চশমা এবং অপ্রস্তুতবাবু – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

চশমা এবং অপ্রস্তুতবাবু

সেই ছোটবেলা থেকে চশমার শখ। বড় দিদি চশমা পরত। বেশ লাগত। চশমার দৌলতেই আলাদা একটা গাম্ভীর্য ফুটে উঠত মুখে। কিন্তু শখ থাকলেই তো হল না। চোখটা তো খারাপ হতে হবে তবে তো চশমা।

তা সেটার জন্যে কোনও চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি অপ্রস্তুতবাবু। শুয়ে শুয়ে বই পড়া, এমন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা—যাতে চোখে লাগে, কম আলোতে পড়া, কাছ থেকে টিভি দেখা, সূর্যের দিকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেওয়া। কিন্তু কিছুতেই কিছু কাজ হয়নি। মাঝেমধ্যেই আশা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান আর হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। চোখে এখনও পাওয়ার হয়নি। আর জিরো পাওয়ার লেন্স পরে ঘোরাটাও ওনার পছন্দ নয়।

অফিসে পাশের টেবিলে বসেন বিভাসবাবু। বয়সে ওনার থেকে বছর দশেক ছোট। সেদিন অফিসে গিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে মন একেবারে ভেঙে গেল অপ্রস্তুতবাবুর। বিভাসের চোখেও চশমা। বেশ দেখাচ্ছে।

তা শেষ পর্যন্ত ভগবান যে ওনার দিকে মুখ তুলে তাকাবেন, ভাবতে পারেননি অপ্রস্তুতবাবু। দু-তিনদিন বই পড়ার পর একটু মাথা ধরছিল ওনার। যথারীতি চোখের প্রতিই প্রথম সন্দেহ হল অপ্রস্তুতবাবুর। পাড়ার নতুন ডাক্তার অনিন্দ্য বসাককে বেশ পছন্দ। ওনার কাছে যাওয়াই মনস্থ করলেন। বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। অফিসে আজ না হয় একটু দেরি করে যাবেন। অফিসের বড়সাহেবের শালির বিয়ে। এ ক’দিন একটু দেরি করে অফিসে আসবেন উনি। তাই সেদিক দিয়ে কোনও চিন্তা নেই।

অনিন্দ্যবাবুর চেম্বারে মোটে একটাই লোক ছিল। তারপরেই ডাক পড়ল অপ্রস্তুতবাবুর।

—পড়তে পারছেন ওই নীচের লাইনটা? বাঁ-চোখ বন্ধ রাখুন, খালি ডান চোখে।

—না, কিছুই পড়তে পারছি না।

—আবার চেষ্টা করুন।

—না, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

—তার উপরের লাইনটা, বাঁদিক থেকে।

৩,৪,৮,৯।—মন থেকে যা আসে বলে গেলেন অপ্রস্তুতবাবু।

—আরেকবার দেখে বলুন।

২,৮,৪,৫।—ভয়ে ভয়ে বলে উঠলেন অপ্রস্তুতবাবু। দু-একটা মিলে গেলেই হল। বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল ওনার।

—নাহ, আপনার চোখ বেশ খারাপ হয়েছে, দেখছি। দেখুন তো এই লেন্সটার মধ্যে দিয়ে, কীরকম পাওয়ার হল দেখি।

আরও মিনিট পাঁচেক পরে অনিন্দ্যবাবু সিদ্ধান্ত নিলেন। প্লাস ১, মাইনাস ২।

ডাক্তারের পাওয়ার লেখা কাগজটা বুকপকেটে সযত্নে রেখে চশমার দোকানের উদ্দেশ্যে বেরোলেন অপ্রস্তুতবাবু। অফিস চুলোয় যাক। মহৎকাজে দেরি করতে নেই। বৌবাজারে অনেকগুলো নতুন পুরোনো চশমার দোকান। বহুদিন ট্রামে যেতে যেতে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন উনি। আজ উনি বীরদর্পে দোকানে ঢুকে ফ্রেম দেখতে শুরু করলেন।

কিন্তু সবকটাই কেমন কেমন যেন! কোনওটার ডান্ডিটা খারাপ তো কোনওটার লেন্সের জায়গাটা বিশাল বড়। কোনওটাই পছন্দ হয় না। একটা দোকান থেকে বেরিয়ে আরেকটাতে ঢুকলেন। কিন্তু লাভ হল না কিছু। একটা দোকানের ছোকরা সেলসম্যান তো বলেই বসল, —আপনি চশমা কিনছেন না গাড়ি-কিনছেন মশাই। গাড়িও কেউ এত বাছবিচার করে কেনে না। শেষ পর্যন্ত না কিনেই ফিরতে হবে।

 কোনও উত্তর দিলেন না অপ্রস্তুতবাবু। চশমাকে যারা উপযুক্ত সম্মান দিতে পারে না তাদের সঙ্গে কথা বলতেও ওনার ইচ্ছে করে না।

তবে ছোকরার কথাই ঠিক হল। শেষ পর্যন্ত অপ্রস্তুতবাবু খালি হাতেই দোকান থেকে বেরোলেন। ভাদ্রমাসের ভ্যাপসা গরম। চশমা না পেয়ে মাথাটা আরও গরম হয়ে উঠেছে। ডালহৌসীর একটা ট্রাম আসছিল। চলন্ত ট্রামের পাদানিতে লাফ দিয়ে ওঠার সময় হঠাৎ ওনার খেয়াল হল—নতুন চশমার দোকানগুলোর পাশে পুরোনো চশমার একটা দোকান আছে। ওই দোকানটা তো দেখা হয়নি।

ট্রাম থেকে ফের নেমে অপ্রস্তুতবাবু ওই দোকানটায় ঢুকলেন। দোকানটার ভেতরে বেশ অন্ধকার। ভেতরে এককোণে এক বৃদ্ধ বসে আছেন। নিষ্পৃহভাবে। চোখেও বেশ কম দেখেন মনে হল। অপ্রস্তুতবাবুর মতো লম্বা-চওড়া একজন লোক যে ওনার দোকানে ঢুকেছে সে বিষয়ে বৃদ্ধের কোনও হুঁশই নেই। দোকানে সব পুরোনো ব্যবহৃত ফ্রেম রাখা আছে। তবে বেশ ভালো স্টক। কিছু নতুন ফ্রেমও আছে। অপ্রস্তুতবাবুর পুরোনো একটা ফ্রেম পছন্দ হল।

দাম জিগ্যেস করতে বৃদ্ধ বলে উঠল,—সত্যিই আপনার চোখ আছে। আর পাঁচজনের কাছে এ ফ্রেমটা পছন্দই হত না। আমার কিন্তু এটা প্রিয় ফ্রেম।…আপনাকে আরেকটা দেখাই। দেখুন পছন্দ হয় কিনা। দাম একটু বেশি।

—দামের জন্য চিন্তা করবেন না। চশমা তো বারবার কিনব না। একবারই কিনব।

বৃদ্ধ খুব উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল,—ঠিক বলেছেন। এই যে আমি পঞ্চাশবছর দোকানে বসছি, একি শুধু লাভের জন্যে! একটা চশমা একটা মানুষের চেহারা বদলে দিতে পারে। আর এ তো জামাকাপড় নয় যে বারবার চেঞ্জ করবেন। সুকুমারবাবু লিখেছিলেন না—চশমার আমি, চশমার তুমি—একদম হক কথা।

—উঁহু সেটা বোধহয় গোঁফ নিয়ে। তা সে যাক গে, আপনি কোন ফ্রেমটা দেখাবেন বলছিলেন!

বৃদ্ধ মিনিট পাঁচেক খোঁজাখুঁজির পরে একটা চশমা আলমারির ভেতর থেকে বার করে এনে দিল। আর সেটা দেখামাত্রই অপ্রস্তুতবাবু বুঝতে পারলেন যে ঠিক এরকমই একটা চশমা উনি এতক্ষণ খুঁজছিলেন। কোনওরকম দরাদরি করলেন না। বৃদ্ধের হাতে ছ’শো টাকা দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন। দুদিন বাদে পাওয়ার অনুযায়ী লেন্স বসানো হলে চশমাটা উনি নিয়ে যাবেন।

অফিসে একটা হালকা হিন্দিসিনেমার গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ঢুকলেন অপ্রস্তুতবাবু। দেড়টা। লাঞ্চ খেয়ে সবাই ফিরে এসেছে। যে যার সিটে বসে কাজ করছে। কী ব্যাপার? বড়বাবু অফিসে আছেন নাকি?

বুকটা ভয়ে একটু ঢিপঢিপ করে উঠল। বিনাশব্দে চেয়ারটা পিছনে সরিয়ে জায়গা করে সিটে এসে বসলেন অপ্রস্তুতবাবু। আর বসা মাত্রই ঠিক যে কথাটা শোনার ভয় ছিল, সেটাই পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল তপন রায়,—বড়বাবু, তিন-তিনবার খোঁজ করে গেছেন।

—উনি শালির বিয়েতে যাননি?

—আরে, কী দরকারি কাজ পড়েছে, তাই বর্ধমান যাওয়া ক্যানসেল করে আজ আরও তাড়াতাড়ি কাজে এসেছেন। আর তেমনই তিরিক্ষে মেজাজ।

তপন খারাপ খবর শোনাতে ওস্তাদ।

খানিকক্ষণের মধ্যেই অপ্রস্তুতবাবুর ডাক পড়ল। বড়বাবুর ঘরে। ওনার নাম অমিতোষ ব্যানার্জি। বছর চল্লিশেক বয়স। শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ার। এমনিতে শান্ত, তবে খেপলে আর দেখতে হয় না। তখন কাছে-পিঠে যেতে কেউ সাহস পায় না। আর যাকে ধরেন, তাকে শুধু মারধোর করতেই বাদ রাখেন। আজকে ওনার ঘরে ঢুকে মুখের দিকে একনজর তাকিয়েই অপ্রস্তুতবাবু বুঝতে পারলেন, কপাল নেহাতই খারাপ।

মিনিট খানেক বাদে নীরবতা ভাঙলেন বড়বাবু,—ব্লক ওয়ান-এ কেবল লেয়িং-এর কাজটা কদ্দূর? শেষ হতে আর ক’দিন?

—না, মানে আর্লিস্টেজে এভাবে বলা মুশকিল। তা ছাড়া লোকেদের সমস্যা তো আছেই। মনে হয় আরও মাসখানেক লেগে যাবে।

—মাসখানেক? একমাস আগেও তো একই কথা শুনেছি। না, না, এরকমভাবে কাজ করলে চলবে না। আপনি নিজেই আসছেন একটার সময়, তো আপনার আর কাজ দেখার সময় হবে কী করে? আমি বুঝি না মাসে মাসে মাইনে নেবার সময় আপনার একটুও লজ্জা হয় না? কেন?

আরও মিনিট কুড়ি বাদে অপ্রস্তুতবাবু যখন ঘর থেকে বেরোলেন, তখন কান লাল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এমন বকুনি আগে কোনওদিন খাননি। সত্যি চশমার জন্যই কত বিপত্তি!

তবে এত সহজে অপ্রস্তুতবাবু ভয় পান না, হাজার হোক তিরিশবছর কেরানির চাকরি করছেন। কাজ না করার জন্য বকুনি খাওয়া, সুযোগ বুঝে ফাঁকি দেওয়া, ঠিক সময়মতো আবার বড়সাহেবকে খুশি করা—এ সবই অপ্রস্তুতবাবুর কাছে নিতান্ত পরিচিত।

তাই পরের দিন বিকেল তিনটের সময় আবার অপ্রস্তুতবাবুকে দেখা গেল বৌবাজারের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে। অফিসে বলেছেন ভাগ্নির শরীর খারাপ। দেখা করতে হাসপাতালে যাচ্ছেন। সব বাজে কথা। ভাগ্নিই নেই, তো তার আবার শরীর খারাপ! ইচ্ছে আছে চশমা নিয়ে অনাদি কেবিনে গিয়ে মোগলাই-কষামাংস খেয়ে একটা সিনেমা হলে ঢুকবেন। বাছাবাছির কোনও ব্যাপার নেই, সব সিনেমাই ওনার ভালো লাগে। আজ আবার চশমা পরে!

এসব ভাবতে ভাবতেই দশমিনিটের পথ পাঁচমিনিটেই পেরিয়ে এলেন।

চশমার দোকানে সেই ভদ্রলোকই ছিলেন। চশমাটাও রেডি ছিল। পরে দেখে নিলেন অপ্রস্তুতবাবু। হ্যাঁ, পাওয়ার একদম ঠিক। সবকিছু আরও স্পষ্ট হয়ে চোখে ধরা দিচ্ছে। মনটা ফুর্তিতে ভরে উঠল।

অনাদি কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন উনি।

পনেরো মিনিট এই গরমে হাঁটা! কথাটা মনে হতেই বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালেন। দুটো ওই রুটের বাস চলে গেল। বড় ভিড়। শেষে একটা ট্যাক্সি ডেকে চেপে বসলেন,—অনাদি কেবিন।

ট্যাক্সিতে উঠে বসার মিনিটখানেকের মধ্যেই ওনার মনে হল—ছি: ছি:, অফিসটাইমে কাজ ফাঁকি দিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া! সিনেমা দেখতে যাওয়া! লজ্জায় মাটিতে মিশে গেলেন। ট্যাক্সিকে ফের পথ বদলাতে বললেন,—ডালহৌসী চলো।

অফিসে ঢোকার মুখেই অতনু, সনাতনদের সঙ্গে দেখা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে আর খোশগল্প করছে। অপ্রস্তুতবাবুকে হন্তদন্ত হয়ে অফিসে ঢুকতে দেখে সনাতনই বলে উঠল,—অ্যাই কী ব্যাপার! ছুটির সময় অফিস ঢুকছিস?—আরে! চোখে ওটা কী? নতুন চশমা।

—চোখে পাওয়ার হয়েছে। নতুন করালাম। কেমন হয়েছে?

দেখতে তো দারুণ, তবে এত সুন্দর চশমা আমাদের মতো ছাপোষা লোকদের মানায় না।—একটু থেমে সনাতন ফের বলে উঠল : চ, চা খেয়ে আসা যাক।

না, আজ অনেক কাজ আছে।—বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে অপ্রস্তুতবাবু লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন। মনের মধ্যে রীতিমতো অনুশোচনা হচ্ছে অফিস ফাঁকি দিয়ে চশমা নিতে যাওয়ার জন্য।

নানা ধরণের ছুতোয় অপ্রস্তুতবাবু বহুদিন অফিস পালিয়েছেন। কোনওদিন ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য, কোনওদিন সিনেমা দেখার জন্য, তো কোনওদিন নিছকই আড্ডা মারতে। কিন্তু আজকের এ অনুভূতি আগে কখনও হয়নি। অফিস ঘরে ঢুকেই চেয়ারে বসে কাজ শুরু করে দিলেন।

হুঁশ ফিরল উপেনবাবুর ডাকে,—কী মশাই। হঠাৎ করে এত কাজ দেখাচ্ছেন। ইনক্রিমেন্টের চিঠি পাওয়ার সময় তো এখনও হয়নি।

অপ্রস্তুতবাবু বিব্রত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন। সত্যি সওয়া ছ’টা বেজে গেছে। আশেপাশের টেবিলে কেউ বসে নেই। অন্যদিন সাড়ে পাঁচটার সময় উঠে পড়েন। আজ কীরকম কাজের নেশায় পেয়ে বসেছে। বেশ ভালোও লাগছে কাজ করতে।

বাড়ি ফিরেও সন্ধ্যেটা অন্যভাবে কাটল অপ্রস্তুতবাবুর।

অন্যদিন কাজের লোকটাকে চা-জলখাবারের বন্দোবস্ত করার হুকুম দিয়ে টিভির সামনে গিয়ে বসেন। একা মানুষ, আর করারই বা কী আছে। আটটা নাগাদ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব এসে হাজির হয়, নয়তো উনিই গিয়ে তাদের কারওর বাড়িতে হানা দেন। তাসের আড্ডা বসে। চলে রাত দশটা-এগারোটা অবধি। তারপরে রাতের খাওয়া আর ঘুম।

আজ কিন্তু রুটিনটা একেবারে পালটে গেল। বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনায় উনি যে বইগুলো পেয়েছিলেন—দীর্ঘদিন যা বইয়ের আলমারির শোভাই বাড়াচ্ছিল শুধু, তারই একটা নিয়ে সোফায় বসে গেলেন। বই পড়তে পড়তে এমন মজে গেলেন যে আটটার সময় ফোন করে জানিয়ে দিলেন যে আজ আর ওনার তাসের আড্ডায় যাওয়ার কোনও ইচ্ছে নেই।

ন’টা নাগাদ বইটা শেষ হলে গান শুনতে টেপ চালালেন। টেপের মধ্যে যে ক্যাসেটটা ছিল সেটা বাজতেই ওনার গা রি রি করে উঠল। বেসুরো চিৎকার। যেমন কথা তেমনি সুর! কোনও একটা সিনেমার গান। ক্যাসেটের তাকটা হাতড়ালেন। সবই সিনেমার নিম্মমানের গানের ক্যাসেট। কী করে যে এসব গান এতদিন শুনেছেন, সেটা ভেবে নিজেই বেশ অবাক হলেন।

অবশেষে উপরের তাকের পিছনের দিক হাতড়ে রবিশঙ্করের সেতারের একটা ক্যাসেটের খোঁজ মিলল। বাঁচোয়া। কালকেই বেশ কয়েকটা পছন্দসই ক্লাসিকাল গানের ক্যাসেট কিনে আনতে হবে।

বাড়ির চাকর গণেশ একবার বলতে এসেছিল,—বাবু, টিভিতে একটা জবর সিনেমা দিয়েছে। দেখবেন?

তাতে অপ্রস্তুতবাবু এমনভাবে ওর দিকে তাকালেন যে গণেশ আর দ্বিতীয়বার বলার সাহস পেল না। অন্যদিন বাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে টিভি দেখতে ছুটে আসেন।

বাবু যে আজ একেবারে অন্যরকম হয়ে গেছেন, ক্ষণে ক্ষণে তার প্রমাণ পেতে থাকল গণেশ। খেতে বসে কষা মাংস’র দিকে একনজর তাকিয়েই অপ্রস্তুতবাবু চমকে উঠলেন,—অ্যা! দিনকে দিন একী শুরু করেছিস! এতে তো দুদিনেই শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে যাবে। এত তেল মশলা! যা, দুটো মাংস ধুয়ে এনে দে। তাই দিয়ে খাই।

গণেশ একবার বলতে গিয়েছিল,—বাবু আপনি রোজ রোজ বলেন—তাই তো—

কিন্তু বাবুর কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মুখের কথা মুখেই আটকে গেল। বাবু আজকে সত্যিই কেমন হয়ে গেছেন! মুখের উপর আবার ইয়া শেয়ালপণ্ডিত মার্কা চশমা। অফিসে খুব বকুনি খেয়ে মাথা গন্ডগোল হয়নি তো!

পরের দিন গণেশের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হল। সকালে ও যখন বাজার থেকে ফেরে, বাবু তখন ব্যাজার মুখ করে সোফায় বসে টুথব্রাশ চিবোতে চিবোতে ঝিমোয়। অফিসে যেতে যেতে আরও দু’ঘণ্টা। আজ গণেশ যখন ফিরল, তখন অপ্রস্তুতবাবু অফিসের জামাকাপড় পরে সকালের জলখাবার খেতে বসে গেছেন। পোশাক—তাও আবার কেমনতরো যেন! সুট, টাই—কস্মিনকালেও বাবু এসব পরতেন না।

আর মিনিট দশেকের মধ্যেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন। ব্যাজার মুখে নয়, হেলতে দুলতে নয়, বেশ উৎফুল্লভাবে গটগট করে হেঁটে।

অপ্রস্তুতবাবু যখন অফিসে পৌঁছোলেন, তখন ন’টা বাজতে দশ। দশেশ্বর বেয়ারা চেয়ার-টেবিলের ধুলো পরিষ্কার করছে। পুরো অফিস খাঁ-খাঁ করছে। দশেশ্বর তো অবাক হয়ে বলেই ফেলল,—সার, আপকা তবিয়ত তো ঠিক হ্যায় না! ইতনে জলদি!

ঠিক ন’টার সময় বড়সাহেব এসে ঢুকলেন। অপ্রস্তুতবাবুকে এত তাড়াতাড়ি আসতে দেখে এতটাই অবাক হয়ে গেছেন যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে আরেকটু হলে দেওয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেতেন।

সওয়া দশটার সময় বড়সাহেবের চেম্বারে ডাক পড়ল অপ্রস্তুতবাবুর। আজ কিন্তু ওনার সেই জড়সড় ভয়-ভয় ভাব নেই। কাজের হাল জিগ্যেস করা মাত্রই দৃপ্তভঙ্গিতে সুশৃঙ্খলভাবে বলতে শুরু করলেন। এত গুছিয়ে এত সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন সেটা ওনারই জানা ছিল না।

সকাল থেকে বসে একটা প্রাোজেক্ট প্ল্যান করেছেন। তাতে কবে কী কাজ হবে, কোনদিন কী কী চেক করতে হবে—যাবতীয় উল্লেখ আছে। মি: ব্যানার্জি এতটাই চমৎকৃত যে অন্যদিনের মতো ধমক-ধামক কিছুই তো করলেন না, উলটে অন্য একটা প্রাোজেক্টের কাজও ওনার হাতে তুলে দেবেন জানালেন।

আজ উনি মাত্র একবার সিগারেট খেতে বাইরে গেলেন। লাঞ্চটাইমের আড্ডাটা ঘণ্টাদুয়েক না হয়ে মাত্র আধঘণ্টার হল।

অফিসের শেষে ইউনিয়নের মিটিং-এ অপ্রস্তুতবাবুকে চিরকালই যেতে হয় বলে যান। এককোণে বসে চুপচাপ শুধু শুনে যান। সেখানে শিকদার, অতনু—এসব ইউনিয়নের বড় বড় পান্ডাদের সামনে কোনও ব্যাপারই মুখ খুলতে চান না। কিন্তু আজ যেভাবে মিটিং চলাকালীন শিকদারকে থামিয়ে—দ্যাটস নট ইন আওয়ার এজেন্ডা। লেট আস কনসেনট্রেট অন রিয়াল ইস্যুস।—বলে বসলেন, তাতে বাকিরা তো অবাক হলেনই, কিন্তু সব থেকে অবাক উনি নিজে।

এভাবে দিন পনেরো চলল। ওনার রুটিন এখন একেবারে বদলে গেছে। আগের অপ্রস্তুতবাবুর সঙ্গে এখনকার অপ্রস্তুতবাবুর অনেক তফাত। বলতে গেলে আলাদা মানুষ। এ ক’দিনেই উনি বড়বাবু মি: ব্যানার্জির প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন। কাজের মানুষ হিসেবে নাম ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্যই সবই যে ভালো হয়েছে তা নয়। অফিসের বেশির ভাগ বন্ধুই এখন ওনার ওপর হাড়ে চটা। ওনার এই ভারিক্কি মেজাজ, হঠাৎ কাজের আগ্রহের তলায় অনেক কিছুরই সম্ভাবনা ওরা খুঁজে পেয়েছে। ঢলা জামা ছেড়ে স্যুট-টাই, এগারোটার বদলে ন’টায় অফিসে ঢোকা, সময়মতো কাজ করা, আড্ডা না মারা—সবই অফিসের কর্মসংস্কৃতির বিরোধী। আড়ালে তাই ওনাকে নিয়ে সবসময় আলোচনা চলে। কেউই সেধে কথা বলতে চায় না। এককথায় আগের সঙ্গীসাথিরা ওনাকে একঘরে করেছে। সবথেকে বড় অসুবিধে বাড়ির চাকর গণেশের। বাড়িতে কেবল-লাইন বন্ধ করে দিয়েছেন অপ্রস্তুতবাবু। তাই তার সিনেমা দেখা বন্ধ। আগে হিন্দি সিনেমা দেখতে দেখতে গুনগুন করে গান করত ও। এখন বাবুর দাবড়ানিতে সেটাও বন্ধ। সময় মেপে মেপে কাজ। ঠিক রাত সাড়ে ন’টায় টেবিলে রাতের খাবার, ঠিক রাত সাড়ে দশটায় সব আলো নেভানো, ঠিক সকাল ছ’টায় ওঠা, ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায় জলখাবার দেওয়া—সবকিছুর আগেই ঠিক-ঠিক-ঠিক। একটু নড়ন-চড়ন হলে বাবু একেবারে খেপে লাল।

গণেশকে একটা হাতঘড়ি কিনে দিয়েছেন অপ্রস্তুতবাবু। এমনিতে পরতে বেশ ভালোই লাগে গণেশের। বাজারে ঘড়ি পরে গেলে বেশ একটা বাবু বাবু ভাব আসে। কিন্তু ঘড়ি দেখে ছুটতে ছুটতে এর মধ্যেই হাঁফিয়ে উঠেছে গণেশ। ঠিক করেছে দেশে ফিরে গিয়ে চাষ-বাস নিয়ে থাকবে, আর এ চাকরি নয়।

এ ক’দিনে অপ্রস্তুতবাবুর খরচও বেশ বেড়েছে। আগের মতো ভিড় বাসে চড়তে কি হেঁটে যেতে আর ওনার ইচ্ছে করে না। দু-বেলা ট্যাক্সি করে অফিস যাতায়াত করেন। ছোটখাটো দোকানে গিয়ে চপ-কাটলেট না খেয়ে পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে আসেন। বাড়ির দেওয়াল দামি-দামি পেন্টিংয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন। প্লাস্টিকের চেয়ারগুলো বাতিল করে সেগুন কাঠের চেয়ারের অর্ডার দিয়েছেন।

সেদিন অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধে সাতটা হয়ে গেল। মি. ব্যানার্জি বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব ওনার উপর তুলে দিয়েছেন। মি: ব্যানার্জি একটু দেরি করে বেরোন। বেরোনোর সময় উনি লিফট দিতেও চাইলেন। কিন্তু অপ্রস্তুতবাবুর তখনও কিছু কাজ বাকি। এ ক’দিনে পরিস্থিতি অনেকটা সামলালেও গত কয়েক বছরের কৃতকর্মের ফল ওনাকে ভোগ করতে হচ্ছে। কোনও কাজই ঠিকভাবে করা নেই।

আজ অফিস থেকে যখন বেরোলেন, রাস্তা ফাঁকা। অফিসপাড়ায় যত চাঞ্চল্য সন্ধে সাড়ে ছ’টা অবধি। তারপরে আর কে থাকে? অফিসের বাইরে থেকে একটা ট্যাক্সি নিলেন।

আবেগ আলী লেন। নিউ আলিপুর। অন্যমনস্কভাবে বলে উঠলেন।

বলার খানিকবাদে ওনার নিজেরই মনে হল ‘নিউআলিপুর’ বললেন কেন? উনি থাকেন তো ৬৩ নম্বর পাঁচুমিত্তির লেন, লিচুবাগান, দমদমে। হঠাৎ করে ওই ঠিকানাটা বলতে গেলেন কেন? কপালে হাত রাখলেন। নাহ, শরীর ঠিক আছে। জ্বরের বিকারে ভুল বকারও চান্স নেই। তবে কি কোনও আত্মীয়ের ঠিকানা? ফট করে মুখে এসে গেছে? না, তাও নয়। কেমন যেন অদ্ভুত রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন বলে ওনার মনে হল। আর কিছু না বলে বসেই রইলেন। দেখা যাক না, কোথায় নিয়ে যায়। ওই নামের কোনও সত্যিকারের রাস্তা আছে কিনা দেখা যাবে।

আধঘণ্টা বাদে হঠাৎ নীরবতা ভেঙে আবার ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলে উঠলেন,—ব্যস, ব্যস, ডানদিক করে দাঁড় করাও।

ভাড়া মিটিয়ে নামার পর ওনার আবার অবাক হওয়ার পালা। রাস্তাটার নাম আবেগ আলী লেনই বটে। বেশ পরিষ্কার। প্রশস্ত রাস্তা। দুপাশে সুদৃশ্য ফ্ল্যাটবাড়ির সারি। রাস্তায় দু-একটা লোক দেখা যাচ্ছে। নির্ঘাত বেশ বড়লোকদের পাড়া। এতক্ষণে ওনার খেয়াল হল—হঠাৎ করে এখানে নামতে গেলেন কেন? রাস্তার নামটা তো আর নামার আগে খেয়াল করেননি।

ঘাড় ঘুরিয়ে ডানদিকের আটতলা ফ্ল্যাটবাড়িটার দিকে তাকিয়েই বুঝলেন ওখানেই ওনাকে যেতে হবে। কিন্তু কেন? কার সঙ্গে দেখা করতে?—এসব প্রশ্নের উত্তর ওনার জানা নেই।

বাইরের আধখোলা লোহার গেট পেরিয়ে তিন ধাপ উঠে মার্বেল ঢাকা বিশাল হলঘরে প্রবেশ করলেন। এটাই এ বাড়ির রিসেপশান। মাঝে গোল মার্বেলের টেবিলে এক দারোয়ান বসে আছে। তাকে কিছুই জিগ্যেস না করে উনি ডানদিকের লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন। এত সাবলীল ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলেন যে দারোয়ানটা অপরিচিত লোক দেখেও কিছু বলল না।

লিফটে ঢুকে চারতলার স্যুইচ টিপে দিলেন। চারতলার লিফট থেকে নেমেই সপ্রতিভাবে ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটটার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজায় বড় বড় তিনটে নাম্বার লক ঝুলছে। ফিরেই আসছিলেন অপ্রস্তুতবাবু, হঠাৎ করে ৩৮৯, ৫৪২, ২০১—সংখ্যা তিনটে ওনার মাথায় এসে গেল। অন্য এক সম্পূর্ণ অচেনা ব্যক্তির ফ্ল্যাটের তালা খুলে ঢোকা যে কত বড় অপরাধ তা জেনেও অপ্রস্তুতবাবু আর কৌতূহল সামলাতে পারলেন না। সংখ্যা তিনটে পর পর তিনটে তালার উপর প্রযোগ করতেই তালা তিনটে খুলে গেল। নিজেই নিজের মনের হদিশ পাচ্ছেন না—এরকম মনে হল অপ্রস্তুতবাবুর। কোনও জাদুক্ষমতা পেয়ে যাননি তো! কত অবাক কাণ্ডই তো ঘটে!

মনের ভয় দ্বিধা একমুহূর্তে কোথায় উবে গেল। সামনের শ্বেতশুভ্র মার্বেলের মেঝে যেন ওনার পদক্ষেপের অপেক্ষাতেই রয়েছে। বিশাল ড্রয়িংরুম। মাঝে কুড়ি বাতির ঝাড়লণ্ঠন। চারদিকের দেয়ালে কাঠ, পোড়ামাটির আর কাচের অনবদ্য কাজ। মাঝে দামি লেদারের সোফাসেট। তার উপরেই গিয়ে বসলেন উনি। ভাবখানা এমন, যেন কেউ আপ্যায়ন করে ওনাকে ডেকে এনেছে। দেওয়ালে লাগানো ছবিগুলো ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। দুর্বোধ্য সব ছবি।

কিছুক্ষণ দেখার পর ওনার অবশ্য ছবিগুলো চেনা চেনা লাগল। এমনকী কোন পেন্টারের কোন গ্যালারি থেকে কেনা—সেসবও ওনার মনে পড়তে লাগল। তবে ওনার চোখ আটকে গেল ড্রয়িংরুমের বেসিনের উপর লাগানো ছবিটার উপর। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন উনি। স্যুট-টাই পরা ভদ্রলোক। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। চোখে চশমা। আর চশমাটা অবিকল ওনারটারই মতো। সোনার জলে রং করা চশমার ফ্রেমটা অবিকল একরকম। ভদ্রলোকের মুখে অদ্ভুত এক আভিজাত্যের ছাপ। কী যেন এক আকর্ষণে অপ্রস্তুতবাবু ওই ছবির দিকে তাকিয়েই বসে রইলেন।

বেশ খানিকক্ষণ বাদে অপ্রস্তুতবাবু ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে নিচে নামার লিফটের স্যুইচ টিপলেন। নিচে নেমে রিসেপশানের সামনে দিয়ে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন, হঠাৎ দারোয়ানের ডাক শুনলেন,—সাহেব, আপনি কবে এলেন? আপনাকে ঢুকতেও তো দেখিনি। সত্যি কত সব আজব কথাই না শোনা যায়। এই তো সেদিন মল্লিক সাহেব বলছিল আপনি নাকি আমেরিকায় কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। যাক সে কথা, সাহেবকে অনেকদিন পরে দেখে দারুণ ভালো লাগল। তা খবর সব ভালো তো?

অপ্রস্তুতবাবু অবাক হয়ে কিছুই না বুঝে দারোয়ানের দিকে মুচকি হেসে তাকালেন। তারপর ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে আরও অবাক হয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন ট্যাক্সির খোঁজে। এরকম দাড়ি তো ওনার ছিল না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *