দাঙ্গাবিরোধী গল্প – সম্পাদনা ও অনুবাদ : কমলেশ সেন
দাঙ্গাবিরোধী গল্প – সম্পাদনা ও অনুবাদ : কমলেশ সেন
Dangabirodhi Galpo: A short story collection in Bengali. Translated and edited by Kamalesh Sen
প্রথম সংস্করণ – মার্চ ১৯৮২
প্রচ্ছদ – তমাল ভট্টাচার্য
.
মুখবন্ধ
ভারতবর্ষের রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে সাম্প্রদায়িতার উৎস, সময়কাল এবং গতি-প্রকৃতি নিয়ে বিদ্বজ্জনদের মধ্যে অবশ্যই যথেষ্ট মতবিরোধ আছে। এই মতবিরোধ থাকা স্বাভাবিক। তবে তাঁরা অধিকাংশই অন্তত একটা বিষয়ে একমত যে, ব্রিটিশ শাসনকালে একদিকে যেমন সাম্প্রদায়িক ঐক্য গড়ে উঠেছে এবং সেই ঐক্য জঙ্গি রূপ নিয়েছে; তেমনি অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চক্রান্তে একাধিকবার সাম্প্রদায়িক অনৈক্য এবং রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছে। জাতীয় আন্দোলনে বিভেদ সৃষ্টি করে আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী অত্যন্ত সুকৌশলে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি চালিয়ে গিয়েছে— যে রাজনীতি আজ সুগভীরভাবে এদেশের মাটিতে প্রোথিত।
একদিন এই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরাই বিপ্লবের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম দেয়—যাতে বিপ্লবের রাশ জাতীয় কংগ্রেসের বুর্জোয়া নেতাদের হাতে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতবর্ষের শোষিত নির্যাতিত মানুষ এই কংগ্রেসের পতাকাতলেই জমায়েত হয়। তাই কংগ্রেস নেতৃত্বের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বেড়াজাল বারবার ভেঙ্গে পড়ে সেই আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও শাসনের ভিত কাঁপিয়ে তোলে।
জাতীয় আন্দোলনের উদ্ভব এবং বিকাশের যুগে জাতীয়তাবাদী হিন্দু নেতারা জাতীয়তার ভারতীয় ভিত্তিভূমি অনুসন্ধান করছিলেন। প্রাচীন হিন্দুধর্ম এবং সামন্ততান্ত্রিক হিন্দু সংস্কৃতিকেই তাঁদের জাতীয়তার ভিত্তি করলেন। ফলে গো-রক্ষা সমিতি স্থাপন, শিবাজী উৎসব এবং গণেশ পূজারও প্রচলন এবং বাঙলা দেশে শক্তির উপাসনা শুরু হয়। এমন কি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনও শক্তির এই উপাসনায় মেতে ওঠে। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের এই মেল বন্ধন ছিল মারাত্মক। আজও এই বন্ধন নানাভাবে অটুট।
এই জাতীয়তাবাদী নেতারা জাতীয় আন্দোলনকে পরিপুষ্ট, সতেজ ও সবল করার জন্যে আমাদের জাতীয় সংগ্রামের বীর নেতাদের কখনই ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন না। অথচ তাদের সামনেই ছিলেন বাসুদেব ফাড়কে, চাপেকার ভ্রাতৃদ্বয়, নানা সাহেব, তাঁতিয়া টোপী, কুঁয়ার সিংহ, ফৈজাবাদের মৌলনা আহম্মদুল্লাহ— ছিল সাঁওতাল এবং নীল বিদ্রোহের অমর সংগ্রামের কাহিনি ও বীর নায়করা। কিন্তু কেন তাঁরা এই সংগ্রামী ঐতিহ্যগুলির মধ্যে থেকে জাতীয়তার মাল-মশলা সংগ্রহের জন্যে আগ্রহী হলেন না? তার কারণ এই সব নেতা ছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিভূ। শ্রেণিস্বার্থকেই তাঁরা রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।
এই উগ্র এবং প্রাচীনপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতারা পরবর্তী সময়ে অধিকাংশই হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হন এবং ইংরেজদের সমর্থক হয়ে ওঠেন। ফলে হিন্দু মহাসভা এবং আর.এস.এস-এর মতো সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় ।
স্বাভাবিক কারণেই ভারতবর্ষের জাতীয় আন্দোলনে এক বিরাট ফাটল সৃষ্টি হয়—যে ফাটল দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ে বিষের ধারা। তাই একদিন (১৯০৬ – ৩০ ডিসেম্বর) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং উসকানিতে জন্ম হল ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ-র নেতৃত্বে মুসলিম লিগ। মুসলিম লিগ প্রত্যক্ষভাবেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের খয়ের খাঁ হয়ে আসরে নামে এবং বিভেদ সৃষ্টি করতে থাকে ।
কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মেহনতি মানুষ নেতৃত্বের রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে সংগ্রামের রণভূমিতে অবতীর্ণ হয়। এই রণভূমি ছিল যেমন ব্যাপক তেমনি সুসংহত। এই সুসংহত সংগ্রামের রূপ আমরা দেখতে পাই পেশওয়ার অভ্যুত্থান, শোলাপুর কমিউন, বরদৌলী কৃষক অভ্যুত্থান, চৌরিচোরা, পুন্নপাভায়লারের কৃষক সংগ্রাম, রসিদ আলি দিবসে।
এইসব গণ-অভ্যুত্থান এবং সংগ্রামে ভীত-সন্ত্রস্ত কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভারত বিভাগের পরিকল্পনা করে । এবং সমগ্র উপমহাদেশে দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়। এই দাঙ্গা যে কত সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করে তা আমরা প্রত্যক্ষ করি আমাদের জীবন এবং মান-সম্মান দিয়ে ।
ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, বাঙলাদেশ—সমগ্র উপমহাদেশের রাজনীতি এবং সমাজ জীবনে এই সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতি বিদ্বেষ আজ গভীর থেকে গভীরতর আকার ধারণ করেছে। এই কট্টর সাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং রাজনীতির বিরুদ্ধে যে আদর্শগত এবং তত্ত্বগত লড়াই পরিচালনা করা উচিত ছিল তা আজও অনুপস্থিত। অনুপস্থিত বলেই যাঁরা সমাজ সচেতন বলে পরিচিত, তাঁরাও নির্বাচনে মুসলিম এলাকায় মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করান। এবং নির্বাচনে ধর্মের আশ্রয় নেন।
শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রেণি রাজনীতির সপক্ষে দৃঢ়ভাবে না দাঁড়ালে এ দাঙ্গা কখনই বন্ধ করা সম্ভব নয়। শুধু দু ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন করা ছাড়া আমাদের আর কোন কিছুই করার থাকবে না। কারণ আজ যে তীব্র শ্রেণি সংঘাত শুরু হয়েছে সেই শ্রেণি সংঘাতকে ধ্বংস করার জন্যে শাসকশ্রেণি আরও উগ্র আকারে সাম্প্রদায়িকতা, প্রাদেশিকতা ও জাতপাতের জিগির তুলে রক্তের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে।
এই বিদ্বেষ, এই হত্যার বিরুদ্ধে বারবার প্রতিবাদ উঠেছে—প্রতিরোধও হয়েছে। সেই প্রতিবাদ, সেই প্রতিরোধ একদিকে যেমন শ্রমিক, কৃষক ও অন্যান্য মেহনতি মানুষ করেছে, তেমনি লেখক শিল্পীরাও নীরব নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকেননি। আমরা চাই সারাদেশ ব্যাপী এই দাঙ্গার বিরুদ্ধে আবার সোচ্চার প্রতিবাদের ঝড় উঠুক। এই প্রতিবাদ ক্রমেই সংহত রূপ নিক এবং আমাদের মনন ও চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করুক। এই আলোড়ন এবং লক্ষ্যমুখ নির্দিষ্ট করার জন্যই এই সংকলনের প্রচেষ্টা। সংকলনের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে দেশ বিভাগের সময়-পর্বে রচিত ছোট গল্প থেকে। এই গল্পগুলোর রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক মূল্য আছে।
.
সংহত জীবনবোধ এবং চিন্তায় সমুজ্জ্বল আশা, মার্গারেট, আয়েশা, কল্পনা, মলয়া, রতি, মালতি, তৃপ্তি, মিতা, লিলি, বুলু এবং আরতি গাঙ্গুলীকে





Leave a Reply