জলঙ্গীর অন্ধকারে – ৪

আশ্রমে ঢোকার কিছুক্ষণর মধ্যেই তমসাময়ের কাছ থেকে গঞ্জের বাজারের পথ জেনে নিয়ে মল্লাররা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে জায়গার উদ্দেশে৷ আগের মতোই নদীকে একপাশে রেখে গ্রামের রাস্তা ধরে ছুটল তাদের গাড়ি৷ মল্লার গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, ‘বাচ্চাগুলোর মাংস ভালো লাগে শুনে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল৷ আমিও ওদের মতো মাংস খেতে ভালোবাসতাম৷ কিন্তু ন-মাসে, ছ-মাসে একবার একটা মাংসের হাড় আর ঝোল জুটত আমার ভাগ্যে৷ আমার প্রতিপালকদের দয়াপরবশত হয়ে দেওয়া সেই হাড় আর ঝোলই আমি কত তৃপ্তি করে খেতাম৷ তাই ওদের মাংস খাওয়াব বললাম৷ মাংস কেনার সঙ্গে সঙ্গে গঞ্জের হাটে তমসাময় আর তাঁর আশ্রম সম্পর্কে খোঁজ খবরও নেওয়া যাবে৷’

চূর্ণী বলল, ‘এখনও পর্যন্ত তমসাময় শাস্ত্রীকে খারাপ লাগেনি ওই একমাত্র চিতাকাঠ দিয়ে রান্না করার ব্যাপারটা ছাড়া৷’

সোহম বলল, ‘লোকটা কিন্তু আমাদের অস্বস্তি হতে পারে জেনেও সত্যি কথা গোপন করার চেষ্টা করেনি৷ এটা কিন্তু তাঁর চরিত্রের ভালো দিক বলেই মন হয়৷’

মল্লার বলল, ‘কালকের দিনটাও আশ্রমে কাটিয়ে পরদিন ভোরে ফেরার জন্য রওনা দেব৷ এখন পর্যন্ত যা দেখলাম তাতে সবকিছু ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে৷ আশ্রমের জন্য টাকার দরকার এটাও সত্যি বলেই মনে হচ্ছে৷ কালও যদি আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক বলে মনে হয়, তবে আর ঝামেলা না বাড়িয়ে টাকাটা এখানেই দিয়ে যাব৷’

সোহম বলল, ‘ঠিক আছে তাই হবে৷’

গঞ্জে যাবার রাস্তায় এ পথে তমসাময়ের কথামতোই বেশকিছু ঘর-বাড়ি, লোকজন চোখে পড়ল৷ ধানের গোলার সামনে কোনও রমণী ধান ঝাড়ছে, কেউ বা দাওয়ায় বসে হুঁকো টানছে বা কাঁধে গুড়ের হাঁড়ির বাঁক বা ঝুড়িতে শীতের ফসল নিয়ে গঞ্জের পথে এগচ্ছে—এসব দৃশ্য চোখ পড়ল তাদের৷ এ সব গ্রামীণ দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় তারা গঞ্জের হাটে পৌঁছে গেল৷

গঞ্জের হাট বেশ বড়ই বলা যায়৷ পোস্ট অফিস, পুলিশ চৌকি, টেলিফোন বুথ, প্রসাধনীর দোকান, বাইক সারাইয়ের দোকান সবই আছে৷ আর আছে চাল-ডাল-সব্জি-ফল-গুড় ইত্যাদি নানান গ্রামীণ জিনিসের দোকান৷ মাটির হাঁড়ি-কলসিও বিক্রি হচ্ছে কোথাও কোথাও৷ হাঁক-ডাক, লোকজনও প্রচুর৷ তাদের পরনে লুঙ্গি বা ধুতি দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা স্থানীয় গ্রামীণ মানুষ৷ রাস্তার পাশে একটা খাসির মাংসের দোকান দেখে সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে পড়ল তারা৷ মল্লার হিসাব করে দেখল তাদের নিজেদেরকে ধরে মোট পনেরোজন লোক আশ্রমে৷ চার কেজি মাংস কিনল তারা, তারপর কাছেই একটা চায়ের দোকান দেখে এগল সে দিকে৷

দোকানটার বাইরে বসার জন্য কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ আছে৷ তারই একটাতে চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে অথবা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে গল্প করছিল চারজন বৃদ্ধ লোক৷ স্থানীয় মানুষ তারা৷ মল্লাররা দোকানের সামনে গিয়ে দোকানিকে তিন ভাঁড় চা আর বিস্কুট দিতে বলে বুড়োগুলোর সামনেই অন্য একটা কাঠের বেঞ্চে বসল৷ সেখানে বসতেই লোকগুলো কথা বন্ধ করে উৎসুকভাবে তাকাল মল্লারদের দিকে, বিশেষত চূর্ণীর দিকে৷ হয়তো পরনে জিন্স আর চামড়ার জ্যাকেট দেখেই ভালো করে চূর্ণীকে দেখল তারা৷

মল্লার তাদের সঙ্গে কথা বলার আগেই এক বৃদ্ধ প্রশ্ন করল, ‘বাবুরা কি কলকাতা থেকে আসছেন, নাকি কেষ্ট নগর?’

মল্লার জবাব দিল, ‘কলকাতা৷ আপনারা নিশ্চয়ই স্থানীয় মানুষ?’

লোকটা বিড়িতে টান দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, এখানেই আমাদের পাঁচ পুরুষের ভিটে৷ জন্ম, কম্ম, সারাজীবন এখানেই কেটে গেল৷ এখন ওপারে যাব বলে ঠ্যাঙ উঠিয়ে বসে আছি৷’

মল্লার বলল, ‘মাইল তিনেক দূরে ‘নবজীবন’ নামে একটা আশ্রম আছে, সেই আশ্রম চেনেন?’ এক বৃদ্ধ প্রশ্ন করল, ‘ঠিক কোন জায়গায় বলুন তো?’

সোহম জবাব দিল, ‘উত্তরদিকে নদীর পাড়ে তমসাময় শাস্ত্রী নামের একজন লোক আশ্রম বানিয়েছেন? বাচ্চারা থাকে যেখানে?’

এবার তার কথা শুনে এক বৃদ্ধ বলে উঠল, ‘তাই বলুন৷ মড়ার আশ্রম৷ হ্যাঁ, জানি৷’

চূর্ণী বিস্মিতভাবে বলল, ‘মড়ার আশ্রম মানে?’

বৃদ্ধ খকখক করে কেশে বলল, ‘ওখানের শ্মশানে সবাই মড়া পোড়াতে যায় কি না; তাই আমরা ওকে মড়ার আশ্রম নামে ডাকি৷ তাছাড়া এই আশ্রম যে চালায় সেই মানুষটা নাকি আগে মড়া নিয়ে সাধনা করত৷ কেউ কেউ বলে এখনও নাকি করে৷’

আর এক বৃদ্ধ বলল, ‘আমিও তাই শুনেছি৷ নইলে শ্মশানের পাশে ছাড়া লোকটা আর আশ্রম খোলার জায়গা পেল না! শুনেছি ও জায়গা নাকি ভালো নয়৷ রাতের বেলা ওই লোকটা তাদের ভূত-প্রেত-চেলা চামুণ্ডাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়৷’

তার এ কথার পর বৃদ্ধদের মধ্যে থেকে অন্য একজন বলল, শুনেছি ওই সাধুর নাকি বামন শাগরেদ আছে৷ বামনরা শয়তানের অবতার হয়৷ হারান চৌধুরীর জমিতে কাজ চাইতে গিয়েছিল লোকটা৷ একে বামন, তার ওপর ডোম, ওকে কে কাজ দেবে! হারানও দেয়নি৷ তাই বামনটা বাণ মেরে হারানের সেজো নাতিটাকে মেরে ফেলল৷ নইলে এক রাতের জ্বরে একটা কুড়ি বছরের জোয়ান ছেলে কখনও মরে? হারান তো ওকে খুনই করে ফেলত৷ ওই সাধুটাই ওকে বাঁচিয়ে দিল৷ শুনেছি বামনটা নাকি কাঁচা মাংস খায়!’

চা দোকানের যুবক দোকানদার ভাঁড়ে চা ঢালতে ঢালতে এই কথোপকথন শুনছিল৷ এবার সে বেশ ঝাঁঝিয়ে উঠে বৃদ্ধদের উদ্দেশে বলল, ‘নতুন লোক দেখে তোমরা তখন থেকে কী সব আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছ! তোমরা এসব কেউ নিজের চোখে দেখেছ? যত সব ফালতু কথা! তোমাদের কোনও কাজ নেই?’

মল্লারদের সামনে ধমক খাওয়াতে সম্ভবত আঁতে ঘা লাগল বৃদ্ধদের৷ তারা বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল৷ একজন বৃদ্ধ দোকানদার ছেলেটার উদ্দেশে বলল, ‘চোখে না দেখলে বুঝি শোনা কথা বিশ্বাস করতে নেই৷ বারো ক্লাস পাশ করেছিস বলে নিজেকে বেশি তালেবর ভাবিস না৷ বয়স্কদের কথার সম্মান করতে শেখ৷’ এই বলে গজগজ করতে করতে অন্যদিকে রওনা হল বৃদ্ধের দল৷

মল্লার খেয়াল করে দেখল বুড়োগুলোর কথা শুনে চূর্ণীর মুখটা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু দোকানদার ছেলেটা এরপর চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ওদের কথায় কান দেবেন না৷ ওদের কাজকর্ম নেই৷ সময় কাটে না৷ তাই লোকের নামে খালি নিন্দামন্দ করে বেড়ায়৷ ওই আশ্রম যে চালায় সে লোকটা আগে সাধু ছিল ঠিকই৷ কিন্তু লোকটা খুব ভালো৷ আমি বেশ কয়েকবার ওই শ্মশানে গিয়েছি মড়া পোড়াতে৷ কিন্তু সাধু অবস্থাতেই কখনও লোকটাকে কিছু চাইতে দেখিনি বা নেশাভাঙ করতে দেখিনি৷ বরং কোনও সাহায্য চাইলে পেয়েছি৷ সাধুগিরির নামে কোনও চুরি জোচ্চুরি কখনও করেনি লোকটা৷ আর এখন তো ওসব ছেড়ে দিয়ে আশ্রমে বাচ্চাদের নিয়ে থাকে৷ মাঝে মাঝে গঞ্জেও আসে বাজার করতে৷ আমার দোকানে চা-ও খায়৷’

ছেলেটার কথা শুনে চুর্ণীর মুখের গম্ভীর ভাবটা অনেকটাই কেটে গেল৷ সে ছেলেটাকে বলল, ‘তাহলে লোকটা আর ওই জায়গাটা ভালোই বলছ?’

কাচের বোয়াম থেকে বিস্কুট বের করে চূর্ণীর হাতে তুলে দিয়ে ছেলেটা বলল, ‘হ্যাঁ, ভালো লোক৷ শ্মশানের ব্যাপারে গ্রামের লোকদের সব সময়ই একটু ভয় থাকে৷ তবে ও জায়গা নির্জন হলেও খারাপ নয়৷ কোনওদিন ডাকাতি, খুন বা অন্য কোনও হাঙ্গামা হয়েছে বলে শুনিনি৷ শান্ত পরিবেশ৷’ চূর্ণী বেশ আশ্বস্ত হল ছেলেটার কথা শুনে৷

ছেলেটা এ কথা বলে প্রশ্ন করল, ‘বাবুরা কি সরকারি লোক?’

সোহম জবাব দিল, ‘না, কিন্তু আমাদের দেখে তোমাদের সরকারি লোক বলে মন হল কেন?’ দোকানদার ছেলেটা বলল, ‘কিছুদিন আগে আপনাদের মতোই কয়েকজন লোক গাড়ি থামিয়ে আমার দোকানে চা খেতে নেমেছিল৷ চা খেতে খেতে তারাও আমাকে ওই আশ্রমের ব্যাপারে নানা কথা জিগ্যেস করছিল৷ তারা বলছিল তারা সরকারি লোক৷ সরকারি কাজের জন্যই আশ্রমের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছে৷ আমি যতটুকু জানি তা ওদের বললাম৷’

মল্লার বলল, ‘আমরা সরকারি লোক না হলেও বিশেষ কারণে ওই আশ্রমে এসেছি৷ ওখানেই আছি৷ বাচ্চাদের খাওয়াব বলে মাংস কিনতে এসেছি৷’

দোকানদার ছেলেটা আর এ বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করল না৷ একদল লোক চা খেতে এল৷ তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে৷ চা-বিস্কুট খেয়ে মল্লাররাও উঠে দাঁড়াল৷ ছেলেটাকে পয়সা মিটিয়ে তারা এগলো কিছুটা তফাতে মাংসর দোকানের সামনে রাখা গাড়িটার দিকে৷

গাড়ির দরজা খুলে তারা গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক সেই সময় পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘এক্সকিউজ মি৷’

মল্লাররা পিছনে তাকিয়ে দেখল সেখানে একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে৷ মাঝবয়সি৷ পরনে শার্ট, প্যান্ট, জ্যাকেট, জুতো৷ মাথায় একটা ক্যাপ, কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ৷ তার মধ্যে থেকে উঁকি মারছে এক তাড়া কাগজ৷ লোকটার চেহারা বা পোশাক দেখে তাকে ঠিক গ্রামীণ মানুষ বা স্থানীয় লোক বলে মনে হল না৷

মল্লার তার উদ্দেশে বলল, ‘হ্যাঁ, বলুন?’

লোকটা বলল, ‘কিছু মনে করবেন না৷ আপনাদের দেখে শহরের লোক বলে মনে হচ্ছে৷ তাই পরিচয়ের লোভ সামলাতে পারলাম না৷ আমিও শহরের লোক৷’

মল্লার বলল, ‘আপনার পরিচয়?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার নাম, কিঙ্কর খাস্তগীর৷ সরকারি নদী বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে চাকরি করি৷ এখানে জলঙ্গী নদী নিয়ে কাজ করতে এসেছি। ওই নদীর নাব্যতা কেন কমে যাচ্ছে এসব ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে৷’—এ কথা বলে মল্লারদের উদ্দেশে হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন সেই মাঝবয়সি ভদ্রলোক৷

মল্লারও তাকে প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলল, ‘ও আপনি গবেষক! কোথা থেকে আসছেন আপনি?’ কিঙ্কর খাস্তগীর বললেন, ‘বাড়ি আমার দমদম তবে থাকি আমার কর্মস্থল নদী গবেষণা কেন্দ্রে৷ জায়গাটা নদীয়ার মোহনপুরে৷ কাঁচরাপাড়ার কাছে৷’

মল্লারের কথার জবাব দিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনাদের পরিচয়টা?’

মল্লার জবাব দিল, ‘আমরা তিন বন্ধু৷ কলকাতা থেকে এসেছি৷ এখানে জলঙ্গীর পাড়ে একটা আশ্রম আছে৷ সেখানে এসেছি৷’

কিঙ্কর বললেন, ‘ওই শ্মশানের কাছে যে অনাথ আশ্রম আছে সেটা তো? নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে থেকে আমি আশ্রমটা দেখেছি৷ ওখানে কেউ থাকে আপনাদের?’

মল্লার আসল কারণটা না ভেঙে লোকটাকে বলল, ‘না, কেউ থাকে না৷ একটা বিশেষ কাজে আমরা ওই আশ্রমে এসেছি৷’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ও৷ তা এখানে আপনারা থাকবেন, নাকি আজই ফিরে যাবেন?’

মল্লার বলল, ‘আমরা গতকাল রাতে এসেছি৷ আজ আর কালকের দিনটা আশ্রমে কাটিয়ে পরশু ভোরে কলকাতায় ফিরব৷ তা আপনি এখানে কোথায় উঠেছেন?’

কিঙ্কর উত্তর দিলেন, ‘এই বাজারে পান্থনিবাস নামে একটা ছোট হোটেল মতো আছে৷ সারাদিন নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়াই আর রাতে সেখানে মাথা গুঁজি৷ ক’দিন এখানে থাকি তারপর আবার কর্মস্থলে ফিরে যাই৷ এভাবে এখানে কিছুদিন ধরে আসা যাওয়া চলছে৷’

এ কথা বলে ভদ্রলোক বললেন, ‘ঠিক আছে, এবার আমি আসি৷ ভালো লাগল আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে৷’—এই বলে মল্লারদের উদ্দেশে আবারও নমস্কার জানিয়ে কিঙ্কর খাস্তগীর অন্যদিকে পা-বাড়ালেন৷ আর মল্লাররাও গাড়িতে উঠে রওনা হল আশ্রমের দিকে৷

গঞ্জের হাট থেকে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ তারা আশ্রমে ফিরে এল৷ বুনোই তাদের দরজা খুলে দিল৷ গাড়িটা নিয়ে তমসাময়ের ঘরের পাশে গাড়ি থেকে নামতেই গাড়ির শব্দ শুনে দাওয়া থেকে নীচে এলেন তমসাময়৷ বুনোও এসে উপস্থিত হল সেখানে৷ তমসাময়ের উপস্থিতিতে সোহম মাংসর ব্যাগটা বুনোর হাতে দিয়ে বলল, ‘ভালো করে রেঁধো৷ বাচ্চাগুলো যেন তৃপ্তি করে খায়৷’

তমসাময় বললেন, ‘নিশ্চয় খাবে৷ কিন্তু আপনারা যে মাংস আনবেন তা বুনোকে জানাতে ভুলে গিয়েছিলাম৷ ছেলেদের দুপুরের রান্না হয়ে গিয়েছে৷ ওদের মাংস রাতে রেঁধে দেবে বুনো৷ আর আপনাদের জন্য মাংস দুপুরে রেঁধে দেবে৷’

কথাটা শুনে মল্লার বলল, ‘এত হাঙ্গামার কী দরকার? রাতেই তাহলে একসঙ্গে রাঁধা হোক৷’ এ কথা শুনে তমসাময় মৃদু হেসে বললেন, ‘রাতে হলেও আপনাদের রান্না বুনোকে আলাদাই করতে হবে৷ কারণ, পাছে বাচ্চাদের শরীর-স্বাস্থ্য খারাপ হয় তাই ওদের রান্নাতে তেল মশলা তেমন দেওয়া হয় না৷ ওরকম রান্না খেয়ে ওরা অভ্যস্ত৷ সে রান্না আপনাদের ভালো লাগবে না৷ তাছাড়া ছোট স্টোভে একসঙ্গে এতটা মাংস রান্না করা সম্ভব নয়৷’

তমসাময়ের শেষ কথা শুনে চূর্ণীর সম্ভবত মনে পড়ে গেল শ্মশান থেকে আনা সেই কাঠগুলোর কথা৷ ছেলেগুলোর সঙ্গে একসঙ্গে মাংস রাধাঁর ব্যবস্থা হলে যদি সেই মড়া পোড়ানোর কাঠ দিয়ে রান্না করা হয়, সেই আশঙ্কায় চূর্ণী সোহমকে বলল, ‘উনি যখন বলছেন যে আলাদা রান্নার কথা তখন আমাদের জন্য দুপুরে আলাদা রান্নাই হোক৷ সেই ভালো৷ আমার আবার মাংস ঝাল না হলে খেতে ভালো লাগে না৷’

তমসাময় হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, বুনো আপনাদের জন্য ঝাল মাংসই রেঁধে দেবে৷ আসলে কী জানেন, ছেলেগুলোর শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে আমি সবসময় চিন্তায় থাকি৷ তাই কিছু বিধিনিষেধ রাখি ওদের জন্য৷ আমার তো সে সঙ্গতি নেই যে ওদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে ভালো হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব৷’

বুনো মাংস নিয়ে এরপর রান্না ঘরের দিকে এগলো৷

তমসাময়ও তার দাওয়ায় ওঠার জন্য পা বাড়ালেন৷ আর ওরা তিনজন এগলো তাদের বাসস্থানের দিকে৷ সেখানে ফিরে শীতের রোদ মেখে মাটির দাওয়াতে পা ঝুলিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর একে একে স্নান সেরে নিল৷ বেলা একটা নাগাদ বুনো খাবার নিয়ে এল৷ ধোঁয়া ওঠা ভাত আর মাংস৷ সঙ্গে আশ্রমের বাগানের সব্জি৷ বুনোর মাংস রান্নার হাতটা সত্যিই দারুণ৷ বেশ তৃপ্তি করে দুপুরের খাওয়া সাঙ্গ করে ওরা দুটো ঘরে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল৷

বিকালবেলা যখন তাদের ঘুম ভাঙল তখন সাড়ে চারটে বাজে৷ চূর্ণীই ঘুম ভাঙাল সোহম আর মল্লারের৷ চূর্ণী বলল, ‘চল নদীর পাড় থেকে একটু ঘুরে আসি৷ সন্ধ্যার পর থেকে তো আবার ঘরেই থাকতে হবে৷’

চূর্ণীর কথাতে অন্য দু’জনও সায় দিল৷ বাইরে বেরিয়ে দেখতে পেল বাচ্চা ছেলেগুলো তাদের বাড়ির দাওয়াতে পা ঝুলিয়ে সার বেঁধে বসে আছে৷ চূর্ণী তাদের উদ্দেশে হাত নাড়তেই তারাও হাত নাড়ল৷ শীতের বিকালের নরম আলো, সূর্য ঢলতে শুরু করেছে৷ চূর্ণীরা এগলো আশ্রমের পিছন দিকে নদীর পাড়ে যাবার জন্য৷ সেদিকে কিছুটা এগতেই দেখল বুনো আসছে হাতে একটা ফুলকপি ঝুলিয়ে৷ সোহম জিগ্যেস করল, ‘এখানের বাগানের কপি?’

বুনো হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, বাগানের৷ আপনাদের জন্যই তুলে আনলাম৷ ভেজে দেব৷’

বুনো তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবার পর সোহম চূর্ণীকে বলল, ‘তোর কি মনে হয়, এই লোকটা সত্যিই কাঁচা মাংস খেতে পারে?’

চূর্ণী তার কথার কোনও জবাব দিল না৷ তারা পৌঁছে গেল বাইরে বেরবার ঝাঁপের কাছে৷ যে জায়গার পাশে কাঠগুলো পড়ে আছে৷ মাঝে মাঝে চূর্ণীকে লেগপুল করার স্বভাব তার হবু বর সোহমের৷ ঝাঁপটা ঠেলে সরাবার সময় কাঠগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘শুনেছি কাঠের আঁচে মাংস ভালো সিদ্ধ হয়৷ সুযোগ যখন আছে তখন কালকে একবার এই কাঠের আঁচে মাংস রান্না খেয়ে দেখলে মন্দ হয় না৷’

কথাটা শুনে চূর্ণী ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘তোর যা ইচ্ছা, যেমনভাবে ইচ্ছা খা৷ কিন্তু এরপর আমার সামনে এসব নিয়ে আলোচনা করলে খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি৷’

মল্লার বলল, ‘সোহম তুই যাই বলিস না কেন শ্মশানের পোড়া কাঠে রান্না করার কথা শুনলে সত্যি মনের মধ্যে কেমন যেন অস্বস্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক৷’

তারা আশ্রম ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে জলঙ্গীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল৷ বেলা শেষের আলো ছড়িয়ে আছে নদীর ওপর৷ ধীরে ভেসে চলেছে কচুরিপানার ঝাঁক৷ দিন শেষে পাখির দল ডাকতে ডাকতে নদীর মাথার আকাশ দিয়ে উড়ে চলেছে৷ বেশ মনোরম পরিবেশ চারপাশে৷ মল্লার একটা সিগারেট ধরিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কচুরিপানা আর পাড়ের ঝোপজঙ্গলগুলো যদি পরিষ্কার করা যায় তবে এখানে শীতের সময় ভালো পিকনিক স্পট হতে পারে৷ চারপাশে বেশ নিরিবিলি, ফাঁকা ফাঁকা৷ আমার কিন্তু বেশ লাগছে এ জায়গা৷’

সূর্য দ্রুত ঢলতে শুরু করেছে৷ গাঢ় কালো হতে শুরু করেছে নদীর জল৷ নদীর দিকে তাকিয়ে তিনজন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল৷ হঠাৎ তাদের নাকে কেমন যেন একটা পোড়া গন্ধ এসে লাগল৷ চারপাশে তাকাতেই সে গন্ধের কারণ বুঝতে পারল৷ যেদিকটা শ্মশান, সেদিকে এক জায়গায় ধোঁয়া উঠছে৷ দূর থেকে বেশ কয়েকজন মানুষকেও চোখে পড়ছে সেখানে৷ মৃতদেহ পোড়ানো হচ্ছে৷ তারই গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে লাগছে তাদের নাকে৷ সেদিকে তাকিয়ে সোহম বলল, ‘শ্মশানের ওদিকটা কেমন তা একবার দেখে আসবি নাকি?’ কথাটা শুনেই চূর্ণী বলে উঠল, ‘শ্মশানে আবার কোনও মানুষ বেড়াতে যায়? এসব করলে কিন্তু আমি কালই এ জায়গা ছেড়ে চলে যাব৷ আমি আশ্রমের ভিতরে চললাম৷’ এ কথা বলে চূর্ণী শ্মশানের দিক থেকে অন্য দিকে মুখ ফেরাল৷ সোহম তার কথার জবাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই চূর্ণী এবার বলে উঠল ‘আরে দ্যাখ, সেই লোকটা না? যে গঞ্জের বাজারে আমাদের সঙ্গে কথা বলল?’

চূর্ণীর দৃষ্টি অনুসরণ করে সোহমরা তাকাল সেদিকে৷ তারা দু’জনও চিনতে পারল লোকটাকে৷ হ্যাঁ, সে-ই নদী গবেষক কিঙ্কর খাস্তগীর৷ তারা তিনজন যেখানে দাঁড়িয়ে তার থেকে কিছুটা দূরে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি৷ তার হাতে একটা বাইনোকুলার৷ তিনি যেন আশ্রমের দিকেই তাকিয়ে আছেন৷ তাকে দেখতে পেয়ে মল্লার হাঁক দিল, ‘মিস্টার খাস্তগীর? মিস্টার খাস্তগীর? এই যে আমরা এখানে৷’

কিন্তু বার কয়েক তার উদ্দেশে হাঁক দিলেও ভদ্রলোক যেন তার ডাক শুনতেই পেলেন না৷ মল্লারদের দিকে পিছন ফিরে তিনি নদীর পাড় বরাবর অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করলেন৷ ব্যাপারটা দেখে সোহম বলল, ‘অদ্ভুত লোক তো৷ যেচে এসে আলাপ করলেন তখন, আর এখন আমাদের ডাক শুনতেই পেলেন না৷ মল্লারের গলা তো তাঁর কাছে না পৌঁছবার কথা নয়৷’

সোহমের কথা শুনে চূর্ণী বলল, ‘এসব বিজ্ঞানী বা গবেষকরা শুনেছি আত্মভোলা টাইপের মানুষ হন৷ হয়তো উনি গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছেন৷ তাই মল্লারের ডাক তাঁর কানে পৌঁছয়নি।’

মল্লার বলল, ‘তাই হবে হয়তো৷ নইলে এমন ব্যবহার তো করার কথা নয়৷ ভদ্রলোককে বেশ আলাপি বলেই মনে হয়েছে৷’

অন্ধকার নামতে চলেছে৷ তাই এরপর তারা আশ্রমে ফেরার পথ ধরল৷ নিজেদের ঘরে ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে ঝুপ করে অন্ধকার নামল৷ লণ্ঠন জ্বালিয়ে গল্প করতে বসার পরই বুনো এসে হাজির হল চায়ের কেটলি আর এক থালা গরম গরম ফুলকপির বড়া নিয়ে৷ একটা বড়া মুখে তুলে সোহম বলল, ‘ডিলিশিয়াস! আশ্রম দেখতে নয়, মনে হচ্ছে আমরা কোনও হোম-স্টেতে বেড়াতে এসেছি! এই রান্নার জন্যই টাকাটা আশ্রমকে দেওয়া যেতে পারে৷’

ব্যাস, জমে উঠল আড্ডা৷ গল্প করতে করতে একসময় রাত আটটা বাজল৷ বুনো আবার এসে উপস্থিত হল রাতের খাবার নিয়ে৷ মল্লার জানতে চাইল, ‘বাচ্চারা মাংস কেমন খেল?’

বুনো বলল, ‘ওদের ঘরের সামনেই রান্নার ব্যবস্থা করেছি, চড়ুইভাতির মতো৷ খুব আনন্দ করছে ওরা৷ এখন ওখানে গিয়ে রান্না চাপাব৷ বেশিক্ষণ লাগবে না৷ এমনিতেই ওরা একটু বেশি রাতে খায়, যাতে মাঝ রাতে ওদের খিদে না পায় সে জন্য৷’

মল্লার বলল, ‘আচ্ছা৷ ছেলেগুলোকে একটু দেখেশুনে ভালো করে মাংস খাইয়ো৷’

বুনো বলল, নিশ্চয় বাবু৷ ওরা আমাদের সন্তানের মতো৷ ভালো করেই খাওয়াব ওদের৷ আপনাদের বড় দয়া৷ শ্মশানকালী আপনাদের সব বিপদ থেকে মুক্ত করুক৷’

বুনো খাবার দিয়ে চলে যাবার পর তিনজন রাতের খাবার খেয়ে নিল৷ শোবার আগে দাওয়ায় বেরিয়ে সোহম মল্লারকে বলল, ‘বাইরে আয়, একটা জিনিস দেখে যা।’

মল্লার বাইরে বেরতেই সোহম তাকে আঙুল তুলে দেখাল, ছেলেগুলো যে বাড়ি বা ঘরটাতে থাকে তার দাওয়ার নীচেই একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়েছে৷ কাঠের আগুন৷ আর তাকে ঘিরে নাচছে ছোট ছোট অবয়ব, সেই বাচ্চা ছেলেগুলো৷ অস্পষ্ট উল্লাসধ্বনিও ভেসে আসছে সেখান থেকে৷

সেদিকে তাকিয়ে সোহম বলল, ‘মনে হচ্ছে রান্নার আগুন ওই চিতাকাঠ দিয়েই জ্বালানো৷’

মল্লার বলল, ‘হতে পারে৷ কিন্তু যে কাঠের আগুনই হোক না ছেলেগুলো যে বেশ আনন্দ করছে তা বোঝা যাচ্ছে৷ ওদের মনে আনন্দ পাওয়াটাই তো আসল ব্যাপার৷’

কিছুক্ষণ দাওয়াতে দাঁড়িয়ে থাকার পর দু’জন ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল৷ খাওয়া সেরে তাদের আগেই চূর্ণী বেড়ার ওপাশের ঘরে ঘুমোতে চলে গেছে৷

ঘণ্টা দুই বাদে হঠাৎ মল্লারের ঘুম ভেঙে গেল৷ না, ঠান্ডার জন্য নয়৷ জানলার মতো জায়গাটাতে আগেই চাদর চাপা দেওয়া আছে৷ তার ঘুম ভেঙে গেল যেমন অনেক সময় অজানা কারণে ঘুম ভেঙে যায় ঠিক তেমনই৷ বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করার পর ঘুম আসছে না দেখে সিগারেট খেতে ইচ্ছা হল তার৷ পাশে শুয়ে থাকা সোহমের ঘুম যাতে ভেঙে না যায় সেজন্য সে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে প্যান্টের পকেট হাতড়ে সিগারেট আর লাইটার বার করে দরজা খুলে দাওয়ায় এসে দাঁড়াল৷ সিগারেট ধরাবার আগে ছেলেগুলোর ঘরের দিকে তাকাল সে৷ আগুন নিভে গেছে৷ সেখানে আর কেউ নেই৷ কুয়াশার স্তর ভেসে বেড়াচ্ছে আশ্রমের সর্বত্র৷ সিগারেটটা ঠোঁটে দিয়ে এরপর সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে লাইটার জ্বালাতে গিয়েও থেমে গেল৷ কুয়াশার আবরণের মধ্যে দিয়ে দেখতে পেল ছেলেগুলোর অস্পষ্ট অবয়ব৷ ভালো করে ঠাহর করে সে বুঝতে পারল তাদের সঙ্গে তমসাময়ও আছেন৷ তাকেই অনুসরণ করে আশ্রমের পিছন দিকে এগচ্ছে ছেলেগুলো৷ গতরাতেও ঠিক একই রকম দৃশ্য দেখেছে মল্লার৷ যদিও সে কথাটা বলতে ভুলে গেছে সোহম আর চূর্ণীকে৷ এই শীতের রাতে ছেলেগুলোকে নিয়ে কোথায় যান তমসাময়? বেশ অদ্ভুত ব্যাপার তো!

বাচ্চাগুলোকে নিয়ে তমসাময় প্রতি রাতে কোথায় যাচ্ছে তা জানার জন্য একটা অদম্য কৌতূহল জেগে উঠল মল্লারের মনে৷ সিগারেট না ধরিয়ে সে ঘরে ঢুকে পাজামা বদলে প্যান্ট পরে গায়ে জ্যাকেট দিয়ে, মাফলার জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল৷ ছেলেগুলো ততক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেছে কুয়াশার আড়ালে৷ দাওয়া থেকে নীচে নেমে পড়ল মল্লার৷ তারপর ছেলেগুলো যেদিকে গেছে, সেদিকে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এগোল৷ হাঁটতে হাঁটতে একমসয় সে পৌঁছে গেল আশ্রমের পিছনে নদীর দিকে বাইরে বেরোবার মুখটাতে৷ মল্লার দেখতে পেল সেখানকার ঝাঁপ বা দরজাটা একেবারে উন্মুক্ত৷ তবে কি তমসাময় বাচ্চাগুলোকে নিয়ে বাইরে বেরিয়েছেন? কিন্তু কেন? কৌতূহলটা যেন আরও পেয়ে বসল মল্লারকে৷ ব্যাপারটা কী তা দেখার জন্য মল্লারও বেরিয়ে পড়ল আশ্রম ছেড়ে৷ ঠিক সেই সময়েই কাছেই কোথায় যেন একপাল শিয়াল ডেকে উঠল৷

বাইরে বেরিয়ে চারপাশে তাকাল মল্লার৷ নদীর পাড়ে এ জায়গা ঘন কুয়াশায় মাখামাখি৷ সে কুয়াশা মুছে দিয়েছে পাড় আর জলের সীমারেখা৷ তবুও তারই মধ্যে মল্লারের মনে হল যেদিকে শ্মশান সেপাশ থেকে যেন কথাবার্তার শব্দ শোনা যাচ্ছে৷ ছেলেগুলোরই গলার শব্দ মনে হয়৷ তারা যেন কথা বলতে বলতে এগচ্ছে শ্মশানের দিকে৷ কৌতূহল বস্তুটা বড় বিপজ্জনক৷ মল্লার কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করল সেদিকে৷ সেই অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরগুলোও যেন তার সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে এগিয়ে চলল সামনের দিকে৷

এত ঘন কুয়াশা যে পাঁচ হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ মল্লারের মুখ, হাত ভিজে যাচ্ছে কুয়াশার জলে৷ হাঁটতে হাঁটতে আর একটু হলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল মল্লার৷ সে দেখতে পেল তার পায়ের সামনে পড়ে আছে বেশ বড় একটা কাঠের টুকরো৷ তার সামনে ছড়িয়ে আছে তেমনই আর কিছু কাঠ, মাটির হাঁড়ি৷ মল্লার বুঝতে পারল সে শ্মশানে পৌঁছে গেছে৷ সে চারপাশে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল ছেলেগুলোকে দেখা যায় কি না? কিন্তু কুয়াশার জন্য কোনও কিছুই ধরা দিচ্ছে না তার চোখে৷ আর যে শব্দকে অনুসরণ করে সে আসছিল সে শব্দও যেন কুয়াশার মধ্যেই হারিয়ে গেছে৷ তবে কি তা মল্লারের শোনার ভুল ছিল?

মল্লারের মনে হতে লাগল সে যেন কুয়াশা মোড়া এক নিস্তব্ধ অপার্থিব পৃথিবীতে এসে উপস্থিত হয়েছে৷ এবার সে উপলব্ধি করল এভাবে এত রাতে এই অচেনা জায়গাতে আসা তার উচিত হয়নি৷ ভূত-প্রেতের ব্যাপারে তার তেমন ভয় না থাকলেও সাপ খোপ বা চোর-ডাকাত তো এখানে থাকতে পারে! কুয়াশা যেন চারপাশ থেকে আরও ঘন হয়ে ঘিরে ধরতে আসছে তাকে! সেখানে থাকা আর সমীচীন মনে না করে মল্লার পিছন ফিরে এরপর ফেরার পথ ধরল৷ কিন্তু কিছুটা এগবার পরই সে দেখতে পেল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা গাছের গুঁড়ি! মল্লারের যাওয়া আসার পথে তো কোনও গাছ ছিল না! তবে হ্যাঁ, দিনেরবেলা সে কয়েকটা গাছ দেখেছিল বটে নদীর পাড় বরাবর দাঁড়িয়ে থাকতে৷

গাছটা দেখে মল্লারের মনে হল ঘন কুয়াশার মধ্যে দিক ভুল করে সে একেবারে নদীর গায়ে চলে এসেছে! মল্লার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল গাছটার সামনে৷ তার চারপাশে শুধু গাঢ় কুয়াশার আবরণ৷ সে বুঝে উঠতে পারল না কোনদিকে যাবে৷ পথ ভুল করে যদি সে পাড় থেকে নদীর জলে পড়ে যায় তবে তো সর্বনাশ হবে! মল্লার সাঁতার জানে না৷ কে তাকে উদ্ধার করবে জল থেকে? এবার তার মনে ভয় ধরতে শুরু করল৷ গাছটার থেকে কিছুটা সরে এসে সে চারপাশে তাকিয়ে কোনদিকে ফেরা দরকার তা বোঝার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল৷

আর এরপরই তার মনে হল তার চারপাশে কুয়াশার আবরণের আড়াল থেকে কেমন যেন একটা খচমচ শব্দ শুরু হয়েছে! আর তা যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে মল্লারের দিকেই৷ ভালো করে শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করে মল্লার বুঝতে পারল এ তার মনের ভুল নয়, সত্যিই শব্দ হচ্ছে! শব্দগুলো মল্লারের কাছে পৌঁছে হঠাৎই থেমে গেল৷ আর তারপর মল্লার দেখতে পেল তার চারপাশে কুয়াশার আবরণ ভেদ করে আবির্ভূত হচ্ছে বিন্দু বিন্দু আলো! জ্বলছে চোখ! এগুলো কাদের চোখ? এভাবে তারা মল্লারকে ঘিরে ধরেছে কেন? তারা তাকে আক্রমণ করবে নাকি? এবার সত্যিই একটা হিমেল স্রোত বইতে শুরু করল মল্লারের শিরদাঁড়া বেয়ে৷ জ্বলন্ত চোখগুলো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মল্লারের দিকে৷ মল্লারের প্রতি মুহূর্তে মনে হতে লাগল, এই বুঝি ওই জ্বলন্ত চোখগুলো কুয়াশার ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে ঝঁপিয়ে পড়বে তার ওপর৷

মল্লার আর নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল৷ ঠিক সেই মুহূর্তে কাছ থেকে তমসাময়ের কণ্ঠস্বর কানে এল—’মল্লারবাবু, আপনি এখানে এসেছেন কেন?’

সেই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে-সঙ্গেই মল্লারের চারপাশে ঘিরে থাকা জ্বলন্ত চোখগুলো যেন নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ কুয়াশার আবরণ ঠেলে তার সামনে আত্মপ্রকাশ করলেন তমসাময়৷

তাকে দেখেও মল্লারের আতঙ্ক সেই মুহূর্তে কাটল না৷ কাঁপা গলায় মল্লার তাকে জিগ্যেস করল, ‘আমার চারপাশে ওরা কারা ছিল, কাদের চোখ জ্বলছিল?’

তমসাময় জবাব দিলেন, ‘শিয়ালের।’

মল্লারের কথার জবাব দিয়ে তমসাময় আবারও তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু এত রাতে আশ্রম ছেড়ে বেরিয়ে আপনি একা এই শ্মশানে এসে উপস্থিত হলেন কেন?’

মল্লার এবার একটু ধাতস্ত হয়ে বলল, ‘সিগারেট খেতে দাওয়ায় বেরিয়ে ছিলাম৷ দেখলাম আপনি ছেলেগুলোকে নিয়ে আশ্রমের পিছন দিকে যাচ্ছেন৷ গতকাল রাতেও আমি একই দৃশ্য দেখেছি৷ ভাবলাম আপনারা কী করছেন দেখি। হাঁটতে হাঁটতে এসে দেখি নদীর দিকে বাইরে বেরোনোর দরজা খোলা৷ আমি ভাবলাম আপনারা বাইরে বেরিয়েছেন৷ তাই আমিও বাইরে বেরিয়ে পড়লাম৷ তারপর আমার মনে হল কুয়াশার মধ্যে দিয়ে বাচ্চা ছেলেদের গলা যেন এদিকেই আসছে৷ সেই শব্দ অনুসরণ করে আমিও শ্মশানে এসে উপস্থিত হলাম৷ তারপর কাউকে না দেখতে পেয়ে ফিরতে গিয়ে কুয়াশায় পথ ভুল করে এখানে এসে দাঁড়ালাম৷ তারপর শিয়ালগুলো ঘিরে ধরল আমাকে৷’

মল্লারের কথা শুনে তমসাময় বললেন, ‘রাতের খাওয়ার পর শীত-গ্রীষ্ম ছেলেগুলোকে নিয়ে রাতে আমি আশ্রমের মধ্যে ঘুরি৷ তাতে ওদের শরীর ভালো থাকে, হজম ভালো হয়৷ হাঁটার পর ওরা ঘরে ঢুকে গেছে৷ আমরা কেউ বাইরে বেরইনি৷ কোনও কারণে দরজাটা খোলা ছিল৷’

মল্লার বলল, ‘আমার যেন স্পষ্ট মনে হচ্ছিল ছেলেগুলোর গলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি!’

তমসাময় বললেন, ‘শ্মশানের কাছে নদীর পাড়ের বেশ কয়েকটা গাছে শকুনের বাসা আছে৷ আপনি যা শুনেছেন তা শকুনের বাচ্চার ডাক৷ রাতের বেলা সে ডাক শুনলে মনে হয় ছোট ছেলেরা কথা বলছে অথবা কাঁদছে৷’

এ কথা বলার পর তমসাময় বললেন, ‘ভাগ্যিস আমি দেখতে পেয়েছিলাম যে আপনি আশ্রম থেকে বাইরে বেরচ্ছেন, তাই আপনাকে খোঁজার জন্য এখানে এলাম৷ তবে এখানে এত রাতে এভাবে এসে কাজটা ভালো করেননি৷ আমি না এলে আপনার বিপদ ঘটতে পারত৷’

মল্লার বলল, ‘শিয়ালগুলো কি আমাকে আক্রমণ করত?’

তমসাময় বললেন, ‘শিয়াল এমনিতে দিনেরবেলা সূর্যের আলোতে ভীরু প্রাণী বলে পরিচিত, কিন্তু অন্ধকার নামলে তারা সাহসী হয়ে ওঠে৷ তখন তারা মানুষকেও আক্রমণ করতে পারে৷ কুয়াশাতে পথ বুঝতে না পেরে আপনি জলেও পড়ে যেতে পারতেন৷ সবচেয়ে বড় কথা হল…৷’

একথা বলে থেমে গেলেন তিনি৷

মল্লার বলল, ‘কী কথা?’

তমসাময় বললেন, ‘চলুন সে কথা আশ্রমে ফিরে বলছি৷ এখানে বেশিক্ষণ থাকা আপনার পক্ষে ঠিক নয়৷ আমার সঙ্গে আসুন৷’

ঘন কুয়াশার মধ্যেও কিন্তু পথ চিনতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হল না তমসাময়ের৷ তাঁকে অনুসরণ করে মল্লার ফিরে এল আশ্রমের সামনে৷ ভিতরে প্রবেশ করে আগলটা বন্ধ করে তমসাময় বললেন, ‘এবার আর আপনার কোনও ভয় নেই৷’

মল্লারের ভয় এবার কেটে গেছে৷ তবু সে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷ আশ্রম ছেড়ে বাইরে বেরনো আমার উচিত হয়নি৷ শিয়ালগুলো আমাকে আক্রমণ করতে পারত, কিংবা আমি নদীতে পড়ে যেতে পারতাম৷’

তমসাময় তাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘তার চেয়েও বড় বিপদ ঘটতে পারত আপনার৷ যার ফলে প্রাণসংশয়ও হতে পারত৷ যা আপনাকে বলতে গিয়েও তখন বলিনি৷’

মল্লার বলল, ‘কী সে বিপদ?’

তমসাময় একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘শ্মশান হল প্রেতযোনির আবাসস্থল৷ অন্ধকার নামলে ওরা আত্মপ্রকাশ করে৷ এ সময় তারা জীবন্ত মানুষের উপস্থিতি পছন্দ করে না৷ আপনার ক্ষতি করতে পারত৷ এই আশ্রমে তারা অনিষ্ট করতে পারে না আমি এই আশ্রমের চারপাশে মন্ত্রের বন্ধন দিয়ে রেখেছি বলে৷ কিন্তু শ্মশানে তারা উন্মুক্ত, স্বাধীন৷ খেপে গেলে যে-কোনও মানুষকে হত্যাও করতে পারে৷’

মল্লার এসব ব্যাপার বিশ্বাস না করলেও এ নিয়ে তমসাময়কে আর কোনও প্রশ্ন করল না৷ কারণ, তার মনে হল, তমসাময় তাঁর বিশ্বাস থেকেই কথাগুলো বললেন৷ আর অপরের বিশ্বাসে আঘাত করা উচিত নয়৷

তমসাময়ও আর এ প্রসঙ্গে কোনও কথা বললেন না৷ মাঝরাতে তিনি মল্লারকে তার ঘরের সামনে পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন৷

ঘরে ঢুকে মল্লার দেখল সোহম বেহুঁশ হয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমচ্ছে, তার অন্তর্ধানের কথা টের পায়নি সোহম৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *