ভূমিকা
লালনের পরেই দুদ্দু শাহ সবচেয়ে মান্য মহাজন হিসেবে বাউলসমাজে খ্যাত। তাঁর গানের পঙ্ক্তি বাউলতত্ত্বের ভাষ্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। বাউল-মতাদর্শের প্রচার ও প্রসারে তাঁর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেহকেন্দ্রিক বাউল-ফকির সাধনার গুপ্তকথা রহস্যাচ্ছাদিত বৃত্তের বাইরে এনে দুদ্দু শাহ নবপ্রাণ দিয়েছেন। তত্ত্বজিজ্ঞাসুদের জন্য তাই দুদ্দুর পদাবলি প্রবল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
দুদ্দু শাহ সরাসরি লালনের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এ কারণেই লালন আখড়ায় তিনি দীর্ঘ সময় অবস্থান করার সুযোগ পান। তখন প্রত্যক্ষভাবে লালনের মত ও পথের জানা-বোঝায় সুযোগ পেয়েছেন। সেসব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান তিনি তাঁর রচনায় সহজসাধ্য ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
২
বাউলদের নিয়ে কাজ করার সুবাদে প্রায়ই কিছু গবেষক বৈষ্ণব অনুসারীদের সঙ্গে বাউলদের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারেন না। অনেকেই বাউল ও বৈষ্ণব অনুসারীদের একই অভিধায় গুলিয়ে ফেলেন। এ বিষয়টি দুদ্দুর গানে এভাবেই এসেছে :
বৈষ্ণব বাউল ধর্ম এক নহে তো ভাই
বাউল ধর্মের সাথে বৈষ্ণবের যোগ নাই।।
বিশেষ সম্প্রদায় বৈষ্ণব পঞ্চতত্ত্বে করে জপতপ
তুলসী, মালা, অনুষ্ঠান সদাই ॥
বাউল মানুষ ভজে যেখানে নিত্য বিরাজে
বস্তুর অমৃতে মজে নারী সঙ্গী তাই ॥
নিত্যানন্দের দুই পুরুষ হয় বীরভদ্র বীরচূড়ামণি কয়
দুইজন দুই মতের গোঁসাই শুনতে পাই ॥
দরবেশি বাউলের ক্রিয়া বীরভদ্র জানে সেই ধারা
দরবেশ লালন সাঁইয়ের কথায়, দুদ্দু জানায় তা-ই ॥
দুদ্দুর উপর্যুক্ত গানে বাউল সাধনায় ‘মানুষ ভজনা’ এবং ‘বস্তু সাধনা’-এর বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি আরও সুস্পষ্ট করে বলেছেন—‘যে খোঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল’ কিংবা ‘যে বস্তু জীবনের কারণ তা-ই বাউল করে সাধন’। বাউল সাধনার দুটি প্রধান তত্ত্বই লুক্কায়িত রয়েছে উপর্যুক্ত দুটি পঙ্ক্তিতে।
মানুষের মধ্যে খোদার অবস্থান নির্ণয় করার আহ্বান সকল সাধকেরাই করে গেছেন। যুগে যুগে, কালে কালে মানুষ-বন্দনার বিষয়টিই সাধকদের কণ্ঠে জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছে। খোদার সাকাররূপ দৃশ্যমান না-থাকায় বাউল-ফকিরেরা প্রতিটি মানুষের ভেতরে সৃষ্টিকর্তা বিরাজমান বলে উল্লেখ করে থাকেন। এ কারণেই কেউ কেউ এঁদেরকে ‘বস্তুবাদী’ বলেও অভিহিত করে থাকেন।
দুদ্দুর বিশ্বাস—‘আগে মানুষ, পরে ধর্ম জাতির নির্ণয়’। এ জন্যই তিনি বলছেন, ‘কে তাহারে চিনিতে পারে ভাই/মানুষের চরণ না চিনিলে উপায় নাই ॥/কাশী কিংবা মক্কায় যাও রে মন দেখিতে পাবে মানুষের বদন/ধ্যান ধারণা ভজন পূজন মানুষনিধি সব ঠাঁই ॥/মানুষের আকার ধরে খোদ খোদা যে ঘোরে-ফেরে’। এই ‘মানুষের আকার’ মানে নিজের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তার বসতি—এটাই দুদ্দু বোঝাতে চেয়েছেন। তাই মানুষের সেবায় জীবন উৎসর্গ করতে পারলেই কেবল তা সৃষ্টিকর্তার ভজনা হিসেবে গণ্য করা হবে।
‘শাস্ত্র ধর্ম তীর্থ ব্রত’ সব কিছুই মানুষ তাঁর নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছে। মনুষ্য-সৃষ্ট এসব ধর্মীয় রীতিনীতিতুল্য প্রক্রিয়াগুলোকে পাশ কাটিয়ে তাই বাউল-ফকির সাধকেরা মানবধর্মের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। সাধকদের একই ধারাবাহিকতায় দুদ্দুও তাই মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর সক্রিয় ছিলেন।
মানুষ ভজনার পাশাপাশি ‘বস্তু নিয়ন্ত্রণ’ করাও বাউলদের অন্যতম রীতি। ‘বস্তু নিয়ন্ত্রণ’ মানে বীর্যরস নারীদেহে প্রবেশ করতে না দেওয়া। তবে এর জন্য সাধনার প্রয়োজন। সাধুশাস্ত্র অনুযায়ী, এ সাধনা হচ্ছে সঙ্গমকালে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বীর্যরক্ষা করা। ‘কামহীন হয়ে পরস্পরকে নিবিড়ভাবে দেখা, জানা ও আস্বাদন’ও সাধনার অন্যতম শর্ত। আর যেসব সাধক সাধনায় বীর্যক্ষয় রোধ করতে পারেন না, তাঁকে ‘ভবযন্ত্রণা’ সহ্য করতে হয় প্রচণ্ডভাবে। দুদ্দু সেটিও ইঙ্গিত করেই বলেছেন :
আপন হাতে কপালের চাবি
মনে বুঝে দেখো অমনি পাবি ॥
অযথা দোষ দাও খোদারে জানো নাকো কী কষ্ট করে ॥
পড়িয়া অদৃষ্টের ঘোরে খাও রে খাবি ॥
অদৃষ্ট বরাত আদি খোদার হাতে হয় গো যদি
তবে কেনে নেকি বদি করে রে দাবি ॥
লালন সাঁই বলে আমায় দুদ্দু দাও আপনার দায়
সকলই আত্ম ইচ্ছায় জগৎ জীবন সবি ॥
একই ধরনের তত্ত্বকথা প্রকাশ করতে গিয়ে আরেকটি গানে দুদ্দু শাহ বলছেন :
আপন হাতে জন্ম মৃত্যু হয়
খোদার হাতে হায়াত মৌত কে কয়
বীর্যরস ধারণে জীবন অন্যথায় প্রাপ্তি মরণ
আয়ুর্বেদ করে নিরূপণ, করি নির্ণয় ॥
নিজে বীর্য ক্ষয় করে পশুর মতো পথে পড়ে
কতজনে যায় মরে, খোদার দোষ দেয় ॥
আপন হাতে জীয়ন-কাঠি দেখো দেল করতে খাঁটি
দুদ্দু বলে হাতে লাঠি, নিয়েছি ঠ্যালায় ॥
নারীর যোনিতে শুক্রস্খলন হলে সাধকের পতন ঘটে। কারণ এসব শুক্রকীট থেকে নবপ্রাণের জন্ম হয়। এতে করে ভবের মায়ামোহে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাই ‘শরিক’ মানে সন্তান-সৃষ্টি থেকে সাধকেরা সর্বদাই বিরত থাকেন। বাউল-দর্শনের চিরায়ত এ তত্ত্ব যাঁরা মানেন না অথবা মানতে পারছেন না তাঁদের অসাধক- তকমা পেতে হচ্ছে।
‘বীর্যরস ধারণ’ সম্পর্কিত রীতিপদ্ধতি পালনে অনেক সাধনার প্রয়োজন। সঠিকরূপে তা আয়ত্তের জন্য গুরু ধরে সাধনার অন্তর্নিহিত সত্য জানতে হয়। এটিই বাউল-ফকির পরম্পরা। সাধনায় ‘দেহমিলন যজ্ঞবিশেষ’। তাই যজ্ঞের পবিত্রতা দেহের পবিত্রতারই অংশবিশেষ। আর এই পবিত্রতা রক্ষিত হয় বিন্দুরূপী বীর্য রক্ষার মাধ্যমে। যিনি পবিত্র থাকার এসব পদ্ধতিগত রীতিনীতি হাতে-কলমে শিখিয়ে দেন তিনিই দীক্ষাগুরু/মুর্শিদ। সেই মুর্শিদ-ভজনার বিষয়টি দুদ্দু প্রাধান্য দিয়েছেন এভাবে :
আপনাকে চিনবি যদি মুর্শিদকে চেনো আগেতে
তবে সে চিনিতে পাবে কীরূপ খোদা এই দেহেতে ॥
মুর্শিদ হন রাহা কলেন্দার দেখান সে কায়দা বন্দেগির
মোরাকেবা খোদার দিদার হয় যাহাতে ॥
আপনি ডুবে আপন মাঝার আছে সে নিরূপ নিরাকার
সে রূপ মন চিনে বেখুদি পিয়ালার সাথে ॥
সিঁড়ি ধরে উঠলে পরে মোকাম মঞ্জিল মেলে তারে
লালন সাঁই কয় দুদ্দু ভেড়ে ঘুরিস কেন ঘুরোপথে ॥
‘ঘুরোপথে’ মানে অপথে-কুপথে না-ঘুরে মুর্শিদ-নির্দেশিত পথ ধরে এগোলে নিজেকে ও সৃষ্টিকর্তাকে চেনার পাশাপাশি সাধনার তত্ত্বগত খুঁটিনাটি বিষয়াদি জানা সম্ভব। গুরু শিষ্যের জ্ঞান বুভুক্ষা মেটান। নারীদেহ সাধনায় অটল থাকা, রজোবিকাশকালে শিষ্যের করণীয়, গুপ্ত সাধনার স্তরে কী করা উচিত, ষোলোজন শঠকে কীভাবে বশ করতে হয়, সহজ মানুষ লাভের মূলমন্ত্র, দেল নমাজের পদ্ধতি, আলেক সাঁইয়ের অবস্থান নির্ণয়, ত্রিবেণীর ঘাটে সতর্কতার সঙ্গে তরী ভেড়ানো কিংবা গুরুবস্তু আত্ম-নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলগুলো গুরুই শিষ্যকে শেখান।
গুরু যেহেতু শিষ্যকে সাধনকলা সম্পর্কে জ্ঞান দেন, তাই গুরুর প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলতে হয়। কোনো কারণে গুরুর নির্দেশ অগ্রাহ্য করলে সাধনায় পতন ঘটে। পতিতকে উদ্ধারের জন্য গুরু সুপথ দেখান—এটি যেমন সাধনকাজে ধ্রুব সত্য, তেমনি পতিতকে উদ্ধারের আশায় গুরু/মুর্শিদের প্রতি প্রতি শতভাগ আত্মনিবেদনও করা উচিত।
গুরুরূপ উপাসনায় কেবল আনন্দধামে সঠিকভাবে চলা যায়। গুরু তাই সাধনায় অপরিহার্য ব্যক্তি। দেহবাদী সাধনায় নারী-শরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নারীদেহের বিচিত্র ও রহস্যময় অনুষঙ্গগুলো সম্পর্কে একজন সাধককে অভিজ্ঞ হতে হয়। দুদ্দুও তাঁর একাধিক গানের পঙ্ক্তিতে নারীদেহের সাধনকালীন অবস্থাকে প্ৰাধান্য দিয়েছেন। এ জগৎ-সংসার থেকে প্রকৃতই মুক্তি পেতে হলে সঠিকভাবে সাধনা চালানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। গুরু ভজনা এবং সাধনার বিষয়টি মাথায় রেখেই দুদ্দু বলছেন :
নিরাকার সেই ভাসিয়াছে নীরে
ডিম্বরূপে আছে ব্যাপে সাধনদ্বারে ॥
ত্রিবেণীর ঘাট যাহার নাম যোগেতে তথায় বারাম
ধারণে ত্রিতাপ তামাম পলায় রে দূরে ॥
ডিম্বরূপে যাহার বিহার তারে ধরেই পেলি আকার
মানুষ জন্ম হয় তোমার ভবের উপরে ॥
যে ভাসায় সেই ফল ঘাটে মহিমা অপার বটে
দুদ্দু কয় তার নিকটে খোদায় খোদা নাম ধরে ॥
দুদ্দু শাহ উপযুক্ত পদাবলির মতো সাধনতত্ত্বের অসংখ্য পদ রচনা করেছেন। বাউলতত্ত্বের ভীত নির্মাণে এসব গানের গুরুত্ব অপরিসীম। দুদ্দুর সাধনসংশ্লিষ্ট পদগুলো সহজ ও স্পষ্ট হওয়ায় বাউলসমাজে এসব গানের খুবই আবেদন রয়েছে।
‘শরিক’ অর্থাৎ সন্তান জন্ম না দেওয়ার জন্য দুদ্দুর বিশেষ আহ্বান ছিল। তিনি সার্বক্ষণিক শিষ্যদের উপদেশ দিতেন—’বাপের পুকুর যারে কয় জন্ম মৃত্যুর কারণ সে হয় ॥/এ দ্বারে অমৃতনিধি কেহ কেহ করে সিদ্ধি/আবার পরান বধি নরকে যায় ‘ ‘বাপের পুকুর’ অর্থাৎ নারীদেহে যেহেতু বীর্যক্ষয় হলে মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। মৃত্যু মানে বীর্যক্ষয়ের কারণে সন্তান জন্মানোকেই বোঝানো হয়েছে। সন্তান জন্ম নিলে ভবজ্বালায় আক্রান্ত হতে হবে।
সন্তান যাতে কোনোভাবেই ‘একজন সাধক জন্ম না-দিতে পারেন, সে জন্য নানা ধরনের উপদেশবাণী দুদ্দু তাঁর গানে প্রকাশ করে গিয়েছেন। তাঁর গানে বর্ণিত এসব বাণী এখন বাউলসাধনায় নিগূঢ়তত্ত্ব হিসেবে অভিহিত হচ্ছে। দুদ্দু সন্তান জন্ম না দেওয়ার বিষয়ে বলেছিলেন :
শরিক করো না মন করি বারণ
শরিকে বড়ো জ্বালা বারেবারে হবে জনম ॥
নিজ বীর্যে পুত্র কন্যা জন্ম দিয়ে শেষে কান্না
কন্যা পুত্রের ধন্না দিয়ে বেড়াবে রে মন
তাহারেই পুনর্জন্ম বলে লালন সাঁই ফুকারিলে
শরিকের উল্টা কলে পড়ো না রে ভাই কখনো ॥
দেখো না এই জগতের সবাই শরিকের যাতনায় কষ্ট পাই
দীনহীন দুদ্দু বলে তাই, শরিকই মৃত্যুর কারণ ॥
৩
দুদ্দু শাহকে অনায়াসেই বস্তুবাদী বাউল হিসেবে অভিহিত করা যায়। ‘ভাববাদ’ তাঁর গানের অন্যতম উপকরণ হলেও ‘বস্তুবাদ’-এর প্রভাব তাঁর গানে ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। খোদার কোনো আকার জনসমাজে প্রকাশিত না থাকায় সৃষ্টিকর্তাকেও তিনি অনায়াসেই খারিজ করে দেন। বস্তুই তাঁর কাছে উপাস্য, তাই কোনো ধরনের কল্পনায় আতিশয্যে তিনি গা ভাসাতে চান না।
দুদ্দু শাহ আত্মার অলৌকিক অবস্থাকে মানতে নারাজ। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সুস্পষ্ট উচ্চারণ :
বস্তুকেই আত্মা বলা যায়
আত্মা অলৌকিক কোনো কিছু নয় ॥
বিভিন্ন বস্তু সমন্বয়ে আত্মার বিকাশ হয়ে
জীবনরূপ সে পেয়ে, জীবেতে রয় ॥
অসীম শক্তি তার যে তাহার করে সমাচার
সাধিয়া ভবের কারবার বস্তুতে হয় লয় ॥
অন্ধ গোড়ামির বিকারে শূন্যেতে ভরলি ঘট রে
দুদ্দু কয় সে আপন ধান্ধায় এখানে ঘুরে বেড়ায়।
উপর্যুক্ত গানে দুদ্দুর বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনার পরিচয় ধরা পড়ে। কিংবা নিম্নোক্ত গানেও দুদ্দুর প্রাসঙ্গিক উচ্চারণ :
হজ করিলে যদি যেত গুনা
মক্কায় জন্মিয়া কেউ পাপী হতো না ॥
মক্কায় গেলে পাপ যাবে ভাই এ কথার বলিহারি যাই
যুক্তিতে বোঝাও তো এবার সরার বেনা ॥
ইব্রাহিমের মক্কা গঠন তাতে যদি হয় পাপ বিমোচন
এমন কথা কে বলেছে জগতে কোন জনা ॥
লালন সাঁই দরবেশের বচন দুদ্দু ভেড়োর হয় না যাজন
তাই মিছে ধুড়ে ধেড়ে মনের ঘোরানা ॥
দুদ্দু কখনোই ভাগ্যে বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন— ‘কপালের দোষ কেন দেও ভাই/আপনি করো সকল দিয়ে কপালের দোহাই ‘ জগতে খারাপ কাজের ফল যেমন রয়েছে, তেমনি ভালো কাজেরও ফল রয়েছে। স্বর্গ-নরক যন্ত্রণা তাই মর্তধামেই ভোগ করতে হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
দুদ্দু ঈশ্বরের অলৌকিক বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ‘আজগুবি মানুষ লীলে কেউ দেখিলে না/আন্দাজে হাতরিয়ে মরে খবর নিলে না। /অনাদির আদি নাম যাহার মানুষরূপে সে-ই করেন বিহার/ত্রিকুলে তুলনা নাই যাহার, তারে জানলে না ॥/মানুষ মানুষ বলিছে সবাই মানুষের তুলনা কিছুই নাই/মানুষের দ্বারে খবর তাহার পাই, যে করে সে কারখানা ॥/সুজন বলিব তারে মানুষের খবর দিতে যে পারে/দীন দুদ্দু বলে বিনয় করে, লালন সাঁই দরবেশের বেনা ॥’
‘বস্তুবাদী’ চেতনার পাশাপাশি দুদ্দু শাহ রাধাকৃষ্ণের রসবন্দনা, বিচ্ছেদ, গোষ্ঠ পর্যায়ের গানের সঙ্গে হিন্দু-পুরাণকে অবলম্বন করে বেশ কিছু গান রচনা করেছেন। এসব গানের আবেদনও বাউলসমাজে যথেষ্ট মাত্রায় উদ্ভাসিত। যদিও বিভিন্ন মিথের আলোকে এসব গানের আদল তৈরি হয়েছে, তবুও যেন এগুলো নানা রূপক ও উপমায় ভরপুর। রূপকাশ্রিত এসব গানের একাধিক অর্থও রয়েছে। তবে সব ছাপিয়ে এসব গানেও বাউল-মতবাদের ধারাই পরিস্ফুট হয়েছে।
ভারতবর্ষের বাউল-ফকির পরম্পরায় দুদ্দু শাহের যে অবদান, সেটা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বাভাবিক সহজবোধ্যতা এবং প্রাঞ্জলতা তাঁর গানগুলোকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কেবল গানের ভাষা ও বিন্যাসের জোরেই লালনের পরেই দুদ্দু শাহ বাউলসমাজে খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করছেন। লালনের যথার্থ উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে একমাত্র তিনিই সার্থকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
লালনের সঙ্গে অপরাপর বাউল-ফকিরদের সংযোগ-সাধক হিসেবে দুদ্দুকে কেউ কেউ চিহ্নিত করে থাকেন। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলার বাউল-ফকির ধারায় দুদ্দু শাহের সৃষ্টিসম্ভার অমর, অবিনশ্বর ও কালজয়ী।
সুমনকুমার দাশ
.
তথ্যসূত্র
শক্তিনাথ ঝা (সম্পা.), দুদ্দুসার পদাবলি (কলকাতা : সহজপাঠ, ২০১২)।
