1 of 2

ঝরে পড়া শিক্ষার্থী

ঝরে পড়া শিক্ষার্থী

১৯৮৮ সালে জুনিয়র ও উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র ও ছাত্রীসংখ্যার একটি জরিপে দেখা যায় জুনিয়র বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৬৩.২৫ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ৩৬.৭৫ জন। একইভাবে উচ্চবিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৬৭.০৫ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ৩২.৬৭ জন। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৭৮.৭৮ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ২১.২২ জন। স্নাতক শ্রেণিতে ছাত্রসংখ্যা শতকরা ৭৭.৫৩ জন এবং ছাত্রীসংখ্যা শতকরা ২৩.৪৭ জন।

এই ছাত্র ও ছাত্রীসংখ্যার অনুপাত থেকে আমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করছি জুনিয়র বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়ে ছাত্রীসংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। ১৯৮৮ সালের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায় ছাত্রীসংখ্যা নিম্ন থেকে উচ্চ শ্রেণিতে ক্রমশ নিম্নগামী হয়। যেমন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৩৬.৮৭%, সপ্তম শ্রেণিতে ৩৪.৪৪%, অষ্টম শ্রেণিতে ৩৩.০৬%, নবম শ্রেণিতে ২৮.৯৩% এবং দশম শ্রেণিতে ২৭.৯৭%। আমার প্রশ্ন, কেন বিদ্যালয়ের উঁচু শ্রেণিতে এবং মহাবিদ্যালয়ে ছাত্রীসংখ্যা ছাত্রসংখ্যার তুলনায় কমে আসে? ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থী’ ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীই অধিক কেন? এই ‘কেন’র কারণ অনেক। প্রথম কারণ সংস্কার। আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের সংস্কার এবং বিশ্বাস এই যে, বিয়ের পর মেয়েরা সাংসারিক দায়িত্ব পালন করবে। আর সেই লক্ষ্যেই কিছু ধর্মীয় শিক্ষা আর লিখন-পঠন ও হিসাবনিকাশ করতে পারাই হচ্ছে নারীশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। প্রচলিত এই ধারণাই নারীশিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা। দ্বিতীয় কারণ, সাংসারিক কাজে জড়িয়ে পড়া, বেতন পরিশোধে অনিয়ম, বইপত্র ও অন্যান্য শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব, মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার লোকের অভাব, প্রতিবেশীর রক্ষণশীল মনোভাব, রাস্তার বখাটে ছেলেদের উৎপাত ইত্যাদি। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের কম অংশগ্রহণের প্রধান কারণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তো আছেই, তার উপর শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর শহরভিত্তিক অবস্থান এবং পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে শহরে এসে উচ্চশিক্ষা লাভ সম্ভব হয় না। অধিকাংশ অভিভাবকই শহরের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে রেখে ছেলেকে পড়াশোনা করাতে রাজি হলেও মেয়েকে রাজি হয় না। তাই লক্ষ করি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা অধিকাংশই শহুরে এবং সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। গ্রামের যদি কেউ হয়েই থাকে তবে অবশ্যই সে মেয়ে বিত্তবানের মেয়ে। তা ছাড়া কোনও দরিদ্র ছেলের পক্ষে নিজে উপার্জন করে লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব, কিন্তু দরিদ্র কোনও মেয়ের জন্য নিজের উপার্জনের ব্যবস্থা করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। মেয়েদের নির্ভর করতে হয় মা-বাবা-আত্মীয়স্বজন বা বৃত্তির উপর। দারিদ্র্য শেষ অবধি উপার্জন-অক্ষম মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে বাধ্য করে।

শিক্ষায় মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণের উপায় নিয়ে অনেকে ভাবছেন, কেউ-কেউ বলছেন—‘যেহেতু প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েদের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবার জন্য পিতা-মাতার ইচ্ছা-অনিচ্ছা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই নিরক্ষর পিতা-মাতাকে বয়স্কশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত করা একটি প্রধান কাজ।’ সকল ছেলে-মেয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা বাড়িয়ে মেয়েদের শিক্ষিত হতে উৎসাহ দেওয়া সরকারের উচিত। প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাধ্যমিক বিদ্যালয় তৈরি যদি আপাতত সম্ভব না হয় তবে কোএডুকেশন মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় অধিক নারী-শিক্ষক এবং মেয়েদের জন্য আলাদা কমনরুম এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের বাসস্থান এবং যানবাহনের ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের বয়সসীমা শিথিল করতে হবে। যেহেতু উচ্চ আর্থসামাজিক অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের মেয়েরাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে থাকে তাই দরিদ্র ও নিম্নআয়ভুক্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য প্রচুর বৃত্তি, অনুদান ও বিশেষ আর্থিক সহায়তা স্কিম প্রচলনের মাধ্যমে মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে হবে।

উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের স্বল্পকালীন কাজের সুযোগ দিতে হবে যেন তারা তাদের শিক্ষাব্যয় কিছু লাঘব করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে আকর্ষণীয় করা এবং কাজের সঙ্গে সমন্বয় করবার পাশাপাশি মেয়েদের কর্মব্যবস্থার সুযোগ এবং সুবিধা বাড়াতে হবে।

এ-কাজগুলো শিক্ষায় মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণে সাহায্য করবে—এ-কথা একেবারে অসত্য নয়। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষাকে প্রধান কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত ও গুরুত্ব প্রদান করলে এবং নারীশিক্ষার ব্যাপারে সকলে অধিক সচেতন হলে নিশ্চয়ই ঝরে পড়া শিক্ষার্থী’র হার ক্রমশ কমে আসবে। অন্ধকারের শেকলে বন্দি হওয়া নারীরা শিক্ষা এবং চেতনার বন্ধনহীন আলোয় আলোকিত হবে। সমাজের নানা অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, বিশেষ করে নারীকে অবনমনের নানা কলা ও কৌশলের বিরুদ্ধে একমাত্র শিক্ষাই করতে পারে প্রবল প্রতিবাদ। এই শিক্ষাই পারে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির পথ মসৃণ করতে। নারীর ওপর আর্থিক, সামাজিক ও শারীরিক জোরের যে প্রবণতা পুরুষের, তা থেকে নারী যদি সার্বিক মুক্তি চায়, তবে শিক্ষা ছাড়া তার আর পথ নেই এগোবার। শিক্ষাই নারীকে শক্তিমান ও বেগবান করতে পারে, শিক্ষাই নারীকে বিদ্যমান সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার সাহস জোগাতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *