ঝুটা

ঝুটা

তোমাদের কাছে বুধোদা অর্থাৎ বোধিসত্ত্ব মজুমদারের পরিচয় নিশ্চয় নতুন করে দিতে হবে না। হ্যাঁ, সেই বোধিসত্ত্ব মজুমদার, ‘অ্যান্টিক হান্টিং’ যার পেশা। অবশ্য পেশা না বলে নেশা বলাই ভালো। কলেজ-ইউনিভার্সিটির পরীক্ষাগুলোতে বুধোদার যেরকম রেজাল্ট ছিল, তাতে শুধু অর্থ উপার্জনই যদি ওর উদ্দেশ্য হতো, তাহলে অনায়াসেই কর্পোরেট সেক্টরে হোয়াইট-কলার-জব পেয়ে যেত। যদি নিশ্চিন্ততা চাইত, তাহলে ওদের পারিবারিক পরিবহন-ব্যবসায় যোগ দিতে পারত। কিন্তু সেসব কিছুই করল না বুধোদা। পড়াশোনা শেষ করেই অ্যান্টিক-হান্টিং-এর ব্যবসায় নেমে পড়ল।

‘অ্যান্টিক কালেকশন’ নয়; ‘অ্যান্টিক হান্টিং।’ বুধোদা বলে কালেকশনের মধ্যে কোনো মজা নেই। কালেকশন যেন সাজানো-বাগান থেকে সাজি ভরে ফুল তুলে আনা। ওসব কাজ একটা বাচ্চা ছেলেও পারে। আর হান্টিং? সে তো সত্যিকারেই শিকার। শিকারের সমস্ত উত্তেজনা অ্যান্টিক হান্টিং-এর পরতে-পরতে জড়ানো থাকে। বুধোদার সঙ্গে অ্যান্টিক-হান্টিংয়ে বেরিয়ে কতবার কত দুর্গম পাহাড়ে কিংবা জঙ্গলে পথ হারিয়ে ঘুরেছি; মুখোমুখি হয়েছি কত জাত ক্রিমিনালের। প্রত্যেকবারেই যে অসামান্য কোনো অ্যান্টিক আমাদের হস্তগত হয়েছে তা হয় তো নয়। তবে একটা জিনিস প্রত্যেকবারেই লাভ হয়েছে। তার নাম রোমাঞ্চ।

বুধোদার সঙ্গে ঘুরতে-ঘুরতে আরেকটা কথাও মনে হয়েছে। একজন মানুষের মধ্যে অনেকগুলো গুণের সমাবেশ ঘটলে তবেই সে একজন সফল অ্যান্টিক হান্টার হতে পারে। এই বুধোদাই যেমন…সারা পৃথিবীর ইতিহাস, ভুগোল, শিল্প এবং সাহিত্যের ঠিকুজি-কুলুজি ওর মুখস্থ। গাছপালা এবং পশুপাখিকে ও বই পড়ে চেনেনি; চিনেছে পায়ে হেঁটে জঙ্গলে-পাহাড়ে ঘুরে। সবার ওপরে রয়েছে ওর অসীম সাহস আর মস্ত বড় একটা হৃদয়। আমি আজ অবধি বুধোদাকে অন্যায় উপায়ে কোনো অ্যান্টিক হস্তগত করতে দেখিনি।

বুধোদার বয়স এখন ত্রিশের কাছাকাছি। উত্তরপাড়া শহরে জিটি রোডের যেদিকে আমাদের বাড়ি, সেখান থেকে রাস্তা পেরোলেই অন্যদিকে বুধোদাদের একশো বছরের পুরোনো তিনমহলা প্যালেস। নাম ‘হেমকুঞ্জ’। হেমকুঞ্জের বিশাল লনে ক্রিকেট খেলে আর ছাদে নাটক করে আমরা বড় হয়েছি। তাই ওই বাড়িটাকে যেমন নিজের বাড়ি বলেই মনে করি, তেমনি বুধোদাকেও নিজের দাদা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না।

ক্যামাক স্ট্রিটে বুধোদার একটা দারুণ সাজানো-গোছানো অ্যান্টিকের শোরুম রয়েছে—নাম ‘মহারাজা কালেকশনস।’

তোমরা যদি বুধোদাকে চেনো তাহলে আমাকেও নিশ্চয় চিনবে। কারণ, বুধোদার বহু অ্যাডভেঞ্চারে তোমরা আমাকে ওর সঙ্গী হিসেবে দেখেছ। আমার ভালো নাম মাল্যবান মিত্র, ডাকনাম রুবিক। উত্তরপাড়া গভর্মেন্ট স্কুলে ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। পড়াশোনার থেকে খেলাধুলায় আকর্ষণ বেশি। সিলেবাসের বাইরের বইও পড়ি প্রচুর। এসব সত্ত্বেও রেজাল্ট মন্দ করি না; মানে সত্যিকথা বলতে কি ক্লাসে ফার্স্টই হই।

.

কিন্তু এবারে যে কাহিনিটা বলতে চলেছি সেখানে আমার ভূমিকা শুধুই কথকের। এর মধ্যে কোথাও আমি ছিলাম না, কারণ, ঘটনাগুলো ঘটেছিল ছ-সাতবছর আগে আর আমি বুধোদার মুখে সেই সব ঘটনার কথা শুনলাম এই সেদিন।

এপ্রিলের মাঝামাঝি একটা দিন…সারা দুপুর গরমে আর লোডশেডিংয়ে অসহ্য কষ্ট পেয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। বিকেলের দিকে ভাবলাম গঙ্গার ঘাট থেকে একটু হাওয়া খেয়ে আসি। তারপর না হয় আবার পড়াশোনা নিয়ে বসা যাবে।

মনে আছে, দিনটা ছিল মঙ্গলবার। রোববারের আগে বুধোদার সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো আশা ছিল না, কারণ সপ্তাহে ওই একটা দিনই ওর ‘মহারাজা কালেকশনস’-এর শোরুম বন্ধ থাকে। তাই হেমকুঞ্জের সামনে দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম, তখনও বাড়িটার দিকে তাকাইনি।

আমি না তাকালে কী হবে, হঠাৎই একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর আমার পাশ কাটিয়ে হেমকুঞ্জের দিকে টার্ন নিতে গিয়ে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল আর ড্রাইভারের সিট থেকে মুখ বাড়িয়ে স্বয়ং বুধোদা বলল, কীরে রুবিক, কোথায় চললি?

এত তাড়াতাড়ি ওকে বাড়ি ফিরতে দেখে খুব অবাক হলাম। বললাম, তেমন কোথাও না। এই একটু গঙ্গার ঘাট থেকে ঘুরে আসব ভাবছিলাম। তুমি আজ এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে!

সে কথার উত্তর না দিয়ে বুধোদা বলল, চাইলে আমার সঙ্গেও আসতে পারিস। আজ আর বেরোব না। এই বলে বুধোদা গেট পেরিয়ে বাগানের মোরাম-বেছানো রাস্তার একপাশে গাড়িটা পার্ক করে নেমে দাঁড়াল।

ভালো করেই জানি, বুধোদার ঘরে গিয়ে বসলে একসঙ্গে দুটো কাজই হয়ে যাবে। ওর কাছে নানারকমের গল্পও শোনা যাবে আবার গঙ্গার হাওয়াও খাওয়া যাবে। কারণ হেমকুঞ্জের পেছনের অংশটা একেবারে নদীর পাড় থেকেই উঠেছে আর সেদিকেই দোতলায় বুধোদার ঘর। সেই ঘরেও আবার দেয়ালের থেকে জানলা বেশি। জানলার ধারে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলে মনে হয় হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ফ্যান চালানোর দরকার পড়ে না।

বুধোদা গাড়ি থেকে নামার পরে দেখলাম ও আজ সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে আছে। পুজোর সময় দু-একদিন বাদ দিলে ওকে এই পোশাকে দেখাই যায় না। তার ওপরে একটা বড় সাদা রুমালে গিঁট দিয়ে মাথাটাকেও ঢেকে রেখেছে।

আমাকে সঙ্গে নিয়েই বুধোদা হেমকুঞ্জে ঢুকল। সদর-দরজা, দুর্গাদালান ইত্যাদি পেরিয়ে দোতলার সিঁড়ির মুখে পৌঁছিয়েও যখন দেখলাম বুধোদা নিজে থেকে কিছু বলছে না, তখন বাধ্য হয়েই জিগ্যেস করলাম, কোথায় গিয়েছিলে বুধোদা?

মাথার রুমালটা একটানে খুলে, সেটা দিয়েই মুখের ঘাম মুছতে-মুছতে বুধোদা উত্তর দিল, মাহফুজা আলমের অন্ত্যেষ্টি ছিল আজ। বাগমারি কবরস্থানে গিয়েছিলাম।

অবাক হয়ে বললাম, মাহফুজা আলম! তিনি কে? আগে কখনো নাম শুনিনি তো।

ঘরে ঢুকে জানলার পর্দাগুলো সরিয়ে দিল বুধোদা। ওইখানে দাঁড়িয়েই নদীর স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়া কচুরিপানার দলের দিকে তাকিয়ে বলল, শুধু তোকে কেন, কাউকেই বলিনি তাঁর কথা। অবশ্য কজনই বা ওঁকে মনে রেখেছিল? আজ ওঁর দাফন-কাফনের সময় সব মিলিয়ে আমরা সাকুল্যে পাঁচজন লোক উপস্থিত ছিলাম। সেও গীতামাসি আর খিজির উদ্যোগ নিয়েছিল বলে।

অথচ জানিস রুবিক, অ্যান্টিকের সঙ্গে যে শুধু ইতিহাস জড়িয়ে থাকে না, শুধু যে মানুষের সৌন্দর্য-বোধ জড়িয়ে থাকে না, চরম লোভ আর হিংস্রতাও জড়িয়ে থাকে, সেটা নানির দুর্ভাগ্য দেখেই প্রথম শিখেছিলাম। পরে অবশ্য আরও অনেকবার দেখেছি।

একটু অভিমান হল। বললাম, বলোনি কেন এতদিন সেই নানির কথা?

বুধোদা ঘরের লাগোয়া বারান্দায় বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছিল। আমার কথা শুনে টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে-মুছতে বলল, কী করব বল! সারাক্ষণ ভয়ে-ভয়ে থাকতাম, নিজের অজান্তেই ওই অসুস্থ নিঃসঙ্গ মানুষটাকে যেন দুঃখ দিয়ে না ফেলি। ওঁর কানে যেন ঝুটা জিনিসগুলোর কথা পৌঁছে না যায়। সেইজন্যেই গত সাত বছর ঠোঁট টিপে বসেছিলাম। আজ ভোরবেলায় সেই মাহফুজা আলম, আমার সুন্দরী-নানি, সব সুখ-দুঃখের ওপারে চলে গেলেন। আজ তোকে সবটাই বলতে পারি।

পিঠের নীচে বালিশ দিয়ে পালঙ্কের ওপর আধশোয়া হয়ে বসল বুধোদা। এটাই ওর বিশ্রাম নেওয়ার প্রিয় ভঙ্গি। তারপর বাকি সন্ধেটা জুড়ে ও যা-যা বলেছিল, সবটাই এখানে তুলে দিলাম।

.

তোকে তো বললামই রুবিক, এসব সাতবছর আগের কথা। সাত বছর আগেই নানির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তখন সবে এদিক-ওদিক থেকে নানারকমের অ্যান্টিক জোগাড় করে নিজের কালেকশন বানিয়ে তুলছি। বেশি দূরে কোথাও যাওয়ার রেস্ত ছিল না। বেশি দামি জিনিসে হাত ছোঁয়াতে পারতাম না, কারণ তুই তো জানিস, বাবা বলে দিয়েছিলেন ব্যবসা করতে গেলে মজুমদার-ফ্যামিলির ট্র্যান্সপোর্টের ব্যবসাই করতে হবে। তাই নিজের স্কলারশিপের টাকা সম্বল করে কলকাতার মধ্যেই যতটা পারি অ্যান্টিক-হান্টিং করে বেড়াতাম।

অবশ্য কলকাতা শহরটা আমাকে কখনোই খালি হাতে ফেরায়নি। বয়স মাত্র আড়াইশো বছর হলে কী হবে, তার মধ্যেই তো এই শহরে অনেক পালাবদল হয়ে গিয়েছে। এখানেই একসময়ে ব্রিটিশদের হাতে সাহেবপাড়া তৈরি হয়েছিল। বাবুদের বাগানবাড়ি তৈরি হয়েছিল, সে-ও এখানেই। লক্ষ্ণৌ থেকে নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহর নতুন আবাস­—সে-ও আমাদেরই মেটিয়াবুরুজে। আর সেই জন্যেই নানান সময়ে নানান দেশের ফার্নিচার, গয়না, মোহর, আতর, বই আর অয়েল-পেন্টিং এসে পৌঁছেছিল এই কলকাতায়। খুঁজতে গিয়ে বুঝলাম, সেসবের অনেকটা হারিয়ে গেলেও, কিছুটা এখনো লোকের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে।

তবে হ্যাঁ। এটাও বুঝে গিয়েছিলাম যে, ওসব অ্যান্টিক খুঁজে বার করতে গেলে এজেন্টদের ওপর ভরসা করলে হবে না। নিজেকে অকুস্থলে পৌঁছতে হবে। ময়লা ঘাঁটতে হবে। ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন’­—ওটাই তখন আমার জপের মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সবসময়ে যে খুব বড়লোকদের বাড়িতেই অ্যান্টিক খুঁজে পেয়েছি, তা নয়। বুঝলি রুবিক, বাংলাদেশে এমন একটা সময় ছিল যখন যাদের হাতে তেমন পয়সাকড়ি ছিল না তাদেরও ছিল আর্টের সমঝদারি। তাই বেলেঘাটা চাউলপট্টি রোডের নিবারণ বাঁড়ুজ্জের বাড়ির চিলেঘর থেকে খুঁজে পেয়েছিলাম গওহর জানের গানের রেকর্ড। বেহালার শিবনাথ বসাকের এক অযোগ্য বংশধর ভাঙা আলমারির মাথা থেকে পেড়ে এনেছিলেন কালীঘাটের অমূল্য সব পটচিত্র। ভদ্রলোক জানতেনই না যে, ওগুলো একটা হারিয়ে যাওয়া সময়ের দলিল।

যাই হোক, ওই সময়েই খিজির বলে একটা ছেলের সঙ্গে আমার খুব দোস্তি হয়ে গিয়েছিল। আমার চেয়ে কয়েকবছরের ছোটই ছিল ছেলেটা। মেছুয়া-বাজারে ফল বিক্রি করতে-করতে হাতে অনেক পয়সা এসে গিয়েছিল। তাই দিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিং-এর গায়ে একটা পুরোনো বইয়ের দোকান কিনে ফেলেছিল। আগের মালিকের পুরো বইয়ের স্টক সমেতই দোকানটা কিনেছিল ও।

একদিন খুব বৃষ্টির মধ্যে ওর দোকানের শেডের নীচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, ছেলেটা হিউমের গেম-বার্ডস অফ ইন্ডিয়ার অরিজিনাল কপি এক খদ্দেরকে দুশো টাকায় বিক্রি করে দিল। আমার হিসেবে তখনকার দিনেও খিজির ওই বইটা বিক্রি করে পাঁচ হাজার টাকা হেসেখেলে পেতে পারত।

পরের কয়েকমাসে খিজিরকে আমি হাতে ধরে দুষ্প্রাপ্য-বইয়ের সুলুকসন্ধান চিনিয়েছিলাম। ও আমাকে গুরু মেনে নিয়েছিল। ডাকতও আমাকে উস্তাদ বলে। তো, সেই খিজিরই একদিন আমাকে বলল, উস্তাদ, একজনের একটু উপকার করবেন?

বললাম, কী ব্যাপার?

খিজির জানাল, বেকবাগান রোডে ওদের বাড়ির কাছেই এক মুসলিম ভদ্রমহিলা থাকেন। খিজিরের ভাষায়, তিনি একজন ‘আকেলি অওর বেসাহারা অওরৎ।’ ভদ্রমহিলা একটা সমস্যায় পড়েছেন।

আমার নিজেরই তখন প্রচুর সমস্যা ছিল। কাজেই খিজিরের কথায় অত কান দিইনি। প্রাচীন ভারতের নৌ-বিদ্যার ওপরে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে-ওল্টাতে জিগ্যেস করলাম, কেমন সমস্যা?

খিজিরও ক্যাজুয়ালি বইয়ের তাক গোছাতে-গোছাতে উত্তর দিল, নেতাজীর দেওয়া মেডেল নিয়ে কীসব যেন ঝামেলা।

চট করে খিজিরের দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। বললাম, নেতাজী মতলব?

ও বলল, আপ ভি আজীব ইনসান হ্যায়, উস্তাদ। কিতনি নেতাজী পয়দা হুয়ি হ্যায় ইস দুনিয়ামে? নেতাজী বোস। ইয়ানি সুভাষ চন্দর।

জিগ্যেস করলাম, সুভাষ চন্দ্রের দেওয়া মেডেল ওই মহিলার কাছে রয়েছে?

রয়েছে তো। খিজির বলল।

চলো।

আর কোনো কথা নয়। দু-মিনিটের মধ্যে খিজির দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করল। এরকমই গরমের মাস ছিল সেটা। তবু সেই দুপুর আড়াইটের সময় ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম কলেজ স্ট্রিট থেকে বেকবাগান রোড।

বেকবাগান থানার সামনে ট্যাক্সি ছেড়ে দিতে হল; তারপরে আর গাড়ি যাওয়ার মতন রাস্তা ছিল না। একটা সরু গলি ধরে আমরা দুজন এগিয়ে চললাম। ওই গলিটারই মুখের কাছে ছিল খিজিরের বাসা। গলিটার দু-পাশে গায়ে-গায়ে লেগে থাকা ঝোপড়-পট্টি। রাস্তার ওপরে বাচ্চারা খেলা করছিল। ঠেলাগাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেরিওয়ালারা কাটা ফল, চপ, রঙিন সরবত এইসব অখাদ্য বিক্রি করছিল।

মজার কথা, একটু গিয়েই গলিটা শেষ হয়ে গেল আর দেখলাম আমরা একটা বেশ বড়সড় বাগান-ঘেরা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। বুঝতে অসুবিধে হল না­—এই গলিটা আসলে এককালে বাড়িটারই অ্যাপ্রোচ-রোড ছিল। এখন জবরদখল হয়ে গেছে।

খিজির বলল, আসুন স্যার। এই বাড়ি।

বাড়িটা খুব পুরোনো। জরাজীর্ণ বললেই ঠিক হয়। কিন্তু খুবই অন্যরকমের আর্কিটেকচার। কলকাতায় এরকম বাড়ি কমই দেখা যায়। পাঁচিল ঘেরা বাগানের মাঝখানে একতলা বাংলো-প্যাটার্নের বাড়ি। দু-ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে টানা বারান্দা। বারান্দার মাথায় কাঠের জাফরি। মাঝে মাঝে কাঠের থাম। বড়-বড় কাচের শার্সি বসানো জানলা-দরজা। যদিও তখন বাগান বলতে শুধুই জঙ্গল, কাঠের জাফরিতে উঁইপোকার কামড় আর জানলার ফ্রেমে যত না কাচের শার্সি, তার চেয়ে বেশি কাগজের তাপ্পি। ওইজন্যেই বললাম জরাজীর্ণ।

কাঠের উইকেট-গেট ঠেলে বাগানে ঢুকবার সময় দেখলাম গেটের পিলারের গায়ে মার্বেল-পাথরের ফলকে ইংরিজিতে লেখা ‘ব্রিগেডিয়ার আবিদ হুসেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি। ১৯২৭।’

আমাকে সেই নামফলকের দিকে তাকাতে দেখে পাশ থেকে খিজির ফিসফিস করে বলল, উস্তাদ, বিরাট বনেদি ফ্যামিলি ছিলেন এই হুসেনসাহেবরা। পুরো মিলিটারি ফ্যামিলি। আব্বার মুখে শুনেছি, তিন জেনারেশনের ফৌজি ছিলেন ওনারা। এখন অবশ্য মাহফুজা নানি ছাড়া আর কেউই নেই। সবাই মারা গেছেন।

দরজায় কড়া নাড়ার পরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। তারপর একজন মাঝবয়সি মহিলা দরজা খুলে দিলেন। খিজিরকে দেখে হাসলেন। মলিন শাড়ির আঁচলে ভিজে হাত মুছতে-মুছতে বললেন, এসো। ভেতরে এসো। ভালো সময়ে এসেছ। মা এই সবে চান-খাওয়া সেরে উঠল।

খিজির আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই হচ্ছে গীতামাসি। নানির পুরো দেখভালো এরই হাতে।

আমরা কথা বলতে-বলতে সামনের ড্রইং-রুমটার ভেতরে ঢুকলাম। বাইরে জুন-মাসের চামড়া-পোড়ানো রোদ্দুর। ঘরটার ভেতরে গিয়ে বসতেই কিন্তু শরীর জুড়িয়ে গেল। প্রত্যেকটা জানলায় ভারী সবুজ পর্দা। মোটা গাঁথনির দেয়াল ভেদ করে তাপ ভেতরে পৌঁছোতে পারছে না। বহু পুরোনো আমলের একটা সিলিংফ্যান ‘কিট-কিট কিট-কিট’ শব্দ করে ঘুরছিল।

গীতামাসির সঙ্গে খিজির দুয়েকটা কথা বলতে-না-বলতেই অন্দরমহলে ঢুকবার দরজার ওপাশ থেকে পরিষ্কার বাংলায় প্রশ্ন ভেসে এল­—কে এসেছে গীতা? তারপরেই পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন, ঘরের মালকিন­—খিজিরের নানি, গীতামাসির মা, মাহফুজা আলম। সেদিন থেকে আমারও তিনি নানি।

তোকে কী বলব রুবিক, মনে হল ছায়ায় ঢাকা ঘরটা সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অথচ নানির বয়স তখন সাতাশি বছর। সাধারণ একটা সাদা শাড়ি পরেছিলেন, হাতে দু-গাছা সোনার চুড়ি। একমাথা সাদা চুল। শরীরটা ভারী। স্কিন যেন দুধের পাতলা সর, দুধের সরের মতনই তাতে অনেক রিঙ্কলস। সবচেয়ে আশ্চর্য পাখির ডানার মতন ঘন কালো দুটো ভুরু আর ভারি মায়ায় ভরা দুটো চোখ।

খিজির চেয়ার ছেড়ে লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। আসসালামু আলাইকুম।

ওয়া আলাইকুমুস সালাম। খিজির বেটা নাকি?

জি নানি। প্রফেসর সাহেবকে নিয়ে এসেছি।

হাত-পা নেড়ে বলতে যাচ্ছিলাম যে, আমি সাতজন্মেও মাস্টারি করিনি, প্রফেসরি তো দূরের কথা। কিন্তু তার আগেই টুকটুক করে লাঠি ঠুকতে-ঠুকতে এগিয়ে এলেন মাহফুজা আলম। একদম আমার সামনে দাঁড়িয়ে জহুরি-চাঁপার কুঁড়ির মতন সাদা আর সরু আঙুলগুলো আমার গালে মাথায় বুলিয়ে বললেন, বাঃ। ভারি সুন্দর প্রফেসর তো। গালে আবার ঠিক আব্বাস-ভাইয়ার মতনই একগাল দাড়ি। আব্বাস-ভাইয়ার মতনই লম্বা। মাশাআল্লাহ! বেঁচে থাকো বাবা।

সেই প্রথম বুঝলাম, নানি অন্ধ। অমন হরিণের মতন টানা-টানা দুই চোখে দৃষ্টি নেই।

.

মাহফুজা আলম আমাদের বসতে বললেন। নিজেও মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন। তারপর একটু এলোমেলো ভাবে যা বলে গেলেন, সেগুলো ঠিক ওইভাবে বললে তোর শোনার ধৈর্য থাকবে না। আমি একটু গুছিয়ে বলছি, শোন।

ও হ্যাঁ। তার আগে বলে রাখি, ওঁর অন্ধত্বের পেছনে কিন্তু কোনো গল্প নেই। উনিই সেদিন বলেছিলেন, বছর পাঁচেক আগে গ্লকোমা বলে একটা বিচ্ছিরি অসুখে ওঁর চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

নানির কথা শুনে যা বুঝলাম, খিজির ওই কথাটা ভুল বলেনি। সত্যিই ফৌজি ফ্যামিলি ওনাদের। মাহফুজা আলমের দাদু এবং বাবা দুজনেই ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কমিশনড অফিসার। ওঁর বাবার নামই আবিদ হুসেন, যিনি ব্রিগেডিয়ার ব়্যাঙ্ক অবধি উঠেছিলেন। তিনিই এই বাংলো-বাড়ি বানিয়েছিলেন।

নানিরা ছিলেন দুই ভাইবোন। মাহফুজা আর আব্বাস। একটু আগে বললাম না, আমার মুখে হাত বুলিয়ে নানি বলেছিলেন, ঠিক আব্বাস ভাইয়ার মতন দাড়ি। সেই আব্বাস।

আব্বাস হুসেন ছিলেন মাহফুজার থেকে চার-বছরের বড়। ১৯২১ সালে তাঁর জন্ম হয়েছিল।

মাহফুজার যখন মাত্র সাতবছর বয়স, তখন ওদের মা গত হলেন। বাবাকে মানে আবিদ হুসেন সাহেবকে তো বেশিরভাগ সময়ে মিলিটারি ব্যারাকেই পড়ে থাকতে হতো। মনে রাখিস, তখন দুটো ওয়ার্ল্ড-ওয়ারের মাঝের সেই অস্থির সময়। মোটকথা ওই বাংলোবাড়িতে মাহফুজার জন্যে ছিলেন শুধু আব্বাস আর আব্বাসের জন্যে মাহফুজা। অবশ্য এমনিতে ওনাদের বাড়িতে তখন সাহেবি কায়দায় সার্ভেন্ট, কুক, গভর্নেস সবই ছিল। কিন্তু আত্মীয় বলতে শুধু ওই দুজন।

অসম্ভব ভালোবাসা ছিল দুই ভাইবোনের মধ্যে। আব্বাস যেহেতু বড়, তাই মাহফুজাকে একদম চোখের মণির মতন আগলে-আগলে রাখত। ওই ছোট্ট বয়সেই আব্বাস যেন মাহফুজার মা-বাবার ভূমিকাটা নিয়ে নিয়েছিল। সে নিজে ছিল পড়াশোনায় তুখোড়। বোনকে পাশে নিয়ে পড়তে বসত। বোন মেলায় যেত আব্বাস ভাইয়ার সঙ্গে। বিকেলে পার্কে খেলতে যেত যখন আব্বাস ভাইয়া ওই পার্কেই ক্রিকেট খেলছে। এমনকী নানি সেদিন আমাকে হাসতে-হাসতে বলেছিলেন­—বাংলোর পেছনের বাগানে লুকিয়ে-লুকিয়ে বাইসিকেল চালানো অবধি শিখিয়ে দিয়েছিল আব্বাস ভাইয়া।

বংশের ধারা মেনে আঠেরো বছর বয়সেই ইন্ডিয়ান মিলিটা্রি অ্যাকাডেমিতে ফৌজি হবার ট্রেনিং নিতে চলে গেলেন আব্বাস হুসেন। উনিশশো বিয়াল্লিশ সালে, মাত্র একুশ বছর বয়সে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির কাপুরথালা রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দিলেন এবং যোগ দেওয়ার পরেই সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে চলে যেতে হল তাকে। যেতে হল মালয়ে, যেখানে তখন জাপানের সঙ্গে ব্রিটেনের লড়াই চলছে। জাপান অক্ষশক্তির অংশীদার আর ব্রিটেন মিত্রশক্তির।

পূর্ব এশিয়ায় ইংরেজদের সঙ্গে জাপানিদের লড়াইয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবি, জাপানিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আসল লড়াইটা করেছিল ব্রিটিশ রেজিমেন্টের ভারতীয় সৈন্যরা। তার আগে অবধি ব্রিটিশ বীরপুঙ্গবদের সম্বন্ধে যত গল্পকথা তৈরি করা হয়েছিল, ওই কয়েকদিনে সেসব ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।

মাহফুজা আলম ওইসময়ে-লেখা আব্বাস হুসেনের একটা চিঠি আমাকে দেখিয়েছিলেন, যাতে আব্বাস লিখছেন, ‘এই প্রথম ইংরেজরা হাড়ে-হাড়ে টের পেল, জাঙ্গল-ওয়ারফেয়ার কী জিনিস। সাদা চামড়ার লোকগুলো চিরকাল ট্যাঙ্ক, আর্মার্ড-কার আর কংক্রিটের বাঙ্কারের আড়াল থেকে যুদ্ধ করতে শিখেছে। মালয়ের রাবার প্ল্যান্টেশনের মধ্যে তাই ওরা জাপানিদের হাতে স্রেফ কচুকাটা হচ্ছিল।

লড়ছিলাম আমরা, ভারতীয় সৈন্যরা।

লড়ছিলাম আর মরছিলাম।

মরছিলাম আর ভাবছিলাম।

ভাবছিলাম, কীসের জন্যে প্রাণ দিচ্ছি? কাদের জন্যে? দুশো বছর ধরে যারা আমাদের মাতৃভূমিকে চুষে ফোঁপড়া করে দিয়েছে, তাদের জন্যে?’

ওই চিঠিতেই আব্বাস লিখছেন, ‘বুঝলি বোন, আমি একজন কমিশনড অফিসার। দুন অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েট। মাইনে পাই মাসে ষাট টাকা। আর ক্লাস এইট পাশ বিলি রবিনসন, আমাদের কোম্পানির কোয়ার্টার মাস্টার, রান্নাঘরের তদারকি করে, সে মাইনে পায় একশো-পঁচিশ টাকা।’

অনেক দুঃখে তিনি লিখছেন, ‘দেখছি এখানে, এই কুয়ালালামপুরেও আমাদের ওপরে সেই কলোনিয়াল-রুল চেপে বসে রয়েছে। যখন ট্রেনে চেপে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হচ্ছে, তখন কয়েকটা কামরায় হাত-পা ছড়িয়ে গল্প করতে-করতে কুড়ি কি বাইশজন ইংরেজ ফৌজি ট্র্যাভেল করছে আর অন্যান্য কামরাগুলোতে গোরু-ছাগলের মতো গাদাগাদি করে যাচ্ছি আমরা—কালোচামড়ার জওয়ানরা। ইন্ডিয়ার মতন এখানেও রেলের এক কামরায় নেটিভরা সাহেবদের সঙ্গে ট্র্যাভেল করতে পারে না।’

অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল, বুঝলি রুবিক। বাইরে তখন দু-হাজার বারো সালের কলকাতা। অথচ ছায়ামাখা ঘরটার মধ্যে বসে অন্ধ এক বৃদ্ধা বলে চলেছেন প্রায় সত্তর বছর আগের কাহিনি।

নানি চিঠিটা আমার হাত থেকে ফেরত নিয়ে বললেন, বুঝলে প্রফেসরসাহেব…।

এইবার আমি হাত জোড় করে বললাম, নানি। আমাকে বেটা বলে না ডাকলে আমি এক্ষুনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাব।

উনি হেসে ফেললেন। বললেন আচ্ছা বেটা। তাই বলব। একথা তো ঠিকই, যদি বিয়ে-শাদি করতাম তাহলে আমার পোতার উমর তোমার চেয়ে বেশিই হতো। আচ্ছা বেটা, তোমার কি ভালো লাগছে এসব কিসসা শুনতে? আসলে যে ব্যাপারটায় তোমাকে ডেকেছি তার সঙ্গে আব্বাস ভাইয়ার ফৌজি-লাইফের যোগ আছে। তাই বলছিলাম।

বললাম, আমার খুব ভালো লাগছে। আপনি যতক্ষণ প্রাণ চায় বলে যান।

খিজির অনেকক্ষণ ধরে বিড়ি টানবার জন্যে উসখুস করছিল। ও এই সুযোগে, যাই একটু বাড়ি থেকে ঘুরে আসি, বলে কেটে পড়ল। ঘরে রইলাম শুধু আমি আর নানি। নানি আবার বলতে শুরু করলেন—

দু-মাসের মধ্যে জাপানিরা মালয়েশিয়া হাসিল করে নিল। ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান আর ইন্ডিয়ানদের কম্বাইনড ফোর্স আশ্রয় নিল সিঙ্গাপুরের দ্বীপে।

মালয়েশিয়ায় যারা লড়াইটা করেছিল, তাদের শরীর-মন দুইই চাইছিল বিশ্রাম। কারণ, আগেই বলেছি, তার আগে টানা দু-মাস ওরা লড়েছে। একেকজন ভারতীয় সৈনিককে কখনো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, কখনো পাহাড় ডিঙিয়ে কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার করে হাঁটতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রত্যেককে ম্যালেরিয়ায় ধরেছিল। বলাও হয়েছিল ওরা বিশ্রাম পাবে, চিকিৎসা পাবে, পেটভরা খাবার পাবে।

কিন্তু সিঙ্গাপুরে পা রাখামাত্রই ওরা জানতে পারল, জাপানি বাহিনী সিঙ্গাপুর আক্রমণ করেছে আর সেই আক্রমণ ঠেকাবার জন্যে ভারতীয় সৈন্যদেরই গিয়ে দাঁড়াতে হবে উপকূলে­—সমুদ্রপথে এগিয়ে আসা জাপানি নৌবহরের সামনে। সাদারা সামনে এগোবে না। ওরা ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিল। আসলে মালয়েশিয়ায় জাপানিরা বেছে-বেছে ইউরোপিয়ান-প্রিজনারদের গাছের ডালে ঝুলিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছিল কিনা। দশজনকে ওইভাবে মারত আর দুজনকে ছেড়ে দিত। বলত, যা ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে অন্যদের বল, আমাদের হাতে ধরা পড়লে কী অবস্থা হয়।

মোটকথা আব্বাস ভাইয়ারা যখন সিঙ্গাপুর পোর্ট আগলাবার জন্যে পজিশন নিল, তখন ওদের জন্যে কোনো এয়ার-কভার ছিল না। ব্রিটিশ এয়ারফোর্স তখন ব্যস্ত ছিল অন্য জায়গায়। এভাবে তো লড়াই জেতা যায় না। সিঙ্গাপুরও জাপানিরা দখল করে নিল।

উনিশশো বিয়াল্লিশের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের কাছে পূর্ব-এশিয়ার মিত্রশক্তি আত্মসমর্পণ করল। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ তো মিত্রশক্তির অন্তর্গতই ছিল। আব্বাস ভাইয়ারা ব্রিটেনের হয়েই জাপানি সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। তারা জাপানিদের হাতে বন্দি হল। নাম হল প্রিজনার্স অফ ওয়ার। শুধু সিঙ্গাপুরেই সেদিন এরকম পঁচিশ-হাজার ইন্ডিয়ান প্রিজনার্স ছিল।

আমি নানির কথার মধ্যেই বলে ফেললাম, আপনার দাদা নিশ্চয় আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিয়েছিলেন।

নানির চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, বাঃ, তুমি তো সব জানো দেখছি। হ্যাঁ, ওই পঁচিশ-হাজার প্রিজনার্স অফ ওয়ার আর তার সঙ্গে অসামরিক স্বেচ্ছাসেবী­—এই নিয়েই তো আজাদ হিন্দ ফৌজের গোড়াপত্তন হয়েছিল। জাপানি আর ভারতীয়দের উদ্দেশ্য তো আলাদা কিছু ছিল না। এতদিন দাদারা বেতনের বিনিময়ে ব্রিটিশের হয়ে লড়াই করছিল। এবার রাসবিহারী বসুর মতন নেতাদের ডাকে তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন চোখে নিয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করল। গঠিত হল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি কিংবা আই. এন. এ। আজাদ হিন্দ ফৌজ। জাপানের সক্রিয় সাহায্যে ভারতের বাইরে একটা ভারতীয় সৈন্যদল তৈরি করে ওরা ইন্ডিয়ায় ঢোকার প্ল্যান করেছিল।

ওদের লক্ষ্য কী ছিল? নেতাজী তো বলেই দিয়েছিলেন—দিল্লি চলো। টু ডেলহি। তার চেয়ে কম কিছু না।

জিগ্যেস করলাম, আর আপনার বাবা? ব্রিগেডিয়ার আবিদ হুসেন?

নানি বললেন, আব্বা? ভাইয়া আজাদ হিন্দ ফৌজে জয়েন করেছে জানতে পেরেই আব্বা সার্ভিস থেকে রিজাইন করেছিলেন। বাবা ব্রিটিশের সেবা করলে ছেলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ওঠাবে কেমন করে? ভাইয়াকে সেই সঙ্কট থেকে মুক্তি দিতেই আব্বা রিজাইন করেছিলেন।

.

আমাদের মাঝখানের টেবিলে গীতামাসি একটা টিনের ছোট বাক্স নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। বাক্সটার ভেতরে ছিল বহু পুরোনো সব চিঠি। আঙুলের ডগা দিয়ে নাড়াচাড়া করে তারমধ্যে থেকে একটা চিঠি বার করে আমার হাতে তুলে দিলেন নানি। বললেন দ্যাখো তো বেটা, তারিখটা কি উনিশশো চুয়াল্লিশ সালের তেসরা জানুয়ারি?

চিঠিটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। উনি তারিখটা একদম সঠিক বলেছেন। মনে-মনে একটা হিসেব করে দেখলাম, নানি চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন দু-হাজার সাত সালে। এই চিঠিগুলো উনিশশো তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশ সালে ওঁর দাদা ওনাকে লিখেছিলেন। মাঝের বাষট্টি বছরে কতবার করে একেকটা চিঠি পড়লে তবে প্রত্যেকটা চিঠিকে এইভাবে শুধু স্পর্শ দিয়ে চেনা যায়! মনের বিস্ময় মনেই রাখলাম। কারণ ততক্ষণে মাহফুজা আলম চিঠিটা কোলের ওপরে রেখে কথা বলতে শুরু করেছেন—

 উনিশশো চুয়াল্লিশ সালের তেসরা জানুয়ারি। ভাইয়া সেদিন প্রথম নেতাজীকে চোখের সামনে দেখল। দেড়ঘণ্টার ওপরে দাঁড়িয়ে শুনল তাঁর বক্তৃতা। চিঠিটা তুমি যদি পড়ো বেটা, তাহলে বুঝতে পারবে, এর প্রতিটি অক্ষরে ভাইয়ার উত্তেজনার আঁচ লেগে রয়েছে। কেন জানো? আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম যে অপারেশন, সেই অপারেশনে সুভাষ ব্রিগেডের একজন মেম্বার হিসেবে সিলেক্টেড হয়েছিল ক্যাপ্টেন আব্বাস হুসেন।

অনেক অপমানের ইতিহাস রয়েছে এর পেছনে, জানো বেটা। অপমানিত হয়েছিলেন স্বয়ং নেতাজী। মাসাকাজু কাওয়াবে, জাপান রয়্যাল ফোর্সের বার্মা ডিভিসনের হেড, নেতাজীকে বলেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ ফ্রন্টে গিয়ে কি যুদ্ধ করতে পারবে? ওরা বরং আমাদের সৈন্যদের রেশন পৌঁছে দেওয়া, খবর-টবর সংগ্রহ করা এইসব কাজগুলো করুক। আরে, সেটাও তো একরকমের যুদ্ধ।

নেতাজী অবাক হয়ে বলেছিলেন, কেন? পারবে না কেন?

না, এতদিন তোমার ফৌজিরা যাদের হুকুম তামিল করে এসেছে, সেই সাদা চামড়াদের উল্টোদিকে দেখলে রাইফেল ধরে রাখতে পারবে? হাত কাঁপবে না? তাই বলছিলাম আর কী।

নেতাজী জেনারেল কাওয়াবেকে উত্তর দিয়েছিলেন, শুনুন জেনারেল। ভারতের মাটিতে ঢুকবার পর লড়াইটা আমার ফৌজিরাই লড়বে। তোমরা নও। ওরা পয়সার জন্যে লড়ছে না সেটা জানো তো। ওরা লড়ছে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্যে। সেরকম লড়াই তোমরা দ্যাখোনি কখনো।

উনিশশো চুয়াল্লিশ সালের তেসরা জানুয়ারির সেই দেড়ঘণ্টার বক্তৃতায় নেতাজী আমার ভাইয়াদের বলেছিলেন, আমি তোমাদের কোনো আশ্বাস দিতে পারছি না। শুধু ব্রিটিশ নয়, তোমরা জাপানিদের কাছ থেকেও অসহযোগিতা পাবে। হয়তো তোমাদের খাবার জুটবে না, জল জুটবে না, ওষুধের কথা ভুলেই যাও। কারণ ওসবের জন্যে আমাদের জাপানিদের মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। এর পরে যদি কেউ মনে করো শেষ অবধি যেতে পারবে না, তাহলে সে দয়া করে এখানে এই রেঙ্গুনেই থেকে যাও। আর এগিয়ো না। মনে রেখো তোমাদের নেতাজীর সম্মান তোমাদের হাতে।

সুভাষ ব্রিগেডের চারটে রেজিমেন্টের একজন জওয়ানও সেদিন পিছিয়ে আসেনি। উল্টে তারা বলেছিল, কত রক্ত আমরা দিতে পারি আপনি দেখে নেবেন নেতাজী। মণিপুরের নদী রক্তে লাল করে দেব। কিন্তু আপনি রক্তের বদলে আমাদের স্বাধীনতা এনে দেবেন বলেছিলেন, সেটা মনে রাখবেন।

পরের ছ-মাসে রক্ত দিয়েছিল বটে ছেলেগুলো। একটা ব্যাটেলিয়ন আরাকান হয়ে চিটাগঙের কাছে মোওডক পোর্ট ক্যাপচার করে নিয়েছিল। ভাইয়া ছিল মেন ফোর্সের সঙ্গে­—যেটার টার্গেট ছিল কোহিমা। ওরা কোহিমা ক্যাপচার করতে পারেনি।

আমি বললাম, সেটা বোধহয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের গ্রেটেস্ট ট্র্যাজেডি। ওই সময় জাপানি ফোর্স যদি রিট্রিট না করত, যদি আই. এন. এ-কে মেটিরিয়াল-সাপোর্টটুকু দিয়ে যেত, তাহলে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

নানি বললেন, কিছুটা ভাগ্যের খেলাও ছিল। জাপানের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধের রসদ কিনবার জন্যে নেতাজী তখন সাধারণ মানুষের কাছে হাত পেতেছিলেন। তারা নেতাজীকে ফেরাননি।

বার্মার বহু মানুষ নিজেদের সবকিছু উজাড় করে নেতাজীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে রেঙ্গুনের ধনী ব্যবসায়ী হাবিব বিতাই ছিলেন। শোনা যায় কয়েক লক্ষ টাকা নেতাজীর ভান্ডারে তুলে দিয়ে ফকির হয়ে গিয়েছিলেন হাবিব। ‘সেবক-ই-হিন্দ’ উপাধি দিয়েছিলেন তাঁকে নেতাজী।

আবার সেই দিনমজুর মহিলাও ছিলেন। লাইনের একদম শেষে যিনি সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজের পালা যখন এল তখন ছেঁড়া শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে নেতাজীর হাতে তিনটে টাকা তুলে দিয়েছিলেন। ভাইয়া লিখেছে, ওই টাকাটা হাত পেতে নেওয়ার সময় নেতাজীর চোখ থেকে বড়-বড় ফোঁটায় জল গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ওই দিনমজুরের সারা জীবনের সঞ্চয়টা তিনি নিয়ে নিলেন। কিন্তু না নিয়েই বা করবেন কী? এ তো ওই মহিলা দিচ্ছেন নিজের দেশকে। মাকে। নেতাজী ‘না’ করেন কেমন করে?

যাই হোক, এইভাবে যে টাকাটা উঠেছিল, তাই দিয়ে কিছু খাবার-দাবার, ওষুধ ইত্যাদি কিনে তিনি ইম্ফলের রাস্তায় পাঠাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ভয়ঙ্কর পাহাড়ি বর্ষা নেমে গেল। ওই সাপ্লাই আর ফৌজের কাছে পৌঁছল না। জানো বেটা, ওই কোহিমা-ক্যাম্পেনে সুভাষ-ব্রিগেডের যতজন সৈন্য গুলির ঘায়ে মরেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি মরেছিল ফেরার পথে, খেতে না পেয়ে। একেই বলছিলাম ভাগ্যের খেলা।

জিগ্যেস করলাম, আব্বাস সাহেব কি তাহলে ওইখানেই…?

না, না। চমকে উঠলেন মাহফুজা আলম। একটু থেমে যোগ করলেন, তখনই নয়। আরও ছ’মাস বাদে।

নানির গলায় এতক্ষণ যে প্রাণবন্ত ভাবটা লক্ষ করছিলাম সেটা হঠাৎ হারিয়ে গেল। তিনি বললেন, ইম্ফল থেকে রিট্রিট করার সময়ে ওদের কোম্পানির মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র ষাটজন। ষাট জন মিলেই পেছনে তাড়া করে আসা পাঠান-রেজিমেন্টকে আটকে রেখেছিল, যতক্ষণ না অন্যান্য কম্পানির বাকি বন্ধুরা আবার নিরাপদে বার্মার মাটিতে ফিরে যেতে পারে।

ভাইয়াদের হঠানোর জন্যে ব্রিটিশরা ওদের ট্রেঞ্চের ওপর এয়ার রেড করেছিল। বাঁচবার জন্যে ভাইয়া আর ওর সঙ্গীরা পাশের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেছিল কিন্তু তাতেও ভাইয়া ছাড়া কেউ বাঁচেনি। কারণ ব্রিটিশ বম্বারগুলো নাপাম-বম্ব দিয়ে পুরো জঙ্গলটাই জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ভাইয়া অদ্ভুতভাবে সেদিন বেঁচে গিয়েছিল। আসলে ও ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে একটা পাহাড়ি খাদে গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল। আগুন সেদিন ওকে ছুঁতে পারেনি।

বিশ্বাস করা কঠিন, পুরো তিনটে মাস ভাইয়াকে ওই পাহাড়ে লুকিয়ে কাটাতে হয়েছিল। কারণ, ততক্ষণে ইম্ফল-পেগু রোড ব্রিটিশরা আবার ক্যাপচার করে ফেলেছে। সারা রাস্তা থিকথিক করছে মিত্রশক্তির মিলিটারিতে। ভাইয়ার মোটেই ওদের হাতে ধরা পড়ার ইচ্ছে ছিল না। ও যে ওই তিনটে মাস কেমনভাবে বেঁচেছিল, কেমনভাবে তিন মাস বাদে মিলিটারির পাহারা একটু কমলে আবার রেঙ্গুনে গিয়ে নেতাজীর সামনে দাঁড়িয়েছিল, সেটা জানলাম এই কদিন আগে।

শুধু দুটো কথা জানতাম, ও নিজেই লিখেছিল। এক, ফেরার পরে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু নিজের হাতে ওর বুকে সর্দার-এ-জঙ্গ মেডেল পরিয়ে দিয়েছিলেন। আর দুই, ওই পাহাড়ি জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার সময় ও ব্লু-রডোডেনড্রন ফুল দেখেছিল।

রেঙ্গুনে ফেরার পরে আর মাত্র ছ’মাস বেঁচেছিল আমার ভাইয়া, ক্যাপ্টেন আব্বাস হুসেন। উনিশশো পঁয়তাল্লিশের এপ্রিল মাসে জাপানি সৈন্যদের পাশে দাঁড়িয়ে বার্মাকে ডিফেন্ড করার সময়ে ওর বুকে গুলি লেগেছিল। আজাদ-হিন্দ-ফৌজের কেউ কেউ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে সারেন্ডার করেছিল। ও করেনি। সেরকম ধাতুতে তৈরি ছিল না ও। আব্বাও এই খবর পাওয়ার পরে মাত্র একবছর বেঁচেছিলেন। ওঁরা কেউই ভারতের স্বাধীনতা দেখে যাননি।

আমি দেখলাম। একা। এই বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম উনিশশো-সাতচল্লিশের পনেরোই অগাস্ট, তার জলুস। তবে তার আগের কয়েকদিনে এই কলকাতার রাস্তাতেই যে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখেছিলাম তার কথা আর জিগ্যেস কোরো না। শুধু প্রতিজ্ঞা করো, সেরকম দিন আর কলকাতার বুকে আসতে দেবে না।

.

কাম কা বাত কুছ হুয়ি কেয়া, নানি? দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সাবধানে জিগ্যেস করল খিজির।

নানিও ততক্ষণাৎ ছদ্ম রাগে ধমকে উঠলেন, চুপ যা তু বেত্তমিজ। ব্রিগেডিয়ার আবিদ হুসেনকা বেটি বেফজুলকা বাত কব করতি হ্যায়? খিজিরের মুন্ডুটা আবার সুড়ুৎ করে দরজার বাইরে বেরিয়ে গেল।

নানি বললেন, না, সত্যি। এবার কাজের কথাটা বলি। কতক্ষণ তোমাকে আটকে রাখব!

বড়ে ভাইয়াকে তার ব্রিগেডের লোকজন রেঙ্গুনেই সমাধিস্থ করেছিল। আমার আব্বার তার জন্যে কোনো দুঃখ ছিল না। আমারও না। এই দেশে তখন আজাদ-হিন্দ-ফৌজের সদস্যদের সম্বন্ধে অনর্গল কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছে ইংরেজরা। ওই রেঙ্গুনের যুদ্ধেই ভাইয়ার যে সঙ্গীসাথীরা ব্রিটিশের কাছে সারেন্ডার করেছিল, দেশদ্রোহী বলে তাদের কোর্ট-মার্শাল হচ্ছে এখানে, এই ভারতের মাটিতে। তার চেয়ে রেঙ্গুনের মাটিতেই ভাইয়ার সম্মান ছিল বেশি।

ভাইয়া আর আব্বার মৃত্যু আমাকে অনেকদিন কেমন যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এত বড় দুনিয়ায় আমি একটা কুড়ি-বছরের মেয়ে…একদম একা। কেমন যেন পাগল-পাগল লাগত। সেইসময় আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন এখানকার মসজিদের মৌলবিসাহেব। তিনিই আমাকে কয়েকটা চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন।

যুদ্ধে যে-শিশুগুলো অনাথ হয়ে গিয়েছিল, কিছুটা আমার শিক্ষা দিয়ে, কিছুটা আমার অর্থ দিয়ে, তাদের মানুষ করে তোলার কাজে ডুবিয়ে দিলাম নিজেকে। বিয়ে-শাদি করার কথা মনেও পড়েনি। বছর দশেক বাদে কলকাতার একটা নামি স্কুলে টিচারের চাকরি পেলাম। ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে বাকি দিনগুলোও দিব্যি কেটে গেল। যতদিন চোখ দুটো ঠিক ছিল, এমনিই মাঝে মাঝে গিয়ে সেই স্কুলে গিয়ে পড়িয়ে আসতাম। পাড়াতেও তো দেখছ গরিব লোক অনেক। ওদের বাচ্চাদেরও পড়াতাম­—ওই বারান্দায় বসে।

খারাপ অবস্থায় পড়লাম চোখের দৃষ্টিটা চলে যাওয়ার পর। তাও মালিক মেহেরবান। তিনিই গীতাকে জুটিয়ে দিয়েছেন। নিজের মেয়ে থাকলে সেও বোধহয় এতটা করত না, যতটা গীতা আমার জন্যে করে।

ভাইয়ার কথা খুব ভাবি, চিরকালই ভাবি। ওই তো আমার সব ছিল। ওর স্মৃতিচিহ্ন বলতে ওই চিঠিগুলো ছিল, আর ছিল ওর দুন অ্যাকাডেমিতে চলে যাওয়ার আগের জামাকাপড়, ক্রিকেট-ব্যাট, ব্যাডমিন্টন ব়্যাকেট, এইসব। বইখাতাগুলোও যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছি ওর ঘরে। এইসব নেড়েচেড়ে দেখতাম আর ওর কথা ভাবতাম।

কোনদিনও ভাবিনি এই স্মৃতিচিহ্নের সঙ্গে আরও কিছু যোগ হতে পারে।

খেয়াল করলাম, কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মাহফুজা আলমের মুখটা শুধু যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাই না, একেবারে একটা কিশোরী মেয়ের মতন কৌতুকে ঝলমল করে উঠল। হাতের পিঠ দিয়ে হাসি আড়াল করতে-করতে কোনোরকমে বললেন, বলো তো বেটা, আব্বাস ভাইয়া কেন সেই নীল রডোডেনড্রনের কথা বারবার চিঠিতে লিখত? পারবে না। কিছুতেই পারবে না। আরে, মিঞাসাহেব যে প্রেমে পড়েছিল। নীল রডোডেনড্রনের প্রেমে।

ওঁর কথা শুনে আমি কেমন যেন ভ্যাবলা মেরে গেলাম। বললাম, মানে?

ব্লু-রডোডেনড্রনকে পাহাড়ি লোকেরা কী বলে ডাকে জানো?

জানি। নীল গুরাস।

ও যে মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, তার নাম নীলি। নীলি মেইতেই। মণিপুরের আদিবাসী মেয়ে।

আমতা-আমতা করে বললাম, কিন্তু ওই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মধ্যে…‘কুইন ঝাঁসি রেজিমেন্ট’ ছিল অবশ্য…নীলি ম্যাডাম কি তাহলে ওই রেজিমেন্টের মেম্বার ছিলেন?

আবার বাচ্চা মেয়ের মতন হেসে উঠলেন নানি। বললেন, ধুর বাপু। তোমার কিচ্ছু মনে থাকে না। বললাম না, ভাইয়া জঙ্গলের মধ্যে তিন মাস লুকিয়ে ছিল। ওই তিন মাস ও ছিল নীলিদের বাড়িতে।

একটু দম নিয়ে, একঢোক জল খেয়ে নানি বললেন, লজ্জা পেয়ো না। আমারও কথাগুলো শুনে প্রথমটায় তোমার মতনই অবস্থা হয়েছিল। তাও তো সে ছিল আমার মায়ের পেটের ভাই। তুমি তো আব্বাস হুসেনের কিছুই জানো না।

বললাম, আপনি কি এতদিন বাদে সে কথা জানলেন?

হ্যাঁ, ঠিক পাঁচ দিন আগে। এইরকম সময়েই একটা ছেলে এসে দরজায় নক করল। গীতা ওর সঙ্গে কথা বলে এসে বলল একজন নেপালি ছেলে এসে আমাকে খুঁজছে। বলছে আব্বাস হুসেনের কিছু জিনিস ওর কাছে রয়েছে। আমি তো অন্ধ চোখ নিয়েই প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এই ঘরে এলাম। তারপর শুনলাম তার কথা।

নেপালি নয় মোটেই। সরু সরু চোখ আর বোঁচা নাক দেখলেই গীতা বলে নেপালি। আসলে ছেলেটা মণিপুরী। গ্রামের নাম মোরবাং। ওর নাম বিষ্ণোই মেইতেই। গীতা যা বলেছিল, তাতে মনে হয়েছিল বিষ্ণোইয়ের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। সে নাকি খুব রঙচঙে জামা প্যান্ট পরেছিল। চোখে কালো সানগ্লাস। দিব্যি চালাক-চতুর কথাবার্তা। আমার সঙ্গে হিন্দিতেই কথা বলছিল।

ও যা বলল, শুনে বেশ অবাক লাগল। ও বলল, মোরবাং গ্রামে এক বৃদ্ধা থাকেন, তার নাম নীলি মেইতেই। তিনি উইডো। স্বামী মারা গেছেন অনেকদিন আগে। ছেলে-মেয়ে নেই। এই বিষ্ণোই ছেলেটা হচ্ছে নীলির ভাশুরের ছেলে।

নীলির শরীর ভালো নয়। কবে আছে কবে নেই অবস্থা। তাই নীলির যা সম্পত্তি সব এই বিষ্ণোই ছেলেটাই পাবে। কিন্তু তার আগে নীলি এক শর্ত চাপিয়েছে। বিষ্ণোইকে কলকাতায় গিয়ে কোনো এক মাহফুজা আলমকে খুঁজে বার করে তার হাতে কয়েকটা জিনিস তুলে দিতে হবে। মাহফুজা ফোনে নীলিকে জানাবেন যে, জিনিসগুলো তিনি পেয়েছেন। তবেই নীলি তার উইলে বিষ্ণোইকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করবেন।

আমি তো মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাও বললাম, দাও দেখি, কী পাঠিয়েছেন তোমার কাকিমা। তাতে বিষ্ণোই বলল, সেগুলো সেদিন সঙ্গে করে নিয়ে আসেনি। হোটেলের ঘরে রেখে এসেছে। কারণ আমাকে খুঁজে পাবেই কিনা তাই তো সে জানত না। কাকিমা তাকে শুধু বলতে পেরেছিল, মাহফুজা হচ্ছে আব্বাস হুসেনের বোন, লেকবাগানে থাকে। তাতে প্রথমে দুদিন ধরে বিষ্ণোই ঢাকুরিয়া লেকের আশেপাশে সবক’টা রাস্তা খুঁজেছে। তারপর লিচুবাগানে দুদিন। আজ পঞ্চমদিনে বেকবাগানে এসে আমাকে ধরতে পেরেছে। ওস্তাদ ছেলে বলতে হবে।

যাই হোক, আমি বললাম, তুমি আমাকে নীলির ফোন নম্বর দাও, আমি ওর সঙ্গে কথা বলব। ও ফোন নম্বর দিল। নীলি নিজেই ফোন ধরেছিল। যা বুঝলাম, আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট ও। ওই ভাঙা ভাঙা হিন্দিতেই ও আমাকে সেই যুদ্ধের দিনগুলোর কথা বলতে শুরু করল। আমি তো যত শুনছি, তত কাঁদছি।

অন্য কিছু নয় জানো, আমি ফৌজি ফ্যামিলির মেয়ে-ভাইয়ার ওই সময়ের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে আমার কান্না আসেনি। আমি শুধু ভাবছিলাম, এই পৃথিবীতে তাহলে আরেকজন ছিল যে আব্বাস হুসেনকে চিনত, ভালোবাসত? তাহলে তার সঙ্গে আগে কেন আলাপ হল না, খুদা? দুটো কথা বলে, দুটো স্মৃতি ভাগ করে নিয়ে তো বাঁচতাম। নীলিকে বললামও সেই কথা। আরও আগে কেন যোগাযোগ করোনি বোন?

নীলি বলল, ওর স্বামী ছিলেন, সংসার ছিল। তাই সারাজীবন আব্বাসের কথা লুকিয়েই রেখেছিল। আব্বাস ছিল ওর মনের মধ্যে। আর আব্বাস ভাইয়ার মৃত্যুর পরে আব্বাসের কয়েকটা ব্যবহৃত জিনিস নীলির হাতে এসেছিল। সেগুলোও নীলি যত্ন করে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল। ভেবেছিল যতদিন বাঁচবে ততদিন ওগুলো নিজের কাছেই রাখবে।

কিন্তু হঠাৎই কিছুদিন আগে ওর একটা স্ট্রোক হল। তারপর থেকেই নীলির চিন্তা হল, ও মরে গেলে কী হবে! বিষ্ণোইয়ের মতন ছেলে যদি টান মেরে জিনিসগুলো রাস্তায় ফেলে দেয়। তখন ওর মনে পড়ল, আব্বাসের বোনের কথা, মানে আমার কথা। ভাবল আমি যদি এখনো বেঁচে থাকি, যদি পুরোনো পাড়ার কাছাকাছি থাকি, তাহলে আমার কাছে এই জিনিসগুলো আদরে থাকবে। তাই বিষ্ণোইয়ের হাতে জিনিসগুলো দিয়ে পাঠিয়েছে। শুধু বেকবাগান নামটা ভুলে গিয়েছিল… বলেছিল লেকবাগান।

আমি বললাম, কিন্তু আব্বাস সাহেবকে নীলি ম্যাডাম খুঁজে পেলেন কোথায়? উনি তো মারা গিয়েছিলেন রেঙ্গুনে। আর ম্যাডাম তো মণিপুরের মেয়ে।

শোনামাত্রই মাহফুজা আলমের মুখটা আবার খুশি খুশি হয়ে উঠল। বললেন, সে তো অনেক গল্প। সেই গল্পই তো নীলির কাছ থেকে গত কয়েকদিন ধরে দফায়-দফায় শুনছি।

বললাম, তাই নাকি! আপনাদের মধ্যে কথা হচ্ছে?

নানি বললেন, হবে না? কপাল ভালো হলে তো আমাদের মধ্যে বউদি আর ননদের সম্পর্ক হতো। বেশ, তা নাই হলাম। কিন্তু দুজনেই যখন দুজনের ফোন নম্বর পেয়ে গেছি, তখন বন্ধু হতে আপত্তি কোথায়?

আমি ঘাড় নাড়লাম। ঠিকই তো। তা কী জানতে পারলেন নীলি ম্যাডামের কাছ থেকে?

সে ভারি রোমান্টিক ব্যাপার। তুমি ভেবো না যে আটষট্টি বছর আগে দুনিয়ায় রোমান্স ছিল না।

.

সেদিন দুপুরে পাহাড়ের ঢালে ছাগল চরাচ্ছিল মোরবাং গ্রামের কিশোরী নীলি। এমন সময় হঠাৎ কড়কড় করে মেঘ ডাকার মতন শব্দ। গত কয়েকমাসে নীলি এসব শব্দ খুব চিনে গেছে। সে এখন শুধু কানে শুনেই বলে দিতে পারে কোনটা রাইফেলের শব্দ আর কোনটা মর্টারের। ওই মেঘডাকার মতন শব্দটা যে বম্বার প্লেনের সেটা বুঝতে ওর একটুও দেরি হল না, আর বুঝতে পারা মাত্রই নীলি খরগোশের মতন দৌড়ে চলল একটু দূরের ওই ন্যাড়া জমিটার দিকে।

ভাগ্যিস ক’দিন আগেই ওখানে একটা বড়সড় ধস নেমেছে। তাইতো পাহাড়ের মাথা থেকে কয়েকটা বিশাল বোল্ডার গড়াতে-গড়াতে এসে থেমেছে ওইখানে। ওই বোল্ডারগুলোই একমাত্র এখন নীলিকে বাঁচাতে পারে।

দুটো বোল্ডারের মাঝখানে একফালি জায়গায় শরীরটাকে গুঁজে দিয়ে ভয়ে কাঁপছিল নীলি। ওদের গ্রামটা বড়-রাস্তার কাছাকাছি হওয়াতেই হয়েছে বিপদ। যত মিলিটারির যাতায়াত ওই রাস্তা দিয়ে, আর যত মারামারি তাও ওই রাস্তায়—যেটা সোজা চলে গেছে এদিকে ইম্ফল আর ওদিকে বর্মা বর্ডারে পোগো।

নীলি গোরা সৈন্য দেখেছে, জাপানি সৈন্যের গল্পও শুনেছে। দু-দলই সমান খারাপ, সমান নিষ্ঠুর। মেয়েদের ওপর যা অত্যাচার করে, ভাবাও যায় না। শুধু কদিন হল আশ্চর্য কিছু ভারতীয় সৈন্য এসে ঘাঁটি গেড়েছে ওদের গ্রামের ওপরের রাস্তায়­—জঙ্গলটার ওপাশে।

যদিও ভারতীয়, তবু ওরা কিন্তু গোরাদের হয়ে লড়ছে না। গোরাদের বিরুদ্ধেই লড়ছে। ওদের উর্দিগুলো ছেঁড়াখোঁড়া, রাইফেলগুলো পুরোনো, জুতোয় হা, কাঁধের ব্যাগে একটা মাত্র পাতলা কম্বল। তবু ওই ফৌজিগুলোকে দেখলে মনে হয় নিজের ঘরের লোক। নীলিদের গ্রামের লোকেরা সাহস করে ওদের ক্যাম্পে খাবার বিক্রি করতে গিয়েছিল কয়েকবার। নীলি নিজেও গিয়েছিল। ওদের গোরুর দুধ কিছুটা বাড়তি হয়েছিল সেদিন। বাবা-মাকে কিছু না বলে নীলি একটা মাটির হাঁড়িতে করে সেই দুধটুকু নিয়ে ওদের ক্যাম্পে গিয়েছিল।

যাওয়ার পথে ওদের গ্রামের লৌহন দাদু নীলির সঙ্গে গল্প করতে-করতে হাঁটছিল। লৌহন দাদু ব্যবসার কাজে প্রায়ই বাইরে বেরোয়। তাই দুনিয়ার খবর কিছুটা রাখে। তো সেদিন দাদু বলছিল, ওরা নাকি আজাদ-হিন্দ-ফৌজের সেপাই। ওদের সেনাপতির নাম নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। ওরা জাপানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইংরেজদের ভারত থেকে তাড়াবার চেষ্টা করছে।

সেদিন নীলি আর ওর সঙ্গীরা আজাদ-হিন্দ-ফৌজের ক্যাম্পে পৌঁছনো-মাত্র ফৌজিদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছিল। তার আগে কয়েকদিন না খেয়েই ছিল বোধহয় ওরা। মকাই, শসা, রামদানা, বাদাম­—নীলিরা যে যা নিয়ে গিয়েছিল, সব ওরা কিনে নিল। তারপর ওদের সামনেই হামহুম করে খেতে আরম্ভ করে দিল। ওদের খাওয়া দেখে চোখে জল আসছিল নীলির। একবার কাঁখে ধরে রাখা মাটির হাঁড়িটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নীলি ভাবল, কী হবে এইটুকু দুধে? কে খাবে?

ভাবতে না ভাবতেই লম্বা-মতন, দাড়িওলা একজন ফৌজি ওর সামনে দাঁড়িয়ে হিন্দিতে জিগ্যেস করল, তুমি হাঁড়িতে করে কী এনেছ? মাছ?

নীলি শুকনো-মুখে মাথা নেড়ে বলল, না। দুধ।

তারপর বলল, কিন্তু বড্ড অল্প। তোমরা অনেকগুলো লোক। কে খাবে?

দাড়িওলা লোকটা বলল, খাবার লোক রয়েছে একজন। এসো দেখাচ্ছি। ওর জন্যেই খোদা তোমার হাতে দুধ পাঠিয়েছেন। এসো।

মাটির একটা গর্তের মধ্যে তেরপল বিছিয়ে শুয়েছিল এক ফৌজি। তীব্র ওষুধের গন্ধেও তার কাটা পায়ের ঘায়ের দুর্গন্ধ চাপা পড়ছিল না। দাড়িওলা ছেলেটা বলল, ও সলিড কিছু খেতে পারছে না। সকালবেলায় একটু আটা গুলে খাওয়াতে গিয়েছিলাম। খেতে পারল না। বমি করে দিল। তোমার ওই দুধটুকুর দাম কত?

নীলির চোখে তখন এত জল এসে গিয়েছিল যে ও ভালো করে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। হাঁড়িটা ট্রেঞ্চের মাটিতে সাবধানে নামিয়ে রেখে বলেছিল, দাম লাগবে না।

তারপর বলল, আমি কালকেও আবার দুধ নিয়ে আসতাম। কিন্তু কাল গ্রামের কেউ আসবে না।

তাতে কী হয়েছে? তুমি একাই এসো।

ভয়ার্ত মুখে নীলি বলেছিল, না না! ফৌজিরা মেয়েদের ওপর অত্যাচার করে। ওদের কাছে কক্ষনো একা যেতে নেই।

দাড়িওলা অল্প হাসল। বলল, আমরা যখন রেঙ্গুন থেকে বেরোচ্ছিলাম, তখন নেতাজী বলে দিয়েছিলেন, যদি দ্যাখো কোনো ফৌজি ভারতের মাটিতে কোনো মেয়ের গায়ে হাত দিচ্ছে, সে ফৌজি নিজের পক্ষেরই হোক কিম্বা শত্রুপক্ষের, তাকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে মারবে। খুদা-কসম, আমি সেরকম জানোয়ারকে গুলি করে মেরেছি। তোমার কোনো ভয় নেই। কালকেও একটু দুধ খাইয়ে যেও বেচারা রবি সাহানিকে। রবি আর বেশিদিন বাঁচবে না।

পরেরদিন গিয়েছিল নীলি, একাই। ক্যাম্পের বাইরে শুকনোমুখে বসেছিল সেই দাড়িওলা ফৌজি। নীলিকে দেখে ঘাড় নেড়েছিল। বলেছিল, নাঃ, লাগবে না। রবি কাল রাতে চলে গেছে। নীলি পায়ে-পায়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল।

কিন্তু সেসব তো তিনদিন আগের কথা। আপাতত নীলি ভাবছে প্রাণ বাঁচানোর কথা।

বম্বার প্লেনগুলো একটু আগে বোমা ফেলে ফিরে গেছে। এখন মাথার ওপরের জঙ্গল জ্বলছে। ওরা যদি আবার ফিরে আসে?

না, তার আগেই যেভাবে হোক গ্রামে পৌঁছতে হবে।

নীলি বোল্ডারের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আবার খরগোশের মতন দৌড় লাগাল গ্রামের দিকে। ওদের গ্রামটা পাহাড়ের থেকে বেরিয়ে-আসা একটা পাথরের কার্নিশের নীচে হওয়ায় আকাশ থেকে দেখা যায় না। সেইজন্যে অন্য সব জায়গার থেকে ওদের মোরবাং গ্রামটা নিরাপদ।

কিন্তু গ্রামে পৌঁছনোর একটু আগে নীলি দেখতে পেল, সেই লম্বা দাড়িওলা জওয়ান মাটির ওপরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। একবার ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল নীলি। জ্বলন্ত গাছপালার দেয়ালের মাঝখানে এক জায়গায় একটু ফাঁক। তার নীচের পাহাড়ের ঢালে ঝোঁপঝাড়গুলো দলে-পিষে গেছে। এই লোকটা তার মানে ওখান দিয়েই গড়িয়ে পড়েছে।

নীলি লোকটার পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে ওর কাঁধে ধাক্কা দিয়ে ডাকল, এই! এইই!

লোকটা নড়াচড়া করল না। চোখও খুলল না। শুধু ওর মুখ দিয়ে একটা কাতর গোঙানি বেরিয়ে এল আর তখনই নীলির চোখে পড়ল ওই দাড়িওলা ফৌজির ডান পা-টা অদ্ভুতভাবে দুমড়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কয়েকটুকরো হয়ে ভেঙে গেছে ওই পা-টা।

.

মাহফুজা আলম বলে চললেন, পরের দুটো দিন ভাইয়ার মাথার কাছ থেকে নড়েনি নীলি। দু-দিন বাদে ভাইয়ার জ্ঞান ফিরল। নীলিদের গ্রামের কবিরাজমশাই হাড়জোড়া মলম আর লতাপাতা দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন বড়ে ভাইয়ার ভাঙা পা। চিকিৎসা ভালোই করেছিলেন নিশ্চয়, কারণ, দেড়মাসের মাথায় বগলের তলায় একটা ভাঙা গাছের ডাল নিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতে পারল ভাইয়া।

এই দেড়মাসের মধ্যে নীলির বাবা-মা আর গ্রামের অন্য লোকেরাও বহুবার বড়-রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চেষ্টা করেছে, যদি আজাদ-হিন্দ-ফৌজ বা জাপানি আর্মির কোনো কনভয় দেখা যায়, তাহলে আব্বাস হুসেনকে তারা ওদের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারত। কিন্তু কনভয় তো দূরের কথা, সেরকম একজন সিপাই-এরও দেখা মেলেনি। পেগু-ইম্ফল রোড তখন পুরোদস্তুর মিত্রশক্তির দখলে।

গ্রামের সবাই জানত, ক্যাপ্টেন আব্বাস হুসেন যতক্ষণ মোরবাং গ্রামে রয়েছে, ততক্ষণ ওদের সবারই মাথায় খাড়া ঝুলছে। একবার যদি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির কোনো লোক কোনোভাবে খবর পায় যে, এই গ্রামের লোকেরা আজাদ হিন্দ ফৌজের একজন অফিসারকে আশ্রয় দিয়েছে, তাহলে ওরা পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে তো নিশ্চয়ই, খুনও করবে গ্রামের সবক’টা লোককে।

দুয়েকজন মোড়ল সেইজন্যে এরকম প্রস্তাবও দিয়েছিল যে, তার চেয়ে আব্বাস হুসেনকে আমরা নিজেরাই ইংরেজদের হাতে তুলে দিই। নীলি তাই শুনে নিজের গলায় ঘাস কাটবার হাসুয়াটা ঠেকিয়ে বলেছিল, তাহলে আমাকে বাঁচাতে পারবে না।

তবে তারপর গ্রামের সবার মঙ্গলের কথা ভেবে, নীলি আর ওর মা আব্বাস ভাইয়াকে নিয়ে গ্রাম থেকে অনেকটা দূরে এক পাথরের ঘরে গিয়ে উঠেছিল। ওই ঘরটায় শীতকালে যাযাবর মেষপালকেরা আশ্রয় নিত। তখন আশ্রয় নিয়েছিল নীলিরা।

বুঝলে বেটা, রেঙ্গুনে ফেরার পরে ভাইয়া যে-চিঠিগুলো লিখেছিল, তার থেকে বেশ বুঝতে পারি, ওইসব চিঠিতে যে নীল রডোডেনড্রনের কথা লিখেছিল, ছোট্ট একটা পাহাড়ি নদী আর সবুজ ঘাসে মোড়া পাহাড়ের ঢেউয়ের কথা লিখেছিল, ঝোপঝাড় থেকে নানারকমের বেরী খুঁজে খাওয়ার কথা লিখেছিল, সবই ওই পাহাড়ের ঘরটায় নীলি আর ওর মায়ের সঙ্গে কাটানো তিরিশটা দিনের স্মৃতি।

হ্যাঁ, মাত্রই ত্রিশ দিন। তার বেশি ভাইয়াকে ধরে রাখা যায়নি। মোরবাং গ্রাম যতই স্বর্গের মতন হোক, ওর আসল স্বর্গ পড়েছিল রেঙ্গুনে, যেখানে ওর সহযোদ্ধারা শেষ লড়াই লড়ছিল। তাই সেই অ্যাকসিডেন্টের ঠিক আড়াই-মাসের মাথায় ভাইয়া জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে লুকিয়ে-লুকিয়ে রেঙ্গুনের দিকে রওনা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল নীলি। নাহলে পথ দেখাত কে?

রেঙ্গুনে পৌঁছনোর পরে নীলি ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে ওখানেই থেকে গিয়েছিল। কালকেই ও ফোনে বলছিল, ওর ওই সিদ্ধান্তের পেছনে যতটা না দেশভক্তি ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল অসুস্থ আব্বাস হুসেনকে চোখে-চোখে রাখার ইচ্ছে।

ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টের মেয়েরা আজাদ-হিন্দ-ফৌজের মেডিকাল-ইউনিটে নার্সের কাজও করত। বড়ে ভাইয়া যখন রেঙ্গুন রক্ষার লড়াইয়ে মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হল, তখন নীলি ওই ওয়ার্ডে নার্সের কাজ জোগাড় করে নিয়েছিল। ভাইয়ার শেষ সময়ে নীলিই ওর পাশে ছিল। সে যে কত বড় যন্ত্রণার মুহূর্ত, সে আমি কেমন করে আন্দাজ করব বলো, বেটা। তবে নীলির পক্ষে যন্ত্রণার হলেও, ভাইয়া নিশ্চয় মৃত্যুর সময় কপালে একটা হাতের ছোঁয়ায় একটু শান্তি পেয়েছিল। নীল গুরাসের পাপড়ির মতন নরম আর ঠান্ডা একটা হাত…নীলি মেইতেইয়ের হাত।

.

স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম নানির কথা। মনে হচ্ছিল, আগুন, বুলেট আর বারুদের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে বুকে হেঁটে এগিয়ে চলা এক তরুণ আর এক তরুণীকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

কিছুক্ষণ পরে নানিকে বললাম, ক্যাপ্টেন আব্বাসের ডেথ-বেডের পাশে যখন নীলি মেইতেই উপস্থিত ছিলেন, তাহলে ওঁর যা কিছু স্মৃতিচিহ্ন সব কি নীলির হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল?

মাহফুজা আলম বললেন, তুলে দেওয়ার মতন লোকও তখন ছিল না। শহর জুড়ে তখন মিত্রশক্তির ধরপাকড়। লুঠতরাজ আর আগুন লাগানো। আই.এন.এর লিডাররা সকলেই তখন হয় বন্দি নয় পলাতক। নীলি হসপিটালের ইন-চার্জের কাছ থেকে ভাইয়ার ক্যাম্বিসের ব্যাগটা চেয়ে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আর একমিনিটও ওখানে থাকেনি। ফিরে এসেছিল মোরবাং গ্রামে। বিয়ে করেছিল, সংসার করেছিল। সবাই আস্তে আস্তে ভুলে গিয়েছিল আব্বাস হুসেনের কথা।

জিগ্যেস করলাম, তারপর? সেই ব্যাগটাই কি নীলি ম্যাডাম বিষ্ণোইয়ের হাতে ফেরত পাঠিয়েছেন?

হ্যাঁ। প্রথমদিন তো বিষ্ণোইয়ের সামনে বসেই আমি নীলিকে ফোন করলাম। তখন আমি উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি। থাকতে না পেরে ওকে জিগ্যেস করলাম, কী রয়েছে গো ব্যাগটার ভেতরে?

নীলি বলল, তেমন কিছু না। দুয়েকটা জামাকাপড়, এক সেট ফৌজি উর্দি, রুমির কবিতার বই একটা আর ওই মেডেলটা­—যেটা নেতাজী নিজের হাতে মণিপুর অপারেশনের বীর যোদ্ধাদের বুকে পরিয়ে দিয়েছিলেন। সর্দার-এ-জঙ্গ।

হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। ভাইয়ার চিঠিতে বারবার ব্লু-রডোডেনড্রন, মানে নীল গুরাসের অপরূপ রূপের কথা শুনে আমি বায়না করেছিলাম, যখন কলকাতায় আসবি, আমার জন্যে ওই ফুল নিয়ে আসবি। তাতে ও লিখেছিল, যেতে-যেতে ফুল তো শুকিয়ে যাবে রে বোন। আমি বরং তোর জন্যে নীল গুরাসের বীজ নিয়ে যাব। তুই আমাদের পেছনের বাগানে পুঁতে দিবি। তারপর ফুল হলে দেখবি, পুরো বেকবাগান রোডের চেহারা পাল্টে যাবে।

আমি উত্তরে লিখেছিলাম, হুঁঃ। কত আনবি সে আমার জানা আছে। ঠিক ভুলে যাবি।

ও আবার তার উত্তরে লিখেছিল, ভুলব না। যাতে না ভুলি সেইজন্যেই আমার উর্দির পকেটে ভরে রেখেছি সেই বীজ। আমি যদি কলকাতায় পৌঁছই, তাহলে নীল গুরাসের বীজও তোর কাছে পৌঁছবে।

সেই কথাটাই মনে পড়ে গেল। ভাবলাম, সত্যিই ওর উর্দির পকেটে আছে নাকি নীল গুরাসের বীজ। আর থাকতে না পেরে জিগ্যেসই করে বসলাম নীলিকে—ওর উর্দির পকেটে কোনো গাছের বীজ দেখেছ?

নীলি একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, সেরকম খুঁটিয়ে তো দেখিনি দিদি। থাকতেও পারে। গাছের বীজ তো ছোট্ট জিনিস। ছিল হয়তো সেলাইয়ের ভাঁজে, আমি খেয়াল করিনি।

বিষ্ণোই বলে সেই ছেলেটা কাছেই বসেছিল। চোখে দেখতে পাই না বলে ওর কথা মনেই ছিল না। ও হঠাৎ জিগ্যেস করল, কীসের বীজ, নানি?

বললাম, সে তোমার অত জেনে কাজ নেই বাছা। তুমি অবশ্যই কাল আমার জিনিসগুলো এনে দিও।

গলা শুনে বুঝলাম ছেলেটা বেশ বেজার হল। বলল, সে তো আনতেই হবে। আপনি ফোনে যদি কাকিমাকে না বলেন যে জিনিসগুলো আপনার হাতে পৌঁছেছে, তাহলে সেই বুড়ি আমাকে বাড়ি-জমি লিখে দেবে না। কম শয়তান!

কানে যে কী বিশ্রী লাগল কথাগুলো; শুধু বলতে পারলাম, ছিঃ! ছেলেটাও আর কিছু না বলে সেদিনের মতন চলে গেল। পরেরদিন আবার ওই দুপুরের দিকেই এসে একটা ক্যানভাসের ব্যাগ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, দেখে নিন।

দেখে নেওয়ার কিছু ছিল না। আমি নিজেও জানতাম না যে, আমার স্মৃতি ভাইয়ার প্রতিটি জিনিসকে এত নিখুঁতভাবে ধরে রেখেছে। ও ফ্রন্টের দিকে রওয়ানা হওয়ার আগের রাত্রে ওই ব্যাগ তো আমি নিজের হাতে গুছিয়ে দিয়েছিলাম। সেদিন কত…কত-বছর বাদে আবার হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখছিলাম সেই ব্যাগের খসখসে মোটা কাপড়। দেখছিলাম ভাইয়ার শখের সিভিল ট্রাউজার্স আর শার্ট। রংগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম না বলে খুব দুঃখ হচ্ছিল কিন্তু ছুঁতে পাচ্ছিলাম তাই বা কম কি?

অচেনা জিনিসও ছিল তার মধ্যে। ওই আজাদ-হিন্দ-ফৌজের উর্দি আর মেডেল। ওগুলো আমি আগে দেখিনি। কেমন করেই বা দেখব?

ঠান্ডা-মেটালের গোল বড় মেডেলটা অনেকক্ষণ গালে চেপে ধরে বসে রইলাম। তারপর ওই মিলিটারি উর্দি। হাত বোলালাম বুকের রিবনগুলোর ওপরে, কাঁধের বিল্লায়। তারপর কাঁপা-কাঁপা হাতে পকেটের ফ্ল্যাপ সরিয়ে আঙুল দিয়ে ভেতরে একটু হাতড়াতেই আঙুলের ডগায় উঠে এল কয়েকটা হালকা চ্যাপটা গাছের বীজ। তখন যে আমার বুকের ভেতরটায় কী হচ্ছিল, সে তোমাকে বোঝাতে পারব না বেটা। তারস্বরে ডাকছিলাম­—গীতা, এই গীতা! শিগগির আয়।

গীতা আসার আগেই সেই বিষ্ণোই বলে ছেলেটা পাশ থেকে বলে উঠল, নানি, এবার একবার যদি আমার কাকিমাকে ফোন করে বলে দেন যে, জিনিসগুলো আপনার হাতে পৌঁছে গেছে, তাহলে আমি ছুটি পাই। বুঝতেই পারছেন, আমাকে আজ রাতেই গুয়াহাটির ট্রেন ধরতে হবে।

বললাম, স্যরি, স্যরি। এক্ষুনি আমি নীলিকে বলে দিচ্ছি। দিলামও বলে। তবে সেকি আর এককথায় বলা যায়? বিশেষ করে ওই ব্লু-রডোডেনড্রনের বীজের কথা? শুনে নীলি তো একইসঙ্গে ভীষণ অবাক হল আবার ভীষণ লজ্জাও পেয়ে গেল। ও তো জানত, বড়ে ভাইয়া নীল গুরাসের মধ্যে ওকেই দেখত। সেইজন্যেই নীল গুরাস ওর অত প্রিয় ছিল।

তারপর? জিগ্যেস করলাম নানিকে।

নানি বললেন, এ তো গেল গত পরশুর আগের দিনের কথা। মাঝের দুদিনে নীলির সঙ্গে ফোনে কত কথা হল। ওকে বললাম, জানো বোন। ভাইয়ার পাঠানো ওই গাছের বীজ আমি গীতাকে দিয়ে পেছনের জমিতে লাগিয়ে দিয়েছি। তুমি কি জানো, কতদিনে চারা বেরোয়? কতদিনে ফুল আসে?

নীলি বলল, তা সাত-আট বছর লাগে বোধহয়। আমাদের এদিকে তো আর জঙ্গল নেই। সব কেটে ফেলেছে। আমি নিজেও কতদিন নীল গুরাস দেখিনি, তাই ঠিক মনে পড়ছে না।

আমি বললাম, সে যাই হোক। ফুল ফুটলেই আমি তোমাকে খবর দেব। ততদিন আমরা দুজনে নিশ্চয় বেঁচে থাকব, কী বলো!

ও শুধু একটুখানি হাসল। মুখে কিছু বলল না। কিন্তু মুশকিল কী হল বলো তো, আজ সারাদিনে যতবারই নীলিকে ফোন করছি, বলছে সুইচড অফ। কী জানি, মেয়েটার কী হল!

.

খিজির এবার ঘরে ঢুকে এল। ইশারায় বলল, ওকে দোকান খুলতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি নানিকে বললাম, নানি! আমাকে কী জন্যে ডেকেছিলেন বললেন না তো?

নানি বললেন, দেখেছ। এই হচ্ছে বয়সের দোষ। তোমাকে যেটা বলছিলাম, তুমি একবার ভাইয়ার উর্দি আর মেডেলটা দ্যাখো। এগুলো তো অ্যান্টিক, তাই না?

বললাম, পঞ্চাশ বছরের বেশি পুরোনো আর হিস্টোরিকাল ভ্যালু রয়েছে। কাজেই অ্যান্টিক তো বলা যায়ই।

ওঁর চেয়ারের পাশেই একটা ক্যানভাসের ব্যাগ নামানো ছিল। সেটার মধ্যে থেকে হাতড়ে-হাতড়ে নানি একটা ভেলভেটের কৌটো আর এক সেট ভাঁজ করে রাখা শার্ট-প্যান্ট বার করলেন। বললেন, তাহলে এগুলো তুমি নিয়ে যাও। আমি কবে আছি, কবে নেই। তার চেয়ে তুমিই ওগুলোর একটা বন্দোবস্ত করে দাও।

আমি মেডেলটা আর উর্দিগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখে বললাম, শুনুন নানি। এখন এগুলো আপনার কাছেই থাক। কাউকে দেখানোর দরকার নেই। কাউকে কিছু বলারও দরকার নেই। আমি কথা দিচ্ছি, যদি সেরকম দিন আসে, আমি সেদিন এগুলো ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছে দেব।

নানি ভারি খুশি হয়ে বললেন, ইনশাল্লাহ, বেঁচে থাকো বাবা! এই বুড়ির সঙ্গে তাহলে একটু যোগাযোগ রেখো। যেদিন ওপারে চলে যাব, সেদিন তুমি এগুলো নিয়ে যেও।

.

নানিকে কথা দিয়ে সেদিন আমি আর খিজির বেকবাগানের বাংলো বাড়ি থেকে ফিরে এসেছিলাম। তবে আমি কথার খেলাপ করিনি, বুঝলি রুবিক। প্রতি ছ’মাস অন্তর একবার করে ওঁকে দেখে আসতাম। বসে কিছুক্ষণ গল্প করতাম। এইভাবেই কোথা দিয়ে যেন সাতটা বছর কেটে গেল। বুঝতে পারতাম খুব দ্রুত ওঁর আয়ুর প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে। আরও খারাপ লাগত দেখে যে ওঁর মন ভালো নেই।

দুটো ব্যাপারে উনি অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। এক তো, সেই বিষ্ণোই মণিপুরে ফিরে যাওয়ার পর থেকে আর নীলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, ওরা দুজনে মিলে বাকি জীবনটা আব্বাস হুসেনের স্মৃতিচারণা করে কাটাবেন। সেটা আর বাস্তব হয়নি। আর দুই, যদিও সেই বীজ থেকে চারা গজিয়েছিল, চারায় ফুল আর আসছিল না।

আমাকে একদিন বললেন, যাও না বেটা পেছনের বাগানে। গাছটার একটা পাতা নিয়ে এসো আমার জন্যে।

তাই করলাম। একটা পাতা ছিঁড়ে এনে ওঁর হাতে দিলাম। উনি খুব মায়ার সঙ্গে পাতাটায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি তো নীল গুরাসের গাছ নিজের চোখে দেখেছ। এইরকমই গোল গোল পাতা হয় তো? এইরকমই খসখসে?

আমি বললাম, বিলকুল এইরকমই হয় নানি। কোনো সন্দেহ নেই। উনি নিশ্চিন্তে হাসলেন। কিন্তু একটু বাদেই আবার অস্থির স্বরে বললেন, ফুল কবে ফুটবে বেটা? ভাইয়া যে বলেছিল, আমাকে নীল গুরাসের ফুল দেখাবে। সেইজন্যে মরবার সময় অবধি বুকপকেটে নীল গুরাসের বীজ বয়ে নিয়ে চলেছিল। তো, ওর সেই কথা কি ও রাখতে পারবে না?

আমি ওঁর রোগা হাতের মুঠোটা নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে বললাম, নিশ্চয় পারবেন নানি। আপনি তো এত তাড়াতাড়ি কোথাও যাচ্ছেন না। বড় গাছ তো, ফুল ফুটতে একটু দেরিই হয়।

উনি তখনকার মতন চোখের পাতাদুটো একটু বুজলেন। কিন্তু পরের দিন গিয়ে দেখতাম অস্থিরতা আরও বেড়ে গেছে। আসলে মানুষ বোধহয় বুঝতে পারে সময় ফুরিয়ে আসছে।

তারপর এই দিন কুড়ি আগে ওঁর বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, গীতামাসি খুব চিন্তিত মুখে ঘোরাফেরা করছে। নানি একদম শয্যাশায়ী। গীতামাসি বলল, অবস্থা একদম ভালো নয়। আমি বিছনার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই কেমন করে বুঝলেন কে জানে, বললেন, বোধিসত্ত্ব এসেছ?

বললাম, হ্যাঁ নানি।

এটা ইংরিজির কোন মাস?

মার্চ মাস শেষ হতে চলল নানি।

তুমি বলেছিলে না, এইরকম সময়েই পাহাড়ে রডোডেনড্রন ফোটে?

আমি প্রমাদ গুনলাম। বাড়িতে ঢোকার আগে দেখে এসেছি, পেছনের বাগানে ওই গাছটায় কুড়ি এসেছে।

মুখে বললাম, তাই তো দেখেছি নানি। এবার আপনার নীল গুরাসেও নিশ্চয় ফুল ফুটবে।

এই কদিন নানি অচৈতন্য অবস্থায় ছিলেন, তাই জানতে পারেননি সবে গতকালই ওঁর গাছ ভরে ফুল ফুটেছে। আজ তো উনি চলেই গেলেন। আর জানবার কোনো উপায়ও রইল না। খুব ভালো হল, বুঝলি রুবিক। আমি এইটাই চাইছিলাম।

.

বুধোদার ওই শেষ কথাগুলো আমার গালে একটা জোরালো থাপ্পড়ের মতন আছড়ে পড়ল। হতোভম্ব হয়ে বললাম, এ তুমি কী বলছ, বুধোদা! ওই বৃদ্ধা মহিলাটি এতদিন যার জন্যে অপেক্ষা করেছিলেন, সেই ফুল যখন ফুটতে চলেছে, তখন তুমি তার মৃত্যুকামনা করেছিলে?

বুধোদা সোজা হয়ে বসল। তীব্র-দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কেটে-কেটে বলল, হ্যাঁ, করেছিলাম। কেন করেছিলাম জানিস? ওই ফুল যদি ওঁর চৈতন্য হারানোর আগে ফুটত, যদি গীতামাসি ওই ফুল নানির হাতে তুলে দিত, তাহলে নানি বুঝতে পারত ওটা গুরাস নয়। উনি গুরাস না চিনতে পারেন। কিন্তু একজন বাঙালির মেয়ে পলাশফুল চিনবেন না, তা তো হয় না।

বললাম, তার মানে? আব্বাস হুসেনের উর্দির পকেটে পলাশগাছের বীজ ছিল?

বুধোদা বলল, আব্বাস হুসেনের উর্দির পকেটে কী ছিল আমি জানি না, কারণ সেই উর্দি আমি দেখিনি। তার পকেটে নীল গুরাসের বীজ থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। ছেষট্টি বছর তো কম সময় নয়, তার মধ্যে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। কিন্তু আমি সেই উর্দি দেখিনি। আমি সর্দার-এ-জঙ্গের মেডেলও দেখিনি। আমি দেখেছিলাম কলেজ স্ট্রিট থেকে কেনা সস্তা টিনের একটা মেডেল আর ময়দান মার্কেটের মার্কামারা নাইটগার্ডের পোশাক। সাত-বছর আগে এক অন্ধ বৃদ্ধা আমাকে ওইগুলোই দেখিয়েছিলেন।

আমি খুব অসহায়ের মতন বললাম, কিছুই বুঝতে পারছি না বুধোদা। একটু খুলে বলো।

হ্যাঁ, বলছি। ওই বিষ্ণোই বলে ছেলেটা প্রথমদিন নানির বাড়িতে গিয়ে যে-মুহূর্তে বুঝতে পারে যে নানি অন্ধ, সেই মুহূর্তেই ও ঠিক করে নেয় ওই দুর্মূল্য উর্দি আর মেডেল ও নানিকে দেবে না। যদিও সেদিন ওর কাছেই সেই ক্যানভাসের ব্যাগটা ছিল, কিন্তু ও মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে সেটা ফেরত নিয়ে চলে যায়। পরেরদিন আসল জিনিসগুলো সরিয়ে, ব্যাগের ভেতরে নকল মেডেল আর উর্দি ভরে, নানির হাতে ব্যাগটা তুলে দেয়। আসল জিনিসগুলোর কী হয়েছিল, সেটা তোকে একটু বাদে বলছি।

যে লোক একজন অন্ধ বৃদ্ধাকে ঠকিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের উর্দি আর মেডেল নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, সে যে নীলি মেইতেইয়ের সঙ্গে কী ব্যবহার করবে তা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। তাঁকে খুন যদি নাও করে, রাস্তায় কি আর বার করে দেবে না? সম্পত্তি পাওয়া তো ওর হয়েই গিয়েছে।

নাহলে নীলির ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আর কী কারণ থাকতে পারে বল?

আমার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। তবু কোনো রকমে বললাম, কিন্তু বুধোদা, ওই পলাশের গাছ…?

বুধোদা বলল, বুঝতে পারলি না? বিষ্ণোই যখনই নানির সঙ্গে নীলি মেইতেইয়ের কথোপকথনের মধ্যে শুনেছিল, উর্দির মধ্যে ব্লু-রডোডেনড্রনের বীজ থাকতে পারে, তখনই ও ঠিক করে নেয় যা হোক একটা গাছের বীজ ও ওই সস্তার উর্দির পকেটে পুরে দেবে। আসলে বিষ্ণোই কোনো ব্যাপারেই রিস্ক নেয়নি। যদি উর্দির পকেট ফাঁকা দেখে নানির কোনো সন্দেহ হয়। যদি নানি নীলিকে বলে দেন সে-কথা। ময়দান মার্কেটের পেছনের দিকে কয়েকটা বড়-বড় পলাশগাছ আছে। ওই জুন মাসে গাছগুলোর নীচে বীজ পড়ে থাকাটাই স্বাভাবিক। ওখান থেকেই হয়তো ও কয়েকটা বীজ কুড়িয়ে উর্দির পকেটে পুরে দিয়েছিল। ও জানতো একবার মাহফুজা আলম নীলিকে ফোনে কনফার্ম করে দিলে তারপর পলাশ না পিয়াল তাতে কিচ্ছু আসে যায় না।

.

বুধোদার মুখ থেকে এই অবধি শোনার পর মনটা স্বাভাবিক-ভাবেই খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল। যে স্বাধীনতা আমরা নিশ্চিন্তে উপভোগ করছি, তার জন্যে আব্বাস হুসেনের মতন কত সৈনিকের রক্ত ঝরেছে; নীলি মেইতেইয়ের মতন কত সাধারণ মানুষের জীবন তছনছ হয়ে গেছে। অথচ সেই স্বাধীন ভারতেই আবার জন্ম হয়েছে বিষ্ণোইয়ের মতন নরকের কীটের—একজন অন্ধ বৃদ্ধাকে ঠকিয়ে ওই পবিত্র স্মৃতিচিহ্নগুলো হাতিয়ে নিতে যার এতটুকু বাধে না।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বুধোদাকে প্রশ্ন করলাম, বিষ্ণোই কি এত সহজে পার পেয়ে যাবে বুধোদা? শয়তানটার কিছু শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় না?

বুধোদা খুব শান্তভাবে বলল, পেয়েছে। চূড়ান্ত শাস্তি পেয়ে গেছে।

এই ছোট্ট উত্তরটার মধ্যে এমন একটা কাঠিন্য ছিল যে, আমি চমকে ওর মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ঠিকই। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। চোখদুটো যেন জ্বলছে। বুধোদা খাট থেকে নেমে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। নদীর ওপারের আকাশে তখন সূর্যাস্তের রঙ লেগেছিল। সেদিকে তাকিয়ে বুধোদা বলল, সেদিন কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু যে-মুহূর্তে ওই নকল উর্দি আর নকল মেডেলটা নানি আমাকে আনন্দ করে দেখিয়েছিলেন, সেই-মুহূর্তে আমি মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হয় বিষ্ণোইয়ের কাছ থেকে আব্বাস হুসেনের উর্দি আর মেডেল ফেরত আনব, আর না হলে অ্যান্টিকের ব্যবসা ছেড়ে দেব।

সেইদিন থেকে আমি বিষ্ণোইয়ের পেছনে পড়ে ছিলাম। তুই জানিস, ইন্ডিয়ান অ্যান্টিক-মার্কেটে বোধিসত্ত্ব মজুমদারের একটা সুনাম আছে। এই-লাইনে এমন কোনো বিগ-ডিলার নেই যে আমাকে ভালোবাসে না; যে আমার কাছে কখনো উপকৃত হয়নি। তাই আমি যখন গোপনে তাদের অনুরোধ করলাম যে, আই.এন.এ-র উর্দি আর মেডেল যদি কেউ কোথাও বিক্রি করতে আসে, সেই খবর যেন আমি তৎক্ষণাৎ পাই, তখন তারা আমাকে অগ্রাহ্য করেনি।

প্রথম দু-বছরের মধ্যে তিন তিনবার আমার কাছে এরকম ফোন এল। তিনবারই ফোনের বক্তব্য ছিল মোটামুটি এক—মিস্টার মজুমদার! আপনার পাখি আমার ফাঁদের কাছে এসে বসেছে। চলে আসুন। ধরে নিয়ে যান। অর্থাৎ বিষ্ণোই ওইসব ডিলারদের কাছে আই এন এর উর্দি আর শের-এ-জঙ্গের পদক বিক্রি করতে এসেছিল। একবার গুয়াহাটি, একবার পাটনা আর একবার খোদ আমাদের এই কলকাতায় সে পৌঁছে গিয়েছিল জিনিসগুলো বিক্রি করবার জন্যে।

ওই ডিলাররা তাকে দু-দিন বা তিনদিন বাদে আবার আসতে বলেছিল। কেন বলেছিল বুঝতেই পারছিস…যাতে আমি ইতোমধ্যে অকুস্থলে পৌঁছে যেতে পারি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, বিষ্ণোই ছেলেটা শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত। ওই যে ওকে ঘুরে আসতে বলা হয়েছিল, তাতেই সে সন্দেহ করেছিল কোথাও গড়বড় রয়েছে। সে আর দ্বিতীয়বার ওসব জায়গায় মুখ দেখায়নি। আমি তিনবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিলাম।

আরেকটা কাজ আমি করেছিলাম। নানির কাহিনির মধ্যে থেকে মোরবাং গ্রামের নামটা আমার মনে ছিল। মনে ছিল যে মণিপুরের সেই গ্রামেই বাস করতেন নীলি মেইতেই। আমি সেই গ্রামেও একবার ঘুরে এসেছিলাম। সেখানে গিয়ে দুটো জিনিস জেনেছিলাম। এক, নীলি মেইতেই মারা গেছেন। গ্রামবাসীদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে জানতে পেরেছিলাম, মৃত্যুটা খুব স্বাভাবিক নয়। যেদিন তিনি ভাশুরের ছেলেকে অর্থাৎ বিষ্ণোইকে সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন, তার পরদিনই ফুড-পয়জ়নিং-এ মারা গিয়েছিলেন। খাদ্যে বিষক্রিয়াটা নাকি হয়েছিল জঙ্গলের এক ধরনের ব্যাঙের ছাতা খেয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে একজন আশি বছরের বৃদ্ধা তো আর নিজে জঙ্গলে গিয়ে সেই ছাতা তুলে আনেননি। কেউ নিশ্চয় তাঁর রান্নাঘরে বিষাক্ত জিনিসটা পৌঁছে দিয়েছিল। সে কে?

ওই দূরবর্তী পার্বত্য গ্রামে এমন প্রশ্ন তোলার লোক কম। পুলিশ তো যে কোনো মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখিয়ে কেস ক্লোজ করতে পারলেই বাঁচে। নীলি মেইতেইয়ের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

আর যেটা জানতে পেরেছিলাম, শুধু কাকিমার অর্থাৎ নীলি মেইতেইয়ের সম্পত্তিই পায়নি বিষ্ণোই, সে নিজে মাঝের দু-বছরের মধ্যে এক মাঝারি-মাপের মাফিয়া হয়ে উঠেছে। মণিপুরের মাদকদ্রব্যের ব্যবসা যে কুখ্যাত তা তো জানিস। সেই মাদকের ব্যবসায় হাত দিয়েছে বিষ্ণোই। লোকাল পুলিশ-টুলিশ সব ওর হাতের মুঠোয়। ফলে আমি যতই সাবধানে ওখানে যাই না কেন, আমি পৌঁছবার ঢের আগেই বিষ্ণোই সেই খবর পেয়ে গিয়েছিল এবং ওর গ্রাম ছেড়ে চম্পট দিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, যে দুদিন আমি ওখানে ছিলাম, তার মধ্যে আমার কাছে বেশ কয়েকবার খুনের হুমকি এসেছিল। নেহাত আরও ওপরের মহল থেকে প্রোটেকশন নিয়ে গিয়েছিলাম। নাহলে হয়তো ওরা আমাকে অ্যাটাকই করে বসত।

মোরবাং থেকে চলে এসেছিলাম ঠিকই, তবে তার আগে বিষ্ণোইয়ের একটা ব্যবস্থা করে এসেছিলেম। সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোতে আমার কিছু পরিচিতি আছে। ওখানকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অফিসারদের লাগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম বদমাশটার পেছনে। এর পেছনে আমার একটা উদ্দেশ্যও ছিল। জানতাম, টাকার টানাটানি শুরু হলেই বিষ্ণোই আবার ওই অ্যান্টিকগুলোকে বিক্রি করার জন্যে মোরবাং-এর বাইরে বেরোবে।

যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই হল। মাদকদ্রব্যের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দু-বছর বিষ্ণোই কোনোরকমে মণিপুরের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে বসেছিল আর জমানো পুঁজি ভেঙে খাচ্ছিল। তারপর সে আবার বাইরে বেরোল। বাইরে মানে দিল্লিতে।

একটু আগেই বললাম না, লোকটা শেয়ালের মতন ধূর্ত। এবার আর ও কোনো বড় ডিলারের কাছে গেল না। গেল দিল্লির চাঁদনিচকের চোরাবাজারে। কারণ ও বুঝতে পেরেছিল, বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে।

ও যেটা বুঝতে পারেনি সেটা হল, কেরিয়ারের শুরুতে বোধিসত্ত্ব মজুমদার নিজে দিনের পর দিন চাঁদনির মতন ছোটখাটো বাজারগুলোতে পায়ে হেঁটে অ্যান্টিক খুঁজে বেরিয়েছে। তাই শুধু বড় ব্যবসায়ী নয়, ছোট দোকানদারদের সঙ্গেও তার জান-পেহচান কিছু কম নয়। তাদেরও আমি বলে রেখেছিলাম চোরাই উর্দি আর মেডেলের কথা। তাই নানির বাড়ি থেকে ওগুলো চুরি করে নিয়ে পালাবার বছর চারেক বাদে যেদিনই বিষ্ণোই দিল্লির চোরাবাজারে ওগুলো বিক্রি করতে গেল, সেদিনই আমার কাছে খবর পৌঁছে গেল। খবরটা দিল সুলেমান নামে আমার এক পূর্বপরিচিত অ্যান্টিক কালেকটর।

চাঁদনি-মার্কেটের মাঝামাঝি জায়গায় সুলেমানদের একটা সুর্মা আতরের দোকান আছে। বেশ বড় দোকান, বেচাকেনাও ভালোই হয়। তবে ওই ব্যবসার আড়ালে ওদের একটা অ্যান্টিকের ব্যবসাও রয়েছে।

তুই তো ভালো করেই জানিস, একেকজন অ্যান্টিক-ডিলারকে একেক ধরনের অ্যান্টিকের ব্যাপারে স্পেশালিস্ট বলে ধরা হয়। সুলেমানদের স্পেশালিটি ছিল প্রাচীন ট্রোফি, মেডেলিয়ন, শিল্ড ইত্যাদি ব্যাপারে। তবে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, ওদের বেশিরভাগ জিনিসের সঙ্গে বৈধ কাগজপত্র থাকত না, যে-কারণে আমি ওদের সঙ্গে খুব বেশি লেনদেন করতে পারিনি।

তবে তা না পারলেও ওদের দোকানঘরের পেছনে ছোট্ট গোডাউনটার মধ্যে বসে এককালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমূল্য সেই সব মেডেল আর ট্রোফি নেড়েচেড়ে দেখেছি। তাতে আমার জ্ঞান যে বেড়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। আর ওই শুরুর দিনগুলোতেই আমার সঙ্গে সুলেমানের একটা দারুণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তার একটা বড় কারণ হল, সুলেমানের বয়স আমার কাছাকাছি। আর দ্বিতীয় কারণ, সুলেমানেরও আমার মতন অ্যান্টিক নিয়ে পড়াশোনার ঝোঁক ছিল। আমরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে ওই সংক্রান্ত বইয়ের লেনদেন করতাম।

সেই সুলেমানই একদিন আমাকে ফোন করে বলল, তুরন্ত চলা আও দোস্ত। তুমি যাকে খুঁজছ সে আশেপাশেই ঘুরছে।

বললাম, ব্যাপারটা কী?

সুলেমান বলল, ব্যাপার কিছুই না। ওই চিটিংবাজ ছেলেটা চাঁদনি মার্কেটের এখানে ওখানে খোঁজখবর নিয়ে বেড়াচ্ছে, কোথায় জিনিসগুলোর জন্যে ভালো দাম পাবে। আশা করছি কাল পরশুর মধ্যে আমার এখানে পৌঁছে যাবে, কারণ, ঘুরতে-ঘুরতে ও আমার খোঁজ পাবেই। জানতে পারবে, এ-লাইনে আমার চেয়ে বড় খেলোয়াড় আর কেউ নেই। তুমি আর দেরি না করে চলে এসো।

চলেই গেলাম। তখন তো আমার হাতে কথায়-কথায় প্লেন ধরার মতন পয়সা থাকত না, তাই ট্রেন ধরে পৌঁছতে দুদিন সময় লাগল। সুলেমানের দোকানে যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধে হয়ে গেছে। সময়টা ছিল দেওয়ালির ঠিক আগে। পুরো চাঁদনিচক জমজমাট। ওখানকার বিখ্যাত সব রুপোর গয়নার দোকান, কাজু-কিশমিস আর মেওয়ার দোকান, রং-বেরঙের কাপড়ের দোকান—সব আলোয় ঝলমল করছে। আমি দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সুলেমান ব্যস্তসমস্ত হয়ে কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে এসে আমাকে একরকম টানতে টানতে নিয়েই ঢুকে পড়ল ওর দোকানের পেছনে সেই গোডাউনে।

একটু অবাক হয়েই ওকে জিগ্যেস করলাম, কী হল?

সুলেমান বলল, আরে, ছেলেটা ঠিক আধাঘণ্টা আগে আমার দোকানে এসেছিল। তুমি তখন আমাকে ফোন করে বলছ প্রায় পৌঁছে গেছ। তাই আমি একটা অজুহাত দেখিয়ে ওকে কিছুক্ষণ বাদে আসতে বলেছি। এখন ও যদি তোমাকে দেখে ফেলত…।

আমি বললাম, দেখলেও চিনতে পারত কি? তারপর নিজেই বললাম, পারত বোধহয়। মোরবাং গ্রামের থানার ওসিই আমার ছবি ওকে পৌঁছে দিয়ে থাকবে। তাছাড়া আমার ব্যবসার ওয়েবসাইটেও আমার ছবি আছে। যাগ্‌গে, এখন কী করব বলো!

সুলেমান বলল, বিষ্ণোই আসলে তাকে ধরবে। ধরে ওর কাছ থেকে জিনিসগুলো কেড়ে নেবে। সিম্পল।

সিম্পল? সুলেমানের কথা শুনে রেগেই গেলাম। বললাম, এই ভরা বাজারের মধ্যে একজনের কাছ থেকে মাল ছিনতাই করব, কাজটা কি অতটাই সহজ? এখানে আমাকে কে চেনে? বিষ্ণোই একবার ‘চোর চোর’ করে চেঁচালেই তো পাবলিক আমাকে পিটিয়ে তক্তা করে দেবে।

সুলেমান আমার দিকে গরম সামোসা আর মালাই চায়ের খুরি এগিয়ে দিয়ে বলল, কেউ পেটাবে না। সে গ্যারান্টি আমার। আবে ছোটু! জারা ইধার আকে দেখ!

সুলেমানের ডাক শুনে বাইরে থেকে একটা ছেলে ঘরে ঢুকল। কুড়ি-একুশ বছর বয়স হবে ছেলেটার। টাইট জিনস, কর্ডের রংচটা হাফ-জ্যাকেট, পেটানো চেহারা। টিপিকাল হেঞ্চম্যানের চেহারা। সুলেমান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই ছোটু আর ওর দলবল তোমাকে ঘিরে থাকবে। একবার বিষ্ণোইয়ের জিনিসগুলো তুমি হাতে পেয়ে গেলে তোমাকে আর বিষ্ণোইকে থানা অবধি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ওদের। তুমি বিষ্ণোইকে পুলিশের জিম্মা করে না দেওয়া অবধি ওরা তোমার সঙ্গে থাকবে।

ছোটু আমাকে সেলাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি বললাম, এত ঝামেলা না করে, এই ঘরের মধ্যেই ওকে ধরলে তো ভালো হতো, সুলেমানভাই। তাই শুনে সুলেমান হাত জোড় করে বলল, দোস্ত, আমার ব্যবসার গুডউইলের কথাটাও একবার ভাবো। চোর-ছ্যাঁচোড় নিয়েই আমার কারবার। ওরাই আমার রুটি জোগায়। একবার যদি পাঁচকান হয়ে যায় যে, আমার দোকানঘরের মধ্যে থেকে পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে গেছে, তাহলে আর কেউ এখানে আসবে?

সুলেমানের কথায় যুক্তি ছিল। তাই চা-টা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সুলেমান বলল, চলো, এগিয়ে যাও। সন্ধেবেলায় যখন বিষ্ণোই আমার দোকানে এসেছিল, তখনই ছোটু লোকটাকে দেখে রেখেছে। এখনো ওই তোমাকে দেখিয়ে দেবে। বিষ্ণোইকে তোমরা এই গলির মোড়ে ঘিরে নিও। আমি কাল তোমার সঙ্গে হোটেলে দেখা করব। বেস্ট অফ লাক।

সে-বছর দেওয়ালি ছিল নভেম্বরের মাঝামাঝি। দিল্লিতে তখন ভালোই ঠান্ডা পড়ে গিয়েছিল। আটটার পর থেকেই দ্রুত ফাঁকা হয়ে আসছিল চাঁদনিচক। একটার পর একটা দোকান থেকে শাটার টানার ঝমঝম শব্দ আসছিল। সরু গলিগুলো অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছিল। আমি সুলেমানদের গলির মোড়ে একটা ঝুপড়ির ছায়ায় গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে একইভাবে এদিকে-ওদিকে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করছিল ছোটু আর তার দলের আরও তিনটে ছেলে।

একবার ঘড়িতে সময় দেখলাম, ন’টা। সবে যখন ভাবছি, তাহলে কি এবারেও বিষ্ণোই কোনোভাবে খবর পেয়ে সাবধান হয়ে গেল, ঠিক তখনই ছোটুর চাপা গলায় বলা কথাগুলো কানে এল, উও আ রহা হ্যায়।

আমি দেখলাম লম্বা রোগা একটা ছেলে…গেটের দিক থেকে এগিয়ে আসছে। পরনে অ্যাশ-কালারের জগার্স প্যান্ট আর হুডিস। কাঁধে একটা সস্তার ব্যাগ।

ছেলেটার হাবভাবে সতর্কতা ছিল ঠিকই কিন্তু একইসঙ্গে আরেকটা জিনিস ছিল। একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব। যেন পৃথিবীর কেউ ওকে ছুঁতে পারবে না এরকম একটা ঘাড় উঁচু করা ভঙ্গি।

সতর্ক ছিল বলেই আমরা ওর দিকে এগিয়ে যাওয়া মাত্রই ও ঘুরে দৌড়তে শুরু করল। পেছনদিক থেকে ছোটুর এক শাগরেদ দু’দিকে দুটো হাত ছড়িয়ে ওকে আটকাবার চেষ্টা করেছিল। বিষ্ণোই দৌড় না থামিয়েই মাথাটা নীচু করে সেই ছেলেটার পাঁজরের নীচে একটা ঢুঁ মারতেই ছেলেটা আর্তনাদ করে রাস্তার ওপরে ছিটকে পড়ল। বিষ্ণোই ঢুকে পড়ল পাশের একটা আরও ছোট গলির মধ্যে।

একটা ক্লিক শব্দ শুনে দৌড়োতে-দৌড়োতেই আড়চোখে পাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ছোটুর হাতে একটা রামপুরিয়া ছুরি উঠে এসেছে। তারই লক খোলার শব্দটা পেয়েছিলাম। চিন্তায় পড়লাম। সঙ্গীকে মার খেতে দেখলে ছোটুর মতন ছেলেদের যে মাথার ঠিক থাকে না, সেটাও জানতাম। তাই আরও জোরে বিষ্ণোইয়ের দিকে দৌড়লাম। ছোটুর আগে আমাকে ওর কাছে পৌঁছতে হবে। নাহলে ও বাঁচবে না।

কিছুক্ষণের মধ্যে ছোটু আর তার বাকি দুই চেলাকে ছাড়িয়ে চলে গেলাম। এখন আমার আর বিষ্ণোইয়ের মধ্যে বড় জোর দশফুটের ব্যবধান। আর ঠিক তখনই বিষ্ণোই দৌড় থামিয়ে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ঘুরে না দাঁড়িয়ে ওর উপায় ছিল না। আগে বুঝতে পারিনি, গলিটা একটা কানাগলি…ব্লাইন্ড লেন।

এই চাঁদনিচক মহল্লায় আজও ওরকম কিছু পোড়ো বাড়ি রয়ে গেছে। ভাঙাচোরা বাড়িগুলো দেখলেই বোঝা যায় নবাবি আমলে সেগুলো রহিস আদমীদের বাসস্থান ছিল…যাকে বলে হাভেলি। কিন্তু এখন সেগুলোতে কেউ থাকে না। ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে এমনই বদনাম রয়েছে বাড়িগুলোর যে পথের ভিখিরিরাও ওসব বাড়িতে থাকতে ভয় পায়।

সেরকমই একটা বাড়ির ভাঙা সদর দরজায় পিঠ দিয়ে বিষ্ণোই দাঁড়িয়েছিল। ওকে দেখতে লাগছিল ঠিক একটা প্রেতের মতন। রোগা, লম্বা, কাঁধ অবধি লম্বা চুল। হুডিস আর জগার্স প্যান্টের বাইরে শুধু ওর মুখের চামড়াটুকুই দেখতে পাচ্ছিলাম। সেই-চামড়ার রঙ মৃত মানুষের চামড়ার মতন হলদেটে-সাদা। মুখ হা করে হাঁপাচ্ছিল বলে ওর দাঁতগুলো ঠোঁটের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল আর ছোট-ছোট চোখদুটো কয়লার টুকরোর মতন জ্বলছিল।

ঠিক তখনই ছোটু আর তার দুই শাগরেদ আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ছোটু একটা বিশ্রী গালাগাল দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘এবার কোথায় পালাবি? রক্ত দেখব তোর’। হয়তো সত্যিই দেখত, কিন্তু ঠিক তখনই বিষ্ণোই একটা কাণ্ড ঘটাল। সে কাঁধের ব্যাগটা দু-হাতে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে সেটা রাস্তার একপাশে ছুড়ে দিল।

ওদিকে গলির গা দিয়ে একটা গভীর নালা চলে গেছে। নালাটার বোধহয় যমুনার সঙ্গে যোগ ছিল, কারণ অনেকক্ষণ ধরেই জোরালো জলস্রোতের কলকল আওয়াজ কানে আসছিল। পরিষ্কার দেখলাম সেই জলের টানে ব্যাগটা দূরে চলে যাচ্ছে…যেদিকে বিষ্ণোই দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার উল্টোদিকে।

আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, ছোটু, ব্যাগটা বাঁচাও। চেঁচাতেই হতো আমাকে, কারণ, তখনো অবধি আমি জানতাম ওর মধ্যেই রয়েছে আব্বাস হুসেনের উর্দি আর মেডেল। আমার চিৎকার শুনে ছোটুরা ভেসে যাওয়া ব্যাগটার পেছনে দৌড়োল। এক-মুহূর্তের জন্যে আমরা অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। ছোটু যখন ব্যাগটা তুলে নিয়ে ফিরে এল তখন একসঙ্গে দুটো জিনিস দেখে আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল।

এক, ব্যাগের ভেতরে এক সেট জামা-প্যান্ট রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো একেবারেই আধুনিক কাটিং এবং ডিজাইনের জামাপ্যান্ট। তাদের দেখে কোনো পাগলেও আই.এন.এ-র উর্দি বলে ভুল করবে না। এবং দুই, বিষ্ণোই একটু আগেই যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে আর সে নেই।

মহল্লার মাস্তান হিসেবে ওর এই পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাকে ছোটু অ্যান্ড কোম্পানি নিজেদের ইজ্জতের সওয়াল বলে ধরে নিল। ওরা বুঝতে পেরেছিল, বিষ্ণোই ওই ভাঙা হাভেলির মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। তাছাড়া আর কোথায়ই বা যাবে? ফলে তারপর ওরা যেটা শুরু করল সেটাকে ইংরিজিতে বলে ‘ম্যান হান্ট।’

আমি নীচে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম, তিনতলা সেই হাভেলির এখানে-ওখানে মোবাইল-ফোনের ফ্ল্যাশ লাইটের আলো জ্বলে উঠেই আবার নিভে যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ ছোটুদের মধ্যে কারুর চাপা গলার আওয়াজ ভেসে আসছে—ওখানে…ওই যে ঘরের কোণে…ওই দ্যাখ সিঁড়ি দিয়ে উঠছে…ছাদের দরজাটা আগলা।

বিষ্ণোই ইঁদুরের মতন ভাঙা হাভেলি জুড়ে দৌড়চ্ছিল আর তার পেছনে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল ছোটুরা তিনজন।

আমি কিন্তু তখন অন্য-কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম, ওরা যদি বিষ্ণোইকে ধরতেও পারে, ধরবে তো নিশ্চয়ই, তাহলেই বা আমি কী করব? ওর কাছে তো আব্বাস হুসেনের উর্দি আর মেডেল নেই। পিটিয়ে মুখ দিয়ে কথা বার করা যাবে, সেরকম ধাতুতে যে বিষ্ণোই তৈরি নয়, সেটা ইতোমধ্যে আমি বুঝে নিয়েছিলাম আর করলেও পুলিশ বা আদালতের সামনে সেরকম স্বীকারোক্তির কোনো দামও থাকত না।

আচ্ছা, উর্দি আর মেডেলগুলো সঙ্গে না নিয়ে ও সুলেমানের দোকানের দিকে যাচ্ছিলই বা কেন? ও যদি কোনোভাবে জানতেই পেরে থাকে যে, সুলেমানও একটা ফাঁদ পেতেছে তাহলে নিজের গোপন ডেরায় চুপ করে বসে থাকলেই পারত। বেরোল কেন?

আমার এইসব চিন্তার মধ্যেই হঠাৎ ছোটুর গলার আওয়াজটা ভীষণ স্পষ্টভাবে কানে বেজে উঠল। সঙ্গীদের হাঁক দিয়ে ও বলল, ব্যাস, খেল খতম। ঘিরে নিয়েছি শয়তানটাকে।

ওপরদিকে তাকিয়ে দেখলাম, সত্যিই তাই। হাভেলির তিনতলার ঝুলবারান্দায় বেরিয়ে এসেছে বিষ্ণোই। ছোটুরাও ওর পেছন-পেছন বেরিয়ে এসেছে। নীচ থেকে কালো পিজবোর্ডে তৈরি চারটে পুতুলের মতন দেখতে লাগছিল ওদের। বারান্দা ধরে এক-পা এক-পা করে পিছিয়ে যাচ্ছিল বিষ্ণোই। আর ওর দিকে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে যাচ্ছিল ওরা তিনজন। বিষ্ণোইয়ের আর পালাবার উপায় ছিল না।

ঠিক তখনই ঘটে গেল এক বীভৎস ঘটনা। পেছন ফিরে ছিল বলেই বিষ্ণোই দেখতে পায়নি, বারান্দার এক-জায়গায় মেঝে ধসে পড়ে মস্ত একটা হা হয়েছিল। ও সেই ভাঙা জায়গাটা দিয়ে গলে পড়ল একদম পঞ্চাশফুট নীচে, রাস্তার ওপরে। কোনো শব্দ করারও সময় পায়নি ও। পড়ল আমি যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম তার বড়জোর পাঁচহাত তফাতে। সামান্য নড়াচড়া করেই দেহটা স্থির হয়ে গেল।

অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে বুধোদা থামল। জানলার কাছ থেকে ফিরে এসে টেবিলে রাখা কাচের জগ থেকে এক গ্লাস জল ঢেলে খেল। আমার ধৈর্য থাকছিল না। বললাম, বিষ্ণোই মরে গেল? তাহলে তুমি আর সেই অরিজনাল উর্দি আর মেডেল হাতে পেলে না?

বুধোদা বলল, কে বলল পাইনি? পেয়েছিলাম তো।

কোথায় পেয়েছিলে?

বুধোদা বলল, ওর শরীরে। আশ্চর্য ব্যাপার, বুঝলি রুবিক। যে-মুহূর্তে বিষ্ণোইয়ের বডিটা আমার সামনে আছড়ে পড়ল, সেই মুহূর্তেই কীভাবে যেন আমি ওর বদমাইশিটাও বুঝতে পারলাম। দু-পা এগিয়ে গিয়ে ওর হুডিসের জিপারটাকে সামান্য টেনে নামাতেই দেখতে পেলাম, নীচে রয়েছে আই.এন.এ-র উর্দি। মেডেলটাও ছিল ওই উর্দির পকেটে।

কেন? ও এরকম করেছিল কেন?

ফর ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি। যাতে ওর কাছ থেকে জিনিসগুলো কেউ কেড়ে নিতে না পারে। ও নিশ্চয় ঠিক করে রেখেছিল যে, সুলেমানের কাছ থেকে নগদ টাকা বুঝে পেলে তবেই ও ব্যাগে করে যে নতুন জামা-প্যান্টের সেটটা নিয়ে ঘুরছিল, সেগুলো পরে নেবে। এবং উর্দিটা খুলে সুলেমানকে দিয়ে দেবে। তবে সেই সুযোগ ও পেল না।

তারপর? সেগুলো এখন কোথায়?

বুধোদা বলল, অস্বাভাবিক মৃত্যু তো। তার ওপরে আমি ওর চুরির ব্যাপারটা পুরোটাই দিল্লি-পুলিশকে সেই রাতেই জানিয়েছিলাম। ফলে দিল্লি কোর্টে পুলিশ একটা কেস রুজু করেছিল। যতদিন সেই কেস চলছিল, ন্যাচরালি, মৃতের শরীরে যা-যা ছিল, সবই পুলিশের হেফাজতেই ছিল।

অদ্ভুত কো-ইনসিডেন্স, নানির মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার পরে আজ সকালে যখন বেকবাগানের দিকে যাচ্ছি, তখনই আমাদের ল-ইয়ার ফোন করে জানালেন, কেসটা ডিসমিস হয়ে গেছে এবং কোর্ট অর্ডার দিয়েছে আব্বাস হুসেনের উর্দি আর মেডেল তাঁর উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দিতে। আমি ওঁকে জানিয়েছি, উত্তরাধিকারী কেউ নেই। জিনিসগুলো যেন কোনো যাদুঘরে সসম্মানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

ভাব রুবিক, আর এক-মাস আগেও যদি এই অর্ডারটা বেরোত, আমি নানিকে পুরো বিষয়টা খুলে বলতে পারতাম। নকলগুলো ফেলে দিয়ে আসল জিনিসগুলো তুলে দিতে পারতাম ওঁর হাতে। সেটা আর পারলাম না।

.

সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। বুধোদা খাট থেকে নেমে ঘরের আলো জ্বালল। তারপর ওর কাঁধব্যাগের মধ্যে থেকে ছাইরঙের একটা সিকিউরিটি-গার্ডের ইউনিফর্মের সেট আর একটা চকচকে গোল চাকতি বার করে দেয়ালে বসানো আয়রন চেস্টটার দিকে এগিয়ে গেল। আমি জানি, খুব দুর্মূল্য কিছু অ্যান্টিক-আইটেম, যেগুলোকে ও প্রাণে ধরে বিক্রি করতে পারে না, সেগুলোকে ওই চেস্টটার মধ্যে রেখে দেয়। তাই ও যখন চেস্টের কম্বিনেশন লকটা খুলছে, তখন আমি জিগ্যেস না করে পারলাম না, ওই ঝুটা মালগুলোকে যত্ন করে রেখে দেবে নাকি, বুধোদা?

বুধোদা খুব ক্লান্তগলায় বলল, ঝুটা কাকে বলেরে রুবিক? আব্বাস ভাইয়ার জন্যে মাহফুজা আলমের ভালোবাসা ঝুটা? নীলি মেইতেইয়ের প্রেম ঝুটা? নেতাজীর স্বপ্ন ঝুটা ছিল?

না রুবিক। মানুষের ভালোবাসা, মানুষের স্বপ্ন এগুলো কখনো ঝুটা হয় না। এই যে দেখছিস টিনের চাকতি, এই যে দেখছিস সস্তার উর্দি, এগুলোর গায়ে মাহফুজা আলমের স্বপ্ন লেগে আছে। উনিশশো চুয়াল্লিশে আব্বাস হুসেন মারা গিয়েছেন। তখন থেকে দু-হাজার বারো সাল অবধি দীর্ঘ আটষট্টি বছর ধরে নানি তাঁর দাদার স্পর্শ ফিরে পাওয়ার যে-স্বপ্নটাকে বুকে আগলে বসেছিলেন, এগুলো সেই স্বপ্ন। সেইজন্যেই এগুলো অ্যান্টিক। আর আমার কাজই তো অ্যান্টিককে আগলে রাখা, তাই না?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *