যুগতরঙ্গের খেলা

কিন্তু শিবনাথ অস্থির হয়ে উঠল মনে মনে। বেহুলা গ্রামের গুপ্ত রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক ভয়াবহ বন্যার আবর্ত পাক খাচ্ছিল। সে টের পায়নি। ভানুমতীর যৌবন সঞ্চারের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন্যার উত্তরঙ্গ ঢেউ আচমকা ফুঁসে উঠতে লাগল, যে-যৌবনের রাজত্বে সে বেড়াবে সুখী কুরঙ্গের মতো। কিন্তু অনেকগুলি ঘটনা একসঙ্গে ঘটতে লাগল। যেন সুখনিদ্রা বাসরে শ্মশানযাত্রীর খোল-করতাল সহকারে চিৎকার উঠতে লাগল চারদিকে। শিবনাথ শুনেছে, নারায়ণ এসেছে কয়েকদিন আগে। সে দেখা করতে যেতে পারেনি। যেতে পারেনি, এই কথাই নিজের মনকে বলেছে সে। যেতে মন চায়নি, সে কথাটি স্বীকার করতে পারেনি নিজের কাছেও। একটা বিচিত্র ভয় ও লজ্জা তাকে গ্রাস করে আছে। সে শুনেছে, নব্য ধর্মসভা বলে এক সভা স্থাপন করেছে নারায়ণ নিজের চণ্ডীমণ্ডপে। অথচ, টোলে পড়াতে আসেনি। সে লক্ষ করেছে, অবনী তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ধর্মসভায় গেছে। দেখা করেছে নারায়ণের সঙ্গে। নারায়ণকে কেন্দ্র করে এক নতুন আলোচনার ঢেউ উঠেছে চারদিকে। 

দ্বিতীয় বিবাহের উৎসবের দিন বিকালের দিকে বিলোচনের ছেলে বউ চিৎকার করে কেঁদে এসে পড়ল তার উঠোনে। শুনল, বিলোচনকে গুপ্তিপাড়ার কুঠির লাঠিয়ালেরা ধরে নিয়ে গেছে। এ দুর্ঘটনা আশঙ্কা করেছিল শিবনাথ। 

জোট পাকিয়ে এবার যারা দাদন নেয়নি, বিলোচন তাদের অন্যতম। তবুও সংশয় ছিল শিবনাথের। কলকাতায় যেভাবে রায়তদের নিয়ে আন্দোলন চলছে, আশা করেছিল, ইতিমধ্যে কিছু ঘটবে। সে ঘটনা রায়তের মঙ্গল ছাড়া অমঙ্গল ডেকে আনবে না। ইতিপূর্বে দাদন না নেওয়ার দরুন বিলোচনকে কুঠিতে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। বিলোচন যায়নি। এখন, যখন নীল বোনা শেষ হয়ে গেছে, বিলোচন নিঃসংশয়ে ধান দিয়েছে মাঠে, সেই মুহূর্তে কুঠিয়াল হঠাৎ কয়েদ করল বিলোচনকে। 

সে আশা করেছিল, এবছরে যদি কুঠিয়ালদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা অবলম্বিত না হয়, তবে আগামী বছরের গোড়ায় গোরারা এর সুদসুদ্ধ আদায় করবে। কিন্তু মাঝে এমন কী ঘটল, যার জন্য বিলোচনকে কয়েদ করল তারা। শোনা গেল, শুধু বিলোচন নয়, আরও তিন জন রায়তকে কয়েদ করেছে কুঠিয়ালরা। বাঁশবেড়ের কুঠিতে একই ঘটনা ঘটেছে। 

মন বড় দমে গেল শিবনাথের। তার উৎসবের বাসরে নেমে এল নিরুৎসবের অন্ধকার। এই প্রথম তার মন বিরক্ত ও নারাজ হয়ে উঠল সকলের প্রতি। একদিন সে অনেক আশা দিয়েছে বিলোচনকে। বিলোচনকে একলা নয়, অনেককেই। কিন্তু আজ! আজই কেন? আজ তার জীবনের প্রথম উৎসবের দিন। তার সমস্ত উদ্দীপনা, আশা আজ অন্যত্র। 

তবু সে এক বার পরামর্শের জন্য গেল নারায়ণের কাছে। নারায়ণের বাড়িতে রাখাল বললে, ঠাকুর বাড়ি নেই। 

এমন সময় দেখল, গুপ্তিপাড়ার ঈশান মিত্র একটি টাট্ট ঘোড়ায় চেপে নারায়ণের বাড়িতেই এসে হাজির। শিবনাথকে দেখে ঈশান মিত্র নেমে এসে তাকে প্রণাম করলেন। বললেন, শিরোমণি ঠাকুর ফেরেননি? 

শিবনাথ ঈশানকে আশীর্বাদ করে বলল, কোথায় গেছে সে? 

একটু অবাক হয়ে বললেন ঈশান, কেন, তিনি তো উঁচড়ো গেছেন অনেকক্ষণ। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সব কথা প্রকাশ করতে গেছেন। কথা ছিল লোকাল ইনস্পেকশন হবে। তারপর শোনা গেল হবে না, কিন্তু কমিশন বসবে চুচড়ো কোর্টে। কুঠিয়ালেরা তার আগেই রায়তদের মেরে টিপসই নিয়ে রাখছে। তারা দেখাবে যে, রায়তেরা দাদনের টাকা নিয়েও জমিতে নীল বুনতে দেয়নি। অত্যাচারী রায়তের জ্বালায় তারা নাকি অস্থির। আরও শুনলাম, কুঠির উঠোনে ছাই জমিয়েছে ছোট সাহেব। কমিশন যদি এদিকে আসে, তার আগেই নীলের মাঠে ছাই ঢেলে দিয়ে দেখাবে, রায়তেরা দল বেঁধে কী সর্বনাশ করেছে। 

বলে ঈশান একটু হেসে বললেন, শুনলাম, ছোট সাহেবের রাগ আপনার ওপরও খুব আছে?

শিবনাথ বলল, আমি তো দাদন নিয়েছি, সেখানে নীলও বোনা হয়েছে। তবে আমার অপরাধ? 

ঈশান শিবনাথের প্রশ্ন শুনে থমকে গেলেন। ভেবেছিলেন এ কথা শুনে শিবনাথ নীলকরের প্রতি ঘৃণায় ধিক্কার দেবেন। কিন্তু তিনি জিজ্ঞেস করেছেন তাঁর অপরাধের কথা। এ তো ঠিক বেহুলার শিবু পণ্ডিতের কথা নয়। এ বিষয়ে এত নির্বিকার! নীলকরের রাগের কথা শুনে যেন বিমর্ষ হয়ে গেলেন পণ্ডিত। এমন কী নারায়ণ শিরোমণি যে সদরে গেছেন বিলোচনের ব্যাপার নিয়ে, তাও উনি ঠিক জানেন লো। পরমুহূর্তেই তাঁর মনে পড়ল, পণ্ডিতের বাড়িতে উৎসবের কথা। তার বালিকা স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহের কথা তিনিও শুনেছেন। শ্লেষ হাসির ঝিলিক দিয়ে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। লোক-চরিত্র অভিজ্ঞ ঈশান বুঝলেন, পণ্ডিতের মন অন্যত্র পড়ে আছে।

তিনি শিবনাথকে যেন সান্ত্বনা দেবার জন্য বললেন, অবিশ্যি ভয়ের কিছু নেই। বিলোচনকে ছেড়ে দেবে ওরা আজকালের মধ্যেই। সবকিছু সাবুদ করতে হবে কমিশনের কাছে। সাবুদ আমাদেরও কিছু আছে। সেইদিন আপনাকে চুঁচড়ো যেতে হবে এক বার দয়া করে। 

কিন্তু শিবনাথের মুখ লাল হয়ে উঠেছে। সে লক্ষ করেছে ঈশানের শ্লেষ হাসি। ঈশান এক টুকরো কাগজ দেখিয়ে বললেন, সব কথা লিখেছি আমি। পাঠিয়ে দিয়েছি সংবাদ প্রভাকরে। একবার পড়ে দেখবেন? 

শিবনাথ বিব্রত হল। ওটা স্পর্শ করলে তাকে স্নান করতে হবে আবার। বলল, তুমি নিজেই পড়ো৷ 

ঈশান পড়লেন। আজকালকার রীতি অনুযায়ী কলকাতার কথ্য ভাষায় খানিকটা গদ্য লিখে তারপর ছড়া কেটেছেন। ছড়া কেটে নীলকরদের অত্যাচারের ঘটনা লিখেছেন। শিবনাথের মনে হল তার কানের মধ্যে বৃশ্চিক দংশন করছে। তার সারা গায়ে সহস্র বৃশ্চিক দংশনের জ্বালা। চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা করল তার। যে আলালী ভাষার এত নাম হয়েছে কলকাতার শিক্ষিত সমাজে, যার অনুসরণ করছে আবার এখন হুতোম প্যাঁচা, শূদ্র শিরোমণি কালী সিঙ্গি, সেই ভাষায় গদ্য লিখছে ঈশান। ছড়া কেটেছে যেন অর্বাচীন কবিয়ালের মতো। সে বলল, বিষয়বস্তু বিবৃত হয়েছে ভালই। ভাষাটা ভাল হয়নি, বাগদিপাড়ার কোন্দল হয়ে গেছে। কলম দিয়ে অর্বাচীন কথা লেখা যায় না, মুখে বলা যায়। 

ঈশানও একটু বিব্রত হয়ে বললেন, সকলেই যাতে বুঝতে পারে, সেজন্য এই ভাষায় লিখেছি।

শিবনাথ বলল, তোমাদের সকলে কে তা জানিনে। কলকাতার লোকে তোমাদের বিদ্যাসাগরের গদ্য তো বুঝতে পারে শুনেছি। সেই পণ্ডিতকেও তো তোমরা মানো! তবে তার মতোই কেন বাংলা গদ্য লেখো না। 

ঈশান জানতেন বিদ্যাসাগরের উপর শিবনাথের বিতৃষ্ণা কতখানি। বোধ হয় একমাত্র তাঁর ভাষাটাই সহ্য করতে পারেন। বললেন, আজ্ঞে, রায়তেরা বিদ্যাসাগরের ভাষা বুঝতে পারে না। 

রায়তেরা পড়তে না জানলে বুঝবে কী করে? যারা পড়তে জানে না, তাদের কি তোমরা নিজেরা অর্বাচীন হয়ে বোঝাবে? 

বাংলা ভাষা লেখ্য হিসাবে কতখানি গ্রাহ্য হওয়া উচিত, তাতেও সংশয় আছে শিবনাথের। কথ্য ভাষাকে লেখ্য করায় তার ঘোরতর আপত্তি শুধু নয়, বোধ হয় ঘৃণাও আছে। 

যে জন্য আলালী হুতোম শুধু নয়, ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা পর্যন্ত কখনও পড়েনি। তবু ঈশান বললেন, যারা অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানে, তারাও যাতে বিষয়টা বুঝতে পারে..। 

শিবনাথ উত্তেজিত হতে চায়নি। তবু শেষ পর্যন্ত না বলে উঠে পারল না, জানি। কলকাতার বাবুদের অন্দরমহলের বিবিদের দৌড় ওর বেশি নেই। আলালের গপ্পো আর এ সব তাদের জন্য লেখা দরকার। ভাল, ওতে আনন্দ বিধান আর স্ত্রী-শিক্ষা দুয়েরই বেশ বাড়াবাড়ি হবে। 

শিবনাথের মুখ রাগে ও বিদ্রুপে লাল হয়ে উঠেছে। ঈশানকে সে রীতিমতো খাতির করে। নারায়ণ হলে তার ভাষা সম্ভবত আরও রূঢ় হত। ঈশানও উত্তেজিত কম হয়নি। ইতিপূর্বে এ বিষয়ে আরও অনেক কথা হয়েছে। প্যারী মিত্রকে রাধানাথ শিকদার কথ্য ভাষা লিখতে অনুরোধ ও উৎসাহিত করেছিলেন। বলেছিলেন, মেয়েদের যাতে সুবিধে হয়, এমন ভাবে লিখবে। এমনকী মহিলাদের কথ্য ভাষা কেমন লাগছে, সেই মতামতের জন্য অনেক ছুটোছুটিও করেছেন। শিবনাথের ইঙ্গিত সেদিকেই। 

ঈশানের গায়ে লাগল। তিনি পালটা কিছু বলার উদ্যোগ করবার আগেই শিবনাথ ফিরেছে। নিজের প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠেছে শিবনাথ। কেন, কী দরকার ছিল তার এ সব কথায়। বন্যা আসে, চলে যায়। কিছু দিন তার দাগ থাকে সর্বত্র। কিছু দিনের জন্য মড়ক আসে, শকুন উল্লসিত হয় তাতে। তাতে সমুদ্রের কী ক্ষতি! তার গভীরতা, তার বিশালত্ব, তার মহিমা তো কমে না। মিথ্যের পিছনে কেন অকারণ সে তার মন জুড়ছে। তার মন, যে মনে অনেক রং-এর ফুল ফুটেছে আজ। অনেক রং আর অনেক গন্ধ, যা দিয়ে তার বাহান্ন বছরের শূন্য বাগান ভরে উঠবে…তবু বিলোচনের জন্য মনটা খচখচ করতে লাগল। একটা বিদ্বেষ অথচ তীব্র ব্যথা আঁকড়ে ধরে রইল মনটা নারায়ণের জন্য। 

ঈশানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সে অগ্রসর হল।

এমন সময় আবার একজন ছুটে এল। একজন মাহিন্দর মানুষ। কিন্তু অচেনা। দাঁড়াল এসে শিবনাথের কাছেই। লোকটি হাঁপাচ্ছে। প্রণাম করে বলল, এঁজ্ঞে, লারানঠাকুর মোশায়ের বাড়ি কোনটা বলতে পারেন? 

শিবনাথ বলল, এইটেই। কেন? কোত্থেকে আসছ তুমি? 

এক মুহূর্ত দ্বিধা করল লোকটি। এক বার সন্দেহান্বিত চোখে তাকাল শিবনাথের দিকে। তারপর বলল, এঁজ্ঞে, বাড়ি বাঁশবেড়ে, আসছি সেই চুড়ো থেকে। শুনলাম কী যে ঈশেন মোশায় এখানে এইছেন। ওনারে দরকার, দুটি কথা বলতে লাগবে। 

ঈশান তাড়াতাড়ি টাট্টু থেকে নেমে এগিয়ে এলেন, কী হয়েছে বলল, আমি ঈশান মিত্র।

লোকটা আর একবার কপালে হাত ঠেকিয়ে উপুড় হল। হেসে বলল, এঁজ্ঞে, লয়ন সার্থক হলেন গো আপনিকে দেখে। কত দিন যে এসবো এসবো ভাবছি, হয়ে ওঠেনি। 

ঈশান বাধা দিয়ে বললেন, খবর কী, কী বলতে এসেছ, আগে তা-ই বলল। 

অপ্রতিভ না হয়েই লোকটি বলল, এঁজ্ঞে হ্যাঁ, বলি। চুড়ো থেকে এলুম। লারান ঠাকুর মোশায় বলে দিলেন, আপনাকে এট্টা চিঠি দিতে। 

বলে সে একটা চিঠি বাড়িয়ে দিল ঈশানের হাতে। ঈশান উৎকণ্ঠিত চোখে চিঠিটা দেখলেন। পড়লেন, নারায়ণ লিখেছে, সর্বসাকুল্যে একান্নটি মামলা দায়ের করেছে গুপ্তিপাড়ার কুঠিয়াল। আরও ধরপাকড় হতে পারে কেনো জেলাশাসকের মতিগতি বিশেষ সুবিধার বুঝছি না। আমি কলকাতা যাচ্ছি হরিশ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে। শুনেছি, উনি গতকাল রাত্রি থেকে পেটের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, তবুও কাজের কামাই নেই। আমার সঙ্গে কয়েকজন রায়তও আছে, উনিও রায়তদের মৌলিক বিবরণ পছন্দ করেন। আজকে আর ফিরতে পারব বলে আশা হয় না। আগামীকাল ফিরব নিশ্চয়ই। আজ আর ধর্মসভার বৈঠক সম্ভব নয়। আগামীকাল পেনিটি, ভাটপাড়া আর বরানগরের পণ্ডিতেরা আসবেন। ফিরতে দেরি হলে আমার বাড়িতে তুমিই তাঁদের খাওয়া থাকার ব্যবস্থা করবে অন্যথায় অবনকে সংবাদ দিলে সে নিজেই এসে বেঁধে-বেড়ে খাওয়াতে পারবে। শিবনাথকে জানাবে, বৃহস্পতিবারের ধর্মসভার বৈঠকে তার বিশেষ নিমন্ত্রণ। বেহুলা ও গুপ্তিপাড়ার পণ্ডিত সমাজের হয়ে সে যদি প্রতিনিধিত্ব করে, তবে ভাল হয়। সাবধানে থেকো। কুঠিয়ালেরা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে..ইত্যাদি অনেক কথা লিখেছে নারায়ণ। 

ঈশান চিঠি পড়ছিলেন, শিবনাথও উৎকণ্ঠিত চিন্তিত। কিন্তু ব্যথায় ও অভিমানে বুকটা যেন বিষাক্ত পোকা কুরে কুরে খাচ্ছে। বন্ধুর সব খবর জানবার অধিকার নেই। আর কোনও দিন, কোনও বিপদে, সুখে দুঃখেই নারায়ণ তাকে চিঠি দেবে না। সংবাদ নিতে হলে, পেতে হলে, অন্যের কাছ থেকে পেতে হবে। তবু সে না জিজ্ঞেস করে পারল না, কী সংবাদ ঈশান? 

ঈশান চিঠিটা বাড়িয়ে দিতে গিয়েও থামলেন। বুঝলেন, চিঠিটা হাতে নেবেন না পণ্ডিত। পড়েই শুনিয়ে দিলেন। শুনতে শুনতে ক্ষোভে ও ব্যথায় শিবনাথের বিশাল মুখ থমথমিয়ে উঠল। এ যেন নারায়ণের চিঠি নয়, যে তার আবাল্য বন্ধু। এ যেন আর কারও, কোনও অপরিচিত মানুষের। টোলে না আসার জন্য জবাব কোনও নেই, ধর্মসভার প্রতিনিধিত্বের জন্য নিমন্ত্রণ। উদ্দেশ্য যেন শুধু শিবনাথকেই আহত করা। আর অবনী। তার প্রিয়তম ছাত্র, সে কি নারায়ণের প্রতি এতই অনুরক্ত! শিবনাথের মনে হল, নারায়ণ যেন তাকে সমস্ত বিষয়ে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ফাঁদ পেতেছে। এই নীলকর অত্যাচার বিষয়ে চুঁচুড়া কলকাতা ছুটোছুটি, ধর্মসভা, অবনকে তার খণ্ড কালের সুখ দর্শনতত্ত্বে টেনে নেওয়া, সমস্তই একটা অদৃশ্য ষড়যন্ত্রের লীলা। তার আনন্দ, তার সুখ নারায়ণের অসহ্য হয়েছে। তার নতুন গড়া বাগানে সে শেয়াকুলের কাঁটা দিতে চায় ছড়িয়ে। সেই আয়োজনেই মেতেছে নারায়ণ। সেই আয়োজন, আর তারই অন্তস্রোতে হয়তো আরও এক আয়োজন চলেছে। নীলরতন চক্রবর্তীর মেয়ে স্বর্ণলতাকে কুল ও মেল ভেঙে লাভের আয়োজন। তাই এত ধর্মসভার ডাকাডাকি। 

… একটা বিদ্বেষকুটিল রেখা বিদ্যুতের মতো ঠোঁটের পাশ থেকে ঊর্ধ্বে মোটা জ্বর মধ্যে অদৃশ্য হল শিবনাথের। পরমুহূর্তেই মনে মনে মাথা নাড়াল সে। না না, কারও সুখে সে বাধা দেবে না। নিজের এই আনন্দের মাঝেও সে কোনও বিঘ্ন চায় না। 

তার ছাতিফাটা আকণ্ঠ পিপাসার্ত চোখের সামনে দেখা দিল ভানুমতীর মূর্তি। কানায় কানায় ভরা এক ফেনিল পানপাত্র। মহাজীবনের ও মহামরণের শীতল পানীয় চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে তার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বাইরের সব দ্বার বন্ধ করে দেবে সে। কোনও আন্দোলন, কোনও আলোচনার প্রবেশ সে নিষেধ করে দেবে। তার সময় নেই। সময় নেই উপায় নেই, বুকের মধ্যে শুধু দুটি মলপরা পায়ের ঝুমঝুম বাজনা। ঘুম পাড়ানো, ঘুম ভাঙানো বাজনা। ধর্মসভা, রায়ত, নীলকর, কোনও কিছুই সেই বাজনার শব্দ ঢেকে দিতে পারবে না। 

ঈশানকে কোনও জবাব না দিয়ে চলে গেল সে। ঈশান বাঁশবেড়ের চাষি রায়তকে বিদায় দিয়ে টাট্ট নিয়ে ছুটল গুপ্তিপাড়ার দিকে। 

.

শিবনাথ বাড়িতে ঢুকেই শুনতে পেল তখনও চলেছে মেয়েদের খিলখিল হাসি, ধস্তাধস্তি, চুড়ি ও মলের ঐকতান। মেয়ে গলার গান শোনা যাচ্ছে, মাতাল ভোলার কোলের পরে মা দুগগো আসন পাড়ে। 

একজন বলল, আসন পাড়বে কী লো। লজ্জা করবে না?

আর একজন বলল, আ মরণ! লজ্জা কীসের। অন্ধকার যে… 

অমনি হাসির মুক্ত বন্যা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। শিবনাথ মত্ত ভোলানাথ হয়ে আপন মনে দোলা দিতে লাগল দুর্গাকে। 

অন্তঃপুরের এই হাসি দূরপাল্লা পিচকারির রং-এর মতো এসে ছিটকে পড়ছিল টোলের ঘরে। আর চমকে চমকে উঠছিল অবনী। নব্যধর্মসভার চিন্তা ছেড়েছে, বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্র পুথি তুলে রেখেছে। সে। ঈশানের নির্দেশ অনুযায়ী এ বেলা সে ইংরাজিতে দরখাস্ত লিখছে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিলোচনের স্ত্রীর জন্য। অনেক ভেবে, প্রতিটি বাক্য কষ্ট করে নির্ভুল ভাবে লিখতে হচ্ছে। যাতে ইংরেজি কোথাও ভুল না হয়। কিন্তু সেই অভিযোগপত্রের বুকে চোখ ঘুরিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে একজন হাসছে, ঘুরছে। প্রমাদ ঘটাচ্ছে কেবলি ইংরেজি বিশেষ্য বিশেষণ নিয়ে। কিন্তু সে আসে আর যায়, কেন যেন চায় ফিরে ফিরে হেসে হেসে। ইতি নেই সে আসা যাওয়ার।

রাত্রে, নতুন বাসর ঘরে শিবনাথের দেখা হল ভানুমতীর সঙ্গে। অনেক দিন পর, চার দিন নয়, চার যুগ পরে। শিবনাথের খুশির অন্ত নেই। এ সেই চার দিনের আগের মেয়েটি নয়। তার চেয়ে অনেক ডাগর, অনেক বড় একটি বউ! বউ! আজ তার চলায় বলায় অনেক অর্থ। অনেক ইশারা যেন ব্যক্ত হয়ে পড়ছে অঙ্গ-ভঙ্গিতে। 

কাছে আসে না, ধরা দেয় না, কেবল ভানু দাঁড়িয়ে থাকে দূরে। শিবনাথ ডাকলে আরও দূরে সরে যায়। ফিরে চায়, কখনও জ্ব বাঁকিয়ে সংশয়ে, কখনও ভয়ে, কখনও রাগে, কখনও অবাক বিস্ময়ে হেসে। আর মনে পড়ে, এ চার দিন ধরে এয়োদের নানান কথা। এই রাত্রির রহস্যের কথা। 

তাই সে দূরে দূরে থাকে। ভয় পায়, রাগ হয় আবার কেন যেন হাসে। চার চারটি দীপ্ত প্রদীপ। সেই আলোয় ঝলমল করছে তার সর্বাঙ্গের সোনা। চকচক করছে তার তেলজলে ধোয়া খোঁপা আর সোনার চিরুনি। পাতলা ফিনফিনে ঢাকাই লাল শাড়ি শুধু পরনে। তার কিশোরী দেহ সুস্পষ্ট মূর্তি নিয়েছে আলোর ছটায়। দীপ্ত প্রদীপের আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে শাড়িতে আর জড়ানো সোনার নিতম্বহারে। 

ভানুর কানে কানে বাজছে মেয়েদের কথা। আর কেবলি দূরে সরে যেতে ইচ্ছে করছে ঠাকুরের কাছ থেকে। আবার ভরসা করে কাছে আসতে ইচ্ছে করছে। কখনও নবর কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে। কখনও অবনের মুখ। আবার শিবনাথের দিকে চেয়ে, তার চোখ মুখ দেখে নির্ভয়ে কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। একই কথা শুনে শুনে, একই পরিবেশে থেকে থেকে তার রক্তধারায় যেন কীসের তাল বাজছে। কাঁপছে, অসহায় মনে হচ্ছে, শরীরটা অবশ লাগছে থেকে থেকে। একটি একটি করে তিনটি প্রদীপ নেভাল শিবনাথ। তিন বারই চমকের পর চমকে, শেষ মূহুর্তে ডুকরে উঠল ভানু, কী হবে? কী হবে? 

শিবনাথ কাছে এসে আদর করে বলল, কিছু নয়, আমি যে তোমার স্বামী।

স্বামী মনে মনে উচ্চারণ করল ভানু, সোয়ামি! যেন এমন অদ্ভুত কথা কখনও শোনেনি সে। তারপর বিস্ময়ে ও ঝিমিয়ে পড়া আতঙ্কে শেষে কাঁদতে লাগল সে। শিবনাথ দুহাত বুকে করে সরিয়ে নিয়ে গেল তাকে। 

শিবনাথের বক্ষ-সংলগ্ন ভানু তবু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল ফিসফিস করে, কী করবে ঠাকুর, কী হবে? 

শিবনাথ মাতাল চোখে ভানুর মুখের দিকে তাকিয়ে, যেন স্বপ্ন-ঘোরে গাঢ় চাপা স্বরে বলতে লাগল, 

কুসুমে কুসুমোৎপত্তিঃ শায়তে ন চ দৃশ্যতে 
বালে! তব মুখাদ্যোজে কথমিন্দীবরদ্বয়ম?

ভানু যেন আরও ভয় পেল। ফুলের ওপর ফুল ফোঁটার কথাকখনও শোনেনি, দেখেনি, ঠাকুর সেই কথা বলছে ভানুর চোখ দেখে। কিন্তু ভানু বলল, কী মন্তোর পড়ছ গো ঠাকুর, এমন করছ কেন? 

প্রমত্ত শিবনাথের কানে ভানুর অর্বাচীন ভাষা বাজল না। সে চুম্বন করল ভানুকে। আবার বলল যেন তন্দ্রাঘঘারে, 

অপূৰ্ব্বো দৃশ্যতে বহ্নিঃ কামিন্যাঃ স্তনমণ্ডলে 
দূরতো দহতে গাত্রং হৃদি লগ্নস্তু শীতলঃ।

দূর থেকে অঙ্গ জ্বলে যায় নারীর ক্ষমণ্ডলের বহ্নি দেখে, সংলগ্ন হলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। 

আধোপুষ্ট ভানুর দিকে তাকিয়ে সেই কথাই বলছে শিবনাথ। কিন্তু ভানুমতীর আরও ভয় হয় শিবনাথের উষ্ণ আলিঙ্গনে। বলল, এ কীসের মন্তোর?

শিবনাথ হেসে বলল, তুমি আমার দেবী, তোমারই পূজার মন্ত্রপাঠ করছি। 

ভয়ের মধ্যেও হাসি পেল ভানুর। ঠাকুর যেন পাগল, ছেলেমানুষ। জ্যান্ত মেয়েমানুষকে আবার পুজো করে নাকি কেউ! 

শিবনাথ আবার চুম্বন করল ভানুকে। 

.

কিন্তু বারবার বাইরের আঘাত এসে লাগল তার সুখের বহে৷ বিচিত্র সব ঘটনা ঘটতে লাগল চারদিকে, গুপ্তিপাড়ার কুঠিতে ততোধিক না হলেও বাঁশবেড়েতে রীতিমতো অত্যাচার চলতে লাগল। কিন্তু রায়তেরা যেন কী এক জাদুবলে সমস্ত ভয়কে জয় করেছে। চুচুড়া থেকে সংবাদপত্র এনে বাবুদের দিয়ে পড়িয়ে শুনতে লাগল তারা। প্রতিবিধানের জন্য শোরগোল তুলতে লাগল প্রকাশ্যে। জেল, ফাঁসি, মৃত্যু, কোনও কিছুতেই ভয় পায় না তারা আর। 

এদিকে গুপ্তিপাড়া-বেহুলা অঞ্চলে নারায়ণের ধর্মসভা নিয়ে এক ভীষণ সাড়া পড়ে গেছে। বিরাট সভা হয়েছে নারায়ণের বাড়িতে। ভাটপাড়া, পানিহাটির অনেক পণ্ডিত এসেছিলেন। তিন দিন ধরে নারায়ণের বাড়িতে যেন খাওয়া-দাওয়ার উৎসব গেছে। বিধবা বিয়ে নিয়ে আলোচনার অবকাশ থাকলেও আইনত তা সিদ্ধ হয়ে গেছে। সেইজন্য বিশেষ করে ধর্মসভায় বিতর্ক হয়েছে সর্বদ্বারী বিবাহ নিয়ে। কৌলীন্য ও মেল প্রথা ভেঙে দিয়ে যত্রতত্র স্বজাত বিবাহ হল সর্বদ্বারী বিয়ে। শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ পণ্ডিতেরা সর্বদ্বারী বিবাহের অনুকূলে মত করে গেছেন। এমন কী গুপ্তিপাড়ারও অনেকে। বেহুলার পাত-না-পাওয়া ব্রাহ্মণও ছিল।

চারিদিকে জয় জয়কার নারায়ণ চুড়ামণির। বাইরের পণ্ডিতেরা দুহাত তুলে আশীর্বাদ করে গেছেন নারায়ণকে। শুধু তাই নয়, ক্ষয়া বাঁড়ুজ্জে আবার সর্বদ্বারী বিবাহের স্বপক্ষে তর্কজয়ী দুজন পণ্ডিতকে দুটি পশমি শাল উপহার দিয়েছেন। 

নিমন্ত্রণ গিয়েছিল শিবনাথের কাছে। সে আসেনি। তারপরেই দেখা গেল, নারায়ণ এবং ঈশান মিত্র, দুজনে মিলে এক বিধবাকে বিয়ে দেবার আয়োজন করেছে। বিধবা বেহুলারই এক সদগোপের মেয়ে। আইনত কোনও বাধা না থাকলেও মুহূর্তে মাথা তুলে দাঁড়াল অনেক বাধা। যেন মন্ত্রমুগ্ধ অনেকগুলি কালকেউটে আচমকা দাঁড়াল ফণা তুলে। সদগোপের পক্ষ থেকেও একটা বিরাট অংশ বিরোধী হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, যারা ধর্মসভায় বসে সাধুবাদ দিয়েছে, গুপ্তিপাড়ার সেই সব পণ্ডিতেরাও বিরুদ্ধ আসরে গিয়ে যোগ দিলেন। সুযোগ বুঝে কুঠিয়ালের দেশীয় অনুচরেরাও নারায়ণ আর ঈশানের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াতে লাগল। নারায়ণ বুঝল, এটা কলকাতা শহর নয়। এই নির্বান্ধব গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে মেরে ফেললেও রক্ষা করবার কেউ নেই। সেই বিধবা মেয়েটির মুখ মনে পড়ল। দশ বছরের বিধবা। তার সম্মতি আছে কি না নারায়ণ জানে না। কিন্তু বিয়ের কথা শুনে সে যে টিপে টিপে হেসেছে। আড়ে আড়ে চেয়েছে। এর চেয়ে সম্মতি আর সে শিশু বালিকা কী দেবে। হয়তো সে কত মালা গেঁথেছে, কত স্বপ্ন দেখেছে। তিন বছর বয়সে তার মৃত স্বামীর কথা তো তার মনে নেই। সে যে স্বামীর স্বপ্ন দেখছে।..না, থামবে না। কুসংস্কারের স্পর্ধার কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়াতে হবে। পিপাসার্তের মুখের কাছে পানপাত্র ধরে, নিতে হবে ফিরিয়ে! ঈশান স্থির। নারায়ণ যেন একটু অস্থির। একটু বেঁকে পড়া, চলে যাওয়া মন তার। একটু সংশয়। লোকে বলাবলি করল, তার বিধবা মায়ের নামে। কুৎসা রটাল। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন বিচিত্র ঘটনা ঘটে গেল। মানুষের মন কী আশ্চর্য! কী অভূতপূর্ব! শ্রাবণের মেঘ-ভারাক্রান্ত দুপুরে, নারায়ণ দেখল, শিবনাথের দিদি এসেছেন। কেউ নেই, নারায়ণ একলা। দিদি এলেন পা টিপে টিপে, উঁকিঝুঁকি দিয়ে। অবাক কাণ্ড! দিদির এমন মূর্তি তো সে কোনওদিন দেখেনি। এমন ভাবময় মুখ, চোখে দীপ্তি, জ্বর ওঠা নামা। সর্বোপরি এমন চকিত চলা। সে জানত দিদি এক ভাবলেশহীন ধীরগতি বিধবা মেয়েমানুষ। যার শুধু কথাহীন কাজ, ঘুমোনো আর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা সার। কিন্তু সেই চোখ মুখ রূপে ও ভাবে যে এমন সুন্দর, কোনওদিন তার চোখে পড়েনি। 

দিদি এসে বললেন, নারায়ণ একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এলুম।কণ্ঠস্বরে পর্যন্ত নতুন সুর দিদির। নারায়ণ বলল, হ্যাঁ, দিদি বলল, কী বলছ? 

দিদি বললেন, এদেশে নাকি বিধবা বিয়ের আইন করেছে?নারায়ণ অবাক হয়ে বলল, কেন, জান না? বিদ্যেসাগর আইন করিয়েছেন, তাই তো আজ বিধবাদের বিয়ে হচ্ছে। 

দিদির সারা মুখে ঘাম দেখা দিল। হাঁপাতে লাগলেন। মনে হল পড়ে যাবেন টলতে টলতে। দরজাটা ধরে বললেন, সত্যি? বিধবাদের বিয়ে হচ্ছে? কই, কখনও শুনিনি তো? আমরা পেট থেকে পড়েই বিধবা হয়েছি। কেউ তো বলেনি।

নারায়ণের মাথাটা ঘুরে গেল। দিদির ব্যাকুল জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কথা জোগাল না তার মুখে। কী বলতে চান দিদি, কী বলতে চান! 

সে বলল, তোমাদের বয়সকালে হয়নি দিদি। এই বছর তিন-চারেক হল আইন হয়েছে। 

মাত্তর! বলে দিদি ঘোলাটে চোখে খানিকক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে রইলেন। যেন এর পর আক্ষেপেরও কিছু রইল না আর। তারপর ধীরে ধীরে সেই ভাবলেশহীন বোধশূন্য ভাবটা ফিরে এল দিদির মুখে। খানিকক্ষণের তির্যক মুখোনি স্কুল হয়ে উঠল। এলিয়ে পড়ল হাত পা। যেমন চিরদিন ছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে আবার ফিরে চললেন। 

নারায়ণ সামনে এসে বলল, কী বলতে এসেছিলে দিদি, বলে যাও। কোনও কিছুতেই যেমন দিদির কিছু যায় আসে না, তেমন নির্বিকারভাবে বললেন, সবাই বলে, তাই বললাম। 

নারায়ণ বলল, তুমি বলে যাও দিদি, গগন পালের বিধবা মেয়ের বিয়ে দিলে কি আমার অন্যায় হবে? 

বিধবার বিয়ে? কী জানি! দেখো তোমরা। বলে দিদি চলে গেলেন থপ থপ করে। অথচ কেমন নিঃশব্দ পদসঞ্চারে, যেন হাওয়ায় ভর করে এসেছিলেন। নারায়ণের মনে হল, সে কথা বলেছে দুটো মানুষের সঙ্গে। একেবারে ভিন্ন মানুষ দুটি। কিন্তু কী হল, কিছু তো ঠিক বোঝা গেল না। সব যেন গোলমাল হয়ে গেল। 

.

আকাশ ভরা মেঘ। শ্রাবণ মাস। কদিন ধরে নিরন্তর বৃষ্টি হয়েছে। আজ একটু ধরেছে, কিন্তু আকাশের গোঁ যায়নি এখনও। পুবের জোলো বাতাস কখনও জোরে, কখনও ধীরে বইছে। 

নারায়ণ গেল চণ্ডিকার ভাঙা মন্দিরে। চারদিকে ঘন কালকাসুন্দের বন ও আঁশশেওড়ার ঝোঁপ। লকলকিয়ে উঠছে গাছে গাছে, ঝোপে ঝোপে, ছাগলবটি কুকুরছটাক লতা। বাসক ও বন-শিউলির দুর্ভেদ্য বেড়া। বেঁটে বেঁটে কুলের ঝাড়। জোলো বাতাসে মাথা দোলাচ্ছে বন, শোঁ শোঁ করছে। এই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সরু পথ গিয়ে ঢুকেছে মন্দিরে। ভাঙা মন্দির, বসে গেছে অনেকখানি মাটির তলায়। মন্দিরের অভ্যন্তর থেকে মাথা তুলেছে বনস্পতি। বিশেষ পালা গানে ছাড়া এদিকে কেউ আসে না। ভিড় হয় শুধু চৈত্র সংক্রান্তির দিন। মন্দিরের প্রাঙ্গণটি দূর্বা ছাওয়া। আশ্চর্য! রক্তজবা হাঁড়িকাঠের গোড়ায় গজিয়েছে কতকগুলি বনতুলসী।

নারায়ণ এসে দেখল, মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্ণলতা। আঁচল এলিয়ে পড়েছে। খোলা চুল উড়ছে বাতাসে। পিঠের দিক অনেকখানি খোলা। শ্যাম চিকন পুষ্ট কাঁধে যেন বাতাসেই বেঁকে পড়েছে। একটি বিছেহার। হাতে দুটি সোনার রুলি। যেন সেও বর্ষায় লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা বনানী, বাতাসে দুলছে, উড়ছে। যেন সে সত্যি স্বর্ণলতা। এই দুর্গম চণ্ডিকার বনে সে যেন ভয় ধরিয়ে দেওয়া বনসুন্দরী। ছেড়ে যাওয়া যায় না। যাওয়া যায় না কাছে। 

স্বর্ণলতার অভিমানকে, তার রাগকে ভয় করে নারায়ণ। সে-যে মেয়ে হয়েও একদিন ডেকে নিয়ে এসেছিল এখানে নারায়ণকে। প্রেমে সে কর্তৃত্ব করে না। সম্মান করে। তাই মাঝে মাঝে তার সংশয় আসে বুঝি নারায়ণের প্রতি। সে যে এই জাদুকর সমাজের থাকের পুতুল হয়েও নেমে এসেছে জীবন্ত। চৌকাঠের কাছে এসেছে। এই চৌকাঠ পার হওয়াই আজ শেষ কথা। সেদিন আর ফিরতে পারবে না। আজও ফিরতে চায় না ওই মৃত পুতুলের থাকে। 

নারায়ণ কাছে এসে বলল, রাগ করেছ দুদিন আসতে পারিনি বলে?

আয়ত চোখ তুলে নারায়ণকে এক বার দেখে বলল স্বর্ণলতা, কুলীনের মেয়ের রাগ থাকতে নেই।

চকিতের জন্য অন্ধকার হল নারায়ণের মুখ। বলল, ক্ষমা করো। লোকজনের ভিড় কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

তবু অনেকক্ষণ আর কথা ফোটে না কারও মুখে। তারপর হঠাৎ স্বর্ণলতার মেঘ-ভারাক্রান্ত চোখে দু ফোঁটা জল দেখা দিল। বলল, না এসে যে থাকতে পারিনে। কী হবে? 

নারায়ণের মুখে কোনও কথা জোগায় না হঠাৎ। এই একই প্রশ্ন নিয়ে তারা কথা বলে। পরস্পর হাতে হাত দিয়ে বসে থাকে পাশাপাশি। কী হবে? বিধবা বিয়ের আইন হল। তারপরেই নীলের গণ্ডগোল, অন্য দিকে সিপাহি বিদ্রোহ। অনেক চেষ্টা করেও সর্বদ্বারী বিবাহ-আইন করা গেল না, ধামা চাপা পড়ে গেল। উদ্যোক্তাদের অগত্যা নীরব হতে হল। ধর্মসভায় অনুমোদন করিয়েও আজ মুখোমুখি শুধু কী হবে–এই জিজ্ঞাসা।

ঘাড় দুলিয়ে বলল স্বর্ণলতা, যদি সর্বদ্বারী বিয়ের আইন কোনওদিন না হয়, তবে? তবে কি চিরকাল এখানে এইভাবে বসে থাকব? 

নারায়ণ অস্থিরভাবে স্বর্ণকে কাছে টেনে বলল, না না।

তবে? 

তবে? নারায়ণের বুকে স্বর্ণের নিশ্বাস পড়ে ঘন ঘন। নারায়ণ দৃঢ়স্বরে বলল, তবে? তবে ধর্মান্তর গ্রহণ করব, স্বর্ণলতা। তুমি রাজি আছ? 

স্বর্ণ নারায়ণের বুকে মাথা ঠেকিয়ে বলল, রাজি হতে আমার আর কীসে বাকি আছে? 

নারায়ণ বলল, তবে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করব আমি। নবদ্বীপে গিয়ে থাকব দুজনে। বিয়ে হবে বৈষ্ণব মতে। শুধুমাত্র কণ্ঠিবদল করব, নেড়া-নেড়ি হয়ে থাকব দুজনে আর যদি নবদ্বীপের পণ্ডিতেরা আপত্তি করে, তবে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করব। 

স্বর্ণ বলল, যদি তাতেও না হয়?

নারায়ণ আরও কঠিন স্বরে বলল, তবে খ্রিস্টান হব। যারা নিজেদের সুখভোগের জন্য কুল মেলের নোংরা শাস্ত্র গড়তে পারে, আমরা তাদের ভাঙতে পারিনে? পারি, পারব। তাতে তো তুমি আমি বদলাব না।

সেই ভাল। যত তাড়াতাড়ি হয়, তাই চলে যাই। একটু পরে আবার বলল স্বর্ণ, কিন্তু গগনের বিধবা মেয়েটির বে দিচ্ছ না কেন? নারায়ণ অসহায় গলায় বলল, কী করে দিই বলল তো? একটা খুনোখুনির সম্ভাবনা দেখছি। কে জানত, সকল জাতই এই ভণ্ড ব্রাহ্মণদের অনুকরণ করে নিজেরাও বেঁকে দাঁড়াবে।

স্বর্ণলতা এক মুহূর্ত ভেবে বলল, তবে ওদের দুজনকে নিয়ে কলকাতায় বিদ্যেসাগরের কাছে চলো না। সেখানেই বে দেবে। 

মুহূর্তে নারায়ণের মুখের সমস্ত মেঘ যেন ফুঙ্কারে উড়ে গেল। উল্লসিত গলায় বলল, ঠিক বলেছ, ঠিক। ছেলে আর মেয়ে, দুজনেরই অভিভাবকদের নিয়ে, সরাসরি কলকাতায় যাব। বিদ্যেসাগরকে নিমন্ত্রণ করব। প্রধান অতিথি হবেন তিনি। আশ্চর্য, কলকাতা যাওয়ার কথাটা এতক্ষণ মনে হয়নি কেন। 

স্বর্ণ ঠোঁট টিপে হেসে বলল, মাথার ঠিক নেই বলে।স্বর্ণর হাত ধরে কাছে টেনে বলল নারায়ণ, কিংবা তুমি কাছে আছ বলে। 

উৎসাহের আধিক্যে আদরের বন্যা বইয়ে দিল নারায়ণ।

স্বর্ণ চোখে বিদ্যুৎ হেনে বলল, এ দেশে কি এও হয়?

 কী?

কুলীন কুমারী মেয়েকে নিয়ে এই এমনটি? 

বলে খিলখিল করে হেসে উঠল। পুবের ভারী বাতাস বইল শনশন করে। শিউরে শিউরে উঠল বনঝাড়। 

স্বর্ণলতা আবার বলল, সেই সঙ্গে আমাকেও নিয়ে চলো না গো। তিনি তো সর্বদ্বারী বিয়েতে মত দিয়েছেন। তাঁকে এক বার প্রণাম করে আসব। 

নারায়ণ বিস্মিত খুশিতে চোখ বড় বড় করে বলল, বিদ্যাসাগরকে? ঠিক, ঠিক বলেছ। কিন্তু সে যে তোমার শেষ যাওয়া হবে বাপের বাড়ি থেকে। আর তো কোনওদিন ফিরে আসতে পারবে না স্বর্ণলতা। 

স্বর্ণ নারায়ণের হাত দিয়ে নিজের চোখ ঢেকে বলল, না-ই বা পারলাম, তোমার কাছে তো থাকতে পাব।

স্বর্ণর চোখে জল এসে পড়েছে। নারায়ণ তার মুখোনি কাছে টেনে নিয়ে বলল, বাপ মাকে ছেড়ে যেতে তোমার কষ্ট হবে স্বর্ণলতা। 

স্বর্ণ বলল, সকলেরই হয়। তাতে কী হয়েছে। কিন্তু, এমনি করে চলে গিয়ে, নিজেদের ইচ্ছেয় বিয়ে করলে, বিদ্যাসাগর রাগ করবেন না? 

নারায়ণ বলল, তা তো জানি নে স্বর্ণ। করতে পারেন, নাও করতে পারেন। তাঁর কতটুকু দেখেছি। তবে তাঁর বিধানের বিরুদ্ধে কোনও কাজ করব না। আর, এই তো আমার জীবনের সব নয় স্বর্ণ। সমাজ কি শুধু আমার এই অবাধ্যতাটুকুই দেখবে? স্বর্ণ আবার নারায়ণের বুকে মুখ লুকোল। 

আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হয়তো বৃষ্টি আসবে এখুনি। দুজনেই উঠল তারা। একটি শেয়াল ছুটে পালাল তাদের পাশ দিয়ে। দুজনেই এসে দাঁড়াল একটি পথের মোড়ে। 

স্বর্ণ বলল, কবে আবার দেখা হবে?

—পরশু। 

-মিছে কথা। এত মিছেও বলতে পার। 

-না গো, সত্যি, পরশু, জল হোক, ঝড় হোক, আসবই। আর দিন দশেকের মধ্যেই ব্যবস্থা করব কলকাতা যাবার। 

তবু স্বর্ণ দাঁড়িয়ে রইল। বড় করুণ সুরে বলল, আসবে তো পরশু?

 নারায়ণ বলল, হ্যাঁ গো, হ্যাঁ, আসব।

স্বর্ণলতা চলে গেল।

নারায়ণ দাঁড়িয়ে রইল সেদিকে তাকিয়ে। স্বর্ণ অদৃশ্য হতে, সে অগ্রসর হল তার পথে। কয়েক পা অগ্রসর হতেই, সহসা ভাঙা গলায় খ্যাঁকারি শুনে থমকে দাঁড়াল নারায়ণ। দেখল সামনে দাঁড়িয়ে গুপ্তিপাড়ার কুঠির পেশকার চক্রবর্তী। জঙ্গল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসা চিতাবাঘের মতো নারায়ণের দিকে খালি তাকিয়ে রইল জ্বলন্ত চোখে। একটি কথাও বলল না। আবার নিঃশব্দে দ্রুত চলে গেল অন্য রাস্তায়। 

চমকে উঠল মনটা। কী যেন ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। কেমন একটা অমঙ্গলের গন্ধ লাগছে যেন বাতাসে। পরমুহূর্তেই নারীকণ্ঠের একটা তীব্র আর্ত চিৎকারে ধক করে উঠল নারায়ণের বুকের মধ্যে। যে পথে স্বর্ণলতা গেছে সেই পথে ছুটে গেল সে। কিন্তু কেউ কোথাও নেই। সন্ধ্যা নামা মেঘভরা আকাশ, নিঃঝুম গ্রাম। শুধু ব্যাঙ ডাকছে। কী হল তবে? কে চিৎকার করল? 

স্বর্ণলতাদের বাড়ির কাছেই অক্ষয় বাঁড়ুজ্জের বাড়ি। সেখানে নারায়ণের যাতায়াত আছে। আলো জ্বলছে চণ্ডীমণ্ডপে, বাঁড়ুজ্জেও রয়েছে বসে। 

বাঁড়ুজ্জের চণ্ডীমণ্ডপে নারায়ণ অনেকক্ষণ বসে কথা কইল কয়েকজনের সঙ্গে। ধর্মসভা, সর্বদ্বারী বিবাহ, নানান প্রসঙ্গ এসে পড়ল। বিধবা বিয়ের বিষয়ও আলোচনা হল। তারপরে নারায়ণ একসময়ে জিজ্ঞেস করল, কিছুক্ষণ আগে কীসের একটি শব্দ পাওয়া গেল এদিক থেকে? 

বাঁড়ুজ্জের ভ্রু কুঁচকে বলল, কীসের শব্দ বলো তো? মেয়েমানুষের কান্নার মতো নয়? 

-হ্যাঁ।

 –আমিও শুনেছিলাম। কিন্তু লোক পাঠিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না।

নারায়ণ ফিরে এল অস্বস্তি নিয়ে। মনটা খচখচ করতে লাগল সারা রাত। আর কোনও শব্দই তো শুনতে পাওয়া গেল না। সারা রাত ভারী বাতাস ও শ্রাবণের ধারা যেন ভারী আঘাত ও শাসানির শব্দে ঘরের বেড়ায় এসে লাগল। আর সারা রাত সেই আর্ত চিৎকার বাজতে লাগল নারায়ণের কানে। 

পরদিন সকাল বেলায় তার ঘুম ভাঙল একটু বেলায়। সারা রাত্রি স্বপ্ন দেখেছে, বিচিত্র সব দুঃস্বপ্ন তাকে যেন জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল। এবার স্নান করে গায়ত্রীটুকু জপ করে নিতে হবে। শিবনাথের ওখানেও ঘুরে আসতে হবে এক বার।

বাইরে আসতেই রাখালটা উঠান থেকেই গড় করল তাকে। বলল, দা-ঠাউর, চক্কোত্তি ঠাউর মোশায়ের বড় বেটি গঙ্গাযাত্রা হচ্ছেন গো! শুনে নারায়ণের পায়ের তলার মাটি যেন কেঁপে উঠল। পড়তে পড়তে কোনও রকমে আঁকড়ে ধরল খুঁটি। বলে কী রাখালটা! না কি গত রাত্রের দুঃস্বপ্নগুলো এখনও যায়নি? এখনও খেলা করছে তাকে নিয়ে? তবু সে যেন অনেক দূর থেকে বলল, কী বললি? 

রাখালটা আবার বলল, এঁজ্ঞে, হ্যাঁ গোদা ঠাউর, বড্ড ভাল মেইয়া ছালেন গো। এক আতের মধ্যেই মা ওলাই নিদেন হেঁকে দিইচে, এ্যাতক্ষণে গেলেন বোধ হয়।

ওলাই? মিথ্যে, মিথ্যে, ভয়ংকর মিথ্যে। কোনও ওলাই, শীতলা বা চণ্ডীর কাজ এ নয়, স্বয়ং নীলরতন চক্রবর্তীই খুন করেছে স্বর্ণলতাকে। নারায়ণের চোখে রক্ত ছুটে এল; শক্ত চোয়ালের ভাঁজে ভাঁজে, কপালের রেখায় রেখায় হিংস্র নিষ্ঠুরতা উঠল ফুটে। তার শ্যামল রং হঠাৎ কালো হয়ে একটা ভয়ংকরতা দেখা দিল সর্বাঙ্গে। মুহূর্তে দাওয়া থেকে নেমে ছুটে চলল সে নীলরতন চক্রবর্তীর বাড়ির দিকে।

বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি। রাখালটা ভয় পেয়ে গেল–ভয় পেয়ে লাঠি নিয়ে ছুটল নারায়ণের পিছনে পিছনে। চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে এসে নারায়ণ দেখল, লোকজনের বেশ ভিড় হয়েছে। শাঁখ আর কাঁসি বাজছে। বলাবলি করছে কেউ কেউ, কেন, শাঁখ কাঁসি কেন? কোনও বৃদ্ধা মরেনি, মরেছে একটা মেয়ে, তাও অনূঢ়া কন্যা। কেউ কেউ অবাক হয়ে তাকাল নারায়ণের দিকে। নীলকুঠির পেশকার তাকিয়েছিল অন্য নজরে। সে নীলরতনের জ্ঞাতি। স্বর্ণের আত্মীয়। 

বাড়ির বাইরে, চণ্ডীমণ্ডপের সামনে তুলসীমঞ্চ। দেখা গেল, কয়েকজন ধরাধরি করে পিড়ির উপর বসিয়ে আনছে স্বর্ণকে। এই স্বর্ণলতা। রক্তচেলির জোড় জড়ানো তার গায়ে। সারা মুখে তার চন্দন লেপা। চোখ বুজে আছে স্বর্ণ। 

চেলির ঘোমটা টেনে দিয়েছে কে তার মাথায়। পাশে পাশে ঘোর কালোবৰ্ণ সেই চক্রবর্তী। কাকে যেন বলছে, তাড়াতাড়ি করো, তাড়াতাড়ি। এখনও প্রাণ আছে, সম্প্রদানটা সেরে ফেলতে হবে। 

সম্প্ৰদান! বয়স্থা অনুঢ়ার মৃত্যুতে নরক বাস হয়। তাই চক্রবর্তী মেয়ের বিয়ে দিয়ে তারপর চিতায় তুলবে। কাকে সম্প্রদান করবে সে মেয়েকে? 

দেখা গেল, তুলসী-মঞ্চের কাছে এনে নামাল স্বর্ণকে। কে একজন বলল, নাড়িটা দেখো হে৷

আর একজন বলল, আছে এখনও।

তারপর মন্ত্র উচ্চারিত হল। পাত্ৰাভাবে তুলসী গাছকে কন্যা সম্প্রদান করা হচ্ছে।

নারায়ণ দাঁড়াতে পারল না। ছুটে এল কাছে। স্বর্ণ! স্বর্ণলতা! 

একটা ঠেলাঠেলি পড়ে গেল। কে একজন বলে উঠল, হয়েছে, হয়েছে, তোলো সাতপাক ঘুরিয়ে দাও তাড়াতাড়ি।

সবাইকে ঠেলে নারায়ণ স্বৰ্ণর কাছে এসে পড়ল। কে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চেষ্টা করল। নারায়ণ চিৎকার করে উঠল, সাবধান, গায়ে হাত তুলো না আমার। তা হলে একলা মরব না। 

আশ্চর্য! চক্রবর্তী তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে মোলায়েম গলায় বলল, কে? নারায়ণবাবা এসো এসো। দেখো, মেয়েটা এক রাতের মধ্যে 

বোলোনা, বোলোনা চক্কোত্তি খুড়ো।নারায়ণ চিৎকার করে উঠল তেমনি তীব্র গলায়। তার হাত পায়ের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। বলল, পিশাচ! একী করেছিস তুই! শাঁখ ও কাঁসির তীক্ষ্ণ শব্দে চাপা পড়ে গেল তার গলা। চক্রবর্তী জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে হাসল। সে হাসি ভয়ংকর। বলল, বাবাজির মাথাটি গোলমাল হয়েছে দেখছি। 

নারায়ণ তীক্ষ্ণ চোখে দেখল স্বর্ণর দিকে। প্রাণ আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। সমস্ত মুখটা ফুলে উঠেছে, কালশিরার উপর লেপে দিয়েছে চন্দন। মাথার এক জায়গায় জমাট রক্ত। চেলি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে ক্ষতের উপর। স্বর্ণ! কাল সন্ধ্যায় যে হেসেছে, কেঁদেছে, কলকাতায় গিয়ে বিদ্যাসাগরকে প্রণাম করব বলেছে, সেই স্বর্ণলতা! যার অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী পরিচয় নারায়ণের, খুলে দেখতে ইচ্ছে করছে তার প্রতিটি প্রত্যঙ্গ। কেমন করে মেরেছে ওরা তাকে, কেমন করে ওই বুক নোড়া দিয়ে থেঁতলেছে ওরা, কেমন করে অগ্নি শলাকা দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়েছে নিম্নাঙ্গ। কিন্তু এত লোক। হাত দিতে পারবে না গায়ে। যে শবে পরিণত হয়েছে কিংবা হচ্ছে তার গায়েও হাত দেওয়া যায় না। আর সমস্ত প্রতিবেশীজনতা কী রকম বোকাটে বিস্ময়ে চেয়ে রয়েছে। শুধু বোকাটে বিস্ময়, প্রাণহীন নির্বিকার মাটির পুতুলের চেয়েও স্থূল। শুধুই মজা দেখতে এসেছে।

নারায়ণ জানে না, চোখে তার জল এসেছে। হিংস্র জ্বলন্ত চোখে জল। পুরোহিত বলল, কন্যাকে গণ্ডুষ করতে হবে যে? 

আর একজন বলল, কন্যার হাত উঠছে না।

শেষ হয়ে গেছে নাকি? 

না। চক্রবর্তী স্বর্ণর মুখে জল দিতে গেল। মুখ খুলল না। তখন মন্ত্রোচ্চারণ করে নাকের মধ্যে জল ঢেলে দিল। মাথাটা ঢলে পড়ল স্বর্ণর।

ফেনার বুদ্বুদ ফাটল কয়েকটা নাকে। বোধহয় শেষ নিশ্বাসের সঙ্গে, স্বর্ণের সকল জ্বালা জুড়োল। হরিধ্বনি দিয়ে উঠল একজন। নারায়ণ তার সাঁড়াশির মতো হাত দিয়ে চক্রবর্তীকে ধরতে যাচ্ছিল। কিন্তু কে যেন তাকে পেছনে টানল। দেখল ঈশান। ঈশানকে পেয়ে নারায়ণ বলে উঠল, খুন করেছে ওরা মেয়েটাকে। ঈশেন ভাই, তুই চুঁচুড়া চলে যা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। আমি এর তদন্ত করাব। 

প্রচণ্ড হরিধ্বনির মধ্যে আর কেউ শুনতে পেল না নারায়ণের গলা।

 ঈশান তাকে টেনে দূরে নিয়ে গিয়ে বলল, ম্যাজিস্ট্রেট নীলকরদের পক্ষে তুমি জান। তুমি বিপক্ষের লোক, তোমার কথামতো সে তদন্ত করবে না। এর তদন্তে আসতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে এখুনি আনতে হবে, লাশ আটকে রাখতে হবে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট হয়তো দুদিন বাদে আসবে তদন্তে, যখন মৃতের ছাইয়েরও চিহ্ন থাকবে না। নারায়ণ বলল, নীলকরদের বিরুদ্ধতা আমি ছেড়ে দেব, আর কোনও বাধা দেব না, এই কথা তুই গিয়ে বল ড্যালারিম্পলের কেরানিবাবুকে। তা হলে সে এ বেলার মধ্যেই আসবে।– ঈশান বলল, চূড়ামণি দাদা, তা হয় না। তাতে অনেকের সর্বনাশ। তুমি যাকে হারিয়েছ, তাকে তো আর পাবে না।

কিন্তু ওরা কোনও শাস্তি পাবে না? 

শাস্তি তুমি পরেও দিতে পারবে। দিন তো আছে। এবার চলো, শ্রাবণেই তাড়াতাড়ি দিন দেখে গগন পালের মেয়েটার বিয়ে দিই। কপালে থাকলে সেইদিন খুননাখুনি করব।

তারপর নারায়ণ গঙ্গার ধারে সারাদিন স্বর্ণর চিতা পোড়ানো দেখল দূর থেকে। বাড়িতে লোক নেই। স্বপাকে খেতে হয়। খাওয়া হবে না। রাখালটা অনেকবার ডাকতে এসে ফিরে গেছে। ভয়ে ডাকতে পারেনি। বিকালে গঙ্গায় নেয়ে এসে সে যখন বাড়ি ফিরল, তখন আবার বৃষ্টি এসেছে। এসে দেখল, শিবনাথ দাওয়ায় বসে আছে। আশ্চর্য রকম শান্ত গলায় সে জিজ্ঞেস করল, কী মনে করে শিবনাথ?

শিবনাথ হঠাৎ কোনও কথা বলতে পারল না। নারায়ণের মনেও চকিতে একটা সন্দেহের ঝিলিক দিয়ে উঠল। শিবনাথই কি এর মূলে! সে-ই কি সব বলে দিয়েছে চক্রবর্তীকে? পরমুহূর্তেই মনে পড়ল পেশকার চক্রবর্তীর কথা। সে-ই নিজে থেকে খোঁজ নিয়ে এসেছে। 

শিবনাথ জানত, এমনি সন্দেহ উঁকি মারতে পারে নারায়ণের মনে। বলল, কিছুই মনে করে নয়। কিন্তু এ আশঙ্কা আমি অনেক দিন করে ছিলাম। 

নারায়ণ শুকনো গলায় বলল, তুমি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা।

শিবনাথ উত্তর দিল, না। এই-ই পরিণতি হয়। 

নারায়ণ বলল, এ শেষ পরিণতি নয় শিবনাথ। পৃথিবীর শেষ হতে এখনও অনেক বাকি। পরিণতিও বদলায়। কিছু সুবিধাভোগী মূর্খদের তৈরি সংস্কারের জন্য খুনোখুনি, চিরদিন কখনও চলবে না। তোমাদের যুগ কখনও থাকবে না। 

শিবনাথ বলল, আমাদের যুগ আছে কিনা জানি না। আমার পূর্বপুরুষদের অনুশাসনের বাইরে আমি যেতে পারব না। 

নারায়ণ উত্তর দিল, মূর্খ পণ্ডিত আর গোঁয়ারের মতো কথা বোলো না। কিছু প্রকৃত শাস্ত্র পাঠ করো, কু-অনুশাসন তো অনেক মেনেছ। আর আমি একটু ঘুমোব শিবনাথ। তুমি বাড়ি যাও এখন। 

গম্ভীর কণ্ঠস্বর নারায়ণের। অপমানে লাল হয়ে উঠল শিবনাথের মুখ। তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে নারায়ণ। বৃষ্টির মধ্যেও একটু বসতে বলল না! সেই নারায়ণ, যে তার জীবনে মরণে মরে ও বাঁচে!

সে বেরিয়ে গেল। কিন্তু দেখতে পেল না, নারায়ণের বিশাল শরীরটা কীসের দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। নারায়ণ চুড়ামণির চোখ ফেটে জল এসেছে। সব আঘাত সে সহ্য করেছে, কিন্তু এক মুহূর্তে আর পারল না। 

এই সময়ে, ঘরের ভিতর থেকে দাওয়ায় এসে তাকে প্রণাম করল অবন। 

সে নারায়ণ আসার আগেই এসে বসে ছিল, শিবনাথকে দেখে বেরোয়নি। অবনকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরল নারায়ণ, পায়ে নয়, পায়ে নয়। ছোট হলেও তুমি হৃদয়বান, বুদ্ধিমান, নতুন যুগের মানুষ। তুমি আমার বন্ধু। তুমি সব জান, সব বোঝ, আমি জানি। তুমি ভুল বোঝনি।

অবনীর চোখে জল দেখা দিল। কিছু বলতেও তার লজ্জা করল। এই বেদনার মধ্যে একটি নতুন যুবতীর মুখ ভেসে উঠে তাকে আরও ব্যাকুল করে তুলল। 

.

বিধবা বিয়ে হল না এখানে। কোনও পুরোহিত বিয়ে দিতে চাইল না। নারায়ণের সব সর্বনাশের মূল্যেও নয়। কুসংস্কারের স্পর্ধা আছে আইনকে অমান্য করার। 

বরকনে নিয়ে নৌকায় করে কলকাতা যাত্রা করল নারায়ণ। সঙ্গে চলল ঈশান। যাওয়ার আগে শুধু এক বার চণ্ডিকার ভাঙা মন্দির প্রাঙ্গণটি ঘুরে এল। এক বার উপুড় হয়ে হাত দিতে গেল, যেখানে সেই মেয়েটি বসত। সেই মেয়েটি, যে সব কিছুতেই রাজি ছিল। সবকিছু, এই মরণের জন্যও। 

.

অস্থির হয়ে উঠল শিবনাথ। তার নিটোল সুখের বুকে, লুকানো বুকে বাইরের রণাঙ্গন থেকে কারা চোরাগুপ্তি হানছে বারবার। অন্ধকার চেপে আসে তার চোখে। কেবল ভানুমতীকে দেখলে সব ভুলে যায় সে। ভানু যখন আলতা পায়ে মল বাজিয়ে ঘোরে তার সামনে, তখন সব ভাবনা দূরে যায়। যখন সে ঢাকাই শাড়ি পরে ঘোরে রৌদ্রচ্ছায়ায়, যখন মনের গোপন লীলায় হাসে, রাগে, যেন কী এক বিচিত্র অভিসন্ধিতে সর্বত্র বেড়ায় উঁকিঝুঁকি দিয়ে, শিবনাথ চুমু খেলে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, আপন মনে গহনা দেখে, কাঁদে আর গুনগুন করে গান গায়, তখন শিবনাথ বর্ষণক্লান্ত মধ্যরাত্রির বিহ্বল মৃগের মতো সব ভুলে দুলতে থাকে। নারায়ণ যেদিন সকালে চলে গেল, সেইদিন বাড়ি ঢুকে শিবনাথ দু হাতে ভানুমতীকে জড়িয়ে নিয়ে এল বুকের কাছে। ফিসফিস করে বলল, সবাই যাবে, তুমি তো থাকবে আমার বুকে এমনি করে। 

ভানু এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সবসময় অর্থ বোঝে না। খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ধু। অমনি করে বুঝিন আবার কেউ থাকে? 

শিবনাথ অর্থহীনভাবে এখন ভানুকেই সব কথা বলে। বলল, ওরা সমস্ত প্রথা ভেঙে দিতে চায়। নারায়ণ স্বর্ণকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। তার পরিণতি এই হল। 

ভানুমতী বলল, কে, ওই আর এট্টা ঠাউর কত্তা? তোমার মিতে?

খট খট করে লাগে কানে ভানুর কথাগুলি৷ অবিশ্যি অনেক বামুনের মেয়েই অর্বাচীন কথা বলে। তা বলে এতটা? এড়িয়ে যায় শিবনাথ। ঘাড় নাড়ে। 

ভানু বলল, ওই মেয়েটাকে বাউনরা মেরে ফেলে দিয়েছে, সবাই বলছে। কেন বেদিল না? তোমার মিতে তো বাউন পণ্ডিত। 

শিবনাথ চমকে ওঠে, ছিঃ, তুমিও তো ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণে ব্রাহ্মণে কত তফাত আছে। বোঝ না, তোমার জন্য সর্বেশ্বরকে আমি কেন টাকা দিয়েছি? আমি, আমরা যে অভিশপ্ত ব্রাহ্মণ, আমরা বংশজ, আর ওরা কুলীন। 

বোঝে না, হালিশহরের মৎস্যজীবীর মেয়ে মেল বন্ধনের জটিলতা বোঝে না। কিশোরী মন তার সমাজ সামাজিকতা বোঝে না। তার অর্বাচীন জিভ দিয়েও যেন বিষেরই মতো বিদ্যাসাগরের সর্বদ্বারী বিবাহের প্রতিধ্বনি শোনা গেল। 

ভানু বলল ঠোঁট উলটে, কুলীন তো কী হয়েছে! বাউন তো। 

শিবনাথ আঁতকে উঠল, ও কথা বোলো না, বলতে নেই। ওরা বিধবার বিয়ে দিতে চলেছে, যে বিধবারা এ দেশের রত্ন। 

ভানু হেসে বলল, খুব ভাল করছে বে দিয়ে। অতটুকুনি মেইয়ে বুঝি আবার বেধবা হয়। এই জন্যেই বাউনের বেধবারা ঘুসকি হয়। তোমার মিতেটা খুউব ভাল।

ভানু শুধুই ব্রাহ্মণদের কথা বলে, যেন সে ব্রাহ্মণ কন্যা নয়। শিবনাথের বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে উঠল। একটা অব্যক্ত আতঙ্ক যেন বিষাক্ত সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ধরে। কিন্তু না, তা কখনও হয়? তবু শিবনাথের আলিঙ্গন শিথিল হয়ে গেল। চাপা গলায় ডুকরে উঠল, চুপ চুপ, ওগো চুপ করো। মুখে এনো না, মুখে এনো না। তুমি ব্রাহ্মণের স্ত্রী…

কিন্তু আলিঙ্গন মুক্ত ভানুমতী খিলখিল করে হেসে বাইরে ছুটে গেল। তার সেই হাসিতে শিবনাথের পায়ের তলাটা কাঁপতে লাগল। দুলতে লাগল বসে যাওয়া বাড়িটা। মলের ও হাসির শব্দ সারা বাড়ির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বাতাসে বাতাসে আকাশে পড়ল ছড়িয়ে। শিবনাথের জীবন, সমাজ, শাস্ত্র তত্ত্বের মূল্য সে জানে না। লোকটাকে ভাল লাগে, তাই লোকটির অবুঝ ভয়ের কথায় হাসি পায় তার। বোঝে না, একটি মানুষের গলায়, একটি অসহায় মানুষের গলায় তীক্ষ্ণ ধারালো ক্ষুর চুঁইয়ে চুঁইয়ে সে খেলা করছে। কখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটবে, কখন একটা ভয়ংকর সর্বনাশ যেতে পারে ঘটে, ভানুমতী বোঝে না। হাসিটা তার ধারালো ক্ষুরের চমকানির মতোই, এখানে ঝলকে ওঠে, ওখানে ঝিলিক মারে। আর হাসিটা খালি ঝাঁপ দিয়ে পড়ে টোলের একজন ছাত্রের বুকে, তার খোলা পুথির পাতায় পাতায়, তার নীলকর বিদ্রোহের চাপা আগুনের ধোঁয়ায় ধোঁয়ায়। ধারালো ক্ষুরটা তার বুকের অদৃশ্য দরজায় দাঁড়িয়ে রক্ত মাখামাখি করতে চাইছে।