কবিয়াল বিজয় সরকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী

কবিয়াল বিজয় সরকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী

কবিয়াল বিজয় সরকার বাংলা ১৩০৯ সনের ৭ই ফাল্গুন, মোতাবেক ইংরেজি ১৯০৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বৃহত্তর যশোহরের নড়াইল জেলার ডুমদী গ্রামের নমঃশূদ্র বৈরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল নবকৃষ্ণ বৈরাগী ও মাতার নাম-হিমালয় কুমারী বৈরাগী। ঠাকুর দাদা গোলাপ চন্দ্র বৈরাগী ছিলেন একজন সহজ সরল ভূমি চাষী। পুত্র নবকৃষ্ণ ছিলেন সুটামদেহী এক বলীয়ান পুরুষ। নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ে তিনি ছিলেন একজন গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন সম্প্রদায়ের মাথা, মাতব্বর।

তাঁর পুত্র বিজয় সরকার শিক্ষার আলোকে এসে নিজেদের ‘বৈরাগী’ পদবী পরিবর্তন করে ‘অধিকারী’ লিখতে থাকেন যদিও ‘বৈরাগী’ পদবী পরিবর্তন করে ‘অধিকারী’ লিখতে থাকেন। যদিও বৈরাগী ও অধিকারী সমার্থক শব্দ।

বিজয় সরকারের পিতা নবকৃষ্ণ ছিলেন কবিগানের একান্ত ভক্ত। তৎকালীন কবিয়াল আনন্দ সরকার ও তারক সরকারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল কবিগানের সমঝদার হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল।

নবকৃষ্ণ সুঠামদেহী ও বলবান ছিলেন। তাই শক্তি চর্চ্চায় তিনি লাঠি খেলাকে প্রাধান্য দিতেন। তাই পরবর্তী জীবনে একজন খ্যাতিমান লাঠিয়াল হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত হন। একবার হাটবাড়ীয়ার জমিদার বাড়ীতে লাঠি খেলার কসরত দেখিয়ে তিনি পুরস্কৃত হন।

এই নবকৃষ্ণের পাঁচ পুত্র ও পাঁচ কন্যার মধ্যে বিজয় সরকার ছিলেন দশম বা সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান। বিজয় সরকারের জ্যেষ্ঠ ভাইদের নাম ছিল যথাক্রমে প্রথম। শ্রীমন্ত, দ্বিতীয় হৃদয় নাথ, তৃতীয় কেশব কুমার, চতুর্থ পুলিন বিহারী ও সর্বশেষ ছিলেন বিজয় সরকার। সকলের বড় বোনের নাম ছিল সোহাগী।

সকলের ছোট বলে বিজয় সরকার আশৈশব পরিবারের সকলের আদরের ছিলেন। অন্যান্য সন্তান ও সংসার নিয়ে মা হিমালয় কুমারী সদা ব্যস্ত থাকতেন। তাই বড় বোন সোহাগীর কোলেপিঠেই বিজয়ের শৈশব কেটেছে।

শৈশবে মায়ের সান্নিধ্য কম পেলেও বিজয় ছিলেন অত্যন্ত মাতৃভক্ত। মাকে এতটুকু সময় চোখের আড়াল রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। একবার হিমালয় কুমারী নবদ্বীপ তীর্থে যাবার আয়োজন করলেন। তখনকার দিনে যশোর থেকে নবদ্বীপ যাতায়াত বেশ কষ্ট সাধ্য ছিল। তাই যাতায়াত ছিল কয়েক দিনের ব্যাপার। কথাটা বিজয়ের কানে যেতেই তিনি মাকে ধরলেন, ‘মা, তুমি চলে গেলে আমি বাঁচবো কি করে? যদি যেতেই হয়, আমাকেও সঙ্গে নেবে, নতুবা আমি তোমাকে যেতে দেবনা।’ কিন্তু সে যুগে একটি বালক নিয়ে এতদূরে যাতায়াত সম্ভব ছিল না। তাই অগত্যা মাকে তীর্থ যাত্রা স্থগিত করতে হলো।

বিজয়ের জ্যাঠতুতো ভাই অভয়চন্দ্র ছিলেন তাঁর কয়েক বছরের বড়। তাঁর উৎসাহে বিজয়ের লেখাপড়া শুরু হয়। গ্রামের পাঠশালায় তাঁকে ভর্তি করে দেয়া হলো। ওই পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন নেপাল পণ্ডিত। তিনি শিক্ষক, ছাড়াও ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ এবং যাত্রাদলের অভিনেতা ও পরিচালক। পাঠশালার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয় কণ্ঠ দান করে নেপাল পণ্ডিতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নেপাল বাবু স্বেচ্ছায় বিজয়কে গান শিখতে উদ্বুদ্ধ করলেন এবং অবসর সময় তিনি তাকে গানের তালিম দিতে লাগলেন। এই পণ্ডিত মশায়ের উৎসাহেই সেই বয়েসে বিজয় যাত্রা দলেও গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। শিশু শিল্পী হিসেবে বেশি নাম করেছিলেন তিনি।

পাঠশালার পাঠ শেষ হলে তাঁকে হোগলা ডাঙ্গার ইউ, পি, স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হলো। এই সময় নড়াইলের জমিদার মনীন্দ্রনাথ রায় নেপাল পণ্ডিতকে দিয়ে। একটা যাত্রাদল গঠন করেন। সেই দলে বিবেক গায়ক হিসেবে বিজয়কে নির্বাচন করা হলো। ফলে বিবেক গায়ক হিসেবে বিজয় সরকার বেশ সুনাম অর্জন করলেন।

কিশোর কালে বিজয় ছিলেন খুব চঞ্চল ও ডানপিটে প্রকৃতির। সারাটা দুপুর তিনি গাছে গাছে চড়ে বেড়াতেন। একবার এক তেঁতুল গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তার ঠোঁট কেটে যায়। যার দাগ পরবর্তী জীবনেও স্পষ্ট ছিল। সেজন্য তাকে অনেকেই ‘ঠোঁটকাটাবিজয়’ বলেও ডাকতো।

হোগলা ডাঙ্গার ইউ. পি: স্কুলের পাঠ শেষ হলে তাঁকে ভর্তি করে দেয়া হয় বাঁশগ্রামের এম. ই. স্কুলে। সেই স্কুলে হেডমাষ্টার ভুবন মোহন ঘোষ বিজয়ের সঙ্গীত প্রীতি দেখে তাঁকে যথেষ্ট উৎসাহ দেন। পরবর্তীকালে বাঁশগ্রামের স্কুল ত্যাগ করে তিনি সিঙ্গা শোলপুর গ্রামের কে. পি. ইনষ্টিটিউশনে ভর্তি হয় এখানেও তাঁর কবি প্রতিভা বিকশিত হয়। শিক্ষকগণের উৎসাহে তিনি কবিতা ও গান রচনায় ব্রতী হন। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় তিনি কবিতাও গান লিখে বেশ সুনাম অর্জন করেন।

গান যেন তাঁকে পেয়ে বসেছে ভালভাবে। তাই প্রায়ই তাঁকে দেখা যেত, নির্জন গ্রামের পথে, কিংবা মাঠের আল পথে আপন মনে একা একা গানগেয়ে চলতে। একা পথে চললেই যেন গানের ভূত তাঁর ঘাড়ে ভর করতো। গান এবং লেখা পড়া, এই দুটোকেই সমান মর্যাদা দিয়ে তিনি শিক্ষা নিতে থাকলেন।

১৯২৬ সালে বিজয় ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেন। এরপরে তিনি পিতৃহারা হন। ফলে সংসারের হাল ভেঙ্গে পড়লো তাই ইচ্ছা থাকলেও আর তার পরীক্ষা দেয়া হলো না। তিনি টাবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি গোপালপুর কাছারীর নায়েবের পদে যোগ দেন। কাছারীর কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি অবসর সময় সঙ্গীত চর্চা নিয়ে মেতে রইলেন।

একবার পার্শ্ববর্তী হোগলাডাঙ্গা গ্রামে ফরিদপুরের কবিয়াল মনোহর সরকার এবং খুলনার কবিয়াল রাজেন সরকারের কবির লড়াই হয়। বিজয় মনোহর সরকারের কবি গানে মুগ্ধ হন। গান শেষে তাঁর একতারাটি বাজিয়ে বিজয় সরকার একটি গান গেয়ে শোনান। গান শুনে মুগ্ধ হন মনোহর সরকার। তিনি বিজয়কে কবি গান শিক্ষা দিতে রাজী হন।

বিজয় সরকার ফরিদপুরে মনোহর সরকারের বাড়ীতে দুই বছর থেকে কবিগান শিক্ষা করেন। অতঃপর খুলনার রাজেন সরকারের কাছেও এক বছর শিক্ষা নেন। এই শিক্ষানবিসী সময়ে গুরুগৃহে থেকে তাঁকে সংসারের সকল কাজই করে দিতে হতো বাড়ীরে রাখা মানুষের মত। বিজয় অবলীলায় সেসব কাজ করতেন গুরুকে সন্তুষ্ট রেখে কবি গানে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করতেন।

অবশেষে ১৩৩৬ সালের ১২ই অগ্রহায়ণ, বুধবার দিনে বিজয় তাঁর গুরু মনোহর সরকারের অনুমতি নিয়ে পৃথকভাবে নিজস্ব একটি কবি গানের দল গঠন করেন। প্রথমেই গান করেন তিনি ভেন্নাবাড়ী গ্রামের কবিয়াল মহিম সরকারের সাথে। মধুকণ্ঠের অধিকারী তরুণ কবিয়াল বিজয় সরকারের গানের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। পুরনো কবিয়ালদের চাইতে বিজয়ের চাহিদা বেড়ে গেল। বিজয়ের খ্যাতিতে বিভিন্ন কবিয়াল দল থেকে নামী-দামী সহগায়কেরা বিজয়ের দলে এসে যোগ দিতে লাগলো। তখনকার দিনের নামকরা গাইয়ে নগেন মাষ্টার, সদানন্দ মল্লিক, হারমোনিয়াম বাদক ধীরেন রায়, ম্যানেজার মতিবাবু এরা সবাই প্রবীণদের ছেড়ে এসে নবীনের দলে যোগ দিয়ে দলের আরো শ্রীবৃদ্ধি করেন। এছাড়াও রাজেনের দলে যোগ দিলো দুজন বালক গায়ক। যারা শুধু গানই নয়, বাঁশীও বাজাতো সুন্দর। এসব লোকের অধিকাংশই ছিলেন কবিয়াল রাজেন সরকারের দলের। তাই কবিয়াল রাজেন সরকার বিজয়ের উপর হাড়ে হাড়ে চটে গেলেন। তিনি আরো প্রবীণ কবিয়ালকে তাঁর বাড়ীতে ডেকে বিজয়কে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেন। রাজেন সরকার তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিলেন-তিনি বিজয় সরকারকে দেখা মাত্রই জুতো পেটা করবেন।

সাময়িকভাবে বিজয় বিপাকে পড়লেন। কারণ, কবিগান তো একা হয় না বিপক্ষ দল একটা থাকতে হয়। কিন্তু প্রবীণদের সিদ্ধান্ত মত পরিচিত কোন কবিয়ালই তাঁর বিপক্ষে গান গাইতে রাজী নন। ফলে বিজয় সরকার ফরিদপুরের ঘোষালকান্দি গ্রামের শামলাল রায়ের বাড়ীতে আশ্রয় নেন। তিনি ছিলেন কবিগানের একজন সমঝদার ব্যক্তি। এই শ্যামবাবুই বরিশালের বিখ্যাত কবিয়াল নকুল সরকারের সঙ্গে বিজয় সরকারের জোট করে দেন। বিজয় সরকার ও নকুল সরকার জোট হয়ে প্রায় আড়াই বছর বিভিন্ন গ্রামের কবির লড়াই করে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। শ্যামলাল বাবুর বাড়ীতে বিজয় সরকার তিন বছর ছিলেন। এসময় তিনি বহু শাস্ত্র গ্রন্থ পাঠ করে প্রচুর, জ্ঞান লাভের সুযোগ পান।

এই শ্যামলাল বাবুর প্রচেষ্টায় ১৩৪২ সালে বিজয় সরকার বরিশালের বড় মগরা গ্রামের শশীভূষণ পাণ্ডের কন্যা বীণাপাণি পাণ্ডের পাণি গ্রহণ করেন। বীণাপাণি লেখাপড়া জানতেন। তাই কবিয়াল স্বামীকে তিনি সর্বোতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন।

বিবাহিত জীবনে বীণাপাণির গর্ভে দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে বড় মেয়ের নাম কানন বালা (বুলবুলি) ও ছোটটির নাম মঞ্জুরাণী। ছোট মেয়ে মঞ্জু শিশুকালেই মারা যায়। বীণাপাণির একমাত্র ভাই অক্ষয় কুমার পাণ্ডের যক্ষারোগ হলে তিনি বরিশালে যান ভাইয়ের সেবা যত্ন করতে। কিন্তু সেখানেই ভাই ও বোন মারা যান। অর্থাৎ বিজয় সরকার স্ত্রী হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।

অতঃপর বিজয় সরকার ফরিদপুরের সাতপাড় গ্রামের রমেশচন্দ্র বিশ্বাসের কন্যা প্রমদা রাণী বিশ্বাসকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। বিজয় চির দিনেই সংসার বিমুখ ব্যক্তি। কবিগান ছাড়া তাঁর জীবনে আর কিছুই প্রিয় ছিল না। তাই স্ত্রী প্রমদাকেই সংসারের সব কিছু দেখা শোনা করতে হতো, পালন করতে হতো বিজয়ের একমাত্র মেয়ে কাননকে। বিজয়ের লক্ষ্য ছিল কাননকে নিজের মত করে মানুষ করা।

দ্বিতীয় স্ত্রী প্রমদার গর্ভে যথাসময়ে দুই পুত্র জন্মগ্রহণ করে। বড় ছেলের নাম কাজল কুমার, ছোট ছেলের নাম বাদল কুমার।

বিজয় সরকার ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও ভক্তিবাদে বিশ্বাসী। কোন ধর্মকেই তিনি কখনো খাটো করে দেখেননি। বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন মতাবলম্বীদের সংগে মিশে নিজেরই জ্ঞান পিপাসা মিটিয়েছেন,’ জেনেছেন-শিখেছেন ওড়াকান্দির ‘মতুয়া’ ধর্মবিশ্বাসীদের সঙ্গে যেসর ওতঃপ্রোতভাবে মিশেছেন, তেমনি ফরিদপুরের কাঁথার ফকিরের’ কাছেও দীক্ষা নিয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন। আবার বরিশালের ‘খেজুর তলার মতে’ ও নিজেকে জড়িত করে নিজের জ্ঞান পিপাসা মিটিয়েছেন। ঠাকুর শ্রী শ্রী অনুকুল চন্দের সাহচর্যও লাভ করেছেন তিনি। আবার ভুবন মোহন গাঙ্গুলীর কাছে ‘সত্য ধর্মে’ও দীক্ষা গ্রহণ করেছেন বিজয় সরকার পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি বৈষ্ণব মতে আস্থা স্থাপন করেন।

সুফী মতবাদের প্রতিও বিজয় সরকারের ছিল প্রগাঢ় আকর্ষণ। নড়াইলের পেড়োলী গ্রামের পীর সাহেব কেবলার সংগে গভীর যোগাযোগ রেখে বিজয় সরকার ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন এবং গোপন জিকিরে অভ্যস্ত হন।

প্রকৃতপক্ষে বিজয় সরকার’ ছিলেন সমস্ত ধর্ম ও মতবাদ সম্পর্কে উদার ভাবাপন্ন। তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ। তাঁর এই মহত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁর নিজের সম্প্রদায় এবং মাঝি সম্প্রদায়ের বহুলোক তাঁর কাছে দীক্ষাও গ্রহণ করেছে।। মানুষের এই ভালবাসা এবং এই মমত্ব তাঁর শেষ জীবনে ধর্মীয় উপদেশ দান ও দীক্ষা দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বিজয় সরকার সময় সময় মানুষের সততা নিষ্ঠা ও কর্মগুণের বিচার করে তার সংগে মেলামেশা করতেন।

কবিয়াল বিজয় সরকার ১৩৩৬ সাল থেকে প্রায় ৫০ বছর কবিগান করে ভারত-বাংলাদেশের মানুষের মনের মণি-কৌঠায় চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের ঢাকা ও খুলনার বেতার কেন্দ্রে গান করেছেন, তেমনি করেছেন টেলিভিশনে, শিল্পকলা একাডেমীতে, বাংলা একাডেমীতে, জগন্নাথ হলে, খুলনার সাহিত্য পরিষদে। আবার ভারতের আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রে, দিল্লীর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ সম্মেলনে, বোলপুরে, শান্তি নিকেতনে, দণ্ডকারণ্যে, কলকাতার এলবার্ট হলে এবং ভারতীয় ভাষা পরিষদ হলেও কবিগান গেয়ে অগণিত মানুষের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে গেছেন তিনি।

এই গানের মাধ্যমে তিনি জীবনে বহুবিধ পুরস্কার পেয়েছেন। সেসব পুরস্কার ছিল-স্বর্ণপদক, রৌপ্যপদক, শাল, ধুতি ইত্যাদি।

পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের সংগে কবিয়াল বিজয় সরকারের পরিচয় হয় কলকাতায়। জসীম উদ্দীন বিজয়ের গানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পরবর্তীকালে ১৯৬৯-৭০ সালে কবি জসীম উদ্দীন খুলনার সাহিত্য পরিষদের সম্মেলনে এসে শুনতে পান, দৌলতপুরের কাছে পাবলার এক বাড়ীতে বিজয় সরকার কবিগান করছেন। কবি সাহিত্য পরিষদের কয়েক জনকে নিয়ে ছুটে যান পাবলা গ্রামে। বহুদিন পরে দু’জন দু’জনকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেদিন কবিয়াল বিজয় সরকার তাঁর প্রিয় কবি জসীম উদ্দীনের খাতায় লিখে দিলেন।

কালের টানে চলে মানুষ জোয়ার-ভাটা ধরে,
আবার দেখা হলো বন্ধু চল্লিশ বছর পরে।।

পল্লী কবিও কবিয়াল বিজয়ের নোট বইতে লিখে দিলেন:-

চোখের দেখা নয়তো এ যে আত্মায় আত্মায় দেখা,
তোমার আমার মধ্যে বন্ধু বিরাট স্রোতস্বত্বা।।

দুই কবির এই মহামিলনে সেদিন পাবলা গ্রাম হয়েছিল ধন্য। যা পরবর্তীকালে অনেকের কাছেই ছিল গর্বের ব্যাপার।

কবিয়াল বিজয় সরকার তাঁর সুদীর্ঘ ৫০ বছরের গায়কী জীবনে অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। সেসব কাহিনীর কিছু তুলে না ধরলে তাঁর জীবনের একটা বিরাট দিকই অনুচ্চারিত থেকে যায়। যেমন : বিজয় সরকার জাতিতে নমঃশূদ্র বলে বর্ণ হিন্দুরা প্রায়শঃ ঘৃণার চোখে দেখতো। তাঁকে একবার বাগেরহাটের ফকির হাটের এক বাড়ীতে বর্ণ হিন্দুরা নির্দেশ দিল, তোমরা খাবার পর যার যার এঁটো পাতা তুলে নিয়ে ফেলে দেবে। তোমাদের এঁটো বর্ণ হিন্দুরা কেউ ছোঁবে না!’ বিজয় প্রতিবাদের মারমুখো হলেন। এই অপমানে তিনি গান না। গেয়েই চলে আসেন। তিনিই এই জাত্যাভিমান ও ভেদাভেদ কোন দিনই মানেন নি।

এমনি আর একটা ঘটনা ঘটেছিল বাগেরহাটের সণ্ডিয়া গ্রামে। কবিয়াল বিজয় ও নিশিকান্তের গান হবে বর্ধমানের রাজপণ্ডিত আশু তোষ স্মৃতি তীর্থের বাড়ী। খাওয়ার সময় পণ্ডিত মশায় বললেন, ‘বিজয়-নিশিকে তামার গ্লাসে জল দিও। ওরা নমশুদ্র, কাঁসার গ্লাস দিলে ছুঁৎ যাবে।’ এই কথা শুনে বিজয় সরকার লাফিয়ে উঠলেন। এমন ছোট যার মন, তার বাড়ীতে ভাত খাওয়াও পাপ। খাব না ভাত। চল সব, সবাই যখন চলে যেতে প্রস্তুত, তখন পণ্ডিত মশায় উপায় না দেখে ক্ষমা চেয়ে নিলেন এবং কাঁসার গ্লাস দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর বিজয় একটা গান লিখেছিলেন :-

আবাল্যে কুসংস্কার যার জীবন সাহিত্য,
কৌণ বৃত্তি ঘোচে না তার সহস্র পাণ্ডিত্যে।।

বিজয় সরকার চির দিন মানুষকে ভাল বেসেছেন। নিজেও একজন মানুষের মত মানুষ হতে কঠোর সাধনা করে গেছেন। তাই মানুষ হয়ে মানুষকে ঘৃণা করতে দেখলে তিনি প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠতেন।

তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে অসম্প্রদায়িক। হিন্দু-মুসলমান তাঁর কাছে ছিল দুটি চোখের মত। কারো চাইতে কেউ ছোট নয়, উভয়ে সমান। তাই তাঁর গুণগ্রাহীদের মধ্যে যারা মুসলমান ছিলেন, তাঁদেরকেও তিনি নিজের ভাইয়ের মর্যাদা দিতেন। তাঁরাও তাঁকে আপন জন বলে মনে করতো।’

কবিয়াল বিজয় সরকার দীর্ঘকাল ভারত-বাংলাদেশের আপামর জনগণকে। গানের মাধ্যমে অন্তরংগ করে ও হয়ে শেষ জীবনে অন্ধত্ব বরণ করেন।। দৃষ্টিহীনতার কারণে তিনি চিকিৎসার্থে কলকাতায় যান। সেখানে. পি. জি. হাপাতালে এবং বিভিন্ন চক্ষু ক্লিনিকে চোখের চিকিৎসা করান। কিন্তু তাঁরদৃষ্টি শক্তি আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। বরং বার্ধক্যজনিত আরো বিভিন্ন প্রকার রোগে তাঁকে হীনবল করে তোলে। ফলে তিনি কলকাতায় তাঁর বড় মেয়ে কাননের বাসায় বেলুড়ের বিধান পল্লীতে আশ্রয় নেন। সেই বাসাতেই বাংলা ১৩৯২ সালের ১৮ই অগ্রহায়ন, বুধবার দিনগত রাত ১০-৫৫ মিনিটে পরলোক গমন করেন। (ইংরেজি ১৯৮৫ ৪ঠা ডিসেম্বর)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর ২ মাস ১৯ দিন। মৃত্যুকালে স্ত্রী প্রমদা ও দুই পুত্র, এক কন্যা এবং কতিপয় নাতী-নাতী ও অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগী রেখে গেছেন; আর তাঁর রচনার বিশিষ্ট ভক্ত হলেন মানিক বিশ্বাস ও কালীপদ মণ্ডল।

কবিয়াল বিজয় সরকার অত্যন্ত প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সারা জীবন দুই ধারায় গান গেয়েছেন। (১) কবি গান (২) রামায়ণ গান। মাঝে মধ্যে জারিগানও করেছেন। কবিগান করে তিনি পারিশ্রমিক নিতেন না। ওটাকে তিনি ধর্ম প্রচার বলে গণ্য করতেন।

কবিগানের সে যুগে আদিরসাত্মক কথাবার্তা বেশি হত। কিন্তু বিজয় সরকার সব সময় অশ্লীলতাকে বর্জন করবার চেষ্টা করেছেন। তিনি নিরপেক্ষ বিচ্ছেদ- ভাটিয়ালী গানের পক্ষপাতি ছিলেন। নিজে অসংখ্য ভাটিয়ালী ও বিচ্ছেদ গান রচনা করে শ্রোতাদের মনোমুগ্ধ করেছেন। এই গীতি সংকলনের কবিয়ালের ২০৩টি গান সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এই গীতি সংকলনের ফলে বিজয় ভক্তগণের বহু দিনের একটি আকাঙ্খার অবসান ঘটবে বলে আমাদের ধারণা।

আজ আমাদের দেশে লোক সংস্কৃতি লোক গীতি সংরক্ষণের একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদি ও বিলম্বের কারণে আমাদের লোকজন অনেক কিছুই আজ বিস্মৃতির অতলে, তবু আজও যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গ্রাম-গঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সেগুলো সংরক্ষিত হলে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হবে বলে মনে করি। সেদিক থেকে কবিয়াল বিজয় সরকারের রচিত এই গানগুলোও আমাদের লোকগীতির জগতের এক অমূল্য সম্পদ বলেই আমরা ধারণা করি।

মোহাম্মদ সাইদুর

মহসিন হোসাইন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *