রইল বাকি তিন
পনেরোই ফেব্রুয়ারি
রঞ্জিত গগৈয়ের অফিসের বিশাল টেবিলের পিছনের দেওয়ালে যে মনিটর লাগানো আছে সেখানে আছড়ে পড়ছে একের পর এক ফোটোগ্রাফ আর ম্যাপ। কথা বলছেন রঞ্জিত। শুনছে প্রথমা আর আয়েশা।
অরুণাচল প্রদেশের মানচিত্র দেখিয়ে রঞ্জিত বললেন, ‘এই রাজ্যের দক্ষিণে অসম, পশ্চিমে ভোটল্যান্ড, উত্তর ও উত্তর পূর্বে সিনচান রাষ্ট্র, পূর্বে মায়ানগরী রাষ্ট্র। মোদ্দা কথা হল, সিনচান অধিকৃত তিব্বতের সঙ্গে আমাদের দেশের অরুণাচল প্রদেশের প্রায় বারোশো কিলোমিটার লম্বা আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। কিন্তু, অরুণাচল প্রদেশ নামের শান্ত রাজ্যটিকে নিয়ে হঠাৎ কেন আলোচনা করছি?’
আর্দালি চা দিয়ে গেছে। সন্তর্পণে চুমুক দিয়ে প্রথমা বলল, ‘আমার একটা আন্দাজ আছে। বলব?’
‘ইয়েস, অফকোর্স!’
‘কিছুদিন আগেই তাওয়াং সেক্টরে, ইয়াংসি নদীর ধারে ভারত আর সিনচানের সৈন্যদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। সেই ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল। টিভি আর খবরের কাগজেও প্রসঙ্গটা এসেছে। ২০২০ সালেও গালওয়ান উপত্যকায় আমাদের সৈন্য এবং সিনচানের ‘‘পিপলস লিবারেশান আর্মি’’ বা ‘‘পিএলএ’’-র মধ্যে হাতাহাতি হয়েছিল। মোদ্দা কথা হল সিনচান দেশটা সুবিধের নয়। ওদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হল সবাইকে দুর্বল করে দাও।’
‘ঠিক বলেছিস। তাওয়াং সেক্টরে ‘‘লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কনট্রোল’’ বা ‘‘এলএসি’’ বরাবর এমন কিছু এলাকা রয়েছে যার মালিকানা নিজের বলে দাবি করে ভারত এবং সিনচান—দুটো দেশই। ‘এলএসি’ অনেকগুলো রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকলেও সিনচানের পাখির চোখ অরুণাচল প্রদেশ। এর কারণ হল সিনচান যদি অরুণাচলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তা হলে ভোটল্যান্ড পর্যন্ত কনট্রোল ওদের হাতে।’
আয়েশা চায়ে চুমুক দিল। রঞ্জিত বললেন, ‘আর একটা সমস্যাও মাথাচাড়া দিচ্ছে। ইয়ারলং সাংপো নদী নিয়ে।’
‘সেটা আবার কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করল প্রথমা।
‘তিব্বত দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় যে নদীর নাম ইয়ারলং সাংপো, সেটাই ভারতে ব্রহ্মপুত্র নদ হিসেবে প্রবাহিত। এই নদ উত্তর-পূর্ব ভারতের জলের প্রধান উৎস। ‘‘রিসার্চ অ্যান্ড আন্যালিসিস উইং’’ বা ‘‘র’’ জানতে পেরেছে যে ইয়ারলং সাংপো নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করতে চলেছে সিনচান। সেটা তৈরি হলে অসম ও অরুণাচলে মারাত্মক জল সংকট দেখা দেবে। আমাদের তরফে প্রচার শুরু হয়ে গেছে। পরিবেশবিদরা বাঁধের প্রতিবাদ করছেন। উত্তর-পূর্বের রাজনৈতিক নেতারা এক সঙ্গে গলা ফাটাচ্ছেন যে সড়ক ও বাঁধ নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য হল ভারতবর্ষের জমিতে সিনচানের দখলদারি।’
‘খেলা জমেছে তা হলে!’ ফুট কাটল প্রথমা।
‘১৯৮৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অরুণাচল প্রদেশের জন্ম হয়। তার আগে ওই অঞ্চলকে বলা হতো ‘‘নর্থ ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি’’ বা ‘‘নেফা’’। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বীরেন্দ্র মেহতা অরুণাচলে যাচ্ছেন আগামী পরশু। সেটাও আর একটা ২০ ফেব্রুয়ারি।’
‘কেন যাচ্ছেন?’
‘ভারত সরকার অরুণাচল সীমান্তের বুমলা পাসে শক্তিশালী সামরিক পরিকাঠামো তৈরি করেছে। হাইওয়ে এবং বিশাল ফৌজি ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে। অস্ত্র আর ফৌজ পাঠানোর কাজও শেষ। প্রধানমন্ত্রী পরশু সকাল দশটার সময় সেই ঘাঁটির উদ্বোধন করবেন। এর মধ্যে হঠাৎ ‘র’ জানতে পেরেছে যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় সিনচান বিষ্ফোরণ ঘটাতে চলেছে।’
আর্দালি এসে চায়ের কাপ নিয়ে গেল। রঞ্জিত আর এক প্রস্থ চা দিতে বললেন। প্রথমা জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কী ভাবে জানা গেল?’
‘সিনচানের ইনটেলিজেন্স এজেন্সির নাম “মিনিস্ট্রি অফ স্টেট সিকিয়োরিটি” বা “এম এস এস”। তার একজন এজেন্ট ইটানগরের বাসিন্দা। নাম সাঙ্গে ওয়াংসু। লোকটা তাওয়াঙে টুরিস্ট গাইডের কাজ করে। ওয়াংসু যে এম এস এস-এর এজেন্ট এটা “র” জানত। ওকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সব কিছু মনিটর করা হতো। গতকাল রাতে “র” জানতে পারে, ওয়াংসুকে মেল করেছে সিনচানের বাসিন্দা, আর এক এম এস এস-এর এজেন্ট, চ্যাং। বিষ্ফোরণ কী ভাবে ঘটবে, সেই ফ্লো-চার্ট এনক্রিপ্টেড হয়ে ই-মেল মারফত চলে এসেছে। কিন্তু সেই ফ্লো-চার্ট ডিক্রিপ্ট করার যে “কি” বা “চাবি”, সেটা ওয়াংসু পায়নি। এবং সেটা আমরাও জানি না।’
‘ও বাবা! এর মধ্যে ক্রিপ্টোগ্রাফি ঢুকে গেল?’ বিস্ময় প্রকাশ করে প্রথমা। ‘আমার এই নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
আয়েশা বলল, ‘স্যর! এটা আমি ওকে বোঝাব?’
‘ক্যারি অন।’ বললেন রঞ্জিত। আর্দালি আবার তিন কাপ চা দিয়ে গেল।
আয়েশা একটা কাগজে লিখল, ‘J MPWG ZPV,’ তারপর বলল, ‘এই কয়েকটা হরফ আপনাদের দুজনের সামনে রাখলাম। আমি চাই, এখানে কী লেখা আছে, সেটা শুধু প্রথমা জানুক, স্যর নন।’
প্রথমা কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানাল, সে শুনছে।
আয়েশা বলল, ‘ক্রিপ্টোগ্রাফি হল বিশেষ ধরনের যোগাযোগের পদ্ধতি যাতে গ্রাহক এবং প্রেরক, উভয়ের তথ্য তৃতীয় পক্ষের থেকে গোপন থাকে। প্রথমে লেখা হয় প্লেন টেক্সট। সেটাকে চাবির সাহায্যে সাইফার টেক্সটে বদলে ফেলা হয়। এই বদলে ফেলাকে বলা হয় এনক্রিপশন। আমাদের সামনে যেটা রয়েছে, অর্থাৎ ‘J MPWG ZPV,’ এটা হল সাইফার টেক্সট। চাবির মাধ্যমে গ্রহীতা সাইফার টেক্সটকে প্লেন টেক্সটে বদলে নেন। এই পদ্ধতিকে বলে ডিক্রিপশান। আমি যে কোডটা লিখেছি তার নাম ‘সিজার কোড।’ এনক্রিপশন পদ্ধতিগুলোর মধ্যে এটা সব থেকে সহজ। জুলিয়াস সিজার ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতেন বলে এরকম নাম।’
‘কাজের কথায় আয় না!’ বিরক্ত হয়ে বলে প্রথমা।
‘আসছি,’ চায়ে চুমুক দিয়ে বলে আয়েশা, ‘সিজার কোডে একটি টেক্সটের সঙ্গে একটি সংখ্যা দেওয়া হয়, যাকে “চাবি” বলা হয়। চাবির মান যত, টেক্সটের অক্ষরগুলো তত ঘর পরের অক্ষর দিয়ে বদলে দেওয়া হয়। যেমন, চাবির মান যদি “১” হয়, তখন A-কে লেখা হবে B। এবার বল, কী লেখা আছে?’
কাগজটার দিকে তাকিয়ে প্রথমা বলল, ‘J মানে হল I, M মানে হল L…তুই লিখেছিস…I LOVE YOU!’
‘একজ্যাক্টলি!’ হাসছে আয়েশা, ‘আজকের জমানায় এটা খুব দুর্বল এনক্রিপশান, কিন্তু তোকে বোঝানোর জন্যে যথেষ্ট।’
‘কাজের কথায় আসা যাক,’ বললেন রঞ্জিত, ‘চ্যাং ‘চাবি’টা ইমেল বা সোশাল মিডিয়া মারফত পাঠাচ্ছে না। ও কোনও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট চাইছে না।’
‘তা হলে?’
‘ওরা এম এস এস-এর একজন এজেন্টকে অরুণাচলে পাঠাচ্ছে, যে নিজে এসে ওয়াংসুকে চাবিটা বলে যাবে!’
‘সিনচানের বাসিন্দা কী করে ভারতে ঢুকবে?’
‘অরুণাচলের বার্ষিক ‘রক-ফোক ফেস্টিভাল’ শুরু হচ্ছে সতেরোই ফেব্রুয়ারি থেকে। সেই ফেস্টিভালের শেষ দিন, মানে উনিশে ফেব্রুয়ারি সিনচানের বিখ্যাত রক ব্যান্ড ‘সিনচান সি’ ইটানগর আসছে পারফর্ম করতে। ব্যান্ডের চার সদস্য এবং ওদের টিমে থাকা আটজন মেম্বারের মধ্যে কেউ একজন এম এস এস-এর এজেন্ট। সেই এজেন্ট ‘চাবি’ ওয়াংসুকে জানিয়ে দেবে। ফ্লো চার্ট ডিক্রিপ্ট করে ওয়াংসু ঠিক পরের দিন প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় বিষ্ফোরণ ঘটাবে।’
‘প্রধানমন্ত্রীর যাওয়া পিছিয়ে দিলেই তো হয়।’
‘তুই বীরেন্দ্র মেহতাকে চিনিস। উনি এই প্রস্তাব শুনে বলেছেন, ‘পড়শির ভয়ে আমি নিজের বাড়ির সব ঘরে ঢুকতে পারব না? এ কখনও হয়?’’
‘সিনচান সি-র শো ক্যানসেল করা হোক!’
‘বীরেন্দ্র মেহতার সাফ কথা, কাইমেরা ওই এজেন্টকে খুঁজে বার করে এলিমিনেট করুক। কিন্তু টুরিস্ট, স্থানীয় মানুষ বা শিল্পীদের গায়ে যেন আঁচড় না লাগে। এবং মিডিয়া যেন কিচ্ছু জানতে না পারে। উনি সারা ভারত থেকে ‘র’-এর কিছু এজেন্টকে হ্যান্ড পিক করে একটা টিম বানিয়েছেন। তারা ওখানে পৌঁছে যাচ্ছে সতেরো তারিখ রাতে। তোরাও ওই দিনই পৌঁছে যা, ‘র’-এর মুম্বইয়ের এজেন্ট হিসেবে। টিমের বেশিরভাগ সদস্যই একে অপরকে চেনে না। কাজেই তোদের আইডেন্টিটি ‘র’-এর কারও কাছে ফাঁস হবে না।’
রঞ্জিতকে থামিয়ে প্রথমা বলল, ‘তার মানে সবাইকে ছেড়ে কাইমেরার ঘাড়ে ঝামেলা ফেলে দেওয়া হল। মিশন ফেল করলে আমাদের দোষ। সফল হলে ‘র’-এর ক্রেডিট। তাই তো?’
রঞ্জিত হাসছেন। প্রথমা বলল,
‘হারাধনের চারটি ছেলে
নাচে ধিন ধিন,
একটি ম’ল আছাড় খেয়ে
রইল বাকি তিন…’
উনিশে ফেব্রুয়ারি। সকাল দশটা
সকাল দশটার সময় ইটানগর এয়ারপোর্টে যে প্লেনটি টাচ ডাউন করল সেটি এসেছে দিল্লি থেকে, কলকাতা ছুঁয়ে। প্লেনের পেট খালি করে যাত্রীরা নেমে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরে প্লেন থেকে নামছে দুটি ছেলে ও দুটি মেয়ে। অরুণাচলের বাসিন্দাদের মুখের ছাঁচ মঙ্গোলয়েড। এই চারজনও ব্যতিক্রম নয়।
প্লেনের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সীমা ফুকন তাঁর সঙ্গী কল্পিতা মুর্মুকে বললেন, ‘সিনচানি ভাষায় ‘সি’ মানে ‘চার।’ ‘সিনচান সি’ মানে ‘চার সিনচানি।’ ব্যান্ডের সদস্য সংখ্যা চার বলে ব্যান্ডের নাম এই রকম। ছেলেদুটোর নাম গ্যাং আর হাও, মেয়েদুটোর নাম লি আর মিন। ওদের সঙ্গে আছে টিমের আরও আটজন। ওই আটজনের ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ চিরুনি তল্লাসি করে দেখা হয়েছে। ওদের কেউ এম এস এস-এর এজেন্ট নয়। এই চারজনের মধ্যে একজন এম এস এস-এর এজেন্ট। আমাদের কাজ হল আজ রাতের মধ্যে সেই এজেন্টকে খুঁজে বার করে ‘চাবি’ জোগাড় করা।’ সীমা ফুকন এসেছেন দিল্লি থেকে। তিনি ‘র’-য়ের সিনিয়ার এজেন্ট। কল্পিতা মুর্মু নামের বাঙালি মেয়েটি সদ্য ‘র’তে জয়েন করেছেন। এটিই ওর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট।
‘ম্যাম, শুনলাম যে মুম্বই থেকে একজন ভি আই পি এজেন্ট আসছে। আপনি জানেন?’
সীমা ফুকন কড়া ধাঁচের মহিলা। তুচ্ছ কথায় সময় নষ্ট করা স্বভাবে নেই। কল্পিতাকে বাজিয়ে দেখার জন্যে প্রশ্ন করলেন, ‘কার কথা বলছ?’
‘প্রথমা নামের এক মহিলা এজেন্ট। ও নাকি সব জায়গায় ছদ্মবেশে যায়, নিখুঁত কাজ সেরে কেটে পড়ে। ও যে একজিস্ট করে এটাই নাকি কেউ জানে না!’
সীমা বললেন, ‘দেখো কল্পিতা, আমাদের চাকরি আর পাঁচটা সরকারি চাকরির মতো নয়। আমাদের কারবার অপরাধীদের নিয়ে। মরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রতি মুহূর্তে। এখন গালগল্প কোরো না। আমাদের কাজ হল অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে ব্লু পাইন হোটেল পৌঁছে দেওয়া।’
‘আমরা ওই হোটেলে গেস্ট হিসেবে থাকতে পারি না?’
‘না। আমরা সতেরো তারিখ থেকেই ব্লু পাইন হোটেলের স্টাফ!’ দাঁতে দাঁত চেপে জুনিয়রকে ঝাড় দিয়ে ফুলের বোকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন সীমা। একদম প্রথমে যে ছেলেটি আসছে তার নাম গ্যাং। বছর বাইশ বয়স। ফর্সা, মাঝারি উচ্চতা, চুলে মাশরুম কাট, চোখে ফাঙ্কি সানগ্লাস। পরনে ফুশিয়া রঙের টি-শার্ট, ব্লু ডেনিম, পায়ে ফুশিয়া রঙের স্নিকার।
গ্যাং-কে ফুলের তোড়া দিয়ে কল্পিতার কাছে পাঠিয়ে দিলেন সীমা। এখন তাঁর সামনে লি নামের মেয়েটি। এর মাথার অর্ধেক নেড়া, বাকি অর্ধেক চুলে কার্ল করা। টি-শার্ট এবং স্নিকারের রং কাকাতুয়া সবুজ। একেও ফুলের তোড়া দিয়ে কল্পিতার কাছে পাঠালেন সীমা।
মিন নামের মেয়েটি দু-বিনুনি করে আছে। পরনে ভায়োলেট রঙের টি-শার্ট আর স্নিকার। এর হাতেও পুষ্পস্তবক তুলে সামনের ছেলেটির দিকে তাকালেন সীমা। হাও-এর মাথায় ওয়েজ শেপেড ক্রু-কাট, টি-শার্ট আর স্নিকারের রং কমলা। প্রত্যেকেই মেকআপ করে আছে।
এদের সঙ্গে যে আটটি স্যাঙাত রয়েছে তাদের পোশাক সাধারণ। এরা হল টুর ম্যানেজার, টুর অপারেটার, লাইট ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার আর সোশাল মিডিয়া টিম। সোশাল মিডিয়া টিমের দুটি মেয়ে সারাক্ষণ ভিডিও আর স্টিল ফোটো তুলে যাচ্ছে। এইগুলো দিয়ে সিনচান সি-র ওয়েবসাইট, ইন্সটা প্রোফাইল, ফেসবুক পেজ, স্পটিফাই, ইউটিউব এবং অন্যান্য সোশাল মিডিয়া সরগরম রাখবে।
ব্লু পাইন হোটেলে এখন অন্য কোনও অতিথি নেই। সতেরো তারিখ দুপুরো থেকে র-এর এজেন্টরা হোটেলের দখল নিয়েছে। ভারতের নানা প্রান্ত থেকে আসা এজেন্টরা গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়ে থাকছে। একটি ঘর মিটিং করার জন্যে বরাদ্দ। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়ার রুম’। বাকি ঘরগুলোয় দুজন করে এজেন্ট থাকছে। হোটেল স্টাফেদের বাড়ি যেতে দেওয়া হয়নি। তারাও দুটো ডরমিটরি মিলিয়ে থাকছে।
এজেন্টরাই এখন হোটেলের ফ্রন্ট অফিস, কিচেন, রুম সার্ভিস, ফুড অ্যান্ড বিভারেজ, লন্ড্রি, হাউস কিপিং বা পার্সোনাল সার্ভিস সামলাচ্ছে। টিম লিডার হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনকে জড়ানোর কোনও ইচ্ছে ছিল না সীমার। তবে যোগাযোগ রক্ষার জন্যে লোকাল থানার মহিলা পুলিশ অফিসার তাশি দোরজিকে টিমে নেওয়া হয়েছে। ওকে নেওয়ার অন্য কারণটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিনচান সি-এর বিরাট বড় ফ্যান হল তাশি। অরুণাচলের একমাত্র ‘সিনচান সি ফ্যান ক্লাব’-টি ও চালায়। ব্যান্ডের সব গান এবং গানের সঙ্গে সব নাচের স্টেপ মুখস্থ।
সীমা ইশারায় কল্পিতাকে বললেন গাড়িতে উঠতে। পাঁচটি গাড়ির মোটরকেড ব্লু পাইন হোটেলের দিকে এগোল। সিনচান সি-র অনুষ্ঠান আজই রাত আটটা থেকে। অর্থাৎ হাতে ঠিক দশ ঘণ্টা সময় আছে, এই চারজনের মধ্যে কে এম এস এস-এর এজেন্ট যেটা জানার জন্যে। এবং তার কাছ থেকে ‘কি’ জোগাড় করে সাইফার টেক্সট ডিক্রিপ্ট করার জন্যে। সেটা না পারলে আগামিকাল সকাল দশটার সময় প্রধানমন্ত্রী বীরেন্দ্র মেহতার ভাষণের সময় ঘটে যাবে সেই বিষ্ফোরণ!
উনিশে ফেব্রুয়ারি। সকাল সাড়ে এগারোটা
‘আমাদের এই রক-ফোক ফেস্ট প্রতি বছর তিনদিন ধরে চলে,’ ব্লু পাইন হোটেলের গ্যাং-এর রুমে বসে বকবক করছে তাশি দোরজি। ও যে পুলিশ, এটা সিনচান সি-র সবাই জানে। সীমা তাই ওর পরিচয় লুকোনোর চেষ্টা করেননি।
এই গ্রুপের সবাই খুব ভালো ইংরিজি জানে। গ্যাং বলল, ‘আপনাদের এই রক-ফোক ফেস্ট কত বছর ধরে হচ্ছে?’
‘কুড়ি বছর হয়ে গেল স্যর।’
ওদের কথার মধ্যে রুম সার্ভিসের একটি মেয়ে দরজায় টোকা মেরে ঢুকেছে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘রুমে লাঞ্চ করবেন না ডাইনিং হলে?’
গ্যাং মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখল, ইউনিফর্মে নাম লেখা আছে ‘রিনচিন।’ সে বলল, ‘হাই রিনচিন! হোটেলে আর কোনও গেস্ট যখন নেই, তখন ডাইনিং হলেই যাব।’
ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেল রিনচিন। পাশের রুমের দরজায় খটখট করল। ভিতর থেকে একাধিক ছেলেমেয়ের গলা শোনা গেল। মহিলাকন্ঠ বলল, ‘উই আর বিজি।’
রিনচিন আন্দাজ করল, ব্যান্ডের তিনজন একই রুমে বসে আড্ডা মারছে। এখন একটা ঝুঁকি নেওয়াই যায়! সে পাশের রুমে নক করল। যথারীতি কেউ সাড়া দিল না। রিনচিন স্মার্টলি হোটেলের নিজস্ব ‘ডুপ্লিকেট কি’ ব্যবহার করে রুমে ঢুকে বিছানা পরিষ্কারের অছিলায় চারদিক ছানবিন করছে। সন্দেহজনক কিছু নেই। তাও খুঁজছে। অবশেষে ওয়েস্ট বিন থেকে তুলে নিল একগাদা কাগজ। তার মধ্যে প্লেনের টিকিট, বোর্ডিং পাস, লাগেজ ট্যাগ, এয়ারলাইন্স ম্যাগাজিনের পাশাপাশি একটা চিরকুট পাওয়া গেল। এটা অনুষ্ঠানের প্লে লিস্ট। কোন পাঁচটা গান গাইবে, কী অর্ডারে গাইবে, কী ভাবে নাচবে, হুক স্টেপ ক’বার হবে—এসব লেখা আছে। প্রপ হিসেবে থাকবে টুপি আর ছড়ি। লিড করবে গ্যাং আর মিন। এই সবের মধ্যেই কাগজের কোনে লেখা আছে, ‘ডান্সিং ম্যান।’ পাশে একটা ধূমপানের পাইপ আঁকা।
চিরকুটটা নিয়ে রুম থেকে বেরোল রিনচিন।
উনিশে ফেব্রুয়ারি। সকাল পৌনে বারোটা
‘ডান্সিং ম্যান বললে কী মনে হয়?’ ওয়ার রুমে বসে কল্পিতাকে প্রশ্ন করলেন সীমা।
‘মাইকেল জ্যাকসন।’
‘খারাপ বলোনি। ধরো কাগজে লেখা রয়েছে, ‘ডান্সিং ম্যান।’ তার পাশে একটা স্মোকিং পাইপ আঁকা। এবার কী ভাববে?’
চিরকুটটা টিম লিডার সীমার হাতে তুলে দিয়ে রিনচিন চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, ‘পাইপ বললে শার্লক হোমসের কথা মনে পড়ে। হোম্সের স্রষ্টা স্যর আর্থার কন্যান ডয়েলের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ ডান্সিং ম্যান’ গল্পটিতে ‘ডান্সিং ম্যান সাইফার’ ব্যবহার করা হয়েছিল না?’
‘গুড!’ খুশি হলেন সীমা। কল্পিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজেবাজে কথা না ভেবে কাজের কাজটা শেখো।’ তারপর রিনচিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যদ্দুর মনে পড়ছে এটায় ছড়ি আর টুপি দিয়ে কিছু কিছু হরফ প্রথমে আলাদা করা হয়েছিল।’
‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’ বলল রিনচিন। ‘আমি মিনের রুমের থেকে প্লে লিস্টটা পেয়েছি।’
‘আপনি কি প্রথমা?’ কল্পিতা উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘একটা সেল্ফি তুলতে পারি?’
রিনচিন ভুরু কুঁচকে কল্পিতাকে একবার দেখল। ওকে একদম গুরুত্ব না দিয়ে সীমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার ব্রিফ অনুযায়ী সাইফার টেক্সট ডিক্রিপ্ট করার মতো কোনও ফিজিকাল ‘কি’ বা চাবি ওদের কাছে নেই। আমার মনে হয় ওই এজেন্টটি ‘ডান্সিং ম্যান সাইফার’ ইউজ করে নাচতে নাচতে ‘কি’ দেখাবে।’
‘এই কথা কেন মনে হল?’ রিনচিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সীমা।
‘ওদের নাচের সব ভিডিও আমার অনেকবার করে দেখা। কোনও নাচের ভিডিওতে টুপি বা ছড়ি নেই।’
কল্পিতা আবার বলল ‘একটা সেল্ফি নিই?’
সীমা বিরক্ত হয়ে কল্পিতাকে বললেন, ‘এখন তো আমার মনে হচ্ছে তুমিই সেই প্রথমা। তার নাম আর তো কেউ শোনেনি। রিনচিন, তুমি শুনেছ?’
উত্তর না দিয়ে শ্রাগ করল রিনচিন।
কল্পিতার দিকে তাকিয়ে সীমা কড়া গলায় বললেন, ‘আমাদের প্ল্যান অফ অ্যাকশান ভাবো।’
কল্পিতা ঘাবড়ে গেছে। তাও বলল, ‘‘কি’ না পেলে কিছু করা যাবে না ম্যাডাম।’
রিনচিন নিঃশব্দে ওয়ার রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
উনিশে ফেব্রুয়ারি। দুপুরো বারোটা
লাঞ্চে খুব অল্প খেল সিনচান সি-র চারজন। ওদের বাকি টিম মেম্বাররা অবশ্য পেট পুরে খেল। টুর ম্যানেজার মেয়েটি আগে থেকেই মেনিউ ঠিক করে দিয়েছিল। ব্যান্ড মেম্বাররা খাওয়ার আগে সে নিজে প্রতিটা পদ চেখে দেখল। এমনকী মেয়েটা ব্লু পাইন হোটেলের প্রতিটি রুমে উঁকি মারার চেষ্টা করেছে। সীমা এবং তাশি মিলে ওকে অনেক কষ্টে আটকেছে।
দুপুরের খাবার চুকিয়ে যে যার রুমে চলে গেল। হাও নিজের রুমে ঢুকে টিভি দেখছিল। ভারতীয় টিভি চ্যনেলের সঞ্চালক বলছেন, ‘অরুণাচল প্রদেশের এগারোটি অঞ্চলের নাম বদলের ঘোষণা করেছে সিনচান সরকার। এই ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, ‘অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। নামবদলের মাধ্যমে ভারতের অন্তর্গত ওই অঞ্চলে সিনচানের দখলদারির চেষ্টার কোনও বাস্তবতা নেই।’
রাজনীতি মাথায় ঢোকে না হাওয়ের। সে ঘুমনোর তোড়জোড় করছে, এমন সময় দরজায় হালকা ঠকঠক আওয়াজ।
হাও বলল, ‘কে?’
‘ডু ইউ নিড আ মাসাজ?’ খসখসে গলায় বলল একটি মেয়ে।
মৃদু হেসে দরজা খুলে হাও বলল, ‘কাম ইন!’
কমবয়সি একটি মেয়ে রুমে ঢুকে করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘হাই! আই অ্যাম বালা!’
বালা হোটেলের ইউনফর্ম পরে আছে। তাতে লেখা আছে, ‘বালা। পার্সোনাল সার্ভিস।’ অর্থাৎ মেয়েটা বেআইনি কিছু করছে না। ওর দিকে তাকিয়ে হাও বলল, ‘আমি মাসাজ খুবই ভালোবাসি। তবে সেটা ছেলেদের মাসাজ। মেয়েদের মাসাজ ভালোবাসে লি।’
বালা ভুরু কুঁচকে তাকাল।
হাও মুচকি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, এটাই সত্যি। আমার ছেলেদের মাসাজ ভালো লাগে।’
বালা নমস্কার জানিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
উনিশে ফেব্রুয়ারি। দুপুরো সওয়া বারোটা
দুপুরের খাওয়া চুকিয়ে রুমে ফিরে বারান্দায় বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে লি। ভারতবর্ষের নাম শুনেছে শুধু। দেশটা সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। এখান থেকেই টিভির খবর শোনা যাচ্ছে। সঞ্চালক বলছেন, ‘অতীতেও ভারতের জমি দখলের লক্ষ্যে নামবদলের কৌশল নিয়েছিল সিনচান। ২০১৭ সালে ছ’টি এবং ২০২১ সালে পনেরোটি জায়গার নাম বদলের ঘোষণা করে সিনচান। ওখানকার সরকারি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ‘মানুষ যাতে এই অঞ্চলগুলির নাম আরও সহজে মনে রাখতে পারেন, সেই জন্যেই এটি করা হয়েছে।’
টিভি দেখে লি জানতে পারছে নামবদল নিয়ে ভারত ও সিনচানের ঝগড়ার কথা। সে স্কুল থেকে জেনে এসেছে, অরুণাচল প্রদেশের অনেকটা জায়গা সিনচানের অন্তর্গত। ভারত সেটা জোর করে নিজের সীমানায় ঢুকিয়ে রেখেছে। ভারতের টেলিভিশনে উল্টো খবর বলছে। এই দেশটা খুব খারাপ! কিন্তু গায়ককে এসব ভাবলে চলে না। তার কাজ গান গাওয়া। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার সামনে!
দরজায় হঠাৎ খটখট শব্দ। লি গলা তুলে বলল, ‘কে?’
খসখসে গলার মহিলাকণ্ঠ বলল, ‘আমি বালা। এই হোটেলের মাসুস।’
মহিলা মাসাজকারীকে ‘মাসিউস’ বা ‘মাসুস’ বলে। লি চুপ করে ভাবছে। এমন সময় বালা বলল, ‘হাও আপনার কাছে পাঠালেন।’
হাওয়ের নাম শুনে নিশ্চিন্ত বোধ করল লি। না হলে বিদেশে হোটেল রুমে মহিলা মালিশউলিকে সে ঢুকতে দিত না।
দরজা খুলে বালাকে দেখে দম আটকে গেল লি-র। একটা মেয়ে এত সুন্দরী, এত আকর্ষণীয় হয় কী করে? এটাই কি এক্সটিক ইন্ডিয়ার চার্ম? ফ্যাকাশে হেসে লি বলল, ‘কাম ইন।’
বালা রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই তার ঘাড়ে হাত রেখে বলল, ‘আমি এক মিনিটের একটা স্যাম্পল মাসাজ দেখাচ্ছি। পছন্দ হলে করাবেন। পছন্দ না হলে আমি চলে যাব।’
এক মিনিটের আগেই বালার স্পর্শে মুগ্ধ লি। এ মেয়ের হাতে জাদু আছে। ঘাড় আর কাঁধের যাবতীয় ব্যথা দূর হয়ে যাচ্ছে, পেশী নরম হয়ে আসছে, ঘুম পাচ্ছে। লি বলল, ‘আমার ভালো লাগছে। দাঁড়াও, পোশাক বদলে আসি। তোমার কাছে হার্বাল অয়েল আছে তো?’
‘কী চাই বলুন না!’ হাসল বালা।
পোশাক বদলে খাটে শুল লি। তার কপাল মাসাজ করছে বালা। লি বলল, ‘টিভিতে দেখলাম, ভারত সরকার বলছে অরুণাচল প্রদেশের এগারোটি অঞ্চলের নতুন নামকরণ করেছে সিনচান। কিন্তু আমি তো বরাবর জানি, ওই জায়গাগুলো তিব্বতের অংশ, নাম জাংনান।’
‘আমরা সাধারণ মানুষ ম্যাম,’ কাঁধ মালিশ করছে বালা, ‘দুবেলা দুমুঠো খেতে পেলেই হল। যে দেশ খেতে দেবে, আমি সেই দেশের বাসিন্দা।’
‘তুমি নিজেকে কোন দেশের মানুষ বলে মনে করো?’
‘আমি ইন্ডিয়ান ম্যাম। আপনি এসব না ভেবে বিশ্রাম নিন।’
বালার কথা শুনে চুপ করল লি। নিঃশব্দে মাসাজ উপভোগ করতে লাগল।
উনিশে ফেব্রুয়ারি। দুপুরো দুটো
দুপুর দুটোর সময় গ্যাং বাকি ব্যান্ড মেম্বারদের ফোন করতে শুরু করেছে। অনুষ্ঠানের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। বিকেল চারটে নাগাদ ভেনিউতে যেতে হবে সাউন্ড চেকের জন্যে। এখন সব মেম্বারের উচিত দু-ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেওয়া।
কিন্তু কোথায় কী? হাও জানাল সে ফ্যান ক্লাবের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করছে। লি-র মোবাইল বেজে গেল। গ্যাং বলল সে আর সোশাল মিডিয়া ম্যানেজার মিলে আড্ডা মারছে। একমাত্র মিন নিজের রুমে ঘুমোচ্ছে।
বিরক্ত হয়ে রুমে দুটো কলা অর্ডার করল। কলা খেলে ভালো ঘুম হয়। একটু পরেই রিনচিন এসে কলা দিয়ে গেল। টিভি চালিয়ে কলা খাচ্ছে গ্যাং।
সঞ্চালক বলছেন, ‘কিছুদিন আগে সিনচানের বিদেশমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সৌহার্দের বার্তা দিয়েছিলেন। সীমান্তের টানাপড়েন কাটিয়ে দুটি দেশের সম্পর্কের উন্নতির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। কিন্তু সিনচানের নয়া পদক্ষেপে প্রশ্নের মুখে সেই সওয়াল। ভারতের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন সীমান্ত পরিস্থিতি এখনও জটিল। নাম বদলের অছিলায় ভারতের জমি দখলের কৌশলে প্রশ্ন উঠছে, কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতিতে সিনচান কি আদৌ আন্তরিক?’
আপনমনে ঘাড় নাড়ল গ্যাং। সে রাজনীতি ভালোবাসে না। ঘৃণা ও বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে বলেই ‘সিনচান সি’ শুরু করেছিল। তাদের গান ভালোবাসার কথা বলে, মৈত্রীর কথা বলে, সীমানা মুছে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু এসব কী হচ্ছে? শিল্পী মানুষটি বিমর্ষ মুখে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল।
খবর শেষ। কলা খাওয়া চুকিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল গ্যাং। পাহাড়ের একদম গায়ের হোটেল বলে জানলা দিয়ে তাকালেই খাদ দেখা যাচ্ছে। অনেক নীচে, কোথাও কোথাও পাহাড়ের ঢালে একটা-দুটো গ্রাম আছে। আর দেরি করা ঠিক না। সবার খবর নিয়ে শুতে হবে। রুমের দরজা খুলে বেরোল গ্যাং। ঠিক পাশের রুমটাই হাওয়ের। রুমে খটখট করতে হাওয়ের গলা শোনা গেল, ‘ডোন্ট ডিসটার্ব!’
নিশ্চিন্ত হয়ে পাশের রুমে নক করল গ্যাং। মিন জড়ানো গলায় গালিগালাজ করল। যাক! এও শুয়ে পড়েছে। এবার পাশের ঘরে গেল গ্যাং। লি কী করছে দেখা যাক।
লিয়ের রুমে ধাক্কা দেওয়ার ঠিক আগেই গ্যাং দেখল যে রিনচিন করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে মোবাইলে দুর্বোধ্য কোনও ভাষায় অতি দ্রুত কথা বলছে। ভাবভঙ্গী দেখে বোঝা যাচ্ছে যে রাগারাগি চলছে।
রিনচিনের পাশে গিয়ে গ্যাং তার কাঁধে হাত রাখল। চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল রিনচিন। ইংরিজিতে বলল, ‘উফ্! আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’
‘তোমাকে দেখে চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে। আমি কি কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারি?’
‘না, না! সে রকম কিছু নয়। আসলে আমি…আমি…’
‘হ্যাঁ, বলো!’ গ্যাং-এর গলায় সহমর্মিতা।
‘পার্সোনাল ফোন কল কাজের সময় অ্যালাও করা হয় না। কাজের সময় মোবাইল রাখাও অ্যালাওড নয়। হোটেলের এই জায়গাটা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে বলে এখানে দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আপনি প্লিজ কাউকে বলবেন না স্যর! তা হলে চাকরি চলে যাবে।’
‘চিন্তা কোরো না।’ রিনচিনের পিঠে হাত বুলিয়ে গ্যাং বলল, ‘মায়ের সঙ্গে রাগারাগি কেন হল?’
‘এই কারণে স্যর!’ করিডোরের অন্য দিকের জানলা দিয়ে বাইরে আঙুল দেখায় রিনচিন। গ্যাং দেখে, তাশি পাকদণ্ডী দিয়ে আপনমনে নাচতে নাচতে যাচ্ছে। হাতে ছড়ি, মাথায় টুপি।
‘আমাদের ফ্যান ক্লাবের সেক্রেটারি তোমার মা?’ জিজ্ঞাসা করল গ্যাং।
‘হ্যাঁ,’ ঘাড় নাড়ল রিনচিন, ‘নিজের কাজ আর নাচ নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত। বাবা বা আমাদের জন্যে সময় নেই। বাবার খুব অসুখ স্যর!’
ওয়ার রুমে বসে সিসিটিভি মনিটরে রিনচিন আর গ্যাংকে মন দিয়ে দেখছিলেন সীমা আর কল্পিতা। ওদের কথাও শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ কল্পিতা চেয়ার থেকে উঠে জানলা দিয়ে উকি মেরে বলল, ‘আমাদের না বলে তাশি কোথায় যাচ্ছে?’
সীমা কিছু বলার আগেই তার মোবাইল বেজে উঠল। তিনি ফোন কানে দিয়ে কিছু একটা শুনে কল্পিতাকে বললেন, ‘তুমি এখানে থাকো। আমি আসছি।’ তারপরে ওয়ার রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সিসিটিভি মনিটরে কল্পিতা দেখতে পাচ্ছে যে সীমা ছুটতে ছুটতে রিনচিন আর গ্যাং-এর কাছে যাচ্ছেন।
আর একটি পর্দায় দেখা যাচ্ছে, হোটেলে থেকে সামান্য দূরে, নিজের বাড়িতে বসে ওয়াংসু সিগারেট খাচ্ছে আর কাগজে ছবি এঁকে ‘ডান্সিং ম্যান সাইফার’ এনক্রিপ্ট ও ডিক্রিপ্ট করা প্র্যাকটিস করছে।
উনিশে ফেব্রুয়ারি। রাত আটটা থেকে রাত এগারোটা
অনুষ্ঠান শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। দুপুর দুটো থেকে সন্ধে ছ’টা পর্যন্ত যা যা হল সেটার কথা ভেবে লজ্জায় গ্যাং-এর মাথা কাটা যাছে।
রিনচিনের সঙ্গে কথা বলার সময়েই তার কাছে হাজির হয় ব্লু পাইন হোটেলের ম্যানেজার সীমা। জানায় যে কুড়িজন মিডিয়া পার্সন এসেছে ইন্টারভিউয়ের জন্যে। ডাইনিং হলে প্রেস কনফারেন্স করতে চেয়েছিল সীমা, কিন্তু কোনও সাংবাদিক রাজি হয়নি। এরা দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা আর চেন্নাইয়ের টিভি, খবরের কাগজ বা ওয়েব পোর্টালের সাংবাদিক। ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান এবং বাকি তিন সদস্যের এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউই নেবে। প্রেস মিটের গণ-উত্তর চায় না।
সিনচানের বাইরে তাদের ব্যান্ডের যে বিপুল খ্যাতি আছে, এটা কখনও বুঝতে পারেনি গ্যাং। সিনচানের সব কিছুই খুব নিয়মতান্ত্রিক। মানুষের অনুভূতির প্রকাশও নিয়ন্ত্রিত। ফ্যানেরা লাইন দিয়ে দাঁড়ায়, একজন করে আসে, সই বা সেল্ফির জন্যে আবেদন করে, কাজ মিটলে চলে যায়। সাংবাদিকরা প্রশ্ন পাঠায় ইমেলে।
হোটেলে আসা ইস্তক ফ্যানেদের বাঁধভাঙা ভিড়। পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রতি আধঘণ্টা অন্তর ব্যান্ডের কাউকে না কাউকে বারান্দায় গিয়ে হাত নেড়ে আসতে হচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে এখন এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউর চাপ।
রাজি হয়েছিল গ্যাং। বাকি মেম্বারদের সীমা জানিয়ে দিয়েছিল এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউয়ের কথা। সবাই যে যার রুমে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিয়ে যাচ্ছিল। পরস্পরের সঙ্গে দেখা করার ফুরসত নেই। বিকেলের চা খেতে হল দুই সাংবাদিকের সঙ্গে। সব থেকে খারাপ ব্যাপার, সাউন্ড চেকের জন্যে ভেনিউতে যেতে পারল না গ্যাং। এই ভুল সে আজ পর্যন্ত করেনি।
একদম অচেনা মঞ্চে রিহার্সাল ছাড়া পারফর্ম করার অনেক সমস্যা আছে। তবে অনুষ্ঠান শুরু হতেই গ্যাং-এর টেনসান চলে গেল। কিউ মেনে বাঁদিক থেকে মঞ্চে প্রবেশ করল সে। ডান দিক থেকে হাও। ওপর থেকে ক্রেনে চেপে নামল মিন। স্টেজের তলা থেকে উঠে এল লি। লাইট ও সাউন্ডের প্রোগ্রামার কনসোলে বসে অপারেট করছে। স্ট্রোব, ফ্লাডলাইট, স্পটলাইট, লেসার, ডিমার আর এলইডিতে ঝকমক করছে চারিদিক। সোশাল মিডিয়া ম্যানেজাররা টানা ভিডিও করে যাচ্ছে। সিকিয়োরিটির লোকেরা সমানে টকব্যাকে কথা বলেছে। মঞ্চের ঠিক সামনে উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে শ্রোতা। গান ধরল গ্যাং। সবাই উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। এই অ্যাড্রিনালিন রাশের থেকে বড় নেশা আর হয় না।
প্রথম গান শেষ হল। শ্রোতারা হেড ব্যাং করছে, ডেভিলস হর্ন দেখাচ্ছে, মোবাইলের টর্চ একসঙ্গে জ্বেলে দু-দিকে হাত নাড়িয়ে ‘সিং অ্যালং’ করছে। এত ভালো, এত দীক্ষিত শ্রোতা নিজের দেশে পায়নি গ্যাং। সে পরের গান ধরল।
দ্বিতীয় গান শেষ হওয়ার পরে সে বুঝতে পারল কোথাও একটা ছন্দপতন হচ্ছে। শ্রোতারা আর আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত নয়। তারা ফোটো তুলতে ব্যস্ত।
ফোটো তোলা ভালো, কিন্তু সবাই মিলে সেইটাই করলে লাইভ শোয়ের ‘ভাইব’ বা আবহ নষ্ট হয়। তৃতীয় গানটা দ্বিগুণ এনার্জি নিয়ে শুরু করল গ্যাং। এবং শেষ করার পরে বুঝতে পারল মঞ্চে এমন একটা কিছু ঘটছে, যেটা স্বাভাবিক নয়। সবাই মঞ্চের ডান দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে দিকে এক পলক দেখে কিছু বুঝতে পারল না গ্যাং। লি হঠাৎ সবার নয়নের মণি হয়ে গেল কেন? চতুর্থ গান শুরু করল গ্যাং।
ওয়ার রুমে বসে সীমা তাকিয়ে রয়েছেন মনিটরের দিকে। স্টেজের একদম কাছে চলে গেছে ওয়াংসু। সে স্থির দৃষ্টিতে দেখছে নির্দিষ্ট একজন ব্যান্ড মেম্বারকে। নোটবুকে দ্রুত হাতে লিখে যাচ্ছে একের পর এক শব্দ! শঙ্কিত হয়ে কল্পিতাকে ফোন করলেন সীমা। মেয়েটার ফোন বেজে গেল…
চার নম্বর গানটি গাওয়ার সময়েই গ্যাং বুঝতে পারল নাচে ছন্দপতন ঘটছে লি-র জন্যে। টুপি আর ছড়ি নিয়ে যে নতুন স্টেপগুলো তারা প্র্যাকটিস করে এসেছিল, সেগুলো লি-র ক্ষেত্রে মিলছে না। লি বারবার অন্যদের স্টেপ দেখে মেলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গ্যাং, হাও বা মিন তো এক রকম স্টেপে নাচছে না। সবার স্টেপ আর মুভমেন্ট আলাদা। সেই ভাবেই লি কোরিওগ্রাফি করেছিল। সে নিজেই সেগুলো পারছে না কেন? লাইভ শো এমন একটা জিনিস যেখানে গানের কথা, সুর, শরীরের ভাষা, কণ্ঠস্বর, কোরাস, মেলডি, বাদ্যযন্ত্র, আলো, শব্দ—সব মিলে এক হয়ে যায়। সামান্য গন্ডগোল গোটা পারফরম্যান্সকে নষ্ট করে দেয়। এখানে তো পরপর চারটে গানে একই কাণ্ড চলছে।
আপাতত গ্যাং-এর একমাত্র লক্ষ্য পঞ্চম ও শেষ গানটি পারফর্ম করা। নিজের ফোকাস এক জায়গায় এনে গান শুরু করল সে। যখন শেষ করল, শ্রোতারা হাসছে। এবং লি-র ছবি তুলেই যাচ্ছে।
কার্টেন কলের পরে মঞ্চ অন্ধকার হতেই সবাই গাড়ি নিয়ে দৌড়োল ব্লু পাইন হোটেলে। এখানে অনেক লোক আছে। ব্যান্ড মেম্বারদের সঙ্গে বোঝাপড়া হওয়ার জায়গা এটা নয়।
হোটেলে ঢুকে সবাইকে নিজের রুমে ডেকে নিল গ্যাং। কেউ কিছু বলার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল লি-র ওপরে। আজ সে লি-কে খুন করেই ছাড়বে।
গ্যাংকে আটকাল হাও। সর্বশক্তি দিয়ে গ্যাংকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ওটা লি নয়। ওটা পেমা দোরজি। ও ছিল বলে আমরা পারফর্ম করতে পারলাম। লিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘কী?’ আঁতকে উঠল গ্যাং, ‘এটা আমাকে আগে বলা হয়নি কেন?’
‘কী করে বলব?’ খুব রেগে গেছে মিন, ‘তুমি হোটেলের স্টাফদের অর্ডার দিয়েছ, কেউ যেন এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউয়ের সময় তোমার রুমে না ঢোকে। এমনকী আমরাও নয়। এদিকে আমাদের কারও মোবাইল কাজ করছে না, হোটেলের ইন্টারকম খারাপ। জানাব কী করে? আত্মপ্রচারের জন্যে তোমার এই পাগলামি সিনচানে দেখিনি তো! এরকম করলে ব্যান্ড ভেঙে যাবে।’
‘মুখ সামলে!’ গ্যাং উত্তেজিত। নিজেকে সামলে পেমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে মঞ্চে ওঠার অনুমতি কে দিল?’
‘হাও আর মিন দিয়েছেন,’ শান্ত গলায় বলল পেমা। এখন সে ফ্যান কম, পুলিশ বেশি। ‘কাজ উতরে দেওয়ার জন্যে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। আপনাদের সব গান আমার মুখস্থ। সব নাচের স্টেপ চোখ বেঁধে করতে পারি। কিন্তু আপনারা যে ছড়ি আর টুপি নিয়ে পারফর্ম করবেন, সেটা জানতাম না। তাই অল্পবিস্তর ভুল হয়েছে। এনিওয়ে, আপনারা এই নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। বরং বলুন লি-কে শেষ কখন দেখেছেন?’
কেউ কোনও কথা বলছে না।
পেমা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘এখন রাত সাড়ে দশটা। আর পাঁচ ঘণ্টা বাদে আপনাদের ফ্লাইট। আপনারা যাবেন তো?’
মিন বলল, ‘লিকে না নিয়ে যাব না।’
‘তার জন্যে বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিতে হবে। লি-র লাশ পাওয়া গেছে ওর রুমের বারান্দার নীচে, পাঁচশো ফুট গভীর খাদে। রেসকিউ টিম এইমাত্র লাশের কাছে পৌঁছেছে। উদ্ধারকর্তারা ফোনে আমাকে জানালেন যে মুখ থেকে মদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পোস্ট-মর্টেম না হলে বডি দেওয়া যাবে না।’
কথাটা শুনে চুপ করে গেল গ্যাং। তারপর ব্যান্ডের বাকি দুই সদস্য ও আটজন সাপোর্ট স্টাফকে নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে ছোট্ট একটা মিটিং করল। গ্যাং-এর মোবাইল থেকে একটা আইএসডি কল গেল সিনচানে। পুরো মিটিংটা ওয়ার রুমে বসে শুনছেন সীমা। পাশে কল্পিতাও আছে। ফোন কলটাও শুনলেন দুজনে।
পাঁচ মিনিটের মাথায় রুম থেকে বেরিয়ে গ্যাং বলল, ‘মিডিয়া কিছু জানে না তো?’
পেমা বলল, ‘এখনও পর্যন্ত না।’
‘ফ্যান ক্লাবের সভাপতিকে অনুরোধ, লিয়ের মৃত্যুর কথা আমরা চলে যাওয়ার আগে যেন কেউ জানতে না পারে।’
‘ঠিক আছে স্যর।’
‘আমরা এক্ষুনি চেক আউট করতে চাই।’
‘অ্যাজ ইউ উইশ!’ রিসেপশানের দিকে এগোল পেমা। ওয়ার রুমে বসে কল্পিতা বলল, ‘ব্যাপারটা কী হল?’
‘জানি না,’ সীমা বললেন, ‘কনসার্ট চলাকালীন তোমাকে ফোন করেছিলাম। ধরোনি কেন?’
‘আমি ওয়াংসুর ওপরে নজর রাখছিলাম। ফোন আসার আওয়াজ শুনতে পাইনি। তবে ও কোথায় গেল সেটা জানি। তিব্বত সীমান্তর দিকে।’
বাইশে ফেব্রুয়ারি
দিল্লিতে রঞ্জিত গগৈয়ের ঘরে বসে প্রথমা বলল, ‘উফ্! কী ঝামেলায় যে ফেলেন! গাদাগাদা “র”-এর এজেন্ট। কেউ কাউকে চেনে না। কিন্তু তার মধ্যে একটা মেয়ে আমার ফ্যান। স্টারের সঙ্গে সেল্ফি তুলবে বলে সবাইকে জিজ্ঞাসা করছে, “আপনিই প্রথমা?” ডিজগাস্টিং!’
ভুরু কুঁচকে রঞ্জিত বললেন, ‘কল্পিতা মুর্মু কী করে তোর নাম জানল, এটা আমার কাছেও রহস্য। ওকে আপাতত অন্য ডিভিশানে দেওয়া হয়েছে। আর নাক গলাতে আসবে না। তবে ওকে নজরে রাখা হচ্ছে।’
‘বাঁচা গেল!’ বলল প্রথমা।
‘কল্পিতা ভেবেছিল যে রিনচিন হল প্রথমা।’ বললেন রঞ্জিত।
‘ওসব বাদ দিন।’ রঞ্জিতকে থামিয়ে আয়েশা বলল, ‘প্রথম কথা হল, ডান্সিং ম্যান সাইফারের মাধ্যমে ‘‘কি’’ পায়নি বলে ওয়াংসু বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশে ফেব্রুয়ারি ইটানগরে জনসভা করে দিল্লি ফিরে এসেছেন। ওয়াংসু পলাতক, তবে “র”-এর নজরদারিতে আছে। ও যদি “লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কনট্রোল” পেরিয়ে সিনচানে ঢুকেও যায়, তা হলেও অসুবিধে নেই। “র” ওকে ট্র্যাক করবে। দ্বিতীয় কথা হল, সিনচান সি-র বাকি তিন ব্যান্ড মেম্বার দেশে ফিরে লি-কে নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। খাদ থেকে উদ্ধার হওয়া লি-র বডি পোস্ট-মর্টেম হওয়ার পরে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ঠান্ডা ঘরে রাখা আছে। কেউ দাবি করে কি না, দেখা যাক!’
‘কেউ দাবি করবে না। আমি নিশ্চিত।’ বললেন রঞ্জিত, ‘কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে প্র্যাট। তুই সাইফার স্ক্রিপ্টের ডিক্রিপশান আটকালি কী করে?’
‘এটা ল্যাটারাল থিঙ্কিং বলতে পারেন,’ হাসল প্রথমা, ‘সিনচানের এজেন্ট ভেবেছিল কনসার্টের সময় নাচতে নাচতে “ডান্সিং মেন সাইফার” ব্যবহার করে “কি” জানিয়ে দেবে। আমি কিন্তু ওই লাইনে ভাবিনি। আমি সিনচানের এজেন্টকে খুঁজে বার করতে চেয়েছিলাম। খুঁজে বার করামাত্র তাকে মার্ডার করি। হিন্দিতে একটা কথা আছে। “না রহেগা বাঁশ, না বাজেগা বাঁশুরি!” যে নেচে নেচে “কি” বলবে, সে-ই যদি গায়েব হয়ে যায়, তা হলে পুরো প্ল্যান মাটি!’
‘লি যে ওদের এজেন্ট, এটা জানার পরে প্রথমা ডিসিশানটা নেয়,’ বলল আয়েশা। ‘লি-কে মদ খাইয়ে আউট করে প্রথমা আমাকে ফোন করে এটা জানিয়েছিল। পেমা যে লি-র রিপ্লেসমেন্ট হতে পারে, এটা ওর মাথায় ছিল। প্ল্যানের মধ্যে একটাই মুশকিলের জায়গা। দুপুরো বা বিকেলে লি-র খোঁজ পড়বে। ওই জন্যেই পেমার সাহায্য নিয়ে গাদাগাদা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করা হয়। রুম সার্ভিসে আমাদের এজেন্টরা বাকি ব্যান্ড মেম্বারদের বলে যে গ্যাং কারও সঙ্গে দেখা করবে না। রুমেও আসতে দেবে না। জ্যামার ব্যবহার করে মোবাইল কানেক্টিভিটি বন্ধ করা হয়। হোটেলের ইন্টারকম খারাপ করে দেওয়া হয়। পাশাপশি হাও আর মিনের অনুমতি নিয়ে পেমাকে লি সাজানো হয়।’
‘সীমা ভেবেছে রিনচিন খুনি। ওই লি-কে খাদে ফেলে দিয়েছে।’ বললেন রঞ্জিত।
‘রিনচিন তো আমি!’ বিরক্ত হয়ে বলে আয়েশা।
‘তা হলে দুপুরে লি-র ঘরে কে গিয়েছিল?’
‘আমি গিয়েছিলাম,’ বলল প্রথমা, ‘বালা নামের মালিশউলি সেজে প্রথমে হাওয়ের কাছে যাই। হাও বলে যে সে ‘গে।’ এবং লি হল ‘লেসবিয়ান।’ তখন যাই লি-র কাছে। ও যে সমপ্রেমী, এই কথাটা সিনচানে প্রকাশ্যে বললে খুন হয়ে যাবে। আমার মতো এক সমপ্রেমী পেয়ে নিজের দুঃখের কথা উজাড় করে দেয়। এটাও বলে যে সরকারের সুনজরে থাকার জন্যে এম এস এস এজেন্টের কাজ করছে। এরপরে আমি আর দেরি করিনি। ওকে বারান্দা থেকে নীচে ফেলে ওই রুমেই রয়ে যাই। গ্যাং একবার খুঁজতে এসেছিল। তখন রিনচিন তার মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার গল্প করে গ্যাংকে আটকায়। পেমা নাকি রিনচিনের মা! কী মিথ্যে কথা বলতে পারে! উফ্!’
‘নেকু!’ প্রথমাকে আওয়াজ দেয় আয়েশা, ‘আমি ওই সময়ে গ্যাংকে না আটকালে ও ঠিক তোর রুমে নক করে খবর নিত। সীমাও তো দৌড়ে এসেছিলেন।’
‘যাই হোক! সব ভালো যার শেষ ভালো।’ আড়মোড়া ভাঙলেন রঞ্জিত।
হঠাৎ আয়েশা আর প্রথমার পিছন থেকে চেনা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ধন্যবাদ!’
প্রথমা আর আয়েশা তড়াক করে চেয়ার থেকে উঠে স্যালুট করল। রঞ্জিত চেয়ার থেকে উঠে বীরেন্দ্র মেহতার কাছে গিয়ে করমর্দন করে বললেন, ‘আপনি কেন এলেন? আমাকে ডাকলে পারতেন!’
‘সময় নেই। নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ‘প্রথমা আর আয়েশাও বসে পড়ো। নতুন কাজ আছে।’
