ঘামের জলে নৌকো চলে দেখবি চল
নব্বই শেষ হয়ে তখন দুহাজার এসে গেছে কিন্তু গায়ে তখনও ভরপুর নব্বইয়ের গন্ধ। আমরা বন্ধুবান্ধবেরা কুড়ির কোঠায়। স্কুলের গণ্ডী ডিঙিয়েছি কিছুদিন হোল। কলেজ থেকে পিকনিকে গেলাম আমরা ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা দল বেঁধে। জায়গাটা ছিল বাটানগর ছাড়িয়ে গঙ্গার ধারে এক মরে যাওয়া টাউনশিপ, যেখানে কোনও এক সময়ে একটা কারখানা ছিল এবং তাকে ঘিরে লোকালয়। এখন শীতকাল, এখানে সন্ধ্যে নেমে যায় সকাল হতে না হতেই, এবং সারা অঞ্চল জুড়ে একটা কালচে কুয়াশার চাদর।
সেই মৃত জনপদ আসলে গোটা কারখানা জুড়েই। তার বড় রাস্তার পাশে বন্ধ কোয়ার্টারের সারি,তার ভাংগা দেওয়াল জুড়ে বর্ষার ড্যাম্প, নিঃঝুম পানের দোকান, অচল বাসের কংকাল, ফ্যাক্টরির ছমছমে বিশাল বিল্ডিং, বন্ধ ওয়েল্ডিং মেশিন, মাল ট্রান্সফার করার রেললাইন যা এই মুহূর্তে একলা নির্জন। শুধু এক শুকনো খটখটে হাওয়া হা হা করে ছুটে যাচ্ছে গঙ্গার দিকে। এই ফ্যাক্টরির এখন কিছু খুচরো আয় হয় পিকনিক বা বিয়েবাড়ির জন্য ঘরভাড়া দিয়ে। বাকি যে সব লেবারারেরা ছিল তারা জন খাটতে যায় কলকাতার দিকে। অথবা এখানে ওখানে শীর্ণ চায়ের গুমটি। দিনমজুরি। অথবা হয়ত কিছুই না। চুপচাপ নিজের ঘরে বসে থাকা জায়গাটা রম্য এবং নির্জন। অস্বাভাবিকভাবে কোনও পাখিও ডাকছিল না। মাঝে মাঝে শুধু ছুটকো নৌকো ভেসে যাচ্ছিল নদীর ওপর দিয়ে। নদীর ওপারে সারিসারি বন্ধ জুটমিল। সারা অঞ্চল জুড়ে আগাছা, ঝোপঝাড়। তারই মধ্যে একটা দুটো ভাঙা মন্দির অথবা পোড়ো সিগারেটের দোকান। আমরা অনেকেই গাঁজা খেতে অথবা প্রেম ও খুচরো শরীর করতে সেই ঝোপ জঙ্গলে সেঁধিয়ে গিয়েছিলাম একে একে। নদীর ধারে বান্ধবীদের সঙ্গে বসে দেখেছিলাম এখানে ওখানে মরা সাপের খোলস পড়ে আছে অবহেলায়, এবং জলের ধার থেকে মাটি ফাটিয়ে উঠে আসছে বটঅশ্বত্থের চারা। গোটা জায়গাটার দখল নিয়ে নিচ্ছে প্রকৃতি ।
আমাদের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল লোকাল বাচ্চারা। আধময়লা জামা গায়ে। নাকে শিকনি, চোখে পিচুটি। এরা অনেকেই স্কুলে যায় না আর। সারাদিন টো টো। ফ্যাক্টরির ভাংগা বাড়িতে লুকোচুরি অথবা ক্রিকেট। এদের সকলেরই চোখের দৃষ্টি মরা আর ঘোলাটে। ডাকলে সাড়া দেয় না। কথা বলতে গেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। শুধু দূর থেকে নিঃশব্দে আমাদের লক্ষ্য করে যায়। একে একে তারা জড়ো হচ্ছিল দূরে। নিঃসাড়ে দেখে যাচ্ছিল আমাদের নেশা করা, শরীরী ঘনিষ্ঠতা। আমরা খুব সহজ হতে পারছিলাম না এদের সামনে। বাচ্চাগুলো কোনওরকম বিরক্ত করছিল না। কাছেও আসছিল না। শুধু মরা চোখে অপেক্ষা করছিল দূরে দাঁড়িয়ে। আমরা শেষে বিরক্ত হয়ে উঠে চলে গেলাম অন্য দিকে, দলের মধ্যে। কারণ মনে হচ্ছিল দলছুট হলেই আরও বেশি করে নজরবন্দি হয়ে যেতে হবে।
কীভাবে বন্ধ হল এই ফ্যাক্টরি? স্থানীয় চায়ের দোকানে বসে জিজ্ঞাসা করেও খুব সদুত্তর পাইনি। কেউই বিশেষ পুরনো কথা তুলতে চায় না আর । টুকরোটাকরা কিছু শব্দ যা ভেসে আসছিল তা দিয়ে একটা ছবি খাড়া করার চেষ্টা করছিলাম নিজের মনে কিন্তু সেসব অসম্পূর্ণ ছিল। শুধু এটুকু বুঝলাম গোটা নব্বই দশক ধরে একের পর এক বন্ধ কলকারখানার যে ছবি খবরের কাগজের পাতায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের বিবরণ তার থেকে আলাদা কিছু নয়। বছরের পর বছর লস, ম্যানেজমেন্টের অবিমৃশ্যকারিতা, শক্তিশালী ইউনিয়ন না থাকা, রাজ্য সরকারের অধিগ্রহণ না করা, লেবার ট্রাইবুনালে হেরে যাওয়া কেস এরকম কিছু কিছু শব্দ দিয়ে একটা ছবি বানাবার চেষ্টা করছিলাম নিজের মনে। এবং এই শব্দগুলোর শেষে গিয়ে কী অপেক্ষা করে থাকে সেটাও খুব ভাল করেই জানতাম তখন। নব্বইজাতক হবার কারণেই জানতাম। সব জায়গায় যেমন হয় আর কী! এক সুন্দর সকালে গেটের গায়ে তালা ঝুলে যায় আর খুব মন দিয়ে বাধ্য ছেলের মতন একে একে ওয়ার্কারেরা বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়। না, বিশেষ কোনও প্রতিরোধ হয়নি এখানে। এমনকি পিএফ বা গ্র্যাচুইটির টাকাও পায়নি কেউ। শুনলাম, এই গোটা অঞ্চল নাকি রিয়েল এস্টেটের কাছে বেচে দেওয়ার প্ল্যান চলছে কিন্তু কিছু আইনি জটিলতায় আটকে গেছে সেই প্রক্রিয়া। জটিলতা কেটে গেলেই যে মুষ্টিমেয় কিছু শ্রমিক এখনও এই মরা জনপদে পড়ে আছে নেহাত অভ্যেসের বশে, তারা উচ্ছেদ হবে। প্রকৃতির হাত থেকে আবার একটানে দখল নেবে রিয়েল এস্টেট। সে মেঘমল্লার শুনবে কি না জানা নেই যদিও।
দুপুরের রান্নার পর খেতে বসেও অস্বস্তিটা যাচ্ছিল না। দূরে দাঁড়িয়ে একঠায় সেই বাচ্চার দল নিঃশব্দে দেখে যাচ্ছে আমাদের। ওদের কি কিছু খাবার দেওয়া যায়? কিন্তু ডাকতে গেলেই পালিয়ে গেল। আবার ফিরে আসল একটু বাদেই। অথবা এরা হয়ত অন্য দল। সকলকেই একরকম দেখতে লাগছিল। আমরা নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতেও সচেতন হয়ে যাচ্ছিলাম মাঝে মাঝে। অনুভব করছিলাম আমাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে নিঃসাড়ে।
নিঃশব্দ সেই মৃত জনপদে অন্ধকার নেমে এসেছিল ঝুপ করে। আমরা ফেরার জন্য উশখুশ করছিলাম। পুরো জায়গাটাই ভৌতিক লাগছিল। নদীর জল থেকে উঠে আসছিল একটা হিমাভ ভাপ। আর সেই শুকনো হাওয়া আমাদের হাড়ের ভেতর ঢুকে খটখটে করে দিচ্ছিল আমাদের মগজ। আমাদের কথা, গল্প, আড্ডা, গান, প্রেম সব একে একে নিভে আসছিল। নদীর ওপারে অন্ধকারে ভূতের মতন দাঁড়িয়ে থাকা সারসার জুটমিলগুলো দেখে ভয় লাগছিল আমার। মনে হচ্ছিল এই গঙ্গা, এই জুটমিল, ওই বাচ্চাগুলো, এই ঘন ঝোপ, মরা সাপের খোলস, ভাঙা শিবমন্দির, একলা রেললাইন – এই সবকিছুই চুপচাপ প্রহর গুণছে। সময় অপেক্ষা করছে।
না, সেই মরা অজগরের মতন বিশাল নিঃঝুম জনপদে কোনও প্রতিরোধ হয়নি ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবার পরেও। শুধু গত তিন বছরে ঝুপ ঝুপ করে কয়েকজন লেবারার একা কিংবা সপরিবারে সিলিং থেকে ঝুলে পড়েছিল। অথবা গলায় ঢেলে দিয়েছিল সস্তা কীটনাশক। কোনও খবর হয়নি সেগুলো। কোনও প্রতিরোধ হয়নি, আন্দোলন হয়নি, ঘটেনি উচ্চকিত আলোড়ন। আপাতত সব শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে। শুধু চায়ের দোকানে বসে এক হলদেটে চোখের বৃদ্ধ বলেছিল যে সন্ধ্যের পর ফ্যাক্টরি চত্বরে কেউ ঢুকতে চায়না। গা একটু ছমছম করে। আর বলেছিল, মনের ভুলও হতে পারে, তবু মনে হয় যেন আজকাল অনেক অচেনা মুখের বাচ্চা ছেলেমেয়ে ভিড় করেছে এই অঞ্চলে। তাদের আগে দেখা যায়নি কোথাও। তারা কাছে আসে না। কথাও বলে না। চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে যায় এই ফ্যাক্টরিকে। তাদের সকলকেই যেন একইরকম দেখতে। তারা কোথা থেকে আসে, কোথায় মিলিয়ে যায়, কেউ জানে না। শুধু একটা করে সপরিবারে আত্মহত্যা ঘটে আর আরও নতুন নতুন বাচ্চা এসে জড়ো হয় অন্ধকার মাঠের ধারে, নদীতীরের জঙ্গলে কিংবা পোড়ো তেঁতুলের তলায়।
বাসে ওঠার আগে শেষবার পেছন ফিরে দেখে নিলাম গোটা জায়গাটা। জামের গায়ের মতন পাতলা অন্ধকার আস্তে আস্তে বিছিয়ে যাচ্ছিল জঙ্গলের ওপর। জনপদটা মনে হচ্ছিল ঢালু হতে হতে গঙ্গার বুকে নেমে গেছে। গম্ভীর নদী এখন কানায় কানায় পূর্ণ। ভোঁ করে একটা স্টিমার বেজে চলে গেল কোথাও। মিটমিটে আলো জ্বলে উঠেছে আশেপাশের ঝুপড়িতে। দূরে আধো অন্ধকারে মনে হল বেশ কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে ঝোপঝাড়ের পাশে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। একটু বাদেই ঘন কুয়াশা নামবে। ইচ্ছে করলেই এখন নদীর ঘাটে নৌকো ভিড়িয়ে চার্ণক যে কোনও সময়ে নেমে আসতে পারে।
