খুনে মার্শাল – ২০

বিশ

‘বুঝলাম,’ বলে নিজের হোটেলের দিকে তাকাল টেড। আজ সে ক্লান্ত। এই অবস্থায় রেক্সের মত নামজাদা পিস্তলবাজের মোকাবিলা করার কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু লোকটা যদি কাল আর কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করে থাকে, তাহলে আজ রাতেই তার ওই আউটলর মুখোমুখি হওয়া দরকার। কারণ, একবার কোম্যাঞ্চি ওয়েস্ থেকে বেরিয়ে গেলে ওকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। কিন্তু হোটেলের বিছানা, একটা ভাল ঘুম-

‘তুমি ঠিক জানো সে কালকেই চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছে?’

কোন জবাব এল না। ঘুরে তাকাল টেড। চলে গেছে। নিঃশব্দে একটু হেসে চিবুক চুলকাল সে। কোম্যাঞ্চি ওয়েলসের সবাই যে রেক্সকে সমীহ করে চলে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ক্লাইড ডোটির মেসেঞ্জার ওকে খবরটা পৌঁছে দিয়ে আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি-সরে পড়েছে। তার যে এই ব্যাপারের সাথে কোন সম্পর্ক আছে, তা কাউকে জানতে দিতে চায়নি।

নাপিতের দোকানের কোনায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল টেড। চুরুটে টান দিয়ে ভাবছে। চোখ তুলে সামনের জনশূন্য রাস্তাটার দিকে তাকাল সে। এখন ওখানে কিছুটা আলো দেখা যাচ্ছে। বাড়ির জানালা থেকে কিছুটা আলো আসছে, বাকিটা আসছে আকাশের চাঁদ থেকে। খাপ থেকে অস্ত্রটা বের করল সে।

কাজটা আজ রাতেই সেরে ফেলা ভাল; সিদ্ধান্ত নিল মার্শ। সিলিণ্ডার ঘুরিয়ে সব চেম্বারে গুলি আছে কিনা চেক করে দেখল। ওর প্রিয় পিস্তলটা বেইটসরা রেখে দিয়েছে বটে, কিন্তু নতুন কোল্টটাও তার হাতে চমৎকার খাপ খায়।

পিস্তলটা খাপে রেখে হোটেলে ফিরে এল সে। কামরায় পৌঁছে রাইফেল আর স্যাডলব্যাগ তুলে নিয়ে হোটেলের চাবি বিছানার ওপর রেখে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। আস্তাবলে কাউকে দেখতে পেল না। মনে মনে খুশিই হলো-কাজ সেরে যদি সবার অগোচরে ফিরতে পারে, তাহলে ডোটি আর তার মেসেঞ্জার ছাড়া আর কেউ জানবে না সে বাইরে গেছিল। যত কম লোক জানে ততই ভাল। একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল ওর ঠোঁটে। সে নিজেও এখন আউটলদের মত চিন্তা করতে শুরু করেছে!

ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে লাগাম ধরে ওকে আস্তাবল থেকে বের করে আনল সে। ছায়ার আড়াল দিয়ে রোনটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে এগোল। হোটেল আর বাড়িগুলো থেকে বেশ কিছুটা দূরে এসে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। তারপর আকাশের তারা দেখে দিক ঠিক করে মেক্সিকোর ট্রেইল ধরে দক্ষিণে রওনা হয়ে গেল।

ট্রেইলের শক্ত মাটি এড়িয়ে পাশের নরম জমির ওপর দিয়ে ঘোড়া চালাচ্ছে টেড। এতে শব্দ কম হবে। স্বাভাবিক সাবধানতা-কিন্তু আউটলরাও ঠিক এই লাইনেই চিন্তা করে ভেবে একটু বিব্রত বোধ করছে।

আমি আউটল নই, বলে প্রবোধ দিয়ে মন শক্ত করল সে। রেক্সের মত একজন পাজি আউটলকে পৃথিবী থেকে সরালে সেটা সমাজের উপকার করাই হবে। আগেও সে বুনো আর অবাধ্য অনেক আউটলকে গুলি করে মেরেছে। তফাত কই? তবু…এটা একটু ভিন্ন, কারণ ওর বুকে এখন আর স্টার আঁটা নেই।

সোজা সামনের দিকে তাকাল টেড। শহর ছেড়ে কয়েক মাইল দক্ষিণে চলে এসেছে সে। রেক্স যেখানে আছে সেটা কাছেই কোথাও হবে। সুন্দর মায়াবী একটা রাত-কোমল আর স্নিগ্ধ। চারপাশে হালকা একটা রূপালি আলো ছড়াচ্ছে চাঁদ। তারার চুমকিতে ভরা গাঢ় রঙের ভেলভেটের চাদরে যেন পৃথিবীটাকে ঢেকে রেখেছে আকাশ। থেকে থেকে করুণ সুরে সাথীকে ডাকছে একটা পাখি।

একটা মোড় নিয়ে দূরে রেক্সের চালাঘরটা দেখতে পেল টেড। ওটা ট্রেইল থেকে কিছুটা পুবে। হয়তো কোনকালে ওখানে পৌছার একটা পরিষ্কার পথ ছিল, কিন্তু এখন অযত্নে জায়গাটা র‍্যাবিশ, অ্যাপাচি পিউম, মেসকিট আর বিভিন্ন ধরনের আগাছায় ভরে উঠেছে। বাড়ির পাশে একটা বড় গাছ ঘন পাতায় ভরা ডালপালা ছড়িয়ে জীর্ণ চালাঘরটাকেই যেন আগলে রেখেছে।

ঘোড়াকে ট্রেইল ছেড়ে সাবধানে এগিয়ে নিয়ে বাড়ির উঠানের কাছে এসে টেড নিচে নামল। ঘরের ভিতর থেকে জানালা ভেদ কোরে ক্ষীণ আলো আসছে ব্লাইণ্ডের ফাঁক গলে। বাম পাশে করাল থেকে একটা ঘোড়ার নড়াচড়ার আওয়াজ আসছে। মনে মনে সন্তুষ্ট হলো মার্শ-রেক্স এখনও বাড়িতেই আছে।

সরু একটা পথ ঝোপের ভিতর দিয়ে এঁকেবেঁকে বাড়িটার দিকে গেছে। ওটা এড়িয়ে ঝোপের আড়াল দিয়ে কিছুটা পরিষ্কার একটা জায়গায় এসে সে থামল। মনে হচ্ছে কেউ বাড়ির চারপাশ আগাছামুক্ত রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সক্ষম হয়নি। ওখানে উবু হয়ে বসে চালাঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখল টেড।

করালে কেবল একটা ঘোড়াই আছে, তাতে মনে হচ্ছে রেক্স একাই বাড়িতে আছে। তবে আরেকটা করাল বা বার্ন থাকতে পারে পিছনে যেখানে আরও ঘোড়া রাখা হয়েছে। তবে তার সম্ভাবনা কম, কারণ রেক্সের সাথে যদি আর কেউ থাকে, তবে তার ঘোড়াও স্বভাবতই রেক্সের ঘোড়ার সাথে একই করালে থাকত।

জানালার ফাঁক দিয়ে আলোর চিলতে এখনও দেখা যাচ্ছে। তবে কাছে থেকে দরজাটাও দেখতে পাচ্ছে টেড। ওটার ফাঁক দিয়েও আলো আসছে। ঘরের ভিতর থেকে কোন আওয়াজ আসছে না। সুতরাং ভিতরে লোকটা ঘুমাচ্ছে কিংবা এমন কিছু করছে যাতে মোটেও নড়াচড়া করতে হয় না।

এই পরিস্থিতিতে কেবল একটা পথই তার কাছে খোলা রয়েছে, সেটা হচ্ছে সন্তর্পণে দরজার কাছে এগিয়ে লাথি দিয়ে দরজা ভেঙে ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়া। টেডের হাতে তৈরি থাকবে পিস্তল, রেক্স পিস্তল তুললে সে গুলি করবে। এতে সহজেই কাজ শেষ হবে, আর বেভিন মিলারও তাকে টাকা দেবে। কিন্তু তাতে এটাও প্রমাণ হবে যে সে সত্যিই ভাড়াটে পিস্তলবাজে পরিণত হয়েছে।

প্ল্যানটাকে মনের মধ্যে যতই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিচার করে দেখছে, ততই বীভৎস মনে হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে সে জানে যে রেক্স বিলিঙ একজন আউটল এবং ক্রিমিনাল-ওদিক থেকে বিচার করলে কাজটা খুব দূষণীয় মনে হয় না।

একজন জঘন্য আউটলর মৃত্যুতে দেশের কোন ক্ষতি হবে না, বরং মরলেই দেশ আর দশের লাভ। কিন্তু এর পরবর্তীতে কি হবে? টাকার বিনিময়ে তাকে যখন দ্বিতীয় একজন মানুষকে খুন করার জন্যে ভাড়া করা হবে তখন?

পরে কি ঘটতে পারে সেকথা চুলোয় যাক, এক্ষেত্রে সে অন্যায় কিছু করছে না। এতে অবশ্য আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আইন যখন হাত গুটিয়ে বসে থাকে, অন্যায়ের কোন প্রতিকার করে না, তখন মানুষকে মাঝেমাঝে আইন নিজের হাতেই তুলে নিতে হয়।

শ্রাগ কোরে কোল্টটা বের করল মার্শ। তারপর নিঃশব্দে হ্যামারটা পরীক্ষা করে দেখল। আগামীতে কি ঘটতে পারে তা এখন ভেবে লাভ নেই। এই কাজটা যখন হাতে নিয়েছে, এটা সে শেষ করবে। ভবিষ্যতের কথা পরে ভাবা যাবে।

চারপাশে চেয়ে দেখল, কেউ কোথাও নেই। পিস্তল হাতে বাড়িটার দিকে এগোল সে।

হঠাৎ ষষ্ঠ-ইন্দ্রিয় ওকে সাবধান করল। ঝাঁপিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল মার্শ। সঙ্গে সঙ্গে তিনজন লোক একসাথে ওর দিকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। একটা পাথর বা ঝোপের আড়াল পাওয়ার জন্যে দিশাহারা হয়ে গড়াচ্ছে ও।

একটা ঘন ঝোপের আড়ালে এসে হাঁটু গেড়ে বসে গুলি করার জন্যে তৈরি হলো টেড। ওর প্রথম গুলিতে গুপ্তঘাতকদের একজন টলতে টলতে পিছিয়ে গেল। দ্বিতীয় গুলিতে আর একজন পড়ল। ওর দিকে গুলি আসছে দেখে আবার ঝাঁপিয়ে নিজের জায়গা থেকে বাম পাশে সরে গেল সে। মাটিতে শুয়েই তৃতীয়বার ট্রিগার টিপল।

তিন গুপ্তঘাতকের শেষ লোকটা, একটু আগে টেড যেখানে ছিল, সেই ঝোপ লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে হঠাৎ আড়ষ্ট হলো। ওই ভঙ্গিতেই এক মুহূর্ত স্থির থেকে লম্বা একটা মর্মান্তিক চিৎকার ছেড়ে মাটিতে পড়ল।

সঙ্কটময় মুহূর্তে এপর্যন্ত কখনও নার্ভ হারায়নি টেড। আজও হারাল না। আরেকবার গড়িয়ে উঠে বসল। ধুলো আর বারুদের কটু গন্ধ নাকে আসছে। খালি খাপগুলো ফেলে দিয়ে পিস্তলে তাজা কার্তুজ ভরে নিল সে।

কয়েক মিনিট স্থির বসে কান পেতে রইল। আক্রমণকারীরা সবাই শেষ হয়েছে কিনা শিওর হতে পারছে না। আরও কেউ তাকে হত্যা করার জন্যে ওত পেতে লুকিয়ে থাকতে পারে। হঠাৎ ওর মনটা রাগে বিষিয়ে উঠল।

বুঝতে পেরেছে খুন করার জন্যেই তাকে অ্যামবুশ করা হয়েছে! ক্লাইড ডোটি ইচ্ছা করেই তাকে অ্যামবুশের মুখে ঠেলে দিয়েছে! কিন্তু কেন?

একুশ

টেডের ভিতরটা রাগে ফুঁসছে। হাঁটুর ওপর ভর রেখে চাঁদের আলোয় উঠানটা ভাল কোরে খুঁটিয়ে দেখল সে। ঘাতকদের তিনজনই মাটিতে পড়ে আছে। দুজন একেবারে স্থির, সম্ভবত মারা গেছে-বাকি একজন দুর্বলভাবে সামান্য নড়ছে।

কিন্তু তবু উঠে দাঁড়াল না মার্শ। আরও কেউ অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র কিছুই নয়। ডোটি তাকে খুন করাবার জন্যে যখন এতকিছু করেছে, কাঁচা কাজ সে করবে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কাউকে দেখতে পেল না টেড। কোনরকম শব্দও তার কানে এল না। খুব সতর্কতার সাথে উঠে মাথা নিচু করে চক্কর দিয়ে ঘুরে বাড়ির পিছনে চলে গেল ও।

ওখানে হিচ-রেইলের সাথে আরও দুটো ঘোড়া বাঁধা আছে। ঘোড়ার মোট সংখ্যা তিনটে। সম্ভবত কেবল ওই তিনজনই তাকে অ্যামবুশ করার কাজে এসেছিল।

যুক্তিটা মেনে নিলেও, পুরো আস্থা না রেখে ঘুরে বাড়ির দক্ষিণে জানালার পাশে সরে এল টেড। সামনের জানালার মত এটাতেও ব্লাইণ্ড টানা রয়েছে। কিন্তু নিচের একটা ছেঁড়া অংশে চোখ রাখলে ঘরের ভিতরটা দেখা যায়।

ভিতরে টেবিলের ওপর একটা বাতি জ্বলছে। কামরায় দুটো চেয়ার, একটা রান্নার স্টোভ আর দেয়ালের সাথে একটা বাঙ্ক রয়েছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে সম্প্রতি এখানে কেউ বাস করেনি। এবং বর্তমানেও বাড়ির ভিতর কেউ নেই।

কিছুক্ষণ চালাটার ছায়ায় নিঃশব্দে অপেক্ষা করল মার্শ। তারপর আর কেউ কোথাও লুকিয়ে নেই বুঝে, উঠানে বেরিয়ে মাটিতে আগাছার ভিতর অসম্ভব ভঙ্গিতে শোয়া আকৃতিটার পাশে পৌঁছল। ওর পাশে গোড়ালির ওপর বসে আড়ষ্ট আঙুলের মুঠো থেকে পিস্তলটা ছাড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ঝোপের ভিতর ফেলল। তারপর নিজের পিস্তলটা বাম হাতে নিয়ে ওকে চিত করল। চেহারা দেখে সে চিনতে পারল এই লোকটাকেই মেসেঞ্জার হিসেবে তার কাছে পাঠিয়েছিল ডোটি।

টেডের চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে উঠল। প্রত্যেকটা শিরা-উপশিরা বেয়ে রাগ তার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। দ্বিতীয় লোকটার কাছে গিয়ে একইভাবে ওর অস্ত্রটা ঝোপের ভিতর ফেলে ওকে চিত করল। দ্বিতীয় লোকটা সম্পূর্ণ অপরিচিত।

শেষ লোকটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল টেড। লোকটা মরেনি, ব্যথায় ককাচ্ছে। ওকে ডিঙিয়ে পার হয়ে লাথি দিয়ে ওর মুঠোয় ধরা পিস্তলটাকে ছিটকে দূরে সরিয়ে দিল সে। তারপর ওর পাশে বসল।

‘বাঁচাও! ওহ, খোদার দোহাই, বাঁচাও!’

লোকটার রক্তাক্ত শার্টের বুকের দিকটা খামচে ধরে ওকে রুক্ষভাবে আলোর দিকে ফেরাল টেড। ওর চেহারা দেখে প্রাক্তন মার্শালের মুখ থেকে এক রাশ গালি বেরিয়ে এল। আহত লোকটা বারটেণ্ডার ডোটি!

‘এসবের মানে কি, ডোটি?’ নির্দয়ভাবে ওকে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করল টেড।

‘আমি…আমি মারা যাচ্ছি…আমাকে বাঁচাও!’ ফুঁপিয়ে বলল ডোটি। ‘মরার জন্যে আমাকে এখানে ফেলে রেখে যেয়ো না-দয়া করো!’

‘তোমাকে দয়া করব?’ গর্জে উঠল মার্শ। ‘জোচ্চোর, বিশ্বাসঘাতক! তোমাকে এখানেই ধুঁকে মরার জন্যে আমার ফেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু আপাতত যতক্ষণ জান না যায় কথা বলো! আমাকে খুন করার জন্যে কে তোমাকে ভাড়া করেছে?’

টেড জানে ওর জবাব কি হবে। কিন্তু লম্যান হিসেবে কাজ করে ওর নিশ্চিত হওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। কোন সন্দেহ সে রাখতে চায় না।

‘মিলার…বেভিন মিলার…আমাদের ভাড়া করেছে,’ ধীরে দুর্বল স্বরে কথা কয়টা বলল ডোটি। ‘দয়া করো প্লীজ আমাকে সাহায্য করো!’

‘এত তাড়া দিয়ো না। তুমি আমার সাথে বন্ধুত্বের ভান করে আমারই পিঠে গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিলে। আর এখন আমাকেই সাহায্য করতে বলছ? না, আমি তোমাকে সাহায্য করব বলে কথা দিতে পারছি না। কিন্তু তুমি যদি সব কথা আমাকে খুলে বলো, তাহলে আমি ভেবে দেখব কি করা যায়।’

‘আমি…আমি, যা জানতে চাও সবই তোমাকে বলব।’

‘ভাল। এখন বলো মিলার আমাকে কেন মারতে চায়?’

ক্লান্তিতে শ্বাস ফেলল ডোটি। ‘আমি জানি না। সত্যি বলছি, জানি না। ট্রেস ক্যামেরন-ওখানে পড়ে আছে-ওর সাথেই মিলার আমার সেলুনে এসেছিল। বলল একটা প্রস্তাব আছে-আমাদের সে পাঁচশো ডলার করে দেবে, যদি-’

কাশির দমকে ডোটির কথা থেমে গেল। দয়া থেকে নয়, নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যেই কাঁধের নিচে হাত দিয়ে লোকটাকে একটু উঁচু করে ধরল টেড। ক্লাইড কাশতে কাশতে মরে গেলে ওর প্রশ্নের জবাব দেয়ার মত আর কেউ থাকবে না। জবাব পেতে হলে ডোটিকে তার বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এবার ওর জখমের দিকে নজর দিল টেড। লক্ষ করল গুলিটা বুকে লেগেছে। ক্ষত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। নিজের স্কাফটা গলা থেকে খুলে ভাঁজ করে একটা প্যাডের মত তৈরি করল। তারপর রক্ত পড়া বন্ধ করার জন্যে প্যাডটা ক্ষতের ওপর চেপে ধরল।

‘এই রেক্স বিলিঙ…লোকটা কি সত্যিই আছে?’

‘ওটা একটা ভুয়ো নাম,’ জবাব দিল ডোটি। তারপর প্যাডটা নিজেই চেপে ধরে টেডকে রেহাই দিল। মনে হচ্ছে এখন যেন লোকটার কিছু শক্তি ফিরে এসেছে। টেড ওকে সাহায্য করছে দেখেই হয়তো ওর মনোবল বেড়েছে। ‘ওটা ছিল একটা কোড নাম। বেভিন মিলার বলেছিল, সে একজন লোক পাঠাবে লোকটা রেক্স বিলিঙের খোঁজ করবে। যে-ই ওর খোঁজ করুক তাকেই আমাদের হত্যা করতে হবে।’

মিলারের প্ল্যানটা নিজের মনেই একটু উলটে-পালটে দেখল মার্শ। অবাক না হয়ে পারল না-লোকটা আটঘাট বেঁধে চমৎকার একটা প্ল্যান তৈরি করেছিল। এটা ঠিক ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’র মত একটা ব্যাপার। টেড খুন হলেও, খুনের সাথে র‍্যাঞ্চারকে কেউ জড়াতে পারত না।

ওদের চারপাশে আগাছায় ভরা প্রান্তরে গোলাগুলির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পর আবার নীরবতা নেমেছে। প্রচণ্ড শব্দে ঝিঁঝি পোকাগুলো পর্যন্ত তাদের ডাক থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছিল। এখন ওরা আবার ডাকতে শুরু করেছে। শুকনো ঘাসের ওপর এখানে-ওখানে ছোটছোট প্রাণীর নড়াচড়ার সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে টেড প্রশ্ন করল, ‘ও আমাকে কেন মারতে চায় তা তুমি জিজ্ঞেস করোনি?’

‘না। মিলারের সাথে ডীলটা ট্রেস ক্যামেরনই করেছিল। ট্রেস হচ্ছে ভবঘুরে লোক। খেয়াল-খুশি মত আসে, যায়। সাধারণত ক্যাট্‌ ড্রাইভ না থাকলেই সে শহরে থাকে।’

‘ওই তরুণ ছেলেটা কে? তোমার ‘মেসেঞ্জার’?’

ডোটি আবার কেশে উঠল। ‘আমি…আমি খুব দুর্বল…অনেক রক্ত হারিয়েছি। তোমার প্রশ্ন কি এখনও শেষ হয়নি?’

‘না, হয়নি,’ নির্লিপ্ত স্বরে বলল টেড। ‘ছেলেটা কে?’

‘ওর নাম বিল শ। ওকেও আমরা সাথে নিয়েছিলাম, কারণ মিলার বলেছিল কাজটা ঠিকমত করার জন্যে অন্তত তিনজন লোকের দরকার হবে। বলেছিল তোমাকে মারা সহজ হবে না।’ একটু কেশে সে আবার বলল, ‘ঠিকই বলেছিল মিলার!’

‘তাহলে তুমি সত্যিই জানো না মিলার কেন আমাকে খুন করার জন্যে এতকিছু করল?’

‘না। খোদার কসম বলছি আমি জানি না! তোমাকে আগেই বলেছি ট্রেস ডীলটা করেছিল। হয়তো মিলার ওকে বলে থাকতে পারে, আমি জানি না। তবে এটা ঠিক সে আমাকে বা বিলকে কিছু বলেনি। এখন…তুমি কি আমাকে শহরে ফিরতে সাহায্য করবে?’

মার্শের মাথায় অত্যন্ত দ্রুত চিন্তা চলছে। সে ভেবে বের করতে চেষ্টা করছে তাকে হত্যা করতে চাওয়ার পিছনে মিলারের কী কারণ থাকতে পারে। স্মৃতির পাতায় খুঁজছে একটা নাম…মিলার—কিংবা আর কিছু, যা ওই লোকটার তার প্রতি আক্রোশ থাকার কারণ দর্শাতে পারে। কিন্তু শিপরকে এসে র‍্যাঞ্চার নিজের পরিচয় না দেয়া পর্যন্ত ওই নাম সে শুনেছে বলে মনে করতে পারল না।

‘আমাকে বাঁচাও! প্লীজ!’

‘তুমি আমার নামটাও জানো না, তাই না?’ বলল টেড। ‘তুমি আমাকে চেনো না, আমি কি করি তাও জানো না, অথচ আমাকে খুন করার জন্যে তুমি কত কীই না করেছ!’

এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল ডোটি। ‘না, তা আমি জানি না। মিলার যদি বলেও থাকে, আমার মনে নেই। শুধু এইটুকুই মনে আছে কেউ যখন আমার সেলুনে এসে রেক্স বিলিঙের খোঁজ করবে, ওই লোকটাকেই বিল, ট্রেস আর আমার খতম করতে হবে। বিনিময়ে আমরা প্রত্যেকে পাঁচশো ডলার করে পাব।’

কোন কথা বলল না টেড।

‘বিল…টেস…ওরা কি-?’

মাথা ঝাঁকাল টেড। তারপর প্রশ্ন করল, ‘মিলার কি তোমাদের টাকা দিয়েছে?’

আবার দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল ডোটি। ‘না। তোমাকে মারার পর ট্রেসের ওই টাকা আনতে যাওয়ার কথা ছিল। অবশ্য মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে তোমার কোন কাগজ বা ব্যক্তিগত কোন জিনিস নিয়ে যেতে বলেছিল মিলার।’

‘মিলারের সাথে ক্যামেরনের কোথায় দেখা করার কথা ছিল?’

‘ওর র‍্যাঞ্চে-এম বার।’

‘এখান থেকে ওটা কোন্ দিকে?’

‘সোজা উত্তর পুবে। দশ-পনেরো মাইল হবে।’

মার্শের ঠোঁটে কঠিন একটা হাসি ফুটে উঠল। মিলারের সাথে একজন ঠিকই দেখা করবে। কিন্তু যাকে আশা করছে তার জায়গায় যাবে অন্য একজন। এবং সেই লোক মিলারের কাছে অনেক প্রশ্নের জবাব চাইবে। হয়তো ওটাই হবে ওর জীবনের শেষ দিন।

‘ওখানে কোন্ পথে পৌঁছানো যাবে?’

‘সহজ। শহর থেকে পুবের ট্রেইল ধরে এগোলে মিস করার উপায় নেই। রাস্তার ওপরই ওর র‍্যাঞ্চ।’ কাশির দমকে থেমে গেল ওর কথা। একটু সামলে নিয়ে মার্শের বাহু চেপে ধরল ডোটি। ‘তুমি মরার জন্যে আমাকে এখানে নিশ্চয়ই ফেলে যাবে না? তুমি আমাকে সাহায্য করবে, তাই না? প্লীজ!’

উঠে দাঁড়িয়ে টেড প্রশ্ন করল, ‘ঘোড়াগুলোর মধ্যে কোনটা তোমার?’

‘বাড়ির পিছনে বড় বে’টা আমার। তুমি যদি—’

ওর কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষা না রেখেই সোজা বাড়ির পিছনে চলে এল টেড। যদিও ডোটির মত লোককে মরতে দিলে সেটা অন্যায় কিছু হবে না-তবু, লোকটাকে সে বাঁচার একটা সুযোগ দেবে। এবং তারপর মিলারের র‍্যাঞ্চের দিকে এগোবে।

ঘোড়া দুটোর সাথে করালের ঘোড়াটাকেও নিয়ে ফিরল টেড। লাশ দুটোকে নিজেদের ঘোড়ার ওপর শুইয়ে বেঁধে দিল, যেন পিছলে পড়ে না যায়। তারপর বারটেণ্ডারকে তার বে ঘোড়ার ওপর উঠতে সাহায্য করল। ওর পা দুটো পাদানির ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে লাগাম হাতের সাথে পেঁচিয়ে দিল, যেন ঘোড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে না যায়।

এবার স্যাডল হর্নের সাথে ঝুলানো দড়ির কয়েল নামিয়ে ডোটির ঘোড়ার পিছনে বাকি দুটো ঘোড়াকে বেঁধে দিল। কাজ সেরে নিজের ঘোড়া নিয়ে আবার ফিরে এল টেড।

‘তুমি…তুমি আমাকে এই অবস্থায় ফেলে চলে যাচ্ছ?’ কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল ডোটি। কিন্তু ততক্ষণে ডোটির ঘোড়ার মুখ কোম্যাঞ্চি ওয়েলসের দিকে ঘুরিয়ে পাছায় চাপড় দিয়ে রওনা করিয়ে দিয়েছে টেড।

‘হ্যাঁ, চলে যাচ্ছি,’ শান্ত স্বরে জবাব দিল টেড। ‘তোমাকে যে মারিনি এটাই বেশি। তোমার জন্যে এর বেশি কিছু করার সময় আমার নেই।’ ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল ও।

‘কিন্তু…মনে হয় না আমি একা এতটা পথ-’

‘সেটা তোমার সমস্যা,’ কঠিন স্বরে বলল মার্শ। সে ভোলেনি এই ডোটিই তার দুই বন্ধুকে নিয়ে কয়েক মিনিট আগে তাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল। ‘তুমি এক হাতে স্যাডল হর্ন আর অন্য হাতে লাগাম ধরে রওনা হয়ে যাও। ঘোড়াই পথ চিনে তোমাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেবে।’

মাথা নাড়ল ডোটি। ‘কিন্তু তা কি করে সম্ভব? আমাকে তো একহাতে বুকের পট্টিটা ধরে রাখতে হবে।’

‘চেষ্টা করো, তুমি ঠিকই ম্যানেজ করতে পারবে,’ ঠাণ্ডা স্বরে বলল মার্শ। ‘কিন্তু শহরে ফিরে তুমি এখানে যা ঘটেছে সেটা ঠিকঠিক জানাবে। বুঝেছ? তুমি যদি সত্যি কথা না বলো, তাহলে আমি ফিরে এসে তোমাকে শেষ করব। মনে থাকবে তো?’

‘তুমি দুশ্চিন্তা কোর না,’ আশ্বাস দিল ডোটি। ‘আমি একটুও মিথ্যে বলব না। যা ঘটেছে-’

ওর কথার বাকি অংশ টেডের কানে পৌছল না। পুবের ট্রেইল ধরে মিলারের র‍্যাঞ্চে পৌঁছবার জন্যে মাঠের ভিতর দিয়ে পুরোদমে কোনাকুনি ঘোড়া ছুটিয়েছে সে।

বাইশ

ছোট টিলাটার মাথায় উঠে লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল টেড। ভোরের অল্প আলোয় বেভিন মিলারের এম বার র‍্যাঞ্চটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নিচে।

মিলারের ঘৃণ্য প্রতারণার চক্রান্তটা আবিষ্কার করার পর প্রচণ্ড রাগে তেলে- বেগুনে জ্বলে উঠেছিল টেড। চোখের সামনে বেভিনের র‍্যাঞ্চহাউস দেখে রাগটা আবার দ্বিগুণ হয়ে চাড়া দিয়ে উঠল। এমন নীচ প্রবঞ্চনার পুরো মাশুল র‍্যাঞ্চারকে সুদে আসলে দিতে হবে। লোকটার জন্যে টেডের মনে এখন আর দয়ামায়ার কোন ঠাঁই নেই। মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যে লোক কাউকে অ্যামবুশ করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে সে নিকৃষ্ট জীবের চেয়েও নীচ।

ঢালের নিচে র‍্যাঞ্চ থেকে প্রাণের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বাঙ্কহাউস আর রান্নাঘরে বাতি জ্বলে উঠেছে। রান্নাঘরের সাথেই লম্বা একটা শেড। বোঝা যাচ্ছে ওটাই খাবার ঘর। র‍্যাঞ্চহাউসটা অন্যান্য দালান থেকে কিছুটা দূরে। কিন্তু ওখানে মানুষের কোন সাড়া নেই। টেডের সন্দেহ হচ্ছে, হয়তো র‍্যাঞ্চার বাড়িতে নেই।

তার অনুমানই যদি ঠিক হয়, তাহলে পরবর্তী প্ল্যান কি হবে সেটা ভাবছে টেড। ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় রইল। ওখানে বসেই আড়াল থেকে দেখল, বাঙ্কহাউস থেকে কাউহ্যাণ্ডরা বেরিয়ে ঘুম-জড়ানো ভঙ্গিতে ধীর পায়ে খাবারঘরের দিকে এগোল। সকালের নাস্তা সেরে ওরা কাজে বেরোবে। দুজন এম বার র‍্যাঞ্চের সদস্য বার্নের পিছন থেকে ঘোড়াগুলো নিয়ে এল। ওগুলো তাড়িয়ে নিয়ে একটা করালে ঢোকানো হলো।

হঠাৎ র‍্যাঞ্চহাউসের দরজাটা খুলে গেল। বেভিন মিলারকে বেরোতে দেখে আশ্বস্ত হলো টেড। লোকটা হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙল। বারান্দার কিনারে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে পুব দিকে তাকাল সে। সূর্য উঠতে আর বেশি দেরি নেই। পুবের আকাশে লালচে রঙ ধরেছে।

‘হ্যাঁ, ভাল করে দেখে নাও,’ নিজের মনেই বিড়বিড় করল টেড। ‘তোমার জীবনে এটাই শেষ সূর্যোদয়!’

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোরের তাজা বাতাস আর সূর্যোদয় উপভোগ করল বেভিন। তারপর বারান্দা থেকে নেমে খাবার ঘরের দিকে এগোল।

সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকাল টেড। বেভিন র‍্যাঞ্চহ্যাণ্ডদের সাথে খায়-অর্থাৎ র‍্যাঞ্চহাউসে সে একাই থাকে-বাড়ির ভিতর রাঁধুনী বা আর কোন মানুষ নেই।

একটু নড়তেই টেড বুঝল লম্বা পথ ঘোড়া চালিয়ে তার দেহ আড়ষ্ট হয়ে আছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দাঁড়াল সে। হাত আর পা দুটো কয়েকবার ভাঁজ করে পেশীগুলোর আড়ষ্টতা যতটা সম্ভব দূর করে নিল।

এই মুহূর্তে তার করার কিছু নেই। কিন্তু তার যা জানার দরকার ছিল তা সে জেনেছে: বেভিন মিলার র‍্যাঞ্চহাউসে একাই থাকবে। অবশ্য একা না থাকলেও এমন কিছু ক্ষতি হবে না। কোন মানুষ ওর পথ রোধ করে দাঁড়ালে সে নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনবে।

রোনটা টিলার ওপর রসালো সবুজ ঘাস খাচ্ছে। গোড়ালির ওপর বসে নিচের দালানগুলোর দিকে নজর রাখল টেড। সবগুলোই বেশ ভাল অবস্থায় আছে। ওগুলোর যে যত্ন নেয়া হয়, তা দেখেই বোঝা যায়। চুনকাম করা কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা হয়েছে র‍্যাঞ্চহাউস। উঁচু গেইটের ওপর ঝুলানো আছে একটা সাইনবোর্ড: বার এম র‍্যাঞ্চ।

টেক্সাস র‍্যাঞ্চারের রেঞ্জটা দক্ষিণ আর পশ্চিম দিকে প্রসারিত। মোটামুটি সমতল মাঠগুলো তাজা সবুজ ঘাসে ভরা। এখানে সেখানে কিছু বড় গাছ রোদ আড়াল করে গরুকে ছায়া দিচ্ছে। একটা ঝর্না র‍্যাঞ্চহাউসের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে দক্ষিণে চলে গেছে।

সব খুঁটিয়ে লক্ষ করে মাথা থেকে হ্যাট খুলে মাথার পিছনে হাত বোলাল মার্শ। বেইটসদের দয়ায় ওখানে এখনও ব্যথা রয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপার ওর কাছে কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না-একজন সফল র‍্যাঞ্চার হয়েও বেভিন খুনের দিকে ঝুঁকল কেন? ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল টেড। নাস্তা সেরে লোকজন খাবারঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। ওদের কিছু লোক কাজে বেরোবার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করার জন্যে বাঙ্কহাউসে ঢুকল। বাকি লোক, যারা আগে থেকেই প্রস্তুত, তারা নিজের পছন্দমত ঘোড়া ধরে আনতে করালে ঢুকল। বেভিন মিলারেরও বেরিয়ে আসার সময় হয়ে এসেছে।

একটা ঝোপের আড়ালে স্থির দাঁড়িয়ে টেড দেখল কাউহ্যাণ্ডরা একে একে ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে কাজে রওনা হচ্ছে। তাজা ঘোড়াকে বাগে আনতে কয়েকজনের একটু সময় লাগল।

লোকগুলো কাজে বেরিয়ে যাওয়ার মাঝেই চুরুট মুখে বেভিনকে খাবারঘর থেকে বেরোতে দেখা গেল। হেঁটে করালের দিকে এগোল সে। দুজন আরোহী ঘোড়া নিয়ে ওর পাশে এসে থামল। তিনজনে সংক্ষিপ্ত আলাপ হওয়ার পর অশ্বারোহী দুজন স্পারের খোঁচায় ঘোড়া ছুটিয়ে বাকি কাউহ্যাণ্ডদের সাথে গিয়ে যোগ দিল। অলসভাবে ধীর পায়ে হেঁটে র‍্যাঞ্চহাউসে ফিরল মিলার।

টেড় দেখল র‍্যাঞ্চার ভিতরে ঢুকে প্রথমে স্ক্রীনের দরজা বন্ধ করে ভোরের ঠাণ্ডা বাতাস ঠেকাতে সদর দরজাটাও বন্ধ করল। আকাশে শেখ শা থাকলে বেলা বাড়ার সাথে চারপাশ চমৎকার গরম হয়ে উঠবে। কিন্তু বিকেলের দিকে সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ার পর বাতাসের ঠাণ্ডা ভাবটা ফিরে এসে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেবে গ্রীষ্ম শেষ হতে চলেছে।

হ্যাট নিচের দিকে টেনে কিছুটা নামিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল টেড। টিলা থেকে কোনাকুনিভাবে ঘুরে নেমে, পিছন দিক থেকে র‍্যাঞ্চহাউসের দিকে এগোল।

নিজেকে লুকাবার কোন চেষ্টা করল না সে, কারণ ওই বাড়িতে একটাও নিরেট দেয়াল নেই-চারপাশেই জানালা রয়েছে। তবে বেড়ার বাইরে যথেষ্ট আগাছা আর ঝোপ আছে-সেগুলোই ওকে আড়াল দিল। উঠানে ছোটছোট শুকনো ঘাস ছাড়া আর কিছু নেই।

ধীর কদমে ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে চওড়া গেইটের কাছে পৌঁছল টেড়। শান্ত, গম্ভীর চেহারা। বারান্দার বাম পাশে হিচ রেইলের কাছে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। ঘোড়ার লাগামটা ক্রসবারের সাথে আলগাভাবে পেঁচিয়ে রেখে নিজের পিস্তলটা সামান্য উঁচিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। ওটা সহজেই বেরিয়ে আসছে দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বারান্দায় উঠল।

ভাবছে, এখন একটা বড় কুত্তা তেড়ে না আসে! সে জানে বেশির ভাগ র‍্যাঞ্চারই র‍্যাঞ্চহাউস পাহারা দেয়ার জন্যে কুকুর পোষে।

হাতল ধরে টেনে স্ক্রীনের দরজাটা খুলে অল্পক্ষণ কান পেতে রইল। কোন শব্দ নেই। এবার দরজার নব্‌টা সাবধানে ঘুরাতেই দরজার কপাট নিঃশব্দে খুলে গেল। চট করে ভিতরে ঢুকে পড়ল টেড। এখন পর্যন্ত কেউ ওর উপস্থিতি টের পায়নি, কোন কুকুরও ধাওয়া করে ছুটে আসেনি।

বৈঠকখানায় একটা ছোট টেবিল ঘিরে কয়েকটা চামড়ায় মোড়া চেয়ার পাতা রয়েছে। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটা ধুলো-পড়া বুকশেলফ। দেয়ালে টাঙানো আছে কয়েকটা ছবি-সম্ভবত আত্মীয়-স্বজনের। মেঝেটা ফুলের নক্সা করা পুরু কার্পেটে ঢাকা।

কামরার মাঝখানে কান পেতে দাঁড়াল টেড। ওর পেশীগুলো টানটান হয়ে আছে। বাড়ির ভিতরে যাওয়ার দরজাটা খোলা। করিডরের ওপাশে একটা কামরা থেকে কাগজ নাড়াচাড়ার খসখস আওয়াজ আসছে। মিলার নিশ্চয় তার অফিস-ঘরে কাজে ব্যস্ত।

পিস্তল হাতে করিডর ধরে এগোল সে। চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে উঠেছে; রাগে চোখ দুটো সরু।

করিডরটাও কার্পেটে মোড়া, তাই নিঃশব্দে এগোতে পারছে টেড। ডানদিকে একটা শোয়ার ঘর পার হলো, বাঁয়ে আরও একটা-এর পরেই ছোট একটা স্টোর রূম।

করিডরের প্রায় শেষ মাথায় একটা খোলা দরজা। ওটার উলটো পাশে আরও একটা দরজা রয়েছে-সম্ভবত অতিথি এলে ওখানেই খাওয়া-দাওয়া করে মিলার।

শেষ মাথার কামরাতেই আছে লোকটা। এখন টেড নিশ্চিত, বাড়িতে র‍্যাঞ্চার ছাড়া আর কেউ নেই। তবু অভ্যাস বশে খোলা দরজাটার পাশে এসে থামল সে।

বাইরে উঠান থেকে কিছু আওয়াজ ভেসে আসছে। রাঁধুনী বা আর কোন লোক দৈনন্দিন কাজ সারছে।

নিশ্চিত হয়ে চট করে কামরার ভিতর ঢুকল মার্শ। সে ঠিকই আঁচ করেছিল-ওটাই মিলারের অফিস-ঘর। র‍্যাঞ্চার একটা ডেস্কের পিছনে পেনসিল হাতে কিছু কাগজপত্র দেখছে। ছোট কামরাটায় আর কোন আসবাবপত্র নেই। দেয়ালে একটা ক্যালেণ্ডার ঝুলছে। ঘরের কোনায় একটা রাইফেল দাঁড় করানো আছে। চেয়ারের সাথে ঝুলছে লোকটার গানবেল্ট আর পিস্তল।

কৌতুকহীন কঠিন এক টুকরো হাসি ফুটল টেডের ঠোঁটে। ‘হাওডি, মিলার,’ বলল সে।

তেইশ

চোখ তুলে তাকিয়ে হাঁ হয়ে গেল র‍্যাঞ্চারের মুখ। ভূত দেখার মত চমকে উঠেছে সে। বিস্ময়ে চোখ দুটো বিস্ফারিত।

‘সর্বনাশ…মার্শ, তুমি! আমি—’ হড়বড় করে কথা বলে গিয়ে হোঁচট খেয়ে থেমে গেল মিলার।

একটু বাঁকা হাসল টেড। ‘ভেবেছিলে এতক্ষণে আমি মরে ভূত হয়ে গেছি, তাই না? না, ভূত হয়ে তোমার সাথে হিসাব চুকাতে আসিনি আমি, সশরীরেই এসেছি।’

লোকটার চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। ভয়ে মুখটা ছাইয়ের মত সাদা হয়ে গেছে। ‘আমি…আমি তোমাকে দেখব আশা-’

‘হ্যাঁ, আমি জানি তুমি তা আশা করনি, ঠাণ্ডা স্বরে বলল টেড। ‘এখন উঠে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াও। আমি চাই তুমি চেয়ে দেখো কিভাবে গুলি করে আমি তোমার কপাল ফুটো করি!’

খুব সাবধানে, ধীরে উঠে দাঁড়াল বেভিন। তারপর ভয়ে কুঁকড়ে টেডের নির্দেশ মত দেয়ালের পাশে সরে গেল। ‘তুমি…তুমি এভাবে আমাকে গুলি করে হত্যা করতে-’

‘কেন পারি না, মিলার?’ রেগে ধমকে উঠল টেড। পা দিয়ে ঠেলে দরজা বন্ধ করে সে আবার বলল, ‘কোম্যাঞ্চি ওয়েলসে তিনজন ভাড়াটে ঘাতককে লাগিয়ে আমাকে অ্যামবুশ করে খুন করার চেষ্টা করেছিলে তুমি, একটুও বাধেনি-তাই তোমাকে এভাবে কুকুরের মত হত্যা করতে আমার হাত মোটেও কাঁপবে না!’

কাঁপা হাতে নার্ভাসভাবে মুখ মুছল মিলার। ঘরটা ঠাণ্ডা হলেও দানাদানা ঘাম ফুটে উঠেছে ওর কপালে।

‘তুমি…এটা করে তুমি…তুমি পার পাবে না,’ কথা বেধে যাচ্ছে ওর। ‘বাইরে, আমার লোকজন আছে-ওরা তোমার গুলির শব্দ শুনতে পাবে-কি হলো দেখতে ছুটে—’

‘ভুল, মিলার। পিস্তলের নলটা তোমার পেটে ঠেসে ধরে ট্রিগার টিপলে ওরা কোন শব্দই শুনতে পাবে না। তোমার পেটে শব্দটা চাপা পড়ে যাবে।’

ঢোক গিলল মিলার। কপাল থেকে আবার ঘাম মুছল সে।

‘কিন্তু তোমাকে মারার আগে আমি জানতে চাই তুমি এভাবে অ্যামবুশ করে আমাকে খুন করতে কেন চেয়েছিলে? শিপরকে আমার অফিসে আসার আগে আমি তোমাকে জীবনে কোনদিন দেখিনি!’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাল বেয়ে গড়িয়ে নামা ঘাম মুছল র‍্যাঞ্চার।

‘জানতে চাও? তাহলে শোনো! তুমি আমার একমাত্র ছেলেকে খুন করেছ!’ ভাঙা স্বরে বলল সে। ‘তুমি আমার ছেলেকে খুন করেছ, আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছ-আমার জীবনটাই ব্যর্থ করে দিয়েছ তুমি!’

বিস্ময়ে ভুরু কোঁচকাল টেড। ‘তোমার নিশ্চয় মাথা খারাপ, মিলার। তোমার ছেলের সাথে আমার কখনও দেখাই হয়নি, হত্যা করব কি? তোমার স্ত্রীকেও আমি চিনি না-তাকে মারলাম কিভাবে? নাহ্, তোমার সত্যিই মাথায় দোষ আছে।’

‘আমি পাগল নই, মার্শ। পাগল তুমি-খুন করার নেশায় পাগল।’

‘এক মিনিট, মিলার! আমাকে তুমি বোঝাও, তোমার ছেলে আর স্ত্রীকে আমি কিভাবে হত্যা করলাম?’

‘তাতে আর এখন কি লাভ? তোমাকে যদি সব খুলেও বলি, তবু তুমি আমাকে হত্যা করবে। তোমার মত একজন খুনীর কিভাবে মনে থাকবে? এত লোক তুমি মেরেছ যে তাদের হিসেব রাখতে পারো না। তোমার কাছে ওরা মানুষ নয়, একটা নামও নয়, মার্শ। ওরা শুধু আউটল, তুমি মনে করো হত্যা করে তুমি ওদের দুর্দশা ঘুচাচ্ছ। ওরাও মানুষ…রক্তমাংসের মানুষ! কিন্তু তুমি সব সময়ে খুন করে আত্মরক্ষার অজুহাত দেখাও!’

র‍্যাঞ্চারকে লক্ষ করছে টেড-ওর চোখের পাতা প্রায় বোজা। রোদে পোড়া মুখের চামড়া টানটান হয়ে উঠেছে।

‘আমি যখন লম্যান ছিলাম, আমার যা কর্তব্য সেটাই কেবল পালন করেছি। আমার হাতে যারা মরেছে, তাদের প্রত্যেকেই লড়ার জন্যে পিস্তল বের করেছিল। তাই ওদের সবার সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আমার হয়নি।’

‘বিশ্বাস করলাম!’ উদ্ধতভাবে থুতু ফেলল র‍্যাঞ্চার। ‘জানি, আমার ছেলেকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার সময়ে তুমি জানতে না সে আমারই ছেলে। ওর…মাত্র সতেরো বছর বয়স…’ ভাঙা গলায় কথা কয়টা বলে আর বলতে পারল না মিলার।

সামান্য একটু ভুরু উঁচাল টেড। ‘সতেরো বছর বয়সে একটা ছেলের ভাল আর মন্দের তফাত বোঝা উচিত!’

ভীত র‍্যাঞ্চার রেগে কিছু বলার জন্যে মুখ খুলেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মুখ বন্ধ করল।

‘তুমি সবকিছু আমাকে খুলে বলছ না, মিলার। তোমার ছেলেকে আবার আমি কোথায় বা কবে মারলাম?’

একদৃষ্টে কতক্ষণ টেডের দিকে চেয়ে থেকে শান্ত স্বরে সে বলল, ‘বছরখানেক আগে, অ্যামারিলোতে। আমার ছেলে রনি বন্ধুবান্ধবের পালায় পড়ে তোমার শহর শিপরকে যায়। ওখানে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করাই ছিল ওদের উদ্দেশ্য। কিন্তু তার আগেই একটা বারে জুয়া খেলতে বসে ওদের কাছে টাকা- পয়সা যা ছিল সবই খোয়াল। আধা-মাতাল অবস্থায়, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য সফল হলো না দেখে খেপে ওরা একটা পাগলামি করে বসল। এমপোরিয়াম সেলুন লুট করার চেষ্টায় ওদের অফিসে ঢুকল। কিন্তু তাড়া খেয়ে ভয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অ্যামারিলোতে পালিয়ে গেল। ওদের ধরে শিপারকের কাঠ পড়ায় দাঁড় করাবার জন্যে তোমাকে পাঠানো হলো। তুমি ওদের ঠিকই খুঁজে বের করেছিলে, এবং তিনজনকেই তুমি ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছ।

‘আমার স্ত্রী ছেলেটাকে এত ভালবাসত যে ওই মর্মান্তিক খবরটার চোট সহ্য করতে পারল না-হার্টফেল করে মারা গেল। এই…এসব ঘটনায় সব খুইয়ে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, তুমি আমার যা ক্ষতি করেছ এর শোধ আমি ভুলবই। এবং প্রায় সফলও হয়েছিলাম…’ র‍্যাঞ্চারের স্বর বুজে এল।

র‍্যাঞ্চারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে কাঁধ উঁচাল মার্শ। ‘তোমাকে আগেই বলেছি, মার্শাল হিসেবে আমার যা কর্তব্য সেটাই শুধু পালন করেছি আমি।’

‘হ্যাঁ, তোমার কর্তব্যই শুধু পালন করেছ!’ ব্যঙ্গ করল রুষ্ট র্যাকার। ‘তাই বটে! অ্যামারিলোতে আমার ছেলে আর তার দুই বন্ধুকে হত্যা করার কোন প্রয়োজন তোমার ছিল না। আমার বন্ধুবান্ধব আর ওখানকার লোকজনের মুখে আমি শুনেছি, তুমি ওদের কোন সুযোগ না দিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছিলো।’

অদ্ভূত একটা অপরাধ বোধ টেডকে পীড়া দিচ্ছে। তার মনে আছে অ্যামারিলোতে সে কয়েকবারই আউটল ধরে আনতে গেছে-প্রায় প্রত্যেকবার একইভাবে তা শেষ হয়েছে। বিচার এড়াতে আউটলরা পিস্তল ধরে ওর হাতে মারা পড়েছে। কিন্তু র‍্যাঞ্চার যে ঘটনার কথা বলছে সেটা অন্যান্যগুলোর থেকে আলাদা করে ওর মনে পড়ছে না। মার্শাল থাকা অবস্থায় বহুবারই তাকে আউটলদের পিছনে ধাওয়া করতে হয়েছে। যারা পিস্তল ধরেনি তাদের সে জীবিতই নিয়ে ফিরেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হলের মত শোধ তুলতে এসে তারাও ওর হাতে মারা পড়েছে।

‘তোমার ছেলে, ড্যানি নিশ্চয় নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছিল, নইলে আমার হাতে মরত না,’ অপরাধ বোধটাকে ঝেড়ে ফেলে বলল টেড।

হঠাৎ দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা গেল। করিডর থেকে গভীর স্বরে কেউ ডাকল, ‘মিস্টার মিলার! তুমি ঘরে আছ?’

চট কোরে একপাশে সরে গেল টেড। হাতের পিস্তলটা বেভিনের দিকে তাক করে নিচু স্বরে বলল, ‘খুব সাবধান!

‘মিস্টার মিলার-তুমি ভিতরে?’ স্বরটা আবার শোনা গেল।

দরজাটা কয়েক ইঞ্চি ফাঁক হলো। কামরার ভিতরে মাথা গলাল লোকটা। প্রথমে দেয়ালের ধারে মিলারকে দেখতে পেল সে পরে টেডকেও দেখল। পিস্তল নামিয়ে নিয়েছে টেড, লোকটা পিস্তল দেখতে পাচ্ছে না।

‘ওহ্, আমি দুঃখিত, মিস্টার মিলার,’ অপ্রস্তুত হয়ে বলল র‍্যাঞ্চ কর্মচারী। ‘বুঝতে পারিনি তোমার সাথে আর কেউ আছে। আমি নাহয় পরে আবার আসব।’

মিলার আড়চোখে একবার টেডের দিকে চেয়ে আবার লোকটার দিকে ফিরল। ‘না, না। ঠিক আছে, প্যাট। কি দরকার তোমার?’

‘নতুন কেনা ষাঁড় দুটো আবার ছুটে গেছে। করালের একটা পাশ একেবারে মাটিতে শুইয়ে বেরিয়ে গেছে। তুমি কি হ্যারি আর আমাকে গিয়ে ওদের ধরে আনতে বলো? নাকি কিছুক্ষণ ছাড়াই থাকবে?’

‘কিছুক্ষণ ছাড়া থাকুক, প্যাট,’ নির্বিকার স্বরে বলল র‍্যাঞ্চার। লোকটা করিডরে বেরিয়ে যাবার পথে ওকে কিছু বলতে যাচ্ছিল মিলার, কিন্তু টেডকে নীরবে মাথা নাড়তে দেখে চুপ করে গেল।

এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে মিলার। একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে সে বলল, ‘আমি বেফাঁস কিছু বলে ফেললেই তুমি আমাকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে, তাই না?’

মাথা ঝাঁকাল টেড। ‘হ্যাঁ, মিলার। এবং তারপর প্যাট সাহায্য আনতে যাওয়ার আগে ওকেও আমার হত্যা করতে হত।’

জ্বলে উঠল র্যাঞ্চারের চোখ। ‘ওই দেখো! তুমি নিজের মুখেই স্বীকার করছ মানুষ খুন করা তোমার কাছে কিছুই না। তুমি কি মানুষ? তুমি একটা জানোয়ার!’

হাতের পিস্তলটা মিলারের দিকে তুলে ধরল টেড। তারপর একটু বাঁকা হেসে বলল, ‘তোমার মুখে যা আসে তা এখনই বলে নেয়ার অধিকার তোমার আছে। কারণ, তোমার কথা বলার দিন আজই শেষ…মিছেই তুমি এসব বলছ- আমাকে খুন করার চেষ্টা করে আজ পর্যন্ত কেউ পার পায়নি!’

‘আমি জানতাম তুমি ওই রকম কিছুই বলবে। দুঃখের বিষয় ডোটি আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের আমি যে কাজের জন্যে ভাড়া করেছিলাম, সেটা ওরা পশু করেছে। তোমার মত মানুষ না থাকলে টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনা আর টেরিটরির লোকজন খুশিই হত। ভাল থাকত।’

কথাগুলো টেডের মাথায় সন্দেহের বীজ বুনে ওকে জ্বালাচ্ছে। সে নিজেও আউটলদের গুলি করে মারার সপক্ষে ওই একই যুক্তি দেখিয়ে বিবেককে বুঝ দিয়েছিল। এখন সেই যুক্তিটাই তার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে। ওকে নির্দয়, আর তার পিস্তলটার মতই অনুভূতিহীন বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এবং মিলার প্রতিটা কথা অন্তর থেকেই বলেছে।

কিন্তু এটা নতুন কিছু নয়। এই ধরনের কথা আগেও সে অনেক শুনেছে। অনেকে তাকে হৃদয়হীন পশু বলে ঘৃণা করেছে। কিন্তু এসব কথায় তখন সে কান দেয়নি, কারণ লম্যান হিসেবে সে তার কর্তব্য পালন করছিল-কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন, তাই কথাগুলো তার হৃদয়ে দাগ কেটে বসে যাচ্ছে। সংশয় জাগছে ওর মনে।

মিলারকে সে সত্যি কথাই বলেছে, র‍্যাঞ্চারের ছেলেকে হত্যার কথা তার মনে পড়ছে না। কিন্তু ওই সত্যটাই তাকে ব্যথিত করে তুলছে। তার মনে থাকা উচিত-প্রত্যেকটা আউটল, যাদের সে আত্মরক্ষার জন্যে মারতে বাধ্য হয়েছে, তাদের সবার চেহারাই তার মনে গেঁথে থাকা উচিত…কিন্তু ও মনে করতে পারছে না কেন? সে কি নিজেকে বিবেকের কামড় থেকে রক্ষা করার জন্যেই ওসব ঘটনার খুঁটিনাটি মন থেকে মুছে ফেলেছে?

তাই যদি হয়, তাহলে তো সত্যিই সে হৃদয়হীন একজন খুনী। যে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত না হয়ে আইন রক্ষার নামে ব্যাজের আড়াল নিয়ে এতদিন মানুষ হত্যা করে বেড়িয়েছে।

‘মার্শ, তুমি আমাকে হত্যা করতেই এখানে এসেছ,’ মিলার কথা বলছে শুনতে পেল টেড। ‘ঠিক আছে, জাহান্নামে যাক সব, আমাকে মেরে ফেলো তুমি! যেদিন তুমি আমার ছেলেকে খুন করেছ…আমার বৌকে মেরেছ—সেদিনই আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। আমি এতদিন মরেও বেঁচে ছিলাম কেবল তোমাকে হত্যা করে শোধ নিতে। ওই একটা কাজ আমি শেষ করে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তা আর হলো না। এখন আর আমার বেঁচে থাকার কোন অর্থ হয় না। আমি যে সত্যি কথা বলছি, তার প্রমাণ, এই র‍্যাঞ্চটাও আমি নিলামে চড়িয়ে দিয়েছি।’

কোন মন্তব্য না করে মিলারের দিকে নীরবে চেয়ে রইল টেড।

‘আর মিছে দেরি কোর না, মার্শ,’ বলে চলল র‍্যাঞ্চার। ‘তুমি যা করতে এসেছ সেটা শেষ করো-খুন করো আমাকে! শিপরকে আমি একজনকে বলতে শুনেছি তুমি এখন আর মানুষ নেই-তুমি শুধু একটা পিস্তল। তুমি যদি চাও আমি আমার পিস্তলটা হাতে নিচ্ছি। তাহলে আমাকে খুন করে তুমি বলতে পারবে আমি পিস্তল বের করায় তুমি আমাকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছ—সেলফ-ডিফেন্স!’

টেডের ঠোঁট দুটো চেপে বসেছে। একবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল সে। কিন্তু ওর চোখ দুটো মুহূর্তের জন্যেও মিলারের ওপর থেকে সরেনি।

‘কেবল একটা কথা, মার্শ…আমি কত নম্বর? যত মানুষ তুমি মেরেছ তার কত নম্বরে আমি? নাকি আমি অন্যান্যদের মতই…ভুলে যাওয়ার মত নিছক একটা সংখ্যা? যার চেহারা বা নাম তোমার মনে থাকবে না?’

স্থির দাঁড়িয়ে আছে টেড। র‍্যাঞ্চারের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। শেষে মাথা নেড়ে মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে নিল সে। হঠাৎ, যা করতে এসেছিল সেটা তার কাছে নেহাত খেলো বলে মনে হচ্ছে। হাতের পিস্তলটার দিকে তাকাল টেড। ওটা দিয়ে হত্যা করা-একটা মানুষের জীবন নাশ করা অত্যন্ত সহজ। ওটা ছাড়া মানুষের পক্ষে শান্তিতে বাস করা হয়তো সম্ভব—ঘৃণা আর বিদ্বেষ থাকবে না…বুঝতে পারছে ঘৃণা আর বিদ্বেষই ওর মন বিষিয়ে দিয়েছে। তাই আবার খুন করতে চাইছে।

‘ঠিক আছে, মিলার,’ কোল্টটা খাপে ভরে সে বলল, ‘অতীতে যা ঘটেছে তা ভুলে যাও—আমিও ভুলছি।’

চব্বিশ

বেভিন মিলারের আড়ষ্ট দেহ কিছুটা শিথিল হলো। অবিশ্বাস ভরা চোখে টেডের দিকে চাইল সে।।

‘এটা আবার তোমার কোন্ খেলা? দ্বিধা করছ কেন?’

কাঁধ উঁচাল মার্শা। ‘এটা আমার কোন নতুন খেলা নয়-দ্বিধাও করছি না। এখন আমি আর তোমাকে মারতে চাই না-ক্ষমা করলাম- ব্যস।’

‘তুমি—তুমি সত্যি বলছ?’

‘হ্যা, তাই। অনেকদিন পিস্তল বয়ে বেড়িয়েছি আমি। দু’একবার যেখানে পিস্তল ব্যবহার না করলেও চলত সেখানেও প্রাণের ভয়ে ওটা ব্যবহার করেছি- কিন্তু আর নয়। এখানেই আমি এর ইতি টানতে চাচ্ছি। পশ্চিমে চলে যাব আমি, হয়তো সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ায়…তুমি আমার পাওনাটা চুকিয়ে দিলেই চলে যাব।’

মিলারের একটা ভুরু উপর দিকে উঠল। সবজান্তা ভাব ফুটে উঠেছে ওর চোখে। ‘পাওনা?’ র‍্যাঞ্চারের স্বরে বিস্ময় প্রকাশ পেল। ‘তোমার আবার কিসের পাওনা? তোমার কাছে আমার কোন দেনা নেই। শুনছ? একটা কানাকড়িও না!’ আগুন ঝরছে ওর চোখ থেকে।

মৃদু হাসল মার্শ। ‘মিলার, তুমি কথা দিয়েছিলে রেক্স বিলিঙ নামের একজন আউটলকে হত্যা করতে পারলে আমাকে এক হাজার ডলার দেবে। তখন আমি জানতাম না কী রকম একটা জঘন্য ফাঁদ তুমি আমার জন্যে পেতেছ। আর রেক্স বিলিঙ তোমার মনগড়া একটা চরিত্র। কিন্তু তোমার ফাঁদ বানচাল করে বেরিয়ে এসেছি আমি। তাই তোমার কথামত টাকাটা ন্যায্যত আমারই প্রাপ্য।’

‘জাহান্নামে যাও তুমি!’ গর্জে উঠল মিলার। ‘আমি যদি তোমাকে কিছু দিই, সেটা আমার থেকে তোমার চুরি করে নেয়ার মতই হবে!’

পিস্তলের বাঁটের ওপর পড়ল টেডের ডান হাত। মিলারের চোখ ওর হাতটাকে অনুসরণ করল।

‘তারমানে তুমি রিটায়ার করছ না? আমার টাকা লুট করার জন্যে তুমি পিস্তল ব্যবহার করবে!’

টেডের চেহারা নির্বিকার, কিন্তু চোখে ফুটে উঠল ওর ভিতরকার ফুঁসে ওঠা রাগের আভাস।

‘আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করছি, মিলার। টাকাটা দিয়ে দিলেই আমি চলে যাব। কথা ছিল রেক্সকে শেষ করতে পারলে টাকাটা তুমি দেবে। আর তোমার প্ল্যান বানচাল করে আমার বেরিয়ে আসার মানেই হচ্ছে তোমার মনগড়া রেক্সের মৃত্যু। সুতরাং মিছে সময় নষ্ট না করে আমার পাওনা মিটিয়ে দাও। এখনই!’

‘বাস্টার্ড!’ চিৎকার করে গালি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মিলার।

একটু সরে ছুটে আসা র‍্যাঞ্চারের পাঁজরে কনুই দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করল টেড। মুখ দিয়ে বাতাস ছেড়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে ব্যথায় কুঁকড়ে গেল লোকটা। ফুঁপিয়ে শ্বাস নিচ্ছে সে।

‘তোমাকে আগেই বলেছি, ঝামেলা চাই না আমি। পাওনা টাকাটা বুঝে পেলেই চলে যাব।’

কোনমতে হাঁটুর ওপর উঠে ছোটছোট শ্বাস নেয়ার ফাঁকে সে বলল, ‘একেও…তুমি…আত্মরক্ষা…বলবে?’

‘ঠিক তাই, মিলার। আত্মরক্ষা। তুমিই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে।’ একটু ধাতস্থ হয়ে র‍্যাঞ্চার উঠে দাড়াল। পাজরে যেখানে আঘাত লেগেছে তার ওপর হাত বোলাচ্ছে। ‘আমার পাঁজর প্রায় ভেঙে দিয়েছিলে তুমি!’

‘ইচ্ছে করলে তাও পারতাম-কিন্তু ভাঙিনি। আমি চাই না আমার পাওনা টাকা বুঝে নেয়ার ব্যাপারটা জোর করে আদায় করা, বা ডাকাতি করে নেয়ার মত দেখাক।’

মাথা ঝাঁকাল মিলার। তারপর ডেস্কের কাছে সরে গিয়ে একটা কপাট খুলল-ভিতরে একটা সিন্দুক। ওটা খুলে এক তোড়া নোট বের করল সে।

‘সোনার মুদ্রা, মিলার। ওই কাগজের টাকা আমি চাই না।’

‘কিন্তু–’

‘বাজে অজুহাত ছাড়ো-নইলে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে!’

নোটগুলো ভিতরে রেখে একটা কাপড়ের থলে বের করল র‍্যাঞ্চার। তারপর সিন্দুক বন্ধ করে মুদ্রার থলেটা টেডের দিকে বাড়িয়ে দিল।

‘এখানে এক হাজার ডলার আছে?’

মাথা ঝাঁকাল মিলার। ‘ইচ্ছা করলে তুমি গুনে নিতে পারো।’

‘তার দরকার নেই। তোমার কথাই ঠিক বলে মেনে নিচ্ছি।’

ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোল মার্শ। আপাতত সে সামনের শহরে একটা দিন বিশ্রাম নিয়ে সেসিলার সাথে দেখা করতে সিলভার সিটিতে যাবে। তার ভাগ্যদেবী যদি প্রসন্ন থাকে, তবে পিস্তলবাজি ছেড়ে সেসিলাকে বিয়ে করে সংসারী হবে। হয়তো ওরা দুজন ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়েও ঘর বাঁধতে পারে। দুজনে মিলে নতুন সংসার গড়ে তুলবে…

দরজার মুখে এসে থামল মার্শ। ওর সাবধানী মন ওকে বিপদ সঙ্কেত দিল। মিলারের দিকে ফিরে তাকাল সে। লোকটা এখনও ডেস্কের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে র‍্যাঞ্চারকে যাচাই করে দেখল টেড।

‘অ্যাডিয়স, মিলার। আর…টাকাটার জন্যে ধন্যবাদ!’

জ্বলন্ত দৃষ্টিতে নীরবে তাকিয়ে আছে র‍্যাঞ্চার। ভিতরে-ভিতরে আক্রোশে জ্বলছে।

কামরা ছেড়ে করিডরে বেরিয়ে আবার থেমে দাঁড়াল টেড। একটু ইতস্তত কোরে মিলারের দিকে ফিরে তাকাল।

‘শোনো, মিলার, অ্যাপলজি চাওয়ায় আমি অভ্যস্ত নই। তোমার ছেলে আর বৌয়ের জন্য আমি দুঃখিত। যা ঘটেছে সবটাই দুঃখজনক। সত্যিই আমি ব্যথিত।’

মিলার নির্বিকার। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে।

‘কথাটা তোমাকে বলে আমার মন কিছুটা হালকা হলো,’ বলে বাইরে বেরোবার জন্যে করিডর ধরে এগিয়ে গেল টেড।

পিস্তলের ব্যবহার ছেড়ে দেয়া তার জন্যে কঠিন হবে না-নিজের মনকে বোঝাল মার্শ। আইন রক্ষার কাজে লম্বা সময় তাকে জিনের ওপর বসে কাটাতে হয়েছে। ঠাণ্ডা, রোদ, বৃষ্টি আর ঝড় মাথায় করে তাকে বিভিন্ন শহর আর গ্রামে ঘুরতে হয়েছে।

এখন এগুলো সব ছেড়ে দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বা আর কোথাও গিয়ে সেসিলাকে নিয়ে ও সংসার পাতবে। সে এত দূরে যেতে চায় যেখানে কেউ তাকে চিনবে না, যেখানে পিস্তলবাজ হিসেবে তার খ্যাতি কোনদিন পৌঁছবে না। যেখানে নিজের নিরাপত্তার জন্যে তাকে বারবার পিছন ফিরে দেখতে হবে না। যেখানে-

আবার তার ভিতর থেকে বিপদ সঙ্কেতটা বেজে উঠল। পিছন থেকে শুকনো কাপড়ের ঘষা খাওয়ার আওয়াজ ওর কানে পৌঁছল। চুপিসারে কেউ তার দিকে এগিয়ে আসছে।

ঝট কোরে ঘুরে দাঁড়াল টেড। বিদ্যুৎ গতিতে ওর অভ্যস্ত হাতে উঠে এসেছে কোল্ট ফোরটি ফাইভ। ট্রিগার টিপে দিল সে।

ঘুরেই পিস্তল হাতে মিলারকে দেখতে পেয়েছিল টেড। আর দেখেছিল বিদ্বেষ আর ঘৃণায় ভরা দুটো চোখ। আগেই তার বোঝা উচিত ছিল লোকটা যে বিষ মনের মধ্যে পুষে রেখেছে তা কিছুতেই কাটবে না। মরণের তোয়াক্কা করে না র‍্যাঞ্চার, সুতরাং অপেক্ষা না করে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করবে।

বাম বাহুমূলে গরম বুলেটের ছোঁয়া অনুভব করল টেড। তাড়াতাড়ি গুলি ছুঁড়তে গিয়ে মিলারের নিশানা ঠিক হয়নি। সরু করিডরে দুটো পিস্তলই একসাথে বিকট শব্দে গর্জে উঠেছিল। এখনও কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোয়া উঠছে। ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে টেড দেখল টলে উঠে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেলো মিলার, তারপর দেয়ালে পিঠ ঘষে পিছলে কার্পেটের ওপর বসে পড়ল।

মনে মনে একটা গালি দিয়ে দ্রুত র‍্যাঞ্চারের কাছে পৌঁছে ওর হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিল মার্শ। অস্ত্রটা করিডরের শেষ প্রান্তে ছুঁড়ে দিয়ে ওর পাশে বসল।

‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে, মিলার?’ ঝাঁঝের সাথে প্রশ্ন কোরে ওর শার্টের বোতাম খুলে ক্ষতটা পরীক্ষা করল। গুলিটা বুকে উঁচুর দিকে লেগেছে। এবং মারাত্মক কোন ক্ষতি না করে পরিষ্কার বেরিয়ে গেছে।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল টেড। ‘তুমি বাঁচবে, মিলার,’ বলে, উঠে দাঁড়াল সে। উঠান থেকে কোন শব্দ বা চিৎকার শোনা যাচ্ছে না। হয়তো বাইরের কেউ গুলির শব্দ শুনতে পায়নি।

‘ঘটনা এখন একটু অন্যদিকে মোড় নিয়েছে,’ র‍্যাঞ্চারকে বলল সে। ‘বুঝতে পারছি তুমি আমাকে খুনী, ডাকাত আর পিস্তলবাজ বলেই ধরে নিয়েছ। তোমার বুকে আরও একটা বুলেট গেঁথে দিয়ে, তোমার ধারণাই ঠিক, এটা প্রমাণ করাই আমার উচিত।’

মিলার নিজেই পকেট থেকে একটা রুমাল বের কোরে ক্ষতটার ওপর চেপে, ককিয়ে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, ড্যাম ইউ, আমাকে আবার গুলি করো! তোমার থেকে সেটাই আমি আশা করি!’

লোকটার দিকে নির্বিকার চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পিস্তলটা খাপে ভরল টেড। তারপর মাথা নেড়ে বলল, ‘জাহান্নামে যাও, মিলার! ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে আমি চাই না!’ ঘুরে সোজা হেঁটে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে।

বারান্দা থেকে নেমে রোনের লাগাম খুলে জিনের ওপর উঠে বসল মার্শ। বেভিন মিলার তাকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না-ছেলে আর স্ত্রী হারানোর ব্যথা সে ভুলবে না। উঠান ছেড়ে এগোল সে। কিন্তু এটুকু ও নিশ্চিত জানে, র‍্যাঞ্চার আইনের সাহায্য চাইতে যাবে না। কারণ তাতে ওর নিজের কীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে।

‘মার্শ! থেমে দাঁড়াও!’

তীক্ষ্ণ স্বরে আদেশ করল কেউ। গেইটের বাইরে বড় ঝোপটার আড়ালে লুকিয়ে আছে বক্তা। থেমে দাঁড়াল টেড। স্বরটা চেনাচেনা লাগলেও চিনতে পারছে না।

‘কি ব্যাপার?’ প্রশ্ন করল মার্শ। ডান পাশে কোমরের কাছে নেমে এসেছে ওর হাত।

‘বোকার মত কিছু করতে যেয়ো না, এক্স-মার্শাল!’ সাবধান করল লোকটা। ‘হাত তুলে ঘুরে দাঁড়াও!’

দূর থেকে একটা বন-মোরগ ডাকল। ধীরে ঘোড়ার মুখ ফেরাল টেড। একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল ওর ঠোঁটে। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ডোবি বেইটস!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *