1 of 2

পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা

পাকিস্তান-প্রীতি, অলৌকিকতা এবং অভিজ্ঞতা

উনিশ শো একাত্তর সালে কার সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তা আমাদের জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলো উচ্চারণ করে না। গত ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে টেলিভিশনে বারবার বলা হয়েছে, ন’মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশে স্বাধীনতা এসেছে। কার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল একাত্তরে বাংলাদেশ? দেশ কি তার ভাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে যে নাম উচ্চারণ করা নিষেধ? প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে মিত্রশক্তি ভারতের অবদান কৌশলে অস্বীকার করেছেন, তিনিও উচ্চারণ করেননি একাত্তরে কোন দেশি ভাসুর বা শ্বশুরেরা বাঙালির ঘরবাড়ি লুট করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে, নির্বিচারে হত্যা, অবাধ ধর্ষণ কারা করেছে, কারা বুদ্ধিজীবী ধরে ধরে খুন করেছে বধ্যভূমিতে। ইতিহাস স্বীকার করতে আমাদের ক্ষমতাসীন দলের এখন প্রবল আপত্তি।

গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে টিভিতে একটি নাটক প্রচার হচ্ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে কাহিনি শুরু হয়ে ক্রমে গড়িয়ে নামছে। হঠাৎ ভারতভাগের আগে মুসলিম লিগের ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানটি মুহুর্মুহু ধ্বনিত হল বিজয় দিবসের আগের রাতে টিভির নাটকে, কেন এই সদম্ভ উচ্চারণ? যদি বলা হয় ইতিহাস তুলে ধরা হচ্ছে, তবে তো একাত্তরের ডিসেম্বরে বাংলা আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়েছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে, সেই ‘জয় বাংলা’ কেন উচ্চারিত হয় না? যেখানে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণে বাধা, সেখানে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ উচ্চারণে কোনও বাধা নেই। এই গ্লানি আমরা রাখব কোথায় আজ?

একবার এক ছোট শহরে বইয়ের দোকান খুঁজতে খুঁজতে দু’-চারটে দোকানের দেখা মেলে। দোকানে কোনও গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ বা কবিতার বই নেই। এক র‍্যাকে স্কুলের পাঠ্য কিছু বই, বাকি র‍্যাকগুলোয় মকছুদোল মোমেনিন, বেহেশতি জেওর, তাজকেরাতুল আওলিয়া, নেয়ামুল কোরান, ছোটদের হজরত মুহম্মদ, হজরতের জীবনী, নবির বিবিগণ, হজরত খাদিজা-হজরত আয়শার জীবনী ইত্যাদি। অবাক হয়ে বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করি, ‘সব এই ধরনের বই কেন?”

বিক্রেতা বললেন, ‘এগুলো প্রাইজের বই।’

‘প্রাইজের বই মানে?’

স্কুলগুলোয় এখন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হচ্ছে। সারা বছর যারা লেখাপড়ায় ভাল করে তাদের পুরস্কার দেওয়া হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ এইসব বইই পছন্দ করে কিনে নিয়ে যান। ‘হজরত খাদিজা (রাঃ)’ নামের একটি বই র‍্যাক থেকে নামিয়ে পৃষ্ঠা উলটে দেখি, কী আছে বইয়ে। চরিত্র গঠনের জন্য খাদিজা কেন অপরিহার্য এই দেশে? হজরতের তেরো বা চোদ্দোজন বিবির জীবনী পড়ে স্কুলের মেয়েরা কোন আদর্শে দীক্ষিত হচ্ছে তা আমার জানবার প্রয়োজন আছে বই কী! গ্রাম ও ছোট শহরগুলোর বালিকারা হজরত খাদিজার নিপুণ স্বামীসেবা বিষয়ক জ্ঞান আহরণ করে আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ রাঁধুনি এবং আদর্শ স্বামীসেবিকা হিসেবে নিজেদের তৈরি করবার, ব্যাপারে উৎসাহী হবে, কিন্তু কী লাভ হবে এতে দেশের এবং জগতের? তাদের কেন ‘জোন অব আর্কে’র গল্প, মেরি ওলস্টোনক্রাফটের জীবনী, বাংলার মাতঙ্গিনী হাজরা, সরোজিনী নাইডু, বেগম রোকেয়া, ননীবালা দেবী, লীলা নাগ, ইলা মিত্রের জীবন সম্পর্কে কোনও ধারণা দেওয়া হয় না?

তবে কি আমাদের এই ধরে নিতে হবে যে, সত্য ও সুন্দরের জন্য যে দীর্ঘকালের সংগ্রাম, ঘোর অন্ধকার থেকে আলোকিত জীবনে যাবার কণ্টকাকীর্ণ পথ সম্পর্কে কিছুই জানানো হচ্ছে না নতুন প্রজন্মকে, আলোর জগৎ থেকে ছিটেফোঁটা আলোও ছোড়া হচ্ছে না তাদের উদ্দেশ্যে। তাদের মননের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা। স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকেরা নিয়ন্ত্রণ করছে বালিকাদের ভাবনার গতি। আমার আশঙ্কা হয়, যখন যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেককে অন্তরে প্রবেশ করাবার সময়, ঠিক তখনই সেই আনকোরা মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় অলৌকিকের দুর্মর মোহ।

অলৌকিকে যাদের আসক্তি আছে, যে নারীদের, তাঁদের প্রতি আমার আকুল আবেদন— বেহেশ্ত আপনাদের কাঙ্ক্ষিত হবার কথা নয়, বেহেশতে আপনাদের শারীরিক এবং মানসিক সুখের কোনও ব্যবস্থা নেই এবং আপনাদের প্রিয় পুরুষেরা যখন অসংখ্য হুরের সঙ্গে জলকেলিতে মগ্ন হবে তখন অপমানে, ক্রোধে আপনাদের এও মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে, দোজখে নিশ্চয় এর চেয়ে অনেক স্বস্তি বিরাজ করে। অতএব বেছে নিন কোন পথে যাবেন, শুধুই স্বামীসেবায় না স্বনির্ভরতায়?

এনেস্থেসিয়ার একজন প্রফেসর সেদিন অপারেশন থিয়েটারে কিছু ছাত্র পড়াচ্ছিলেন। কী করে রোগীকে ঘুম পাড়াতে হয় অর্থাৎ কী ইনজেকশন ব্যবহার করলে রোগী আট থেকে দশ সেকেন্ডের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে, অপারেশন শেষ হলে কী করে রোগীকে জাগাতে হয়— এ-সব তিনি বেশ যত্ন করে বোঝালেন এবং বললেন— ‘রোগী যখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে তখন এমন কোনও দুঃসংবাদ তাকে দেওয়া উচিত নয়- যে কারণে রোগী তার জ্ঞান ফিরে পাবার সময় আবার জ্ঞান হারাতে পারে।’

বিজ্ঞ প্রফেসর রোগীর স্নায়ুর ওপর আকস্মিক আঘাতের উদাহরণ দিলেন এভাবে— যদি কোনও নারীর সিজারিয়ান অপারেশন হয় এবং তার কন্যাসন্তান জন্মায় তবে রোগী তার অজ্ঞান অবস্থা থেকে সংবিৎ ফিরে পাবার সময় বলতে হবে আপনার বাচ্চা হয়েছে’। আর পুত্রসন্তান জন্মালে বলতে হবে ‘আপনার ছেলে হয়েছে’। কখনও যেন ‘আপনার মেয়ে হয়েছে’ এই সংবাদটি তাকে না দেওয়া হয়। কারণ এনেস্থেসিয়ার প্রবীণ অধ্যাপক তাঁর জীবনে নিশ্চয় অনেক দেখেছেন, কোনও রোগী যখন সিজারিয়ান অপারেশনের পর চোখ খুলতে খুলতে এই দুঃসংবাদ শোনে যে, তার মেয়ে হয়েছে তবে সে-চোখ তার জন্মের মতো বন্ধ হয়।

ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যুসংবাদ এবং কন্যার জন্মসংবাদ সম্ভবত দুঃসংবাদ হিসেবে একই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *