আলাপচারিতা – অনন্যা পাল

আলাপচারিতা

গেলো সোমবার সকালের দিকে একটা দামী কাফেতে ঢুকেছি; এসব জায়গায় যাওয়া আমার মত বেকারের কাছে বিলাসিতাই, তবে সেদিন খানিকটা দায়ে পড়েই গিয়েছি সেখানে। একটা চাকরীর উমেদারিতে দেখা করার ছিল এক কর্তাব্যক্তির সাথে, জ্যামের আশঙ্কায় আর অতি উৎসাহে পৌঁছে গেছি সময়ের ঢের আগেই; চাচা আমার স্বভাব জানেন, তাই বারবার বলে দিয়েছিলেন বেশী আগে গিয়ে ওনার অফিসে যেন হত্যে না দি, যোগাযোগটা চাচাই করিয়ে দিয়েছিলেন কি না! তা কি করি, ওখানে আশেপাশে খানিক্ষন সময় কাটানোর জন্যে ওই কাফে ছাড়া আর গতি নেই। অগত্যা, বিরিয়ানির চেয়ে বেশী দাম দিয়ে এককাপ কফি কিনে কোণার দিকের একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম আয়েশ করে। বসে চারপাশটা জরিপ করছি, এসির ঠান্ডায় মনটা বেশ চনমনে লাগতে শুরু করেছে, পয়সা নষ্টের ক্ষোভটাও মোলায়েম হয়ে আসছে তার সাথে। এমন সময় পাশের টেবিলের দুই মাঝবয়সী মহিলাকে দেখে বেশ আগ্রহ বোধ করলাম, মানে ঠিক দেখে নয় ওঁদের আলাপচারিতা শুনে।

‘বুঝলেন, আমাদের কাজের বুয়ার ভাইয়ের ছেলেকে কুকুরে কামড়েছে; সেই নিয়ে বাসায় একেবারে হুলুস্থুল’, বেশ দাপুটে চেহারার একজন মহিলা তাঁর উল্টোদিকে বসা ছোটখাটো সঙ্গিনীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন।

‘সেকি বুয়ার ভাইয়ের ছেলের কারণে আপনার বাড়ীতে হুলুস্থুল?’ অন্যজন বিস্ময় চেপে রাখতে পারেননা।

‘হবে না? বুয়া তো ফোনে খবরটা শুনেই দেশে দৌড় দিলো, তো আমার বাড়ীতে হুলুস্থুল হবেনা?’ সামনের প্লেটে রাখা ফ্রাইড চিকেনের ঠ্যাঙে কামড় বসাতে বসাতে জানান দেন মহিলা। অতঃপর সঙ্গিনীর মুখ সমবেদনায় কাঁচুমাচু।

‘এর মধ্যে আবার মামীর ভাই আসছেন লন্ডন থেকে, বুঝুন অবস্থা’।

‘ওহো, কাজের বুয়া না থাকলে বাড়ীতে মেহমান এলে তো খুবই মুশকিল’, উল্টোদিকের মহিলা মিয়োনো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নাড়াচাড়া করতে করতে বান্ধবী সমস্যায় মুষড়ে পড়েন।

‘আরে না না, আমার বাসায় নয়, মেহমান তো কুমিল্যায় মেজোমামার বাসায় আসছেন; আমাকে অতদূরে আবার দেখা করতে যেতে হবে না? সেটাই তো মুশকিল’। সম্ভবত সমস্যার গুরুত্ব বোঝাতেই বার্গারে একটা বড় কামড় বসান তিনি।

‘তার মধ্যে পরশু বাথ্রুমে পড়ে গিয়ে গোড়ালি মচকে সে এক কান্ড; ডাক্তার বলেছে একসপ্তাহ বেডরেস্ট, না হলে নাকি পায়ের গোলমাল হতে পারে’।

‘ওমা, তাই নিয়ে আপনি আবার চলাফেরা করছেন?’ সাথের মহিলা আঁতকে উঠে ঝুঁকে পা দেখতে যান।

‘ধ্যেৎ, আমার পা দেখেন কেন, গোড়ালি তো আমার শাশুড়ির মোচকেছে’। ধ্যাঁতানি খেয়ে সঙ্গিনীর মুখ আঁধার, প্লেটের কোণায় রাখা অবহেলিত কাটা শসার মতই।

‘এদিকে গরমটা যা পড়েছে, এসি ছাড়া এক মিনিটও থাকার উপায় নেই, বেডরুমের মেশিনটা বিগড়োনোর আর সময় পেলনা! বাপের বাড়ীর বুঝলেন না? আমাকেই তো সব খেয়াল রাখতে হয়!’ দয়া করে নিজেই এবারেরটা খোলসা করলেন মহিলা কোল্ড কফিতে লম্বা চুমুক দিতে দিতে।

‘সকাল থেকে গলাটা কেমন ব্যাথা ব্যাথা করছে, কথা বলতেও কষ্ট, নতুন করে ডাক্তার বদ্যি করতে ভাল্লাগে না আর!’

‘কার গলায় ব্যাথা?’ সঙ্গের মহিলাটি এবার সাবধানী গলায় জানতে চান। ‘কার আবার, আমার! গলা শুনে বুঝছেন না কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে?’ রীতিমত হুঙ্কার ছাড়েন দাপুটে মহিলা সালাডের প্লেট দূরে ঠেলে দিতে দিতে।

‘গলাকে একটু বিশ্রাম দিন, ঠিক হয়ে যাবে’ স্পিনিঙের কায়দায় পাশ থেকে কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে আর বসে থাকতে ভরসা হয় না; তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগোই আমি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *