খালি খালি লাগে – তসলিমা নাসরিন
খালি খালি লাগে – তসলিমা নাসরিন
.
উৎসর্গ
তাকে, যাকে ভালবাসার কথা ছিল, অথচ বাসিনি
.
পাথর-মত
মানুষ, মানুষের কাঁধে কাঁধে মানুষ
পায়ে পায়ে কুকুর
কাউকে চেনা লাগে না, না কুকুর, না মানুষ।
অন্য কোনও গ্রহ থেকে নেমে আসা এরা
বুঝি না, নাকি আমিই অন্য গ্রহের!
নাকি আমারই এমন, আর কারও নয়, খালি খালি লাগে।
গাছে পাতা ধরলেও মনে হয় ধরেনি
ফুলগুলোকে মনে হয় ফুল নয়
ঘাসে হাঁটছি অথচ ঘাসে হাঁটছি না, ঘাসগুলোকে পাথর-মত লাগে
মেঘগুলোকে ঠিক মেঘ মনে হয় না
চাঁদকেও চাঁদ না।
নিয়ন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকি এক শরীর অন্ধকার
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই পাথরের শরীর ফুঁড়ে ঢুকে যায় শেকড়।
আমিও, আমার কাছেই, দিনদিন অচেনা ঠেকছি
শহরটি বড় ধুসর ধুসর,
শহরের মধ্যিখানে ঘোলা জনের নদীটিও।
নদীটিই আমার আপন ছিল, আমার উদাস চুলে স্পর্শ দিত তার,
ফুলে ফুলে আমার জন্য কেঁদেছেও অনেক।
নদীটিকে সেদিন বলেছি, তোমাকে খুব পাথর-মত লাগে,
নদীও বলল আমার কানে কানে, আঁচল উড়িয়ে দিয়ে হু হু হাওয়ায়,
–তোমাকেও।
শরতের গ্রাম
ফসল তোলা সারা,
গরু ভেড়ার শীতের সঞ্চয়ও জড়ো করা সারা,
মেশিনগুলো ঝিমোচ্ছে, নিঝুম সারা পাড়া
কৃষকের কোনও কাজ নেই টেলিভিশনের বোতাম টেপা ছাড়া
কমপিউটারের ইঁদুর হাতে নিয়ে বসে থাকা ভদ্র বেড়াল
কোথাও যেতে ইচ্ছে, ঝকঝকে গাড়ি দাঁড়ানো আঙিনায়
প্ৰায় উড়ে কাছে কিংবা দূরে
চিড়িয়াখানায়, যাদুঘরে, গানের নাচের উৎসবে চলে যায়।
শরতের আকাশে মেঘবালিকারা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে নেমেছে,
পাতায় পাতায় লাল হলুদ রং, ঘাসের বিছানায় টপু টাপ ঝরছে
আপেলে লাল হয়ে আছে মাঠ,
ময়লা তোলা গাড়ির পেটে কয়েকশ আপেল ঢুকে যাবে আসছে বুধবার।
শরত ছাপিয়ে কৃষকের মনে হয় এই বুঝি শীত এল, এই বুঝি
বরফে ঢেকে গেল সমস্ত সবুজ, আকাশ আকাশ অন্ধকার হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাথায় আর
না বন্ধু না প্ৰতিবেশি, মোমের আলোয় একা বসে মাখনে ভাজা শুকর খেতে খেতে
ফুরোচ্ছে বোতল বোতল আঙুরের রস।
এত মান, এত যশ তবু এই স্বৰ্গকেও কৃষকের মনে হয় স্বৰ্গ নয়,
স্বৰ্গ অন্য কোথাও, অন্য কোনও সূর্যালোকের দেশে।
ওদিকে অন্য দেশে অন্য কৃষকেরা লাঙলে জমি চাষ করে খালি পায়ে খালি গায়ে রোদে পুড়ে
বাড়ি ফেরে, ক্ষিদে পেটে নুন-ভাত গিলে ছাড়পোকা ভরা চট পেতে শোয়
আকাশের তারার মত দুএকটি স্বপ্ন ঝিকমিক করে নাগালের অনেক দূরে।
ভোর হলে শীর্ণ গরুদেরর তাড়িয়ে নেয় ক্ষেতে,
হাতে হাতে বুনতে হয় ধান, হাতেই কাটতে হয়, বইতে হয়। কাঁধে, ঘামে ভেজা তামাটে কাঁধে,
সারাবছর শস্য ফিলিয়েও দুবেলা পায় না খেতে।
যদি হত
এরকম যদি হত তুমি আছ কোথাও, কোথাও না কোথাও আছে, একদিন দেখা হবে,
একদিন চাঁদের আলোয় ভিজে ভিজে গালিস্প হবে অনেক, যে কথাটি বলা হয়নি, হবে
যে কোনও একদিন দেখা হবে, যে স্পর্শটি করা হয়নি, হবে।
আজ হতে পারে, পরশু, অথবা কুড়ি বছর পর, যে চুমুটি খাওয়া হয়নি, হবে
অথবা দেখা হবে না, কুড়ি কেটে যাচ্ছে, দু কুড়িও
তুমি আছ কোথাও, ভাবা যেত তুমি হাঁটছ বাগানে, গন্ধরাজের গন্ধ নিচ্ছ
গোলাপের গোড়ায় জল দিচ্ছ, কামিনীর গা থেকে আলগোছে সরিয়ে নিচ্ছ মাধবীলতা,
অথবা স্নান করছ, খোঁপা করছ, দু এক কলি গাইছ কিছু
অধবা শুয়ে আছে, দক্ষিণের জানালায় এক ঝাঁক হাওয়া নিয়ে বসেছে লাল-ঠোঁট পাখি,
অথবা ভাবছ আমাকে, পুরোনো চিঠিগুলো ছুঁয়ে দেখছ, ছবিগুলো
গা পোড়া রোদ্দুর আর কোথাকার কোন ঘন মেঘ চোখে বৃষ্টি ঝরাচ্ছে তোমার ..
অথবা ভাবা যেত আমি বলে কেউ কোনওদিন কোথাও ছিলাম তুমি ভুলে গেছ,
তবু ভাবা তো যেত।
জীবন
এই অস্তিত্ব
চপল চিত্ত, বোঝাই বিত্ত
নিত্য নৃত্য
অদৃশ্য
ভূত ভবিষ্যত অদৃশ্য
রম্য জীবন অদৃশ্য
এক পলকে অদৃশ্য
মহাজগতের শখের খেলা
হেলা ফেলায় মায়ার মেলা
জীবন-ভেলা
বেলা থাকতেই নিশ্চিহ্ন
এক মুহুর্তে নিশ্চিহ্ন
এই নৃত্য, বিত্ত, চিত্ত নিশ্চিহ্ন
ফুঃ মন্ত্রে স্নায়ুতন্ত্র
ছিন্ন ভিন্ন
নিশ্চিহ্ন
দাঁড়াও সময়
দুদন্ড দাঁড়াও, হাতের কাজগুলো সেরে নি
সংসারের ঝামেলাগুলো,
কী এত কাজ? সে বলে শেষ হবে না, অনেক।
সে বলে শেষ হবে না, বরং অপেক্ষা করো।
তোমার সঙ্গে ঠিকই যাব ওখানে, ওখানে উৎসব হচ্ছে জানি,
ওখানে আকাশ তার লাজুক মুখ লুকোচ্ছে জলে, ওখানে লজ্জাবতীর শরীর থেকে সবগুলো রং
তুলে বিষম নাচছে প্ৰজাপতি
পাড়ার ফুলেশ্বরীর মত দৌড়ে যাচ্ছে গঙ্গা পদ্মা চুল উড়িয়ে
ওখানে সমুদ্র দুহাত বাড়িয়ে আছে উতল হাওয়ার দিকে
পাহাড়গুলো এক একটি দুষ্টু ঈশ্বরের মত
গাঙচিলগুলো অপ্সরীর পালক
সময় তুমি অপেক্ষা করো, আমি আসছি।
বেঁচে থাকা
একটি কফিনের ভেতর যাপন করছি আমি জীবন
আমার সঙ্গে একশ তেলাপোকা
আর কিছু কেঁচো।
যাপন করছি জীবন, যেহেতু যাপন ছাড়া কোনও পরিত্রাণ নেই
যেহেতু তেলাপোকাদেরও যাপন করতে হবে, কেঁচোগুলোকেও
যেহেতু শ্বাস নিচিছ আমি, তেলাপোকা আর কেঁচো
যেহেতু শ্বাস ফেলছি, বেঁচে থাকছি।
বেঁচে থাকছি যেহেতু বেঁচে থাকছি।
একটি কফিনের ভেতর কিছু প্ৰাণী
পরষ্পরের দিকে বড় করুণ চোখে তাকিয়ে আছি
আমরা পরষ্পরকে খাচ্ছি পান করছি
এবং নিজেদের জিজ্ঞেস করছি, কী লাভ বেঁচে!
না আমি না তেলাপোকা না কেচো কেউ এর উত্তর জানি না।
স্মৃতিরা পোহায় রোদ্দুর
কেউ আর রোদে দিচ্ছে না। লেপ কথা তোষক বালিশ
পোকা ধরা চাল ডাল, আমের আচার
দড়িতে ঝুলছে না কারও ভেজা শাড়ি, শায়া
একটি শাদা বেড়াল বাদামি রঙের কুকুরের পাশে শুয়ে মোজা পড়া
কবুতরের ওড়াওড়ি দেখছে না, কেউ স্নান করছে না জলচৌকিতে বসে তোলা জলে।
কোনও কিশোরী জিভে শব্দ করে খাচ্ছে না নুন-লংকা মাখা তেঁতুল
চুলোর পাড়ে বসে কেউ ফুকনি ফুকছে না, টগবগা শব্দে বিরুই চালের ভাত ফুটছে না,
কেউ ঝালপিঠে খাবার বায়না ধরছে না কারো কাছে,
উঠোনে কেবল দুই পা মেলে সুতিরা পোহাচ্ছে রোদ্দুর।
ঘাসগুলো বড় হতে হতে সিঁড়ির মাথা ছুঁয়েছে,
একটি পেয়ারাও নেই, একটি ডালিমও, নারকেলের শুকনো ফুল ঝরে গেছে,
লেবু তলায় কালো কালো মৈসাপের বাসা, জামগাছের বাকল জুড়ে বসে আছে লক্ষ বিচ্ছু
কেউ নেই, স্মৃতিরাই কেবল পোহায় রোদ্দুর।
তোমার শরীর, তুমি নেই
একটু সরে শোও, পাশে একটু জায়গা দাও আমাকে শোবার
কত কথা জমে আছে।
কত স্পর্শ
কত মৌনতা, মুগ্ধতা।
সেই সব সুদূর পারের কথা শোনাব তোমাকে
শুনতে শুনতে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে,
কয়েক ফোঁটা কষ্ট তোমার উদাস দুচোখে বসবে
শুনতে শুনতে হাসবে, হাসতে হাসতে চোখে জল।
ভেবেছিলাম রোদেলা দুপুরে সাঁতার কাটিব হাঁসপুকুরে,
পূৰ্ণিমায় ভিজব, নাচব গাইব।
ভেবেছিলাম যে কথা কোনওদিন বলিনি তোমাকে, বলব।
এখন ডাকলেও চোখ খোলো না
স্পর্শকরলেও কাঁপো না,
এখন এপার ওপার কোনও পারের গলপাই তোমাকে ফেরায় না
নাগালের ভেতর তোমার শরীর, তুমি নেই।
খালি খালি লাগে
সেই যে গেলে, জন্মের মত গেলে
ঘর দোর ফেলে।
আমাকে একলা রেখে বিজন বনবাসে
কে এখন ভাল বাসে,
তুমি নেই, কেউ নেই পাশে।
কে এখন দেখে রাখে তোমার বাগান
তুমিহীন রোদুরে গা কারা পোহায়
কে গায় গান পূর্ণিমায়
তুমিহীন ঘরটিতে কি জানি কে ঘুমোয় কে জাগে।
জীবন যায়, যেতে থাকে
যেখানেই যাই যে পথে বা যে বাঁকে দাঁড়াই
যে ঘাটে বা যে হাটে, বড় খালি খালি লাগে।
ঠিক তাই তাই চাই
একটি চমৎকার বাগানঅলা বাড়ির বড় শখ ছিল আমার,
ব্যাক্তিগত গাড়ির, এমনকি জাহাজেরাও, জলে ভাসার – ওড়ার।
ভালবাসার কারও সঙ্গে নিত্য সংসারের,
আমার সাধ্যের মধ্যে যদিও এখন সব , আমার সাধ্যের মধ্যে এখন আমার সুখী হওয়া
সুখকে বিষম ঘেন্না এখন
আমি এখন আমার জন্য এমন কিছু চাই না যা দেখলে আনন্দ হত তোমার–
আমার আর ইচ্ছে করে না সমুদ্রের সামনে দাঁড়াতে, তুমি ইচ্ছে করেছিলে একদিন দাঁড়াবে।
তুমি কিছু হারাচ্ছ না, এই দেখ আমার সারা গায়ে ক্ষত,
স্মৃতির তল থেকে তুলে আনছি। মুঠো মুঠো অচেতন মন,
অমল বৃষ্টি থেকে রংধনু থেকে চোখ সরিয়ে রাখি, এই স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে বসে
ঠিক তাই তাই চাই, যা দেখলে কষ্ট পেতে, বেঁচে থাকায় ছোবল দিত কালনাগিনী,
আমি অসুস্থ হতে চাই প্রতিদিনই।
সবিতার কবিতা
সবিতা তার নবজাতিক কন্যাটিকে সাত তলা থেকে ফেলে দিয়েছে নিচে।
ছিঃ সবিতা ছিঃ
এত পাষন্ড তুই!
কে পারে অবোধ শিশুর চোখ ফুটি ফুটি করে ফুটছে যখন, যখন ঠোঁট খুঁজছে কিছু মধু, কিছু দুধ বা জল—
তুলোর মত নরম শরীর খুঁজছে কোনও উষ্ণ স্পর্শ
তখন কি না শিশুটিকে আচমকা ছুড়ে ফেলে দিলি। হৃদয় কি দিয়ে গড়া তোর? পাথর!
হ্যাঁ পাথর। সবিতার চোখেও বসানো দুটো কালো পাথর।
সবিতা কি মানুষ? কে বলেছে মানুষ! আস্ত ডাইনী !
নিচের রাস্তায় থেতলে যাওয়া মাংসপিন্ড নিয়ে একশ নেড়ি কুকুর উৎসব করছে ভুরি ভোজনের।
লোক জড়ো হচ্ছে। সবিতার দিকে ছুড়ে দিচ্ছেদলা দলা ঘৃণা।
ছিঃ সবিতা ছিঃ।
সবিতা পাগল, সকলেই একবাক্যে রায় দেয় সবিতা পাগল।
পাগল মেয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে আকাশে, যেমন করে কবিরা তাকায়।
সবিতা তো কবি নয়। তবে সে একটি কবিতা লিখেছে আজ,
তৃপ্ত সে কবিতাটি লিখে।
সেই শৈশব থেকে চেয়েছিল। চমৎকার একটি কবিতা লিখতে, পারেনি।
নবজাতক কন্যাটিকে সাততলা থেকে ছুড়ে ফেলাই সবিতার কাছে নিটোল একটি কবিতা নির্মাণ করা।
যদি বেঁচে থাকত কন্যাটি, বেঁচে থাকত পঞ্চাশ বছর, পঞ্চাশ বছর ধরে সইতে হত তার,
সে নিজে যেমন সয়েছে মেয়েমানুষ হওয়ার যন্ত্ৰণা।
নিজেকে সে যতটা ভালবাসে, তার চেয়ে বেশি বাসে কন্যাটিকে,
পঞ্চাশ বছরের যন্ত্রণাকে পঞ্চাশ মিনিটে কমিয়ে একটি অনবদ্য কবিতা লিখছে সবিতা
এ কবিতা নিজের কন্যাকে হত্যা নয়, বাঁচানো।
কবিতা তো মানুষের মঙ্গলের জন্যই মানুষ লেখে।
শিউলি বিছানো পথ
শিউলি বিছানো পথে প্ৰতিদিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে তোমাকে
কি ভীষণ ভালবাসতে শিউলি তুমি।
একটি ফুলও এখন আর হাতে নিই না আমি, বড় দুৰ্গন্ধ ফুলে।
আমি হাঁটছি, হেঁটে যাচ্ছি, কিন্তু হেঁটে কোথাও পৌঁছোচ্ছি না।
কোথাও পৌঁছব বলে আমি আর পথ চলি না। কোনও গন্তব্য, আগে যেমন ছিল, নেই। অপ্ৰকৃতহের মত দক্ষিণে উত্তরে পুবে পশ্চিমে হাটি, হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে কোথাও ফিরি না। আমি।
এখন তো কোথাও কেউ আর আমার জন্য অপেক্ষা করে নেই।
এখন তো এমন কোনও কড়া নেই যে নাড়ব আর ভেতর থেকে তুমি খুলে দেবে দরজা।
এখন তো কেউ আমাকে বুকে টেনে নেবে না। সে আমি যেখান থেকেই ফিরি সুড়িখানা থেকে কী
বেশ্যাবাড়ি থেকে কী নর্দমা থেকে কী চুরি ডাকাতি করে কী মানুষ খুন করে।
শিউলি বিছানো পথে প্ৰতিদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে তোমাকে
কি ভীষণ ভালবাসতে তুমি শিউলি।
ফুলগুলো আমি পায়ে পিষে পিষে হাঁটি। তুমি ভালবাসতে এমন কিছু ফুটে আছে কোথাও দেখলে
বড় রাগ হয় আমার।
গোলাপ কী রজনীগন্ধা কী দোলনচাপা কী আমি।
এদের আমি দশানখে ছিঁড়ি,
দাঁতে কাটি, আগুনে পোড়াই। তুমিই যদি নেই, এদের আর থাকা কেন!
তুমি ছিলে বলেই না গোলাপে সুগন্ধ হত,
তুমি ছিলে বলেই এক একটি সুযোদয় থেকে কণা কণা স্বপ্ন বিচ্ছরিত হত,
তুমি ছিলে বলেই বৃষ্টির বিকেলগুলোয় প্রকৃতির আঙুলে সেতার এত চমৎকার বাজত।
তুমি নেই, বৃষ্টি আর পায়ে কোনও নুপুর পরে না,
স্নান সেরে রূপোলি চাদরে গা ঢেকে আকাশে চুল মেলে দিয়ে আগের মত চাঁদও আর গল্প শোনায় না।
তুমি নেই, কোনও গন্তব্যও নেই আমার। কোনও কড়া নেই, কোনও দরজা।
হেঁটে হেঁটে জীবন পার করি। কাঁধের ওপর বিশাল পাহাড়ের মত তোমার না থাকা।
গায়ে পেঁচিয়ে আছে তোমার না থাকার হা—মুখো অজগর।
পায়ের তলায় তোমার না থাকার সাহারা,
পুবে পশ্চিমে দক্ষিণে উত্তরে হাটছি। আমি, আমার সঙ্গে হাঁটছে বিকট তোমার না-থাকা।
যত হাঁটি দেখি পথগুলো তত শিউলি ছাওয়া
তুমি সে যে কি ভালবাসতে শিউলি
কি দরকার আর শিউলি ফুটে, যদি তুমিই নেই!
কি দরকার আর ফুলের সুগন্ধে, তুমিই যদি নেই!
কি দরকার আমার!
কাল
প্রভাত ও সন্ধ্যাকাল কাাহাকে কহে তাহা সকলেই জানে। যখন আমরা শয্যা হইতে উঠি, সূর্য্যের উদয় হয়, তাহাকে প্রভাত কহে। আর সূর্য্য অস্ত যায়, অন্ধকার হইতে আরম্ভ হয়, তাহাকে সন্ধ্যাকাল বলে। প্রভাত অবধি সন্ধ্য পর্যন্ত যে সময় তাহাকে দিবা ভাগ কহে। আর সন্ধ্যা অবধি প্রভাত পর্য্যন্ত যে সময় তাহাকে রাত্রি কহে। দিবা ভাগে সকল জীব জন্তু জাগরিত থাকে ও আপন আপন কর্ম্মে ব্যস্ত থাকে। রাত্রিকালে সকলে আরাম করে ও নিদ্রা যায়; দিবা ভাগের প্রথম ভাগকে পূর্ব্বাহ্ন, মধ্য ভাগকে মধ্যাহ্ন, ও শেষ ভাগকে অপরাহ্ন কহে।
দিবা ও রাত্রি এই দুয়ে এক দিবস হয়; অর্থাৎ এক প্রভাত অবধি আর এক প্রভাত পর্য্যন্ত যে সময় তাহাকে দিবস কহে। দিবসকে ষাটি ভাগ করিলে ঐ এক এক ভাগকে এক এক দণ্ড কহে। আড়াই দণ্ডে এক হোর হয়। তিন হোরাতে অর্থাৎ সাড়ে সাত দণ্ডে এক প্রহর। দিন চারি প্রহর, রাতি চারি প্রহর। পনর দিবসে এক পক্ষ হয়। দুই পক্ষ,শুক্ল ও কৃষ্ণ। যখন চন্দ্রের বুদ্ধি হইতে থাকে তাহাকে শুক্ল পক্ষ কহে; আর যথম চন্দ্রের ক্ষয় হইতে থাকে তাহকে কৃষ্ণপক্ষ বলে। দুই পক্ষে অর্থাৎ ত্রিশ দিনে এক মাস হয়।
বার মাস। মাসের নাম এই; বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্ত্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র; দুই মাসে এক ঋতু হয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত সমুদায় এই ছয় ঋতু। তন্মধ্যে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস গ্রীষ্ম ঋতু; আষাঢ়, শ্রাবণ বর্ষা; ভাদ্র, আশ্বিন শরৎ; কার্ত্তিক, অগ্রহায়ণ হেমন্ত; পৌষ, মাঘ শীত; ফাল্গুন, চৈত্র বসন্ত। বার মাসে অর্থাৎ ৩৬৫ দিনে এক বৎসর হয়।
সচরাচর সকলে কহে, ত্রিশ দিনে এক মাস হয়; কিন্তু সকল মাস সমান হয় না; কোন কোন মাস ত্রিশ দিনে, কোন কোন মাস ঊনত্রিশ দিনে, কোন কোন মাস একত্রিশ দিনে কোন কোন মাস বত্রিশ দিনে হয়। এই ন্যূনাধিক্য প্রযুক্তই বৎসরে তিন শত পঁয়ষট্টি দিন হইয়া থাকে। সকল মাস ত্রিশ দিন হইলে ৩৬০ দিনে বৎসর হইত। পূর্ব্ব কালের লোকের ৩৬০ দিনে বৎসর গণনা করিতেন; সেই অনুসারে অদ্যাপি সামান্য লোকে তিন শ ষাটি দিনে বৎসর কহে। মাসের শেষ দিবসকে সংক্রান্তি কহে। চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে বৎসর সমাপ্ত হয়। বৈশাখ মাসের প্রথম দিবস নূতন বৎসর আরম্ভ। চির কালই বৎসরের পর বৎসর আসিতেছে ও যাইতেছে। এইরূপ এক শত বৎসরে এক শতাব্দী হয়।
কোন সুপ্রসিদ্ধ রাজার অধিকার, অথবা কোন সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা, অবলম্বন করিয়া বৎসরের গণনা হইয়া থাকে। এইরূপে যে বৎসর গণনা করা যায় তাহাকে শাক কহে! আমাদিগের দেশে দুই শাক প্রচলিত আছে, সংবৎ ও শকাব্দ। বিক্রমাদিত্য নামে এক অতি প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন; তিনি যে শাক প্রচলিত করিয়া গিয়াছেন তাহার নাম সংবৎ। আর শালিবাহন রাজা যাহা প্রচলিত করেন তাহার নাম শকাব্দাঃ। বিক্রমাদিত্যের উনবিংশ শতাব্দী অতীত হইয়াছে; এক্ষণে বিংশ শতাব্দী চলিতেছে। এখন সংবৎ ১৯০৮, অর্থাৎ বিক্রমাদিত্যের সময় অবধি ১৯০৭ বৎসর গত হইয়াছে। এই রূপ শালিবাহনের সতর শতাব্দী অতীত হইয়াছে, অষ্টাদশ চলিতেছে; এক্ষণে শকাব্দাঃ ১৭৭৩। এই রূপ ইঙ্গরেজ, ফরাসী, জর্ন্মন্ প্রভৃতি ইউরোপীয় জাতিরা য়িশুখ্রীষ্টের জন্ম অবধি শাক গণনা করে; উহাকে খ্রীষ্টীয় শাক কহে; এক্ষণে খ্রীষ্টীয় শাক ১৮৫২। মুসলমানেরাও মহম্মদের মদীনা পলায়ন দিবস অবধি এক শাক গণনা করে; ঐ শাক এক্ষণে? ৫৮ ইহার নাম সাল।
তাসের রাজ্য
খেলতে খেলতে সময় চলে যাচ্ছে
এ সময় কোনওদিন ভুল করে আমার জানালায় উঁকিও দেবে না জানি
যে যায়, সে যায়।
সময়ের মত তুমিও আর ফিরে আসো না, সেই যে গেছো।
নির্মাণ করেছি তাসের ঘর আমার তাসের রাজ্যে,
খেলার প্রতিটি জয় আমাকে অর্থহীন সুখ দেয়, তবু তো দেয়,
তুমিই দাওনি কোনও সুখ।
অর্থহীন জীবনের মত অর্থহীন খেলা আমার
অর্থহীন খেলতে খেলতে অর্থহীন মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছি।
খেলতে খেলতে জীবন ফুরোচ্ছে জানি, এ জীবন ফুরোলেই কী না ফুরোলেই কী
তুমি তো আর ফিরবে না কোনও সুগন্ধী রজনীগন্ধা হাতে
তুমি তো আর জ্বালবে না আলো ঘোর আধার ঘরে
বাতিগুলো এক এক করে নিবিয়েই তো গেছে, সেই যে গেছো।
সেই কবে লোবান জ্বেলেছিলে ঘরে, কেবল ছাইটুকু পড়ে আছে,
আজও আমি বেড়ে ফেলিনি এক কনা ছাই,
তোমার স্পর্শ ছিল লোবানে, কী করে ফেলি, হোক না সে ছাই!
আমি তো পুড়েছি লোবানের মত কবেই
সেই ছাইটুকু যখন গেছো সঙ্গে নিয়ে গেছো,
ওটুকু তোমারও তো সূতি, ওটুকুই তোমার আমি।
একদিন একটি পদক্ষেপ
ডায়নোসোরের রাজত্ব আর নেই। মরে সব ভুত হয়ে গেছে একদিন
ছশ পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগে হঠাৎ একদিন।
কিছু ধারালো ঠোঁটের পাখি ডায়নোসোরের নাতির ঘরে পুতি আকাশ কালো করে উড়তে শুরু করেছে, সেও অনেকদিন।
এর মধ্যে সমুদ্র এই পার থেকে বেড়াতে বেড়াতে ওই পারে গেছে, ধু ধু বালুর মরু কচ্ছপের মত
হেঁটে হেঁটে দিগন্তের কাছাকাছি গভীর জঙ্গলে মিশেছে।
আর ওদিকে ইথিওপিয়ার এক গভীর জঙ্গলে বুনো হাতি বুনো ঘোড়া বুনো ভালুক আর বুনো
ইঁদুরের সঙ্গে বাস করছে বুনো শিম্পাঞ্জি
আগ্নেয়গিরির লাভা শুকোনো পাথুরে মাটিতে শিম্পাঞ্জি
ভুমিকম্পে কম্পে চৌচির মাটিতে শিম্পাঞ্জি।
নদীর কিনারে, কাদাজলে, ঝোপঝাড়ে চারপেয়ে শিম্পাঞ্জি
বৃক্ষচূড়ায় শিম্পাঞ্জি।
আর তখনই হঠাৎ ডাল থেকে ডালে লম্ফঝম্ফ দে দৌড় দে দৌড়
মোটে ভাল লাগে না বলে,
দু পায়ে ভর করে দাঁড়ালো কোনও এক শিম্পাঞ্জির খুড়তুতো দিদি
সাতান্ন লক্ষ বছর আগে হঠাৎ একদিন।
খুড়তুতো দিদি শিরদাঁড়া সোজা করে প্রথম দাঁড়ালো,
খুড়তুতো দিদি একটি পা ফেলল সামনে,
একটি পদক্ষেপ রচিত হল।
একটি ছোট্ট, কিন্তু বিশাল পদক্ষেপ।
হাজেরা বিবির দিন
জন্মেছিল আকালের বছর
বারো বছর বয়সে সোহাগি বাজারে সের দরে বিক্রি হয়ে গেছে,
কন্যাকে বিক্রি করে হাজেরার বাবা এক পোয়া চাল কিনে বাড়ি ফিরেছিল একা।
যে গৃহস্থ লোক হাজেরাকে কিনেছিল, সে লোকের বাড়ি গতর খেটেছে সে তিরিশ বছর।
শৈশব কৈশোর গেছে একটি স্বপ্ন নিয়ে, এক থাল শাদা ভাত।
যৌবনও সেই।
এই মধ্যবয়সেও একটি স্বপ্ন নিয়ে সকালে সে জাগে, এক থাল শাদা ভাত
একটি স্বপ্ন নিয়েই সে ঘুমোতে যায় মধ্যরাতে, কাল যেন জোটে এক থাল শাদা ভাত
আকালের দিন যায়, হাজেরার স্বপ্ন যায় না কোথাও
শাদা ভাত ছাড়া আর কিছু চায়নি হাজেরা জীবনে,
শৈশবে কোনও পুতুল নয়, কৈশোরে পাঠশালা নয়, যৌবনেও কোনও
বটবৃক্ষতলের প্রেম নয়, ঘর আলো করা ফুটফুটে সন্তান নয়—এক থাল ভাতের যোগাড়।
বেঁচে থাকাই এরকম হাজেরার, বেঁচে থাকার অর্থই এমন
কেবল এক থাল শাদা ভাত।
এক থাল ভাত জোগাতে সে দিন শুরু করে, শরীরের শেষ বিন্দু শক্তি খাটিয়ে শাদা ভাত
আবার নতুন শক্তি নিয়ে পরদিন সে শক্তির ক্ষয় করে ভাত জোগাতেই
এক থাল শাদা ভাত, আর কিছু নয়। আর কোনও স্বপ্নের কথা সে কখনও জানে না, কখনও শেখেনি।
এই মধ্যবয়সে ভাত সামনে নিয়ে বসে দূর আকাশের দিকে মুখ করে হাসে হাজেরা
কৃতজ্ঞতার হাসি।
পরম করুণাময়ের কৃপায় এ ভাত জুটেছে তার
বাকিটা জীবন তাঁর কৃপা পেতে হাজেরার দুচোখে আকুতির জল…
ন বছর বয়সী ছেলেটি
ন বছরের ছেলেটি ঘরের মেঝেতে বসে রেল রেল খেলেনি কোনওদিন, তাকে কেউ দেয়নি কোনওদিন কোনও খেলনা রেলগাড়ি,
রেলের লেজের কিনারে চাবি, সেটি ঘোরালেই রেল যায় লাইন ধরে এমন খেলনা।
গাড়ি বন বাদাড় পেরোতে পেরোতে পুঁ ঝিকঝিক শব্দ তোলে এমন খেলনা।
ন বছরের ছেলেটি কমলাপুর ইশটিশনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে সত্যিকার রেলগাড়ির।
রেল এসে দাঁড়াতেই ছেলেটি দৌড়ে যায় ভারী বোঝাঅলা কোট প্যান্ট টাই পরা যাত্রীর দিকে,
কাতর মিনতি বোঝাটি যেন বইতে দেওয়া হয় তাকে।
দেড় কী দু মণ ওজন মাথায় নিয়ে ছেলেটি হাঁটে, তলে থেতলে যেতে থাকে, তবু সে হাঁটে,
ইশটিশন পার হয়ে রিক্সার পা দানিতে দেড় কী দু মণ নামালে কোট প্যান্ট টাই ঠিক দুটাকাই দেয়
ছেলেটিকে,
টাকা শার্টের পকেটে গুঁজে ছেলে নতুন যাত্রীর দিকে আবার দৌড়োয়।
সন্ধে পার হলে কুড়ি টাকা উপার্জন রফিকের
এ টাকায় চাল ডাল কিনে বস্তিতে ফেরে সে
পঙ্গু একটি মা আর মায়ের পাঁচটি কাচ্চা বাচ্চা বসে আছে গোল গোল চোখ করে রফিকের অপেক্ষায়,
ডাল ভাত রাঁধা হলে গোগ্রাসে খায় সাতটি অভুক্ত প্রাণী।
সকালে বই খাতা হাতে উঁচু দালানের ছেলেরা শাদা শাদা জামা জুতো পরে যখন যেতে থাকে ইশকুলে,
রফিক হাঁটে কমলাপুর ইশটিশনের দিকে খালি পায়ে, ছেঁড়া শার্ট, ময়লা হাফপ্যান্ট গায়ে।
বড় তার ইচ্ছে করে একদিন দেখে সে ইশকুল দেখতে কেমন,
ইচ্ছে করে একদিন কোনও একটি বইএর গন্ধ শোঁকে সে, স্বরে অ স্বরে আ গলা ছেড়ে পড়ে
ইচ্ছে করে একদিন খাতা খুলে শাদা পৃষ্ঠায় লেখে সেও, লেখে এক দুই তিন চার
একদিন কোনও একদিন…
রফিকের বয়স নদগুণে আঠারো হয়,
বস্তার ওজন বেড়ে দ্বিগুণ ত্রিগুণ হয়, বস্তি ঘিঞ্জি হয় চতুর্গুণ,
কেবল সেই একদিনটি রফিকের জীবনে আসে না কোনওদিন।
বস্ত্রবালিকারা
বস্ত্রবালিকারা দল বেঁধে হাঁটছে
যেন এক ঝাঁক পাখি উড়ছে বাংলাদেশের আকাশে।
বস্ত্রবালিকারা দল বেঁধে গভীর রাত্তিরে বস্তিতে ফিরছে, ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত
বালিকাদের গুটিকয় টাকার দিকে হাত বাড়াচ্ছে রাস্তার অকর্মা যুবক
বালিকাদের শরীরের দিকে শরীর বাড়াচ্ছে বখাটে মদারু
বালিকাদের খোয়াতে হয় সব, যা আছে যা নেই সব।
রাতটুকু নিদ্রাহীন কাটিয়ে সূর্য ওঠার আগে বালিকারা দল বেঁধে হাঁটে
দেখে শহরের তাবৎ ভদ্রলোকের জিভে লোল জমে
দেখে অতি ভদ্রলোকেরা থুতু ছিটোয় বালিকাদের গায়ে
বালিকারা তবু হাঁটে, হেঁটে যায়—
কারও খায় না পরে না তারা হেঁটে যায়
বস্ত্রবালিকারা বাঁধা ধনীর শক্ত দড়িতে,
কলুর বলদের মত ঘানি টানছে ধনীর। ধনীরা পাচ্ছে তেল, বালিকারা খাদ।
রংধনুর রং দেখা বস্ত্রবালিকাদের হয় না কখনও।
ঘুরঘুট্টি অন্ধকার গায়ে মুড়ে তাদের ধর্ষণ করে বস্তির মাস্তান
রূপসী চাঁদের জলে স্নান করা তাদের কখনও হয় না।
বস্ত্রবালিকারা দল বেঁধে হাঁটছে
যেন পৃথিবীর আকাশে উড়ছে এক ঝাঁক বাংলাদেশ।
ঈদুল আরা
ঈদুল আরার বইখাতা ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলেছে ঈদুল আরার স্বামী
ঈদুল আরা এখন রাঁধবে বাড়বে, সন্তান জন্ম দেবে।
ঈদুল আরা রাঁধে বাড়ে সন্তান জন্ম দেয়,
তবু ঈদুল আরার মন পড়ে থাকে বইয়ে, ঈদুল আরার দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ওড়ে, কেউ দেখে না দীর্ঘশ্বাস তো দেখার জিনিস নয়।
ঈদুল আরার স্বামী দীর্ঘশ্বাসও দেখে তৃতীয় নয়নে
ছিঁড়ে দুটুকরো করে নর্দমায় ছুঁড়ে দেয় দীর্ঘশ্বাস
ঈদুল আরা এখন সন্তানকে খাওয়াবে গোসল করাবে ঘুম পাড়াবে।
ঈদুল আরা সন্তানকে খাওয়ায়, গোসল করায়, ঘুম পাড়ায়,
তবু ঈদুল আরার মন পড়ে থাকে দীর্ঘশ্বাসে, ঈদুল আরার দুঃখ বাতাসে ওড়ে, কেউ দেখে না
দুঃখ তো দেখার জিনিস নয়।
ঈদুল আরার স্বামী তৃতীয় নয়নে এই দুঃখ দেখে না,
নারীর দুঃখ ঈদুল আরার স্বামীর চোখে কেন, দেবতাদের চোখেও পড়ে না।
মককা মদিনা
মককা আর মদিনা দুই বোন, এক বোনের বয়স নয়, আরেক বোনের এগারো।
এক বিকেলে ইশকুল থেকে ফিরছে দু বেণি দুলিয়ে দুবোন,
আলপথে হাঁটতে হাঁটতে এক বোন আরেক বোনের কাছে জানতে চাইছে আকাশ কেন নীল!
কেন সূর্য কেন চাঁদ, কেন হাওয়া কেন নদী!
আলপথ পার হয়ে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছের তল দিয়ে হাঁটছে দুজন, হাঁটতে হাঁটতে মদিনা উত্তর দিচ্ছে
মককার নতুর প্রশ্নের প্রজাপতিতে রং কেন, ফুলে গন্ধ কেন!
উত্তর মদিনা যে করেই হোক দেয়, কারও কোনও প্রশ্নের সামনে কখনও হতবুদ্ধি দাঁড়িয়ে থাকে না
বই থেকে, মন থেকে, আজব আজব রূপকথা থেকে হলেও দেয়
মককাকে কখনও সে অতুষ্ট করে না।
একটি হাত বোনের কাঁধে রেখে হাঁটছে সে, মককাকে দেখে দেখে রাখে মদিনা, যেন আঁচড় না লাগে
গায়ে, কাদাজল থেকে, খানা খন্দ থেকে, গরুঘোড়া থেকে।
মাতবর আলী ফুলতলি মসজিদ থেকে আসরের নামাজ সেরে ফিরছে দেখে দুবোনের দুবেণি
বেণি তো নয় যেন দুটো কাল নাগিনী, আঙুলে তসবিহর গোটা পাথর হয়ে থাকে, মাতবর আলীও
পাথর।
হযরে আসওয়াদের মত কালো পাথর, চুম্বনের তৃষ্ণায় কাতর হয়ে থাকে হযরে আসওয়াদ, জগতের
সব বিষ শুষে নেওয়া হযরে আসওয়াদ।
এক হাত তসবিহতে, আরেক হাতে মদিনার বেণি ধরে টেনে নেয় সে বারবাড়ির ঘরে,
সুনসান ঘরে
অন্দরে ব্যাস্ত মাতবর আলীর চার বিবি, পুত্রকন্যা, নাতি নাতনি
বারবাড়িতে মাতবর আলী, ব্যস্ত মককা আর মদিনাকে আদব কায়দা শেখাতে, ব্যস্ত বেপর্দা ঘরবার
হলে দোযখের আগুনে কি করে দুবোন জ্বলবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায়।
জমির মিয়া বিচার চাইছে ফুলতলি গ্রামে, মককা মদিনাকে রক্তাক্ত করার বিচার।
জমির আলীর বাড়ির আঙিনায় বসে বিচার, বিচারপতি ফুলতলি মসজিদের ইমাম, গ্রামের গন্যমান্য ব্যক্তি সভায় উপস্থিত, উপস্থিত মাতবর আলীও, শাদা দাড়িতে শাদা পোশাকে অনেকটা
আল্লাহতায়ালার মত দেখতে।
রক্তাক্ত কে করেছে, কে নিয়েছে দুবোনের ইজ্জত?
জমির আলী আঙুল তুলে দেখায় মাতবর আলীকে।
সাক্ষী আনো জমির আলী, সাক্ষী আনো। ঠান্ডা গলায় ইমামের আদেশ।
সভার লোকের দিকে অসহায় তাকায় জমির আলী, কে দেবে সাক্ষী! কেউ সেই দৃশ্য দেখেনি মককা
মদিনা ছাড়া! সাক্ষী নেই। নেই সাক্ষী। জমির আলী লুটিয়ে পড়ে ইমামের পায়ে, গলা ছেড়ে কাঁদে, সাক্ষী আল্লাহতায়ালা।
আল্লাহতায়ালাকে সাক্ষী মানে না ইমাম, ইজ্জত খুইয়েছে মককা মদিনা, অপরাধ মককা মদিনার। বিচারে পাঁচ হাজার টাকা ধার্য হয় জরিমানা, জমির আলীকে এক সপ্তাহ সময় দেন ইমাম, টাকা অনাদায়ে দুই কলঙ্কিনীকে একশ করে দুররা,
সাবাস সাবাস, দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে সোল্লাসে চিৎকার করে সভার গণ্যমান্যগণ।
দিনমজুর জমির আলীর টাকার যোগান হয় না
মককা আর মদিনাকে দুররা মারা হয়, পুরো ফুলতলি গ্রাম সে দৃশ্য দেখে, মাতবর আলীও।
মককার চোখে জগতের সকল বিস্ময় হুমড়ি খেয়ে পড়ে, কি দোষের শাস্তি পেলাম বুবু?
মদিনা যে কোনও প্রশ্নের উত্তর যে করেই হোক দেয়, বই থেকে মন থেকে
আজব আজব রূপকথা থেকে হলেও দেয়,
মদিনার কাছেও প্রশ্নটি বড় কঠিন, সে এর উত্তর জানে না, হতবুদ্ধি দাঁড়িয়ে থাকে এই প্রথম।
সাবলীল
আমি রাতকে রাত বলি, শর্বরী বলি না।
বলি না কারণ একুশ কোটি বাঙালি রাতকে রাত বলে, শর্বরী বলে না।
কুয়াশা কুয়াশা করে ভালবাসার কথা, রেখে ঢেকে ঘৃণা
পোষাতে পারি না,
সশব্দে সজোরে যা বলার বলি, যা হয় হোক, রাস্তায় পড়ে থাকবে লাশ থাকুক,
এসবে আর যে করে করুক, বাঙালিই পরোয়া করে না।
যে ভাষায় দুঃখ সুখের কথা বলে তারা, ভাব বা অভাবের কথা,
যে ভাষায় যুদ্ধ বা সংগ্রামের কথা বলে
যে ভাষায় শান্তি স্বস্তির কথা, সে ভাষায় বলি
সংগোপেনে যে স্বপ্নটি একুশ কোটি বাঙালি দেখে, সে স্বপ্ন আমিও দেখি।
আমি সুবিধাকে সুবিধা বলি, সৌকর্য বলি না
বলি না কারণ একুশ কোটি বাঙালি সুবিধাকে সুবিধা বলে, সৌকর্য বলে না।
মুঠোর মধ্যে আধুলি নিয়ে মুহূর্তে জগতের অধীশ্বর বনে যেতে পারি,
সকল বৈভব ছেড়ে বৈরাগ্যসাধনে মগ্ন হতে।
সকল নিয়ে সর্বনাশের আশায় বসে থাকা, খড়কুটোর মত বানের জলে ভাসিয়ে দেওয়া নির্মোহ জীবন
জীবন তো নয়, শুদ্ধ কবিতা,
একুশ কোটি বাঙালির জীবন একুশ কোটি কবিতা।
শুদ্ধ স্নিগ্ধ সহজ কবিতায় আমি মগ্ন নিমগ্ন
তাই কোমলকে কোমল বলি, শ্লক্ষ্ণ বলি না
বলি না কারণ একুশ কোটি বাঙালি কোমলকে কোমল বলে, শ্লক্ষ্ণ বলে না।
তুমি চাও অথচ চাও না
সাঁতার কাটতে যেতে চাইছ আবার বলছ জল তোমার সয় না
আসলে সবই তোমার সয়, কিছু কিছু জিনিস না সওয়ানোর শখ তোমার
কারও টাকা কড়ির শখ থাকে, কারও বাড়ির গাড়ির নারীর.
তোমার শখ অন্যরকম, এ সয় তো ও সয় না
দুধ সয়, দই সয় না
মাছি সয়, মশা সয় না।
আমাকে কখনও সয়, কখনও না।
ভালবেসে জীবন দিয়ে দিলে এক পূর্ণিমায়, তারপর পুরো কৃষ্ণপক্ষ জুড়ে দিয়ে দেওয়া জীবনটির জন্য
তোমার মায়া হতে থাকে, ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, টাপুর টুপুর বৃষ্টি এলে ইচ্ছেটি ঝমঝমিয়ে বাড়ে।
চাঁদ সয়, সূর্য সয় না,মাছ সয় মাংস না
ভেড়া সয় তো গরু না
আসলে কিন্তু সবই সয় তোমার, মানুষের মত সর্বভুক কে আছে আর!
মানুষের জল যেমন সয়, আগুনও তেমন।
আমাকেও সইত তোমার, সওয়াতে ইচ্ছে করতে যদি
একদিন ইচ্ছে করে যদি, আরেকদিন করে না
একদিন নৌকো চড়লে, আরেকদিন ঘোড়া–দুটোতে দুরকম সুখ।
এ আর এমন আশ্চর্য কি যে একশ রকম সুখের শখ তোমার।
আমাকে চাও অথচ চাও না
চাও না যেদিন বলে দিলে সাফ সাফ, মনে মনে খুব ভাল জানো যে চাও
বর্ষায় দুকূল উপচে উঠছে আর তখন ফিরিয়ে নেওয়া জীবনটি নতুন করে দিতে চাইছ,
এবার আর পুরোটা নয়,
আধখানা।
দেওয়া আধখানার জন্য তারপর মন কেমন করে তোমার, রাখা আধখানার জন্যও।
রাখা আধখানা দিতে চাও, দেওয়া আধখানা নিতে
আর আমি যখন আমার জীবনখানা জলের মত তোমার কাদামাখা হাতে উপুড় করে দিলাম,
আলগোছে তুলে রাখা হৃদয়ও
জীবনটুকু খেলে তুমি, হৃদয় ফেলে দিলে।
হৃদয় ফেরত পেতে ব্যাকুল ঘুরছো এখন
এটি ছাড়া আমার সহায় কিছু নেই জেনেও এটি তোমার চাই
পুরোটা না হলেও আধখানা চাই,
আধখানা না হলেও সামান্য
এক চিমটি হলেও।
বৃষ্টিতে ভিজছে হৃদয়
টিনের চালে রিমঝিম শব্দ হলে ঝাঁপিয়ে নামতাম উঠোনে
ভিজতে ভিজতে ঝড়ে পড়া কড়া আম কুড়োতাম– সে ছোটবেলায়।
বড়বেলায় বৃষ্টি হলে ঝাঁপিয়ে নামার কোনও উঠোন নেই
জানালায় একা বসে বৃষ্টিতে হৃদয় ভেজাই।
জল নয়, টুপটাপ স্মৃতি পড়ে
স্মৃতিতে ভাসতে থাকে জীবন, জীবনের নিকোনো উঠোন।
মনে মনে সে উঠোনে নেমে কড়া কড়া আম কুড়োনোর মত অগুনতি দুঃখ কুড়োই
কুড়োতে কুড়োতে দুহাতে কুলোয় না, উপচে পড়ে আঁচল, ভেজা হৃদয়।
পদ্মপাতা তুমি ভাসো
ভাসো, ভেসে থাকো পদ্মপাতা, ভেসে থাকো তোমাকে দেখব
ভেসে থেকে সুখ দাও পদ্মপাতা।
দুঃখগুলোর ওপর আমি ভাসতে চেয়েছি তোমার মতন, পারিনি
ডুবে গেছি।
দুঃখের গভীর জলে একটি সোনার কৌটো, সেই কৌটোর ভেতর আরেক কৌটো,
সেই আরেক কৌটোয় আরেক কৌটো, খুলে খুলে শেষ কৌটোয় দেখি এক টুকরোা দুঃখই পড়ে
আছে।
ভেসে থাকো পদ্মপাতা
না ধুলো না জল গায়ে মেখে ভাসো,
ভেসে থাকা দেখাও সুখ, সুখ দাও পদ্মপাতা।
পদ্ম ফুটে যাক, ফুটে ঝরে যাক, রূপসীর রূপ হেমন্তের হলুদ পাতার মত
তুমি ভেসে থাকো জলে, ঘোলা নষ্ট জলে আবর্জনা জলে।
ভেসে থাকা যে কেউ পারে না, সাততাড়াতাড়ি ডুবে যায়
যারা সুখে থাকে, সুখের অতলে খাবি খেতে খেতে মরে, জানে না কতটা নির্লিপ্ত হলে ভাসা যায়
না ছোঁয়া যায় মণিমুক্তো, না ধরা যায় তিমি, আকাশের সঙ্গে কতটুকু সখ্য হলে
কে আছে কি আছে নিচে, ক্ষুদ্র তুচ্ছ কি কি, খড়কুটো, বাসি ফুল, কার কী নির্যাস
না ছুঁয়ে না কিছু ভাসা যায়।
নিরুদ্বেগ মেঘের মত, মেঘেরা যেমন খেলে আকাশের উঠোনে তেমন পদ্মপাতা খেলো তুমি
ছুঁই না ছুঁই খেলা, ভেসে থাকো,
পদ্মপাতা ভেসে থাকো, তোমাকে দেখব।
ভালবাসা
ভালবাসা এমন করে কোথায় নেবে
নিতে নিতে, নিতে নিতে
সাত সমুদ্র পার করেছে,
আর কত!
এখনও তো পাইনি কোনও
পুরুষ কিংবা নারী আমার
মন মত।
ভালবাসা আর কতদূর?
ভিড়ভাট্টার অলিগলি, চাঞ্চর দোকান আর থিয়েটার
এই বাড়ি আর সেই বাড়ি, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়
সব খুঁজেছি, শহর ছেড়ে বিষ্ণুপুর, নিঝুম গ্রামের একলা পথও।
যাকে চাইছি সে জোটে না
ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘাড়ের ঞ্চপর সেই লোকটি যাকে না চাই
মানেনা আমার একটি মতও।
আমার কি আর অঢেল সময় লোক নাচাই!
ভালবাসা পাই বা না পাই
দিতে হবে যে করে হোক, এমন দাবি
ওরেব্বাস, চাষ করি যে উপচে পড়ছে বিলিয়ে যাব?
সটকে পড় উটকো লোক, একটু যেটুক অবশিষ্ট
নিজের জন্য রাখব আমি
বাদ দিয়েছি পাওয়ার আশা,পেলে পেলাম না পেলে নাই
হা পিত্যেশে কার কী লাভ!
ভালবাসা নিতে নিতে কোথায় নেবে আর?
কে জানে কারও সঙ্গে কি না আদৌ হবে ভাব
হলেও জানি থেকেই যায় শখের বীণায় একটি তারের অভাব।
এটুক যেটুক অবশিষ্ট, নিজের জন্য রাখাই ভাল
লোকে না হয় চমকালো
তন্ন তন্ন খুঁজে শেষে পাওয়ার আশা বাতিল করে নিজের দিকে মুখ ফেরালাম,
আমার যেটুক আমার থাকুক, এই ভাল,
নাহয় শুভাকাঙ্খিগণ একটুখানি ধমকালো।
সবাই, সবকিছু এখন স্মৃতি
যাদের সঙ্গে খোলা মাঠে গোলাপপদ্ম খেলেছি তারা এখন সুতি ছাড়া কিছু নয়
সবচেয়ে আপন যে বন্ধু ছিল, কথা ছিল চোখের আড়াল হব না কেউ কারও,
ভর দুপুরে সন্ধের অন্ধকার আচমকা বাদুরের মত ঝুলে থাকে, যখন সেই মুখটি মনে করি।
সেই মাঠ, সেই কড়ইতলা, ব্রহ্মপূত্র নদ, কাশফুলে ঢাকা নদের ওপার সবই স্মৃতি
লাল শাদা বাড়িগুলো, লিচুগাছগুলো, ভোরবেলা পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা রবীন্দ্রসঙ্গীত, কাঁঠালিচাপার ঘ্রাণ সবই–
রাত জেগে গল্পগুলো স্মৃতি, সুখগুলো।
জীবনের তিনভাগ স্মৃতি নিয়ে যাপন করছি বাকি এক ভাগ।
এই এক ভাগে কিছু নেই, ফাঁকা, খাঁ খাঁ
আমার মনুষ্যত্ব
নিজের মাকে কখনও বলিনি ভালবাসি,
অন্যের মাকে বলেছি,
নিজের মার কোনও অসুখ কোনওদিন সারাইনি,
অন্যের মার সারিয়েছি।
নিজের মার জন্য কাঁদিনি, অন্যের মার কষ্টে কেঁদেছি
এই করে করে জগতের কাছে উদার হয়েছি।
তার পাশে কখনও বসিনি, যে ডাকত
একটি হাত ভুলেও কখনও রাখিনি তার হাতে,
একটি চোখ কখনও ফেলিনি সেই চোখে।
সবচেয়ে বেশি যে ভালবাসত, তাকেই বাসিনি
যে বাসেনি, তাকেই দিয়েছি সব,যা ছিল যা না ছিল
এই করে করে মহান হয়েছি,
মানুষের চোখে মানুষ হয়েছি।
বাহান্নো থেকে একাত্তর
চোখ মেলে প্রথম দেখে মুখ বাঁধা,
একদল কুচুটে লোক চোখ রাঙাচ্ছে, গাল দিচ্ছে
বাহান্নোয় প্রথম তারা মুখের বাঁধন খুলে চিৎকার করেছে, যেই না চিৎকার অমনি
লোমশ লোমশ থাবা ধরেছে গলা চেপে
এরপর তো চোখ মেলে দেখলোই তারা বন্দি, হাতে পায়ে শেকল
তবু শিরদাঁড়া শক্ত করে দাঁড়িয়েছিল
শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছিল পথে, পথ ভেসে গেছে বুকের রক্তে
সেই রক্তাক্ত পথই ছিল তাদের ঠিকানা।
একাত্তরে তারা চেতনার চূড়ান্ত শিখরে
একাত্তরে তারা যেমন হৃদয়বান, তেমন আগুন
একাত্তরে হিংস্র লোকের হিংস্রতা থেকে মুক্ত করল নিজেদের
এরপর ধ্বস
এরপর ধ্বস নেমেছে একটি জাতির জীবনে
ক্ষুদ্রস্বার্থে নিমগ্ন এক একটি হৃদয়বান মানুষ, এক একটি জ্যোতির্ময় আগুন,
এক একটি সম্ভাবনার বিনাশ।
নিজেরাই নিজেদের পুড়িয়ে ছাই করেছে,
বাহান্নো থেকে একাত্তর, এই কুড়ি বছর যাপন করেই তারা আবার আগের মত বন্দি,
নিজেরাই নিজেদের পথ ভাসায় নিজেদের রক্তে। নিজেদের শেকলে নিজেরা বাঁধা,
নিজেরাই কুলুপ এঁটেছে নিজেদের মুখে। নিজেরাই নিজেদের চেতনার ঘরে ঢুকিয়েছে কালসাপ।
ফুলন দেবী
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ফুলন দেবী হতে
ফুলন দেবী কি যে সে হতে পারে!
কত সহস্ৰ ধৰ্ষিতা নারী মুখে কুলুপ এঁটে আছে,
ধর্ষকের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মাথা নুইয়ে,
কত লক্ষ ধৰ্ষিতার নাশ হয়ে গেছে স্বপ্ন!
কত কোটি ধর্ষিতা গলায় দড়ি দিচ্ছে,
কেউ কি ফুলন দেবীর মত পারে! কেবল ফুলন দেবীই পারে।
এই সভ্য সমাজে তোমাকে মোটেও মানায়নি ফুলন, ওখানে ওই চম্বলের বনেই তুমি ছিলে তুমি।
ওখানেই ফুটেছিলে গন্ধরাজের মত
ওখানেই ছিলে দেবী।
যেই কি না সভ্য হতে গেছো, হাতে চুরি পরে, রঙিন শাড়িতে জড়িয়ে শরীর আর সব কূলবধুর মত
লজ্জাশীলা বিনোদিনীর মত, যে কোনও মালবিকা তমালিকার মত—
দেবীত্ব ঘুচে গেছে সেই তখনই। সভ্যতার কালি গায়ে মেখে তুমি সর্বনাশ করেছো তোমার।
ধনীর আবর্জনা
আবর্জনার স্তুপে সেদিন দেখি আস্ত একটি সোফা, কয়েকটি চেয়ার টেবিল, মখমলের গালিচা,
দেখি গাড়ি, আধখানা বাড়ি, রেডিও-টেলিভিশন, এমনকি না -ভাঙা কমপিউটার
দেখি থাল বাসন, মাখনে ভাঁজা মুরগি, তাজা তাজা আপেল আঙুর, ডিম দুধ, দেখি ঝলমলে জামা জুতো।
যারা ছুঁড়েছে তাদের কাছে এসব বড় বাসি বাসি ঠেকে
দাম দিয়ে নতুন কায়দার আসবাব, যন্ত্রপাতি, কাপড় চোপড় থাল বাসন কিনে নেবে
কিনে নেবে নতুন কায়দার খাবার।
আবর্জনার স্তূপে অনেকক্ষণ বিমুঢ দাঁড়িয়েছিলাম আমি
যে বন্ধুটি সঙ্গে ছিল টেনে সরালো আমাকে
—-ছিঃ ওখানে কি কর?
ওখানে কিছুই করিনি আমি, ওখানে কিছুই করার নেই আমার
ওখানে দাঁড়ালে সখিনা বেগমের শুকনো মুখটি মনে পড়ে শুধু।
চালচুলো নেই, পরনে ছেঁড়া ত্যানা সেই সখিনা বেগম
গোসলের পর শরীরের ত্যানা শরীরেই শুকোনো সখিনা বেগম
ক্ষিধেয় পুকুরের শাপলা চিবিয়ে খাওয়া সখিনা বেগম
ফুটপাতে ঘুমোনো সখিনা বেগম।
শাদা ধবধবে বন্ধুটি নোংরা থেকে সরে এক পরিচ্ছন্ন বাগানে বসে উচ্ছ্বসিত
–দেখো দেখো কি চমৎকার সবুজের উৎসব চারদিকে, ফুলের বন্যা বইছে দেখো!
ফুলে আমার মন বসে না, মনে আমার লক্ষ লক্ষ সখিনা।
ভাল আছি, ভাল থেকো
কে কোথায় আছে কেমন আছে ভেবে ভেবে আমার দিন নষ্ট করি, রাত নষ্ট করি।
কারও পিঠে ব্যাথা, কারও উদরাময়, কারও রক্তচাপ বেশি, কারও চোখে ছানি
কারও পেচ্ছাবে গোলমাল, কারও মাথায়
—দুশ্চিন্তার চাদর মোটেও খুলি না গা থেকে।
নিজের দূরারোগ্য ব্যাধির কথা ভুলে যাই, যেন এ কিছু নয়, এ তুষার-তুলো, এক ফুঁয়ে উড়ে যাবে, ঊষ্ণ স্পর্শে গলে জল হবে।
অথচ মনে মনে ঠিকই জানি ভেঙে চুর চুর আমার ভেতরবাড়ি
ধ্বসে পড়বে স্মৃতি স্বপ্ন সব নিয়ে হঠাৎ একদিন, হঠাৎ নিঃশব্দে একদিন
আমার থাকায় না থাকায় না এই জগতের, না সংসারের, না কোনও মানুষের না আমার
কিছু আসে যায়
মানুষগুলো বেঁচে থাক,
দুধে ভাতে বেঁচে থাক, মানুষগুলো সুখে থাক, যত দূরেই থাক
আমার না হয় নাইবা হল, না হয় নাইবা হল দেখা অসীম আকাশ।
দৌলতুন্নেসা
দৌলতুন্নেসার দৌলত নেই এক কড়ি
অন্যের দৌলতে খায় পরে,
অন্যে দিয়েছে সোনা তিন ভরি
অন্যে দিয়েছে সাতনরীহার গড়ে।
অন্যের সুখে সুখী সে, অন্যের দুখে দুখি
তবু অন্যেরা বলে রে পোড়ারমুখি
দূরে সর, দূরে সর
দূরে গিয়ে তুই অসুখে অভাবে মর।
অন্যেরা তাকে আজ চুমু খায়
কাল ফেলে দেয় নোংরা নর্দমায়
তার দৌলত নেই কোনও
অন্যকে তার শরীর দিয়েছে, মনও।
যে কোনও নারীর মতই নিঃস্বা সে
শূন্যতা প্রতি নিঃশ্বাসে
দাঁড়াবার কোনও মাটি নেই বলে বেঁচে আছে এক বিশ্বাসে
একদিন এক ভাল লোক হয়ত দাঁড়াবে পাশে।
দৌলতুন্নেসা জানে না এখনও দাঁড়াবার মাটি নিজেকেই পেতে হয়
অন্যের কাঁধে ভর দিলে অন্যকে সব দিতে হয়
নিজের একটি জীবন, সেটিও তখন নিজের নয়।
মানুষের জাত
ঈশ্বর ঈশ্বর জপছে মানুষ, ঈশ্বরের জন্য এখনও নির্বিচারে খুন হচ্ছে নারী পুরুষ
রক্তে ভাসছে রাজপথ অলিগলি, শহর বন্দর।
কে এই ঈশ্বর, যে কি না ছ দিনে তৈরি করেছে বিশ্বব্রহ্মান্ড! যে কি না সূর্যকে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরায়!
ঈশ্বরকে তো হত্যা করেছে কোপারনিকাস আজ নয়, সাড়ে চারশ বছর আগে।
পৃথিবী যতবার প্রদক্ষিণ করেছে সূর্য, লাশে ধাককা লেগে ততবার টুকরো হয়েছে ঈশ্বর
সেই টুকরো লাশও ভস্ম করে দিল ডারউইনের ভীষণ আগুন।
ঈশ্বর -পোড়া -ছাইএর একটি কণাও আর কোথাও নেই
তবে কেন আর রক্তপাত না থাকা ঈশ্বরের নামে!
তবে কেন আর ধ্বংস করা মানুষের তাবৎ সম্ভাবনা।
মানুষ তোমরা মানুষের কথা ভাবো।
ঈশ্বর-পুজোয় আজ উন্মাদ মানুষ
মন্দির মসজিদ গির্জায় ঢাকা পড়ছে মানুষের মুখ
অন্ধ হচ্ছে চোখ, মস্তিস্কে ঢুকে যাচ্ছে বিষাক্ত পোকা।
ঘৃণায় ভর করে বুক ফুলোচ্ছে এক একজন ডাকসাইটে ধার্মিক,
তিল পরিমাণ ঈশ্বর নেই কোথাও, পূনর্জন্ম নেই, শেষ বিচার নেই, স্বর্গ নরক নেই,
মহাজগতে মানুষের চেয়ে মহান কিছু নেই,
তবে কেন পরষ্পরের প্রতি ঘৃণায় মানুষের নিশ্চিহ্ন করা মানুষেরই জাত!
মানুষ তোমরা মানুষকে ভালবাসো।
হঠাৎ একদিন ধুম
কেউ কোথাও নেই, কোনও বস্তু নেই, কোনও সময়, কোনও বায়ু নেই, কোনও জল
চারদিকে একটি জিনিসই শুধু, শূন্যতা তার নাম।
সেই অপার শূন্যতার মধ্যে হঠাৎ একদিন ধুম
সেই ধুম থেকে জন্ম হল পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র কিছুর, আর তক্ষুণি ছিটকে পড়ল দিগ্বিদিকে
ক্ষুদ্রাদিক্ষুদ্র সেইসব একের গায়ে আরেক লেগে পরমাণু হল, ধীরে ধীরে বাষ্পের, মাটির, পাথরের
পিন্ড—
পিন্ডগুলো ভাসতে ভাসতে অসীমের দিকে যাচ্ছে, যাচ্ছেই
কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জ, ছায়াপথ, সহস্র কোটি সৌরজগত যাচ্ছে অসীমের দিকে, যাচ্ছেই।
হয়ত উৎস থেকে টান পড়লে উৎসের দিকে চুপসে যাবে একদিন।
এই মহাবিশ্বের ছোট্ট এক সৌরজগতে একটি ছোট্ট গ্রহ, পৃথিবী তার নাম।
এই গ্রহের জলে জন্ম হল এক কোষি প্রাণী, এক কোষী থেকে প্রকৃতির বিবর্তনে একদিন বহুকোষি
বহুকোষি থেকে বিবর্তনে বিবর্তনে মানুষ
কোনও একদিন মানুষের কোনও চিহ্নও থাকবে না কোথাও, কোনও একদিন সূর্যের আলো যাবে নিভে,
নিভে যাবার আগে আর সব নক্ষত্রের মত সূর্যও বিশাল রাক্ষস হয়ে গিলে ফেলবে পৃথিবীর আপাদমস্তক।
কোনও একদিন চুপসে যাওয়া উৎসে আবার হয়ত হবে ধুম।
আবার হয়ত ছিটকে পড়া, পৃথিবীর মত গ্রহ আর হয়ত জন্মাবে না, আর হয়ত
জন্মাবে না মানুষ নামের কোনও প্রাণী।
প্রকৃতির এই খেলায় মানুষ কেবলই এক পলকের স্মৃতি
প্রকৃতির এই কবিতায় মানুষ একটি জ্বলজ্বলে অক্ষর।
আজ আছ তো কাল নেই
যে মানুষই জন্ম নিচ্ছে, একটি সত্যই সামনে তার, মৃত্যু।
মৃত্যু আছে বলেই জীবন এমন সুন্দর,
অথবা মৃত্যু আছে বলেই এত অর্থহীন।
খাও দাও নাচো গাও, যতদিন বেঁচে আছো স্ফূর্তি কর,
পান কর জীবনের রস
নাও যা পেয়ে যাও, সুখ হলে সুখ, দুঃখ হলে দুঃখ।
আজ আছ তো কাল নেই, যদি দুঃখ জোটে জুটুক
দুঃখ কি সহজ অর্জন করা! বড় শ্ৰম ও নিষ্ঠার ফসল
আলগোছে ঘরে তোলো, বড় যত্নে বুকে পোষো
সুখ যে কেউ পারে নিতে, দুঃখ নয়
দুঃখ পেতে হলে হৃদয় চাই, কোমল কুমারী হৃদয়।
ইট-ভাঙা মেয়ে
রাস্তার ধারে বসে একটি মেয়ে ইট ভাঙছে,
লাল শাড়ি পরা মেয়েটি ইট ভাঙছে, রোদে পুড়ে পুড়ে ভাঙছে ইট,
তামাটে রংয়ের মেয়েটি ভেঙে যাচ্ছে ইট।
একুশ বছর বয়স, অথচ দেখতে লাগে চল্লিশ ছাড়িয়ে যাওয়া
ঘরে একটি নয়, দুটি নয়, সাতটি সন্তান।
সারাদিন মেয়েটি ভেঙে যায় ইট, সারাদিন পর মহাজন দেবে গুণে গুণে দশ টাকা।
.০দশ টাকায় না হয় তার, না হয় সাত পোষ্যের ভরপেট খাওয়া,
মেয়েটি তবু ভেঙে যায় ইট প্রতিদিন।
পাশে বসে যে পুরুষটি ইট ভাঙে, সে একটি ছাতার তলে বসে ভাঙে,
দিন গেলে সে পুরুষ পায় কুড়ি টাকা,
পুরুষ বলেই সে পায় দ্বিগুণ।
মেয়েটির একটি গোপন শখ আছে, রোদ থেকে গা বাঁচাতে কোনও একটি ছাতার তলে বসার,
মেয়েটির আরও এক গোপন শখ, হঠাৎ একদিন কোনও এক স্নিগ্ধ ভোরবেলা পুরুষ হয়ে যাওয়া, পুরুষ হলে কুড়ি, পুরুষ হলে দ্বিগুণ।
অপেক্ষা করে সে, কিন্তু তার হয়না হঠাৎ একদিন ফুসমন্তরে পুরুষ হওয়া
একটি মলিন ছাতাও তার ভাগ্যে জোটে না।
মেয়েটির ভাঙা ইটে নতুন রাস্তা হয়, বড় বড় দালান ওঠে শহরে, অথচ মেয়েটির ঘরের চাল উড়ে
গেছে গতবছরের ঝড়ে, ছেঁড়া চট চুইয়ে পড়ে বর্ষার জল, একটি ঢেউটিন কেনার শখ সে গোপন
রাখে না, পাড়ায় চেঁচিয়ে জানায় তার ঢেউটিন চাই, লোকে হাসে শুনে, বলে আহা চুলে তার তেল
চাই, মুখের পাউডার চাই!
সাতটি পোষ্য ঘরে, মেয়েটি দিন দিন রোদে পুড়ে তামাটে হতে থাকে,
দিন দিন মেয়েটির আঙুলগুলো ইটের মত শক্ত হতে থাকে
মেয়েটি নিজেই হতে থাকে আস্ত ইট,
হতে হতে ইটের চেয়েও কঠিন. হাতুড়িতে ইট ভাঙে, মেয়েটি ভাঙে না।
রোদে পোড়ার, না পেট না মন ভরার, ঢেউটিন না পাওয়ার কোনও কষ্ট তাকে স্পর্শ করে না আর।
বিশ্বায়ন
বিশ্বায়ন বিশ্বায়ন বলে চেঁচাচ্ছে কিছু ধনী দেশ।
বিশ্বায়নে লাভ কার? ধনীর ছাড়া আর কার?
ধনীর আরও ধন জুটবে, দরিদ্র যে দরিদ্রই।
আমি স্বপ্ন দেখি দেশে দেশে কাঁটাতার নেই কোনও
পৃথিবীর সম্পদ আর ভূমির বন্টন হয়েছে সুষম,
কোনও আমার-তোমার নেই, কোনও কলহ কোন্দল নেই
কোথাও গাদাগাদি ভিড় নেই, কোথাও সহস্র একর পড়ে নেই খালি
স্বপ্ন দেখি মানুষের আর খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের অভাব নেই
মানুষ চাঁদে বেড়াতে যায়, মঙ্গলগ্রহে যায়, আলোর গতির চেয়ে দ্রুত গতি তুলে যায় মহাবিশ্বের
শুরুতে।
ধর্ম বলে কিছু নেই কোথাও, কোনও রক্তপাত নেই, কোনও জাতপাত নেই, ঘৃণা নেই
মানুষ ফুল ফোটায়, গান গায়, মানুষ হাসে, মানুষ সুখে থাকে, মানুষ ভালবাসে,
স্বপ্ন দেখি নারী পুরুষে, কালো শাদায় হলুদ বাদামিতে কোনও বৈষম্য নেই—
বিশ্বায়ন বিশ্বায়ন বলে চেঁচায় যারা, ধন ছাড়া আর কি চায় তারা?
বিশ্বায়নে লাভ কার? ধনীর ছাড়া আর কার?
ধনীর আরও ধন জুটবে, দরিদ্র যে দরিদ্রই।
আমি অন্যরকম বিশ্বায়নের স্বপ্ন দেখি—
আমার বিশ্বায়নে নেই দরিদ্র-শোষণ, নেই সস্তার শ্রম, নেই লোভ, কাড়ি কাড়ির লোভ।
আমার বিশ্বায়নে ধনের নয়, আছে মনের বিকাশ। আছে চেতনার উন্মীলন, আছে মানববন্ধন, আছে প্ৰেম।
সুলেখা
সুলেখার চুল ওড়েনা দখিনা হাওয়ায়,
আপাদমস্তক ঢাকা বোরখায়।
এরকমই নিয়ম সংসারে
এমন নিয়মের তলে সুলেখার গা গতর বাড়ে।
অসভ্যের মত চুল বেড়ে নিতম্বে গড়ায়
বৃন্ত বিকশিত স্ফীত স্তনজোড়ায়।
ঢেকে রাখ ঢেকে রাখ সুলেখা, লজ্জা ঢেকে রাখ
তোর চুল চোখ চিবুক
নাক, চোখ, মুখ, বুক,
হাত পায়ের আঙুল, হুল, ভুল সব ঢেকে রাখ,
তোর পেট পিঠ ঢাক, ঢাক অশ্লীলতা,
বুজে থাক মুখ, না শব্দ না কথা।
ঢুকে যা বন্ধ খাঁচায়
নারীকে খাঁচাই বাঁচায়।
সুলেখা অঙ্গ ঢাকে তার, সর্বাঙ্গ ঢাকে সর্বাঙ্গের অশ্লীলতায়।
পচা রক্তের গন্ধ শরীরে,
ছিঃ লজ্জা, ছিঃ লজ্জা, ঘরবার হোসনা সুলেখা, যাসনে ভিড়ে।
বেঢপ মাংস বেজন্মার মত উত্থিত রে, মর্তে জন্মালি স্বর্গের হুরী
তোকে দেখে ঘেন্না লাগে, ভয় লাগে, তোকে দেখে লাগে পর-পুরুষের পুরুষাঙ্গে সুড়সুড়ি
ছিঃ লজ্জা ছিঃ লজ্জা!
ঢিলে কর শরীরের কলকব্জা,
স্থির হ রে, ঢুকে যা আঁধারে, যা বন্ধ খাঁচায়
নারীকে খাঁচাই বাঁচায়।
পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ -ভোগ হয়না সুলেখার,
নেই দেখার অধিকার নারীর অধিকার।
বৃক্ষনিধন
বৃক্ষের কাছে ঋণী তুমি,
বৃক্ষের কাছে নত হও
বৃক্ষ দিচ্ছে ফল মূল ছায়া,
বৃক্ষ দিচ্ছে অম্লজান।
বৃক্ষ দিচ্ছে শক্তি তোমাকে,
হাত ভরে নাও বৃক্ষের দান,
বৃক্ষের কাছে ঋণী তুমি,
বৃক্ষনিধন বন্ধ কর, বৃক্ষকে কর মায়া।
বৃক্ষ নেহাত জড়কাঠ নয়, জড়কাঠ নয়, জড়কাঠ নয়
বৃক্ষেরও আছে প্রাণ।
রং
বুদ্ধিমতী মেয়ে, মুগ্ধ করা ব্যাবহার
সুচারু আচার,
গুণে টইটম্বুর, কেবল একটিই অপরাধ ওর
যদিও সে ভাল, সে কালো।
মেয়েটির যৌবন কাটে একা, কালো বলে কেউ বাসে না ভাল
রূপসী বলে না কেউ, যদিও রূপসী সে,
সুযোগ্য অযোগ্য কালো কালো পাত্র এসে তার চুল দেখে খুলে, রান্না বান্নায় ভাল কি না
কন্ঠে সূর আছে কি নেই, হাঁটা চলা চলে কি না, দেখে যথেষ্ট লজ্জাবতী কি না,
সব সয় পাত্রের, কেবল রংটি সয়না।
একটিই অপরাধ ওর, ত্বকে মেলানিন বেশি,
কারণ ওর পূর্ব পুরুষ দ্রাবিড়ভাষী দেশি
কোনও বহিরাগত শাদার সঙ্গে যৌনমিলনে মিশ্রিত হয়নি ওরা
রোদে শরীর পোড়া
কড়া রোদের দেশে এই হয়, এরকমই প্রকৃতির নিয়ম
পরিবেশ-প্রয়োজন দেয় কারো ত্বকে মেলানিন কিছু বেশি, কারো ত্বকে কম।
পৃথিবীর প্রথম মানুষটি কালো। তার থেকে যে জন্মেছে সে কালো,
তার থেকেও জন্মেছে আরেক কালো। কালো মানুষেরা হেঁটেছে পৃথিবীর পথে,
জন্ম দিয়েছে আরও লক্ষ লক্ষ কালো।
কেবল বরফের তলে আটকে পড়ে কিছু কালোর মেলানিন গেছে ফুরিয়ে,
ওরা যায় সাততাড়াতাড়ি বুড়িয়ে
কুড়িতেই ভাঁজ পড়ে ত্বকে, সূর্যরশ্মিতে ত্বক কর্কট রোগে ভোগে
ওইসব ফ্যাকাসে দস্যু কালো মানুষের সম্পদ লুটে পুটে ধর্ষণ করেছিল কালো নারী
সেই থেকে কিছু জারজ ঘুরছে হর্ষে ভারতবর্ষে।
মেলানিন নেই ত্বকে, এ কোনও অহংকার নয়,
ফ্যাকাসে দেখতে ত্বক, এ কোনও সৌন্দর্য নয়
এ নেহাত মূর্খতা ভারতের
ফ্যাকাসে খেদিয়ে ফ্যাকাসের কাছে মাথা নত করে ফের।
শাদা সঙ্গিণীর লোভে পুরুষেরা হন্যে হয়ে ঘোরে,
কৃষ্ণকলি জগতনন্দিনী পড়ে থাকে একা অন্ধকারে মরে।
পণ
মেয়ের বিয়েতে পণের গ্যাড়াকল,
চাষের জমি বিক্রি করে সমীরণ মন্ডল,
এতে হবে না, আরও চাই। এবার বাড়িঘর বিক্রি হল, এতেও হয় না আরও,
এত চাই চাই মেটাতে পারেনা সমীরণ, বাকিটা আজ নয় কাল দেবে বলে ঘটিয়ে দিয়েছে বিয়ে।
স্বামীর সংসারে উঠতে বসতে গাল খায় মেয়ে,
উঠতে বসতে কিল চড়,ঝাঁটা
মেয়েটির বাগানে ফুল ঝরে যায়, ফুটে থাকে শুধু কাঁটা।
বছর গড়িয়ে যায় সমীরণ, দিচ্ছ না কেন পণ?
এই তো দিচ্ছি সবুর কর, এই তো হয়ে এল,
কিন্তু ওদিকে বেলা তো গেল,
দেরি বলে স্বামী কুপিয়ে মেরেছে মেয়ে।
মুখ বুজে থাকে সমীরণ. মাথা নত শরমে।
শিশুকন্যা
সন্তান কালা হোক খোঁড়া হোক, মায়ের কাছে প্রিয়
সন্তান ভালবাসে হিংস্র বাঘিনীও।
এমন কোনও পশু নেই, এমন কোনও পাখি
শৈশবে যত্নে যার মা দিয়েছে ফাঁকি।
প্রাণীর সংসারে পিতা বলে কোনও স্বজন নেই,
মানুষই করেছে পিতাকে প্রিয়, পিতাকে পরম আত্মীয়।
পাখি-পিতা খায় পাখির ডিম
পশু-পিতা খায় পশু-সন্তান
মানুষ ভাবে মানুষ শ্রেষ্ঠ, মানুষের আছে মান।
মানুষ-পিতা নখরথাবা গুটিয়ে রাখে বটে
এমন ঘটনা ঘটে,
আড়ালে আবডালে অঙ্গ উচাটন
শিশু-কন্যাকে গায়ের জোরে পিতা করে ধর্ষণ।
উত্তরের দেশগুলো
বরফের তলে পড়ে থেকে ত্বক হয়েছে মেলানিনহীন, খড়ের রংএর মত চুল,
পেয়েছে বুনো বেড়ালের চোখের মণি, যেন অন্ধকারে দেখতে পায় বুনো শুয়োর,
ধারালো দাঁতে নখে ছিঁড়তে পায়।
বর্বর জলদস্যুর দল এদেশে ওদেশে আচমকা উদয় হয়ে হত্যা করেছে মানুষ,
পুড়িয়েছে ঘর, ভেঙেছে মন্দির, লুট করেছে সোনা দানা হীরে।
জলদস্যুদের যখন অক্ষরজ্ঞান নেই, ভারত তখন বিশাল বিশাল কাব্য লিখছে, শিল্পকলায় মগ্ন
ভারতে তখন দর্শন-বর্ষণ।
আজ সেই জলদস্যুদের দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য দেশ
আজ সেই জলদস্যুদের দেশে কোনও ক অক্ষর গোমাংস নেই
একটিও মানুষও থাকেনা অনাহারে, না-বস্ত্রে, না-বাসস্থানে, প্রত্যেকেই ধনে মানে উপচানো
আজ সেই জলদস্যুদের দেশ থই থই করে মানবাধিকারে
ভারত রয়েছে পড়ে অন্ধকারে
অদ্ভুত অনটনে।
মিশরও হারিয়ে ফেলেছে অতীত গৌরব, পারস্যদেশ হারিয়েছে তার সব
সভ্যতা গড়িয়ে গিয়েছে জলের মত দক্ষিণ থেকে উত্তরে।
দক্ষিণী মানুষ শেকল পরাতে পারেনি সভ্যতার পায়ে, যত শেকল ছিল নিজেরাই পরেছে শখে।
সুখ
দরিদ্র দেশে দরিদ্র থাকে সুখে,
সুখে থাকে, কারণ জানে না তার কি কি সব পাওয়ার কথা, অথচ পাচ্ছে না।
তাকে কি অসুখী করবে জানিয়ে কি কি হারাচ্ছে, কি কি পাচ্ছে না সে
না কি সুখেই থাকতে দেবে, যেমন আছে!
একটিই জীবন মানুষের, এ জীবনে সুখের চেয়ে বড় অন্য কিছু কি আর!
বিশাল অট্টালিকায় মনমরা বসে থাকে সব-পাওয়া লোক, আত্মহত্যার জন্য গোপনে বিষ খোঁজে, কড়িকাঠ খোঁজে।
ওদিকে আধপেট পান্তা খেয়ে ন্যাংটো বালক পাখির একটি ডিম হাতে পেয়ে সুখের হাসি হাসে। বালকের বরগাদার বাবা পরম সুখে আছে মাত্র দুমাইল দূরে বসেছে বলে একটি জলের কল,
বালকের মা সুখী লেবুগাছে লেবুর ফুল ফুটেছে বলে, এক খাঁচা গোবর কুড়িয়ে লেপছে সে তার মাটির ঘরখানি।
রাতে টিমটিম করে দাওয়ায় জ্বলে প্রদীপ। দিনে সূর্য, রাতে চাঁদ, অমাবস্যায় প্রদীপ, আর কি চাই বালকের বাবার! তাকে কি অসুখী করবে বিদ্যুত বাতির কথা বলে? অসুখে বিসুখে তার চিকিৎসার অধিকারের কথা বলে! তাকে কি অসুখী করবে বলে যে যে ঘরে থাকছে, সে ঘরে নিরাপত্তা নেই, যে কোনও সময় চোর ছ্যাঁচড় সিঁধ কেটে ঢুকে যাবে, নিয়ে যাবে জমানো এক হাঁড়ি ধান তার, ঝড়
বা তুফানে উড়ে যাবে ঘর, বন্যায় ভেসে যাবে, তাকে কি বলবে যে এর চেয়ে ভাল দর দালানের কোনও পোক্ত ঘর, বর্ষা বাদলে জল ঝরবে না যে ঘরে, যে ঘরে আবার বৈদ্যুতিক পাখাও থাকতে পারে, হাতপাখায় যে সুখ, তার চেয়ে বেশি সুখ সে পাখায়? তাকে কি বলবে যে মাছ বা মাংস, পাউরুটি,মাখন, পনির, পুষ্টিকর খাবার মাস বা বছর গেলে নয়, প্রতিদিনই জুটতে পারে, জুটছে অন্যের। তার ঘরে কি একটি টেলিভিশন থাকা জরুরি বলবে, যেখানে নানা দ্রব্যের বিজ্ঞাপন চোখ কপালে তুলে দেখবে সে, তাকে কি এসব বলে তার অভাববোধ বাড়াবে, যে অভাববোধ তাকে নিশ্চিত অসুখি করবে, না কি তাকে সুখে থাকতে দেবে সে যেমন আছে!
পরনের একটি সুতি শাড়িই বালকের মার। দুবছর পর আরেকটি জুটবে, এ ভেবেই সুখী সে। তাকে কি বলবে চমৎকার রেশমি শাড়ির কথা, সোনার অলংকারের কথা, পরে সে কোনওদিন শহরেও যেতে পারে বায়োস্কোপ দেখতে। তার পা দুটো কোনওদিন জুতো ছুঁয়ে দেখেনি, তাকে কি বলবে রঙিন রঙিন জুতোর কথা! তাকে কি রকমারি প্রসাধনীর গন্ধ শোঁকাবে! নাকি সুখেই থাকবে দেবে তাকে, যেভাবে আছে সে! অসুখে অভাবে আধপেটে, যেভাবে ধর্মে, কর্মে, ঝাড়ফুঁকে ধুঁকে, সুখে বালক যাচ্ছে আরও বালকের সঙ্গে বিলে ঝাঁপাতে, গামছায় ট্যাংরা পুঁটি ধরতে, সুখে তিরতির কাপে সে। তাকে কি বলবে জামা জুতো পরে ইশকুলে যাবার কথা যেন ইশকুল কলেজ পাশ দিয়ে বড় বড় জজ ব্যারিস্টার হয়! বালক হাডুডু খেলেই সুখী, তাকে কি স্বপ্ন দেখাবে কমপিউটারে টুম রাইডার খেলার!
তাকে কি পরাতে চাও তোমার কাপড় যে কাপড় পড়ে নিজেকে তুমি সভ্য ভাবছ?
তাকে কি পড়াতে চাও সেই বই যে পড়ে তুমি ভাবছ শিক্ষিত তুমি?
নাকি তাকে তার মত সভ্য থাকতে দেবে, তার মত সুখী।
তার মত গাইতে দেবে তার গান, দেখতে দেবে তার নিজের স্বপ্ন।
স্রষ্টা
ইতর প্রাণী বানাতে চাও বানাও
চতুর প্রাণী নয়
ইতরের বেলা যত টাকা লাগে নাও,
চতুর ভুলে যাও।
ঈশ্বর আছে থাক
মানুষ চাক বা না চাক
চতুর বানালে ফতুর হবে সে
যাকেই বানানো যাক ভাল বেসে বা না বেসে।
তৃষ্ণা
বেঁচে থাকলে মনে হয় বেঁচে থাকব অনন্তকাল
অনন্তকাল হাসব খেলব, ঘর বানাবো, দোর সাজাবো, কাউকে কাউকে ভালবাসব
সময় তো আছে বাসব ক্ষণ,
আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায় জল আর কত জলের চেয়ে বেশি তরল সময়।
জীবন যত না ওঠে, নামে ধাপে ধাপে
বড় হতে হতে, বুড়ো হতে হতে, উচ্চ রক্তচাপে
নিশ্ছিদ্র জীবনেও অলক্ষ্যে ঢুকে যায় হঠাৎ কোনও বেজন্মা মৃত্যু
অনন্তকালের তৃষ্ণা থেকে যায়, অনন্তকাল থেকে যায়।
হৃদয়
আমার হৃদয় আছে মাথায়, হৃদপিন্ড বুকে
হৃদপিন্ড রক্ত ধরে, হৃদয় ধরে স্নায়ু
কাউকে যদি ভালবাসি, স্নায়ুর কাছে খবর যায়,
স্নায়ুই পাঠায় সুখবরটি সর্বত্র
চোখের তারায় খবর যায়,
হৃদপিন্ডে খবর যায়
অলিগলির গ্রন্থিতে যায়।
অন্ত্র জানে, বৃহদন্ত্র জানে
মাংসপেশি ত্বক জানে
এমনকি যৌনাঙ্গ জানে—
পুরো শরীর খবর জানে কাউকে আমি ভালবাসি,
যাকে বাসি সেই জানে না।
কনিকার গানগুলি
বিষম মেতে থাকি এরিক ক্ল্যাপটনে
ব্লুজ, জ্যাজ, সোল, কান্ট্রি শেষ করে এসে রক এন রোলে।
ব্রুস স্প্রিন্সটিনের সঙ্গে গাইতে থাকি, নাচি
ট্রেসি চ্যাপম্যানে মন দিই,
ইদানিং কে কি গাইছে, কে কেমন এসব নিয়ে গড়াতে থাকি ঝকমকে পাথর
গড়াতে গড়াতে শ্বাসকষ্ট হয়, রক্ত শীতল হতে থাকে পশ্চিমি হাওয়ায়,
আমাকে ফিরতে হয় রবীন্দ্রনাথে, কণিকার গানে,
গানগুলি আমাকে বাঁচায়।
দিনগুলি রাতগুলি
দিনের কোনও আলো, রাতের কোনও নিবিড় আঁধার
কোনও সুখ কোনও দুঃখ আমাকে স্পর্শ করে না আর।
সূর্য উদয় হয়, অস্ত যায়
পূর্ণিমা যায় আসে, শুনি
কেবল শুনিই—জন্মান্ধের মত শুনি।
একটি ঘাসের ডগার পতন
আর একটি জলজ্যান্ত মানুষের—আমাকে একই শোক দেয়।
একই রকম মূহ্যমান থাকি অনাবৃষ্টিতে, বৃষ্টিতে, অতিবৃষ্টিতে
একই রকম মৃত্যুতে, সৃষ্টিতে।
রাতগুলির পাঁজরে দিনগুলি সেঁধিয়ে যাচ্ছে
দিনগুলির মস্তিস্কের কোষে কোষে রাতগুলি
রাতগুলির রক্তে দিনগুলি
আলাদা করতে পারি না দিনগুলি রাতগুলি
জীবিতকে পারি না মৃত থেকে
মৃতকে জীবিত থেকে।
আমাকে পারি না এক জীবন দুঃখ থেকে।
মৃত্যুভয়
মৃত্যুকে অস্বীকার করতে নানারকম ঈশ্বরের গল্প ফেঁদেছে মানুষ
পূনর্জন্ম ঘটবে একদিন
অবিনশ্বর আত্মারা যার যার শরীর ফিরে পাবে একদিন না একদিন।
মৃত্যুভয়ে মানুষ এতই কাতর,যে করেই হোক সান্ত্বনা চায়, এই জীবনের পরও আরও একটি জীবন আছে,
দীর্ঘ দীর্ঘ দীর্ঘতর জীবন আছে, না ফুরোনো জীবন আছে,
বেঁচে থাকা বুঝি এমন নিমেষে নিঃশেষ হয়! আরও বেঁচে থাকা আছে
আরও খাদ্য পানীয়, আরও সঙ্গম, আরও সুখ।
এইপারে কষ্ট আছে থাক, ওইপারে রঙ্গ যাদু, ওইপারে সর্বসুখ
এই ভেবে পৃথিবীর লক্ষকোটি মানুষ এ পারের কষ্ট সয়ে যায়,
ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই যার,
একটি স্বল্পায়ু জীবনই সম্বল তার, একটি জীবনই সে পায় আগাগোড়া যাপন করার,
তাকে সব পেতে দাও যা কিছু সম্ভব পাওয়ার।
খাবার-জল
আস্ফালন করছ রাগে
প্রতিবেশি দেশ উড়িয়ে দেবে তো বোমায়, সে দাও, আমাকে খাবার-জল দাও আগে।
মঙ্গলগ্রহে যেতে চাইছ যাও, খাবার-জল দিয়ে যাও
পচা পুকুরের জল খেয়ে আছি, বৃষ্টিজল খাব, বর্ষা এসে নিক,
কুয়োর বা জলের কলের যে জলই মুখে নিই, জলে আর্সেনিক।
মঙ্গলগ্রহে মঙ্গল হোক তোমার, আরও পারো যদি আরও গ্রহে যাও
আমার নাম ঠিকানা নাও, নাম ফুল্লরা বিবি
সাকিন হরিণপুর, জেলা ফরিদপুর, দেশ বাংলাদেশ, গ্ৰহ পৃথিবী।
দুর্নীতি
সমাজের একশ রীতি
ঢংএর একশ রীতি
পালনেই গেছে যতটা বয়স ছিল তার চেয়ে বেশি।
শিখেছি নীতির কথা, একশ নীতি
ঘর থেকে বেরোলেই বোধিবৃক্ষ
তলে পড়ে থাকে পচা নীতি, ঝুলে থাকে পাকা টসটসে দুর্নীতি
লোক ধায়
হন্যে হয়ে দুর্নীতি পেড়ে খায়।
পূর্ব পশ্চিম
মারগটের বাগান দেখলে আমার মায়ের বাগানটির কথা মনে পড়ে,
আমার মায়ের বাগানও ছিল এরকম
সুগন্ধী ফুলের গাছ, সুস্বাদু ফলের, সবজির
আমার মা যেমন গাছের গোড়ায় জল ঢালতেন, মারগটও ঢালে তেমন।
মারগটের বাগানে চারটে আপেল গাছ, ছোট্ট একটি পুকুর-মত, ওতে পদ্ম ফোটে
আরও একটি বাড়তি জিনিস আমার মার বাগানে ছিল না,
সূর্যঘড়ি।
মার কখনও সময় দেখা হয়নি, মার সময় উড়ে গেছে হাওয়ায়
মার দিনগুলো গেছে, এভাবেই বছরগুলো।
মারগট বাগান করে মারগটের জন্য
আমার মা বাগান করতেন অন্যের জন্য
একটি ফুলের ঘ্রাণও তিনি নিতেন না, একটি ফলের স্বাদও
একটি সবজিও মুখে তুলতেন না।
আমার মা অন্যের জন্য নিজের জীবন যাপন করতেন, নিজের জন্য নয়।
মারগট নিজের জন্য ঘর করে, নিজের জন্য বাগান, নিজের জন্য পদ্ম ফোটায় ও,
মারগটের স্বামী সন্তান সব আছে, মার যেমন ছিল।
মারগট নিজের জন্য বাঁচে, মা নিজের জন্য বাঁচেননি।
ও মেয়ে
নিজেকে প্রথম ভালবেসো মেয়ে তারপর বেসো সুশান্তদাকে
সামলে রেখো যা আছে নিজের, সামলে রেখো জোছনাকে
সহস্ৰ হাত এগোচ্ছে লোভে এগোক, হৃদয় তুমি যখন তখন দিওনা যাকে তাকে।
ফুরিয়ে গেলে তোমাকে ওরা একফোঁটা দেবে না
হাতগুলো যত নেবার বেলায়, দেবার বেলায় তত নয়,
ও মেয়ে তুমি যত্রতত্র দিও না পরিচয়।
যতই করুক সুশান্ত পালেরা নর্তন কুর্দন
বাঁকা হাসিটির রহস্য ভেঙো না, ওটিই তোমার যাকে বলে যক্ষের ধন।
নিজেকে প্রথম ভালবেসো মেয়ে, তারপর বেসো অন্যকে
আগে দেখে নিও যা আছে তার সব দেবে তোমার জন্য কে।
কাঁপন ১১
আর কাঁপি না আগের মত তীব্র কোনও যৌনতায়
আকাশ দেখি দুচোখ ভরে অসম্ভব মৌনতায়।
কাঁপন ১২
এত হা পিত্যেশ বল কিসে
এলি তো সবে চল্লিশে
জীবন বাকি অর্ধেকই, ভালবাসি চল দেখি।
কাঁপন ১৩
চল্লিশে এসে নারীর শরীর পূর্ণতা পায় বেশি
কুপোকাত করে এক নিমেষেই বিদেশি কী দেশি পেশি।
নমঃশুদ্র
আমি ক্ষুদ্র
নমঃশুদ্র
আমাকে ছুঁসনে তোরা
ছুঁয়ে নোংরা করিসনে হাত,
বড় জাত।
আমি নারী
পাপাচারি
ছুঁলে নষ্ট হবি নির্ঘাত।
দুবেলা আমার চাই ভাত,
আমার পাকা ধানে মই দিসনে তোরা
তোরা বড় বড় ঘোড়া,
ক্ষিদে লাগলে অন্ন কেন, জাত খা না,
করেছে কে মানা?
তোরা ব্রাহ্মণ, তোরা ক্ষত্রিয়, তোরা বৈশ্য
তোরা বড় জাত, আমি ছোটজাত, অস্পৃশ্য
তোরা আকাশে, আমি পাতালে
তোরা ভুলে যাস ভাই পাতালে
আমি কাদাজলে তোরা চাতালে।
তোরা ভাল জাত, তোরা বড় জাত
আমি ইতর গিধড় বন্য
তোরা জ্ঞানী গুণী, মান্য গণ্য।
তোরা মহীয়ান, তোরা ভগবান,
আমি মানুষের মত দেখতে, আসলে মানুষ নই
তোরা মানুষের জাত, দিসনে আমার পাকা ধানে কোনও মই।
জয় গোস্বামী
ওই যে যাচ্ছে কাবেরীর স্বামী জয় গোস্বামী
তাকে চিনি আমি।
চুল থেকে পায়ের নখ অবদি সে কবি
অদ্ভুত সন্ন্যাসী
মনে মনে তাকে ভালবাসি, নাশি।
টাঙানো আছে তার ছবি
তার উদাস উদাস সবই
মনে,
গহন বনে
বসে তাকে ভাবি
একবার যদি পাই তার গোপন ঘরের চাবি।
লোকালয়ে যাব না জয়,
বড় ভয়।
অরণ্য ঢের ভাল
জমকালো।
পাতায় পাতায় কবিতা ছড়ানো
গানও,
তুমি মানো?
তবে চলে এসো, শুকনো পাতায় শুয়ে কবিতা কবিতা খেলি,
হৃদয় মেলি।
মায়ের কাছে চিঠি
কেমন আছ তুমি? কতদিন,কত সহস্ৰ দিন তোমাকে দেখি না মা, কত সহস্র দিন তোমার কন্ঠ শুনি না,
কত সহস্ৰ দিন কোনও স্পর্শ নেই তোমার।
তুমি ছিলে, কখনও বুঝিনি ছিলে।
যেন তুমি থাকবেই, যতদিন আমি থাকি ততদিন তুমি—যেন এরকমই কথা ছিল।
আমার সব ইচ্ছে মেটাতে যাদুকরের মত। কখন আমার ক্ষিধে পাচ্ছে, কখন তেষ্টা পাচ্ছে, কি পড়তে চাই, কী পরতে, কখন খেলতে চাই, ফেলতে চাই, মেলতে চাই হৃদয়, আমি বোঝার আগেই বুঝতে তুমি।
সব দিতে হাতের কাছে, পায়ের কাছে, মুখের কাছে। থাকতে নেপথ্যে।
তোমাকে চোখের আড়ালে রেখে, মনের আড়ালে রেখে যত সুখ আছে নিয়েছি নিজের জন্য। তোমাকে দেয়নি কিছু কেউ, ভালবাসেনি, আমিও দিইনি, বাসিনি।
তুমি ছিলে নেপথ্যের মানুষ। তুমি কি মানুষ ছিলে? মানুষ বলে তো ভাবিনি কোনওদিন,
দাসি ছিলে, দাসির মত সুখের যোগান দিতে।
যাদুকরের মত হাতের কাছে, পায়ের কাছে, মুখের কাছে যা কিছু চাই দিতে, না চাইতেই দিতে।
একটি মিষ্টি হাসিও তুমি পাওনি বিনিময়ে, ছিলে নেপথ্যে, ছিলে জাঁকালো উৎসবের বাইরে নিমগাছতলে অন্ধকারে, একা। তুমি কি মানুষ ছিলে! তুমি ছিলে সংসারের খুঁটি, দাবার ঘুটি, মানুষ ছিলে না।
তুমি ফুঁকনি ফোঁকা মেয়ে, ধোঁয়ার আড়ালে ছিলে, তোমার বেদনার ভার একাই বইতে তুমি, তোমার কষ্টে তুমি একাই কেঁদেছ। কেউ ছিল না তোমাকে স্পর্শ করার, আমিও না।
যাদুকরের মত সারিয়ে তুলতে অন্যের অসুখ বিসুখ, তোমার নিজের অসুখ সারায়নি কেউ, আমি তো নইই, বরং তোমাকে, তুমি বোঝার আগেই হত্যা করেছি।
তুমি নেই, হঠাৎ আমি হাড়েমাংসেমজ্জায় টের পাচ্ছি তুমি নেই। যখন ছিলে, বুঝিনি ছিলে। যখন ছিলে, কেমন ছিলে জানতে চাইনি। তোমার না থাকার বিশাল পাথরের তলে চাপা পড়ে আছে আমার দম্ভ।
যে কষ্ট তোমাকে দিয়েছি, সে কষ্ট আমাকেও চেয়েছি দিতে, পারিনি। কি করে পারব বল! আমি তো তোমার মত অত নিঃস্বার্থ নই, আমি তো তোমার মত অত বড় মানুষ নই।
ভালবাসা টালবাসা
বসে থাকো পাশে অথবা মুখোমুখি
চোখে চোখ রাখতে পারো, না রাখলেও চলে
হাতে হাত রাখার কথা হচ্ছে না, কাঁপা আঙুলের কথাও নয়
হাতের ভেতর ভিজে ওঠা স্যাঁতসেঁতে হাত
আর ঢোক গিলে গিলে ভালবাসা টালবাসার কথা তো নয়ই।
বসে থাকো কেবল, চোখ যদি বিরক্ত করে বাদ দাও দূরেই বস
এমন দূরে যেন চাইলে তোমাকে দেখি, তোমার চুল চোখ চিবুক,
তোমার চোখের পাতা কাঁপছে কি না
ভুরুতে ভুরুতে ঠোকর লাগছে কি না
ঠোঁটের গালে লাগছে কি না কামড়—দেখি
যেন দেখি তোমার মত দেখতে তুমি আছ ওখানে
যেখানে বসে আছো, দূরে কিন্তু তত দূরে নয়
হাতের নাগালে না হোক চোখের নাগালে আছো।
এর চেয়েও দূরে যেতে ইচ্ছে কর যদি যেও
না হয় ছায়াটুকুই রেখে যেও
ছায়ার সঙ্গে রাত কাটাবো আপত্তি কি?
ছায়ার হাতটি হাতে নিয়ে শূন্যে ওড়া
কয়েক লক্ষ তারার সঙ্গে বৌচি খেলা
আর ভোর হল যেই আকাশ থেকে গায়ের ভেতর গা ধপাস করে পড়া!
চাঁদের আলোয় চুলে চুলে চুমোচুমি হয়, তবু ভালবাসা টালবাসার কথা ছায়ার সঙ্গে হয় না, তোমার সঙ্গে তো নয়ই।
পারো যদি বসে থেকো পাশে,
পাশে না হোক মুখোমুখি
মুখোমুখি না হোক দূরে
বসতে ইচ্ছে না হয় শুয়ে থেকো, দাঁড়িয়ে থেকো
তবু থেকো।
দূরে গেলেও ফিরে এসো,
তবু এসো, থেকো
চোখে না চাও, থেকো
কথা না বল, থেকো
নৈঃশব্দই থাক, তবু তো সে থাকা, এ তো তোমারই নৈঃশব্দ।
ভালবাসা টালবাসা ফালতু জিনিস, ওসবে রুচি নেই তোমার
ভাল না বাসো, তবু থাকো।
ঘৃণা যদি কর, কর। তবু থাকো।
মা
মা কাঁপছেন শীতে, কেউ একটি লেপ পৌঁছে দিচ্ছে না মাকে,
মা’র ক্ষিদে পাচ্ছে, কেউ কোনও খাবারও খেতে দিচ্ছে না,
অন্ধকার গর্তে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে মার
একটু আলো পেতে, হাওয়া পেতে, শুকনো জিভে একফোঁটা জল পেতে
কাতরাচ্ছেন মা, বেরোতে চাইছেন,
কেউ তাঁকে দিচ্ছে না।
মা ছিল মাটির,
জ্যান্ত মানুষগুলো পাথর দিয়ে গড়া।
মা তুমি একটি পাখি হয়ে এই পাথুরে পৃথিবী ছেড়ে
অন্য কোনও গ্রহে কোনও পাখির দেশে চলে যাচ্ছ না কেন!
তোমার সঙ্গে দেখা হবে না আমার, নাহোক। তবু জানব তুমি ভাল আছ।


Leave a Reply