সোমনাথ সুন্দরী – ৮

প্রতিদিনের মতোই সেদিনও সেই সোনার শিকলের শব্দেই ঘুম ভাঙল অঙ্গিরার। গতরাতে দেবদাসী সমর্পিতার কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল অঙ্গিরা। সে তাকে নিয়ে স্বপ্নও দেখেছে। ঘুম ভাঙার পর ব্যাপারটা ভেবে বেশ অবাক হল অঙ্গিরা। সমর্পিতা নামে ওই দেবদাসীর নৃত্য এভাবে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে কেন?

শিকলধ্বনির সঙ্গে সঙ্গেই জেগে উঠতে শুরু করল বাইরের পৃথিবী। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জন পরিবর্তিত হল কোলাহলে। পাথরের জাফরির ফাঁক গলে একটা আলোকরেখা প্রবেশ করেছে কক্ষে। কুলুঙ্গির ওপর এসে পড়েছে সেই আলো। তাতে চিকচিক করছে সেই ঘুঙুরদানাটা।

অঙ্গিরা শয্যা ত্যাগ করার পর সে কারণেই ঘুঙুরদানাটা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দানাটা তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তার যেন মনে হল দানাটা সুর্বণ নির্মিত! গত রাতে আধো-অন্ধকারে ব্যাপারটা সে ঠিক বুঝতে পারেনি। দানাটা কার কাছে ফেরত দেওয়া উচিত বা আদৌ ফেরত দেবার প্রয়োজন আছে কিনা, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না অঙ্গিরা। ঘুঙুরদানাটা আবার সে যথাস্থানে রেখে দিল।

অঙ্গিরার বাইরে বেরিয়ে নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের কোনও ব্যাপার নেই। তাই শয্যা ত্যাগ করলেও সে অতিথি নিবাস ত্যাগ করল বেশ অনেকটা সময় পরে। ততক্ষণে ত্রিপুরারিদেব গর্ভগৃহর দ্বারোদঘাটন করেছেন, দেবদাসীদের নৃত্যগীতও সমাপ্ত। মন্দির চত্বরে প্রবেশের জন্য বাইরে অপেক্ষারত ভক্তকূলের উদ্বেলিত জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত হতে শুরু করেছে।

অতিথি নিবাস থেকে বাইরে বেরিয়ে অঙ্গিরা যখন অঙ্গণ, বাগিচা ইত্যাদি অতিক্রম করে মন্দিরের প্রবেশ তোরণের সামনে উপস্থিত হল, ঠিক সেই সময়ই পুণ্যার্থীদের জন্য তোরণ উন্মুক্ত করা হল। ‘জয় সোমেশ্বরের জয়! জয় সোমনাথের জয়’ ধ্বনি দিতে দিতে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো চত্বরে প্রবেশ করে মন্দিরের দিকে ধাবিত হতে লাগল সোমেশ্বর মহাদেবের ভক্তবৃন্দ। কোনক্রমে তাদের পাশ কাটিয়ে তোরণ থেকে বাইরে বেরিয়ে সমুদ্র তীরের দিকে পা বাড়াল অঙ্গিরা।

সমুদ্রতটে প্রতিদিনের মতোই পরিচিত দৃশ্য। সেখানেও পুণ্যার্থী সমাগম হতে শুরু করেছে। সার বেঁধে বসে থাকা ক্ষৌরকারদের কাছে তারা কেউ মস্তক মুণ্ডন করাচ্ছে, সমুদ্রে অবগাহন করছে অথবা ব্রাহ্মণরা তাদের দিয়ে পিণ্ডদান করাচ্ছে।

প্রচলিত ধর্মের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর আত্মারা দেহত্যাগ করে এই সোমেশ্বর মন্দিরে সমবেত হন পুনর্জন্ম অথবা মুক্তি লাভের আগে। যিনি সোমেশ্বর, তিনিই মহাদেব, তিনিই তো আবার ভূতনাথ। তাই প্রেত সমাগম ঘটে এখানে। প্রভাসপত্তনে পিণ্ডদান করলে পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তি ঘটে। তাই অনেকেই এখানে পিণ্ডদান করেন।

ওই পিণ্ড ভক্ষণের জন্য বড়বড় বায়সপক্ষী ঘুরে বেড়ায় সমুদ্র তটে। অনেকের এ-ও বিশ্বাস যে প্রেতাত্মারা ওই দাঁড়কাকের রূপ ধারণ করে পিণ্ড ভক্ষণ করতে আসে।

অঙ্গিরা তার পিতা-মাতার নির্দেশ মতো তাদের পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করেনি। তার পিতার আত্মাও কি মৃত্যুর পর এই সোমেশ্বর মন্দিরে এসে উপস্থিত হয়েছেন? বায়সপক্ষী রূপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সমুদ্রতটে মুক্তিলাভের আশাতে? কথাটা একবার মনে হল অঙ্গিরার।

অঙ্গিরা এসবের পাশ কাটিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে, পৃথিবীর শেষ ভূখণ্ডে যেখানে সেই স্তম্ভটা দাঁড়িয়ে আছে, তার কাছাকাছি সমুদ্রতটে পড়ে থাকা একটা শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডের ওপর বসল। এদিন বিকালে ত্রিপুরারিদেব তার অস্ত্রপরীক্ষা নেবেন। সে পরীক্ষাতে যে সে উত্তীর্ণ হবে সে আত্মবিশ্বাস তার আছে। তবে প্রধান পুরোহিত তাকে ঠিক কোন কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করতে চান, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না অঙ্গিরা। এবং সে সম্পর্কে ত্রিপুরারিদেবের কাছে প্রশ্ন করা সমীচীন হবে কিনা তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে। তার চোখের সামনে কূলহীন নীল সমুদ্র। তার মাথার ওপর পাক খাচ্ছে গাঙচিলের দল। সেদিকে তাকিয়ে নানা কথা ভাবতে লাগল অঙ্গিরা।

হঠাৎ বাদ্যযন্ত্রের শব্দ কানে গেল তার। শব্দটা আসছে তার পিছনের মন্দির প্রাকার যেখানে বাঁক নিয়েছে সেদিক থেকে। অঙ্গিরা তাকাল সেদিকে। বাদ্যযন্ত্রের শব্দ ক্রমশ নিকটবর্তী হতে থাকল। তারপর বাঁকের আড়াল থেকে প্রথমে আত্মপ্রকাশ করলেন পুরোহিত মল্লিকার্জুন ও কয়েকজন সেবায়েত। সহ প্রধান পুরোহিতের মাথায় ছত্রধর ছাতা ধরে আছে। তাদের দেখে অঙ্গিরা অনুমান করল মন্দির থেকে সমুদ্রতটে নির্গমনের জন্য কোনও একটা পথ আছে বাঁকের আড়ালে।

মল্লিকার্জুনের কিছুটা তফাতে আবির্ভূত হল বাদ্যকারেরা, আর তার পিছনে নৃত্যরত দেবদাসীরা। তাদের সোনার কঙ্কণ, পায়ের নূপুর সূর্যালোকে ঝিলিক দিচ্ছে। দেবতার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরে কোনও নৃত্যগীত পরিবেশিত হবে নাকি?

কৌতূহলবশত সেদিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল অঙ্গিরা। কিন্তু নৃত্যরত দেবদাসীদের পিছনে পিছনে এরপর যা প্রাকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল তা দেখে বেশ বিস্মিত হল অঙ্গিরা। বাঁশের খাঁচায় একটা শব বহন করে আনছে কয়েকজন দেবদাসী। আর সেই শব বাহকদের ঘিরেও নৃত্য করছে আরও একদল দেবদাসী!

অগ্রবর্তী মল্লিকার্জুন এসে দাঁড়ালেন সমুদ্র কিনারে, যেখানে জল এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে সমুদ্রতট। হাতের লাঠিটা তুলে তিনি তার সামনে একটা স্থান নির্দেশ করলেন। সেখানেই শব সমেত খাঁচাটা নামিয়ে রাখা হল। নারীর শবদেহ। পরনে তার নতুন পট্টবস্ত্র। ফুলমালা শোভিত শরীর। কুমকুম চর্চিত এক নারীর মুখমণ্ডল।

ব্যাপারটা দেখে কৌতূহলী হয়ে অঙ্গিরা তাদের কিছুটা কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তাকে অবশ্য ভ্রুক্ষেপ করল না কেউ। সবারই দৃষ্টি শবদেহের ওপর নিবদ্ধ। অঙ্গিরাও ভালো করে তাকাল সেই শবদেহর দিকে। এক যুবতী নারীর দেহ।

তার পায়ে ঘুঙুর দেখে অঙ্গিরা অনুমান করল এই মৃতা রমণীও কোনও সোমনাথ সুন্দরী হবে। একটা ক্ষুদ্রাকৃতি কাষ্ঠপেটিকা তার বুকের ওপর রাখা। মৃতার দক্ষিণ হস্ত তার ওপর রাখা। যেন ওই কাষ্ঠপেটিকা বুকে চেপে ধরে আছে সে।

তাঁর দিকে তাকিয়ে মল্লিকার্জুন কি যেন বললেন দেবদাসীদের উদ্দেশ্যে। সেই শবদেহকে ঘিরে দেবদাসীরা এরপর বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করতে লাগল।

তার সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যকাররা উচ্চনাদে তাদের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে লাগল। ব্যাপারটা দেখে বেশ কিছুটা অবাক হয়ে গেল অঙ্গিরা। মৃতার প্রতি শোক প্রকাশ না করে নৃত্য পরিবেশন করছে কেন দেবদাসীরা?’

অঙ্গিরার মনে প্রশ্নটা উদয় হতেই কাকতালীয় ভাবে তার ঠিক পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘এই নারী জন্মর দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি ঘটল ওর। তাই অন্য দেবদাসীরা আনন্দ প্রকাশ করছে ওর মুক্তি উপলক্ষে।’

কথাটা কানে যেতে মৃদু চমকে উঠে অঙ্গিরা দেখল তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শনের মতো চুল আর বলিরেখাময় মুখ সমৃদ্ধ সেই নরসুন্দর শিরোমণি খগেশ্বর। আবছা হাসি লেগে আছে তার ঠোঁটের কোণে।

অঙ্গিরা জানতে চাইল, ‘কি রোগে মৃত্যু হল ওর? বার্ধক্য তো গ্রাস করেনি ওকে! ওর পরিচয় কী?’

খগেশ্বর জবাব দিল, ‘ওর নাম অবন্তিকা। কিছু বৎসর আগে কাশীরাজ একটি হস্তি, একটি হীরকখণ্ডসহ এই কন্যাকে মন্দিরে দান করেছিল। ধুতুরা, ধুতুরার বিষে মৃত্যু হয়েছে ওর।’

কথাটা শুনে অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে বলল ‘আত্মহত্যা?’

খগেশ্বর বলল, ‘আত্মহত্যা হতে পারে, হত্যাও হতে পারে। তবে যে ভাবেই ওর মৃত্যু হোক না কেন, এ মৃত্যুর পিছনে আমার একটা অনুমান আছে। কারণ হয়তো কিছু সময়ের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাবে।’ এ কথা বলে থেমে গেল খগেশ্বর।

বেশ অনেকটা সময় ধরে শবদেহকে ঘিরে সোমনাথ সুন্দরীদের নৃত্যগীত চলল। ইতিমধ্যে মল্লিকার্জুনের অনুচররা একটা ভেলা বানিয়ে ফেলেছে। নৃত্য সমাপ্ত হলে শবের এক পাশে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল দেবদাসীরা। পুরোহিতের এক পাশে মাটির ভাণ্ডে কিছু উপাচার নিয়ে দাঁড়াল কয়েকজন। ধুনো, হরিতকি, তিল, গন্ধদ্রব্য ইত্যাদি উপাচার।

মল্লিকার্জুন মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে পাত্র থেকে সে সব মুঠো করে তুলে নিয়ে বর্ষণ করতে লাগলেন মৃতদেহে। এরপর একজন অঙ্গারপূর্ণ একটা পাত্র এনে ধরল মল্লিকার্জুনের সামনে! তিনি একটা লৌহ শলাকা দিয়ে প্রথমে একটা অঙ্গারখণ্ড প্রতিস্থাপন করলেন মৃতদেহের মুখে, আর অপর একটি ক্ষুদ্রাকৃতির জ্বলন্ত অঙ্গার স্থাপন করলেন মৃতার উদরে। তাই দেখে বহুদর্শী খগেশ্বর, অঙ্গিরাকে অবাক করে চাপা স্বরে বলল, ‘আমার অনুমানই ঠিক ছিল। এ রমণী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েছিল। নইলে পুরোহিত ওর উদরে অঙ্গার স্থাপন করতেন না। এ কারণেই মরতে হল মেয়েটাকে।’

অঙ্গিরা বিস্মিতভাবে বলল, ‘কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব?’

ক্ষৌরকার দলপতি বলল, ‘হ্যাঁ, সম্ভব। ওর গর্ভে ছিল রাত্রির ফসল। আপনাকে আমি বলেছিলাম না, দিনে নয়, আসলে রাত্রিতেই জেগে ওঠে এ মন্দির। কত কিছু যে ঘটে তখন!’

অঙ্গার প্রতিস্থাপনের পর একজন সেবায়েত মৃতের পায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ে কী যেন করতে লাগল। অঙ্গিরাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেবার জন্য খগেশ্বর বলল, ‘জানেন তো এই সব কন্যাদের মহাদেবের উদ্দেশ্যে সমর্পণের পর, অর্থাৎ তারা দেবদাসী হবার পর তাদের প্রত্যেককে সোমেশ্বর মহাদেবের স্পর্শ পাওয়া একটা করে ঘুঙুরদানা দেওয়া হয়। যা দেবদাসীরা তাদের পায়ের ঘুঙুর ছড়ার সঙ্গে বাঁধে। বলা যেতে পারে ওই বিশেষ ঘুঙুরদানাই সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে ওই নারীদের বন্ধন রচনা করছে। সেবায়েত সেই বিশেষ ঘুঙুরদানাটি খুলে নিচ্ছে। ওটা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই এ জন্মের মতো এ মন্দিরের সঙ্গে, সোমেশ্বর মহাদেবের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে ওর।’

সেয়াবেত কাজটা সম্পন্ন করল। ঘুঙুর দানাটা সে খুলে ফেলল মৃতার ঘুঙুর ছড়া থেকে। মৃতার পাশ থেকে সরে দাঁড়াল দেবদাসীর দল। এবার তাকে শেষ বিদায় জানাবার জন্য বুকের কাছে হাত জোড় করে দাঁড়াল দেবদাসীরা। অঙ্গিরা এবার তাদের মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারল তাদের অনেকেরই চোখের কোণে টলটল করছে অশ্রুবিন্দু।

পুরোহিত মল্লিকার্জুনের কাজ শেষ হয়ে গেছিল। কয়েকজন সেবায়েত মিলে চালি সমেত মৃতদেহটাকে ভেলার ওপর তুলে দিল। তারপর ভেলাটাকে জলে নামিয়ে ঠেলতে শুরু করল ভূভাগের শেষ সীমানাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্তম্ভর দিকে। ভেলা নিয়ে স্তম্ভর কাছে পৌঁছে গেল তারা। লোকগুলো কিন্তু স্তম্ভ অতিক্রম করল না। তাদের পাতাল প্রবেশের ভয় আছে। স্তম্ভর এপাশে দাঁড়িয়ে তারা ভেলাটাকে সজোরে ঠেলে দিল স্তম্ভর ওপাশে।

স্তম্ভ অতিক্রম করেই ভেলাটা বেশ কয়েকবার পাক খেল, তারপর মৃতদেহ নিয়ে উল্কার গতিতে ছুটতে শুরু করল মহাসমুদ্রের দিকে। মুক্তি ঘটল সেই হতভাগ্য অথবা ভাগ্যবতী দেবদাসীর। পুরোহিত মল্লিকার্জুন ও দেবদাসীর দল মন্দিরে প্রবেশের জন্য পা বাড়াল।

সকালবেলাই এ ঘটনাটা দেখে অঙ্গিরার মন কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল। সে স্থানে থাকার আর ইচ্ছা রইল না তার। তা ছাড়া একটা বড় তীর্থযাত্রীর দলকেও সেদিকে আসতে দেখল অঙ্গিরা। সে পাশে দাঁড়ানো খগেশ্বরকে বলল, ‘এবার আমাকে ফিরতে হবে।’

খগেশ্বর বলল, ‘আমাকেও কার্যোপলক্ষে মন্দিরে প্রবেশ করতে হবে। চলুন তবে একত্রে যাই।’

দুজনে এক সঙ্গে পা বাড়াল মন্দিরে যাবার জন্য। পথে যেতে যেতে খগেশ্বর বলল, ‘সব দেবদাসীদের শেষ পরিণতি কিন্তু এটাই। সমুদ্রতে ভেসে যাওয়া, এভাবেই তাদের অন্ত্যেষ্টি কার্য সম্পন্ন হয়।’

এ কথা বলার পর খগেশ্বর হঠাৎ বলল, ‘এক নতুন দেবদাসী, ওই যে প্রধান পুরোহিত যাঁর নাম রেখেছেন ‘সমর্পিতা’, তার রূপের কথা, নাচের কথা আজকাল অনেকেই আলোচনা করছেন। কেউ কেউ বলছেন যে ওই মেয়েটির নাকি ভবিষ্যতে দেবদাসীশ্রেষ্ঠা তিলোত্তমার স্থলাভিষিক্ত হবার প্রবল সম্ভাবনা। আমি তার নৃত্য না দেখলেও তাকে দেখেছি। ওদের বাসস্থানে মাঝে মাঝে নখর ছেদনের জন্য যেতে হয় আমাকে। তখনই দেখেছি। আপনি তাকে দেখেছেন? তার নৃত্য দেখেছেন? আমার অবশ্য তার নৃত্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি।’

চলতে চলতে অঙ্গিরা একটু ইতস্তত ভাবে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি। সন্ধ্যারতির সময় সে নৃত্য পরিবেশন করে। সত্যি, অতীব সুন্দর সেই নৃত্য বিভঙ্গ।’

কথাটা শুনে ক্ষৌরকার অধিপতি বলল, ‘যার কাছে সোমেশ্বর মুদ্রা আছে সে তো সর্বত্রগামী।’

অঙ্গিরা বলল, ‘সন্ধ্যারতি দর্শনের জন্য প্রধান পুরোহিত আমাকে বিশেষ অনুমতি দিয়েছেন।’

বৃদ্ধ খগেশ্বর বললেন, ‘আপনার সম্বন্ধে একটা ব্যাপারে খুব কৌতূহল হচ্ছে। সোমেশ্বর মুদ্রা তো সকলের কাছে থাকে না! অন্য যাদের কাছে এখানে সোমেশ্বর মুদ্রা আছে তাদের অনেককেই চিনি। তাদের কেউ হয়তো মন্দিরের কোনও অংশ নির্মাণে প্রভূত অর্থ ব্যয় করেছেন, কেউ বা তীর্থযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পান্থশালা নির্মাণের মতো জনহিতকর কার্য সম্পাদন করেছেন, কেউ-বা কোনও দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেছেন মন্দিরকে, নিদেনপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরের সেবা করেছেন বা একনিষ্ঠ ভাবে পালন করেছেন মন্দিরের কোনও গুরুদায়িত্ব। তারপর তারা হস্তগত করেছেন সেই মুদ্রা। বয়সে তারা অধিকাংশই বৃদ্ধ অথবা নিদেনপক্ষে প্রৌঢ়। কিন্তু আপনার মতো তরুণ এই দুর্মূল্য মুদ্রা কীভাবে সংগ্রহ করলেন তা জানতে আগ্রহবোধ করছি।’

অঙ্গিরা বলল, ‘এ মুদ্রা আমার পিতা-মাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত।’

জবাব শুনে খগেশ্বর বলল, ‘কোথায় থাকেন তারা? নিশ্চয়ই তাঁরা কোনও না কোনও ভাবে মন্দিরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন বা আছেন?’

অঙ্গিরা বলল, ‘তারা বল্লভী নগরীতেই থাকতেন। কিছু মাস পূর্বে তারা প্রয়াত হন। তবে এক সময় তারা এই মন্দিরে ছিলেন বলে শুনেছি।’

অঙ্গিরার কথা শুনে খগেশ্বর বলল, ‘কী নাম তাদের? হয়তো আমি তাদের চিনব।’

কথা বলতে বলতে কথার ভিতর জড়িয়ে যাচ্ছে অঙ্গিরা। বিস্তারিত আত্মপরিচয় লোকটার কাছে প্রকাশ করা উচিত হচ্ছে কিনা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তবু সে জবাব দিল, পিতার নাম মারীচ, মাতা অম্বালিকা।’

খগেশ্বর বিড় বিড় করে নাম দুটো উচ্চারণ করে তার শনের মতো চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘না, ঠিক মনে আসছে না। বৃদ্ধ হয়েছি তো। মাঝে মাঝে স্মৃতিশক্তি লোপ পায়।’ এ কথা বলার পর খগেশ্বর আর কোনও কিছু বলল না। নিশ্চুপ ভাবে হাঁটতে হাঁটতে সে মনে হয় ভাবার চেষ্টা করতে লাগল ও নাম দুটি সম্পর্কে কোনও কথা মনে পড়ে কিনা।

কিছু সময়ের মধ্যেই ভিড় ঠেলে মন্দিরে প্রবেশ করল তারা। নাপিত শিরোমণি, অঙ্গিরার কাছে বিদায় নিয়ে নিজের কর্মোপলক্ষে অন্যদিকে চলে গেল। আর অঙ্গিরা ফিরে এল অতিথিশালাতে। দ্বিপ্রহরে স্নানাহার সাঙ্গ করার পর নিজের অস্ত্রগুলো নিয়ে তাদের পরিচর্যায় বসল সে। ভালো করে ধনুকের ছিলা বন্ধন করল। তিরের ফলাগুলো ও তরবারি কোষমুক্ত করে পাথর খণ্ডে ঘষে ঘষে আরও তীক্ষ্ন আর ধারালো করে তুলল।

বিকাল হয়ে এল। অঙ্গিরার মন চঞ্চল হতে শুরু হল। সন্ধারতির সময় হয়ে আসছে। অঙ্গিরার চোখ পড়ল কুলঙ্গিতে রাখা ঘুঙুরদানার ওপর। পোশাক পরিবর্তন করে মন্দিরের গর্ভগৃহতে যাবার জন্য প্রস্তুত হল সে।

ঠিক সেই সময়তেই নিজের কক্ষে ফুলমালা পট্টবস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছিল সমর্পিতা বা রাজশ্রী। এক তীব্র বিষণ্ণতা ছেয়ে আছে তার মনকে। যে দেবদাসীর মৃত্যু ঘটেছে তার সঙ্গে সমর্পিতার সখ্য না থাকলেও তার মৃত্যু বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে তাকে। তার জীবনের শেষ পরিণতি কি অমন কিছুই? তাকেও কি দেবদাসী অবন্তিকার মতো ভেসে যেতে হবে, হারিয়ে যেতে হবে সমুদ্রের বুকে?

বাইরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। সন্ধ্যারতিতে নৃত্য পরিবেশনে যাবার জন্য সমবেত হচ্ছে দেবদাসীরা। বাইরে থেকে তাদের কলহাস্যর মৃদু শব্দ আর নূপুর ধ্বনি ভেসে আসছে। মন যতই বিষণ্ণ হোক না কেন তাকে নৃত্য পরিবেশন করতে যেতে হবে, সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে।

প্রস্তুতির অন্তিম পর্বে পায়ে ঘুঙুর বাঁধতে বসল সমর্পিতা। হঠাৎই সে খেয়াল করল তার একটি ঘুঙুর ছড়ার মধ্যে সেই স্বর্ণ ঘুঙুরদানাটা নেই! যে ঘুঙুরদানা তাকে দেবদাসী রূপে গ্রহণ করার পর তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কোথায় গেল সেটা?

সমর্পিতা কক্ষের মধ্যে খুঁজতে লাগল। সে যে কুলুঙ্গিতে ঘুঙুরছড়া রাখে, ঘরের মেঝে বা শয্যায় কোথাও সেটা পড়ে নেই। ঘুঙুরছড়া হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে সমর্পিতা ভাবতে লাগল কোথায় খসে পড়ে থাকতে পারে সেটা? গর্ভগৃহ চত্বরে, নাকি সেখানে যাওয়া আসার পথে কোনও স্থানে?

ঠিক সেই সময় কক্ষে প্রবেশ করল দেবদাসী উত্তরা। সমর্পিতার কক্ষ ত্যাগে বিলম্ব হচ্ছে বলে সে তাকে ডাকতে এসেছে। চিন্তান্বিত মুখে সমর্পিতাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘তোমার শরীর খারাপ নাকি?’

সমর্পিতা জবাব দিল, ‘না, শরীর ঠিক আছে।’

উত্তরা বলল, ‘তবে তোমাকে চিন্তাক্লিষ্ট লাগছে কেন?’

সমর্পিতা ইতস্তত করে জবাব দিল, ‘সেই সোনার ঘুঙুরদানা যেটা আমাকে দেওয়া হয়েছিল সেটা ছড়ার মধ্যে নেই। কোথাও খুলে পড়েছে ছড়া থেকে।’

কথাটা শুনেই উত্তরা চাপা স্বরে বলে উঠল, ‘ওটা খুঁজে না পেলে তোমার বিপদ হবে। ওই ঘুঙুর পায়ে না থাকলে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে নৃত্য পরিবেশন করতে দেওয়া হয় না দেবদাসীদের। এক বৎসরকাল দেবদাসীদের তখন অন্য দেবদাসীদের পরিচারিকার কাজ করতে হয় ঘুঙুর হারিয়ে ফেলার শাস্তি হিসাবে। তারপর প্রধান পুরোহিত যদি মনে করেন যে তাকে নতুন ঘুঙুরদানা দেবেন, তবে সে আবার দেবদাসীর পূর্ণ মর্যাদা ফিরে পায়। নচেৎ বাকি জীবনটা তাকে পরিচারিকা হিসাবেই কাটাতে হয়।’

উত্তরার কথা শুনে সমর্পিতা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বলল, ‘তবে কি হবে?’

একটু ভেবে নিয়ে উত্তরা বলল, ‘ব্যাপারটা কাউকে জানানোর দরকার নেই। কারোর খেয়াল না করারই কথা তোমার ঘুঙুরের ছড়াতে যে সেটা নেই। দেখি তোমার জন্য একটা অমন ঘুঙুরদানা জোগাড় করতে পারি কিনা?’ সমর্পিতা জিগ্যেস করল ‘কী ভাবে তুমি তা জোগাড় করবে?’

উত্তরা বলল, ‘আমি রাতে যার কাছে অভিসারে যাই, তাকে অমন একটা দানা বানিয়ে দিতে বলব। এখন তাড়াতাড়ি বাইরে চলো। নইলে তিলোত্তমার মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটবে।’

উত্তরার কথা শুনে এরপর দ্রুত ঘুঙুরছড়া পায়ে বেঁধে কক্ষত্যাগ করল সমর্পিতা। প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে দেবদাসীরা যখন দলবদ্ধ ভাবে গর্ভগৃহ চত্বরে উঠে এল তখন সেখানে সার সার সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে উঠেছে। বাদ্যকারের দলও উপস্থিত হয়েছে সেখানে। প্রতিদিনের মতোই প্রদীপদণ্ড তুলে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আরতি শুরু করলেন পুরোহিত নন্দিবাহন। ঘণ্টাধ্বনি আর ধূপের ধোঁয়াতে ভরে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর। আরতি সাঙ্গ হলে সমবেত নৃত্য শুরু করল দেবদাসীরা।

সমর্পিতা একপাশে দাঁড়িয়ে গর্ভগৃহ চত্বরের চারদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল স্তম্ভগুলোর আনাচে কানাচে কোথাও তার ঘুঙুরদানাটা পড়ে আছে কিনা? তবে সেটা যদি সেখানে পড়েও থাকে তবে তা আর পাবার সম্ভাবনা যে কম, সমর্পিতা ব্যাপারটাও অনুমান করল। কারণ, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হাজারে হাজারে মানুষ এই চত্বর পরিভ্রমণ করেছে। হয়তো বা তারাই কেউ দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে নিয়েছে সেই সুবর্ণ ঘুঙুরদানা।

সমবেত নৃত্য চলল বেশ কিছু সময় ধরে। সে নৃত্য সমাপ্ত হলে দেবদাসী শ্রেষ্ঠা তিলোত্তমা, সমর্পিতাকে ইশারা করল একক নৃত্য পরিবেশনের জন্য। গর্ভগৃহ তোরণের সমুখ ভাগে চত্বরের কেন্দ্রস্থলে এসে দাঁড়াল সমর্পিতা। তার খালি মনে হতে লাগল তার পায়ের ঘুঙুরছড়ার দিকে কেউ তাকিয়ে নেই তো? কেউ খেয়াল করেনি তো তার পায়ে সুবর্ণ ঘুঙুর দানা নেই!

মহাদেবকে প্রণাম জানিয়ে নৃত্য শুরু করল দেবদাসী সমর্পিতা। দেবদাসী আর বাদ্যকাররা ছাড়া মুষ্টিমেয় যে ক’জন সেখানে উপস্থিত তারা অবাক হয়ে দেখতে লাগল দেবদাসীর অপূর্ব নৃত্যকলা। আজ যেন অনেক বেশি দ্রুত ছন্দে নৃত্য পরিবেশন করছে দেবদাসী সমর্পিতা।

ব্যাপারটা সত্যি, যাতে কেউ তার পায়ের ঘুঙুরছড়ার ওপর মনোযোগ দিয়ে কিছু লক্ষ না করতে পারে তাই অতি দ্রুত পদসঞ্চালন করতে লাগল সে। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নৃত্যরত সমর্পিতা বিদ্যুৎ গতিতে স্থান পরিবর্তন করতে লাগল।

একপাশে সরে দাঁড়িয়েছে অন্য দেবদাসীরা। নৃত্যের ভঙ্গীতে সমর্পিতা কখনও বৃত্তাকারে পাক খেতে লাগল গর্ভগৃহর সামনে। দ্রুত লয়ে বেজে চলছে বাদ্যযন্ত্র। ঘূর্ণায়মান সমর্পিতার ঘুঙুরের ছমছম শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহ চত্বর। সত্যি ইন্দ্রসভা থেকে উর্বশী যেন নৃত্য পরিবেশন করছেন সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে।

কিন্তু এরপরই ঘটনাটা ঘটল। নৃত্যরত অবস্থায় সমর্পিতা মাঝে-মাঝেই এগিয়ে যাচ্ছিল গর্ভগৃহর তোরণের একেবারে সামনে। যাতে গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে শূন্যে ভাসমান সোমেশ্বর মহাদেব ভালো ভাবে তার নৃত্য দর্শন করতে পারে সেজন্য।

আরতি শেষ হবার পর পুরোহিত নন্দিবাহন প্রদীপদণ্ডটা নামিয়ে রেখেছিলেন গর্ভগৃহর দ্বারপ্রান্তে। শাখা সমৃদ্ধ প্রদীপদণ্ডের প্রদীপগুলো তখনও জ্বলছিল। নৃত্যরতা দেবদাসীর আঁচল হঠাৎই গিয়ে পড়ল তার ওপর। শুষ্ক পট্টবস্ত্রে প্রথমে অগ্নিস্ফুলিঙ্গির সৃষ্টি হল, তারপর তা জ্বলে উঠল! সমর্পিতা খেয়ালই করেনি ব্যাপারটা। সে নেচে চলেছে।

ব্যাপারটা খেয়াল করতেই আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল দেবদাসীরা। কিন্তু সমর্পিতার কাছে ছুটে যাবার সাহস তাদের হল না। আর সমর্পিতা যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারল তখন এক অগ্নিবলয় গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে তাকে। কিন্তু কিছুতেই সে যেন তার নৃত্যগতি রুদ্ধ করতে পারছে না! আর এরপরই কেউ যেন বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে তার জ্বলন্ত আঁচল ধরে সজোরে টান দিল। আর সেই আকর্ষণে সমর্পিতা কয়েকবার পাক খেয়ে তার শরীর আবৃত করে থাকা নীলাম্বরি থেকে মুক্ত হয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল।

সম্বিত ফিরে উঠে বসতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল সমর্পিতার। কিছুটা তফাতে মাটিতে পড়ে থাকা নীলাম্বরির দিকে প্রথমে চোখ গেল তার। সেই বস্ত্রখণ্ড তখন দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে! তা দেখে শিউরে উঠল সমর্পিতা। আর এক মুহূর্ত হলেই তো ওই লেলিহান অগ্নিশিখা স্পর্শ করত তার শরীরকে।

এরপরই সে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। তার পরনে সেবায়েতদের মতো শুভ্রবসন নয়, পুরোহিতদের মতো সে মুণ্ডিত মস্তক, শিখাধারীও নয়। তীক্ষ্ন নাসা, কুঞ্চিত কেশ, তামাটে গাত্রবর্ণের, ধনুকের ছিলার মতো নির্মেদ, ঋজু, এক যুবক চেয়ে আছে তার দিকে।

সমর্পিতার রক্ষাকর্তা ওই যুবক। সে-ও কিছুটা বিস্মিত ভাবে চেয়ে আছে ভূমিতে পতিত, সদ্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ওই দেবদাসীর দিকে। সমর্পিতা তার দিকে তাকাতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হলো তাদের দুজনের মধ্যে। আর এরপরই সমর্পিতার খেয়াল হল বর্তমানে সে প্রায় অর্ধনগ্ন! অন্তর্বাস ছাড়া পরনে কিছু নেই! সমর্পিতার গাঢ় বক্ষ বিভাজিকা সম্পন্ন স্তন যুগলের স্পষ্ট অবয়ব, মুদ্রার আকৃতির গভীর নাভি কূপ, কদলী কাণ্ডের মতো মসৃণ উরু যুগল, সবই উন্মুক্ত বা প্রকট ভাবে ধরা দিচ্ছে যুবকের চোখে!

ব্যাপারটা মাথায় আসতেই সমর্পিতা লজ্জিত ভাবে দু-হাত বুকে চাপা দিল তার বক্ষ বিভাজিকা আড়াল করার জন্য। যুবকও যেন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সমর্পিতার ওপর থেকে। আর এরপরই চারপাশ থেকে ছুটে এল তিলোত্তমা-সহ অন্য দেবদাসীরা। এতক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকার পর হুঁশ ফিরেছে তাদের। কে যেন একটা বস্ত্রখণ্ড দিয়ে আবৃত করল সমর্পিতার শরীর। তারপর তাকে উঠিয়ে নিয়ে দেবদাসীরা গর্ভগৃহ চত্বর ত্যাগ করল।

গম্ভীর মুখে গর্ভগৃহের কপাট বন্ধ করলেন নন্দিবাহন। এ ধরনের ঘটনা অমঙ্গলসূচক। প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবকে এ সংবাদ জানাতে হবে। তিনি এগোলেন প্রধান পুরোহিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। অঙ্গিরা একপাশে কিছুটা সরে দাঁড়িয়েছিল। এবার তাকে ফিরতে হবে। ফেরার জন্য সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল রক্ষীপ্রধান জয়দ্রথকে। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘চলুন, এবার তবে ফেরা যাক। আপনার জন্যই নিশ্চিত রক্ষা পেল ওই দেবদাসী।’

জয়দ্রথের সঙ্গে ফেরার জন্য পা বাড়িয়ে অঙ্গিরা বলল, ‘হ্যাঁ, আর সামান্য বিলম্ব হলেই মৃত্যু হত ওই দেবদাসীর। নিদেনপক্ষে অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিরদিনের মতো রূপলাবণ্য হারাত। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, তার কাছাকাছি যারা দাঁড়িয়েছিলেন তারা কেউ এগোলেন না। আমি তাই ছুটে গিয়ে ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড উৎপাটিত করলাম।’

রক্ষীপ্রধান হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিলেন, ‘ওই রমণী যতই সুন্দরী হোক না কেন, নৃত্যগীতে যতই পারঙ্গম হোক না কেন, সামান্য দেবদাসী বই তো কেউ নয়, একজন সামান্য দেবদাসীর জন্য কে আর নিজের জীবন বিপদগ্রস্থ করবে? এই তো আজ ভোরেই এক দেবদাসীর মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপারটা আপনি শুনেছেন কিনা জানি না। তার দেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হল। আপনি ওকে রক্ষা না করলে ওর অগ্নিদগ্ধ মৃতদেহটাও কাল প্রত্যুষে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হোত। ওরা একজন আসে একজন যায়। কতজনকেই তো মন্দিরে দেবদাসী হতে দেখলাম। আবার সমুদ্রতে ভেসে যেতেও দেখলাম। তবে দেবতার সামনে এসব দুর্ঘটনা অমঙ্গলসূচক।’

অঙ্গিরা বলল, ‘অমঙ্গলসূচক মানে?’

সোপানশ্রেণী বেয়ে নামতে নামতে জয়দ্রথ বললেন, ‘হ্যাঁ, দেবতার সামনে এ ধরনের দুর্ঘটনা অমঙ্গলের বার্তাবাহক বলেই অনেকের বিশ্বাস। আরব শাসনকর্তা জুয়ানেদ চার শতাব্দী পূর্বে একবার এ মন্দির অপবিত্র করেছিল, ধ্বংস করেছিল। কথিত আছে সে ঘটনার কিছু দিবস পূর্বে এক দেবদাসী নাকি তার বদ্ধ জীবনের থেকে মুক্তি পাবার জন্য উন্মাদ অবস্থায় উন্মুক্ত গর্ভগৃহর সামনে বুকে কিরিচ বিঁধিয়ে আত্মহনন করে। তারপরই হানা দেয় জুয়ানেদ বাহিনী।

আর একবার গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড দাবদাহে মধ্যাহ্নে দেবতার সামনে নৃত্য পরিবেশন করার সময় নৃত্যরতা এক দেবদাসীর মৃত্যু ঘটেছিল হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে। সে সময় গর্ভগৃহর সমুখে দেবদাসীরা যেখানে নৃত্য পরিবেশন করে তার মাথার ওপর এখনকার মতো আচ্ছাদন ছিল না। সূর্যকিরণে তপ্ত প্রস্তরখণ্ডের উপরই তাদের নৃত্য পরিবেশন করতে হতো। যাই হোক সেই দেবদাসীর মৃত্যুও অমঙ্গলের বার্তা বহন করেছিল।

শ্রাবণ পূর্ণিমাতে প্রচুর জনসমাগন হয় এই সোমেশ্বর মন্দিরে। সেবার শ্রাবণ পূর্ণিমাতে পুণ্যার্থীদের ভিড়ে পদপৃষ্ট হয়ে প্রধান পুরোহিত-সহ বহু সেবায়েতের মৃত্যু হয়েছিল। এমন আরও ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনার কাহিনি আছে সোমেশ্বর মহাদেবের সামনে ঘটা অমঙ্গলজনক ব্যাপারকে কেন্দ্র করে।’

নীচে নেমে এসে রক্ষীপ্রধান পা বাড়ালেন অন্য দিকে। আর অঙ্গিরা এগোল অতিথিশালার দিকে। মধ্যরাতে প্রধান পুরোহিত ত্রিপুরারিদেবের অতিথিশালাতে উপস্থিত হবার কথা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *