ওরা থাকে পাতালে

ওরা থাকে পাতালে

এক

ববিন, মানে বেদব্রত সরকার রানিগঞ্জের সেন্ট স্টিফেনস স্কুলে ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে প্রমোশন পেল, আর ওর বাবা ভাস্কর সরকারও ঠিক তখনই অমৃতনগর কোলিয়ারি থেকে শিমুলিয়া কোলিয়ারিতে ট্র্যান্সফার হয়ে গেলেন।

কোলিয়ারি মানে কয়লার খাদ—যেখানে মাটির নীচ থেকে কয়লা তোলা হয়। রানিগঞ্জের আশেপাশে এরকম অনেক কয়লাখনি রয়েছে। ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড বলে একটা কোম্পানি সেগুলোর মালিক। কোম্পানিটাকে ছোট করে ডাকা হয় ‘ই. সি. এল.’ বলে। ভাস্কর সরকার ই. সি. এল.—এর একজন ইঞ্জিনিয়ার।

অমৃতনগর কোলিয়ারিটা ছিল রানিগঞ্জ শহরের খুব কাছে। তাই ভাস্করবাবু ই. সি. এল.—এর কোয়ার্টারে না থেকে, ববিন আর তার মাকে নিয়ে রানিগঞ্জেই বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। বাড়ি থেকে মোটর—সাইকেলে কোলিয়ারির অফিসে যেতে কুড়ি মিনিট সময় লাগত। সেটুকু কষ্ট ভাস্করবাবু গায়ে মাখতেন না। কিন্তু নতুন যে অফিসটায় ভাস্করবাবুকে ট্র্যান্সফার করা হল, মানে শিমুলিয়া, সেটা রানিগঞ্জ শহর থেকে অনেক দূরে। শুধু রানিগঞ্জ থেকেই নয়, যে—কোনো বড় শহর থেকেই শিমুলিয়ার দূরত্ব অনেক। ওখানে চাকরি করতে গেলে কোলিয়ারির নিজস্ব স্টাফ—কোয়ার্টারে থাকা ছাড়া উপায় নেই।

ববিন, ওর মা অদিতি কিম্বা ভাস্করবাবু—কারুর—ই রানিগঞ্জ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু উপায় কী? চাকরি করতে গেলে তো আর নিজেদের ইচ্ছেমতন সবকিছু হয় না। তাই এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে একটা লরিতে মালপত্র চাপিয়ে, তার পেছন—পেছন শিমুলিয়া কোলিয়ারি থেকে সরকার সাহেবের জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া সাদা অ্যাম্বাসাডরে চেপে ববিনরা নতুন জায়গার দিকে রওনা হয়ে গেল।

জন্ম থেকে দশ বছর বয়স অবধি ববিনের পুরো সময়টাই কেটেছে রানিগঞ্জের মতন বড় শহরে। শিমুলিয়ায় পা দিয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেল। এ কেমন জায়গা? চারিদিক এত ফাঁকা, এত থমথমে চুপচাপ! রাস্তায় একটাও লোক দেখা যাচ্ছে না। বাস নেই, রিক্সা নেই, টোটো নেই। দোকানপাটের বালাই নেই। এমনকি কোনো ফেরিওলার ডাক অবধি শোনা যাচ্ছে না। ববিন কোয়ার্টারের দরজায় দাঁড়িয়ে ঘাড় গোঁজ করে ঘোষণা করল—আমি ঢুকব না এই বিচ্ছিরি বাড়িতে। এখানে থাকব না, কিছুতেই থাকব না। এক্ষুনি রানিগঞ্জে ফিরে চলো।

সত্যিকথা বলতে কি অদিতি আর ভাস্করবাবুর মনের কথাগুলো ববিনের থেকে খুব আলাদা কিছু ছিল না। তাঁদেরও মনে হচ্ছিল পালাতে পারলে বাঁচি। কিন্তু ববিনের সামনে তো আর সেসব বলা যায় না। তাই ওনারা দুজনে মিলে ববিনকে অনেক বোঝালেন। বললেন—দেখ, এখন দুপুরবেলা তো, তাই এরকম নিঃঝুম লাগছে। সন্ধে হলেই দেখবি কোলিয়ারির কুলি—কামিনরা কেমন লাইন দিয়ে হাসতে হাসতে, গান গাইতে গাইতে ঘরে ফিরবে। আমরা তিনজনে মিলে একদিন মাইথন বেড়াতে যাব, কেমন? এখানে তোর বাবার জন্যে একটা সব সময়ের গাড়ি থাকবে, জানিস তো? আর এই ভেকেশনের পরেই তো তোর স্কুল শুরু হয়ে যাবে। তখন তুই আর কতক্ষণ বাড়িতে থাকবি বল?

অনেকক্ষণ বোঝানোর পরে, মনের দুঃখ মনে চেপে রেখেই ববিন নতুন বাংলোয় ঢুকে পড়ল।

বাংলোটা ববিন আর তার বাবা—মার কাছে হয়তো নতুন, কিন্তু আসলে একশো বছরের পুরোনো। তখন এইসব কোলিয়ারির মালিক ছিল সাহেবরা, আর তারা নিজেদের থাকবার জন্যেই এইসব এলাহি বাংলো বানিয়েছিল।

একতলা বাংলো। বিশাল বিশাল চারটে শোবার ঘর। মাঝখানের হলঘরটার মধ্যে অনায়াসে সেভেন—সাইড ফুটবল খেলা যাবে। ববিনের মনে হল, ঘরের দরজাগুলো জিরাফদের যাতায়াতের কথা ভেবে বানানো; মানুষের জন্যে অত উঁচু দরজা তো লাগে না। তাছাড়া ভেজা—ভেজা স্যাঁতসেঁতে চুনকাম করা দেওয়াল। অনেক উঁচু সিলিং থেকে তারের ডগায় আলোর বাল্ব ঝুলছে আর লম্বা রডের মাথায় সিলিং—ফ্যান।

ববিন চারিদিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ঘরগুলোতে টিউবলাইট নেই কেন বাবা?

ভাস্করবাবু বললেন, পুরো জায়গাটাতেই ভোলটেজ খুব লো, তাই টিউবলাইট জ্বলে না।

অদিতি নিজের মোবাইলটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কাউকে ফোন করার চেষ্টা করছিল। একটু বাদে ‘ধুত’ বলে মোবাইল—টা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ভাস্করবাবু বললেন, কী হল?

অদিতি বলল, এসে থেকেই দেখছি টাওয়ার নেই। এ কী জায়গায় এসে পড়লাম বলো তো? তুমি কিন্তু ঠিক এক বছরের মাথায় ট্র্যান্সফারের জন্যে অ্যাপ্লিকেশন করবে। নাহলে আমি ববিনকে নিয়ে রানিগঞ্জে পালাব। এই জায়গাটা আমার একদম সহ্য হচ্ছে না।

সহ্য না হওয়ারই কথা। সেইদিনই সন্ধের মুখে ববিন আর ওর মা রাস্তার দিকের বারান্দায় বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। একটাই ভাঙাচোরা পিচের রাস্তা খাদের মুখ থেকে শুরু হয়ে এঁকে—বেঁকে প্রায় দু—কিলোমিটার দূরে জি টি রোডে গিয়ে মিশেছে। সেই রাস্তাটারই ধারে ধারে কোলিয়ারির বড়সাহেবদের বাগানঘেরা কোয়ার্টারস। রাস্তা দিয়ে সারাদিন কয়লার চাঙড়—ভর্তি বড় বড় ডাম্পার যাতায়াত করছে। রাস্তার ওপরে জমে রয়েছে এক হাঁটু কয়লার গুঁড়ো; যে কোনো গাড়ি গেলেই চাকার ধাক্কায় সেই কয়লার গুঁড়ো হাওয়ায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে গজিয়ে ওঠা বুনো ঝোপ আর খেজুরগাছগুলোর পাতার সবুজ রং কালো কয়লায় ঢেকে গেছে।

এই সন্ধেবেলাতেও কোথাও কোনো উজ্জ্বল আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে না। অনেক দূরে দূরে রাস্তার ধারে শালখুঁটির মাথায় একটা করে টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে। সেই আলোগুলোর দিকে তাকালে বুকের মধ্যে কেমন যেন ভয় আর মনখারাপ চেপে বসে।

গান নেই, পাখির ডাক নেই, মানুষের গলার আওয়াজ নেই। একটাই শব্দ সারাক্ষণ কানে ভেসে আসছে—ডাইনির কান্নার মতন তীক্ষ্ন একটানা একটা শব্দ। কিছুক্ষণ বিরতি। তারপর একটা ফোঁস ফোঁস শব্দ। যেন সেই ডাইনিটাই কান্না থামিয়ে নাক টানছে। অদিতি কিম্বা ববিন কেউই সেই শব্দটাকে চিনতে পারছিল না। ভাস্করবাবুকে জিগ্যেস করাতে তিনি ওদের বাংলোর পেছনের বারান্দায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালেন। বললেন, ওই দেখ, তোমাদের ডাইনিবুড়ি।

ওরা দেখল অনেক দূরে একটা উঁচু লোহার ফ্রেমের ওপর দুটো বিশাল চাকা ঘুরছে। শব্দ হচ্ছে ক্যাঁঅ্যাঅ্যাচ কোঁওওচ। মাঝে মাঝে চাকাটা থামছে। তখন নীচের কোনো জায়গা থেকে হুশ হুশ করে সাদা ধোঁয়া উঠে আসছে।

ওটা কী? ববিন চোখ গোলগোল করে জিগ্যেস করল।

ভাস্করবাবু হাসতে হাসতে বললেন, তুই তো মাইনিং—ইঞ্জিনিয়ারের বেটা হয়েও কখনো কোল—মাইনস—এ আসিসনি, তাই জানিস না। ওকে বলে ডুলি। ডুলি হচ্ছে খাদের সঙ্গে ওপরের পৃথিবীর লাইফ—লাইন। একটা মস্ত বড় আদ্যিকালের লিফট বলতে পারিস। ওই যে চাকা দুটো ঘুরছে না, ওই দুটো একদিকে ঘুরলে বোঁ বোঁ করে দুটো বড়—বড় খাঁচা খাদের নীচে নেমে যায়। আবার উলটোদিকে ঘুরলে খাদের গভীর থেকে খাঁচা দুটো ওপরে উঠে আসে। আমরা যারা খাদের নীচে কাজ করি, তারা ওই খাঁচায় চড়েই ওঠানামা করি। খাদের নীচে যে কয়লা কাটা হয়, সেই কাটা—কয়লার ট্রলিগুলোও খাঁচায় চেপেই ওপরে ওঠে।

চাকাগুলো ঘুরছে কেমন করে? ববিন জিগ্যেস করে।

স্টিমে, মানে জলের বাষ্পে। এখানে তো কয়লার অভাব নেই। সেই কয়লা জ্বালিয়ে বড় বড় বয়লারে জল গরম করে স্টিম তৈরি করা হয়। ওই দ্যাখ না, মাঝে মাঝে কেমন হুশ হুশ শব্দ করে স্টিম বেরিয়ে আসছে আর যেখানে খাদের মুখে ডুলি বসানো আছে ওই জায়গাটাকে আমরা বলি ‘চানক’। ইংরেজিতে বলে pit head।

নতুন বাড়িতে তিনদিন কেটে গেল, কিন্তু ববিন কিম্বা অদিতি জায়গাটাকে কিছুতেই ভালোবাসতে পারছিল না। ভাস্করবাবুর কেমন লাগছিল জানার উপায় নেই, কারণ শিমুলিয়ায় এসে থেকে তিনি দিনের মধ্যে ষোলো ঘণ্টাই অফিসে নাহলে খাদের নীচে কাটাচ্ছিলেন। এখানে অনেকদিন ইঞ্জিনিয়ারের পোস্ট ফাঁকা পড়ে ছিল, তাই ভাস্করবাবুর ওপরে খুব কাজের চাপ পড়েছে।

রানিগঞ্জে থাকতে ববিনের বন্ধুর অভাব ছিল না। সাহেববাঁধের গলিতে ছুটির দিন বিকেলে হাওয়াই—চটির গোলপোস্ট বানিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সেই হুড়ুদ্দুম ফুটবল খেলা—ভেবেই ববিনের চোখে জল আসে। এখানে তার একটাও বন্ধু নেই।

সারাদিন অদিতি আর ববিন সেই প্রকাণ্ড কোয়ার্টারের ভেতরে এদিক—ওদিক ঘুরে বেড়ায়। দুজনেই মাঝে মাঝে এ ওকে ডেকে সাড়া নেয়। সাড়া পেলে নিশ্চিত হয়—যাক, হারিয়ে যায়নি।

লোকজন বেশি আসে না এই বাড়িতে। কে আসবে? প্রতিবেশী বলতে বাঁদিকের কোয়ার্টারে ওয়েলফেয়ার—অফিসার রামানুজন সাহেব। তাঁর বাড়ির সবাই তামিল না তেলেগু কী একটা ভাষায় কথা বলেন, তাই তাঁদের আসা না আসা সমান। আর ডানদিকের বাড়িটা আপাতত ফাঁকা পড়ে রয়েছে।

আসলে শিমুলিয়া কোলিয়ারির তো অনেক বয়স হয়েছে—মাটির তলার কয়লার স্টক কমে আসছে। কয়লার প্রোডাকশনও হচ্ছে কম। তাই বেশি লোকজনের প্রয়োজন নেই। অনেক বাংলোই এরকম ফাঁকা পড়ে আছে।

ববিনদের এই বাংলোটাও গত পাঁচবছর ধরে ফাঁকা পড়ে ছিল। ওরা আসছে বলে সারিয়ে—সুরিয়ে চুনকাম করে ঠিক করা হয়েছে। পেছনের বাগানের কুয়োটাও নতুন করে ঝালাই করা হয়েছে।

এবাড়িতে কাজের লোক আছে বেশ কয়েকজন। কোলিয়ারির অফিস থেকেই তাদের বহাল করা হয়েছে। বাগানের মালির নাম মুক্তিদাদু। কুয়ো থেকে যে বাঁকে করে বাথরুমের চৌবাচ্চায় জল ভরে দিয়ে যায় তার নাম বাঁকাকাকু। কি জানি, বাঁক থেকেই বাঁকা নাম হয়েছে কিনা। আর ঘর মোছা, বাসন মাজার কাজ করে যে পিসিটা, তার নাম ফুলি। বাঁকাকাকু আর ফুলিপিসি খুব কম কথা বলে। বরং মুক্তিদাদুর সঙ্গে অনেক কথা বলা যায়।

মুক্তিদাদুর বাংলোটা একটু অন্যরকম, তবে ববিনের বুঝতে অসুবিধে হয় না। এই ভাষাটাকে বলে ‘বাহে’, বাবা বলেছে। মুক্তিদাদু এতটাই বুড়ো যে, ববিন দেখেছে, ওর চোখের মণিদুটো কালো থেকে নীলচে—সাদা মতন হয়ে গেছে। নীল রঙের একটা জেমস লজেন্স জিভ দিয়ে একবার চেটে নিলে যেমন রং হয়, ঠিক সেইরকম। তাছাড়া মুক্তিদাদুর গায়ের রং কুচকুচে কালো হলেও মাথার চুলগুলো সব ধবধবে সাদা। বাবা একদিন মুক্তিদাদুর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, মুক্তিদাদু ব্রিটিশ মালিকদের আমলেও এখানে মালির কাজ করেছে। ওর বাগান করার ট্রেনিং নাকি উইলিয়াম নামে এক সাহেব ম্যানেজারের কাছে। মুক্তিদাদুর কেউ নেই। একটাই ছেলে ছিল, সেও মারা গেছে।

রোজ বিকেলে বাংলোর বাগানে মুক্তিদাদু একটা খুরপি দিয়ে টুকটুক করে মাটি খোঁচায় আর ফিসফিস করে গল্প বলে। ববিন মুক্তিদাদুর পাশে উবু হয়ে বসে সেই গল্প শোনে। গল্পগুলো সবই বেশ ভয়ের, কিন্তু না শুনে উঠে আসাও যায় না। মুক্তিদাদু বলে, ওগুলো নাকি গল্পই নয়, সব সত্যি ঘটনা। এই শিমুলিয়া আর আশেপাশে গ্রামের ঘটনা সেসব।

মুক্তিদাদুর গল্পগুলো নিজের মনের মধ্যেই পুষে রেখে দেয় ববিন। কারণ, সে জানে, বাবা—মাকে ওই গল্পগুলো বলতে গেলেই ধমক খাবে। ওরা বলবে, ওইসব হাবিজাবি গল্প শুনতে নেই। ওইসব গল্প শুনে তুমি ভীতু হয়ে যাবে। ববিন তাই নিজের মনেই নাড়াচাড়া করে মুক্তিদাদুর কাছে শোনা সেই ‘বুক গেল রে’ ভূতটার গল্প।

অনেক বছর আগে একজন বাঙালি ক্লার্ক কোলিয়ারির অফিস থেকে টাকা চুরি করেছিল বলে সাহেব ম্যানেজার তাকে একদম বুকের মাঝখানে গুলি করে মেরে ফেলেছিল। তারপর থেকে এই শিমুলিয়ার চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ধু—ধু মাঠের মধ্যে অনেকেই সেই লোকটাকে দেখেছে। সাদা কুয়াশার মতন শরীর নিয়ে সে বুকের ওপর দু—হাত চেপে ধরে ঘুরে বেড়াত, আর হঠাৎ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠত—’বুক গেল রে—এ—এ!’।

শিমুলিয়ায় আসার ক’দিন বাদে, একদিন দুপুরে অদিতি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভাস্করবাবু তখন অফিসে। হঠাৎ অদিতি ধড়মড় করে উঠে বসল। একটা খুব বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে গেছে। অদিতির পাশে শুয়ে ববিনও ঘুমিয়ে পড়েছিল। অদিতি দেখল, ববিনও যেন তখনই ঘুম থেকে উঠল। শুধু তাই নয়, ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, খুব ভয় পেয়েছে। অদিতি জিগ্যেস করল, কী হল রে ববিন?

একটা বিচ্ছিরি স্বপ্প দেখলাম, মা। দেখলাম, একটা টানেলের মধ্যে দিয়ে তিনজন লোক লাইন দিয়ে এগিয়ে আসছে। তাদের গায়ে খাকি হাফশার্ট আর হাফপ্যান্ট। মাথায় সাদা হেলমেট। হাতে গাঁইতি। ঠিক কোলিয়ারির লেবারদের মতন ড্রেস।

অদিতি তাড়াতাড়ি ববিনের হাতটা জড়িয়ে ধরে বলল, ববিন, ওদের কারুর চোখে মণি ছিল না, তাই না? চোখগুলো একেবারে পচে যাওয়া লিচুর মতন নোংরা সাদা, তাই না? ওরা অন্ধের মতন থপ থপ করে এগিয়ে আসছিল আর ওদের গা থেকে এমন একটা পচা মাছের মতন গন্ধ ছাড়ছিল যে, গা গুলিয়ে যাচ্ছিল।

ববিন অবাক হয়ে বলল, হ্যাঁ, মা! তুমি কেমন করে জানলে?

ববিন, ওই স্বপ্নটাই তো আমিও এইমাত্র দেখলাম রে। ওই স্বপ্নটা দেখেই ভয়ের চোটে ঘুম ভেঙে গেল।

অদিতি আর ববিন, দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। একই স্বপ্ন, একই সময়ে দুজনে দেখেছে। এ কেমন করে হয়?

ববিন কিম্বা ওর মা, কেউই আর শুতে সাহস পেল না। যদি আবার ওই ভয়ের স্বপ্নটা দেখতে হয়? অদিতি একটা ম্যাগাজিন নিয়ে জানলার ধারের চেয়ারে গিয়ে বসল আর ববিন পায়ে চটি গলিয়ে বাগানে চলে গেল। বাগানে গিয়ে দেখল, মুক্তিদাদু যথারীতি একটা কুন্দফুলের ঝোপের পাশে বসে মাটি খুঁড়ছে। ববিন মুক্তিদাদুর পাশে উবু হয়ে বসে বলল, দাদু, কি স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার জানো; আমি আর মা একসঙ্গে একটা স্বপ্ন দেখলাম। বিচ্ছিরি একটা স্বপ্ন। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

মুক্তিনাথ মাহাতোর নীলচে চোখের মণিদুটো ববিনের মুখের ওপর দিয়ে জোড়া মৌমাছির মতন দ্রুত একবার ঘুরে গেল। তারপর সে বলল, তিনটে লোকের স্বপ্ন? তিনজন কয়লাখনির লেবারের স্বপ্ন? তোমার দিকে ওরা এগিয়ে আসছিল?

ববিন এত অবাক হয়ে গেল যে অনেকক্ষণ তার মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজই বেরোল না। তারপর সে বলল, দাদু, তুমিও কি স্বপ্নের মধ্যে ওই লোকগুলোকে দেখেছ?

মুক্তিনাথ বলল, দেখেছি বই কি ভাই। তবে স্বপ্নে নয়। সারদিন মাটি খুঁড়ি। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে চোখ চলে যায় পাতালে। সেইখানেই ওদের ঘোরাফেরা করতে দেখেছি। ওদের দেখেছি বলেই তো আমি তোমাদের বাগানে মালির কাজটা চেয়েচিন্তে নিলাম। কে জানত তোমার বাবা আবার এত বছর বাদে এই এরিয়ায় ফিরে আসবেন? সরকার সাহেবের জন্যে বড় চিন্তা হয়।

ববিন কিছুক্ষণ মুক্তিনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ধ্যাৎ। যত বাজে কথা। তারপর একা একাই পাঁচিলের গায়ে আঁকা উইকেটে রবারের বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলা আরম্ভ করল।

দুই

সেদিন রাতে ববিন আর অদিতি আর কোনো দুঃস্বপ্ন না দেখেই ঘুমোল। সত্যিকথা বলতে কি, ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে সেই প্রথম অদিতির মনে হল, শিমুলিয়া জায়গাটা নেহাত খারাপ নয়। কত শান্ত, কত গাছপালা চারিদিকে। এই যে একটা দোয়েল অদ্ভুত সুরের ঝরনা ঝরিয়ে দিচ্ছে, রানিগঞ্জে এরকম কি ও কখনো শুনেছে? তাছাড়া এখানে ভাস্করবাবুর কত সম্মান। আলাদা গাড়ি, আলাদা কোয়ার্টার। সারাক্ষণ হুকুম তামিল করার জন্যে দশটা লোক একপায়ে খাড়া। এসবেরও তো একটা দাম আছে।

অদিতি মুখটুখ ধুয়ে যখন চায়ের জল বসাবার জন্যে রান্নাঘরের দিকে গেল তখন ওর গলা দিয়ে গুনগুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর বেরোচ্ছিল। কিন্তু রান্নাঘরের দরজার শেকল খুলে ভেতরে পা দিয়েই তার গান থেমে গেল। বেশ জোরেই বলে উঠল—ও মা, এ আবার কী!

ভাস্করবাবুর তখন বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছিলেন। অদিতির গলার আওয়াজ শুনে তিনি ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। জিগ্যেস করলেন, কী হল? সাপ নাকি?

অদিতি মুখে কিছু না বলে আঙুল দিয়ে মেঝের দিকে দেখাল। ভাস্করবাবুও দেখলেন, লাল সিমেন্টের মেঝেয় এপাশ থেকে ওপাশ অবধি একটা ফাটল। ফাটলটা চওড়া বেশি নয়, কড়ে আঙুলের মতন হবে। কিন্তু লম্বায় এ দেওয়াল থেকে ও দেওয়াল অবধি প্রায় বারো ফুট। ফাটল—টা দেখে ভাস্করবাবু বেশ অস্বস্তিতে পড়লেন। দু’দিকে ঘাড় নেড়ে বললেন, এ তো ভালো লক্ষণ নয়। আজই ম্যানেজার সাহেবকে বলতে হচ্ছে।

অদিতি তার বরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কিসের লক্ষণ ভালো নয়? সত্যি কথাটা বলো দেখি।

ভাস্করবাবু আমতা আমতা করে বললেন, তেমন কিছু নয়। কয়লা কাটতে কাটতে মাটির নীচে বড় বড় সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে যায় তো। নিয়ম হচ্ছে সেগুলোকে বালি দিয়ে ভালো করে ভরাট করে দেওয়া। আমাদের গাফিলতিতে সেই কাজটাই অনেক সময় হয় না। তখন ওপরের মাটি ওই নীচের সুড়ঙ্গের মধ্যে ধসে পড়ে। এই ফাটলটা হচ্ছে তারই পূর্বলক্ষণ। মনে হচ্ছে এখানেও মাটির নীচে ভালো করে স্যান্ড—ফিলিং হয়নি।

অদিতি গোমড়া মুখে বলল, বাঃ, দারুণ সুখের কথা। চলো, তাহলে এবার সবাই মিলে বাড়ির সঙ্গে জ্যান্ত কবরে যাই।

ভাস্করবাবু বললেন, আরে না না। মেঝের একটা সরু ক্র্যাক দেখেই অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাড়ি তো আর একদিনে হুড়মুড় করে ধসে পড়ে না। তবে তোমাকে কথা দিচ্ছি, পনেরো দিনের মধ্যে আমরা নতুন কোয়ার্টারে চলে যাবো।

অদিতি তখনকার মতন শান্ত হল। কিন্তু আসল ঘটনাটা ঘটল সেদিন দুপুরে।

ভাস্করবাবু প্রতিদিনের মতন বাড়িতে লাঞ্চ করতে এসেছিলেন। লাঞ্চ সেরে আবার অফিসে ফিরে গেছেন। খাওয়াদাওয়ার পর ববিন শোয়ার ঘরের মেঝেয় বসে হোমটাস্ক করছিল। অদিতি একাই রান্নাঘরে সেলফের সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে গ্যাস—আভেনটা পরিষ্কার করছিল। হঠাৎ তার মনে হল পায়ের কাছে কি যেন সুড়সুড় করছে। প্রথমে অদিদি পাত্তা দেয়নি। ভেবেছিল সুড়সুড়ে পিঁপড়ে হবে বোধহয়। সে পা দুটো একবার ঝেড়ে নিয়ে একটা সরু তার দিয়ে বার্নারের ফুটোগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করেছিল।

কিন্তু একটু বাদেই অদিতি বুঝতে পারল সুড়সুড়ির ফিলিংসটা খুব তাড়াতাড়ি তার পা থেকে কোমর হয়ে আরো ওপরে উঠে আসছে। অদিতি এবার নিজের গায়ের দিকে চেয়ে দেখল আর দেখামাত্রই তার গলা দিয়ে একটানা তীক্ষ্ন একটা চিৎকার বেরিয়ে এল—মাআআ, মাআআ, মা গোওওও!

ফুলি পেছনের কুয়োতলায় বসে বাসন মাজছিল। সে বৌদির চিৎকার শুনে দৌড়তে দৌড়তে এসে যা দেখল তাতে তারও অজ্ঞান হয়ে যাবার জোগাড়। দেখল, মেঝের ওই ফাটলটা দিয়ে হাজারে হাজারে পোকা উঠে আসছে। সাদা, নরম, ছোট—ছোট পোকা। তাদের ডানা নেই, পা নেই, চোখ নেই। মুড়ির দানা—কে একটু বড় করলে যেমন দেখতে লাগবে, সেরকমই তাদের চেহারা। তবু শরীরটাকে ঢেউ খেলিয়ে তারা অদ্ভুত দ্রুততার সঙ্গে অদিতির শরীরে উঠে আসছিল। অদিতির পা থেকে কোমর হয়ে একটা সাদা পোকার চাদর তার বুকের দিকে উঠে যাচ্ছিল।

মায়ের চিৎকার শুনে ববিন পড়া ছেড়ে দৌড়ে এসেছিল। কাজের কাজটা প্রথম সে—ই করল। রান্নাঘরের কোনা থেকে ঝুলঝাড়ুটা টেনে নিয়ে ঝটপট মায়ের গা থেকে পোকাগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে শুরু করল।

অদিতি নিজেও শরীরে সাড় ফিরে পেয়েছে। প্রাণপণে লাফালাফি করে বাকি পোকাগুলোকে সে গা থেকে ঝেড়ে ফেলল। তারপরেই ছুটল বাথরুমের দিকে। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে ওয়াক ওয়াক করে বমি করার শব্দ পাওয়া গেল।

বাকি কাজটা শেষ করল ফুলি। পোকাগুলোকে ঝাঁটা দিয়ে আবার মেঝের ফাটলের মধ্যে টেনে ফেলে দিয়ে সে কেরোসিনের বোতল থেকে হড়হড় করে ফাটল বরাবর তেল ঢেলে দিল। তারপর একটা দেশলাই কাঠি জ্বেলে আগুন ধরিয়ে দিতেই বিচ্ছিরি মাংস পোড়ার গন্ধে ঘর ভরে গেল ঠিকই, তবে পোকাগুলোকে আর বেরোতে দেখা গেল না।

অদিতি ততক্ষণে শোয়ার ঘরে গিয়ে চোখের ওপর হাত চাপা দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। ববিন ঘরে ঢুকতেই সে বলল, ববিন, তুই একবার তোর বাবাকে ফোন করে সব কথা বল। বল, এখনি চলে আসতে। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার।

এখানে প্রত্যেক অফিসারের কোয়ার্টারেই পি. বি. এক্স. টেলিফোন রয়েছে। ইচ্ছে করলে অফিসের এক্সটেনশনে কথা বলা যায়। মোবাইলের কানেকশন কখন থাকে কখন থাকে না তার ঠিক নেই, তাই এই ফোনগুলো বেশ কাজে লাগে। বাবার এক্সটেনশন—নাম্বার ববিনের মুখস্থ।

সেদিন ববিন যখন ফোন করল, তখন ভাস্করবাবু খাদে নয়, নিজের অফিসেই ছিলেন। সব কথা শুনে তিনি নিজে তো দৌড়ে এলেনই, সঙ্গে নিয়ে এলেন দুজন মিস্ত্রি। তারা স্টোন—চিপস আর সিমেন্ট দিয়ে ফাটলটা ভালো করে বুজিয়ে দিয়ে গেল।

সবই হল, কিন্তু অদিতি পুরো ঘটনাটায় যে ভয়ঙ্কর শক পেয়েছিল তাতে তার শরীর খারাপ হয়ে গেল। নিশ্বাস নিতে পারছে না, বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। এমনই অবস্থা যে, ভাস্করবাবু ঠিক করলেন তখনই ওকে নিয়ে রানিগঞ্জে ডক্টর চ্যাটার্জির কাছে দেখিয়ে আনবেন। ডক্টর চ্যাটার্জি অনেক বছর ধরেই ওনাদের ফ্যামিলি—ফিজিশিয়ান। ভাস্করবাবু আর অদিতি, দুজনেরই তাঁর ওপরে অগাধ বিশ্বাস।

ডক্টর চ্যাটার্জির সঙ্গে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা হয়ে গেল। অফিসের গাড়িতেই ওঁরা দুজনে বেরিয়ে পড়লেন। ববিন নিজেই বলল, ও বাড়িতে থাকবে। ডাক্তারখানায় গিয়ে বসে থাকতে ওর কোনোদিনই ভালো লাগে না। আর তাছাড়া ও এটাও বুঝতে পেরেছিল, আজ বাবা—মার সঙ্গে রানিগঞ্জ গেলেও বিগ বাজার—টাজারে ঢোকার কোনো চান্স নেই।

ডক্টর চ্যাটার্জি সব শুনে বললেন, তেমন কিছু নয়। হঠাৎ শক থেকেই অদিতির নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে। ক’দিন ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। প্যাডের কাগজে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে তিনি আপনমনেই বললেন, আমি কিন্তু একটা অন্য ব্যাপার নিয়ে চিন্তিত, মিস্টার সরকার।

ভাস্করবাবু বললেন, কী ব্যাপারে বলুন তো?

আপনি পোকাগুলোর যেমন ডেসক্রিপশন দিলেন তাতে তো মনে হচ্ছে ওগুলো ম্যাগটস, মাছির লার্ভা।

এই অবধি শুনেই অদিতি মুখে হাত চাপা দিয়ে ওয়াক তুলল।

ডক্টর চ্যাটার্জি কথা থামিয়ে অদিতির ফ্যাকাশে মুখটা দেখলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, ঠিক আছে ম্যাডাম, আপনি বরং একটু বাইরে গিয়ে ফ্রেশ এয়ার খান। এনাকে দু—মিনিটের মধ্যে ছেড়ে দিচ্ছি।

অদিতি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ডক্টর চ্যাটার্জি আবার আগের কথার খেই ধরে বললেন, হ্যাঁ, যা বলছিলাম। ওই ম্যাগটস জন্মায় মরা পশুপাখির দেহে। আপনার রান্নাঘরের মেঝের নীচ থেকে ওরা উঠে এসেছে মানে জায়গাটা হাইজিনিক নয়। কাছাকাছি কোথাও ভাগাড়—টাগাড় আছে নাকি? আপনার বাড়ির ড্রেনটা হয়তো ওরকম কোনো জায়গায় গিয়ে মিশেছে।

ভাস্করবাবু অবাক হয়ে বললেন, কী বলছেন স্যার? কোলিয়ারির টাউনশিপের মধ্যে বাগানঘেরা বাড়ি। ভাগাড় কোথা থেকে আসবে?

ডক্টর চ্যাটার্জি প্রেসক্রিপশনের নীচে সই করে সেটা ভাস্করবাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, কী জানি! সেইটাই তো আমার প্রশ্ন।

ডক্টর চ্যাটার্জির কথাগুলো মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে ভাস্করবাবু বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর তিনি আর অদিতি গাড়িতে উঠলেন।

রানিগঞ্জ ছেড়ে বেরোতে আরো কিছুটা সময় লাগল। অদিতির ওষুধগুলো ছাড়া আরও কিছু কেনাকাটা ছিল, বিশেষ করে লম্বুগলির কচুরি আর জিলিপি ববিনের খুব প্রিয়। সে—জিনিস না নিয়ে বাড়ি ফেরা যায় না।

দুপুর থেকেই অল্প অল্প মেঘলা করেছিল। ছটা নাগাদ ওঁদের গাড়ি যখন জি টি রোড ধরল, তখন আকাশ কালো করে মেঘ ঘনিয়েছে। দু—চারবার বিদ্যুত চমকাল। তারপরেই শুরু হল ঝড়।

ভাস্করবাবুর গাড়ির ড্রাইভারের নাম বলরাম। ছেলেটার চেহারা যেমন সুন্দর তেমনি ফুর্তিবাজ। এই ক’দিনেই সে অদিতির খুব প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল। অদিতি জানলার কাচ তুলে দিতে দিতে বলল, বলরাম, সাবধানে চালিও ভাই। বলরাম বলল, আমি যতক্ষণ স্টিয়ারিং—এ আছি ততক্ষণ কোনো চিন্তা করবেন না ম্যাডাম।

ঝড় ক্রমশই বেড়ে চলেছিল। রানিসায়র মোড়ের কাছে একটা বিশাল বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং রাস্তার ধারের লোহার পোস্টের মাথা থেকে খুলে, এঁটো শালপাতার মতন উড়ে এসে পড়ল ঠিক ওদের গাড়ির সামনে। যদি বলরাম সময় মতন ব্রেক না কষত, তাহলে ওই ভারী স্টিলের পাতের নীচে ওরা চাপ পড়ত। দু—মিনিটের মধ্যেই রাস্তা ভর্তি হয়ে গেল ভেঙে পড়া গাছের ডালে আর পাতায়। উইন্ডস্ক্রিনের ওপর ওয়াইপার—দুটো ক্রমাগত শিকারি পাখির ডানার মতন ঝটপট করছিল, কিন্তু তাতে উপকার কিছুই হচ্ছিল না। কাচের ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল নায়েগ্রার মতন নেমে এসে সামনের রাস্তাকে মুছে দিচ্ছিল।

বলরাম বলল, স্যার, এই ওয়েদারে মিঠাপুর হয়ে যাওয়া যাবে না। ওদিকের রাস্তা এমনিতেই খুব খারাপ। তার ওপরে দু’দিকে বড় বড় পুকুর আছে। গাড়ির চাকা স্কিড করলেই পুকুরের মধ্যে গিয়ে পড়ব। তার চেয়ে নিস্তারিয়া হয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিই।

ভাস্করবাবু বললেন, তাই চল। নিস্তারিয়া কোলিয়ারি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য ওই রাস্তায় আর কখনো ঢুকিনি।

বলরাম বলল, আমিও ঢুকিনি। তবে আমার এক বন্ধু ক’দিন আগে নিস্তারিয়া হয়ে ফিরেছে। ও বলছিল, রাস্তা ভালোই আছে। আরো একটা ইনটারেস্টিং জিনিসের কথা বলেছিল। সেটাও পারলে আপনাদের দেখিয়ে দেব।

অদিতি তাই শুনে বলল, রক্ষা করো। আর ইনটারেস্টিং জিনিস দেখাতে হবে না। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িতে ঢুকতে পারলে বাঁচি।

বৃষ্টির জন্যেই গাড়ি ঘণ্টায় কুড়ি কিলোমিটারের বেশি স্পিড তুলতে পারছিল না। নিস্তারিয়া অবধি আসতে আসতেই ঘড়িতে বেজে গেল সাতটা, আর চারিদিকে নেমে এল গভীর অন্ধকার। তবে ভরসার কথা, ঘণ্টাখানেক একটানা মুষলধারে ঝরার পরে বৃষ্টির তেজটা তখন একটু কমেছিল।

গাড়ি তখন নিস্তারিয়া কোলিয়ারির রাস্তা ধরে চলেছিল। বাইরে অন্ধকার, তবু জানলার সঙ্গে গাল ঠেকিয়ে অদিতি অবাক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। অবাক হওয়ার কারণ রয়েছে। এরকম কোনো জায়গা ও এর আগে দেখেনি তো বটেই, থাকতে যে পারে, তাও ভাবেনি কখনো। একেকবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর সেই আলোয় অদিতি দেখতে পাচ্ছে রাস্তার দু’পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফাঁকা বাড়ির সারি। কোনো বাড়িটাতেই একটা জোনাকির আলো অবধি জ্বলছে না। ছাদ ভেঙে পড়েছে, উঠোনে বড় বড় ঘাসের জঙ্গল। দরজা—জানালার পাল্লাগুলো নিশ্চয় চোর—ছ্যাঁচোড়ে খুলে নিয়ে গেছে; শুধু খালি ফোকরগুলো কঙ্কালের চোখের ফুটোর মতন হা হা করছে।

আর থাকতে না পেরে অদিতি ভাস্করবাবুকে জিগ্যেস করল—হ্যাঁ গো, জায়গাটা এরকম কেন?

ভাস্করবাবু বললেন, পাঁচবছর আগে নিস্তারিয়ার মাটির নীচের কয়লা ফুরিয়ে গেছে। তখন থেকেই কোলিয়ারি বন্ধ। কোলিয়ারি বন্ধ হয়ে গেলে আর টাউনশিপে কে থাকবে বলো? তাই টাউনশিপ ফাঁকা করে সবাই চলে গেছে।

অদিতি হঠাৎ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, দেখো দেখো, এখনো কিন্তু কুকুরগুলো রয়েছে। ওদের কে খেতে দেয়?

সত্যিই, কুকুরের মতন দেখতে দুটো জন্তু রাস্তা পেরোতে গিয়ে চোখের ওপর জোরালো হেড—লাইট এসে পড়ায় থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বলরাম আলোটা একবার নিভিয়ে দিতেই জন্তু দুটো আবার এক দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে ঘন ঘাসবনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ভাস্করবাবু বললেন, ওগুলো কুকুর নয়, শেয়াল। এককালে কি জমজমাট ছিল এই নিস্তারিয়া কোলিয়ারি! সেখানে এখন রাস্তায় শেয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাবতেই কেমন যেন লাগে।

অনেকক্ষণ কেউ আর কোনো কথা বলল না। নিস্তারিয়ায় ঢোকার পর থেকে এমনকি বলরামের বকবকানিও থেমে গেছে।

আরো কিছুটা যাওয়ার পর ওদের চোখে পড়ল নিস্তারিয়া কোলিয়ারির চানক। পাঁচবছরেই চানকের মাথার বিশাল চাকাদুটোর অনেক স্পোক মরচে লেগে খসে পড়েছে। ডুলি ঝোলানোর স্টিলের মোটা রোপও ছিঁড়ে পড়েছে। একসময়ে যে জায়গাটা ডাম্পারের সারি আর লোকজনের ভিড়ে গমগম করত, এখন সেখানে আকন্দ আর পুঁটুশের ঘন ঝোপের মধ্যে বর্ষার ভিজে হাওয়া খড়খড় সরসর শব্দ করে ছোটাছুটি করছে।

বলরাম হঠাৎ চানকের কাছাকাছি একটা জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিল। অদিতি আর ভাস্করবাবু দুজনেই চমকে উঠলেন। ভাস্করবাবু বললেন, কী হল বলরাম?

একটা মজার জিনিস দেখাব বলেছিলাম না স্যার? ম্যাডাম, নেমে আসুন। আমার সেই বন্ধু এটার কথাই বলেছিল।

অদিতি মহা আপত্তি জুড়ল। বলল এই অলক্ষুণে জায়গা ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি বেরোতে পারি বাঁচি। তুমি আবার এখানে কোন মজা খুঁজে পেলে? না, নামা—টামা চলবে না। আর কিছু না হোক, সাপে তো কামড়াতে পারে।

বলরাম কিন্তু নাছোড়বান্দা। বলল, এরকম জিনিস আর দেখতে পাবেন না ম্যাডাম। কোনো ভয় নেই। আমার সঙ্গে টর্চ রয়েছে। সাপ—টাপ সব আলো দেখে পালাবে। এই বলে সত্যিই সে গাড়ির গ্লাভস—কম্পার্টমেন্টের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কিন্তু জোরালো এল. ই. ডি. টর্চ বার করে জ্বালিয়ে ফেলল। তীব্র সাদা আলোর বীম ছিঁড়ে ফেলল অন্ধকারকে। তাই দেখে অদিতির একটু সাহস হল। সে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, বেশি দূর যেতে পারব না কিন্তু।

বলরাম বলল, না না। বেশি দূরে যেতে হবে না। এই তো চানকের অফিস—বাড়িটায় যাব। এই বলে সে ভাস্করবাবু আর অদিতিকে টর্চের আলোয় রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চলল চানকের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বড় একতলা বাড়িটার সামনে।

যে কোনো কোলিয়ারির চানকের মুখেই এরকম একটা বড় অফিসঘর থাকে। শিমুলিয়াতেও রয়েছে। সাধারণত এই ঘরটায় কুলিদের হাজিরার হিসেব রাখা হয়। তাছাড়া কোন শিফটে কত কয়লা উঠল তার হিসেবও এখানেই রাখা হয়। কুলি বা অন্য যে—কেউ খাদে নামার সময় যে ব্যাটারিচালিত জোরালো সার্চলাইট—টা হেলমেটের সঙ্গে লাগিয়ে নীচে নামে, সেই ব্যাটারি আর আলো এই ঘর থেকেই নিতে হয়, আবার কোলিয়ারি ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সময় এখানেই জমা দিয়ে যেতে হয়। এক কথায়, কোনো কোলিয়ারিতে চানকের এই অফিসই হচ্ছে সবচেয়ে ব্যস্ত জায়গা।

স্বাভাবিকভাবেই নিস্তারিয়ার অফিসঘরে এখন মানুষের ব্যস্ততার কোনো ছবিই নেই। ব্যস্ততা যদি কারুর থাকে তাহলে রয়েছে জোনাকি আর ঝিঁঝিঁপোকাদের। ভাস্করবাবু, অদিতি আর বলরাম একটু কাছাকাছি যেতেই কার যেন ইশারায় হঠাৎ ঝিঁঝিঁদের তীব্র তীক্ষ্ন চিৎকার থেমে গেল আর সঙ্গে সঙ্গেই চারিদিক এমন ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধ হয়ে গেল যে, ওরা চমকে উঠল।

বলরামের পেছন পেছন ওরা দুজনে চানকের অফিসঘরের সামনে পৌঁছে গিয়েছিল। এবার একটা পাল্লাভাঙা জানলার মধ্যে দিয়ে টর্চের আলো ফেলে বলরাম ম্যাজিশিয়ানের মতন সুর লাগিয়ে বলে উঠল—এই দেখুন স্যার! এই দেখুন ম্যাডাম।

টর্চের আলোয় ওরা দুজন যা দেখল, তা সত্যিই দেখবার মতন দৃশ্য। অফিসঘরের দেওয়াল আছে, ছাদ আছে, কিন্তু মেঝে নেই। মেঝের জায়গায় একটা বিশাল চৌকোনা গর্ত। জানলার মধ্যে দিয়ে কোমর অবধি ঝুঁকিয়ে বলরাম সেই গর্তের মধ্যে টর্চের আলো ফেলল। জোরালো আলোর বীম নীচে নামতে নামতে অন্ধকারে হারিয়ে গেল, কিন্তু সেই গর্তের তল দেখা গেল না।

অদিতির মাথাটা হঠাৎ ভীষণ জোরে ঘুরে উঠল। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্করবাবুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে টাল সামলাল। তারপর বলল, চল ফিরে যাই। আমার ভালো লাগছে না। ভয় করছে ওদিকে তাকালে।

চলো।

ওরা গাড়িতে ফিরবার জন্যে পা চালাল। বলরাম কৃতিত্ব নেওয়ার ঢঙে বলল, কেমন ম্যাডাম? দারুণ জিনিস নয়?

অদিতি বলল, হুঁ। কিন্তু মেঝেটার এরকম দশা হল কী করে?

বলরাম উত্তরে যা বলল, মোটামুটি সেরকমই একটা কথা আজ সকালে ভাস্করবাবুর মুখেও শুনেছে অদিতি। বলরাম বলল, আমাদের এই এরিয়ার মাটির নীচে পুরোটাই তো কয়লার লেয়ার। কয়লা কেটে বার করে নেওয়ার পরে তাই মাটির নীচটা ফোঁপরা হয়ে যায়। নিয়ম হচ্ছে ফাঁকা জায়গাগুলো ভালো করে বালি দিয়ে প্যাক করে দেওয়া। কিন্তু সেই কাজটাই নানান কারণে করা হয় না, আর তখনই ওপরের পাতলা মাটির লেয়ার ধসে পড়ে একদম পাতালে। এখানেও তাই হয়েছে। সাহেব জানেন। সাহেব তো একসময় এখানে ছিলেন।

অদিতি কী যেন চিন্তা করতে করতে গাড়ি অবধি হেঁটে এল। তারপর গাড়িতে উঠে ভাস্করবাবুকে বলল, তুমি নিস্তারিয়ায় কাজ করেছ? কই, বলোনি তো কখনো!

যদিও গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজে বলরামের পক্ষে পেছনের সিটের প্যাসেঞ্জারদের কথাবার্তা শোনা সম্ভব নয়, তবু ভাস্করবাবু অদিতির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে গলাটা বেশ নামিয়ে নিলেন। বললেন, চাকরি জীবনের শুরুতে আমাকে ছ’মাস অন্তর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলি করত। সব কি তোমাকে বলা সম্ভব?

তিন

বৃষ্টি তখন পুরোপুরিই থেমে গেছে। শুধু মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল আর গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছিল। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত হয়ে অদিতি গাড়ির ব্যাক—রেস্টে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভাস্করবাবু উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মতন বসেছিলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনি গভীরভাবে কিছু ভেবে চলেছেন।

ভাস্করবাবুর মনে আছে, আরো কিছুটা গেলেই একটা ছোট নদী পড়বে। নদীটার ওপরে একটা কাঠের পুল ছিল। পুলটা পেরিয়ে গেলেই শিমুলিয়া কোলিয়ারির এলাকা।

মিনিট দশেকের মধ্যে সেই নদীটার কাছে পৌঁছোনো গেল। কিন্তু হঠাৎই বলরাম মুখে একটা ভয়ের আওয়াজ করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছনের সিট থেকে অদিতি বলল, কী ব্যাপার বলরাম? আবার কোনো ম্যাজিক দেখাবে নাকি?

বলরাম কিছু বলার আগে পাশের সিট থেকে ভাস্করবাবু উত্তর দিলেন—বলরাম নয়, ভাগ্য আমাদের আজ একটার পর একটা ম্যাজিক দেখাচ্ছে অদিতি। সামনে তাকিয়ে দেখো।

অদিতি ঘাড় বাড়িয়ে যে দৃশ্য দেখল তাতে তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে দেখল, ছোট নদীটা গত কয়েকঘণ্টার বৃষ্টিতে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। হেডলাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছে, তীব্রবেগে বয়ে যাচ্ছে রাশি রাশি ঘোলা জল। কী তার গর্জন! যেন নদী নয়, একটা হিংস্র ময়াল সাপ শিকার ধরার জন্যে ছুটে চলেছে। অদিতি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, বলরাম, এক্ষুনি গাড়ি ঘুরিয়ে নাও! এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকো না। আমার ভীষণ ভয় করছে। মনে হচ্ছে ওই নদীটা হাত বাড়িয়ে আমাদের গাড়িটাকে টেনে নেবে।

বলরাম বলল, হ্যাঁ ম্যাডাম। সত্যিই এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক নয়। জলের যেরকম তোড়, কখন যে পাড় ভেঙে আমাদের ডুবিয়ে নেয় তা তো বলা যায় না। আর দাঁড়িয়ে থেকে করবোই বা কী? জল কখন নামে তার কী কোনো ঠিক আছে? বলরাম কথা বলতে বলতেই ব্যাক গিয়ার দিয়ে অ্যাম্বাসাডরটাকে ঘোরাতে শুরু করল।

ভাস্করবাবু হতাশ গলায় বললেন, আবার সারা দুনিয়া ঘুরে সেই মিঠাপুর দিয়ে যেতে হবে। বাড়ি পৌঁছতে রাত বারোটা বেজে যাবে মনে হয়। তুমি একবার দেখো তো মোবাইলের টাওয়ার আছে কিনা। তাহলে ববিনকে বলে দাও আমাদের ফিরতে রাত হবে।

না, মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া গেল না। ভাস্করবাবু বললেন, তুমি ফুলিকে বলে এসেছ আমাদের দেরি হলে ববিনকে খাইয়ে দিতে?

অদিতি বলল, হ্যাঁ, আমরা না ফেরা অবধি ফুলি আমাদের বাড়িতেই থাকবে।

ভাস্করবাবু বললেন, ঠিক আছে। তাহলে চিন্তা নেই।

গাড়ি এগিয়ে চলল। আবার সেই নিস্তারিয়া কোলিয়ারির চানক। সেই জনশূন্য অফিসঘর, যার মেঝের জায়গায় অন্ধকার পাতাল—ছোঁয়া গর্ত।

আসবার সময় অফিসটাকে ওরা জনশূন্যই দেখেছিল। কিন্তু এখন আর তা বলা যায় না।

দরজা দিয়ে এক এক করে ওরা কারা বেরিয়ে আসছে? এক… দুই…তিন। মোট তিনটে লোক। তিনজন কয়লাখনির কুলি, তাদের গায়ে খাকি শার্ট আর হাফপ্যান্ট, পায়ে কাপড়ের কেডস—জুতো, মাথায় সাদা হেলমেট। ওরা অফিসঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সামনের সরু রাস্তাটার ওপরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘরটায় তো মেঝে বলে কিছু নেই। ওরা কোথায় ছিল তাহলে? পাতালে?

এখন ওদিকে যেতে গেলে ওদের সরিয়ে দিয়ে যেতে হবে। বলরাম দু—বার হর্ন দিল। সরে দাঁড়ানোর বদলে লোক তিনটে রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

বলরাম একবার ভালো করে ওদের দিকে দেখল। তারপরে গাড়ি থামিয়ে দিল। এই ঠান্ডার মধ্যেও ঘামের স্রোতে ওর কপাল, গাল সব ভেসে যাচ্ছিল। স্টিয়ারিং—এর ওপরে ওর হাতদুটো থরথর করে কাঁপছিল।

লোকগুলো একভাবে ওদের গাড়ির দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিল। কেমন অদ্ভুত ওদের হাঁটার ভঙ্গি। যেন মানুষ নয়, দম দেওয়া পুতুল। সেইরকমই টলতে টলতে, ঘাড় নাড়তে নাড়তে ওরা এগিয়ে আসছিল। এখন গাড়ির হেডলাইটের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তিনজনের তিন—দু’গুণে ছটা চোখ। সেই চোখে মণি বলে কিছু নেই। মুখ কাগজের মতন সাদা। ঠোঁট নীচের দিকে ঝুলে পড়েছে আর খোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে বড় বড় হলুদ দাঁতের পাটি। ওদের চলার সঙ্গে সঙ্গে গা থেকে ছিটকে পড়ছে সাদা পোকা—ম্যাগটস। পচা গন্ধে ভরে উঠছে বাতাস।

অদিতি থরথর করে কাঁপছিল আর ফিসফিস করে বলছিল—আমি ওদের চিনি। ওদের দেখেছি। ববিনও ওদের দেখেছে। কিন্তু ওরা এখানে এল কোথা থেকে? আমি তো স্বপ্ন দেখছি না।

ভাস্করবাবু এতক্ষণ পাথরের মতন সামনের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন। লোকগুলো যখন গাড়ি থেকে আর পঞ্চাশ মিটার দূরেও নেই, তখনই হঠাৎ তিনি দু—হাতে নিজের কপালের রগদুটো চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন—বাদল, সমীর, খোকন! আমি তোমাদের মারিনি। আমার কোনো দোষ ছিল না। বিশ্বাস করো, আমার কোনো দোষ ছিল না।

ভাস্করবাবুর এই চিৎকারেই বোধহয় বলরামের ভয়ের ঘোর কেটে গেল। সে হঠাৎ পুরো শক্তিতে অ্যাক্সিলারেটর দাবিয়ে উল্কার মতন সামনের দিকেই চালিয়ে দিল তার গাড়ি এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে রাস্তা ছেড়ে পাশের ঘাসজমি দিয়ে লোকগুলোর পাশ কাটিয়ে গাড়ি বার করে নিল।

বলরাম গাড়ির আয়নায় দেখল লোক তিনটে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে ওরা ইতিমধ্যেই অনেক দূর চলে এসেছে। আর ভয় নেই।

ওরা তারপর রাস্তায় আর একবারই দাঁড়িয়েছিল। মিঠাপুরে। মিঠাপুর বাজারে তখনো কয়েকটা দোকান খোলা ছিল। বলরাম বলল, স্যার, কিছু মনে করবেন না, আমি একটু চা খেয়ে আসি। না হলে আর গাড়ি চালাতে পারছি না।

বলরাম গাড়ি থেকে নেমে যেতেই অদিতি খুব নরম স্বরে ভাস্করবাবুকে বলল, তুমি আমাকে সত্যি করে বলবে, পনেরো বছর আগে নিস্তারিয়ায় কী হয়েছিল? ওরা কারা? ওদের কী বোঝাতে চাইছিলে তুমি?

ভাস্করবাবু ক্লান্ত গলায় বললেন, বলছি। সব বলছি। না বলে আমার উপায় নেই।

শিবপুর বি. ই. কলেজ থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছি। কতই বা বয়স তখন আমার? তেইশ? হ্যাঁ, ওইরকমই হবে। ফার্স্ট পোস্টিং হল ওই নিস্তারিয়া কোলিয়ারিতে।

প্রথমদিন খাদের নীচে নেমে বুঝলাম, র‌্যাগিং শুধু কলেজেই হয় না, চাকরির জায়গাতেও হয়। শম্ভুনাথ হাঁসদা বলে একজন সুপারভাইজার ছিল। তার অনেক বয়স, অনেক এক্সপেরিয়েন্স। খাদে নামা মাত্র আমার হাতে এক মুঠো ডিনামাইটের স্টিক ধরিয়ে দিয়ে বলল, তাহলে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, একটু দেখিয়ে দিন কোথায় কোথায় এগুলো বসাব।

পাথরের মতন শক্ত জমাট কয়লার লেয়ার তো শুধু গাঁইতি দিয়ে কাটা সম্ভব নয়, তাই প্রথমে ডিনামাইট ব্লাস্ট করিয়ে সেই লেয়ারের কিছুটা অংশ ধসিয়ে ফেলা হয়। তারপরে কুলিরা গাঁইতি দিয়ে খসে পড়া বড় বড় চাঙড়কে ভেঙে ট্রলিতে চাপিয়ে ডুলিতে লোড করে দেয়। এই ডিনামাইট স্টিক ঠিক কোথায় কটা বসালে যতটুকু চাইছি ততটুকু লেয়ার ভেঙে পড়বে, সেটা অনেক হিসেবের ব্যাপার। একটু এদিক—ওদিক হয়ে গেলে মাথার ওপরের ছাদ ভেঙে পড়বে নীচে। জ্যান্ত কবর হবে সবার। আবার কম হয়ে গেলে ব্লাস্টিং—এর আওয়াজটুকুই হবে, দেওয়ালের গা থেকে একটা চাঙড়ও খসে পড়বে না।

কলেজের ক্লাসরুমে বসে খাতায় ক্যালকুলেটরে এই ব্লাস্টিং—এর হিসেব শেখা এক জিনিস, আর সত্যিকারের খাদের নীচে ডিনামাইট ব্লাস্ট করানো আরেক। শম্ভু হাঁসদা সেটা জানত, তাই বদমাইশের মতন হেসে আমার হাতে স্টিকগুলো ধরিয়ে দিয়ে বলল, একটু দেখিয়ে দিন স্যার, কোথায় কোথায় বসাব।

শম্ভুর মতন সুপারভাইজারদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া না থাকলেও, স্রেফ এক্সপিরিয়েন্সের জোরেই ওরা নিখুঁতভাবে খাদানের সমস্ত কাজ করে ফেলতে পারে। এই কাজটাও শম্ভু অনায়াসেই নিজে করে নিতে পারত। কিন্তু ও চেয়েছিল প্রথমদিনেই আমার মতন একটা বাচ্চা ছেলে, যে ওর বস হয়ে জয়েন করেছে, তাকে একটু ঘোল খাওয়াতে।

আমারও কেমন যেন জেদ চেপে গেল। মনে মনে যাবতীয় ক্যালকুলেশন স্মরণ করে, হিসেবে যা বলছে সেইভাবেই, কোথায় কোথায় ডিনামাইট স্টিকগুলোকে ফিট করতে হবে দেখিয়ে দিলাম। আর অবাক কাণ্ড, প্রথমবারেই নিখুঁত ব্লাস্টিং হল। যতটুকু প্ল্যান ছিল ততটুকু কয়লার দেওয়ালই বিকট শব্দ করে খসে পড়ল। একটু কমও নয়, একটু বেশিও নয়।

প্রায় পঞ্চাশজন কুলি—কামিন ওই শিফটে ডিউটি করতে নেমেছিল। তারা একসঙ্গে হাততালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দন জানাল। শুধু শম্ভু হাঁসদার মুখটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। সে ভাবতে পারেনি, তার অর্ধেক বয়সের একটা ছেলে তাকে হারিয়ে দেবে। অবশ্য আমি ওর সঙ্গে কোনো কম্পিটিশনে নামতে চাইনি। কেন নামব? এটা তো খেলা নয়, আমাদের দুজনেরই চাকরি।

শম্ভু সে কথা বুঝতে চাইল না। দিনের পর দিন ও নানাভাবে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল।

সাধারণ লেবাররা কিন্তু আমাকে ভালোবাসত। তারা আমাকে সাবধান করত। বলত, শম্ভু এর আগেও নানা কারণে মানুষ খুন করেছে। লোকটা ভয়ঙ্কর বদমাশ আর হিংস্র প্রকৃতির। প্রায় সব সময়েই নেশায় চুর হয়ে থাকে। এর পয়সা কেড়ে নেয়, ওকে কাজ থেকে বার করে দেয়। কোলিয়ারির মেশিনপত্র চুরি করে বেচে দেওয়া তো ছিলই। কোলিয়ারির কর্তারা যে এসব কথা জানতেন না তা নয়। তবু তাঁরা শম্ভুর সব বদমাইশি মেনে নিতেন একটাই কারণে। পুরো কুলিবস্তির লোক শম্ভুকে যমের মতন ভয় পেত। শম্ভুকে দিয়ে কোলিয়ারির সাহেবরা নিজেদের অনেক অন্যায় ডিসিশন লেবারদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারতেন। শম্ভু সহায় থাকলে কারুর ক্ষমতা ছিল না সেই অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে একটা টুঁ শব্দ করে।

আমি লেবারদের জিগ্যেস করেছিলাম, তোমরা শম্ভুকে এত ভয় পাও কেন?

ওরা উত্তর দিয়েছিল—শম্ভুর হাত অনেক লম্বা স্যার। আসানসোলের কয়লা— মাফিয়াদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ আছে। বেআইনি খাদান থেকে যে কয়লা পাচার করার চক্র রয়েছে, শম্ভু তার চাঁই। ও দরকার হলে পুরো কুলিবস্তি জ্বালিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ওর গায়ে কেউ হাত দেবে না। সেইসব জানি বলেই ভয় পাই। আমরা লেখাপড়া জানি না, সামান্য লেবার। আমরা খুন হয়ে গেলে গাছের একটা পাতাও নড়বে না।

এইসব শুনে আমার আরও জেদ চেপে গেল। ঠিক করলাম যেভাবে হোক শম্ভুকে সবক শেখাব। তক্কে থাকতে থাকতে একদিন শম্ভুর একটা বড়সড় চুরি হাতেনাতে ধরে ওকে সিকিউরিটি পুলিশের হাতে তুলে দিলাম। সে এমনই চুরি যে, ইচ্ছের বিরুদ্ধেও ম্যানেজার ওকে ছ’মাসের জন্যে সাসপেন্ড করতে বাধ্য হলেন। অন্য কেউ হলে তার চাকরিটাই চলে যেত, তবে শম্ভু হচ্ছে শম্ভু—নিস্তারিয়ার মুকুটহীন রাজা। তার জন্যে ছ’মাসের সাসপেন্ডও বিরাট অপমান।

ছ’মাস বাদে সাসপেনশন থেকে কাজে ফিরে শম্ভু সত্যিই আমাকে খুন করার জন্যে উঠে পড়ে লাগল। সরাসরি নয়, তাতে বিপদ ছিল। আফটার অল আমি একজন সরকারি অফিসার। কিন্তু ঘুরপথের তো অভাব ছিল না। নিস্তারিয়া কোলিয়ারির কয়েক বর্গ—কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সুড়ঙ্গের জালের সবটাই ছিল শম্ভু হাঁসদার মুখস্থ। কোনোদিন ও আমাকে বেরোবার রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার নাম করে এমন একটা টানেলের মুখে ছেড়ে দিয়েছে, যে—টানেল শেষ হয়েছে মিথেন গ্যাসের চেম্বারের মধ্যে, যার মধ্যে একবার গিয়ে পড়লে মৃত্যু অনিবার্য। কখনো আমার পেছনে ছেড়ে দিয়েছে লোডেড ট্রলির লাইন। প্রত্যেকবারেই কিছুটা ভাগ্য আর কিছুটা বুদ্ধির জোরে বেঁচে গিয়েছি। কিন্তু কখনো কাউকে কিছু বলিনি। আত্মসম্মানে বাধত। একটা সামান্য গুন্ডা আর জোচ্চেচার আমাকে ভয় দেখাবে, আর আমি সবাইকে সেই দুঃখের কথা কাঁদুনি গেয়ে বলে বেড়াবো? কভি নেহি।

শেষমেশ সেই কালো দিনটা এল।

সেদিনও একটা ব্লাস্টিং করাচ্ছিলাম। অনেকদিন বাদে শম্ভু হাঁসদা দেখলাম বেশ খুশিমনে আমার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করছে। বলল, যতই রিটায়ারমেন্টের দিন এগিয়ে আসছে, ততই এই কোলিয়ারির সবার জন্যে ওর বুকের ভেতরে একটা মায়া তৈরি হচ্ছে। এমনকি আমাকেও নাকি ওর ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। আমি যেন পুরোনো ঝামেলার কথা ভুলে গিয়ে ওকে মাফ করে দিই।

আমি ভাবলাম, হবেও বা। মানুষের নেচার কি বদলায় না?

সেদিনের কাজটার কথা বলি। কয়লা কাটতে কাটতে একটা প্রায় দুশো—ফুট লম্বা টানেল তৈরি হয়েছিল। আমাদের প্ল্যান ছিল ওই টানেলটার শেষ মাথা থেকেই আরো কয়লা কাটতে কাটতে এগিয়ে যাবো, কারণ খুব হাই গ্রেড কয়লা পাওয়া যাচ্ছিল ওই জায়গাটায়। তাই টানেলের শেষ প্রান্তে কয়লার দেওয়ালের গায়ে ডিনামাইট—স্টিক ফিট করে, ফিউজ—তার টেনে নিয়ে ফিরে এলাম নিরাপদ দূরত্বে। তারের শেষ মাথায় সুইচে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল আমার তিন বিশ্বস্ত সহকারী—বাদল, সমীর আর খোকন। ওরা তিনজনেই ছিল খুব সিনিয়র লেবার। দারুণ কাজ জানত আর আমার জন্যে জান লড়িয়ে কাজ করত। ওদের তিনজনের হাতে দায়িত্ব দিয়ে আমরা বাকিরা নিয়ম মতন টানেলের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম।

বাদল, সমীর আর খোকন সুইচে চাপ দিল। ফিউজ তার বেয়ে বিদ্যুৎ ছুটে গেল ডিনামাইট স্টিকের মধ্যে। বিস্ফোরণের শব্দ কানে পৌঁছোনোর আগেই একটা আগুনের মতন গরম হাওয়ার ঝড় টানেলের ভেতর থেকে ছুটে এসে আমাদের সবাইকে মাটিতে ছিটকে ফেলে দিল।

মাটিতে মুখ গুঁজে শুয়েই শুনতে পেলাম বাজ পড়ার মতন কড় কড় আওয়াজ। আমার ঠিক পাশেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল বৃদ্ধ কুলি যামিনীদা। যামিনীদার মুখটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই ফিসফিস করে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেল সরকারসাহেব। টানেল ধসে পড়ছে। ওই শুনুন তার আওয়াজ।

তার পরের কয়েকঘণ্টার কথা ভাবতে ভালো লাগে না, কিন্তু এখনো প্রতিদিন কখনো না কখনো সেই ছবিগুলো আমার মনে ভেসে আসবেই।

আমি নিজেও চোট পেয়েছিলাম, তবু একদিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম পাগলাঘন্টির আওয়াজ। দেখছিলাম, ডুলি দুটো পাগলের মতন ওঠানামা করছে—চানক থেকে খাদ, আবার খাদ থেকে চানক। স্ট্রেচারের পর স্ট্রেচারে আমারই আহত সহকারীদের নিয়ে কাল্লা হসপিটালের দিকে ছুটে যাচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্স। ই. সি. এলের কুনুস্তোরিয়া—অফিস থেকে এসে পৌঁছোল স্পেশাল রেসকিউ—টিম।

সকলেই যন্ত্রের মতন কাজ করে যাচ্ছিল, কিন্তু মনে মনে সবাই একটা কথা বুঝতে পারছিল—বাদল, সমীর আর খোকনের মৃতদেহ কোনোদিনই আর উদ্ধার করা যাবে না। একটা আস্ত কয়লার পাহাড় ওদের ওপরে ধসে পড়েছে। সে পাহাড় কেটে ওদের কাছে পৌঁছোত হয়তো একশো বছর লাগবে।

অ্যাকসিডেন্টের পরের দিনই আমি কুলিবস্তিতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল সেই যামিনীবুড়ো। আমি দেখা করেছিলাম বাদলের পরিবারের সঙ্গে, সমীরের পরিবারের সঙ্গে। ওনারা সবাই কাঁদতে কাঁদতেই আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন—তুমি কী করবে সাহেব? তোমার কাজের অনেক সুখ্যাতি শুনেছি। তারপরেও যদি তোমার হাতে এমন ভুল হয় তাহলে বুঝতে হবে আমাদেরই কপালের দোষ। আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি। শুধু মাথা নিচু করে প্রাণপণে ভেবে যাচ্ছিলাম, কী ভুল করলাম? কোথায় হিসেবের গণ্ডগোল হল?

দেখা করেছিলাম খোকনের বাবার সঙ্গেও। হ্যাঁ, সংসারে ওরা মাত্র দুটি লোক ছিল—খোকন আর ওর বৃদ্ধ বাবা। একটা ভাঙা ঘরের দাওয়ায়, আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে তিনি বসেছিলেন। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াতে একবার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। মনে হল বুঝতেও পারলেন না, আমি কে, কেন এসেছি। আমার মনের মধ্যে যে তখন কী হচ্ছিল তোমাকে বোঝাতে পারব না। কেবলি ভাবছিলাম এনার একমাত্র রোজগেরে ছেলেটা আমার দোষে মরে গেল। ইনি এখন কী করবেন? এনার খাওয়া—পরা জুটবে কেমন করে? কেমন করে বাঁচবেন? আমি কান্না আটকাতে পারলাম না, কাঁদতে কাঁদতেই ওনার সামনে বসে পড়লাম। বললাম, বাবা, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আপনার ছেলেকে মেরে ফেলেছি।

বৃদ্ধ হঠাৎ কথা বলে উঠলেন। খুব শান্তভাবে বললেন, চিন্তা করবেন না। ওরা আবার ফিরে আসবে।

বুঝলাম শোকে—দুঃখে মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে এলাম।

এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই কিন্তু মন ভালো করে দেওয়ার মতন খবর পেলাম। কেমন করে এই দুর্ঘটনা ঘটল, সেটা খুঁজে বার করার জন্যে এনকোয়ারি কমিটি বসেছিল। তারাই সাতদিন ধরে নানান দিকে খোঁজখবর নিয়ে বার করল, সেদিন স্টোর থেকে যখন ডিনামাইট ইস্যু করা হয়েছিল, তখন কম পাওয়ারের ডিনামাইটের বদলে তার চেয়ে দশগুণ বেশি শক্তির ডিনামাইট দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্টোরের লোকেরা বলল, তাদের কোনো দোষ নেই। সেইরকমই রিকুইজিশন ছিল। আমিই নাকি সেই রিকুইজিশন—স্লিপে সই করেছি।

সেই রিকুইজিশন—স্লিপও খুঁজে পাওয়া গেল। বুঝতেই পারছ, আমার সই নকল করা হয়েছিল। কে করেছিল, সেটাও বুঝতে অসুবিধে হল না। শম্ভু হাঁসদা সেদিন নিজের হাতে স্টোর থেকে ডিনামাইট নিয়ে এসেছিল।

তার মানে পুরো ব্যাপারটায় আমার কোনো দোষ নেই। আমার বুক থেকে পাথর নেমে গেল।

তবু আমারই রিকোয়েস্টে আমাকে নিস্তারিয়া থেকে ট্র্যান্সফার করে দেওয়া হল। বুঝতে পারছিলাম, শম্ভুর কেরিয়ার খতম হয়ে যাওয়ার পর আমার শত্রু বাড়বে। ওর বন্ধুরাই আমাকে এখানে আর কাজ করতে দেবে না। ম্যানেজমেন্টও নিশ্চয় কথাটা বুঝেছিল, তাই বিশেষ আপত্তি না করেই আমাকে অন্য কোলিয়ারিতে ট্র্যান্সফার করে দিল।

কিন্তু এত কিছুর পরে শম্ভুনাথ হাঁসদার কী হল? সে আরেক অদ্ভুত ব্যাপার। ডিনামাইট চুরি করে কয়লাখনিতে ধস নামানোটা ওর পক্ষেও একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাটা আর নিস্তারিয়ার অফিসারদের নাগালের মধ্যে ছিল না। সেন্ট্রাল ইনডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের লোকেরা যখন ওর খোঁজে তল্লাশি চালাতে শুরু করেছে, তখনই একদিন দেখা গেল ধু ধু মাঠের মধ্যে এক জায়গায় আকাশে শকুনে চক্কর কাটছে। গ্রামের লোকেরা কৌতূহলী হয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখল, শম্ভু একটা জলার ধারে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। বিষে ওর সারা শরীর নীল। মনে হয় ওর অপরাধের কথাটা জানাজানি হওয়া মাত্র ও মাঠ পার হয়ে পালাতে গিয়েছিল, আর তখনই ওকে সাপে কামড়েছে।

বলরাম চা খেয়ে ফিরে এসেছিল। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনটা শেষবারের মতো লাল শালু দিয়ে মুছে নিয়ে তৈরি হচ্ছিল গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার জন্যে। গাড়ির ভেতরে ভাস্করবাবু অদিতিকে বললেন, এই হচ্ছে ঘটনা। পনেরো বছর বাদে আবার নিস্তারিয়ার পাশের কোলিয়ারি শিমুলিয়াতে ফিরে আসতে এইজনেই আমার বুক কাঁপছিল। মন বলছিল, একটা কিছু হবে। কিন্তু যা হল, তা কাকে বলব? কে বিশ্বাস করবে? কথাটা ভালো করে শেষ না করেই ভাস্করবাবু দু—হাতে মুখ ঢাকলেন। অদিতি ওনার পিঠে হাত রেখে বললেন, চিন্তা করো না। তুমি কাল সকালেই ট্র্যান্সফারের অ্যাপ্লিকেশন দাও।

ভাস্করবাবু বলল, কাল সকালটাকে অনেক দূর বলে মনে হচ্ছে অদিতি। মন বলছে আজকের রাতটা ভালো কাটবে না।

চার

বাবার একটা একস্ট্রা মোবাইল আছে। বাবা—মা দুজনেই যখন বাইরে কোথাও যায়, আর ববিন একা বাড়িতে থাকে, তখন ওই ফোনটা বাড়িতে রেখে যায়। আজকেও রেখে গিয়েছিল।

সন্ধের দিকে খুব ঝড় এসেছিল। বৃষ্টিও হল অনেকক্ষণ ধরে। ফুলিপিসি দৌড়ে দৌড়ে সব দরজা—জানলা বন্ধ করল। ববিনের তখন মা—বাবার জন্যে খুব চিন্তা হচ্ছিল। ওরা ফোন করছে না দেখে ববিন নিজেই মাকে ফোনে ধরবার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। টাওয়ারই ছিল না তো কেমন করে পারবে?

তারপরেও আরো অনেকবার ফোন করেছে ববিন। একবারও কানেক্ট করতে পারেনি। ওর বাবা—মার জন্যে চিন্তা তো হচ্ছিলই, তাছাড়া নিজেরও খুব ভয় করছিল।

ফুলিপিসি ওকে রাতের খাওয়া খাইয়ে দিয়ে বলল, তুমি একটু একা থাকতে পারবে? আমি তাহলে আমার বাচ্চাটাকে চট করে একটু দুধ খাইয়ে আসি। ববিন বলেছিল, পারব। তুমি এসে দরজার কড়া নেড়ো, আমি খুলে দেব। ফুলিপিসি যখন চলে গেল, তখন ববিন ঘড়ি দেখেছিল। দশটা।

খাওয়া—দাওয়ার পর ও টিভিতে একটু ছোটা ভীম দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু টিভিতেও ঝিরিঝিরি ছবি আসছিল। ঝড়ের জন্যেই বোধহয় টিভি, টেলিফোন সবকিছুই গুবলেট হয়ে গেছে। খুব বিরক্ত মুখে ববিন একটা টিনটিনের কমিকস নিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।

পড়তে পড়তে একবার ওর মনে হল দরজায় কেউ কড়া নাড়ল। ভাবল, ফুলিপিসি বোধহয় ফিরে এসেছে। ও দৌড়ে গেল, কিন্তু পিপ—হোল দিয়ে দেখল, দরজার বাইরে কেউ নেই।

আবার কিছুক্ষণ বই পড়ার পরেই মনে হল, বাইরে যেন গাড়ি থামার আওয়াজ পেল। ও আবার দৌড়ে গেল। কিন্তু নাঃ, কোথায় গাড়ি? তার মানে আবার ভুল শুনেছে। তখন আবার ঘড়ি দেখল ববিন। এগারোটা বাজতে দশ মিনিট বাকি।

এবার ববিনের সত্যিকারেই কান্না পাচ্ছিল। বাবা—মার গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করল না তো? ফুলিপিসিই বা এত দেরি করছে কেন?

ববিন আবার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ‘এক্সপ্লোরারস অন দা মুন’—এর পনেরো—নম্বর পাতায় ঢুকিয়ে রাখা পেজমার্ক ধরে পাতাটা খুলল। টমসন আর থমসনের মাথায় নীল—হলুদ সব চুল গজিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের জন্যে মন থেকে টেনশনটা উবে গিয়েছিল, কিন্তু তখনই ও প্রথম কাঁপুনিটা টের পেল। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে না থাকলে হয়তো টের পেত না—মেঝে—টা খুব আস্তে আস্তে কাঁপছে। যদি কেউ দোতলার ঘরে শুয়ে থাকে আর ঠিক তার নীচে একতলার ঘরে ফ্যান চলে, তখন যেমন কাঁপুনি বোঝা যায় সেইরকম। ববিন বই ভাঁজ করে রেখে দৌড়ে গিয়ে বাইরের দরজার খিল খুলে ফেলল। একবার ভাবল দৌড়ে বাগানের পেছনে ফুলিপিসির বাড়ি চলে যায়। কিন্তু বাগানটা এত ঘুটঘুটে অন্ধকার যে, সাহস পেল না। তাছাড়া একটু একটু লজ্জাও করল। ফুলিপিসি যদি পরে অন্যদের কাছে গল্প করে যে, ববিন ভয়ের চোটে বাড়ি ফাঁকা রেখে বাইরে চলে গিয়েছিল। না, দশ বছরের ছেলের এত অল্পে ভয় পেতে নেই। ববিন আবার শোয়ার ঘরে ফিরে এল।

বিছানায় শুয়েই ও বুঝতে পারল, মাটির নীচের কাঁপুনি—টা এর মধ্যেই অনেকটা বেড়ে গেছে। একটা দুম দুম করে আওয়াজ হচ্ছে যেন মাটির নীচে। আর তার সঙ্গে একটা পচা গন্ধ। গন্ধটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। এই গন্ধটাই ববিন আগের দিন স্বপ্নে পেয়েছিল। ববিন মোবাইলটা হাতে নিয়ে শেষ একবার মায়ের নম্বরে কল করল। না, টাওয়ার নেই। কী করবে বুঝতে না পেরে ববিন বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে ঘরের দরজাটায় খিল দিয়ে দিল। আর কি কেউ ঢুকতে পারবে? উঁহু। ওই বিরাট দরজা ভাঙতে গেলে ছোটা ভীমকেও বেশ কষ্ট করতে হবে।

ববিন ঘড়ি দেখল। এগারোটা কুড়ি। ওর খুব ঘুম পাচ্ছিল, কিন্তু বাবা—মা না এলে ঘুমোবে কেমন করে? তাই ও টিনটিনের বইটা নিয়ে ঘরের কোনায় একটা চেয়ারে গিয়ে বসল।

এগারোটা তিরিশ। বাংলোর গেটের সামনে ভাস্করবাবুদের গাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে ওঁরা দুজনে প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই বাড়ির দিকে আসছিলেন। বারান্দায় আলো জ্বলছিল। সেই আলোর নীচে ফুলি দাঁড়িয়ে। ওর মুখে কেমন যেন অপরাধীর ভাব। অদিতি সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকেই মুখ তুলে জিগ্যেস করল—কী হয়েছে রে ফুলি? ববিন কোথায়?

ভাস্করবাবু ভয়ার্ত গলায় বলে উঠলেন—ববিন ঠিক আছে তো?

ফুলি বলল, ববিন মনে হয় ভেতর থেকে খিল লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি অনেকক্ষণ থেকে ডাকছি, সাড়া দিচ্ছে না।

অদিতি ডাইনিং—হলের ভেতর দিয়ে প্রায় দৌড়তে দৌড়তেই জিগ্যেস করল, তুই ওর কাছে ছিলিস না?

ফুলি বলল, সারাক্ষণই ছিলাম। শুধু একটু আগে একবার বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াতে গিয়েছিলাম। ফুলির জবাবটা শুনেই ভাস্করবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনার যেন বোঝা হয়ে গিয়েছিল, কী হয়েছে। উনি আবার বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে গলা তুলে ডাকলেন—বলরাম! একবার গাড়ির স্প্যানারটা নিয়ে ভেতরে এসো তো।

অদিতি তখনও প্রাণপণে ধাক্কা দিচ্ছিল আর গলা তুলে চেঁচাচ্ছিল—ববিন! ববিইইন! দরজা খোল বাবা! দ্যাখ, তোর জন্যে কী এনেছি। ববিন! এত বড় ছেলে এইভাবে ঘুমোয়!

ভাস্করবাবু পেছন থেকে এসে হাতে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে অদিতিকে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে দিলেন। অদিতি অবাক হয়ে দেখল, ভাস্করবাবুর মুখটা টকটকে লাল। চোখ দেখলে মনে হচ্ছে উনি কাউকে খুন করতে যাচ্ছেন। অদিতি ভয়ের চোটে আর কোনো কথা বলল না।

ভাস্করবাবু ববিনকে ডাকলেন না। দরজায় ধাক্কা দিয়েও সময় নষ্ট করলেন না। শুধু ইঞ্জিনিয়ারের নিপুণ হাতে দরজার দুটো পাল্লার মধ্যে দিয়ে লোহার স্প্যানারটাকে গলিয়ে দিয়ে খিলটাকে নীচ থেকে ওপরে ঠেলে দিলেন। শব্দ করে ঝুলে পড়ল মোটা শালকাঠের খিল। তারপর এক ধাক্কায় পাল্লাদুটো হাট করে খুলেই পাথরের মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে পড়লেন ভাস্করবাবু।

অদিতি ভাস্করবাবুকে পেরিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পাগলের মতন একবার চারি—দিকে তাকাল। তারপর অজ্ঞান হয়ে মেঝের ওপরে পড়ে গেল। ফুলি শব্দ করে কেঁদে উঠল।

ওরা সকলেই দেখেছিল, বন্ধ ঘরের মেজের এদিক থেকে ওদিক অবধি হা—মুখ মেলে রেখেছে একটা অন্ধকার অতল ফাটল। ফাটলের মুখে পড়ে আছে একটা খুলে রাখা টিনটিনের কমিকস। ববিন ঘরে নেই।

ভাস্করবাবু যেন ঘুমের ঘোরে হেঁটে গেলেন টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখা টেলিফোনটার দিকে। রিসিভারটা যখন হাতে তুলে নিতে যাচ্ছেন, তখনই পেছন থেকে কেউ প্রশ্ন করল—আপনি কি পুলিশ ডাকার কথা ভাবছেন?

ভাস্করবাবু ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে চিনলেন। তারই বাগানের মালি, মুক্তিনাথ মাহাতা। কিন্তু এই মুক্তিনাথকে একদমই চেনা মুক্তিনাথ বলে মনে হচ্ছে না। কোথায় সেই অথর্ব বুড়ো, যে কিনা সারাদিন একটা খুরপি হাতে নিয়ে টুকটুক করে ঘাসের শেকড় উপড়োয়? এ যেন একটা পদ্মগোখরো সাপ, সটান ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে। কোথায় বার্ধক্য? কোথায় জরা? কী অদ্ভুত একটা শক্তি যেন মুক্তিনাথের চোখমুখ থেকে ফুটে বেরোচ্ছিল। এমনকি তার পরনের পোশাকও বদলে গিয়েছে। এখন সে পরে রয়েছে একটা রক্তলাল আলখাল্লা। মাথায় ওই রঙেরই পাগড়ি। কাঁধে একটা বাউলদের ঝোলার মতন নানা রঙের তাপ্পি—মারা ঝোলা।

ফুলি জড়োসড়ো হয়ে একপাশে সরে দাড়িয়ে নিজস্ব প্রথায় প্রণাম জানিয়ে বলল, জোহর জোহর জানগুরু।

জানগুরু! আদিবাসী গুণীন! এই মুক্তিনাথ? ভাস্করবাবু অবাক হয়ে মুক্তিনাথের দিকে তাকালেন। উনি তাহলে এই বাগানে মালির কাজ করতেন কেন?

মুক্তিনাথ ফুলির মাথায় অন্যমনস্কভাবে ডানহাতটা ছুঁইয়ে আবার জিগ্যেস করলেন, ববিনকে খুঁজে বার করার জন্যে কি থানা—পুলিশের কথা ভাবছেন?

ভাস্করবাবু ওপরে—নীচে ঘাড় নেড়ে রিসিভারটার দিকে হাত বাড়ালেন।

কেন পুলিশের কথা ভাবছেন? আপনি চোখের সামনে যা দেখছেন, তা কি পুলিশের আওতায় পড়ে?

মুক্তিনাথ মাহাতো ভাস্করবাবুর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই অদিতির পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েছিলেন। কাঁধের ঝোলা থেকে কি একটা পাতা বার করে দু’ হাতের চেটোয় সেটাকে ভালো করে ডলে নিয়ে অদিতির নাকের তলায় ধরেছিলেন আর সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরের ভেতরে জমে থাকা ফুল—বেলপাতা আর চন্দনের গন্ধের মতন একটা ঠান্ডা গন্ধে ঘরের পচা গন্ধটা যেন এক ঝটকায় অনেকটা পিছিয়ে গেল। অদিতি উঠে বসেই হুহু করে কেঁদে উঠল। মুক্তিনাথ তার মাথায় হাত রেখে বললেন, কাঁদবেন না মা। ছেলেকে আপনি ফিরে পাবেন। আমি ফিরিয়ে আনব।

ভাস্করবাবুর সারা শরীরে হঠাৎ ক্লান্তি নেমে এল। তাঁর মনে হল, মুক্তিনাথ মাহাতো যদি এই মুহূর্ত থেকে তাঁর সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেন, তাহলে বড় ভালো হয়। তাঁর নিজের ক্ষমতা নেই পাতালবাসী ওই তিনটে চলন্ত লাশের বিরুদ্ধে কিছু করার। মুক্তিনাথ ঠিকই বলেছেন। পুলিশেরও ক্ষমতা নেই। ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে ভাস্করবাবু বললেন, তাহলে কী করব? এখন আমি কী করব জানগুরু? চুপ করে বসে থাকব?

না, চলুন। আমরা বেরোব। সময় বড় কম।

মুক্তিনাথ আর ভাস্করবাবু দরজার দিকে পা বাড়াতেই অদিতি বলল, আমিও যাব।

মুক্তিনাথ বললেন, না মা। আপনাকে এই ঘরেই থাকতে হবে। ছেলে বাইরে থেকে কিসের টানে ঘরে ফেরে বলুন? মায়ের টানে, তাই না? মা ঘরে না থাকলে সে ফিরবে কেন?

অদিতি বিহ্বল দৃষ্টিতে মুক্তিনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ। কিন্তু মনে রাখবেন, ভোর অবধি। তারমধ্যে যদি ববিন না ফেরে তাহলে আমি নিজে আমার ছেলেকে খুঁজতে বেরোব।

বাগানে বেরিয়ে এসে ভাস্করবাবু বললেন, জানগুরু! অদিতির সামনে যে প্রশ্নটা করতে পারিনি, সেটা এখন করছি। আপনি আমাকে সত্যি কথাটাই বলবেন, আমি সহ্য করতে পারব। ওরা কি ববিনকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে? ববিন কি মরে যায়নি?

মুক্তিনাথ বললেন, ববিনকে তো ওরা চায় না। ওরা চায় আপনাকে। সেইজন্যেই ওরা ববিনকে বাঁচিয়ে রাখবে।

ভাস্করবাবু একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, আমি রাজি। ওরা ববিনকে ছেড়ে দিক। আমাকে ওরা মেরে ফেলুক, ক্ষতি নেই।

মুক্তিনাথ এই কথার কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি খুব দ্রুতপায়ে বাড়িটার চারপাশে মন্ত্র পড়ে বন্ধন দিয়ে এলেন। তারপর ভাস্করবাবুকে ডাকলেন, আসুন।

মুক্তিনাথ বাগানের গেটের দিকে এগোচ্ছিলেন। পেছন পেছন ভাস্করবাবু। হঠাৎ কুয়োতলার দিক থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। যেন বিরাট একটা উনুনের ওপর বিশাল হাঁড়িতে টগবগ করে জল ফুটছে। মুক্তিনাথ কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে বুঝবার চেষ্টা করলেন শব্দটা কিসের। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন কুয়োটার দিকে। ওঁরা দুজনে যখন কুয়োটার থেকে বড়জোর দশহাত দূরে তখনই হঠাৎ একটা জলস্তম্ভের মতন কুয়োর জল লাফ মেরে আকাশের দিকে উঠে গেল। ওঁরা দুজনেই কয়েক সেকেন্ডের জন্যে দেখতে পেলেন, সেই জলস্তম্ভের মাথায় ববিনের ভয়ার্ত মুখ। ববিন চিৎকার করে উঠল—বাবাআআআ। আমাকে বাঁচাও বাবা।

তারপরেই জলস্তম্ভ নেমে গেল কুয়োর মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে ববিনও হারিয়ে গেল।

ভাস্করবাবুকে কুয়োর পাড়ের ওপর থেকে টেনে নামালেন মুক্তিনাথ মাহাতো। বললেন, পাগলামি করবেন না। কুয়োর মধ্যে ববিন নেই। যা দেখলেন তা ববিনের ছায়া। ভাস্করবাবু বাগানের মাটির ওপরে মুখ গুঁজে শুয়ে হাঁফাচ্ছিলেন। মুক্তিনাথের কথা শেষ হওয়া মাত্র উনি বলে উঠলেন, আপনি একাই যান জানগুরু। আমি পারব না। আমার পা কাঁপছে। বুকে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি তো একটা মানুষ না কি? কত সহ্য করব?

শুকনো বাঘনখ ফলের একটা মালা ভাস্করবাবুর গলায় পরিয়ে দিয়ে মুক্তিনাথ বললেন, মানুষের সহ্যের কি কোনো সীমা আছে? চলুন। মা ঠাকরুণ বলে দিয়েছেন ভোরের আগে ফিরতে হবে।

ভাস্করবাবু মালাটায় হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করলেন—এটা পরালেন কেন?

ওটা আপনাকে ওদের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করবে, সবটা নয়। চলুন।

ভাস্করবাবু একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, অন্ধের মতন কোথায় যাব? সেই নিস্তারিয়া থেকে এই শিমুলিয়া অবধি মাটির নীচটা তো পুরোটাই ফোঁপরা। পুরোটা জুড়েই উইয়ের বাসার মতন আঁকাবাঁকা টানেল। সবটা জুড়লে হয়তো দুশো কি তিনশো কিলোমিটার হবে। তার মধ্যে কোথায় খুঁজব আমার ছেলেকে?

মুক্তিনাথ মুখে কোনো উত্তর না দিয়ে ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা বাঁদরের খুলি বার করে মাটির ওপরে গড়িয়ে দিয়ে বললেন, পথ দেখাও বাবা মধুমর্কট।

খুলিটা হালকা নীল আভায় জ্বলছিল, যেন ফসফরাস মাখানো আছে ওটার গায়ে, আর তাই অন্ধকারের মধ্যেও সেটাকে বেশ পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। যেন একটা খুদে পুলিশ—কুকুর। একবার এদিক, একবার ওদিক ঘুরে—ফিরে যেন কোনো একটা গন্ধের সুতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। লক্ষণ দেখে মনে হল যা খুঁজছিল তা পেয়েও গেল, কারণ হঠাৎই খুলিটা এঁকেবেঁকে গড়াতে গড়াতে গেট পেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। পেছন পেছন ছুটে চললেন মুক্তিনাথ, আর তাঁর পেছন পেছন ভাস্কর সরকার।

বলরাম গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, স্যার, গাড়িটা নিয়ে আসব?

চলতে চলতেই তার কথার উত্তর দিলেন ভাস্করবাবু—এখন দরকার নেই। ফোনটা হাতে রেখো। দরকার হলে তোমাকে ডেকে নেব।

কিছুক্ষণ থেমে থাকার পর আবার বৃষ্টি নেমেছিল। সেই ছিপছিপ বৃষ্টির ভেতর দিয়েই ভিজতে ভিজতে ওনারা অনুসরণ করে চলেছিলেন বাঁদরের খুলিটাকে। কখনো ঝোপ, কখনো রাস্তার ধারে জড়ো করে রাখা কাঁচা কয়লার স্তূপ পেরিয়ে গড়িয়ে চলেছিল সেই মন্ত্রপূত খুলি। ভাস্করবাবু মিনিট দশেকের মধ্যে ঘেমে চান করে গেলেন। তাঁর বুকটা হাপরের মতন ওঠানামা করছিল।

মুক্তিনাথের মধ্যে কিন্তু বিন্দুমাত্র ক্লান্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। তাঁর রক্তলাল—আলখাল্লা একটা আলেয়ার শিখার মতন অন্ধকারের ঢেউ ভেঙে ছুটে চলেছিল। তাঁকেও এ জগতের প্রাণী বলে মনে হচ্ছিল না। সেইদিকে তাকিয়ে ভাস্করবাবুর শরীরে একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল। একইসঙ্গে একটা ভরসাও।

চলতে চলতেই জানগুরু বললেন, আমি না থাকলেও কিন্তু আপনি ওদের খুঁজে পেতেন। আসলে তখন ওরাই আপনাকে খুঁজে নিত। এখন ওরা লুকিয়ে রয়েছে। কেন জানেন?

কেন?

আমার ভয়ে। ওরা জানে মাটির নীচে আমি ওদের কিছু করতে পারব না। ওটা মৃতদের রাজ্য। কিন্তু একবার যদি ওদের মাটির ওপরে পাই তাহলে দাদুভাইকে আটকে রাখে এমন সাধ্য ওদের নেই।

ভাস্করবাবুর মনে পড়ল সেই মড়ার মতন সাদা তিনটে মুখ, তিনজোড়া মণিহীন চোখ। তার বিশ্বাস হল না ওরা কাউকে ভয় পেতে পারে। কিসের জন্যেই বা ভয় পাবে? মৃতদের তো আর মৃত্যুভয় থাকে না।

ঠিক তখনই সেই বাঁদরের খুলিটা একটা ছোট জলার মধ্যে নেমে পড়ল। তারপর জল ছিটোতে ছিটোতে সেই নীলচে আগুনের বল সাঁতরে চলল ওপারে। পুকুরটাকে বেড় দিয়ে ওপারে যেতে যেতে ভাস্করবাবু জিগ্যেস করলেন, ওরাও কি এইরকম অদ্ভুত আঘাটা ধরেই চলে গেছে? একবারও রাস্তায় ওঠেনি?

মুক্তিনাথ বললেন, ‘চলে গেছে’ মানে? ওরা তো এখনো যাচ্ছে। ওরা যাচ্ছে মাটির নীচের কয়লাখনির টানেল ধরে। আর আমার মধুমর্কট সেই টানেলের ওপর দিয়ে ছুটছে। এখন যদি টানেলের ওপরে জল থাকে তো জলের ওপর দিয়েই মধু যাবে, আগুন থাকলে আগুন। ওকে কেউ থামাতে পারবে না।

ভাস্করবাবু নিজের পায়ের তলার জমির দিকে তাকালেন। মুক্তিনাথের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ওই মাটিরই অনেক নীচ দিয়ে তাঁর ছেলেকে কাঁধে নিয়ে দৌড়ে চলেছে তিনটে মৃতদেহ। ববিন কি বেঁচে আছে? না কি প্রচণ্ড ভয়ে ববিনের ছোট্ট হৃদপিণ্ডটা জমে বরফ হয়ে গেছে!

তিনটে মৃতদেহ কি আরেকটা মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে দৌড়চ্ছে?

হঠাৎ চলতে চলতেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন ভাস্করবাবু। কান্না—জড়ানো গলায় বললেন—ববিন, ববিন। সোনা আমার। তুই তো আমার সাহসী ছেলে বাবা। ভয় পাস না। আমি আসছি। তোর বাবা তোকে নিতে আসছে। তুই শুধু বেঁচে থাকিস, আর কয়েক ঘণ্টা বেঁচে থাকিস।

পাশ থেকে মুক্তিনাথ বললেন, আপনার ছেলে আমাকে প্রায়ই একটা কুকুরের গল্প বলত। একটা নেড়ি কুকুর, যাকে ও রানিগঞ্জে ছেড়ে এসেছে। দাদুভাই প্রাণের চেয়েও ভালোবাসত ওই কুকরটাকে। কুকুরটাকে কেমন দেখতে ছিল বলতে পারেন?

ভাস্করবাবু নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, নেড়িকুকুর যেমন হয় তেমনই ছিল। গায়ে মিশকালো লোম। চারটে থাবাই সাদা, মনে হত যেন মোজা পরে রয়েছে। আর কপালে একটা বড় সাদা লোমের টিপ।

আর চোখের মণির রং?

মনে পড়ছে না। কিন্তু এখন এইসব জিগ্যেস করছেন কেন বলুন তো। আমার বিরক্ত লাগছে এখন এইসব আবোলতাবোল বকতে।

মুক্তিনাথ বললেন, নাঃ, আসলে আপনার কান্না শুনে মনে হল, দাদুভাইয়ের মনটা একটু ভালোবাসার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া ভালো। নাহলে ওর পক্ষে সহ্য করা সত্যিই মুস্কিল।

পাঁচ

যেভাবে মানুষ কড়াইশুঁটির খোলা ফাটিয়ে দেয়, সেইভাবেই যেন কেউ মেঝেটাকে নীচ থেকে চিরে দিয়েছিল। পুরো ব্যাপারটা এত নিঃশব্দে ঘটেছিল যে, ববিন প্রথমটায় কিছু বুঝতেই পারেনি। বুঝতে পারল, যখন সেই ফাটলের ভেতর থেকে দুটো ঠান্ডা সাদা হাত বেরিয়ে এসে ওর পায়ের গোছদুটো চেপে ধরে টান মেরে ওকে ফাটলের ভেতরে ঢুকিয়ে নিল।

তারপর তো শুধুই নেমে যাওয়া আর নেমে যাওয়া। ঘন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে নামতে নামতে ববিন বুঝতে পারছিল, যে লোকটা তাকে কাঁধে নিয়ে ঢালু পথ ধরে নামছে, সে স্বপ্নে দেখা বীভৎস লোক তিনটের মধ্যে একজন। কেমন করে বুঝল তা ববিন ঠিক জানে না। তবে স্বপ্নের ভেতরে যে পচা গন্ধটা পেয়েছিল, সেই গন্ধটা তখনো তার নাকে এসে লাগছিল। আর সেই লোকটাও থপথপ করে হাঁটছিল। লোকটার দু—পাশে আরো দুজন লোক থপথপ করে হাঁটছিল। তাদের দেখতে না পেলেও পায়ের শব্দ পাচ্ছিল ববিন।

তারপরেই নিশ্চয় সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

জ্ঞান হওয়ার পর ববিন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবল, দেখেছ! আবার একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখছিলাম। কোথায় সেই ডিপ—ফ্রিজে রাখা চিংড়িমাছের মতন সাদা আর ঠান্ডা লোকগুলো? আমি তো দিব্যি রানিগঞ্জ সাহেববাঁধ—পাড়ার গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

গলির আকাশে একটা অদ্ভুত রুপোলি রঙের আলো, একটা সবুজ পাথরের মতন সূর্য। হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে নানারঙের ছোট ছোট কিউব, পিরামিড, আর সিলিন্ডার। ববিন কেমন করে যেন জেনে ফেলেছে ওগুলোই সাহেববাঁধ—পাড়ার পাখি আর প্রজাপতি। হঠাৎ ববিনের পেছন থেকে ভারী খুশির একটা ডাক ভেসে এল—ঘেউ। ববিন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল মোতি তার মুখের দিকে তাকিয়ে এমন প্রবল—বেগে ল্যাজটাকে নাড়াচ্ছে যে, ল্যাজটা যে কোনো সময়ে খসে পড়তে পারে। ববিন হাঁটু গেড়ে বসে মোতির গলাটা জড়িয়ে ধরল। মোতিও লম্বা জিভ বার করে ওর গাল চেটে দিল।

গলির দু’দিকে ইঁট বার করা অনেক পুরোনো বাড়ি। বাড়িগুলোর একতলায় ঘুপচি ঘরের সারি। ঘরগুলোতে জানলা নেই। ওখানে যারা থাকে তারা প্রায়ই দরজায় নোংরা মাদুর কিম্বা সতরঞ্চি ঝুলিয়ে রাখে। ববিন অনেকবার ভেবেছে, ওই ঘরগুলোয় ঢুকে দেখবে ওখানে কারা থাকে, তারা কী করে? কিন্তু ঠিক সাহস পায়নি। মা বলে ছেলেধরারা নাকি ওই ঘরগুলোতেই চুরি করা ছেলেমেয়েদের লুকিয়ে রাখে। কথাটা নিশ্চয় সত্যি নয়। ছেলেধরারা এরকম পাড়ার মধ্যে বাস করে না। আজ যখন সুযোগ এসে গেছে তখন একবার ঘরগুলো দেখে এলে হয়। ববিন ডাকল—চল মোতি। দেখে আসি।

প্রথম ঘরটায় একটা লোক পা—মেশিনে ঘড়—ঘড় করে রাশি রাশি মশারি বুনে যাচ্ছিল। স্বপ্নের মতন নীল মশারিতে ভরে যাচ্ছিল সেই বিচ্ছিরি ঘরটা। তার পাশের ঘরে একটা মস্ত বড় দুর্গাপ্রদীপের শিখায় ফুঁ—নল দিয়ে ফুঁ দিচ্ছিল এক স্যাঁকরা। নীল আগুনের নীচে তেলাকুচো ফলের মতন লাল হয়ে উঠছিল কার যেন একটা সোনার নাকচাবি। তার পাশের ঘরে একটা শানপাথরের গায়ে ছুরি—কাঁচি শান দিচ্ছিল একটা লোক। ঝরনার মতন ঝরঝর করে ঝরে পড়ছিল আগুনের ফুলকি। অন্ধকার ঘরগুলোর মধ্যে কত রকমের যে রূপের কারখানা! ববিনের খুব আফসোস হল, কেন সে আগে এদের দেখেনি? এত দেরি হয়ে গেল এই রূপের কারখানা খুঁজে পেতে। কতটুকুই বা দেখতে পাবে? সময় যে বড় কম।

কেন সময় এত কম? কোথায় তাকে চলে যেতে হবে? ববিন ঠিক বুঝতে পারছিল না। শুধু একটা ভোঁতা মনখারাপ তাকে আস্তে আস্তে চেপে ধরছিল। তার চোখের কোনায় জল জমছিল। মনে মনে সে বলছিল, কেন যাবে? এত তাড়াতাড়ি কেন যাবে? আমার যে কিছুই এখনো দেখা হল না।

ববিন মনখারাপ করে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতেই এক একবার তার মনে হচ্ছিল, সে যেন হাঁটছে না। তাকে কেউ কাঁধে করে নিয়ে যচ্ছে। সাহেববাঁধ—পাড়ার রুপোলি আকাশটাকে হঠাৎ টুকরো টুকরো অন্ধকার এসে ঢেকে দিচ্ছিল। একটা পচা গন্ধ…। কিন্তু মোতি তো রয়েছে। মোতি নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিল ববিনের মনখারাপ; বুঝতে পেরেছিল ববিনের ভয়। সে তাই প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লাফ দিয়ে ডেকে উঠল—ঘেউ ঘেউ ঘেউউউ।

সঙ্গে সঙ্গে আবার ববিনের পা মাটিতে ফিরে এল। অন্ধকারের জায়গায় ফিরে এল রুপোলি আকাশ। হাওয়ায় ক্যাডবেরি—ফুলের গন্ধ। গাছে গাছে রুবিক কিউবের মতন নানা রঙের চৌকোনা ফুল ফুটেছে। শুধু একটাই দুঃখ—ববিন মোতিকে আদর করতে গিয়ে দেখল, ওর চোখের মণিদুটো আর আগের মতোন ব্রাউন ব্রাউন নেই। কেমন যেন বুড়ো মানুষের মতন নীলচে সাদা হয়ে গেছে। নীল রঙের একটা জেমস লজেন্স জিভ দিয়ে একবার চেটে নিলে যেমন রং হয়, ঠিক সেইরকম।

শেষ অবধি মধুমর্কট জ্যান্ত লাশ তিনটের কাছে পৌঁছোনোর একটা রাস্তা খুঁজে পেল। শিমুলিয়া আর নিস্তারিয়ার সীমানা বরাবর সেই যে নদীটা, সেটা তখনও আগের মতনই ভীমবেগে বয়ে যাচ্ছিল। সেই নদীরই শিমুলিয়ার দিকের পাড়ে, নদীর চরার মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটা বেআইনি খাদান।

এই এরিয়ায় যদিও যেখানে ইচ্ছে মাটি খুঁড়লেই কয়লা পাওয়া যায়, তবু গভর্নমেন্টের আইন, ই. সি. এল ছাড়া সে কয়লা আর কেউ তুলতেও পারবে না, বিক্রিও করতে পারবে না। তবু অনেকেই তোলে, অনেকেই বিক্রি করে। নাটের গুরু থাকে শম্ভু মাহাতোর মতন হাতে গোনা কয়েকজন ক্রিমিনাল। মাফিয়া। তারাই গরিব লোকেদের দিয়ে কুয়োর মতন গর্ত খোঁড়ায়, গরিব লোকেরাই সেই গর্তে নেমে গিয়ে কয়লা তুলে আনে। তারপর সাইকেলের পেছনে বাঁধা বস্তায় ভরে সেই কয়লা জমা করে বড় বড় লুকোনো ডিপোতে।

নদীর ধারে, সাদাবালির চরার মাঝখানে, ওইরকমই একটা কুয়োর মুখ আশেপাশের বালির সঙ্গে মিশে ছিল। মধুমর্কট সোজা গিয়ে গর্তটার মুখ দিয়ে নীচে ঝাঁপ দিল। মুক্তিনাথ মাহাতো আর ভাস্করবাবুকে অবশ্য লাফিয়ে নামতে হল না। কুয়োর মুখ থেকে বেশ শক্তপোক্ত শালকাঠের সিঁড়ি নীচে নেমে গিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল কয়লা—চোরদের ওঠানামার জন্যেই সিঁড়িটা বানানো। ওই সিঁড়ি ধরেই ওনারা দুজন নীচে নামলেন।

প্রায় চল্লিশ ফুট নামার পর ওনারা পায়ের নীচে মাটি পেলেন। মাটি নয়, শক্ত কয়লার লেয়ার। এখান থেকেই সুড়ঙ্গের শুরু। এই সুড়ঙ্গ ই. সি. এলের মাইনসের মতন ডিনামাইট ফাটিয়ে বানানো হয়নি, কারণ লোক জানাজানি হয়ে যাবে বলে এই সব চোরা—খাদানে ব্লাস্টিং—এর সুযোগ নেই। এই সুড়ঙ্গ বানিয়েছে কুলিরা, স্রেফ কোদাল আর গাঁইতির ঘায়ে।

সুড়ঙ্গটা সরু আর নিচু। ঘাড় হেঁট করে ওটার মধ্যে ঢুকবার আগে ভাস্করবাবু একবার মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকালেন। অনেক উঁচুতে, কুয়োর মুখে, একটুকরো গোল আকাশ দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিথামা রাতের আকাশ। ওইটুকু আকাশের মধ্যেই অসংখ্য তারা ঝলমল করছে। ভাস্করবাবু সেই আকাশ দেখতে দেখতে ভাবলেন, হয়তো এই শেষবার দেখলাম। তারপর তিনি জানগুরুর পেছন পেছন সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।

কুয়োর মুখে পৌঁছোনোর পরেই মুক্তিনাথ বাঁদরের খুলিটাকে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ঝোলার মধ্যে পুরে ফেলেছিলেন। ভাস্করবাবু বুঝতে পারছিলেন, এরপর থেকে জানগুরু যা করবেন, সবই নিজের চোখের ওপর ভরসা করে। সামনাসামনি লড়াই। সেই লড়াইয়ে আর অলৌকিক চোখের দরকার পড়বে না।

সুড়ঙ্গে ঢোকার পরেই মুক্তিনাথ একটা মশাল জ্বালিয়ে নিয়েছিলেন। এত ভয়ের মধ্যেও ভাস্করবাবু যেন তাঁর কয়লাখনিতে কাজ করার অভ্যেসেই বলে ফেলেছিলেন, খোলা আগুন নিয়ে কয়লার খাদে ঢুকবেন?

মুক্তিনাথ বললেন, মিথেনের কথা ভাবছেন?

সত্যিই ভাস্করবাবু মিথেনের জন্যেই ভয় পাচ্ছিলেন। কয়লাখনির মধ্যে কখনো কখনো মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। বাতাসের থেকে ভারী বলে সেই গ্যাস মাটির কাছাকাছি জমে থাকে আর সামান্য আগুনের ফুলকির ছোঁয়া পেলেই দপ করে জ্বলে ওঠে। ডেভিস সেফটি—ল্যাম্প আবিষ্কার হওয়ার আগে অবধি খনিতে যত লোক কয়লা চাপা পড়ে মারা পড়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি লোক মারা পড়েছে খোলা আগুন নিয়ে অজান্তে মিথেন গ্যাসের ডিপোয় পা ফেলার জন্যে। তিনি জানগুরুর প্রশ্নের উত্তরে বললেন, হ্যাঁ।

চিন্তা করবেন না। আমি অনেক দূর থেকে মিথেনের গন্ধ পাই। আমার কাছে টর্চলাইট—ও আছে, এখনই জ্বালতে পারতাম। কিন্তু আগুনের কাজ সবসময় টর্চ দিয়ে হয় না, বুঝলেন? ওই দেখুন, ওরা আগুন দেখে কেমন সিঁটিয়ে যাচ্ছে।

কারা? জানগুরুর কথায় ভাস্করবাবু সামনের দিকে তাকালেন। মশালের আলো বড়জোর দশফুট দূর অবধি পৌঁছচ্ছিল। তার ওদিকে অন্ধকার ক্রমশ ঘন হতে হতে কয়লার কালোর সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। ভাস্করবাবু দেখতে পেলেন, সেরকমই একটা কোনায় অন্ধকারের তিনটে তাল নড়েচড়ে উঠছে।. তার মানে কি ওখানেই বসে আছে বাদল, খোকন আর সমীর? ওখানেই কি কোথাও ববিনকে ওরা আটকে রেখেছে?

ভাবতে না ভাবতেই জানগুরু কী যেন একটা গুঁড়ো মশালের ওপর ছুঁড়ে দিলেন আর সঙ্গে সঙ্গে মশালের আগুন রংমশালের মতন চোখধাঁধাঁনো সাদা শিখায় জ্বলতে শুরু করল। এখন আর দেখতে কোনো অসুবিধে নেই, সত্যিই ওরা ওই কোনাটায় গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বাদল, খোকন আর সমীর—তিনটে জিন্দা লাশ।

ওরা মণিহীন চোখ মেলে রেখেছে ভাস্করবাবুর মুখের ওপর। ওদের মরামুখের প্রত্যেকটা রেখায় ঘৃণা, ঘৃণা অর ঘৃণা। ওদের মুখ বলছে, মৃত্যুর পরেও ওরা যে বেঁচে আছে সে শুধু ওই একটা স্বপ্ন বুকে নিয়ে—ওরা ইঞ্জিনিয়ার ভাস্কর সরকারকে খুন করবে।

ভাস্করবাবু ভাবছিলেন, কিন্তু আমার ওপরে ওদের এত রাগ কেন? আসল খুন তো করেছিল শম্ভুনাথ। সেই তো ডিনামাইটের স্টিক পালটে দিয়েছিল। মৃত্যুর পরেও কি ভুল ধারণা থেকে যায়?

তারপরেই ভাস্করবাবুর মন চলে গেল অন্য চিন্তায়। ববিন কোথায়? ববিনকে দেখা যাচ্ছে না কেন? ভাস্করবাবু আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। প্রাণপণে গলা তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন—ববিইইইন!

”বাবা ডাকছে। বাবার কি এখন রানিগঞ্জে থাকার কথা? শিমুলিয়ার অফিসে কি আজ ছুটি?” ববিইইন!

”না, আবার ডাকছে। বাবারই গলা। কোনো ভুল নেই। ইচ্ছে করছে না, তবু যেতেই হবে। চল মোতি। জলদি দৌড়ো। নাহলে ভীষণ বকুনি খাবো।”

ওরা বোধহয় ববিনকে নিজেদের শরীরের আড়ালে কোথাও একটা শুইয়ে রেখেছে। জানে, ববিন যতক্ষণ ওদের খপ্পরে আছে ততক্ষণ জানগুরু ওদের কিচ্ছু করতে পারবেন না। এক সময় না এক সময় ভাস্করবাবুকে ছেলে ফিরে পাওয়ার জন্যে এগিয়ে যেতেই হবে, আর তখনই…।

হঠাৎ অদ্ভুত একটা ব্যাপার হল। বাদলদের মৃতদেহের পেছন থেকে ববিন লাফ মেরে বেরিয়ে এল। তারপর চেষ্টা করল ওদের পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে ছুটে আসতে। কিন্তু পারবে কেন? একটা হাত, সেটা বাদলের হতে পারে, কিম্বা সমীরের, ছিটকে গিয়ে ববিনের গলাটা টিপে ধরল। খোকনকে অনেকক্ষণ থেকেই দেখা যাচ্ছিল না।

”মোতি রে, দ্যাখ, গলায় মশারির দড়ির ফাঁস লেগে গেছে। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে রে মোতি। কী করি বল তো? চেষ্টা করব ফাঁস—টা ছিঁড়ে ফেলতে? দেখি তাহলে। আঃ, এইই, ইয়ায়া। পেরেছি মোতি। ছিঁড়ে ফেলতে পেরেছি। চল এবার যাই।”

ভাস্করবাবু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ববিন, দশ বছরের রোগা—প্যাংলা ববিন, দুটো ছোট্ট হাতে চাড় দিয়ে গলার ওপর থেকে ওই জিন্দা লাশের হাতের মুঠো খুলে ফেলল? এর পেছনে মুক্তিনাথের ম্যাজিক নেই তো? ভাস্করবাবু ববিনের দিকে এগোতে এগোতেও একবার চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে মুক্তিনাথকে দেখে নিলেন। দেখলেন ওনার চোখদুটো শক্ত করে বোজা। মুখ ঘামে ভেসে যাচ্ছে। মশালের হাতলের ওপরে ডানহাতটা এত জোরে চেপে বসেছে যে, মনে হচ্ছে আঙুলের হাড়গুলো মাংস—চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। জানগুরুই কি তাহলে নিজের শক্তি ববিনের শরীরে সঞ্চারিত করছেন?

খনির মেঝেতে দাঁড়িয়ে ববিনের সম্মোহন কেটে গেল। ভ্যাপসা গরম, অন্ধকার, পচা গন্ধ আর সর্বোপরি পেছন পেছন ছুটে আসা দুটো মৃতদেহ ববিনকে ভয়ে পাগল করে দিল। সে দৌড়তে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল, তারপর ওদের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে ডানাভাঙা পাখির মতন মেঝের ওপর দিয়ে শরীরটাকে হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে এগিয়ে এল বাবার দিকে।

ভাস্করবাবু দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে উলটোদিকে দৌড়লেন। পেছন পেছন মুক্তিনাথ।

বেরোবার মুখের সেই সিঁড়ি লাগানো কুয়োটার কাছে পৌঁছিয়ে ভাস্করবাবুর মনে হল তিনি এইবার নিশ্চিত অজ্ঞান হয়ে যাবেন। কারণ কাঠের সিঁড়িটা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিন মৃতদেহের একটি। খোকনই সম্ভবত। নিশ্চয় সুড়ঙ্গের পেছন দিক থেকে বেরিয়ে আসা কোনো একটা শাখা—সুড়ঙ্গ দিয়ে ও আগেই পৌঁছে গেছে সিঁড়ির মুখে। মুক্তিনাথের মুখটাও এই প্রথম ফ্যাকাশে লাগছিল। তিনি ভাস্করবাবুর হাতে টান দিয়ে বললেন, ওদিকে নয়। এদিকে আসুন।

ঘন অন্ধকারের মধ্যে মুক্তিনাথ কেমন করে যে কয়লার দেওয়ালের গায়ে অন্য একটা সুড়ঙ্গের মুখ খুঁজে পেলেন, ভেবেই পাচ্ছিলেন না ভাস্করবাবু। তবু পেছনে ছুটে আসা অন্য দুটো লাশের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে ববিনকে কোলে জড়িয়ে নিয়ে ওই সুড়ঙ্গটাতেই ঢুকে পড়লেন।

সুড়ঙ্গের মুখটা বড়জোর তিনফুট উঁচু। ফলে কোমর বাঁকিয়ে ঢুকতে হল, কিন্তু সেই একই কারণে আটকে গেল বাদল, সমীর আর খোকনের জিন্দা লাশ। দেখা গেল মৃত্যুর আড়ষ্টতা ওদের শরীরকে জড়িয়ে ধরেছে। ওরা কোমর ভাঁজ করে ওই নিচু সুড়ঙ্গে ঢুকতে পারছিল না।

কিছুক্ষণের নিশ্চিন্ততা। কিছুক্ষণের আয়ু। কিন্তু বেশিক্ষণের নয়। সুড়ঙ্গে ঢুকতে না পেরে ওরা যা করছিল সেটা অকল্পনীয়। খালি দু—হাত দিয়ে টেনে দেওয়াল থেকে বড় বড় পাথুরে কয়লার চাঙড় ছাড়িয়ে নিয়ে মেঝেতে আছড়ে ফেলছিল। তিনফুটের সুড়ঙ্গমুখ ইতিমধ্যেই লম্বায় আরো একফুট বেড়ে গিয়েছিল। বড়জোর মিনিট পাঁচেক বাদেই ওরা মাথা সোজা রেখেই ভেতরে ঢুকে আসতে পারবে।

ভাস্করবাবু একটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে একটু দম নিচ্ছিলেন। কিন্তু আর দেরী করা যাবে না। নিভু নিভু মশালটা হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিনাথ তাঁকে ডাকলেন, চলুন।

কোথায় যাব? ববিনকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জিগ্যেস করলেন ভাস্করবাবু।

সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই। এই সুড়ঙ্গগুলো অনেক সময় ঢালু হয়ে মাটির ওপরে পৌঁছিয়ে যায়; কয়লা তোলার সহজ রাস্তা আর কি। যদি তাই হয় তাহলে তো বেঁচে গেলাম। মাটির ওপর একবার যদি উঠতে পারি, তাহলে ওরা আমার সঙ্গে পেরে উঠবে না। কিন্তু অন্ধকারের জীবদের সঙ্গে অন্ধকারের মধ্যে টক্কর নেওয়া খুব কঠিন। খুউউব কঠিন।

ঠিক সেই সময়েই সুড়ঙ্গের মুখের কাছ থেকে একটা বুক কাঁপিয়ে দেওয়া শব্দ ভেসে এল। তার মানে খুব বড় একটা চাঙড় ওরা ভেঙে ফেলেছে। একটু বাদেই পাতালের নিস্তব্ধতা ভেঙে, মেঝেয় জমে থাকা জলের মধ্যে দিয়ে তিন জোড়া পায়ের এগিয়ে আসার ছপ ছপ শব্দ শোনা গেল। আর কোনো কথা না বলে ভাস্করবাবু আর মুক্তিনাথ সামনের দিকে দৌড়তে শুরু করলেন।

মুক্তিনাথের হাতের মশালের জোর কমে আসছিল বলে ওনারা বার বার হোঁচট খাচ্ছিলেন। মুক্তিনাথ তো একবার সটান মুখ থুবড়ে পড়েই গেলেন মেঝের ওপরে। তারপর হাত থেকে ছিটকে যাওয়া মশালটাকে তুলে নিতে নিতে আক্ষেপের সুরে বললেন, আরো একটা মশাল সঙ্গে না এনে ভুল করেছি। এটার তেল তো ফুরিয়ে এল বলে।

ভাস্করবাবুও ভেবে পাচ্ছিলেন না, মশাল নিভে গেলে কী হবে। কয়লাখনির নীচে যে অন্ধকার, তার সঙ্গে অন্য কোনো অন্ধকারের তুলনা হয় না। ওনারা তো অন্ধ হয়ে যাবেন, কিন্তু দেখতে পাবে যাদের চোখের মণি নেই, সেই মৃতদেহগুলো।

তাহলে? ভালো করে ববিনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে জিগ্যেস করলেন ভাস্করবাবু।

মুক্তিনাথ হঠাৎ কুকুরের মতন বাতাস শুঁকতে শুরু করলেন। একটু বাদে খুশি খুশি গলায় বললেন, ভগবান আমাদের সঙ্গে আছেন। নিশ্চয় আপনার কোলের ওই শিশুটির জন্যেই তিনি আমাদের রক্ষা করছেন। এদিকে আসুন সরকার সাহেব। আর দেরি করবেন না।

আরো একটা শাখা সুড়ঙ্গের উলটোদিকের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। মুক্তিনাথ ভাস্করবাবুর পিঠে একটা ঠেলা দিয়ে বললেন, দৌড়ন। এই সুড়ঙ্গটা ধরে দৌড়ন। যতক্ষণ দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা না খাচ্ছেন, ততক্ষণ থামবেন না। যা বললাম মনে রাখবেন, শেষ মাথায় না পৌঁছিয়ে থামবেন না।

নতুন সুড়ঙ্গের মধ্যে পা বাড়িয়েও ভাস্করবাবু থমকে গেলেন। বললেন, আপনি আসবেন না?

আসছি আসছি। এই নিন টর্চটা হাতে রাখুন। নাহলে হোঁচট খেয়ে পড়বেন।

এক হাতে জ্বলন্ত টর্চ আর অন্য হাতে ববিনকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে ভাস্করবাবু নতুন সুড়ঙ্গটার মধ্যে ঢুকে পড়লেন। সুড়ঙ্গটার অন্য প্রান্ত লক্ষ করে যতটা জোরে পারেন পা চালালেন। তিনি আশা করেছিলেন, জানগুরু কোনোভাবে ওই তিনটে জিন্দা লাশকে সুড়ঙ্গের মুখেই রুখে দেবেন। সেইজন্যেই বোধহয় তিনি সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হল না।

কিছুটা যাওয়ার পরে ভাস্করবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, বাদল, সমীর আর খোকনের পনেরো—বছরের পুরোনো লাশ তিনটে তাঁর পেছনে পেছনে সুড়ঙ্গে ঢুকে এল। সুড়ঙ্গের মুখে জানগুরু নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। লাশ তিনটে ওনার দিকে ফিরেও চাইল না, উনিও ওদের আটকাবার কোনো চেষ্টাই করলেন না।

ভাস্করবাবু প্রাণপণে দৌড়লেন। প্রায় এক কিলোমিটার দৌড়নোর পর তাঁর সামনে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। মেঝেতে জমে থাকা জলের ওপর ছপ ছপ আওয়াজটা হয়েই চলেছিল। ধীর মন্থর গতিতে লাশ তিনটে এগিয়ে আসছে। এক কিলোমিটার পথ পেরোতে ওদের কত সময় লাগবে? তিরিশ মিনিট? পঁয়তাল্লিশ মিনিট বড় জোর। ভাস্করবাবু বুঝতে পারছিলেন তাঁর দু—হাতের মধ্যে ববিন চড়াইপাখির ছানার মতন থরথর করে কাঁপছে।

নিরেট দেওয়ালের গায়ে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাস্করবাবু উঁচু গলায় চিৎকার করে বললেন, এইজন্যেই তাহলে আপনার এত উদ্যোগ জানগুরু? কিন্তু কেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছিলাম?

ভাস্করবাবুর সেই কথাগুলো নিরেট দেওয়ালে প্রতিফলিত হতে হতে সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা জানগুরুর কানে পৌঁছোল। মুক্তিনাথ বললেন, আমাকে চিনতে পারেননি, তাই না সরকার সাহেব?

আপনি…আমাদের আগে দেখা হয়েছিল?

হয়েছিল বই কি। সাপের মতন হিস হিস শব্দে হেসে উঠলেন মুক্তিনাথ মাহাতো। পনেরো বছর আগে আপনি আমার বাড়িতে এলেন। ক্ষমা চাইলেন আমার ছেলের মৃত্যুর জন্যে। চোখের জল ফেললেন। মনে পড়ছে না?

ভাস্করবাবুর মনে হল তাঁর দম আটকে আসছে। তিনি কোনোরকমে বললেন, আপনি খোকনের বাবা?

একদম ঠিক ধরেছেন সাহেব। আমি খোকনের বাবা। দেখুন, আমার খোকন কেমন টলোমলো পায়ে আপনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে ওর দুই বন্ধুও রয়েছে। মনে আছে…মনে আছে সাহেব, আমি সেদিনই আপনাকে বলেছিলাম—চিন্তা করবেন না। ওরা আবার ফিরে আসবে?

জানগুরুর হাসিটা যে উন্মাদের হাসি সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। সেই উদ্ভট হাসির ওপরে গলা চড়িয়ে ভাস্করবাবু চেঁচিয়ে বললেন, কিন্তু ওরা বেঁচে উঠল কেমন করে?

আমিই বাঁচালাম। আমি জানগুরু, আমি মরা বাঁচাতে পারি।

ছেলের মৃত্যু সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই যেদিন অ্যাকসিডেন্ট হল সেদিনই গভীর রাতে যেখানে ওদের মাথার ওপরে ধস নেমেছিল সেই মাটির ওপরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ডেকে আনলাম আকাশের বিদ্যুৎ আর পাথরের বিষ—কে। ওদের শরীরগুলোকে দম দেওয়া পুতুলের মতন চালু করে দিলাম।

সেইদিন থেকেই ওরা আমার হাতের পুতুল। আদরের পুতুল আমার। পনেরো বছর ধরে ওরা মাইলের পর মাইল অন্ধকার টানেলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর আপনার জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি ভাবতেও পারিনি, আপনি সত্যিই আবার কোনোদিন এই এরিয়ায় ফিরে আসবেন।

দোহাই, দোহাই আপনার জানগুরু। যদি আপনার হাতের পুতুলই হয়, তাহলে ওদের থামান। ওদের বোঝান, ওদের মৃত্যুর জন্যে আমি দায়ী নই।

তা যে আর হয় না সরকার সাহেব। আপনি যে আমার দাওয়ায় বসে কাঁদতে কাঁদতে আপনার চোখের জল মোছা রুমালটা ফেলে গিয়েছিলেন, সে কথা বোধহয় আপনার মনে নেই। সেই রুমাল আমি প্রথমদিনেই ওদের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলাম, যতদিন না এই লোকটাকে মারতে পারছিস, ততদিন তোরা ঘুমোস না। এই লোকটা তোদের চারিদিকে বোমা বেঁধে দিয়ে নিজে পালিয়েছিল।

ভাস্করবাবু বললেন, কিন্তু সে কথা তো সত্যি নয়। সকলেই জানে শম্ভুনাথ হাঁসদা ওদের মেরেছিল।

সে কথা জানার পরে আমিও তো শম্ভুনাথকে ছাড়িনি। আমি ওকে মাঠের ওপরে বিষবাণ মেরেছিলাম। আপনারা ভেবেছিলেন বুঝি সাপে কেটেছে। কিন্তু সত্যি কথাটা জানতে জানতে তো এক সপ্তাহের বেশি পেরিয়ে গিয়েছিল। ততদিনে তো আমি খোকন, সমীর আর বাদলের হাতে আপনার ডেথ—ওয়ারেন্ট তুলে দিয়েছিলাম। সে ওয়ারেন্ট ফেরানোর মন্ত্র আমার জানা নেই সরকার সাহেব।

ভাস্করবাবু আবার চিৎকার করে বললেন, তাহলে কি এইভাবে মরব? আমার নিষ্পাপ ছেলেটা এমন বীভৎস ভাবে মরবে? ও তো কিছুই জানে না। ওর কী দোষ?

হঠাৎই সুড়ঙ্গের মুখের কাছ থেকে মশালের আগুনটা ভেতরের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। জানগুরু এগিয়ে আসছেন। কেন? উনি কি কাছ থেকে দেখতে চান কেমন করে তিনটে জিন্দা লাশ ভাস্করবাবু আর ববিনের মুন্ডুগুলো ঘাড়ের ওপর থেকে টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে? উনি কি রেলিশ করতে চাইছেন সেই নরকীয় দৃশ্য? প্রচণ্ড ঘৃণায় ভাস্করবাবু মেঝের ওপরে থুতু ফেললেন। তারপর চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলেন ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসা তিনজোড়া পায়ের আওয়াজ।

ভাস্করবাবু কানের আন্দাজে বুঝতে পারছিলেন বাদলদের সঙ্গে তাঁর ব্যবধান আর দুশো মিটারও নয়। তবে জানগুরুর হাতে ধরে থাকা মশালটাকে তিনি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছিলেন। এখন জানগুরু চলে এসেছেন ওদের একশো মিটার পেছনে।

কী করতে চান উনি?

হঠাৎ জানগুরু চেঁচিয়ে উঠলেন—সরকার সাহেব! আপনাকে যেমন বলেছিলাম, একদম দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছেন তো? তাহলে এবার ঘুরে যান, দেওয়ালের দিকে ঘুরে যান। দাদুভাইকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখুন। খবর্দার এদিকে ফিরবেন না।

কী যেন ছিল মুক্তিনাথের সেই নির্দেশের মধ্যে, ভাস্করবাবু সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালের দিকে ঘুরে গেলেন। অবশ্য তার আগেই তিনি চোখের কোণ দিয়ে দেখে নিয়েছেন এক আশ্চর্য দৃশ্য। জানগুরুর হাতের সেই জ্বলন্ত মশাল হাওয়ার মধ্যে একটা বাঁক খেয়ে উড়ে আসছে তিনটে জিন্দা লাশের দিকে।

ওরা বোধহয় কিছু বুঝতে পেরেছিল। মণিহীন চোখগুলো তুলে তাই তাকিয়েছিল ওপর থেকে নেমে আসা মশালের দিকে।

মশালটা মাটি ছোঁয়ার পরে খুব বড় কোনো বিস্ফোরণ ঘটল না। শুধু মৃতদেহ তিনটের পায়ের কাছে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। যেন একটা আগুনের সুইমিংপুল, যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওরা তিনজন কিছুক্ষণ দু—হাত তুলে লাফালাফি করল। তারপর আস্তে আস্তে আগুনের মধ্যেই ডুবে গেল বাদল, সমীর আর খোকন। পোড়া গন্ধে ভরে গেল সুড়ঙ্গ।

দেওয়ালের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন ভাস্কববাবু। ভয়ে ভয়ে তাকালেন নিভে যাওয়া অগ্নিকুণ্ডের দিকে। তারপর কুণ্ডের ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিনাথকে জিগ্যেস করলেন, মিথেন? এখানে মেঝের ওপর মিথেন জমেছিল? আপনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাই না?

মুক্তিনাথ ওপরে—নীচে ঘাড় ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, অনুমান সঠিক। তারপর বললেন, ওই জায়গাটা সাবধানে পেরিয়ে চলে আসুন। এবার আমাদের ফিরতে হবে।

ছয়

কুয়োর নীচে দাঁড়িয়ে আবার ওপরের দিকে তাকালেন ভাস্করবাবু। এখনও দেখা যাচ্ছে সেই একটুকরো গোল আকাশ। তবে সেই আকাশে এখন তারা নেই। বেনেবউ পাখির বুকের পালকের মতন ভোরের নরম হলুদ আলোয় ভরে আছে।

কাঠের সিঁড়ি বেয়ে বাইরে এসে এতক্ষণ বাদে ববিনকে কোল থেকে চরার সাদা বালির ওপর নামিয়ে দিলেন ভাস্করবাবু। ববিন মাটিতে পা রেখেই প্রশ্ন করল, দাদু কই?

এই যে দাদুভাই। আমি এসে গেছি। বাঁ—হাতে সিঁড়ির কাঠামো ধরে কুয়োর ভেতর থেকে বাইরের মাটিতে নেমে এলেন মুক্তিনাথ মাহাতো। ভাস্করবাবু দেখলেন, তিনি ডানহাতের মুঠোর মধ্যে কী যেন শক্ত করে ধরে রেখেছেন।

ভাস্করবাবু জিগ্যেস করলেন, আপনার হাতে কী?

মুক্তিনাথ বললেন, ছেলের অস্থি আর ভস্ম নিয়ে এলাম সাহেব। এ জিনিসের যে কি ভয়ঙ্কর ওজন, তা যেন কোনো বাবাকে বুঝতে না হয়। তবে মৃত্যুর পনেরো বছর পরে আজ খোকনের সৎকার হবে সাহেব…সৎকার হবে।

তারপর হঠাৎ কথা পালটে জানগুরু বলে উঠলেন, আপনার পকেটে মোবাইলটা রয়েছে তো? তাহলে বলরামকে ডেকে নিয়ে রওনা হয়ে যান। ভোর হয়ে গেছে। আর বেশি দেরী করলে মা ঠাকরুণকে ঘরে আটকে রাখা যাবে না।

আর আপনি?

আমি? একবার ডানহাতের মুঠোর দিকে তাকালেন জানগুরু। তারপর ববিন শুনতে না পায় এইভাবে ফিসফিস করে বললেন, আমি এখন ছেলের এই অস্থিভস্মটুকু ওই নদীর জলে বিসর্জন দিতে যাব সাহেব। এক অদ্ভুত কায়দায় বিসর্জন দেব বলে ঠিক করেছি। হাতের মুঠোয় এই ছাইটুকু ধরে বুক—জল…গলা—জল…তারপর আরো গভীরে নেমে যাব। আর উঠব না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *