দীন শরৎ-এর গান
১
অনন্ত মহিমা যার, ভক্তি পরীক্ষার জন্যে হইলেন বুদ্ধ অবতার।
জগবন্ধু দেখলে রথে পুন জনম হয় না তার ॥
নিম গাছেতে কৃষ্ণ হইলেন লয়, ইন্দ্র দ্রোণ মহারাজের ঘাটে গিয়া রয়।
স্বপ্ন যোগে রাজারে কয়, বলি দিতে পুত্র তার ॥
পূর্ব জনমের তপস্যা ছিল, আঠারোটি পুত্র দানে শ্রীকৃষ্ণ পাইল।
আঠারোটি নালা হইল, কীর্তি রইল চমৎকার ॥
প্রসাদে তার ভক্তি পরীক্ষা, অবজ্ঞা করলে তার নাহি রে রক্ষা।
হিন্দু ধর্মে দিলাম দীক্ষা, প্রসাদের নাই জাত বিচার ॥
সুভদ্রা অর্জুনের রমণী, শতরূপ লক্ষ্মী অংশ ছিলেন গো তিনি।
দীন শরৎ বলে সেই রমণী, সঙ্গে ছিল ভগ্নী তার ॥
২
আইল রে চৈতন্যের গাড়ি নদীয়ায়।
রাই কোম্পানি জংশন হইল, শ্রীবাস আঙ্গিনায় ॥
শ্রীঅদ্বৈত ইঞ্জিনিয়ার, নিত্যানন্দ টিকেট মাস্টার।
শ্রীগৌরাঙ্গ ড্রাইভার হয়ে, সেই গাড়ি চালায় ॥
হইল গরিব দুঃখীর কি সুবিধা, যাইতে কারো নাইকো বাধা।
দিয়ে ভক্তি মাশুল নববিধা, টিকেট পাওয়া যায় ॥
কত ধনী মানী ঘোরে ফিরে, টিকেট ছাড়া যাইতে না রে।
টিকেট সাইন করে দেয়, চেক করে নিত্যানন্দ রায় ॥
দীন শরৎ বলে যাদের কাছে, রাধারাণীর চারপাশ আছে।
তারা ফার্স্ট ক্লাসে সুখে বসে, নিত্যধামে যায়।
৩
আকাশ বায়ু বহ্নিধারা না ছিল যখন।
না ছিল সেই চন্দ্র সূর্য, ব্রহ্মা বিষ্ণু পঞ্চানন ॥
নিরাকার সব নিরাকৃতি, না ছিল কোন আকৃতি।
সে কালে পুরুষ প্রকৃতি, কেমনে হইল সৃজন ॥
ব্রহ্মা শব্দের কিবা অর্থ, কোন আকৃতি কি পদার্থ।
সগুণ কিবা গুণাতীত, সচেতন কি অচেতন
দীন শরৎ বলে ভাবছি বসে, এ ব্ৰহ্মাণ্ড হলো কি সে।
গুরু বলো মোরে কোন পুরুষে, করিলেন সৃষ্টি পত্তন ॥
৪
আগে স্কুলের তত্ত্ব জানো রে মন, মাতৃগর্ভে মহাপদ্মে ছিলায় রে যখন।
এগো রজঃ বীর্যে এক হইয়ে, স্থুলাকার করে ধারণ ॥
পিতামাতার রমণ ক্রিয়াতে, মাতৃগর্ভে প্রবেশিলে বিন্দু রূপেতে।
মহাতত্ত্ব হইল তাতে, শুক্র শোণিতের মিলন ॥
মহাতত্ত্ব শক্তি বলেতে, দশ ইন্দ্রিয়ের উৎপত্তি হয় রজের ক্রিয়াতে।
সৃষ্টিকর্তা সেই জন্যে, রজঃগুণে ব্রহ্মা হন ॥
জন্মিলে অবশ্য মৃত্যু হয়, সে কারণে স্কুলের দেশকে জম্বুদ্বীপ কয়।
পিতামাতা হইবেন আশ্রয়, যার যার মূল কারণ ॥
আলম্বন সেই আচারকে বলি, কালে ধ্বংস হয় বলে কয় অনিত্য কলি।
দীন শরৎ বলে তার প্রাণালী, পূরণ হইল উদ্দীপন ॥
৫
আগের মূলের তত্ত্ব জানতে হয়, চতুর্দলে মায়ের কোলে জীবাত্মা ধন রয়।
মায়া ডাকিনী শক্তি সে পদ্মে জীবের আশ্ৰয় ॥
ষড়দলে রাকিনী শক্তি, ভূতাত্মার বসতি হয় পুরাণের উক্তি।
আছেন ডাকিনী সেই দশম দলে, আত্মারাম সেখানে রয় ॥
দ্বাদশ দলে আত্মা রামেশ্বর, কাকিনী নামেতে শক্তি পদ্মের উপর।
চতুর্দলে আছে রে তার বাস করাল আর বরাভয় ॥
ষোড়শ দলটি কণ্ঠেতে জানি, দশভুজা শিব তথা শক্তি সাকিনী।
ভ্রু মধ্যে দ্বিদলে মন, হাকিনী সেখানে রয় ॥
দীন শরৎ বলে সহস্রদলে, পরমাত্মা বিরাজ করেন মহাজন বলে।
আছেন মহাকুণ্ডলিনী শক্তি, পরম শিব জ্যোতির্ময় ॥
৬
আমি অভাজন গো গুরু সাধন ভজন জানি না।
না চিনিলাম দেশ কাল পাত্র, হইল না মোর উপাসনা ॥
স্কুলের তত্ত্ব বলো সমুদয়, কেবা কাল কেবা পাত্র কে হইলেন আশ্রয়।
আমি জানব বলে সেই সমুদয়, মনে করি এই বাসনা ॥
আলম্বন আর কিবা উদ্দীপন, কত বিধা ভক্তি ধর্ম বলো গুরুধন।
স্কুলের গুরু কোন মহাজন, কোন দেবতার হয় সাধনা ॥
দীন শরৎ বলে মিছে মায়াতে বিফলে কাটাইলাম কাল স্কুলের দেশেতে।
আমি যেতে চাইলে সাধন পথে, ফিরায় আমায় ওই ছয়জনা ॥
৭
আমায় কও শুনি গুরুধন, কোন পাপেতে ব্রহ্মা এসে হইলেন যবন।
হরিভক্ত হরিদাসের, কেন এত বিড়ম্বন ॥
রজঃগুণে সৃষ্টিকর্তা হয়, আগে ব্রহ্মা পরে বিষ্ণু পরে শিব কয়।
যাঁহার ব্রহ্মলোক বসতি হয়, মর্ত্যে এলেন কি কারণ ॥
যে বিধি হন জগতের পিতা, কাজীর পুত্র বলে তারে এ কেমন কথা।
হলেন বিধির বিধি কোন বিধাতা, বিধিকে করলেন সৃজন ॥
যে জন জীবের ভাগ্যে সুখ-দুঃখ লিখে, তার কপালে এত দুঃখ লিখিয়াছে কে।
দীন শরৎ বলে কোন বিপাকে, ঘটল এত অঘটন ॥
৮
আমায় কও শুনি গুরুধন, জম্বুদ্বীপে স্কুলের দেশ হইল কি কারণ।
আমায় বুঝাইয়া দাও কারে বলে, আলম্বন আর উদ্দীপন ॥
কাল কেন হয় অনিত্য কলি পাত্র সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা কেন বা বলি।
আমি জানব বলে সেই প্রণালী, করতেছি ওই নিবেদন ॥
কও শুনি সেই তত্ত্ব সমুদয়, জীবে আর পরমে কি সম্বন্ধ হয়।
কেবা পিতা কেবা তনয়, কিসে হয় দেহের গঠন ॥
মহাতত্ত্ব কারে বা বলে, কোথায় ছিলাম কেন আইলাম এই ভূ-মণ্ডলে।
দীন শরৎ বলে জানব বলে, মনে করি আকিঞ্চন ॥
৯
আমায় কও শুনি হে গুরুধন, দেহের খবর জানতে আমার মনের আকিঞ্চন।
দেহে আছে ষটচক্র, কোন চক্রেতে কোন মহাজন ॥
গুরু এই যে পঞ্চআত্মা হয়, কও শুনি কোন চক্রে কোন আত্মা ধরায়।
এগো আত্মা শব্দের কি অর্থ হয়, জানতে চাই তার মূল কারণ ॥
ছয়টি পদ্মে ছয়টি শক্তির বাস, কোন শক্তির কি নাম হয় জানতে অভিলাষ।
কোন পদ্মে কে বিরাজ করে, কোন আকার করে ধারণ ॥
দীন শরৎ বলে দয়াল গুরুজি, তুমি না জানালে তত্ত্ব জানবার উপায় কি।
পরমকে না জানলে নাকি, জীবে মানব জন্ম অকারণ ॥
১০
আমায় কও শুনি হে গুরুধন, মাতৃগর্ভে মহাপদ্মে ছিলেন গো যখন।
ছিলেন কোন শিয়রে কোন ভাবেতে সচেতন কি অচেতন ॥
অন্ধ কোটা দুর্গম স্থানেতে, কোন কারিগর গড়িয়াছিল কোন সন্ধানেতে।
কোনখানের কোন বস্তু এনে, করেছে দেহের গঠন ॥
মণি মগজ রক্ত মাংস হাড়, কেমন করে এই দেহেতে হইতেছে সঞ্চার।
কোন পদার্থে হইল আমার, দশ ইন্দ্রিয় আত্ম মন ॥
মাতৃ অংশে কোন কোন বস্তু হয়, পিতৃ অংশে কোন পদার্থ এই দেহেতে রয়।
দীন শরৎ বলে কও সমুদয়, জানতে মনে আকিঞ্চন ॥
১১
আমায় কও শুনি হে দয়াময়, কোন গুণে উৎপত্তি জীবের কোন গুণে লয়।
পঞ্চে পঞ্চে মিশে গেলে, অবশিষ্ট কে বা রয় ॥
আকাশাদি এই যে পঞ্চভূত, পঞ্চতত্ত্বের তত্ত্বকথা শুনিতে অদ্ভুত।
কোন তত্ত্বে কেবা বিলীন হবে শুনিতে বাসনা হয় ॥
মরলে কেন করে পিণ্ডদান, মরায় কিসে আহার করে বলো সে বিধান।
জানি দেহ ছাড়া হইলে এ প্রাণ, অনন্তে মিলিয়ে রয় ॥
দীন শরৎ বলে অনিত্য সংসার, যাবে চলিয়া আপন দেশে কেহ নয় কার।
ওরে পুত্র পিণ্ড দিলে পিতার, মুক্তির উপায় কি সে হয় ॥
১২
আমার মনপাখি তুই আসল জংলি চিনেছি তোরে।
তোরে এত করে বুঝাইলাম রাধাকৃষ্ণ বুলি বললে না রে ॥
মন তুই হতে যদি টিয়া ময়না, শান্তি দিতে নাম শুনাইয়া।
তুই যে কাকের ছানা না চিনিয়া, পুষিয়াছি যত্ন করে ॥
কত আঙ্গুর বাদাম পেস্তা দানা, খাওয়াইলাম ইংরেজি খানা।
একদিন গুডমর্নিং তুই আর বললে না রে, ভালোবাসার অঙ্গার করে ॥
স্বভাব দোষ না জায়তে, তার পরিচয় প্রমাণেতে।
দুগ্ধে অঙ্গার শত ধুইলে, স্বমূর্তি যে ছাড়ে না রে ॥
দীন শরৎ বলে মন কাকটি, এখনও তুই হ রে খাঁটি।
কা ছেড়ে কও কৃষ্ণ নামটি, ধন করে ডাকো আঁকড়ে ধরে ॥
১৩
আমার সাধের শ্যাম শুকপাখিটা উড়ে গেল কই।
সখী বলো গো তোরা ত্বরা করে, শ্যাম শুকের শোক কেমনে সই ॥
পাখি ছিল আমার হৃৎ পিঞ্জরে, রেখেছিলাম যত্ন করে।
আমার হৃদয় রতন চুরি করে, জন্মের মতন ছেড়ে গেল সই ॥
সদা প্রেম-শিকলে থাকত বাঁধা, পেখম ধরে নাচত সদা।
পাখি বলত সদা রাধা রাধা, জানত না আর সে আমা বই ॥
আমার সরল প্রাণে দিয়ে ব্যথা, প্রাণপাখি মোর গেল কোথা।
আমার বাদী হলো কোন বিধাতা, তাই ভেবে প্রাণ সারা হই ॥
সখী বলো গো ত্বরা শীঘ্র করে, খুঁজে পাখি আন গে ধরে।
দীন শরৎ বলে মধুপুরে, কুবজায় পাখি ধরছে ওই ॥
১৪
একটি পরম তত্ত্ব জানতে চাই, মহাপ্রভুর গুরু কেন ভারতী গোঁসাই।
যিনি জগৎ গুরু কল্পতরু, যার উপরে কেহ নাই ॥
সর্বমন্ত্র হয় যার স্থিতি, কিবা মন্ত্র তাঁর কর্ণে দিলেন ভারতী।
কেন শিষ্য হয়ে বিশ্বপতি সন্ন্যাসী হলেন নিমাই ॥
সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলিতে, যুগে যুগে অবতার হলেন ধরাতে।
এগো কেবা গুরু কোন যুগেতে, গুরু মোরে বলো তাই ॥
কত ভক্ত ছিল নদীয়ায়, কেন গৌরা নাচে গায় শ্রীবাস আঙ্গিনায়।
দীন শরৎ বলে এই অভিপ্রায়, ভক্ত সঙ্গ যেন পাই ॥
১৫
একটি পরম তত্ত্ব জানব বলে বাসনা আমার।
পতিত পাবন দয়াল গুরু তুমি সর্ব মূলাধার ॥
কে বা গুরু কে বা শিষ্য, কে গড়িল এই যে বিশ্ব।
আমি অজ্ঞানো তিমিরান্ধস্য, আমায় ঘুচাইয়া দাও অন্ধকার ॥
আমার হইল কি সে দেহের গঠন, দেহে আছে কোন মহাজন।
এই যে গুরু শিষ্য আমরা দুজন, আগে জন্ম হইল কার ॥
দীন শরৎ বলে তুমি সত্য, ভূত-ভবিষ্যত তুমি নিত্য।
আমায় বলে দিয়ে পঞ্চতত্ত্ব, ভবসিন্ধু করো পার । ।
১৬
এমন উল্টা দেশ গো গুরু কোন জায়গায় আছে।
আকাশ পানে গাছের গোড়া, নিচ দিকে তার ডাল মেলিয়াছে ॥
সে দেশের যত নদ-নদী, উর্ধ্বদিকে জলের স্রোত যায় নিরবধি।
আছে নদীর নিচে আকাশ বাতাস, তাতে মানুষ বাস করতেছে ॥
সে দেশে যত লোকের বাস, মুখে আহার করে না কেউ নাকে নাই নিঃশ্বাস।
মলমূত্র সে ত্যাগ করে না, আবার আহার করে বাঁচতেছে ॥
দীন শরৎ বলে হইলেম চমৎকার, চন্দ্র সূর্যের গতি নাই দেশে ঘোর অন্ধকার।
সেই দেশের লোক অবিরত, এই দেশে আসতেছে ॥
১৭
ও তুই কি দেখিতে ব্রজধামে, যাবে রে নিমাই।
সাধের বৃন্দারণ্য হইল শূন্য, আর তো ব্রজের সে শোভা নাই ॥
ভাই ব্রজে নাই রাই চন্দ্ৰমুখী, ললিতা বিশখা সখি।
আর তো তমাল ডালে বসে পাখি, পাখা তুলে নাচে না ভাই ॥
সাধের কদমতলা বন হইয়াছে, ভুজঙ্গ আশ্রয় নিয়াছে।
ব্রজের আর কি সেই শোভা আছে, যমুনার সে ধারা নাই ভাই
ব্রজের কুঞ্জ নিকুঞ্জ মন্দিরে, কত বন্য পশু বিরাজ করে।
ভাই তোর সখা সকল বেঁচে নাই রে, নাই কবলী ধবলী গাই
দীন শরৎ বলে গৌরহরি, তোমার খেলা বুঝতে নারি।
যেন ব্ৰজে দিয়া তোমায় হেরি, শ্রীচরণে এই ভিক্ষা চাই ॥
১৮
ও তোর কেন রে ভাই জীবনকানাই, এমন দশা হলো।
ও তোর ছেঁড়া কাঁথা মুড়া মাথা, কাঙাল বেশে কে সাজালো ॥
ভাই তোর ভাব পরাল কোন ভাবিনী, কে ধরাল ডোর কৌপিনী।
কথা বলো শুনি রে চক্রপানি, কোন চক্রিনী ঐ করিল ॥
ও তোর চূড়া ধরা মোহনবাঁশি, কই রইলো শ্যাম কালশশী।
কেন কাঙাল বেশে নদে এসে, হরিবল হরিবল বল ॥
ভাই তোর বুক ভেসে যায় নয়ন জলে, কাঁদিস কেন রা রা বলে।
বুঝি ব্রজের কথা মনে হলে, জ্বলে ওঠে প্রেমানল ॥
দীন শরৎ বলে অমনি ভাবে, সাধে কি কেউ কাঁদে ভবে।
কাঁদেন গোরা যার অভাবে, তারে সে কাঁদাইয়াছিল ॥
১৯
কও শুনি গো গুরুধন, জগবন্ধু কাষ্ঠের মূর্তি হইলা কী কারণ
এমন বিকৃতি আকৃতি হরি কেন করলেন ধারণ ॥
অর্ধ অঙ্গ তার বিধবার আকার, অর্ধ অঙ্গ শোভে তার বস্ত্র অলংকার
আউসের অন্ন তাতে মাসকালাই, কী দিয়া লাগাইছে ভোগ
তার জাতের বিচার নাই, দুপাশে তার কানাই বলাই, মধ্যে রমণী হয় কোনজন ॥
দীন শরৎ বলে জানতে বড়ো সাধ
কি কারণে প্রসাদ বলে বাজারে বিকায় ভাত
কি জন্যেতে জগবন্ধু রথে দিলেন দরশন ॥
২০
কও শুনি হে গুরুধন
কী কারণে হয় গো জীবের অকালে মরণ?
গর্ভে মরা কেন গো হয় জানতে চাই তার কারণ ॥
রজঃগুণে জীবের সৃষ্টি হয়, সত্ত্ব রজঃ তমঃ এই ত্রিগুণ আশ্রয়
ভিন্ন আকার সন্তানেরই কি জন্য কী জন্য করে ধারণ ॥
কোন মাসে কোন তিথির মিলনে
সহবাসে পুত্র জন্মে কন্যা হয় কয়দিনে
কোন বারেতে কন্যা জন্মে কোন তিথিতে হলে মিলন ॥
দীন শরৎ বলে কহ দয়াময়, জানতে চাই এসব তত্ত্ব বাসনা যে হয়
যমজ সন্তান কেবা হয় ভেঙে বলো তার মূল কারণ ॥
২১
কলিকাতা শহরে ট্রাম চলেছে একতারে।
শিকের উপর চলছে গাড়ি, তাদের টানা উপরে ॥
ও তার দেহে আছে তিন তারের টানা, ঈড়া পিঙ্গলা তার মধ্যে সুষমা।
মূলাধার হইতে তারা, গিয়াছে সহস্রারে ॥
কোন তারেতে টেলিগ্রাম চলে, ট্রাম চলে যায় কোন তারের বলে।
কোন তারেতে আগুন জ্বলে, যায় চলে কোন তারে ॥
তাদের উপর দুনিয়াই খাড়া, আঠারো মোকামে তার পথে থাম গাড়া।
ও তার পোস্টমাস্টার হয় যাহারা, তার যোগে সংবাদ করে ॥
দীন শরৎ বলে শক্তি কি অদ্ভুত, কি সন্ধানে তারের ভিতর ভরেছে বিদ্যুৎ।
নিভলে আগুন সবেই নির্গুণ, কার খবর আর কে করে ॥
২২
কাল চিনে না অকালে, কর্মক্ষেত্রে জন্ম জীবের স্বকর্মের ফলে।
গর্ভে মরা পাপের কারণ, মহাজন তাই বলে ॥
রজঃ বীজ জীবের সৃষ্ট হয়, সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ গুণে ত্রিগুণী আশ্রয়।
নানা বর্ণে গঠিত হয়, সপ্ত ধাতু মিলিলে ॥
মাতৃভার হয় সোম শুক্র আর বুধ, সহবাসে কন্যা জন্মে কে করিবে রোধ
আমি সকল কথার দিলাম প্রবোধ, রতি শাস্ত্রে যাই বলে ॥
রবি গুরু শনি মঙ্গলবার, অষ্টাদশ পরে তারে করিলে বিহার।
অবশ্য হবে পুত্র তার, সমান তিথি থাকিলে ॥
দীন শরৎ বলে যমজ সন্তান হয়, দুই ফোঁটাতে দুই ভাগেতে বিন্দু যদি রয়।
নপুংসক হয় তার পিতামাতার, সমান অংশ থাকিলে ॥
২৩
কালেতে উৎপত্তি জীবের, কালে করে লয়।
পঞ্চে পঞ্চ মিশে গেলে, মরণ এল কয় ॥
মৃত্যু কন্যা হয় রে যেজন, আঠারোটি হাত ছয়টি চরণ।
চব্বিশ চক্ষে চব্বিশ চন্দ্র হরণ কলে লয় ॥
একটি ডিমের ভিতরে এই ব্রহ্মাণ্ড, কে বুঝিবে তার আজব কাণ্ড।
ওই যে মহাকাশে আকাশ খণ্ড, মিশে যেয়ে রয় ॥
আছে জীবরূপী শিব মূলাধারে, পরম শিব সহস্রারে।
তারে না জানলে বারেবারে, জন্ম-মৃত্যু হয় ॥
দীন শরৎ বলে অহং শিব, আমি আমার যখন হব।
আমি আমায় মিশে যাব, জানিবে নিশ্চয় ॥
২৪
কী কারণে জন্মে মানুষ কেন বা মরে।
আমি কোথায় ছিলাম কেন বা এলাম, কোথায় যাব দুদিন পরে ॥
এসব আজব কাণ্ড কে করিল, এ ব্রহ্মাণ্ড কে গড়িল।
ওই যে ডিমের ভিতর বাচ্চা মরল, প্রাণ গেল তার কি প্রকারে ॥
মৃত্যু কন্যা কে হইয়াছে, কয়টি হস্ত পদ রহিয়াছে।
ও সে কেমনে যায় জীবের কাছে, সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র হরণ করে ॥
কেবা ভাঙে কেবা গড়ে, কেবা মারে কেবা মরে।
কেবা কারে ভজন করে, কেবা তরায় কেবা তরে ॥
দীন শরৎ বলে ভেবে অপার, কেবা আমি তাই বোঝা ভার।
আমি সাধন ভজন করব কার, চিনলেম না আমি আমারে ॥
২৫
কী চমৎকার ফল রে মন ধরে এই গাছে।
আকাশ পানে গাছের গোড়া, নিচ দিকে ডাল মেলেছে ॥
বোঁটা ছাড়া আগলা ফল ধরে, কাটিলে সে জীয়ে গাছ না কাটিলে মরে।
সে ফল পাকা হয়ে ঝরে পড়ে, আবার কাঁচা হয়ে পাকতেছে ॥
সে গাছের আছে তিনটি ডাল, দুই ডালেতে ব্রহ্মা বিষ্ণু আরেক ডালে কাল।
শূন্যে আছে একটি হংসের বাসা, হংসে চারযুগে এক ডিম পেড়েছে ॥
দীন শরৎ বলে ডিমে নাই কুসুম, উড়ে সেই পাখিটি ডিমে না দেয় উম।
পাখি ধরতে পারলে ঘুম ভেঙে যায়, চারি যুগের মরা বাঁচে ॥
২৬
কুলবধূ বিষ্ণুপ্রিয়া প্রিয়সী তাহার।
সে তো অবলা সরলাবালা, কি অপরাধ ছিল তার ॥
সতী অতি পতিব্রতা, সুলক্ষণা সুচরিতা।
গেলেন তারে করে অনাথা, এ কেমন বিচার ॥
রাধার ঋণ শোধিতে নৈদে এলেন, ভাবকান্তি আর বিলাস নিলেন।
আরও কত ঋণের দায়ী হলেন, দেখতে পাই এবার ॥
করবেন গৌরা জীবকে দয়া, তার পরিচয় বিষ্ণুপ্রিয়া।
দীন শরৎ বলে তাই ভাবিয়া, হইলাম চমৎকার ॥
২৭
কে না শোনে মোহন বাঁশি এই বৃন্দাবনে।
তোর মতো রাই পাগলিনী আছে কোনখানে ॥
জল আনতে যমুনার জলে, কে না যায় সেই কদম্ব তলে।
তোর মতো রাই কয়জন ভুলে শ্যাম দরশনে ॥
না বুঝে পিরিতি করে মন দিলে সেই মনচোরা রে।
ভুলাতে পারলে কই তারে আপনার গুণে
যে না ভাবে রাই তোমারে, তুমি কেন ভাবো তারে।
প্যারী তোমার মরণ না বুঝে ভুলে যায় প্ৰাণে ॥
দীন শরৎ বলে এ সংসারে, যার নয়নে লাগলো যারে।
সে কি তারে ভুলতে পারে চির জীবনে ॥
২৮
কে বা না পিরিতি করে এই ভূমণ্ডলে।
কাষ্ঠের সঙ্গে পিরিত করে, লোহা ভাসে জলে ॥
দিনমণি কমলিনী জানে তাই সকলে।
উভয়ে পিরিতি করে আছে কৌতূহলে ॥
জলের সঙ্গে মাছের পিরিতি, আছে উভয় মিলে।
বারিশূন্য মীনের দশা আমারই কপালে ॥
যখন পিরিতি করি সেই কদম্ব তলে।
বন্ধু আমায় বলেছিলে ছাড়ব না প্রাণ গেলে ॥
দীন শরৎ বলে কমলিনী, জানলে না সে কালে।
প্রাণ থাকতে পাবে না তারে, বলে গেল চলে ॥
২৯
কেন বা মরে মানুষ, কেন বা মরে।
পাঁচে পাঁচে যায় গো মিশে, যমে বেঁধে নেয় গো কারে ॥
গুরু তব মুখের উক্তি হয়, আত্মারূপে ভগবান প্রতি ঘটে রয়।
জীব শিব ভিন্ন যে নয়, কার অধিকার তার উপরে ॥
মৃত্যু নামে হয় গো কোন জন, কেমনে হরিয়া নেয় গো জীবের জীবন।
তার কি কখন হয় না মরণ, যে জন সবারে মারে ॥
দশ ইন্দ্রিয়ে দশ দেবতা রয়, অতি বলবন্ত হয় জন্মে রিপু ছয়।
তার যেন শমনের ভয়, পলাইয়া যায় দেহ ছেড়ে ॥
দীন শরৎ বলে গুরু দয়াময়, শ্রীপদে আশ্রয় দিও মরণ সময়।
আমি মরণকে তো ভয় করি না, ভয় করি ওই যন্ত্রনারে ॥
৩০
কোথা হতে আসে মানুষ, কোথায় চলে যায়।
এ ব্রহ্মাণ্ডের আজব কাণ্ড, বোঝা বড়ো দায় ॥
কত এল কত গেল, গেল মানুষ আর না এল।
ও তার দেহ পুড়ে ভষ্ম হলো মিশিল ধরায়
পঞ্চআত্মা দেহে আছে, শুনলেম গুরু তোমার কাছে।
ও যার দেহ ছেড়ে প্রাণ গিয়াছে, সে আছে কোথায় ॥
অনেক দিন হয় সে মরেছে, স্বপ্নে দেখি এল কাছে।
প্রত্যক্ষ তার দেহ আছে, কথা বলে যায় ॥
দীন শরতের এই অভিলাষ, দেহে আছে বায়ু আকাশ।
কি জন্যে হয় দেহের বিনাশ জানতে অভিপ্ৰায় ॥
৩১
কোথা হতে এল গৌরা, সোনার নদীয়ায়।
হয়ে কি ধন হারা অমনি ধারা, ধারায় অঙ্গ ভেসে যায় ॥
নাই কি গৌরার পিতামাতা, নাই কি ভার্যা সুচরিতা।
কি দুঃখে মুড়াইয়ে মাথা, সন্ন্যাস নিয়ে গো যায় ॥
এই যে কত ভক্তবৃন্দ, অদ্বৈত আর রামানন্দ।
কেবা গৌর নিত্যানন্দ, ছিল হে কোথায় ॥
কেবা গদাধর শ্রীনিবাস, কেবা ভক্ত হরিদাস।
জানতে মনে এই অভিলাষ, বলো হে আমায় ॥
দীন শরৎ বলে গৌর তত্ত্ব, গুরু আমায় বলো সত্য।
আমি জানব বলে সেই মাহাত্ম্য জিজ্ঞাসি তোমায় ॥
৩২
গুরু আমি এই নিবেদন করি,
পরমার্থ শিবতত্ত্ব বুঝাইয়া দাও কৃপা করি ॥
আছেন শিব সহস্রারে, শক্তি সেই মূলাধারে।
মিলন হয় কি প্রকারে, আমি বুঝিতে না পারি ॥
ভুজঙ্গিনী রূপে কেন, আছেন যোগেশ্বরী।
নিদ্রিতা সেই চতুৰ্দ্দলে, কথা শুনে ভেবে মরি ॥
মূলাধারে মহাপদ্ম, সে পদ্ম ভবারাধ্য।
যাহাতে আছেন বদ্ধ, আপনি শংকরী ॥
সে পদ্মের কি হয় আকৃতি, আর কিবা বর্ণধারী।
কোন আত্মা সেই পদ্মে আছে, কোন শক্তিকে আশ্রয় করি ॥
আছে যে পঞ্চআত্মা, জীবাত্মা আর পরমাত্মা।
কোন আত্মায় শিবের সত্তা, কোন আত্মায় শংকরী ॥
দীন শরৎ বলে কৃপা করি, আত্মা তত্ত্ব জানতে না পারি।
কও শুনি হে দয়াল গুরু, ভবের চালকে কিসে ধরি ॥
৩৩
গুরু কও শুনি হে সারাৎসার, কোন মজুরে করেছে ঘর এমন চমৎকার
ঘরের বাহিরেতে জ্বলছে বাতি, ঘরেতে ঘোর অন্ধকার ॥
কোন তলায় সেই ঘরের মহাজন, অনুভবে বুঝি ঘরে আছে অনেকজন।
তারে দেখতে পাই না থাকতে নয়ন, আসে যায় কে বারেবারে
দশ ইন্দ্রিয় এই যে রিপু চয়, কোন মহাজন এই সকলের বিচারকর্তা হয়।
আমায় ঘরের তত্ত্ব কও সমুদয়, কয়টি কোঠা কয়টি দ্বার ॥
কি দিয়ে বানাইছে ঘরখানি, কিসের বা হয় পালা মাস্তুল কিসের বা ছাউনি।
দীন শরৎ বলে বলো শুনি, কোন কোঠায় বসতি কার ॥
৩৪
গুরু তুমি মূলাধার, আমায় দেশ কাল পাত্র বুঝাইয়া।
ঘুচাইয়া দাও মনের আঁধার ॥
স্কুলের দেশে ওই মায়াপাশে, কামিনী কাঞ্চনে ভুলে ছয় রিপুর বেশে।
আমি দিন কাটালাম মিছে কাজে, সাধন ভজন হইল না আর ॥
কোনটা বা হয় প্রবর্তকের দেশ, কিবা কাল কেবা পাত্র জানালাম না বিশেষ।
গুরু বলো মোরে সেই উপদেশ, আশ্রয় নিতে হবে গো কার ॥
আলম্বন আর উদ্দীপন কি হয়, কত বিধা ভক্তি ধর্ম সে দেশেতে বয়।
কোন রতি সাধন করা হয়, বলো মোরে সেই সমাচার ॥
দীন শরৎ বলে করি মিনতি, কও শুনি হে দয়াল গুরু সে দেশের রীতি।
শিক্ষাগুরুর কি আকৃতি, প্রকৃতি কি পুরুষাকার ॥
৩৫
গুরু তোমার কৃপাতে, এলেম আমি সাধকের দেশে।
আমায় কও শুনি হে দয়াল, গুরু সাধন সিদ্ধি হবে কিসে ॥
বৃন্দাবনের ওই যে পঞ্চরস, কোন রসেতে কৃষ্ণচন্দ্র হইলেন কার বশ।
সুরন রে পায় না যারে, কেন ব্রজপুরে বাস করে সে ॥
প্রেম হইয়াছে সাড়ে তিন রতি, কোন রতিতে সাধন করে পাইলেন শ্রীমতী।
এবং রতি শব্দের অর্থ বা কি, অর্ধরতি কার বা পাশে ॥
দীন শরৎ বলে বৃথায় দিন যায়, না ভজিলাম রাধাকৃষ্ণ কি হবে উপায়।
করে ধরে গুরু মোরে নিয়ে যাও সেই দেশেতে ॥
৩৬
গুরু তোমার কৃপাতে, পরম তত্ত্ব লাভ করিলাম প্রবর্তকেতে।
নববিধা ভক্তি হইল, নিত্য নবদ্বীপেতে ॥
সাধকের দেশ কোনখানেতে রয়, কিবা কাল কেবা পাত্র কে হলেন আশ্রয়।
আলম্বন আর উদ্দীপন কি, বাসনা তাই জানিতে ॥
কত বিধা ভক্তি সেখানে, কোন রতি সাধন করা হয় গেমন সন্ধানে।
দয়া করি নিজ গুণে, বলো আমার সাক্ষাতে ॥
দীন শরৎ বলে বিফলে দিন যায়, না ভজিলাম রাধাকৃষ্ণ কি হবে উপায়।
করে ধরে গুরু আমায়, নিয়ে চলো সুপথে ॥
৩৭
চেতন গুরুর সঙ্গ করো দূরে যাবে অন্ধকার।
তখন জ্ঞানালোকে দেখতে পাবে ব্রহ্মময় ত্রিসংসার ॥
হইলে গুরুভক্তি নামে রুচি হবে রে তোর দেহ শুচি।
তখন ভেদ রবে না ব্রাহ্মণ মুচি, সমজ্ঞান সবাকার ॥
নিত্য বস্তু শুদ্ধ তত্ত্ব, জেনে শুনে হও রে মত্ত।
কলুর চোখ বাঁধা বলদের মতো, ঘুরিস না রে অনিবার ॥
আত্মারূপে সর্বজীবে, যখন তারে দেখতে পাবে।
তখন মনের ধাঁধা ঘুচে যাবে, রবে না তোর অহংকার ॥
দীন শরৎ বলে প্রেমবাজারে, মনের মানুষ ঘুরে ফিরে।
তারে মেয়ে হলে ধরতে পারে, পুরুষের নাই অধিকার ॥
৩৮
জগাই-মাধাই কলিতে, জয়-বিজয় নামে দ্বারী ছিল স্বর্গেতে।
ব্রহ্মশাপে শত্রুভাবে জন্ম নিলো ধরাতে ॥
হিরণ্যকশিপু সত্যযুগে হয়, নরসিংহ রূপে বিষ্ণু করিলেন ক্ষয়।
রাবণ কুম্ভকর্ণ হয়ে, জন্মেছিল ত্রেতাতে ॥
তারা যুগে যুগে জন্ম যে ধরে, শিশুপাল আর দন্তবক্র হলো দ্বাপরেতে।
বিনাশিলেন কৃষ্ণ যারে, সুদর্শন চক্রেতে ॥
কলিতে সন্ন্যাসী দুটি ভাই, শত্রু সংহারিতে আর অন্য অস্ত্র নাই।
নামের অস্ত্র যুজলেন নিতাই, অহিংসা ধনুকেতে ॥
নিতাইর মতো এমন দয়াল নাই, মার খেয়ে উদ্ধারিল জগাই আর মাধাই।
দীন শরৎ বলে এই ভিক্ষা চাই, পাই যেন অন্তিমেতে ॥
৩৯
জানো না কি মন আমার, সুমতি কুমতি দুইটি প্রেয়সী তোমার।
পুত্র কন্যা বত্রিশজনা নিত্য জন্মে দুইজনার
শম দম তপ জপ দান, হরিষ চৈতন্য সভা সুমতির সন্তান।
এই অষ্টজন পুত্র প্রধান, শুদ্ধমতি সদাচার ॥
ক্ষমা দয়া ভক্তি চেতনা সুতৃষ্ণা মমতা শান্তি নিষ্ঠা যে জনা।
সুমতির এই অষ্ট কন্যা, গুণে মুগ্ধ ত্রিসংসার
কাম ক্রোধ লোভ মোহ আর হিংসা পৌষনাদি মদ অহংকার।
কুমতির হয় অষ্টকুমার, সবেই অতি দুর্নিবার
নিদ্রা আলস্য চিন্তা নিষ্ঠুর, পাবক নাসিকা আশা নিদয়া তারা।
দীন শরৎ বলে মন বেহায়া, এই সকলের সঙ্গ ছাড়া ॥
৪০
জিজ্ঞাসি হে গুরুধন কেবা গুরু কেবা শিষ্য জানতে আকিঞ্চন।
গুরুতত্ত্ব না জানিলে, কিসে হয় সাধন ভজন ॥
গুরু শব্দের কি বা অর্থ হয়, গু কারে আর রু কারেতে কি পদার্থ রয়।
আমি জানব বলে সেই সমুদয়, করিতেছি এই নিবেদন ॥
সন্ধ্যা দেবীর কিবা আকৃতি, দিনে তিনবার হইল কেন সন্ধ্যা গায়ত্রী।
কোন সময়ে কোন মূর্তি, সেই দেবী করেন ধারণ ॥
দীন শরৎ বলে তত্ত্ব সমাচার, জানব বলে দয়াল গুরু বাসনা আমার।
কি পদ্ধতি সন্ধ্যা পূজার, জানতে চাই তার মূল কারণ ॥
৪১
জীবের মরণ নাই রে মন মরাই সে মরে।
জীবের কর্মফাকে দেহ থেকে, সুখ-দুঃখ অনুভব করে ॥
আত্মারূপে আছেন ভগবান, জীবাত্মা রূপেতে শিব ঘটে অধিষ্ঠান।
জীবের যখন হয় ব্রহ্মজ্ঞান, মরণরে ভয় সে কি করে ॥
হইলে জীবের ভোগের অবসান, পরমাত্মা হবে রে লয় আছে রে প্রমাণ।
তখন প্রাণ-অপ্রাণ ধ্যান সমান উদয়, আকাশে গ্রাসিবে তারে ॥
দশ ইন্দ্রিয়ের দশ দেবতা রয়, মনবুদ্ধি অহংকার ওই যে রিপু ছয়।
দীন শরৎ বলে ত্রিগুণেতে হবে রে লয়, মরাই তখন থাকবে পড়ে ॥
৪২
জুটল রে চৈতন্যের হাটে অসংখ্য পাইকার।
এগো ব্রজ হতে নদে এসে লাগলো ইস্টিমার ॥
ষোল নাম বত্রিশ অক্ষরে, এনেছে মাল বোঝাই করে।
শ্রীঅদ্বৈত ওজন করে, ভরতেছে ভাণ্ডার ॥
মাল বিকায় নিত্যানন্দ, নেয় না রে যার কপাল মন্দ।
যার কাছে নাই প্রেমের গন্ধ, নিতাই কাছে যায় না তার ॥
পঞ্চরসের রসিক যারা, এক নম্বর খরিদ্দার তারা।
ওরে চালান জমা গোদাম ভাড়া লাগে না রে তার ॥
দীন শরৎ বলে নিতাই আইল, নাম শুনে শমন পলাইল।
চাঁদ বদনে হরি বলো, জীবের ভাবনা কি রে আর ॥
৪৩
তরি কূলে ডাকছে নিতাই কে যাবে রে আয়।
তোরা হরি বলে আয়রে চলে, পারের সময় বয়ে যায় ॥
অন্ধ আঁতুর কানা খোঁড়া, চলছে যত ছেলে বুড়া।
নিতাই ঘাটে শোনো রে তোরা, কলরব শোনা যায় ॥
হইল গরিব-দুঃখীর কি সুবিধা; যাইতে কারো নাইকো বাধা।
দিলে ভক্তি মাশুল নববিধা, নিতাই কোলে করে তুলে নায় ॥
ও সে কাঙাল বড়ো ভালোবাসে, দয়াল নিতাই কাছে আসে।
কখন কাঁদে কখন হাসে, হরি বলে নাচে গায় ॥
ও তার অভেদ, ব্রাহ্মণ মুচি, নিতাইর কাছে সবই শুচি।
থাকে যার নামে রুচি, তারে নিতাই প্রেম বিলায় ॥
ধনী মানী অহংকারী, লোভী কামী অনাচারী।
যার চক্ষে নাই প্রেম বারি, তাদের না তুলে নায় ॥
পাপের বোঝা মাথায় করে, যাইতে চাইলে ভবপারে।
শমন পুলিশ ঘাড়ে ধরে, তাড়াইয়া দিতেছে তায় ॥
বৃন্দাবনের যাত্রিক যত, পার হইতেছে অবিরত।
সখিরূপা গুরু যত, আদর করে নিয়ে যায়
দীন শরৎ বলে ভারতী গোসাই, শ্রীচরণে এই ভিক্ষা চাই।
দয়াল নিতাইর ঘাটে কি নিয়ে যাই, পথের সম্বল দাও আমায় ॥
৪৪
তিন মানুষে সৃষ্টি লীলা, খেলা অতি চমৎকার।
অনন্ত বিভোর লীলা, জানতে সাধ্য আছে কার ॥
স্বত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ, গুণে ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব তিনে।
সৃজন পালন সংহারণে, মত্ত আছেন অনিবার ॥
মধু কৈটব দৈত্য ছিল, বিষ্ণুর চক্রে সে মরিল।
তার মেদেতে মেদিনী হইল, বসুন্ধরা নামটি যার ॥
কূর্মের উপর গজ রয়েছে, তার উপর বাসুকী আছে।
তিনজনে বহিতে আছে সসাগরা ধরার ভার ॥
আদ্যাশক্তি মহামায়া, সকলই তাহার কায়া।
দীন শরৎ বলে না বুঝিয়া, আসা-যাওয়া হইল সার ॥
৪৫
তুমি গুরু হইয়া গুরুর মতো কথা বলো না।
জিজ্ঞাসিলাম যে সব কথা উত্তর হইল না ॥
মনের ধান্দা না ঘুচায়ে, গুরু হয় কি মন্ত্র দিলে।
তোমায় মানবো কেন গুরু বলে তত্ত্ব জানো না ॥
গুরু মন্ত্র দেওয়া মাত্র বুঝাইতে হয় মন্ত্রের অর্থ।
তুমি পঞ্চতত্ত্ব দেশ কাল পাত্র নিজেই বোঝো না
যে না জানে শাস্ত্রতত্ত্ব তার কাছে নাই মনুষ্যত্ব।
গুরু বলে আধিপত্য করতে পারবে না ॥
দীন শরৎ বলে কোন সাহসে গুরু স্বীকার করলে এসে।
শিষ্যের কাছে হারলে শেষে জবাব চলে না ॥
৪৬
ত্রিলোকের আরাধ্য ধন, কোন গুণে পাইলেন কৃষ্ণ ব্রজ গোপীজন।
অবিরত ভাবে যারে, ব্রহ্মা বিষ্ণু পঞ্চানন ॥
কেবা হয় নন্দ যশোদা, কি কারণে ধরলেন কৃষ্ণ শ্রীনন্দের বাধা।
উদুখলে মা যশোদা, কোন পূণ্যে করলেন বন্ধন ॥
গোলোকে বসতি হয় যার, কি কারণে গোপের ঘরে জন্ম হইল তাঁর।
ব্রহ্মময়ী শ্রীরাধিকার, কেন এত বিড়ম্বন ॥
দীন শরৎ বলে এই বাসনা মোর, শুনব বলে কৃষ্ণকথা অতি সুমধুর।
গুরু কও শুনি হে তত্ত্ব নিগূঢ়, ধরি তোমার শ্রীচরণ ॥
৪৭
দয়াল গুরু আমি রইলাম পরবাসে।
ছয় রানী কুসঙ্গীর সঙ্গে, ভুলে মায়াপাশে ॥
দেশ ছেড়ে বিদেশে এলাম, লাভ করিবার আশে।
লাভে মূলে সব হারালাম, আপন কর্মদোষে ॥
আমি লক্ষ্মীছাড়া কপালপোড়া, কেউ না ভালোবাসে।
এমন বান্ধব নাই গো আমার, ডাক দিয়া জিজ্ঞাসে ॥
প্রাণ কাঁদে মোর দিবানিশি, যাইতে আপন দেশে।
একটি কানাকড়ি নাই গো হাতে, টিকিট নিব কিসে ॥
দীন শরৎ বলে ভারত গোসাই, রইলাম তব আশে।
ফুল টিকিটটি দাও হে গুরু, চলে যাই স্বদেশে ॥
৪৮
দয়াল গুরুজি তুমি ভব কাণ্ডারি।
আমায় করো হে পার অকূল পাথার, নিজ গুণে দয়া করি ॥
দেহতরি জীর্ণ অতিশয়, তাতে আবার পাপ-পুণ্যেতে বোঝা ভরা রয়।
ঘোর তুফানে কাঁপছে হৃদয়, কখন জানি ডুবে মরি ॥
দেখে নদীর বিষম তরঙ্গ, আমায় ফেলে দাড়ি মাঝি দিয়েছে ভঙ্গ।
তারা দূরে থেকে দেখছে রঙ্গ, আমি এ বিপদে কিসে তরি ॥
ঘটনা এবার বিষম বিপাক, উজান বাঁকে সমনদূতে পাড়ে ঘন ডাক।
আমায় পার করো গো হে ত্রিপুনীর বাঁক, জলের পাকে ডুবল তরি
দীন শরৎ বলে রামকৃষ্ণ গোসাই, তুমি বিনে ভবপারের বন্ধু কেহ নাই।
শ্রীচরণে এই ভিক্ষা চাই, আমায় অন্তে দিও চরণ তরি ॥
৪৯
দুইটি নারীর তত্ত্ব জানিতে, জিজ্ঞাসি হে দয়াল গুরু তোমার সাক্ষাতে।
তাদের মতো এমন নারী হেরি না ত্রিজগতে ॥
এক ঘরেতে বাস করে মাত্র, ভিন্ন ভিন্ন হয় গো তাদের স্বভাব চরিত্র।
অষ্ট কন্যা অষ্ট পুত্র প্রসব করে দিনেতে ॥
দুইজনে হয় ষোলটি তনয়, পুত্র কন্যা বত্রিশজনা দিনের মধ্যে হয়।
কাণ্ড দেখে হলেম বিস্ময় নারি কিছু বুঝিতে ॥
দিবা রাত্র অষ্ট প্রহরে, নিত্য নিত্য জন্মে তারা নিত্যই মরে।
এসব পুত্র কন্যা কি নাম ধরে, বাসনা তাই জানিতে ॥
দীন শরৎ বলে এই দুই রমণী, কোথায় থাকে কি নাম ধরে, কোন রাজার রাণী।
আমায় সকল কথা বলবেন যিনি, তারে গুরু মানি সভাতে ॥
৫০
দেখছি ভবে সবই তো শব, জিয়ন্তে কেউ না।
ভব শ্মশান ক্ষেত্র কী বিচিত্র, ভেবে কিন্তু অন্ত না পাই ॥
মরার পেটে জন্মে মরা, আহার করে আরেক মরা।
মরলে মরা গাড়া পোড়া, মরা ছাড়া কেউ করে নাই ॥
দেখছি মরার শিরে ছত্রদণ্ড, মরায় করে মরার কাণ্ড।
মরায় ভরা এ ব্রহ্মাণ্ড, আজব কাণ্ড তাই বুঝি নাই ॥
ওই যে মরায় কাঁদে মরায় হাসে, মরায় মরা ভালোবাসে।
মরা দেখলে মরা পালায় ত্রাসে, এর তো কিছু ভাব বুঝি না ॥
দীন শরৎ বলে এ শ্মশানে, এসেছিলাম সে কারণে।
ছয়টা স্কন্ধ কাটা ভূতের জন্যে, আমার শব সাধনা করা হলো না ॥
৫১
দেহের গুরু পরমাত্মা, শিষ্য হয় রে মন।
ওরে গুরু-শিষ্য এক হইলে, আসা-যাওয়া হয় বারণ ॥
প্রকৃতি পুরুষ হইতে, মহাতত্ত্বের জন্ম তাতে।
আকাশাদি পঞ্চভূতে, হইয়াছে দেহের গঠন ॥
বীজ হইতে জন্ম বৃক্ষ, বৃক্ষেতে হয় ফল প্রত্যক্ষ।
ওই যে দেহাদেহী এই সম্পর্ক, করো তত্ত্ব নিরূপণ ॥
পাঁচ পাঁচ পঁচিশের তত্ত্ব, জেনেশুনে হও রে মত্ত।
আছে পঞ্চআত্মা দেহাস্থিত, দশে ছয়ে ষোলজন ॥
দীন শরৎ বলে তত্ত্ব জেনে, সাধ্য বস্তু লও রে চিনে।
বাধ্য করে ষোলজনে, করবে তারে অন্বেষণ ॥
৫২
দেহের তত্ত্ব জানতে আমার মনের আকিঞ্চন।
সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রের তত্ত্ব, কও শুনি হে গুরুধন ॥
কোথায় আছে রবি শশী, বলো গুরু তাই প্ৰকাশি ।
অমাবস্যা পৌর্ণমাসী, কোন সময়ে হয় গ্রহণ ॥
ওই যে আমার দেহ মাঝে, কোন চন্দ্ৰ কোথায় বিরাজে।
কোন চন্দ্ৰ আকাশে আছে, কোন চন্দ্ৰ পাতালভুবন ॥
চারি চন্দ্রের সাধন তত্ত্ব, গুরু আমায় বলো সত্য।
কোন চন্দ্রের হয় কি মাহাত্ম্য, জানতে চাই তার মূল কারণ ॥
দীন শরৎ বলে গ্রহণকালে, কোন রাহু সেই চন্দ্ৰ গিলে।
কোন চন্দ্র সাধন করিলে, জন্ম মরণ হয় বারণ ॥
৫৩
দেহের তত্ত্ব জানবে তোর, আগে যেয়ে গুরুর চরণ ধর
পাবি রে তুই নিত্য দেহ, চারি চন্দ্র সাধন কর ॥
সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রের তত্ত্ব ওই, হাতে দশ, পায়ে দশ, গণ্ডগোলে দুই।
অধরে ললাটে দুইটি, অর্ধ চন্দ্র তার উপর ॥
চারিচন্দ্রের জান রে সন্ধান, একটি গরল একটি উন্মাদ রোহিনী আর চান্দ।
গরলেতে আছে সুধা, জেনে লও রে তার খবর ॥
জেনে লও সেই চন্দ্রের পরিচয়, চন্দ্রমণ্ডল সূর্যমণ্ডল সহস্রারে রয়।
চন্দ্র বিজয় সুধা ঝরে, খাইলে মানুষ হয় অমর ॥
দীন শরৎ বলে মমন রাহুতে, চন্দ্র সূর্য গ্রাস করিবে সে সময়েতে।
হবে দুইটি গ্রহণ এক দিনেতে, আঁধার হবে দেহঘর ॥
৫৪
দেহের মালিক কে আছে তোর, দেখো তালাশ করি।
আগে চেয়ে কবালা করো, এ দেহ জমিবাড়ি
কর্ম আর জ্ঞান ভক্তিরে, সাক্ষী লিখো তিনজনা রে।
আছে সাবরেজিস্টার মণিপুরে, করে লও রেজিস্টারি ॥
খাস দখলের মামলা করে, উচ্ছেদ করো ছয়জনা রে।
ক্ষতিপূরণ আদি ধরে, করো গিয়ে ডিগ্রি জারি
এনে জমি নিজ নিজ দখলে, সময়মতো চাষ করিলে।
আর রীতিমতো ফসল পাইলে, ঋণের কি আর ভয় করি ॥
ছয়টি বলদ হালে জুড়ি, ভক্তি লাঙ্গলে কষে ধরি।
দীন শরৎ বলে কৃষি করো, গুরু বীজ বপন করি
৫৫
ধর্ম-কর্ম ছাড়ো ভাই, ধর্মে কোনো কাজ নাই, ধর্ম করাই পাপের কারণ।
ধর্মেতে সম্ভোগ রয়, সংসারেতে আসিতে হয়, ভোগের কারণে হয় জন্মগ্রহণ ॥
অনেক পুণ্যের ফলে জন্ম হয় রাজকুলে, অথবা ধনীর ছেলে হয় কোনজন।
সুখী হলেই করে ভোগ ভোগের সঙ্গে পাপের যোগ, কৃষ্ণ ভক্তি থাকে না তখন ॥
মদ্য মাংস বেশ্যা আর যত সব অনাচার, সুখী ভোগী বিনে আর করে কোনজন।
ভোগে করে পুণ্যক্ষয় পুণ্যক্ষয়েই পাপ হয়, শেষকালে হয় নরকে গমন ॥
দালান কোঠা টিনের ঘর নাটমন্দিরে মনোহর, পাঁচতালার উপরে করিলে শয়ন।
তথাপি নিবৃত্তি নাই মনে ভেবে দেখো ভাই, অনিত্য সুখ শুধু হয়েছে কারণ ॥
কাঙাল শরতে বলে অনেক পুণ্যের ফলে, স্বর্গের সিংহাসন পেলেন নহুস রাজন।
ভোগেতে বাড়িয়া পাপ হইল শেষে ব্রহ্মশাপ, সর্পদেহ করিলেন ধারণ ॥
৫৬
নিতাই আমায় নিয়ে চলো দাদা ব্রজধামে যাই।
দেখি আমারে কি করে দয়া, প্রেমময়ী কিশোরী রাই ॥
শান্ত দাস্য মধুর প্রেমে, সখ্য আর বাৎসল্য ক্রমে।
হইলে পঞ্চরসের কথা মনে, নয়ন জলে ভেসে বেড়াই ॥
যমুনার তরঙ্গ খেলা, প্রেমের হাট কদম্ব তলা।
আমার মনে হইলে ব্রজলীলা, আগুন জ্বলে ওঠে রে ভাই ॥
আমার সদা এইভাব পড়ে মনে, কবে যেয়ে বৃন্দাবনে।
আমি চড়াব রাখালের সনে, কবলী ধবলী গাই ॥
দীন শরৎ বলে ভক্ত সখা, তব হৃদয় প্রেমে মাখা।
আমার হৃদে এসে দাও হে দেখা, সঙ্গে নিয়ে প্রাণের নিতাই ॥
৫৭
নিত্যধামে যাবে যদি পাষাণ মন আমারই।
শ্রীগুরু কাণ্ডারি করে, ভবসাগর দেও না পাড়ি ॥
সিদ্ধের দেশ হয় রে বৃহৎ বৃন্দাবন।
কাল হইল আঠারো দণ্ড নিশি নিরূপণ
পাত্র হইল শ্রীরাধিকাজি, আশ্রয় হইল শ্রীরূপ মঞ্জরী ॥
প্রেমসেবা হয় রে আলম্বন, উদ্দীপন হয় বংশীর ধ্বনি শোনো রে আমার মন
বিরাজ করে মদনমোহন এক দেহেতে পুরুষ নারী ॥
দীন শরৎ বলে সেই দেশে যাবি, মেয়ে হয়ে মাইয়ার সঙ্গ করো গে রে তবে
মেয়ের দয়া হলে দেখতে পাবে, অপরূপ সে রূপমাধুরী ॥
৫৮
পঞ্চরস আছে রে শ্রীবৃন্দাবনে।
পাইলেন দাস্যভাবে গোপী সবে, মাধুর্য প্রেম রাধার সনে ॥
সখ্যভাবে রাখাল সবে পায়, বাৎসল্যভাবে পাইলেন নন্দ যশোদায়।
শান্তভাবে পেয়েছে তায় যোগী ঋষি মুনিগণে ॥
রতি শব্দে রমণ করা হয়, রমণ শব্দে মন হরণ, কাম রতি যে নয়।
কাম থাকিলে প্রেম হবে না ব্রজগোপীর স্বভাব বিনে ॥
সাধারণী রতি গোপিকায়, সামঞ্জস্য রতিতে সেই চন্দ্রাবলী পায়।
পাইলেন সমর্থাতে শ্রীরাধিকায়, অর্ধরতি আছে কুবজার পাশে ॥
দীন শরৎ বলে শোনো রে আমার মন, সখিরূপা গুরুর কাছে লও রে স্মরণ
গুরু কৃপা হলে দেখবে তখন, মদনমোহন রাধার সনে ॥
৭৮
পরম আত্মা পরম ব্রহ্ম, নির্গুণ সে নিরাকার।
ব্রহ্মাণ্ড সৃজন তরে, আপনি হইলেন সাকার ॥
অনাদির আদি যিনি, প্রকৃতি সৃজিলেন তিনি।
শূন্যভরে পুরিখানি, করিলেন বর্তুলাকার ॥
শক্তিভরে আভু হইল, আভেতে ব্রহ্মাণ্ড হইল।
তাতে মহাবিষ্ণু জন্মিল, ক্ষীরোদ বসতি যার ॥
শক্তি হইলেন ললাটেতে, চন্দ্ৰ সূর্য নয়নেতে।
আকাশ হলো মন হইতে, নিঃশ্বাসে পবন তার ॥
প্রকৃতি পুরুষ হইতে, মহাতত্ত্বের জনম তাতে।
দীন শরৎ বলে ত্রিগুণেতে, জন্ম হইল তিনজনার ॥
৬০
পরমার্থ সৃষ্টিতত্ত্ব বোঝা বড়ো দায়।
অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড আছে এক মানুষের গায় ॥
ব্ৰহ্মলোক বিষ্ণুলোক শিবলোক আর ইন্দ্রলোক।
যেজন আসে যে লোক থেকে তথায় চলে যায় ॥
স্থুল দেহটি পরিহরি, সূক্ষ্ম দেহ ধারণ করি।
মুক্ত জীব যায় স্বর্গপুরী, আসে না ধরায় ॥
বদ্ধজীব এখানেই থাকে, যারে লোকে স্বপ্ন দেখে।
মরে যায় সে যমলোকে, ভৌতিক দেহ পায় ॥
দীন শরৎ বলে তুই ঘটাকাশ, যখন হয় রে ঘটের বিনাশ।
মহাকাশ ক্ষুদ্রাকাশ, তখন মিলিয়ে যায় ॥
৬১
ফৌজদারি আসামি মন তুই হলে রে ফেরার।
ঐ যে সরকারি পরোয়ানা লইয়া, পুলিশ তোরে খুঁজছে এবার
গুপ্ত পুলিশ সঙ্গে আছে, ফিরে সদায় পাছে পাছে।
ও তোর পলাইবার কি উপায় আছে, নিত্যসাক্ষী তোর ছয় চৌকিদার ॥
থানা হতে পুলিশ এসে, যখন তোরে বাঁধবে কষে।
ভাই বন্ধু সব দেখবে বসে, রাখতে শক্তি হবে না কার ॥
পুলিশের আপন স্বভাবে, থানায় নিয়ে দণ্ড দিবে।
শেষে শমন কোর্টে চালান দিবে, কর্ম মতে হবে বিচার ॥
দীন শরৎ বলে যেতে হবে, ছোটো বড়ো কেউ না রবে।
যে জন গুরুদণ্ড টিকেট নিবে, শমন দণ্ড হবে না তার ।।
৬২
বড়ো অপূর্ব কাহিনি, রাধা গিয়া হলেন কেন আয়ান গৃহিণী।
আদ্যাশক্তি স্বয়ং রাধা, যিনি গোলোকবাসিনী ॥
গোপনে সে পিরিতি করে, কৃষ্ণ কলংকিনী বধূ লোকে কয় তারে।
জটিলা কুটিলায় করে, গঞ্জনা দিন যামিনী ॥
যাহার ভয়ে কাঁপিত গোলকধাম, বিরজা হইল নদী শুনি যার নাম।
সর্বরূপে যাহার ভয়ে শ্যাম ভেসেছিলেন আপনি ॥
বৃষভানু কন্যা কেন হয়, আয়ান ভার্যা হয়ে করে কুটিলারে ভয়।
দীন শরৎ বলে গুরু মোরে, সেই সমুদয় কও শুনি ॥
৬৩
বড়ো অপূর্ব গঠন গুরু, দেখি এই গাছে।
গাছের কোনটি আগা কোনটি গোড়া, জানা বড়ো দায় হইয়াছে ॥
ওই যে গাছের মূল শিকড় কাটা, কি সন্ধানে ধরে ফল ফলের নাই বোঁটা।
কত ভূত পিশাচ আর ব্রহ্মদৈত্য, ওই গাছে আশ্রয় নিয়েছে ॥
তাতে একটি পাখির বাসা রয়, কও শুনি তার কোন পাখাতে কোন দেবতা হয়।
পাখি ডিম পাড়ে বা কেমন সময়, কি খাইয়া তার জীবন বাঁচে ॥
দীন শরৎ বলে গাছের কয়টি ডাল, কোন ডালে কে বসত করে বলো হে দয়াল।
গাছে কয়টি পদ্ম ফুটে আছে, কোন পদ্মে বা কে রয়েছে ॥
৬৪
বলে না ছিলেন গো প্যারী পিরিতি করিস না।
পিরিতি বিষম জ্বালা প্রাণে তো বাঁচবে না ॥
সাধ করে প্রাণ সঁপে দিয়ে ঘটলো বিড়ম্বনা।
হিয়ার মাংস কেটে দিলে, পর কি হয় আপনা
বনে থাকে ধেনু রাখে, শ্যাম কালিয়া সোনা।
অবলা রমণীর মরম, রাখালে জানে না ॥
কত না বুঝাইয়া ছিলাম, শুনেও তো শুনলে না।
এখন নয়নের জল হলো সম্বল, সার হলো ভাবনা ॥
দীন শরৎ বলে প্রেম করিলে, পাইতে হয় যাতনা।
তাই ভাবিয়া প্রেম করে না, আছে বা কয়জনা ॥
৬৫
বলো রে ভাই শ্রীদাম সখা, ব্রজের কথা বলো।
তোমার কথা শুনে এতদিনে, তাপিত অঙ্গ হইল শীতল ॥
রাধার প্রেমঋণ শোধিবার তরে, এসেছি ভাই নদে পুরে।
আমি সব ছেড়ে ডোর কৌপিন পরে, রাধা নাম করেছি সম্বল ॥
সাধের ব্রজলীলা করে সাঙ্গ, রাই রূপে ঢেকেছি অঙ্গ।
পেয়ে কয়জন ভক্ত সঙ্গ, রাধা নামে কাঁদছি কেবল ॥
যখন তোদের কথা পড়ে মনে, ধারা বয় ভাই দুই নয়নে।
যখন ধেনু চড়াইতাম বৃন্দাবনে, খাওয়াতে ভাই কত মিষ্টিফল ॥
দীন শরৎ বলে ভক্তজনে, কাঁদাও গৌর নিশিদিনে।
তোমায় পায় না কেহ কাঁদা বিনে, কাঁদায় কাঁদা হয় গো নিৰ্মল ॥
৬৬
বানাইয়া রঙমহল ঘর, ওই ঘরে আছে তোর ঘরের কারিগর।
ও তার হাড়ে থুনি চামড়ার ছাউনি মজবুত গাঁথুনী কি সুন্দর ॥
ঘরে আট কুঠরি নয় দরজা হয়, আঠারো মোকামে মানুষ আঠারো জন রয়।
রবি শশী দুইটি বাতি, জ্বলছে ঘরে নিরন্তর ॥
দ্বারে দ্বারে আছে প্রহরী, আদালত ফৌজদারী কোর্ট সদর কাছারী।
প্রধান কর্মচারী জ্ঞান চৌধুরী, বিচারের ভার তার উপর ॥
বায়ু ভরে ঘরখানি খাড়া, আসে যায় তোর ঘরের মানুষ যায় না রে ধরা।
সে তো ভিতরে বাহিরে ফিরে, মন্ত্র বলে দুই অক্ষর ॥
দীন শরৎ বলে শুনো রে আমার মন, দ্বারে কপাট দিয়া ঘরে করো অন্বেষণ।
যদি ধরতে পারো সেই মহাজন, অমরত্ব হবে তোর ॥
৬৭
বাসনা তাই জানিতে, কৃষ্ণ কেন প্রাণ ত্যাজ়িলেন ব্যাধের শরেতে।
যিনি জগৎ জীবন মধুসূদন শমন পালায় নামেতে ॥
পূর্ব জন্মে কে ছিল এই ব্যাধ, করেছিলেন ভগবান কি অপরাধ।
ঘটলো কেন এতই প্রমাদ, পারি না তাই বুঝিতে ॥
যদু বংশ ছাপ্পান্ন কোটি, কি কারণে ধ্বংস হলেন জানতে চাই খাঁটি।
ভগবানের একটি পুত্র ছিল না জগতে ॥
ষোল হাজার অষ্ট রমণী, বিবাহ করিলেন কৃষ্ণ আপনি।
দীন শরৎ বলে সেই রমণী, রেখে গেলেন কার হাতে ॥
৬৮
বিধির বিধি হন যেজন, বৃন্দাবনে ধেনু রাখেন ব্রজেন্দ্রনন্দন।
উচ্ছিষ্ট খায় খাওয়ায় তারে, শ্রীদামাদি রাখালগণ ॥
কৃষ্ণ চড়েন রাখালের কাঁধে, রাখাল চড়ে কৃষ্ণের কাঁধে খেলে আমোদে।
দেখে ব্রহ্মা মনের ক্রোধে, গো ধেনু করলেন হরণ ॥
অন্তর্যামী ত্রিভঙ্গ কানাই, আপনি সৃজিয়া নিলেন নব লক্ষ গাই।
নিত্য নিত্য কানাই বলাই, বাথানে চড়ায় গোধন ॥
দেখে ব্রহ্মা হইলেন বিষ্ময়, যে ধেনু হরিলেন তিনি ব্রহ্মলোকেই রয়।
অমনি এসে করে বিনয়, ধরলেন কৃষ্ণের শ্রীচরণ ॥
বলরাম দিলেন অভিশাপ, যবন হইয়া ভুঞ্জ গিয়া গো হরণের পাপ।
দীন শরৎ বলে এই মনস্তাপ, পাইলেন ব্রহ্মা সে কারণ ॥
৬৯
বিনা দোষে মাকে ছেড়ে প্ৰভু নাহি যায়।
কৌশলার অভিশাপে, কর্মমত ফল পায় ॥
ত্রেতাযুগে দশরথে, রামকে চাইলেন রাজ্য দিতে।
কৈকেয়ী পাষণ্ড তাতে, শ্রীরামকে বনে পাঠায় ॥
জানকী লক্ষণ সনে, চৌদ্দ বৎসর রইলেন বনে।
কৌশলা সুমিত্রার মনে, পুত্রশোকে কষ্ট পায় ॥
কৈকেয়ী হইলেন শচীরানী, নিমাই চাঁদ রাম গুণমণি।
যেমন কর্ম করেন যিনি, কর্মফল ছাড়ানি দায় ॥
দীন শরৎ বলে তারে, বেঁধে কেউ রাখিতে নারে।
ওই যে টান পড়েছে ভক্তিডোরে, যার জন্য এলেন ধরায় ॥
৭০
বিষ্ণুপ্রিয়া ছিলেন সীতা ত্রেতা যুগেতে।
রাম লক্ষণ আর সীতা ছিলেন, পঞ্চবটি বনেতে ॥
মায়ামৃগ মারী ছেড়ে, রাম যখন বধিলেন শরে।
মরণকালে লক্ষণেরে ডাকে রামের স্বরেতে ॥
লক্ষণ দিয়ে রামকুণ্ডলী, রামের কাছে গেলেন চলি।
বক্ষে নিয়ে ভিক্ষার ঝুলি, রাবণ এল দ্বারেতে
রামের গণ্ডি লংঘন করে, ভিক্ষা দিলেন রাবণে রে।
তাতে রাবণ নিলো হরে, সীতারে সেই লংকাতে ॥
সে দোষে বিষ্ণুপ্রিয়ারে, মহাপ্রভু গেলেন ছেড়ে।
দীন শরৎ বলে বুঝতে পারে, তার খেলা কে জগতে ॥
৭১
বৃন্দাবনে ছিল যারা, কানাই আর বলাই।
নৈদে উদয় হইলেন এসে দুটি ভাই গৌর নিতাই ॥
ব্রজাঙ্গনা যত ছিলেন, সকলই নদীয়ায় এলেন।
রাধা গদাধর হইলেন, সখিরা অষ্ট গোঁসাই ॥
ব্রহ্মা হইলেন হরিদাস, নারদ মুনি শ্রীনিবাস।
অদ্বৈত হইলেন কৃত্তিবাস, যে আনিলেন দুইটি ভাই ॥
প্রেমঋণ শোধবার তরে, জন্ম নিলেন শচীর ঘরে।
বিষ্ণুপ্রিয়া প্রেয়সীরে ছেড়ে চলে যায় নিমাই ॥
দীন শরৎ বলে শ্রীচৈতন্য, নবদ্বীপে অবতীর্ণ।
ধন্য কলির যুগ ধন্য, এমন দয়াল নাই ॥
৭২
ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবে করে সৃজন পালন লয়।
তিন হইতে হয় এ ব্রহ্মাণ্ড একে তিনে ভিন্ন নয় ॥
ব্রহ্ম উপাসক কত কেহ বা হয় ভাগবত।
শৈব শাক্ত গাণপত্য ভিন্ন ভিন্ন মত রয় ॥
যে যাকে ভজনা করে সেই তো মুক্তি দিতে পারে।
ছোটো-বড়ো বলব কারে এক ভিন্ন দ্বিতীয় নয় ॥
নিরাকার যে জন হইয়াছে তার কিরে মন ভজন আছে।
সাকার মূর্তি ধরিয়াছে পূর্ণ ব্ৰহ্ম জ্যোতির্ময় ॥
দীন শরৎ বলে তত্ত্ব জেনে সাধ্য বস্তু লও রে চিনে।
যারে সদায় ভাবে তিনে প্রতি ঘটে সেজন রয় ॥
৭৩
ভক্তাধীন সে ভগবান নিজে ছোটো হয়ে বাড়ায় ভক্তের সম্মান।
গুরু বিনে নাই রে গতি, জীবকে দেখায় তার প্রমাণ ॥
সত্য যুগে সনক ঋষি যেই, ত্রেতাতে বিশ্বামিত্র রামের গুরু সেই।
দ্বাপরেতে গর্গ মুনি কৃষ্ণ নাম রাখিয়া যান ॥
কলিতে কেশব ভারতী, শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম দেন মহামতি।
যুগে যুগে গুরুপতি, ভক্তি প্রভুর এক সমান ॥
শ্রীবাস হইলেন নারদ মুনিবর, সত্যভামার দানের কথা খ্যাত চরাচর।
তুলসী পাতায় লিখে সে নাম, নারদেরে করলেন দান ॥
দীন শরৎ বলে ভবারাধ্য ধন, শ্রীবাস রেখেছিলেন করিয়া যতন।
গৌরা এখন হতে নিয়ে সে ধন, জীবকে করেন পরিত্রাণ ॥
৭৩
ভক্তের বাঞ্ছা পুরাইতে গোলোক হতে গোলোকের নাথ এলেন ধরাতে।
এগো কৌশলে কেউ পায় না তারে, পাইলে হয় গো কাঁদিতে ॥
ওই যে নন্দ যশোদা রাণী,
পূর্ব জন্মে ছিল তারা ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী।
নাম ছিল ধরাদ্রোণ, কাল কাটাতেন দুঃখেতে ॥
একদিন অতিথ রূপে আইলেন নারায়ণ,
ব্রাহ্মণীকে বলে শীঘ্র করাও গো ভোজন।
ভিক্ষাতে গিয়েছেন ব্রাহ্মণ, কিছু নাই তার ঘরেতে ॥
ব্রাহ্মণী হাটে গেলেন ডাইল-চাউলের কারণ,
মুদি বলে দিতে পারি বান্ধা দিলে স্তন।
আপন স্তন কাটিয়া বান্ধা দিয়া, সেবা করায় অতিথে ॥
অতিথি রেগে বলে ওগো ব্রাহ্মণী
অস্পৃহ্য হইয়া করো সেবার বিধানী।
ব্যর্থ হইল তোমার সেবা, পারলাম না ভোজ করিতে ॥
ব্রাহ্মণী কাতরে কয় ওগো মহাজন,
হাটে গিয়াছিলাম আমি ডাউল-চাউলের কারণ।
অস্পৃশ্য তো নয় গো আমি, রক্ত ঝরে বুকেতে ॥
অর্ন্তযামী অন্তরে জেনে,
তুষ্ট হয়ে দিলেন বর সন্তুষ্ট মনে।
অধীন শরৎ বলে সে কারণে, পুত্র পাইলা ভবেতে ॥
৭৫
ভাবছ কি মন চিরজীবন এ সুখে যাবে।
মন তোর বাবুয়ানা ঠিক রবে না, একদিন ছেঁড়া তেনা পরতে হবে ॥
মন রে সিন্ধুক ভরা টাকা মোহর, দালান কোঠা ঢেউ টিনের ঘর।
বিষয়-সম্পদ কই রবে তোর, যেদিন নদীর কূলে যাবে ॥
মন রে তুমি ছোটো আমি বড়ো, লোকের কাছে গৌরব করো।
যমের হাতে পড়বে যেদিন, জাঁক মারিয়া আর কি রবে ॥
মন রে নানা রঙে পোশাক পরি, সিঁথি পাটি আয়না ধরি।
কই রবে তোর বাবুগিরি, যেদিন মুখে আগুন দিবে ॥
দীন শরৎ বলে এসব ছাড়ি, মালা তিলক বেশ করি।
সদা মুখে বলো হরি, নাম শুনে শমন পালাবে ॥
৭৬
ভুলতে পারি না সে রূপ সদা জাগে মনে।
আমার বন্ধু বিনে আর কে আছে জীবনে মরণে ॥
অবিরত জ্বলছে হিয়া বিরহ আগুনে।
কান্ত বিনে হয় না শান্ত দহে নিশিদিনে ॥
আমার সার হয়েছে এই ভাবনা শয়নে স্বপনে।
আমার মন ভুলে না আমি তারে ভুলিব কেমনে ॥
মনে হয় উড়িয়া যাইতাম প্রাণবন্ধু যেখানে।
আমার পোড়া হৃদয় জুড়াইতাম মিলে তার সনে ॥
দীন শরৎ বলে না ভজিলে আকুল পরাণে।
সাধনের ধন চিন্তামণি মিলে যে কেমনে ।।
৭৭
মনচোরা পড়ল ধরা কুমতির ঘরে।
সুমতির দরখাস্ত নিলেন জ্ঞান পুলিশ ইন্সপেক্টারে ॥
পুলিশ চালান মামলা হবে, থানা হইতে রিপোর্ট যাবে।
তোর সঙ্গী ছয়টার সাক্ষী নিবে, কর্ম সেকেন্ড অফিসারে ॥
আইন মতো অপরাধী হলে, যাইতে হবে দায়রায় চলে।
তখন বিচার করবেন নথি কই রে, শমন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্টারে ॥
দীন শরৎ বলে মন বিবাদী, অব্যাহতি পাবে যদি।
দেও না আপোষনামা শীঘ্র করি, বাধ্য করে সুমতিরে ॥
৭৮
মন তোর দেহ বাংলার জমিদারি যাবে রে খাসে।
ও তোর সেক্রেটারি কাম চৌধুরী কোর্ট ওয়ার্ডে নিতে চায় সে ॥
লাটের কিস্তি খেলাপ হয়ে গেল ঐ নিলামের নোটিশ এল।
মন তোর স্থাপ্যধন চোরে নিলে নিলাম রদই করবে কিসে ॥
ঐ যে সদর কর্মচারী ছয়জনে চালাকি করি।
স্টেইটের জমা হতে খরচ ভারি দেখায় তারা মাসে মাসে ॥
আবার দেখছি কত ঋণও আছে মহাজন নালিশ করেছে।
মন রে তুই থেকে কুমতির কাছে সব খোয়ালে সর্বনেশে ॥
দীন শরৎ বলে মন চৌধুরী ছয়জনাকে বরখাস্ত করি।
করে জ্ঞানবাবুকে সেক্রেটারি কিস্তি বন্দী করো গে শেষে ॥
৭৯
মন তোর দেহরাজ্যের কাউন্সিলে কে হইল মেম্বার।
ছিল সুমতি কুমতি দুইজন ভোটের জন্য প্রচার এবার ॥
ভক্তি শ্রদ্ধা জ্ঞান তিনজনে সুমতির পক্ষেতে টানে।
কত বুঝাইল জনে জনে কেউ তো কথা শুনল না তার ॥
দেহে দশটি জিলা চৌদ্দ পরগনা ভ্রমিয়া আঠারো থানা।
সবকে বাধ্য করল এই ছয়জনা কুমতির হয়ে ক্যানভাসার ॥
মন তোর মন্ত্রীসভার সভ্য যত কেউ নয় তোর অনুগত।
কুমতির মন্ত্রণামতো প্রজার উপর অত্যাচার ॥
দীন শরৎ বলে ভাগ্য ফলে দেহ রাজ্য পেয়েছিলে।
মন্ত্রীর দোষে সব হারাইলে এ রাজত্ব রবে না আর ।।
৮০
মন তুই ধরবে যদি তারে
আগে যেয়ে মহাশক্তির চেতন করো মূলাধারে
মূলাধার রক্তবর্ণ, তাতে রয় চারিটি বর্ণ।
ব হইতে স পর্যন্ত চারিটি অক্ষরে ॥
মায়া ডাকিনী শক্তি, সে পদ্মে বাস করে।
সাড়ে তিন প্যাচেতে আছে, কুণ্ডলিনী শিবে ঘিরে ॥
ভুজঙ্গিনী রূপ ধরি, আছেন সেই যোগেশ্বরী।
ভক্তিযোগ সাধন করি, জাগাইয়া নিও তারে ॥
একাক্ষর মহামন্ত্রের, তিনটি বর্ণ ধরে।
চারি ষোল আট দ্বিগুণ করে, উঠাও নিয়া সহস্রারে ॥
পরম শিব পরমাত্মা, ব্রহ্মাণ্ড যাহার সত্তা।
জীব শিব জীবাত্মা, ভিন্ন মূর্তি ধরে ॥
দীন শরৎ বলে, জীবে শিবে এক হইলে পরে।
ভবের বন্ধন হয় রে ছেদন, অনায়াসে যায় রে তরে ।।
৮১
মন তুই মরার মতো মরা যদি মরতে রে একবার।
তোর আসা-যাওয়া জন্ম-মরণ হইতো নারে আর ॥
কত লক্ষ যোনী জন্ম ধরে, কতবার এসেছে মরে।
ও তোর মরণ বারণ হলো না রে, আসা-যাওয়া সার ॥
পশু পক্ষী যক্ষ রক্ষ, মরে মানুষ লক্ষ লক্ষ।
মরে যদি পায় রে মোক্ষ, আসল মরণ তার ॥
ওই যে শব রূপেতে শিব রয়েছে, মরে মরণ জয় করেছে।
মরার কিরে মরণ আছো, প্রমাণ দেখো তার ॥
দীন শরৎ বলে দিন ফুরাল, আবার বুঝি মরণ এল।
হায় রে জন্ম মরণ কত ছিল, কপালে আমার ॥
৮২
মন তোর মায়ের বিয়া দেখতে যদি বাসনা থাকে।
আগে যেয়ে মূলাধারে জাগাও মাকে ।।
করে রেচক পূরক দুই বেয়ারা, প্রাণারাম পালকিতে চড়া।
প্রণব দোলে দাও রে সাড়া জাঁক জমকে ॥
কুম্ভক বাসরশয্যা ঘরে আছেন সীতা সহস্রারে।
মাকে উঠাইয়া নাও তথাকার লগ্ন দেখে ॥
বর কন্যাদাতা বিবেকে রে পুরোহিত করো জ্ঞান ঠাকুরে।
ভক্তিরত্ন অহংকারে সাজাও তাকে ॥
দীন শরৎ বলে কন্যা বরে মিলন হলে সহস্রারে।
মন তোর ত্রিতাপ জ্বালা রবে না রে সে বিয়া দেখে ॥
৮৩
মন রে সেই দেশের কথা এখন ভুলে গিয়েছ।
উর্ধ্বপদে অধমুণ্ডে সেই দেশে বাস করেছ ॥
সেই দেশে বিন্দু রূপে পিতার মস্তকে ছিলে,
কাম রসে গর্ভবাসে প্রবেশ করিলে
রজ শুক্রের মিলন হয়ে তুমি স্থূলাকার ধরিয়াছ ॥
ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোমেতে হলো
পঞ্চমাসে পঞ্চপ্রাণ ভৌতিক দেহেতে
সপ্তম মাসে গুরুর কাছে মহামন্ত্র লাভ করেছ ॥
চন্দ্র সূর্যের নাহিক প্রকাশ, জলের নিচে অন্ধকারে ছিলে দশমাস
ছিলে নাভিপদ্মে মাতৃনাড়ী, তাই দিয়ে আহার করেছ ॥
দীন শরৎ বলে সাধনার ফলে, অন্ধকার কারাগার হতে এ দেশে এলে
তুমি মিছে মায়ায় ভুলে রইলে, যাবার উপায় কি করেছ ॥
৮৪
মহাবিষ্ণুর অংশে হইলেন ব্রহ্মা বিষ্ণু পঞ্চানন।
কোন শক্তিতে কোন গুণেতে, কে করেন সৃজন পালন ॥
সসাগরা বসুন্ধরা কোন পুরুষের হাতে গড়া।
জলের উপর এই যে ধরা কেমনে হইল স্থাপন ॥
সৃষ্টিতত্ত্ব জানব বলে এই বাসনা হৃদকমলে।
গুরু আমায় বলো খোলে আদি অন্ত বিবরণ ॥
দীন শরৎ বলে হইলাম ভ্রান্ত বেদ-বেদান্ত না পাই অন্ত।
দূর হইতে হয় দুরন্ত, অচিন্ত সাধনের ধন ।।
৮৫
মানুষ হইতে কয়জন পারে।
কেবল মানুষ কূলে জন্ম নিলে, মানুষ বলে কই না তারে ॥
যত সব পশুপাখি, ভূত পিশাচ নাই রে বাকি ।
কালেতে কতই দেখি মানুষ জন্ম ধরে ॥
লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে, মানুষ হয় তার পরে।
মানুষ পশু যায় রে চিনা, স্বভাব কর্ম অনুসারে ॥
মানুষের আহার ভিন্ন, কার্যেতে পাবে চিহ্ন।
সকলের অগ্রগণ্য নীতি সদাচারে ॥
দেব দ্বিজ গুরুভক্তি, জীবে দয়া করে।
পঞ্চরসে যেজন মাখা, শুদ্ধ মানুষ বলি তারে ॥
ভেবে দীন শরৎ বলে, মানুষে মানুষে মিলে।
মানুষের দয়া হইলে, কত মানুষ তরে ॥
একটি মানুষ এসেছিল, নদে শান্তিপুরে
কত মানুষ তরে গেল, সেই মানুষের নামের গুণে ॥
৮৬
মিছে গৌরব করো মন কি ধন লইয়া।
দেহ তোর ভোজের বাজী, মিছে মায়া মোহে মজিয়া
কেবল আমার আমার করো না বুঝিয়া ॥
করো কত বাবুয়ানা, খাট-পালংকে সুন্দর বিছানা
হাসি খুশি প্রাণপ্রেয়সী লইয়া।
মন রে যখন যমে বেঁধে নিবে, প্রেয়সীর প্রেম কোথায় রবে,
তারে জন্মের মতো যাবে রে ছাড়িয়া ॥
যে দেহের গৌরব করি, প্রাণ গেলে ওই দেহ ছাড়ি,
নিবে না কেউ কানাকড়ি দিয়া।
শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাবে, জ্ঞাতি বন্ধু সবে মিলে রে,
পুড়বে তোর মুখে আগুন দিয়া ॥
দারা সুত ঘৃণা করে, স্নান করিয়া যাবে ঘরে
শুদ্ধ হবে গোবর ছড়া দিয়া।
হবে দীন শরতের শেষ বিছানা, নোংরা পাটি ছেঁড়া নেকরা রে
শুধু মাটির ঘড়া রবে রে পড়িয়া ॥
৮৭
যিনি অখণ্ডমণ্ডলাকার, গুরু রূপে ভগবান আপনি সাকার।
দেহের গুরু পরমাত্মা, জীবাত্মা হয় শিষ্য তার ॥
গু শব্দের অনেক অর্থ হয়, গুরুতত্ত্ব মতে তারে আধার বলে কয়।
রু কারে হয় জ্ঞানের উদয়, নাশ করে সে অন্ধকার ॥
সন্ধ্যা যিনি গায়ত্রী তিনি, তিন সন্ধ্যায় ত্রিগুণধারিনী।
মূল তত্ত্ব না জানেন যিনি, সন্ধ্যা পূজা হয় না তার ॥
প্রভাত সময়ে ব্রহ্মশক্তি কয়, মধ্যাহ্নেতে শ্যামবর্ণা চতুর্বাহু হয়।
সায়াহ্নে বরদা দেবী, শিবশক্তি চমৎকার
দীন শরৎ বলে পরম তত্ত্বজ্ঞান, পাবে যদি করো গিয়ে সৎগুরু সন্ধান।
ধ্যানের গুরু হয় বর্তমান, তত্ত্ব জানা আছে যার ॥
৮৮
রমণীর মরম দুঃখ জানে কি পুরুষে।
বনফুলের ভ্রমরের মতো, উড়ে যায় আর আসে ॥
দিনমণি কমলিনী উভয়ে ভালোবাসে।
জল শুকাইলে দিনমণি কমলে বিনাশে ॥
জলের সঙ্গে মাছের পিরিতি, জলে ডোবে আর ভাসে।
ডোবে যদি ভাসতে না রে, জলেই জীবন নাশে ॥
কালার প্রেমসিন্ধু নীরে, ফিরিলে না ভেসে।
ডুব দিয়া মরিলে প্রাণে আপন কর্মদোষে ॥
দীন শরৎ বলে কমলিনী আমায় রেখো চরণ পাশে।
শ্যাম বিচ্ছেদে মরো যদি, সঙ্গে নিও দাসে ॥
৮৯
রাজস অহংকারেতে, এ দেহ উৎপত্তি হলো রজঃগুণেতে।
হলো দশ ইন্দ্রিয় দশ দেবতা, সাত্ত্বিক অহংকার হতে ॥
তমঃ গুণে সৃষ্টি করে লয়, তামস অহংকার হতে পঞ্চতত্ত্ব হয়।
মনবুদ্ধি অহংকার হয়, সকল গুণের ক্রিয়াতে ॥
মিশে ক্ষিতি জলে অনলেতে জল, আকাশে গ্রাসিবে বায়ু বায়ুতে অনল।
মনে আকাশ করিবে গ্রাস, বুদ্ধি অহংকারেতে ॥
তখন জীবের ঘটেরে মরণ, স্কুলের বিধি মতে করে পিণ্ড সমর্পণ।
তাতে প্রেতাত্মার হয় স্বর্গারোহণ, শমন রাজার পুরীতে ॥
দীন শরৎ বলে এসব কিছু নয়, এমন স্বর্গের কাজ কি যদি ফিরে আসতে হয়।
পরমাত্মায় না হইলে লয়, মুক্তি হয় তার কি মতে ॥
৯০
শিব শক্তির সাধনতত্ত্ব জানলে না রে মন।
তরবে যদি ভবনদী, শক্তিকে করো সাধন ॥
ভুজঙ্গিনী রূপ ধরে, আছেন শক্তি মূলাধারে।
সাড়ে তিন পেঁচেতে ঘিরে, করে মহানিদ্রায় অচেতন ॥
শিঙ্গা ডম্বুর নিয়ে করে, আছেন শিব সহস্রারে।
শিব শক্তির মিলন করে, পুরাও মনের আকিঞ্চন ॥
ভেবে দীন শরৎ বলে, শিবই সত্য ভূমণ্ডলে।
বিনাশ নাই যার প্রলয়কালে, সেই তো বিশ্বের মূল কারণ ॥
৯১
শুধু মন্ত্রদাতা গুরু নয়, বিনা উপদেশে মন্ত্ৰ সিদ্ধ নাহি হয়।
তুমি কোন সাহসে গুরু বলে, সভায় দিলে পরিচয় ॥
অন্ধে যেমন আরেক অন্ধেরে, পথ দেখাতে গিয়ে শেষে কূপেতে পড়ে।
তুমি অজ্ঞান হয়ে অজ্ঞানেরে, বুঝাতে চাও কোন বিষয় ॥
গুরু শব্দের অর্থ হয় জ্ঞান, পরম তত্ত্ব না জানলে সে পশুর সমান।
লোকসমাজে পায় অপমান, শিষ্যের কাছে পরাজয় ॥
কেবল অর্থ লাভে মন্ত্ৰ বেচি খাও, অঙ্গভঙ্গী করি শুধু লোকেরে ভুলাও।
নিজেও ডুব পরকেও ডুবাও, শেষে কালে যাও যমালয় ॥
দীন শরৎ বলে না করিও রোষ, শাস্ত্র মতো কথা বলি আমার কিবা দোষ।
গুরুজন শুদ্ধ পুরুষ, শুদ্ধ মানুষ সদাশয় ॥
৯২
শুধু মুখের কথায় হবে না, ব্রজগোপীর ভাব না হলে সে ধন মিলে না।
ছাড়তে হয়রে হিংসা নিন্দা, বাসনা আর কামনা ॥
সাধকের দেশ হয় রে বৃন্দাবন, কাল হলো দ্বাপর কলি পাত্র শ্রীনন্দের নন্দন।
আশ্রয় হইল সখীর চরণ, আলম্বন আর ভাবনা ॥
পূর্বরাগ যে হয়রে উদ্দীপন, পঞ্চবিধা ভক্তি হয় জেনে লও কারণ।
সামঞ্জস্য রতি যাহা, সাধিলেন ব্রজাঙ্গনা ॥
পঞ্চরসে হয় রে বিভোর, শান্ত দাস্য সখ্য আর বাৎসল্য মধুর।
দীন শরৎ বলে তা না হলে, হবে কিসে সাধনা ॥
৯৩
শৈব শাক্ত গাণপত্য, মতের অন্ত নাই।
শিব শক্তির ভজনের কথা, তব মুখে শুনতে চাই ॥
কে বা শিব কে বা শক্তি, শিব শক্তির কি আকৃতি।
কোন দলে হয় কার বসতি, কেমনে তাহারে পাই ॥
গুরু তব মুখে শুনি, প্রতি ঘটে আছেন তিনি।
এই যে আমার দেহখানি, শিব শক্তি ছাড়া নাই ॥
বেদে বলে শিবই সত্য, জানলাম না সেই পরম তত্ত্ব।
শিব শক্তির কি মাহাত্ম্য, কও শুনি হে দয়াল গোসাই ॥
দীন শরৎ বলে এই বাসনা, লয়ের কর্তা হয় যে জনা।
ভবে জন্ম আর যেন হয় না, তার পদে লয় হয়ে যাই ॥
৯৪
শ্রীগুরুর চরণ মন তুই করগে রে ভজন।
দেশ কাল পাত্র না জানিলে, বিফলে রে তোর মানব জনম ॥
নবদ্বীপ হয় প্রবর্তকের দেশ, কাল হয়েছে নিত্য কলি জেনে লও বিশেষ।
শ্ৰীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু পাত্র হলেন সেই মহাজন
শ্রীগুরু হলো সে দেশের আশ্রয়, প্রকৃতির ভাব কান্তি বিলাস তাতে রয়।
আলম্বন হয় বৈষ্ণব গোসাই, উদ্দীপন হরি সংকীর্তন ॥
নববিধা হয় রে ভক্তি, সাধারণে রতি হয় ভাগবতের উক্তি।
দীক্ষা শিক্ষা জীবের মুক্তি; নইলে কেহ পায় না সে ধন ॥
দীন শরৎ বলে সেই দেশে চলো, কলির জীব তরাতে গৌর নিতাই যে দেশে এল
জগাই-মাধাই যে তরাল, ধরো গে তাঁর যুগল চরণ ॥
৯৫
সখি গো প্ৰাণসখি, সখি বলিয়া দে আমারে গো
সখি বলিয়া দে আমারে ॥
শুইলে না আসে নিদ্রা, ভাসে নয়ন জলে।
দিবানিশি জ্বলছে অনল হিয়ারও মাঝারে গো সখি ॥
চিন্তা হইতে চিতা ভালো, চিতায় মরা মানুষ পোড়ে।
এগো জিয়ন্তে পুড়াইয়া মারে, চিন্তায় যারে ধরে গো সখি ॥
শরৎ বলে চিন্তা ছাড়া কেহই না সংসারে।
এগো চিন্তিলে যায় ভবচিন্তা, চিন্তায় যারে ধরে গো সখি ॥
৯৬
সত্ত্বঃ রজঃ তমঃ গুণে ব্রহ্মা বিষ্ণু হর।
আপন আপন বিষয় নিয়ে মত্ত আছে নিরন্তর ॥
সৃষ্টি করেন পদ্মযোনি পালন করেন চক্রপাণি।
শূল হাতে শূলপাণি সংহার করেন চরাচর ॥
কেবা জীবের মুক্তিদাতা বলো গুরু তত্ত্ব কথা।
কে হইয়াছেন মূল দেবতা কারে ভজে সুর নর।
বিষয়ী যে জন হইয়াছে হুকুম মতো কাজ করতেছে।
তিনের উপর আর কে আছে নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের ঈশ্বর ॥
দীন শরৎ বলে সেই মূলাধার সাকার কিংবা হয় নিরাকার।
গুরু বলো মোরে এই সারাসার তত্ত্ব কথার সদুত্তর ॥
৯৭
সাধে কি প্রেম করেছিলাম কালিয়ার সনে।
চিত্রপটে দেখে সে রূপ লাগলো নয়নে ॥
কালায় কিবা জানে যাদু বাঁশিতে ভরিয়া মধু।
অবলা ভুলাইল শুধু সে বাঁশির গানে ॥
যমুনার জল ভরতে গিয়ে, জলের ছায়ায় রূপ দেখিয়ে।
কলসি ছেড়ে রইলেন চেয়ে প্রাণবন্ধুর পানে ॥
দীন শরৎ বলে অমনি করে, কালায় যারে দৃষ্টি করে।
সে জনা জিয়ন্তে মরে, বাঁচে না প্রাণে ॥
৯৮
স্কুলের বিবরণ আগে জেনে লও রে মন।
স্কুলের মূলে ভুল হইলে, হবে কিসে সাধন ভজন ॥
জম্বু দ্বীপ হয় রে স্কুলের দেশ, কাল হইল অনিত্যকলি জেনে লও বিশেষ।
পাত্র হইলেন সৃষ্টিকর্তা, আশ্রয় পিতামাতার চরণ ॥
আলম্বন হয় বেদাদি ক্রিয়া, উদ্দীপন হয় পুরাণাদি শ্রবণ করা।
ভক্তি হয় চৌষট্টি অঙ্গ, অষ্টকর্ম হয় রে বারণ ॥
দীক্ষাগুরু স্কুলের মূলাধার, সন্ধ্যা গায়ত্রী পূজা নিত্য সদাচার।
দান, ধর্ম, আদি কৰ্ম ব্রত পুণ্য তীৰ্থ দৰ্শন ॥
দীন শরৎ বলে যে দেশে যাবে, স্থূল হইতে মূল বস্তু সঙ্গেতে নিবে।
প্রবর্তকে শিক্ষাগুরু, করে দিবেন মন্ত্র চেতন ॥
৯৯
স্নেহময়ী শচীরানী জননী তাঁহার।
ও তার বুকজোড়া ধন অন্ধের নয়ন, ছিল সে কলিজার সার ॥
গর্ভে তারে করে ধারণ, করেছিলেন প্রতিপালন।
নিমাই দিলেন না তার কিসের কারণ, একবিন্দু দুধের ধার ॥
নিমাই বলে উচ্চৈঃস্বরে, কাঁদেন রানী ধরায় পড়ে।
কেন ছেড়ে গেলেন জননীরে, এ কেমন তার ব্যবহার ॥
দয়া নাই যার মায়ের প্রতি, বুঝিবা তার কেমন রীতি।
কলির জীব আমরা অতি, হীনমতি পাপাচার ॥
দীন শরৎ বলে এত করে, মায়ে যারে রাখতে নারে।
বাৎসল্য ভাবের উপরে, এমন ভক্তি আছে কার ॥
১০০
স্বয়ং রাধা নন তিনি, ছায়া রাধা সীতা হলেন আয়ান গৃহিণী।
অযোনি সম্ভাবা রাধা বৃষভানু নন্দিনী ॥
যখন সীতা রয় অশোক বনে, রামের মূর্তি গড়েছিলেন সেবার কারণে।
সীতা উদ্ধার হয়ে যায় যখনে, দাঁড়াইল মূর্তিখানি ॥
সীতায় তারে দিলেন উপদেশ, তপস্যা করিয়া তুষ্ট করো হৃষীকেশ।
বিষ্ণু যদি করেন আদেশ, আমায় পাবেন আপনি ॥
সেই মূৰ্তি হইয়া সুতপা ব্রাহ্মণ, সাত জন্ম পর্যন্ত করে বিষ্ণু আরাধন।
ভক্ত জেনে তার আকিঞ্চন পুরাইল চক্রপাণি ॥
দীন শরৎ বলে গোলোকবাসীগণ, গোপকুলে জন্মিল সবে এসে বৃন্দাবন।
রাধাকৃষ্ণের অংশেতে হয় যত গোপ আর গোপিনী ॥
