• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে – তসলিমা নাসরিন

লাইব্রেরি » তসলিমা নাসরিন » আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে – তসলিমা নাসরিন
আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে - তসলিমা নাসরিন
লেখক: তসলিমা নাসরিনবইয়ের ধরন: কাব্যগ্রন্থ / কবিতা

সূচিপত্র

  1. আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে – তসলিমা নাসরিন
  2. সারাদিন কেটে যায় বিষে ও বিষাদে
  3. দুঃখবতী মেয়ে
  4. আমি এরকম কোনও দিব্যি দিইনি
  5. কাঁপন ৮
  6. সাতই মার্চ, ১৯৭১
  7. মেঘ ও চাঁদের খেলা
  8. পিতা, স্বামী ও পুত্র
  9. তোমার এত অহংকার কেন?
  10. কাঁপন ৯
  11. ধূসর শহর
  12. মৃত্যুদণ্ড
  13. মানুষ—এই শব্দটি আমাকে বড় আলোড়িত করে
  14. পরাধীনতা
  15. কাঁপন ১০
  16. ভাবি ছেড়ে গেছ, ফিরে চেয়ে দেখি, এক পা-ও ছেড়ে যাওনি
  17. হাত
  18. নূরজাহান
  19. অস্বীকার
  20. ধর্মবাদ
  21. প্লেবয়
  22. কাঁপন ১১
  23. দারিদ্র
  24. কলকাতা, প্রিয় কলকাতা
  25. যদি তুমি আসো
  26. যাব না কেন? যাব
  27. যে স্বামী প্রেমিক নয়, তাকে
  28. কাঁপন ১২
  29. নিমজ্জন
  30. যাত্রা
  31. বিবি আয়শা
  32. ভালবাসায় আজকাল মন বসে না
  33. কামান দাগা
  34. দীর্ঘ পথ যাব
  35. পোকামাকড়ের গল্প
  36. অনুগত
  37. প্রেরিত নারী
  38. বহুগমন
  39. নির্বোধের দেশ
  40. প্রশ্ন
  41. ১৫০০ সাল
  42. কবি নির্মলেন্দু গুণ
  43. জলে ভাসা
  44. চাওয়া
  45. ঢের দেখা আছে
  46. চুক্তি
  47. সই
  48. মেয়েবেলা
  49. জীবন কখনও বাঁ হাতে, কখনও ডান হাতে
  50. অন্তরীণ
  51. ব্লাসফেমি আইন
  52. এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি
  53. বাবার কাছে চিঠি

আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে – তসলিমা নাসরিন

সারাদিন কেটে যায় বিষে ও বিষাদে

সংসারে তেমন মানুষ কি আছে যে কিনা দীর্ঘ দীর্ঘ দিন দুঃখ না দিয়ে পারে?

যে মানুষই সুখের নদীতে সাম্পান ভাসাবে বলে শর্ত দিয়েছে,
যে মানুষই কাছে এসে বিস্তর গল্প শুনিয়েছে ফুলের জন্মের,
প্রজাপতির ডানায় যে রং থাকে সেই রঙের…
যে মানুষই আকাশের ডাল থেকে চাঁদ ছিঁড়ে এনে কপালে পরাতে চেয়েছে আমার
তারই খুব তাড়া পড়ে যাবার যদি হাতখানা না বাড়াই তার হাতের দিকে ক্রমশ,
অথবা যদি বাড়াই, সে ছোঁয়, ছুঁয়ে একটু একটু করে মন্থন করে মেদ মাংস, বশ করে স্নায়ু।
ভালবাসি শব্দটি যে উচ্চারণ করে বেশি, সেই যায় ভেড়াতে
এক-এক দিন এক-এক ঘাটে তার বুকের সাম্পান…
বেনিয়া প্রেমিকগুলো কড়া দরে ফেরি করে ফেরে প্রেমের অঙ্কুর।

সংসারে আসলে তেমন মানুষ নেই, যে কিনা দীর্ঘ দীর্ঘ দিন দুঃখ না দিয়ে পারে।

দুঃখবতী মেয়ে

এ কথা কি ঢোল পিটিয়ে বলতে হয় যে আমি সুখে আছি?
সুখে থাকলে চোখের তারাই বলে,
ঠোঁট বলে,
দোলনচাঁপা-ঘ্রাণ ভাসে বাতাসে, সে বলে।
যে সুখে নেই তারও বা ঢোল পিটিয়ে বলতে হবে কেন যে সে সুখে নেই?
সুখ তো আর এমন নয় যে এটি না হলে মানুষের চলে না।
এটি না হলে ছত্রাক জমে যায় ত্বকে,
এটি না হলে ফুসফুসে ঘা হয়,
হাত পা কিছু খোঁড়া হয়,
হৃৎপিণ্ড পচে যায়
অন্ধ হয় চোখ!

এই যে বছরে এক-আধবারও আমার ত্রিসীমানায় সুখ ঘেঁষে না, আমি কি বেঁচে নেই?

যে মেয়েটির গায়ে জামা নেই, গুটিশুটি শুয়ে থাকে রেললাইনের কিনারে, দু’দিন ভাত নেই,

সেই মেয়েটিকে ভাত, কাপড় আর একটি বাসযোগ্য ঘর দেব বলে আমি যে হাঁটছি…
দৌড়চ্ছি…এর নাম কি বাঁচা নয়?
আমি তো মাঝেমধ্যে কারও কারও কাণ্ড দেখে ঠা ঠা হাসি,
তারা এর ওর খাবার কেড়ে মার্বেল পাথরের ঘরে বসে একা একা গোগ্রাসে খায়,
ভাল কিছু খাবে বলেই বেঁচে থাকে—
পরকালেও খাবে বলে মেঝেয় কপাল ঠোকে পাঁচবেলা।

সুখে নেই এ কথা আমি ঢোল পিটিয়ে বলি না,
ঢোল পিটিয়ে আমি এ কথাও বলি না যে আমি খুব একা…
আমার কেবল আকাশ আছে আপন, আমার কেবল এক-আকাশ দুঃখ আছে আপন।

আমি এরকম কোনও দিব্যি দিইনি

ভালবাসো এ কথা এত বেশি বলো তুমি যে, মাঝে মাঝে
আমি ভুল করে বিশ্বাসও করে ফেলি যে তুমি বোধহয় সত্যিই ভালবাসো আমাকে,
এ আমার বোঝা উচিত ছিল অনর্গল কেউ কিছু বলে গেলেই সেটা সত্য হয় না।
ভালবাসা তো মুখের কথা নয়,
ভালবাসা বুঝব নিমগ্নতায়, ত্যাগে।
তুমি নিমগ্ন কতটুকু?

আমি তো এরকম কোনও দিব্যি দিইনি যে আমাকে ভালবাসতেই হবে।
বেসো না ভাল। হাজার মানুষ ভালবাসে না,
তাই বলে আমি কি মরে গেছি নাকি?
ভালবেসো না—সে অনেক ভাল, তবু মিথ্যের জলে ডুবিয়ে আমার শ্বাসরোধ কোরো না।

কাঁপন ৮

হৃদয় ছুঁতে ইচ্ছে করো যদি
তবেই আমি শরীর-জলে গড়ব এক নদী।

সাতই মার্চ, ১৯৭১

একটি তর্জনী উঠেছিল সেদিন রেসকোর্সের মাঠে
সেই তর্জনীর প্রতি আমি নত হচ্ছি,
একটি গর্জন উঠেছিল সেদিন রেসকোর্সের মাঠে
সেই গর্জনের প্রতি নত হচ্ছি আমি।

এখনও চোখের সামনে একটি দীর্ঘ মূর্তি দেখি,
মূর্তিটি লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্নের কথা বলে,
চেতনার জল মাটি পেয়ে সেই স্বপ্ন বেতস লতার মতো বাড়ে।
এখনও একটি তর্জনী আমার সামনে উঁচু করা,
এখনও একটি গর্জন কানে বাজে—
আমি আন্দোলিত হই, আমি স্বপ্নবান হই।

স্বাধীনতা এখনও অর্জন হয়নি আমার,
পঁচিশে মার্চের রাতে যারা আমার মা’কে ধর্ষণ করেছিল,
তারা আজ আমাকে ধর্ষণ করবে বলে ঘিরে ধরেছে…

আরও একটি যুদ্ধ আমার প্রয়োজন।

মেঘ ও চাঁদের খেলা

পূর্ণিমা দেখব বলে আসা
অথচ মেঘের ঘোমটায় চাঁদ লুকিয়েছে মুখ।
তিনতলা জাহাজে দাঁড়িয়ে আমি একা একা অন্ধকারে ভিজি
অবোধ পদ্মার জল থেকে থেকে জাহাজের লোহার শরীরে চুমু খায়।

মেঘের ঘোমটা খসে গেলে চাঁদমুখ
দেখব কখন—হৃদয়ের জলে সাঁতরায় একঝাঁক অস্থির ইলিশ।
কচুরি পানার মতো ভেসে যায় গাঢ় সবুজাভ রাত
স্রোতের শরীরে একা ডিঙি
তীরের কুটিরে দু’-একটি রাতজাগা বাতি চোখের তারার মতো জাগে।

সারারাত পর
শেষরাতে মেঘ ফুঁড়ে চাঁদ জেগে ওঠে,
আর জাহাজের ডেকে নিঝুম দাঁড়িয়ে
আমার জড়িয়ে যায় চোখ ঘুমে।

পিতা, স্বামী ও পুত্র

তুমি যদি নারী হয়ে জন্ম নাও
শৈশবে তোমাকে শাসন করবে পিতা
তুমি যদি নারী হয়ে শৈশব পার করো
যৌবনে তোমাকে শাসন করবে স্বামী
তুমি যদি নারী হয়ে যৌবন পার করো
বার্ধক্যে তোমাকে শাসন করবে পুত্র!

জীবনভর তোমাকে শাসন করছে পুরুষ।
এবার তুমি মানুষ হও, মানুষেরা কারও শাসন মানে না—
তারা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে অর্জন করে স্বাধীনতা।

তোমার এত অহংকার কেন?

মানুষ আর বাঁচে কতদিন? এই ধরো ষাট সত্তত আশি নব্বই একশো বছর
একটি কচ্ছপ বাঁচে যদি দেড়শো বছর, একটি শকুন বাঁচে চারশো
তবে মানুষ কত ক্ষণজীবী দেখ কচ্ছপ বা শকুনের মতো ইতর প্রাণীর কাছে।
যে কোনওদিন ট্রাক তাকে চাপা দিতে
যে কোনও জীবাণু দ্বারাই সে আক্রান্ত হতে পারে
হৃৎপিণ্ড বা মস্তিষ্কের রোগ যে কোনওদিন তাকে
অকেজো শুইয়ে দিতে পারে বিছানায়।

মানুষ আর বাঁচে কতদিন,
এই হাসল, খেলল, সিটি বাজাল, বাজার করল, খেল, ঘুমোল,
ছেলেমেয়ের বিয়ে দিল,
তাদের বাচ্চা-কাচ্চা হল, নাতি নাতনিরা বুড়োধুড়ো বলে খেপাল,
অসুখবিসুখে তেমন লোক পাওয়া
গেল না কাছে বসার, জানালার ওপারে রোদ আর ছায়া দেখতে দেখতে-
জীবনের সীমানা তো এটুকুই।
গোপনে যারা টাকা জমাল বাড়ি করার, টাকা জমাল ভবিষ্যতে
গা ভাসিয়ে সুখ করবে বলে
সেই টাকার থলে রেখে স্বজন বন্ধু ফেলে মানুষকে ছাড়তেই হয় ঘর-দুয়োর,
ছাড়তেই হয় খেত-খামার, ভিটেমাটি
মানুষ আর বাঁচে কতদিন, নব্বই একশো অথবা দুশো?
বাঁচে, স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন পূরণ হয় অথবা না হয়— মরে যায়।
মরে যে যায়, যে কোনও সময়ে স্বপ্নের আকাশ থেকে তাকে গুটিয়ে নিতে হবে ঘুড়ি
যদি সে জানেই তবে কেন এত অহংকার মানুষের? রূপ ও গুণের? বিষয়-আশয়ের?

কেন দু’দিনের সংসারে এর ওর সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন মিলিয়ে গল্প করা নেই?
কেন আলিঙ্গন নেই,
কেন শস্যখেতে বিভেদের দেয়াল থাকে, কেন আলিশান বাড়ির
উলটো দিকেই থাকে রোঁয়া ওঠা নেড়িকুকুরের মতো উদ্বাস্তু মানুষ?
এই ক্ষুদ্র তুচ্ছ বেঁচে থাকা—অথচ তুমি গ্রীবা ফুলিয়ে দমকে ওঠো ছলকে ওঠো ঝলসে ওঠো

তোমার কীসের এত অহংকার?

কাঁপন ৯

তোমাকে আঁচলে গিঁট দিয়ে ভাল বেঁধেছি
দিন দিন তবু তুমিহীনতায় কেঁদেছি।

ধূসর শহর

যখন ছ’বছর বয়স, মায়ের আঁচল ধরে কেঁদেছিলাম ‘ঢাকা যাব’
ঢাকা যাব ঢাকা যাব,
ঢাকা দেখতে কেমন, ঢাকা হাতি না ঘোড়া কিছুই না জেনে আমি তখন ঢাকা যাব।
সেবারকার মতো ঢাকার স্বাদ লেবেনচুষে মেটাতে হল।
পুলসেরাত পার হয়ে বেহেস্তে ঢোকার মতো একদিন ঢাকায় ঢুকেছিলাম
তখন বয়স কত মনে নেই,
কয়লার ধোঁয়া ছেড়ে ধুঁকে ধুঁকে
মাইল মাইল অন্ধকার বস্তি পেরিয়ে ট্রেন যখন থামল তেজগাঁ স্টেশনে
আমার নেমেই মনে হল ঢাকায় কি গাছপালা নেই, ঢাকায় কি মানুষ থাকে না?

ঢাকা নিয়ে আমার বিস্ময় এখনও কাটে না
এই দেখলাম শেয়াল ডাকছে, এই দেখি দশতলা দালান উঠছে।
ঢাকা আসলে কোত্থেকে শুরু? আরমেনিয়ান গির্জা?
আহসান মঞ্জিল? লালবাগের কেল্লা? নাকি বুড়িগঙ্গা?
ঢাকা শেষই বা কোথায়? উত্তরা? না শ্যামলী?
ঢাকার আমি শেষ খুঁজে পাই না, শুরুও না।
এক-একবার মনে হয় ঢাকা শাঁখারিবাজার থেকে বাবুবাজার ঘুরে আরমানিটোলা হয়ে
বংশালে শেষ হয়েছে,
আবার আমার এও মনে হয় ধানমণ্ডি থেকে
ক্যান্টনমেন্ট হয়ে গুলশান বনানী বারিধারায় ঢুকেছে ঢাকা।

ঢাকার কিছু চোখ ভুলোনো ঘটনা আছে।
কাকরাইল মসজিদের দিকে যে মার্সিডিসগুলো ছোটে,
তার হেডলাইট আমাদের চোখের দিকে তাক করা,
মনে হয় শহরে বুঝি আলোর বন্যা বইছে।
ঢাকা যখন নিজেকে একমাস উপোস করিয়ে ছাড়ে, বড় কৃচ্ছ্র গন্ধ আসে নাকে,
মানুষগুলো মহামানবের মতো সন্ধের দিকে রকমারি ভোজে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
ঢাকার রাস্তায় একদিন রফিক সালাম জব্বার হেঁটেছিলেন, শেখ মুজিব হেঁটেছিলেন,
নূর হোসেন হেঁটেছেন খালি পায়ে,
এই রাস্তায় এখন আয়ুব ইয়াহিয়ার নাতির জিপ দৌড়োয়,
গোলাম আজমের বোররাক চলে,
মানুষের পিঠে চড়ে কিছু মানুষ-মতো জিনিস যায় শিকারে।

ঢাকাকে কারা যেন মূর্খতার ত্রিপল বিছিয়ে ঢেকে রাখছে,
ঢাকার চোখে কারা যে পরাচ্ছে ঠুলি….
ঢাকা কি শেষ অবধি তার শহিদ মিনার, অপরাজেয় বাংলা,
স্বোপার্জিত স্বাধীনতাকে বুকে ঢেকে আগলাতে পারবে?
আচমকা বুলডোজারে ভেঙে দেওয়া মাইল মাইল বস্তির মানুষকে
ঢাকা কি দু’বেলা ভাত দেবে?

মৃত্যুদণ্ড

এই আমি দাঁড়ালাম
শরীরে কোনও অসুখ আছে কি না পরীক্ষা করুন। শেষ স্নান করিয়ে দিন।
আখেরি ইচ্ছে-টিচ্ছের কথা জিজ্ঞেস করুন—
আপনারা তো এমন কথাই জিজ্ঞেস করবেন, কী আমার খেতে ইচ্ছে করে
বিরুই চালের ভাত? গলদা চিংড়ি? কই ভাজা? তেঁতুলের আচার? সর্ষেবাটা ইলিশ
কাকে দেখতে ইচ্ছে করে, বাবা মা? ভাই বা বন্ধু? খুব কাছের কোনও মানুষ?

না, এরকম কোনও ইচ্ছে আমার করবে না,
এসবের কিছুই না চেয়ে
আমি এমন একটি ইচ্ছের কথা বলব যে আমি জানি আপনারা চমকে উঠবেন।
আমি যদি বলি একটি সেকুলার পৃথিবী চাই, দেবেন?
অথবা যদি চাই শস্যখেতের সব আল ভেঙে যাক, কাঁটাতার সীমানা আর
দেশে দেশে দেয়াল ধসে যাক।
যদি চাই কোনও শ্রেণী নেই, নারী ও পুরুষে বৈষম্য নেই, ধর্ম নেই, দেবেন?
দেবেন তেমন একটি সুন্দর জগৎ আমার চোখের সামনে?

দিলে আমি হেসে ঝুলব ফাঁসিকাঠে
দিলে আমি মাথা পেতে মেনে নেব মৃত্যুদণ্ডাদেশ,
তা না হলে ফাঁসির দড়ি ছিঁড়ে আমি বেরিয়ে যাব, আবার বাঁচব।
বেঁচে আমি স্বপ্ন বপন করব একভাগ মাটি আর তিনভাগ জলে।

মানুষ—এই শব্দটি আমাকে বড় আলোড়িত করে

হ্যাঁ, এই শব্দটি আমাকে আলোড়িত করে
আমি কোনও মানুষবিহীন অরণ্যে বাস করতে পারি না,
কোনও নিঝুম ঘরেও, যদি মানুষ না থাকে, গা ছমছম করে
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সমুদ্রের চেয়ে মানুষ দেখে উল্লসিত হয়েছিলাম বেশি।
কাঞ্চনজঙ্ঘার সূর্যোদয়ের চেয়েও বেশি
কাশ্মীরের আকাশছোঁয়া পর্বতের চেয়ে সুন্দর মানুষ,
ম্যানহাটনের উঁচু উঁচু বাড়ির চেয়ে মানুষ অনেক উঁচু।
নায়াগ্রার জলপ্রপাতের চেয়ে বেশি ভাল লাগে মানুষের মনে যখন
প্রেমের প্রপাত বয়।
মানুষ—এই শব্দটি আমাকে আলোড়িত করে বড়
না কোনও গিরিশৃঙ্গ, না কোনও ফুল প্রজাপতি নদী বা সমুদ্র,
না কোনও অট্টালিকা-না কোনও হিরে সোনা,
না কোনও বনবাদাড়… কিছুই আমাকে এত টানে না,
যত আমাকে টানে মানুষ
যত আমাকে গ্রাস করে মানুষ। যত আমাকে প্লাবিত করে মানুষ।

মানুষ… এই শব্দটির চেয়ে আর কোনও সুন্দর শব্দ আমি পাইনি জগতে।

পরাধীনতা

এ আমার ঘর,
আমারই ঘর এটি,
লোকে বলে মেয়েমানুষের আবার ঘর কী?

এ আমার জমিন, এতে আমি নিজ হাতে ফসল ফলাব।
দেখে হাসে লোকে,
বলে, নারী নিজেই তো এক ধরনের শস্যখেত, ওতে আমরা
শখ করে বীজ বপন করি।

এ আমার হাত,
লোকে বলে ও তোমার হাত নয়, আমাদের সেবার জন্য বিশেষ অঙ্গ মাত্র।
এ আমার ঠোঁট,
লোকে বলে ও তোমার কিছু নয়, চুম্বনের জন্য তৈরি একজোড়া অলংকার।
এ আমার জরায়ু,
লোকে বলে ও আসলে আমাদের বীর্য রাখার থলে।
ওখানে বাড়বে আমাদের পৌরুষের ভ্রূণ।

কাঁপন ১০

আঙুল একটি চোয়ালে
রেখে ঠোঁটখানা ছোঁয়ালে
ঠোঁটে।
মোরগ যেমন খোঁটে
ধান ধুলো, রাত পোহালে।

ভাবি ছেড়ে গেছ, ফিরে চেয়ে দেখি, এক পা-ও ছেড়ে যাওনি

আহা, চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছ একলা যুবক।
তুমি কি চলে যাবে? যেতে চাইলে যাও
যেতে যে চায়, তাকে আমি আঁচল পেতে ফিরে ডাকি না,
যেতে যে চায়, চোখের জল চোখে নিয়ে আর দুয়োর আগলে দাঁড়াই না।

তুমি যখন শেষ কথা বলে দিলে যে যাবেই,
আমি জানলা ধরে দাঁড়িয়েছিলাম, চোখ বুজে অপেক্ষা করছিলাম
কখন তোমার প্রস্থানের গা-ছোঁওয়া হাওয়া আমার গায়ে আছড়ে পড়ে
কখন তোমার জুতোর শেষ শব্দ আমার হৃদযন্ত্র কাঁপায়।
আমি অপেক্ষা করছিলাম যেভাবে সবাই যায়, তুমিও যাবে স্মৃতির কৌটোগুলো এলোমেলো ছুড়ে ফেলে বারান্দায়, উঠোনে, মাঠে, খাবার টেবিলে, বিছানায়…
যেহেতু আর সব যুবকের মতো তোমার নাক চোখ মুখ দৈর্ঘ্য প্রস্থ সব।

অথচ অবাক দেখ, চোখের জল ঝরে ঝরে যখন বুক ভিজল, বুকের কাপড় ভিজল,
তখন দুয়োরে খিল আঁটতে গিয়ে দেখি তুমি আছ, চৌকাঠ ছেড়ে এক পা-ও দূরে যাওনি।

হাত

আবার আমি তোমার হাতে রাখব বলে হাত
গুছিয়ে নিয়ে জীবনখানি উজান ডিঙি বেয়ে
এসেছি সেই উঠোনটিতে গভীর করে রাত
দেখছ না কি চাঁদের নীচে দাঁড়িয়ে কাঁদি দুঃখবতী মেয়ে!

আঙুলগুলো কাঁপছে দেখ, হাত বাড়াবে কখন?
কুয়াশা ভিজে শরীরখানা পাথর হয়ে গেলে?
হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম বর্ষা ছিল তখন,
তখন তুমি ছিঁড়ে খেতে আস্ত কোনও নারী নাগাল পেলে।

শীতের ভারে ন্যুব্জ বাহু স্পর্শ করে দেখি
ভালবাসার মন মরেছে, শরীর জবুথবু,
যেদিকে যাই, সেদিক এত ভীষণ লাগে মেকি।
এখনও তুমি তেমন আছ। বয়স গেল, বছর গেল, তবু।

নিজের কাঁধে নিজের হাত রেখে নিজেই বলি:
এসেছিলাম পাশের বাড়ি, এবার তবে চলি।

নূরজাহান

নূরজাহানকে ওরা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে উঠোনের একটি গর্তে,
ওখানে কোমর ডুবিয়ে সে নতমুখ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
নূরজাহানের দিকে পাথর ছুড়ছে ওরা,
ওই পাথর আমার গায়ে লাগছে।

আমার মাথায় কপালে বুকে পিঠে পাথর এসে লাগছে
ওরা পাথর ছুড়ছে আর হা হা করে হাসছে, হাসছে আর গাল দিচ্ছে।
নূরজাহানের কপাল ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে, আমারও।
নূরজাহানের চোখ গলে গেছে, আমারও।
নূরজাহানের নাক থেতলে গেছে, আমারও।
নূরজাহানের বুক ফুঁড়ে হৃৎপিণ্ড ছিদ্র হয়ে গেছে, আমারও।
এই পাথর কি তোমার গায়ে লাগছে না?

হা হা করে হাসছে ওরা, হাসছে আর দাড়িতে হাত বুলোচ্ছে
মাথা কামড়ে পড়ে আছে টুপি, সেও হাসির দমকে নড়ছে
ওরা হাসছে আর হাতের ছড়ি দোলাচ্ছে,
ওদের ক্রূর চোখের তূণ থেকে তির ছুটে নূরজাহানের গায়ে বিঁধছে, আমার গায়েও।
এই তির কি তোমার গায়ে বিঁধছে না?

অস্বীকার

ভারতবর্ষ কোনও বাতিল কাগজ ছিল না যে তাকে ছিঁড়ে টুকরো করতে হবে।
সাতচল্লিশ শব্দটিকে আমি রবার দিয়ে মুছে ফেলতে চাই।
সাতচল্লিশের কালিকে আমি জল সাবান দিয়ে ধুয়ে দিতে চাই।
সাতচল্লিশ নামের কাঁটা গলায় বিঁধছে, এই কাঁটা আমি গিলতে চাই না,

উগরে দিতে চাই
উদ্ধার করতে চাই আমার পূর্বপুরুষের অখণ্ড মাটি।

আমি ব্ৰহ্মপুত্র যেমন চাই, সুবর্ণরেখাও চাই
সীতাকুণ্ড পাহাড় চাই, আবার কাঞ্চনজঙ্ঘাও চাই।
শ্রীমঙ্গল চাই, জলপাইগুড়িও।
শালবনবিহার চাই, আবার ইলোরা অজন্তাও।
কার্জন হল যদি আমার, ফোর্ট উইলিয়ামও আমার।

একাত্তরে যে মানুষ যুদ্ধ করে,
জয়ী হয়,
দ্বিজাতি তত্ত্বকে ঠেঙিয়ে বিদেয় করে—
সাতচল্লিশের কাছে সে মানুষ পরাজিত হয় না কখনও।

ধর্মবাদ

ধর্মবাদীরা যেদিন ধ্বংস হবে, সেদিন ফিরব আমি ব্রহ্মপুত্র-পাড়ে।
তার আগে ঘোলা জলে আমি আঙুল অবধি ভেজাব না।
ধর্মবাদীরা যেদিন গুটিয়ে নেবে তাদের বাণিজ্য, সেদিন ফিরব আমি
ঘরে, তার আগে দুর্গম অরণ্য অঞ্চল ছেড়ে কোথাও যাব না।
সেদিন আমি নিশ্চিন্তে বারান্দার চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে সূর্যোদয় দেখব।
সেদিন আমি গান গাইব গলা ছেড়ে, বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাব,
সেদিন এমনও হতে পারে কাউকে খুব মন দিয়ে আমি ভালও বাসব।
ধর্মবাদীরা ধ্বংস না হলে যদি আমি হাসতে চাই সে হাসি যেন কাষ্ঠহাসি হয়
যদি আমি গান গাইতে চাই আমার কণ্ঠে যেন কোনও সুর না ওঠে…
মাটিতে বিষের বীজ বুনলে সে মাটি থেকে বিষবৃক্ষ গজাবেই।
ডাল পাতা পত্র পুষ্প কেটে তো আর বিষ দূর হয় না।
শেকড় ওপড়াতে হয়।
আজ ধর্ম তার ডাল পাতা ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দেশে
এই আফিমে আসক্তি বাড়ছে মানুষের।
মহামারি ঠেকাবে কে? আমি? তুমি? নাকি সে?

এমনও তো হতে পারে আমি তুমি সে মিলে আমরা একজোট হব, তারপর পাথর সরাব!

প্লেবয়

তুমি আরেক শহরে থাকো, এ শহরে মাঝে মধ্যে আসো
আধঘণ্টাটাক থাকো, ভালবাসো।
তারপর দিব্যি গানের সুর ভাজতে ভাজতে চলে যাও
তোমার ভালবাসাও তোমার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্পূরের মতো চলে যায়।

আরেক শহরে থাকো, সেখানে এক ফর্সা রমণীকে ভালবাসো,
আবার এ শহরে এসে কালো এক মেয়ের সঙ্গে শরীর বদল করো।
আরেকটি নিঝুম শহর আছে এ শহরের দক্ষিণে,
ওখানে বাদামি রঙের এক নারীও পেয়েছ জানি—
এ তোমার স্বভাবের অন্তর্গত— ঘাটে ঘাটে ভেড়াতে চাও ভালবাসার ডিঙি।

মাঝখান থেকে আমার হয়েছে বিপদ, ডিঙি নেই, নদী নেই,
ধু ধু জীবন জুড়ে কেবল একটি কূল আছে দাঁড়াবার—
সে তুমি।

কাঁপন ১১

হিরে সোনাদানা থই থই করে, প্রাসাদ গড়েছি আজই,
ভালবাসো যদি, সব দিয়েথুয়ে সন্ন্যাসী হতে রাজি।

দারিদ্র

দারিদ্র কীসের আমাদের?
কেউ বলে ভাতের, মাছের,
কেউ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে কাপড়ের,
কেউ কেউ দু’-দশ মিনিট ভেবে নিয়ে মাথা ঝাঁকায় ওপর-নীচ
বাসস্থানের অভাব নাকি খুব বেশি।

কেউ কিন্তু বলেনি সামান্য
আরও এক দারিদ্রের কথা
সে হল চিন্তার।
খেলে পরলেই কি অভাব ঘোচে?
শূকর যে কাদা খায়, তার কাদা খেয়েই জীবন যাবে বলে কেবল কাদাই খায়–
আর কোনও অঙ্গীকার সে করেনি জীবনের কাছে
মানুষ কি ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে খাবে শুধু? পরবে? ঘুমোবে? ব্যস?
আর কোনও অঙ্গীকার নেই মানুষের কাছে তার?

দারিদ্র ঘোচাতে হবে আগে মননের।
তা না হলে গরু বা গাধার চেয়ে মূল্যবান হয় না জীবন মানুষের।
ভালবাসার কোনও বয়স নেই
ভালবাসতে গেলে এমন কোনও নিয়ম আছে যে বয়স হবে কুড়ি-পঁচিশ?
ভালবাসায় বয়স কী গো?
ষোলোয় যেমন, তেমন করে ষাটে এসেও ফল্গুধারা বইতে পারে।

ষাটে এসেও হৃদয় বড় কাঁদতে পারে,
প্রেমার্ত সব আঙুলগুলো কাঁপতে পারে আলিঙ্গনে।
ষাটে এসেও বুকের জলে প্লাবন ওঠে, ষাটে এসেও কাদা ঘেঁটে পদ্ম তোলার মন মরে না।

বয়স হল তুচ্ছ সুতো, ইচ্ছে করলে ডিঙোনো যায়
বয়স যত বাড়ে তত ভালবাসার চারাটিও লকলকিয়ে আকাশ ছোঁয়, বৃক্ষ হয়।
বয়স যত বাড়ে, শোনো, মানুষ তত প্রেমিক হয়।

কলকাতা, প্রিয় কলকাতা

কলকাতা, কেমন আছ তুমি? কেমন আছে তোমার চৌরঙ্গি, গড়ের মাঠ,
ইডেন গার্ডেন, কেমন আছে হাওড়া ব্রিজ? শ্যামবাজার?
গড়িয়াহাটের মোড়? ধর্মতলা?
কথা ছিল চিৎপুরের রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটব, জীবন দেখতে দেখতে যাব খড়কুটোর,
মানুষের, কথা ছিল ফুটপাতের তেলেভাজা, কলবেরুনো ছোলাসেদ্ধ, আলুকাবলি,
লংকার আচার খেয়ে হাইড্র্যান্টের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আঁজলা ভরে পান করব জল,
হাওড়া স্টেশনে ষোলো রকম মানুষের গা-ধাক্কা খেতে খেতে হাঁটব,
হুইসেল শুনে দৌড়ে ধরব ট্রেনের
হ্যান্ডেল। ট্রেন যাবে বোলপুর দুর্গাপুর জয়পুর… কী কী সব পুরের দিকে।
কথা ছিল দেশপ্রিয় পার্কের ঘাসে শুয়ে কচ্ছপের মতো হেঁটে-আসা ট্রাম দেখব, ট্রাম দেখব
আর জীবনানন্দের জন্য আমার মায়া হবে খুব
কখনও খিদে-পেটে বসন্ত কেবিনের কাটলেট,
কখনও গিরিশমঞ্চে নাটক, নন্দনে সত্যজিতের ছবি,
সারা দুপুর পড়ে থাকব বইয়ের ওপর উবু হয়ে বইপাড়ায়,

কফি হাউজে ঠান্ডা কফি সামনে নিয়ে ঈশ্বরের চেয়ে বেশি ভাবব ঈশ্বরচন্দ্রের কথা।
কথা ছিল। কথা কার সঙ্গে ছিল আমার?
রবীন্দ্রসদন? লেকের জল? মেমোরিয়াল? মনুমেন্ট? কার সঙ্গে?
নাকি ওই কালো পাথরের মাতঙ্গিনী হাজরার সঙ্গে কাকপক্ষী দেখেনি কথা হয়েছিল?
চুপিচুপি কাকে যে আমি কথা দিয়েছি যাব চুমু খাব দৌড়ব
ব্রহ্মপুত্রের মতো দেখতে গঙ্গার দিকে
গঙ্গার হাওয়ার দিকে তীরের বালুর দিকে
ভোঁ-বাজা লঞ্চের দিকে…
কলকাতায় কারা তোমরা ব্রহ্মপুত্রের লোক গো,
কারা তোমরা পদ্মা যমুনা সুরমা তিতাস আর শীতলক্ষার
ছলছল জল দেখেছিলে? তুমি, নয় তোমার বাবা, নয় তোমার ঠাকুর্দা
তোমরা আমার গা থেকে কংসের গন্ধ নেবে নাও,
আমার নাকের ঘামে কর্ণফুলি, চোখে আস্ত একটি মেঘনা…
কথা কার সঙ্গে হয়েছিল আমার? মেট্রো রেল? শুকনো বকুল?
নাকি নিজের সঙ্গে নিজেরই?
আমার আঙুল কাপে তিরতির তৃষ্ণায়, কতদিন ছুঁই না কলকাতার চিবুক—
তার রোদে ভিজে বাড়ি ফিরি না,
কতদিন কেউ ঘুম পাড়ায় না সুতানটি গ্রামে পর্তুগিজ দস্যু আর
ইংরেজ বেনিয়ার ছড়ি ঘোরানো আঙুল আর
লালচক্ষুর গল্প শোনাতে শোনাতে,
কতদিন কুয়াশা কেটে দৌড়নো হয় না এসপ্লানেডের ফুটপাথ ধরে সোজা…
আমার গা হাত পা শক্ত শেকলে বাঁধা, আমি তোমাকে একবার ছোঁবার জন্য
কাঁদছি কলকাতা, কাঁদছি বলে লোকে আমাকে দুয়ো দিচ্ছে,
ধুঁয়ো দিচ্ছে…
তোমাকে ভালবাসি বলে লোকে আমাকে ঢিল ছুড়ছে, কাদা ছুড়ছে, চোখের ভেতর
ঢেলে দিচ্ছে গোলমরিচের গুঁড়ো, মুখে পুরে দিচ্ছে
একতাল গোবর, ভরদুপুরে ন্যাংটো করছে রাস্তায়…

কবে আমাদের দেখা হবে কলকাতা? সামনের শীতে, বসন্তে?
নাকি বসন্ত যাবে, ঝরাপাতার ওপর মরমর হাঁটবে ভুঁইফোড় ইঁদুর,
বর্ষায় চুপসে যাবে রাসবিহারী এভিন্যু, তার যে গা মুছিয়ে দেব, যাওয়া হবে না;
বালিগঞ্জের আকাশে তুলো তুলো মেঘ জমবে
আর আমি বসে থাকব একা দরজা জানালা সাঁটা অন্ধকার ঘরে শ্বাস
ফেলার শব্দ যেন কেউ না শোনে এমন নিঃশব্দে, আমার আর লেজআলা
ঘুড়ির পেছনে সারা বিকেল ছোটা হবে না, স্বপ্নগুলো লাটাইয়ে পেঁচাতে
পেঁচাতে শখের বয়স ফুরোবে…

মল্লিকাদের সঙ্গে কথা ছিল দলবেঁধে গোল্লাছুট খেলব আবার,
মাঠ পড়ে আছে খরখরে, খোয়া ফেলা, খেলা হবে না;
প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে একজন খুব হৃদয়বান মানুষের সামনে চেয়ার পেতে বসে
দুটো কষ্টের কথা বলার ছিল, বলা হবে না।

যদি তুমি আসো

ঝেঁপে যদি দুঃখ আসে, না হয় আসুক
বৃষ্টিতে যেভাবে ভেজে শিশু, তেমন ভিজব আমি সারাদিন।

ঝেঁপে যদি তুমি আসো,
তোমার জলেও আমি নির্দ্বিধায় ডুব দেব,
ডুবে যদি মুক্তো মেলে ভাল, না মিললে সাঁতরে সাঁতরে যাব তোমার হৃদয়ে।

অন্তর

শোনো,
দ্বিধা নেই কোনও,
ভালবেসে যদি পার হতে পারো সাঁকো
বুকে টেনে নিয়ে বলব তোমাকে—থাকো।
কত কেউ এল, গভীর হাঁ-মুখো জল দেখে ভয়,
অগত্যা সাঁকো একা নির্জনে না-ছোঁয়াই থেকে যায়।

আমি,
যেতে যেতে বারবার পথে থামি,
যেখানে যাচ্ছি সেখানের প্রতি পুরো অন্তর নিবেদিত আছে কি না
নিজেকে যাচাই করে দেখে নিই বুকে জমা আছে ভালবাসা কত, কতটুকু আছে ঘৃণা।
তুমিও পরখ করে এসো,
থেকে থেকে যদি জল ফুঁসে ওঠে, তবু তুমি ভালবেসো।

যাব না কেন? যাব

যদি যাই…
যদি যাই ওইখানে যে তমাল গাছটি আছে তার পাশে
পাশ দিয়ে চলে গেছে যে নদী—
আমার শৈশবের নদী, যদি যাই—
যেতে তো পারিই, কে আমাকে বাধা দেবে, কেউ যদি বাধা দেয়
বাধা দিলে আমিই বা বাধায় জড়াব কেন—
যদি যাই গোল্লাছুট মাঠে, যদি যাই—
যাই যদি ঘাসফুল, নেবুপাতা, জামরুলতলায় আবার,
যেতে তো পারিই, তবু যেতে চেয়ে চেয়ে বারবার আটকে রাখি পা এঁটেল কাদায়।

যদি যাই আকাশ যেখান থেকে শুরু, সেইখানে
মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে কিছু স্বপ্ন হাতে নিতে
যেতে চাই ঝাউবন পেরিয়ে বইচি ফলের গাছ আছে, সেইখানে।
যেতে চাই একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে একা, তার হাতে একটি নিবিড় হাত রেখে
বলতে যে, ভালবাসি।
যাবার যে কত মাঠ আছে, নদী, সমুদ্দুর আছে, বৃক্ষ আছে,
উঠোনে বেড়ানো ঝাঁক ঝাঁক লাল ঘুঙুরের হাঁস,
যাবার যে কত শনে-ছাওয়া ঘর আছে। ওম ওম বুক আছে, দু’ হাতের আলিঙ্গন আছে,
তবু পায়ে পায়ে লেগে থাকে লকলকে জিভের সাপ, যেতে চাই…
আমার একথা বারবারই মনে হয়
যদি যেতে চাই, যেতে চাইই আমি
তা হলে যাব না কেন? যাব।

যে স্বামী প্রেমিক নয়, তাকে

তোমার কাছে ফাঁপা একটি শরীর দাঁড়িয়েছে
হৃদয় ছিল একটি, সেটি নিলাম হয়ে গেছে।

কাঁপন ১২

মাচায় তুলে শরীর রাখ, কে না কে যায় খেয়ে।
পোকা না থাক, শরীরটাকে বয়স খাবে যে!

নিমজ্জন

ডোবায় কেন ডুবতে যাব, হাতের কাছে উতল নদী রেখে?
ইচ্ছে করে যার যেদিকে যাক
যেমন খুশি বেঁকে।

তুমি আমার সাত সমুদ্দুর,
ভরা পুকুর,
তুমি আমার গভীর জলাশয়।
সাঁতার কেটে সারা দুপুর
তোমার জলে ডুবে মরাও ভালবাসার জয়।

যাত্রা

আমি তাকে লঙ্ঘন করেছি অবলীলায়, ঘৃণায়
ছুড়েছি হৃদয় তাকে দূরে, ঝোপঝাড়ে
পেছনে সে কাঁদে নাকি কামড়ায় নিজের আঙুল
ছেঁড়ে চুল, ঠোকে কি না মাথা অনড় দেওয়ালে
সে কোনও বিষয় নয় ফিরে তাকাবার

লঙ্ঘন করেছি তাকে যদি, যদি তার
মুছেই ফেলেছি নাম, তবে কেন স্মৃতির শরীরে
হাত রেখে কোমল ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁধে
ফোঁটা ফোঁটা কষ্টের বকুল
ঝরাব আবার, অবেলায়?
একবার ধুলো ঝেড়ে ধুলোতে আবার কেউ গড়াগড়ি যায়?

বিবি আয়শা

কাফেলা যাচ্ছে, পেছনে পড়েছ তুমি
উটের লাগাম ধরে টেনেছিলে বুঝি!
মাহুত যুবক ভালবেসেছিল খুব,
তোমারও কিন্তু গোপনে শরীর ভেজে—
উটের হাওদা থেকে সুড়সুড় নেমে গেলে
তপ্ত বালুতে গড়াগড়ি খেলে প্রেমে।

জানাজানি হল মলত্যাগ করেছিলে।
সাত খুন মাপ প্রাকৃতিক প্রয়োজনে।
তুমি করেছিলে শরীরের সম্ভোগ
আমি মানি এও শারীরিক প্রয়োজন।

তোমার শক্তি নারীকে প্রাণিত করুক।

ভালবাসায় আজকাল মন বসে না

ভালবাসায় আজকাল মন বসে না
মনে হয় কিছু যেন কাজ আছে,
মনে হয় কোথাও যেন যাবার কথা, দূরে কোথাও।
ভালবাসা আজকাল আমাকে তেমন করে মালার মতো গাঁথে না।
যেমন গাঁথে না বেদনার দীর্ঘ সুতো।

যারা বেঁচে না থাকার মতো বেঁচে আছে, তাদের জন্য মন কেমন করে আমার।
সারাদিন যদি মন কেমন করে,
সারাদিন যদি সুচ ফোটে গায়ে—
আমি কি পাগল যে ভালবাসার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ব!

আগে তো খড়কুটো দিতে হবে তাদের—যারা ভাসছে,
আগে তো হাতখানা বাড়াতে হবে তাদের হাতের দিকে—যারা ডুবছে।
তারপর নিজে যদি বাঁচি তো বাঁচব, ভালবাসি তো বাসব।

কামান দাগা

আমার বাড়ির সামনে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি দেয়
কে আসে কে যায়, বেরোই কখন, কখন ঢুকি বাড়িতে, সব নোট রাখে খাতায়
কার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কার কোমর জড়িয়ে হাসি, কার সঙ্গে ফিসফিস… সব।
কিন্তু একটি জিনিসের নোট তারা রাখতে পারে না, সে হল
আমার মাথার মধ্যে কোন ভাবনাগুলো আসে আর যায়,
কী আমি লালন করি চেতনায়।

সরকারের কামান বন্দুক আছে
আর আমার মতো তুচ্ছ মশার আছে হুল।

দীর্ঘ পথ যাব

হেঁটে হেঁটে আমি ওই পথে যাব
বাবা বলছেন—তুমি যদি কন্যা হও, ফেরো
আমি বলি—কন্যা হলে যদি আমাকে ফিরতে হয়, তবে আমি কন্যা নই।
বন্ধুরা ডাকছে—এসো, এসো খেলা করি।
আমি ফিরব না।
ও পথ এমন পথ যে, আমাকে কেউ ফুল-চন্দন পরাবে না
ও পথ এমন পথ যে, পায়ে কাঁটা বিধবে আমার
ও পথ এমন পথ নয় যে, ও পথে মানুষ যায় বা যেতে চায়
ও পথ এমন পথ, যে পথে হাঁটলে বড় শ্বাসকষ্ট হয়।
ও পথে হাঁটলে, একদিন, আমি জানি, পাব আলোকিত একটি ব্ৰহ্মাণ্ড
মানুষে মানুষে প্ৰেম পাব,
শুদ্ধ হাওয়া পাব—
মা বলছেন—ফেরো। ভাইবোনেরা বলছে—ফেরো।
ফিরব না। আমাকে যেতেই হবে ওই পথে, যে পথে সাহস নেই সবার যাবার।

পোকামাকড়ের গল্প

আধ-ঘুমে চমকে তাকাই, দেখি
গায়ে কারও আঙুল নয়, তেলাপোকা হাঁটে।
হেঁটে হেঁটে নাভির কাছে থামে, শোঁকে।
জরায়ুর ফুল-ছেঁড়া ক্ষতে কী এমন মধু গো! সেও কি পুরুষ নাকি?
লোভের লাল জিভ ঝুলে থাকে কার্তিকের কুকুরের মতো?

বিষপিঁপড়েও দেখি পা বেয়ে বেয়ে ঊরুতেই দেবে কামড়।
ঊরু কি চিনির সিরায় ভাজা?
কী জানি সেও পুরুষ কি না, তারও নিশপিশ করে কি না খরখরে নখ!

বোলতার হুল ফোটে সব রেখে স্তনের গোড়ায়,
রাত গাঢ় হলে কড়িকাঠ থেকে সুড়সুড় নেমে সাদাসিধে টিকটিকি
খোঁজে মসৃণ ত্বক, ত্বকের খোঁড়ল।
ঘুণ খায় কুরে কুরে জরায়ুর নালি, নালিমুখ, ডিমের থলে….
ঝেঁটিয়ে বিদেয় করি, তবু শুঁয়োপোকা ঊর্ধ্বশ্বাস ছোটে সুগন্ধ খাদের দিকে,
পুরুষেরা সময় সময় শখ করে পাতালেও নামে না বুঝি!
নীল ডুমো মাছি মল থেকে উঠে সারা দিন ছল করে ঠোঁটে বসে, জল
পান করে স্যাঁতসেঁতে জিভের
এরা কি পুরুষ ছাড়া আর কিছু?

ছারপোকা ছাড় দেবে? বেছে বেছে সেও চায় নিতম্বের ঢিবি, মিহি দাঁতে টুকটুক কামড়ায়
মাংসের পলি।
থাক থাক পলির তলে শেকড়ের দাঁত চলে যায়, পুরুষের দাঁতের মতো ধার তার…
যোনিলোমে জাল বোনে মাকড়শার চৌদ্দপুরুষ।
তার চতুর তন্তুর ঘেরে, এত যে বোধের আড়ত আমি,
আমিও নিভৃতে জড়াই।
পুরুষেরা খাবে বলে প্রকৃতিও কায়দা করে পাতে নারীর শরীর কেটে রসের কলস।

অনুগত

এসো বললে আসি, যাও বললে যাই
কিছু পাই বা না পাই
রাত্রিদিন তোমার কথায় নাচি।
বলো, আমি কি আমার জন্য বাঁচি?

প্রেরিত নারী

আমরা প্রকৃতি-প্রেরিত নারী
প্রকৃতি নারীকে পুরুষের পাঁজর থেকে গড়ে না।

আমরা প্রকৃতি-প্রেরিত নারী
প্রকৃতি নারীকে পুরুষের অধীন করে না।

আমরা প্রকৃতি-প্রেরিত নারী
প্রকৃতি নারীর বেহেস্ত পুরুষের পায়ের তলায় রাখে না।

প্রকৃতি নারীকে মানুষ বলেছে, পুরুষ-রচিত ধর্ম তাতে বাগড়া দিয়েছে।
প্রকৃতি নারীকে মানুষ বলেছে, সমাজ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হেসেছে।
প্রকৃতি নারীকে মানুষ বলেছে, মানুষেরা মারমুখো হয়ে বলেছে—না।

বহুগমন

যদি চাও চলে যেতে, দেরি করবার
কোনও দরকার
আছে কি? না হয় পৌঁছে দিয়ে
আসি আমি, যেদিকে তাকিয়ে
থাকো সারাদিন। এদিকে নিশ্চিত আমি
বুঝি আমাকেই ভাবো, অথচ কী ভীষণ বোকামি!
কোথায় তোমার মন পড়ে থাকে, জানি,
জেনেও আবার না-জানার মতো করে মনখানি
তোমার জন্যই রাখি।
সব ফাঁকি
একদিন টের পাই,
তড়িঘড়ি তখন পালাই।
তোমার আঙিনা ছেড়ে
যতই দাঁড়াতে চাই স্মৃতি-টিতি ঝেড়ে
দূরে, পারি না; সকল
ছাপিয়ে হৃদয় থেকে ঝরে অবিরল জল।

তুমি কি এসব বোঝ? আমাকে একলা রেখে অমন যে চলে যাও,
পেছনে কি একবার ভুলেও তাকাও?

নির্বোধের দেশ

চুলের মুঠি ধরে দেশটিকে দু’বেলা আছাড় দিচ্ছে যারা
তারা এখন দেশের মাথা।
আর আমরা যারা দেশটির পোড়া ক্ষতে মলম লাগিয়ে দিই
আমরা যারা সবুজের মধ্যে লাল একটি সূর্য এনেছি পতাকায়,
আমরা যারা দেশটির দুঃখে রাতভর কাঁদি,
তারা দেশের কেউ হই না।

যারা দেশটির পিঠে চাবুক চালায়, পেশিতে জোর আছে বলে
মাঝেমধ্যে দেশটিও স্তাবক হয়ে পড়ে তাদের,
আর আমরা যারা রোগা, পলকা, না-খাওয়া, মাথার ওপর আকাশ নিয়ে বাঁচি,
দেশটিকে দুধ-কলা খাইয়ে মানুষ করি,
তারা নাকি লোক ভাল নই।

প্রশ্ন

কেউ কি এমন কিছু দিতে পারো
ভালবাসার চেয়ে ভাল?
এমন একটি তরবারি যেটি
আমার থেকে ধারালো?

১৫০০ সাল

শতবর্ষ পরে এই কবিতাটি কেউ না কেউ পড়বে….
যে পড়বে সে যদি নারী হয়, সে কি তখনও কেবল নারীই?
ধরে নিচ্ছি নারী নয়, সে তখন আদ্যোপান্ত ‘মানুষ’
সে আর চার দেওয়ালে বন্দি নেই, তার পায়ে যে সহস্র বছরের শেকল ছিল,
সে শেকল নেই
তার হাতে যে কুরশি-কাঁটা আর খুন্তি ছিল, নেই।
হাতে উঠেছে কলম, কাস্তে, কোদাল আর কলকবজা।
সে মানুষের মতো হাঁটে, দৌড়োয়, হা হা হাসে
মাছের মুড়ো খায়, দুধের সরও, তাকে আর ভুগতে হয় না পুষ্টিহীনতায়।
সে যদি নারী হয়,
তাকে কেউ পাঠশালায় না পাঠিয়ে
ঠেলে দিতে পারছে না জ্বলন্ত উনুনের কাছে, তাকে আর
পরাতে পারছে না বাল্যবিবাহের ফাঁস, তাকে আর
আবৃত করতে পারছে না ভুতুড়ে বোরখায়।
সে নিশ্চয় তখন দাবি করতে পারে সমান উত্তরাধিকার
সে নিশ্চয় তখন দাবি করতে পারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্মান
সে নিশ্চয় তখন দাবি করতে পারে জরায়ুর স্বাধীনতা, কন্যা জন্ম
সে নিশ্চয় তখন দাবি করতে পারে চাঁদ বা সূর্যের
নীচে তার অবাধ বসবাস!

যে পড়ছে এই কবিতা, সে নারী বা পুরুষ হোক
সে নিশ্চয় ধর্মের গ্রাস থেকে ইতিমধ্যে মুক্ত
তাকে আর পাঁচবেলা কপাল ঠুকতে হয় না মেঝেয়
তাকে আর প্রসাদ খেতে হয় না ঠাকুরের
মসজিদ-মন্দির ভেঙে গজিয়ে গেছে মনোলোভা ফুলের বাগান।
জুসমে জুলুসে নেই, পিরের মাজার নেই, স্বৈরাচারের উৎপাত নেই, কাঁটাতার নেই
বদলে দিগন্ত অবধি রজনীগন্ধার ঘ্রাণ, মুগ্ধ ভালবাসা।

শতবর্ষ পর নেতার বাড়িতে, শিক্ষাঙ্গনে, শহরে, গ্রামে কি
দ্রিম দ্রিম বর্ষণ চলে গুলির? ককটেলের?
দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সন্ত্রাসের দেশে
অক্ষত আছে কি শহিদ মিনার, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা,
অপরাজেয় বাংলা, জয়দেবপুরের মুক্তিযোদ্ধা, স্মৃতিসৌধ?
তখনও কি একুশের ভোরে খালি গায়ে ফুল দিতে ভিড় করে অগণন বাঙালি?
তখনও কি বৈশাখে, শরতে, অঘ্রানে, ফাগুনে উৎসব হয়
প্রথম প্রভাতের, সাদা মেঘের, নবান্নের, ঝরাপাতার হাওয়ার…
তখনও কি মানুষ মানুষের জন্য গান গায়, কাঁদে?

যে তুমি পড়ছ এই কবিতা, তুমি কি জানো শত বছর আগে
কী ভীষণ স্বপ্নহীন অন্ধকারে একাকী হেঁটেছিলাম
নত, ন্যুব্জ নষ্ট মানুষেরা? দারিদ্রে, পারমাণবিক ধোঁয়ায়,
অশিক্ষায়, অজ্ঞতায়, জরায়, ব্যাধিতে ক্লান্ত ক্লিষ্ট…
তুমি বা তোমরা নিশ্চয় হাতের মুঠোয় নিতে পারো
সততা ও সমতার আলোকিত ব্রহ্মাণ্ড?
আমরা পারিনি।

এই সুফলা মাটির শরীর ফুঁড়ে ততদিনে নিশ্চয় জন্মেছেন আরেক রামমোহন,
আরেক ঈশ্বরচন্দ্র, ক্ষুদিরাম, সুভাষ বসু, আরেক রবীন্দ্রনাথ,
জন্মেছেন সূর্য সেন, প্রীতিলতা, বেগম রোকেয়া, শেখ মুজিব,
জন্মেছেন নূর হোসেন। শতবর্ষ পরে সমৃদ্ধ বাংলায়,
আমার কবিতা যদি ধুলোয় লুটোয়, তবু
মাছ-ভাতে বাঙালি বাঁচুক,
গোলাপের গন্ধে বাঁচুক স্বপ্নবান মানুষ
শুদ্ধ স্নিগ্ধ ভালবাসায় বাঁচুক, বৃক্ষেরা সবুজ হোক আরও।

কবি নির্মলেন্দু গুণ

সারা দুপুর কমপিউটারকে প্রতিদ্বন্দ্বী করে দাবা খেলছেন,
মানুষকে শতরঞ্চির অপর পারে বসাবার চেয়ে যন্ত্রকে বসানো বোধহয় ঢের নিরাপদ!
হবে হয়তো। তা না হলে তিনি কেন আজিমপুর কবরখানার খুব কাছে বসে, এত কাছে যে
মৃত্যুর গন্ধ পাওয়া যায়, সারা দুপুর বোড়ে চালাচ্ছেন, ঘোড়া হাতি রাজা মন্ত্রী চালাচ্ছেন!
কখনও কখনও কমপিউটারকেও তিনি হারিয়ে দেন।
অথচ তিনি বারবার হেরে যান রহিমুদ্দিনের কাছে, বদর আলির কাছে

আজকাল তিনি মদ এবং মেয়েমানুষে তেমন বিশ্বাসী নন
সন্ধেয় বসেন জুয়ো খেলতে, হাইড্রোজেন।
জুয়ো না খেললে তাঁর ভাল ঘুম হয় না, জুয়োতে না হারলেও
তাঁর অস্থির-অস্থির লাগে।
জুয়োতে দু’-চারশো টাকা হেরে গেলে তাঁর ক্রোধ হয় এক ধরনের
ক্রোধ হওয়াটাই চান তিনি।
ক্রোধ হলে দু’-একজনকে হারামজাদা বলে গাল দিতে পারেন।
বদর আলিরা তাঁকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নেত্রকোণা থেকে দুর্গাপুর ঠেলে দিচ্ছে
রহিমুদ্দিনেরা তাঁকে ঠেলতে ঠেলতে পলাশি থেকে….
এদের তিনি প্রকাশ্য রাস্তায় শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে
গুলিস্তানের মাথায় কিংবা প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে পাঁচশো লোক শুনিয়ে
হারামজাদা বলে গাল দিতে চান, কিন্তু ভয়ে তাঁর গলার স্বর বুজে আসে।
তাই জুয়োর টেবিলে বসে একটি হারামজাদা গাল দেবার জন্য তিনি ইচ্ছে করেই হারেন
লোকে ভাবে এ বোধ হয় নিস্পন্দ তাসকে গাল দেওয়া, ইস্কাপনের বিবিকে
বা রুইতনের সাহেবকে।

নির্মলেন্দু গুণকে আমি বাংলাদেশ বলি,
বদর আলিদের কাছে সর্বস্ব হেরে
ছেঁড়া বালিশে মাথা রেখে পুলি কাঁথায় গা ঢেকে শুয়ে থাকে আমার বাংলাদেশ।

জলে ভাসা

আকাল পড়েছে দেশে প্রেমিকের,
দেখেছি তো ঢের
শরীরের কূপে ডুব দেয় সোনা ব্যাঙগুলো
শেষে ধুলো
আর জল ঝেড়ে চলে যায় তারা, যেন রাজহাঁস।
আমি ঘাস
পেতে বসে থাকি,
রাখি
আশা মনে, কেউ এসে একদিন বলবেই বাসি, ভালবাসি
অবোধ স্বপ্নের জলে সারাদিন ভাসি।

তুমি যদি আসবেই ভাবো,
যাব
যেদিকে দু’চোখ যায়,
পাখিরা যেমন করে হঠাৎ হারায়।

এসো,
আমার একটি শর্ত শুধু, ভালবেসো।

চাওয়া

তোমাকে আমি বিষম চাই, বুঝলে!
এরকম ডাকাবুকো মেয়ে তোমাকে চাইছি, বুক কাঁপছে বুঝি!
দুর, বুকে কিন্তু কামড়ে দেব। এই যে রাজ্যিসুদ্ধ মেয়ে খুঁজলে….
অবশ্য আমি লাইনে দাঁড়ালেই তোমার সব এদিকওদিক খোঁজাখুঁজি।

পেলে? অন্তত দু’-একটি? আমি যদি ধরে এনে তোমাকে বিছানায় শুইয়ে….
ভয় পাচ্ছ? বিছানায় শুইয়ে আবার কাপড় না টেনে খুলে ফেলি!
ধরো জল পড়ছে ঘরে, ভাঙা জানলা আর টিনের চাল ছুঁইয়ে,
আর আমি বলছি তোমাকে, ‘চলবে? জলকেলি?’

তুমি তখন ‘না’ বলতে পার যদি, আমি নাম বদলে রাখব,
স্পর্শ করব আর তুমি আকাশে নক্ষত্র গুনবে অত সন্ন্যাস তোমার নয়,
লোকের সামনে ভান করবে, নাচতে জানে না গাইতে জানে না চাইতে জানে না মেয়ে
নোবো,
আর আড়ালে আবডালে যত ডাকাবুকো আর দস্যি আছে, সবার সঙ্গে প্রণয়।

অমন রাখঢাক করে নয়, আমি সোজাসাপটা বলতে চাই-চাই।
চাই মানে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে ঈশ্বরবাদীরা যেমন ভান করে যে ঈশ্বর থাকে,
অমন থাকা চাই তোমার, সর্বত্র। খাড়াইয়ের
দিকে যেতে যেতে মস্ত এক অরণ্য পড়বে, দক্ষিণে দাঁড়িয়ে ঢিল দেবে মৌচাকে।

মৌমাছিরা হুল ফুটোতে আসলে আমি করব কী জানো? পিঠ পেতে দেব,
তুমি বাঁচবে পড়ে আমার গায়ের আড়ালে,
ও কিছু না, মেয়েদের কে না কামড়ায়, না হয় মৌমাছিই, এই ফাঁকে নেব
তোমার সারা শরীরের ঘ্রাণ, তোমার কি সাধ্য আছে ডিঙোবার, ওরকম সুনসান রাতে,
দু’জনে দাঁড়ালে?

ঢের দেখা আছে

দেখ, বাজে বোকো না
যখন তখন বলা নেই কওয়া নেই, হুড়মুড় ঢুকো না।
কোথায় আবার? ঘরে, বিছানায়-
আচ্ছা, প্রেম কি এভাবে কেউ করে? নাকি করা যায়?

পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকি, হাত ছড়িয়ে উপুড় হয়ে, তুমি যে ঢোকো
কে জানে ঢুকে কী সব লুকিয়ে লুকিয়ে শোঁকো
অথবা, তোমার আর গন্ধ নেবার কী দায়
কোথাও জাদুর কাঠি-টাঠি পুঁতে রাখো কি না, দেয়ালে বা জানালায়…
আমি কি কখনও বশ হতে পারি। বোকা!
অবশ্য একদা যত্রতত্র খেয়েছি বিস্তর ধোঁকা।
আর নয়! ন্যাড়া বুঝি বারবার বেলতলা যায়?
এত যে দুর্যোগ গেল, ঢের দেখা আছে, এক আমি ছাড়া কেউ নেই আমাকে বাঁচায়।

চুক্তি

এক বিকেলে মেঘনা যাব, ঠিক তো!
আগের সব অভিজ্ঞতা তিক্ত,
একটু ভাই বুঝে চলবে, নৌকো যদি চড়ি
শেষ বিকেলে খিদে লাগলে কাঁচকি-চচ্চড়ি,
চন্দ্রমুখী আকাশখানি আয়না-জলে ফেলে
উপুড় করে রাখব কিছু স্বপ্ন এলেবেলে।

সুখে কিন্তু শরীর ভাসে, জল-জোয়ারে সুখ,
একটু তুমি জানি জলের পা ছুঁতে ইচ্ছুক।
আমার বড় শহর ছেড়ে দূরে যাবার শখ
সঙ্গে যদি ইচ্ছে যেতে চঞ্চল বালক
একটু ভাই দেখে চলবে, পিছলে যদি পড়,
সাঁতার জানো? মনে হয় না। নৌকো নড়বড়।

এক বিকেলে জীবন ছোঁবো, ঠিক তো!
সেই কতকাল ভেতরখানা রিক্ত।

সই

সবার জন্য আমি আর আমার জন্য কেউ নয়,
যে মানুষই যায় আর যে মানুষই আসে—
আমি সবার পদতলের পথ হই।

সবার জন্য আমি আর আমার জন্য কেউ নয়,
তাদের জীবন টইটম্বুর আমার শুধু শূন্যতাময়।
যে মানুষই আসে আর যে মানুষই যায়—
নাগাল পেলে অন্ধকারে ছিঁড়ে ছিবড়ে খায়।
বন্ধু কোনও নেই, একা আমিই আমার দুঃখ-পোষা সই।

মেয়েবেলা

১

তিরের মতো শীত বেঁধে গায়ে তখন, তখন আমার হাতের
তালুতে ধোঁয়া ওঠা ভাপাপিঠে আর ভাপাপিঠের
পেটের ভেতর পাটালি গুড় আর কথা বললে মুখ থেকে ধোঁয়া বার হয় যেন
চুলো, যেন জঙ্গলের ঝরাপাতায় আগুন, যেন ভাত ফুটছে, যেন
ডালে হচ্ছে পাঁচফোড়ন, যেন
বাড়িঘর পুড়ছে, পেটের নাড়ি পুড়ছে, জিভ পুড়ছে

তখন একহাতের ভাপাপিঠের দাগ, আরেক হাতে ডাংগুটির গুটি
ডাং হাতে দাঁড়িয়ে যায় লাবু বাবু সাবু হাবু… ছয় ভাই
অপর পক্ষে একা আমি, গুটি হাতে, গুটির পেছন ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়, গুটি
ওড়ে কড়ইগাছে, চালে, পগারে, খাটা পায়খানায়, রোদে দেওয়া শুকনো মরিচে,
বরইয়ের আচারে…হাত পা মেখে যায় কাদায়, তেলে, গুয়ে পিঁপড়েয়;
লাবুরা ছক্কা মেরে ছয় ভাই আমার পিঠে চড়ে বাড়ি ফেরে, আমার হাঁটু ছিলে যায়,
হাতের তালু ছিলে যায়, ভাপাপিঠের দাগ মুছে যায়।

২

গুঙ্গি সই। মামু কই? মাছের কাছে। মাছ কই? চিলে নিছে। চিল কই? উইড়া গেছে,
ধল্পত।
এভাবে ধল্পত পড়তে পড়তে, মানুষের পায়ের পাতা থেকে কাত হয়ে শীতলপাটিতে
মাটিতে
পড়তে পড়তে আরও একটি খেলা খেলেছি
এই মেয়ে তোর বাড়ি কই? শিউলিতলা। শিউলিতলায় শিউলি নেই?
বানর আছে। শিউলিতলায় শিশির নেই? ইঁদুর আছে। শিউলিতলায় ঘাস নেই? কাদা
আছে।
পা পিছলে আলুর দম। ধল্পত।
এই মেয়ে তোর বুকে কী?

৩

বুকের মধ্যে বরই হয়, বুকের মধ্যে সুপুরি, বুকের মধ্যে কমলালেবু, বুকের মধ্যে কুমড়ো
আর শেষে গিয়ে বুকের দড়িতে চামচিকে
সারা সকাল বরই পাড়ল বালকেরা, বুড়োরা কোঁচড় ভরে সুপুরি নিল, কড়া দুপুরে
কমলালেবু কামড় দিল মস্ত মস্ত যুবক, কুমড়োকে মোরব্বা করে খেল হাভাতেগুলো
আর রাতে চামচিকে ঝুলতে দেখে ছেলে বুড়ো সব পালাল।

জীবন কখনও বাঁ হাতে, কখনও ডান হাতে

আজকাল ছোট একটা মার্বেল পাথরের আকার নিয়েছে জীবন,
কখনও একে বাঁ হাতে নিই, কখনও ডান হাতে,
ছুড়ে দিলে গড়গড়িয়ে ছুঁতে যায় খাটের পা।
দেয়ালে সিলিং-এ যেখানেই একে ছুড়ি, ঠক্কর খেয়ে
কিছু না কিছুর আড়ালে পড়ে থাকে, কখনও দিন দশ পরে
ইঁদুর-মারা কলের পেছনে, গাদা করা বাসনকোসনের পেটে,
শলার ঝাঁটার ফাঁকে অথবা জল-যাওয়া-গর্তের ছাঁকনিতে
দেখি, একা অন্ধকারে শুকনো মুখে ঝিমোচ্ছে জীবন….

ছোট একটা মার্বেল পাথরের মতন জীবন
ইচ্ছে করে তিনতলা থেকে ফেলে দিই সামনের চৌরাস্তায়
লোকের গোড়ালিতে, রিকশার চাকায়, ট্রাকের টায়ারে
থেতলে থেতলে মিহি নুনের মতো গুঁড়ো হবে!
জীবন নিয়ে ন’-দশ বছরের মতো এই যৌবনেও খেলতে ইচ্ছে করে
উঠোনের ঘাসে, কাচের বয়ামে পুরে লুডু খেলার ছক্কা নাড়ার
মতো, অথবা কৌটোয় চিঁড়ে-চানা-নুন-ঝাল-তেল নিয়ে
মিশেল দেবার মতো ঝাঁকাতে ইচ্ছে করে,
মনে হয় জীবনের তবু শ্বাসরোধ হবে না, খেলা সাঙ্গ হবে না।

আর অবাক কাণ্ড, হঠাৎ হঠাৎ, রাত্তিরের দিকে
অথবা ভোর হয় হয় এমন সময়
জীবন দেখি, ছোট মার্বেল পাথর থেকে আস্ত একটা পিরামিড হয়ে গেছে
কখনও একে বাঁ কাঁধে নিই, কখনও ডান কাঁধে
সারাদিন এমন অবস্থা হয় যে, জীবনের ভারে আমার হাত পা
সব খোঁড়া হতে থাকে, পিঠের হাড় ভেঙে যায়, ন্যুব্জ হতে হতে
জীবনের তলে পড়ে, রক্তমাংসের আমি এককণা ধুলো হয়ে যাই।

অন্তরীণ

ঘণ্টার কাঁটা চড়ুইপাখির মতো দ্রুত দৌড়োচ্ছে, আর আমি
আমি একটি অন্ধকার ঘরে একা
নিশ্বাসের শব্দ যেন কেউ না শোনে এমন নিঃশব্দে
বেঁচে আছি।
এর নাম কি বাঁচা না অন্য কিছু?
মৃত্যুর সঙ্গে কাল বা পরশু দেখা হবে অথবা আজই
অথবা এখন, আর দু’ মিনিট পর—এরকম
আতঙ্কে আমি নীল হয়ে থাকি ভেতরে।
যে বন্ধুটি দু’বেলা খাবারের থালা হাতে ঘরে ঢোকে
তাকে দেখে ওপরে ওপরে হাসি, তার আঙুলের ফাঁকে
নলা থাকে তামাকের। আমাকেও
আগুনমুখো শলা দেয় সে, আশ্বাসের করতল রাখে পিঠে।
আমি জানি, বন্ধুরা ফাঁসির আসামীর গায়ে
এরকম আদর বুলোয়, করুণায়।
আমি জানি, আমাকে এখন কেউ কেউ
দু’ গালে চুম্বন, বাহুতে ‘কেয়াবাৎ মেয়ে’ বলে চাপড়
আর আচমকা পাতে ঢেলে দেবে মাছ মাংস ডিম দুধ।
আর এদিকে জিভে এত তেতো লেগে থাকে আমার
যে, খাবার দেখলেই পেটের নাড়িতে পাক দিয়ে ওঠে।
এখন যে কোনও খাবারে মৃত্যুর গন্ধ পাই, বন্ধুদের
জীবিত কাঁধে যখন মাথা রাখি, তখনও মৃত্যুর গন্ধ।
এখন নদীর জল, ফুলের পাপড়ি, গাছের পাতা
আর মৃদুমন্দ হাওয়া থেকেও ভকভক করে মৃত্যুর গন্ধ বেরোয়।

আমি একা, একটি ঘোর আঁধার ঘরে
অনেকটা কফিনে,
শুয়ে থেকে থেকে দেখি একটি স্বপ্ন এসে বসে আমার চোখে—
শৈশবের খেলার মাঠে, লেবুতলায় বাঁশঝাড়ে, অবাধ দৌড়োচ্ছি
স্বজন আর পড়শির ভিড়ে আমি, নির্ভয়ে।

ব্লাসফেমি আইন

সংসদ ভবন থেকে সড়সড় করে নেমে এল একটি মস্ত অজগর
নগরের বড় রাস্তায় রাজার মতো চলল, ডানে গেল, বামে গেল
অলিগলি ঘুরল আর মানুষ খেল
যে মানুষ সত্য বলে, তাকে।
যে মানুষ সভ্যতা চায়, তাকে।
যে মানুষ নোংরা ঘাঁটে না, তাকে।
অজগরের খিদে মেটে না তবু, সে এক নগর থেকে
আরেক নগরে গেল, বড় শহর থেকে ছোট শহরে,
সেখানেও তাজা মাংসের স্বাদ পেল—
যে মানুষ ছবি আঁকে,
যে মানুষ কবিতা লেখে,
যে মানুষ গান গায়।
অজগর বিষম খুশি। সে এঁকেবেঁকে নেচে নেচে
গঞ্জে গ্রামে নদী হাওড় খেত খামার পেরিয়ে আরও খাদ্য পেল—
যে কৃষক পাঁচবেলা লাঙল চালায়,
যে নারী মাঠে কাজ করে,
যে রাখাল বাঁশি বাজায়।
খেতে খেতে পেট যখন ভরল অজগরের
তখন আর মানুষ নেই দেশে, কিছু কেবল শ্বাপদ আছে
শ্বাপদ আর অজগরের বেশ ভাব হল, তারা দীর্ঘ দীর্ঘকাল বেঁচে থাকল।

(দেশব্যাপী ব্লাসফেমির বিরুদ্ধে আইন পাশ করবার জন্য যখন ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আন্দোলন করছে, তখন এই কবিতাটি লেখা। )

এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি

মৃত্যুর সঙ্গে এখন আমার রোজ দু’বেলা দেখা
আমরা পরস্পরকে গাঢ় চুম্বন করি, পাশাপাশি বসি, ধুম আড্ডা দিই।
মৃত্যুর শরীরে চমৎকার সুগন্ধ, হাঁটুতে থুতনি রেখে
জীবনের গল্প যখন করি, থই থই নদীতে
ডুবে ভেসে কৈশোর-যাপন, ধুলো খেলা—
যখন গল্প করি ফিতে-বাঁধা বেণী উড়িয়ে গোল্লাছুট
গোলাপ-পদ্ম, হাডুডু আর ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে দৌড়ে দৌড়ে
ভর সন্ধেয় মাঠ পেরিয়ে, খাল পেরিয়ে
রাত্তিরে পুকুরপাড়ে বসে সারা গায়ে জ্যোৎস্না মাখানো—
জলের ওপর শুয়ে থাকা রুপোলি মাছ দেখে
সেই মাছের দিকে হাত বাড়ালে হাতের মুঠোয় আসে
মাছ নয়, টুকরো টুকরো চাঁদ।
যখন গল্প করি ঘাসের বিছানা থেকে ফ্রক ভরে শিউলি তুলে
পড়শির দেয়াল ডিঙিয়ে দে দৌড় দে দৌড় দিনের কথা
মৃত্যুর চোখেও তখন অল্প অল্প শিশির জমে।
তারও কণ্ঠ বুজে আসে। বলে—যাই।

মৃত্যুর সঙ্গে রোজ দু’বেলা দেখা হয় আমার
দেখা হলে পরস্পরকে গাঢ় চুম্বন করি আর যখন গল্প করি
কৈশোর পেরোতেই গহন অরণ্যে এক পাল বুনো মোষের মুখে
আমাকে ছেড়ে দিল কারা যেন,
কারা যেন একটি ডোবায় ঠেসে ধরল আমার মুখ, মাথা
কারা যেন আমার পায়ে হাতে শেকল পরাল
কারা যেন পাথর ছুড়তে ছুড়তে আমার কপাল, মাথার খুলি…
মৃত্যুর চোখেও তখন গভীর কুয়াশা নামে, বলে—যাই।

মৃত্যুর সঙ্গে রোজ দু’বেলা দেখা হয় আমার।
আমার চুলে পিঠে হাত বুলিয়ে সে কথা দিয়েছে
আবার আসবে সে, এবার আর ঘোর অন্ধকারে
আমাকে একলা বসিয়ে কোথাও যাবে না, তার
বাড়ি আছে একটি আলোয় ঝলমল, ওখানে নেবেই আমাকে।

বাবার কাছে চিঠি

বাবা, তুমি কেমন আছ?
এখনও কি আগের মতো মর্নিং ওয়াকে যাও ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে?
ব্ৰহ্মপুত্রে তো জল নেই, তুমি তবে কার দিকে তাকাও?
কাশফুল? কাশফুলও তো আজকাল তেমন ফোটে না।
তবে কি মানুষ দেখ, মানুষের ঢল নামে যে সার্কিট হাউসের মাঠে
সেই মানুষ?
মানুষেরা কি এখন আর তোমার দিকে এগিয়ে আসে আগের মতো,
চেনা মানুষ? বন্ধুরা? অথবা দু’-চারজন পড়শি?
নাকি ধর্মদ্রোহী কন্যা জন্ম দেবার অপরাধে তোমাকে হাঁটতে হয়
মাথা নিচু করে গাছগাছালির আড়ালে
মানুষের শ্যেন দৃষ্টি থেকে গা বাঁচিয়ে?
হয়তো আজকাল মর্নিং ওয়াকও ছাড়তে হয়েছে ভোরের হাওয়া খেতে
আসা মানুষগুলো তোমাকে আঙুল তুলে শাসায় বলে!

তোমার জন্য আমার বড় মায়া হয়,
বড় মায়া হয় আমার।
সেই ছোটবেলায়, জুতোর মচমচ শব্দ তুলে ঢুকতে যখন বাড়িতে
এক্কাদোক্কার দাগ মুছে দৌড়ে যেতাম পড়ার টেবিলে।
এখনও মনে আছে, একদিন চুলোর কাছে বসে কী একটা
রান্না শিখছিলাম বলে উঠোনে সজনে ডাঁটা ছিল, তা নিয়েই
তাড়া করেছিল, যেন ঘরে যাই, পড়তে বসি। যেন মানুষ হই।
পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে দিনে সত্তর বার
তোমার ‘ছাত্রানাম অধ্যয়নং তপঃ’ মন্ত্ৰ শুনতে শুনতে
মানুষ কতটুকু হয়েছি জানি না,
তবে এটুকু জানি দুর্যোগ এলে মিথ্যের খোপের মধ্যে যখন
তাবৎ লোকেরা লুকোয়,
তখন মেরুদণ্ড শক্ত করে বেশ দাঁড়াতে পারি একা,
সত্যগুলো জিভের আগুনে খইয়ের মতো ফোটে।

আর এ কারণেই আজ আমাকে লক্ষ মিথ্যুকেরা খুঁজছে
ফাঁসি দেবে বলে, আমি হুলিয়া মাথায় নিয়ে
ছুটছি ঘোর অন্ধকারে, আলো নেই, বুঝলে বাবা এতটুকু আলো নেই কোথাও—
দেশ কি এভাবেই এরকম ভুতুড়ে অন্ধকারে ডুবে থাকবে, মানুষগুলো
খোপের ভেতর বোবা কালা অন্ধ—স্বপ্নহীন বেঁচে থাকবে দীর্ঘ আয়ু
আর খাদ্য আর তসবিহর গোটা আর লোভ আর মোহ-মাৎসর্য নিয়ে
তুমিও কি চোখের সামনে বোঝো যে আলো নেই?
তুমিও কি পায়ের তলায় বোঝো যে মাটি সরছে?
তুমিও কি হাতের কাছে বোঝো যে কোনও বন্ধুর কাঁধ নেই?
তুমিও কি মাথার ওপর বোঝো যে মেঘ জমছে?

এখনও কি নতুন বাজারের ‘আরোগ্য বিতানে’ বসো? রোগী দেখ?
গরিব রোগীরা বিনে পয়সায় চিকিৎসা নেয়?
এই যে তোমার উদার দরজা মানুষের সেবার জন্য খোলা
তুমি কি জীবনের শেষ বয়সে এসে পারো রোগীর নাড়ি দেখতে ঠিক ঠিক?
নাকি ধর্মদ্রোহী কন্যা জন্ম দেবার অপরাধে
যারা তোমার মাথায় পাথর ছুড়ে মারে, তারা তোমার হাত
থেকে ছিনিয়ে নেয় রোগীর কবজি
কেড়ে নেয় তোমার স্টেথেসকোপ? এক্সরে মেশিন? মাইক্রোসকোপ?
স্কালপেল, ফরসেপ?
তুমি একা পড়ে থাকো, বড় একা, কপালের দু’পাশে দপদপ শিরাদুটো দু’ হাতে চেপে!

তোমার জন্য বড় মায়া হয় আমার, বড় মায়া।
একটু একটু করে যখন মানুষ হয়ে উঠছি, রক্তে টগবগ করে ফুটছে
যেন মানুষ হই, তোমার সেই মন্ত্র
কোথায় সকালে ঘুম ভেঙে তুমি দেখবে গোলাপ যেমন পল্লবিত হয়,
তেমন অন্ধকার কেটে কেটে ফুটছি
আমি, দু’ হাত ভরে আলো আনছি থোকা থোকা
তোমার জন্য আর বারো কোটি মানুষের জন্য।
তোমার তো ব্লাড প্রেশার বেশি,
নিজের চিকিৎসায় কখনও তোমার মন নেই,
জ্বরে গা পুড়ে গেলেও
টলতে টলতে চলে যাও রোগী দেখতে,
বিনে পয়সার রোগী।

নিজের রক্তবমি রেখে অন্যের অম্বল সারাও!
এই তোমাকেই আজ মাথা নত করে হাঁটতে হয় রাস্তায়,
দেয়ালে পোস্টার পড়েছে ধর্মদ্রোহী কন্যার ফাঁসির দাবিতে
আমাদের বাড়ির দেয়ালেও কি, বাবা?
সেদিন ওরা তিন দফা ভাঙচুর করল আমাদের বাড়িতে, তোমার চেম্বারে
ওই ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে তোমার কি মনে হয়নি
ধর্ম বেচে খায় এরা, ধর্ম এদের মসনদে ওঠার মসৃণ সিঁড়ি।
ধর্ম কি তখন মনে হয়নি তোমার যে, এটি আসলে বেচে খাওয়ার
এটি কেবল বোকা বানাবার অন্ধ বানাবার বধির বানাবার একটি তেতোমিষ্ট ফল,
আফিম!
তোমার জন্য বড় মায়া হয় আমার, বড় মায়া।

কতদিন দেখা হয় না তোমার সঙ্গে, কত দীর্ঘদিন!
শেষ যখন দেখি, দেখে তোমাকে মনে হয়নি তুমি সেই আগের তুমি,
আগের সেই ঋজু শরীর আর নেই, আগের সেই গমগমে কণ্ঠস্বর,
আগের সেই জুতোর মচমচ শব্দ, আগের সেই…
তুমি তো হেরেছ জীবনে অনেক, আমিও।
তুমি তোমার গ্রামকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলে, চেয়েছিলে
ধানে পাটে শাকে সবজিতে বৃক্ষে ফলে ছেয়ে যাক
তোমার শখের গ্রাম, এত সবুজের স্বপ্ন তুমি
কী করে লালন করতে, তোমার স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে যতই
ওপরে উঠি, যতই উঠি কোনও শীর্ষের নাগাল পাই না এই কৌতূহলী আমিও।
বিনিময়ে ওই গ্রামের লোকেরাই তোমার মাথায় কুডুলের
কোপ বসাল।
আর আমার স্বপ্নের ওপর দেশসুদ্ধ মানুষ ফেলে দিচ্ছে মণ মণ পাথর,
গজারি কাঠ, হাতবোমা, আগুন, বিষাক্ত সাপ, ফাঁসির দড়ি,
কী ভীষণ তাণ্ডব চারদিকে তাই না?
একটি মানুষকে হত্যা করবে বলে লক্ষ লোক তাড়া করছে,
হন্যে হয়ে খুঁজছে—
তুমি কি ভয় পাচ্ছ, ব্লাড প্রেশার বাড়ছে?
না বাবা ভয় পেয়ো না, আমি ঠিক দাঁড়াবই
ওদের পাথর, বোমা, তলোয়ার, পিস্তলের সামনে
আমি অনড় দাঁড়িয়ে থাকব। এত অনড় দাঁড়াব যে
ওরা হয়তো ওদের অস্ত্র নিক্ষেপ করে
আমার দেহকে নির্মূল করবে, কিন্তু বিশ্বাস?
বিশ্বাস তো মরবে না, যা আমি ছড়িয়ে দিয়ে
গেছি হাজার মানুষের মধ্যে, তা মানুষ
গোপনে হলেও রোপণ করবে, ওতে জল দেবে,
আর চারা যদি বড় হতে হতে বৃক্ষ হয়,
মহীরূহ হয়, তবে জগতে কত কুড়ুল আছে
যে কোপ বসাবে ওদের গায়ে? না হয় বসাক
মরা বৃক্ষের আনাচ-কানাচ থেকে আবার বুঝি অঙ্কুরোদগম হয় না? হয়!

বাবা তুমি ভেঙো না, যেমন মেরুদণ্ড শক্ত করে
দাঁড়াতে শিখিয়েছিলে আমাকে, তেমন দাঁড়িয়ে থাকো,
আমরা হেরে গেছি বটে আজ, মানুষ আজ চাবুক
মারছে আমাদের পিঠে
একদিন দেখো তোমার গ্রামও ধানে পাটে শাকে সবজিতে
বৃক্ষে ফলে সমৃদ্ধ হবে,
একদিন দেখো আমার স্বপ্নগুলোও ডালপালা মেলে বিকশিত হবে,
বিত্ত নেই, মান নেই
আমাদের বুকের ভেতর নিষ্কলুষ স্বপ্ন ছাড়া আর আছে কী, বলো?

***

Book Content

আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে – তসলিমা নাসরিন – Lesson – 2332
লজ্জা - তসলিমা নাসরিন

লজ্জা – তসলিমা নাসরিন

ভালোবাসো? ছাই বাসো! – তসলিমা নাসরিন

বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা – তসলিমা নাসরিন

নেই, কিছু নেই – তসলিমা নাসরিন

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.