটের অনুমতি ভিন্ন গুরুদেবের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা করার সাহস পাচ্ছে না। কারণ কোনটা বলা উচিত আর কোনটা নয় সেটা সবসময় কর্কট নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু কৈটভের বিশ্বাসঘাতকতার পর যে তিনি এভাবে মিথ সংঘ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেবেন তা কেউ ভাবতেও পারেনি।

বিবস্বান ভাবতে থাকে কার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলা যায়। ঠাকুরদার বাকি নাতিদের সঙ্গে কথা বলাই যায় কিন্তু ওরা যে এই বিষয়ে তাকে সাহায্য করতে পারবে না সেটা সে জানে। কারণ কর্কট সবসময় একেকজনকে একেকরকমের কাজের জন্য নিযুক্ত করতেন। তাই যে সমস্যা বিবস্বান ভোগ করছে তার সমাধান অন্য নাতিদের কাছে নেই। অনেক ভাবনা চিন্তার পর বিবস্বান মনে মনে ভাবল রামানুজের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলা উচিত। রামানুজকে মাঝে মাঝেই গুরুদেবের সঙ্গে দেখা যায়। ওঁরা দুজনে বসে নানারকম শলা-পরামর্শ করেন। কিন্তু ওইসময় এসব বলার চেয়ে ভালো হয় আগে যদি রামানুজের সঙ্গে কথা বলা যায়। রামানুজ যে এই বিষয়টা বুঝবেন তাতে সে একেবারেই নিশ্চিত। সাধ্যের মধ্যে থাকলে বুদ্ধি বিবেচনা করে যে সাহায্যের হাতও এগিয়ে দেবেন সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। সমস্ত কিছু ভেবে একদিন গ্রামের মধ্যে কাঞ্চনকে ডাক দেয় বিবস্বান।

“শুনছ?”

“হ্যাঁ বলুন।”

“আমাকে তুমি করে বলতে পারো।”

“বেশ বলো।”

“আসলে একটা জরুরি ব্যপারে রামানুজবাবুর সঙ্গে কথা বলা দরকার।”

“বেশ তো। রামানুজদা আশ্রমে আসেন। তখন আমি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।”

“না। আমি আশ্রম এমনকি এই গ্রামের বাইরে কোথাও কথা বলতে চাই।”

“বেশ। কোয়ার্টারে চলবে? সামনেই, বেশি একটা দূর না।”

“দৌড়োবে।”

“তা হলে আজ সন্ধ্যায় আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।”

কাঞ্চন চলে গেল। বিবস্বান সন্ধ্যার অপেক্ষায় বসে রইল।

কথা মতো সন্ধেবেলায় কোয়ার্টারে উপস্থিত হয় সে। কাঞ্চন গোঁ, খুলে দিল। বিবস্বান এই প্রথম এই কোয়ার্টারে ঢুকল। সারি সারি টবে গাছ লাগানো আছে। অল্প কিছুটা হাঁটলেই বিল্ডিং। হল ঘরে ঢুকেই রামানুজকে দেখতে পেল বিবস্বান। রামানুজ নিজেই এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানাল। দাসবাবু পাশেই ছিলেন। সন্ধেবেলায় সব রিপোর্টস জমা দিতে তিনি আসেন। এরপর বেরিয়ে যান। আজকে হয়তো তিনি থেকেই যাবেন। রামানুজ তাকে থাকতে বলেছে।

“আসুন। আমাকে কাঞ্চন আপনার কথা বলেছিল। বসুন।”

সোফায় বসলেন সবাই। রামানুজ কাঞ্চনকে বলল, “রাধামাধবদাকে বল চা পাঠাতে।”

কাঞ্চন রান্নাঘরে গিয়ে রাধামাধবদাকে চায়ের কথা জানিয়ে টুক করে হলঘরে চলে এল। আজ সে কোনো কথা মিস করতে চায় না। বিবস্বান চারদিকে দেখছিল। শান্ত চোখে জরিপ করে নিচ্ছিল জায়গাটাকে।

রামানুজ কথা শুরু করল, “আপনি তো সেকেন্ড কমান্ড ছিলেন। আপনার একেবারে ওপরে কর্কট নিজে।”

বিবস্বান রামানুজের কথায় না-এর ভঙ্গিমায় মাথা নাড়ে।

রামানুজ জিজ্ঞেস করে, “তাহলে মাঝে অন্য কেউ ছিলেন? “ বিবস্বান হাসল। হেসে বলল, “আপনি সোজা কাজের কথায় বিশ্বাসী, তাই না?”

রামানুজও হেসে বলল, “হ্যাঁ। এই কেসে সময় নষ্ট করার মতো সময়টাই আমার কাছে আর নেই। আমার মাথায় বহুদিন ধরেই প্রশ্নটা ঘুরছিল। আজ কাঞ্চন আপনার কথা বলার পর মনে হল এই বিষয়ে আমাকে সঠিক তথ্য দেওয়ার মতো একমাত্র লোক আপনি। কর্কট যদি সঠিক মানসিক অবস্থায় থাকতেন আমি আগেই জেনে নিতাম। কিন্তু এই অবস্থায় তাঁকে বিশেষ ঘাঁটাতে চাই না।”

বিবস্বান বলল, “আমিও সোজা কথাতেই বলি। বৃশ্চিক ছিল আমার থেকে পদাধিকারে বড়ো এবং গবেষণাগারে আমার থেকে অধিক ক্ষমতাধর মানুষ। এমনকি ঠাকুরদার বেশিরভাগ আবিষ্কার বৃশ্চিককে ছাড়া সম্ভব হত না। সেদিন যখন ঠাকুরদা-সহ প্রায় গোটা টিম আপনাদের সঙ্গে ছিল, ওইদিন আমাকে বৃশ্চিক বলেছিল কিছু যন্ত্রাদি তৈরির জন্য এক বিশেষ ধাতব পদার্থের প্রয়োজন। সেটা আহরণ করতে সে আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তাই সেদিন আমি বেঁচে যাই।”

রামানুজ তাকে থামিয়ে প্রশ্ন করল, “কেন, কেন? এটা সে করল কেন? তাহলে বৃশ্চিক কি কৈটভের সঙ্গে মিলে কোনো প্ল্যান করেছিল?”

বিবস্বান মাথা নাড়ে, “আমার সেটা মনে হয় না। এর পেছনেও একটা কারণ আছে। আসলে বৃশ্চিক বেশ কিছু সময় ধরেই কর্কটের একটা অত্যন্ত সাধের প্রোজেক্ট নিয়ে গবেষণার কাজ করছিল। মাইন্ড রিডার।”

রামানুজ-সহ বাকি সকলে একসঙ্গে বলল, “মাইন্ড রিডার?”

ঘরে যেন একটা বাজ পড়ল। তারপর সব চুপচাপ। মাইন্ড রিডিং করার যন্ত্র আবিষ্কার হয়ে গেলে যে কত অসম্ভব কাজ সম্ভব হয়ে যাবে তার ইয়ত্তা নেই। বিবস্বান মাথা ঝাঁকিয়ে নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, “হ্যাঁ, মাইন্ড রিডার।”

কাঞ্চন বলল, “তার মানে কার মনে কী চলছে সব বুঝে ফেলা যাবে?”

বিবস্বান ভ্রু নাচিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ। কিন্তু কাজটা যে সে করে ফেলেছিল তা আমি জানতাম না। এমনকি ঠাকুরদার কাছেও সেই খবর ছিল না। বৃশ্চিক আগে থেকেই জানত যে কৈটভের মনে কী চলছে। তাই সে আমাকে বের করে দিয়েছিল। কারণ আমিই একমাত্র লোক ছিলাম যে বৃশ্চিককে কিছুটা হলেও দমন করতে পারতাম।”

রামানুজ প্রশ্ন করল, “কিন্তু কৈটভকে সে সাহায্য করল কেন? আর কীভাবে?”

বিবস্বান উত্তরে বলল, “আমি যতটা অনুমান করতে পারছি যে সে কৈটভকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছে। ঠাকুরদা না-চাইলে কেউ পরীক্ষাগারে প্রবেশ করতে পারে না। এবার ঠাকুরদা সেদিন সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার এবং বৃশ্চিকের ওপর ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল। আমি ধাতবের সন্ধানে বেরিয়ে গিয়েছিলাম বলে শুধুমাত্র বৃশ্চিক ছিল সেদিন সর্বেসর্বা। সে গবেষণাগারের প্রবেশ অবাধ করে দিয়েছিল। ফলে ক্টৈভের পক্ষে সমস্ত কিছু চুরি করা সম্ভব হয়েছিল। নইলে সে কোনোভাবেই গবেষণাগারে ঢুকতে পারত না, এমনকি কোনো আবিষ্কার ব্যবহার করতেও পারত না।”

দাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “সে কোথায়? মানে বৃশ্চিক কোথায়?”

বিবস্বানের কপালে এবার চিন্তার ভাঁজ দেখা দিল। সে বলল, “সমস্ত মৃতদেহের সৎকার আমি করেছি। তাতে কোথাও বৃশ্চিকের লাশ ছিল না। আমার ধারণা সে অদৃশ্যভাবে কৈটভের সঙ্গে সময়যানে চড়ে বসেছিল।”

রাধামাধব চা দিয়ে গেল। সঙ্গে গরম গরম তেলেভাজা। চিকেন পকোড়া, বেগুনি এসব ছিল। বিবস্বানকে খাবার এগিয়ে দিতে গিয়ে রামানুজ মুখে চটক কাটল।

“কিন্তু সে এতসব করল কেন? এটা তো বুঝতে পারছি না।”

বিবস্বান বলল, “বৃশ্চিক প্রথম থেকেই ক্ষমতালিপ্সু ছিল। আর মিথ সংঘে সবকিছু যে শুধু ঠাকুরদার আদেশে চলে, তা সে বুঝতে পেরেছিল। তাই সে তক্কে তক্কে ছিল কখন ঠাকুরদাকে পেছনে ফেলে সে এগিয়ে যেতে পারবে। এ-নিয়ে আমার কাছে বহুবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল সে। আমি তাকে এসব ভাবতে বারণ করতাম। যদিও সে আমার কথায় বিশেষ কিছু গুরুত্ব দিত না। কিন্তু এরকম কাণ্ড যে ঘটাতে পারে তার বিন্দুমাত্র আঁচ আমি পাইনি। পেলে অবশ্যই ঠাকুরদাকে আগে থাকতে সতর্ক করতাম। ঠাকুরদা কৈটভকে বিশ্বাস করেছিল ঠিকই কিন্তু নিজের গবেষণাকেন্দ্রকে সুরক্ষিত করেও রেখেছিল। তাঁর সঙ্গে শুধু বাইরের লোক অর্থাৎ কৈটভ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। করেছে মিথ সংঘের ভেতরের লোকও। এখনও বৃশ্চিকের ব্যপারে তাঁকে জানাতে পারিনি। তিনি শুনতেও চান না অবশ্য।”

রামানুজ বারণ করল, “কর্কটকে এসব এখন বললে তিনি আরও ভেঙে পড়বেন। এগুলো এখন আমাদের মধ্যে থাকাই ভালো হবে। তবে এখন কী করা যায়?”

বিবস্বান বলল, “আমি ঠিক জানি না। ওরা এখন কোথায় আছে সেটাও জানি না। কারণ টাইম-টাকার জাতীয় আবিষ্কারগুলো একাধিক ছিল না। আসল যন্ত্রটাই ঠাকুরদা কৈটভের হাতে দিয়ে দিয়েছেন। সময়চক্রযানও আমরা আর ব্যবহার করতে পারব না।”

রামানুজের কান মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল, “সময়চক্রযান কেন ব্যবহার করতে পারব না? আমি তো আরও ভাবছিলাম, সব একটু ঠিকঠাক হয়ে গেলে আবার যাত্রা করব।”

বিবস্বান এই পরিকল্পনাকে পত্রপাঠ বিদায় করে, “অসম্ভব। বৃশ্চিক গবেষণাগার খুলে দিয়েছিল। বিভিন্ন আবিষ্কার সম্পর্কিত তরল কৈটভ চুরি করে ফেলেছে। বৃশ্চিকের সাহায্য ছাড়া ঠাকুরদাও সেগুলো আর একা তৈরি করতে পারবেন না।”

রামানুজের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তার সমস্ত প্ল্যান চৌপাট হয়ে গেল। সময়চক্রযান ছাড়া কৈটভকে ধরার কোনো উপায় নেই। কৈটভ পালিয়ে গেছে সময়ের চক্রে। সেই চক্রে না-পৌঁছালে তাকে খোঁজার প্রশ্নই আসে না।

বিবস্বান বলল, “আপাতত হতাশ হয়ে লাভ নেই। সঠিক সময়ের আগে কিছুই সম্ভব না। এই কাহিনি আপনাদের বললাম কারণ আপনারাই এই দুঃসাহসিক অভিযানে প্রথম থেকে আছেন। আপনাদের সমস্ত কিছু জানার অধিকার আছে। কাঞ্চন বলেছে বলেই যে আমি আপনাকে বলেছি তা কিন্তু নয়। আমি অনেক কিছু ভেবেচিন্তেই আপনার কাছে এসেছি।”

রামানুজ বলল, “ধন্যবাদ। কিন্তু এখন কী করা উচিত আমি নিজেই জানি না।”

বিবস্বান বলল, “অপেক্ষা করুন। আর তো কিছুই আমাদের হাতে নেই। সময়ের আগে সময়ের ধাঁধার সমাধান কেউ করতে পারে না।”

বিবস্বান সেদিনের মতো উঠে পড়ল। কাঞ্চন তাকে গ্রাম অবধি পৌঁছে দিল। ততক্ষণে পাহাড়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। কুয়াশায় ঢেকে গেছে এই অঞ্চল। এমনকি ঘরের ভেতরেও কুয়াশা জমেছে। রাত বাড়তে থাকে। সকলে ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু জেগে থাকে রামানুজ। নেশার তরলে বুঁদ হয়ে বারবার ভাবতে থাকে কৈটভের কথা। বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “একবার কাছে আয়। তোকেও ছিঁড়ে ফেলে দেব। স্কাউন্ডেল!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *