কিশোর কবিতা

কিশোর কবিতা
হুমায়ুন আজাদ

শুভেচ্ছা

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
 ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা
 ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা
ভালো থেকো চর, ছোটো কুঁড়েঘর, ভালো থেকো।
 ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির
 ভালো থেকো জল, নদীটির তীর
 ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।
 ভালো থেকো কাক, ডাহুকের ডাক, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাঁশি
ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি
ভালো থেকো আম, ছায়াঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।
ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল
ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল
ভালো থেকো নাও, মধুমাখা গাও, ভালো থেকো।
 ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।

*

কখনো আমি

কখনো আমি স্বপ্ন দেখি যদি
স্বপ্ন দেখবো একটি বিশাল নদী।
নদীর ওপর আকাশ ঘন নীল
নীলের ভেতর উড়ছে গাঙচিল।
 আকাশ ছুঁয়ে উঠছে শুধুই ঢেউ
 আমি ছাড়া চারদিকে নেই কেউ।
কখনো আমি কাউকে যদি ডাকি
ডাকবো একটি কোমল সুদূর পাখি।
পাখির ডানায় আঁকা বনের ছবি
চোখের তারায় জ্বলে ভোরের কবি।
 আকাশ কাঁপে পাখির গলার সুরে
 বৃষ্টি নামে সব পৃথিবী জুড়ে।

*

স্বপ্ন

যখন আমি দাঁড়িয়ে থাকি     অথবা পাখির ছবি আঁকি
কিম্বা বই পড়ি,
যখন বনে বেড়াতে যাই    গোশলখানায় কবিতা গাই
অথবা কাজ করি,
 যখন আকাশ মেঘে ভরে    আমার মন কেমন করে
একলা বসে লেখি,
 চারদিকে সোনার মতো    ছড়িয়ে থাকা ইতস্তত
কেবল স্বপ্ন দেখি।
ওই যে মানুষ নৌকোগুলো    পথের ওপর রঙিন ধুলো
ফুলের শোভা গাছে,
বিশাল একটা চাঁদের তলে    ধানের পাতায় শিশির জ্বলে
নর্তকীরা নাচে!
যেনো তাদের ডাকছে কেউ    তাই তো আসে শ্যামল ঢেউ
দুলে পুকুর পাড়ে,
আমার স্বপ্ন গোলাপ ডালে    সকাল দুপুর সন্ধ্যাকালে
দীর্ঘ গ্রীবা নাড়ে!
আমার স্বপ্ন বাসে ওঠে    ট্রাকের চাকার সঙ্গে ছোটে
বিমান হয়ে ওড়ে,
আমার স্বপ্ন ফেরিঅলা    উচ্চস্বরে ফুলিয়ে গলা
শহর ভরে ঘোরে। 
আমার স্বপ্নে হাজার গন্ধ    একশো একুশ রকম ছন্দ
পাঁচশো পঁচিশ রং,
আমার স্বপ্ন গ্রামের মাঝে    রাত দুপুরে হঠাৎ বাজে
ডিং ডং ডিং ডং।
অন্য সবাই ঘুমিয়ে পড়ে    স্বপ্ন দেখে ঘুমের ঘোরে
মাথা রেখে মেঘে,
শুধুই আমি একলা আমি    সকাল সন্ধ্যা দিবসযামি
স্বপ্ন দেখি জেগে।
আমি শুধুই ভয়ে মরি যদি আমি ঘুমিয়ে পড়ি
স্বপ্নদের কী হবে,
যদি কোনো দস্যু এসে    ভাঙে আমার স্বপ্নকে সে
বাঁচবো কেমনে তবে?
এই পৃথিবী এত মধুর   তার গলাতে এতো যে সুর
শুনি এ-বুক ভরি,
 তাই তো আমি রাত্রি ও দিন    জেগে থেকে নিদ্রাবিহীন
স্বপ্ন রক্ষা করি।

*

ধুয়ে দিলো মৌলির জামাটা

আষাঢ় মাসের সেদিন ছিল রোববার ও মাস পয়লা
তাকিয়ে দেখি দূরের আকাশ ভীষণ রকম ময়লা।
পুব দিকটা মেঘলা রঙের বুকের পাশটা কালচে
পায়ের দিকটা কুঁচকে গেছে একটুকু নয় লালচে।
ধুলোর তলে হারিয়ে গেছে চোখের মতোন নীলটা
দেখাই যায় না টিপের মতো টুকটুকে লাল তিলটা।

 আকাশ নয় রে মৌলির জামা তৈরি নরম সিল্কে
দিনভর মৌলি পরেছে বলেই দেখাই যায় না নীলকে!
 নীল জামাটা ময়লা এখন এ তো মৌলির দোষ না
হঠাৎ আকাশে একটা সাবান উঠলো ছড়িয়ে জোস্না।
আকাশে সাবান ধবধবে গোল দুধের মতোন মিষ্টি
নামলো ঝরঝর নরম নরম রুপোর রঙের বিষ্টি।
চাঁদের সাবান মেখে মেখে ফরশা রুপোর পানিতে
মৌলির জামা ধুয়ে দিলো সাতটি পরীর রানিতে!

 ভোর হতেই দেখলো সবাই ঝিলমিলঝিল বাতাসে
নীল জামাটা আকাশ ভরে উড়ছে বিরাট আকাশে।
 সিল্কে তৈরি নীলকে জামা কেমন মিষ্টি নীলটা
পুবের দিকে উঠছে হেসে টুকটুকে লাল তিলটা।

*

ফাগুন মাস

ফাগুনটা খুব ভীষণ দস্যি মাস
পাথর ঠেলে মাথা উঁচোয় ঘাস।
হাড়ের মতো শক্ত ডাল ফেড়ে
সবুজ পাতা আবার ওঠে বেড়ে।
সকল দিকে বনের বিশাল গাল
 ঝিলিক দিয়ে প্রত্যহ হয় লাল।
বাঙলাদেশের মাঠে বনের তলে
ফাগুন মাসে সবুজ আগুন জ্বলে।

ফাগুনটা খুব ভীষণ দুঃখী মাস
 হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস।
 ফাগুন মাসে গোলাপ কাঁদে বনে
কান্নারা সব ডুকরে ওঠে মনে।
ফাগুন মাসে মায়ের চোখে জল
ঘাসের ওপর কাঁপে যে টলমল।
ফাগুন মাসে বোনেরা ওঠে কেঁদে
 হারানো ভাই দুই বাহুতে বেঁধে।
ফাগুন মাসে ভাইয়েরা নামে পথে
 ফাগুন মাসে দস্যু আসে রথে।
ফাগুন মাসে বুকের ক্রোধ ঢেলে
ফাগুন তার আগুন দেয় জ্বেলে।
বাঙলাদেশের শহর গ্রামে চরে
 ফাগুন মাসে রক্ত ঝরে পড়ে।
ফাগুন মাসে দুঃখী গোলাপ ফোটে
 বুকের ভেতর শহিদ মিনার ওঠে।

সেই যে কবে কয়েকজন খোকা
 ফুল ফোঁটালো–রক্ত থোকা থোকা
 গাছের ডালে পথের বুকে ঘরে
 ফাগুন মাসে তাদের মনে পড়ে।
সেই যে কবে–তিরিশ বছর হলো
ফাগুন মাসের দু-চোখ ছলোছলো।
বুকের ভেতর ফাগুন পোষে ভয়
তার খোকাঁদের আবার কী যে হয়!

*

দোকানি

দু-দিন ধরে বিক্রি করছি
চকচকে খুব চাঁদের আলো
টুকটুকে লাল পাখির গান,
 জাল ছড়িয়ে আস্তে ধরছি
 তারার ডানার মিষ্টি কালো
ঝকঝকে সব রোদের ঘ্রাণ।

বিক্রি করছি চাঁপার গন্ধ
 স্বপ্নে দেখা নাচের ছন্দ
গোলাপ ফুলের মুখের রূপ,
একশো টাকায় এক রত্তি
বিক্রি করছি সত্যি সত্যি
সবুজ রঙের নরম ধূপ।

চাঁদে চড়ে ভর নিশিতে
 জ্যোৎস্না ভ’রে ছোটো শিশিতে
বানাই ঠাণ্ডা আইসকিরিম,
টোস্টে একটু রৌদ্র মেখে
বিক্রি করছি টাটকা দেখে
মেঘ-রৌদ্রের সিদ্ধ ডিম।

বিক্রি করছি সন্ধ্যা রাত্রে
চকচকে এক রুপোর পাত্রে
জ্যোৎস্না-ডাবের মিষ্টি জল,
সবার যাতে সময় কাটে
 ছুঁড়ে দিয়েছি আকাশ-মাঠে
একটি শাদা রবার বল।

বিক্রি করছি রাশি রাশি
 লাল গালের মিষ্টি হাসি
পরীর গায়ের সিল্কশাড়ি,
জোনাকিদের দেহের মতো
করছি বিক্রি শতো শতো
ইস্টিমার ও ঘরবাড়ি।

ইকড়িমিকড়ি চামচিকড়ি
 হচ্ছে এখন ভীষণ বিক্রি
নীল ময়ূরের লাল ছবি,
 শিশির-ভেজা মিনার থেকে
এসব ছবি দিচ্ছে এঁকে
ডানাঅলা এক কবি।

*

ইঁদুরের লেজ

বিলেত থেকে একটি ইঁদুর ঠোঁটে মাখা মিষ্টি সিঁদুর, বললো এসে
মুচকি হেসে চুলের ফাঁকে আস্তে কেশে,
আমাকে কি চিনতে পারো?
চিনতে আমি পারি তারে, দেখে
ছিলাম লেকের পারে: মুখখানা তার
 শুক্রবারে, পা-দুখানা রোববারে।
ইঁদুর সে খুব রূপবতী গায়ের চামড়া
 দুধেল অতি, হাসলে ঠিক সোনার
 মতো জ্যোৎস্না বেরোয় শতোশতো
জানি আমি জানি নিজে, পাশ
করেছে ক্যামব্রিজে একটা ভীষণ
 পরীক্ষাতে শনিবার সন্ধ্যা
 রাতে। বলি আমি তারে ডেকে,
এসেছো তুমি বিলেত থেকে কী
কারণে? ঝিলিক দিয়ে রঙিন
অতি হাসলো একটু রূপবতী,
বললো, আমি আ-শি-আ-ছি
বাংলাড্যাশে অ-পা-রে-শ-নে!
লেজটি যদি ছাঁটতে পারি
তা হলে তো সারিসারি
 জুটবে রাজা। এসেছি
তাই বাংলাদেশে।
চমক শেষে চক্ষু
 মেলে দেখি
আমি, রূপ
বতী গেছে
আমার
সামন্র
তার
লেজটি
ফে
লে।

*

স্বপ্নের ভুবনে

ফিরে এসো সোনার খোকন সারাক্ষণ চুপি চুপি ডাকে
স্বপ্নের ভেতর থেকে গাঢ় স্বরে কে যেনো আমাকে।
তার ডাকে আমার ভেতরে বাজে টুংটাং হীরের গিটার
সারা মন ঢেকে দেয় মায়াবী রঙের পাখি ডানা দিয়ে তার।

কে তুমি আমাকে ডাকো রাশিরাশি কাজের ভেতরে
কোথা থেকে দাও ডাক সোনাঝরা লাল নীল স্বরে?
তোমার পালক ঢাকে আমার শরীর মুখ আঁকাবাঁকা চুল
 রামধনু উড়ে এসে ছুঁড়ে দেয় রাশিরাশি রঙিন পুতুল।
আমি তারে বলি–কে তুমি ডাকছো হয়ে এতো স্নিগ্ধ লাল?
আস্তে বললো সে–আমি, আমি তো তোমার বাল্যকাল।

তার স্বরে আমার ঘরের জানালারা হয়ে গেলো গাছ
 ঘরটাকে নদী ভেবে বইগুলো হয়ে গেলো মাছ,
দেয়ালের ঘড়িটিতে ডেকে ওঠে দশটি মধুর কোকিল,
আয়নায় দুলে ওঠে শাদা পদ্ম, শাদা আড়িয়ল বিল।
 পাখি সব করে রব, খড়কুটো মেঠো ঘাস গেয়ে ওঠে গান,
খেলাঘরে খেলা করে ছেলেবেলা একরাশ স্বপ্নের সমান।
 আমি বলি, ভোলো নি আমাকে তুমি সোনার পাখি?
কবুতর গেয়ে ওঠে : তা তো সহজ নয় তুমি জানো না কি?
আমি বলি তোমরা কেমন আছো তোমরা সবাই?
নেচে ওঠে ইলশে : ভালো আছি, আজ আমরা তোমাকেই চাই।

রূপোলি শিশির হয়ে গলে যেতে চায় চারতলা বাড়ি
আমাদের, কানামাছি ভোঁ ভোঁ চলে নিচ ঘরে, ছাদে আড়ি
 পাতে কোমল কুয়াশা, বুক ভরে জোনাকিরা জ্বলে আর নেভে
তারা আজ রাতে সারাদেশে লাল নীল আলো জ্বেলে দেবে।

তোমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি আমরা–গান গায় চিল,
আমার সোনালি ডানা দেখো তুমি সোনালি রুপোলি, খয়েরি ও নীল
তোমার জন্যে। বেহালা শোনাবো আজ, স্বপ্নের মতো রূপকথা
শোনাবো তোমাকে যাদের এসেছে ফেলে সেই পাতালতা।
আবার হিজল ফুল লাল হবে যদি তুমি আজ আসো ফিরে
গান হবে নদীতীরে কাশবনে টুপটাপ নিশির শিশিরে।

আমাকে ডাকলো এসে আমারই বাল্যকাল আজ রাতে
যখন কোমল হ’য়ে গলা বাড়িয়েছে চাঁদ এই আঁধার ঢাকাতে
একটি শিশুর জন্যে। আমাকে দেখেই দিলো মিষ্টি হাতছানি
সবচে রূপসী যিনি সেই আলোঢালী মায়াবতী আকাশের রানী।
তখন শহর ভ’রে অন্ধ লোকেরা সব পথে হাটে বাটে
 ভীষণ খুশিতে ফুল ছিঁড়ে দুই হাতে ভাঙে ডাল আর গাছ কাটে।
নিঃশব্দ ব্যথায় কাঁদে গাছ হাহাকার করে ওঠে রাত
গাছের শরীর ফাড়ে মানুষেরা দুই হাতে ধারালো করাত।

চলো আমি যাবো তোমাদের সাথে বলি কেঁদে আমি।
একটি সোনালি চিল বকুলের মালার মতোই এলো নামি
আমার গলায়। বললো সে মনে তুমি রেখো না কো ভয়,
 তোমাকে উড়িয়ে নেবো আমার ডানায়। আকাশকে জয়
করে বেঁচে আছি আমি। চিলের ডানায় আমি ও আকাশ
আমাদের সাথী হয় নীল মেঘ রোদ আর নরম বাতাস।

আবার ফিরেছি আমি বাল্যকালে, প্রিয় বন্ধুরা সবাই
আসে নাচে গান গায় ছড়া কাটে নাচে তাই-তাই।
আমি ইলিশ পদ্মার।
আমি মাছরাঙা।
বাকুম বাকুম আমি কবুতর।
তোমার খেলার মাঠ আমি।
আমি তোর আনন্দের স্বর।
 আমি ঘুড়ি লাল রঙ।
আমি মারবেল।
আমি তোর বাঁশের লাটাই।
 তুই নেই পড়ে আছি কী যে কষ্টে সময় কাটাই।

আমার বন্ধুরা ছুটে আসে তুলে নেয় সকলের কাঁধে,
আমার শৈশব নদীর জলের মতো বয়ে চলে উল্লাসে অবাধে।
দলে দলে আসে, চার দিকে জমে ওঠে ছবি আর ছবি,
গুনগুন গান গেয়ে আসেন আমার আদিমহাকবি
 জীবনের। গান গান বাজিয়ে একতারা :
শোনো ভাই আছে যারা    আমি আজ নিজহারা
নদীর মতোন,
অনেক রজনী জেগে    পাখিদের বর মেগে
করেছি সৃজন
 একটি মায়াবী গাথা    মায়ের নকশী কাঁথা
অতি অপরূপ,
বাঁশির সুরের সাথে    জ্বেলে দাও এই রাতে
সোনারঙ ধুপ।
ফুটুক গানের ফুল   সকল গাছের মূল
জ্বেলে দিক সুর,
জোনাকিরা গাছে গাছে    ফুল হয়ে ফুটে আছে
অত্যন্ত মধুর।
 তোমাকে অনেক দিন    দেখি নাই চোখহীন
হয়ে আছি তাই,
তুমি এলে বাঁশি বাজে    মনের বনের মাঝে
বেজে ওঠে একতারা বেহালা সানাই।

আমার শৈশব বাজে বাঁশবনে ধানক্ষেতে নদীর কিনারে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাশবনে শাদা চাঁদ মেঘের মিনারে
 পুকুরের আয়নায় শাপলা কলমি পদ্মের ডাঁটায়
আকাশের নদী আর তারাদের জোয়ার ভাটায়
হিজলের ফুলে চিল বক মাছরাঙা ডাহুকের ডাকে
মাছেদের লাফে লাফে ছেলেবেলা ডাকছে আমাকে।

রুপোলি ইলিশ এসে ধরে হাত, আমরা দুজন
দাঁড় বেয়ে চলে যাই যেইখানে থেমে আছে স্বপ্নের ভুবন।
পদ্মার ঢেউয়ের তলে রুপোর দাগের মতো সারিসারি
 থাম দিয়ে ছবি এঁকে কারা যেনো বানিয়েছে বাড়ি।
একটি বাড়িতে দুটি হাঁস ছড়া কাটে আগডুম বাগডুম
 ছাদের ওপরে শাদাশাদা নীল নীল বাকুম বাকুম।
বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি রিংয়ে দোলে এক জোড়া মাছ
 হাততালি দিয়ে হরিণের পিঠে উঠে দেখায় সার্কাস।
 ভেসে উঠি জল থেকে, খেজুরের ডালে বসে একটি বাবুই
 চোখের মতোন বাসা বুনে চলে ঠোঁটে নিয়ে সুতো সুই।

হঠাৎ দেখি
উড়ছে তারা
রোদের মধ্যে
ধুলোর মতো
চাঁদের থেকে
নামছে পরী
নূপুর বাজে
শত শত।

 মেঘের মতো  আসছে ছুটে  কাশের শাদা  ফুলের মালা
মাঝ নদীতে  লাফিয়ে ওঠে  একটি বিরাট  রঙের থালা।
আকাশ ছুঁড়ে  বাড়তে থাকে  বলের মতো  তালের মাথা
জ্যোৎস্নাবুড়ি  বিছিয়ে দিলো  তারায় গাঁথা  নকশী কাঁথা।

খোকন তোমার কেমন লাগছে–আমাকে শুধায় পাখি।
 দেখছি আমি ছায়াছবি, আমিও উঠি তারই মতোন ডাকি।
 ধীরে এসে কাছে সে কেমন চোখ মেলে নীরবে তাকায়।
জানতে চায় ফিরে যেতে চাও আর হিংসুটে ঢাকায়?
যেইখানে মানুষেরা গাছ কাটে দুই হাতে ছিঁড়ে ফেলে ফুল,
মল্লিকা হাস্না নেই, গন্ধরাজ চম্পা আর নেই কো শিমুল?
যেখানে শিশুরা পাখির মধুর ডাক রেডিয়োতে শোনে
 কল্পনায় স্বপ্নে হাজার রকম জাল সারাদিন বোনে?

সোনালি ধানের ছড়া কথা বলে স্বপ্নের কূজন,
এতো দূরে এতো কাল রয়েছি দুজন।
আমার জবাব নেই বলি শুধু চুপে মনে মনে
 তোমাকে দেখেছি বন্ধু রঙিন টেলিভিশনে।
 তোমাকে দেখার জন্যে কতো দিন ভেঙে গেছে বুক
তোমাকে দেখার জন্যে বুক জুড়ে গভীর অসুখ।

ফিরে আসি আবার ঢাকায়। দেখি ঘরের জালনায়
 দুলছে দোয়েল, বাবুই বুনছে বাসা কাঠের আলনায়।
 আয়নাটি জুড়ে নদী, কাশবন; দেয়াল ঘড়িতে
কোকিল মুখর করছে বাড়ি কুহু কুহু গীতে।
 মেঝেটা আকাশ হয়ে গেছে, ছাদখানা হয়ে আছে চাঁদ,
বাড়ির দেয়াল মেঝে মিষ্টি গন্ধ কমলার স্বাদ।
ছড়ার বইয়ের চোখে নেমে আসে রূপকথা, স্বপ্নভরা ঘুম,
দেখি আমি হাতঘড়ি পাপড়ি মেলে হয়ে আছে বনের কুসুম।

আজকাল সবাইকে ফাঁকি দিয়ে না জানিয়ে আমি মনে মনে
 গোপনে হারিয়ে যাই বাল্যকালে, কুয়াশায়, স্বপ্নের ভুবনে।

*

নদী

ঘুমিয়ে ছিলাম নীল পাহাড়ের বনে
হঠাৎ ঝিলিক লাগলো এসে মনে
 ঝরনা হয়ে কাঁপল বুকের তল
 ছলকে উঠল রুপোর মতো জল
 রোদের চুমোয় সবুজ কুঁড়ি টুঁটে
 নাম না-জানা উঠল কুসুম ফুটে
আকাশ জুড়ে জাগলো পাখির গান
 শুনতে পেলাম ঢেউয়ের কলতান
 দেখতে পেলাম ভুবনজোড়া নীল
তারার মতো উড়ছে সোনার চিল
 সাগরে যাবো সাগর অনেক দূর
 রক্তে আমার বাজলো তারই সুর
সাগরে যাবোই বলে বইছি নিরবধি
তাই তো আমার নাম হয়েছে নদী।

পাহাড়ে ছিলাম আহারে কতো কাল
দেখি নি তখন পুবের দিকে লাল
দেখি নি তখন আকাশজোড়া মেঘ
তখন আমার শরীরভরা বেগ
 এলাম যখন পাহাড় থেকে নেমে
 চলছি ধীরে আস্তে থেমে থেমে
 আমার তীরে খোঁপার মতো গ্রাম
মধুর মতো কতো যে তাদের নাম
আমার জলে এলেই জাগে গান
আমার তীরে সোনারা হয় ধান
আমার বুকে রুপোর বালুচর
শিমের মতন চাষীর কুঁড়েঘর
 বইছি আমি চলছি নিরবধি
 তাই তো আমার নাম হয়েছে নদী।

আমার বুকে তারার মতো বালি
আমার জলে ঢেউয়ের করতালি
আমার তীরে মোমের মতো গাছ
 আমার জলে মাখনভরা মাছ
 আমার তীরে কাশবনের বধু
আমার জল গোলাপ ফুলের মধু
যাবো আমি অনেক দূরে যাবো
তখন আমি তার তো দেখা পাবো
বের হয়েছি যার হৃদয়ের ডাকে
 সাগর আমার সাগরে সে থাকে
 তবুও আমি মানুষই ভালোবাসি
ঘুরে ফিরেই গ্রামের পাশে আসি
 বইছি আমি বইছি নিরবধি
 তাই তো আমার নাম হয়েছে নদী।