সেই ফুলের দল – ৯

১৯৭৫ সালের নিউ দিল্লি। সেপ্টেম্বর মাস চলছে। পঁচিশ তারিখ। সকাল ন’টা বাজে। স্থান: জেএনইউ ক্যাম্পাস।

একটা কালো রঙের অ্যাম্বাস্যাডার গাড়ি স্কুল অব ল্যাঙ্গোয়েজের সামনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামলেন এক সুন্দরী তরুণী। বছর ঊনিশ বয়েস হবে হয়তো। ক্যাম্পাসের লোকজনেরা মেয়েটিকে জেএনইউ-তে আসার আগে থেকেই চেনে। বাথ টাওয়েলের বিজ্ঞাপনের মুখ ছিল এই মেয়েটিই। সেই প্রচারে দিল্লির গোটা মুখ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, তাই এঁকে না-চেনাটাই অস্বাভাবিক হতো।

তবে আপাতত বিজ্ঞাপনী মডেল হিসেবে নয়, জার্মান ভাষা শেখার জন্যেই এই ললনা জেএনইউ-তে এসেছেন। আরেকটা পরিচয় অবশ্য আছে। ইনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ। ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টারের ছোট ছেলে সঞ্জয়ের স্ত্রী মানেকা গান্ধী।

মাত্র তিনমাস আগেই এমারজেন্সি লাগু হয়েছে। জেএনইউ-তে একটা কলেজ প্রোটেস্ট চলছে। ছ’বছর আগে শিক্ষার এই পীঠস্থান স্থাপিত হওয়ার পর থেকে এখানে অবশ্য পড়াশোনার পাশাপাশি প্রোটেস্ট লেগেই থাকে। অতীব সাধারণ একটি ঘটনা। এমারজেন্সির সঙ্গে এই প্রোটেস্টের কোনো যোগাযোগও নেই। কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর এমফিল-এ ভর্তি হওয়া নিয়ে কিছু সমস্যা হয়েছে। একদম গোড়ার দিক থেকেই জেএনইউ ক্যাম্পাসে এসএফআই (মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট), এআইএসএফ (কমিউনিস্ট পার্টি) এবং ফ্রী-থিংকার্স (সোশ্যালিস্ট)-দের দাপট ছিল। তবে এই তিনটি পক্ষের মধ্যে একমাত্র ফ্রী-থিংকার্স (সোশ্যালিস্ট) দলের ছাত্রনেতা আনন্দ কুমার অবশ্য জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘সম্পূর্ণ ক্রান্তি’ আন্দোলনকে সাদর সমর্থন করছিলেন। এমনিতে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইণ্ডিয়া প্রো-ইন্দিরাই ছিল। তবে দিনকাল এখন একটু অন্যরকম চলছে। সবকিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া।

নিজের গাড়ি থেকে নেমে মানেকা যখন নিজের ক্লাসের দিকে এগোচ্ছেন, তখন দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠীর নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্র ওঁর পথ আটকে দাঁড়াল।

কে দেবীপ্রসাদ ত্রিপাঠী?

জেএনইউ-এর এসএফআই প্রেসিডেন্ট। তা কী বললেন তিনি? — ‘ও ম্যাডাম জুনিয়র মিসেস গান্ধী, আপ ভি হম মে সে হিঁ হ্যাঁয়! হম সভি প্রোটেস্ট মেঁ হ্যাঁয়। ক্লাস বন্ধ হ্যাঁয়।’

মানেকা ধানিলঙ্কার মতো ঝাঁঝ দেখালেন— ‘মুঝে ক্লাস মে জানে সে রোকতে হো? অভি দেখনা তুম লোগ ম্যায় কেয়া করতি হুঁ!’

মানেকা গান্ধী ফিরে গেলেন। তাঁর ফিরে যাওয়ার আধঘন্টা-চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই আরেকটা কালো রঙের অ্যাম্বাস্যাডার গাড়ি ক্যাম্পাসে এসে দাঁড়াল। গাড়ির চালকের আসনে একজন শিখ পুলিশ কর্তা। এঁকেই পরবর্তীকালে বিরোধীরা এমারজেন্সির সবথেকে ভয়ানক পুলিশ অফিসার হিসেবে চিনেছিল —প্রীতম সিং ভিণ্ডের, দিল্লি পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল। সঞ্জয় গান্ধীর খাস লোক। তবে ভিণ্ডের একা আসেননি। সঙ্গে এসেছেন একজন ডিএসপি আর দুজন কনস্টেবলকেও।

ভিণ্ডের গাড়ি থেকে নেমেই একটা রোগাপটকা ছেলেকে পাকড়াও করলেন — ‘দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী?’

ছেলেটা চশমা সামলে বলল— ‘নহিঁ, ম্যায় তো…’

কিন্তু কথা শেষ করার সুযোগই পেল না ওই ছাত্র। তার আগেই তাকে গাড়িতে চালান করে দিলেন ভিণ্ডের। ছেলেটির সঙ্গে থাকা বন্ধুরা হইহই করে উঠল। পুলিশকর্তা ততক্ষণে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটির পা গাড়ি থেকে ঝুলছে এমন অবস্থাতেই রিভার্স ড্রাইভ করে গাড়ি ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেল। যাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হল, সেই ছেলেটি কিন্তু দেবীপ্রসাদ ত্রিপাঠী নন, প্রবীর পুরকায়স্থ।

বিনা সাক্ষ্যে, বিনা প্রমাণে প্রবীরকে গ্রেফতার করে পরের টানা দুবছর ধরে তাকে দেশের বিভিন্ন জেলে চালান করা হল— নৈনী, তিহাড়, আগ্রা— প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকার হল প্রবীর। এমারজেন্সির সময়ে ভুল পরিচয়ে এই একটাই গ্রেফতারি হয়েছিল। দুর্ভাগ্য!

কেরলের এক ছাত্রকে এভাবেই ধরে নিয়ে গিয়ে গায়েব করে দিয়েছিল পুলিশ। ছেলেটি জীবিত নাকি মৃত সেই খবরটাও পায়নি তার পরিবার। জেএনইউ-এর এক শিখ ছাত্রকে চেয়ারে বেঁধে ঝুলিয়ে এমনভাবে মারা হয়েছিল যে তার বিবরণ লিখে প্রকাশ করতে পারা অসম্ভব। এই সময়ে এক লাখেরও বেশি অ্যারেস্ট হয়েছিল।

ডিসেম্বর মাসে ধরা হল আসল দেবীপ্রসাদ ত্রিপাঠীকে। সঙ্গে গ্রেফতার হলেন আরেক ছাত্রনেতা। পরে ইনি ভারত-বিখ্যাত এক মুখ হয়ে উঠবেন সীতারাম ইয়েচুরি। দুজনকেই তিহাড়ে চালান করা হল। আর ওদিকে তিহাড়ে তখন দেবীপ্রসাদের দিল্লি ইউনিভার্সিটির এক বন্ধুও বন্দি হয়ে ছিলেন। তিনি আবার অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ছাত্রনেতা। অরুণ জেটলি। আর এঁদের সবাইকে দিশা দেখানোর জন্য জেলে বন্দি হিসেবে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন নানাজি দেশমুখ, বিজয়ারাজে সিন্ধিয়ারা। সুধী পাঠক, দল, মত ইত্যাদির বৈচিত্র্য দেখলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, বিপরীত চিন্তাধারার মিলনই ভবিষ্যৎ হয়ে উঠছিল। আর এই প্রত্যেকটি মতধারাকে জুড়ে দেওয়ার কাজটা করছিলেন একটাই মানুষ— জয়প্রকাশ নারায়ণ।

ওদিকে ব্যাঙ্গালোর পুলিশ একজন তরুণ নেতাকে খুঁজে চলেছিল। পুলিশের কাছে গোপন সূত্রে খবর ছিল যে ওই নেতা নাকি বোমা বানাচ্ছেন।

.

১৯৭৬ সালের পয়লা মে। ব্যাঙ্গালোরের একটি বাড়িতে ফোন বেজে উঠল। রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে এল— ‘হ্যালো, লরেন্স ফার্নান্ডেজ?’

ইয়েস, স্পিকিং।

তোমার ভাই কোথায় লুকিয়ে আছে বলো তো?

কী বলছেন এসব? আমি কিছু জানি না।

এরপরে পুলিশ আসে। লরেন্সকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায়। বীভৎসভাবে অত্যাচারিত হন লরেন্স। মারের মুখে পড়ে যা যা জানতেন, তা বলে দিতে বাধ্য হন।

গ্রেফতারির প্রায় দু’সপ্তাহ পরে লরেন্সকে মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একটু সুস্থ হলে পরে আবার ভরে দেওয়া হয় ব্যাঙ্গালোর সেন্ট্রাল জেলে। কিন্তু কী ছিল তাঁর অপরাধ? কার খোঁজই বা করছিল পুলিশ? কে ছিলেন লরেন্সের ভাই?

জর্জ। জর্জ ফার্নান্ডেজ। চুয়াত্তর সালের রেল হরতালের মহানায়ক এমারজেন্সি জারী হতেই তিনি চলে যান আন্ডারগ্রাউন্ডে। জর্জ কোথায় লুকিয়ে ছিলেন সেই খবর লরেন্সও সঠিকভাবে জানতেন না।

জর্জকে নিয়ে অনেক খবর ছড়াচ্ছিল। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যে তা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারছিল না। বাজারে উড়ো খবর রটেছিল যে তিনি নাকি বিদেশি শক্তির সাহায্য নিয়ে সিআইএ-এর অঙ্গুলিহেলনে রাষ্ট্রের এবং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। হালফিলে উইকিলিক্সের একটি কেবল ঠিক এই ধরনের একটি খবরকে সমর্থনও করেছিল। সুব্রাহ্মণিয়ান স্বামী নেপাল হয় আমেরিকায় পলায়ন করেছিলেন। জর্জ কিন্তু ভারতেই ছিলেন। এক উগ্র সোশ্যালিস্ট নেতা। ভারতের জনতা এর আগে ঠিক এমনি উগ্র নেতৃত্ব ক্ষমতা জয়প্রকাশ নারায়নের মধ্যে দেখেছিল। ব্রিটিশ আমলে জয়প্রকাশ একইরকম উগ্র বিপ্লব করেছিলেন। আর এক্ষন জর্জ, একাই বিপ্লব ঘটাতে মরিয়া এক যুবক। এ যেন পুরোনো বোতলে নতুন মদ। রাজনীতিকরা জর্জের যৌবনে জয়প্রকাশের অতীতকে দেখতে পাচ্ছিলেন।

একাই বিপ্লব ঘটাতে মরিয়া হলেও অবশ্য জর্জ একলা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্নেহলতা রেড্ডি। স্নেহলতা- একজন কন্নড় অভিনেত্রী। চুটিয়ে থিয়েটার করতেন। সিনেমার মুখও ছিলেন। ‘সমস্কারা’-এর মতো বিখ্যাত ফিল্মে অভিনয় করেছিলেন স্নেহলতা। থিয়েটারে অভিনয় ছাড়াও নির্দেশনা এবং লেখালিখি করতেন। রাম মনোহর লোহিয়ার অনুসারী স্নেহলতা ইন্দিরা-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন। একটা সময়ে স্নেহলতা গ্রেফতার হয়ে গেলেন। জর্জের সঙ্গে তাঁর নামটাও জড়িয়ে গিয়েছিল বরোদা ডায়নামাইট ব্লাস্ট কেসে। ফাইনাল চার্জশিটে নাম না-থাকা সত্ত্বেও ‘মিসা’ আইনে স্নেহলতার জেল হল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর শ্বাসকষ্টের একটা ভয়ানক সমস্যা ছিল। জেলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং টানা অমানবিক অত্যাচারে জেলেই স্নেহলতার মৃত্যু হয়।

বরোদা ডায়নামাইট ব্লাস্ট কেসে জর্জকে পুলিশ খুঁজে চলেছিল, আর তিনি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। আজ বোম্বাই তো কাল কলকাতা। শিখের ছদ্মবেশে ঘুরতেন। নিজেকে পরিচয় দিতেন আরেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের নামে। বলতেন, ‘ম্যায় হুঁ খুসবন্ত সিং।’ কিন্তু কত আর পালিয়ে বেড়ানো সম্ভব? ১৯৭৬ সালের ১০ই জুন জর্জকে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করা হল।

যখন জর্জকে মামলায় কোর্টে পেশ করা হচ্ছিল, তখন শৃঙ্খলাবদ্ধ হাত শূন্যে তুলে জর্জ হুঙ্কার দিয়েছিলেন—

‘এই হাতকড়া শুধু আমার হাতের শৃঙ্খল নয়। এই একনায়কের চাবুকের দাগ সারা দেশের মানুষের পিঠ বয়ে বেড়াচ্ছে। এদেশের মানুষই এই শেকল ভাঙবে!’

গ্রেফতার হওয়া জর্জের মুখে সেদিন এক বিজয়ীর হাসি ছিল। সেই ছবি এমারজেন্সির প্রতীক হয়ে যায়। ইন্দিরা গান্ধী গভর্নমেন্টের পতনের দিনগোণা আরম্ভ হয়েছিল সেদিন থেকেই।

জর্জের সঙ্গে অ্যারেস্ট হয়েছিল সি জি কে রেড্ডি। ভদ্রলোক সুভাষ চন্দ্র বসুর সহযোগী ছিলেন। একইসঙ্গে জেল হল দুজনের। রেড্ডি জয়প্রকাশ নারায়ণের কমরেডও বটে। নারায়ণের প্রভাব স্পষ্ট ছিল তাঁর চরিত্রে। বর্তমান রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম সেভাবে উচ্চারিত না-হলেও এই ভদ্রলোকের চরিত্রকে নিয়ে রীতিমতো থ্রিলার নভেল নামিয়ে দেওয়া সম্ভব। আর জর্জের কথা তো আগেই বলেছি, আবার যেন জয়প্রকাশ নারায়ণের যৌবন ধরা দিয়েছিল ভারতের রাজনীতিতে। জেলে তাঁর সঙ্গী রেড্ডি। জয়প্রকাশ নারায়ণের ভবিষ্যৎ আর আর জয়প্রকাশ নারায়ণের অতীত একই সেলে সহাবস্থান করছিল।

এর কয়েক মাস আগেই জয়প্রকাশ নারায়ণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি চন্ডীগড়ে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে প্রাণ যায়-যায়। মরার আগেই পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেল যে জয়প্রকাশ নারায়ণ মরলে কী হবে। রীতিমতো ড্রিল হচ্ছিল যে কীভাবে বায়ুসেনা তাঁর মরদেহ চুপি চুপি তুলে নিয়ে যাবে। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, যদি সত্যিই ওইসময়ে জয়প্রকাশের মৃত্যু হতো, তাহলে হয়তো ভারতের রাজনীতিতে বড়সড় ভূমিকম্প হয়ে যাবে। সরকার চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। চণ্ডীগড় থেকে বোম্বাইয়ের যশলোক হসপিটালে তাঁকে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী তখন বংশীলাল। তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। নিজের আধিকারিকদের বলেছিলেন— ‘যাক গে, বাঁচা গেল! এখানে মরলে ঝামেলা হয়ে যেত। অন্য জায়গায় গিয়ে বাঁচুক মরুক আমার আর সমস্যা নেই।’

জয়প্রকাশ সুস্থ হয়ে উঠে এক ডিএম-কে বলেছিলেন, ‘কেহ দো হুক্সরানোঁ সে, ইয়ে জেপি য়ুঁ হি নহিঁ মরেগা। তুমহারি ম্যাডাম কো হরা কর হি মরেগা।

আর জর্জ? জর্জ তখন তিহাড় জেলে। তদানীন্তন সরকার একটা বড় ভুল করে ফেলেছিল। সকল সরকার-বিরোধীকে তিহাড়ে পাঠিয়ে দেওয়া একটা ভুল সিদ্ধান্তই ছিল বইকি। তিহাড় ছাড়াও অন্যত্র অনেককেই বন্দি করা হয়েছিল। লালকৃষ্ণ আডবানি, বালাসাহেব দেওরস, চরণ সিং, মোরারজি দেশাই, বিজু পট্টনায়ক, নানাজি দেশমুখ, দেবগৌড়া, পিলু মোদী, অশোক মেহতা, অরুণ জেটলি, সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ জাভড়েকর, ভেঙ্কইয়া নাইডু, নীতিশ কুমার, রামবিলাস পাসোয়ান, বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া, আর কত নাম লিখব?

আর কংগ্রেসের মধ্যে থেকে কি কেউ বিরোধ করেননি?

একজন করেছিলেন। ফলস্বরূপ তাঁকে চণ্ডীগড়ের জেলে বন্দি করা হয়েছিল।

কে?

তিনিও জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো বালিয়া-কে-বাগী। তৎকালীন কংগ্রেস দলের তরুণ তুর্কি। পরবর্তীকালের one man army তথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী— চন্দ্রশেখর।

দেশের আরেক ভাবী প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী তখন গ্রেফতার হয়েছেন। অপর এক ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন পঁচিশ বছরের যুবক, তিনিও তখন ছদ্মবেশে পলাতক। দিকে দিকে জয়প্রকাশ নারায়ণ জন্ম নিচ্ছিলেন।

.

তিহাড় জেল, দিল্লি, ১৯৭৬ সাল।

জেল তখন আর জেল ছিল না। ভারতের সংসদ ভবন মনে হচ্ছিল। জনসঙ্ঘ, কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট সবাই তখন তিহাড় জেলে। আবহাওয়া সরগরম। সবসময় হইহই হচ্ছে, আলোচনা চলছে নিজ-নিজ বৃত্তে। একের পর এক বড় নেতাকে গ্রেফতার করে এমন ভাবে জেলে আনা হচ্ছিল যেন কারো বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়েই তাঁরা আসছিলেন। রাজনীতির কত দিগগজ ব্যক্তি, কত নব্য যুবা— এঁদের মধ্যেই কত তরুণ পরবর্তী কালে নানা ক্ষেত্রের রথী মহারথী হয়ে উঠেছেন। কিন্তু পরে যাই হোক না কেন সেই মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার মনে করেছিল যে এঁরা দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় বিপদ। Main – tenance of Internal Security Act বা মিসা আইনে এঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল।

একদিন জেলের এক বন্দিকে হাতে-লেখা একটি লিফলেট বিলি করতে দেখা গেল। সেই কাগজে বড় অদ্ভুত কথা লেখা ছিল। জেলের ক্যাম্পাসে যজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছে।

যজ্ঞ? কে করবেন?

চৌধুরী চরণ সিং।

চরণ সিং। জয়প্রকাশ নারায়ণের বয়স্য। পুরোনো কংগ্রেসি। সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি দমন এবং দাবিদাওয়াকে কড়া হাতে সামলানোর ইস্যু নিয়ে মতান্তর হলে তিনি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ‘ভারতীয় লোকদল’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। উত্তরপ্রদেশে প্রথম অ-কংগ্রেসি রাজ্যসরকার তৈরি করার পালকটাও চরণ সিং-এর শিরোপাতেই গোঁজা হয়েছে। তো যাই হোক, চরণ সিং যজ্ঞ করছিলেন। পূজা অর্চনাদিতে ভদ্রলোকের বিশেষ রুচি ছিল একথা সকলেই জানত। কিন্তু শুধুই কি পূজার জন্য করা হচ্ছিল এই যজ্ঞ? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? আরও বড় কিছু?

সেদিন জেলের লনে অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক টি-শার্ট আর শর্টস্ প’রে জেলেরই এক স্টাফের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন। যুবকের হাতে যজ্ঞের লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে গেলেন বিলিকারী ব্যক্তি। লেখা কথা পড়ে নিয়ে সেটাকে পকেটে চালান করে দিলেন যুবক। উলটোদিকের খেলোয়াড় জিজ্ঞেস করলেন–‘কেয়া লিখ-খা হ্যাঁয় ইস মে, অরুণ?’ মৃদুভাষী অরুণ মুচকি হেসে যজ্ঞের কথাটা বলে আবার খেলা শুরু করে দিলেন।

এই অরুণ হলেন ভবিষ্যতের স্বনামধন্য আইনজীবী তথা রাজনীতিক অরুণ জেটলি। টেকনিক্যালি অরুণ জেটলিই ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী সরকার ঘোষিত এমারজেন্সির বিরুদ্ধে ‘প্রথম সত্যাগ্রহী’। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন রাতে এমারজেন্সি ঘোষণা হওয়ার পরই অরুণকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ আসে ওঁর নারাইণার বাড়িতে। অরুণ তখন উঠোনে খাটিয়া পেতে ঘুমোচ্ছিলেন। পুলিশ এসে ডাক দেয়— ‘অরুণ জেটলি ঘর পে হ্যাঁয়?’

অরুণের বাবা মহারাজ কিষেণ জেটলি গিয়ে দরজা খুলে মিথ্যেই বলেন–‘নহি, উয়ো আজ রাত কো ঘর নহিঁ আয়া। লেকিন আপ লোগ উসে কিঁউ ঢুণ্ঢ রহে হো?’

‘বড়া নেতা বনা ফিরতা হ্যাঁয় আপকা বেটা। অকল ঠিকানে লগানা হ্যাঁয় উসকা…’

অরুণ বাড়িতে নেই জেনে ওঁর বাবাকেই থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। খানিকটা শাসানি দিয়ে বলা হয় যে, ছেলে বাড়ি ফিরলেই থানায় রিপোর্ট করবেন। আসলে পুলিশ আগামী ২৯শে জুন সারা দেশব্যাপী হতে চলা সত্যাগ্রহকে আটকানোর জন্য সম্ভাব্য সকল প্রয়াস চালাচ্ছিল। অরুণ একাধারে ছিলেন দিল্লি ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট’স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, অন্য দিকে উনিই জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের যুব শাখার আহ্বায়ক। স্বাভাবিক ভাবেই বছর বাইশের অরুণ গ্রেফতারির তালিকায় একেবারে ওপরের দিকেই ছিলেন।

পুলিশের সঙ্গে বাবার কথোপকথন শুনে সেই রাতে অরুণ বাড়ির পেছনের দিকের পাঁচিল টপকিয়ে নামেন। পাড়াতেই এক বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটান। পরদিন সকালে জনসঙ্ঘের ছাত্র ইউনিয়ন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ছেলেরা অরুণকে নিয়ে একটা বিক্ষোভ কর্মসূচীর আয়োজন করে। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ অরুণ জেটলির নেতৃত্বে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। প্রায় দুশো লোকের জমায়েত হয়েছিল। অরুণ সেই সময় পর্যন্ত জানতেন না যে এমারজেন্সি জারী হয়ে গেছে, তবে বড় বড় রাজনীতিকদের গ্রেফতারির খবরটা শুনেছিলেন।

ওদিকে যখন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অরুণ জেটলিদের কর্মসূচী চলছিল, তখন পুলিশের বাহিনী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘিরে ফেলছিল। ফোর্সে নেতৃত্বে ছিলেন পি এস ভিণ্ডের। এই ভিণ্ডেরের কথা আগেই লেখা হয়েছে। অরুণ নিজের দুই সঙ্গী রজত শর্মা (ইনি পরে সাংবাদিক রূপে বিখ্যাত হন। ‘আপ কি আদালত’ নামক একটি শো হোস্ট করেন।) এবং বিজয় গোয়েল (দিল্লিতে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা) –কে গা-ঢাকা দিতে বলেন এবং ঘোষণা করেন যে তিনি গ্রেফতারি বরণ করে নেবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অরুণ গ্রেফতারি এড়ানোর একটা চেষ্টাও করেন। নিজের আরেক বন্ধু প্রভু চাওলাকে (ইনিও পরবর্তীতে বিখ্যাত জার্নালিস্ট রূপে পরিচিত হন। ‘তিখি বাত’, ‘সিধি বাত’, ‘সচ্চি বাত’ ইত্যাদি জনপ্রিয় টক শো হোস্ট করেছেন।) অরুণ স্কুটার নিয়ে ইউনিভার্সিটির পেছনের একটি গেটের দিকে যেতে বলেন। পুলিশের নজর এড়িয়ে কোনোমতে সেই পয়েন্টে পৌঁছে অরুণ দেখেন প্রভু চাওলা আসেননি (প্রভু খানিকটা দাগা-ই দিয়েছিলেন বলা চলে। ইন্দিরা গান্ধীর টোয়েন্টি পয়েন্টস্ প্রোগ্রাম মেনে নিয়ে মুচলেকা দিয়ে এমারজেন্সিতে গ্রেফতারির প্রকোপ থেকে রক্ষা পান।)। অরুণ জেটলি শেষমেশ অ্যারেস্টই হয়ে গেলেন। আলিপুর পুলিশ স্টেশনে নিয়ে অরুণ এবং তাঁর সঙ্গীদের নামে মিসা ওয়ারান্ট ফীল আপ করা হল। সেখানে বসেই ট্রানজিস্টর রেডিওতে অরুণ প্রথম এমারজেন্সি জারী হওয়ার কথাটা জানতে পারেন।

অরুণ জেটলিকে তিহাড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দু নম্বর ওয়ার্ড। অরুণের সেল ইনমেট ছিলেন ছত্রী লাল গোয়েল।

.

দিল্লির তিহাড় সেন্ট্রাল জেলে তখন ১২৭৩ জন কয়েদিকে রাখার মতো ব্যবস্থা ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৬শে জুন সেই কয়েদির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৬৯। ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে ৪২৫০ জন। তীব্র জলকষ্ট। নর্দমা উপচে পড়ছে। টয়েলেটের সিস্টার্ন কাজ করছে না। পূতিগন্ধময় পরিবেশ। জেল তো নয়, নরক।

বন্দিদের রাখার জায়গা অপ্রতুল বলে নতুন ঘরের ব্যবস্থা করা হয়। অ্যাসবেস্টসের টিন দিয়ে ঢাকা হয় ছাদ। গরমে সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেই সময়কার দাপুটে আধিকারিক আবার এমারজেন্সির সময়ে বন্দি হওয়া ব্যক্তিদের পাগলাগারদে রাখার নিদান পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

আধসেঁকা চাপাটি, জলের মতো ডালের ওপরে ভাসছে মরা মাছি এই চিত্র তখন বন্দিদের থালায় অহরহ দেখা যেত। কোনো ব্যারাকে হয়তো এক জায়গাতেই ২৮-৩০ জনকে ঠুসে রাখা হয়েছে। খাটা পায়খানা। দুর্গন্ধে টেকা যায় না বলে পায়খানা করতে গেলে ধূপ জ্বালতে হয়েছে। সেলগুলোতে জানলা থাকত না। শুধু একটা করে ছোট ঘুলঘুলি। তা দিয়ে আলো বাতাস না-এসে আসত নোংরা জল আর ধুলো।

সময় কাটানোর উপায় বলতে লাইব্রেরির বই। বিকেলের দিকে কিছু খেলাধুলোর আয়োজন থাকত। কেউ খেলত ভলিবল, কেউবা ব্যাডমিন্টন খেলত। চৌধুরী চরণ সিং-এর পছন্দের খেলা ছিল ‘সুইপ’ (তাসের খেলা)।

আমরা আবার ফিরে যাব চৌধুরী চরণ সিং-এর যজ্ঞের সময়ের কথায়। জেলের ১৮ নাম্বার ওয়ার্ডের একটা ঘরে বসে জর্জ ফার্নান্ডেজ কিছু লিখছেন। তিহাড়ে চালান হওয়ার পর থেকে কারো সঙ্গে বিশেষ কথা বলেন না। তেমন কারো সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ হয়নি। তিনিও খবর পেয়েছেন যে জেলে যজ্ঞ হচ্ছে।

ওই একই ওয়ার্ডে রয়েছেন এক দিগগজ ব্যক্তিত্ব। নাম নানাজি দেশমুখ। নানাজিকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না। খোঁজ করে দেখা গেল তিনি পাশেরই ত নাম্বার ওয়ার্ডের দিকে গেছেন।

৩ নাম্বার ওয়ার্ড? সে তো মহিলাদের ওয়ার্ড? সেখানে নানাজি কী করছেন?

মহিলা ওয়ার্ডে তখন বন্দি হিসেবে রয়েছেন  গ্বালিয়রের রাজমাতা বিজয়ারাজে সিন্ধিয়া। জেলের চিকিৎসক তাঁকে যোগাসন করার পরামর্শ দিয়েছেন। জেলে তখন একজন কুশল যোগ-প্রশিক্ষক রয়েইছেন— নানাজি দেশমুখ। তাই তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি মহিলাদের ওয়ার্ডে গিয়ে রাজমাতাকে যোগব্যায়াম শেখাতে পারবেন।

১৫ নাম্বার ওয়ার্ডের বাইরে প্রকাশ সিং বাদল আর সীতারাম ইয়েচুরি কথা বলছিলেন। যজ্ঞ ইত্যাদিতে দুজনের কারো তেমন আগ্রহ নেই, কিন্তু জেলে শুধু শুধু বসেই বা কী করবেন? অগত্যা…

যজ্ঞ বলুন বা যোগব্যায়াম, এগুলো আসলে অছিলা। তিহাড় জেলের মধ্যে আসলে সেদিন একটি এমন দলের নির্মাণ হতে চলেছিল, যা হয়ে উঠবে জনতার দল। এই দলের নাম আগামীতে পাব— জনতা পার্টি। এই জনতা পার্টি যখন আসবে, তখন এক হয়ে যাবে অনেক পক্ষ। কংগ্রেস-বিরোধী বিপক্ষের জন্ম হবে। এ যেন এক ফুলের মালা। অজস্র রাজনৈতিক দল এখানে ফুলের কাজ করবে। এই দলই আগামীতে ভাঙাগড়া করতে-করতে ভারতের বুকে জন্ম হবে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের, যার নাম ভারতীয় জনতা পার্টি বা ভাজপা বা বিজেপি। যার প্রতীকচিহ্ন হবে কমল বা পদ্ম— সেই ফুলের দল।

তা আমরা কোথায় ছিলাম? না কংগ্রেস-বিরোধী শক্তি জন্ম নিচ্ছিল। এই শক্তির জন্ম কোথা থেকে হল? তিহাড় জেলে চৌধুরী চরণ সিং-এর যজ্ঞের আগুন থেকে।

জয়প্রকাশ নারায়ণ তখন বোম্বেতে। যজ্ঞের সুবাস সেখানেও গিয়ে পৌঁছল। জেলে বন্দি সোশ্যালিস্ট দম্পতি মধু দণ্ডবতে ও প্রমিলা দণ্ডবতে একটু শঙ্কিত হলেন। জনসঙ্ঘ, সোশ্যালিস্ট, কমিউনিস্ট সব একই যজ্ঞভাগ পাবেন? পারবেন কি এঁরা সকলে একটা দিনও একে অপরকে সহ্য করে একসঙ্গে থাকতে?

জয়প্রকাশ নারায়ণের উদ্দেশে মিডিয়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—দেশে সংখ্যাগুরুদের হিতৈষী বলে পরিচিত জনসঙ্ঘ কীভাবে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সু-আচরণ করবে? আপনি কী মনে করেন?

জয়প্রকাশ বললেন— ‘যে কোনো গণতন্ত্রের সুস্থতার পরিচয় একটাই বিষয় থেকে পাওয়া যায়, তা হল সেখানে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে অন্যায় হতে থাকলেই বুঝতে হবে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে। জনসঙ্ঘ আপাতত কথা দিয়েছে যে তারা এদিকটা মাথায় রাখবে। যদি ভবিষ্যতে তা রাখতে না-পারে, তাহলে গণতন্ত্র বিপদে পড়বে ও একসময়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। একনায়কতন্ত্র জন্ম নেবে, আর তার প্রথম চাবুকটা পড়বে সংখ্যালঘুদের পিঠেই। এই এখন যেমন হচ্ছে। দেখুন না, আর কিছু দিনের মধ্যেই ইন্দিরা আর তাঁর ছেলে সঞ্জয় সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে শুরু করে।’

জয়প্রকাশ নারায়ণ কয়েক দশক আগে বসে ঠিক বলেছিলেন কিনা সে বিচার ভারতের জনগণ করবে। আমরা ইতিহাসটাকে গল্পের মতো করে পড়ে এগোই বরং। যজ্ঞের দিকে। রাজনৈতিক দিগগজের দল তখন যজ্ঞ-জোটে নিজেদের সঙ্ঘবদ্ধ করছেন। আর ওদিকে যজ্ঞের হইচইয়ের ফাঁকে তেরো জন কয়েদি জেলের মধ্যে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালিয়ে গেল।

.

১৯শে এপ্রিল, ১৯৭৬। স্থান: দিল্লির দুজানা হাউজ। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। জামা মসজিদ সংলগ্ন একটি পুরোনো বিল্ডিং। তারই একপাশে অ্যাসবেস্টসে ঢাকা কতগুলো ঘর। বাইরে বোর্ড ঝুলছে— ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং ক্যাম্প’। সঞ্জয় গান্ধীর এমারজেন্সি প্ল্যানিং-এর বিভিন্ন বিন্দুর মধ্যে এটাও অন্যতম।

ক্যাম্পে আলাদা কিছু নেই। অতি সাদামাটা। সরকারি উদ্যোগে এ ধরণের প্রকল্প-শাখা গ্রামগঞ্জের দিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভূরি-ভূরি দেখা যায়। নির্বীজকরণের বদলে সরকার উপহার দেয়, সরকারি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। অবশ্য সরকারি ক্যাম্পগুলোর সাথে এই ক্যাম্পের কোনো ফারাক নেই বললে আবার ভুল বলা হয়। এই দুজানা হাউজের ক্যাম্প স্বেচ্ছায় আসার ক্যাম্প নয়। এখানে জোর করে লোকজনকে তুলে আনা হচ্ছে। বলিউডি সিনেমা ‘শুক্রাণু’তে এই ব্যাপারটাকে বেশ মজার ছলেই দেখানো হয়েছিল। যাই হোক, এই ক্যাম্পটাকে নিজে দেখভাল করছিলেন ইন্দিরা-তনয় সঞ্জয় গান্ধী এবং তাঁর এক বান্ধবী তথা পেজ থ্রি সোশ্যালাইট রুখসানা সুলতানা।

রুখসানা এক প্রগতিশীল, হাই ফাই মুসলিম ফ্যামিলির মেয়ে। বোরখার বালাই নেই, সেজেগুজে, কালো সানগ্লাস পরে, গলায় সাদা মোতির হার সাজিয়ে তিনি দিল্লি-সিক্সের অলিতে গলিতে বিচরণ করেন। তাঁকে এস্কর্ট করে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশের বাহিনী। রুখসানার কোনো সাংবিধানিক পদ নেই। এক হিন্দু পিতা ও শিখ স্বামী থাকা সত্ত্বেও তিনি মায়ের মুসলিম পরিচয়েই পরিচিত। আবার ইসলামের রীতিও পুরোপুরি মানেন না। জামা মসজিদের ইমাম বুখারীর চোখের কাঁটা রুখসানা। আবার এলাকার মুসলিম রমণীদের কাছে তিনি উন্মুক্ত আদর্শ। তাঁর মিশনে আপাতত দুটো পয়েন্ট—

১. যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক পুরুষের নির্বীজকরণ করাতে হবে।

২. মুসলমান রমণীদের বোরখা ত্যাগ করিয়ে বের করে আনতে হবে। রুখসানা এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে হিন্দি-উর্দু গল্প উপন্যাসেও তাঁর চরিত্রকে নিয়ে লেখা হয়েছে।

দুজানা হাউজের ক্যাম্প একটা ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। স্বাধীনতার পর থেকে এমারজেন্সি পিরিয়ড আসার আগে অবধি দেড় কোটি পুরুষের নির্বীজকরণ হয়েছিল। এমারজেন্সির পর একবছরে মোট আশি লক্ষ পুরুষের অপারেশন করা হয়। তারতম্য চোখে পড়ার মতোই। গ্রামগঞ্জ থেকে ট্রাকে, বাসে করে লোক এনে অপারেশন করানো হতো। হিন্দু মুসলিম এসব ভেদ হতো না। তবে গরিব লোকেরাই বেশি ছিল।

সঞ্জয় গান্ধী টেকনিক্যাল থিংকিং করাতে বিশ্বাসী ছিলেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটা সমস্যা। তাকে দূর করতে গেলে কড়া হাতে দমন করতেই হবে। আবেগের জায়গা নেই। দেশের একাধিক লেখক বুদ্ধিজীবী রাজনীতিক সঞ্জয়ের এই পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

মহারাষ্ট্র সরকার ঘোষণা করে দিল, যাদের তিনটির বেশি সন্তান আছে, যারা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত, তাদের নির্বীজকরণ বাধ্যতামূলক করা হল। উত্তর প্রদেশে স্কুল শিক্ষকদের বলা হল দুইয়ের অধিক সন্তান নেওয়া চলবে না অন্যথা বেতনে কোপ পড়বে। পঞ্জাব সরকার একটু বেশি কড়াকড়ি করল। সেখানে বলা হল দুইয়ের বেশি সন্তান হলেই জেল। বিহার গভর্নমেন্ট জানাল তিনের বেশি বাচ্চাকাচ্চা হলেই রেশন বন্ধ করে দেওয়া হবে। হরিয়ানার একটি মুসলিম প্রধান গ্রামের সমস্ত পুরুষকে পুলিশরা বাসে করে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্বীজকরণ করিয়ে দিল। সন্তানের সংখ্যা যাচাই করে দেখা হল না।

সমস্ত ঘটনার ডিরেক্ট রিপোর্টিং করা হতো শ্রী সঞ্জয়কে। যেহেতু তাঁর কাছে কোনো সাংবিধানিক পদ ছিল না, তাই তিনি সমালোচনার মুখে পড়ছিলেন। সমস্যা বাড়ছিল। কেউ বলছিল একনায়কতন্ত্র চলছে, কেউ বলছিল অরাজকতা। পুলিশের গুলিও চলছিল। মুরাদাবাদ, প্রতাপগঢ়ি, মুজফফরনগরে বারোজন মারা গেলেন। তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল সঞ্জয় গান্ধীকে নিয়ে, রুখসানা সুলতানাকে নিয়ে

এই রুখসানা সুলতানার একটা আলাদা পরিচয় আছে। ইনি ফিল্ম অভিনেত্রী অমৃতা সিংরে মা, সেফ আলি খানের একদা শাশুড়ি মা, সারা আলি খানের দিদা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *