কণিষ্ক – ৩

কয়েকজন রক্ষীর সাময়িক অনুপস্থিতির জন্য ভট্টরাইয়ের বিশ্রাম বিলম্বিত হয়েছে। আজ সে বিশ্রাম পেয়েছে এবং যথারীতি জাঙ্কের আদেশে তাকে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে উপস্থিতি দিতে হবে। সেদিন বিষ্কের প্রতিনিধি উপস্থিত হয়ে ঘটনা লিপিবদ্ধ করে গেলেও—জাঙ্ক আদেশ করেছিলেন ভট্টরাইকে আসতে হবে ঘটনার খুঁটিনাটি লিপিবদ্ধ করার জন্য। আচার্য চরক যুবতীটিকে নিজ দায়িত্বে নিয়ে গেছেন শুনে সে সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছু উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ, তিনি জানেন, আচার্য চরক পুরুষপুর কেন—গোটা সাম্রাজ্যে এক সম্মানিত ব্যক্তি। লোকে তাঁকে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী বলে। তাছাড়া সম্রাটের সঙ্গে তাঁর রয়েছে গভীর সখ্যতা। এ হেন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিছু করে সম্রাটের বিরাগভাজন হওয়ার মতো মূর্খ তিনি নন। তবু তাঁর মনে ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ তিনি ভট্টরাইয়ের ওপর উগড়ে দেবার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন।

ভট্টরাই বুদ্ধিমান। সে সহজেই বুঝতে পেরেছিল জাঙ্ক কেন তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সে সকাল সকাল উপস্থিত হলেও—সারাদিন তাকে বসিয়ে রেখে শেষ বেলায় ডেকে পাঠাবেন—তর্জন-গর্জন করবেন। ভট্টরাই ওসবে ভয় পায় না। সে জানে, সে জাঙ্কের কর্মচারী নয়—বিষ্কের। আর বিষ্কের ওপর খবরদারি করা জাঙ্কের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, গোষ্ঠীগত দিক দিয়ে সম্রাট এবং প্রশাসনের অন্যান্য অংশে তাঁরও সহজ প্রবেশ আছে। বিষ্ক কখনই জাঙ্কের হাতে তাঁর কোনো কর্মচারিকে নিগৃহীত হতে দেবেন না।

কার্যালয়ে পৌঁছে ভট্টরাই দেখল তার অনুমানই সঠিক। ভট্টরাইয়ের উপস্থিতির কথা জেনেও তাকে অপেক্ষা করতে বলে তিনি নিগ্রহ কক্ষে প্রবেশ করে কোনো বন্দীর ওপর অত্যাচার করা শুরু করলেন। বন্দীর আর্তনাদে সারা কার্যালয় সচকিত হয়ে উঠল। বিরক্ত বোধ করলেও ভট্টরাইয়ের করণীয় কিছু ছিল না। সে জানে না বন্দীটি প্রকৃতপক্ষে দোষী না নির্দোষ। জানলেই বা কী হবে? এ এক পৃথক কার্যালয়। জাঙ্কই এখানকার সর্বেসর্বা। শেষ পর্যন্ত তিতিবিরক্ত হয়ে ভট্টরাই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে এক প্রহরীকে বলল, “আমি কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে—ঐ গাছের তলায় বসছি। আমার ঘুম পাচ্ছে। নগরাধ্যক্ষের সময় হলে যেন ডেকে নেন।” কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সত্যই ভট্টরাই গাছের তলায় শুয়ে পড়ল এবং দেখতে দেখতে ঘুমিয়েও পড়ল। ঘুমোনটা আশ্চর্যজনক নয়। দীর্ঘ পনেরো দিন সে রাত্রি জাগরণ করেছে। রাত্রি জাগরণ যারা করে বা করেছে তারাই বুঝবে বিষয়টি।

বেলা শেষে পড়ন্ত সূর্যের আলো মুখে-চোখে পড়তে ঘুম ভেঙে গেল ভট্টরাইয়ের। ধড়মড় করে উঠে সে তাকাল কার্যালয়ের সিঁড়ির দিকে। তার অনেক পরের একজন বেরিয়ে আসছে। ভট্টরাই জিজ্ঞেস করল, “আর কেউ কি নগরাধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করার জন্য বসে রয়েছে?”

লোকটি বলল, “না, সেই শেষজন।”

“আমাকে খোঁজ করেছিল?”

“না বলেই তো মনে হয়।” লোকটি চলে গেল।

মনে মনে উত্তপ্ত হয়ে উঠল ভট্টরাই। তারপরের মানুষ চলে গেল অথচ তার ডাক পড়ল না। না! একবার খোঁজ নেওয়া উচিত। যদি না ডাকে তো সে ফিরে যাবে। তারপর যা হবার তা হবে। ভট্টরাই উঠে পড়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। সেই মুহূর্তে একজন রক্ষী হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল।

“কোথায় যে থাক!”

“কেন জানো না? আমি তো বলেই গেলাম।”

“তা জাঙ্কের সঙ্গে দেখা করতে এসে তোমার ঘুম পায়!”

“আমি কেন নগরাধ্যক্ষকে মিছিমিছি ভয় পাব? আমার মাথার ওপর কেউ নেই নাকি?”

যাকগে বাপু। চল। তোমার ডাক পড়েছে।”

ভট্টরাই সিঁড়ির ধারে মাটির কলসিতে রাখা জলে মুখচোখ ধুয়ে নিয়ে জাঙ্কের কক্ষে প্রবেশ করল।

চিৎকার করে উঠলেন, “কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”

“আপনার ডাকের অপেক্ষা করছিলাম। জানি তো—আগে এলেও শেষ বেলায় ডাকবেন। তাই একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিলাম। তা আপনি কি আগে আমাকে ডেকেছিলেন? প্রহরীরা তো জানতই আমি কোথায়?”

সক্রোধে জাঙ্ক বললেন, “তুমি খুব দুর্বিনীত। ভেবেছ বিষ্ক তোমায় বাঁচাবে?”

“কেন? আমি চোর না ডাকাত? বাঁচাবার কী আছে?”

“তুমি হত্যাকারী। দুজন নিরীহ লোককে হত্যা করেছ!”

বিনয়ের সঙ্গে ভট্টরাই বলল, “মার্জনা করবেন। আপনি কি সংবাদ নিয়েছেন যে ঐ অস্ত্রধারী দুজন নিরীহ মানুষ? তারা খেলা করার ছলে যুবতীটিকে হত্যা করার জন্য ছুটে আসছিল? আমি আমার কর্তব্য করেছি। যুবতীটিকে রক্ষা করেছি। আপনিই খুঁজে বার করুন—আমি হত্যাকারী কি না। আমার প্রধান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।”

জাঙ্ক যেন একটু দমে গেলেন ভট্টরাইয়ের নির্ভীকতা দেখে। এ যাবৎ তাঁকে দেখে সবাই ভয় পায়। এ তো তাঁর গর্জনকেও গ্রাহ্য করছে না! মনে মনে গর্জে উঠলেন জাঙ্ক, বিষ্ক—বিষ্কই এর মাথাটা খেয়েছে! যা হোক, যুবতীটির কথা শুনলেই সব বোঝা যাবে।—সে এখন কোথায়?

“কেন? তা তো আপনার জানার কথা। আমার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? আচার্য চরক নিজ দায়িত্বে তাঁকে তাঁর আশ্রমে নিয়ে গেছেন। এই পর্যন্ত আমি জানি।”

জাঙ্ক বুঝলেন, এই যুবকটি যথেষ্ট সাহসী এবং স্পষ্ট-বক্তা। অযথা তর্জন-গর্জন করে কোনো লাভ নেই। কিছু তথ্য তার কাছ থেকে নিতে হবে। হঠাৎ তিনি সদয় হয়ে বললেন, “ঐ আসনটিতে বস। আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দাও।”

আসনে বসে পড়ে ভট্টরাই বলল, “প্রশ্ন করুন।”

জাঙ্ক বললেন, “শুরু থেকে ঘটনাটি তুমি বল।”

ভট্টরাই আনুপূর্বিক ঘটনার বিবরণ দিল।

জাঙ্ক প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়, কেন ঐ দুজন যুবতীটিকে আক্রমণ করেছিল?”

ভট্টরাই বলল, “আমি তো বলেইছি—আচার-আচরণ আর অবয়বে ওরা দু’জন দস্যু শ্রেণির। মনে হয় যুবতীটির বহুমূল্যের অলংকার ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।”

“বহুমূল্যের অলংকার! কই আগে তো কেউ বলেনি। কী অলংকার?”

ভট্টরাই বলল, “রূপ আর আভরণ থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না যে যুবতীটি ধনাঢ্য। তার কণ্ঠে মূল্যবান হীরক হার। সারা অঙ্গে আরও সব নানান রত্নখচিত অলংকার। ঐসব অলংকারের যে মূল্য হবে তাতে যে কোনো সাধারণ মানুষ চতুর্দশ পুরুষ বসে খেতে পারবে।”

জাঙ্ক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, “আশ্চর্য! বিষ্কের প্রতিনিধি সেদিন এসব কথা আমাকে বলার প্রয়োজন বোধ করেনি! এখন সেসব অলংকার কোথায়?”

“কেন তার গায়েই রয়েছে।”

“আশ্চর্য! তার জ্ঞানহীন অবস্থার সুযোগ নিয়ে যে কেউ তো খুলে নিয়ে থাকতে পারে। তুমি বলছ, চতুর্দশ পুরুষ বসে খেতে পারে এত অলংকার।” জাঙ্কের চোখে যেন লোভের ছায়া! নীরবে তা লক্ষ করল ভট্টরাই।

“আশ্চর্য! চরক যখন তাকে নিয়ে গেলেন—অলংকারগুলির কোনো হিসাব কি রাখা হয়েছিল?”

“আচার্য বলেছিলেন। বিষ্ক আচার্যকে অপমান করতে চাননি।”

নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে জাঙ্ক বললেন, “আরে! আচার্যের কথা আসছে কেন? তাঁর আশ্রম তো বারো ভূতের জায়গা। কেউ যদি খুলে নেয়?”

“খুলে নিয়ে থাকলে নিয়েছে। সেই যুবতীটি যতক্ষণ অভিযোগ না করছে, ততক্ষণ বলার কী আছে?”

“ঠিক–ঠিক। আমি এত বোকা। অনেক আগেই আমার আশ্রমে গিয়ে যুবতীটির অবস্থা দেখে আসা উচিত ছিল। ছিঃ!” নিজেকে দুষলেন জাঙ্ক। “এখন যদি সে মারা গিয়ে থাকে!”

ভট্টরাইয়ের বুক যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল।—”অমন কথা বলবেন না। আচার্য সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী!” জাঙ্ক হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। “না, না। এ কথার কথা। জীবন-মৃত্যুর কথা কে বলতে পারে? ধর, যদি মারাই গিয়ে থাকে তাহলে ঐ অতুল ঐশ্বর্য……। না—না। চল। যুবতীটিকে এখনই একবার দেখা উচিত। কে জানে, পুরুষপুরের কোনো ক্ষমতাশালীর আত্মীয়া কি না। আশ্চর্য! রাত দুপুরেও এত অলংকার গায়ে চাপিয়ে আসার কী দরকার ছিল? সম্রাট কণিষ্কের শাসন। সুশাসন আছে নিশ্চয়। কিন্তু চোর-দস্যুরা কি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে? ওরা নিঃশেষ হয় না। লুকিয়ে বসে থাকে, চল—চল। তা তুমি কিসে যাবে? শকটটা বার করতে বলব কি?”

“না না, আমার অশ্ব রয়েছে।” ভট্টরাইয়েরও মনে প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিল সেই অপরূপাকে একবার দেখবার। তার খোঁজ নেওয়ার। এটা তার মানবিক কর্তব্য ছিল। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি সুযোগ পায়নি সে। এতদিন সে যে তার কথা ভাবে নি তা নয়। সুস্থ হবার পর এই অপরিচিত নগরে মেয়েটি কী করবে? কোথায় আশ্রয় নেবে? আচার্য চরক অবশ্য হৃদয়বান মানুষ। তিনি একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করবেন। তবু ভট্টরাইয়ের মন যেন বলছিল, ব্যবস্থাটা সে নিজে করতে পারলে বেশি খুশি হত।

ভট্টরাইকে চিন্তাগ্রস্ত দেখে বিরক্ত হয়ে জাঙ্ক বললেন, “তোমার আবার কী হল? চল।”

“না। ভাবছি আমার যাওয়ার কি সত্যিই কোনো প্রয়োজন আছে?”

“আরে? তোমাকেই তো প্রয়োজন! তার গহনার বিবরণ আর কে দেবে? চল—চল। আমার প্রচুর কাজ পড়ে রয়েছে এদিকে।” ভট্টরাই অনুসরণ করল নগরাধ্যক্ষকে।

.

বিশাল অঞ্চল জুড়ে আচার্য চরকের আশ্রম। সেই ভূমির কেন্দ্রস্থলে দক্ষিণ দিক খোলা রেখে উত্তর-পূর্ব-পশ্চিমে সার সার খড়ে ছাওয়া কুটির। মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল প্রাঙ্গণ। গোবরজলে নিষিক্ত। পূর্বের কুটিরগুলোয় আচার্যের পরিবারের বসবাস। পশ্চিমে থাকে শিষ্যরা। উত্তরের কুটিরে তাঁর আরোগ্য নিকেতন। জনা তিরিশ রোগী সেখানে নিত্য রয়ে যায়। বাকি অঞ্চলে নানান চাষ। যে ঔষধীর লতাগুল্মগুলি তিনি এখান থেকে সংগ্রহ করতে পারেন না—তা সংগ্রহ করেন পাহাড়ের বুকের বনভূমি থেকে।

বিদায়ী সূর্যের আলো তখন পশ্চিমের কুটীরে লুটিয়ে পড়েছে। জাঙ্ক আর ভট্টরাই প্রবেশদ্বারের কাছে একটা গাছের গায়ে তাদের অশ্ব দুটিকে বেঁধে রেখে এগিয়ে গেল। চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে চলার জন্য তারা সহজেই আবিষ্কার করল যে পূবের কুটীরের দাওয়ায় আচার্য একটি যুবতীর পরিচর্যায় ব্যস্ত। ভট্টরাইয়ের চিনতে কোনো ভুল হল না, এই সেই সুন্দরী যুবতী।

আচার্য চরক অলংকার শোভিতা সুন্দরীকে আরোগ্যশালায় রাখাটা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন নি; তাই তিনি তাকে নিজের পারিবারিক কুটিরে রেখে দিয়েছেন।

আচার্য সেইদিন আশ্রমে উপস্থিত শিষ্যদের সহযোগীতায় শল্য ব্যবহার করে যুবতীর বাহু থেকে তিরটি বার করে স্থানটি সেলাই করে দেন। তারপর আহত স্থানটিকে বিশেষ কর্পূর জলে ধুয়ে রক্তচন্দনের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যান্য ঔষধি তো ছিলই। আজও তিনি যুবতীটির ক্ষতস্থান ধুয়ে দিতে ব্যস্ত ছিলেন। ঘরের ভেতর থেকে রোগীকে বাইরের দাওয়ায় খোলা বাতাসে নিয়ে এসেছিলেন। রোগী এখন যথেষ্ট সুস্থ। জাঙ্ক আর ভট্টরাইকে এগিয়ে আসতে দেখে চরক বললেন, “জাঙ্কের কুশল তো? তা কী মনে করে? অসুস্থ?”

“না—হেঁ-হেঁ করে বিগলিত ভাবে হেসে জাঙ্ক বললেন, “যুবতীটিকে দেখতে এলাম। কেমন আছে। এই অবস্থার কারণ কি—ইত্যাদি ইত্যাদি।”

ভট্টরাই আড়চোখে দেখল, জাঙ্কের দৃষ্টি যুবতীটির হীরকখচিত কণ্ঠহারের ওপর স্থির হয়ে আছে। যুবতীটি অস্বস্তি বোধ করে গায়ের কাপড় ভাল করে জড়িয়ে নিল।

আচার্য জিজ্ঞেস করলেন, “সঙ্গের যুবকটিকে তো চেনা চেনা লাগছে। এ কে? কোথায় যেন দেখেছি!”

জাঙ্ক বললেন, “সেদিন নগর তোরণে দেখেছেন। এই তো সেই যুবক যে দস্যু দু’টিকে হত্যা করে আপনার রোগিণীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল!”

ভট্টরাইয়ের দৃষ্টির সঙ্গে মিলল যুবতীটির কৃতজ্ঞতা-ভরা দৃষ্টি। কেমন যেন শিহরিত হল ভট্টরাই। সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

জাঙ্ক হঠাৎ শ্লেষের সঙ্গে বলল, “আপনি সেদিন যুবতীটিকে নিজের আশ্রমে নিয়ে এলেন—আমায় কিছু জানাবার প্রয়োজন বোধ করলেন না। এখনও পর্যন্ত আমি এর পরিচয়ের কিছুই জানি না!”

একটু রুঢ় স্বরে চরক বললেন, “জানাটা তোমার কাজ। তোমার জানা উচিত ছিল বিষ্কের প্রতিনিধির কথা শোনা মাত্রই—এই যুবকটি সম্ভবত তোমায় ঘটনার প্রতিবেদন জানিয়েছিল।”

ভট্টরাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না, আমি নই, অন্য একজন গিয়েছিল।”

চরক বললেন, “সে যেই হোক। একজন জানিয়েছিল। জাঙ্ক নিশ্চয় আশা করেন না যে আমি গিয়ে জানিয়ে আসব। রোগীকে বাঁচানো আমার কাজ, অনুসন্ধান করা তোমার কাজ। যদি কোনো অভিযোগ থাকে তবে রাজদ্বারে তা করতে পার।”

জাঙ্ক জানে, নগরের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো কার্য নির্বাহ করতে হলে সম্রাটের প্রত্যক্ষ অনুমোদন চাই। ঐ রক্ষা কবচের মধ্যে রয়েছেন আচার্য চরকও। তাই সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, “ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! এ কী বলছেন, আচার্য! যা হোক অযথা বিতর্কের প্রয়োজন নেই, আমি স্বীকার করছি—আগে আসাই উচিত ছিল। সময়াভাবে তা পারিনি। যুবতীটির সম্পর্কে কোনো তথ্য কি আপনি উদ্ধার করতে পেরেছেন?”

আচার্য বিরক্ত হলেন। আরোগ্যশালায় কয়েকজন রোগী তাঁর প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাই তিনি চুপ করে থেকে যুবতীটির ক্ষতে কার্পাস বস্ত্রের বাঁধনটি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “দেখ, জাঙ্ক! মানুষের জীবনই আমার লক্ষ্য। তার ইতিবৃত্তে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। এ পর্যন্ত আমি যা জেনেছি তা হচ্ছে, যুবতীটির নাম কমলিকা। এখন রোগী যথেষ্ট সুস্থ। আশা করি সে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। তার কাছ থেকেই সব জেনে বুঝে নাও। আমার কাজ রয়েছে। আমি আসছি।” চরক আরোগ্যশালার দিকে চলে গেলেন।

দাসীরা দুটি কাষ্ঠাসন এনে দিয়েছিল। জাঙ্ক তার একটিতে বসে পড়ল। ভট্টরাই আসনে না বসে দাওয়ার ওপর খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসল।

জাঙ্ক প্রশ্ন করলেন, “কী তোমার পরিচয়? পুরো ঘটনাটিই বা কী—আমায় বল।”

নির্লিপ্ত ভট্টরাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে কমলিকা বলা শুরু করল: “আমি চন্দ্রভাগার তীরে বর্ধিষ্ণু অজাতনগরের মণিকার মণিভদ্রের একমাত্র কন্যা। এবার বর্ষায় হঠাৎ অজাতনগরের বাঁধ ভেঙে গিয়ে সারা নগর ও পাশের গ্রামগুলি জলে তলিয়ে যায়। জায়গাটি একটু নিচু হওয়ার জন্যই তা সম্ভব হয়েছে। প্রচুর মানুষ আর গবাদিপশুও মারা যায়। আমাদের বাড়িটা একটি উঁচু টিলার ওপর হওয়াতে আমরা বেঁচে যাই। দুর্ভাগ্যবশত বেশ কয়েকদিন ধরে কোনো ত্রাণ বা উদ্ধারকারীর দল না আসাতে পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে ওঠে। মৃতদেহগুলি পচে মহামারীর সৃষ্টি করে। কারণ, পানীয় জল দূষিত হয়ে গিয়েছিল। চারদিকের অবস্থা লক্ষ্য করে বাবা স্থির করেন, এই নগর পুনরায় পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে বেশ কয়েক বছর সময় নেবে। প্রায় জনমানবহীন এই মৃত্যুপুরীতে অপেক্ষা করে লাভ নেই। দাসদাসীরাও নিজেদের জলমগ্ন গ্রামে পরিবার পরিজনদের দেখতে গিয়ে আর কেউ ফিরে আসেনি। সুতরাং, এই স্থানের মায়া কাটিয়ে পুরুষপুরে নতুন করে ভাগ্যান্বেষণ করাই ভালো।”

“আমি আর মা প্রশ্ন করেছিলাম, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বিশাল নগরে গিয়ে এ বয়সে তুমি কী করতে পারবে? কাউকে জানো না, চেনো না!”

“বাবা বলেছিলেন, রাজকাজে মহামিশ্র বলে তাঁর এক নিকট আত্মীয় আছে। সে নিশ্চয় সাহায্য করবে। এক সময় সে আমার অন্নেই প্রতিপালিত।”

“আমরা ভরসা করতে পারিনি। কারণ, উপকারের কথা মানুষ খুব কমই মনে রাখে। যা হোক, বাবাকে আমরা নিরাশ করিনি। কারণ, আমাদের যা সম্পদ আছে তাতে পুরুষপুরে ছোটখাট একটা গৃহ নির্মাণ করে বা ভাড়া দিয়েও কাটিয়ে দিতে পারব।”

জাঙ্ক প্রশ্ন করলেন, “কোন মহামিশ্র?”

কমলিকা বলল, “আমি জানি না। রাজকাজে একাধিক মহামিশ্র থাকতে পারে। আমি জীবনে তাঁকে দেখিনি। ঐ প্রথমবারই তাঁর কথা শুনলাম।”

জাঙ্ক বললেন, “নগরাধ্যক্ষ হিসাবে আমি বলতে পারি এই নগরে ঐ নামে একটিমাত্র মানুষ রয়েছেন—তিনি সম্রাটের প্রাসাদ মন্ত্রী।”

কমলিকা নিরুৎসাহের ভঙ্গীতে বলল, “হতে পারে। তবে তো তাঁর পক্ষে আমাকে চেনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে! যা হোক, জল একটু নামতে আমরা আমাদের উটবাহী শকটটিতে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিজেরাই বোঝাই করে বেরিয়ে পড়লাম। বাবাই চালক হলেন। তবে সৌভাগ্য কি দুর্ভাগ্য—তা জানি না, পথে এক সার্থবাহী দলের দেখা পেলাম। দলপতিকে খুবই সজ্জন ব্যক্তি বলে মনে হল। তিনি বললেন, তাঁর সার্থ পুরুষপুর যাবে না ঠিকই। তাঁরা ঘুষ্কলাবতী যাবেন। পুরুষপুরের কাছাকাছি তিনি আমাদের ছেড়ে দেবেন। দলপতির এক রক্ষীকে আমার বড় গায়ে পড়া বলে মনে হল। যা হোক, তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা সার্থবাহী দলের সঙ্গে নিরাপদে এগিয়ে চললাম।”

“বাবা সরল মানুষ। এখানেই তিনি একটা ভুল করে বসলেন। দলপতির কাছে ঐ রক্ষীটির উপস্থিতিতে সুখদুঃখের কথা বলতে বলতে তিনি বলে ফেললেন যে তাঁর সঙ্গে একটি রত্নপূর্ণ পেটিকা রয়েছে। কাজ চালাবার মতো কিছু কার্যাপণ, তাম্র ও স্বর্ণমুদ্রাও রয়েছে। সুতরাং ব্যবসা না করলেও তাঁর চলে যাবে। রত্ন পেটিকায় তাঁর পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত মহামূল্য সব রত্ন রয়েছে। পুরুষপুরের বিকিকিনির হাটে রত্নের কয়েকটিকে বিক্রি করলেই তাঁর জীবন কেটে যাবে।”

“আমরা বাবাকে যথেষ্ট বকাবকি করলাম এই নির্বুদ্ধিতার জন্য।”

“বাবা বললেন, দূর! কী হবে? দলপতি আমার মতো কয়েকজনকে কিনে রাখতে পারেন। আমার রত্নপেটিকা নিয়ে তাঁর মাথা ব্যথার কিছু নেই।”

“আমরা বললাম, তা হয়ত ঠিক। কিন্তু ঐ তৃতীয় জন? দলপতির বংশবদ রক্ষীটি? ওকে আমার ভাল লাগে না।”

“বাবা বললেন, তাই তো! তা যাকগে। ও! সার্থবাহদের দলের সঙ্গেই চলে যাবে। চিন্তার কী আছে?”

“সন্ধ্যার সময় আমরা পুরুষপুর আর পুষ্কলাবতীর পথের মিলন স্থানে এসে উপস্থিত হলাম। দলপতি ভল্লাটক আমাদের অভয় দিয়ে বললেন, আজ রাতটুকু এখানে শিবির ফেলে বিশ্রাম নিন। প্রভাতে যাত্রা করবেন পুরুষপুরের পথে। দণ্ড পাঁচেক সময় লাগবে। ভয়ের কোনো কারণ নেই। সম্রাট কণিষ্কের শাসনকাল। দস্যুরা সব গর্তে ঢুকে গেছে!”

“কথাটায় আমরাও বিশ্বাস করতাম। কোনরকমে শিবির ফেলে, শুকনো খাবার খেয়ে আমরা নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়লাম। রাত গভীর হল। প্রায় শেষ রাতে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে আমি জলের একটা ধাতব পাত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ঢুকলাম। চাঁদ তখন পশ্চিম আকাশে। ম্লান আলোক রয়েছে। হঠাৎ দেখলাম, তিনজন সশস্ত্র উটারোহী আমাদের শিবিরের সামনে এসে থামল। দু’জন ভেতরে ঢুকে গেল। তৃতীয়জন আমাদের পড়ে থাকা শকটটির ওপর বসে শিবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যে শিবিরের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। বাবার বয়স হলেও শারীরিক শক্তি ছিল। তিনি দু’জন দস্যুকে রত্নপেটিকাটি দিয়ে প্রহার করে বাইরে এসে চেঁচালেন, কমলি! পালিয়ে যা!

কমলিকার নাম শুনে তৃতীয় দস্যুটি আবার বসে পড়ল। আমার চিনতে ভুল হল না যে ঐ দস্যুটি রক্ষী বাকাটকি। মুহূর্তের মধ্যে আমি পরিস্থিতি বুঝে গেলাম। বাবা-মা আর রত্নপেটিকার জন্য অপেক্ষা করা বৃথা। তাহলে আমাকেও মরতে হবে। শুধু মরণ নয়। তার আগে নিশ্চয় ধর্ষিতা হব তিনজনের দ্বারা। মৃত্যু আর ধর্ষণের ভয়ে আশ্চর্য ভাবে আমার শিথিল স্নায়ুগুলো দৃঢ় হয়ে উঠল। আমি বুকে হেঁটে তৃতীয়জনের অলক্ষে তার পেছনে পৌঁছে ধাতব জলপাত্রটি দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করলাম। চাপা আর্তনাদ করে সে পড়ে গেল। ওদিকের চিৎকার চেঁচামিচিতে দুই দস্যু তৃতীয়জনের আর্তনাদ খেয়াল করল না। অতঃপর আমি আমাদের শকটটিকে দস্যুদের দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি উটের দিকে প্রাণপণে ঠেলে দিলাম। ধাক্কা খেয়ে উটগুলি বিপরীত রাস্তায় ছুটল। সেই অবকাশে আমি বিদ্যুৎবেগে আমার উটটির পিঠে চড়ে বসে তাকে পুরুষপুরের দিকে চালনা করলাম। উটটি আমার অতি প্রিয়। শিশুকাল থেকেই ওকে আমি লালন-পালন করে আসছি। তাই সেও যেন আমার বিপদের কথা বুঝতে পেরে দুরন্ত বেগে ছুটে চলল। কিছুদূর যাবার পর আমি ভাবলাম, বিপদ বোধহয় এড়াতে পেরেছি। একটু শ্লথ হয়ে গিয়েছিলাম। আর ঠিক তখনই দেখলাম, দস্যু তিনজন বিভিন্ন ব্যবধানে ছুটে আসছে। আমার অলংকারগুলি বোধহয় তাদের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিয়েছিল। নচেৎ কেমন করে তারা ভুলে গেল যে তারা তোরণদ্বারের কাছে এসে গেছে। দ্বার তখন সবে খুলছে! তোরণ শীর্ষের দিকে আমার চোখ গেল। দেখলাম ভট্টরাইকে। চিৎকার করলাম, ‘বাঁচাও’। আর তখনই একটি তির এসে আমার বাম বাহুমূল বিদ্ধ করল, আমি জ্ঞান হারালাম। তারপরের ইতিবৃত্ত তো আপনাদের জানা! বাবা-মায়ের পরিণতির কথা তো আমি বুঝতে পারছি। জগৎ সংসারে আমি একা হয়ে গেলাম।” কমলিকার চোখে জল।

কমলিকার দুঃখে ভট্টরাইও যেন আবিল হয়ে গেল।

জাঙ্ক হঠাৎ বললেন, “তুমি এমন মহামূল্য রত্নালংকার কি সব সময়ে পরে থাক?”

বিরক্ত হয়ে কমলিকা বলল, “হ্যাঁ। রত্নালংকারে আমি সব সময় সেজে থাকতে ভালবাসি। এটা আমার শখ বা নেশা।”

“তোমার পুরুষানুক্রমিক ভাবে সঞ্চিত ঐ রত্নপেটিকাটির জন্য কোনো দুঃখ হচ্ছে না?”

 বাঁকাভাবে কমলিকা বলল, “আমার বাবা-মায়ের দেহ উদ্ধার করে তাদের অন্তেষ্টিক্রিয়া এখনও হল না—আর আমি দুঃখ করতে বসব ঐ রত্নপেটিকার জন্য! আশ্চর্য মানুষ তো আপনি!”

জাঙ্ক নিজেকে সামলিয়ে বলল, “তা নয়। তুমি যখন স্থান নির্দেশ করেছ—তখন কাল সকালেই আমার অনুসন্ধানী দল ওখানে যাবে। মৃতদেহ দু’টি উদ্ধার হলে গলিত বা শ্বাপদ দ্রংষ্ট যাই হোক না কেন, ওদের অন্তেষ্টিক্রিয়া ওখানেই করা হবে। কিন্তু তোমার ভবিষ্যত বলে তো একটা কথা আছে তাই রত্নপেটিকার কথা বলছিলাম। ভবিষ্যতে ওটাই তো তোমাকে বাঁচাবে! শোক দূর হয়ে যায়। কিন্তু রূঢ় বাস্তব পড়ে থাকে। অবশ্য তোমার গায়ে যা অলংকার আছে—তাতে সুখে-আনন্দে জীবন কেটে যাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাল করে দেখেছ তো—কিছু খোয়া যায়নি?”

“না-না। মেয়েরা তাদের অলংকার গুণে রাখে। আমার কোনো কিছু খোয়া যায়নি।”

জাঙ্ক বলল, “আমার ভাগ্য ভাল। তুমি আচার্য চরকের আশ্রয়ে এসে পড়েছিলে। নইলে, আমার আবার খাটুনি বাড়ত।”

ভট্টরাই জাঙ্কের মনোগত ইচ্ছা বুঝতে পারল। জাঙ্ক আচার্যকে জড়াতে পারলে খুশি হতেন।

জাঙ্কের মনে এখন নতুন ভাবনা। তৃতীয় দস্যুটিকে ধরে রত্নপেটিকাটি হস্তগত করতে হবে। মণিকার পুত্রীর যে এ সম্বন্ধে কোনো মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এটা তাঁর পক্ষে ভাল। উঠে দাঁড়ালেন জাঙ্ক।—”আমি আসি। প্রচুর কাজ। তৃতীয় দস্যুটিকে ধরতে হবে।”

ভট্টরাই ফিরবে কিনা তা না জেনেই বড় বড় পা ফেলে জাঙ্ক প্রবেশ দ্বারের দিকে এগিয়ে গেল। ভট্টরাই তাঁকে অনুসরণ করতে উদ্যত হতেই বাধা পেল।—”না আপনি একটু বসে যান।”

ভট্টরাই একদিক দিয়ে কমলিকার প্রতি যেমন এক তীব্র আকর্ষণ বোধ করছিল, অন্যদিকে তার নিজের মনের এই লোলুপতা তাকে বিব্রত করছিল। কমলিকার আহ্বানে সে খুশি হলেও এক অস্বস্তি নিয়ে বসে পড়ল।—”বলুন।”

“একদিনের জন্যও আসেন নি কেন? আমি প্রতিদিনই ভাবতাম…”

“এলে তো আবার পরিচয় দিতে হত। সে বড় লজ্জার। তাই নয়?”

“না। তা কেন? পরিচয় দিতে হবে কেন? ছুটন্ত অবস্থায় যে মুখ একবার আমি দেখেছি—তা আমার মনে গাঁথা হয়ে গেছে। আমি কোনো মুখ ভুলি না।”

সত্যিই লজ্জা পেল ভট্টরাই। “আমি সাধারণ মানুষ। কোনো অজুহাতে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম?”

“কেন? মানবিকতা! প্রাণটুকু বাঁচানোর পর সব কর্তব্য শেষ? এই অপরিচিত নগরে এক রূপবতী কন্যা কেমন করে বাঁচবে সে চিন্তা কি নেই?”

ভট্টরাই বলল, “বিশ্বাস করবেন? এতদিন আমি আপনার অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করেছি।”

“তবে আসেন নি কেন?”

“আজই তো রাত-কর্তব্য থেকে বিশ্রাম পেলাম। তাও নগরাধ্যক্ষের কার্যালয়ে প্রায় সারাটা দিন কেটে গেল। তিনি জোর করে নিজের স্বার্থের জন্য আমাকে ধরে না আনলে আজও আসা হত না।”

“তাহলে নগরাধ্যক্ষকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। যা হোক আপনি ধরা পড়ে গেছেন।” হাসল কমলিকা।

ভট্টরাই ধরা পড়ার অর্থটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করে সাধারণ অর্থেই বলল, “ধরা তো আপনি আগে পড়ে গেছেন। আমার পথ দেখছিলেন না?”

খিলখিল করে হেসে উঠল কমলিকা।—”এ বাবা! আপনি মনে রেখেছেন।”

আচার্য চরক এসে দাঁড়িয়ে পড়ে আশ্চর্য হলেন। রান্নাঘর থেকে চরক পত্নীও বেরিয়ে এলেন। কমলিকা হাসছে! এখানে আসার পর কমলিকাকে শোক ভুলে আজ প্রথম হাসতে দেখলেন তাঁরা।

চরক-পত্নীর এক দাসী একটি থালিতে কয়েকটি মিষ্টান্ন জাতীয় জিনিস আর পানপাত্র ভরা শীতল জল নিয়ে এল। তিনি বললেন, “খাও বাবা। ক্ষিদে নিশ্চয় পেয়েছে।”

“নিশ্চয়।” অস্বীকার করল না ভট্টরাই। মায়েরা এসব কথা বুঝতে পারে!

মায়ের প্রসঙ্গে বিষণ্ণ হয়ে গেল কমলিকা। চরক-পত্নী তা লক্ষ করে কমলিকাকে জড়িয়ে ধরলেন, “আমি তোমার মা। দুঃখ কিসের?” কমলিকা চরক পত্নীর বুকে মাথা রাখল।

আহার শেষ করে ভট্টরাই উঠে দাঁড়াল।—”এবার আসি।”

কমলিকার হয়ে চরকপত্নীই বললেন, “আবার এস অবকাশের দিনে। তুমি এলে মেয়েটা একটু হাসে।”

চরক ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। ভট্টরাই চেঁচিয়ে বলল, “আচার্য! আমি এলাম।”

ঘর থেকেই চরক বলল, “এস বাবা!”

কমলিকা বলল, “সাবধানে যাবেন। আবার আসবেন।”

ভট্টরাই জনান্তিকে বলল, “নিশ্চয়!”

শুক্লপক্ষের চাঁদ আকাশে উঠে পড়েছে। ভট্টরাইয়ের প্রাণে যেন অপার্থিব উল্লাস!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *