ভূমিকা (দীন শরৎ)

ভূমিকা

দীন শরৎ ছোটোবেলা থেকেই দুঃখ-কষ্টকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠেছেন। যখন তিনি মাতৃগর্ভে তখন তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছে। শৈশবে মাকে হারিয়েছেন। মা- বাবাহারা শরৎ এরপরও হাল ছাড়েননি। স্কুলে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। তবে বছর দুয়েক পরেই নয় বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এরপরই শরতের কষ্টের দিনযাপন শুরু হয়।

চরম দুঃখী শরৎ মনের দুঃখে গান গাইতে আরম্ভ করেন। তাঁর গানের কণ্ঠ ছিল অপূর্ব। একসময় নিজে গান লেখাও শুরু করেন। সুর করে বিভিন্ন আসরে সেসব গান গাইতেও থাকেন। ক্রমশ‍ই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তাঁর গান। এলাকার বিভিন্ন বৈঠকী বাউলগানের আসরে তাঁর যাতায়াত বেড়ে যায়। পরিধি ও বিস্তৃতি বেড়ে যাওয়ায় দীন শরতের কদরও থরথর করে শ্রোতাদের কাছে বাড়তে থাকে।

অখণ্ড বাংলার অর্থমন্ত্রী নলিনী সরকার একদিন শরতের গান শুনে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এরপর নলিনী সরকারের অনুরোধেই তাঁর বাড়িতে প্রায়শই যাতায়াত ঘটত শরতের। দুজনের সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুত্বে রূপ নেয়। সে সম্পর্কের কারণে শরতের আর্থিক অস্বচ্ছলতা কিছুটা দূর হয়। শরৎ নতুনভাবে গান রচনায় মনোনিবেশ করেন।

দীন শরৎ তত্ত্বগান রচনায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন তাঁর স্বজেলা নেত্রকোনায়। ক্রমশ তাঁর সুনাম সিলেটসহ পুরো হাওরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন গানের আসরে গান গাইতে তাঁর ডাক পড়তো। জীবদ্দশাতেই স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। তবে তিনি কখনোই তাঁর শৈশবের দুঃখ-কষ্ট-দারিদ্র্যকে ভোলেননি। স্বাভাবিকভাবে তাঁর জীবনের ভয়াবহ ও দুর্বিসহ দিনগুলোর কথা তাঁর গানে স্থান পায়। পাশাপাশি তত্ত্বমূলক গান রচনা এবং বাউল-পরম্পরার ঐতিহ্য ধারণ করে সাধক হিসেবে বাউল সমাজের স্বীকৃতি অর্জন করেন।

দীন শরৎ ‘অন্ধকবি শরৎ’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তাঁর আসল নাম শরৎচন্দ্র দাস। ১৩১০ বঙ্গাব্দে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার সাজিউড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। অকৃতদার এই বাউলসাধকের রচিত কয়েক শো গান এখনো গ্রাম-বাংলার সমঝদার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর আত্মজৈবনিক গান শেখা ‘গুরু উপায় বলো না/জনম দুঃখী কপালপোড়া আমি একজনা ॥/শিশুকালে মইরা গেলা মা/গর্ভে থুইয়া পিতা মইলা চোখে দেখলাম না। /আমায় কে করিবে লালন-পালন গো/কে দিবে আজ সান্ত্বনা…’ এখনো নতুন প্রজন্মের কোনো শিল্পী পরিবেশন করলে শ্রোতাদের চোখের অশ্রু ঝরায়। গুণী এই বাউলসাধক ১৩৭০ বঙ্গাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

দেহতত্ত্বের গান বাউল-মতবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শাখা। দেহসাধনার নানা গুহ্য প্রসঙ্গ এসব গানের মুখ্য ভিত্তি। এসব গান থেকে তাঁর ভক্ত-অনুরাগীরা সাধনতত্ত্বের নির্দেশ পায়। জল, আগুন, মাটি ও বায়ুর সমন্বয়ে মানবদেহ সৃষ্টি হয়েছে—এ মতবাদের বিশ্বাসী বাউলেরা তাই এই চার উপাদানের বন্দনাসূচক পঙ্ক্তিও রচনা করেছেন। দেহ সৃষ্টির প্রক্রিয়া উন্মোচন কিংবা সৃষ্টিরহস্য নিয়ে বিস্ময় থাকলেও বাউলেরা মানবদেহকে সাধনক্ষেত্র রূপেই চিহ্নিত করেছেন। এ সাধনক্ষেত্র বাউলদের কাছে তীর্থতুল্য। এর ফলে তীর্থের পবিত্রতা রক্ষায় তাঁরা সবসময় যারপরণাই সজাগ দৃষ্টি রাখেন।

দীন শরৎ অন্য সাধকদের মতন দেহতত্ত্বের গান রচনা করেছেন। সাংকেতিক ভাষায় সাধনার চিরায়ত ধারা—চারচন্দ্র ভেদ, পুরুষ- প্রকৃতির মিলন কিংবা রস-রতি প্রসঙ্গ ঠাঁই দিয়েছেন। সর্বসাধারণের জন্য দুর্বোধ্য এসব গান বাউল অনুরাগীদের কাছে শাস্ত্রতুল্য। যেহেতু শরিয়তি শাস্ত্রাচার বাউল সাধকেরা অস্বীকার করেন, তাই সেসব শাস্ত্রের রীতিনীতিকে মারফতিভাবে তাঁরা উপস্থাপন করে থাকেন। বাউল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হয়ে এ মতবাদকে জীবনভর বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা করেছেন।

দীন শরতের অধিকাংশ গানে গুরু-শিষ্যের প্রশ্নোত্তর লক্ষ করা যায়। মনঃশিক্ষা, পরমতত্ত্ব, আত্মা-পরমাত্মার ভেদাভেদ, রহস্যসংকুল জীবন-মৃত্যু, পরমপুরুষ, রজঃ-বীর্য পঞ্চতত্ত্ব, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, মনের মানুষের অনুসন্ধান, বস্তুধারণ—এসব নানা বিষয়ে শিষ্যের সুস্পষ্ট উত্তর জানার আকুলতা শরতের গানে রয়েছে। একইভাবে সাধনায় শিষ্যের অজ্ঞতা দূর করার জন্য গুরু সুনির্দিষ্টভাবে সেসব প্রশ্নের জবাব দিয়েও গান রচনা করেছেন। এতে করে শিষ্যের জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি ঘটে। তবে গুরু কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেন না। শিষ্যের প্রতি গুরুর উপদেশ—কেবল সাধনতত্ত্ব সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলেই চলবে না, বরং সেগুলোকে অবলম্বন করে দক্ষ-সাধক হিসেবে তৈরি হতে হবে।

বাউলসাধনা গুরুবাদী মতবাদ। এক্ষেত্রে দীন শরতের অবস্থান স্পষ্ট। গুরুকেই তিনি জ্ঞানদাতা হিসেবে ধরে নিয়ে তাঁর কাছেই আত্ম-নিবেদন করেছেন। সে কারণেই দেহের ষটচক্র, পঞ্চ আত্মা কিংবা ছয় পদ্ম সকল বিষয়েই ধারণা পেতে চান। দেহের নিগূঢ় রহস্যাচ্ছন্ন সাধনায়ও আশ্রয় হিসেবে পেতে চান গুরুকেই। জগৎ- সম্পর্কিত ধারণা নিয়েও স্বচ্ছ ধারণা জন্মে গুরুর আচার-উপদেশেই। তাই বাউলসাধনায় গুরুই শিষ্যের প্রধান নিয়ামক। শরৎ কখনোই এ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাননি বলেই তিনি গুরুবাদী ধারায় একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন।

সাধন-ভজনে গুরু ধরতে হয়। গুরু ছাড়া প্রকৃত সাধনা সম্ভব নয়। তাই দীন শরৎ জানাচ্ছেন, সাধন-ভজনহীন অভাজন তিনি। উপাসনা-পদ্ধতি তাঁর জানা নাই। এ কারণেই তিনি ‘স্কুলের তত্ত্ব’, ‘গুরুবস্তু’ জানার উদ্দেশ্যে গুরুকে অবলম্বন করতে চান। তাইতো তাঁর উচ্চারণ : ‘দীন শরৎ বলে মিছে মায়াতে বিফলে কাটাইলাম কাল স্কুলের দেশেতে/আমি যেতে চাইলে সাধন পথে, ফিরায় আমায় ওই ছয়জনা ॥’

‘ছয়জনা’ মানে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এই ‘ছয় ডাকাত’রূপী কু-প্রবৃত্তিতে দূরে ঠেলতে না-পারলে সাধনকার্য কোনোভাবেই সুচারুরূপে সম্পন্ন হবে না। তখনই বিপাকে পড়তে হয়। একবার বিপাকে পড়লে তা থেকে উদ্ধার অতি-সহজেই হওয়া যায় না। মনের ভেতরে যে ‘সুমতি’ আর ‘কুমতি’ নামক দুইটি চেতনা রয়েছে, সেখানে ‘কুমতি’-কে সর্বক্ষণই দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। এ বিষয়টিতে দীন শরত্ত প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তিনি বলছেন :

জানো না কি মন আমার, সুমতি কুমতি দুইটি প্রেয়সী তোমার।
পুত্র কন্যা বত্রিশজনা নিত্য জন্মে দুইজনার । ।
শম দম তপ জপ দান, হরিষ চৈতন্য সভা সুমতির সন্তান।
এই অষ্টজন পুত্র প্রধান, শুদ্ধমতি সদাচার । ।
ক্ষমা দয়া ভক্তি চেতনা সুতৃষ্ণা মমতা শান্তি নিষ্ঠা যে জনা।
সুমতির এই অষ্ট কন্যা, গুণে মুগ্ধ ত্রিসংসার । ।
কাম ক্রোধ লোভ মোহ আর হিংসা পৌষনাদি মদ অহংকার।
কুমতির হয় অষ্টকুমার, সবেই অতি দুর্নিবার । ।
নিদ্রা আলস্য চিন্তা নিষ্ঠুর, পাবক নাসিকা আশা নিদয়া তারা।
দীন শরৎ বলে মন বেহায়া, এই সকলের সঙ্গ ছাড়া ॥

কু-প্রবৃত্তি মন থেকে তাড়াতে না-পারলে জগতে পাপের বোঝা ক্ৰমশ ভারী হয়। সঙ্গ কারণেই সাধকেরা এসব কুসঙ্গীর বন্ধুত্ব পরিহার করে থাকেন। দীন শরৎ বাউল-পরম্পরার উত্তরসূরীদের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন : ‘দয়াল গুরু আমি রইলাম পরবাসে। /ছয় রানী কুসঙ্গীর সঙ্গে, ভুলে মায়াপাশে ॥/দেশ ছেড়ে বিদেশে এলাম, লাভ করিবার আশে। /লাভে মূলে সব হারালাম, আপন কর্মদোষে /আমি লক্ষ্মীছাড়া কপালপোড়া, কেউ না ভালোবাসে। /এমন বান্ধব নাই গো আমার, ডাক দিয়া জিজ্ঞাসে ॥’

শিষ্যের আকুলতা গুরুকে মেটাতে হয়। অনুসন্ধিসু শিষ্যের প্রশ্নের শেষ নেই। তাঁর জানার আগ্রহ গুরুকে অনুপ্রাণিত করে। তাই শিষ্যকে উজ্জীবিত রাখতে গুরু নিরন্তর তাঁর শত-সহস্র জিজ্ঞাসার জবাব দিয়েই চলেন। শিষ্য যখন গুরুর কাছে সাধনতত্ত্বের বিষয়াদি নিয়ে প্রশ্ন রাখেন :

আমায় কও শুনি হে গুরুধন, দেহের খবর জানতে আমার মনের আকিঞ্চন।
দেহে আছে ষটচক্র, কোন চক্রেতে কোন মহাজন ॥
গুরু এই যে পঞ্চআত্মা হয়, কও শুনি কোন চক্রে কোন আত্মা ধরায়।
এগো আত্মা শব্দের কি অর্থ হয়, জানতে চাই তার মূল কারণ ॥
ছয়টি পদ্মে ছয়টি শক্তির বাস, কোন শক্তির কি নাম হয় জানতে অভিলাষ।
কোন পদ্মে কে বিরাজ করে, কোন আকার করে ধারণ ॥
দীন শরৎ বলে দয়াল গুরুজি, তুমি না জানালে তত্ত্ব জানবার উপায় কি।
পরমকে না জানলে নাকি, জীবে মানব জন্ম অকারণ ॥

দেহে ষটচক্র রয়েছে তা শিষ্য জানেন। কেবল তিনি জানেন না এসব চক্রের অবস্থান কোথায়? তাই শিষ্য গুরুর কাছে সেসব চক্রের অবস্থান সমেত বর্ণনা জানতে আগ্রহী। গুরুর কাছ থেকেই শিষ্য জানতে চার পরমের অবস্থান। কারণ পরমকে না-জানলে ‘মানব জন্ম অকারণ’। আবার মাতৃগর্ভে কীভাবেই আরেকটি প্রাণের জন্ম হয়, কীভাবেই একটি শুক্র থেকে হাড়, মাংস, মণি ও মগজের উৎপন্ন হয়, সেটিও শিষ্যের কাছে বিস্ময় হিসেবে দেখা দেয়। সেই চিরবিস্ময়কর রহস্যের সন্ধানও শিষ্য গুরুর কাছে দাবি করেন।

শিষ্যের নানা প্রশ্নের সঠিক জবাব গুরুই দেখিয়ে দেন। ‘রজঃগুণে জীবের সৃষ্টি’ যেভাবে উৎপন্ন হয় সেটা গুরুর কাছ থেকেই হাতে- কলমে শিষ্য শিক্ষা পেয়ে থাকেন। কোন তিথিতে সহবাসে পুত্র কিংবা কন্যার জন্ম হয় আবার কীভাবে জন্মনিরোধ করতে হয়—সেসবও শিষ্য শিক্ষা পান গুরুর কাছ থেকে। সাধনায় তাই গুরুই শিষ্যের একমাত্র কাণ্ডারি। তাই গুরুবাক্যকে আদর্শ ধরে দেসসাধনায় পথ চলতে হয়। এ থেকে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলে সাধনায় পরিপূর্ণ সফলতা অর্জিত হবে না।

গুরু এও শিষ্যকে শিখিয়ে থাকেন, কীভাবে সাধনায় নারীদেহে অটল থাকা যায়। কীভাবে সাধনায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয় কিংবা কোন আচার-রীতিতে ‘বস্তু নিয়ন্ত্রণ’ সম্ভব, সেটার পাঠ গুরুই শিখিয়ে থাকেন। গুরু শেখান চারচন্দ্র ভেদের রহস্য কেমন করে জানা যায়। শিষ্যের প্রতি গুরুর উপদেশমূলক উক্তি :

দেহের তত্ত্ব জানবে তোর, আগে যেয়ে গুরুর চরণ ধর।
পাবি রে তুই নিত্য দেহ, চারি চন্দ্র সাধন কর।
সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রের তত্ত্ব ওই, হাতে দশ, পায়ে দশ, গণ্ডগোলে দুই।
অধরে ললাটে দুইটি, অর্ধ চন্দ্র তার উপর ॥
চারিচন্দ্রের জান রে সন্ধান, একটি গরল একটি উন্মাদ রোহিণী আর চান্দ।
গরলেতে আছে সুধা, জেনে লও রে তার খবর ॥
জেনে লও সেই চন্দ্রের পরিচয়, চন্দ্রমণ্ডল সূর্যমণ্ডল সহস্রারে রয়।
চন্দ্র বিজয় সুধা ঝরে, খাইলে মানুষ হয় অমর ॥
দীন শরৎ বলে মমন রাহুতে, চন্দ্র সূর্য গ্রাস করিবে সে সময়েতে।
হবে দুইটি গ্রহণ এক দিনেতে, আঁধার হবে দেহঘর ॥

উপর্যুক্ত গানের মতোই নানা উপদেশমূলক পক্তি গুরু তাঁর শিষ্যকে দীক্ষা শেষে সাধনায় রপ্ত হওয়ার সময় জানিয়ে থাকেন। পঙক্তির ভেতরের নির্যাসটুকুও গুরু জানিয়ে থাকেন। তবে যে দেহ নিয়ে এত সাধনা এত কথা, সেই দেহ কেমন করে চলছে—সেটাও সাধকেরা শিষ্যদের ধারণা দেন।

বাউলেরা যেহেতু দেহকেন্দ্রিক সাধনায় বিশ্বাসী তাই দেহের সকল প্রকার রহস্যের অনুসন্ধানে নিরন্তর ব্যস্ত থাকেন। সেই অনুসন্ধিসু চেতনা থেকেই দেহবাদী বাউলের উচ্চারণ :

বানাইয়া রঙমহল ঘর, ওই ঘরে আছে তোর ঘরের কারিগর
ও তার হাড়ে থুনি চামড়ার ছাউনি মজবুত গাঁথুনী কি সুন্দর ॥
ঘরে আট কুঠরি নয় দরজা হয়, আঠারো মোকামে মানুষ আঠারো জন রয়।
রবি শশী দুইটি বাতি, জ্বলছে ঘরে নিরন্তর । ।
দ্বারে দ্বারে আছে প্রহরী, আদালত ফৌজদারী কোর্ট সদর কাছারী।
প্রধান কর্মচারী জ্ঞান চৌধুরী, বিচারের ভার তার উপর ॥
বায়ু ভরে ঘরখানি খাড়া, আসে যায় তোর ঘরের মানুষ যায় না রে ধরা।
সে তো ভিতরে বাহিরে ফিরে, মন্ত্র বলে দুই অক্ষর ॥
দীন শরৎ বলে শুনো রে আমার মন, দ্বারে কপাট দিয়া ঘরে করো অন্বেষণ।
যদি ধরতে পারো সেই মহাজন, অমরত্ব হবে তোর ॥

বাউলেরা বিশ্বাস করেন—আপন দেহের খবর জানতে পারলেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব জানা সম্ভব। কারণ দেহের ভেতরেই সৃষ্টিকর্তার বসবাস। তাই মানুষ-ভজনার দিকে বাউলদের দৃষ্টি বেশি থাকে। দেহসাধনা কিংবা মানুষ-ভজনা দুটো ক্ষেত্রেই মানুষই প্রাসঙ্গিক থাকায় বাউল মতবাদে মানুষের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বারবার সাধকেরা মানুষের ভেতরের সত্তাকে অনুভব করার তাগিদ দিয়ে থাকেন উত্তরসূরিদের।

দীন শরৎ অসংখ্য ধারার গান রচনা করেছেন। তিনি অসংখ্য কীর্তন পর্যায়ের গানও রচনা করেছেন। তাঁর রচিত কীর্তন ঢঙের অসংখ্য গান হিন্দু ধর্মালম্বীদের নিকট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বৈঠকী আসরে সেসব গানের অসম্ভব প্রভাব রয়েছে। কীর্তনাঙ্গিকের গান হলেও সেসব গানের মধ্যে বাউলধারার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। এর বাইরে তাঁর রচিত মনঃশিক্ষা ও বিচ্ছেদ পর্যায়ের গানের আবেদনও রয়েছে অপরিসীম।

দীন শরৎ বাউল পরম্পরার অগ্রগণ্য পথিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। যদিও সাম্প্রতিক কালের বাউলধারার অনুসারীদের মধ্যেও তাঁর গানের তেমন একটা প্রচলন পাওয়া যায় না। তবে তাঁর স্বজেলা নেত্রকোনা অঞ্চলের বাইরেও নানা অঞ্চলের বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা তাঁর গান চর্চা করে আসছেন। শক্তিমান এই বাউলসাধকের গানের চর্চার ধারাটা ক্ষীণ হয়ে এলেও বাংলার বাউল পরম্পরার ইতিহাসে তিনি কখনোই ম্লান হবেন না।

বাউল-ফকিরদের গানের চর্চা, ধারা ও দর্শন নিয়ে ভারতবর্ষের বাইরেও ইদানীং ব্যাপক গবেষণা ও আগ্রহ তৈরির বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। বাংলার দর্শন চর্চায় বাউলদের চিন্তা-চেতনা ও ভূমিকাকে এখন সবার আগে ঠাঁই দেওয়ার একটা ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তা যতই কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় উদ্ভাসিত হচ্ছে ততই দীন শরৎদের মতো গুণী সাধকদের ভিন্ন আবেদন তৈরি হচ্ছে। নাগরিক ও শহুরে সমাজের কাছে দীন শরতের গানের প্রচার ও প্রসার তেমন না- ঘটলেও বাউলধারার ঐতিহ্যে তাঁর নাম অবিস্মরণীয় ও অনন্য।

সুমনকুমার দাশ

.

তথ্যসূত্র

১. সঞ্জয় কান্তি দেব (সম্পা.), দীন শরৎ গীতি (সিলেট : সঞ্জয় কান্তি দেব, ২০০৬);

২. গোলাম এরশাদুর রহমান, নেত্রকোণার বাউলগীতি (ঢাকা : বাংলা একাডেমি, ১৯৯৪)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *