উপহার – উল্লাস মল্লিক

উপহার

মনে বড় আঘাত পেয়েছে ধানুয়া। নকার কাণ্ড দেখে পেয়েছে। ভূত হয়েও ব্যাটার এমন টাকার লোভ। আগে বরং এমন টাকার লালস ছিল না ওর। চুরি-চামারি করে যা পেত ধানুয়াই দু’বখরা করত। নকাকে যা দিত, চোখ বুজে নিয়ে নিত। ধানুয়া বরং বলত, ওরে, তোর ভাগ তুই ভালো করে বুঝে নে। নকা বলত, তোমাকে আপন দাদার মতো দেখি, তুমি কি ঠকাবে আমাকে!

সত্যি বলতে, ধানুয়াও ভাই ছাড়া কিছু ভাবত না নকাকে। বেঘোরে যখন প্রাণটা গেল নকার, খুব কষ্ট পেয়েছিল ধানুয়া। ঠিক করেছিল, নকার স্মরণে পর পর তিনদিন ভাত একটু কম খাবে। দু’দিন খেয়েও ছিল। কিন্তু তিনদিনের দিন, পান্তির মা ল্যাঠা মাছের ঝাল চচ্চড়িটা এমন জমিয়ে করল যে দুঃখ-টুঃখ ভুলে বেশি খেয়ে ফেলল ধানুয়া। আর নকা-ব্যাটা ঠিক তখনই বাতাসে মিশে থেকে বলল, এটা কী হল দাদা! তোকার পোতিজ্ঞা গেল কোথায়! ধানুয়া লজ্জায় জিভ কেটেছিল। করেছিল, ঠিক আছে নকা, পরে সুযোগমতো একদিন কম খেয়ে পুষিয়ে দেব।

ক’দিন পরেই পান্তির বিয়ে। আজই কথা ফাইনাল হয়ে গেল। ছেলে ভালোই। মুকুন্দপুর বাজারে মাছ বিক্রি করে। পান্তিটা আবার মাছভক্ত খুব। পাতে এক টুকরো মাছ না দেখলে মুখ ভার হয়ে যায় মেয়ের। কিন্তু ধানুয়ার যা অবস্থা রোজ দিন মাছের ব্যবস্থা হয়ে ওঠে না। ধানুয়া এই ভেবে খুশি, আর যাই হোক, মেয়েটার পাতে এক টুকরো মাছের অভাব হবে না কোনওদিন।

সন্ধেবেলা পুরুত ঠাকুরের ফর্দটা নিয়ে বসেছিল ধানুয়া। লম্বা ফর্দ করেছেন ঠাকুরমশাই। এখানেই অনেক টাকা বেরিয়ে যাবে। আরও অনেক খরচ খরচা আছে। তাই চিন্তার ভাঁজ ধানুয়ার কপালে। এই সময়ই আবার এল নকা। বলল, বিয়ের দিন তাহলে ধরেই ফেললে দাদা!

একটু শুকনো গলায় ধানুয়া বলল, হ্যাঁ।

নকা বলে, খুব শখ ছিল পান্তির বিয়েতে আনন্দ করব। ও তো আমার কোলেপিঠেই মানুষ একরকম।

কথাটা সত্যি বটে। নকা সংসার করেনি। বাপ-মাও গত হয়েছে। পান্তিকে বড় ভালোবাসত নকা। পান্তিটাও নকাকাকা বলতে অজ্ঞান। আর এখানেই হিসেবটা মিলছে না ধানুয়ার। দেখছে, ধানুয়ার এখন টানাটানির সময়। তবু টাকার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করে যাচ্ছে। বলছে, আমার ন্যায্য ভাগ আমাকে বুঝিয়ে দাও। আসল কাজ তো, ঠিকঠাক উতরে গিয়েছিল। শুধু পালাবার সময়…

কথাটা মিথ্যে নয়। সেদিন মাঝরাতে নিকুঞ্জ সাহার বাড়ি ঢুকেছিল দুজনে। খবর ছিল নিকুঞ্জর আলমারিতে ক্যাশ আছে বিশ হাজার। দোতলায় নিকুঞ্জর ঘরের আলমারি খুলে দেখল টাকার বান্ডিলটা যেন অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় মেঝেতে পড়ে থাকা একটা কাচের গেলাসে লাথি কষাল নকা। ঝনঝনাৎ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল নিকুঞ্জর। ‘চোর চোর’ চিৎকার। চ্যাঁচানির চোটে গোটা বাড়ি জেগে উঠল। এমন ঝকমারি অবশ্য নতুন কিছু নয়। তাদের যা পেশা, তাতে হামেশাই এসব পোহাতে হয়। সেই মতো প্ল্যানও ছকা থাকে। এখানেও ছিল। দোতলার ছাদে উঠে বাড়ির পিছনের জলের পাইপ বেয়ে নামলেই পাঁচু বদ্যির পাট খেত। দেড় মানুষ উঁচু পাট খেতে একবার ঢুকে যেতে পারলেই হল। পাবলিককে তখন খড়ের গাদায় সুচ খুঁজে মরতে হবে।

পাইপ বেয়ে ঠিকঠাক নেমেও এসেছিল ধানুয়া। কিন্তু নকা ঠিক মতো পারল না। হাত ফসকে ওপর থেকে পড়ল নিচে। মাথাটা ফুটিফাটা হয়ে গেল। বডিটা দু-চারবার ছটকে স্থির হয়ে গেল। যা বোঝার বুঝে গেল ধানুয়া। এখন তারও আর দাঁড়াবার উপায় নেই।

বাড়ির লোকজন চিৎকার করতে করতে এদিকেই আসছে। অগত্যা পাঁচু বদ্যির পাট খেতেই ঢুকে পড়তে হল তাকে। এখন সেই টাকার ভাগ চাইছে নকা। বলছে, অর্ধেক, মানে দশ হাজার চাই তার।

ধানুয়া দেখল, এ তো ছিনে জোঁকের মতো লেগে থাকবে। শুভ কাজের আগে এমন অশান্তি ভালো কথা নয়। তাই বিরক্ত হয়ে সে বলে, ঠিক আছে কাল দিয়ে দেব।

পান্তির বিয়ের আগের দিন রাতে খরচ খরচার হিসেব করছিল ধানুয়া। ঠিকঠাক উতরে যাবে বলেই মনে হচ্ছে। শুধু একটা ব্যাপারেই খচখচ করছে মনটা। ভেবেছিল জামাইকে একটা সোনার চেন দেবে। এমনিতে ওদের কোনও দাবি দাওয়া নেই। পান্তির মায়ের যেটুকু আছে, তাতে পান্তির গা সাজানো গয়নাটা হয়ে যাবে। খুব ইচ্ছে ছিল, জামাইকে একটা স্পেশাল জিনিস দেবে সে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না। হল না, ওই হতভাগা নকাটার জন্যে। ছেলেটাকে চিনতেই ভুল হয়েছিল তার। ভূত হয়েও এত লোভ! পরদিন ঠিক এসে নিয়ে গেল টাকাটা।

ধানুয়াদা হিসেব মেলাচ্ছ নাকি?

নকার গলা। ধানুয়া বেশ বিরক্তই হল। আবার কীসের ধান্দায় এসেছে ব্যাটা। ধানুয়া তাই উত্তর না দিয়ে হিসেব মেলাতে লাগল। দাদা, রাগ করেছ আমার ওপর?

এবারও কোনও কথা বলল না ধানুয়া।

কী করব বলো; টাকাগুলোর যে বড্ড দরকার ছিল আমার।

ধানুয়া বেশ বিরক্তর সঙ্গেই বলে উঠল, তোর ভাগের টাকা তো দিয়ে দিয়েছি। আর বিরক্ত করিস না, অনেক কাজ আমার; আয় এখন তুই।

নকা বলে, হ্যাঁ-হ্যাঁ, চলেই যাব। শুধু একটা কথা; পান্তির বরকে এটা দিয়ে দিও; বোলো পান্তির এক কাকা দিয়েছে। যে কাকা পান্তিকে খুব ভালোবাসত। ইচ্ছে ছিল পান্তির বিয়েতে খুব আনন্দ করবে; কিন্তু ভাগ্যের ফেরে আসতে পারেনি। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল যে আমার।

হিসেবের খাতার ওপর একটা সরু চেন পড়ল কোথা থেকে। চকচক করছে চেনটা। ধানুয়ার অভিজ্ঞ চোখ দেখেই বুঝল, সোনার।

নকা বলল, বাজারের সেরা দোকান, ‘দত্ত জুয়েলার্স’ থেকে নগদে কেনা। দশ হাজারই পড়ল। এটা না দিলে আমার শান্তি হত না কিছুতেই।

কথা বলতে ভুলে গেছে ধানুয়া। আহা রে, ছেলেটাকে কত খারাপ ভেবেছিল। মনে মনে গালমন্দ করেছিল কত। এখন বড় অনুতাপ হচ্ছে। সেই অনুতাপেই ডুকরে কেঁদে ওঠে ধানুয়া, ওরে নকা, নকারে…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *