বিজয় সরকারের গান

আমার পোষা পাখী উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে।।
খেলতো পাখী সোনালী খাঁচায়
বলতো কতো কি আমায়, বসে রূপালী আড়ায়
স্ফটিকের বাটী ভরে, কাবার দিতাম, থরে থরে
নিঠুর পাখী খেলতো আনমনে।।
জোংলা পাখী করলো সর্বনাশ।
এখন শুধু হাই হুতাস, কোথায় করি তার তালাস
কে এমন দরদী আছে, বলে দিবে আমার কাছে
পাখী এবার গেছে কোন বনে।।
আগে যদি জানতাম পাখীর মন
সে করবে এমন দিতাম না এ-মন।
বনের পাখী বনে গেলো, আমার বুকে দিয়ে বিষম শেল।
আর কি ফিরে পাবো জীবনে।।
পাখীর মায়ায় পড়ে কতো লোক
পেলো আমার মতো শোক, সদা জলভরা দুই চোখ
অসীম গগনের পাখী, তারে আপন বলে কেন ডাকি
পাগল বিজয় কান্দে বসে নির্জনে।।

তুমি জানো না, তুমি জানো নারে প্রিয় তুমি মোর জীবনের সাধনা
তোমায় প্রথম যেদিন জেনেছি, মনে আপন মেনেছি
তুমি বন্ধু আমার মন মানো না।।
তুমি চলে গেলে আমায় ফেলে
কি আগুন এ-বুকে জ্বেলে, একদিনও দেখিতে তুমি এলে না,
তোমায় পেলে মোর দুঃখের কুটীরে, দেখাইতাম বক্ষ চিরে
বুকের জ্বালা মুখে বলা চলে না।।
কাষ্ঠ যোগে দাবা নলে, জ্বালায় পোড়ায় বন জঙ্গল
মন পোড়ানো আগুন বন্ধু তাহা না,
কতো বিরহীন অন্তর তলে বিনা কাষ্ঠে আগুন জ্বালে
জলে গেলে জ্বলে একি যাতনা।।
আমি ঘুরি জনমে-জনমে, ক্ষিতি, অপ, তেজঃ মরুৎ ব্যোমে
খুঁজে ফিরিয়ে তোমারি ঠিকানা,
পাগল বিজয় বলে চিত্ত চোর আসবে কি জীবনে মোর
বুকে রইলো ব্যথা ভরা বাসনা।।

কি যেন কি দিলেরে আল্লা রাসূলের মাঝারে
জ্বলে নূরের বাতি সারা রাতি দুনিয়ার বাজারে।।
খোদার কালাম করে কবুল; সৃষ্টির বিশিষ্ট রসুল,
ফুটলো ধরার বুকে আলোর মুকুল, গভীর আঁধারে।।
তরাতে এই সারা জাহান, পৃষ্ঠ দিন সাতাশে রমজান,
যেদনি নাজিল হইলো পবিত্র কোরান শুভ সমাচারে।।
শুনায়ে তৌহিদের বাণী, নবী ডাকিছেন দিয়ে হাত ছানি
ছুটলো মরুতে বেহেস্তের পানি, অসীমের জোয়ারে।
পাগল বিজয় বলে রাসূল বিনা, কেন পুল সেরাতের কুল পাবি না
ওহে দ্বীনের নবী ভুলিওনা শেষ দিনে আমারে।।

ললিতা গো বন্ধু বিনা নাহি সদুপায়
পরাণ বন্ধু বিনা নাহি সদুপায়,
আমি কি করিতে কিনা করি, বাঁচি কিনা প্রাণে মরি
নিরুপায় যে হেরিনু পায় পায়।।
মাথার কেশ কেটে দিলাম সই
নয়ন বারি ঝারিতে ওই নিয়ে যাসই শ্যামের মথুরায়,
এই জলে তার পা ধোয়ায়ে, কেশ দিয়ে দিস মুছাইয়ে
যেন ব্যথা না পায় বন্ধুর কমল পায়।।
বলিস গিয়ে বন্ধুর কাছে
জল ছাড়ামীন কয়দিন বাঁচে, পরাণ আছে শুধু তার আশায়,
সব নিয়াছে কমল আঁখি ব্যথাটুকু আর কেন বাকি
যেন ব্যথাহারি করে তার উপায়।।
শ্রীমতির এই প্রেমের কাঁদন
শ্যামের বুকে লাগে বেদন সাধন ভজন লাগে না কোথায়,
বিজয়ের অন্তরের ভাবো, এমন দিন আর কবে পাবো
প্রাণ ছড়াবো শ্রীকৃষ্ণের উপায়।।

নকসী কাঁথার মাঠেরে সাজর ব্যথায়
আজো কান্দে রূপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশী,
তাদের আশার বাসা ভেঙ্গে গেলো রে
তবু যায়নি ভালোবাসা বাসি।।
কতো আশা বুকে নিয়ে বেঁধে ছিলো ঘর
মনের সুখে মিলে ছিলো মিলন মঞ্চের পর
হঠাৎ আসিয়ে এক বৈশাখী ঝড়রে
সেখর কোথায় নিয়ে গেলো ভাসি।।
সাজুর কবরের এক পাশে নক্সী কাঁথা গায়
রূপাই মিয়া শুয়ে আছে মরণের সজ্জায় –
তারা আছে চির নীরবতায়রে
* তাদের দুইটি হিয়া পাশাপাশি।।
অকরুণ দারুণ বিধি বিচার তোর কেমন
তোর বুঝি ভালোবাসার মানুষ নাই এমন-
তাইতো বুঝিস না তুই বিরহীন মনরে
কেন তাদের কান্নাহাসি।।
পল্লীকবি জসীমউদ্দিন বেদনায় ছায়ায়
নকসী কাঁথা লিখে গেছে মনেরি মায়ায়-
ভাবুক কবিগণ আনে কল্পনায়রে
যতো সত্য লোকের তত্ত্বরাশি।
নক্সী কাঁথার মাঠে লোকে আজো শুনতে পায়
সাজুর ব্যথায় রূপাই মিয়া বাঁশরী বাজায়-
পাগল বিজয় বলে পরাণে চায়রে
একবার গিয়ে শুনে আসি।।

তুমি আমার এ-জীবনে সকল হবে কবে, .
আমার চলন বলন স্মরণ মনন তোমার শরণ লবে।।
তুমি বিশ্বের পরিচালক, তুমি জীবনের প্রতিপালক
কৃপাসিন্দুর কৃপা বলে এক বিন্দু শিশিরের জনে
সু-শোভিত ফুলফলে বিপুল বৈভবে।।
যা কিছু পাই কর্ম করে, তোমার করে দিবো ধরে
তোমাকে করে ফল অর্পণ, নির্মল করবো চিত্ত দর্পণ
তোমার ছবির প্রতি ফলন হেরবো নীরবে।।
আপন বলে ভাবলেম যাদের, সন্ধ্যায় সন্ধান পাইনা তাদের
তুমি যে আত্মার আত্মীয়, তোমার করে আমায় নিয়ো
নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দিয়ো পদ পল্লবে।।
যাহা তোমার অপ্রীতিকর, তাহাই করলাম ইহ জীবন ভর
পাগল বিজয়ের করুণ আর্তনাদ ক্ষমীয় মম অপরাধ
আর যেন না ঘটে প্রমাদ মায়াময় ভরে।।

তোমার নামে নয়নে মোর অশ্রু ঝরে যেই
তুমি আছো দয়াল আমার বড়ো প্রমাণ সেই,
আমার জ্ঞান বিজ্ঞান আর যুক্তি প্রমাণ
কোনো কিছুর দরকার নেই।।
তুমি যখন দাঁড়াও আমার মনের দুয়ারে
হৃদয় আমার ভরে ওঠে মধুর জোয়ারে
আমার অন্তর ও বাহির দু’ধারে-
দেখি শুধু তোমাকেই।।
দাওনা ধরা যাও না দূরে আমাকে রেখে
লুকিয়ে লুকিয়ে হামো আড়ালে থেকে
দয়াল তোমার লীলা খেলা দেখে-
মন প্রাণের সাধ মিটেই।।
ঘুরিতে চাহিনা অসার সংসারের পিছু
তোমার চরণ তুলে মাথা রাখিবো নিচু
আছে আমার বলতে যাহা কিছু-
তোমাকে সব সঁপে দেই।।
কতো লোকের ভালোবাসা পেলাম জীবনে
জীবন তো জুড়ায় না দয়াল তোমা বিহনে
তোমার নাম লয়ে বসি বিজনে-
পাগল বিজয়ের বাসনা এই।।

শুধু পাষাণ নয় ঐ তাজমহলের পাথর,
এ যে প্রেমিকের পরাণের ছন্দ আনন্দের এক মিলন বাসর।
সৃষ্টির প্রাতের প্রথম সোপানে যে বিরহ মানুষের পরাণে
সেই বেদনার ব্যাকুলতানে পাষাণও আজ অশ্রু কাতর।।
কে যেন সান্ত্বনা দেয় কোন বিরহীরে
কঠিন পাষাণ বিগলিত বিরহনীরে
তাজমহলের মর্মরের ঐ পাশে, দুইটি হিয়ার মর্মের বাণী ভাসে
ছুটেছে আকাশ বাতাসে পাষাণ ফুলের গন্ধ আতর।।
দাম্পত্য জীবনের রাজ্যে বাদশাহ শাহজাহান
ভাবুক তুমি কবি তুমি প্রেমিক মহান
ছেড়ে বিষয় মরতের বৈভব, ভুলে যৌবন কৈশর ও শৈশব
জমায়েছে মহানীরব জীবন সঙ্গীতের আসর।।
এতো দিনে শুনে এসেছি কবিতা প্রবন্ধ
পাগল বিজয় বলে ঘুচলো আজি চক্ষু কর্ণের দ্বন্দ্ব
যে দেখেছে সে কি কভু ভোলে স্বপনপুরের গোপন দুয়ার খোলে
উচ্ছল তরঙ্গ দোলে বিরহীর হৃদয় সাগর।।

কোনবা বিধির শাপেরে আমার পরাণের মানুষ হারাইয়া গেছে,
না জানি কোন কম দোষেরে আমার মরমে দাগ দিয়াছেরে।।
শুকিয়ে গেছে যে লতাটি উঠতেছিলো বেড়ে
এ জীবনের সুখ শান্তিরে আমার সব গিয়াছে ছেড়ে।
যাছিলো মোর ঝুলি ঝেড়েরে-ও সে সব নিয়াছে কেড়েরে।।
যে-তারাটি হারাইয়া যায় অসীম গগনে
সময় মতো ফিরে আসে শুভ এক লগনে।
মানুষের যা হারাইয়া যায়রে-ফিরে পায় না কাছেরে।
অজানা এক বেদনায় মোর হৃদয়ে ওঠে ভরি
দেউলিয়া সাজাইয়া মোরে করলো দেশান্তরী।
পথ ভোলা ঐ জীবন তরীরে-
সে কোন গোলায় পড়ে আছেরে।।
পরীর মতো চেহারা তার পরিচয় হীন বেশে
হয়তো আবার দিবে দেখা অচেনা এক বেশে।
পাগল বিজয় বলে ভালোবেসেরে-
সে কেমনে ভুলে আছেরে।।

১০

তোমার একটি দিনের একটু পরশ আজো আমার বুকে দোলে
অতীতের সেই দিন গেছে হায় কোন সুদূর চলে-
তোমার স্মৃতির প্রদীপ মিষ্টি মিষ্টি জ্বলে।।
এমনি সেদিন বয়েছিলো মলয় সমীরণ,,
ছিলো চাঁদের হাসি ফুলের সুবাস বাঁশীর শিহরণ।
আমি আজো তাই হই নাই বিস্মরণ জাগে হৃদয় তলে।।
আমার ব্যথার সুর জাগানো জল ঝরানো আঁখি,
পিউ কাহা বলিয়া ডাকে মন হারানো পাখি।
তার মনের কথা জানায় নাকি বিচ্ছেদ ব্যথার ছলে
ও সে ভুলে যাওয়া দিনের ছবি এসে কতো কি যায় বলে।।
কলের জাহাজ কলে চলে পিছনে তার ঢেউ,
সমব্যথার ব্যথিত বিনে আর বোঝে না কেউ।
যে ব্যথায় ব্রজের কলবউ সংসারের মুগ্ধ ভোলে
হয়ে কৃষ্ণ হারা শান্ত মরা তারা ফিরিতো জঙ্গলে।।
বান্ধব বিনা শহর বন্দর বনের মতো লাগে,
মনের মানুষ হারাইলে কেন হেন জাগে।
এ-কথা বুঝি নাই আগে পূর্ব রাগের ছলে
পাগল বিজয় কান্দে মন হারায়ে নিজন বিরলে।।

১১

ও নবীন কিশোররে পরাণ কান্দে তোমার লাগিয়ারে-
আমাবতির কামাই পেয়ে আসিলে যে দিন,
অমাবশ্যায় পূণির্মা চাঁদরে আমি দেখেছি সেই দিনরে।।
পুকুর ঘাটে দেখে এলো টাকুর বাড়ির বুচি,
ঘোমটাতরে আঁচল দিয়েরে আমি চোখের বারি মুছিরে।।
একেতো আষাঢ়ে বাদল বেরোবার ফাঁক নাই,
ও তোর ভাটিয়ালী গানের সুরেরে আছাড় পাছাড় যাই ও রে।।
নিঠুর পুরুষ জাতিরে পরণে নাই টান,
শুকাইয়া হলো ধূলিরে কতো বাঁধা খিলি পানরে।।
পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন হাসি কান্নার ঘর
পাগলবিজয় বলে বেড়েছে তাইরে এতো প্রেম পীরিতের দররে।।

১২

তুমি জানো নারে বাঁশী গোপনে গোপনে তোমায় কত ভালোবাসী
আমি কতো লোকের আড়াল থেকেরে দেখি তোমার মুখের হাসি
সে দিন ফাগুন পূর্ণিমা সন্ধ্যায়, ডালে সুগন্ধ রজনী গন্ধায়
কাজের শেষে সাঁধের বেলা মনের সাথে করি খেলা-
ফুল বাগিচায় তুমি একা দেখা দিয়ো আসি।  
তোমায় আমার ভালো লাগে, তাকি তোমার মনে জাগে
তুমি দূরে দূরে থাকো যদি নিদয়া নিঠুর দরদী-
তোমার লাগি নিরবধি-অকুল নীরে ভাসি।।
আঁখির দৃষ্টি মন মাতানো, যেমন পাখী ধরা ফান্দ পাতানো
সে চাহনির বিলাস, রঙ্গে, আমার মন বিহঙ্গের অঙ্গে-
তুমি পরাইলে গোপন ছন্দে প্রেম পীরিতীর ফাঁসি।।
পাগল বিজয় বলে চপল ছন্দ, যেমন বিরহী মন নয়নান্দ
তুমি দূরে দূরে থাকো যতো, তবু সে মোর আপন কত-
আমি হবো কি আর তোমার মতো বিরহী উদাসী।।

১৩

নিঝুম রাতে বাঁশরী বাজাইয়া ওরে ভাটির নাইয়া
ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলি ভাইটাল সুরে-
আমি খোলা বাতায়ন পাশে বসে শুনি রাত দুপুরে।।
মুচড়ে পড়ে গাঙ্গের তুফান সুর সোহাগে দোলে
ব্যথা বুকে আঘাত ঠুকে আচড়ে পড়ে কূলে,
কান্দে মলয় পবন ফুলে ফুলে মলয় কাননপুরে।।
তর তর করে তরীখানি দূরে চলে যায়।
সুরের পরশ বুকে বুলায় মিঠেম ফুলের বায়,
তুমি কার লাগি চলেছ কোথায় সে দেশ কোন সুদূরে।।
পাখী জাগে ফুল জাগে খোঁজে হারা সাথী
চাঁদ জাগে ঐ নীলাকাশে ঘরে জাগে বাতি,
আমি তারা গুণি সারা রাতি-জাগি আঁখি ঝুরে।।
পাগল বিজয় বলে মরম ব্যথা শুনো পরাণ প্রিয়
সুর বিলাসীর অভিলাষ ঐ নৌকায় তুলে নিও,
তুমি এই পথে আবার আসিও এদেশ ফিরে ঘুরে।।

১৪

আমাকে নাম ধরিয়া ডাকলে কতো বঁধুয়া তবু ভাংগলো না ঘুম
করলে কতো আয়োজনের ধুম।।
আমাকে জাগাতে ঘুম থেকে, এসে বদ্ধদ্বার দেখে
ফিরে গিয়াছো ডেকে কবে মোর ভাংগবে ঘুম ঘোর,
আমার খুলবে এই আঁধার ঘরের দোর-
সম্মুখ কাল রজনী নিঝুম।।
আমার এ-শয়ন ঘরের দ্বার, জোরে ভেংগে গুণাধার
তুমি এলে কতো বার তবু তোমার দিকে ফিরে না চাহি-
কভু তোমার তো অভিমান নাহি অলস চোখে দিনে কতো চুম।।
হৃদয় কাননে কঁচি বৃক্ষের দল, শুকায় জল বিনে সকল
বুঝে দিলেম নাতো জল শুকনো সেফুল বাগিচাতে-
তুমি জল ঢালিয়া আপন হাতে মরাবাগে ধরালে কুসুম।।
ঘুম পড়ানো গান শুনালেম যার ঠাঁই, সেতো বিচানাতে নাই
আমি একা যে ঘুমাই ধুলা খেলা খেলে খেলে
ঘনালো গোধুলী বেলা চোখের সামনে নাচে চিতার ধুম।।

১৫

আমি কি ছিলাম কি হয়েছি তোরে ভালোবাসিয়া
রে পরবাসিয়া বড়ো ব্যথা রইলো পরাণে-
আপনারও পর ভুলেছি তোর গোপন আহ্বানে।।
পড়েছি তোর প্রেম ফাঁদে, প্রথম ফাগুনের চাঁদে
সে আগুনে পরাণ কান্দে- ধৈর্য না মানে।
তোর বাঁশের বাঁশী কি গুণ জানে, কি কথা কয় কানে কানে
মর পরাণ ধরে টানে।।
শয়নে স্বপনে শুধু, তোর লাগিয়া, কাঁদিরে বঁধু
কি মায়ায় করেছো যাদু- কেহ নাহি জানে।
আমার বুকের ব্যথা কেউ খোঁজে না শুধু সমাজে বাজহানে।।
এ হলো মোর কি যন্ত্রণা চোখ মুছিলে জল’ মোছে না,
মুখ দেখে দুঃখ কেউ বোঝে না-কি যন্ত্রণা প্রাণে।
কবে শূন্য বুক মোর পূর্ণ হবেরে তোর পুণ্য পরশ দানে।
ভাটির নদী কান্দে পাছে, মোড় ফিরানো চরের কাছে
বায়ু কান্দে ঝাউয়ের গাছে-উদাস করুণ তানে।
পাগল বিজয়ের মন কাঁদবে এমন অজানার সন্ধানে।।

১৬

কে তোরে সাজালোরে কুমুদিনী এমন সুন্দর করিয়া
কেন জল পরীর ন্যায় জলের পরে এই সাজ পরিয়া।।
চাঁদের আলো মাখানো ওই কাজল দীঘির জলে
সেই জলে স্নান করে এলি সোহাগে বিরলে
তাইতে রূপের মানিক জ্বলে-
এলি সরোবরের বিজন তলে কারে স্মরিয়া।।
ঘোমটা টানা বধূ ছিলি পাপড়ী ঘেরা মুখে।
পেয়ে মিলন মধুর লগ্ন এলি নগ্ন বুকে
চেয়ে পরাণ বধূকে-
মধুর চাঁদের হাসি আজ তোর বুকে পড়ে ঝরিয়া।।
ফুলের দেশের কালো ভ্রমর আলোর পাখা মেলি
দিন মানে মধুর তানে করে ফুল কেলি
তারে রাতে কই পেলি-
তোর মধুর বোঁটা, খুলে নিলি কারে বরিয়া।।
পাগল বিজয় কয় ঐ দূরাকাশে ঘোরে নিশাকর
কুমুদিনীর মিলন লাগি সাজলো নিশাচর
বাঁধলো গোপন ফুল বাসর-
কবে প্রাণ বন্ধু মোর গোপন অন্তর নিবে হরিয়া।।

১৭

তুমি আমার হও হে দলায় যদি আমি তোমার হই,
তুমি স্নেহে আমায় রাঁখো ঘিরে যখন আমার বাঁধা শিরে রই।।
যে গৃহে বাস করলেম আমি, চিনলেম না সেই গৃহ স্বামী,
করলেম কেবল আমি আমি, আমায় আমি চিনলেম কই।।
আমি তো চিনলেম না আমায়, চিন্ময় তাই চিনলেম না তোমায়,
আমি কোথায় আর তুমি কোথায়, কভু কি তার সন্ধান লই।।
জ্ঞানেন্দ্রীয় জ্ঞানের দ্বারায়, কর্মেন্দ্রীয় কর্মে চালায়,
ও তার মাঝখানে রয় মন মনুরায়, বোকার মতো আমি রই।।
পাগল বিজয় বলে এবার বাঁচাও, ইন্দ্রিয় গণকে কেন্দ্রে পাঠাও,
মনকে মনের মতো সাজাও, চলবো না আর তোমারই।।

১৮

ও মন মাঝিরে সাবধানে চলাইয়ো তরীখানি
মরণ সাগরের বুকে ঢেউয়ের কানাকানি।।
তুফান ভেঙ্গে ফিনকে ওঠে জল,
কল্ কল্ কল্ খল খল্ হাসে জল রাক্ষসীর দল।
সাধের তরী যেন যায় নারে তল উছলে ওঠে পানি।।
কূল হারা অকূল দরিয়ায় বোঝা যায় না, গোন্,
মরণ পারের ডাক এসেছে বসে বসে শোন।
হাঙ্গর কুমীর সেই সাগরের গায়,
মরা মানুষ ছোয় না তারা তাজা মানুষ খায়
তারা আহারে লাগি পাহারায় করে রাহাজানি।।
চোখ ধাঁধানো আঁধার রাতি সাথী নাইরে কেউ,
ঝড়ের ঘায়ে আচড়ে পড়ে পাহাড় ভাঙ্গা ঢেউ।
ঈশান কোণে ভীষণ মেঘ মালায়
ঝিলিক ঠাটা জিলিক মেরে ঝিলিমিলি খেলায়
পাগল বিজয় বলে পারের বেলায় দিয়ো আশার বাণী।

১৯

ও নিঠুর শ্রাবণরে তুই আবার কেন এলিরে এই দেশে,
তোর এক প্লাবনে পড়ে আমিরে আমি আজো বেড়াই ভেসে।।
গুরু গুরু ডাকে দেয়া, বদ্ধ হলো নেওয়া দেওয়া,
পারাপারে যায় না খেয়া- মেঘলা দিনের শেষে,
বলে কি কথা ওই ঝাউয়ের বনেরে ভজোপবণ এসে।।
মাতাল ছন্দে পূবালী বায়, শাখি শাখে পাখী দোলায়,
বাদল বাউল মাদল বাজায়-বেতাল পরিবেশে,
আমার ছন্দহারা পরাণ আজিরে ছোটে অজানা উদ্দেশে।।
বাদল নামে বনশীরে, বিহগ বিহগী নীড়ে
ভিজেছে শ্রাবণের নীরে- সোহাগ আবেশে,
যার মন ভালো তার বনও ভালোরে মনের মানুষ ভালোবেসে।।
মিশে গেছে দিকের রেখা, মুছে গেছে সীমার লেখা
আমি চেয়ে আছি একা-আঁখি অনিমেষে,
পাগল বিজয় বলে এমনি দিনেরে আমায় সাজালো দীনবেশে।।

২০

তুই তো ফিরে এলিরে নিঠুর একটি বছর পর
কেন ফিরায়ে দিলিরে যারে নিলি সাথে করে
রে আমার জীবন শূণ্য করে।।
বর্ষা মুখর শ্রাবণ রাতি, কেমনে কাটে বিনা সাথী
খালি ঘরে জ্বালি বাতি-জাগি নিশি ভরে,
যেন বিদ্যুৎ বাতি জ্বালিয়ে কে কারে তালাস করে
রে বুঝি এমনি দশায় পড়ে।।
মেঘের ফাঁকে বেগে ধাওয়া, বাদল ভেজা চাঁদের চাওয়া
পূবালী সেই জালো হাওয়া-এলো তেমনি করে,
কেন হারানো মন ফিরে না আর নয়ন আশারে
রে আমার বিরহ বাসরে।।
বউ কথা কও বলে পাখী কি বেদনায় ওঠে ডাকি
কথা সে বলেছে নাকি-যারে ডেকে মরে
আমার পরাণ পাখী ওঠে ডাকি ছোট আবেগ ভরে
রে এই শ্রাবণ বাদল ঝড়ে।।
মেঘ ঢাকা আকাশের বুকে, বাতাস বহে আঘাত ঠুকে
কে যেন কাঁদে কার দুঃখে-কাতর করুণ স্বরে
বিজয় কয় সেই করুণ কান্নায়রে শ্রাবণ বন্যা ঝরেরে
রে আমার মাটির দেওয়াল ঘরে।।

২১

প্রেমের যে সই এতো জ্বালা আগে তো জানিতাম না
জানলে এ প্রাণ বধূয়ারে মন পরাণ দিতাম না।
মন ভুলানো মোহনীয়া, কি যেন কি গেলো নিয়াগো
বিরহে মরি দহিয়া ঘরে নাই মোর সান্ত্বনা।।
সে যে ফুল বাসরে এসে আমার ভাঙ্গলো কাঁচা ঘুম,
চকিতে অসল চোখে মোর দিলো বিলাস চুম।
কসুম যেমন আলো লাগি, আবেগে রয় নিশি জাগিরে
আমি তেমনি তোমার লাগি বসে আছি আনমনা।।
সে যে পর কাঁদানো পরবাসী পরাণ প্রিয় মোর
পরাণে পরানো তার প্রীতির প্রেমডোর।
পারি না আর তারে তুলতে, পারি না আর বাঁধন খুলতেরে
স্মৃতি পটে চাহি তুলতে বন্ধুর রূপের আল্‌পনা।।
বনে যখন আগুন লাগে দেখে সবজনে
মনের আগুন কেউ দেখে না পোড়ায় গোপনে।
বনের আগুন নেভে জলে মনের আগুন জ্বলে জ্বলে
যেমন কলের জাহাজ জলে চলে বুকের জ্বালা জুড়ায় না।।
পাগল বিজয় বলে মানবাত্মা চির বিরহী
তারে ভুলে এ-জগতে কেমনে রহি।
যার ইচ্ছাতে এলেম ভবে, তারে আমার পেতে হবে
পাওয়ার বস্তু পাবো যবে চাওয়া পাওয়া রবে না।।

২২

সোনা বন্ধু বোনা পাখীর মতোরে জ্বালা সইবো আর কতো।।
হৃদয় লয়ে না কয়ে সে হয়েছে নির্গত,
বুঝি আমারে ভুলেছে কারে পেয়ে তার মনমতো।।
আগে যদি জানতাম তার মনে ছিলো এতো,
আমি চাইতাম না তার দিকে ফিরে সুন্দর হোক সে যতো।।
নীড়ের পাখী ফিরে আসে দিবস হলে গত,
সে যে দুঃখ দেয় সুদূরে থাকি হোমা পাখীর মতো।।
মন লয়ে সে মনের মানুষ খেলে অবিরত,
পাগল বিজয় কয় কবে হবো মন মানুষের অনুগত।।

২৩

যার লাগিয়া কান্দিসরে মন তার চোখে নাই জল,
কেবল পরের কান্না কেন্দে গেলি পেলি না সে কান্নার ফল।।
পরাণ চিরে যারে দিলি ঠাঁই,
তার প্রাণে তো চানা তোরে তুই তো বুঝিস নাই।
কেবল ঘি ঢালিয়া ভিজালি ছাই সকলি হলো বিফল।।
যেমন আলো আশে আলেয়ার প্রতি,
মরণ ভুলে মরিচিকায় হরিণের গতি।
এবার তোর গতি হলো তেমনি বুঝলি না আসল নকল।।
যার দুঃখে তোর চোখে বারিধারা,
তোর দুঃখে তার হাসি ধরে না যে আর।
তুই এই কান্দা কাঁদবি কতো আর সময় থাকতে সামনে চল।।
যার কান্না কাঁদলে এক নিমেষে,
সকল চাওয়া সকল পাওয়া আসা যাওয়া শেষ।
পাগল বিজয়ের নাই সে ভাবের লেশ অভাবের কান্না কেবল।।

২৪

মনের মানুষ না হইলে সই সেকি বোঝে মনের ব্যথা
যে জন মন বোঝে না প্রাণ খোঁজে না কই মনে তারে মনের কথা
মনের কথা বললে যারে, অন্তরের বেদনা সারে
খুঁজে যদি মেলে তারে হবে সফলতা,
সে যে কইবার আগে বুঝে নেবে দেখে প্রাণের ব্যাকুলতা।।
অরসিককে রস নিবেদন, সে কি বোঝে মনের বেদন
সে বড়ো যাতনা ভীষণ সবি হবে বৃথা,
যেমন অন্ধের হাতে আয়না দিলে হয় না তাতে মধুরতা।।
যে ব্যথা কপাল ক্রমে, রইলো সই আমার মরমে
হয়তো তাহা এ-জনমে বলিবো না কোথা,
যদি জন্মান্তরে দেখা পাই তার জানাবো দুঃখের বার্তা।।
মন মানুষ মোহন সাজে, জাগবে কবে হৃদয় মাঝে
দেহ প্রাণ লাগবে তার কাজে ত্যজে অসারতা
পাগল বিজয়ের পরাণের মাঝে এবার রাইলো শুধু আসন পাতা।

২৫

অসীমের এক যাত্রী আমি অচিন পথে আমার চলা,
কবে হবে এই পথের শেষ সম্ভব নয় তা কারো বলা।।
অজানা এক সারথীর রথে, কবে কোন দিন নেমেছি পথে
বিরামহীন চলি আমি দিবস রাতে-
কতো দেখে এলাম পথে পথে পথিকের পান্থশালা।।
দিন কয়েক থাকিয়ে সেখানে, বাহির হইলাম বাহিরের টানে
দিশেহারা ঘুরে মরি কিসের সন্ধানে-
আমি বুঝি না ক্ষুদ্র জ্ঞানে কার এই সব খেলা।।
চলে গ্রহ নক্ষত্র ভিন্ন পথে কেউ নয় একত্র
মহাশূন্যে অভিসারে চলে দিন রাত্র-
তাদের বাদ প্রতিবাদ নাহি মাত্র চলে নিঝুম নিরালায়।।
পাগল বিজয় বলে ওরে আমার মন
পরিচালক আছেরে একজন-
কোথা যাবি জেনে তোর আছে প্রয়োজন
তোর এই পথের শেষ হবে তখন গিয়ে তার চরণ তলায়।।

২৬

আমার জীবন, জীবন নদীর নাইয়ারে,
কবে আমার তীরে ভিড়াবে নাও ধীরে ধীরে বাইয়ারে।।
বের হয়েছি সেই যে ভোরে ধরণীর ধুলে,
খেলা করে বেলা গেছে দয়াল তোমারে ভুলে।
এখন দিনের শেষে নদীর কুলে রয়েছি দাঁড়াইয়ারে।।
ষোল আনা তফিল লয়ে করিয়া কারবার,
জমা শূন্য খরচ বেশি দয়াল হয়েছে বার বার।
আমার হিসাবের কিছু নাই সারবার দেখেছি মিলাইয়ারে।।
নিজের হাতে নিজের বিপদ নিয়েছি গড়ি,
নদীর কূলে কাঁদি এখন বিপদে পড়ি।
আমি দিন ভিখারী পারের কড়ি ফেলেছি হারাইয়ারে।
সাথী যারা গেছে তারা ফেলিয়ে আমায়
এখন শুধু আছি দয়াল তোমার ভরসায়।
এবার কাঙাল বলে এ অভাগায় দিয়ো না ফিরাইয়ারে।।
পাগল বিজয় বলে আছি আমি ভবের এ কুলে
কবে এসে নাবিক বন্ধু লবে যে তুলে
তোমার পারের তরী দিবে খুলে গোনের লগন পাইয়ারে।।

২৭

বেশ করেছ দীন বন্ধু বেশ করেছ বেশ,
তুমি স্বদেশকে করিলে বিদেশ বিদেশকে স্বদেশ।।
স্থূল জ্ঞানে ভুলিয়ে ছিলাম মূলে অনিত্য
ভালোভাবে হয়েছে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত
এখন করে লহো নিত্য ভৃত্য পরশ বান্ধব পরমেশ
নাক মলা কান মলা কতো তীব্র তিরস্কার
যেমন কর্ম হয়েছে তার তেমনি পুরস্কার;
এখন শেষের পথ করো পরিষ্কার দেশে যাওয়ার পরিবেশ।।
অর্থে যে অনার্থ ঘটে স্বার্থে জগতে
সম্পদেরে বিপদ আনে মলিন মরতে;
তাই দীক্ষা লয়ে তীক্ষ্ণ ব্রতে শিক্ষা লয়ে করলাম প্রবেশ।।
সুখ দুঃখ সব তোমার ঐ করুণ হস্তের দান
ধন্য তুমি মহীমাঝে মহা মহীয়ান;
দয়াল তুমি যাহা কর বিধান-সবকিছু নির্মল নির্দোষ।।
পাগল বিজয় কয় যেভাবে রাখো তাতে দুঃখ নাই
চির সাথী তোমায় যেন চলবার পথে পাই;
করবো দুঃখের মুখে মাখিয়ে ছাই-নিত্য সুখের সমাবেশ।।

২৮

যমুনার জলে কেন গেলামরে প্রাণ সজনী তোদের ডাকে,
আমি মন হারায়ে এলাম সখীরে সেই কদম তলীর বাঁকে।
দেখলাম অপরূপ এক অচিনা লোক
জাগলো পরাণে বিপুল পুলক, সে এক নতুন আলোক,
সে যে আমার দিক চাইলো এক পলক তোদের আঁখির গোপন ফাঁকে।।
সে যে হৃদয় মোর নিয়েছে কেড়ে,
আমার কি হইল সই তারে হেরে, জ্বালা উঠলো বেড়ে,
কেমনে গৃহে থাকি তারে ছেড়ে মন-পরাণ দিলাম যাকে।।
সে যে কি যেন কি হয় আমার সই
আমি জানি না আমি তার কি হই, তবু পথ চেয়ে রই,
আমার জানা অজানার মাঝে ঐ প্রাণে দেখিতে চায় তাকে।।
স্বপ্নের এক সংসার গড়ায়ে
বিষয় বিষানল দিলো ছড়ায়ে, মারিছে পোড়ায়,
পাগল বিজয় আজ কান্দে ছড়ায়ে সেই সংসারে জাল পাকে।।

২৯

আমার মনের কথা মনে রইলো শ্যামল বংশীওয়ালা,
আমি নীরবে দাঁড়ায়ে কাঁদি কেলি কদম্বতলা।।
আনা গোনা করি মনের কাছে যদি পাই,
আমার গোপন স্বপনের ব্যথা বলবো তোমার ঠাঁই,
তোমার সামনে গেলে সব ভুলে যাই হয় না কিছুই বলা।।
কতকালের কতো ব্যথা আমার প্রাণের মাঝে,
তোমার মোহন মুরালীর তানে গানে যে সুর বাজে,
আমার মন লাগে না কোনো কাজে ঘটলো কি জ্বালা।।
ব্যাকুল বুকেতে মোর বিরহের এক দাবি,
তুমি দাও না ধরা যাও না দূরে খেলো লুকোচুরি,
তোমার প্রেমের অভিসারে ঘুরি নিয়ে প্রেম পিয়ালা।।
পাগল বিজয় বলে যদি তুমি দূরে থাকো প্রিয়,
তোমার গোপন বাঁশীর ডাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ো,
আমায় তোমার দিকে টেনে নিয়ো কৃষ্ণ কিশোর কালা।।

৩০

সাধক আর কবিতে আছে পার্থক্য
কর্ম যোগে সাধক সিদ্ধ কবির পুষ্পিত কাব্য।।
সাধকে দৃষ্টি অন্তরে কবির দৃষ্টি নীলাম্বরে
ক্ষণেক রয় মাঠে প্রান্তরে-দূর প্রসারিত তার লক্ষ্য,
কবি দেখে মহাসিন্ধু, সাধক দেখে শিশির বিন্দু
বিন্দুযোগে মহাসিন্ধু স্কুলে দেয় মূলে সাক্ষ্য।।
কবির দৃষ্টি ফল ও ফুলে, সাধক থাকে গাছের মূলে
অন্তর বাহির চক্ষু খুলে দুইজনের দুইদিক লক্ষ্য,
সাধকে পায় অনুভূতি, কবির মাত্র অনুমতি,
দু’দেশে দুই রসের প্রীতি লাভ করে উভয় পক্ষ।।
পেয়ে সকল প্রশ্নের উত্তর, সাধক চির নীর বনিথর
কবি যে কল্পনা মুর্খর আঁকে কতো আলেখ্য;
কবি চাহে প্রকাশিতে সাধক চাহে ডেকে রাখিতে
কেউ চায় নির্জনে থাকিতে কবি স্বজন সাপেক্ষ।।
সুন্দর করে গড়ে সবি, কল্পনা বিলাসী কবি
চক্ষে আঁকা স্বর্ণ ছবি বর্ণনাতে সুদক্ষ;
পাগল বিজয় কয় কল্পনার মাঝে, সাজিয়ে বাস্তবের সাজে
সই রাখিয়ে কথা কাজে, নাহই কারো প্রতিপক্ষ।।

৩১

সাগর পারের মাঝিরে হারে মাঝি তুমি চলেছ কোন দেশে,
লালচে বাদাম টেনে দিয়েরে তোমার ময়ূর পংখীর নৌকাতে
হাতে ধরা হালের কাঁটারে সে এক নবীন কিশোর বেশেরে।।
হাল মাঁচায় মাল কোচা দিয়েরে মাঝি তোমার চিকন মান্‌জা দুলে
খোল হাওয়ায় দোলা দিয়েরে তোমার মাথার বাবরী চুলে,
আমার গেলো ঘোমটা খুলেরে আমি দেখি তোমায় চাহিয়া
গাহিছো ভাটিয়াল গীতিরে তুমি কারে ভালোবেসেরে।।
ভরা নদীর গোনের জোয়াররে হারে মাঝি চাড়ে নাতো কেউ
আমার ব্যাকুল মনের মাঝে ওঠে দু’কুল ভাঙ্গা ঢেউ,
কেউ বোঝে না মনের ব্যথারে মরি মরমেতে দলিয়া
তোমায় বলিয়া জানাবো কথারে নদীর তীরে ভিড়াও এসেরে।।
সকল পিপাসা মিটায়রে মাঝি এই না নদীর জলে
কি পিপাসা বুকে লয়েরে নদী সাগর মুখে চলে,
কূলে আঘাত দিয়ে বলেরে আমার খুলে দাও কুলের বন্ধন
বন্ধুর সন্ধানে যাবোরে আমি কুল হারা আবেশেরে।।
পাগল বিজয় কয় দরদী মাঝিরে তুমি বিশ্বের মরম জানা প্রিয়
ইশারায় ডেকে যাও সবায়রে উড়ায়ে রঙিন উতরিয়ো
আমায় তোমার নৌকায় তুলে নিয়োরে আমার কেহ আজ নাই সাথে
খালি হাতে নদীর কূলেরে বসে আছি দিনের শেষেরে।।

৩২

নিজে গেয়ে নিজে শুনিস নিজের গান,
তোর গান তোর মনমতো হলে ছড়াবে সকলের প্রাণ।।
কোন মোকামে গানের সুর ভাসে,
কোথা হতে কোন পথ দিয়ে বাহিরে আসে।
তুই বসে সেই সুরের এক পাশে করিস শুধু তাহার ধ্যান।।
অনাহতে নাদ বিন্দু ফোঁটে,
সংঘাতে সংযত হয়ে তদুর্দ্ধে ছোটে।
শেষে বিশুদ্ধেতে বেজে ওঠে বীণা পানির বীণার তান।।
জীবন ভরে যে গান গেয়েছিস,
ঘরকে না শুনায়ে গান পরকে শুনায়েছিস,
তুই এই গান গেয়ে কি পেয়েছিস হিসাব নাই তোর লাভ লোকসান।।
তোর কণ্ঠে সে সুর দিলো মধুর,
সে শ্রোতা হয়ে তোর গান শোনে দাঁড়ায়ে অদূর,
তুই সুর পেয়ে সেজেছিস অমুর হিসাব নাই তোর লাভ লোকসান।।
পাগল বিজয় বলে সরকারী পেশায়,
জীবন ভরে গান গাহিলাম যশঃ মানের নেশায়।
দিন কাটলো মোর স্বার্থ সেবার পরমার্থ হলো ম্লান।।

৩৩

দীন বন্ধুরে আমি ভেবেছিলাম সমান যাবে দিন,
এখন জীবন শেষে এসে দেখি আমার সকল ভাবনা ভিত্তিহীন।।
সুখের সংসার গড়লাম যাদের আপন বুঝিয়া,
কোন অজানা দেশে তারা পাইনা খুঁজিয়া,
এখন ভাঙ্গি বসে চোখ বুজিয়া সন্মুখে দেখে দুর্দিন।।
আগে তো দেখি নাই আমি ভাবিয়া বিশেষ,
হাসি কান্না আলো ছায়া ভাঙ্গা গড়ার দেশ,
এ যে অন্ধ কূপের উপনিবেশ, ছাড়পত্র পাওয়া কঠিন।।
চলার সাথী নাহি পথে কে দেবে সন্ধান,
একা আসা একা যাওয়া বিধাতার বিধান,
আমি করতে পারি না অনুমান, এ পথে যে চির অচিন।।
কাল স্রোতের তৃণের মতো ভাসে ধরাধাম,
ব্যথার আঘাত বুকে নিয়ে চলি অবিরাম,
কবে হবে আমার চির বিশ্রাম হয়ে তোমার সম্মুখীন।।
জীর্ণ কর্ম সূত্র করে বসে নিরালা,
পাগল বিজয় কয় পুষ্পিত বাক্যে গাঁথিলাম মালা,
আমি সাজিলাম দেউলীয়া দোকানওয়ালা নিয়ে মহাজনের ঋণ।।

৩৪

আমি গড়াতে চাই সবার প্রাণে আমার গানের তাজমহল,
প্রবল কাল-স্রোতের বুকে রইবে চির নিরমও
মমতাজের স্মৃতিটিরে, মমতায় রাখিবো ঘিরে
হৃদয় যমুনা তীরে শোভা পাবে সমুজ্জল।।
কল্পনা সুন্দরী মম মমতাজ সমান
তার রূপের পূজারী আমার চিত্ত শাহজাহান
রচিব তার স্মৃতিসৌধ কেউ যদি বলে অবৈধ
বলবো মোর প্রাণের নৈবেদ্য নিবেদন মাত্র কেবল।।
গাঁথনী তুলিবো আমি মর্মের মর্মরে
ধোয়াইয়া রাখবো তাহা অশ্রু নির্ঝরে।
দেখিয়ে সেই ছন্দের ধারা, ভাবুক প্রেমিক মানুষ যারা
মানস স্বরোবরে তারা দেখবে ফুটন্ত কমল।।
এই পৃথিবী কতশত দরদী কবি
আঁকিয়াছে তাজমহলের মরমী ছবি
পাগল বিজয়ের তাই আশা করা, যেমন বাসনা হয়ে চন্দ্রধরা
ক্ষুদ্র প্রাণে আশা ভরা লংঘিতে সমুদ্রের জল।।

৩৫

তোমার পরশ মাখা গান,
আজো আমি হায় শুনি নিরাবয় সরস করে মন প্রাণ।
মাধবী পূর্ণিমা চাঁদিনী উজ্জলে ফুলমালা গাথি সোহাগে বিরলে
চৈতালী মেলায় বট গাছের তলে মালা বিনিময়ের স্থান।।
তুমি আজ কোথায় রয়েছ প্রিয় ঠিকানাবিহীন অজানায়
আরকি পারো না মিলনের লগন আমরা দু’জনায়,
ব্যথা যদি দেবে বিরহ বিরাগে, তবে কেন ভালোবেসে ছিলে আগে
ছেড়ে গেছে তবু পোড়া বুকে জাগে হাসি মাথা মুখখান।।
সেই বট গাছের পুরাণ পাতা সব ঝরে পড়ে চৈতী খরায়
নতুন পাতা জাগে পাতা ঝরা ডালে সবুজের রঙ ছড়ায়,
যেদিন চলে গেছে পূরণ হয়ে ফিরে কেন আসে না নতুনের রূপ লয়ে
জীবন কি কাটবে ব্যথার বোঝা বয়ে এই কি তোমার শেষ দান
পাগল বিজয়ের পথ চাওয়া নয়ন আশা পথ আছে চেয়ে
আবার আসিবে মিলনের ছন্দে আনন্দের গান গেয়ে,
মেঘের ফাঁকে চাদের কিরণ রাশি, মনে মানি যেন তোমার মুখের হাসি
লুকাইয়া লুকাইয়া তাই দেখ বুঝি আসি প্রীতি ভালোবাসার টান।।

৩৬

জীবন ভরে দেখলিরে ভাই এইতো দুনিয়া,
কেবল যাই যাই করে উঠেছে রোল আকাশ বাতাস ধ্বনিয়া।।
জীবনে বসন্তের সবুজ মুছে গেছে তোর অবুঝ
এতো সংসারের সংঘাতে তোর হলো না বুঝ,
ও তুই বুঝলিনারে ওরে অবুঝ- দেখিয়া আর শুনিয়া।।
অসার পশারে ভুলে আশার বাতাসার মূলে
দূয়ার দেওয়া ঘরের কপাট দিলি না খুলে,
এখন বসে আশা নদীর কুলে-দিন গেলো ঢেউ গুনিয়া।।
বেধে ভাঙ্গন তীরে ঘর, ভুলে আছো পরাৎপর
কতো ভাঙ্গে কতো গড়ে এই সে নদীর চর
তবু জড়ায়ে আছো তার ভিতর-মায়াতে জাল বুনিয়া।।
দেখে মায়ার মত পুর, পিছন পলেম অনেক দূর
পাগল বিজয় বলে এযে আমার সৎ কর্মের কসুর
উঠলো অনেক দিনের হারানো সুর মরমে গুন গুণিয়া।।

৩৭

আমি তোমার ছাড়া আর কতো দিন রইবোরে দুনিয়া,
তোমা বিনা জীবন বৃথা যায়রে।
আমি দীনহীন কাংগাল বেশে, কতো ঘুরিলাম দেশ বিদেশ
তবু আমি পাইলাম না তোমায়রে।।
আমার বাল্যকাল যায় খেলাতে, দিন যায় যৌবন মেলাতে
শেষে দিন যায় দেশের ভাবনায়রে।।
যতোবন্ধু বান্ধব পরিজন, কতো পাইলাম আত্মীয় স্বজন
তবু পোড়া পরান না জুড়ায়রে।
কতো অর্থ সম্পদ হাতে পাই, দেখি হিসাবে মোর কিছু নাইরে
পারের বেলা কি হবে উপায়রে।।
পাগল বিজয় বলে মাঝিরে, আমার পার হবারকড়ি নাহিরে
নিকড়েরে তুলে নিয়ো নায়রে।।

৩৮

আমার উচিৎ বিচার করলে আমি খালাস পাই না কোনো মতে,
আমি কি ছিলাম আর কি হয়েছে আরো কি হবো যে কি হতো।।
হাম বড়ো এক আমিত্বের জোরে
নিজেরে করেছি স্বীকার বিকারের ঘোরে।
আমি তোমারে সারথী করে একদিনও বসাই নাই জীবন রথে।।
লোক ভুলানো গোসাই গিরিতে
তোমার দিকে আমি আর পারি নাই ফিরিতে।
আমি কি করেছি কি করিতে ঠিক মতো চলা হয়নি চলার পথে
হিসাব আমার মিলবে না জানি
আমার তরিলে যা আছে তাই দিলাম তোমায় আজি।
আমি আর কিছু রাখিনি টানি আমার দরকার নাই আর দাখলে খতে।।
পাগল বিজয় বলে হে অন্তর্যামী
আমার চেয়ে আমারে বেশী জানো তুমি।
তুমি বিশ্বের বিচার স্বামী আছে আমার জমা খরচ তোমার হাতে।।

৩৯

ঘর ভাঙ্গবে তোর আজ না হয় কাল কাল বৈশাখীর ঝড়ো মেঘ
যে ঘরে তুই আছিস দিন কয়েক-
তোর রং করা ঘর ঘূনে জারা জং ধরা লোহা পেরেক।।
চৌদ্দ পোয়া চৌহদ্দি করে, যুত লাগাইছে দুই খুঁটার পরে
আট কুঠুরী নয়দরজা খোলা সকল দোর-
ঘরে প্রহরী একজন মাত্র তোর চোর জুটেছে জন ছয়েক।।
জানিস না সে প্রহরী কেমন নিয়ত সে জোগায় চোরের মন,
ঘরের লোক ভোগায়ে মারে স্বভাব তার এমন-
তারে কেমন করে করবি শাসন হারায়েছিস জ্ঞান বিবেক।।
মনি কাঞ্চন পরিপূর্ণ ঘর, সময় থাকতে তাহার সন্ধান কর
এ ঘর প’লে উঠবে না আর দুই খুঁটির উপর-
তুই পাবি না সেই জ্ঞানের আকর যত্ন করে কৌশল শেখ।।
গুরু কৃপা লভিয়ে ভবে, অজানা ঘর জানিবি কবে
প্রহরী হুঁশিয়ার হয়ে পাহারায় রবে-
পাগল বিজয় বলে সেই দিন হবে আত্মতত্বে অভিষেক।।

৪০

ও বউ সর্ষ কোট,
নিমনা বনের পাখীরে কেন তুই ডাকিস এমন করে
তুই কি হারায়ে খুঁজে ফিরিস সারা জীবন ধরে।।
গ্রীষ্মকালে সর্ব ভিজায়ে কোনসে কূলের বউ
কালের ডাকে চলে গেলো তারে ফিরাতে নারিলো কেউ,
তার ভিজানো সর্ষ রয়েছে পড়িয়া আরো আছে টেকী নোট
তাই বুঝি পাখি কাঁদিয়া ফিরিছে ও বউ সর্ষ কোট্
ও তার ব্যাকুল চোখের জলের ফোটা পাতার ঠোটে ঝরে
অতীতে যুগের বিগত-কাহিনী চলে গেছে কতো দূরে
তার স্মৃতির বেদন গীতিকা আজিও পাখীর কণ্ঠ সুরে,
সারা বিশ্বে সাড়া দিয়ে বিরহ করুণ তানে
তার চলে যাওয়া দিনের ছবি আজো জাগায়ে তোলে প্রাণে
তোর কি যেন কি আছে গানে হৃদয় বিদরে।।
বিরহ মিলনে গড়েছে বিধাতা বিশ্ব চরাচর
তারই মাঝে বাঁধে মানুষ হাসি কান্নার ঘর,
কেউবা পেলো কাঁটার জ্বালা কেউবা পেলো ফুল
কারো ভেঙ্গে গেছে আশা বৃক্ষের মূল কাল বৈশাখীর ঝড়ে।।
কতো বিরহীর মরমের বাণী ঘুরে মরে আকাশে
কতো বিরহীর দীর্ঘ নিশ্বাস মিশে আছে বাতাসে,
কতো করুণ আঁখির বারি ভেসে বেড়ায় জলস্রোতে
বিম্ব আছে দৃশ্যলয়ে তার ভাঙ্গা গড়ার ব্রতে
পাগল বিজয়ের বুকের পরতো দুঃখের হাওয়া ঘোরে।।

৪১

ভরা গোনের জোয়ার পাইয়া, তোমার ময়ূর পংখী বাইয়ারে
কবে আসবেরে সুজন রসিক নাইয়া-
আমার হারানো পরানের ছন্দে তোমার আনন্দের গান গাইয়।।
ভাটির নদী জোয়ার পেয়ে যখনে উজায়,  
তোমার আগমনী বাণীরে ওসে আমায় বলে যায়।
আমি বসে থাকি সেই ভরসায়রে তোমার আশা পথ চাইয়া
আমি ঘর চাড়া হয়েছি বন্ধু তোমার সাড়া পাইয়া।।
জোয়ার শেষে নদী যখন ভাটির দিক যায় বয়ে,
আমার সকল ব্যথার কথারে আমি তার কাছে দেই কয়ে।
আমার মনের নিমন্ত্রণ লয়েরে দেয় সে তোমারে জানাইয়া
আমার মনের খবর পেয়ে কেমনে রয়েছো লুকাইয়া।।
হইতাম যদি বনের হরিণ আমি খুঁজিতাম জঙ্গলে,
মীনহলে এতো দিন আমিরে তালাস করতাম গলে।
আমি খুঁজে দেখতাম পাখী হলেরে তোমায় সব দেশে উড়িয়া
দারুণ বিধাতা হয়েছে বিমুখ আমার কপাল খাইয়া।।
পাগল বিজয় বলে আমি একজন শেষের খেওয়া যাত্রী,
পার করে দাও পারের মাঝিরে আমার ঘনাইল রাত্রি।
আমার কেহ নাই আর সহ যাত্রীরে আছে একা যে দাঁড়াইয়া
এখন বেলা শেষে দেশের মানুষ দেশে দাও পাঠাইয়া।।

৪২

আমার দরদিয়া আমি তোমার লাগিয়া কোন বা দেশে যাবো,
কোন বা দেশে গিয়ে আমিরে আমি তোমার নাগাল পাবো।।
চলেছি অজানা পথ বেয়ে, পথের সন্ধান না পেয়ে
শুধু তোমার দিকে চেয়ে;
যাত্রা পথের শেষের তীরেরে তোমার সম্মুখে দাঁড়াবো।।
মায়া যবনিকার অন্তরাল, ঘুরে হয়েছি নাকাল
সেতো আজ নয় বহু কাল;
সমদুঃখের দুখী নাহিরে এ দুঃখ বুক চিরে দেখাবো।।
কতো জনম আসিলাম ঘুরে, তবুও রহিলাম দূরে
মায়াই ইন্দ্রজাল পুরে;
এমনি করে তোমায় ছেড়েরে কতো ঘুরিয়া বেড়াবো।।
আমাকে তুমি তোমার বলে, কবে লইবে কোলে
তোমার সোহাগ হিল্লোলে;
পাগল বিজয় বলে সেদিন আমিরে পোড়া পরাণ জুড়াবো।।

৪৩

হাটের মাঝে রইলি বসে রবি অস্তাচল
পারের বোঝা বুঝে দিয়েরে মনা ঘরে চল্ ঘরে চল।।
ঘনাইলো আঁধার রাতি, পথে কেহ নাই তোর সাথের সাথী
কেড়ে নিবে হাট বেসাতি পথে জড়া চোরের দল।।
এই হাটের হাটুরে গুলি, কতো চলে গেলো দোকান তুলি
তুই ভাঙ্গা হাটে দোকান খুলি মিছে বসলি কেন বল।
এই হাটের যে ইজেদ্দারী, সেতো বেশী নয় মাত্র দিন চারি
কেনো তার জন্য তোর এ জোর জারি এতো জুয়াড়ির কূটকল।।
ছেড়ে দিয়ে বেচা কেনা, তুই চুকিয়ে নে তোর লেনাদেনা
কূলের বাঁধা তরী খুলে দেনা পাগল বিজয় বিষয়ে বিহবল।।

৪৪

জীবনে মোর যতো আসুক প্রকৃতির ঘোর পরিহাস,
যেন তোমারে না করি অবিশ্বাস-
দয়াল যেন তোমারে না করি অবিশ্বাস;
দূর্ণিবার কালের পেষণে, দুদিনের দুঃখ বেদনে
যতোই জেগে ওঠে মনে বুক ভাঙা দীর্ঘ নিশ্বাস।।
নির্মম সংসারে মোরে যতো দেয় যন্ত্রণা।
আপন জনের কাছে যদি না পাই সান্ত্বনা,
বঞ্চনা সে করে যতো, যতোই হই আশাহত
তোমায় পদে থাকলে নত-সব হবে বিনাশ।।
অন্ধকারে পথ হারায়ে ঘুরিয়ে সময়
তুমি সাথে আছো যেন ইহা মনে হয়;
সম্মুখেতে বাঁধলে নদী, ডাকলে কেউ না শোনে যদি
তুমি মোর আছো দরদী-তখনে দিবে আশ্বাস।।
কেহ যদি যুক্তিতর্ক এনে জোরানো
আমার মনের চিন্তা ধরার করে ঘোরালো;
অন্তরে সহজ সংস্কার, যেন করে দেয় মোর পথ পরিষ্কার
এ জীবনেএই পুরস্কার-লভিতে মোর অভিলাষ।।
তুমি যদি তুষ্ট থাকো আমার স্বভাবে
জন সমাজে লোক নিন্দার কি আসে যাবে;
সহ্য করে সর্ব নির্যাতন, হই যেন তোমার মন মতন
নিত্য করি স্মরণ মনন-চিত্তে দাও মোর এই বিকাশ।।
সর্বহারা হলে যেন গর্ব থাকে এই
তুমি আমার পরম সম্পদ তুলনা যার নেই;
পালগ বিজয় বলে ঘোর বিপাকে যেন ভুলি না তোমাকে
নিরন্তর অন্তরে থাকে তোমার প্রীতি প্রেম বিলাস।।

৪৫

তারে পাবি শুধু সাধনে তারে পাবি শুধু ভজনে
মন মানুষ ধররে যতনে-
সে যে পলকে ঝলক দিয়ে যায় গো
ও তোর অলস নয়ন কোণে।।
দুয়ার দেওয়া ঘরের পাশে আসে দেবতা
ভুল করে দিসনাই দুয়ার খুলে বলিস নাই কথা,
তারে কতো দিয়েছিস ব্যথাগো তবু অভিমান নাই তার মনে।।
বাড়ীর পাশে আরশী নগর পড়শী একজন
একদিনেও চিনলিনারে মানুষটি কেমন সে যে কতো মোর আপন
সে যে সকল অভাব করে পূরণ গো; সাবধানে সু-গোপনে।।
বিলাসের বিছানায় ঘুমে মন নিশি করিস ভোর
শিয়রে বসিয়া জাগে সে যে দরদিয়া তোর,
সে যে আগলিয়া তার বাহুডোেরগো কতো বাঁধে স্নেহের বাঁধন।।
পথ হারায়ে কাঁদিস যবে ভীষণ বিপাকে
গন কালো রাতে আরো হাতে নাম ধরে ডাকে,
তোর বিপদে সে সাথে থাকে গো থাকে চলবার পথের সামনে।।
পাগল বিজয় বলে বেলা গেলো খেলা ফেলে আয়
পুঁজিবাটা ফুরায়েছে নিলো ছয় বেটা চোরায়,
এখন যা আছে তাই সঁপিয়ে গিয়ে ক্ষমা চাও তার চরণে।।

৪৬

আর কতো খেলবি খেলা বেলা বয়ে যায়,
ও তুই খেলতে খেলতে ভূত সাজিলি পথের ধূলি মেখে গায়।।
সকাল বেলায় খেলতে হলিবার
বিকালে হিসাব করে দেখ কতো হলো হার,
তোর এই খেলায় মেয়াদ দিন দুই চার ভাবলি নাকো হায়।
খেলার সাথী ছিলো যে কয়জন
বেলা শেষে খেলা ফেলে কররো পলায়ন;
কবে ভাঙ্গবেরে তোর খেলার স্বপন আপন বুঝে আয়।।
চোখ ঢাকা তোর ধরণী ধুলে
চলার পথের সাথী নাই তোর পথ যাবি ভুলে,
শেষে আঁধারে তুই নদীর কূলে ঘুরবি পার ঘাটায়।।
পাগল বিজয় বলে ওরে আমার মন
এখনো তোর সময় আছে আমার কথা শোন,
আমরা দুইজন হইলে একজন ঘুচবে পারের দায়।।

৪৭

নবী নামের নৌকা খোলা আল্লা নামের পাল খাটাও
বিসমিল্লাহ বলিয়ে মোমিন কূলের তরী খুলে দাও,
দয়াল মুর্শিদকে কাণ্ডারী করে গোনের জোয়ার বেয়ে যাও।।
যার ইচ্ছাতে মাটির মানুষ মাটির ধরাতে
সুখ সম্পদ সম্ভোগ করলে সরেবরাতে,
এখন মরা এক নদীর চরাতে বাঁধিয়ে রেখোনা নাও।।
কোথা ছিলে কোথা হতে এই দেশে এলে
এসে এই দেশে সেই দেশের কথা সব ভুলে গেলে,
এমন দুর্লভ মানব জনম পেলে তারে ফেলে কারে চাও।।
ঈমান সহ যেজন করে আল্লার ইবাদত
অন্তর দিয়ে যে করে তার বান্ধার খেদমত,
রহমান করিবে রহমত লাগাবে বেহেস্তের বাও।।
পাগল বিজয় বলে দীনের নবী দীনের মোনাজাত,
তুমি পাঠিয়ে দিয়ো যেথা পরোয়ার পাকজাত,
যেন সহজে পার হই পুলসেরাত চলিতে টলে না পাও।।

৪৮

আর কতোকাল ঘুরবো দয়াল পথের কাঙ্গাল হয়ে,
আমি কোন পথে যাই তোমার কাছেরে আমায় কেউতো দেয় না কয়ে।।
কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম আনিল বা কে
আবার ইহার পর কোন দেশে যাবো অজানার ডাকে,
আমি ঘুরে মরি পথের বাঁকেরে বুক ভরা দুঃখ লয়ে।।
ছিলাম বা কি হলাম বা কি আরো কিবা হবে
কি করতে কি করে গেলাম কেনো এলাম ভবে,
আমার এই ভাবে কি জীবন যাবেরে শুধু ভূতের বোঝা বয়ে।।
বিশ্ব যখন বিমুখ হয়ে ওঠে সহসা
দুর্দিনে ঘনায়ে আসে দুঃখের বরষা,
দয়াল তুমিই একমাত্র ভরসারে আছি তাই ব্যথা বেদনা সয়ে।।
পাগল বিজয় বলে পরাণ প্রিয় পরিচয় কি দিবা
আমি জানিনা তুমি আমার কে আমি তোমার কেবা,
তবু তোমার লাগি নিশি দিবারে আমি কান্দি রয়ে রয়ে।।

৪৯

আমায় ধোয়াইয়ে লহো তোমার চরণ ধোয়া জলে,
আছে জমাট বাঁধা মলিনতা আমার শুকানো অন্তর তলে।।
মিথ্যা চাটু পাটোয়ারী মন অন্তরে, দুষ্টামী মুখে সুমিষ্ট বচন,
লোকের মর্ম জোগাতে করলেম এমন একটু স্বার্থের লোভে পলে পলে।।
সাধু হইতে অন্তরে নাই টান, যাদুকরের মতো শুধু করে গেলাম ভান, ক্রসে বন্ধ হলো ব্যবসার দোকান এখন আর মাল জোটে না খদ্দের এলে।।
কাম, ক্রোধ লোভ মোহের সংগতে বিহঃরঙ্গে ঘুরে বেড়াই কু-সঙ্গে মেতে
আমি এই বেশে পারি না যেতে দয়াল তোমার ঐ পবিত্র কোলে।।
আর কতো কাল ঘুরবো এই দেশে, বিদেশে কাজ নাই আমায় নিয়ে চলো দেশে, আমায় সাজাও তোমার ভাবাবেশে পাগল বিজয় কেন্দে কেন্দে বলে।।

৫০

তোমার সামনে বসে গাহিবো গান এইটুকু সময় দিয়ো
গভীর নির্জনে স্থির মনে হে মোর পরান প্ৰিয়।।
যে সুর আমি সাধিয়াছি জীবন সে তারে
দিনের শেষে সে সুরখানি শুনাবো তোমারে
ভেসে ব্যাকুল নয়ন ধারে,
বাজে সে সুর আমার বীণার তারে তুমি তাই শুনিয়ো।।
বেদনা জড়িত সুরে উঠেছে যে তান
তুমি যদি শোন প্রিয় পরাণের পরাণ
সফল হবে আমার গান,
আমার ছন্দের কুসুম হয়েছে ম্লান-তুমি পায়ে তুলে নিয়ো।।
যশঃ ও মানের গরবেতে হয়ে ভরপুর
সংসার কোলা হলের মাঝে সাধিতে যাই সুর
বেজে ওঠে তাই বে-সুর,
আমার যন্ত্রে হয় না অন্তরের সুর -তুমি অন্তরে বুঝিয়ো।।
পাগল বিজয় বলে সুর সাধিলাম ইহজনম ভর
স্বর গ্রামের সংগ্রামেতে হয়েছি কাতর
খুঁজে পাইনা সুরের ঘর,
আমার সেতারে যাচে তোমার কব পরশ আমিয়।।

৫১

তোমার কাছে চাইবো না তো দয়াল আর আমায় চাইবার জায়গা কই?
আমার দুঃখ কষ্ট ব্যথা বেদনা সবি তোমার কাছে কই।।
হাত পেতে সংসারের কাছে পাইলাম না তো কিছু
বঞ্চিত হয়ে ছুটে ছিলাম এই সংসারের পিছু,
এখন সকল বিষয় হয়ে নিচু তোমার দিকে চেয়ে রই।
ইহকাল পরকালে মোর যা কিছু দরকার
পিতার কাছে পুত্রের থাকে চিরকাল আব্দার,
তুমি যাহা দাও তাই হবে আমার জীবন পথে চলন সই।।
তোমার পরশ সরস করে নিরস পরাণ
সকাম কিংবা নিষ্কাম যা হোক তোমার হাতের দান,
সকল সমস্যার হবে সমাধান তোমার পূজায় লাগলে ওই।।
পাগল বিজয় বলে স্বার্থে কিংবা নিঃস্বার্থের চাওয়া
তুমি যা দাও এ-জীবনে স্বার্থক সেই পাওয়া,
যেন ভুলে গিয়ে পিছন চাওয়া তোমার কাছে চেয়ে লই।।

৫২

দূরে দূরে রাখো দয়াল আমায় কাছে নেবে বলেরে দয়াল কাছে নেবে বলে,
তুমি আঘাত দিয়ে পথে আনো বিপথগামী হলে।।
তোমায় ভুলে থাকি যখন, তুমি নেমে আসো তখন
কঠিন হস্তে করো শাসন-নিঠুর দয়া বলে,
দেহের ময়লা মাটি ধুয়ে শেষে তুলিয়া লও কোলে।।
নানা পথে ঘোরাঘুরি কখন নিকট কখন দূর
এমনি কতো লুকোচুরি -খেলিছো বিরলে,
তুমি হাসাও কাঁদাও ডুবাও ভাসাও ভালোবাসার ছলে।।
তুমি কান্না বড়ো ভালোবাসো কান্নার মাঝে কাছে আসো।
ব্যথা দিয়ে ব্যথা নাসো- ব্যথা হারি বলে,
তুমি বজ্রকঠোর কুসুম কোমল সু-সময় মন ভোলে।।
পাগল বিজয় কাঁদিবো অবিরল,
আর কিছু চাই না কান্নার ফল-ফুলে উঠুক হৃদয় শত দল,
যেন পৌঁছায় আমার অশ্রু কমল তোমার চরণ তলে।।

৫৩

ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে অনেক জন,
কতো হাতাহাতি করিয়ে যায় রাতারাতি বিসর্জন।।
যে শক্তিতে বিশ্ব ধরাবয় জানিস তারেই ধর্ম কয়
ধূ-ধাতু ম্যান প্রত্যয় যোগে ধর্ম শব্দ হয়,
রেখে অন্তর ও বাহির সমন্বয়-স্থীরচিত্তে করো সাধন।।
কেহ হিন্দু কেহ মুসলমান, কেহ বৌদ্ধ ইহুদী খ্রিস্টান
সৃষ্টির পানে দৃষ্টিদানে স্রষ্টার প্রতিটান
ইহার মূলে কিছুই ব্যবধান খুলে দেখ জ্ঞান নয়ন।
স্বার্থ সিদ্ধি করিতে কায়েম, প্রভুত্ব রাখিতে মোতায়েম
কাজে শয়তানের চেলা সাজেতে আলেম;
সে যে দূরন্ত জালিয়াত জালেম মানে না শাস্ত্রের বচন।।
পাগল বিজয় কয় ধর্মের এই চিহ্ন মতে পথে দেখায় বিভিন্ন
এক গন্তব্যে যাবে সব পথ হয়ে উত্তীর্ণ
যারা বিকারগ্রস্ত জরাজীর্ণ পথের পর তাদের মরণ।।

৫৪

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ কে বলে আজ নাই,
এই মহাদেশে পূর্ণ পৃথিবীর দেখি তাকে যেদিক চাই।।
বালক কিংবা কিশোর যুবক বুদ্ধ লোকের পাতে
রুচী মতো খোরাক জোগায় আজো আপন হাতে,
তাদের প্রাণের কথার মালা গাঁথে আনন্দে কন্ঠে বুলাই।।
নীলাকাশে শোভা করে দুপুরের রবি
অপরাহ্নে অস্তগামী মলিন তার ছবি;
এনে উদিত উদীপ্ত রবি অস্তাচলে লবেনা ঠাঁই
পুরাতনের মাঝে কতো নতুনের সৃষ্টি
মৃতনদে বাহাইলো অমৃতের বৃষ্টি
কভু যায়নি তার সন্ধানী দৃষ্টি এমন স্থান খুঁজে না পাই।।
পাগল বিজয় বলে শুভ লগ্নে জন্ম ধরেছি
একাধিক বার কবির চরণ পরশ করেছি;
আমি এ জনম ধন্য মেনেছি তার জন্য গান আনন্দে গাই।।

৫৫

বাসর ঘরে নবীন কিশোর বাঁশরীরা বাজায় বাঁশী,
তার সুর যেন ওই দূর গগনে পবন সনে বেড়ায় ভাসি।।
সেই বাঁশীর তানে প্রাণে জাগে, যেন এ গান তার শুনেছি আগে
তার সুর সোহাগে কুসুম বাগে চমকে সুষুমা রাশি।।
সুরের মায়ায় স্বপন সুখে, যেন দোলন জাগে নদীর বুকে,
এ বাঁশী শোভে যার মুখে তার যেন কেমন মুখের হাসি।।
তার বাঁশরীর সুর রসঘন, আমার সরম করলো প্রাণ মন,
আমার কেড়ে নিলো ধনজন সাজাইলো বনবাসী।।
পাগল বিজয় বলে মনরে ভোলা সে সুর শুলিলে আর যায় না ভোলা
সেই বাঁশীর সুরে পাগলা ভোলা ভুলে গেলো সোনার কাশী।।

৫৬

তোর ঘরে তোর সবি আছে যাবি কেন পরের ধারে,
সাধনে সন্ধান করে দেখ মূল শক্তি তোর মূলাধারে।।
তোর ঘরে থেকে দেবতা, তোর মুখে জোগালো কথা
শুনিয়া তুই শুনলিনাতো পড়েছিস শ্রবণ বিকারে;
তোর শব্দ স্পর্শ রূপরস গন্ধ দ্বন্ধ বাঁধায় অন্ধকারে।।
তুইতো রাখলি না তোর হিসাব, তোর যে কতো বিষয় বৈভব
তুব তোর গেলোনা অভাব স্বভাবের এই ব্যভিচারে;
কতো মনি কাঞ্চন পড়ে আছে তোর বসত বাড়ীর পাছ দুয়ারে।।
পালটায়ে দাও কর্মের বহর উল টায়ে দাও ইন্দ্রিয়ের ঘর
উলটা নাম জবে রত্নাকর বাল্মিক হয়ে যে প্রকারে
তখন অনাগত কালে খবর শুনতে পাবি বিনাতারে।।
যোগেতে পারলেম না জাগতে ছাই দিয়ে চাই আংগুল ঢাকতে
নিজেকে সামলায়ে রাখতে পারলেম না কোনো প্রকারে;
পাগল বিজয় বলে সকল থাকতে জীবন গেলো অনাহারে।।

৫৭

নিজের সাথে নিজে পীরিত কর,
নিজে হলে নিজের সুহৃদরে শেষে বুঝবি সেই পীরিতীর দর।।
আপনারে তুই না বুঝিয়া, মরিস আঁধারে কারে খুঁজিয়া
কানেতে কলম গুজিয়ারে মিছে তালাস করিস সারা ঘর।।
তোর মন মজেনা আত্মসত্ত্বায় কেবল ইন্দ্রিয়ের বিষয় মত্ততায়
জোঁক লাগে না পাথরের পায়রে আবার গাছ গাজায় পাহাড়ের পর
আগে না হলে তোর আত্ম দর্শন, তোরে কি করিবে বিজ্ঞান দর্শন
যেমন মরুভূমে বারি বর্ষণরে তবু তরুহীন সেই বালুচর।।
তোর দর্শন ইন্দ্রিয় ষঢ়রিপু আছে ছাড়ায়ে তোর জড়বপুরে
তুই তার মধ্যে পাবি না বাপুরে সেই অরূপের স্বরূপ নগর।।
পাগল বিজয় বলে পরের সাথে কাল কাটালাম খালি হাতেরে
শুধু বাধায় পড়ে আঁধার রাতেরে আমি ঘুরে মরি জনম ভর।।

৫৮

মরম জানা দরদিয়ারে বড়ো ব্যথার কথা জাগিলো মনে।।
তোমার চরণের ছায়ায় ছিলাম মরণের ওপারে
সৃষ্টির প্রবাহে মোরে পাঠাইলে সংসারে,
সেই হতে আমি তোমায় দেখি নাই নয়নে
আমার আর কতো কাল কাটবে ভবে তোমা বিহনে।।
আসবার কালে বলে ছিলে মনের মায়ায়
আবার আমায় ডেকে নিবে তোমার চরণের ছায়ায়,
বসে আছি সেই ভরসায় জীবনের শেষ লগনে
তুমি এসো বন্ধু ফিরে এসো শূন্য জীবনে।।
ভুলে গেছি কবে তোমায় ছেড়ে এসেছি
কারে ভালোবাসতে আমি কারে ভালোবেসেছি,
নানা প্রবাহে ভেসেছি অজানা আকর্ষণে
আমি আর কতো বেড়াবো ভেসে মোহের প্লাবনে।।
দাঁড়ায়ে রয়েছি এখন সন্ধ্যার আঁধারে
মাঝখানে বিরহের নদী তুমি আমি দু’ধারে
কেমন করে যাবো পারে পারের উপায় দেখিনে
পাগল বিজয় বলে নৈবেদ্যদেব শুধু তোমার চরণে।।

৫৯

তোমায় একদিন দেখিয়ারে পরাণ কান্দেরে পরাণ বধুয়ারে,
আমার ফুলঝরা বাগিচার পথে তোমার আসা যাওয়ারে।।
লক্ষ লোকের চক্ষের পরে এলে গোপনে
কেউ জানে না তুমি আমি জানি দু’জনে সে এক মধুর লগনে,
আমার হারিয়ে গেছে সেই বনে মনের কাকাতুয়ারে।।
তোমার রূপে আমার নয়ন মুগ্ধ গুণে স্নিগ্ধ মন
সেই হইতে প্রিয়তম হয়েছি এমন, তোমায় দিয়েছি এ-মন,
আমি বুঝিয়াছি, তুমি কেমন মন হরা যাদুয়ারে।।
কোকিলে কাকলি সাধে বসন্ত বাহার
ফাগুনের আগমনীতে ভ্রমরের ঝংকার, রঙিন ফলবন আমার,
যেন বাতাসে ভাসিছে তোমার তোহন মহুয়ারে।।
পাগল বিজয় কয় বাসন্তী রাতি পূর্ণিমা তিথি
বিরহের বাসর কুঞ্জে এসো অতিথি, গেয়ে মিলন গীতি,
তোমার চরণে ঢালিবো প্রীতি প্রেমচন্দন চুয়ারে।।

৪৯

আষাঢ়ের কোন ভেজা পথে এলো ওই এলোরে এলো আবার দূরন্ত শ্রাবণ,
এমনি দিনে লেগেছে মনের কূলে ভাঙ্গন।।
চূর্নী নদীর ঘূর্ণী পাঁকে যেথা পড়লো চর
সেই চরেতে বেঁধে ছিলাম বসতি এক ঘর,
শেষে ভেসে গেলো দিন কয়েক পর -এসে এক প্লাবন।।
ছাড়া ভিটেয় হিজল গাছে জলপরী কন্যা
উদাস চোখে বসে দেখে শ্রাবণের বন্যা
আমি কান্দি তাহার কান্না -তারকি নাই কাঁদন।।
মেঠো আগুন নেভেরে জলের ছিটে লেগে
রাবণের চিতা নেভেনা শ্রাবণের মেঘে;
সেই আগুন জ্বলে দ্বিগুণ বেগে-দুর্সহ দাহন।।
শ্রাবণ ওই আসিলো ফিরে একটি বছর পর
ফিরে আমার আশা নাই আর জলে ভাসা ঘর;
পাগল বিজয় বলে এমনি তর-বিধাতার বাঁধন।।

৬১

তোমার শেষের দাবি ভুলি নাই আমি ভুলিবার তো নয়,
আমার মনের অন্তরালে গোপন আড়ালে তুমি জড়ায়ে রয়েছ হৃদয়।।
একদিন লিখেছিলে চঞ্চলে, নেবেন অঞ্চলে
শেষের দাবি দেশে যাওয়ার সময়;
তোমার অতীতের সেই বাণী, আজিও দেয় আনি
মোরে নতুনরূপ কতো পরিচয়।।
কতো মার্স মাঘ দিবস দীঘল, ববর্ষ-চলে গেলো তোমার বিষয়
তোমার কায়াহীন ছায়ালোকে
তোমার ছবির মায়া চোখে আজিও দেখি অভিনয়।।
ওই যে সীমাহীন গ্রহ তারা, তারি মাঝে পথ হারা
খুঁজিয়া ফিরিছ বুঝি আমায়;
তাই তোমার জল ঝরে আঁখি পাতে, মিশায়ে শিশির সাথে সাথে
প্রভাতে গাহে প্রেমের জয়।
আমার জীবন সন্ধার ফাঁকে, দেশে যাবার শেষের ডাকে
তুমি আমি মিলিবো এক আশ্রয়;
পাগল বিজয় বলে প্রিয়, সেথা মোরে নেয়ো
বেশী নাই আসিবার সময়।।

৬২

তুই যারে চাস সকল দিয়ে সে তোরে চায় না,
পেলি জনম ভরে অবহেলে তবু এ-খেলা কেন তোর যায় না।।
আপন আনন্দে মাতি, পরকে ভাবলি পথের সাথী
পর কি বোঝে পরের বেদনা;
কেন পরের ভাবনায় দিন কাটালি ঘরের ছেলে ঘরে আয়না।।
যারে চাস তারে না পালি, যারে পাস তারে না পালি
সংসারে তোর অসার সাধনা;
কেন কাঞ্চনে তোর হয়না আকিঞ্চন কাছে পেয়ে কাঁচের আয়না
মরমের দরদী থুয়ে নামলি কেন মরুভূয়ে
নিরাস রহিলো রসনা,
সে যে মরিচিকায় জল ভ্রান্তি তাতে অন্তরের পিপাসা যায় না।।
হারানো পথের শেষে, দাঁড়ায়ে কাঁদি বিদেশে
স্বদেশের পথ কেউতো শুধায় না;
আছে যে দেশে সেই ব্যথাহারী পাগল বিজয় সেই পথ খুঁজে পায় না।

৬৩

বেলা গেলো খেলা ফেলে সময় থাকতে ঘরে যা,
তুই সন্ধ্যায় তার সন্ধান পাবি না দেখেছিলি ভোরে যা।
ভুলি গিয়ে নিজের বাপের ঘর, ঘর বাধিলি এক ভাসা ধাপের পর
বাতাসের চাপেতে সরে যাবে দু’দিন পর
এখন ত্যাগ করো পারের বাড়ী ঘর ঘরের ছেলে ঘরে যা।।
পথে চলতে হবে তোর একা পথে ভীষণ এক ঠেকা
সেদিনের বেশী দিন বাকী নাইরে শোন বোকা,
আজো চোখে কিছু যায়রে দেখা পথের রেখা ধরে যা।।
সম্মুখে এক নদী বাঁধের তোর, সে ঘাটে পারের জ্বালা ঘোর
কাতো জ্যান্ত লোকের দাহ কাজ হয় খাটেনারে জোর;
যদি পারের আশা থাকেরে তো সহজ জ্ঞানে সরে যা।।
পাগল বিজয় বলে মনের পিয়াসে, এ দেশে আছিস কি আশে,
সং সেজে কতো কাল রবি সংসার বিলাসে;
দরকার কি তোর হিসাব নিকাশে কর্তব্য কাজ করে যা।।

৬৪

পোড়া মনের সাথে পারলাম না আমি
সে যে পঙ্খীরাজ ঘোড়াতে চড়ে ছুটে চলে দিনজামি।।
ঘোরে ঢাকা শহর দিল্লী লাহোর কলকাতা বোম্বে
ক্ষণেক চীন জাপান রাশিয়া জার্মান ইংলন্ড কলম্বে;
ঘোরে স্বর্গ মর্তে অবিলম্বে -এমনি সে দ্রুতগামী।।
 জীবন মলিন কার্যভাবি করবোনা আর ফের
ও সে নিমেষে’ করায়ে আনে তাই আমি পাই না টের,
আমায় নাস্তানাবুদ করিলো ঢের খাসমহলের বদনামী।
সাবধান থাকি সে যে কি করবে তাহা জানি;
তবু স্বপন মাঝে করে কতো রাহাজানি
আমার খোরাক জোগায় যাহা আনি তাতে কেবল নোংরামী।।
হীরের দরে সমাদরে জিরে কিনেছি
এ খ্যাপে ব্যাপারে লাভ যা হবে জেনেছি;
পাগল বিজয় বলে হার মেনেছি থাকবো অন্তরযামী
আমি ঘর ছাড়া হইলাম প্রাণ সই সেই শ্যামের লাগিয়া,
আমি কেমনে এমন হলেম সই পেলাম না ভাবিয়া।।
বন্ধু ঘরে অন্ধকারে তারে ছিলাম ভুলে
মনের মানুষ দিয়েছে সই মনের দুয়ার খুলে
রে সই কেমনে রই ভুলে;
তোরা যা বলিস তা বলিস মোরে রহিবো সহিয়া।।
বিরাম হারা নদী চলে চাহে না পিছনে
কূলের নেশায় ভুলে না সে সাগর আলিঙ্গনে
সে সই জীবন সম্মিলনে;
কতো বাঁধা বুকে থাকে ফেলে যায় ভাঙ্গিয়া।।
পাপড়ি ঢাকা ঘোমটা খুলে ফুলের দেশের মেয়ে
ভগ্ন বুকে নগ্ন মুখে আসে কেন ধেয়ে
বেকার মুখের পানে চেয়ে;
সে কোন পিয়াসে কাঁদে হাসে যামিনী জাগিয়া।।
পাগল বিজয় বলে এমনি করে পাইবো তার সাড়া
পরান বন্ধুরা মধুর ডাকে হইবো ঘর ছাড়া
রে সই ভালো মন্দ হারা;
আমি বিকাইবো আপনারে বিরাগে রাগিয়া।

৬৬

যার অন্তরে লেগেছে সই কৃষ্ণ প্রেম পীরিতের রেখা,
ও তার লোভ মেটে না ক্ষোভ ছোটে না যেমন ওঠে না পাষাণের রেখা।।
জ্বলিছে মরম ব্যথায়, বলিতে না পারে কথায়
কি ব্যথা সে জানে একা
তার বুক ফেটে যায় মুখ ফোটে না যেমন বোরা লোকের স্বপ্ন দেখা।
বাহিরে যতোজল ঢালো, অন্তর পুড়ে হয় তার কালো
এমনি সে অগ্নির দাহিকা;
যেমন কলের জাহাজ জলে চলে তার বুকে জ্বলে অগ্নি শিখা।।
মুখ দেখে দুখ বুঝে লবে, এমন দুখ দরদী কেউ নাই ভবে
বিনা সে মরম সখা;
আমি বুক চিরে দুখ দেখাইতাম যদি পেতাম সে নিঠুরের দেখা
বুকে মেরে মিছরির ছুরি, মন প্রাণ করে চুরি
প্রেম পীরিতের এমনি ঠেকা;
পাগল বিজয় বলে ভালোবেসে সাজিলাম দুনিয়ার ন্যাকা।।

৬৭

আমি তোমার সাথে কইবো কথা অতি গোপনে আমার গোপন বান্ধবরে
কেউ জানবে না জানবো শুধু আমরা দু’জনে
ঘন জনপূর্ণ নির্জন বাসরে মানস কাননে।।
তোমা হারা ব্যথা ভরা এ জীবন আমার
কতো কাল চলিবে আমার ব্যথার অভিসার
কবে এই পথের শেষ হবে আমার তোমার মিলন প্রাঙ্গণে।।
ব্যথার আসন পাতিয়াছি ফুলশয্যার পরে
অনিমেষ নয়নে আছি বেদনা ভরে,
কবে আসবে এই কুঞ্জ বাসরে নীরব চরণে।।
কতো কিছু পেলাম ভবে জড়ো সূক্ষ্ম স্থুল,
তোমারে না পেলে আমার সকল পাওয়া ভুল;
সকল বিপদে ঐ শ্রীপদ মূল সম্পদ সম্পাদনে।।
কালচক্রে এলাম পেলাম এ-সংসার
পাগল বিজয় বলে হলো শুধু আসা যাওয়া সার,
শুধু নিজেকে সাজালাম আমার মায়ার ভূষণে।।

৬৮

আমি যারে ভালো বেসেছি হোক সে যতোই কালো
সে যে কতো ভালো তোরা তো তা জানিস না,
কতো রঙ বেরঙের মানুষ দেখলাম সইরে তার মতো লোক দেখলাম না।।
তার কথা কি বলবো সখি, মানুষ না দেবতা সে কি
সইগো গান্ধব কন্দর্প নাকি দেখলেম তারে চিনলেম না,
আমায় কি দিয়া সে কি করিলো ভুলে কূলে রইতে পারি না।।
তার বলা মধুর চলা মধুর, বাঁশী মধুর হাসি মধুর
সইগো চোখের চাহনি মধুর সে মধুর নাই তুলনা,
সে যে পরকে আপন করে সখি কারো আশা মলিন করে না।।
তার সাথে যার সম্বন্ধ, তারাই তারে বলে মন্দ
সই গো সে মোর নয়নানন্দ দেখলে ভুলতে পারি না,
আমার আঁখির দৃষ্টি নিয়ে তারে দেখার মতো দেখলি না।।
ফুল যদি হয় গন্ধনাসা, ভুল যদি হয় ভালোবাসা
সইগো নিভে যায় মিলনের আশা বিধির বিধান তাহা না,
পাগল বিজয় বলে ভুল যদি হয় তবু ভুলেও তাদের ভুলবো না।।

৬৯

আমার বন্ধুকে যে মন্দ বলে তবু মনে বলে সে যে আমার দলের লোক, যতো হিংসা বিদ্বেষ মনে রাখবে তবু তার দিকে থাকে তার চোখ।।
না বুঝে তার মর্ম গাঁথা, লোক তারে বলে যা তা
তবু তো হয় কৃষ্ণ কথা-যদিও বিতৃষ্ণা মূলক,
পড়লে অনিচ্ছায় অমৃতের কুণ্ডে ভবে রয় না জন্ম মৃত্যু শোক।।
প্রাণে অজানা সম্বন্ধ, বলে তার বিরুদ্ধে ভালোমন্দ
তার মধ্যে কৃষ্ণনাম গন্ধ-আনন্দ দায়ক,
বন্ধুর নিন্দার ছলে বন্দনা হয়রে শুনে অন্তরে বাড়ে পুলক।।
ভালো মন্দ মনের বিকার, ইন্দ্রিয়ে তাই করে স্বীকার
না মেনে বিবেকের বিচার মত্ত মর্ত লোক,
তবু খারায়না আত্ম অধিকাররে একদিন পাবে সে সত্যের আলোক।।
বিজয় কয় মোর চলার ছন্দ হয় যদি ঘোর মলিন মন্দ
তাহাতে তাহার সম্বন্ধ-রয় যেন ব্যাপক,
আমার ভালোমন্দ দ্বিধা দ্বন্দ্বরে সবি তার পূজার নৈবেদ্য হোক।।

৭০

প্রাণ সখিরে আমায় কি দিয়ে বুঝাবি বল দেখি
আমার মন নিয়াছে মনের মানুষ-মানুষের কথায় হবে কি।।
আমি প্রথম যে দিন তারে জেনেছি
সে যে কাতো মোর আপনের আপন মনে মেনেছি
এখন ঘর পরকে সকল চিনেছি সেবিনে সরি ফাঁকি।
সে যে আমার কেমন বান্ধব আমি তাহা জানি
তারে কেউ যদি সই মন্দ বলে আমি কি তা মানি,
লোকের বুক ভরা বিষ-মুখ চাপানি কতো কাল সয়ে থাকি।।
এতো কাল আপন ভেবে করলেম যাদের ঘর
এখন ঘর ছাড়া সেই জঙ্গল ভালো আপন চেয়ে পর,
সখি পর বোঝে পরের সমাচার ঘর না ছেড়ে বুঝাবি কি।।
সংসারের সার পেল্লাম না সংসারে দিয়ে ডুব
শুধু মন জোগাতে পারলে লোকে ভালোবাসে খুব,
পাগল বিজয় কান্দে হয়ে বেকুব বুঝেলো না হলো একি।।

৭১

ক্ষ্যাপারে পাগলরে তোর আপন ঘরে বেঁধেছে গোলমাল,
এবার পরের হাতে গেছেরে নিজের ঘরের মালামাল।।
তোর বসত করা ঘরের মধ্যে ছয়জন ফেরে তোর বিরুদ্ধে
একাকী তাহাদের যুদ্ধে পারবি নারে বেসামাল।।
দশজন তোর বাহির দরজায়, ছয়জন তোর ভিতর কামরায়
বিষয়ের বিষ দাঁতে কামড়ায় মোহের মহাকাল,
ও মা আছে পরতন্ত্রে, বিষ চলে তার চালান মন্ত্রে
ষড় রিপুর ষড়যন্ত্রে সব করে দিলো পয়মাল।।
বাহিরে বীরত্বে ভারি ভিতরে প্রবাল অরি
তোর দিয়ে নাকে দড়ি ঘুরায় চিরকাল,
বিষয় সদে হয়ে মত্ত, জাগলোনা আর আত্মতত্ত্ব
ভুলে গেলি পরসার্থ কেবল স্বার্থের ঝামাল।।
টাকা পয়সা সিন্দুক ভরা পার হতে তোর নাই এক কড়া
ঘাটের মাঝি বড়ো কড়া দূরন্ত ভয়াল,
ধুলায় দিয়ে গড়াগড়ি কুড়ায়ে লও পায়ের কড়ি
শ্রী গুরুর চরণে পড়ি নিজেরে করো সামাল।।
অজানা এই সংসার পুরে, পথচিনে মরনি ঘুরে
পড়ে গেছিস অনেক দূরে এলো সন্ধ্যা কাল,
মোহে মুগ্ধমহীতলে, দগ্ধচিত্তে বিজয় বলে
বাস করলেম বাঁশ গাছের তলে ত্যাগ করে কৃষ্ণত মালা।।

৭২

ক্ষ্যাপারে, পাগলরে ভাব না জেনে পীরিত করো না,
এবার সুহৃদ চিনে করো পীরিত কোন অভাব রবে না
মানুষ চিনবি রয়ে সয়ে শাহ স্নিগ্ধ স্বভাব লয়ে
দুগ্ধ হোসেন মুগ্ধ হয়ে দুগ্ধে দিয়ে গোচানা।।
মধু হয় না বল্লার চাকে, ইলিশ মাছ কি বিলে থাকে
কিলাইলে কি কাঁঠাল পাকে সব লোকের জানা,
সুজন সাথে না করলে পীরিত হিতে ফল ফলবে বিপরীত
নষ্ট হবে মানব চরিত চোখ থাকতে হবে কানা।।
প্রেম গাছে চড়িস না শখে ঝকমারি করিস না ঝোকে
কামড়াবে শুধু মৌপোকে মধু মিলবে না;
ডাল ভাঙ্গিয়া তলায় পলে, জনম তোর যাবে বিফলে
যেমন চিনির ভরা ডুবলে জলে কোনো কাজে লাগে না।।
পীরিত করে লাইলী মজনু, বিষাম প্রেমে ভরা তনু
তনুতে নাই অতনু প্রেমের দেওয়ানা;
চণ্ডিদাস পীরিত করে এক মরণে দুইজন মরে
এমন পীরিত যেজন করে মরলেও প্রেম ছোটে না।।
গুণে কর্মে সমান দু’জন মিলিবে সু-জনে সুজন
প্রেম নদীতে ধরবি উজান তীরে ফিরবি না;
বেঁধে রাখবি কাল কৌশলে মাওঙ্গ মাকড়সার জালে
পাগল বিজয় কয় এই কপালে ঘটলো কইসে সাধনা।।

৭৩

বিজলী ঝরা দুপুরের রোধ ঘুঘু পাখীর তান,
ঝাউবনে গাহিছে বায়ু মন ভাঙ্গানো গান
আমার কেন হেন দীপ্রহরে শিহরে পরাণ।।
মরমরিয়া গাছের পাতা ঝরিছে বনে
নাবলা ব্যথা জাগে মরমের কোণে;
একা বসে ভাবি মনে- এস কাহার দান।
চৈতালী জ্বলন্ত রাগে ফাগুনের বিদায়
বনাপোড়া রোদ ঝরে পড়ে আগুনের হাওয়ায়।
মনে পোড়া এক পথিক বাজায় ব্যথার বীনা খান।।
চোখ ঝল সানো বীচিমালা সরবর কাঁপে
পাপড়ী ঝরা ফুলগুলো সব বিদাঘের তাপে,
আরো মাধবী প্রখর তাপে হয়ে আছে স্নান।।
মলিন হয়ে ঝরে পড়ে কুসুম কলি
কোকিলের তাস ভ্রমরের গান বন্ধ সকলি;
ঐ শুকায়ে পড়েছে ঢালি ফোঁটাফুল বাগান।।
পাতার আড়ে লুকায়েছে বোনা পাখীর দল
চাতক চাহিয়া মাঠে শুধু ফটিক জল;
জলে স্থলে জ্বলে অনল কে করে নির্বাণ।।
পাগল বিজয় বলে বনের আগুন মনে জ্বলে মোর
অন্তর বাহিব দগ্ধ করে আমারণ কঠোর;
সে যে সংগোপনে সন্ধানী চোর মারিয়াছে বান।।

৭৪

চোখ গেলো পাখীরে কেন তুই ডাকিস অমন,
কার রূপের ছোঁয়া লেগে চোখে হারায়ে গেছে তোর মন।।
যারে ভালোবেসেছিলি সকল পরাণ দিয়া
তারে মনের মনি কোঠায় রাখতে পারিস নাই বাঁধিয়া,
কেন তার লাগি মরিস কাঁদিয়া যে বুঝলো না তোর বেদনা।।
যার মোহনীয় রূপে মুগ্ধ হলো তোর আঁখি
সে এড়ায়ে চলে গেলো তোরে দিয়ে ফাঁকি,
তাই চোখ গেলো বলিয়া পাখী ডেকে ফিরিস সারা বন।।
চোখ ধাঁধানো রূপের নেশায় দশা এমনি
যার চোখে লেগেছে সেই রূপের পরশমনি,
তার চকিত চোখেরমনি ছুটেছে রূপের পিছন।।
অরূপ স্বরূপের রূরে এরূপ যে জন হয় তার শব্দ,
স্পর্শ রূপ, রস গন্ধ সকলি তন্ময়
পাগল বিজয় কয় এমন মধুময় হবে কি আমার জীবন।

৭৫

সবিনয় নিবেদন আমার অভিনয় নয় ধর্মের রাস্তা;
শুধু মুখ ছুটালে ধর্ম মেলে ধর্ম নয় ভাই আলুর বস্তা।।
বাক্য যেথা নির্বাক হয়ে রয়, মন নে হার মানে মনুরায়
কাজ না করে সাজ পরে তাই পাবি কি কথায়,
আগে খুঁজে দেখ তোর গলদ কোথায় করে লও তাই শায়েস্তা।।
ছদ্মবেশে জীবন কাটালে, ভাবভঙ্গিতে লোকজন মাতালে
কাঁচা বাঁশ ঘৃণ ধরেছে মাচার আথালে,
শুধু ব্যবসার এক দোকান পাতালে নকল মাল দামে সস্তা।।
সু-সজ্জিত তিলক মালায় ইন্দ্রীয় গণ কু-পথে চালায়
পঞ্চমুখ হও মঞ্চপরে বক্তৃতার বেলায়
যেমন ডাক্তার মরে রোগের জ্বালায় রোগীকে দেয় ব্যবস্থা।
মন ভ্রমিছে বাহিরের কার্যে, কাম-ক্রোধ লোভ মোহের সাহায্যে
পাগল বিজয় বলে কেমন যাবে ধর্মের রাজ্যে,
নিছক নিঃস্ব সে এই বিশ্ব মাঝে ঈশ্বরে যার অনাস্থা।

৭৬

পূর্বের বাংলারে মোদের জন্মস্থান
সারা এ পৃথিবীর সেরা প্রকৃতির বিধান।।
তরা এ-তাদর ক্ষেতে, সবুজ রঙের চাঁদর পেতে
আদর সোহাগে মেতে করিছে আহ্বান,
পদ্মবনে থোকা থোকা বিল বিহগী পলাতকা
মুন্দি শালুক চোখা চোখা জোলো ফুল বাগান।।
আগন মাসে ভাঙ্গন লাগে সবুজ নেশায় বিদায় মাগে
সোনালী রঙ মাঠে জাগে পেকে ওঠে ধান,
উঁচু নিচু জমি সমেত সোনার পাতে ঢেকে যায় ক্ষেত
নবান্নোৎসবে হই সমবেত হিন্দু মুসলমান।
কঁচি মায়ায় রাখালে ছেলে প্রাণের দরদ নিয়ে মেলে
মেঠো খেলা কতোই খেলে সব যেন একজন,
ধেনু চরে অবিরত বেনু বাজে রুচি মত
আমি বসে বসে শুনি কতো সেই রাখালীয়া গান।।
এই দেশের এই মাটি ধূলি বন উপবন নদীগুলি
বিজয় বলে কেমনে ভুলি এই মাতৃ-ভূমির দান,
স্বাধীন দেশের এই ক্ষেত খামার বাস করতে ভাই কি ভয় তোমার
ছাড়বো নাকো যতো দিন আমার দেহে আছে প্রাণ।।

৭৭

সুখ দুঃখ মনের ভাবধারা তাছাড়া কি আছে ধারায়,
ভবে কে সুখী আর কে বা দুঃখী বিচারে বুঝে উঠা দায়।।
কেউ বাস করে ত্রিতালাতে, দুঃখ পায় ত্রি-তাপ জ্বালাতে
কেউ থাকে বৃক্ষতলাতে দুঃখের বাতাস লাগে না গায়
ও সে লাভ লোকসানের হিসাব ভুলে স্বভাবে সব অভাব ঘুচায়।।
কেহ-সুখী তৃণ শয্যায়, কেউ দেখে তাই মরে লজ্জায়
সুখে কেউ নিজেকে সাজায়, সত্তর পটি ছেড়া জামায়,
তবু বিশ্বতারে সালাম জানায়, ফেরাউন কারণকে কে চায়।।
রেখে গেছে পাঁকা দলিল নবীজী ইব্রাহীম খলিল
পুত্রতার প্রিয় ইসমাইল কোরবাণী দেয় খোদার দরগায়,
আরো ধন্য ধন্য দাতা কর্ণ দুঃখ নাই তার পুত্রের মায়ায়।।
ক্ষমারমূর্তি যীশু খৃষ্ট বরণ করলো ক্রশ কাঠ,
এই মরণে নাই তার কন্ঠ সুখের হাসি মুখের আভায়
সে যে দুষ্ট গানের মুক্তির তরে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চায়।।
গৌরাঙ্গ করিয়ে চিন্তা অঙ্গে বেঁধে ছিড়াকান্থা
দেখলো সাধনার পন্থা সেদিনে এসে নদীয়ায়,
বিজয় বলে নিতাই কাঁধার ঘায়ে না কাঁদিয়ে সুখেতে বুক জুড়ায়।।
আমার মন চলো যাই ভ্রমণে আর কেহ নয় তুমি আমি শুধু দুইজনে,
দুইজনে, যেথায় জনগণের কোলাহল নাই নিবিড় নির্জনে।।
পবিত্র ব্রহ্ম মুহূর্ত শুভ সু-সময়
সুরভিত ভোরের হাওয়া কুসুম সুষমায়,
যাহা বলা চলে না উপমায় মওহত আস্বাদনে।।
যেখানেতে নদী শুকায় সাগর মিলন গান
নবীন রবীর আলো আসে হাসে ফুল বাগান,
ওঠে ভোরের সঙ্গীত বিহঙ্গের তান আরো ভ্ৰমণ গঞ্জগণে।
নিভে গেছে আকাশ হাত রাতের দীপালী
বিষাদে ধরাতে লুটায় ঝরা শেফালী,
এমন আজব খেলা কোন খেয়ালী, খেলিছে আপন মনে।।
সবুজ ভরা পাতার মাথায় ফোঁটাফুল পাইয়া
সমীরণ শিহরণ জাগায় মৃদুল দোলাইয়া,
যেন নাচিছে এক সাওতালিয়া বনকুসুমের ভূষণে।।
হেসে ওঠে ভোরের সূর্য সৃষ্টির মহিমায়,
প্রভাতে পৃথিবী হাসে তাহার গরিমায়,
এখন মিলায়ে লও তুমি তোমায় শান্ত প্রকৃতির সনে।।

৭৯

ও সেই বকুলতলার ঘাটেরে
আর্মি কেন বা আইলাম, মধুমতির কূলে।।
কেনবা আইলাম কেনবা আইলাম
কেনবা চাইলামরে মুখ তুলে
ও তার ময়ূর পংখী নৌকা দেখেরে
আমার নয়ন গেছে ভুলেরে।।
দেখতে দেখতে ভাটির নদীর বুকে
জোয়ার উঠিলোরে ফুলে
আমার এনো খোঁপা এলায়ে পড়িনোরে,
মাথার ঘোমটা পলো খুলেরে।।
হালচে মাসী লালচে বাদাম দিয়ে
চিকন মান জারে তার দুলে,
খোলা হাওয়ায় দোলা দিয়ে গেলোরে
ও তার মাথার বাবরি চুলেরে।।
নদী চলে সাগর সন্ধানে
ভ্রমর চলেরে ফুলে,
পাগল বিজয় বলে সবার এই অভিসাররে
কেবল তার বিরহ মূলেরে।।

৮০

আমি গানের মালা গাঁথিয়ে রাখিলাম হরষে,
মালা তোমাদিগের গীতি কন্ঠে শোভা পাবে সরসে।।
যখন আমি মাটির ধরাতে রইবো না কানের ইশারাতে
গানের কথায় কথাকবো তোমাদের সাথে,
পারবে মনে বনে মন মিলাতে গানের প্রীতি পরশে।
তোমাদিগের ব্যাকুল আখি ঝরে, কাঁদবে যখন গানের পদ সুরে
আমি রইবো কোন সুদূরে অজানাপুরে,
তোমরা দেখিবে গানের মুকুরে আমরা ছবি মান সে।।
তোমাদিগের করিতে কল্যাণ, জীবনে মোর নাহি কোনো দান।
শুধু মাত্র রেখে গেলাম কয়েকখানি গান,
যেন গানে দেয় সু-পথের সন্ধান চিত্ত রেখে স্ব বশে।।
পাগল বিজয় বলে বিনয় করিয়ে, গানের মাঝে প্রাণের ভাব নিয়ে
আমার কথা কইয়ো দুফোটা চোখের জল দিয়ে,
যেন জুড়ায় আমার পোড়া হিয়ে বিশ্ব পতির প্রেম রসে।।

৮১

আমি কার কাছে ব্যথা জানাই দয়াল আর আমার নালিশের জায়গা নাই।
তুমি ধ্রুবতারা তোমায় চেয়ে অকূল পাথারে কূল পাই।।
তোমারে না ভালোবেসে বিষয় বাসনার আবেশে আত্ম অভিমানে ভেসে ঘুরিয়া ড়াই,
শেষে ঘুরে ফিরে আবার এসে দয়াল তোমার দুয়ারে দাঁড়াই।।
তোমার ইচ্ছাতে আমি, মায়াময় সংসারে নামি
যা কিছু করেছি আমি পাবো কি রেহাই,
তুমি বিচার কর্তা বিশ্ব-স্বামী আমার জমা খরচ তোমার ঠাঁই।।
সুখে জানায় দুখের ইঙ্গিত, দুখে শুনায় সুখের সঙ্গীত
মানবের জীবনে সঞ্চিত সুখ দুঃখ দুই ভাই,
আমি বুঝিয়া তো পাই না মোটে তোমার নিকটে কি চাই।
অনুকূল কি প্রতিকূল বাও, আপন ইচ্ছার তরণী বাও।।
তোমার নদী তোমারি নাও পার হবে সবাই,
তুমি কাঁদাও হাসাও ডুবাও ভাসাও সব করিতে পারো সাঁই।।
পাগল বিজয় বলে দীন বন্ধু বিনা তোমার কৃপা বিন্দু
পাব হতে এই ভবসিন্দু বন্ধু আর কেউ নাই,
এবার পার করো হে নাবিক বন্ধু আমি দেশের মানুষ দেখে বাই।।
কতো দিনে যাবে আমার সন্ধ্যা আহ্নিক মন্ত্ৰ জুপা,
কবে ভাবময় হয়ে আমার নামময় হবে জপা।।
সন্ধ্যা হবে বন্ধ্যা নারীর প্রায় অবিছিন্ন রতিমতি রাখবে পতির প্রায়
যাবে আমি জ্ঞান স্বামীত্বের প্রভায় হবো নিত্য তত্ত্বের আতসপা।।
ষড়রিপু ছেড়ে জড়োটান, ষোড়শ উপাচারে করতে প্রেম নৈবেদ্য দান
পাবে কু-মতি সু-মতির সোপান তখন বিষয়ে হবো বিলোপ।।
হবে ইন্দ্রিয় সংগ্রাম সন্ধিরে, ইন্দ্রিয়গণ বন্দী হবে কদ্ধন মন্দিরে
তখন লাভ হবে ভাব সমাধীরে হবো উদ্ধারেতা শুদ্ধতপা।।
পাগল বিজয় বলে অন্তর দেবতা, অন্তরযামী জানো অন্তরের ব্যথা
ছেড়ে সংসারের এই আসারগ কবে খাস মহলে হবে রফা।।

৮৩

সাধের জনম গেলো বয়েরে সুখের জীবন গেলো ক্ষয়েরে
ও মন যা করবার তা এই বার করে রাখ,
ও তুই কান পেতে শোন পিছনে তোর বাজিছে যমের জয় ঢাকা।
বাল্যকাল কেটে গেলো তো খেলা ধুলাতে,
যৌবনে ঘুমায়ে রইলি যৌবন দোলাতে,
তুই শেষকালে পড়বি ঘোলাতে এসেছে ওপারের ডাক।।
সোনার স্বপন দেখেছিস মন বাসনার বসে
কি পেয়েছিস দেশে নিবি শেষের দিবসে,
তুই নিজের কাছে বসে বসে হিসাব নিকাশ করে দেখ।।
দুর্লভ মানবজনম মন তোর এলো ফুরায়ে
যা কিছু স্বভাবের অবার এইবার লহো পুরায়ে,
নইলে আবার মারবে ঘুরায়ে আশি লক্ষের ঘূর্ণিপাক।।
পাগল বিজয় বলে বিভোর আছো বিষর বৈভবে
স্বার্থের নেশায় বিশেহারা আত্মগৌরবে,
ও তোর সকল ছেড়ে যেতে হবে পড়ে রবে হাজার লাখ।।

৮৪

এবার যা হাবার তা হলোরে ভাই
চলো দেশের মানুষ দেশে ফিরে যাই
আমি যা ভাবলাম তা হলো নারে
যা না ভাবলাম হইলো তাই।।
সৃষ্টির সেরা প্রথম হতে, উবিয়ে এই জীবন রথে
এসে এখন সন্ধ্যার পথে ঘুরিয়ে বেড়াই,
পথে রূপের ঝর্ণা ভাবের বন্যারে কতো হাসি কান্না দেখতে পাই।
ভেঙ্গে গেছে দিনের মেলা, অন্ধকারে সন্ধ্যা বেলা
দাঁড়ায়ে রয়েছি একেলা ব্যাকুল চোখে চাই,
আমার দেশে যাওয়ার পথের সন্ধানরে আমি আধারে কারে শুধাই।।
ভবের হাটে হেটে হেটে, দিনতো প্রায় গিয়াছে কেটে
সারা জীবন খাটনী খেটে কি পেয়েছ ভাই,
যদি কেহ কিছু পেয়ে থাকোরে হারে আমি তো কিছু পাই নাই।।
পাগল বিজয় বলে আঁধারে রাতি, কেহ নাই পথের সাথী
খুঁজিছে পথ পাতি পাতি যাত্রীরা সবাই,
কেবল চলার পথের চির সাথীরে সেই দীন দরদী মালিক সাঁই।

৮৫

ওরে সুন্দর কালোর পাশে আলো হাসে ফুল ফোঁটা কদম বনে,
সে যে পাগল করা যুগল ছবি দেখনা যুগল নয়নে।।
কাজলা মেঘে আঁচলা টানি বিদ্যুৎ বরণ মেয়ে
সোহাগ জড়ায়ে আছে তার প্রাণ বন্ধুকে পেয়ে,
একাধারে ভোরের আলো বাঁধা পলো সন্ধ্যার কালো
কাতো ঘুমন্ত মানুষ জাগালো মোহন রূপের সন্ধানে।।
চকিত চোখের চাওয়ায় চমকে বিশ্ব
নীরব প্রকৃতি চেয়ে দেখে সেই দৃশ্য
দক্ষিণ হাওয়া অঙ্গে বুলায় কোন সে প্রিয়া চামর ঢুলায়
কতো অভিমানীর মন প্রাণ ভুলায় সেরূপ দরশনে।।
অকূল আকুল ছোঁয়ায় দু’কল ধোয়ারে
নীল যমুনার উছলবারি ভরা জোয়ারে,
দোয়েল চন্দনা বুলবুলি, বন্দনা গাহে সুর তুলি
নীরবে ঝরে ফুলগুলি পড়ে যুগল চরণে।।
যার অন্তরে লেগেছে সেই স্বরূপের ভাতি
অরূপের এই রূপের ঘরে জ্বরে তার বাতি,
অন্তর তার চির অভ্রান্ত, নিজের মাঝে নিজেই শান্ত
পাগল বিজয় বলে জীবন কান্ত আসবে কি মোর জীবনে।।

৮৬

আমার কৃষ্ণ কানাইয়া সকলি ভুলেছি তোরে পাইয়া,
আমি সকলি ভুলেছি তোরে পাইয়ারে।।
কেলি কদম্বের মূলে যেদিন দেখলাম তোরে পরাণ খুলেরে
গেলি মনের কলে ভাঙ্গন লাগাইয়ারে।।
তোর রূপে পরাণ উঠলো মেতে
আমি পথ ভুলে যাই বাড়ী যেতেরে
আমি কি যেন কি ফেলেছি হারাইয়ারে।।
আমি সকল কিছু পারি ভুলিতে
কেবল পারি না তোর বাঁধন খুলতেরে
রাখলি কেমনে এমন জালে জ়াড়াইয়ারে।।
কবে এসে আমার ভাঙ্গা কুঁড়ে
আমার মাটির আসন বসবি জুড়েরে
পাগল বিজয় আছে আশা পথ চাইয়ারে।।

৮৭

সাতটি বছর পরে মনে পড়েরে সেই রাত ফাগুন মাসে,
সেদিন তুমি আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম যেতস’ বনের পাশে।।
পাতা ঝরা গাছের শাখায় হারে কেমন সোহাগ জাগায়
কাতো নতুন পাতা সেজে কোন পুলকে পরাণ মাতায়,
মধুবাসন্তী বাতাসে।।
দিনের শোভা ভেঙ্গে গেছে তখন কোকিল ঘুমায় আমের গাছে
আজো মনে আছে তুমি নীরবে দাঁড়ায়ে কাছে
থেকে অজানা পিয়াসে।।
হারানো সেই বীণার তারে, আঘাত হানে বারে বারে
বাঁধা মানে নারে সে যে কেঁদে মরে স্মৃতির দ্বারে,
মিলন প্রীতির মুখ বিলাসে।।
পাগল বিজয় কয় দুখের সহিতে কার পথ হারায়ে গেলো মহীতে
কে পারে সহিতে লোকের হারানো পথ খুঁজিতে,
এমন দরদী নাই কারো পার্শ্বে।।

৮৮

আমি বড়ো ভুল করেছি সখারে সেই প্রথম জীবনে,
যখন নন্দ দুলালিয়া আমি ছিলাম বৃন্দাবনে।।
খেলিতাম জলকেলী ভাইরে কেলিকদম্ব ঘাটে
রাখালিয়া বেশে কতো ফিরতাম গোধে মাঠে
সেই খেলায় বেলা কাটে-
কতো অবেলায় আসিতো ঘাটে ব্রজ বালা গণে।।
বাঁশীর সুরে শুনে কানে উঠিতো শিহরী
কলসী কাখে গোপন ফাঁকে আসিতো কিশোরী
বেড়াই কুল মানপাশরী-
তারে এখনো আছি বিস্মরি দাগা দিয়ে মনে।।
আশার বাণী দিলাম কতো ভালোবাসার ছলে
কাঁদায়েছি কতো তারে বিজন বিরলে
রে ভাই নীরব কানন তলে-
ও সে কতোকি জানাতো বসে সজল নয়নে।।
পরের কান্না ডেকে ভাইরে আনলাম আপন ঘরে।
কাঁদাইলে কাঁদিতে হয় বুঝলাম এতো পরে
রে ভাই মরণ বিদরে
পাগল বিজয়ের মন ব্যাকুল করে অকূল ক্রন্দনে।

৮৯

পরাণ প্রিয়রে প্রাণের বান্ধবরে আমি আর কতো কাল রইবো
তোমার আশাতে,
আমার এ-জীবন ফুরালো বধূ শুধু কাঁদা হাসাতে।।
তোমাকে মোর পেতে হবে সে পথে খুজলাম না
কি চাইলাম আর কি পাইলাম কিছুই বুঝলাম না,
এমন একজন দরদী পাইলাম না আখির বারি মোছাতে।।
ভালো বেসে যখন যারে বুকে দিলাম ঠাঁই
না বলে গিয়াছে চলে নাই সে আমার নাই,
এখন তোমা ছাড়া কার কাছে যাই মনের ব্যথা জানাতে।।
সিন্দু বুকে বারি বিন্দু তরঙ্গে হাসে
বিশ্ব সাগর ঢেউ খেলিয়ে রূপরসে ভাসে
হহা কোথা হতে যায় আর আসে বোঝান যায় ভাষাতে।।
বিশ্ব ভরা দেখি শুধু বিস্ময়ের বিষয়
কায়া প্রাণে নাই সমন্ধ মায়ার অভিনয়
পাগল বিজয় বলে কেউ কারো নয় পরবাসের বাসাতে।।

৯০

ওপারে মোর বন্ধু থাকে এপারে মোর কুঁড়ে খানি,
আমি কাজের ফাঁকে দেখি তাকে ডাকে সে দিয়ে হাতছানি।।
তালগাছের ঐ মারি মারি, আছে তার পাশে মোর বন্ধুর বাড়ী
আমি কেমন করে ধরবো পাড়ি পাথারে সাঁতার না জানি।।
পোষা পায়রা বন্ধুর বাসে, তারা উড়াল দিয়ে এপার আসে
আমার ভাঙা কুঁড়ের চালে বসে তার খবর দেয় আমায় আনি।।
দিবাকর বসিলে পাটে, আমি ত খনে যাই জলের ঘাটে
শুনতে পাই সেই সাজের মাঠে ভালোবাসার আশা বাণী।।
পাগল বিজয় কয় সে দূরে থাকে, যদি মিলন কুঞ্জে না পাই তাকে
যেন আমার কথা মনে না রেখে-এ জীবন তাই ধন্য মানি।।

৯১

ওদের দরদিয়ারে কোন দেশে যাবো তোর লাগিয়ারে,
আমার জীবনে মরণে সুখ নাই ও মুখ না দেখিয়ারে।।
ঝিল্লি মুখর ঘর বাড়ী সব রজনী নিঝুম
একা একা বসে আছি চোখে নাই মোর ঘুম;
কাঁদে আমার সাথে বনের কুসুম-যামিনী জাগিয়ারে।।
আধ ফালি এক চাঁদের হাসি শেফালী বনে
ফুলশাখায় দোলায় গেলো মলয় পবনে,
আছি প্রতীক্ষায় শূন্য ভবনে মিলন সোহাগিয়ারে।।
আনমনা এক বোনা মেয়ে কাঁদিছে চেয়ে
আঁখির বারি ঝরেছে তার পাতাব ঠোঁট বেয়ে,
আরো তটিনী চলেছে ধেয়ে সেকার তালাসিয়ারে।।
বিরহী পরান আমার খুঁজিছে সাথী
বাসনার মালিকা ভরি মালিকা গাঁথি,
পাগল বিজয় আছে আসন পাতি বাসর বিলাসিয়ারে।।

৯২

সেদিন চপলছন্দে গেলে তোমার চলা রাস্তা দিয়া প্রাণ বধুয়ারে
আমি তখন দাঁড়ানো ছিলাম পাশে।।
গেলে তুমি ধীরে ধীরে, চাইলে কতো ফিরে ফিরে
মন তটিনীর তীরে তীরে আশার জোয়ার আসে,
আমার বিরহী প্রাণ বিভোর হলো তোমার মিলন বিলাসে।।
বিহঙ্গ বিধিয়া শরে যে বেদনায় কেঁদে মরে
বাঁধে না ব্যাধের অন্তরে কি জ্বালা সেই বিষে,
জানি শিকার করা স্বভাব যাদের তারা পরের পরান নাশে।।
কোনবা দেশে তোমার বাসা, বোঝ নাকি ভালোবাসা
খোঁজ নাকি প্রাণে ভাষা নীবর উচ্ছ্বাসে,
আমার মন কেন হইল এমন তোমার পীরিতী পিয়াসে।।
মন মজানো পরান প্রিয়, এই পথে আবার আসিয়ো
উড়াইয়ে উত্তরিয়ো বাসন্তী বাতাসে,
আমার চিত্ত চশের বিভোর হলো তোমার রূপ সুধার আশে।
পাগল বিজয় বলে ধরা দিতে, যদি না চায় তোমার চিতে
আঁখি মোর চাহে দেখিতে মানা মানে নাশে,
তোমায় দূরে থেকে বাসবো ভালো যেমন চাঁদকে ভালোবাসে।।

৯৩

ওপার তুমি এপার আমি মাঝখানে এক সীমারেখা,
সেতো বেশী পথ নয় হাত-আষ্টেক নয় পার হতে তাই বিষম ঠেকা।।
সীমান্তের সব অফিসারে, তারা কাজ করে না অবিচারের
আইন মাফিক অনুসারে মানতে হয় আদেশ পত্রিকা,
সেথায় চলবে না কোনো চালাকী খাটবে নাকো ফাঁকি ফেকা।।
হারায়ে সৎ পথের দিশা, না করিয়ে পাসপোর্ট ভিসা
গোপন পথে যাওয়া আসা অতি ভয়ানক ভূমিকা,
পথে জনসাধারণ অসাধারণ দেখায় শরণ বিভীষিকা।।
পশু পক্ষী কীটপতঙ্গ, তাদের নাইতো বঙ্গভঙ্গ।
পশ্চিম কিংবা পূববঙ্গ, সব যেন তাদের এলাকা,
তার এপার ওপার ঘুরে বেড়ায় লাগে না সরকারী লেখা।।
তোমার লাগিয়া দরদী, বহে নয়নে নীর নিরবধি
এড়ায়ে যেতাম নদনদী বিধি যদি দিতো পাখা,
পাগল বিজয় বলে উড়ে গিয়ে দেখে আসতেম চোখের দেখা।।

৯৪

শ্রাবণ এলো প্লাবন এলো আগে মতো ওই,
এমনি দিনের হারানো মন সে আর এলো কই
আমার মনের মানিক মেনে কোথায় কার কাছে তার সন্ধান লই।।
বড়ো আশায় ঘর বাধিলাম চূর্ণী নদীর পাড়ে
ভাসায়ে নিয়ে গেল এক শ্রাবণ ঘূর্ণী ঝড়ে,
আমি ভাঙা চরে আছি পড়ে, আজিও পথ চেয়ে রই।।
নদীর বুকে উছলে ওঠে পুরাণো কথা
তুফান হয়ে তীরে গিয়ে জানায় সকল ব্যথা,
আমার প্রাণের ব্যথা মনের কথা কে আছে কার কাছে কই।।
বিরহী বিহঙ্গ ডাকে বনের গাছে গাছে
মনের ব্যথা বুঝিবে তার এমন কে বা আছে,
কভু ফিরবে না সে যার যা গেছে যতন তার করো যতেই।।
ভাঙা গড়া বিধির খেলা সংসার সমুদ্রে
কেহ চলিতে পারে না তার বিধির বিরুদ্ধে
পাগল বিজয় বলে লাভের মধ্যে হাসি কান্নার বোঝা বই।।

৯৫

তোমার কাছে যখন থাকি, হৃদয় ভরে তোমার ডাকি
তখন কতো ভালো লাগে আমারে,
তখন সুন্দর ভুবন দর্শন শ্রবণ সুন্দর পবন সঞ্চারে
সুন্দর ভবন জীবন যৌবন সুন্দর বন বসন্ত বাহারে।।
তোমায় ছেড়ে যখন দূরে যাই,
আমার সাজে আমার কাজে আমি বড়ো লজ্জা পাই,
আমি কেমন করে এই সুখ দেখাই দেবতা তোমার ধারে,
আমায় আমি আড়াল করে দাঁড়িয়ে রই মোহের আঁধার।।
চাহি না যখন তোমার দিনে,
বিশ্বজগত বিমুখ তখন আমার মুখ দেখে,
তখন শূধা না কেউ আমায় ডেকে
বঞ্চিত হই সবার দ্বারে খালি হাতে ফেরে না কেউ দীনবন্ধু
তোমার দুয়ারে।।
তুমি কভু কাণ্ডারী হও যার,
জলের কুম্ভির গুন টানে তার বাঘে টানে দাঁড়,
ও তার যেমন ফাগুন তেমন আষাঢ় ভয় কি ভব পাথারে
নামের বাদাম টেনে নৌকায় চলে যায় আনন্দ বাজারে।।
পাগল বিজয় বলে হে প্ৰাণ প্ৰিয়,
ভুল পথে যদি যাই আমি তুমি ফিরায়ে নিয়ো,
তোমার চরণ তলে বাসতে দিয়ো ভুলিয়ো না আমারে
জীবনে মরণে যেন আমি ভুলে না যাই তোমারে।।

৯৬

ধনে জনে সংসারে আছি মগন ওরে দয়াল
তোমার লাগি কাঁদে কেন মন,
তুমি কি হও আমার বুঝাইয়ে দাও গো
জীবনে তো দেখি নাই তুমি কেমন।।
জানি না তো তোমার পরিচয়
তবু আমার ভিখারী হৃদয় চাহে তোমার চরণে আশ্রয়
দেখলাম ভোগের মাঝে রোগের বিষয় গো
সংসার সুখে সারে না বুকের বেদন।।
যাদের আমি আপন আপন কই, স্বপনের সেই খেলার সাথী ঐ
অজানা বান্ধব আমার কই কভু পরান জুড়ায় না তোমরা বই গো
অজানা কি মানুষের এতো আপন।।
ঘুরে ফিরে সংসারে পাছে, যাহা পেলাম সংসারের কাছে
ভাবলাম সকল অভাব গিয়াছে দেখি সকল পাওয়া এখন বাকি আছে গো
যে পাওয়াতে চাওয়া পাওয়া হয় বারণ।।
পশু পাখী কীট পতঙ্গ আর মানব জনম সকল জন্মের সার
এই জন্ম খাঁটি পথ সাধনায় পাগল বিজয়ের ভানা এবার গো
তারে ছেড়ে বিফল ঐ মানব জীবন।।

৯৭

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে রাম,
নামে শোক দুঃখ তাপ যাবে সবি গাহোরে মন অবিরাম।।
নামে হাসা নামে কাঁদা, নামে ঘোচে মাখার ধাঁধা
আছে নামের মাঝে নিত্য বাঁধা চিত্ত বিনোদ রাধা শ্যাম।।
নামেতে প্রেমে ভাসাবে, কামের কামনা যাবে
হৃদ কমলে দেখতে পাবে ধ্যানের ঠাকুর প্রাণারাম।।
এই নাম যার একমাত্র লক্ষ্য, লক্ষ কোটি তার উপলক্ষ
সে তো আর করে না লক্ষ্য ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম।।
রেচক পূরক কুম্ভকাদি, নামে ঘটে ভাব সমাধি
নামে কালের কাল হয় সালতামাদি হরিণামের পরিণাম।।
যাগ যজ্ঞ কর্মের বাঁধন, মরমে নামে না কাঁদন
পাগল বিজয় বলে ভজন সাধন তারক ব্রহ্ম হরিণাম।।

৯৮

প্রেম ভক্তি জ্ঞান যে গান গেয়ে জাগে না হৃদয় তল,
সে গান গেয়ে আছে কি তোর ফল,
বল মন সে গান গেয়ে আছি কি তোর ফল,
যে গানেতে তাহার নামে নামে না প্রেম অশ্রু জল।।
প্রেমে দেখায় সবাই সমান, ভক্তি দেখায় মুক্ত সোপান
জ্ঞান করে পথের সন্ধান-সহজও সরল
প্রেম শক্তি জ্ঞান লাভ হইলে কর্ম হয় ধর্ম উজ্জল।
এই ত্রিবেনীতে স্নান করিলে তাপিত প্রাণ হবে শীতল।।
এক ফোঁটা প্রেম অশ্রুবিন্দু, তারি মধ্যে লুকানো সিন্দু
মুসলিম খৃষ্টান কিবা হিন্দু স্বভাবের বিহবল,
সুরে সুরধনী ছুটে ফোঁটে হৃদয় শতদল
তাহা ইহ পরকালে থাকে পরিপূর্ণ পরিমল।
যদি গানে আনে উন্মাদনা, সে গান শুনলে হবে গোনা
পবিত্র কোরানে মানা রয়েছে প্রবল,
ছোরা লোকমানে মালিক রহমান জানায়েছে অবিকল
যাতে প্রাণের পরশ মেলে নাকো সে যে কলের গানের কোলাহল।।
সর্ব শাস্ত্রে আছে ইঙ্গিত, সাত্বিক জ্ঞান আধ্যাত্যিক সঙ্গীত
প্রেমাজ্ঞনে হলে রঞ্জিত নয়ন যুগল,
তখন দর্শন শ্রবণ পরিবর্তন হবে চির নিরমল
তখন গান হবে তার গুণ কীর্তন আরো কাওয়ালী গজল।।
পাগল বিজয় বলে বিনয় করে, প্রিয়তমের প্রীতির ডোরে
কবে আমি বাঁধবো মোরে নিশ্চিত নিশ্চল,
সরস প্রাণ ভালোবেসে কাঁদবো বসে অবিরল
যেন পৌঁছায় আমার নয়ন বারি দীন বন্ধুর চরণ তল।।

৯৯

আল্লা রসূর বল, বল মোমিন আল্লা রসূল বল,
এবার দূরে ফেলে মায়ার বোজা সোজা পথে চল।।
ফোরকানে ফরমান করেছেন পরোয়ার পাকজাত
নামাজ রোজা সই রাখিয়ো হজ্ব আর জাকাত-
দিবে ফরজ সুন্নত উন্নত পথ-জান্নাতে দখল।।
কালেবে কলেমা জপ ঈমানের সাথে।
হায়াত মউত রেজেক, দৌলত সবি তার হাতে-
কূল পাবি সেই পুলসিরাতে-হবি না দুর্বল।
লা-শারিকায়ালা মাবুদ পাক নিরঞ্জন
এবং এব অদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম সনাতন-
যেজন বিধি নিষেধ করে পালন-জনম তার সফল।।
আলহামদুলিল্লাহে রাব্বিল আলামিন
মুশকিলে আছান দিবে সেই রোজ হাশরের দিন-
দয়াল রসূল তার হয়েছেন জামিন-উম্মাতের সম্বল।।
পাগল বিজয় বলে বেদ- কোরান আর বাইবেল বেদান্ত
ভর দুনিয়ায় আশ্বাস জোগায় আসমানী গ্রন্থ-
যেজন নিত্যভাবে চিরশান্ত-চিত্ত তার নির্মল।।

১০০

একখান মন ভোলানো ছবিরে দেখে যা সুবলরে,
ও তার রূপে কিরণ ছড়িয়ে দিলোরে ঠিক শরৎপ্রাতের রবিরে।।
জল আনতে যায় যমুনার কূলে
বারেক মাত্র চাইলো মুখ তুলে
আমার ধেনু চরান বেনু বাজানরে আমি ভুলে গেছি সবিরে।
ঢেউ দিয়ে জল ভরে ধনি সঙ্গে নাই তার কেউ,
আমার মনে দোলা দেয় তার জল তুলানো ঢেউ।।
কেনবা আমি এ পথে এলাম
কি হতে ভাই কি হয়ে গেলাম-
তোরা একবার যদি দেখিস তারে রে ঠিক আমার মত হবিরে।।
লাল হলো ভাই নীল যমুনা তার রূপ রঙিমায়
ছন্দ তাহার কবিতাময় চলার ভঙ্গিমায়।
পাগল বিজয় কয় সে রূপের পিপাসায়,
দাঁড়িয়ে শ্যাম আছে কি’ আশায়-
ও তাই প্রকাশিতে ভাবে ভাষায়রে সাজলো রূপে পাগল কবিরে।।

১০১

যে ধূলায় অংকিত আছে শ্রীমতির চরণ
কানু পদ রেনু মাখা এই সেই বৃন্দাবন,
এ যে বিরিঞ্চি বাছিত ব্রজ শিবের আলম্বন।।
উঠেছিলো বংশীধ্বনী এই সে বংশী বট,
জল নিয়ে আসিতো রাধা এই যমুনার তট
আছে তাল-তমাল-শাল গোকুল জাপট-
শ্রীনন্দের ভবন।।
পড়ে আছে বেনু ধরের ধেনু চরার মাঠ,
সেই কদম গাছ আজো আছে বসনচুরির ঘাট
আছে রাই শ্যামের মিলন মন্দির নাট-
নিকুঞ্জ কানন।।
কেশী ঘাটে কেশী দৈত্যের হত হলো প্রাণ,
শ্যামকুন্ত আর রাধা কুণ্ড আজো বর্তমান
আছে আয়ানের গো-মহিস বাথনি-
গিরি গোবর্ধন।।
গোপনে গোপনীর ননী যখন খেয়েছে,
হস্ত মুছে রাখিতো শ্যাম তমালের গাছে
তার স্মৃতি চিহ্ন আজো আছে-
প্রীতির নিদর্শন।।
নিধু বনে কৃষ্ণ-কালী বিধু মুখীর দায়
অতীতের ইতিহাস আজো সবুজ বনছায়
আছে জমলার্জনু ভগ্ন দশায়-
কালিয় দমন।।
পাগর বিজয় বলে শ্রম স্বার্থক ব্রজের মহিমায়,
গৌরব মেনেছি মনে যাহার গরিমায়
সেই ধ্যানের ছবি জ্ঞানের সীমায়-
করলাম দর্শন।।

১০২

তুমি যে-
দেশে বাস করোরে বন্ধু সে দেশ যেন কতই সুন্দর,
তোমার নন্দন কানন আনন্দধাম দেখে হার মানে স্বর্গের পুরন্দর।।
তোমার দেশের ফোটা ফুলে, ঝরে না সে বোঁটা খুলে,
কার কথা কেউ যায় না ভুলে তোমার দেশের নারী নর-
মরে আমিত্ব ঠেকিয়ে লাজে মেথা দেখিয়ে স্বামীত্বের দর।
তোমার দেশের গাঙ্গের জলে, কুলে ভাঙ্গে না কলরোলে,
হারানো মানিক দোরে সাগর বুকে ঢেউয়ের পর-
কিছু হারায় নাকো তোমার দেশে করে মরণে জীবনে ভর।।
আবেগে মাখা মেঘের পরে, তোমার দেশের রবী করে,
হারা মনের ছবি করে বিরহীর প্রাণ প্রিয়তর-
সেথা চাদের গায় কলংক নাহি কারো নাহি কলংকের ভর।।
তোমার দেশের আকাশ আলো, জলবায়ু স্থল খুবই ভালো,
যে ভালো তার সবই ভালো ভলো নাই সে ভালোর পর-
পাগল বিজয় কয় আকুল পিয়াসে তোমার বাড়ীর পাশে বাঁধিঘর।।

১০৩

কি সাপে কামড়ালো আমারে ওরে সাপুড়িয়া
জ্বলিয়া পুড়িয়া মলেম বিষে,
আমার বিষ গুণে জ্বলেছে এ-বিষ জুড়াইব কিসে।।
হাস্নাহেনা হাসতে ছিলো সন্ধ্যার আঁধারে
দাঁড়িয়ে ছিলেম তখন আমি তার ধারে,
ও সেই সাপ ছিলো সেই ঝোপের আড়ে আগে পাই নাই দিশে।।
চিকন কালো সাপ যেরে তার মাথায় মানিক জ্বলে
হাস্না ফুলের গন্ধের আশে ছিলো ঝোপের তলে,
ও তার বিষ উঠেছে জ্বলে জ্বলে রক্ত ধারে মিশে।
আগে যদি জানতেম সেইা বিষের এতো তাপ
ঘর বাঁধিতাম হাওয়াই দ্বীপে যে দেশে নাই সাপ,
না হয় লইতাম এড়াইতে এই তাপ ওঝার পরামিশে।।
পাগল বিজয় বসে সাপের লেখা এড়ানো না যায়
বনের সাপে নয়তো এ যে মনের সাপে খায়,
এমন দংশেছে অনেকের হিয়ায় দারুণ আশীবিষে।।

১০৪

কতো ভালো লাগে তোমারে কিশোর বন্ধু বাঁশিয়ারে,
তোমার বাশী শুনে বনে আসি সকল পাশরিয়ারে।।
রোজ বিকালে এই পথ দিয়ে এমনি করে যাও,
আড় বাঁশী বাজায়ে তুমি আড় নয়নে চাও-
তোমার আসার সাড়া পেয়ে, আশা পথ থাকি চেয়ে –
কবে আসবে তুমি এই পথ বেয়ে বাঁশরী বাজায়েরে।।
কি যেন কি জাগে তোমার বাঁশের বাশীর গানে,
কতো সুন্দর লাগে বন্ধু বুঝি নাই তার মানে
না বোঝা সেই গানের ভাষায়, কেন আমায় কাঁদায় হাসায়
আমায় একবার ডুবায় একবার ভাষায়, মরমে মরিয়ারে।।
জীবনে দেখি নাই তোমায় তবু যেন চিনি,
অজানা কি এতো আপন সকল আপন যিনি-
আমি কবে আপন হবো, গোপন কথা ভেঙে কবো
কবে আমার আমি তোমায় দেব সহজে ভরিয়ারে।।
চকিত চরণে মানুষ এসে বাড়ীর ধারে,
আঘাত দিয়ে ফেরে সে মনের গোপন দ্বারে-
পাগল বিজয় বলে এমনি করে কতোবার সে গেছে সরে
আমি ঘুরে মরি জমন ভরে সকলি হারাইয়ারে।।

১০৫

এসো নন্দলালা বংশীয়ালা শ্যাম সুন্দর,
এসো ব্ৰজ বিলাসিয়া রাধা বিনোদিয়া
বাঞ্জিত বিরিঞ্চি দিগম্বর।।
গিরিধারী গোপাল শ্রী মধুসদন,
মুরারী দামোদর আর নিসূদম।
এসো মানস মোহন তামসদহন-
প্রিয়তম প্রেম পিতাম্বর।
উত্তম অনুপম নমর নারায়ণ,
প্রেম অনুরক্ত ভক্ত পরায়ণ।
এসো নয়ন রঞ্জক বিপদ ভঞ্জন-
গোকুল কুলপুরন্দর।।
পাগল বিজয় বলে এসো হে মাধব,
তুলসী জল সহ আঁখি জল দিব।
আমি পরাইবো চন্দন করাইব বন্ধন-
ভরাইবো হৃদয় কন্দর।।

১০৬

কুল ছেড়ে কালো মানিক সাজাই ফুল বিছানা
পর কাঁদানো পরবাসী তোমার মন পেলাম না,
আমার ঘর হলো বন বন হলো ঘর পর হলো আপনজনা।।
তোমার আগমন বাণী, দখিন হাওয়ায় দেয় শুনানী
চমকে উঠি ফুল বনানী ব্যাকুল বেদনা,
আমি একা বসি নির্জনে আমার নয়নে ঘুম আসে না।।
বন্ধু তোমার আমার আশে, ঘর বাঁধিলাম পথের পাশে
শূন্য বুকে মধু মাসে আমি আমনা,
আমি প্রহর গুণি দিবারাতি এ পথে আর এলে না।।
পরাণে পীরিতী জাগে, এ জ্বালা বুঝি নাই আগে
অনুদিন অনুরাগে করি তোমার সাধনা,
তোমায় দেখলে আমার যেমন লাগে তোমার তেমন লাগে না।।
ভেবেছিলাম সুজন নেয়ে, দুজনে মিলনেরই গান গেয়ে
উজানতরী যাবো বেয়ে তীরে ফিরবো না,
কতো মাস মাস বয়স গেলো তোমার প্রীতির পরশ দিলে না।
পাগল বিজয় বলে বেদন ভরে, ব্যর্থ সাধন জীবন ভরে
নিকটে গেলে যাও সরে করে ছলনা,
শুধু যতনে বাড়িলো যাতন তোমার মনের মতোন হলাম না।।

১০৭

অনেক দিনের এক বিরহরে অনেক পুরান এ ব্যথারে
আজ আমার মনে পড়ে গেছে-
আমি এতদিন ভুলিয়া ছিলামরে পড়ে বিষয় বাসনা প্যাচে।।
তারে ছেড়ে যেদিন এলাম মরুমরতে
সেই হতে এক বেদনা মোর বুকের পরতে,
সেই বেদনায় নানা পথেরে আমারে ঘুরায়েছে।।
কথা ছিলো দেখা হবে সাগর বেলায়
সে দিন আমার হয়নি যাওয়া মিলন মেলায়,
আমি মজিয়ে এক রঙিন খেলায়রে অনেকপথ পড়লাম পাছে।।
ভুলের জীবন কেটে গেলো শুধু ভুল করে
সন্ধ্যা কালে কাঁদি এখন নদীর কূল ধরে,
এমন করে তারে ছেড়েরে আমার কেমনে পরাণ বাঁচে।।
 সংসারে যা পেয়েছিলাম হারায়েছি তাই,
বুঝেছি হে দীন বন্ধু তোমা বই কেউ নাই,
পাগল বিজয় বলে ব্যথা জানাইরে তোমা বিনা কার কাছে।

১০৮

পরবাসীরে বড় দাগা দিয়ে গেলি আমার মনে,
আমায় নিয়ে যাবে তোমার দেশেরে এই কথাছিলো তোমার সনে।।
ফাগুনের পূর্ণিমা রাতি একলা বসে মালা গাঁথি
সহসা অজানা সাথী-এলো মোর ভবনে,
আমরা মনের কথা মেনেনিলো রে সজল নীবর নিবেদনে
গাঁথা মালা নিয়ে গলে, আসি বলে গেছে চলে
সেই হতে এই বিজন তলে-আছি প্রতিক্ষণে,
তুমি এই পথে আবার আসিও রে আমার আকুল আহবানে।।
ভুলি নাই সে ভালোবাসা, দিন চলে যায় যায়নি আশা
তোমার বাঁশী কুলূনাসা-বাজে ফুল বানে,
তোমার রূপের ছোয়া লেগে আছেরে আমার পথচাওয়া নয়নে
পাগলী বিজয় বলে জীবন ভরে, আর কতো কাদাবে মোরে।।
কাটবে কি দিন এমনি করে- তোমার বিহনে,
কবে রবো আমি তোমার হয়েছে আমার জীবন ও মরণে।।

১০৯

জোয়ার দিয়েরে নায়, বাদাম দিয়েরে নায়
ও তুমি কোন দেশে চলেছ মাঝিরে।।
আমি দূরে বেড়াই গাঙ্গের কূলে কূলে তার
কেঁদে ফিরি নদীর ঘাটে ঘাটে আপন কপালের দোষে
আমি আর কতো কান্দিব বলরে এই পা ঘাটাতে বসে।। (দয়াল চান)
ঘরে ফেরার লোকজন যারা ছিলো
বাড়ী ফেরার লোকজন যারা ছিলো ফিরে গেছে সব ঘরে,
আমি একা একা বসে কান্দিরে নদীর ভাঙ্গন চরে।। (দয়াল চান )
আমার বলতে কেহ নাই এদেশে
নিজের বলতে কিছু নাই এ দেশে আশ্রয় কোথা আর পাবো,
কথাছিলো তোমার নৌকায়রে তোমার দেশে যাবো। (দয়াল চান)
দূর প্রবাসে বিদেশে বাণিজ্যে
দূর বিদেশে প্রবাসে বাণিজ্যে পাঠাইলে যে কইয়া,
কথাছিলো তোমার নৌকায়রে আমায় যাবে লইয়া। (দয়াল চান )
আমার মন টেকে না ভাঙ্গা গড়ার দেশে
প্রাণ টেকে না হাসি কান্নার দেশে বিদেশে পরবাসে,
আমি ঘর বেঁধে বাস করবো সুখেরে তোমার বাড়ীর পাশে। (দয়াল চান )
পাগল বিজয় বলে কয়ে কি বুঝাবো
পাগল বিজয় বলে কি জানাবো পোড়া পরাণের কথা,
তুমি অন্তর জানা মরমীয়ারে জানে সকল ব্যথা।। (দয়াল চান )

১১০

তোমার কতো ভাবে পেলাম পরিচয় স
দয়াময় তবু তো সন্দেহ ঘোচে নাই
করি বিপদে তোমারে নির্ভর দয়ালরে
আবার সম্পদ পেলে ভুলে যাই।।
দুঃখে যখন হেরি নিরুপায়
তখন অনুপায়ের উপায় ভাবি তোমারই ঐ পায়,
আবার দিন পেলে দীননাথ তোমায় রে
তোমায় পাছে ফেলে আগে যাই।।
এইতো সেদিন দেখলাম তোমারে
বিপদ হতে উদ্ধার তুমি করলে আমারে,
আমি থেকে স্বামীত্বের মাঝারে
দয়ালরে মিছে করি আমিত্বের বড়াই।।
নীরবে করেছ সবি দান
চাওনি কিছু পাওনি কোন দানের প্রতিদান
তবু বিশ্বাস ভক্তি অতিশয় স্নান
দয়ালরে কেবল সংশয় লয়ে কাল কাটাই।।
পাগল বিজয় বলে হে চির নির্ভুল
তুমি করে দেহ আমার সন্দেহ নির্মুল,
তুমি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের মূল
দয়ালরে তোমায় এই জ্ঞানের প্রণাম জানাই।।

১১১

পথঢাকা ঐ কাঁশের ফুলে চর জাগানো নদীর কূলে
বাঁশী বাজায় শ্যামল কিশোর,
তার সুর সোহাগে তন্দ্রা লাগে আবেশে তনু বিভোর।।
সাঁঝের বেলায় সাধে পূরবী
বাতাসে ভেসে চলে তার সুরের সুরভি,
আমি হেরিয়ে তার মোহন ছবি হারায়েছি সবি মোর।।
নাচিছে সুরের সুরধ্বনি
আমারে বেঁধেছে তার সেই সুরের জাল বুনি,
এখন সব সুরে তাঁর বাঁশী শুনি নির্দ্বন্ধে সন্ধ্যা কি ভোর।।
নির্জনে নদীর কিনারায়
আনমনা সে বাজায় বাঁশী নীরব নিরালায়
আমার ঘুম আসে না ফুল বিছানায় ঝরঝর আঁখি নোর।।
উদার সুরে ওঠে বাঁশীর তান
ছুটে চলে সারা বিশ্বে বিরাম হারা গান,
পাগল বিজয় কয় জাগাও আমার প্রাণ সেই সুরেতে মন চোর।।

১১২

ওরে কালার প্রেমে এতো জ্বালা হারে আমি আগে জানি নে,
তারে ভালোবেসে কাঁদতে হবে ভাবি নাই কোন দিনে।।
এখন দেখি কান্নার নদী বয়,
চোখ মুছিলে জল মোছে না লোকলজ্জার নাই ভয়,
আমায় যে যতো নিন্দা মন্দ কয় কোনো সংশয় মানিনে।।
মন হারায়ে গেছে প্রাণ সই,
মন দিয়ে সেই মন মানুষের আমি তার মন পেলাম কই,
আমি কেমনে মন ফিরায়ে লই মনের সথে পারিনে।।
তারে ভুলতে গেলে ভুল হয়ে যায় ভুল,
ফুল বাগানে গিয়ে তুমি বন্ধুর পূজার ফুল,
আমার এই ভুল মনে মানি নির্ভুল বিচার বুদ্ধি রাখিনে।
পাগল বিজয়ের এই ব্যথার গান গাওয়া,
কূলের তরী দেই নাই খুলে বয়ে যায় হাওয়া,
আজো হয়নি তরী সামনে বাওয়া পিছন চাওয়া ছাড়িনে।।

১১৩

আমার জাত গিয়াছে সখিরে সেই কালার পীরিতে,
আমার গৃহবাসে মন ভাঙিলো তার বাঁশের বাঁশরীতে।।
জাতি যে বজ্জাতি করে কেবল লজ্জাদি আট পাশে
মনের কথা কইতে দেয় না মন মানুষের পাশে (রে সই মরি পরিহাসে)
তারা কেউ চায় না মোর মুখপানে টানে বিপরীতে।।
যে মালা দিয়েছে কালা গলে পরিয়া
কুলের তাপে সেই মালা ফুল পড়বে না ঝরিয়া (রে সই মরমে মরিয়া)
আমার প্রাণ বন্ধুয়ার দেওয়া মালা দিবো না ছিঁড়িতে।।
পাষাণের গায় দাগ লেগেছে উঠবে না আর ধূলে
কুলের দৃষ্টি ঢেকেছে মোর এই ধরনীর ধূলে
(রে সই ভুলবোনা আর ভুলে)
আমার প্রাণের গোপন নাহি সইরে চাহি না ফিরিতে।।
হাসুক শত্রু দুষুক সমাজ মনের অবিলতায়
পরাণের যোগাযোগ যাদের নাহি পরের ব্যথায়
(রে সই কাজ কি তাদের কথায়)
পাগল বিজয় কয় প্রেমের অভিসার নীরব নিশীথে।।

১১৪

সাতটি বছর আগে মনে জাগেরে সেই দিন বকুল তলে,
যেদিন বিনা সুতের মালাখানি দিয়েছিলাম তোমার গলে।।
ছিলো এমনি সেদিন চাঁদিনী রাত,
তুমি চকিতের ন্যায় এসে হঠাৎ, মিশালে হাতে হাত-
কতো ঝরিলো প্রেমের পারিজাত মোদের রঙিন রঙমহলে।।
সেই মাধবী বকুল তীরে,
আবার সেই চাঁদিনী এলো ধীরে; বাসন্তী সমীরে-
কেবল তুমি আর এলে না ফিরে আমার ছিন্ন হৃদয় দলে।
গাঁথা মালা কুসুম গুলি,
সকল শুখায়ে হইলো ধূলি ঝরে বাঁধন খুলি-
যে দ্বীপে জ্বেলে জোনাকী গুলি তোমার অভিসারে চলে।।
সাথীহারা পাখিরমিতন
করি মনের দুখে বনে রোদন, কেউ বোঝে না বেদন-
পাগল বিজয় বলে বাকি জীবন শুধু কাটবে চোখের জলে।।

১১৫

দেখলেম কদম তলে জলের ঘাটে সুবলরে সে কোন অচীন
দেশের লোক,
অপরূপ তার রূপের আলোক।।
স্বর্গীয় স্বর্ণ প্রতিমা খান, নন্দন সৌন্দর্য মাখান
সে কোন বিধাতার নির্মাণ,
যে বিধি দিয়েছে গড়ে কেন গড়ে তারে দিলো ছেড়ে
তার বুঝি নাই দেখিবার চোখ।।
মুখ দেখে ফোঁটা ফুলজ্ঞান করে, কতো মধুর গুঞ্জরে
ভ্রমে ভ্রমে ভ্রমরে,
দেখে তার দত্ত কৌমুদী লাজে চাঁদ লুকায় ভাই
আঁখি মুদি ফুলের বনে লেগেছে চসমক।।
লাল হলো ভাই নীল যমুনার কূল, তাল, বকুল
একি রূপ না আমার ভুল
যেন দোল দিয়ে যায় নীল তরঙ্গে আবির ভাঙ্গা রক্ত রঙে
আমার অঙ্গে লেগেছে ঝলক।।
পাগল বিজয় বলে সেরূপ একবার দেখে ভোলে সাধ্য কার
খোলে বন্ধ চোখের দ্বার
তুই তো দেখিস না প্রাণে সুবল আমার মতো
আমি ভাই দেখেছি এক পলক।।

১১৬

ওরে বুকের ব্যথা মুখে বলাদায় নিঠুর কালারে
তোর জ্বালা আর সয় না জীবনে-
তুই মাঠে থাকিস ধেনু রাখিস বুঝবি কেমনে।।
কি মোহনী জানেরে বন্ধু তোর ঐ বাঁশের বাঁশী গোপন প্রাণে দাগা দিলো কোন সন্ধানে আসিরে
গলে পড়লো প্রেমের ফাঁসি,
তোর বাঁশীতে হয়ে উদাসী ছুটে আসি বনে।।
মুখ ফুটে যদিও তোরে কইনি মনের ভাব
চোখের জ্বলে বুঝিস নাই কি অন্তরের অভাব
ওরে এ তোর রাখালে স্বভাব,
তোরে সে দিন দিলাম প্রাণের জবাব প্রথম দরশনে।।
আগে যদি জানিতাম রে তোর কুটিল পীরিতী
ভুল করে দেখিতাম না তোর কুলনামা মূরতি
এ-মন দিতেম না তোর প্রতি,
তোর সর্বনাশা বাঁশীর গীতি শুনতাম না শ্রবণে।।
পাগল বিজয় বলে আশা লতায় নাইবা ফুটলো ফুল
তবু তো মানে না মনে ভালোবাসা ভুল
ওরে প্রিয় পরাণ পুতুল,
আমি তোর লাগি সাজিয়ে বাউল বাস করবো বিজনে।।

১১৭

কোথা হতে এলাম এই দেশে, ইহার পর যাবো কোন দেশে
আমি চলেছি কার গোপন ইশারায়-

আমার যেমন আসা তেমনি যাওয়ারে স্রোতের শ্যালকা প্রায়।।
কতো সাথী পাইলাম পথে পথে কতো সাথী হইলাম হারা
অসীমের অচেনা পথেরে হারিয়ে গেছে তারা,
তাদের আগের মতো পাই না সাড়ারে আমি খুঁজি সারা দুনিয়ায়।।
ঝরনা হতে ছুটিছে তটিনী, সাগর বক্ষবিলাসিনী
কুলে আঘাত দিয়ে চলেরে নীরব ভাষিনী,
সে অভিসার অভিলাষিণীরে শুধু মিলন সিন্ধু অভিপ্রায়।।
আমার জীবন চলনের এই ছন্দ কবে হবে তার শেষ
কতো দিনে ফিরে পাবোরে আমার আপন দেশ,
নিয়ে পরিণামের এই পরিবেশরে সে দেশ খুঁজি আমি নিরালায়।।
পূর্বাচলের সূর্য চলে ধীরে ধরে অস্তাচলের রেখা
আমি যাহার এই জীবনের পাবোকি তার দেখা,
পাগল বিজয় কান্দে একা একা বসে ভাঙ্গন নদীর কিনারায়।

১১৮

আমি কৃষ্ণ বলিয়া ত্যাজিব পরাণ যমুনার নীরে,
কালাকাল বলে গিয়েছে সইরে সেই কালের শেষ নাইরে।।
বাদল ঝরা কাজল আঁখি মানে না মানা
দিগাঞ্চলে মিশে সইরে দৃষ্টির সীমানা,
করি যার লাগিয়া আনাগোনাসে এলো না ফিরে।।
আমার মনের বনে ঘরের কোণে জ্বলে এক আগুন কাল
বৈশাখীর ঝরাপাতায় কাঁদিছে ফাগুন;
সইরে মলয় পবন জ্বালায় দ্বিগুণ কালা বিরহীরে।
শেষের দাবি রইলো সইরে ভুলিস না পাছে
শ্যাম বিহনে শ্যাম দুলালী প্রাণ ত্যাজিয়াছে,
তোরা এই খবর দিস বন্ধুর কাছে আমার মাথার কিরে।।
কোন বিধাতা বানায়েছে এ ভালোবাসা
পাগল বিজয় বরে এ যে শুধু আগুনের বাসা,
যার ঘটে নাই দুর্দশা কে বুঝবে তার কিরে।।

১১৯

মনে মেনেছে আমার জানে জেনেছে তুমি আসতে না
নয়নে ছাড়ে না তবু পথ চাওয়া,
মনে বলে আসবে নামে ময়নে কয় আসে আসে গো
বসে আছি পথের পাশে হলো না ঘরে যাওয়া।।
ভাদর ভরা বিলের মাঝে ছাড়া ভিটের পর
হিজল গাছ ভিজিছে জলে বৃষ্টি ঝরঝর-
পানসী নৌকায় খাটায়ে পাল, কতো মানুষে গাহে ভাটিয়াল গো
হিজল ফুলের গন্ধে মাতাল উদাসী উতল হাওয়া।।
বাদল বাউল মেতেছে তার প্রাণের গান গেয়ে
ধানের ক্ষেতে নাচিছে এক দুলালী মেয়ে-
সবুজ ভরা যৌবন অঙ্গে, কবে মিলবে সোনালী রঙে গো
আমার জীবন মিলন ভঙ্গে বিরহ ব্যথায় ছাওয়া।।
সরবরে সরোজিনী মেঘলা প্রভাতে
দিবাকরে কর পরশ মাগে হিয়াতে-
মেঘে যতো করে নিরাশ তবু ছাড়ে না সে মিলন বিলাস গো আমার তেমনি অভিলাষ না পাওয়ার পরশ পাওয়া।।
পাগল বিজয় বলে বিগত কাল বিস্মৃতির পারে
অজানা কারণে তবু ফিরে চাই তারে-
যারে রেখে বহু দূরে আমি মত্ত আছে মর্ত্যপুরে গো
তারে পাওয়ার ব্যথার মুরে আশার গান গাওয়া।।

১২০

চির সুন্দর এসো বন্ধন মন্দিরে প্রেম আলোকে জ্বালিয়া,
মমপ্রীতি ভকতি প্রেম অর্ঘ্য আজি দিবো পদে ঢালিয়া।।
পুরুষ প্রকৃতি তুমি একেশ্বর,
শ্বাশত অব্যয় তুমি একেশ্বর
তুমি ব্রহ্মা বিষ্ণ তুমি মহেশ্বের তুমি কারী কালিয়া।।
অঙ্গেতে লেগেছে চলবার পথের ধূলি,
জীবনের দিবসে ঘনায়ে যে গোধুলী
মমগোপন অন্তরের অনায়গুলি দাও প্রভু খুলিয়া।।
চালক:
ব্যথা হারি মন থাকিয়ো না আর ভুলিয়া,
আশার বাণী কও আপন হতে কও দেউল দুয়ার খুলিয়া।।
কাঁদিছে বিশ্ব তোমার কারণ
তোমা বিনা অশ্রুকে করে বারণ
অরুণ করুণ সম স্ত্রী করে দাও বুলিয়া।।
সন্ধ্যার আঁধার ওই আসিলো ফিরে,
পারের কাণ্ডারী তুমি অকূল নীরে
পাগল বিজয় কাঁদিছে দাঁড়ায়ে তীরে তরীতে লহো তুলিয়া।।

১২১

এসো প্রিয়তম সুন্দরমম জীবন দেবতা তুমি যে মোর,
বেদন বেদীর আসনের মোহে মুক্ত হৃদয় দেউল দোর।।
কতো নামে ডেকে কতো পথে হেটে
এ জীবনের কতো দিবস গেলো কেটে
বেলা গেলো তবু খেলার সাধনা মেটে কেটে দাও কলুষ মোহঘোর।।
অন্তরের ব্যথা জানো অন্তর্যামী
পূজার মন্ত্র কিছু নাহি জানি আমি
পূজিব তোমারে ওহে বিশ্ব স্বামী চরণে ঢালিয়া নয়ন মোর।।
চালক:  
আশা পথ পানে আছি চাহিয়া (২)
নিদহারা নয়ন সুরহারা কন্ঠে তব আগমন গীতি গাহিয়া।।
ভুলায়ে রেখ না মোরে বিষয়াদি কার্যে
দিন যায় মনধায় অজানা এক রাজ্যে
দুস্তর পারাবার তোমারি সাহায্যে তরিব নামের তরী বাহিয়া।।
পাগল বিজয় বলে এ জীবন যা হবার হলো তাই
পাঠায়ে দাও দীনবন্ধু দেশের মানুষ দেশে যাই
অসার এ-বাণিজ্যে আর কোন কাজ নাই পারি না জীবনভার বহিয়া।।

১২২

ভরা ভাদরের নদী জানোনি তার কথা,
আমায় ঢেউয়ের হাতে তুলে দিয়ে বন্ধু গেলো কোথা।।
এমনি সেদিন বিকেল বেলায় নদীর কূলে ঝাউগাছ তলায়
দক্ষিণ বায়ুর সখিন দুলায়-দোলে গাছের পাতা,
সেদিন আকাশের গায় আলপনা দেয় কোন দেবদয়িতা।।
ঢেউয়ের নাচন দুলে দুলে ভরা নদীর কূলে কূলে
আমি কান্দি ফুলে ফুলে-ফুলের ভ্রমণ যথা,
তোমার পূর্ণ বক্ষে বুঝবে কি মোর শূন্য বক্ষের ব্যথা।।
আমি সেদিন আপন মনে, করে মধুর আলাপ বধূর সনে
মুখোমুখি সুখ আসনে বলি সুখ দুঃখেরি কথা,
আমার অল্পকালে শুখাইলো আশা কল্পলতা।।
ভাঙ্গা গড়ার নিত্য খেলায় বিপুল পুলকের মেলায়
হাসি কান্নার বন্যা মিলায় নিথর নীরবতা,
পাগল বিজয় বলে এমনি খেলা খেলেছেন বিধাতা।।

১২৩

তারে আরকি ফিরে পাবোরে যারে হারায়েছি জীবনে,
যদি সে আমারে কখন দেখেরে তবে চিনবে কি মোর নয়নে।।
বাদল ঝরা নিঠুর শ্রাবণ মেঘে ঢাকা চাঁদ
এমনি দিনে হারায়েছি আমার ঘরের চাঁদ
দিয়ে আলোর ঝরনা আঁধারের বাঁধ তারে খুঁজি সারা ভুবনে।।
মনি কাঞ্চন মুক্তা মানিক না থাকিলে ঘরে
অর্থ হলে মেলে সবি দিন কয়েকের পরে,
শুধু মন বিক্রি হয় মনের দরে গো যে মন মেলে না মণি কাঞ্চনে।।
নদীর কূল ভরিয়া ওঠে ভেঙ্গে গেলে পর
ভাঙ্গা মনের কূলে ভুলে কভু পড়ে নারে চর,
যার ভেঙে গেছে স্বপনের ঘর গো কেন সে ঘর বাঁধে না গহনে।
জীবনে যা হারায়েছি পাবো না তা আর-
এইটুকু মাত্র রইলো পুঁজি প্রাণের হাহাকার,
পাগল বিজয়ের, ছিন্ন বীণার তার গো কাঁদিছে স্বজন বিহীন বিজনে।।

১২৪

জীবন ভরে কাল কাটালাম কালার আশার কালাওনে,
আমার কি জ্বালা হইলোরে তার বাঁশের বাঁশীর গান শুনে।।
তারে প্রথম জানলাম, মনে আপন মানিলাম
আমার বলতে যা কিছু সব তার হাতে দিলাম,
তারে প্রথম যেদিন দেখছিলাম জীবনের এক ফাল্গুনে।।
ও সে যে বনে থাকে, ও মনে দেখতে চায় তাকে
বেরোবার ফাঁক পাই না আমি করমের ফাঁকে,
আমায় কে যেন জড়িয়ে রাখে সংসারের একজাল বুনে।।
আমি জানি না আগে, আমার এই প্রীতির সোহাগে
প্রতিবেশীর প্রতি হিংসা মোর প্রতি জাগে,
তারা তাড়া করে রাগে রাগে বাঘের মতো শালবুনে।।
কথা বলো না উচু ও মাথা রাখিয়ো নিচু
ভালো মন্দের দ্বন্দ্ব সকল ফেলেও দাও পিছু
পাগল বিজয় বলে সকল কিছু সহিতে হয় কাল গুণে।।

১২৫

নামহারা ঐ নদীর কিনারায় বসে আছি তার আসায়
আমি নামহারা ঐ নদীর কিনারায়।।
মন হারানো দিনের শেষে বসে আছি দীনের বেশে গো
বকুল তলে আকুল পিপাসায়।।
কূল ভাঙিয়া ব্যাকুল তানে, নদী ধায় সাগরের পানে
আমি জোয়ার ভাটার টানে টানে তারে খুঁজিয়া বেড়াই,
কতো দেশের অচীন নায়ে, ও তারা গোন পেয়ে চলছে বেয়ে
আরো কি যেন যেতেছে বলে অজানা ভাষায়।।
কলতানে নদী চলে, দিবাকর যায় অস্তাচলে
সন্ধ্যা প্রকৃতির ভালে দোলা দিয়ে যায়,
ঝাউ বনে পবনের উচ্ছ্বাস কোন বিরহীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস
সে যে কেন্দে কেন্দে আমারে কাঁদায়।।
বসে আছি আশার আশে মোড় নিরালীর চরের পাশে
কি যেন বলতেছে হেসে হেসে চোখের ইশারায়,
তুফানের পর তুফান ছোটে চরের পরে পড়ে লুটে গো
সে যে তীরের পানে ফিরে ফিরে চায়।।
পাগল বিজয় বলে এমনি করে কতো জনম গেলো সরে
আমি মরু বালুর চরের পরে আঁখির জল মিশাই,
কোন্ দিন তুমি পারের নায়ে আসবা তোমার তরী বেয়ে গো
আমি ধারে ধারে উঠবো তোমার নায়।।

১২৬

ওরে আমার জীবন-জীবন নদীর নাইয়ারে,
কবে আমার তীরে ভিড়াবে তরী ধীরে ধীরে বাইয়ারে।।
বের হইয়াছি সেই যে ভোরে আমি ধরনীর ধূলে
খেলা করে বেলা গেছে দয়াল তোমারে ভুলে,
আমি দিনের শেষে নদীর কূলে রয়েছি দাঁড়াইয়ারে।।
সাথী যারা গেছে তারা ফেলিয়া আমায়
এখন শুধু বসে আছি দয়াল তোমারি আশায়,
তুমি কাঙ্গাল বলে এই অভাগায় দিয়ো না ফেলিয়ারে।।
ষোল আনা তফিল লইয়া আমি করেছি কারবার
জমায় শূন্য খরচ বেশী দয়াল হয়েছে আমার,
এখন হিসাবের কিছু নাই সারিবার দেখেছি মিলাইয়ারে।।
পাগল বিজয় বলে আছি আমি ভবেরি কূলে
কবে এসে নাবিক বন্ধু আমায় লইবে তুলে,
আমার বাঁধা তরী নিবে খুলে গোনের লগন পাইয়ারে।।

১২৭

(মালমী গান)
তোমায় নমঃ নমঃ বঙ্গমাতা, স্নেহের আসন বুকে পাতা
পালিছো মা সাতকোটি সন্তান,
তোমার করুণা অসামান্য মানুষ থাক দেবের মান্য
ধনও ধান্য সবি তোমার দান।।
কতো ভাঙ্গা গড়া তোমার বুকে ওঠা পড়ার আঘাত ঠুকে
জর্জরিত তব কলেবর, তবু অযাচিত স্নেহ প্রীতি সন্তানের উপর
মাগো কতো লাঙ্গল জোয়াল জোরে চালাই
বক্ষ চিরে ফসল ফলাই
রাই সর্ষে মুগ মটরকালাই তোমার দানে পূর্ণ করি ঘর।।
থাকি ভ্রাতৃভাবে মাতৃ বক্ষে হিন্দু মুসলমান
আমরা সকলে এক মায়ের সন্তান-গৌরবে সৌভাগ্য মানি
পূজিব নয়ন নীরে আমার এ-মন মন্দিরে
মা তোমার ঐ স্নেহের মূর্তি খানি।।
তোমার অমল বিমল শোভা, বিশ্বে ধ্যানী মানির মন লোভা
তোমার সভায় সবাই চাহে মান,
তোমার অনবদ্য সুখাদ্যাদি অফুরন্ত দান
আম কাঠাল সুপারি নারকেল, আতা নোবা বেদানা বেল
কতো ফুল ফল ঢেলেছে অঢেল কে করে তাহার বা খানি
ধনৈশ্বর্যে নিঃস্ব নহ তুমি বিশ্বরাণী।।
মোদের দীঘির জলে আছে মাৎস্য, গাভীর কোলে নাচে বৎস
বৎসরে বৎসরে ফলে ধান,
আরো নোনা জলে সোনা ফলে বিধাতার বিধান
তাইতো লোকে কয় সোনার বাংলাদেশ
প্রকৃতির পূর্ণ পরিবেশ,
রূপ বৈচিত্রের আর নাহি শেষ চিত্ত মাঝে ভাসে চিত্র খান।।
কতো কাঙ্গাল বেশে কতো দেশে ঘুরলাম কতো স্থানে
মাগো তোমার মতো আসন টেনে কেউতো বুকে লয় না টানি।।
বিশ্ব কবির সোনার বাংলা নজরুলের এই বাংলাদেশ
জীবনান্দনের ছন্দে বন্দিছে বাংলা রূপসী
পদ্মা মেঘনা ব্রহ্মপুত্র ধরেশ্বরী নদীনদ
পশর শিবসা মধুমতি নবগঙ্গা তোমার সম্পদ।
পড়ে যখন পলিমাটি ক্ষেত খামার হয় পারপাটী
সোনার বাংলা সোনা খাঁটি মহি মাঝে মহিয়সী
দেশ গেছে বিদেশে পড়ে যখন হই বিদেশ বাসী
পোড়া বুকতো জুড়ায় না মা তাই আবার ফিরে আসি
সকল দেশের সেরা তুমি স্মরণ বিলাস চরণ চুমি
জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরিয়সী।।
তোমার অপরূপ রূপ শস্য শ্যামলা
সুজলা সুফলা বাংলা সন্তান বাৎসল্য জননী
প্রথম নামিয়ে ধরার কক্ষে স্থান পেলাম তোমার বক্ষে
করলে রক্ষে দিবা রজনী।
এই যে বাংলাদেশের আকাশ বাতাস
আমার জন্মের পূর্ব আভাস
এই মাটিতে এই দেহের নির্মাণ
বাংলার অন্নজলে ফুলও ফলে তৃপ্ত মনও প্রাণ
মা মাগো মা তোমার ঐ পদ প্রান্তে, প্রার্থনা জানাই একান্তে
হয় যেন মোর জীবনান্তে দেশের মাটি আমার শেষের স্থান।।

১২৮

(সখি সংবাদ)
একদিন কুঞ্জবাসে, বসে সখির পাশে কাতরে বলে কিশোরী,
যেদিন পূর্বরাগে বঁধূকে দেখিলেম আগে সোহাগে আজো শিহরী।।
সখি পেলেম বন্দুর দরশন, পেলেম মধুর পরশন সে সুখ ঘটলো না আর।।
পেয়ে বঁধূকে হলো শুধু হাসি কান্না সার,
পূর্ব রাগের অপূর্ব সুখ, সে সুখে, হয়ে বিমুখ
এখন সুখের আশায় পেতেছে দুখ
সখি মুখ দেখানো হলো ভার।।
সে হারানো সুখের রেখা আমার বুকের মাঝে
সখি মুখ ফোটে লোক সমাজে-কিছু বলতে পারি
ও তার ভালোবাসায় দিন কাটে মোর আশায় আশায়
এখন হাসায় আর কাঁদায় মোরে শ্যামল বংশীধারী।।
আমার চোখে জল মুখে হাসি এই কি বঁধূর খেলা
ক্ষণেক দুঃখে বিরহ বিগত হয় বিজন বেলা
মনে হয় ভালোবাসে, তাই এ পোড়া মুখ হাসে
তারে না দেখে চোখের পাশে নেমে আসে বারি
সজন বিহনে কেমনে রই সহচরী।।
একবার মনে ভাবি ভুলে যাই, ভুলের মাঝে তারে চাই
ব্যথা জাগে কাছে এলে জ্বলে মরি আবার দূরে গেলে
আমি কোনভাবে তাহারে পেলে
সখি জোড়ায় আমার পোড়া প্রাণ।।
সে না পাওয়া পাওয়ার মাঝে এতো পোড়া জ্বালা
এমন কেমনের করলো কালা কিছু বোঝাতে নারি।
বন্ধুর লাগিয়া আমি কোন বা দেশে যাবো।  
এমন মরম ফাঁটা ব্যথা নিয়ে ঘরে গিয়ে কার কাছে জানাবো
আমি একে থাকি কালার ঘরে জ্বলে মরি কালা জ্বরে
এ জ্বালা সই আর কতো কাল সব-
এতো হাসি কান্নার ভিতর দিয়ে কবে তারে পাওয়ার মতো পাবো
তার ব্যথায় জানায় মিলন বাণী,
মিলনে দেয় বিচ্ছেদ আনি, প্রাণ সজনী কেমনে বুঝাবো।
আমার সুখের বাঁধন দুঃখের কাঁদন কবে তার চরণে মিশাবো
সে যে এমন করে সখি কাঁদায় মোরে তবু কেন তারে চাহি
করবো প্রেম আলাপন, বাসর নিশি উৎযাপন
সে ছাড়া ন কেউ নাহি।।
সখি কেন তাহার চরিত্র, দেখি হেন বিচিত্র ব্রজের মতো নির্মম
সময় মনে হয় কুসুম মম নিরুপম-
ক্ষণেক ভাবি অনাত্বীয়, বিস্ময় ভীষণ কালীয়,
কেন বশ হয় মোর দশে প্রিয়- ভেবে প্রিয় হতে তারে প্রিয়তম।।

১২৯

(কবি গান)
কবির কল্পনায় অল্পনা জোটে যার যে টুকু মাথায়
উঠে করে তাই কবিত্বে প্ৰকাশ,
কতো রূপ কথায় অপরূপ শিক্ষা জ্ঞানী লোকে পায়
বাগ বিতণ্ডা জল্পনায় ভাবলে দেখা যায় যায় সত্যের পূর্ণাভাস।
একজন পাহাড়ী সন্যাসী এসে ভাওয়াল রাজকুমারের পাশে
বসিল পেতে সিংহাসন-
এলো কুচিন্তায় আবৃত করতে চেতন গুরুর মন হায়।
দেখে স্বধর্মের অভাব ধারে ধারে বীরের স্বভাব
রাজার সিংহাসনে করে প্রশ্রাব বসিলো পেতে কুশাসন।।
তখন রামেন্দ্র কয় কও মহাশয় এই করলে কি
ও তার ব্যঙ্গ হাসির রঙ্গ দেখি সাধু দাঁড়ায় ঝড়ো দিয়ে মাথার চুল-
রামেন্দ্র শোন্ বলি শোন্ তোদের রাজার মতো রাজ সিংহাসন
কলিতে নরক কুণ্ডের মূল।।
রাজা গণ বিষয় বিষে জর্জরিত তারা অসুর বলে সবাই ভীত
এই বলে ধরার আধিপত্য কতো কূলের নারীর চুলে ধরি
হরে তার মতিত্ব-
আরর ঘোর নরকের তিনটি দ্বার খোলা দেখি সব রাজার
রাজার সিংহাসন কু-চিন্তার আধার
এর চেয়ে কিছু ভালো টেবিল টুল
রাজার সিংহাসনে গাজা আর মদের নেশায় ঝুল।।
আমি রাজার মতো পাই না হিংসুক, দেখিতে পারে না পরের মুখ
একা যেতে চায় ত্রিভুবন, দেখি এক বনে বাস করতে পারে সাধুগণ
একটি রাজ্যের ভিতরে দুই রাজা বসতে নারে
বসলে ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে সমরে মরে প্রজাগণ।।
সকল রাজার পর এক রাজা আছে রাজার নেই সে জ্ঞান
তাইতে রাজা কষ্ট পাবে না ক্যান
যখন কষ্ট করে প্রজাকুল।।
সত্যে করেরে আইন প্রণয়ন আর্য ঋষিগণ
এখন মানে না সে ধাবা রাজা যারা স্বার্থে পরায়ণ
যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জন্মায় যতো সু-খাদ্য
বিদ্যান বুদ্ধিমানে তাদের পূজা দিতে বাধ্য
যতো রাজা এই পূজার বিরুদ্ধে গো-
শুধু এই যুদ্ধের কারণ, তাতে প্রজাদের মরণ কিসে করবে নিবারণ।।
প্রজার আয়ের দশ ভাগের এক ভাগ তাই নিয়ে রাজা মহাভব
রাজাকোষে রাখিবার নিয়ম-
প্রজার দিপদকালে তাহার বলে করিবে পালন
পিতা সেজে রাজাগণ-
দেখি তার এখন ঘটলো ব্যতিক্রম।
ছিলো সত্যে যট চক্রবর্তী স্বতাদি ত্রি-গুর্ণের মূর্তি
তারপরে হরিশচন্দ্র পাই,
আমরা বাজারে বাজারে এই সব রাজার গুণ পাইলাম
হায় রঘুরাজন পরের হিতে পারিতো জীবন দিতে
জন্মে শ্রীরাম চন্দ্র সেই বাড়ীতে রাজর্ষী জনকের জামাই।।

১৩০

ও ভাই সুবলরে দেখে এলাম নীল যমুনার কুল,
সে যে কুচবরণ মেয়ে ভাইরে মেঘবরণ তার মাথার চুল।।
তার হাসিতে বিজলীর ঝলক, মলিন করে চাঁদের আলোক গো,
সেরূপ কেউ যদি দেখে একপলক নিজেকে নিজে হয় ভুল।।
রূপ দেখিয়ে যমুনার তীরে, অচল হলো মলয় সনীর গো,
আর গতি শূন্য যমুনার নীর দিশেহারা অলিকুল।।
সে যে ভুবন মনমোহিনী, স্বয়ং প্রকৃতি তার পূজারিনী গো,
তার অর্ঘ জোগায় ফুলবনানী বোটা খুলে ফোঁটাফুল।।
পাগল বিজয় কয় এই রূপের হেতু এলোভুলোকে ত্রিলোকের বস্তু গো
রেখে গেছে মুক্তির সেতু ধন্য তাই ব্রজগোকুল।।

১৩১

এলে কি করতে এই মর্তধামে সেকথা কি মনে আছে
সেই পূর্বের কথা ভুলেছি যেন গড়ে মায়া মোহের প্যাঁচে।।
বিশ্ববিধাতার নির্দেশ, দেশ ফেলে এলি বিদেশে
সৎগুরুর সৎ উপদেশে চলিবার পথ লবি বেছে,
শেষে স্বভাবের অভাব ঘটিলে কি জবাব দিবি তার কাছে।।
ক্ষণিকের এই ভালোবাসায়, বিষয়ের সম্পদের লালসায়
অলসে বিলাসে সদা মহানন্দে বেড়াও নেচে,
তোমার জমা খরচ ঠিকনাই মনা গনা দিন প্রায় ফুরায়ে গেছে।।
বাস করেছ সোহাগ ভরে, এপারের বসা ঘরে
তোমার বসত বাড়ী ওপারে বাসা বাড়ীর আশা মিছে,
তুই কান পেতে শোন বিবাদীমন পরপারের ডাক এসেছে।।
বদ্ধ ঘরের রুদ্ধ দুয়ার, মায়া মোহের এই কারাগার
পথ খুঁজে পায় না বেরুবার কেমনে তার পরান বাঁচে,
পাগল বিজয় পড়ে কারাগারে কৃপাময়ের কৃপা যাচে।।

১৩২

ওপারে কি আছে ভাইরে এপার থেকে জানা যায় না
বলে একদলে এ রকম কথা কেউ কারো মতে সায় দেয় না।।
একদল সাধক বৃন্দে, জন্মান্তর মানে নির্বন্ধে
কিছু বলে না ঈশ্বর সম্বন্ধে নির্ধাণ মুক্তির শেষ সাধনা
বলে আরেকদল পুরুষ নইলে নারী জন্মের মুক্তি হয় না।
কেহমানে পুনর জন্ম, কেহ মানে পূর্ণজীবন
পুণরজন্ম পুণ্যজীবন আরেক দল কিছু মানে না,
জন্মমৃত্যুর সঙ্গে বিলীন কোন দিন ফিরে আসে না।
বলে থাকে একদলের লোক, পাপপূর্ণ করিয়া পরখ
কোন দিন ছুটি হয় না,
মাত্র একজন্মের ফল অনন্তকাল আরেক দলতা মেনে নেয় না।।
কারো সাধন নিরাকারে, কেউ পূজা করে সাকারে
ভালোমন্দ বলবো কারে কিছুই বুঝে পারি না,
ইহার কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা দ্বন্ধহীন মিমাংসা পাই না।।
পাগল বিজয়ের সংশয় সুখপাই না কারো মিমাংসায়,
যতো সব আত্মপ্রশংসায় কারো পথে কেউ চলে না,
ধর্মমত বাদের এই ব্যবধান আরকি সমাধান হবে না।।
মোদের ভারতরত্ন প্রধান মন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা দেবী,
চির অবসর গ্রহণ করেছে দীর্ঘ দিন জনসমাজ সেবী।।
তেরশত একানব্বই সালে,
কার্তিক মাসে চৌদ্দ তারিখ বুধবার সকালে-
নয়টা চল্লিশ মিনিট সময় কালে অস্তাচলে ভোরের রবী।।
অন্যায় অস্ত্রে আঘাত করে,
প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হলো এক আততায়ীর করে-
ধৃত দেহ রক্ষী চক্ষের পরে হলোমরা গাঙ্গে ভরাডুবি।।
কোন সে কঠিন পাষাণ হৃদি,
কোন উপদানে গড়ালো বিধানের বিধি-
এ যে শান্তি ধর্মের ঘোর বিরোধী বলেছেন আখেরী নবী।।
স্বার্থের লাগি গোপন হত্যা
বীরের ধর্ম নহে ইহা কাপুরুষতা –
এ যে শ্বাপদীয় ইতরতা জঘন্য এক ঘৃণ্য ছবি।।
বর্তমান রাজনীতির প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রী হত্যা যেন রাজনীতির অঙ্গ-
হবে কার কখনে লীলা সাঙ্গ বুঝে কাজ করিও সবে।।
পাগল বিজয় বলে ওহে মালিক সাঁই
পাঠায়ে দাও দীনবন্ধু দেশে ফিরে যাই,
এ যে হিংসার রাজ্য দেখিতে পাই কার্যাদি সকল অজগুবী।।

১৩৪

একদিন চুপ করে ডুব দিতে হবে অচিন সাগরের,
সে বড়ো কঠিন ঠিকানাহীন অজানা লোকান্তরে।।
চির দিন কেউ ধরায় রহে না
যে যায় সে ফিরে এসে কোন সংবাদ কয় না,
তথায় কারো বোঝা কেহ বহে না স্বীয়কর্ম যেথা করে।।
মানবজনম পেয়ে মর্তধাম,
আতর গোলাপ মেখে শরীরকে যতন করিলাম,
এই জড়ো দেহের শেষ পরিণাম শ্মশানে কিংবা কবরে।।
যাবতীয় জাগতিক দৃশ্য
কবির ভাষায় বলা চলে গভীর রহস্য
ইহার মিমাংসায় কতো মনুষ্য মশ্বান্তরে।।
পাগল বিজয় বলে বোঝাবার শক্তি নাই
বদ্ধ কূপের থেকে সাগর মাফতে চাই;
যেন আমিত্বে স্বামীত্বে মিলাই ক্ষুদ্র অন্তরে।।

১৩৫

অতি সাবধানে চালাও সাধের নাও ওমন মাঝিরে
তোমার পরে সকল দায়িত্ব,
জলের আড়ি বুঝে পাড়ি ধরো মানিয়োনা দাঁড়ি মাল্লার কর্তৃত্ব।।
দাড়ি মাল্লা যারা তারা অতি বদরাগি,
নৌকা ডুবলে দুঃখ তাদের নাই তাহার লাগি,
তারা গামছা কাঁধে দেওয়া ভাগি বোঝে না মহাজনের মাহাত্ত্ব।।
কূলহারা দরিয়ায় পাড়ি ধরতে হবে মন,
দাড়ি মাল্লা তোমার নৌকায় আছে ষোল জন,
তারা কেউ মানে না কারো শাসন ছাড়ে না কেউ আধিপত্য।।
তারা ভাটির গনে হাটিয়ে যায় মাঝিকে ফেলে,
ক্ষণেক অবাধ গতি দেখায় স্বাদ পেলে,
তারা খেয়ালের তাগিদে খেলে তাদের নাহি কোন দায়িত্ব।।
মাঝির আদেশ দাঁড়ি মাল্লা’ করিবে পালন
নিয়মিত মানিবে তার নির্দিষ্ট ভাষণ,
থাকবে স্বতন্ত্র ওই মাঝির আসন রাখার শাসনতন্ত্র স্বায়ত্ত্ব।।
পাগল বিজয় বলে দাঁড়িমাল্লা মাঝি সবারে
বাজার বুঝে বেচা কেনা কর এবারে,
যে ভক্তি প্রেম প্রীতির সম্ভারে ভরে আমার জীবন সাহিত্য।।

১৩৬

অর্থ নইলে যদি দয়াল তোমায় মিলে সহজে
কাঙ্গাল করে তুমি মোরে কাছে লহ যে
যদি পরমার্থ মলিন করে সেই অর্থ অনর্থ যে।।
দীনজনের বান্ধব তুমি সব লোকে বলে
নিরাশ্রয়ের আশ্রয় তোমার চরণ তলে,
যারা ঐশ্বর্যের গৌরবে চলে তুমি তাদের নহ যে।।
যদি দীনতায় তোমারে পাওয়া যায় দীনতারণ
করিয়ো না তুমি আমার দীনতা হরণ,
আমার মন ভ্রমর করবে, বিচরণ তোমার চরণ সরোজে
ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে যাবো নিত্য পরশে
চিত্ত চকোর বিভোর হবে প্রেম সুধারসে
থাকবে প্রবৃত্তি নিবৃত্তির বশে মনের অধীন মনো যে।
যাবতীয় জাগতিক এই অভাবের গ্লানি
স্বভাব শুদ্ধ হলে ঘুচবে সহজে জানি,
সে যে শ্মশানে মিলায় রাজধানী চাওয়া পাওয়ার উর্দ্ধে যে।।
পাগল বিজয় কয় যে সব কিছুতে তোমাকে দেখে
সে চিরকাল সন্তুষ্ট সকল যন্ত্রণা থেকে,
তার বুকের কাছে ও মুখ রেখে মিলন বাণী কহ যে।।

১৩৭

অবস্থায় না পড়লে সাধুর হয় না আত্মপরিচিতি,
যাদের অফুরন্ত ধন ঐশ্বর্য দারিদ্র্যের নাই অনুভূতি।।
রেখে সম্মুখে প্রচুর উপভোগ্য, সহজে দেখানো চলে মৌখিক বৈরাগ্য,
তখন ভোগের রোগ হয় দুরারোগ্য করলে দুরাবস্থায় অবস্থিত।।
চির সুখী যারা সংসারে দুঃখ বেদন কখন কেমন বুঝতে না পারে,
যেমন বন্ধ্যানারী বোঝে নারে হারে যা বোঝে সন্তান প্রসূতি।।
সুখ সম্পদে আনন্দে থাকে, উদ্বিঘ্ন হয় যখন পড়ে দুঃখের বিপাকে,
যারা অভাবে স্বভাব ঠিক রাখে তারা পায় পরিপূর্ণ পরিণতি।
স্বচক্ষে তাই কতো দেখেছি, অবস্থায় মন নড়ে চড়ে ঠেকে শিখেছি,
পাগল বিজয় বলে তাই লিখেছি যা আমার এই ভাবের গীতি।।

১৩৮

আকাশ আঙ্গিনায় রঙ্গীন মেঘের দোলনায়,
ফুল শয়নে নয়ন মেলে ডাকলে কে আমায়,
আমি ঘর ছেড়ে বাহিরে এসেছি কার চোখের ইশারায়।।
সে দিন আধাখোলা বাতায়নে চেয়েছিলাম আকাশ মুখে
আমি উদাস নয়নে-
তার পেল হাসি ছুটে আসি গো আগাত দিলো ঘরের দরজায়
আমার গোপন হিয়ায়।
আমি সেদিন হতে ব্যাকুল প্রাণে চেয়ে আছি আকাশ পানে
আমি উদাস নয়নে-
পাবো কোথায় খুঁজে পাইনা বুঝে গো, সে আমার রয়েছে কোথায়
আমার পরান যারে চায়।।
ও তার সন্ধানী চোখের নজরে তীর মেরে দিয়েছে আমায়
ভাঙ্গা পাঁজরে,
এখন বন পোড়া হরিণের মতো গো মনপোড়া রোগের জীবন যায়
জ্বালা জুড়াবো কোথায়।।
পাগল বিজয় কয়তার রূপের ছোঁয়া, যার লেগেছে তার
সমীহ কুলমান খোয়া,
ওসে সকল হারা বাউলীয়াগো কেঁদে ফেরে দেউলীয়া দশায়
শুধু তার ভালোবাসায়।।

১৩৯

আমার গোপন প্রাণের ব্যথারে আমার না বলা সেই কথারে
পরাণ বন্ধু আমার বুঝিলো কেমন-
আমি যে কথা বলি নাই তারে ছিলো আমার মনে মনে।।
নদীর চরে বাঁশী স্বরে করলো রসিকতা
যে গান খানি বাজালো সে আমার মনের কথা-
জেগে উঠলো আশালতা,
আমার মনে মানলো সফলতা তার বাঁশরীর গান শুনে
স্বভাব দেখে যেজন মনের ভাব বুঝিয়া নেয়
তার সঙ্গ লাভ করলে মনের সকল অভাব যায়
মনে প্রাণে তারে চায়,
আমি রাখিতে চাই তারে সদায় নয়নে নয়নে।।
কতবার যে এ সংসারে করলাম কত ঘর
আপনজন পেলাম না খুঁজে দেখলাম শুধু পর
কত করলেম সমাদর,
যে বুঝে তোর পোড়া অন্তর তারে চাইলাম না জীবনে।।
মনবুঝে যে মনের খোরাক দিতে পারে ভাই,
তাহার মত দরদী আর এ দুনিয়ায় নাই
খুঁজে যদি তারে পাই,
পাগল বিজয় বলে সব দিতে চাই তাহার চরণে।।

১৪০

আমার প্রাণের ঠাকুর হরিচাদরে ঠাকুর
তুমি হেন ভুলে যেও না আমারে
এই সংসারের মাঝে থেকে নানা কাজে
আমি ভুলে যাইরে তোমারে।।
পরাণ ভরিয়ে তোমার ডাকিতে,
একদিন জল ঝরে না আমার আঁখিতে,
কত করেছি গায়ের জোর বিষয়েতে হয়ে ভোর
আমি বাঁসা আছি আরো আঁধারে।।
মায়ার খেলা খেলে ভবের পর
আমি পরকে আপন ভেবে করলাম ঘর,
এই সব আত্মীয় স্বজন মায়া মোহের স্বপন
কেবল তুমি চির আপন সংসারে।।
কতো যতনে ঘর বাড়ী সাজাই
সে ঘরে তোমার পূজার আসন পাতি নাই,
তোমার পূজার নৈবেদ্য করেছি অশুদ্ধ
আমার মনের মলিন আচারে।।
দেহের ময়লা মাটি কবে ছাড়াবো।
তোমার চরণ ছায়ায় পরাণ কুড়াবো,
পাগল বিজয় বলে হরি উপায় নাহি হেরি
তোমা বিনাগোর পাথারে।।

১৪১

আমার বন্ধু যদি থাকে সুখে
আমার দুঃখের সেই তো সান্ত্বনা-
হয়না যে ফুলে তার মনের প্রতি গো
হারে আমি তার পূজোয় তা আনবো না।।
তার যে সকল নিঠুরতা, তাতে কতো মধুরতা
না মানিলে কেউ সে কথা খুলে বলবো না-
আসি তারে যাহা জানিয়াছিরে আমি তার বেশী আর জানবো না।।
প্রিয়তমের প্রেম বিরহে, নিরন্তর মোর অন্তর দহে
যতদিন দেহে প্রাণ রহে সইবো বেদনা-
তার ভালোবাসা বুকে নিয়ারে ভুলে যাবো সকল যন্ত্রণা।।
না বুঝলে সে আমার সোহাগ তবু মোর বাড়ে অনুরাগ
আমার এই জ্বালা পোড়ার ভাগ তারে দেবনারে-
হারে এ যে পোড়া বিষম পোড়ারে পরাণ বন্ধুর প্রাণে সইবো না।।
মজায়ে তার বাঁশীর সুরে, দেয় না ধরা যায় না দূরে
বিরহ নয়ন সুরে যেন ঝরণা ঝরে-
পাগল বিজয় বলে এমনি করেরে খেলে নিঠুর খেলা সেই আনমনা।।

১৪২

আমার প্রাণ বন্ধুয়ার দেশেরে আমি কোন পথে যাই শুধুই কার আছে,
আমি দিশেহারা পাগল পারা আমার পথ হারায়ে গেছেরে।।
মনের ডাকে চলি আমি অজানা পথ বেয়ে
হারানো পথ খুঁজে না পাই কেউ দেখে না চেয়ে
এলো আঁধারে দিক ছেয়ে,
আমি এতকাল তারে না পেয়ে আমার কেমনে প্রাণ বাঁচেরে।।
সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে তারপর
তেপান্তরের মাঠের শেষে ময়না মতির চর
সে দেশ অতি মনোহর,
আমার প্রাণ বন্ধু সেই চরের উপর এক ঘর রাঁধিয়া আছেরে।।
পাখীর মতো পাখা যদি থাকতো আমার গায়
উড়ে গিয়ে পড়তাম আমি সেই যে সোনার গাঁয়
সোনা বন্ধু যে জায়গায়,
আমি বাসা বাঁধতাম মনের আশায়ও তার ফুল বাগিচার পাশেরে।।
পাগল বিজয় বলে চিনলাম না সেই মানুষ রতন
কবে হবো মন মানুষের যতন,
আমার নিরস এই দেহ প্রাণমন তার প্রীতি পরশ যাচেরে।।

১৪৩

আমার ঘুম ঘোরের স্বপনে আমি আজ দেখলাম তোমারে,
ধীরে রাঙ্গা চরণ দিলে আমার ভাঙ্গা ঘরের দুয়ারে।।
নিশীথ শয়নে এলে নিয়ে বীণা খান
স্বপন মাঝে গেয়ে গেলে ঘুম ভাঙ্গানো গান-
মিঠেম চুম খেয়ে ঘুম নয়ন খোঁজে তোমায় আঁধারে।।
সহসা চাহিয়া দেখি উঠে বিছানায়
অভিমানে ফিরে গেছো এসে দরজায়-
তুমি ফেলে যদি যাবে আমায় ডাকলে কেন আমারে।।
বিজন বিটপী শাখে জল ভরা আঁখি
চোখ গেলো বলিয়া কাঁদে জোড় ভাঙ্গা পাখী-

সে ব্যথার সুরে জানায় নাকি মনে কথা তাহারে।।
স্বপনে গোপন প্রাণে লাগায়ে কি সুর
কাঁচা ঘুমে জাগায়ে আজ পালালে নিঠুর-
পাগল বিজয় কয় সোনার স্বপনপুর যাবো তার অভিসারে।।

১৪৪

আমার মনের বনের হরিণটিরে মারলি একটি বাণেরে
নিঠুর বেদে কেনো ঘর ছাড়া করিলি শর সন্ধানে-
কোনো ব্যথার দাগ লাগে নাকি তোর পাষাণ পরাণে।
সব গেছে তার সাথে সাথে হাতে কিছু নাই
 এখন সব হারায়ে পথে পথে ঘুরিয়া বেড়াই,
আমার কি যেন নাই কি যেন পাই বুঝি নাই তো জানে।।
আবার বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দিয়ে বিষমাখা এক তীরে
শেষে চাকিতের ন্যায় চলে গেলো চাইলো না আর ফিরে,
আমি ভেসে বেড়াই অকূল নীরে ব্যাকুল স্রোতের টানে।।
শিকার করা স্বভাব যে তোর নিদয় শিকারী
তবু তোর দ্বারে কি জায়গা পায় না পথের ভিখারী,
আমি এইভাবে কি থাকতে পারি না পাওয়ার এক ধ্যানে।।
পাগল বিজয় বলে মন হারানো মানুষ যতজন,
তাদের ঘর হলো পর বন হলো ঘর পর হলো আপন,
তাদের চলার গতি নদীর মতন মিলন সিন্ধু পানে।।

১৪৫

আমার গানের পদ ধরে আমার কেউ বিচার করো না,
আমার গানে যা আছে তা প্রাণে খুঁজলে পাবে না।।
দেল বাগিচায় নাই যে বৃক্ষের মূল
কল্পলতায় গল্প কথায় ফুটালাম সে ফুল,
শুধু জীবন ভরে করিলাম ভুল ফুল ফুটানো ফল ধরলো না।।
কর্ম শূন্য ধর্মের ভাব লয়ে
যশের নেশায় দশের কাছে রসের কথা কয়ে,
তোমরা কেহ যেন এমন হয়ে আমার মত মরো না।।
আমি গানের মাঝে যা করে গেলাম
তার শতাংশের এক অংশ যদি কাজে করিতাম,
আমি পরম হংস হয়ে যেতাম এড়াইতাম সব যন্ত্রণা।
পাগল বিজয় বলে নাই মোর অন্য বল
সাধু গুরুর করুণা এই জীবনের সম্বল,
আমি সেই ভরসায় আছি কেবল শেষের দিনের সান্ত্বনা।।

১৪৬

আমার প্রাণের খবর কইয়োরে সখা প্রাণেশ্বরী যথা,
আমি যতোই থাকি দূরে সুদূরে মধুপুর তবু ভুলি নাই তার কথা।।
পেলাম কতো নতুন রাজ্য যতন সাহায্য স্বজন বান্ধবতা
আমি যতো কিছু বেশী পাই কি যেন কি পাই না ভাই
অসার এ রাজতা।।
ছিলাম যে সুখেতে গোকুলে পারি নাগো খুলে বলিতে সে কথা,
যেন সুখ স্বপন সম গোপন প্রাণে মন সদা জাগিছে সেই ব্যথা।।
আমি করিয়ে অযত্ন হারায়েছি রত্ন সব করেছি বৃথা,
শুকায় গোকুল গহনে আকুল দহনে সে মাধবী লতা।।
আমার হারানো আনন্দ পরানের ছন্দ মিলবে কি ভাই হেথা,
পাগল বিজয় বলে বঁধু বাঁধা পদ্ম মধু বলো কুব্‌জা পাবে কোথা।।

১৪৭

আমার প্রাণের ঠাকুর কৃষ্ণরে ঠাকুর
তুমি যেন ভুলে যেয়ো না আমারে,
এই সংসারের মাঝে থেকে নানা কাজে
আমি ভুলে যাই যে তোমারে।
পরান ভরিয়া তোমায় ডাকিতে, একদিন জল ঝরে নাই আমার আঁখিতে,
আমি করেছি গায়ের জোর বিষয়েতে হয়ে বিভোর,
বাঁধা আছি ঘোর আঁধারে।।
মায়ার খেলা ভবের পর, পরকে আপন ভেবে করলাম ঘর,
আত্মীয় স্বজন মায়া মোহের স্বপন কেবল তুমি চির আপন সংসারে।।
কত যতনে ঘর বাড়ী সাজাই ঘরে পূজার আসন পাতি নাই,
তোমার পূজার নৈবেদ্য করেছি অশুদ্ধ আমার মনের মলিন আচারে।।
দেহের ময়লা মাটি কবে ছাড়াবো তোমার চরণ ছায়ায় পরাণ জুড়াবো।।
পাগল বিজয় বলে হরি উপায় নাহি হেরি তোমা বিনা ঘোর পাথারে।।

১৪৮

আমার গানের পদ ভেসে বেড়ায় লোকের মুখে অস্মপূর্ণ,
যদি লিখবার শিখবার সুযোগ না পায় ভুলত্রুটি থাকে সেইজন্য।
ধরে রাখবার থাকলে ব্যবস্থা, সঙ্গীতে পায় সঙ্গতের রাস্তা,
ঘটে না কোন প্রকারে এই দুরাবস্থা নইলে সাত নকলে আদত খাস্তা
পদগুলি সব হয় বিপন্ন।।
তুব শুনি এই গানের ভাষায়, মশগুল করে মজালী জলসায়,
গায়ক বাদক শ্রোতাদিগের আনন্দ যোগায়-
হয়তো দিন কয়েক পর এই গানের হায় রইবে না আর কোন চিহ্ন।।
এই গানের যেদিন ঘটবে বিস্মরণ, সেইদিন আমার প্রকৃত মরণ
কেহ যদি পারে ইহার করতে সংরক্ষণ-
তবে আমি মরণে পাইবো জীবন এ জনম মানিবো ধন্য।।
পাগল বিজয় বলে আগ্রহ ভরে, কেউ যদি অনুগ্রহ করে
গানগুলিকে অক্ষয় রাখে ছাপার অক্ষরে-
থাকবো চিরঋণী তার গোচরে পেলে এমন সৌজন্য।।

১৪৯

আমার মন বুঝে তুই কাজ করলি না মন,
ও তুই কি যে করিস নিজের মতে বিপথে পরিভ্রমণ।।
আমি বলি ডাইন যেতে তুই চলিস বামে
কেন্দ্রচ্যুত করেছিস ইন্দ্ৰীয় সংগ্রামে,
আমরা বসবাস করি এক গ্রামে তুই কেন হলি এমন।।
আমার সাথে সহজ ভাবে নাই তোর সহবাস
পরের সাথে মিশে করলি ঘরের সর্বনাশ,
ও তোর সৈন্যগণের দৈন্য প্রকাশ তবু করিস আক্রমণ।।
ষোল জনে দল বেঁধেছে তুই তার মাতব্বর
বাহিরের টান গেলো না তোর সারা জীবন ভর,
তুই আমাকে করিস দেশান্তর অন্তর মুখে নাই গমন।
আমার সাথে মিশে থাকলে পরম পুলকে
পাগল বিজয় বলে পথের সন্ধান পেতাম পলকে,
যেতাম তোরে নিয়ে দিবালোকে দাঁড়ায়ে দেখতো শমন।।

১৫০

আমার সকল ভালোবাসারে আমার সকল প্রাণের ব্যথারে
দয়াল লহো তুমি লহো তোমার রাঙা পায়,
যারে ভালোবেসে কাঁদলাম এতো সে জ্বালার পর কত জ্বালায়
কোন্ বিরহে অহরহ
কত পরাণ দিয়ে হয়রান হলাম জ্বালা দুঃসহ,
এখন যা কিছু মোর তুমি লহো গনা দিন ফুরায়ে যায়।।
কালো রাতে আলো লেগে,
আমি আলোয়ার পিছনে মিছে ছুটিলাম বেগে,
মরলাম ঘুরে ফিরে নিশি জেগে মরম ফাঁটা বেদনায়।
মরু বালুকার উপরে
দয়াল শুকায়ে গেছে কত আঁখির জল ঝরে,
আমার কাঁদন আঁখির বাঁধন ছিড়ো রেখো তোমার চরণছায়।।
পাগল বিজয় কয় কোন্ আকর্ষণে,
আমার ব্যাকুল হিয়া কাঁদে সদা রূপ অদর্শনে,
তোমার মিলন মেঘ বারি বর্ষণে সুশীতল করো আমায়।।

১৫১

আমার পূর্বের বাংলারে গর্বের জয় নিশান
সারা এই পৃথিবীর সেরা প্রকৃতির বিধান।।
ভরা ওই ভাদরের ক্ষেতে সবুজ রঙের চাদর পেতে
আদর সোহাগেতে মেতে করিছে আহবান।।
পদ্মবনে থোকা থোকা বিলবিহগী পলাতকা
শুন্ধি শালুক চোখা চোখা জলো ফুল বাগান।।
অঘ্রাণ মাসে ভাঙন লাগে, সবুজ নেশায় বিদায় মাগে
সোনালী রঙ মাঠে জাগে পেঁকে ওঠে ধান।।
উচু নিচু জমি সমেত, সোনার পাতে ভরে দেয় ক্ষেত
নবান্নোৎসবে সমবেত হিন্দু মুসলমান।।
কঁচি মায়ায় রাখাল ছেলে, প্রাণের দরদ নিয়ে মেলে
মেঠো খেলা কত খেলে সব যেন একজনা।।
ধেনু চরে অবিরত বেনু বাজে রুচিমত
বসে বসে শুনি কত রাখালিয়া গান।।
এই দেশের এই মাটি ধূলি, বন উপবন নদীগুলি
পাগল বিজয় কয় কেমনে ভুলি মাতৃভূমির দান।।
স্বাধীন দেশের এই খাস খামার বাস করতে কি ভয় তোমার
ছাড়বো না যতদিন আমার দেহে আছে প্রাণ।

১৫২

আমার দিনের দিনে দিন ফুরালো ফুরালো না পথ চাওয়া,
আমি কি যেন চাই কি যেন পাই হিসাব নাই চাওয়া পাওয়া।।
তোমার আশার বাণী লয়ে, তোমার অঙ্গের গন্ধ বয়ে,
বন্ধু আসবে আমার হয়ে কয়ে গেলো দক্ষিণ হাওয়া।।
কুল ছেড়েছি ভুল করিয়া, এ যে অজানা অকুল দরিয়া,
আমার খার হলো জীবন ভরিয়া তীরের আশায় তরী বাওয়া।।
জীবনের গান যাবতীয়, তোমার শ্রবণ যোগ্য নহে যদিও
তবে বিফলে কি যাবে প্রিয় তোমার আসার গীতি গাওয়া।।
খুঁজে যদি না পাই তোমারে তবু বন্ধুর সন্ধানী সংসারে
পাগল বিজয় কয় তোমার অভিসারে আজো আমার হয়নি যাওয়া।।

১৫৩

আমি জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল নামটি কি?
আমরা বহু নামে ধরাধামে কত রকমে ডাকি।।
কেহ তোমায় বলে ভগবান, গড বলে কেউ করিছে আহবান
কেহ খোদা কেউ যিহুদা কেউ কয় পাথিয়ান,
গাইলাম জনম ভরে মুখস্থ গান মুখবোলা টিয়া পাখি।।
সকল শাস্ত্রে শুনিতে যে পাই তোমার নাকি পিতা মাতা নাই
তোমার নামকরণ কে করিলো বসে ভাবি তাই,
তুমি নামি কি অনামি হে সাঁই আমরা তার বুঝি বা কি।।
কেহ পিতা কেহ পুত্র কয়, বন্ধু বলে কেউ দেয় পরিচয়
তুমি সকলের সকল আবার করো কিছু নয়,
দয়াল তোমার আসল পরিচয় কে জানে তা কি।।
পাগল বিজয় বলে মনের কথা কই, আমি খাঁটি ভাবের পাগল নই
গোল বেঁধেছে মনের মাঝে কাজেই পাগল হই,
আমার বুকে যা নাই মুখে তাই কই কাটা কান চুলে ঢাকি।।

১৫৪

আমি এতোদিন জেনেছি দয়াল আমার গৌরবের নাই কিছু
হয়ে তুমি সবার পরিচালক চালাও পিছু পিছু।।
খামার জমি আমার বলে, মায়া ফাসি পরলেম গলে
কাজ করেছি গায়ের বলে কথা বলে উচু,
আমি কল্প বৃক্ষের তলায় বসে শুধু কুড়ায়েছি লিচু।।
আগে মনে করতাম এই ভাবনা কারো কাছে কিছু চাবো না
শেষে দেখি হলাম দেনা শোধ দেবার নাই কিছু
আমি পাওয়ার নেশায় পথ ভুলেছি দেওয়ার বেলায় পিছু।।
করেছি জানের গরিমা, ভুলিয়ে তোমার মহিমা
ভাবতাম আমার দৃষ্টি সীমা তার পরে নাই কিছু,
এখন তোমার সভায় আমার আসন দেখি সবার চেয়ে নিচু।।
তুমি প্রভু অন্তর্যামী, নিখিলের হৃদয় স্বামী
পাগল বিজয় বলে আমার আমি তোমার কোলে শিশু,
আমাকে দংশিয়া মারে আমার সহমিকার বিছু।।

১৫৫

আমি ঘর বেঁধে বাস করবো বন্ধুরে চলবার পথের পাশে গো
খোলা জানালার ফাঁকে দেখবো তাঁকে যখন সে যায় আসে গো
ফুলের গাছ লাগাবো আমি আমার বাড়ীর পাশে গো।।
সন্ধ্যের পর গন্ধ ছড়াবে হাসনা হেনার গাছে,
হয়তো এক চাদনী সাঁঝে, আসবে প্রিয় মোহন সাজে
এসো দাঁড়াবে মোর দৃষ্টির মাঝে হাসনা ফুলের বাসে গো।।
তাতে যদি নিদয় বন্ধুর হৃদয় নাহি মানে
ফুলে তুলে গাঁথিবো মালা কাজ কি অভিমানে
তারপথে মালা ছড়ায়ে, অদূরে রবো দাঁড়ায়ে
দেখবো চরণ তার পড়বে জড়ায়ে ফুলামালার ফাঁসে গো।।
আমি তখন ছুটে গিয়ে পড়বো চরণ তলে
বন্ধুর পায়ের মালা খুলে নিয়ে পরবো আপন গলে
আমার সকল জ্বালা যাবে খোয়া, এই মালা তার চরণ ছোঁয়া
এই পাওয়া জীবনের পাওয়া সকল চাওয়া নাশে গো।।
পাগল বিজয় বলে কবে আমি বসিবো বিজনে
বন্ধুর দরশ পরশ পাবো আমার নীরস জীবনে,
আমার এ জনম হইবে সফল, সরুতে ফলিবে ফসল
ভীরু হিয়া হয়ে সবল ছুটবে তাহার আশে গো।।

১৫৬

আমি সুন্দর বনে দেখে এলাম গো সুন্দরী এক মেয়ে,
আছে এলো চুলে সাগর কূলে অপলক নয়নে চেয়ে।।
ফাগুন মাখা সবুজ রঙে অঙ্গের অলংকার
একাকিনী দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গে নাই কেউ তার,
তার নীরব এই গোপন অভিসার যেন কার ইশারা পেয়ে।।
কর্ণে তাহার দুলিতেছে কেওড়া ফুলের দুল
নাসিকার বেসাতি তাহার বনলতার ফুল,
তার রূপের ছটায় সাগরের কূল বনভূমি গেছে ছেয়ে।।
লাফিয়ে ওঠে ভোরের সূর্য পূর্বের অঙ্গে
হোলি খেলার আবির ছড়ায় সাগর তরঙ্গে,
কত ঢেউয়ের নাচন রক্ত রঙ্গে চলে কল গীতি গেয়ে।।
বেলা ভূমি সাজায় কন্যা চিত্র আলপনায়
বিধাতা বিমুগ্ধ যেন শিল্পীর শিল্পনায়,
ইহা বলা চলে না কল্পনায়, দেখ সাগর স্নানে যেয়ে।।
সুন্দরী মেয়ের রূপ রাশি জাগিলে মনে
পাগল বিজয় বলে মন মানে না গৃহ বন্ধনে,
আমি ছুটে চলি সুন্দর বনে মানস তরী খানি বেয়ে।।

১৫৭

আমি যার সন্ধানে নামলাম পথে সে যেন মোর কতই দূরে
আমি তার লাগি বিরাগী হয়েরে সারা জনম বেড়াই ঘুরে।।
অসীম পথের সীমারেখা, মলিন চোখে যায় না দেখা
অচিন পথে চলি একা পথ শুধাবো কারে,
আমার মন বুঝে কেউ কয় না কথারে যে ব্যথায় তার অনন্ত পুড়ে
রাতের তারা আকাশের গায় নিশীথ অভিসারে ধায়
তারাও বুঝি তাহারে চায় আমি চাহি যারে,
আরো নদীর ধায় সাগর সন্ধানেরে ছলছল কল সুরে।।
জোনাকি জ্বারিয়ে বাতি, খুঁজে ফিরে হারা সাথী
ঘুরে মর সারা রাতি বিয়োগ বেদন ভরে,
ডাকে ঘুম জাগা এক রাতের পাখীরে আনমান কাননপুরে।।
পথ পাওয়ার সৎ পরামিশে, আমি নিলাম মা কুসঙ্গে মিশে
জ্বরে মরি বিষম বিষে মিছে মারা ঘোরে,
এবার হারানো পথের পরেরে পাগল বিজয়ের দুই নয়ন ঝরে।

১৫৮

আমি কার দোষ দিবো নিজে দোষী,
ঘুরি কায়া ত্যাজে ছায়ার পিছে চোখে মায়ার ঠুসি।।
শুনলাম না বিবেকের বাণী শুভ সু-সময়
মরিচিকায় ঘুরে মরি রিপুর তাড়নায়,
এখন প্রাণ যাবে প্রবল পিপাসার মরু ভূমে বসি।।
কত চেতন মানুষ ডেকে গেলো ঘরের দরজায়।
বন্ধ ঘরে অন্ধকারে মওসাজ সজ্জায়,
আমি শুয়ে রইলাম সুখ শয্যায় মোহ নিদ্রায় পশি।।
চির মলিন দেহমন প্রাণ বিষয়ে কাতর
পূণ্যের ঘরে শূন্য আমার পাপে চিত্ত ভোর,
তোমরা সাধু শুরু মুচেদাও মোর মনের মোহমসী।।
পাগল বিজয় কয় জুড়াবো প্রাণ সৎ সহবাসে
চিত্ত কর উঠবে জেগে নিত্যের আভাসে,
কবে উদয় হবে হৃদাকাশে অদোষ দরশী।।

১৫৯

আমি কি দিয়ে পূজিবো দেবতা তোমারে
দেওয়ার নাহি কিছু মোর,
করো পূজার উপযুক্ত সেবাতে নিযুক্ত
মুক্ত করো বাঁধন ডোর।।
নানা পথ ঘুরে দিবসের শেষে
ব্যথার ডালি নিয়ে দাঁড়িয়েছি এসে
আমি আছি দ্বারদেশে, দেউলিয়া বেশে
খুলে দাও দেউল দোর।।
পূজার কুসুম করি নাই আহরণ
কি দিয়ে পূজিবো ও রাতুল চরণ
পাগল বিজয়ের পূজার উপকরণ
ব্যাকুল আঁখির লোর।।

১৬০

আমি আমায় জিজ্ঞাস করে পেলাম না এই আমির পরিচয়
আমি কে আর কিবা আমি কতজন কত রকম কয়।
আমি কে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে যাই যখন
প্রশ্ন কর্তা উত্তর দাতা একজন কি দুইজন-
আবার এই প্রশ্নই বা করে কোনজন ক্রমাগত বাড়ে সংশয়।।
চলে কে আর বলে বা কে কে করে শ্রবণ
কে বা খায় আর ‘কে বা ঘুমায় কে দেখে স্বপন-
কে হাসে আর কে করে ক্রন্দন কে করে এই সব অভিনয়।।
শাস্ত্রে বলে দশ ইন্দ্রীয় রিপুর সংখ্যা ছয়
চিত্ত বুদ্ধি অহংকার মন কেহ আমি নয়-
হবে কিরূপ এই আমির নির্ণয় বুঝায়ে কও সহোদয়।।
মহাসাধক তোমরা দার্শনিক বৈজ্ঞানিক
এই সমস্যার সমাধান কি পেয়েছো সঠিক-

ইহা ভাবতে গিয়ে হলো দিক বিদিক দিশেহারা পাগল বিজয়।।
আমি দীনহীন কাঙাল বেশে দয়াল
আর কতকাল ঘুরবো বিদেশে-
আমি কি হতে যে কি হয়েছি আরো কি হবো শেষে।।
জননী জঠরে হলো জন্ম সূত্র পাত
আলো বাতাস নাই সেখানে জগৎ জোড়া রাত,
শেষে দেখিলাম এক নতুন প্রভাত ধরনীর কূলে এসে।।
বাল্যকালে খেলার জগত খেলেছি কত
দেখতে দেখতে সেই খেলার দিন হইল গত,
যখন যৌবন হলো সমাগত সাজিলাম নতুন বেশে।।
দ্বারাপুত্র পরিবারে ভরিলো সংসার
কে যেন বনে যায় ডেকে আপন সারাসার,
ক্রমে ঘুচিলো সব আশার, পশার বার্ধক্যের পরিবেশে।।
পাগল বিজয় বলে এতদিনে করিলাম কাল যাপন
বুঝিলাম কেহ কারো নয় মায়াময় স্বপন,
দয়াল যে দেশ সবার চির আপন পাঠায়ে দাও সেই দেশে।।

১৬২

আমি পাগল হয়েছি তার নামে মরমী গো
আমি পাগল হয়েছি তার নামে,
যায়না জীবন রাখা এনে দেখা প্রাণ প্রিয়তমে’।।
কি করিতে কি যে করি পাই না বুঝিয়া
মনে বলে ঘরের কোণে তারে মরি খুঁজিয়া,
আমি কি ছিলাম আর কি হয়েছি আরো কি হবো পরিণামে।।
কি বেদনা প্রাণের কাছে কার কাছে বা কই
তোদের মুখের কথায় বুকের ব্যথা জুড়ায় না লো সই,
তোরা শুনলি কোথায় বিনা ঝাড়ায় কাল সাপের বিষ নামে।।
বুঝি নাই কেমনে আমি এমন হয়েছি,
ধরম করম কুলের ভরম ভুলে গিয়েছি,
কেবল তাহারে চাই সুখ দুঃখ নাই সুনামে দুর্নামে।।
যার নাম শুনে মনপ্রাণ মোর হয়েছে এমন
না জানি সজনী গো সে মানুষটি কেমন
পাগল বিজয় বলে কবে আমি বিকাবো তার নামে।।

১৬৩

আর কত ভোজ বাজির খেলা খেলবি মিছে বল
সাধুরে ভাই সময় বুঝে সহজ পথে চল,
শুধু গোঁড়ামিতে গড়াগড়ি দিয়ে গড়ামনা আর দল।।
হরিবলে লাফা লাফি করলে সাধু ভাই
জীবনে কি লাভ হয়েছে হিসাব রাখা চাই
তারতো জমা খরচ নাই,
নামে লাভ হবে যা জানিও তাই জীবনের সম্বল।।
অসুর স্বভাব পশুর বৃত্তি যদি না ঘোচে
পরের বাড়ীর তেল জল মাখালে চুল দাড়ি মোচে
তাতে ময়লা কি মোছে,
তোমার মাল কোঠা ইঁদুরে খোঁচে নাম করায় কি ফল।।
হরিবোলা হরবোলা লোক দেখি পাড়া গাঁয়
কৃষ্ণ ভক্ত দেখলে তাদের আগুন জলে গাঁয়
কৃষ্ণ নামে বাঁধা দেয়,
এ যে নাম অপরাধ শাস্ত্রেতে কয় আচার খাওয়া কল।।
কালী কৃষ্ণ হরহরি বিধি শ্রী নিবাস
একই সত্য বিশ্বে তাহার বিবিধ প্রকাশ
মূলে এক শক্তির বিকাশ
যার এই সত্যে জন্মে নাই বিশ্বাস সবি তার বিফল।।
নদীর বুকে তুফান খেলে দেখায় বহুতম
তুফান নদী পৃথক নহে প্রকৃতির নিয়ম
মাত্র প্রকাশের তারতম,
যে জন এই নিয়ম করে অতিক্রম তরী তার অচল।।
সাধু গুরু মতুয়াকি বৈষ্ণব গোঁসাই
ভাব রাজ্যে সকলকে যেন এক জায়গায় বসাই
ভুলে গিয়ে কুলের বড়াই,
পাগল বিজয় বলে দিয়ো সবাই চরণ ধোয়া জল।।

১৬৪

আমায় পাগল করেছেরে কালার বাঁশীতে,
আমি কি ক্ষণে গিয়েছিলাম সই যমুনায জল আনিতে।।
মোহন মুরলী করে ঈষৎ বাঁকা বায়
ইশারাতে কথা বলে ভাবে বোঝা যায়,
সে সে মন মজানো বাঁশী বাজায় কুলজার কুলনাশিতে।।
হাসি মাখা মুখে যেমন ওঠে বাঁশীর তান
সেই হাসি মাখিয়া বুকে হাসে ফুল বাগান,
আমারে কেড়ে নিয়েছে মন প্রাণ বঁধুর মধুর হাসিতে।।
না জানি কেমনে আমার গোপন হিয়া
কোন শুভ লগনে তারে ফেলেছি দিয়া,
এখন বাড়ীর পথে পারি নিয়া পারি না সই আসিতে।।
পাগল বিজয় কয় সেই সুরে মুগ্ধ দেবাত্রিদিবের
কি সাধ্য আছে তাই বুঝবে আবদ্ধ জীবের,
কালার বাঁশীর গান শুনিয়া শিবের মন টিকলোনা কাশীতে।।

১৬৫

আমায় আর ভুলতে দিয়ো না তোমারে,
আমি ভুল পথে অনেক দূর গেছি দয়াল ফিরায়ে লও আমারে।।
রঙিন ফুলের মায়ায় ঘেরা পথে নিয়ত
রূপের নেশায় দিশেহারা পতঙ্গের মতো,
আমি চলিয়াছি অবিরত মরণের ওই দুয়ারে।
কাজ না করে পাবার নেশা পেশা হলো তাই
খাজনা বন্ধ করে আমি দাখিলা পেতে চাই,
আমি যত না পাই ততো লাফাই হামবড়ো অহংকারে।।
নিবৃত্তি ভুলেছি আমি প্রবৃত্তির আদেশে
সোনার স্বপন দেখেছি শুধু বাসনার বশে,
আমি তোমাকে না ভালোবেসে বাঁধা আছি আঁধারে।।
পাগল বিজয় বলে ভুলের পথে জীবন গেলো প্রায়
এখন কূলের তরী খুলে দিলাম তোমার ভরসায়
তুমি কাণ্ডারী হয়ে আমার নায় পার করো ঘোর আধারে।।

১৬৬

ঈশ্বরতত্ব বিস্মরণ হয় বিষয় সুখে বিভোর থাকলে,
তখন তাহার কথা প্রাণে জাগে দুঃখের আঘাত বুকে লাগলে।।
সুখ হলে বিলাসের বাহন, বিনাশের করে আবাহন
ঐশ্বর্যের অসহ্য দাহন চলতে নারে আত্ম সামলে,
দুঃখীজন পায় সুন্দর স্বভাব অভাবের মধ্যে ভাব জগলে।
মানুষ যখন দুঃখে থাকে দায় ঠেকিয়ে তারে ডাকে
তবুতো তাহারে রাখে দুঃখ কষ্ঠের শতদলে,
শেষে স্বার্থ ধরে নিঃস্বার্থের রূপ যে রূপ হয় তারে ডাকলে।।
এ সংসার ছেড়ে চলবে না সংসারে সাধন হবে না
মাছ মারিবে জল ছুঁইবে না করার মতো করতে পারলে,
সেই হয় পরকালে ধন্য অন্তর বাহির সমান রাখলে।।
কাজ না করে কথা কয়ে গেলাম পরের কাছে নিজে বসলে,
পাগল বিজয় বলে সারা যায় না ছাই দিয়ে আগুন ঢাকলে।।

১৬৭

উজ্জলিত কবিকুল করিলে কবি নজরুল
ঘুম ভাঙ্গানো মন্ত্রের আমন্ত্রণে,
ঘুমন্ত আছিলো যারা জীবন্ত হইল তারা
তোমার উদাও কন্ঠের আবাহনে।।
বিশ্ব কবির বিশ্ব প্লাবন কাব্যের বন্যা সব দেশে
তার মধ্যে জাগিলে তুমি স্বতন্ত্র পরিবেশে,
তোমার শিকল ভাঙ্গা গান শুনে জাগলো নৌ জোয়ান
দুর্নীতির বিরুদ্ধাচরণে।।
উৎপীড়িতে উৎপীড়নে করলে তুমি মরণ পণ,
সর্বহারা জন্য করলে কতবার কারাবরণ,
তোমার অগ্নিবীণার সুর শুনে ভীত দেবা সুর
ভুলোকে দুলোকে দোলে আন্দোলনে।।
শাসন করে শোষণ করে যারা দেশের শান্তি সুখ
তোমার কলম শক্তিশেল বাণ দীর্ণ করলো তাদের বুক,
নির্ভিক বীর মেনেছে সবি তাই তুমি বিদ্রোহী কবি
মাতৃভূমির শান্তি সম্পাদনে।।
পাগল বিজয় কয় বিদ্রোহী কবি তোমার বিরাট দান যঞ্জ
স্তুতি বন্ধন অভিনন্দন করতে আমি অযোগ্য,
ক্ষুদ্র প্রাণের শ্রদ্ধা রাশি লহো যদি ভালোবাসি
ধন্য আমি মানি বা জীবনে।।
তার রূপের কিরণ ছড়িয়ে দিলোরে যেন শরৎ প্রাতের রবিরে।।
জল আনতে যায় যমুনার কূলে বারেকমাত্র চাই লোমু খতুলে
আমার ধেনুচরাণ বেনু বাজানরে আমি ভুলে গেছি সবিরে।।

১৬৮

এখন মন সময়, আছে হওরে সাবধান,
তোর কাল পেয়ে কাল আসবে যবে সবি হবে অবসান।।
এ সংসারে এসেছিলি শুভ এক লগ্নে
বাল্য কৈশোর যৌবন গেলো বিলাসের স্বপ্ন,
ও তুই মোহে পোড়ে মহাযত্নে করলি বিষয়ের বিষপান।।
তুই ভাবিস তুই বড়ো হচ্ছিস বিধির কাল ক্রমে
প্রতি দিন তোর জমার খাতায় একটি দিন কমে,
তবু তুই এমন করিস মনের ভ্রমে ঠিক পেলি না লাভ লোকসান।।
বেলা গেলো তবু যে তোর ধুলা খেলার মত
অন্ধকারে চলিতে তোর হবে অন্ধবৎ
তোর জীবনে সেই হারানো পথ সন্ধ্যায় পাবি না সন্ধান।।
পাগল বিজয় বলে বৃথা কাজে গেলো এ-জীবন
আলোর আশে ঘুরে মরলাম আলেয়ার পিছন,
তোর সম্মুখে পারাবার ভীষণ করলি কই পারের বিধান।।

১৬৯

এমন জুয়া চোরের সাথেরে এমন ছেচড়া চোরের সাথেৱে
আমি এক ঘরে বসতি করিলাম,
কতো সরল প্রাণে পরের করে ঘরের বেসাতি দিলাম।।
যা ছিলো মোর পূজি বাটা দিলাম তার হাতে, দিলাম তার হাতে
সে ছেচড়া চুরি করিয়ে সব নিলো তফাতে,
এখন খালি হাতে আঁধার রাতে অনেক পথ পাছে পলাম।।
আপন হাতে কত আপন দেখায় বাহিরে, সে দেখায় বাহিরে
যেন সে ছাড়া জগতে আমার কেহ নাহিরে,
বড়ো ভুল করলাম তারে চাহিরে লাভে মূলে হারালাম।।
তার মুখোস পরা মুখের বাণী শুনিতাম সুখে কত শুনিতাম সুখে
কত স্তুতি বন্ধন অভিনন্দন করিতো মুখে,
সে সম্মুখে মন যোগায় মুখে ফাঁক পেলে করে বদনাম।।
ফাঁদ পেতে চাঁদ ধরতে গেছি শুধু তার কথায় শুধু তার কথায়
কত লাল পতাকা উড়ায়েছি পালটানা নৌকায়,
সে ভাটির গণে হাটিয়ে যায় খুলে ফেলে দাঁড় বাদাম।।
ব্যবসায়ের পথ ভুলানোর ঝাপসা কুয়াশায় ঝাপসা কুয়াশায়
পাগল বিজয় বলে ভুলবো নাকো মায়ার কু-আশায়
এমন অকরুণের ভালবাসায় দুই হাতে জানাই সালাম।।

১৭০

এবার ব্যথার আঘাত দিয়ে দীনবন্ধু হরি
ফিরাইলে আমায় তোমার দিকে,
তুমি সজোনে সজাগ করিলে আমার ঘুমন্ত মনটিকে।।
সহজে ডাকলে কত বার ডাকশুনে ঘুমলাম আবার
ব্যথায় হাতে এসে এবার জাগলে তাই ডেকে,
তোমার ব্যথার প্রতি পরশ দিলে আমার নিরস বুকে।।
ব্যথা দিয়ে ব্যথা নাশ, এমনি কতো ভালোবাসো
লুকায়ে লুকায়ে হাসো কাছে কাছে থেকে,
তুমি ভয় দিয়ে অভয় দান করো চোখের নিমিষে।।
পথভুলে কেউ গেলে চলে, টেনে তারে আনো কোলে
সাধে কি দয়াময় বলে কাঁদে ভক্ত লোকে,
আমরা চলা বসা সকল তুমি দেখ এক নিরিখে।।
পাগল বিজয় বলে বিশ্বপতি চরণে করি মিনতি
বিপদে ওপদে মতি রয় যেন সুখে দুঃখে
আমার বুকের পাতে আপন হাতে দাও প্রভু তাই লিখে।।

১৭১

এলো ব্যথার গীতি গাওয়াতে মেঘলা দিনের পাগলা হাওয়াতে।
ও সেই বহু দিনের পূরণ সুররে ভেসে উঠলো আমার পরাণে,
পুরানো এক স্মৃতির কাঁটারে এসে বিধলো আমার হিয়াতে।।
পাড়ার ঠোঁটে জল ঝরিছেরে কে যেন কাঁদিছে বনে,
সাঁই বলে ঝাউ গাছের শাখায়রে হাই ছাড়ে মলয় পবনে,
নয়ন দিয়ে বাগয়নেরে দেখি বাতাস আর মেঘের খেলা,
কাটে বিজন বাদল বেলারে আমার কি যেন কি পাওয়াতে।।
হতাস মনে বাতাস ভরে রে আকাশ পরে মেঘের আনাগোনা।
ছন্দহারা যাত্রী ওরারে কোথা যাবে নাইকো জানা শোনা
বিলাসের মায়াজাল বোনারে আমার ফেলে আসা দিনগুলি
অতীতের অতিথি আমায়রে এসে বসলো মনের দাওয়াতে।।
একা একা বসেছিলামরে নির্জনে মনের কিনারায়,
মেঘের ফাঁকে ডাকে আমায়রে কে যেন চোখের ইশারায়,
কুল মানের এই ফুল বিছানায়রে আমার ভুলে থাকা হলো দায়
কূলের তরী খুলে দিলামরে কার চপল চোখের চাওয়াতে।।
অসীমের যাত্রী সবাইরে সমীমের এই নিত্য অভিসার,
মেঘের মতো চলে ভেসেরে অকূলের পায় না কূল কিনারা,
পাগল বিজয় কয় বেদনা আমার রে এবার রয়ে গেলো মরমে
জীবন আমার ফুরায় বন্ধুরে কেবল আমার তরী বাওয়াতে।।

১৭২

এসো গুরুদেব মম উৎসব ভবনে মোদের দীন আয়োজন সফল
করো তব পূর্ণ পদার্পণে,
তব কৃপা বিনা দীন দয়াল গুরু, এ জীবন মোদের রসহীন মরু
ভক্ত বৎসল বাঞ্ছা কল্পতরু এসো দেব দেবী সনে।।
নিত্য মুক্ত শুদ্ধ মাহাত্মাগণ সাথে, এসো এসো দেব ধর্মের হাতে
ও চরণ ধূলি তুলিয়া লই মা যে মোরা ধন্য হই জীবনে।।
অসীমের পথে চলিতে শক্তি, একমাত্র গুরু অগতির গতি
পরম পিতাকে জানাতে কাকতি তুমি শক্তি দাও মনে।।
এপারেতে আমি ওপারে মোর পিতা
মাঝখানেতে গুরু ধ্যানের দেবতা
তোমা বিনা পথ শুধুইব কোথা এমন কেহ নাই ভূবনে।।
প্রবর্তক গুরু তোমার শ্রেষ্ঠসুত, পাগল বিজয় হবে শ্রদ্ধাযুত
এই আশীষ দানে কত স্নাত এ দীন সন্তানে।।

১৭৩

ওই ঘাটে আজ দেখলাম কারে বলরে সুবল বল,
সে এলো চুলে এলো চলে পথ ভুলে এই কাননতল।।
বকুল বিছানো পথে, একাকিনী কেউ নাই সাথে
চলে ধনি যমুনাতে কলসী কাঁধে আনতে জল,
আমি কদম ফাঁকে দেখলাম তাকে দেখবি তো মোর সাথে চল।।
অঙ্গশ্রী তার বিদ্যুৎ আটা, মুখের হাসি মিশ্রী কাটা
বিশ্রী মানি চাঁদের ছটা কাঁদে সুরবালা দল,
ও তার রূপে ভিজে হলো কি যে মন সিজের মনোবল।।
উছলে ওঠে মুখের আলো, পিছলে ছোটে নিবিড় কালো।।
ভয় পেয়ে পিছু লুকালো পেয়ে তার কালো কুন্তল,
যেন ভোরের আলো সন্ধ্যার কালো বন্দী হলো সন্ধিস্থল।।
আচল টেনে ঘাটে যাওয়া, ভাজা পরা আঁখির চাওয়া
থমকে ওঠে দক্ষিণ হাওয়া চমকে ওঠে নদীর জল,
আমার মন মুকুরে নাচে সেইরূপ আছে কি ভাই ধরহার কল।।
যেরূপ দেখে আচম্বিতে রূপানুরাগ কানুর চিতে
মহাভাব রাই রূপ সাধিতে স্বরূপে ভাবের পাগল,
পাগল বিজয় চাহে পরাণ ভরা হারানো রূপ অবিকল।।

১৭৪

ওগো দেবতা ব্যথাহারি মোর থাকিয়োনা আর ভুলিয়া,
আশার বাণী কও আপন হাতে দাও দেউল দুয়ার খুলিয়া।।
কাঁদিছে বিশ্ব তোমারি কারণ, তোমা বিনা অশ্রু কে করে বারণ
তরুণ অরুণ সম করুণা কিরণ শ্রী করে দাও বুলিয়া।।
সন্ধ্যার আঁধার ওই আসিলো ঘিরে, পারের কাণ্ডারী-
তুমি অকুল নীরে
পাগল বিজয় কাঁদিছে দাঁড়ায়ে তীরে তরীতে লহো তুলিয়া।।

১৭৫

ও দয়াল তোমার নামে ধরলাম পাড়ি অকুল দরিয়ায়,
আমার তরী ঘোরে ঘোর বিপাকে সেই ত্রিবেণীর ত্রিমোহনায়।।
মরণ মুখে কেমনে বাঁচি,
আমার বেজুত হাল বিপারিত বাতাস নাহি গুণ কাছি,
তোমার ভরসায় পাড়ি ধরেছি আমার কানা ছেড়া ভাঙ্গা নায়।
আগে যারা নৌকা খুলেছে,
তারা গণের বাতাস পেয়ে নৌকায় বাদাম তুলেছে,
আমি কপাল পোড়া পাছে পড়া নাও খুলেছি অবেলায়।।
দিশেহারা গভীর আঁধারে
দয়াল তুমি আমার ধ্রুবতারা অকুল পাথারে,
ওহে বিশ্বের মালিক পারের নাবিক আমি সঁপিলাম ভার তোমার পায়।।
পতিত-পাবণ তোমায় সবে কয়,
দয়াল আমা হতে জানা যাবে তোমার দয়ার পরিচয়,
পাগল বিজয় বলে নয়ন জলে এবার ঘুচাও আমার পারের দায়।।

১৭৬

ও পরাণ প্রিয়রে তুমি আমার খবর নিয়োরে দিনের শেষে,
রবো আর কতকাল ঘরের কোণে রে আমি পরের সনে মিশেরে।।
পাষাণের গায় প’লো রেখা প্রথম যেদিন দিলে দেখা
জীবন পথে ছিলাম একা বিজন প্রদেশে
আমার প্রাণের চমক ভেঙ্গে গেছেরে তোমার প্রথম পরশেরে।।
জড়ায়ে গোপন শৃঙ্খলে ছিলাম যে গোপন সিংহলে
আঘাত দিয়ে নিদমহলে দাঁড়ালে দ্বার দেশে
আমার ঘুমের পশরা কেড়ে নিলেরে আমার বাসর ঘরে এসেরে
পূবালী গগনের পাশে, দিবাকর দীপ্তির আভাসে
সরোবরে কমল হাসে মিলন মানসে,
আমার মানস বনের পদ্মখানিরে আছে বিমুগ্ধ আবেশেরে।।
সেদিনের আর কয়দিন বাকি, যেদিনে এসে লবে ডাকি
ভালোবেসে কাছে রাখি দিবেশেষ দিবসে,
শুধু সেই শুভ লগনের লাগিয়ে পাগল বিজয় আছে বসেরে।।

১৭৭

ও মন রসনা মেটে দেহের গুমন করো না,
এ যে মাটির দেহ মাটি হবে সদা রাখিও এই ধারণা।
হরিণের পিছনে যেমন বাঘের আক্রমণ
মৃত্যু বাঘ তোর পিছনে ছুটিছে তেমন,
তোমার সম্মুখে নিশ্চিত মরণ বুঝতে তাকি পারো না।।
ক্ষিতি অব তেজঃ মরুৎ ব্যোমে এ দেহতরী
জীর্ণ জরা ব্যাধি মরা কত তার বৈরী,
পেয়ে দিন কয়েকের ইজাদ্দারী মাতব্বরী ছাড়ো না।
পরের জায়গা পরের বাড়ী পরের গৃহতল
যখন ছেড়ে যাবে সবি শরণার্থীর দল,
মন পান করে বিষয় হলাহল অমন ভাবে মরো না।।
পাগল বিজয় বলে অবুঝ মনা বুঝবি কবে আর
দিনের দিনে দিন ফুরালো এলো অন্ধকার,
এখন ছেড়ে বেচাকেনার বাজার আপন সারা সারো না।।

১৭৮

ও মন বাউলরে তোর পথে চলার গান গেয়ে যা তোর এক তারাতে
যেগান গাহে দিবা নিশি রবিশশী তারাতে।।
অন্তর দিয়ে যন্ত্রের সুর বাধ
গানের কথায় প্রাণের ব্যথায় নয়নভরে কাঁদ;
ও তুই ভেঙ্গেদে মায়া নদীর বাধ ব্যাকুল আঁখির ধরাতে।।
ধনে জনে পূর্ণ গৃহস্থ,
কালের টানে দেখবি একদিন তোর শূন্য হস্ত,
ও তুই আপন ভাবিস যে সমস্ত সবই হবে হারাতে।।
ধরে চলবি সত্যের সু-রেখা
চলতে পথে হয়তো একদিন পাবি তার দেখা,
ও তোর চলতে হবে একা একা ঝড় বাদল ভরা রাতে।।
মজার খেলা আজব দুনিয়ায়
থাকে না যা তাই রাখতে চাস আপন হিয়ায়,
পাগল বিজয় ঘোরে মরিচিকার মরুময় সাহারাতে।।

১৭৯

ও ভাই মাঝিরে ওমন মাঝিরে সাবধানে চালাইয়ো তরী খানি,
মরণ সাগরের বুকে ঢেউয়ের কানাকানি।।
তুফান ভেঙ্গে ফিনকে ওঠে জল
কল্ কল্ কল্ খল খল্‌ জল রাক্ষসীর দল
ও তোর তরী যেন যায় নারে তল উছলে ওঠে পানি
কূল হারা অকূল দরিয়ায় বোঝা যায় না গো মরণ পারের ডাক উঠেছে বসে বসে শোন হাঙ্গরে কুম্ভীর সেই সাগরের গায়-
মরা মানুষ ছোঁয়না তারা তাজা মানুষ খায়
তারা আহারে লাগি পাহারায় করে রাহাজানি।
চোখ বাঁধানো আঁধার রাতি সাথী নাইরে কেউ
ঝড়ের ঘায়ে পড়ে এসে পাহাড় ভাঙ্গা ঢেউ
ঈশান কোণে ভীষণ মেঘমালায়
ঝিলিক ঠাটায় মিলকি মেরে ঝিলমিল খেলায়
পাগল বিজয় বলে পারের বেলায় দিয়ো আশার বাণী।।

১৮০

ওরাই বলে তারাই কাঁদে যারাই দুর্বল,
দেখি তোমার কান্নার ক্ষাত বুকে আনে কত নতুন বল।।
হাল্‌কা মেঘে আকাশ পরে
হতাম মনে ঘুরে মরে বাতাস ভরে,
সেথা কতক্ষণ থাকিতে পারে মেঘে যখন ভরে জল।।
মূলের কথা ভুলিয়ে পাছে
স্ফীত শাখে থাকে কতো ফলহারা গাছে
শেষে নুয়ে পড়ে ধরার কাছে সেই গাছে যখন ধরে ফল।।
বুক ভরা দুঃখ হৃদয় যার গাঁথা
চোখের জল মুছে যায় তার মরমের ব্যথা,
যারা এই জলকে ভাবে অযথা তারাতো মরুভূমির তরুদল।।
যদি দেখা না পাই জীবনে
একা আমি কাঁদবো তবু বসে বিজনে,
যেন পৌঁছায় গিয়ে তার চরণে পাগল বিজয়ের নয়নের জল।।

১৮১

ওরে অবুঝ বুঝলিনারে দিনের দিনে গনা দিন তোর হলো অবসান,
ও তুই দিন পেয়ে দিন ভুলেছিস দিন দয়াল দীন বন্ধুর নাম-
ভাবো নাকি চিরদিন তোর যাবেরে সমান।
এই যে সোনার দেহরে তোর ক্রমে কমে, এলো জোর
দুই চোখে দেখেছিস ঘোর তবুরে তোর যায় না অভিমান,
ও তুই ভেবেছিস কি ওরে বেভুল ফুল ফুটলে আর হয় না ম্লান
কালের টানে মলিন হলো তোর সাধের ফুল বাগান।।
গাঙ্গে আসিয়ে জোয়ার ভাসিয়ে নেয় কুলপাথার
আর ভাটায় শুকায় আবার শুকনো গাঙ্গে আবার ছোটে বান;
ও তোর জীবন নদীর জোয়ার নাইরে লাগলে একবার ভাটির টান
চড়ায় বেঁধে মারা যাবে তোর জীর্ণ তরী খান।।
যা গেছে গেছে ঢলে, যেদ করিসনা তাই বলে
যা আছে মূল তহবিলে মিলায়ে দেখ কত কি লোকসান
দিয়ে হিসাব নিকাশ তাহার হাতে দেউল হয়ে পথে নাম
বেহাল বেশে গেয়ে ফিরিস দয়াল দীনবন্ধুর গান।
ছড়িয়ে কুটি নাটি ঝাড়িয়ে ময়লা মাটি
দেহ মন হলে খাঁটি পথের সাথী আছেন ভগবান,
পাগল বিজয় বলে কর্ম ফলে পেয়ে মানব দেহ খান
মানুষ হয়ে করলি না মন মানুষের সন্ধান।।

১৮২

ওরে শ্যামল বংশীয়ালা নন্দলালা পরাণ কালারে মরম দরদিয়া
একা ছিলাম জলের ঘাটে সহসা চাহিয়া
দেখি এলে তুমি যমুনার কূল ফুল ঝরা পথ দিয়া।।
সুন্দর চিকন কটিতটে শোভে পীত ধরা
তোমার অঙ্গে রঙিন উত্তরীয় গলে গুঞ্জ ছড়া
নন্দন সৌন্দর্য গড়া,
আমার মনের তীরে ভাঙ্গাগড়া উঠিলো জাগিয়া
আমি কেমনে রাখিবো বন্ধু ধৈর্য বাঁধিয়া।।
কত লোক এই পথে গেছে তোমার আসার আগে
তুমি আসন পেতে বসলে আমার মনের কুসুম বাগে
প্রিয় পিরীতি সোহাগে,
আমার আর কিছু না ভালো লাগে তোমারে ছাড়িয়া
আমি এ জ্বালা জানি নাই আগে দিন যাবে কাঁদিয়া।।
জনসমাজে মন বসে না থাকি আপন লয়ে
আমি আনমনা করি গৃহ কাজ ব্যথা বেদনা সয়ে
জ্বালা জ্বলে রয়ে রয়ে,
কাউকে যদি জানাই কয়ে শোনে না মন দিয়া
রইবে আর কতকাল নির্দয় হয়ে হৃদয় বিনোদিয়া।।
পাগল বিজয় বলে হাসি কান্না তোমার অনুরাগে
তুমি যতো কাঁদাও ততো তোমায় কত ভালো লাগে
প্রাণে প্রীতি পরশ জাগে,
বিরহ মিলন সোহাগে ওঠে যে দুলিয়া
শেষে মিলন কমল ফুটে ওঠে পাষাণ ভেদিয়া।।

১৮৩

ওরে আমার সোনার সোনার ময়না পাখীরে,
তুই কোন ফাঁকে পালিয়ে গেলি আমায় দিয়ে ফাঁকিরে।
বনের পাখী পুষেছিলাম মনেরই আশায়
শুনিতাম তার সুখ দুঃখের গান সুমধর ভাষায়,
তোরে সোহাগে সোনালী খাঁচায় দিয়েছিলাম রাখিরে।।
বাটি ভরে খাবার দিতাম শোভন পিঞ্জরে
এখন তোর বিরহে আঁখিজল মোর রাত্র দিন ঝরে,
আমি তোরে ছেড়ে কেমন করে এমন ভাবে থাকিরে।।
খালি খাচার দিকে যখন সজল চোখে চাই
আমার স্মৃতির তমাল শাখায় তোরে বসা দেখতে পাই,
আমি তোর মুখ চেয়ে সব ভুলে যাই পরান খুলে ডাকিরে।
নদীর বুক শুকায়ে গেলে ভাটির টান লেগে
দুকুল ভরে ওঠে আবার জোয়ারের বেগে,
ও তুই তেমনি মতো মনের বাগে ফিরে আসবি নাকিরে।।
মানুষের হারায় না কিছু শুনলাম এতো দিন
সব হারানো সব ফিরে পায় আছে এমন দিন,
তুই বলতে পারিস সেই দিনের দিন আর কয়দিন আছে বাকিরে,
না পাওয়ার বেদনা আছে হৃদয়ে মোর ছেয়ে
তবু আশায় বুক বেঁধেছি যাত না পেয়ে,
পাগল বিজয় আছে পথ চেয়ে জল ভরা দুই আঁখিরে।।

১৮৪

ওরে বড়ো ব্যথা দিয়ে গেলিরে পরাণে পর কাঁদানো পর বসিয়া
আমি কি ছিলাম আর কি হয়েছি বন্ধু তোরে ভালোবাসিয়া।।
রঙ জড়ানো ভাব ছড়ানো মনের হরষে
যৌবনে ঘুমায়েছিলাম যৌবন সরসে,
আমার ঘুম ভাঙ্গলে প্রথম পরশে ফুল বাসরে আসিয়া।।
শয়ন ছেড়ে তোমার দিকে চাইলাম নয়ন মেলে
বলেছিলাম কেন বন্ধু এমন ভাবে এলে,
তুমি চকিতের ন্যায় চলে গেলে চপল হাসি হাসিয়া।।
আমির বুকে তোমার প্রেমের পরশ নিয়েছি মানি
শ্রবণে মেনেছে তোমার অমিয় বাণী,
তোমার মন ভুলানো ছবিখানি ওঠে আমার চোখের সামনে ভাসিয়া।।
তোমার গুণে ঘূন থরলো মোর মতি কুলমানে,
সমাজে মানুষের মানা মনে নাহি মানে,
আমার মন ছোটে তোমার সন্ধানে পিরীত পিপাসিয়া।।

১৮৫

ও সেই বকুল তলার ঘাটেরে
আমি কেনবা আইলাম মধুমতির কূলে।।
কেন বা আইলাম কেন বাহারে নাইলাম।
কেনবা চাইলাম মুখ তুলে,
তার ময়ূর পংখী নৌকাখানি দেখে
আমার মান প্রাণ গেয়ে ভুলেরে।।
হালচে মাঝি লালচে বাদাম দিয়ে
চিকন মাঞ্জা তার দুলে,
আরো খোলা হাওয়ায় দোলা দিয়ে গেলো।
ও তার মাথার বাবরি চুলেরে।।
দেখতে দেখতে ভাটির নদীয় বুকে
জোয়ার উঠলোরে ফুলে,
আমার এলো খোঁপা এলিয়ে পড়লো
মাথার ঘুমটা গেলো খুলেরে।।
নদী চলে সাগরের সন্ধানে ভ্রমর চলেরে ফুলে,
পাগল বিজয় বলে সবার অভিসার
কেবল তার বিরহ মূলেরে।।

১৮৬

কতকাল বন্ধ রবি অন্ধকারে কেন আন্দাজে তুই তাহড়ে বেড়াস
চোখ ধাঁধা মোহের আঁধারে।।
কাল তোর মায়া কারাগার
বাপের ধন তোর সাপে খেয়ে করলো জরজর,
তোর সম্মুখে অকূল পারাবার কি ধন রয়ে যাবি পারে।।
স্বভাবে তোর অভাব ঘটেছে
ভাব বুঝে ব্যবসায় করলে তোর লাভ হত পাছে,
কত মনিকাঞ্চন পড়ে আছে তোর বসত ঘরের পাছ দুয়ারে।।
তোর মধ্যে রয়েছে সমস্ত
হিসাব করে দেখরে তুই এক মস্ত গৃহস্থ,
তবু পরের বাড়ী বাড়ালী হস্ত ঘুরে বেড়াস বহি দুয়ারে।।
পাগল বিজয় বলে মনের আশ পাশে
সারা জীবন কাটলো এই কারাগারে বসে,
আমি নিজে মরলাম নিজের দোষে এ দোষ আমি দিবো কারে।।

১৮৭

কলির জীব তরাতে নদীয়াতে ওই যে গৌর নিতাই দুই ভাই এসেছে,
জীবের দুঃখ দেখে এ ভুলোকে গোলকের ধন এসেছে।।
ভেবে জীব উদ্ধারের কথা, অঙ্গে বেঁধা ছেড়া কাঁথা
ওই যে দীনহীন বেশে জীবের দ্বারে এসে হরি বলে কত কেঁদেছে।।
মাধার কান্ধার আঘাত খেয়ে, স্বকরুন নয়নে চেয়ে
বলে আয়রে মাধা কোলে হরি হরি বলে আনন্দে বেড়াই নেচে।।
ওদের কোন ধনের নাইরে অভাব, মোদের অভাব দেখে এভাব
ওই যে ব্যথাহারি দু’টি ভাই এমন দয়াল হতে নাই,
মার খেয়ে যে প্রেম যাচে।।
প্রেমিক ভক্ত এ জগতে, সময় বুঝে নামলো পথে
পাগল বিজয় বলে অবোধ মন, বলি তোরে কথা শোন,
এখনো সময় আছে।।

১৮৮

কৃষ্ণ কানাইয়া সকল ভুলেছি তোরে পাইয়া
আমি সকল ভুলেছি তোরে পাইয়ারে।।
কেলি কদম্বের মূলে, যেদিন দেখলাম তোরে পরাণ খুলেরে
আমার মনের কোণে ভাঙ্গন লাগাইয়ারে।।
তোমার রূপে পরাণ উঠলো মেতে, আমি পথ ভুলে যাই বাড়ী যেতেরে
আমি কি যেন কি ফেলেছি হারাইয়ারে।।
আমি সকল কিছু পারি ভুলতে, কেবল পারি না তোর বাঁধন খুলতেরে
রাখলি কেমনে এমন জালে জড়াইয়ারে।।
কবে এসে আমার ভাঙ্গা কুঁড়ে, আমার মাটির আসা বসবে ছেড়েরে
পাগল বিজয় আছে আশা পথ চাইয়ারে।।

১৮৯

কৃষ্ণ প্রেম বিরহে সইরে প্রবোধ মানে না আমার মন প্রবোধ মানে না,
আমি জাত দিলাম যার সঙ্গে যাবো তোমরা কেউ নিষেধ করো না
কূল নাশা সেই কালার পিরীত; প্রেমরাজ্যে মাধুর্যের চরিত
লোকে তাই বুঝে বিপরীত করে গঞ্জনা,
সইরে যে জানে তার জানে জানে ব্যথিত বই আর কেউ জানে না
কালার প্রেমের এমনি জ্বালা, বোঝা যায় বোঝান জ্বালা
যেমন বোবার স্বপন বুকে ঢালা মুখে জোয়ায় না,
সবিরে সেই ভাবের রাজ্যে ভাষা অচল চলে না কোন কল্পনা।।
জল নহে সুশীতল করে, আগুন নয় পোড়ায়ে মারে
বিষামৃত একাধারে আছে যোজনা,
সইরে সুধাপানে ক্ষুধা নাশে বিষপানে পরাণ বাঁচে না।।
ব্যথা জাগে কাছে এলে, জ্বলে মরি দূরে গেলে
মুখের হাসি চোখের জলে সাজায় দেয়া না,
সখী কোনভাবে তাহারে পেলে অন্তরে মানে সান্ত্বনা।।
পাওয়া না পাওয়ার মাঝে, বেদনার এক সুর বাজে
লোভে ক্ষোভে লোক সমাজে থাকি আনমনা,
পাগল বিজয় বলে কৃষ প্রেমে হাসি কান্নার যোগ সাধনা।

১৯০

কেন শুকনো ডালে জাগলো নতুন পাতা,
সে যে বহু দিনের রোয়া গাছ তার খোয়া গেছে লতারে বন্ধু।।
চর পড়া ওই নদীর কিনারে
ঘর পোড়া কোন পথিক বাজায় ব্যথার বীনারে-
খোঁজে দুসহ বিরহ পরে তাহার হারানো দেবতা।।
সবুজ নেশায় মেতে উঠলো বন
শিস দিয়ে গায় দোয়েল পাখী কোকিলের কুজন –
আনে আশান্ত বাসন্তী পবন সেই ভুলে যাওয়া কথা।।
হারিয়েছি ফুল তোলা মাঝি
ভুল করা সেই পূজার মন্ত্র জাগিলো আজি,
আবার কোন সুরে উঠিলো বাজি আমার গোপন প্রাণের ব্যথা।।
অজানা বিরহে একুলে
মিলন পিয়াসী হলাম পথের দেউলে-
পাগল বিজয়ের ভাঙ্গা দেউলে রয়েছে আশার আসন পাতা।।

১৯১

গীতাশাস্ত্র ব্রহ্ম অস্ত্র একমাত্র সংসারে সংগ্রামে,
তা না হলে পদে পদে ঘটিবে পরাজয় এই ধরাধামে।।
সুখের নেশায় দেখনা স্বপ্ন, দুঃখেতে হয়ো না উদ্বিগ্ন
সুখ দুঃখ সমজানে পথ চলবার এই লগ্ন,
নইলে ত্রিতাপ জ্বালায় হৃদয় ভগ্ন করিবে ইন্দ্ৰিয় গ্রামে।
আশে দাতা পরম পুরুষ ভাই প্রকৃতি কর্ম করে তাই
আমরা অবুঝ লোক না বুঝে করি কর্তৃত্বের বড়াই,
শেষে স্বকর্মের জঞ্জালে জড়াই পরিত্রাণ নাই পরিণামে।।
কেন করো বৃথা অহংকার, তোমার হাতে নাই ভুবনের ভার,
বিশ্বের মালিক পারের নাবিক করবে তরী পার,
তোমার ভাবনা চিন্তা কি আছে আর চলবে তরী হরিণামে।।
পাগল বিজয় বলে ভবগৎ গীতা, ধর্মগ্রন্থ শাস্ত্রাদির পিতা
পথ না চিনে রাত্র দিনে ঘুরেছি বৃথা,
এবার ছেড়ে দিয়ে তিতা মিঠা গীতা যোগী হও নিষ্কামে।।

১৯২

গোজা মিলে কাজ চলবে না সোজা পথে চল,
তোর মনটা যে কোন ঠাসা করে বন্ধ রাখে গৃহতল।।
তোর গোপন কর্ম কেউ জানে না মনে তাই মানিস
তোর আগে যে একজন জানে তাকি তুই জানিস,
তুই ছলে বলে যাহা আনিস সকলই হবে বিফল।।
পরকে ফাঁকি দিয়ে করিস তোর বুদ্ধির বড়াই
তুই যে পড়লি ফাঁকিতে তা বুঝতে পারিস নাই,
তোর মতো কেউ অবুঝ আর নাই বুঝিস না নিজের মঙ্গল।।
পরের ঘরে সিধ কেটে এলি চুরি করে
তুই ভাবিস যে চোর বলে কেউ ধরবে না তোরে,
তোর পিছনে ঘুরতেছে জোরে যমরাজার নেই যাতাকল।।
সকলেই তো বহন করে স্বার্থ সিদ্ধির চাপ
পরের অনর্থ ঘটায়ে স্বার্থ উদ্ধারের পাপ,
পাগল বিজয় বলে সেই পাপের মাফ শুধু মাত্র চোখের জল।।

১৯৩

ঘরে সর্বনাশ করলি তুই পরের সাথে মিশে
তুই যার ত্যেজে মজেছিস অসার সংসার বিষয় বিষে।।
জঞ্জালে জড়ায়েছিস এক মায়ার জাল বুনে
চির দিন পরাধীন হয়ে দিন যায় দিন গুণে,
তুই পরকাল খোয়ালী শুনে পরের পরামিশে।।
রূপে আঁকা রসে মাখা জগৎ পেয়েছিস
যার কৃপায় এইসব পেলি তারে কি দিয়েছিস,
তুই পাওয়ার নেশায় হারায়েছিস চলার পথের দিশে।।
এতো পেলি তবু মনের অভাব সারলি না
অভাবে সে স্বভাব নষ্ট বুঝতে পারলি না,
তুই ভাবির সাথে ভাব করলি না তোর অভাব যাবে কিসে।।
ধনের চেয়ে মনের অভাব বেশি যখন হয়
ত্রিতালায়ে বাস করে সে জ্বলে ত্রিতাপ জ্বালায়,
কত মানুষে থাকে গাছতলায় মনের হরিষে।।
পাগল বিজয় বলে ভাবে কিংবা অভাবে থাকি
স্বভাব সুন্দর করে যেন তাহারে ডাকি,
যেন সব রূপে তার স্বরূপ দেখি আঁখি অনিমেষে।।

১৯৪

চিরকালের আমি আছি স্বামীর পরাধীন,
আমার স্বামী হয় না গৃহ শূন্য আমি হই না স্বামীহীন।
ওই যে আকাশ অসীমের দেশ যে অনন্ত ধাম
তাহার প্রতিবেশী হয়ে সেই দেশে ছিলাম,
আবার তার ইচ্ছা এই দেশে এলাম থাকতে হবে কয়েকদিন।
আশি লক্ষের ঘূর্ণিপাকে ঘুরি দিন রাত্রি
আমার যেমন আসা তেমনি যাওয়া অসীমের যাত্রী,
দেখি আমার মতো কতো যাত্রী ছুটিছে পথ বিরামহীন।।
বিরামহারা নদীর ধারা দুই কূলে আঁটা
সাগরের সন্ধানে তাই তার নামা আর ওঠা
নদীর শেষে হইবে জোয়ার ভাটা সাগরে মিলিবে যেদিন।।
পাগল বিজয় রলে আর কত কাল ঘুরবো অনিত্য
কোন খানে এই পথের শেষ ভেবে চঞ্চল এ চিত্ত,
কবে ঘুচায়ে আমার আমিত্ব স্বামীর পদে হব লীন।।

১৯৫

জাতি বলতে কি বুঝলে পণ্ডিত মশাই,
দেখি জগতে এক মানব জাতি দুইভাবে বিভক্ত তাই।।
ব্রাহ্মণ, ক্ষৈত্র, বৈশ্য, শুদ্র, কেহ বৃহৎ ক্ষুদ্র
আচরণে ইতর ভদ্র গুণ কর্ম অনুযায়ী,
কেহ ওঠে বহু উচ্চে, কেহ পড়ে অনেক নিচে
গুণের মাত্র জাতি আছে গুণীর কোণে জাতি নাই।।
আর্য সন্তানের জাতিভেদ, সমাজে আনিলো বিভেদ
উপনিষদ দর্শন কি বেদ জাতি ভেদের কথা নাই
জাতি ভেদ মেনে হিন্দুদল, দিনের দিন গেলো রসাতল
জাতাজাতি এই যাঁতাকল কেমনে এড়াবে ভাই।।
জন্মে যত ঘটে দুর্ণাম, কর্মে বাড়ে মানুষের দাম
জাবালার পুত্র সত্য কাম পিতার ঠিক ঠিকানা নাই,
বিশিষ্ট গণিকাত্মজ, পরাশর চঞ্চাল রক্তজ
মেছনীর পুত্র জারজ বেদের কর্তা ব্যস গোসাই।।
হিন্দুর এই হিংসা বিদ্বেষে, ছুতি স্পর্শ বিষম বিষে
জাতির জীবন বাঁচতে কি সে বসে বসে ভাবি তাই,
ঠুনকো জাতি চরাচরে, আজ না হয় কাল ভাঙ্গবে পরে
পাগল বিজয় বলে বিষাদভরে জাতি ভেদের মুখে ছাই।।

১৯৬

ছড়াবো আজ আমার এ পোড়া হিয়া
প্রিয়তম তবো নাম গাহিয়া।।
মোর শ্রান্ত ক্লান্ত দেহখানি
পদপ্রান্তে লহো টানি
আশার বাণী পরাণে দাও আসি
মঙ্গল অভয় দানে, শান্তি দাও অশান্ত প্রাণে
আছি তবে মুখ পানে চাহিয়া।।
পাগল বিজয় বলে চরিত্র মোর
অপবিত্র হইলো ঘোর,
তবু আশায় রয়েছি বুক বাঁধিয়া
পুত্র চরিত্র হবো পুণ্য পবিত্র তব
করুণার ঝরনা অবগাহিয়া।।

১৯৭

জ্ঞান অন্ত্রে তোর ধার বেড়েছে শাস্ত্রের ঘর্ষণে,
যেন নিজের অস্ত্রে নিজে কেটে মরিস না অসাবধানে।।
জান যদি হয় বাক্যের বাহক কর্মেতে নাকাল
কাছে শূন্য কথায় ধন্য তারে কয় বাচাল,
সে নিজেকে রাখিতে সামাল পারবে নাকো সাধনে।।
লোক ঠকানো সংগ্রহ তোর শাস্ত্রাদি ঘেটে
পরের যাত্রা নষ্ট করিস নিজের নাক কেটে,
ও তুই বেহিসেবী খাটনী খেটে কি পেয়েছিস জীবনে।।
বেদ বেদান্ত পড়ে যদি না জাগে জীবন
দেবতা নিবে না তার নৈবেদ্য নিবেদন,
তার ভজন সাধন যাজন যজন সবি বৃথা ভুবনে।।
নিবেদন যার বেদনাভরা নয়ন ভরা জল
হৃদয় ভরা ভালোবাসা জনম তার সফল
পাগল বিজয় চায় অন্তিমের সম্বল ব্যথার অশ্রু বর্ষণে।।

১৯৮

তব আশাপথ পানে আছি চাহিয়া
নিদ হারা নয়নে সুর হারা কণ্ঠে
তব আগমন গীতি গাহিয়া।।
ভুলায়ে রেখ না মোরে বিষয়াদির কাজে
দিন যায় মন ধায় অজানা এক রাজ্যে
দুস্তর পারাবার তোমারি সাহায্যে-
পাগল বিজয় বলে এ জীবনে যা হবার তা হলো ভাই
পাঠায়ে দাও দীনবন্ধু দেশের মানুষ দেশে যাই
আমার এ বাণিজ্যে আর কোনো কাজ নাই
পারি না জীবনভার বহিয়া।।

১৯৯

সেই দিনের আর কয়দিন বাকি ওহে দীনবন্ধু হরি,
যেদিন জীবন শেষে পার ঘাটাতে ভিড়বে এসে পারের তরী।
দিন কাটে মাটির ঘরে বসে
কালের স্রোতে দেয়ালের সেই মাটি যায় বসে,
ঘরে বেদখল আজ নিজের দোষে কেমনে বসবাস করি।।
সংসারের এই বেচাকেনাতে
দেউলে হয়ে ঘুরি মহাজনের দেনাতে,
মিশেছে বিষের বীণাতে অমৃতের সুর লহরী।।
বন্ধু বান্ধব দেখি সমুদয়
সুখের সাথী সবাই তারা দুঃখের ভাগি নয়,
তুমি সকলের কাছে সব সময় সদা জাগ্রত প্রহরী।।
নদীর বুকে আকাশ ছোয়া ঢেউ
পাগল বিজয় বলে তুমি বিনা কাণ্ডারী নাই কেউ,
আমার সহজে কেটে যাবে ঢেউ তুমি নৌকাতে দাঁড়াও হাল ধরি।।

২০০

তুমি আমার আমি তোমার এই খাঁটি পরিচয়
তা ভিন্ন প্র-পঞ্চ মাঝে রঙ্গ মঞ্চের অভিনয়।।
কেহ যায় আর কেহ আসে, কেহ আছে আশার আশে
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় গ্রাসে পড়েছে জীবন সমুদয়।!
কেহ আসে পিতৃ বেশে; মাতৃরূপে কেহ এসে
কেহ কোথায় চলে যায় শেষে নাহিকো তার নির্ণয়।।
রেঙ্গে ওঠে ফুলের মেলা, ভেঙ্গে পরে সন্ধ্যা বেলা
ভাঙ্গা গড়া বিধির খেলা চলছে এই বিশ্বময়।।
কায়া দেখায় ছায়াছবি, সেই মায়ায় জীব মুগ্ধ সবি
তুমি চির স্থির রবি নাই তোমার অস্ত উদয়।
কবে তোমার আদেশ পেয়ে, তোমার দেশে চলবো ধেয়ে
সেই আশাতে পথ চেয়ে রয়েছে পাগল বিজয়।।

২০১

তার নামে এতো মধুরতা বুঝি নাই তা আগে,
আমার গত দিনের সেই অনুতাপ অন্তরে আজ জাগে।
বাল্যকালে বাক্য খেলায়, কেটেছে দিন অবহেলায়
দিন ফুরায় যৌবনে মেলায় বিষয় অনুরাগে।।
শেষকালে শমনের শংকায়, মরণ ভীতি পরাণ চমকায়
জীর্ণ গৃহ দমকা হাওয়ায় কখন যেন ভাঙ্গে।।
ওঠে সেই দুঃখ বক্ষ ছাপিয়া, রাখতে পারি না চাপিয়া
কাঁদে বিষাদে মনের পাপিয়া দীল কুসুমের বাগে।।
পাগল বিজয় কয় মায়াতে ভুলে, দিন গেলো তাহারে ভুলে
সেই অনুতাপ ওঠে দুলে মনের কূলে লাগে।।

২০২

মরণরে মরণরে তুহু মম শ্যাম সমান,
আমায় রাধা সম বাঁধা দিয়ে রেখেছে সংসার আয়ান
কালম্য কুটিলা গতি অতি ভয়ানক
দুর্মতি জটিলা যেমন জ্বলন্ত পাবক,
আমায় কারাগৃহে করে আটক রাখে সারাদিন মান।।
খেটে খেটে কেটে গেলো সারাটি জীবন
তবু তো পাইলাম না. আমি সংসারের মন
পোড়া সংসার যে স্বার্থপর এমন আগে করি নাই অনুমান।
অজানা দিনের খবর নহে বিদিত
ইহাই জানি তুমি একদিন আসবে নিশ্চিত,
হবো তোমার ভাবে সমাহিত ছেড়ে জাতি কলমান।।
পাগল বিজয় বলে বসে বসে ভাবি নীরবে
দেশে যাওয়া শেষের বাঁশী বাজাবে কবে,
আমার জীবন যৌবন সবি হবে তোমার হাতে অবসান।।

২০৩

এই পৃথিবী যেমন আছে তেমন ঠিক রবে,
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে-
যখন নগদ তলব তাকিত পত্র নেমে আসবে যবে।।
মোহ ঘুমে যেদিন আমার মুদিরে দুই চোখ
পাড়াপড়শী প্রতিবেশী পাবে কিছু শোক,
তখন আমি যে এই পৃথিবীর লোক ভুলে যাবে সবে।।
যত বড়ো হোক না কেন রাজা জমিদার
পাঁকা বাড়ী জুড়ি গাড়ী ঘড়ি ট্রানজিস্টার,
তখন থাকবে না কোনো অধিকার বিষয়ও বৈভবে।।
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা আকাশ বাতাস জল
যেমন আছে তেমনি ঠিক রইবে অবিকল,
মাত্র আমি আর থাকবো না কেবল জনপূর্ণ ভাবে।।
শব্দ,স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ বন্ধ হলো যেন
এই পৃথিবী অস্তিত্ব বোধ থাকবে না আর হেন,
পাগল বিজয় বলে সেই দিন যেন এসে পড়ে কবে।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *