মন্দিরে কঙ্কালপক্ষী

মন্দিরে কঙ্কালপক্ষী

এক

বিপ্লববাবুকে এর আগে আমরা মাত্র একবারই দেখেছিলাম। ঠিক একসপ্তাহ আগে, অর্থাৎ গত সোমবার তিনি এসেছিলেন বুধোদার অ্যান্টিকের শোরুমে, যার নাম ‘মহারাজা কালেকশনস’ আর যেটার অবস্থান ক্যামাক স্ট্রিটে।

ঘটনাচক্রে সেদিন উনি যখন এসেছিলেন, তখন আমিও মহারাজা কালেকশনসের ভেতরে বসেছিলাম। আসলে হয়েছিল কী, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তনীদের এক অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে কুইজ-কম্পিটিশনে আমরা উত্তরপাড়া গভর্মেন্ট স্কুলের চারজন বন্ধু নাম দিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানের শেষে আমার তিন সহপাঠী নিজেদের মতন করে বাড়ি ফিরে গেল। আমি ভাবলাম, মহারাজা কালেকশনসের এত কাছে যখন এসেই পড়েছি, তখন একবার ওখানে ঘুরে যাই। হাঁটতে-হাঁটতেই চলে গেলাম ক্যামাক স্ট্রিট।

বুধোদা আমাকে দেখে খুবই খুশি হল। বলল, ‘তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি খিদে পেয়েছে। দাঁড়া, শিবুজির স্যান্ডউইচ আনাই।’

সেই অপূর্ব স্যান্ডউইচ এল এবং গোগ্রাসে খেয়েও ফেললাম। তারপর বুধোদা বলল, ‘হুকারের হিমালয়ান জার্নালের ফার্স্ট এডিশন হাতে নিয়ে দেখতে চাস? ওই দেখ, ওখানে ব়্যাকে রাখা আছে। তুই আরামসে বসে বসে পড়। আমি কালকের কয়েকটা ডেলিভারি রেডি করেই বেরিয়ে পড়ব।’

আমার আর বুধোদার বাড়ি উত্তরপাড়া জিটি রোডের এপার-ওপার। কাজেই আমি যে ওর সঙ্গেই ওর গাড়িতেই ফিরব এটা তো স্বতঃসিদ্ধ।

তারপর আমি হিমালয়ান জার্নালের মধ্যে ডুবে গেছি, বুধোদাও ওর প্রিন্টার থেকে পরপর ইনভয়েস বার করছে…এমন সময় কাচের দরজা ঠেলে এক ভদ্রলোক শো-রুমের ভেতরে ঢুকলেন। ভদ্রলোকের চেহারা রোগা, লম্বা। বয়স মনে হল পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে, কিন্তু সেই তুলনায় মাথায় পাকা চুলের ভাগ বেশ বেশি। পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোফ। পরনে সাধারণ ট্রাউজার আর হাফস্লিভ শার্ট। পায়ে কালো চামড়ার চপ্পল।

ভেতরে ঢুকেই ভদ্রলোক একটু থতমতো খেয়ে গেলেন। সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যারা অভ্যস্ত নন, অ্যান্টিক গুডসের শোরুমে ঢুকলে তাদের মুখের অবস্থা এরকমই হবার কথা; কারণ এখানে ঘরের মেঝে, দেয়াল এমনকী সিলিং থেকে অবধি প্রাচীন শিল্পবস্তুর চোখ ধাঁধানো সম্ভার সেই আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে থাকে। অবশ্য সবসময় যে চোখ ধাঁধানোই হবে তার মানে নেই, হাড় কাঁপানোও হতে পারে। যেমন সেদিন উনি দরজা ঠেলে ঢুকেই একটি বাঁদরের করোটি মালার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিলেন।

যাই হোক, কিছুটা সামলে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘মিস্টার বোধিসত্ত্ব মজুমদারের সঙ্গে একটু কথা বলা যাবে?’

বুধোদার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। কম্পিউটারটা শাট ডাউন করে ও ঘরের একপাশে রাখা বেতের কাউচটায় আরাম করে বসল। ভদ্রলোককেও ইশারায় বসতে বলল। বলল, ‘বলুন। আমিই বোধিসত্ত্ব। আর ও হচ্ছে মাল্যবান মিত্র, আমার পাড়াতুতো ভাই। ডাকনাম রুবিক।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার নাম বিপ্লব মুন্সী। চাঁদনিচকের কাছে আমাদের দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ি।’

আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়ি শুনেই বুধোদা সোজা হয়ে বসল। কারণটা বুঝতে অসুবিধে হল না। বুধোদার কল্যাণেই শিখেছি, কলকাতার পুরোনো বাড়িগুলোতে এখনো খুঁজলে এমন অনেক জিনিস পাওয়া যাবে, যেগুলোর বয়স একশো বছরের বেশি। যেগুলোর শিল্পমূল্য কিংবা ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে এবং যেগুলো আর কোনোদিনই নতুন করে তৈরি হবে না। তা একটা গ্রামাফোন হতে পারে, একটা হাতির দাঁতের মূর্তি হতে পারে, আবার একটা দুষ্প্রাপ্য বইও হতে পারে। অর্থাৎ এককথায় যা অ্যান্টিক। আর অ্যান্টিকের প্রতি বোধিসত্ত্ব মজুমদারের টানটা স্রেফ পেশাগত কারণে নয়। অ্যান্টিক ওর নেশা।

বিপ্লববাবুও নিশ্চয় বুধোদার আগ্রহটা লক্ষ করেছিলেন। তাই বেশ উৎসাহের সঙ্গে বলে চললেন, ‘আমাদের পরিবারটাও খুবই প্রাচীন, যাকে এককথায় আপনি বনেদি বংশ বলতে পারেন।

‘চারশো বছর আগে আমাদের এক পূর্বপুরুষ কীভাবে যেন আগ্রায় পৌঁছে যান এবং নবাব জাহাঙ্গিরের চিড়িয়াখানায় পাখিদের দানাপানি খাওয়ানোর চাকরি পান। সেখান থেকে তিনি ক্রমশ বুদ্ধি এবং পরিশ্রমের জোরে সেই চিড়িয়াখানার প্রধান হন। তাঁর নাম ছিল জয়রাম মুন্সী।

‘সম্রাট জাহাঙ্গিরের মৃত্যুর পর যখন নবাবের সেই চিড়িয়াখানায় দুর্দিন নেমে আসে, তখন তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং এখানেই পশু-পাখির ব্যবসা শুরু করেন। সেটা সেভেন্টিনথ সেঞ্চুরির মাঝামাঝি সময় হবে। মাঝখানের দুশো বছরের ইতিহাস খুব ডিটেলে জানি না; তবে বাবা এবং দাদুর মুখে শুনেছি, নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন মেটিয়াবুরুজে তাঁর সেই পৃথিবী বিখ্যাত চিড়িয়াখানাটি স্থাপন করেন, তখন সেখানেও বহু পশুপাখির সাপ্লাই দেন আমাদেরই এক পূর্বপুরুষ, যাঁর নাম ছিল নীলকণ্ঠ মুন্সী।। এটা বলছি প্রায় দেড়শো বছর আগের কথা।

‘ওয়াজেদ আলি শাহের কল্যাণে নীলকণ্ঠ মুন্সী ভালোই পয়সা রোজগার করেছিলেন। তিনিই চাঁদনির এই বাড়িটা তৈরি করান। আমাদের বাড়ির গলিটার নামও নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেন। আজ আপনার কাছে যে সমস্যা নিয়ে এসেছি, তার সঙ্গে এই বাড়ির ঘনিষ্ট যোগ রয়েছে।’

‘সমস্যা!’ বুধোদা বিপ্লব মুন্সীকে কথার মধ্যেই বাধা দিয়ে বলল, ‘দেখুন, আমি তো পুলিশের লোক নই। উকিলও নই। আপনার সম্পত্তি নিয়ে কোনো সমস্যা থাকলে আপনি ভুল জায়গায় এসেছেন।’

বিপ্লববাবু তড়িঘড়ি বলে উঠলেন, ‘না না, বোধিসত্ত্ববাবু। লেট মি এক্সপ্লেন। সম্পত্তি নিয়ে কারুর সঙ্গে কোনো বিবাদ নেই আমার। যদিও একটা সময় আমাদের বিশাল ডালপালা ছড়ানো এক পরিবার ছিল, আজ তাদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রবাসী। এই বাড়িতে কারুর ইন্টারেস্ট নেই। আর আমিও আমার বাবার একমাত্র সন্তান। আবার আমারও একটিই সন্তান, মন্দাক্রান্তা। যার ডাকনাম মোহর। বিবাদ করব কার সঙ্গে?’

বুধোদা বলল, ‘তাহলে আপনার সমস্যাটা কী?’

বিপ্লববাবু ভারি অস্বস্তির সঙ্গে হাত কচলাতে-কচলাতে বললেন, ‘জানি না বললে বিশ্বাস করবেন কিনা। আমাদের ওই বাড়িতে গুপ্তধন রয়েছে। আছে যে সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু না জানি তার প্রকৃতি না জানি তার অবস্থান। সেটা খোঁজার ব্যাপারেই আপনার সাহায্য চাইছি, কারণ, আমার নিজের বুদ্ধিতে কুলোচ্ছে না।’

বুধোদা একটু তাচ্ছিল্যের সুরেই বলল, ‘গুপ্তধন! গল্পের বইয়ের বাইরে সেরকম কিছু হয় নাকি?’

বিপ্লব মুন্সী বললেন, ‘আমিও তাই ভাবতাম, জানেন? ছোটবেলা থেকেই গুপ্তধনের গল্প শুনে আসছি। বাড়ির বয়স্কদের মধ্যে কেউ বলতেন দেয়ালের গাঁথনির মধ্যে গুপ্তধন পোঁতা আছে। কেউ বলতেন, দেয়ালে নয়, মেঝের নীচে। কেউ বলতেন, কুয়োর নীচে সুড়ঙ্গের মধ্যে। আমার বিশ্বাস হতো না।’

‘কেন? বিশ্বাস হতো না কেন?’ বুধোদা প্রশ্ন করল।

বিপ্লববাবু বললেন, ‘সহজ যুক্তি। গুপ্তধন থাকতে গেলে প্রথমে তো গুপ্ত করার মতন ধন থাকতে হবে। মুন্সী ফ্যামিলি কোনোদিনই অত বড়লোক ছিল না। আমাদের না ছিল জমিদারি, না ছিল বিরাট ব্যবসা। তাহলে গুপ্তধনটা আসবে কোথা থেকে?’

‘বুঝলাম।’ বুধোদা ঘাড় নাড়ল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘কীসের ব্যবসা আপনাদের?’

‘জয়রাম মুন্সী, নীলকণ্ঠ মুন্সীর দেখিয়ে যাওয়া পথেই আমাদের ব্যবসা। একসময় পশু এবং পাখি দুটোই বিক্রি করেছেন আমার পূর্বপুরুষেরা। দাদুর আমল থেকে আমরা শুধুই পাখির ব্যবসা করি—বিদেশি পাখি, খাঁচার পাখি।’

‘মানে ম্যাকাও ইত্যাদি?’

‘ঠিক বলেছেন। ম্যাকাও, কাকাতুয়া, প্যারট—আরও নানা রকমের কেজ-বার্ডস বিদেশ থেকে আনিয়ে বিক্রি করি। বছর পাঁচেক আগে পর্যন্ত নিজেও পাখি ব্রিড করাতাম, তবে আর পেরে উঠছি না। এখন মাঝেমাঝে ব্যবসাটা তুলে দেওয়ার কথা ভাবি। কিন্তু…।’ ভদ্রলোক কথা শেষ না করেই কেমন যেন হতাশভঙ্গিতে কাঁধ ঝুঁকিয়ে মাথাটা দুদিকে নাড়লেন।

বুধোদা বলল, ‘আচ্ছা, সে-কথা পরে শুনছি। আগে গুপ্তধনের বিষয়ে কী বলছিলেন বলুন।’

বিপ্লববাবু নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। কাঁধের চামড়ার ব্যাগটা থেকে একটা ছোট জলের বোতল বার করে একঢোক জল খেলেন। তারপর বললেন, ‘মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি বিশ্বাস না করলে কী হবে? গত দেড়শো বছরে মুন্সীবাড়ির ছেলেদের মধ্যে যার যখন পয়সার টানাটানি পড়েছে, সেই কিছুটা করে দেয়াল ভেঙেছে। কিছুটা উঠোন খুঁড়েছে। আবার সব সারিয়ে-সুরিয়ে দিয়েছে অবশ্যই। কিন্তু কারুরই ভাগ্যে একটা আধুলি অবধি মেলেনি।

‘অথচ কিছুদিন আগে এই আমি সেই গুপ্তধনের সঙ্কেত খুঁজে পেলাম।’

‘বলেন কী!’ বুধোদা সোজা হয়ে বসল। আমিও। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘কীরকম সঙ্কেত? সেই তুলোট কাগজে…।’

বিপ্লববাবু বললেন, ‘না। গুপ্তধনটা কত পুরোনো জানি না। কিন্তু সঙ্কেতটা লেখা হয়েছিল উনিশশো-অষ্টআশি সালে। একটা রুলটানা চার-নম্বর খাতার মাঝামাঝি একটা পাতায় আমার বাবা ছড়ার মতো কয়েকটা লাইন লিখে গিয়েছিলেন।’

‘সালটা নিয়ে অত নিশ্চিত হচ্ছেন কীভাবে?’ বুধোদা প্রশ্ন করল।

‘কারণ বাবা ওটা লিখেছিলেন তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে। আর উনি মারা গিয়েছিলেন ওই উনিশশো-অষ্টআশি সালের এগারোই এপ্রিল।’

বুধোদা বলল, ‘ছড়াটা কেমন? সেই ‘পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা’ টাইপের কিছু?’

বিপ্লববাবু একটু হেসে বললেন, ‘প্রায় তাই। তবে সুরটা বৈষ্ণবের নয়, শাক্তের। রাধাকৃষ্ণের বদলে এখানে মন্ত্রতন্ত্র ভূত-পিশাচের কথাই বলা আছে আর সেটা অস্বাভাবিকও নয়। আমাদের পরিবার চিরকালই ঘোর শাক্ত। বাড়িতে মা তারার প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত আছে। উপরন্তু বাবা শেষ বয়সে তন্ত্রসাধনার দিকে ঝুঁকেছিলেন। তাঁর ওই খাতাটাতেই আগের পাতাগুলোয় নানারকমের যাগযজ্ঞ মারন-উচাটনের পদ্ধতি-টদ্ধতি লেখা রয়েছে। এটাকেও অনায়াসেই সেরকমই একটা মন্ত্র বলেই ধরতে পারতাম, যদি না…।’

‘যদি না?’

‘যদি না মৃত্যুর আগে বাবা আমাকে যে কথাগুলো বলে গিয়েছিলেন সেগুলো মনে থাকত। বললামই তো, বাবা মারা গিয়েছিলেন উনিশশো অষ্টআশির এপ্রিলে। তখন আমার বয়স মাত্র দশ-বছর। হ্যাঁ, অকালেই বাবাকে হারিয়েছিলাম বলতে পারেন। বাবা প্যাংক্রিয়াসের যে-অসুখটায় ভুগছিলেন, সেই অসুখের তখনো তেমন কোনো চিকিৎসা বেরোয়নি। কাজেই উনিও বুঝতে পেরেছিলেন যে চলে যাবেন।

‘শেষ কয়েকদিন বাবার চেতনা ছিল না। যে-ঘরটায় বাবার শেষ শয্যা পাতা হয়েছিল, সেই ঘরে সারাক্ষণ বড়দের ভিড়। ডাক্তারবাবুরা আসছেন, আমাদের আত্মীয়রা আসছেন। মা তো প্রায় সবসময়েই ওখানেই বসে আছেন। তারমধ্যে আমি মাঝে মাঝে দরজার বাইরে থেকে উঁকি মেরে বাবাকে দেখে আবার পালিয়ে যেতাম। ভেতরে ঢুকতাম না।

‘কিন্তু যেদিন রাতে বাবা মারা গেলেন, সেদিন দুপুরে একটা অদ্ভুত কাণ্ড হল। আমি ওরকম একবার বাইরে থেকে উঁকি দিতেই মা আমাকে দেখতে পেয়ে ডাকলেন—বিলু, তোর বাবার পাশে একটু বস তো মানিক। আমি চট করে ঠাকুরকে একটু জল দিয়ে আসি। আমাকে বাবার মাথার কাছে একটা টুলে বসিয়ে রেখে মা বেরিয়ে গেলেন। ঘরে তখন শুধু আমি আর বাবা; আর কেউ নেই। এরকম অবস্থায় হঠাৎ বাবার চোখদুটো খুলে গেল। তার আগে প্রায় একসপ্তাহ বাবা কোমার মধ্যে ছিলেন।

‘শুধু চোখ খুললেন না, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা খুব মৃদুস্বরে কিন্তু পরিষ্কার উচ্চারণে বললেন, বিলু, গুপ্তধন আছে। কিন্তু সেই গুপ্তধনে লেগে আছে সারা মানবজাতির পাপ। তাই, শুধু যদি কখনো দেখিস আমার বংশলোপ হতে চলেছে, একমাত্র তখনই সেই গুপ্তধনে হাত দিস। মন্ত্রের আশ্রয় নিস, মন্ত্রের আশ্রয়—এই বলতে-বলতে বাবার চোখদুটো আবার বন্ধ হয়ে গেল। আর খুলল না। সেই রাতেই বাবা চলে গেলেন।

‘বাবার সেই স্বল্পস্থায়ী চেতনার মধ্যে বলে-যাওয়া কথাগুলো কোনোদিন কাউকে বলিনি। মাকে না, স্ত্রীকে না। রোগের বিকার ভেবে কথাগুলো ভুলে যেতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের স্মৃতির ব্যাপারটা তো ভারি অদ্ভুত। সে যে কোনটা ভুলবে আর কোনটা মনে রাখবে সেটা কেউ বলতে পারে না।

‘পঁয়ত্রিশ বছর পরে আজ আমি সেই সিচ্যুয়েশনে এসে পৌঁছেছি মিস্টার মজুমদার, যখন আমার বাবার বংশের শেষ সলতে নিভে যেতে বসেছে। আমার মেয়ে মোহর এমন এক স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত, যে রোগের চিকিৎসা এদেশে নেই। একমাত্র আমেরিকায় তার চিকিৎসা হয় এবং তার জন্যে প্রয়োজন প্রায় এক কোটি টাকা। বোধহয় সেই কারণেই, ক’দিন আগে, আমার বাবার মৃত্যুশয্যায় বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল।

‘আমি জানি না, বাবা তাঁর সাধনায় সত্যিই দূরদৃষ্টি ধরনের কিছু লাভ করেছিলেন কিনা। নাহলে কেমন করে অতদিন আগে এমন একটা দিনের কথা বলেছিলেন আমাকে? যাই হোক, গত কয়েকদিন ধরে বাবার কথাগুলো নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছিলাম। বলে তো গেলেন গুপ্তধন রয়েছে। কিন্তু কোথায় রয়েছে তা তো বলে গেলেন না। শুধু বললেন, মন্ত্রের আশ্রয় নিস, মন্ত্রের আশ্রয়। তার অর্থ কী?

‘ভাবতে-ভাবতে হঠাৎই একসময় ছবির মতন চোখের সামনে ভেসে উঠল ঠাকুরঘরে বাবার পুজোপাঠের কথা। বাবা যখন পুজো করতেন, আমি অনেক সময় তাঁর পাশে বসে থাকতাম। কাঁসর বাজাতাম, বাবার ইশারায় তাঁর হাতে ফুল, দীপদান, ধূপদান এগিয়ে দিতাম। ভক্তিতে নয়, পুজোর শেষে প্রসাদ পাওয়ার লোভেই এসব করতাম।

‘সে যাই হোক, ওইভাবে বসে থাকতাম বলেই বোধহয় ছবির মতন দেখতে পেলাম পঁয়ত্রিশ-বছর আগের ঠাকুরঘরের পুরো ছবিটাই। দেখতে পেলাম পুজোর আসনের পাশে পুষ্পপাত্র, ঘণ্টা, গামছা ইত্যাদির সঙ্গেই একটা খাতা। খাতাটার পাতায় তিনি পুজোর পদ্ধতি, মন্ত্র ইত্যাদি লিখে রাখতেন। পুজোর সময় হাতের কাছে খাতাটা নিয়ে বসতেন এবং সন্দেহ হলে পাতা উল্টে মন্ত্রগুলো ঝালিয়ে নিতেন।

‘ভাবলাম, উনি কি তাহলে ওই মন্ত্রগুলোর মধ্যে গুপ্তধনের হদিশ রেখে গেলেন! খোঁজার কাজটা যাতে সহজ না হয়, যাতে নিতান্ত নাচার না হলে আমি ওদিকে হাত না বাড়াই, সেইজন্যেই অভিশাপের কথা বলে ঘুলিয়ে দিয়ে গেলেন পুরো ব্যাপারটা?

‘এইসব ভেবে একদিন সারাদিন ধরে ঠাকুরঘরের স্তূপাকার আসন বাসন ছবি পুঁথি সব সরিয়ে বহুকষ্টে সেই খাতাটা খুঁজে বার করলাম। সাধারণ চার-নম্বর রুলটানা খাতা। আমরাও স্কুলে ওইরকম খাতাতেই লিখতাম।

‘খাতাটার অর্ধেকটা জুড়ে মন্ত্র লেখা ছিল; বাকি অর্ধেক অংশের পাতাগুলো ব্যবহৃত হয়নি। ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি। পাতাগুলোর চেহারা দেখলেই বুঝতে পারবেন, সেগুলো পুজোর সময় বাবার আসনের পাশেই খোলা থাকত। সেই জন্যেই পাতাগুলোয় সিঁদুরের দাগ লেগেছে, চন্দনের ছিটে লেগেছে। শুধু শেষ পাতাটায় একটাই আট-লাইনের মন্ত্র এবং ওই পাতাটায় কোনো সিঁদুর চন্দনের দাগ নেই, একদম ফ্রেশ। অর্থাৎ ওইটি পুজোর উদ্দেশে লেখা হয়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মন্ত্রের ছদ্মবেশে ওটিই গুপ্তধনের সঙ্কেত। ওটিকেই বাবা দুঃসময়ে আঁকড়ে ধরতে বলেছিলেন।’

.

বুধোদা কিছুক্ষণ হাতের মুঠির ওপরে চিবুকটা ঠেকিয়ে চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘দেখুন বিপ্লববাবু, আপনার ইনটেলিজেন্সের প্রশংসা না করে পারছি না। সব শুনে বুঝতে পারছি আপনি একেবারে ঠিক পথে এগোচ্ছেন। এক্ষেত্রে আমি আপনাকে আর কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’

বিপ্লব মুন্সী বললেন, ‘একটা জায়গাতেই ঠেকে যাচ্ছি। ওই যেটা আপনাকে একটু আগে বললাম, ধন থাকলে তবেই না তা গোপন করার কথা আসে। আমাদের পরিবার তো কোনোদিনই সেরকম ধনী ছিল না। বাবার আমলে তো আমরা তো রীতিমতন মধ্যবিত্তের স্তরেই নেমে এসেছি। দেন হোয়াট ইজ দা ক্যারেকটার অফ দিস হিডন ট্রেজার? গুপ্তধনের চরিত্রটা কী?’

আমার মাথায় যে উত্তরটা এসেছিল, বুধোদা ঠিক সেটাই বলল। ‘দেখুন, আপনাদের অনেকদিনের পুরোনো বংশ। অনেকদিনের পুরোনো বাড়ি। এরকম বাড়িতে অনেক সময় একটা ম্যাজিক ঘটে যায়। কীরকম জানেন? ধরুন একশো বছর আগে আপনার কোনো পূর্বপুরুষ একটা গ্রামাফোনের রেকর্ড কিনেছিলেন, কিংবা একটা হাতঘড়ি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই অমূল্য হয়ে উঠল। কারণ ইতোমধ্যে বাকি দুনিয়া থেকে সেগুলো হারিয়ে গিয়েছে। তাদের জুড়ি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না কিংবা পেলেও পাওয়া যায় খুব অল্প।

‘আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা এরকম অনেক দেখেছি। টি-গার্ডেন-টোকেন, যাদুকর হুডিনির ম্যাজিক-আলমারি, আজাদ হিন্দ ফৌজের মেডেল—কত বলব?

‘এরকম হতেই পারে, একটা জিনিস আপনাদের বাড়িতে অনেকদিন ধরেই পড়ে রয়েছে। আপনার বাবা বুঝতে পারলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা অ্যান্টিক হয়ে গিয়েছে। তিনি তখন সেটার হদিশ আপনাকে জানিয়ে গেলেন।’

বিপ্লববাবু বললেন, ‘তাহলে তো আপনার পরামর্শই আমার লাগবে। আপনি ওই অদ্ভুত মন্ত্রটা দেখুন। তার সঙ্গে আমাদের বাড়িটাও ঘুরে দেখুন। দেখুন দুটো মিলিয়ে আপনি সেরকম কোনো অ্যান্টিককে আইডেন্টিফাই করতে পারছেন কিনা। আমি এমনি-এমনি আপনাকে যেতে বলছি না, প্রফেশনাল হেল্প চাইছি। আপনাকে এর জন্যে আমার সাধ্যমতন সাম্মানিক দেব।’

বুধোদা ওঁর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘বেশ। আপাতত সেই হেঁয়ালিটাই দেখান।’

বিপ্লববাবু করুণমুখে বললেন, ‘আমি সেটা সঙ্গে করে নিয়ে আসিনি ভাই। মানে, আনতে পারিনি।’

বুধোদার ভুরুদুটো কপালে উঠে গেল। বেশ বিরক্তস্বরেই বলল, ‘কী মুশকিল। অরিজিনাল খাতাটা বাড়ির বাইরে আনলে চুরি-ডাকাতির ভয় থাকতেই পারে। কিন্তু আজকালকার দিনে মোবাইলে একটা পাতার ফটো তুলে কিংবা স্ক্যান করে আনতে কি খুব অসুবিধে ছিল?’

বিপ্লববাবু খুবই কুণ্ঠা নিয়ে বললেন, ‘অসুবিধে নয়…সেই সংস্কার। আপনারা যদি ‘কুসংস্কার’ বলেন, তাতেও আমার কিছু বলার নেই। আসলে খাতাটার ছবি তোলা বা ওটাকে বাড়ির বাইরে বার করার ব্যাপারে বাবার কড়া নিষেধ ছিল। উনি বারবার বলতেন, ঠাকুরঘর থেকে কোনো জিনিস বাইরে নিয়ে গেলে তারা দেবীর অভিশাপ লাগবে।’

বুধোদা উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘ওকে। তাহলে আপনার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিয়ে যান। আগামীকাল আমি একটা কাজে ভাইজাগে যাচ্ছি। ফিরব রবিবার। নেক্সট মানডে আমরা দুজনেই আপনার বাড়ি যাব।

.

দুই

আজকেই সেই সোমবার। চাঁদনিচক স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা দুজনে সেন্ট্রাল-অ্যাভেনিউয়ের ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়ালাম। একে তো সপ্তাহের প্রথম কাজের দিন, তার ওপরে ঘড়িতে সন্ধে সাতটা। ট্যাক্সি, বাস, মুটে, অটো আর হকারের কল্যাণে জায়গাটা এই-মুহূর্তে কুরুক্ষেত্র হয়ে আছে। একটু অসাবধান হলেই যে-কোনো যোদ্ধার হাতে নিহত না হই, আহত হয়ে যেতে পারি।

ওখানে দাঁড়িয়েই বুধোদা কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে নিজের স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তাকিয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে। জানি, বুধোদা এখন গুগল-ম্যাপে নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেন খুঁজছে। খুঁজে পেলে আমাদের অভিযানের পরের পর্ব শুরু হবে।

পেল না। টাচ-স্ক্রিনে বেশ কিছুক্ষণ আঙুল-টাঙুল ঘষে বিরক্তমুখে বলল, ‘কী ঠিকানা দিয়েছেরে ভাই। এ তো দেখছি গুগলেরও অরুচি। এখন যাব কেমন করে?’

এমনিতেই বেশ দেরি হয়ে গেছে। কখন বাড়ি ফিরব কে জানে। আজ এখানে আসতে হবে বলেই বুধোদা গাড়ি নিয়ে আসেনি। বলেছিল, ফেরবার সময় মেট্রোয় দক্ষিণেশ্বরে নেমে, হেঁটে চলে যাব। কিন্তু এখনো তো নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেনে পৌঁছলামই না। আগে সেখানে পৌঁছব, বিপ্লব মুন্সীর সঙ্গে কথা হবে, তারপরে না ফেরার কথা।

বুধোদা বিপ্লববাবুকে ফোনে ধরবার চেষ্টা করল। উত্তর পেল, নম্বরটি পরিষেবা সীমার বাইরে। অবশ্য এরকমটা যে হতে পারে, সে-কথা বিপ্লববাবু আগেই বলে রেখেছিলেন। ওঁদের পুরো রাস্তাটাতেই নাকি মাঝেমধ্যে টাওয়ার পাওয়া যায় না। অগত্যা একে-ওকে জিগ্যেস করতে-করতে আমরা দুজনে ওয়েলিংটন-স্কোয়ারের দিকে হাঁটা লাগালাম। পথচারী কিংবা দোকানদারদের মধ্যে কেউই নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেনের হদিশ দিতে পারছিলেন না। ঠিক তখনই রাস্তার ধারে কটা হাতে-টানা রিকশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার মাথাতে বুদ্ধিটা এল।

যারা রিকশা নিয়ে বসে আছেন, সকলেই দেখলাম বৃদ্ধ। বৃদ্ধ বলেই আশা হল তাঁরা নিশ্চয় এই জায়গাটাকে ভালোমতন চিনবেন। আমি লাইনের প্রথম রিকশাওলাকে বললাম, ‘যাবেন?’

‘কাঁহা যানা হ্যায় বাবুজি?’ প্রশ্ন করলেন ছেঁড়া গেঞ্জি আর মালকোচা মেরে ধুতি পরা বিহারি রিকশাচালক। কদমফুলের রং যদি সাদা হতো, তাহলে যেরকম দেখতে লাগত, চাচার মাথাটা ঠিক সেরকম।

‘নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেন। বিপ্লব মুন্সীর বাড়ি। চেনেন?’

‘কিঁউ চিনবে না? পাখিবাড়ি তো হামরা সোবাই চিনে। বৈঠিয়ে।’ ওই ‘পাখিবাড়ি’ শুনেই আমি আর বুধোদা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। চাচা যে বাড়িটা ঠিকই চিনেছে তাতে সন্দেহ নেই।

হাতে-টানা রিকশায় উঠতে ভালো লাগে না, একটা অপরাধবোধ কাজ করে। নেহাত উপায় ছিল না বলে আজ অনেক-বছর পরে উঠলাম। গনেশচন্দ্র অ্যাভেনিউটা পার করে চাচা উল্টোদিকের একটা সরু রাস্তার মধ্যে রিক্সাটা ঢুকিয়ে দিলেন আর অমনি আমরা যেন টাইম-মেশিনে করে পঞ্চাশবছর আগের কলকাতায় ঢুকে পড়লাম।

কোথায় গেল একটু আগের সেই সার-সার ইলেকট্রনিক গুডস আর যন্ত্রপাতির দোকান। কোথায় গেল মশলা দোসা, পরাঠা, শিককাবাব আর রোলের স্টল। এখন রাস্তার দু-ধারে শুধু বহু প্রাচীন দোতলা তিনতলা বাড়ির সারি। তাদের গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে, রেন-পাইপের পাশ দিয়ে নেমে এসেছে বটগাছের দীর্ঘ শেকড়। মুখ তুলে দেখলাম, বারান্দায় ঢালাই লোহার রেলিং, জানলায় কাঠের খড়খড়ি।

কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই রাস্তায় এখনো এলইডি ল্যাম্পের প্রবেশ ঘটেনি। লাইটপোস্টের মাথা থেকে কম পাওয়ারের ফিলামেন্ট-বাল্বগুলো মিটমিট করে আলো ছড়াচ্ছিল। ফলে চতুর্দিকে আলোর চেয়ে ছায়া জমেছিল বেশি। বড় হওয়ার পরে এমনকী আমাদের উত্তরপাড়াতেও এরকম ল্যাম্পপোস্ট দেখিনি, কলকাতা তো কোন ছাড়।

প্রায় দশ-মিনিট ধরে আমাদের রিকশা সেই সাপের মতন সরু, সাপের মতোই প্যাঁচানো রাস্তা ধরে ঢিমে গতিতে এগিয়ে চলল। এতখানি রাস্তায় দোকান দেখলাম বড়জোর সাত-আটটা এবং আশ্চর্যজনকভাবে সেগুলোর চরিত্রও এমন যে, অনায়াসেই পঞ্চাশবছর আগের কলকাতার সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। চাঁদনির বিখ্যাত ব্যবসাপাড়ার গায়েই যে এরকম একটা নির্জন পুরোনো পাড়া থাকতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।

বুধোদাও নিশ্চয় আমার মতনই অবাক হয়েছিল। হঠাৎ একটা বড়সড় নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘গত কুড়ি বছর ধরে কলকাতার আনাচে কানাচে এত ঘুরছি, তবু বুকে হাত রেখে বলতে পারব না, শহরটাকে পুরোপুরি চিনে উঠতে পেরেছি।’

ঠিক একই কথা আমাদের মনে হয়েছিল গতবছর, যখন আমরা দরিয়ার সোনার খোঁজে মেটিয়াবুরুজ-খিদিরপুরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আসলে বুধোদার এই অ্যান্টিক-হান্টিং-এর কাজটাই এমন যে, কর্পোরেট-দুনিয়ায় বসে সেটা করা যায় না। ‘অ্যান্টিক’ মানে ফেলে-আসা সময়ের সাক্ষী আর তাকে খুঁজতে গেলে সেইসব জায়গাতেই যেতে হয়, যেখানে সময় স্তব্ধ হয়ে গেছে।

আমরা আপাতত সেরকমই একটা অঞ্চল ধরে চলেছি।

বুঝতে পারছিলাম এই-রাস্তা পশ্চিম থেকে পুবে গিয়ে একসময় শিয়ালদার কাছাকাছি কোথাও এপিসি রোডে মিট করবে। কিন্তু তার আগেই একজায়গায় রাস্তার ধারে রিকশাটা দাঁড় করিয়ে চাচা গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ‘এই গলিটা দিয়ে চলে যান। ডানদিকে দুটো বাড়ির পরেই পেয়ে যাবেন পাখিবাড়ি।’

প্রথমে আমরা কেউই গলি-টলি কিছুই দেখতে পাইনি, কারণ, গলিটার মুখে কোনো আলো ছিল না। তারপর দেখলাম দুটো পুরোনো বাড়ির মাঝখানে একটা চারফিট চওড়া রাস্তা আছে ঠিকই; উপরন্তু ওই দুটো বাড়ির মধ্যে একটার গায়ে এনামেলের বোর্ডে সেই গলির নামটাও পড়া যাচ্ছে—নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেন।

আকাশে নিশ্চয় চাঁদ উঠেছিল। নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেনের ইট-বাঁধানো রাস্তায় সেই চাঁদের আলো না পৌঁছলেও বাড়িগুলোর ওপরদিকটা সেই জ্যোৎস্নার স্পর্শ পাচ্ছিল। রিকশাওলা চাচা না বলে দিলেও পাখিবাড়ি চিনতে অসুবিধে হতো না; পাখিরাই চিনিয়ে দিত। দোতলার বারান্দায় বোধহয় কিছু পাখির খাঁচা রাখা ছিল। রাস্তা থেকেও তাদের ডাকাডাকি শুনতে পাচ্ছিলাম।

দেখলাম, বাড়িটা উচ্চতায় দোতলা হলেও প্রস্থে বেশ অনেকখানি। তার মধ্যে আবার কিছুটা অংশ ভাঙাচোরা, কিছুটার গায়ে নতুন প্লাস্টার আর রং পড়েছে। তার মানে শরিকদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে গেছে।

কিছুটা গিয়ে একতলার রোয়াকের মাঝামাঝি অংশে বাড়িতে ঢোকার সদর দরজা দেখতে পেলাম। পাল্লা-দুটো ভেতর থেকে বন্ধ করা ছিল। আমরা কলিং বেল বাজাতেই দোতলার বারান্দা থেকে বিপ্লব মুন্সী সাড়া দিলেন। তারপর নীচে নেমে এসে দরজা খুলে একগাল হেসে বললেন, ‘আপনাদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। আসুন, ভেতরে আসুন।’

জুতো খুলতে খুলতে বুধোদা বলল, ‘বাড়িতে আর কে কে রয়েছেন?’

‘আমার স্ত্রী স্মৃতি আর মেয়ে মোহর। মোহর তো বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। ওর জন্যেই স্মৃতিও বিশেষ বেরোয়-টেরোয় না।’

বিপ্লববাবু প্রথমে আমাদের একতলার বৈঠকখানাতেই বসালেন। একটু বাদে চা-জলখাবার নিয়ে নেমে এলেন ওঁর স্ত্রী, স্মৃতিবউদি। বউদির খুব আপন করে নেওয়া ব্যবহার। কথাবার্তাতে শিক্ষা এবং বুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। শুনলাম আইটি সেক্টরের একটা বড় ফার্মে চাকরি করতেন কিন্তু মেয়ের অসুস্থতার কারণে তিন-বছর আগে সেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

বাড়ির এই অংশটা, যেটা বিপ্লববাবুর ভাগে পড়েছে, সেটা বেশি বড় নয়। একতলায় তিনটিই মাত্র ঘর। তার মধ্যে একটা বৈঠকখানা, যেখানে আমরা বসেছিলাম। একটা ঠাকুরঘর। আর এই দুইয়ের মাঝখানের ঘরটা পাখির ঘর। চা-টা খেয়ে দোতলায় ওঠার আগে স্মৃতিবউদি আর বিপ্লববাবু আমাদের ওই দুটো ঘরই ঘুরিয়ে দেখালেন। পাখিরা তখন ঘুমোচ্ছিল। ঘরে কম পাওয়ারের বাল্‌ব জ্বলছিল। অনেক খাঁচার ওপরে ঢাকনা ফেলা ছিল, যাতে ওদের চোখে আলো না লাগে। তবু তার মধ্যেই যেটুকু দেখলাম, চোখে ধাঁধা লেগে গেল, এমনই রঙের বাহার সেই পাখিদের।

বিপ্লববাবু বললেন, ‘এ আর কী দেখছেন। কোভিড-পিরিয়ডের আগে যা ছিল, এখন তার দশভাগের একভাগও নেই। ওই লকডাউনের দুটো বছরেই আমার ব্যবসা চৌপাট হয়ে গেল।’

ঠাকুরঘরের ভেতরে আমরা আর ঢুকিনি; দরজার কাছে দাঁড়িয়েই ভেতরে উঁকি মেরে দেখলাম। বিশেষভাবে দেখার মতন কিছু ছিল না। ঘরের মাঝামাঝি একজায়গায় তিন ফুট মতন উঁচু এক কালীমূর্তি। বিপ্লববাবু বললে, দারুনির্মিত, মানে কাঠের তৈরি। বিপ্লববাবু নিজে পুজোপাঠ কিছু জানেন না। পুরোহিত মশাই আছেন, তিনিই প্রতিদিন পুজো করে যান। সেই কালীমূর্তিকে ঘিরে আরও বহু দেবদেবীর ছোট ছোট মূর্তি কিংবা ছবি।

বুধোদার সন্ধানী দৃষ্টি ওইটুকু সময়ের মধ্যেই দেখে নিয়েছে ঠাকুরঘরের একদিকে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা কাঠের আলমারি আর দেয়ালে বেশ বড়সড় একটা ঘড়ি। নিজের মনেই বলল, ‘এই দুটো জিনিসকে যদি আপনার বাবা গুপ্তধন বলে চিহ্নিত করে থাকেন তাহলে আপনাকে হতাশ হতে হবে। আলমারিটার বয়স একশো বছরের বেশি এবং সম্ভবত মেহেগনি কাঠের তৈরি। তবু যেহেতু এই কলকাতাতেই তৈরি তাই ওটার দাম এখন চল্লিশ-হাজারের বেশি হবে না। আর দেয়ালের ওই ঘড়িটা তো দেখছি কুকু-ক্লক। অ্যান্টিকের বাজারে কুকু-ক্লকের জোগানই সবচেয়ে বেশি। তাই দামও কম।’

বিপ্লববাবু পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। বুধোদার কথা শুনে বললেন, ‘তাছাড়া ঘড়িটা বাবার মৃত্যুর আগে থেকে বন্ধ হয়েই পড়ে রয়েছে। আসলে বাবাই ওটায় দম দিতেন। আমি ওসব জানি না। এখন দম দিলেও আর চলবে না। পড়ে থেকে থেকে জ্যাম হয়ে গেছে।’

বুধোদা মুখে চুকচুক আওয়াজ করে বলল, ‘সারানোর মিস্ত্রিও পাবেন না। যাই হোক, যদি কখনো মনে করেন, এই দুটো জিনিস বিক্রি করবেন, আমাকে বলবেন। আমি কাস্টমার জোগাড় করে দেব।’

বিপ্লববাবু তাই শুনে বললেন, ‘না, থাক। বললামই তো, ঠাকুরঘরের জিনিসপত্র সম্বন্ধে আমাদের একটু ইয়ে আছে। চলুন ওপরে যাওয়া যাক। মোহরের সঙ্গেও দেখা করবেন আর বাবার খাতাটাও ওপরেই নিয়ে গিয়ে রেখেছি। ওটাও দেখবেন। ও হ্যাঁ। ওপরেও কিছু পুরোনো আসবাব, কিউরিও আর অয়েল-পেন্টিং রয়েছে। সেগুলোও একবার দেখে নেবেন। হতে পারে, বাবা ওগুলোর মধ্যেই কোনোটাকে গুপ্তধন বলে মিন করেছিলেন।’

বুধোদা বলল, ‘চলুন।’

দোতলাতেও দেখলাম তিনটে ঘর। পুরোনো আমলের বাড়িতে যেমন দেখা যায়, প্রতিটি ঘরে দুটো করে দরজা—একটা বারান্দার দিকে, আর অন্যটা দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়া যায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমেই যে-ঘরটা, সেখানেই বিপ্লববাবুর মেয়ে মন্দাক্রান্তা মুন্সী অর্থাৎ মোহর শুয়েছিল। ঘরের পর্দা সরিয়ে স্মৃতিবউদি বললেন, ‘মাগো, দেখো তোমার ফেভরিট অ্যাডভেঞ্চারাররা চলে এসেছেন।’ তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসো ভাই, ভেতরে এসো।’

একজন চরম অসুস্থ রুগির ঘর বলতেই যে-ছবিটা চোখে ভাসে মোহরের ঘরে ঢুকে একেবারেই সেই অনুভূতিটা হল না এবং হল না যে তার পেছনে নিশ্চয়ই স্মৃতিবউদির হাতযশই কাজ করছে। তিনিই ঘরটাকে অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন।

বাড়ির অন্যান্য ঘরগুলোর মতন এই ঘরটার চেহারা মোটেই জরাগ্রস্ত নয়। প্রতিটি দেয়ালে আর দরজা-জানলায় দামি প্লাস্টিক-পেন্টের কোটিং। রঙের মধ্যে মন ভালো করে দেওয়া পিঙ্ক আর লাইম ইয়োলোর প্রাধান্য। কনসিল্ড লাইটিং-এর ফলে চোখে আলো লাগছে না কিন্তু ঘরের প্রতিটি কোণ ঝলমল করছে। সারা ঘরে অনেক ইনডোর প্ল্যান্ট, দেয়ালে অনেক প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। মোহরের বিছানার মাথার কাছে বড় জানলাটা দিয়ে যখন হাওয়া ঢুকছিল তখন সেই হাওয়ার ঝাপটায় একটা উইন্ড-চাইম টুংটাং করে সুর ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

তবে এই সবকিছুর চেয়ে উজ্জ্বল লাগল গায়ে চাদর চাপা নিয়ে যে বারো-বছরের মেয়েটা বিছানায় শুয়েছিল, তার মুখটা। কোঁকড়া কোঁকড়া একরাশ চুল দিয়ে ঘেরা মুখে বড়বড় দুটো চোখ। ঠোঁটে হাসি। কে বলবে, এই মেয়েরই কোমর থেকে নীচের দিকটা ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ওই হাসিতে উজ্জ্বল চোখ দেখে কে বলবে কলকাতার একটা নামকরা স্কুলের ক্লাস থ্রিয়ের ফার্স্ট গার্লকে আজ থেকে তিনবছর আগে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

বিছানার পাশে রাখা দুটো শ্রীনিকেতনী মোড়ার দিকে ইশারা করে মোহর বলল, ‘বসো।’

বুধোদা ব্যাগের মধ্যে হাত গলিয়ে একজন অ্যাস্ট্রোনটের মডেল বার করে মোহরের হাতে ধরিয়ে দিল। তার স্পেস-স্যুটের বুকে লেখা ‘অ্যাপেলো ইলেভেন।’ বুধোদা বলল, ‘উনিশশো উনসত্তরে যখন মানুষ প্রথম চাঁদে পা দিল, তখন আমেরিকার বাজারে এই পুতুলগুলো বিক্রি হতো। দেখো, এর প্রত্যেকটা গিয়ার—হেলমেট, অক্সিজেন-সিলিন্ডার, জুতো—সব খোলা যায়, আবার পরানোও যায়। তুমি এটা নিয়ে খেলা কোরো।’

মোহর তো খুব খুশি। বলল, ‘কিন্তু আমি তোমাদের কী দেব?’ তারপর একটু ভেবে টুনি টুনি বলে ডাক দিল।

স্মৃতিবউদি বললেন, ‘আবার ওকে কেন? কী আনতে হবে আমাকেই বল না।’

আমরা যখন সবে ভাবছি টুনি বোধহয় কোনো গৃহ-সহায়িকা হবে, ও মা! ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে গটমট করে হাঁটতে হাঁটতে এই ঘরে ঢুকল এক বিশাল ম্যাকাও-পাখি। আমাদের মুখের অবস্থা দেখে বিপ্লববাবু, স্মৃতিবউদি আর মোহর তিনজনেই হাসছিলেন।

টুনি নামে সেই ম্যাকাও ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে মোহরের বালিশের পাশে উঠে বসল। তারপর মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে হেঁড়ে গলায় ডাক ছাড়ল কিররর ক্যাকাও ক্যাকাও।

‘কাকুদের জন্যে ফ্রিজ থেকে ক্যাডবেরি নিয়ে এসো, এখুনি। দেরি করবে না।’

পাখিটা দুবার মাথাটা দুপাশে নাড়াল।

‘বুঝতে পারছ না? এই দেখো, ক্যাডবেরি।’ মোহর বালিশের পাশ থেকে স্মার্টফোনটা তুলে নিয়ে নেট থেকে ক্যাডবেরি চকোলেটের ছবি বার করে পাখিটার চোখের সামনে তুলে ধরে বলল, ‘বোকা কোথাকার। যাও, নিয়ে এসো।’

ম্যাকাও এবার লাফ দিয়ে মেঝেয় নেমে গটগট করে পাশের ঘরে চলে গেল। স্মৃতিবউদি চোখের ইশারায় আমাদের উঠে আসতে বললেন। তারপর দুটো ঘরের মাঝের দরজার পর্দাটা একটু সরিয়ে বললেন, ‘দেখো, কেমন ওস্তাদ। কী করছে দেখো।’

আমি আর বুধোদা অবাক হয়ে দেখলাম, টুনি পাশের ঘরের কোনায়-রাখা ফ্রিজটার ছাদে বসে প্রথমে তার বিশাল ঠোঁট দিয়ে টেনে ফ্রিজের দরজাটা খুলল। তারপর দরজার গায়ের ব়্যাক থেকে একটা বড়সড় ক্যাডবেরির প্যাকেট ঠোঁটে তুলে নিয়ে, থাবা বাড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আবার লাফ দিয়ে মেঝেয় নেমে চলে এল এই ঘরে। মোহরের হাতে ক্যাডবেরির প্যাকেটটা তুলে দিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আবার ফিরে গেল পাশের ঘরে।

মোহর আমার হাতে ক্যাডবেরির প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘রুবিকদা, তোমার অ্যাডভেঞ্চারের গল্প আমি অনেক পড়েছি। আমারও খুব ইচ্ছে করে সপ্তদ্বীপাদিদির মতন তোমাদের অভিযানে সঙ্গী হই। আমি যখন সেরে উঠব, তখন আমাকে সঙ্গে নেবে তো?’

বুধোদা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিশ্চয় নেব। কিন্তু তুমি কি জানো, তোমাদের বাড়ির মধ্যেই গুপ্তধন নিয়ে একটা রহস্য ঘনিয়ে উঠছে?’

মোহর ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘পুরোটা জানি না। মা-বাবা আমাকে বলতে চায় না। অল্প অল্প আন্দাজ করতে পারি।’

‘তোমার কী মনে হয়? এই বাড়িতে গুপ্তধন আছে?’

‘ধুস। ওসব বাবার কল্পনা। এতদিনের একটা বাড়ি। এখন না হয় বাড়িটা ফাঁকা, কিন্তু এককালে তো লোকজন গিজগিজ করত। গুপ্তধন থাকলে কারুর চোখে পড়ত না?’

ওর কথা বলার ধরণে আমরা সবাই হেসে ফেললাম। বুধোদা বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছ। তবু আমি চাইব তোমার বাবার কথাই সত্যি হোক। সবকিছুই যদি যুক্তি মেনে চলে তাহলে পৃথিবীটা বড্ড সাদামাটা হয়ে যায়। ঠিক আছে, এখন আমরা একটু কাজ করে নিই। যাবার সময় আবার তোমার সঙ্গে দেখা করে যাব।’

মোহরের ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বিপ্লববাবু বললেন, ‘মোহরের খুব মনের জোর, বুঝলেন? ওই যে স্মার্টফোনটি দেখলেন, ওটিই ওর পৃথিবী। সারাক্ষণ নেট থেকে কত বিষয়েই যে পড়াশোনা করে যাচ্ছে। আর রয়েছে টুনি, ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু।’

স্মৃতিবউদি বললেন, ‘টুনি আমাদের বাড়িতে রয়েছে পনেরো বছর। ও আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে। এত বুদ্ধি ওর, পাখি বলে মনেই হয় না। কত সময় দেখেছি, ও চুপ করে মোহরের কাঁধে মাথা গুঁজে বসে আছে আর মোহরও ওর যাবতীয় মনের কথা টুনির কানে-কানে বলে চলেছে।’

বুধোদা বলল, ‘ম্যাকাওয়ের বুদ্ধি নিয়ে কিছু ঘটনা আমি আগে পড়েছিলাম। আজকেই প্রথম চাক্ষুষ করলাম। যাই হোক, বিপ্লববাবু, এবার আপনার সেই গুপ্তধনের সঙ্কেতটা যদি একবার দেখান।’

‘হ্যাঁ, আসুন। দালানের ওই শেষ ঘরটাকে আমি অফিস ঘরের মতন ব্যবহার করি। ওখানেই একটা আয়রন চেস্টের মধ্যে খাতাটা রেখে দিয়েছিলাম। আজ আপনারা আসবেন বলে বার করে রেখেছি। আসুন।’

আমরা গেলাম। কিন্তু খাতা দেখতে পেলাম না। কারণ, যে টেবিলের ওপরে বিপ্লববাবু খাতাটা রেখে গিয়েছিলেন সেখানে ওটা ছিল না। কোথাওই ছিল না।

.

তিন

বিপ্লববাবু প্রথমে টেবিলের ওপরে রাখা অন্য খাতাপত্রের মধ্যে খাতাটাকে খুঁজলেন। তারপর ড্রয়ার…টেবিলের পাশে রাখা ব়্যাক। ক্রমশ তাঁর কপালের ভাঁজগুলো গভীর হচ্ছিল। আমি আর বুধোদা কিছু না বলে একপাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কর্মকাণ্ড দেখছিলাম।

একটু বাদেই বিপ্লববাবু উঁচুগলায় ডাক দিলেন, ‘স্মৃতি, স্মৃতি। এদিকে একবার এসো, এখুনি।’

বউদি পাশের ঘরেই ছিলেন। মাঝখানের দরজা দিয়ে সঙ্গেসঙ্গেই বিপ্লববাবুর অফিসঘরে চলে এলেন। অবাক হয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে?’

‘খাতাটা কোথায়?’

‘খাতা, মানে বাবার ওই পুজোর মন্ত্র লেখা খাতাটা? আমি তো জলখাবার নিয়ে নীচে যাবার সময়ও দেখে গেলাম এই টেবিলের ওপরে পড়ে আছে। পাচ্ছ না? কোথায় আর যাবে? মাথা ঠান্ডা করে ভালো করে দেখো; নিশ্চয় তোমার অন্য কাগজপত্রের নীচে ঢুকে গেছে।’

বিপ্লববাবু খেঁকিয়ে উঠলেন। ‘ঢুকে গেছে মানে? খাতার কি পা আছে যে, নিজে হাঁটতে হাঁটতে অন্য কাগজপত্রের নীচে ঢুকে পড়বে?’

বউদি কোনো উত্তর না দিয়ে শান্তভাবে একটা একটা করে কাগজ সরিয়ে পুরো টেবিলটা খুঁজলেন। তারপর তিনিও হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

বুধোদা এতক্ষণে কথা বলল।

‘বিপ্লববাবু! একটু ভালো করে ভেবে দেখুন তো, এই টেবিল থেকে আপনিই ওটা অন্য কোনো ঘরে নিয়ে যাননি তো। হয়তো আমাদের দেখাবেন বলে নীচেই নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিংবা পাশের ঘরে।’

বিপ্লববাবু দু-হাতের মুঠোয় মাথার চুলগুলো মুঠি করে ধরে বললেন, ‘নো চান্স মিস্টার মজুমদার। আমি আপনাদের ডাক শুনে নীচে নামবার সময় এই ঘরের মধ্যে দিয়েই নেমেছিলাম এবং তখনো খাতাটা এই টেবিলের ওপরেই দেখে গিয়েছি।’

স্মৃতিবউদি ভয়-পাওয়া গলায় বললেন, ‘বললে বিশ্বাস করবে না, তোমাদের জলখাবার নিয়ে নীচে নামবার সময় আমিও এই ঘরের মধ্যে দিয়েই গিয়েছিলাম, এবং তখন আমিও দেখেছিলাম ওটা টেবিলের ওপরেই নামানো রয়েছে।’

‘তাহলে?’ বিপ্লববাবু পাগলের মতন এদিকে-ওদিকে তাকালেন। তারপর ফল হবে না জেনেও পাশের দুটো ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজে এলেন। যেহেতু ওই দুটো ঘরই যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন তাই খুঁজতে বেশি সময় লাগল না। আমরাও বিপ্লববাবুর পেছন পেছন ঘুরছিলাম। আমাদের পেছন-পেছন আসছিল টুনি। মুখে সারাক্ষণ নানারকমের কপচানির আওয়াজ। যেন ও-ও বুঝতে পেরেছে একটা কোনো সমস্যা হয়েছে।

মোহরের ঘরে যখন আমরা ঢুকলাম ও তখন একটা বই পড়ছিল। আমাদের দেখে জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে?’

স্মৃতিবউদি বললেন, ‘তোর দাদুর সেই খাতাটা…খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

মোহর অত্যন্ত নিস্পৃহ ভঙ্গিতে একবার ঠোঁট উল্টে আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগ দিল। স্বাভাবিক। ওর পক্ষে তো আর জানা সম্ভব নয় খাতাটা কোথায় ছিল, কোথায় যেতে পারে। ও তো এই বিছানাতেই বন্দি।

আমি আর বুধোদা এতক্ষণ চুপ করে ছিলাম। এবার বুধোদা বলল, ‘আপনি আর বউদি যখন নীচে নেমেছিলেন, তখন বাড়ির আর কারুর পক্ষে কি আপনাদের অজান্তে ওপরে উঠে এসে, খাতাটা নিয়ে, আবার নীচে নেমে যাওয়া সম্ভব?’

স্মৃতিবউদি বললেন, ‘তা কেমন করে সম্ভব? তোমাদের নিয়ে যে ঘরে বসেছিলাম, তার সামনে দিয়েই তো ওপরে ওঠার সিঁড়ি। কেউ উঠলে তো আমরা দেখতে পেতাম।’

বুধোদা বলল, ‘তাহলে? খাতাটা তো সিম্পলি হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না।’

বিপ্লববাবু কিছুক্ষণ ধরে ভুরু-টুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিলেন। এবার হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘না, হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না। একটা জিনিসই হতে পারে। এসো তো স্মৃতি। আপনারাও আসুন’, এই বলে ঝড়ের মতন ঘর থেকে বেরিয়ে দালান ধরে উল্টোদিকে, মানে, যেদিকে মোহরের ঘর, তার বিপরীত দিকে হাঁটা লাগালেন।

আগেই বলেছি, দালানে আলো কম। তাই শেষপ্রান্তে কী আছে এতক্ষণ আমরা দেখতে পাইনি। এবার দেখলাম, একটা দরজা। তার কাঠের পাল্লাদুটো বন্ধ। বিপ্লববাবু হনহন করে এগিয়ে গিয়ে একটা হ্যাঁচকা টানে সেই পাল্লাদুটোকে খুলে ফেলে, আমাদের দিকে তাকিয়ে ম্যাজিশিয়ানের ভঙ্গিতে বললেন, ‘দেখুন। দেখেছেন?’

কী যে দেখব সেটাই অবশ্য বুঝতে পারছিলাম না। যা বুঝতে পারলাম, অতীতে কোনো এক-সময়ে ওইখান দিয়েই পাখিবাড়িকে লম্বালম্বি একটা ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। নীচ থেকে ছাদ অবধি উঠে গেছে পার্টিশনের ইটের দেয়াল; শুধু আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এই দালানের মাঝামাঝি জায়গায় দু-তরফের যাতায়াতের জন্যে একটা দরজা রেখে দেওয়া হয়েছিল।

এই সেই দরজা, যার ওদিকে আবার দালান। সেই দালানের গায়েও পরপর কয়েকটা ঘর। কিন্তু একটা বাদে বাকি ঘরগুলো অন্ধকার। সম্ভবত তালাবন্ধ। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি, সেখান থেকে ভালো বোঝা যাচ্ছে না।

বিপ্লববাবু জিগ্যেস করেছিলেন, দেখেছেন? তারই উত্তরে বুধোদা বলল, ‘কী দেখব বিপ্লববাবু?’

‘দরজাটা যে খোলা ছিল দেখলেন না? নিশ্চয় আমার হতভাগা কাজের মেয়েটা দুপুরে কাজ করে চলে যাওয়ার সময় এদিক থেকে খিল তুলতে ভুলে গিয়েছিল। আর সেই সুযোগে মেজদা…।’

কথা শেষ না করেই বিপ্লববাবু, ‘মেজদা, মেজদা’ বলে হুঙ্কার দিয়ে সেই আলোকিত ঘরটার দিকে প্রায় ছুটেই চললেন। তাঁর পেছনে যেতে-যেতে স্মৃতিবউদি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার মেজ ভাশুর, বিপ্রদাস মুন্সী। ওঁর জেঠতুতো দাদা।’

বিপ্লববাবুর পেছন-পেছন সেই আলো-জ্বলা ঘরটার দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের বাসিন্দাকে দেখার আগে ঘরটার চেহারা দেখেই আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। একটা ঘরের মধ্যে এত বই আর পত্রিকার স্তূপ আমি কোনো লাইব্রেরিতেও দেখিনি। চারটে দেয়াল জুড়ে কাঠের ব়্যাক এবং সেইসব ব়্যাকে ঠাসা বই তো রয়েছেই; তাছাড়াও মেঝের ওপরে বইয়ের স্তূপ, খাটের ওপরেও। সেই খাটেই যেটুকু জায়গা খালি আছে, তার মধ্যে কোনোরকমে পা গুঁটিয়ে, বালিশে হেলান দিয়ে বসে বই পড়ছিলেন এক দীর্ঘকায় ভদ্রলোক।

উনিই তাহলে বিপ্রদাসবাবু?

ভদ্রলোক নিশ্চয় ছ-ফুটের ওপরে লম্বা। তেমনই রোগা। বয়স নিশ্চয় ষাটের ওপরেই হবে। মাথাভর্তি কাগের বাসার মতন সাদা চুল। গালেও খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। চোখে মোটা কাচের চশমা। পরনে বড় ঘেরের সাদা পায়জামা আর একটা ঘিয়েরঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি, যার হাতাটা উনি কনুইয়ের ওপরে গুটিয়ে রেখেছেন।

বিপ্লববাবুকে ঘরে ঢুকতে দেখে তাঁর দাদা বইটাকে উপুড় করে বুকের ওপরে নামিয়ে রাখলেন। তারপর বিরক্তগলায় বললেন, ‘কী ব্যাপার? এত উত্তেজনা কীসের?’

বিপ্লববাবু তাঁর দাদার ওই শান্তভঙ্গির সামনে একটু হকচকিয়ে গেলেন বলে মনে হল। যে-তেজ নিয়ে তিনি এই অবধি এসেছিলেন, সেই তেজ হঠাৎই অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেল। নীচু গলাতেই বললেন, ‘মেজদা, তুমি ছাড়া এ আর কারুর কাজ নয়। প্লিজ, খাতাটা ফেরত দাও। নাহলে এই ভদ্রলোকদের সামনে আমি চূড়ান্ত অপদস্থ হব।’

‘খাতা? কীসের খাতা? আমি কেন তোর খাতা নিয়ে আসতে যাব?’

‘তা আমি কেমন করে বলব? কিন্তু যুক্তি বলছে, তুমি ছাড়া আর কেউ এই কাজ করতে পারে না।’

‘কীসের খাতা বলবি? যদিও আমি কোনো খাতাই নিইনি, তবুও যে-কোনো লিখিত কাগজের প্রতি আমার একটা স্বাভাবিক টান আছে। সেইজন্যেই জিগ্যেস করছি, সেখানে কী এমন মহামূল্যবান কথা লেখা ছিল?’

বিপ্লববাবু বললেন, ‘ইয়ে…মানে বাবার মন্ত্র লেখা খাতাটা।’

বিপ্রদাসবাবু আমাদের দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে হোঃ হোঃ করে বেশ খানিকক্ষণ হাসলেন। তারপর বললেন, ‘তুই জানিস, ছোটবেলা থেকেই আমি নাস্তিক। ইনফ্যাক্ট এখনো তোর একতলা থেকে যে রেগুলার ওই শাঁখ-ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে আসে, সেটা আমাকে পীড়া দেয়। সেই আমাকেই তুই ব্লেম করছিস মন্ত্রচোর বলে! হাউ ফানি! হাউ ইডিয়টিক অ্যাট দা সেম টাইম।’

তারপর আর একটিও কথা না বলে, নামিয়ে-রাখা বইটা আবার মুখের সামনে খুলে, সেটার পাতাতেই সমস্ত মনোযোগ নিবিষ্ট করলেন।

বিপ্লববাবু কিছুক্ষণ ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাঁর দাদার মুখের দিকে চেয়ে থেকে, তারপর এক ঝটকায় উল্টোদিকে ঘুরে দালান ধরে নিজের অংশের দিকে হাঁটা লাগালেন। তাঁর পেছন-পেছন স্মৃতিবউদি। আমরাও ওঁদেরই অনুসরণ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতেই পেছন থেকে ভারী-গলার ডাক ভেসে এল, ‘লিসন জেন্টলমেন।’

আবার বিপ্রদাসবাবুর দিকেই ফিরে তাকাতে হল। দেখলাম উনি বইটাকে আবার কোলের ওপরে নামিয়ে রেখেছেন এবং আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন। কী ঝকঝকে দুই চোখের মণি। মনে হল দুটো হিরেকুচি যেন জ্বলছে। উনি আবার বললেন, ‘দুটো কথা বলি শুনে যান। আসুন ভেতরে আসুন।’

উনি বিছানার ওপর থেকে কিছু বইখাতা একদিকে সরিয়ে আমাদের বললেন, ‘বসুন। এখানেই বসুন। ব্যাপারটা কী বলুন তো। বিলু খেপল কেন?’

বুঝলাম বিলু মানে বিপ্লববাবুর কথাই বলছেন। বুধোদা সংক্ষেপে সবটাই বলল। গুপ্তধনের সংকেত থেকে শুরু করে খাতা হারানো অবধি সবটাই। নিজেদের পরিচয়টাও দিতে ভুলল না।

উনি মন দিয়ে সব শুনলেন। তারপর বললেন, ‘সত্যিই বলছি, খাতা-টাতার ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। বিলুর যে মাথাটা এখন খারাপ হয়ে আছে সেটাও বুঝতে পারছি। একে বেচারার আর্থিক দুরবস্থা চলছে, তার ওপরে মোহরের এরকম একটা অসুখ। আমার যদি সঙ্গতি থাকত, আমি সাহায্য করতে পারতাম। কিন্তু আমার সেরকম অবস্থা নয়।’

কী আর বলব, আমরা চুপ করে বসে রইলাম। উনি হঠাৎ বিছানা থেকে নেমে পড়লেন। তারপর ঘরের কোনে রাখা একটা আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আপনি তো একজন অ্যান্টিক হান্টার। আপনাকে একটা জিনিস দেখাই। বলুন তো এটার মূল্য আজকের দিনে কীরকম হতে পারে?’ এই বলে উনি স্টিলের আলমারিটা খুলে, তার ভেতর থেকে একটা ফাইল বার করলেন। তারপর বুধোদার সামনে সেটা নামিয়ে রেখে বললেন, ‘খুলুন। খুব সাবধানে খুলুন। চারশো বছরের পুরোনো কাগজ, একেবারে পাঁপড়ভাজা হয়ে রয়েছে। হাত লাগলেই গুঁড়ো হয়ে যাবে।’

বুধোদা খুব সাবধানে ফাইলের ফ্ল্যাপগুলো সরিয়ে দিল। দেখা গেল ভেতরে সত্যিই একটা হলুদ বিবর্ণ কাগজ রয়েছে। আমি ঘাড় বাড়িয়ে কাগজটা দেখলাম। মনে হল একটা চিঠি। ভাষাটা ইংরিজি। তবে হরফের ছাঁদ এখনকার মতন নয়। প্রতিটি অক্ষরকে শুরুতে এবং শেষে কিছুটা করে লতিয়ে দেওয়ার এই রীতি বহু প্রাচীন।

বুধোদা মন দিয়ে কাগজটার দিকে তাকিয়েছিল। একটু বাদে নিজের মনেই বলল, ‘চিঠিটি লেখা হচ্ছে কোনো এক জে. আর. মুন্সীকে। তারিখ পাঁচই এপ্রিল ষোলোশো চৌত্রিশ। স্থান আগ্রা। সব মিলিয়ে এটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না যে চিঠির প্রাপক আপনাদের পূর্বপুরুষ জয়রাম মুন্সী, যিনি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের চিড়িয়াখানার পরিচালক ছিলেন। কিন্তু চিঠিটির প্রেরক কে? লিখেছেন কে?’

বিপ্রদাসবাবু বললেন, ‘দুটো ইনিশিয়াল আছে।’

‘দেখেছি। পি এবং এম। এর থেকে কিছু বোঝা অসম্ভব। চিঠির বিষয়টা পড়লে হয় তো বুঝতে পারব এর মূল্য। তবে পড়াটা এত সহজ হবে না। আর্কাইক ইংলিশ, পড়তে একটু সময় লাগবে। তার আগে একটা কথা বলুন। এই চিঠি আপনার কাছে এল কীভাবে?’

বিপ্রদাসবাবু বললেন, ‘আমার দাদু এবং বিপ্লবের দাদু ছিলেন দুই সহোদর ভাই। বুঝতেই পারছেন, পূর্বপুরুষদের বিষয়সম্পত্তির মতন তাঁদের চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, এই সবও একটা সময় দু-ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তার ফলে যেটা হয়েছে, একটা জিনিস হয়তো রয়ে গিয়েছে বিপ্লবের ঘরে কিন্তু তার সঙ্গে রিলেটেড কাগজটা রয়ে গেছে আমার কাছে। হতে পারে এটাও সেরকমই একটা কাগজ। উৎস তো সবই সেই জয়রাম মুন্সী। তার পরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আর নবাব বাদশাহদের কাছাকাছি পৌঁছনোর স্কোপ পেলেন কোথায়?’ এই বলে বিপ্রদাসবাবু কেমন যেন অর্থপূর্ণভাবে বুধোদার মুখের দিকে তাকালেন।

বুধোদা সেটা খেয়াল করল। বলল, ‘বিপ্লববাবু যে গুপ্তধনের কথা বলছেন, তার ক্ষেত্রেও কি এই কথা সত্যি? গুপ্তধনটা বাড়ির ওদিকে রয়ে গেছে আর আপনার কাছে থেকে গেছে তার কাগজ?’

বিপ্রদাসবাবু হ্যাঁ-না কোনোই উত্তর দিলেন না। ঠোঁটে কেমন যেন একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রেখে মাথার নীচে হাতদুটো ভাঁজ করে রেখে শুয়ে রইলেন।

বুধোদা কিছুক্ষণ ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সরাসরি জিগ্যেস করল, ‘এই কি সেই কাগজ?’

বিপ্রদাসবাবু এবারে মুখ খুললেন। বললেন, ‘গুপ্তধন কী, গুপ্তধনের প্রসঙ্গ আসছে কেন, তার কিছুই যখন বিলু নিজের মুখে আমাকে বলেনি, তখন আমিও আর এ নিয়ে একটি কথাও বলব না। ও আপনাদের ভাড়া করে নিয়ে এসেছে তো? সো ইট ইজ ইয়োর জব, আপনারাই গুপ্তধন খোঁজার কাজটা সেরে ফেলুন। আমার শুভেচ্ছা রইল।’

বুধোদা ব্যঙ্গটা গায়ে মাখল না। মুচকি হেসে বলল, ‘খাতাটা ফেরত পেলে হয়তো সে কাজে সফল হতাম। পাইনি যখন, আপনার শুভেচ্ছা আপাতত কাজে লাগছে না। যাই হোক, আপনার এই চিঠিটির অ্যান্টিক-ভ্যালু জানতে চাইছিলেন। বললামই তো, তার জন্যে চিঠিটা আমাকে পড়তে হবে এবং সেটা এখানে এই-মুহূর্তে সম্ভব নয়। পুরোনো টেক্সটের সঙ্গে মিলিয়ে অর্থোদ্ধার করতে হবে। তাই বলছি, আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে পাতাটা স্ক্যান করে নিয়ে যাই।’

বিপ্রদাসবাবু ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানালেন। বুধোদা নিজের স্মার্টফোনে পাতাটা স্ক্যান করে নিল। বিপ্রদাসবাবু বললেন, ‘একটু গোপনীয়তা রাখবেন। বুঝতেই পারছেন, আমাদের বাড়িটা এখন খুব অরক্ষিত এবং লোকালিটিটা এমন যে, কেউ আমাকে খুন করে গেলেও লোকের টের পেতে-পেতে দুটো দিন কেটে যাবে।’

বুধোদা বলল, ‘আমি একজন প্রফেসনাল, স্যার। আমাকে এ-কথা মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না।’

‘গুড। আচ্ছা, এবার আসুন। ও হ্যাঁ। যদি চিঠিটার মর্মোদ্ধার করতে পারেন, দয়া করে আমার সঙ্গে একটু যোগাযোগ করবেন। আমি অবশ্য ওটা কোনোদিনই বেচব না। তবে নিজের মনেই একটু গর্ব অনুভব করব, এই আর কী। আর আমি বাড়ি ছেড়ে বেরোই না, আমার ফোন-টোনও নেই। কাজেই যদি কিছু বলার থাকে, নেক্সট যেদিন বিলুর কাছে আসবেন সেদিন বলে গেলেই হবে।’

বিপ্রদাসবাবু আবার কোলের ওপর থেকে বইটা চোখের সামনে তুলে ধরে বুঝিয়ে দিলেন বাক্যালাপ খতম। আমি আর বুধোদা অন্ধকার দালান ধরে ফিরে গেলাম বিপ্লববাবুর অংশে।

বিপ্রদাসবাবুর ঘরের দিক থেকে ওদিকে যেতে গেলে বিপ্লববাবুর অফিস-ঘরটাই প্রথমে পড়ে। বুধোদাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, ‘বিপ্রদাসবাবুই খাতাটা নিয়ে গেছেন, তাই না? ওই চিঠি আর গুপ্তধনের সংকেত, দুটোকে একসঙ্গে পেলে উনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন। ওঁকে আর কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

বুধোদা কোনো উত্তর দিল না।

বললাম, ‘তাছাড়া, আর কার পক্ষেই বা খাতাটা নেওয়া সম্ভব?’

এবার বুধোদা বলল, ‘কেন? স্মৃতিবউদি। নীচে নেমে যাওয়ার আগে স্মৃতিবউদি নিজেই যদি ওগুলো লুকিয়ে রেখে গিয়ে থাকেন?’

আমি এতই অবাক হলাম যে বলবার কথা নয়। বললাম, ‘কী বলছ!’

বুধোদা বলল, ‘না, তুই বলছিলিস কিনা আর কার পক্ষেই বা খাতাটা নেওয়া সম্ভব, তাই একটা পসিবিলিটির কথা বললাম।’

আমি বললাম, ‘মানে! আরও পসিবিলিটি আছে নাকি?’

বুধোদা বলল, ‘আছে বইকি।’ তার পরেই এমন পা চালিয়ে বিপ্লববাবুর ঘরে ঢুকে পড়ল যে, আমি আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম না।

ও-ঘরে ঢুকে দেখি, বিপ্লববাবু আর বউদি দুজনেই বিধ্বস্ত অবস্থায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। বুধোদা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বলল, ‘বিপ্রদাসবাবুর সম্বন্ধে কিছু জানতে ইচ্ছে করছে।’

বিপ্লববাবুই উত্তরটা দিলেন। অপরাধীর মতন মাথা নীচু করে বললেন, ‘মেজদার সঙ্গে আজ এইমাত্র যে-ব্যবহারটা করে এলাম, তার জন্যে ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করবেন না। ও সাধক মানুষ…জ্ঞানতপস্বী। সেই একধরনের ছাত্রের কথা বলা হয় না, যারা জীবনে কখনো সেকেন্ড হয় না, ও ছিল তাই। প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিলজফির অধ্যাপক ছিল। কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছে। বিয়ে-থা করেনি। একাই থাকে। টান বলতে বই আর মোহর। দিনের মধ্যে দশবার উঠে আসে। আমাদের সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলে না। কিন্তু মোহরের বিছানার পাশে বসে অনেক গল্প করে যায়।’

বউদি পাশ থেকে বললেন, ‘বোধহয় মোহরের বইপড়ার নেশার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান।’

বিপ্লববাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সেই মানুষকেই আজ প্রকারান্তরে চোর বলে এলাম। কিন্তু কীই-বা করব বলুন, আমি আর স্মৃতি দুজনেই একতলায়। মোহর তো বিছানা থেকে নামতেই পারে না। তাহলে তো একমাত্র মেজদারই সুযোগ থাকে খাতাটা নিয়ে চলে যাওয়ার, তাই না?’

যে-প্রশ্ন একটু আগে আমি বুধোদাকে করেছিলাম, সেই একই প্রশ্ন। তবে বু্ধোদা আমাকে যা উত্তর দিয়েছিল, বিপ্লববাবুকে আর তেমন কোনো উত্তর দিল না। বিপ্রদাসবাবু যে ওকে একটা পুরোনো চিঠি নিয়ে খোঁজখবর করতে বলেছে, সেই প্রসঙ্গেও কিছু বলল না। বরং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। আপনাদের পারিবারিক ব্যাপারে আমরা আর কী বলব? যদি সেই গুপ্তধনের সঙ্কেত লেখা খাতা খুঁজে পান, আমাকে ফোন করবেন। এখন আমরা তাহলে চলি।’

স্মৃতিবউদি তাঁর স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার কি ওই মন্ত্র না ছড়া, তার কিছুই মনে নেই? ওদের বলতে পারবে না?’

বিপ্লববাবু দুঃখিতমুখে ঘাড় নাড়লেন। বললেন, ‘মুখস্থ করার চেষ্টাই করিনি। আবছাভাবে মনে পড়ছে মন্দির, কঙ্কাল এইসব নিয়ে কী যেন লেখা ছিল। কিন্তু তাতে তো কাজ হবে না।’

আমি আর বুধোদা পাখিবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। গলি দিয়ে বড়রাস্তার দিকে হাঁটতে-হাঁটতে শুনতে পেলাম বারান্দায় ওর দাঁড়ে বসে টুনি আপনমনে ‘করর কিট কিট, কিকির কিকির’ করে কীসব যেন বকে যাচ্ছে।

ভাবলাম, বেশ পাখিটা। উড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও উড়ে যায় না।

.

চার

সোমবার চাঁদনিচকের পাখিবাড়ি থেকে ফিরে আসার পর পাক্কা পাঁচদিন আর বুধোদার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। একেবারে রোববার সকালে বুধোদা ফোন করল, ‘পড়াশোনা সারা হয়েছে? তাহলে চলে আয়।’

‘আসছি’ বলেই ঝটপট জিন্‌স আর টি-শার্ট গলিয়ে বুধোদার বাড়ি, মানে হেমকুঞ্জের দিকে রওনা দিলাম। বেরোবার সময় মা বলল, ‘জলখাবার খেয়ে যাবি না?’

আমি বললাম, ‘কোন দুঃখে?’

মা মুচকি হেসে বলল, ‘তা ঠিক। বউদির হাতের রান্না, আমারই মনে হয় প্রতিদিন গিয়ে খেয়ে আসি।’

বউদি মানে বুধোদার মা, যাঁকে আমি ডাকি জ্যাঠাইমা বলে, আর মা-বাবা ডাকেন বউদি। বুধোদারা আমাদের প্রতিবেশী হলেও আত্মীয়ের থেকে বেশি।

ঘোরানো কাঠের সিঁড়ি—সিঁড়ি না বলে যেটাকে স্টেয়ারকেস বললেই মানায়—সেটা বেয়ে হেমকুঞ্জের দোতলায় উঠে গেলাম।

রবিবার মহারাজা কালেকশনস বন্ধ থাকে। এইদিনটা বুধোদার পড়াশোনা করার দিন। ওর দোতলার ঘরে ঢুকে দেখলাম, যথারীতি সেই বিশাল পালঙ্কটার ওপর বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে। তবে আজকে আর কোলের ওপরে ল্যাপটপ নেই। তার বদলে বেশ কিছু পুরোনো বই আর ম্যাগাজিন এদিকে-ওদিকে ছড়ানো রয়েছে। আমি বুধোদার মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললাম, ‘কী হয়েছে গো?’

বুধোদা যেমন জানলা দিয়ে বাইরে গঙ্গার দিকে তাকিয়েছিল, সেইভাবেই বলল, ‘শেফার্ডস পাই। আমি আর লোভ সামলাতে না পেরে খেয়ে ফেললাম। তোর জন্যেও আসবে।’

জানি ইচ্ছে করেই লেজে খেলাচ্ছে। তবু বললাম, ‘জলখাবারে কী হয়েছে, সেটা জানতে চাইনি বুধোদা। তুমি আমায় ডাকলে কেন সেটা জানতে চাইছি।’

বুধোদা বলল, ‘ওঃ, সেটা বলবি তো। যেটা জানানোর জন্যে তোকে ডাকলাম, সেটা হচ্ছে, বিপ্রদাসবাবুর সেই ইংরিজি চিঠির পাঠোদ্ধার করে ফেলেছি এবং প্রেরকের নামটাও জানতে পেরেছি। ব্যাপারটা খুব ইন্ট্রেস্টিং…মন দিয়ে শোন।

‘তোর মনে আছে নিশ্চয়ই, চিঠিটা লেখা হয়েছিল জয়রাম মুন্সীকে এবং চিঠির তারিখ ছিল পাঁচই এপ্রিল, ষোলোশো চৌত্রিশ। স্থান আগ্রা।

‘এবার আমাদের এই কাহিনির মধ্যে একটি নতুন চরিত্র প্রবেশ করবে। তার নাম পিটার মনডি। পিটার মনডি একজন ব্রিটিশ তরুণ। তিনি ১৬২৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কেরানির চাকরি নিয়ে ভারতবর্ষে আসেন। বয়স কম হলেও মানুষটি খুব সাধারণ ছিলেন না। তাঁর জ্ঞানপিপাসা, বিশেষত পশুপক্ষী নিয়ে কৌতূহল ছিল অসামান্য। আর একটা গুণ ছিল তাঁর। তিনি খুব অল্পকথায় যে কোনো জিনিসের ছবির মতন বর্ণনা দিতে পারতেন। নিয়মিত জার্নাল লেখার অভ্যেস ছিল মনডির।

‘১৬২৮ থেকে ১৬৩৪ সাল অবধি মনডি কোম্পানির চাকরিসূত্রে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরেছিলেন এবং সেই ভ্রমণপথে যা-যা দেখেছিলেন—দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, রাজ্যাভিষেক, মেলা, নাচগান, নানান জাতির নরনারী এবং তাদের জীবিকা, বিচিত্র সব পশুপাখি এবং গাছপালা—সবকিছুর বিবরণ তিনি তাঁর জার্নালে লিখে গিয়েছেন। অপটু হাতে বেশ কিছু ছবিও এঁকেছিলেন সেই জার্নালের পাতায়।

‘ফলে পরবর্তী কালে যখন পিটার মনডির সেই জার্নাল আবিষ্কৃত হল, তখন ঐতিহাসিকদের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। কারণ, এর আগে সেই সময়ের ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনের ছবি এভাবে আর কেউ লিখে রেখে যাননি।

‘পিটার মনডির জার্নালের বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ছিল জাহাঙ্গিরের চিড়িয়াখানার বিবরণ, আমাদের জয়রাম মুন্সী ছিলেন যেখানকার অধিকর্তা। মনডি সেই চিড়িয়াখানা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

‘ধরে নেওয়া যায়, চিড়িয়াখানায় সময় কাটানোর সময় সেই ব্রিটিশ তরুণ আর বাঙালি যুবকের আলাপ হয়েছিল। দুজনেই যেহেতু ছিলেন পশুপ্রেমী, তাই তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বও নিশ্চয় গড়ে উঠেছিল। মনে রাখিস, সেটা এমন একটা সময়, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘মহামান্য কোম্পানি বাহাদুর’ হয়ে ওঠেনি। ফরাসি এবং ডাচ বণিকেরা ওদের থেকে অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। ফলে কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যেও অহঙ্কার অত প্রবল ছিল না।

‘সে যাই হোক, চিঠির তারিখ এবং ওই চিঠিতে আগ্রার চিড়িয়াখানার উল্লেখ দেখে আমার মনে হয়েছিল এই চিঠির প্রেরক ‘পি এম’ পিটার মনডি হতে পারেন। তাই আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক ইতিহাসের অধ্যাপক, কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে যাঁর নিত্য যাতায়াত রয়েছে, তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম যদি পিটার মনডির অরিজিনাল জার্নালের কিছু পাতা আমাকে স্ক্যান করে পাঠাতে পারেন। তিনি গতকালই আমাকে তা পাঠিয়েছেন। মিলিয়ে দেখলাম, এই চিঠির হস্তাক্ষর আর পিটার মনডির জার্নালের হস্তাক্ষর একেবারে এক। অর্থাৎ…’

আমি বুধোদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ‘অর্থাৎ বিপ্রদাসবাবুর চিঠিটি লিখেছিলেন পিটার মনডি এবং তিনি ওটি লিখেছিলেন আগ্রার চিড়িয়াখানার অধিকর্তা জয়রাম মুন্সীকে। কিন্তু তিনি কী লিখেছিলেন, বুধোদা?’

বুধোদা বলল, ‘বলছি। তুই খেতে-খেতে শোন। শেফার্ডস পাই জিনিসটা ঠান্ডা হয়ে গেলে খেতে ভালো লাগে না।

‘একটা জিনিস তোকে মনে করিয়ে দিই—মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের মৃত্যু হয়েছিল ১৬২৭ সালে। অর্থাৎ চিঠিটি যখন লেখা হচ্ছে, তার সাতবছর আগে জাহাঙ্গিরের মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তী বাদশাহদের মধ্যে তাঁর মতন পশুপ্রেমী আর কেউ ছিলেন না। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, এই সাত বছরে জাহাঙ্গিরের চিড়িয়াখানাটির অনেক অবনতি হয়েছে।

‘চিঠিটা শুরু হচ্ছে মনডির এই মনোকষ্টের কথা দিয়ে। তিনি লিখছেন, বন্ধু! আমাদের চোখের সামনে বাদশাহি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে একের পর এক দুর্লভ পশুপাখির মৃত্যু ঘটছে। এমন সব বিদেশি পশুপাখি—ভারতবর্ষে যাদের আগে কখনো দেখা যায়নি। এর পরে আবার কবে দেখা যাবে তাও আমরা জানি না। সাইবেরিয়ান সারস, ইথিওপিয়ার জেব্রা, দুই কুঁজ-বিশিষ্ট ব্যাকট্রিয়ান উট এবং আশ্চর্য পাখি টার্কি…এরা একদিন তোমার চিড়িয়াখানা আলো করে ছিল। আজ আর নেই। বাকিদের অবস্থাও যে শোচনীয় তা তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।

‘তারপর মনডি লিখছেন, তোমার অনুরোধ মতন আমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রা কুঠির ডিরেক্টরকে দিয়ে বাদশা খুরমের কাছে চিড়িয়াখানার বেহাল দশার কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি কর্ণপাত করেননি। তিনি স্থাপত্যে যতটা আগ্রহী প্রাণীবিজ্ঞানে ততটা নন। এই অবস্থায় তোমার চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তের জন্য আমি তোমাকে দায়ী করতে পারি না। তুমি যদি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাও তাহলে আমার সঙ্গেই যেতে পারো। আমি সামনের মাসেই কলকাতায় রওনা হচ্ছি।

‘যাবার সময় আমি আমার নিজস্ব সংগ্রহ থেকে বাদশাহি চিড়িয়াখানায় যে পাখিগুলিকে দান করেছিলাম, সেগুলিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। আমি ইতোমধ্যেই এই মর্মে যথাস্থানে আবেদন করেছিলাম এবং তা মঞ্জুরও হয়ে গেছে। তুমি সঙ্গে থাকলে যেটা হবে, ভারতের এই তীব্র গরমে আমি পাখিগুলিকে জ্যান্ত অবস্থায় কলকাতা অবধি অন্তত ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব। ওদের পরিচর্যা, ওদের স্নান-খাওয়া, তোমার চেয়ে ভালো কে বোঝে?

‘এই হচ্ছে সহজ বাংলায় বিপ্রদাসবাবুর অধিকারে থাকা চিঠিটির বক্তব্য, এবং স্রেফ পিটার মনডির একটি অনাবিষ্কৃত চিঠি হিসেবেই এটার দাম এখন অ্যান্টিকের জগতে, বিশেষত ইওরোপের সংগ্রাহকদের কাছে, কয়েক লক্ষ টাকা। খবরটা বিপ্রদাসবাবুকে জানানো দরকার, যদিও তিনি বলেছিলেন যে, তিনি ওটা বিক্রি করতে আগ্রহী নন।

‘পরশু পনেরোই অগাস্ট, তোদের ছুটি। তুই কি একবার পাখিবাড়িতে যেতে পারবি?’

আমি বললাম, ‘শুধু এই কথাটুকু বলতে? বিপ্লববাবু তোমাকে ফোন করেন না?’

বুধোদা একটু বিরক্ত সুরে বলল, ‘প্রতিদিনই করেন। ফোন করে সেই হারানো খাতা নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন। আজকেও করবেন ঠিক।’

বললাম, ‘তাহলে ওনাকে দিয়েই বিপ্রদাসবাবুকে খবরটা পাঠিয়ে দাও না।’

এর উত্তরে বুধোদা যা বলল, শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল। বুধোদা বলল, ‘না, মানে দীপাও একবার মুন্সীদের বাড়ি যেতে চাইছিল। তুই যদি যাস তাহলে ওকেও নিয়ে যেতে পারিস, আর…’

আমি বললাম, ‘ওয়েট ওয়েট ওয়েট! দীপা মানে সপ্তদ্বীপা রায়? ও আবার পিকচারে এল কেমন করে?’

বুধোদা অবাক হয়ে বলল, ‘তুই মেয়েটার নাম শুনলেই রেগে যাস কেন বল তো রুবিক। ওর সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে সেটা তো আগে শুনবি। গতকালই দীপা আমাকে ফোন করেছিল। এমনিই, যেমন করে। আমি ওকে পাখিবাড়ির সমস্যার কথা বলছিলাম। খুব ডিটেলে কিছু বলিনি অবশ্য। তো, দীপা ওই মেয়েটার কথা শুনে, ওই যে বিপ্লববাবুর মেয়ে, মোহর, ওর অসুখের কথা শুনে ফোনের মধ্যেই কেঁদে ফেলল। বলল, আমি একবার মোহরকে দেখতে যাব বুধোদা, এক্ষুনি। কিন্তু ভেবে দেখ, দীপারও তো স্কুল আছে। পরশু ছুটির দিন ছাড়া ওই বা আর যাবে কী ভাবে?’

আমি আড়চোখে বুধোদার মুখটা ভালো করে লক্ষ করলাম। বুধোদা খুব ভালো করে জানে, মুখে যতই বিরক্তি দেখাই, সেই লোহুরঙের খুনি আতঙ্কের দিনগুলো থেকেই দীপা সম্বন্ধে আমার একটা দুর্বলতা রয়েছে। ওর ঝকঝকে চোখ, আঙটি-আঙটি চুল আর গজদন্তের হাসি, অদম্য সাহস আর অ্যাথলেটিক্সের স্কিল, এইসবই আমার ভীষণ ভালো লাগে।

কিন্তু আমার সঙ্গে দীপা যে আচরণটা করে, সেটা মোটেই বুঝতে পারি না। সামনা-সামনি দেখা হলে খুব একটা পাত্তা দেয় না, বরং লোকজনের সামনে হ্যাটা করতে পারলেই যেন খুশি হয়। এদিকে আবার তিনদিনের বেশি চারদিন ফোন না করলেই রেগেমেগে এমন ফোঁস-ফোঁস করতে থাকে যে বলবার কথা নয়।

আমাদের দেখা সাক্ষাৎ খুব কম হয়, কারণ, দীপার বাড়ি বাগবাজারে। কী জানি, দীপার এই মুন্সীবাড়ি যাবার আগ্রহের পেছনে আমিও একটা কারণ কিনা। হতেই পারে, কিন্তু বুধোদা কি সেটা বুঝেছে?

বুধোদার কথা শুনে তেমন মনে হল না অবশ্য। ও একটু দুঃখিত হয়েই যেন বলল, ‘তোর অসুবিধে থাকলে ছেড়ে দে তাহলে। আমিই নাহয় পরে ওকে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে আসব।’

মহা বিপদেই পড়া গেল দেখছি। তাড়াতাড়ি বললাম, ‘না না। অসুবিধে কীসের? তবে ওর কাছে এইসব গুপ্তধন-টনের কথা বলা…তোমার মনে আছে তো, বিপ্রদাসবাবু একটু গোপনীয়তা রাখতে বলেছিলেন।’

বুধোদা তাই শুনে বলল, ‘দীপা তো ভেরি মাচ আমাদের টিমের মেম্বার। ওকে কিছু বললে ও সেটা গোপনই রাখবে। আচ্ছা, তাহলে ওই কথাই রইল। পরশু যাবার পথে তোকে আর দীপাকে আমি গাড়িতে তুলে নেব এবং পাখিবাড়ির যতটা কাছে পারি নামিয়ে দিয়ে যাব। তোদের ওখানকার কাজ শেষ হলে, তোরা চাঁদনিচক স্টেশন থেকে মেট্রো ধরে আমার শো-রুমে চলে আসবি। আমি আবার ফেরার পথে তোদের নামিয়ে দিয়ে ফিরব।

‘মণিদীপা কাকিমা আর সুদীপ কাকুকে সেরকমই বলে দিচ্ছি।’

মণিদীপা কাকিমা আর সুদীপ কাকু হচ্ছেন সপ্তদ্বীপার বাবা-মা। ওঁরা দুজনেও আমাকে আর বুধোদাকে খুব ভালোবাসেন, সেই অ্যান্টিক আতঙ্কের দিনগুলো থেকেই।

বুধোদা বলল, ‘আর শোন। দীপা মোহরের সঙ্গে গল্প করে করুক, তুই কিন্তু বিপ্রদাসবাবুকে চিঠিটার ব্যাপারে যা-যা বললাম সব গুছিয়ে বলবি। আর তার থেকেও ইম্পর্ট্যান্ট…’—এই অবধি বলেই বুধোদা কেমন যেন কথার খেই হারিয়ে চুপ করে গেল।

আমি বললাম, ‘তার চেয়েও ইম্পর্ট্যান্ট কী, বুধোদা?’

বুধোদা বলল, ‘তুই বিপ্রদাসবাবুর প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনবি। আমি সেদিনের সামান্য পরিচয়ে যা বুঝেছি, বিপ্লববাবু আর বিপ্রদাসবাবুর মধ্যে অনেক তফাত। বিপ্রদাসবাবু অসম্ভব শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান। আমার কেবলই মনে হচ্ছে, এই গুপ্তধনের ব্যাপারে উনি ইতোমধ্যেই অনেক কিছু জানেন কিংবা আন্দাজ করেছেন।’

জিগ্যেস করলাম, ‘কেমন করে বুঝলে?’

বুধোদা বলল, ‘সেদিন উনি ইচ্ছে করেই আমাদের সামনে তেমন কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মনে করে দেখ, উনি বলেছিলেন, পূর্বপুরুষদের বিষয়সম্পত্তির মতন তাঁদের চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, এই সবও একটা সময় দু-ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তার ফলে একটা জিনিস হয়তো রয়ে গিয়েছে বিপ্লববাবুর ঘরে কিন্তু তার সঙ্গে রিলেটেড কাগজটা রয়ে গেছে বিপ্রদাসবাবুর কাছে। উনি এরকম একটা হিন্টস দিয়েছিলেন যে, এই চিঠিটার মধ্যেই হয়তো গুপ্তধনের নেচারটার কথাও বলা রয়েছে।

‘ওঁর আরেকটা কথাও খুব দামি, বুঝলি রুবিক। আমার মনে আছে, উনি বলেছিলেন, উৎস তো সবই সেই জয়রাম মুন্সী। তার পরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আর নবাব বাদশাহদের কাছাকাছি পৌঁছনোর স্কোপ পেলেন কোথায়? ঠিক কথা…খাঁটি কথা। আর ভেবে দেখ, এই চিঠি ঠিক তখনই লেখা যখন জয়রাম মুন্সী আগ্রা ছেড়ে, বাদশাহি দৌলতের সংস্পর্শ ছেড়ে বাংলায় ফিরে আসছেন। কী নিয়ে আসছেন তিনি সঙ্গে? কোন সম্পদ, যা পরবর্তীকালে মুন্সীবাড়ির গুপ্তধনের কাহিনির জন্ম দেবে?

‘সেইজন্যেই বলছি, আমি তোর মুখ দিয়ে যা বলে পাঠাচ্ছি, সেটা অত ইম্পর্ট্যান্ট নয়। হয়তো উনি অলরেডি জানেন যে, চিঠিটার প্রেরক পিটার মনডি; তাও আমার দৌড় মাপবার জন্যে এই খেলাটা খেললেন। এবার যখন দেখবেন যে, আমার কিছুটা বিদ্যেবুদ্ধি রয়েছে, তখন আরও কিছু হিন্টস উনি দিতে পারেন। মনে রাখিস, উনি মোহরকে ভালোবাসেন এবং জানেন এই গুপ্তধনটা পাওয়া গেলে মোহর বেঁচে যাবে। কাজেই তুই বিপ্রদাসবাবুর কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনিস, রুবিক।’

.

প্ল্যান মতন পনেরোই অগাস্ট সকাল ন’টা নাগাদ আমি আর বুধোদা উত্তরপাড়া থেকে রওনা হলাম। বাগবাজার থেকে সপ্তদ্বীপা রায় খুব সেজেগুজে আমাদের গাড়িতে উঠে পড়লেন। পেছনের সিটে আমার পাশে বসেই কনুইয়ের নীচে একটা জোরালো চিমটি কেটে বলল, ‘মুখটা অমন পাঁপড়ভাজার মতন করে রেখেছ কেন?’ আমি বললাম, ‘তুমিই বা মুখটা অমন ছাইমাখানো মাগুরমাছের মতন করে বেরিয়েছ কেন?’ তাতে বুধোদা ড্রাইভারের সিট থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘দুটোকেই এখানে নামিয়ে দেব; বাকি রাস্তাটা বাস ধরে যাবি।’

যাই হোক, বুধোদা গনেশচন্দ্র অ্যাভেনিউয়ে আমাদের নাবিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার পরে আমি আর রিকশা নিলাম না। রাস্তা যখন চেনাই হয়ে গেছে, তখন আর রিকশা নিয়ে লাভ কী? দুজনে গলি ধরে হাঁটতে শুরু করলাম এবং কিছুটা যাওয়ার পর চারদিকে তাকিয়ে দীপা আমার হাতটা মুঠির মধ্যে চেপে ধরে চট করে একবার নিজের গালে বুলিয়ে নিল। মেয়েটাকে বোঝা সত্যিই মুশকিল।

মুন্সীবাড়িতে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগে বিপ্লববাবুর ফোন পেলাম। উনি খুব অ্যাপোলজি-ট্যাপোলজি চেয়ে বললেন, একটা জরুরি কাজে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে। তবে স্মৃতিবউদি আর মোহর বাড়িতেই আছে। বিপ্রদাসবাবু তো আছেনই। কাজেই আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। অসুবিধে কিছু হলও না সত্যি। বরং স্মৃতিবৌদি যেভাবে আমাদের পরম সমাদরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন তাতে মন ভরে গেল।

কিছুক্ষণ ওঁর সঙ্গে কথা বলে দীপা বলল, ‘আমি তাহলে মোহরের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।’ বউদি বললেন, ‘যাও না। ও তো সকাল থেকে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে বলে সাঙ্ঘাতিক একসাইটেড হয়ে বসে আছে।’ তাই শুনে আমিও দীপার সঙ্গে ওই ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিলাম, কিন্তু দীপা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘দুজন মহিলার আলাপের মধ্যে যে একজন বেটাছেলেকে বসে থাকতে নেই, সেটাও কি তোমাকে কেউ বলে দেয়নি?’

আমি তো শুনে হা। দুজন মহিলা! একজন পড়ে ক্লাস নাইনে আর একজন যদি স্কুলে যেতে পারত তাহলে ক্লাস সিক্সে উঠত। যাই হোক, এই কথার পরে তো আর ওর সঙ্গে যাওয়া যায় না। তাই স্মৃতিবউদিকে বললাম, ‘আমি তাহলে ততক্ষণ একটু জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আসি।’ উনি বললেন, ‘যাও, তবে বেশি দেরি কোরো না। আমি অনলাইনে মোচার চপের অর্ডার দিয়েছি, এক্ষুনি এসে যাবে।’

না, বেশি দেরি করিনি। দেরি করার উপায়ও ছিল না, কারণ, বিপ্রদাসবাবুর ঘরে গিয়ে দেখলাম উনি স্নানে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমাকে দেখে মাথায় নারকোল তেল রগড়াতে-রগড়াতেই বললেন, ‘কী খবর মিস্টার মাল্যবান? দাদা কী বললেন?’

বললাম, ‘বুধোদা বলেছে ওটা পিটার মনডির চিঠি আর ওটার দাম বেশ কয়েক লক্ষ টাকা।’

শুনে উনি একটুও চমকালেন না। কে পিটার মনডি, কোথায় তাঁর নিবাস, এসব নিয়েও একটি কথা বললেন না। বরং ঠোঁটের কোণে এমন একটা হাসি ফুটে উঠল যে, আমি নিশ্চিত হলাম বুধোদা যা বলেছিল তা ঠিক। উনি চিঠিটার অরিজিন সম্বন্ধে সবটাই জানেন।

বুধোদা বলেনি, তবু আমি ওঁকে একটা প্রশ্ন করেই ফেললাম। না করে থাকতে পারলাম না। বললাম, ‘আপনার কী মনে হয় এই চিঠিটার মধ্যেই কোথাও গুপ্তধনের প্রসঙ্গ রয়েছে?’

প্রশ্নটা শুনেই ওঁর সেই হিরেকুচির মতন উজ্জ্বল চোখদুটো আবার ঝিলিক দিয়ে উঠল। বললেন, ‘বোধিসত্ত্ববাবু তোমাকে কী বলেছেন মাল্যবান? বলেছেন তো, আমি কী বলি সেগুলো মন দিয়ে শুনে যেতে। তোমাকে তো ফিরে গিয়ে মনে করে কথাগুলো বলতে হবে, তাই না?’

কথাগুলো শুনে হয়তো আমার রেগে যাওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু রাগতে পারলাম না। কারণ, বুঝতে পারছিলাম উনি কোনো অদ্ভুত উপায়ে আমার মনের ভেতরটা পড়তে পারছেন। তাই কিছু না বলে শুকনো মুখে ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম, উনি যা বলছেন তা ঠিক।

উনি বারান্দার দড়ি থেকে একটা গামছা তুলে নিয়ে আবার ঘরে ঢুকলেন। বললেন, কোনো জিনিস মনে রাখতে গেলে সবচেয়ে সহজ উপায় কী জানো? সেটাকে ছন্দে গেঁথে ফেলা। যে কারণে সারা পৃথিবীর যত মহাকাব্য সব ছন্দে লেখা হয়েছিল। তো, আমার যা মনে হচ্ছে সেটাও তোমাকে ছন্দেই বলে ফেলি, কেমন? তাহলে বাড়ি ফিরে তোমার রিকালেক্ট করতে সুবিধে হবে।’

আমি আবারও ঘাড় হেলালাম।

উনি একটু থেমে থেমে, ছাদের দিকে তাকিয়ে আবৃত্তি করার মতন করে বলে চললেন,

.

‘শিং দাঁত নখ শুঁড়
পালকের নানাবিধ রূপ তো
এঁকে গেছে মনসুর
তারই মাঝে কেহ অবলুপ্ত।

.

লুপ্ত কি পুরোপুরি?

কিছুটা রয়েছে বলে শুনছি

নিয়ে এসেছিল নাকি

চাঁদনির জয়রাম মুন্সী।’

তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘মনে থাকবে তো? না মনে থাকলে এখনই তোমার ওই মোবাইলে লিখেও নিতে পারো। যাও, এবার আমি চান করতে ঢুকি।’

আমি সত্যিই ওঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আর রিস্ক নিলাম না…মোবাইলের ওয়ার্ড-ফাইলে ছড়াটা লিখে নিলাম। যদিও লিখতে-লিখতেই একবার মনে হল এটা বিশুদ্ধ ইয়ার্কি ছাড়া আর কিছু নয়।

তারপর বিপ্লববাবুর অংশে গিয়ে দেখি সেখানে ইতোমধ্যে ক্লাস নাইন আর ক্লাস সিক্সের সেই দুই মহিলার গলার আওয়াজে সিলিং থেকে চুনবালি খসে পড়ছে। ওদের উচ্চস্বরে গল্পগাছার সঙ্গেই মিশে গিয়েছিল টুনির কানে তালা-লাগানো ডাক। সেও দেখি বাড়িতে নতুন লোক দেখে ভারি উত্তেজিত হয়ে, কিছুটা পায়চারি করে, কিছুটা উড়ে, মহা উল্লাস প্রকাশ করে বেড়াচ্ছে।

মোহরের ঘরের দরজার পর্দা সরিয়ে বললাম, ‘আসতে পারি?’

মোহর বিছানায় শুয়েই বলল, ‘প্লিজ এসো রুবিকদা।’ স্মৃতিবউদি ওর বিছানার মাথার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনিও বললেন, ‘এসো রুবিক। তোমার জন্যেই আমরা অপেক্ষা করছি। নাও মোচার চপটা খেয়ে বলো তো, কেমন বানিয়েছে!’

খেতেই খেতেই মোহরের গল্পের বইয়ের কালেকশন দেখলাম। সমস্ত বই-ই ওর হাতের নাগালে, বিছানার দু-পাশে দুটো টেবিলে সুন্দর করে সাজানো থাকে, যাতে ও বেশি নড়াচড়া না করেও যে-কোনো বইয়ের নাগাল পেয়ে যায়। একটা টিনটিনের কমিকস দেখিয়ে ও বলল, ‘এইটা আজ দীপাদি আমাকে উপহার দিয়েছে।’

আরও কিছুক্ষণ গল্পটল্প করে আমি আর দীপা উঠলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে স্মৃতিবউদি ফিসফিস করে আমাকে জিগ্যেস করলেন, ‘মেজদা কি খাতাটার ব্যাপারে কিছু বললেন? কীরকম বিপদে পড়লাম বলো তো। উনি ছাড়া আর কেউ তো নিতেই পারে না ওগুলো।’

আমার মুখ দিয়ে আরেকটু হলে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘বুধোদার ধারণা, আপনিও নিতে পারেন।’ সে-কথা না বলে, বললাম, ‘না বউদি। আমি অবশ্য ওঁকে কিছু জিগ্যেসও করিনি।’

পূর্ব পরিকল্পনা মতোই আমি আর দীপা চাঁদনিচক মেট্রো স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগালাম। যেতে-যেতে ওকে জিগ্যেস করলাম, ‘কেমন লাগল মোহরকে?’

দীপা বলল, ‘ভালো, ভীষণ ভালো। ও যে কতটা ভালো মেয়ে, সেটা তুমি এখনই পুরোটা বুঝতে পারবে না। পরে বুঝবে।’

আমি বললাম, ‘তা হতে পারে। আমি ওকে কতটাই বা দেখেছি। কিন্তু আমি সারাক্ষণ প্রার্থনা করছি যাতে ও সেরে ওঠে, আর সেইজন্যেই প্রার্থনা করছি…।’

আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দীপা বলল, ‘যাতে গুপ্তধনটা পাওয়া যায়, তাই তো? পেয়ে যাবে। চিন্তা কোরো না। বুধোদা আছে না? বুধোদার অসাধ্য কিছু নেই।’

আমি ওর মতন অতটা আশাবাদী হতে পারছিলাম না। মুডটাকে একটু চাগিয়ে তুলতেই বোধহয় দীপা ওর ফোনটা আমার চোখের সামনে তুলে ধরল। এমনিতে এখনো ওকে মণিদীপা কাকিমা বা সুদীপকাকু সারাক্ষণ হাতে মোবাইল নিয়ে ঘুরতে দেন না। আজকে বাইরে বেরিয়েছে বলেই বোধহয় একটা হাতে পেয়েছে।

স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আমার মনখারাপ হয়ে গেল। দেখলাম, ছবির মধ্যে দীপা বিছানার এককোণে বসে দু-হাত দিয়ে মোহরকে আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে। আর অন্যদিক থেকে একইভাবে নিজের একটা বিশাল রঙচঙে ডানা দিয়ে মোহরকে জড়িয়ে রেখেছে টুনি। মনে মনে বললাম এত ভালোবাসার বাঁধন ছাড়িয়ে মৃত্যু কি কাউকে কেড়ে নিতে পারে?

.

পাঁচ

কে জানত তার একটু বাদেই জীবনের সেরা চমকটা আমার জন্যে অপেক্ষা করছে এবং সেই চমকটা খাব আমার খুব চেনা পরিবেশে, চেনা-মানুষদের উপস্থিতিতে!

চেনা-পরিবেশ বলতে মহারাজা কালেকশনসের সেই কাঠের প্যানেল দেওয়া ঘর, যার চতুর্দিকে ছোট বড় নানান অ্যান্টিক সামগ্রীর সম্ভার। আমি আর দীপা যখন ওখানে ঢুকলাম তখন ঘড়িতে দুপুর একটা। বাইরের গুমোট গরম থেকে শোরুমের ভেতরের ঠান্ডায় ঢুকে খুব আরাম লাগছিল। শোরুমের ভেতরে বাইরের লোকজন ছিল না। আমি একটা বেতের সোফার ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম। উল্টোদিকে একটা চেয়ারের ওপরে ওর ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে রেখে দীপা চেনটা খুলল।

বুধোদা দীপার পাশে এসেই দাঁড়িয়েছিল। মুখে কেমন যেন উত্তেজনা। দীপা কিছু বলার আগেই বুধোদা ওর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘কই দেখি। এটাই সেই খাতা তো?’

দীপা বলল, ‘আমি খুঁটিয়ে দেখবার সুযোগ পাইনি বুধোদা। কাকিমা যে-কোনো মুহূর্তে ঘরে ঢুকে পড়তে পারতেন। তুমি দেখে নাও।’ এই বলে ব্যাকপ্যাকে হাত ঢুকিয়ে একটা পুরোনো খাতা বার করে বুধোদার হাতে দিল।

কেউ বলে দেয়নি, তবু আমার সিক্সথ সেন্স বলল, এই সেই হারিয়ে যাওয়া মন্ত্রলেখা খাতা, যার শেষ পাতায় রয়েছে গুপ্তধনের সঙ্কেত। আমিও প্রায় লাফ দিয়েই ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

বুধোদা ততক্ষণে খাতাটা হাতে নিয়ে একটা হ্যাংগিং লাইটের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব দ্রুত পাতাগুলো উল্টে একবার দেখে নিতেই ওর মুখ একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘দারুণ দারুণ। কেমন করে মেয়েটাকে বোঝালি রে দীপা?’

তারপরেই বুধোদার নজর পড়ল আমার দিকে। বলল, ‘রুবিক, বুঝতে পারছি তুই অবাক হয়েছিস। দাঁড়া সবটাই বলছি। তবে খালিমুখে নয়। এগুলোর সদ্‌গতি করতে করতে’—এই বলে বুধোদা শোরুমের কোনায় রাখা ছোট মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ভেতর থেকে শিবুজির স্যান্ডউইচের তিনটে প্যাকেট বার করে নিয়ে এল। সঙ্গে পেপার ন্যাপকিন, সসের প্যাকেট সবই ছিল। বেশ যত্ন করে সেন্টার টেবিলের ওপরে সব সাজিয়ে দিয়ে বলল, ‘নে, তোরা খেতে শুরু কর। তার মধ্যে আমি রুবিককে ছোট করে খাতা-উদ্ধারের গল্পটা বলে দিই। তারপরে তিনজনে গুপ্তধনের সংকেত নিয়ে বসা যাবে।’

বুধোদা একপিস স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে বলল, ‘মুন্সীবাড়িতে তিনজন অ্যাডাল্ট মেম্বার—বিপ্লববাবু, স্মৃতিবউদি আর বিপ্রদাসবাবু। এর মধ্যে বিপ্লববাবু আর স্মৃতিবউদি নিজেদের অধিকারে থাকা খাতা নিজেরাই কেন লুকিয়ে রাখবেন তার কোনো যুক্তি খুঁজে পাইনি। আর সকলের মতন আমারও প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল যে, বিপ্রদাসবাবুই খাতাটা সরিয়েছেন। কিন্তু পরে ওঁর নিজের ভাই, অর্থাৎ বিপ্লববাবুই সেই তত্ত্ব বিশ্বাস করতে চাইছিলেন না। উনি জানেন ওঁর দাদা অনেস্ট, জানেন দাদা মোহরকে অসম্ভব স্নেহ করেন এবং এও জানেন যে মোহরের চিকিৎসার জন্যে গুপ্তধনটা খুঁজে পেলে বিপ্রদাসবাবুও খুশি হন।

‘তবু তোরা কেউই বিপ্রদাসবাবুকে সন্দেহের আওতা থেকে বাদ দিতে পারছিলিস না, একটাই কারণে। যেহেতু আর কারুর খাতাটা চুরি করার সুযোগ ছিল না, তাই।

‘কিন্তু সত্যিই কি ছিল না? তোরা বলবি, না। কারণ বাড়ির চতুর্থ বাসিন্দা, মোহরের কোমর থেকে নীচের অংশটা অসাড়। যে-মেয়ে বিছানা থেকেই নামতে পারে না, সে কেমন করে দুটো ঘর পেরিয়ে গিয়ে বিপ্লববাবুর অফিসঘরের টেবিল থেকে খাতা চুরি করে আনবে?

‘ঠিক। কিন্তু ভাব তো, মোহরের যদি এমন একজন সহযোগী থাকে যে ওর কথায় বিপ্লববাবুর টেবিল থেকে খাতাটা নিয়ে এসে ওর হাতে দিতে পারে!’

বুধোদার এই কথাটা শোনার সঙ্গেসঙ্গেই আমি নিজের ওপর রাগে নিজের হাঁটুতেই একটা ঘুষি মারলাম। ইস। এই সহজ জিনিসটা মাথায় আসেনি কেন?

বুধোদা এক-সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুবিক, তুইও এবার বুঝতে পেরেছিস। হ্যাঁ, সহযোগীটির নাম টুনি। ওদের পোষা ম্যাকাও-পাখি। আমরা নিজের চোখে দেখেছি, ওকে ছবি দেখালে ও ফ্রিজ খুলে কীভাবে ক্যাডবেরি বার করে এনেছিল। তার তুলনায় টেবিলের ওপর থেকে একটা খাতা নিয়ে আসা তো খুবই সহজ। সেদিন আমরা প্রায় পঁয়তাল্লিশ-মিনিট নীচের ঘরে বসেছিলাম। কাজেই টুনিকে দিয়ে ওই অপারেশনটা করানোর জন্যে মোহর অনেকটাই সময় পেয়েছিল।

‘এই পুরো ধারণাটার কথাই আমি দীপাকে ফোনে বলেছিলাম। বলার পর ওকে বলেছিলাম আজ মোহরের কাছ থেকে খাতাটা উদ্ধার করে আনতে হবে এবং সেটাও সবার অগোচরে। এবার আমরা দীপার কাছে শুনব সেই কাজটা ও কেমন করে করল।’

বুধোদা থামতেই আমি বললাম, ‘তা, এগুলো আমাকে আগে বললে কী হতো? আমি কি সবাইকে বলে বেড়াতাম?’

বুধোদা নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘তোর অভিমান হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু অভিমান করিস না ভাই। তোকে বলিনি তার একটাই কারণ। তুই ছেলেটা ভীষণ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড, সৎ। অভিনয় জানিস না। যে-কোনো মনের ভাব পরিষ্কার তোর মুখে ফুটে ওঠে। আজ যদি তুই সমস্তটা জেনে মুন্সীবাড়িতে ঢুকতিস, তাহলে মোহরের সঙ্গে ফ্রিলি কথা বলতে পারতিস? তুই নিজেই বল। আর তাছাড়া আরেকটা কারণ রয়েছে। এটা এমন একটা কাজ, যেখানে তোর কোনো ভূমিকাই থাকা সম্ভব ছিল না। এখানে একজন মেয়েরই প্রয়োজন ছিল, অর্থাৎ এটা দীপার একার কাজ ছিল।’

অস্বীকার করব না, আমার বেশ অভিমান হয়েছিল। কিন্তু বুধোদার কথাগুলো শোনার পরে আর সেই অভিমান রইল না। বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। আন্ডারস্টুড। দীপা তুমি বলো, তারপর কী হল।’

সপ্তদ্বীপা টিস্যুপেপারে ঠোঁট আর আঙুলের ডগা থেকে স্যান্ডুইচের তেল মুছতে-মুছতে বলল, ‘খুব বেশি কিছু বলার নেই। বউদি খাবারের ডেলিভারি নেওয়া, চা বানানো এইসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেতেই আমি মোহরকে সরাসরি বললাম, খাতাটা লুকিয়ে রেখেছ কেন? ইনটেলিজেন্ট মেয়ে তো, তাই অস্বীকার করল না।

‘কিন্তু লুকিয়ে রাখার কারণ হিসেবে ও যেটা বলল, সেটা শুনে আমিই কিছুক্ষণ কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ও বলল, দীপাদি, আমি বাবার মুখে অনেকবার শুনেছি, দাদু মারা যাবার আগে কী বলে গিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, এই গুপ্তধনের গায়ে সারা মানবজাতির পাপ লেগে রয়েছে। হ্যাঁ, উনি এটাও বলেছিলেন যে, যদি বংশলোপের মতন পরিস্থিতি আসে তাহলে ওটাতে হাত দিতে, কিন্তু আমি সেটা মানতে পারছি না। আমার জীবনটা এমন কিছু দামি নয়, যার জন্যে এমন একটা জিনিসকে খুঁজে বার করতে হবে। তাই আমি খাতাটা লুকিয়ে রেখেছি।

‘ওর কথা শুনে প্রথমে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বললাম, দেখো মোহর, তুমি তো বুধোদার অ্যান্টিক-হান্টিং-এর সমস্ত ঘটনাই জানো। তোমার কি কখনো মনে হয়েছে যে, যদি সত্যিই সেই গুপ্তধনের গায়ে পাপের চিহ্ন লেগে থাকে তাহলে বোধিসত্ত্ব মজুমদার নিজেই সেটাকে জনসমক্ষে আনবেন? কখনোই না, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তখন ও ওর বইয়ের স্তূপের ভেতর থেকে খাতাটা বার করে দিল। আমিও সেটাকে ব্যাগে পুরে নিয়ে বললাম, তোমাকে টাইম-টু-টাইম জানাব, আমরা কোনদিকে প্রগ্রেস করছি। ব্যস, এইটুকুই আমার গল্প।’

বুধোদা ওর কথা শুনতে-শুনতেই খাতার পাতা উল্টে চলেছিল। কালো এবং নীল কালিতে পাতার পর পাতা নানারকম মন্ত্র লেখা। আমি আর দীপা বুধোদার দুদিকে ঘেঁষে বসে খাতার দিকে মুখ নামিয়ে আনলাম। বুধোদাও সামনের পাতাগুলো উল্টে চটপট চলে গেল লাল-কালি দিয়ে লেখা সেই গুপ্তধনের সঙ্কেতে।

তারপর বলল, ‘এক কাজ করি আয়। আমরা যে যার ফোনে এই পৃষ্ঠাটার ছবি তুলে নিই। তাহলে দেখতে সুবিধে হবে।’

আইডিয়াটা মন্দ নয়। আমরা তখনই পাতাটার ছবি তুলে নিলাম। তারপর বুধোদা খাতাটাকে ওর শোরুমের আয়রন-চেস্টের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে এল।

এবার আমরা তিনজনেই যে যার ফোনের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। পরের অন্তত পাঁচমিনিট মহারাজা কালেকশনসের ভেতরে আর কোনো শব্দ নেই। তারপরে একসঙ্গে তিনটে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে এল। আমরা ফোন নামিয়ে রেখে ঠিক সেইভাবে এ ওর মুখের দিকে তাকালাম, যেভাবে পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন এলে ক্লাসমেটেরা এ ওর দিকে হতাশ-দৃষ্টিতে তাকায়।

সত্যিকথা বলতে কী এর চেয়ে দুর্বোধ্য কোনো প্রশ্ন এর আগে আমি তো পাইনি বটেই, মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল দীপা কিংবা বুধোদাও পায়নি।

আমি আবার ফোনের দিকে তাকালাম। এ কেমন হেঁয়ালি! এ কেমন ছড়া! অর্থ কী এটার?

.

মন্দিরে কঙ্কালপক্ষী মহাকাল দ্বাররক্ষী
দুখানি ডোমের মাথা নামগান করে
প্রতি পূর্ণ ঘটিকায় সেই দরজা খুলে যায়
পক্ষীটি ভরায় দিক নিজ কুহুস্বরে।
যে ছিল সে নেই আর মানুষের বুভুক্ষার
বলি হয়ে চলে গেছে কবে পরপার
তবু দৈব দুর্বিপাকে স্মরণ করিও তাকে
কঙ্কাল আসিবে নেমে, করিবে উদ্ধার।

.

আমাদের মধ্যে দীপাই প্রথম নিস্তব্ধতা ভেঙে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে উঠল, ‘ও বুধোদা। গুপ্তধনের সঙ্কেত কোথায়? এ তো খাঁটি তান্ত্রিক মন্ত্র। ডোমের মাথা, কঙ্কালের জেগে ওঠা। আমার কিন্তু সিরিয়াসলি ভয় করছে। তুমি এই কেস ছেড়ে দাও।’

আমি দীপাকে বললাম, ‘এক্ষুনি তোমার সঙ্গে একমত হয়ে যেতাম, শুধু যদি ওই শেষ চারটে লাইনে বিপ্লববাবুর বাবার মুখের কথার অবিকল প্রতিধ্বনি না থাকত।’

দীপা বলল, ‘তাই! কী বলেছিলেন বিপ্লববাবুর বাবা? আমি জানি না।’

বললাম, ‘এটা জানো তো যে, এই হেঁয়ালি বিপ্লববাবুর বাবাই লিখে গিয়েছিলেন। তাছাড়াও উনি মৃত্যুর ঠিক আগে বিপ্লববাবুকে কয়েকটা কথা বলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সেই গুপ্তধনে লেগে আছে সারা মানবজাতির পাপ। তাই, শুধু যদি কখনো দেখিস আমার বংশলোপ হতে চলেছে, একমাত্র তখনই সেই গুপ্তধনে হাত দিস। এবার হেঁয়ালির শেষ চারটে লাইন মিলিয়ে দেখো। একদম একই সুর নয়? সেইজন্যেই আমি সিওর এটা গুপ্তধনের হদিশ ছাড়া আর কিছু নয়।’

বুধোদা এতক্ষণ মন দিয়ে আমাদের কথা শুনছিল। এবার বলল, ‘শাবাশ রুবিক। তুই একেবারে মোক্ষম একটা পয়েন্ট খেয়াল করেছিস। মন্ত্র-টন্ত্র নয়, এটা ধাঁধাই বটে। এবং এটাও নিশ্চিত যে, সত্যিই একটা দামি কোনো জিনিসের হদিশ ওনার কাছে ছিল, নাহলে ডেথবেডের যন্ত্রণার মধ্যে ওইভাবে ছেলেকে ডেকে সেই বিষয়ে কথা বলবেন কেন? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জিনিসটা কী? এই ধাঁধা থেকে সেটার কোনো পরিচয়ই তো পাচ্ছি না।’

.

ওই যে বুধোদা হতাশ গলায় বলল, জিনিসটা কী, ওইটুকু শুনেই আমার মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগে বিপ্রদাসবাবুর সঙ্গে সেই কথোপকথন। আজ বুধোদার শোরুমে ঢোকার পর থেকেই দীপা এমনভাবে স্টেজ কেড়ে নিয়েছিল যে আমি কথাগুলো বলবার চান্সই পাইনি। আরেকটু হলে ভুলেও যেতাম। তাই তাড়াহুড়ো করে বললাম, ‘বুধোদা! আরেকটা ধাঁধা রয়েছে কিন্তু।’

তাই শুনে দীপা আমাকে বিশ্রীভাবে একটা ভেঙচি কাটল। বুধোদা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘এটা কি ইয়ার্কি মারার সময়?’ আমি বললাম, ‘নাগো, সিরিয়াসলি বলছি।’

তারপর বিপ্রদাসবাবুর সঙ্গে আমার কী-কী কথাবার্তা হয়েছিল সবটাই ওদের খুলে বললাম। এটাও লুকোলাম না যে, আমি ওঁকে সরাসরি জিগ্যেসই করে বসেছিলাম, পিটার মনডির চিঠির মধ্যে কোথাও গুপ্তধনের পরিচয় লুকিয়ে আছে কিনা।

বুধোদা বলল, ‘এইজন্যেই তোকে ভালো লাগে, বুঝলি রুবিক। বরাবর দেখেছি তুই ডাইরেকট মেথড পছন্দ করিস আর তাতে কাজও হয়। যাইহোক, শুনে উনি কী বললেন?’

বললাম, ‘উনি বললেন তোমার দাদার জন্যে একটা মেসেজ আছে। সেটা যাতে তোমার মনে থাকে তাই ছন্দে বলছি। আমি অবশ্য স্মৃতিশক্তিতে ভরসা রাখি না, তাই লিখে এনেছি। তোমাদের দুজনকেই টেক্সটটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দিচ্ছি, দেখো।’

আমার মেসেজটা পাওয়ার পর বুধোদা বেশ আবৃত্তি করে পড়ল—

‘শিং দাঁত নখ শুঁড়
পালকের নানাবিধ রূপ তো
এঁকে গেছে মনসুর
তারই মাঝে কেহ অবলুপ্ত।

লুপ্ত কি পুরোপুরি?
কিছুটা রয়েছে বলে শুনছি
নিয়ে এসেছিল নাকি
চাঁদনির জয়রাম মুন্সী।’

তারপর কাউচ ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। হাত দুটো মুঠি করে ওপরে তুলে বলল, ‘গ্রেট। আনবিলিভেবল। উনি তো সবই বলে দিয়েছেন রে রুবিক। আর কোনো ধোঁয়াশা নেই। একদম দিনের আলোর মতন স্পষ্ট। ওহ, পিটার মনডি যেখানে ইনভলভড, জাহাঙ্গিরের চিড়িয়াখানা নিয়ে যখন বারবার কথা বলছি, তখনও কেন আমার এটা মাথায় আসেনি? চল রুবিক, বিপ্রদাসবাবুকে একটা প্রণাম করে আসি।’

আমি আর দীপা দুদিক থেকে বুধোদার দুটো হাত ধরে ঝুলে পড়লাম। বললাম, ‘ও বুধোদা, তুমি তো সবই বুঝে ফেললে…।’

বুধোদা বলল, ‘সব নয়, সব নয়। দি আইডেন্টিটি অফ দা হিডন ট্রেজার। সেটা কোথায় রয়েছে সেটা এবার বিপ্লববাবুর বাবার হেঁয়ালি থেকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু এখন অ্যাটলিস্ট আমরা জানি যে গুপ্তধনটা কী। হ্যাঁ, সব মিলে যাচ্ছে। মানুষের পাপ অবশ্যই জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে।’

দীপা এবার রিনরিনে গলায় চিৎকার করে বলল, ‘এরকম করলে খেলব না বুধোদা। শিগগিরই বলো, গুপ্তধনটা কী। সোনার মোহর? জাহাঙ্গিরের তরোয়াল?’

‘না না না!’ বুধোদা তখনও খ্যাপার মতন আচরণ করছিল। তারপর হঠাৎই ঘরের কোনায় রাখা ডেস্কটপটার সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। বলল, ‘আয়, আমার দুদিকে দুটো চেয়ার নিয়ে বোস। ওই ছবিটা আমার মুখস্থ। আমার মতন অনেক অ্যান্টিক-হান্টারেরই মুখস্থ। তোদের দেখানোর জন্যেই গুগলে ওপেন করছি। আচ্ছা দাঁড়া, আগে ওস্তাদ মনসুর কে ছিলেন সেটা দেখ।’

ইংরিজিতে ওস্তাদ মনসুর লিখে সার্চ করতেই উইকিপিডিয়ায় তাঁর সম্বন্ধে বেশ দীর্ঘ এক প্রবন্ধ ভেসে উঠল। যা বুঝলাম, ওস্তাদ মনসুর ছিলেন মুঘল রাজসভার সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর। বাবরের রাজত্বে বালক মনসুর অন্য সব চিত্রকরদের ছবিতে রং বুলিয়ে তাঁর কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। আকবরের রাজত্বকালে তিনি একজন পরিপূর্ণ শিল্পী হয়ে ওঠেন। এবং অবশেষে বাদশা জাহাঙ্গিরের আমলে তাঁর শিল্পনৈপুণ্য এমন জায়গাতেই পৌঁছয় যে, বাদশা তাঁকে উপাধি দেন ‘নাদির আল আসর’ অর্থাৎ যুগশ্রেষ্ঠ।

ওস্তাদ মনসুর তাঁর আসল কেরামতি দেখিয়েছেন পশুপাখি আর ফুল-লতা-পাতার প্রতিকৃতিতে। যে-যুগে ক্যামেরা ছিল না সেই যুগে ফটোগ্রাফিকে হার মানিয়েছিল তাঁর আঁকা এইসব রঙিন ছবি। আর যিনি তাঁকে প্রাণভরে আঁকার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁর নাম বাদশা জাহাঙ্গির।

জাহাঙ্গির নিজে ছিলেন একজন অসামান্য নেচার-লাভার, প্রকৃতিপ্রেমী। এমনকী যুদ্ধ-অভিযানের মধ্যেও তিনি চারপাশের অচেনা গাছগাছড়া, লতাগুল্ম আর পশুপাখির বিবরণ নিজের ডায়েরিতে লিখতে-লিখতে যেতেন আর সেইসব পশুপক্ষী আর ফল-ফুলের ছবি এঁকে তাঁর বিবরণকে সাজিয়ে দিতেন ওস্তাদ মনসুর।

‘দেখ রুবিক, দীপা দেখ।’ গুগল-ইমেজ থেকে মনসুরের আঁকা একটা সাইবেরিয়ান ক্রেন অর্থাৎ সাইবেরিয়ার লালমাথা সারস পাখির ছবি জুম করে বুধোদা আমাদের দেখাল। ‘খেয়াল কর, এই যে ঠোঁটের ওপরের পালকহীন চামড়াটা, এর টেক্সচার, এই যে পাখিটার পায়ের আঙুলে আটকে-থাকা একটা আলগা পালক—কী বলবি একে? এমনি-এমনি চারশো বছর বাদেও একজন শিল্পীকে সারা পৃথিবী মনে রেখেছে রে? এমনি-এমনি তাঁর সম্মানে বুধ গ্রহের একটা ক্রেটারের নাম রাখা হয়েছে ওস্তাদ মনসুর?’

বুধোদা বলে চলল, ‘জাহাঙ্গির মারা যাওয়ার পরে, অর্থাৎ ১৬২৭ সালের পর থেকে ওস্তাদ মনসুর বাদশাহি পৃষ্ঠপোষকতা হারান। বাদশাহি চিড়িয়াখানার সঙ্গে সঙ্গে সেই চিড়িয়াখানার চিত্রকর ওস্তাদ মনসুরের অবস্থাও খারাপ হতে শুরু করে।

‘এককালে ওখানে বসেই তিনি এঁকেছিলেন আফ্রিকার জেব্রার ছবি, যে-প্রাণীটিকে তার আগে ভারত কেন, এশিয়াতেও কেউ চোখে দেখেছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। হয়তো তখন তাঁর পাশে বসেছিলেন আরও দুজন ব্যক্তি, যাদের সঙ্গে মুন্সীবাড়ির যোগ রয়েছে। একজন তো সরাসরি এঁদের পূর্বপুরুষ এবং বাদশাহি চিড়িয়াখানার তৎকালীন অধিকর্তা, জয়রাম মুন্সী। আরেকজন সেই ব্রিটিশ প্রকৃতিপ্রেমী, আগ্রার চিড়িয়াখানা যার দিল জিতে নিয়েছিল—পিটার মনডি।

‘১৬২৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গিরের মৃত্যুর পরেও আরও কয়েকবছর ওস্তাদ মনসুর তাঁর আঁকাআঁকি চালিয়ে গিয়েছিলেন এবং এই সময়েই, অর্থাৎ ১৬২৭ থেকে ১৬৩৩-এর মধ্যে কোনো একটা সময়ে, তিনি এঁকে ফেলেছিলেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটি। শুধু শিল্পরসিকেরা নন, সারা পৃথিবীর প্রাণীবিজ্ঞানীরাও চিরকাল যে-ছবিটির জন্য তাঁকে স্মরণ করবেন। এই যে…এই ছবিটা। বিপ্রদাসবাবু তাঁর মেসেজে এইটির কথাই বলেছেন। এই ছবিতেই রয়েছে মুন্সীবাড়ির গুপ্তধন।’

ওস্তাদ মনসুরের বিষয়ে উইকিপিডিয়ার যে-ফিচারটা স্ক্রিনের ওপরে খোলা ছিল তারই ওপরদিকে ডান কোণে ছবিটা জ্বলজ্বল করছিল। এবার বুধোদার মাউসের ক্লিকে সেটা পুরো স্ক্রিন জুড়ে ফুটে উঠল।

পাঁচ প্রজাতির সাতটা পাখির ছবি একই কাগজে এঁকেছেন ওস্তাদ। ছবিটায় রঙের বাহার দেখার মতন। কিন্তু গুপ্তধনের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না।

বুধোদা কেমন যেন বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার দেখ দীপা, ছবিটা আমার মুখস্থ। কবে আঁকা হয়েছে তাও জানি। ছবিটা কেন যে জগৎবিখ্যাত, তাও। তবু এই ছবিটার কথা গত আটদিনে একবারও আমার মাথায় এল না।

‘এই দেখ, ওপরে বাঁ-দিকে, এটা ব্লু-ক্যাপড হ্যাংগিং প্যারট। মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর এইসব দেশে পাওয়া যায়। তার পাশে, ডানদিকের কোণে আলতা-লাল পাখিটা ওয়েস্টার্ন ট্রাগোপান। হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে বাস। রেয়ার বার্ড। নীচে বাঁ-দিকে দু-খানা বার হেডেড গীজ। এই রাজহাঁসগুলিও ভারতের পাখি নয়, পরিযায়ী। আর নীচে ডানদিকে দুটো পেন্টেড স্যান্ড-গ্রাউজ। মরুভূমির পাখি।

‘বুঝতেই পারছিস, বাদশা জাহাঙ্গিরের পাখির কালেকশনটা ঠিক কোন লেভেলের ছিল। তবে এরা নয়। ছবিটা বিখ্যাত এই মাঝের পাখিটার জন্যে। এর নামটা বলে দিতে হবে না নিশ্চয়ই।’

সত্যিই বলে দেওয়ার দরকার ছিল না। ছোটবেলা থেকে মানুষের হাতে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে এর ছবি আমরা বহু জায়গায় দেখেছি। দেখেছি পাঠ্যবই এবং ডাকটিকিটে, প্রকৃতি-প্রেমীদের পতাকায় এবং অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের গল্পে।

আমি এবং দীপা সমস্বরে বলে উঠলাম, ‘ডোডো।’

বুধোদা বলল, ‘হ্যাঁ, ডোডো। নির্জন মরিশাস দ্বীপের সেই ডানাহীন পাখি যার নাম প্রথম শোনা গেল ডাচ নাবিকদের লগবুকে, ১৫৯৮ সালে। ডাচ সেলররা ভারত মহাসাগরে যাত্রা করার আগে মরিশাসে নামতো আর অন্যান্য কাজের মধ্যে বেশ কিছু ডোডো-পাখিকে পিটিয়ে মেরে বিনিপয়সার মাংস হিসেবে জাহাজে তুলে নিত। ডাচদের আগে মরিশাস দ্বীপে মানুষের পা পড়েনি আর তাই ডোডোপাখিরা মানুষকে ভয় পেতেও শেখেনি। ওদের মারা ছিল খুব সহজ।

‘শেষ ডোডো পাখিটাকে দেখা গিয়েছিল ১৬৬২ সালে। তার মানে একসময় যে পাখিটাকে মরিশাস দ্বীপে গুচ্ছ গুচ্ছ দেখা যেত, মাত্র সত্তর বছরের মধ্যে মানুষ তাদের বংশ ধ্বংস করে দিল। অবশ্য এই সর্বনাশের কথা তেমন কেউ জানলও না। তখন তো আর যে-কোনো খবর পৃথিবী জুড়ে এমন ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ত না।

‘ডোডো সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের নতুন করে আগ্রহ জন্মাল উনিশ শতকে। তখন থেকেই মানুষের হাতে শহিদ হওয়ার প্রতীক হয়ে উঠল ডোডো। সমস্যা হল বিজ্ঞানীদের আগ্রহ জন্মালেও তাঁরা ডোডোপাখির ওপরে রিসার্চ করার মতন সেরকম মেটেরিয়াল পাচ্ছিলেন না। ডোডো পাখিকে চোখে দেখে যারা তার বর্ণনা করেছিল কিংবা ছবি এঁকেছিল তারা বেশিরভাগই ডাচ নাবিক। তাদের বর্ণনার বেশিরভাগটা জুড়েই ডোডোর গলার মাংস বেশি টেস্টি না বুকের, এই আলোচনা।’

আমি বুধোদাকে জিগ্যেস করলাম, ‘ফসিল-টসিল পাওয়া যায়নি?’

বুধোদা বলল, ‘ফসিল ফর্ম করতে গেলে কয়েকলক্ষ বছর সময় লাগে। ডোডোদের হাড়গোড় তো অত পুরোনো নয়, তাই ফসিল হবার সময় পায়নি। যা হয়েছিল তাকে বলা হয় সাবফসিল। সাবফসিল খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, যেমন পৃথিবীর অনেকগুলো মিউজিয়ামের ডোডো স্পেশিমেন নষ্ট হয়ে গেছে। আপাতত সারা পৃথিবীতে দুটো পূর্ণাঙ্গ ডোডোর কঙ্কালের খবর জানা আছে। একটা রয়েছে মরিশাসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়মে আর অন্যটা, সেটা আবার দুটো আলাদা পাখির হাড়গোড় জোড়াতাড়া দিয়ে বানানো, রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ডারবান মিউজিয়ম অফ ন্যাচারাল সায়েন্সের কালেকশনে।’

দীপা বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। এইজন্যেই তুমি বলছিলে যে ওস্তাদ মনসুরের এই ছবিটার কথা শিল্পরসিকদের থেকেও বেশি মনে রেখেছেন প্রাণীবিজ্ঞানীরা।’

‘ঠিক ধরেছিস’, বলল বুধোদা। এটাকেই একমাত্র ছবি বলে ধরা হয় যেটা একজন প্রফেসনাল আর্টিস্ট চোখের সামনে জ্যান্ত ডোডোকে দেখে এঁকেছিলেন। অবাক হোস না। জাহাঙ্গিরের চিড়িয়াখানায় যে দুটি জ্যান্ত ডোডোপাখি ছিল সে কথা একজন লিখে গিয়েছেন। তিনিই সম্রাটকে উপহার হিসেবে ওই পাখি দুটি উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর নাম কী জানিস? পিটার মনডি।’

.

ছয়

এইজন্যেই বলেছিলাম, ‘কে জানত একটু বাদেই জীবনের সেরা চমকটা আমার জন্যে অপেক্ষা করছে এবং সেই চমকটা খাব আমার খুব চেনা পরিবেশে, চেনা-মানুষদের সামনে।’

পিটার মনডির সঙ্গে ডোডোপাখির, ডোডোপাখির সঙ্গে আগ্রার চিড়িয়াখানার, আগ্রার চিড়িয়াখানার সঙ্গে জয়রাম মুন্সীর এমন একটা চেন তৈরি হয়ে গেল যে, ব্যাপারটা হজম করার জন্যে আমাকে আর দীপাকে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে হল। বসে-বসে ভাবছিলাম কেমন জিগ-শ পাজলের টুকরোর মতন, নানান জায়গায় ছড়িয়ে থাকা অবোধ্য তথ্যগুলো, একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে দিব্য একটা ছবি তৈরি করে দিচ্ছে।

আমাদের চুপ করে বসে থাকতে দেখে বুধোদা বলল, ‘মনে আছে তো, জয়রাম মুন্সীকে চিঠিতে মনডি কী লিখেছিলেন? লিখেছিলেন, তুমি যদি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাও তাহলে আমার সঙ্গেই যেতে পারো। আমি সামনের মাসেই কলকাতায় রওনা হচ্ছি।

‘যাবার সময় আমি বাদশাহি চিড়িয়াখানায় যে পাখিগুলিকে দান করেছিলাম, সেগুলিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। আমি ইতোমধ্যেই এইমর্মে যথাস্থানে আবেদন করেছিলাম এবং তা মঞ্জুরও হয়ে গেছে। তুমি সঙ্গে থাকলে যেটা হবে, ভারতের এই তীব্র গরমে আমি পাখিগুলিকে জ্যান্ত অবস্থায় কলকাতা অবধি অন্তত ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব। ওদের পরিচর্যা, ওদের স্নান-খাওয়া, তোমার চেয়ে ভালো কে বোঝে?

‘এবার ভাব তো রুবিক, এরকম কি হতে পারে না, পথে ডোডো পাখিদুটি মারা পড়ল। চিড়িয়াখানার অধিকর্তা হিসেবে জয়রাম মুন্সীর নিশ্চয় ট্যাক্সোনমির জ্ঞান ছিল। তিনি মৃত পাখিদুটিকে মাউন্ট করে নিজের কাছে রেখে দিলেন। সেটা হয়তো ১৬৩৪ কিংবা ১৬৩৫ সাল। পৃথিবীতে তখনও ডোডোপাখি অমিল হয়নি। কাজেই ধরে নিতে পারি উনি নিতান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই পাখিগুলিকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।

‘বিপ্রদাসবাবু কিন্তু এরকমটাই ভেবেছেন। সেইজন্যেই তিনি এই ছবির উল্লেখ করে বলেছেন, মনসুরের আঁকা পাখিগুলির মধ্যে যেটি অবলুপ্ত, অর্থাৎ ডোডো, সেটিকেই চাঁদনির জয়রাম মুন্সী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।’

আমি আর দীপা হা করে বুধোদার কথাগুলো শুনছিলাম। বুধোদা থামতেই একসঙ্গে বলে উঠলাম, ‘তারপর?’

‘মনে কর তারপর আরও একশো বছর কেটে গেল। নানান জায়গায় ঘুরতে-ঘুরতে মাউন্ট করা পাখিগুলির পালক চামড়া সব নষ্ট হয়ে শুধু একটা ডোডোপাখির ভেতরের কঙ্কালটুকুই রয়ে গেল। পরবর্তীকালে যখন ডোডো নিয়ে সারা পৃথিবীতে হইচই হচ্ছে, তখন মুন্সীবাড়ির কেউ সেই কঙ্কালটি দেখলেন এবং সেটিকে গুপ্তধনের মতন যত্নে লুকিয়ে রাখলেন। সেই গুপ্তধনের হদিশ পেলেন আবার বিপ্লববাবুর বাবা।

‘বাড়ির পুরোনো জিনিসপত্রের মধ্যে কোথায় কীভাবে যে সেই কঙ্কালটাকে বিপ্লববাবুর বাবা খুঁজে পেয়েছিলেন তা আজ আর হয়তো জানা যাবে না। কিন্তু যখনই পান, যেভাবেই পান, ওটাকে দেখামাত্র তিনি অমূল্য বলে চিনতে পেরেছিলেন। তারপর সেটাকে এমনভাবেই লুকিয়ে রেখেছিলেন যাতে আর হারিয়ে না যায় কিংবা নষ্ট না হয়ে যায়।

‘একইসঙ্গে তিনি চেয়েছিলেন যখন তার ছেলে ওটার দাম বোঝবার মতন বড় হবে তখন সে যেন ওটাকে খুঁজে পায়।’

একটানা এতগুলো কথা বলার পরে বুধোদা দম নেওয়ার জন্যে একটু থামল। আমি বললাম, ‘তোমার কী মনে হয় বুধোদা? খুঁজে পাওয়া যাবে?’

বুধোদা বলল, ‘সেইজন্যেই এবার আমাদের আরেকবার গুপ্তধনের সঙ্কেতটা নিয়ে বসতে হবে। মনে হয় ওটাকে আর আগের মতন দুর্বোধ্য লাগবে না, কারণ এখন আমরা জানি গুপ্তধনটা কী, তার চেহারা কেমন। তবে দাঁড়া, তার আগে এক কাপ করে চা খেয়ে নিই। নতুন করে মগজের ব্যাটারি রিচার্জ না করলে পারব না।’

.

চা খাওয়ার পরে আমরা তিনজন আবার সেই খাতার পাতাটা খুলে বসলাম, যেখানে বিপ্লববাবুর বাবা হেঁয়ালিটা লিখে রেখেছিলেন। বুধোদা আবার প্রথম থেকে আবৃত্তি করার মতন পড়ে গেল—

মন্দিরে কঙ্কালপক্ষী মহাকাল দ্বাররক্ষী
দুখানি ডোমের মাথা নামগান করে
প্রতি পূর্ণ ঘটিকায় সেই দরজা খুলে যায়
পক্ষীটি ভরায় দিক নিজ কুহুস্বরে।
যে ছিল সে নেই আর মানুষের বুভুক্ষার
বলি হয়ে চলে গেছে কবে পরপার
তবু দৈব দুর্বিপাকে স্মরণ করিও তাকে
কঙ্কাল আসিবে নেমে, করিবে উদ্ধার।

তারপর বুধোদা আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শেষ চার-লাইনের আর আমাদের কাছে সেরকম দাম নেই, বুঝলি। যে ছিল সে নেই আর, মানুষের বুভুক্ষার, মানে খিদের বলি হয়ে পরপারে চলে গেছে, এটা ডোডো পাখির ডেসক্রিপশন। থ্যাঙ্কস টু বিপ্রদাস মুন্সী, আমরা অলরেডি জেনে গেছি যে আমরা একটা ডোডোপাখির কঙ্কালই খুঁজছি।’

দীপা বলল, ‘আর সেইজন্যেই শুরুর লাইনের কঙ্কালপক্ষী যে কাকে বলা হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছি। কিন্তু দুখানি ডোমের মাথা নামগান করে, এই হাড় হিম করা লাইনটা লেখার মানে কী বাপু?’

‘আমি বললাম, ‘এটাও বুঝলে না? ডোমের মাথা মানে শব্দটার প্রথম অক্ষর…ডো। দুখানি ডোমের মাথা মানে ডো এবং ডো…তারাই সেই পাখির নামগান করে, মানে নামটা বুঝিয়ে দেয়। এবং সেই নামটা হল ডোডো।’

দীপা হাততালি দিয়ে বলে উঠল, ‘বাঃ। ভারি মজার তো। তাহলে এবার বলো, সেই ডোডোপাখি রয়েছে কোথায়! ধাঁধায় তো লেখা আছে মন্দিরে কঙ্কালপক্ষী। মন্দিরটা কোথায়?’

আমি বললাম, ‘এটা তো বলা ভারি মুশকিল। এত হাজার হাজার মন্দির রয়েছে চারিদিকে।’

বুধোদা বলল, ‘বাইরের মন্দিরের কথা ভাবব কেন আমরা? অত দামি জিনিসটাকে কি তিনি বাড়ির বাইরে রাখবেন। বরং বাড়ির মন্দিরের কথাই ভাবা ভালো। যেখানে তারা-মা’র মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, অর্থাৎ মুন্সীবাড়ির ঠাকুরঘর।’

আমি বললাম, ‘তাহলে বাকি রইল তৃতীয় আর চতুর্থ লাইন। প্রতি পূর্ণ ঘটিকায় সেই দরজা খুলে যায়, পক্ষীটি ভরায় দিক নিজ কুহুস্বরে। বুধোদা! এই দুটো লাইনের মধ্যেই তাহলে আসল রহস্য। এখানেই বলা আছে ঠাকুরঘরের ঠিক কোথায় লুকোনো আছে ডোডোর স্কেলিটন।’

বুধোদা বলল, ‘উঁহু। প্রথম-লাইনের শেষে আরেকটা টুকরো-কথা রয়ে গেছে, যার অর্থ এখনো তুই উদ্ধার করতে পারিসনি। ভালো করে দেখ। মহাকাল দ্বাররক্ষী।’

ঠিকই বলেছে বুধোদা। আমি কিছুক্ষণ হেঁয়ালিটার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকোলাম। তারপর বললাম, ‘তুই অর্থ উদ্ধার করতে পারিসনি বললে কেন? তুমি পেরেছ?’

বুধোদা সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ওর সেই বিখ্যাত মিসচিভাস হাসিটা হেসে বলল, ‘আগে পারিনি। এখন আবার পড়তে গিয়ে মাথায় এল।’

আমি আর দীপা দুজনেই লাফিয়ে উঠলাম। দীপা চেঁচাল—‘সলভড! ও বুধোদা, রিয়েলি তুমি সলভ করে ফেলেছ? বলো বলো বলো।’

বুধোদা বলল, ‘যে-কোনো ধাঁধার মতন এর উত্তরটাও বলে দিলে দেখবি ভেরি ইজি। মহাকাল দ্বাররক্ষী। মহাকাল মানে সময়। আর মুন্সীবাড়ির ঠাকুরঘরে সময়ের মূর্তি কোথায় রয়েছে? রুবিক, তুই তো ওই ঘরে ঢুকেছিলিস। তুই বল।’

‘দেয়ালের ওই ঘড়িটা?’

‘গ্রেট।’ বুধোদা আমার পিঠ চাপড়ে দিল। এবার দেখ বাকিটাও মিলে যাচ্ছে। প্রতি পূর্ণ ঘটিকায় সেই দরজা খুলে যায়, পক্ষীটি ভরায় দিক নিজ কুহুস্বরে। ভুলে যাসনি নিশ্চয়, ঠাকুরঘরের ওই ঘড়িটা আসলে একটা কুকু-ক্লক—প্রতি ঘণ্টায় যেটার ডায়ালের নীচে একটা গোল কাঠের ঢাকনা খুলে যাওয়ার কথা আর গর্তর মধ্যে থেকে মুখ বার করে একটা যান্ত্রিক-পাখির গান গেয়ে সময় ঘোষণা করার কথা। এই পুরো প্রসেসটাকে বিপ্লববাবুর বাবা যেভাবে ছন্দে ধরেছেন তাতে ভদ্রলোকের কবিত্বশক্তিকে কুর্নিশ করতেই হয়।’

বললাম, ‘সে তো হল বুধোদা। কিন্তু ডোডো?’

বুধোদা মুখটুখ কুঁচকে বলল, ‘আঃ। এত বুঝিস আর এইটা বুঝছিস না যে, ওই পার্টিকুলার ঠাকুরঘরের ঘড়িটার মধ্যে কাঠের পাখির জায়গায় ওই ডোডোর কঙ্কালটাকেই বসিয়ে গিয়েছিলেন বিপ্লববাবুর কোনো পূর্বপুরুষ। এবং সম্ভবত ঘড়িটা দম দিতে গিয়ে কোনোভাবে বিপ্লববাবুর বাবা সেটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন।

‘তার পরেই তিনি দুটো কাজ করেছিলেন। এক, ঘড়িটাকে খারাপ বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। আর দুই, এরকম একটা কথা চালু করে দিয়েছিলেন যে, ওই ঠাকুরঘর থেকে একটা আলপিন সরালেও অভিশাপ লাগবে।

‘এইভাবে তিনি ডোডোর কঙ্কালের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে গিয়েছিলেন এবং তাঁর সেই প্ল্যান যে এতদিন ভালোভাবেই কাজ করেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’

তারপর একটু ভেবে বুধোদা বলল, ‘উঁহু দেখতে পাচ্ছি না…অনুমান করতে পারছি। দেখার একটা উদগ্র কৌতূহল জন্মাচ্ছে। চল, মুন্সীবাড়ি গিয়ে দেখে আসি আমাদের আইডিয়াগুলো ঠিক কিনা। তোরা ঝটপট শো-উইনডোর সামনের শাটারগুলো টান দেখি।’

.

গনেশ অ্যাভিনিউয়ের ওপরে একটা পার্কিং-জোনে গাড়ি পার্ক করে আমরা তিনজন সেই প্যাঁচালো রাস্তাটা ধরে নীলকণ্ঠ মুন্সী বাইলেনের দিকে হাঁটছিলাম। বুধোদা একটু আগেই ফোন করে কনফার্ম করে নিয়েছে, বিপ্লববাবু বাড়ি ফিরে এসেছেন। উনি বলেছেন, বাড়ির দরজাতেই আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবেন।

সত্যিই উনি বাড়ির দরজাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিপ্লববাবু একা নন, স্মৃতিবউদিও পাশে ছিলেন। বুধোদাকে সামনে পেয়েই উনি ওর হাতদুটো চেপে ধরলেন। বললেন, ‘এসব কী কাণ্ড মিস্টার মজুমদার! খাতাটা কোথা থেকে উদ্ধার করলেন সেটা আগে বলুন তো।’

বুধোদা সংক্ষেপে মোহরের কীর্তি বর্ণনা করল। শুনে স্মৃতিবউদি কেঁদে ফেললেন। দীপা স্মৃতিবউদিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুমি ভেবো না বউদি। মোহরকে আমি খুব ভালো করে বুঝিয়েছি। ও এখন আর ওরকম ভাবছে না।’

তারপর আমরা সবাই মিলে জুতো-টুতো খুলে একতলার ঠাকুরঘরে ঢুকলাম। আমিই একটা চেয়ারের ওপরে উঠে দেয়ালের গা থেকে সেই প্রাচীন এবং অচল কুকু-ক্লকটাকে সাবধানে নামিয়ে মেঝের ওপরে রাখলাম। একটা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে বিপ্লববাবু সামনের পুরো কাঠের প্লেটটা খুলে ফেলতেই দেখা গেল ভেতরে অন্যান্য কলকব্জার পাশাপাশি একটা প্রমাণ আকারের রুপোর পাখি বসে আছে।

আমি ওটার গা থেকে রুপোর মোড়কটা খুলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বুধোদা বাধা দিয়ে বলল, ‘উঁহু। ঠোকাঠুকি লাগতে পারে এমন কিছুই করা যাবে না। বিপ্লববাবু, আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন। ক্রীক রোর ওই পলিক্লিনিকটার মালিক ডাক্তার অনির্বাণ বসু আমার স্কুলের বন্ধু। ওকে রিকোয়েস্ট করলে এটার একটা এক্সরে ইম্প্রেসন এখনই বার করে দেবে।’

তাই হল। ক্রীক রোতে গিয়ে রুপোর পাখির এক্সরে প্লেট বার করতে সময় লাগল আরও প্রায় একঘণ্টা। তারপরে সেই প্লেট দেখেই আমি আর দীপা স্থান কাল ভুলে চেঁচিয়ে উঠলাম হুররে। কারণ, ছবিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল একটা জুভেনাইল অর্থাৎ কমবয়সি ডোডোপাখির নিখুঁত কঙ্কাল। যার জুড়ি এই পৃথিবীতে আর একটিই আছে।

.

উপসংহার

এই ঘটনার পরে কেটে গেছে আরও ছ’টা মাস। বুধোদার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই ডোডোপাখির কঙ্কাল আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে স্থান পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা এখনই লিখতে পারছি না তার কারণ ওরা স্কেলিটনটার ওপর একটা সম্পূর্ণ রিপোর্ট তৈরি করে তবেই সেটার কথা ঘোষণা করবে।

মোহর এই ঘটনায় খুশি। ডোডোপাখির অবলুপ্তির পেছনে মানুষের হাত ছিল ঠিকই, কিন্তু এই বিশেষ ডোডোপাখিটি যে তারই এক পূর্বপুরুর জয়রাম মুন্সীর অতি আদরের পোষ্য ছিল, সেই গল্প বুধোদাই ওকে শুনিয়েছে। তাই মোহরের মনে আর কোনো গ্লানিও ছিল না। পোষা পাখি যে মানুষের কত প্রিয় হয়, সেটা মোহরের চেয়ে বেশি কে জানবে? ওর নিজের একটা টুনি আছে না?

আমাদের কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল, এই ডোডোর কঙ্কালের জন্যে বিপ্লব মুন্সী যে সম্মান দক্ষিণা পেয়েছেন সেটা আমাদের কারেন্সিতে এক-কোটির অনেক বেশি। তাই গত তিনমাস ধরে নিউইয়র্কের এক হাসপাতালে রেখে মোহরের চিকিৎসা করাতে ওঁদের কোনো অসুবিধেই হয়নি।

তিনদিন আগে মোহর বাড়ি ফিরেছে এবং ফিরে এসেই আমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে বায়না ধরেছিল। তাই গতকাল আমি, বুধোদা আর দীপা ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম।

মোহর নিজে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। ও অনেকটাই সেরে উঠছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *