দুদ্দু শাহের গান
১
অনাদির আদি যে জন হয়
জন্ম-মৃত্যুর সে নয় অধীন ভাবে জানা যায় ॥
রাধাকৃষ্ণ হরি নারায়ণ রজঃবীর্যে সবার সৃজন
স্বভাবমতো সবার মরণ, শাস্ত্রে লেখা কয় ॥
তার উপরে আছে যে জন করে গোরা তাহার সাধন
তাইতে শাঠিকন্যার চরণ, বুকে তুলে নেয় ॥
জড়ায়ে শাঠির গলা রসের কোটরা করে খেলা
আদ্য আদি রসের লীলা, দীন দুদ্দু গায় ॥
২
অশান্ত চঞ্চল চিত্তে ভক্তি নাহি উপজয়
সে ভক্তিতে শুদ্ধ রতির হয় উদয় ॥
হীনবীর্য চঞ্চল যে জন কোনো সাধনে সিদ্ধ নয় করণ
তার বারঘাটে হয় রে মরণ বার-এর আশায় ॥
ধীর বীর্য, স্থির যার মন তারি সিদ্ধ পরশরতন
স্থিতপ্রজ্ঞ নামে সে জন, খ্যাত যে হয় ॥
বিরাটে বিরাট মিলন ক্ষুদ্রে বিরাট না হয় ধারণ
দরবেশ লালন সাঁইয়ের বচন, দুদ্দু তা-ই কয় ॥
৩
আকারে স্বভজন সাকারে সাধন তায়
আকারে সাকারে অভেদ রূপ তায় জানতে হয় ॥
ভজনের মূল নরাকার, গুরু শিষ্য হয় প্রচার
আকারে নির্ণয় সাকার, আকার ছাড়া সাকার রূপ নাহি রয় ॥
পুরুষ প্রকৃতি আকার যুগল ভজন প্রচার
নায়ক-নায়িকা দোহার যোগে মোহিত সাধন যাতে হয় ॥
অযোনি হয় সহজ রূপ সংসার স্বরূপে দুই রূপ হয় নির্ণয়
স্বরূপে রূপ, রূপে স্বরূপ দুদ্দু কয় ॥
৪
আকারের সকল বিনা দেখো সেই মূল ঠিকানা
আকারে সুখ বিলাস হয় আকারে হয় তাপ যাতনা ॥
আকারে স্থিতি পুরুষ প্রকৃতি আকারে করে উপাসনা
আকারে হয় তপ জপনা আকারে করে সাধনা
ক্ষিতি জল তেজ বাউ আকাশ পাঁচ হতে হয় ঘটনা
তারা এজমালিতে করে বেচাকেনা দেখো ঐ কারখানায় পঞ্চজনা
নিকাসের কারণ ফের ঐ পঞ্চজনা আকার রূপ ধরে দেখো না
ঊর্ধ্বপদে হাঁটমুণ্ডে জঠরেতে গারদখানা
বোবা কানা খোঁড়া অন্তরে হয় শূলবেদনা
শিরঘাতে (শিরাঘাতে) গর্ভপাতে দুদ্দু কয় পূর্বের ফল সে না ॥
৫
আগে করো হাওয়ার মূল ঠিকানা
কোন মোকামে উৎপত্তি হাওয়ার
ও তার কোথায় মঞ্জিল বারামখানা ॥
কয় ঘড়ি দক্ষিণে রয়, বামে স্থিতি কতক্ষণ হয়
হাওয়া আসছে যেতে কী নাম কয়
সে ভেদ না জানলে বন্দেগি হবে না ॥
হাওয়ার সুমার দমের ভরে দম ছাড়িলে হাওয়া প্রচারে
অধর মানুষ দমের পরে তার হাতে দম কলের বিনা ॥
হাওয়ার দ্বারে রয় প্রহরী নিদ্রাত্যাগী যোগেশ্বরী
মূল সাধন হাওয়ায়, শক্তি ধরি
অধীন দুদ্দু সাধন জানলে না ॥
৬
আগে মানুষ, পরে ধর্ম জাতির নির্ণয়
ধর্ম জাতি আগে হলে, শিশু বালক কে না জানতে পায় ॥
দর্শন শ্রবণ পারিপার্শ্বিক অবস্থার গুণে
শেখে শিশু হিন্দু যবন আর খ্রিস্টানে বিচার-আচার
হিংসা ঘৃণা উদয় হয় মনে, জাতি জন্মগত নয় ॥
শিশু ছেলে জানে না কিছুই ছুঁৎ অচ্ছুৎ ন্যায় অন্যায় সাচা মিছাই
যা শেখায় সে তা শেখে ভাই, বয়সের হইলে উদয় ॥
মানুষের জাত ধর্ম সৃজন ঈশ্বর কিংবা প্রকৃতির নয় কখনো
দীন দুদ্দু বলে রে মিলন, কবে যে হয় ॥
৭
আছে রূপে স্বরূপ, স্বরূপ রূপেতে ॥
স্বরূপ রূপ দর্পণে নয়ন দিলে সেই রূপ পাই দেখিতে ॥
স্বরূপে রূপের আসন দ্বিদল পদ্মে হয় নিরূপণ
কোটি চন্দ্র যিনি কিরণ আয়না মহল কাজল কোঠাতে ॥
সারদে জরদ মিলন নিত্যলীলা তার নিরূপণ
তিন মানুষের হয় নিরূপণ দ্বিদল পদ্মে যোগের সাথে ॥
শ্রীরূপ ছেড়ে রূপ দেখতে চায়
সে তো পড়ে বিষম ধাঁধায় ॥
শক্তি রূপের ভাণ্ডার হয় দুদ্দুর ডুবল না মন সেই পদেতে ॥
৮
আজগুবি মানুষ লীলে কেউ দেখিলে না
আন্দাজে হাতড়িয়ে মরে খবর নিলে না ॥
অনাদির আদি নাম যাহার মানুষরূপে সে-ই করেন বিহার
ত্রিকুলে তুলনা নাই যাহার, তারে জানলে না ॥
মানুষ মানুষ বলিছে সবাই মানুষের তুলনা কিছুই নাই
মানুষের দ্বারে খবর তাহার পাই, যে করে সে কারখানা ॥
সুজন বলিব তারে মানুষের খবর দিতে যে পারে
দীন দুদ্দু বলে বিনয় করে, লালন সাঁই দরবেশের বেনা ॥
৯
আত্মরতি খণ্ড করে শরিক হয়
পুত্রকন্যারূপে পুনর্জন্ম তারে কয় ॥
পুত্রকন্যার মধ্যে সেথা থাকে বেঁচে পিতামাতা
এই রূপে সৃষ্টির প্রথা চলিয়া যায় ॥
শুক্র বিন্দু রক্ত রস ধরে বংশপরম্পরা চলে ফেরে
এই রূপে তারা জন্মে জন্মে আসে লতা সাধনায় ॥
ত্রিবিধ যাতনা রে ভাই সেই যাতনায় মরে সবাই
না মরিলে মুক্তি তো নাই জানে তো সবাই ॥
জন্মিয়া যাতনা প্রাপ্তি এ কারণে মোক্ষ মুক্তি
পাইবে সাধনে শক্তি, দীন দুদ্দু কয় ॥
১০
আপন জন্মের কথা যে জানে রে ভাই
সকল ভেদ সেই তো জানে, তার তুলনা নাই ॥
রজঃবীর্য রসের কারণ এ দেহ হইল সৃজন
যারে ধরে সৃজন পালন, তারে কোথা পাই ॥
আদিতে সেই নিরাকারে নিগুম ঘরে আকার ধরে
ভাবিয়া জানিলে তারে, সে-ই পাবে আলেক সাঁই ॥
আল মোকামের মাঝে ধোড় তবে সে ভেদ জানতে পারো
দরবেশ লালন সাঁই কয় দুদ্দু তোর বুদ্ধি কিছুই নাই ॥
১১
আপন হাতে কপালের চাবি
মনে বুঝে দেখ অমনি পাবি। ।
অযথা দোষ দাও খোদারে জান নাকো কী কার্য করে ॥
পড়িয়া অদৃষ্টের ঘোরে খাও রে খাবি ॥
অদৃষ্ট বরাত আদি খোদার হাতে হয় গো যদি
তবে কেন নেকি বদি করে রে দাবি ॥
লালন সাঁই বলে আমায় দুদ্দু দাও আপনার দায়
সকলি আত্ম ইচ্ছায় জগৎ জীবন সবি ॥
১২
আপন হাতে জন্ম-মৃত্যু হয়
খোদার হাতে হায়াত মৌত কে কয়
বীর্যরস ধারণে জীবন অন্যথায় প্রাপ্তি মরণ
আয়ুর্বেদ করে নিরূপণ, করি নির্ণয় ॥
নিজে বীর্য ক্ষয় করে পশুর মতো পথে পড়ে
কতজনে যায় মরে, খোদার দোষ দেয় ॥
আপন হাতে জীয়ন-কাঠি দেখ দেল করতে খাঁটি
দুদ্দু বলে হাতে লাঠি, নিয়েঠি ঠ্যালায় ॥
১৩
আপনাকে আপনি চেনা যায় কিসেতে
যে চিনা আল্লাকে চিনা, নবি ফর্মায় হাদিসেতে ॥
রোজা কি নমাজ পড়া, কলমা কি হজ জাকাত দেওয়া
তম্বি ভারি পাঞ্জাগানা, নিজ পরিচয় কই তাহাতে ॥
কাবাতে নিয়াত নিরূপণ, আপন কাবার নাই অন্বেষণ
খলিলের কাবায় কি কখন, আল্লাজিকে পারো দেখিতে ॥
আপনাকে আপনি ভুলে পশ্চিম তরফ খাড়া হলে
দুদ্দু কয় রুকু সেজদা দিলে, খোদার দিদার কই তাহাতে ॥
১৪
আপনাকে চিনবি যদি মুর্শিদকে চেনো আগেতে
তবে সে চিনিতে পাবে কীরূপ খোদা এই দেহেতে ॥
মুর্শিদ হন রাহা কলেন্দার দেখান সে কায়দা বন্দেগির
মোরাকেবা খোদার দিদার হয় যাহাতে ॥
আপনি ডুবে আপন মাঝার আছে সে নিরূপ নিরাকার
সে রূপ মন চিনে বেখুদি পিয়ালার সাথে ॥
সিঁড়ি ধরে উঠলে পরে মোকাম মঞ্জিল মেলে তারে
লালন সাঁই কয় দুদ্দু ভেড়ে ঘুরিস কেন ঘুরোপথে ॥
১৫
আমি বান্দা তাই জারি করে সবায়
কী বস্তু আমি, আমার নাই নিজ পরিচয় ॥
নুরে নীরে হয় অজুদ গঠন মা বাপ হতে হয় উপার্জন
কী বস্তু খোদা নিরূপণ এই বান্দাতে রয় ॥
কীরূপ খোদা কীরূপ বান্দা খোদা বান্দা নহে জুদা
বান্দার কলবে খোদা, খোদার আরশ কয় ॥
আমি ফানা হলে তখন খুদি ফানা হয় নিরূপণ
বেখুদ হয়ে গেলে গোলাম তখন সই দিবেন খাতায় ॥
খোদা বান্দা একাসনে লক্ষ যোজন ফাঁক দুজনে
দুদ্দু কয় সে ভেদ না জেনে, বান্দার দাবি বৃথায় ॥
১৬
আমি মনের দোষে হলাম সাধনহীন
পূর্বস্বভাব যায় না মনের, স্বভাব হলো ক্ষীণ ॥
স্ত্রীলিঙ্গ পুংলিঙ্গ মৈথুন, পূর্বস্বভাব হয় উদ্দীপন
নিজ ইন্দ্রিয়সুখ তাই নিরূপণ, মনে তাই হলো না সাধন ॥
প্রকৃতিভাব পুরুষ লবে, পূর্বস্বভাব ঘুচে যাবে
গোপী ভাবাশ্রিত হবে, সেভাবে মন ভাবলি কখন
সাধনের বল শুদ্ধ ভক্তি, ভক্তিপাত্র হন প্রকৃতি
যাতে উদয় মধুর রতি, সে রতির হলো না সাধন ॥
পদ্মে মধু হয় নিরূপণ, সে পদ্মের করলে না যতন
দুদ্দু কয় পদ্মপীড়ন, করলি রে মন হয়ে কঠিন ॥
১৭
আল মোকামে আছেন আলেক সাঁই
আলের খবর নিলে আলেক পাই ॥
আলের সন্ধি যার জানা আলেক হলো তার ঠিকানা
বিষে বিষ করে ফানা করে উদয় ॥
আলের দরবেশ যারা আলখানার ভেদ পেল তারা
তাদের হলো কর্ম সারা দেখতে পাই ॥
আসকে মাসক মিলে যে বস্তু হাসেল করিলে
বিনয় করে বলে দুদ্দু কোথায় বা যাই ॥
১৮
একেতে অনন্ত বস্তুর করো ঠিকানা
যেখানে অনন্তের জন্ম খবর নিলে না ॥
অনন্ত যথায় স্থিতি তথায় বসি প্রকৃতি
প্রকৃতি সাধিয়া সিদ্ধি সেধে দেখো না ॥
প্রকৃতি সাধনের মূল তথায় অনন্তের স্থল
তার চরণে হলে ভুল হবে কানা ॥
সাধ প্রকৃতির চরণ মিলিবে অনন্ত রতন
দীনহীন দুদ্দুর বচন লালন সাঁইয়ের বেনা ॥
১৯
কলিকালে ধর্মের না কত রঙলীলা
ধর্ম নিয়ে সবাই রে ভাই করে খেলা ॥
আন্দাজে করে গুরু পার তাই জানে সকলি সার
হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান কিংবা বুদ্ধের চেলা ॥
ধর্মযাজক জগৎজোড়া লোভে কামে যাচ্ছে মারা
মনুষ্যত্ব ন্যায় সত্য শুধু শুধু মুখে বলা ॥
অন্তরে নাই সত্যের অঙ্কুর শুধু রে ভাই বাড়ায় শত্তুর
দীন দুদ্দু বলে রে তাই, কী বলব মুখে তালা ॥
২০
কপালের দোষ কেন দেও ভাই
আপনি করো সকল দিয়ে কপালের দোহাই ॥
কপাল অদৃষ্ট যার নাম মানুষে সৃজন করে তামাম
ভাবিলে সেই আলেক মোকাম হই রে সকল সাফাই ॥
জ্ঞান বুদ্ধি কর্মেরই জোরে কেউ রাজা কেউ প্রজা নাম ধরে
মিছে সংস্কারে পড়ে, বলে কপালেতে নাই ॥
কপাল কপাল করো কখনো এ সকল মানুষের সৃজন
বিনয় করে বলছে লালন, দুদ্দুর বুদ্ধি নাই ॥
২১
কবে রে মানুষ চাঁদের শ্রীচরণ পাব
যাবে সব যাতনা মোর কামনা সেই চরণে কুসুম দেব ॥
কবে দয়া হবে তাহার যাবে আমার ভবের বিকার
কবে মিলন হবে দোহার, সেই চরণে মিশে যাব ॥
নয়নজল আর মনফুলে, দিয়ে কুসুম শ্রীযুগলে
বসিব নদীর কূলে, সেই চাঁদ নিধি হেরিব ॥
কুদরতি ঘাটের কিনারায় দিনে দিনে আমার দিন যায়
কী দশা হলো আমার কারে দোষ দেব ॥
সব বিশ্বাস মানুষ চাঁদে করে অধীন দুদ্দু কাঁদে
লালন সাঁইকে প্রেমের ফাঁদে তাই তো বেঁধে খাবি খাব ॥
২২
করো না শরাফতির বড়াই
সৃজনকর্তার দ্বারে এর মূল্য নাই ॥
যারা করে জাতির অভিমান তারা তো মরদুদ শয়তান
মানুষ নয় হীন অসমান কোনো কালে ভাই ॥
যারে বলো কলু জোলা, সে জোলাই কবির জোলা
তার দ্বারে বাঁধা কালা, ভক্তের মুখে পাই ॥
শিক্ষা দীক্ষা সাধনার গুণে ইতর বিশেষ এই
ভুবনে বীর্যে কেহ হীন নহে, দুদ্দু ভণে তাই ॥
২৩
কার কেমন গুণ জানা যাবে আখেরে
কোথায় কে কী করে ফেরে ॥
ছাইচাপা থাকে না অগ্নি আগুন বস্তু এমনি
মনুষ্যত্ব সত্য তেমনি বের হয় স্ফুরে ॥
ফলে বৃক্ষের পরিচয় এই কথা সকলে কয়
যে যা দেয় সেই তো পায় এই সংসারে ॥
মনে মনে মনকলা খাই করো না রে আত্মবড়াই
দুদ্দু বলে আমি তেমনি ভাই ঘুরে ফিরে ॥
২৪
কী বা রসের সেই নদী বহিছে উজান নিরবধি।
চিনিলে জ্ঞান থাকে না ধৈর্যের ঘরে দেয় হানা ॥
চিরকাল আনাগোনা ব্ৰহ্মাণ্ড ভেদি ॥
সেই নদীতে দিয়ে খেওয়া সে-ই করে ভাই আসা-যাওয়া
জীবন-মৃত্যুর নেওয়া-দেওয়া জীবন অবধি ॥
খুঁজলে সেই নদীর গোড়া হয়ে যাবে ছন্নছাড়া
আপন ঘর দিয়ে ভাড়া দুদ্দুর সেই গতি ॥
২৫
কী ধর্ম প্রচারে গোরা যারে প্রেমের ধর্ম কয়
তবে কেন হরিদাসে ‘হরিনাম’ নিতে হয় ॥
সর্ব ধর্মে আছে মুক্তি বৈষ্ণবেরা বলে যুক্তি
তবে কেন এ রীতি হরিদাসের বেলায় ॥
পক্ষপাতিত্বের দোষে দুষ্ট ভাই বৈষ্ণব মত সে
তাইতে বাউল তাই দোষে, দেখতে যা পায় ॥
কৃষ্ণ বিনে প্রেমের করণ কোন নবি কি জানেনি কখন
তবে কেন এমন বচন কৃষ্ণের পরে দেয় ॥
বৌদ্ধ তন্ত্রের করণ পঞ্চরসিক করে নিরূপণ
শাক্ত মতে এসে মিলন তাইতে হয় ॥
সাহিত্য কাব্যের তরে রাধা কৃষ্ণ সৃষ্টি করে
এভাবে সৃষ্টি হয় রে, দুদ্দু তাই জানায় ॥
২৬
কে এমন ঘর বেঁধেছে জানে কে তার ঠিকানা
খোঁজ পেলে নিতাম মাথায় তার চরণ দুখানা ॥
পানির মধ্যে আগুন জ্বেলে এ দেহ সৃষ্টি করিলে
থাকিয়া গোপন ঘরে, ঘুরায় কল সে না
হরনাল করনাল মৃণালে ঘুরায় কল সদাই চলে
আড়ালে থাকিয়া বলে, আমারে কেউ দেখলে না ॥
যে চেনে তাহার বাসা পূর্ণ হয় তাহার আশা
ঘুচে যায় ভব দুর্দশা, দীন দুদ্দুর বর্ণনা ॥
২৭
কে তাহারে চিনিতে পারে ভাই
মানুষের চরণ না চিনিলে উপায় নাই ॥
কাশী কিংবা মক্কায় যাও রে মন দেখিতে পাবে মানুষের বদন
ধ্যান ধারণা ভজন পূজন মানুষনিধি সর্ব ঠাঁই
মানুষের আকার ধরে খোদ খোদা যে ঘোরে ফেরে
যবন কাফের বলে দিলে গো তাড়াই ॥
দেখিয়া মানুষের দশা দুদ্দুর মুখে নাই যে ভাষা
মনেতে করি গো আশা একদিন জানবে সবাই ॥
২৮
কোন দিন থাকিতে সাঁইয়ের খাতায় সই পেল না
দিনে দিনে গেল দিন আর তো পাবে না ॥
ভেবেছিলেন লঙ্কাপতি স্বর্গ-সিঁড়ি করবেন স্থিতি
আজ করি কাল বলে শেষ হলো না ॥
শুভস্য শীঘ্রম বাণী শাস্ত্রেতে আছে বাখানি
জানলে না কী যে করণী তাইতে সই দিলে না
আহা রে জনম পেলি পেয়ে জনম কী যে হলি
কথা বেচে রাত পোহালি দুদ্দু দিনকানা ॥
২৯
কোন কৃষ্ণ হয় জগৎপতি
মথুরার কৃষ্ণ নয় সে, সে কৃষ্ণ হয় সবার গতি ॥
জীবদেহে শুক্ররূপে এ ব্ৰহ্মাণ্ড আছে ব্যাপে
কৃষ্ণ তারে কয়, পুরুষ সে-ই হয়, রাধার গতি (পতি) ॥
কৃষ্ণ বস্তু নিগুম ঘরে জীবদেহে বিরাজ করে
রসিকের করণ, সে কৃষ্ণ ধারণ, গ্রহণ গম্ভীর অতি ॥
আত্মতত্ত্ব জানে যে জন, কৃষ্ণ হেতু (সেতু) চেনে সে জন
লালন সাঁইর বাণী, বলে রসিক ধনী, দুদ্দুর প্রতি ॥
৩০
কোন রসেতে কোন মানুষের আগমন
রস ভিয়ান করো নিরূপণ ॥
চর্বচষ্য পিয় স্পর্শ রস, রূপরসেতে সাধক নিৰ্যাস ॥
কোথা রসের স্থিতি, কোথায় উৎপত্তি, সাধক করে বিচরণ ॥
গুরুরসে দুগ্ধ ছানা হয়, ক্ষীর দধি ভিয়ানের দ্বারায়
জরদে সরদ যাতে হয় ক্ষীরোদ, রসিক করে সাধন ॥
ইক্ষুরসে গুড় চিনি হয়, মিছরি উলা ফলায় ভিয়ানের দ্বারায়
নায়িকা নায়কে করে সাধন, সুধা অমৃত মিলন
অখ-ইক্ষু জ্বালের দ্বারায় গুড় কি চিনি তাতে কিছুই প্রাপ্তি নয়
দুদ্দু তা-ই খেয়ে রসিক নাম পাড়ায়, শুধুই গরল উপার্জন ॥
৩১
খোদরূপে আছেন খোদায়।
খুদি ছেড়ে বেখুদ হলে, খোদাকে সে-ই দেখিতে পায় ॥
খুদি শব্দের দুই অর্থ হয়, আমি খুদি আর সে খোদায়
জাতে ছেফাত দেখা যায়, ছেফাতে জাত রয় ॥
মোকাম মঞ্জিল লতিফাতে খোদা ছাড়া সাধন তাতে
সেরেকি হইবে তাতে, জানহ নিশ্চয় ॥
খোদরূপেতে খোদাতালা খেলছে কুদরতি খেলা।
কুল্লে সাঁই মোহিত আল্লা স্বয়ং কাদের হয় ॥
খোদরূপেতে সে রূপ জানা, দ্বিদল তার বারামখানা
লালন বলে সে ভেদ জানা দুদ্দুর কর্ম নয় ॥
৩২
গুরু নিজ গুণে কৃপা করে চরণ দাও আমারে
তবে দয়াময় তোমায় জানা যায় ॥
স্বভাবদোষে আমারই মন বাগ ছেড়ে বিবাগে গমন
হীন হয়েছি ভজন সাধন দাও চরণ স্বকরুণায় ॥
জগৎ করিতে তারণ প্রতিজ্ঞা তোমার নিরূপণ
গুরুরূপ করিয়া ধারণ করুণাসিন্ধু নাম তোমার ॥
যদি পতিত পতিত রবে প্রতিজ্ঞা পালন কই হবে
দুদ্দু কয় কলঙ্ক রবে পতিতপাবন কই রয় ॥
৩৩
গুরুবস্তু চেতনের ঘরে চেতনের সঙ্গ ধরে চিনে নাও তারে ॥
চিৎশক্তির উৎপন্ন যেথায় চেতন মানুষ তারে কয়
তারে ধরে চেতনপ্রাপ্তি হয় এ সংসারে
যে দেশে চেতন ধনী শিরে নাও তার চরণখানি
গুরুবস্তু মিলবে এখনি নহে তো দূরে ॥
আগমেতে গেল জানা শক্তির দ্বারে গুরুজনা
দুদ্দু বলে পরশে সোনা, আপনে যারে ॥
৩৪
গুরুরূপ কোন রূপেতে বলা যায়
নিগূঢ় তত্ত্ব উপাসনায় সে ভেদ জানিতে হয়।
আকারে সাকার রূপ কয় পঞ্চরূপ সাকার হয়,
দ্বিদলে উদয় কোন রূপ তার গুরুরূপ হয়, তা-ই করি নির্ণয় ॥
নিত্য স্থিতি সাকার রূপ হয়, অনন্ত রূপ আকার হয়
নিত্য নূতন কয় পুরুষ প্রকৃতি আকার জগৎময় ॥
গুরু আর শ্রীগুরু লিখন শিক্ষা দীক্ষা হয় নিরূপণ
দুই স্বরূপ হয় সাধকের আশ্রয়, সখির চরণ কয় ॥
গুরুরূপ সখি শুনি করে ধরিলেন তিনি
শ্রীগুরু হস্তে দ্যায়, দুদ্দু কয়, নিত্য সেবায় বর্ত রয়।
৩৫
গেল রে জানা গেল তোর ইতরপনা
দুধ বেচে মদ খেলি করে কী বিবেচনা ॥
যা করো মন গোপন ঘরে আপন ইচ্ছায় যমের পুরে
যেতে হবে আখেরে পাবে না কোথাও পানা ॥
পেয়ে এই মানবজনম করিলি পশুর করম
এই কি তোমার মানুষ ধরম, সত্যের ঠিকানা ॥
আমার আমার রবে সদায় দিন তোমার যায় মনুরায়
দুদ্দু কয় দয়াল আমার দিও গো সাঁই চরণখানা ॥
৩৬
চরণ শরণ করো মন তীর্থে খুঁজে মরো না এখন ॥
চরণের দাসী হও রে থাকো চরণ ধরে
সে ধন দেবে তোরে হবি মহাজন ॥
চরণের ভেদ জানো, চরণ অমূল্য ধন, বসিলাম এখন ॥
অমূল্য নিধি কিবা হয় যেজন চরণ না চিনয়
চরণে অধর পয়দা হয় করো রে সেবন ॥
লালন সাঁইজি ডেকে বলিছেন দীন দুদ্দুকে
আর কেন বেড়াস দেখে, বাইরে রেখে মন ॥
৩৭
চাঁদ যেমন মেঘে রয় ঢাকা
মানবদেহেতে তেমন খোদার রূপরেখা ॥
যোগ নীরে হিয়ার মাঝার ত্রিকালেতে করেন বিহার
জানিলে খবর তাহার যায় রে ধোঁকা ॥
যে জানে চাঁদের ঠিকানা সিদ্ধি হলো তার সাধনা
গুরুচাঁদ ভজে সে না, হয় রে পাকা ॥
চাঁদের রূপের কাহিনি শুনে লালন সাঁইজির বাণী
দীন দুদ্দু বলে আমি শুনি, সে এক ফাঁকা ॥
৩৮
চাঁদে চাঁদে আছে ঘেরা
লক্ষ যোজন ফাঁকে থাকে চাঁদ চকোরা ॥
কেমন করে মাসে মাসে যুগল হয় সন্ধিতে এসে
পাইলে তাহার দিশে, করণ হবে সারা ॥
সে বড়ো আজগুবি কথা ব্যাঙে খায় সাপের মাথা
সে ব্যাঙের কী ক্ষমতা, শুনে হই চমৎকার ॥
আজব রমণ বাখানি লালন সাঁইজির মুখে শুনি
দীন দুদ্দু কহে বাণী, সে চাঁদ কেমনে যায় ধরা ॥
৩৯
চার যুগের উপর কে দেয় খেয়া
তাহারে চিনিয়া ধরো, ও মন ভায়া ॥
শুক্রবিন্দু হইয়ে যখন করেছিলে যোনি ভ্রমণ
কে তোমারে করিল ধারণ দয়াল হইয়া ॥
তোমার মতো কতজন রে বিনা যোগে গেছে মরে
কৃপা করে তোমায় ঘরে, রাখে জীবন দিয়া ॥
সেইজন ভজনের গোড়া হোস নে তার চরণছাড়া
দুদ্দু কয় মোর মন বেয়াড়া বেড়ায় হাটে হাঁটিয়া ॥
৪০
জাতাজাতির ঘরে যেও না রে মন
ওতে যাবে ধর্ম কর্ম মর্ম তাই বলি এখন ॥
শয়তান আর অসাধু মিলে, জগতের বর্বর সকলে
জাত গোত্রের সৃষ্টি করিলে সৃজন ধ্বংসের কারণ ॥
মাথায় দিয়ে আঠা হাত সেই কাঁঠাল খাওয়ার জাত
জাতের ব্যবসা করে রে বেজাত, এ সব তাদের দর্শন ॥
যে ঈশ্বর দেয় জাতির ফর্মান, সেই ঈশ্বর ভাই খান্নাস শয়তান
দীন দুদ্দু রচিয়া যায় গান এ পাপ দূর হবে কবে ॥
৪১
জাতির বড়াই তুড়িতে দ্বীনের রাসুল দয়াময়
বারবার চেষ্টা করে যায় ॥
সেই জাতির গৌরব করে বঙ্গদেশে সৈয়দ মরে
ও কথা বলিব কারে দুঃখে মরি সদায় ॥
মুচির ছেলে হলে মুসলমান দেয় যদি সে খোদার ফর্মান
আনিবে সবাই ইমান রাসুলাল্লা কয় ॥
এই কি রে নবিজির ধর্ম দ্বিন পালন করে যত সব মোমিন
দুদ্দু বলে কথার তোড়ে দীন বানায় সবায় ॥
৪২
জীবন থাকিতে মরিতে কয়
জানি না সে কেমন মরা শুনিতে বাঞ্ছা হয় ॥
জীবন থাকিতে মরণ গোস্বামীর কলম নিরূপণ
মরায় মরায় করে সাধন সে মরণ কারে বলা যায় ॥
করিলে অটল সাধন সেও তো আত্মসুখের কারণ
লোহায় লোহায় করে ঘর্ষণ জীবনে মরণে কৈসে হয় ॥
বাণে বাণে রণ করায় পূর্বস্বভাব তাহাতে রয়
মাসি পিসি জ্ঞান নাহি রয় পশু-ব্যবহার তাহারে কয় ॥
রসিক রসিক বলে ঘোষণা কোটির মধ্যে দুই একজনা
দুদ্দু মরার ভাব জানে না শুধু চটকে মাতায় ॥
৪৩
তোমার লীলা বুঝতে জনম যায়
কী লীলায় জগৎ মজালে ওগো দয়াময় ॥
ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির কারণ আসি (আদি) লীলা করলে নিরূপণ
আপন অংশ করলে খণ্ডন রূপের খাতায় ॥
আসলে নকল বানাও নকলে আসল বসাও
যা ইচ্ছা তা-ই করে যাও সৃষ্টির বেলায় ॥
আপ্ত লীলায় গুপ্ত লীলা ত্রিজগতে করো খেলা
দুদ্দু বলে এত ছলা কীসের আশায় ॥
৪৪
তোর মতো আর কলঙ্কিনী দেখিনি ব্রজে
আমরা শুনে মরে যাই লাজে ॥
স্বগৃহে থাকিতে স্বামী করিলি এমন বদনামী
কলঙ্কিত-এ ব্রজভূমি, মনে হয় রে যাই ত্যজি ॥
কে জানত সেই কপালপোড়া সবের অধম কেলে ছোড়া
মজায়ে কুলছাড়া মোদের করিল যে ॥
ছি ছি কী কথা তোর চরণে ছোঁয়ায় মাথা
দুদ্দু বলে যথায় ব্যথা, সেখানে কি লজ্জা সাজে ॥
৪৫
থাকিতে প্রাকৃত রতি অমৃত সে কভু নয়
জারণ হইলে রতি প্রেমামৃত হবে তায় ॥
পরকীয়া ভাব গ্রহণ আগেতে করো ও মন
অন্ত বাহ্য দ্বিবিধ সাধন, হবে যার দ্বারায়
বাহ্য পরকীয়া করো নায়িকাতে নিরন্তর
পূর্বস্বভাব থাকলে পর অঙ্গ সেবায় যোগ্য নয় ॥
অন্তরঙ্গ পরকীয়াতে বানের তরঙ্গে মেতে
পঞ্চগুণ উৎপত্তি তাতে, সপ্ত নদী লঙ্ঘায় ॥
রূপনগরে দিয়ে নয়ন অটল রূপ হেরে সর্বক্ষণ
উজ্জ্বল রসেতে মগন, প্রেমের বিকার হয় না সদায় ॥
অগ্নিকুণ্ড বিনে রে মন দুগ্ধ কীসে হয় আবর্তন
প্রকৃতি দেহ নিরূপণ, অগ্নিকুণ্ড তাই যেমন ॥
সেই অনলে রসিক সুজন প্রাকৃত রতি করে জারণ
ভেক ফণীতে উভয়ে তখন একাসনে যুতে রয়
লালন শাহ দরবেশের বচন দুদ্দু সাধনপথে গোল বাধায় ॥
৪৬
থাকিতে স্বসুখ বাসনা শুদ্ধ প্রেম উদ্দীপনা তার হবে না।
আত্মসুখী ব্যভিচারী সহজ প্রেম তার ঘটে না ॥
টলে জীব অটলে ঈশ্বর আত্মসুখ কামনা দোহার
শুদ্ধ প্রেমের নাই অধিকার হেতুসাধ্য গণনা
নায়ক নায়িকা দুয়ে সদ্ভোগ নয় ভগলিঙ্গতে
প্রেমশৃঙ্গারে উভয়ে মাতে আত্মস্মৃতি থাকে না ॥
শৃঙ্গারের নির্ণয় করে রসিকে প্রেম করে সাধনা
মৃতদেহে জীবন সঞ্চারে অমিলা রস লয় সে না ॥
মহাভাবের হয় ভাবিনী প্রেমশৃঙ্গারের সেই সে ধনী
লালন বলে রসিক তিনি, দুদ্দুর স্বভাব গেল না ॥
৪৭
দেখো রে কুদরতি কারবার
এক মানুষে আর মানুষ খায় বেসুমার ॥
মানুষে মানুষ খেল এ জগতে জানা গেল
মানুষের দেহ হলো মানুষের মাঝার ॥
বিনাশে জীবন প্রাপ্তি তাই দেখি সৃষ্টির গতি
এই রূপে রয় প্রকৃতি যুগ যুগান্তর ॥
একের বিনাশে রে মন অন্যজনে পেল জীবন
দুদ্দু কয় জীবন দর্শন, দেখি বারেবার ॥
৪৮
দুই মরা একত্রে করল রমণ
তাইতে ছেলে এক হলো সৃজন ॥
জন্ম নিয়ে খোঁজে মাকে বাবা থাকে মরার বাঁকে
হাতের কাছে পায় যাকে করে সেবন!
শুনে এই আজগুবি কথা কতজনে মুড়িয়ে মাথা
নিল গলে তুলি কাঁথা ছেলে ধরবার কারণ ॥
যে বুঝেছ চুপ করে থাকো আপন ঘর পাহারায় থাকো
যোগের ঘরে তারে দেখি দুদ্দুর বচন ॥
৪৯
দেহে সাধন সম্ভব হয়
এ দেহে দেহের জন্ম তাইতে কয় ॥
যে দেহ সাধনের কর্ম সেই দেহ দেয় দেহজন্ম।
ভাবিয়া ঢোঁড় মর্ম কথায় দিন যায় ॥
এ দেহ আর সেই দেহ মিশিবে আসিয়া দুহ
তবে তো সিদ্ধি সেহ, অবশ্য পায় ॥
অযথা বৈদিক তর্কে কাটায় সেই সব মূর্খে
ঠিক নাহি তাদের বাক্যে, দীন দুদ্দু গায় ॥
৫০
দ্বিনময় এ সংসার রে ভাই
অধর্ম কি সত্যই নাই ॥
স্বধর্মে সকলি চলে আকাশ পাতাল জলে স্থলে
স্বধর্মের ব্যাঘাত হলে, মরে সবাই ॥
স্বধর্ম কাহারে বলে জানবে জ্ঞাননয়ন হলে
জন্ম-মৃত্যু যারে বলে ধর্মাধর্ম তাই ॥
সে বড়ো আজগৈবি ল্যাঠা খেয়ে স্বধর্মের খোটা
গোল বাধাও দুদ্দু বেটা, বলেন লালন সাঁই ॥
৫১
ধন্য সেই গোপিকার ভাব যাদের দ্বারে বাঁধা হরি
দেহ মন দিয়ে পূজে সাধুশাস্ত্রে খ্যাতি হয় তারি ॥
আত্মসুখ ত্যজি তারা কৃষ্ণসুখে পাগলপারা, বরাবরি
নাই কালাকাল সকাল বিকাল, রাইকিশোরী ॥
গোপী ডাকে সদায় দাসখত লিখে দেয় বংশীধারী
সে প্রেমের আর নাই তুলনা কাম তুফানি নির্বিকারী ॥
ভাবে উত্তম কয় সহজ মানুষ বদ্ধ রয়, সহজ মাধুরী
মাধুর্য ভজন হয় নিরূপণ, দীন দুদ্দু কয় ফুকারি ॥
৫২
ধ্যানী জ্ঞানী পেল না যারে
সামান্যে বলো কে পাবে তারে
বিন্দুরূপে ভাসে সদাই ভাবিলে বুঝিয়া পাই
তবে কেন জঙ্গলে যাই, গাঁজার কল্কে ধরে ॥
ঘরে বাহিরে একইজন সে চিরদিন সন্ধিতে ভাসে
বিশ্বাস না হয় দেখো এসে, সন্ধির সে অন্ধকারে ॥
বর্তমান খোঁজার দলে বাউল সম্প্রদায় সকলে
বিনয় করে দুদ্দু বলে, নিত্যের সে-ই করে ॥
৫৩
নবি চেনা হয় কামনা, আগে মুর্শিদ ধরো।
আউল আখের জাহের বাতন তবে সে ভেদ জানতে পারো ॥
আল্লার নুরে যে নবি হয়, সারা জাহান তার নুরে কয়
হায়তোল মুরসালিন নাম, জিন্দা চারযুগের পর ॥
নবি অঙ্গ অংশকলারূপে, তিনরূপ ধরে একরূপেতে
অংশরূপ রয় সব ঘটেতে, বাতনে নুর কয় যার ॥
কলারূপে মদিনাতে জাহের হলেন তরিক দিতে
জাহেরা আর পুসিদাতে সিনা সপিনা ভেদ তাহার ॥
নবি মুর্শিদ ভজন আইন দিয়ে, খাকের দেহ খাকে থুয়ে
নুরেতে নুর যায় মিশিয়ে দুদ্দু কয় আকারে সাকার তার ॥
৫৪
না দেখে রূপ সেজদা করে অন্ধ তারে কয় ॥
রূপ দেখে সেজদা দিলে রাজি হন খোদায় ॥
গাওয়াহী কালামউল্লা দেয়, মান কানা ফি হাজেহি
আমায় কানা বলে গাল তারে দেয় খোদায় ॥
সাক্ষাতে থাকিতে রতন, অন্ধ কি তার পায় দরশন
না দেখে সেজদা দেয় যে জন, সেও তো তেমনি প্রায় ॥
রূপ দেখে বন্দেগি আদায়, ফরমিয়াছে আপে খোদায়
আহুয়া মালকুম দলিলে কয়, নজির দেখা যায় ॥
মুর্শিদকে চিনিয়া যে জন, করেছে সে রূপ অন্বেষণ
দরবেশ লালন সাঁইর বচন, দুদ্দুর ভুল সদায় ॥
৫৫
নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ শাস্ত্রেতে কয়
নিরাকার চেতন বস্তু কি তার পরিচয় ॥
নিরাকার নীরেতে ভাসে তাই শুনি সাধুর ভাষে
কবে কোন যোগে এসে নিরাঞ্জন হয় ॥
আত্মবস্তু ঠিক না হলে নিরাকার কি আকারে মেলে
ভক্তের দ্বারে আকার ধরে মানুষ আখ্যা পায় ॥
যথাতথা নয় আগমন সহজ বস্তুতে মিলন
তদ্রূপ নিরাকার নিরঞ্জন যৈছে মাখন দুগ্ধে রয় ॥
আত্মতত্ত্বে কামেল যারা নিরঞ্জনকে ধরল তারা
দুদ্দু ভনে বিনয় করে, পেঁড়োর কাজ পিঁড়েয় হয় ॥
৫৬
নিরাকার সেই ভাসিয়াছে নীরে
ডিম্বরূপে আছে ব্যাপে সাধনদ্বারে ॥
ত্রিবেণীর ঘাট যাহার নাম যোগেতে তথায় বারাম
ধারণে ত্রিতাপ তামাম পলায় রে দূরে ॥
ডিম্বরূপে যাহার বিহার তারে ধরেই পেলি আকার
মানুষজন্ম হয় তোমার ভবের উপরে ॥
যে ভাসায় সেই ফল ঘাটে মহিমা অপার বটে
দুদ্দু কয় তার নিকটে খোদায় খোদা নাম ধরে ॥
৫৭
নিরিখ বাঁধো দুটি নয়নে দেখা হবেই হবে জীবনে ॥
মিথ্যা নয় সত্য বলি যে পথে আমরা চলি
বৈরাগী পথ যারে বলি তাজ্য করে জেনে ॥
অনুষ্ঠানে মালা জপা ছাড় রে এসব ভ্যাপা
গাঁজা খেয়ে হাজরা খ্যাপা হয়ো না কোনোখানে ॥
হিন্দুদের ঠোকাঠুকি মুসলমানের যত মেকি
দুদ্দু কয় ছাড় দেখি সকলি জেনেশুনে ॥
৫৮
নীরঘাটার ভেদ কে জানায়
যাহাতে সব সিদ্ধি, মুক্তি, তৃপ্তি, প্রাপ্তি হয় ॥
অকৈতব নীরঘাটার কথা যা শুনিলে জুড়ায় ব্যথা
ডাল ছাড়া সৃজন পাতা, আছে যথায় ॥
নীরঘাটাতে আজব কারবার, সৃষ্টি করে আছে কারিকর
অন্ত নাহি কেউ পেল তার আছে কোথায় ॥
নীরঘাটাকে যে জেনেছে নিরঞ্জনকে সে-ই পেয়েছে
দুদ্দু কয় ভক্তির কাছে, আছেন সদায় ॥
৫৯
নুরে নীরে গুপ্ত বারি রাখিলেন সাঁই ঘিরে
আদ্য নুরি অচিন মানুষ কয় যারে ॥
যখন সাঁই শূন্যকারে ছিলেন একা একেশ্বরে
(অনন্ত) আপন শক্তির জোরে নিজ শক্তি প্রকাশ করে ॥
স্থির বায়ু হেমন্ত যারে কয়, যোগেশ্বরী সত্য যিনি হয়
সৃষ্টি স্থিতি লয় তাহারই প্রলয়, সারেজাহান জন্মায় উদরে ॥
খোদ অঙ্গের অঙ্গিনী যিনি, চম্পক কলি সেহি ধনী
আদ্যাশক্তি প্রেয়সিনী নবি জন্ম নিল তার শরীরে ॥
সেতারা রূপে ছিলেন যখন (ডিম্ব) অম্বু বিম্ব না হয় তখন
লালন কয় অগম্য বচন, দুদ্দু সে ভেদ বুঝতে নারে ॥
৬০
পথ চলতে স্মরণ করো মন
এরও পূর্বে এ পথ দিয়ে গেছে বহুজন ॥
গেছে যে ফেরেনি তারা যা নিয়ে গেছে পসরা
তাহারই গল্প সদা শুনি সর্বক্ষণ ॥
চিরদিনের তরে দুনিয়ায় বসতি কেউ নাহি করে যায়
যতটুকু পারি গো হেথায় করি মনুষ্যের করণ ॥
সরাতে পথের কাঁটা হয়ে যেন থাকি ঝাঁটা
দুদ্দু কয় এই কামনা আমার যে এখন ॥
৬১
পরকীয়া স্বকীয়া দুই শাস্ত্রে লেখা যায়
কোন গুণের তারতম্যে কোন রস কোথা উপজয় ॥
একই দেহ রক্ত মাংস সৃজন একই বস্ত্র উভয়ে ধারণ
একভাবে উভয় নিরূপণ, তবে স্বকীয়ার কী দোষ হয় ॥
পরকীয়ার অধিক উল্লাস কোন রসের হলে প্রকাশ
যার অঙ্গে রসিক নির্যাস, পরকীয়ার গুণ গায় ॥
কী বস্তু কী কারণ ভেদে স্বকীয়া পরকীয়া চাঁদে
দুদ্দু কয় তোমার ফাঁদে মানুষচাঁদ উদয় হয় ॥
৬২
পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়ে সরা ধরে কে পায় তারে।
পাঁচ বেনা সরাতে জারি মোরাকেবা মোশাহেদা তারি
কোন বেনাতে নবিজি মোর নবুয়ত পায় রে ॥
আবদুল্লা আমেনা দুজন করেনি নমাজ নিরূপণ
চল্লিশ বছর নবি সুজন নমাজ পড়েনি রে ॥
এ সকল দেখিলে কিংবা শুনিলে কাহারো ঠাঁই
দয়া করে বলো আমায় কত ‘খোতবা’ নবির তরে ॥
কাটমোল্লারা জানে না খবর অযথা ধরে তর্ক জবর
দুদ্দু কয় হবে পাতক নফলে পড়ে ॥
৬৩
পাত্রগুণে রস উপজয়
পাত্রের প্রকারভেদে স্বকীয়া পরকীয়া হয় ॥
হলে নারী ব্যভিচারী বস্তু তবু নির্বিকারী
বস্তুর দোষ নয় তাহারি, এমত পাত্রের দোষ হয় ॥
স্বভাব আর ভাব প্রকৃতি সাধনের দায় করে স্থিতি
ভাবপ্রকৃতির রীতি মহাপ্রভু সেধে লয় ॥
বিষ্ণুপ্রিয়া শাঠির দেহে একই বস্তু আছে দোহে
দুদ্দু কয় আমি মোহে পড়ে আছি ঘোর ঘোলায় ॥
৬৪
প্রকৃতি পুরুষ দুই রূপ নিরূপণ
পুরুষ নির্গুণ, প্রকৃতি হয় চেতন ॥
পুরুষ নির্গুণ ছিল প্রকৃতি জীবন দিল
তাহাতে সগুণ হলো সাংখ্যের বচন ॥
প্রকৃতি সৃষ্টির আদি প্রকৃতি ধরে পুরুষ সিদ্ধি
তাইতে প্রকৃতি সাধি, সৃষ্টিই জীবন ॥
প্রকৃতি পরশমণি, লালন বলেন বাণী
দুদ্দু শোনে সে কাহিনি, নিগম কথন ॥
৬৫
প্রকৃতির গুণের সীমা নাই যারে ধরে মানবজন্ম পাই ॥
একটি প্রদীপ হতে লক্ষ প্রদীপ প্রাণ পায় তাতে
তেমনি প্রকৃতির ওতে সৃজন সর্বদাই ॥
প্রকৃতি আদির কর্তা সৃষ্টির আদি সত্তা
প্রকৃতিতেই জন্মে পিতা পরমপুরুষ সাঁই ॥
লালন সাঁই দরবেশ যিনি বলেছেন এ সব তিনি
দুদ্দু বলে সত্য মানি, আমি যে তা-ই ॥
৬৬
বড়ো সাধ হয় রে আমার পুনঃ মানবজন্ম পাবার
একবার হারালে জনম আর পাবে না
যত বলো পুনর্জন্ম তাতে তো পরান ভরে না।
দুঃখ ক্ষোভ মনের ধোঁকায় পুনর্জন্ম সৃষ্টি হয়
তাহাতে পড়ে সবায়, খাবি খায় দেখো না ॥
জনম দুর্লভ অতি ভাই এমন জনম আর কি কখনো পাই
পুনর্জন্ম কেবলই বৃথাই, করো না খাতায় দেনা ॥
এ জনম দুর্লভ জেনে ধরো মানুষের চরণে
বিনয় করে দুদ্দু ভণে কে দেবে তার ঠিকানা ॥
লালন সাঁই কয় দুদ্দু তোমার জনম আর হবে না ॥
৬৭
বস্তুকেই আত্মা বলা যায়
আত্মা অলৌকিক কোনো কিছু নয় ॥
বিভিন্ন বস্তু সমন্বয়ে আত্মার বিকাশ হয়
জীবনরূপ সে পেয়ে, জীবেতে রয় ॥
অসীম শক্তি তার যে তাহার করে সমাচার
সাধিয়া ভবের কারবার বস্তুতে হয় লয় ॥
অন্ধ গোড়ামির বিকারে শূন্যেতে ভরলি ঘট রে
দুদ্দু কয় সে আপন ধান্ধায় এখানে ঘুরে বেড়ায় ॥
৬৮
বাউল জীবন কারে কয়
কী সে জীবন, কেমন বস্তু, জন্ম কোথায় লয় ॥
যে বস্তু জীবনের কারণ তা-ই বাউল করে সাধন
জীবনে পরম নিরূপণ বাউলেরা কয় ॥
জীবনই তীর্থ ধর্ম পথ, এই কথা বাউলের মত
বস্তুবাদী বাউল আদ্য কেহ কেহ হয় ॥
না করে অনুমান ভজন, করে না মুক্তির অন্বেষণ
জীবনেই সত্য নিরূপণ, দীন দুদ্দু জানায় (জানয়) ॥
৬৯
বিশেষ সামান্য রতি যারে কয়
কোথায় উৎপত্তি তাহার কোথায় লয়।
সামান্য রাই রতিদান শ্যাম রতির জানিলে বিধান
কার কাছে পাই তার সন্ধান, কেই রে নেয় ॥
পূর্ণিমা অমাবস্যা বিধি জানলে হতো সাধন সিদ্ধি
না জানিয়া অসার বুদ্ধি আন্দাজেতে ধায় ॥
লালন সাঁই দরবেশের চরণ দীনহীন দুদ্দুর বচন
দয়া হলে তার তখন অবশ্যই পায় ॥
৭০
বৈষ্ণব বাউল ধর্ম এক নহে তো ভাই
বাউল ধর্মের সাথে বৈষ্ণবের যোগ নাই ॥
বিশেষ সম্প্রদায় বৈষ্ণব পঞ্চতত্ত্বে করে জপতপ
তুলসী, মালা, অনুষ্ঠান সদাই ॥
বাউল মানুষ ভজে যেখানে নিত্য বিরাজে
বস্তুর অমৃতে মজে নারী সঙ্গী তাই ॥
নিত্যানন্দের দুই পুরুষ হয় বীরভদ্র বীরচূড়ামণি কয়
দুইজন দুই মতের গোঁসাই শুনতে পাই ॥
দরবেশি বাউলের ক্রিয়া বীরচন্দ্র জানে সেই ধারা
দরবেশ লালন সাঁইয়ের কথায়, দুদ্দু জানায় তা-ই ॥
৭১
ভজো মন মুর্শিদের চরণ, পলায় যাতে শমন
রসুলের ফরমান জারি অলি মুর্শিদ তারি
অকূলের কূল পাবে নিরঞ্জন ॥
সে মুর্শিদ গোপন থাকে উম্মত বলিয়া ডাকে
তরাবে সেই বিপাকে ভবতারণ ॥
মানুষ মুর্শিদ যে হয় প্রত্যেকের ঘরে সে রয়
দুদ্দু বিনয় করে কয়, লালন সাঁইর চরণ ॥
৭২
মনের দোষে মন হলি সাধনহীন
পূর্বস্বভাব যায় না মনের স্বভাব যে রইল প্রবীণ ॥
স্ত্রীলিঙ্গ পুংলিঙ্গ মন্থন পূর্বস্বভাব হয় উদ্দীপন
নিজেন্দ্রিয় সুখ তার নিরূপণ মন তায় হলি স্বাধীন ॥
প্রকৃতিভাব পুরুষ নিবে পূর্বস্বভাব ঘুচে যাবে
গোপীভাব আশ্রিত হবে সে ভাবকে তুই ভাবলি ভিন ॥
সাধনের মূল শুদ্ধ ভক্তি ভক্তির পাত্র হয় প্রকৃতি
যাতে উদয় মধুরতি সে রতির হলি না অধীন ॥
পদ্মে মধুর হয় নিরূপণ সে পদ্মের করলি না যতন
দুদ্দু কয় সে পদ্মের পীড়ন কামের অধীন
কল্লি মন তায় হয়ে কঠিন ॥
৭৩
মনের ভ্রান্তি ঘুচে গেলে
মানুষভজনের গোড়া আপনি মেলে ॥
শাস্ত্র ধর্ম তীর্থ ব্রত আর সকলি মানুষ করে তৈয়ার
জানিলে অমনি তাহার অন্ধ ঠুলি যায় খুলে ॥
কুদরত মহিমা যারে কয় সকলি মানুষে উপজয়
জ্ঞাননয়ন হলে দেখতে পায় এই ভূমণ্ডলে ॥
মানুষ আদ্য মূল গোড়া ফিরছে সদাই কেদ ছাড়া
দুদ্দুর সদাই নমাজ পড়া আন্দাজে চলে ॥
৭৪
মনের মানুষ যথায় বিহারে
আট বন্ধ করে দেখো নিগুম দ্বারে ॥
সেই দরজায় মহাজন তারে আগে চিনো রে মন
পরে প্রাপ্তি হবে সে ধন, কই তোরে ॥
আগে তারে বাধ্য করো যোগ নীরে মানুষ ধরো
তবে ধন পেতে পারো, সেই ঘরে ॥
সহজ নয় তারে ধরা জনম ভরে দাও পাহারা
দুদ্দু কয় শুনেই সারা হই আমি রে ॥
৭৫
মানুষ ভজনের কথা জানাই তোরে
যাহাতে অমর হবি যমযাতনা যাবে দূরে ॥
নরনারী নির্বিকার হয়ে দোহাকে জানিবি দোহে
জীবনের অকৈতব গৃহে, আত্মতত্ত্বের খবর করে ॥
যাহাতে সৃজন বর্ধন যোগে তাহা করিবি গ্রহণ
দীর্ঘ পরমায়ুর কারণ, জনম তার মরণের দ্বারে ॥
এ দেহকে অনিত্য ভেবে আত্মবস্তু খুঁজে নেবে
লালন সাঁই বলছে তবে, জানবি দুদ্দু মেয়েরে ধরে ॥
৭৬
মানুষ মানুষ সবাই বলে, মনুষ্যত্ব অর্জন হয় কী করিলে ॥
মানুষ মুর্শিদ ধরো তবে সব জানিতে পারো
নীরেতে আছে ক্ষীর যদি সে বলে ॥
মানুষের বাজার যেথায় সাধু সন্ত আছে সেথায়
কার সাধ্য সেখানে যায় কৃপা না হলে ॥
লালন সাঁইয়ের করণ ভারি দীন দুদ্দু কয় ফুকারি
দিও মোরে চরণ তরি কাঙাল বলে ॥
৭৭
মানুষরতন চিনলে না রে ভাই
গেল পুতুল পূজে জনম গো তাই ॥
যে ভাস্করে গড়ে পুতুল তার চরণ করিয়া ভুল
পূজে সবে মাটির পুতুল, দেখি রে তা-ই ॥
চিনলে না রে রাং কি সোনা কিনলি রে মন পিতলদানা
ভবিষ্যতে যাবে জানা, দেখিতে পাই ॥
সমঝে করো বেচাকেনা এমন জনম আর পাবে না
দীনহীন দুদ্দুর বর্ণনা, যাই রে গাই ॥
৭৮
মানুষের মনস্কামনা ধর্তে আমার সাধ্য নাই
শূন্য ভরে বিহার করে সে দেশে কেমনে যাই ॥
আগম নিগম শ্রবণ আর মন নয়ন, ইহাদের গমনাগমন সে দেশে নাই ॥
ত্রিসংসার-রূপ নির্জন আলয় কী ছাড়া এই শূন্য কোনায়
শূন্য গুহায় মানুষরতন সেই দেশে কেমনে যাই ॥
জলে যেমন সূর্য উদয় ধর্তে গেলে কে হাতে পায়
আধারে মূলাধার ধরায় দেখো তেমনি প্রায়
শূন্য ভরে উদয় প্রেমভাব পরম ব্রহ্মা হতে উদয় ভাব
ব্রহ্মরূপ জ্যোতির্ময় ভাব ঘটে পটে সর্ব ঠাঁই॥
টলাটল ছাড়িয়ে সাধন কী রূপে হয় মানুষের করণ
রসিকজনার হয় ভাব নিরূপণ হিহেতু ভাব উদয় ॥
ভাবেতে করণ করায় আত্মস্থিতি জ্ঞান নাহি রয়
লালন শাহ কয় মানুষ ধরা দুদ্দু ভেড়োর কর্ম নয় ॥
৭৯
মুর্শিদের খেদমতে রুজু যারা, জানতে পারে পুসিদাতে অধর ধরা ॥
মুর্শিদের যে রূপ হয়, খোদারূপ সেই রূপে নির্ণয়
আকারে সাকার রূপ রয়, স্বরূপে রূপ নেহারা ॥
নবি আলি হাসান হোসেন ফাতেমা জহুরা খাতুন
আল্লার কাছে এই পঞ্চজন, নুর সেতারা ॥
লাল জরদ সিয়া সফেদ কয়, চার রঙেতে রংমহল তায়
আয়নামহল কাজল কোঠায় স্থির বিজরি পারা ॥
কী বস্তু নীর কী বস্তু নুর কয়, নুর নীরের পাত্র কী নিৰ্ণয়,
নুর নীরের সাধন কী রূপ হয়, দুদ্দু কয় জানে তারা ॥
৮০
মূলাধারবাসিনী কে ঐ রমণী
আপ্ত ভাবে গুপ্ত লীলা করেন ধনী ॥
সর্পাকৃতি রক্তজবার ন্যায় মূলাধারে ঐ দেখা যায় ॥
যারে বশ করিতে যোগী, সদায় হলেন ধ্যানী ॥
অন্ত আদির সে আদি বসত করেন এক ঠাঁই নিরবধি
যারে ধরে সকল সিদ্ধি, করেন ধ্যানীগুণী ॥
রমণীর নিত্যলীলা যোগের ঘরে করেন খেলা
শাক্ত মতে আছে খোলা, দুদ্দু নেয় গণি ॥
৮১
যার হাতে আছে আমার আসা-যাওয়ার কলকাঠি
তারে আমি কই বা চিনি, ভূতের মতো যাই খাটি ॥
আজন্ম তারেই যে আমি ভাই অপর ভেবে দুঃখে রাখি তাই
যাহাতে অমৃত ফলে সদাই মারি তারে দিয়ে লাঠি ॥
কীসে যে কী গেল হয়ে একদিনও দেখলাম না চেয়ে
তাই তো মন ভেয়ে খেয়ে/হয়ে যাই মাটি
যে কাজ করিলাম যখন গোড়ায় গলদ হলো রে মন
দুদ্দু বলে তারি চরণ, ভাবলাম না করে খাঁটি ॥
৮২
যে খোঁজে মানুষে খোদা সে-ই তো বাউল
বস্তুতে ঈশ্বর খুঁজে, পায় তার উল ॥
পূর্ব পুনর্জন্ম না মানে চক্ষু না দেয় অনুমানে
মানুষ ভজে বর্তমানে, হয় রে কবুল ॥
বেদ তুলসী মালা টেপা এ সব তারা বলে ধোঁকা
শয়তানে দিয়ে ধাপ্পা সব করে ভুল ॥
মানুষে সকলি মেলে, দেখে শুনে বাউলে বলে
দীন দুদ্দু তাই বলে, লালন সাঁইজির কুল ॥
৮৩
যে গুণে দেহ পয়দা হয়
সেই গুণ ছুঁড়িলে সেই গুণাতীতকে পাই ॥
হাতের কাছে নিলে খবর কেটে যায় সকল ঘোর
সে-ই ধরে ঘরের চোর মনের ইচ্ছায় ॥
সাঁই-বিধি অনুষ্ঠান তার নাই কোনো শাস্ত্র আচার
প্রেমের দেশের শুদ্ধ বিচার করে সে জন পায় ॥
যুগে যুগে তার বচন আমি মাথায় করি চরণ
অধীন দুদ্দুর বচন, লালন সাঁইর কৃপায় ॥
৮৪
যে ভাবে সাঁই নবির সাথে মিশলেন মেয়েরাজে
তা কেউ না জানে দুনিয়াতে।
নালায়ন পার নবিজিরে নিলেন সিংহাসনে শূন্যভরে
সেহিত মহব্বতের জোরে, তিরিশ বছর যায় এক রাতেতে ॥
আসক মাসক মিলিল, দুই দেহ এক দেহ হলো, চিহ্ন ভিন্ন না রহিল
যেমন কূপজলে গঙ্গাজলেতে ॥
নবির মতো পিয়ারা নাই, নবি জানো দেহ মালেক সাঁই
দেহ ছাড়া থাকে নাই, প্রেমের নাইকো রে সীমা দিতে ॥
অতুল্য প্রেম তুলনা নাই, আল্লা নবির মিলন যেথাই
দুদ্দুরে ডেকে কয় লালন সাঁই, নবির ছায়া নাই ভূমেতে ॥
৮৫
যে রসে জীবের সৃষ্টি হয় সে রস সামান্য কভু নয়
প্রবর্তের আত্মরসে স্থিতি, সে রসে প্রকৃতি পুরুষ জীবন পায় ॥
জীবনের জীবন সে রস যাহাতে প্রকৃতি পুরুষ বশ
যে রসে সৃষ্টির প্রকাশ, সামান্য কে কয় ॥
জন্ম লতায় পিতা মাতা সেই আবার জীবনদাতা
দুদ্দু কয় পরমাত্মা, কেহ কয় তায় ॥
৮৬
শক্তি ধরে সিদ্ধ করো জীবন সাধন
জানবি এই মানবদেহে কী বস্তু ধন ॥
করো না বাক্যে হেলা অযথা যাবে বেলা
অদেখা শোনা কথা সেধে নাও এখন ॥
পাবে সব বর্তমানে প্রাপ্তি যাহা এ জীবনে
বিফল সব মরণে, ভেবে দেখো রে, মন ॥
দেহকে সত্য জেনো সাঁইজির আইন শোনো
দুদ্দু বলে তার করণ লালন সাঁইর বচন ॥
৮৭
শমনে ভয় কী রে তার শ্রীরূপ গুরু যার সহায়
মরাকে বাঁচায়ে সে-ই জীবন দেয় ॥
জীবন-যৌবন যথায় উৎপত্তি শ্রীরূপের যে তথায় বসতি
ইহ-পরকালের দাত্রী জানা যে যায় ॥
দেহমনের যত ব্যাধি শ্রীরূপ সারে যদি
তবে কেন তারে বাদী করি রে সদায় ॥
খোদার ছোটো নবিজির বড়ো
লালন সাঁই কয় দুদ্দু ধরো
মিছে হাজি হয়ে মরো, কেন রে হায় ॥
৮৮
শরিক করো না মন করি বারণ
শরিকে বড়ো জ্বালা বারেবারে হবে জনম ॥
নিজ বীর্যে পুত্র কন্যা জন্ম দিয়ে শেষে কান্না
কন্যা পুত্রের ধন্না দিয়ে বেড়াবে রে মন ॥
তাহারেই পুনর্জন্ম বলে লালন সাঁই ফুকারিলে
শরিকের উল্টা কলে পড়ো না রে ভাই কখনো ॥
দেখ না এই জগতের সবাই শরিকের যাতনায় কষ্ট পাই
দীনহীন দুদ্দু বলে তাই, শরিকই মৃত্যুর কারণ ॥
৮৯
শাঠির কাছে গেল গোরা বিষ্ণুপ্রিয়ার কী দোষ হলো
বিষ্ণুপ্রিয়া ও মা-জননীর কেঁদে কেঁদে দিন গেল ॥
ত্যজে নারী এই গৃহদ্বার মন্ত্র নিল সে যে সেবার
কেন তবে সার্বভৌমের ঘর চরণধূলায় উজ্জ্বল করিল ॥
বিষ্ণুপ্রিয়ারে কী দোষেতে, ছেড়ে তারে, গেল পথে
এই কি তোমার ধর্মমত হে, এমন বিচার কে দেখিল ॥
কী সুধা শাঠির দ্বারে বিষ্ণুপ্রিয়ায় তা কি নাই রে
দীন দুদ্দু কহে বিনয় করে, কলঙ্কে জগৎ ঘিরিল ॥
৯০
শুদ্ধ প্রেম উপাসনা করে রে যে-বা জন
পুরুষ প্রকৃতি স্বভাব করে সে ধারণ ॥
অনুরাগী ভাবের আশ্রয় পুরুষ প্রকৃতি ভাব লয়
ভাবিতে ভাবিতে সে হয়, দাসীর লক্ষণ ॥
নায়ক-নায়িকা দুজন উভয়ের ভাব হরণ পূরণ
সমবয়স কাল যৌবন যুগল ভজন ॥
প্রকৃতি ভাবভূষণ মহাপ্রভু করে ধারণ
শাঠিকন্যার সঙ্গে সাধন নির্জন ভজন
উজ্জ্বল পরকীয়া সাধন উজ্জ্বল রসেতে মগন
দুদ্দু না পায় অন্বেষণ সে প্রেমরতন ॥
৯১
শুদ্ধ ভক্তি হইতে হয় শুদ্ধ প্রেমের উদ্দীপন।
যে প্রেমেতে বাঁধা আছে সহজ মানুষরতন ॥
অন্য বাঞ্ছা অন্য পূজন জ্ঞান কর্ম উপশাখাগণ
ভক্তি কণ্টক হইলে ছেদন হবে শুদ্ধ প্রেমের উদ্দীপন ॥
টলাটল ছাড়িয়ে সাধন রসিকের হয় নিরূপণ
হেতুশূন্য মানুষের করণ আধারে অধর মিলন (ধরন)
ভেক ফণীতে করে যাজন, ভেকের বাটে ফণীর বদন
প্রেমশৃঙ্গারে মাতি দুজন, প্রেমেতে হয় মগন ॥
শুনতে লাগে বিষম ত্রাস ভেক ফণীতে করে বিলাস
লালন সাঁই কয় রসিক নির্যাস, গরল খেয়ে দুদ্দুর মরণ ॥
৯২
শুদ্ধ সহজ প্রেমের প্রেমিক হয় রে যে জন
টলাটল ছাড়িয়ে রে মন সে-ই যে রসিক হয় নিরূপণ ॥
আত্মাযজ্ঞ হলে পরে তবে হবে তৃপ্তি, নিত্য দাহন
অটলে ঈশ্বর গতি করে মুক্তিধামে গমন ॥
দশেন্দ্রিয় শিষ্য করে পঞ্চ শিষ্যের দ্বারে প্রেম আস্বাদন করে
সমুদ্রেতে অবগাহন, করে না পরশন ॥
হৃদয়ে সাধনা করে আপনি মাধুরী হেরে
সেই জলে রূপ নিরখি সহজ আঁখি চাতক জলদগতি যেমন ॥
রূপকে ধরে আপনি মনে নিত্যধামে গমন করে
লালন শাহ করে সেই প্রেমগরল খেয়ে দুদ্দুর মরণ ॥
৯৩
সত্ত্ব রজঃ তমঃ এ তিন গুণ কয়
তিন গুণের উপরে মানুষ শক্তিতে উপজয় ॥
ছেড়ে আত্মকাম টোড় সেই মোকাম পুরবে মনস্কাম
কথা মিথ্য নয় ॥
সহজ দেশ বলে, এই মানুষে মিলে
জন্ম-মোকাম খুঁজিলে ঘোর তার যায় ॥
লালন সাঁই দরবেশের বাণী দুদ্দু জানায় এমনি
তা-ই সত্য বলে মানি এই দুনিয়ায় ॥
১৪
সত্য বলে জেনে নাও এই মানুষলীলা
ছেড়ে দাও নেংটি পরে হরি হরি বলা ॥
মানুষের লীলা সব ঠাঁই এ জগতে তুলনা নাই
প্রমাণ আছে সর্বদাই, যে করে সে খেলা ॥
শাস্ত্র ধর্ম তীর্থ আদি সকলের মূল মানুষনিধি
তার উপরে নাই রে বিধি, ভজন পূজন জপমালা ॥
মানুষ ভজনের উপায় দীনের অধীন দুদ্দু গায়
দিয়ে দরবেশ লালন সাঁইয়ের দায়, সাঙ্গ করি পালা ॥
৯৫
সহস্রদলের পরে দেখো না নজর করে
নিরাকারে বিন্দুরূপে সেই জনাই ভাসে রে ॥
তাহারে জানিলে রে মন আল্লা চেনা যাবে তখন
তারই কুদরতি করণ ভবের পরে ॥
কুদরতি কারবার যে তার আত্মতত্ত্বের ধরো এবার
যায় যদি মনের বিকার ধরো রে তারে ॥
দোষেতে ভরিয়া রে মন কাটালি মানবজনম
ধরো তবে দুদ্দুর বচন আপন ঘরে ॥
৯৬
সাধন করো রে মন ধরে মেয়ের চরণ ॥
যারে ধরে ভবে এলি তারে আজ কোথায় হারালি
ফিরিবি অলিগলি ভুলিয়া এখন ॥
পিতা শুধু বীর্যদাতা ধারণ পালন কর্ত্রী মাতা
সে বিনে মিছে কথা, ভজন সাধন ॥
আগে মেয়ে রাজি হবে ভজনের রাহা পাবে
কেশ ধরে পারে নেবে দুদ্দুর বচন ॥
৯৭
সামান্যে কি করতে পারে মূল রসের অন্বেষণ
লাল হীরা মানিক মুক্তা যাতে নানা শস্য হয় উপার্জন ॥
রস রসিক দুই পাত্র লিখা যায় কোন পাত্রে কোন রস উপজায়
কোন রসের বশে কে রয় কোন রসে হয় উভয়ের সৃজন ॥
শরদিনীর (শরৎ নীরে) পদ্ম ভাসে শম্ভু রস তাতে প্রকাশে
ভৃঙ্গরতি হয় সে রসে যে রসে বশ রাধিকা রমণ ॥
জরদে নীল পদ্মের স্থিতি মধুর রস তাতে উৎপত্তি
জন্মায় তাতে মধুরতি কৃষ্ণ, অকৃষ্ণ যে রসের কারণ
সামঞ্জস্যা সাধারণী কোন রসে দুই রতি মানি
লালন শাহ কয় রসিক ধনী দুদ্দু সে রসরতিতে না হয় মগন ॥
৯৮
সিঁদ দরজায় পাহারা যে জন দেয়
সে কি অকালে মরে যমের যাঁতায় ॥
নয় দরজা, নয় দেহেতে সিঁদ দরজা দক্ষিণেতে
পারে কি বস্তু পালাইতে সচেতন যে হয়।
সিঁদ দরজার মহিমা অপার পলকেতে সিদ্ধি হবে তার
গুরুবস্তু নিষ্ঠা হলো যার এহি দুনিয়ায় ॥
দিনরজনী মালের ঘরে পাহারা দাও মন নির্বিকারে
দুদ্দু বলে যায় না চোরে, গেলে নাই উপায় ॥
৯৯
হজ করিলে যদি যেত গুনা
মক্কায় জন্মিয়া কেউ পাপী হতো না ॥
মক্কায় গেলে পাপ যাবে ভাই এ কথার বলিহারি যাই
যুক্তিতে বোঝাও তো এবার সরার বেনা ॥
ইব্রাহিমের মক্কা গঠন তাতে যদি হয় পাপ বিমোচন
এমন কথা কে বলেছে জগতে কোন জনা ॥
লালন সাঁই দরবেশের বচন দুদ্দু ভেড়োর হয় না যাজন
তাই মিছে ধুড়ে ধেড়ে মনের ঘোরানা ॥
১০০
হলো সই কী ঘটনা
গৌরাঙ্গ রূপ ধরেছে কেলে সোনা ॥
কোথায় সেই পীত ধড়া কোথা রে সেই মোহনচূড়া
কী যেন হয়েছে হারা আমি তার বুঝি না ॥
রাধা বলে কাঁদে গোরা নয়নে বহিছে ধারা
মস্তক করেছে নেড়া চায় ব্রজের ঠিকানা ॥
স্বরূপ দ্বারে কাঁদে নিমাই রাধা রাধা বলে সদাই
দুদ্দু বলে দিলাম দোহাই আমায় দাও চরণখানা ॥
***
