আমারও পরাণ যাহা চায়
মায়াবী স্বপ্নের খেলা…
ঘড়ির কাঁটার ঠিকঠাক হিসাবটা জানা না থাকলেও রাত যে তখন বেশ ভালোই গভীর সেটা বিছানায় শুয়েও বুঝতে পারছিল মেয়েটা। না, নিজের মনটাকে বশে নিয়ে কিছুতেই দু-চোখের পাতা এক করতে পারছে না ও। সে… সে আবার এসেছে। বাঁশির ছন্দে মূর্ছনা তুলেছে আবার সেই মায়াবী সুরের। ঠিক হ্যামলিনের সেই বাঁশিওয়ালার মতো। ও কি জানে একটা মন পাগল হরিণের মতো ছুটে চলে ওর এই বাঁশির সুরের টানে। কি অদ্ভুত এই সুর! একদম অচেনা, একদম অজানা। কিন্তু কি অদ্ভুত তীব্র মাদকতা এই সুরের। নিজের বিছানা থেকে নেমে পড়ল মেয়েটা। খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে বেরোল ও। সাদা জোছনার আলোয় যেন ধুয়ে যাচ্ছে মায়াবি রাতটা। ওই তো দেখা যাচ্ছে তাকে, ওই কদম গাছটার নীচে বসে সুরে ডুবে রয়েছে সে। এইতো, সামনের এই বড় মাঠাটা পেরিয়ে একছুটে ও চলে যাবে কদম গাছটার একদম সামনে। তারপর আজ জানতে চাইবে ও কেন সে লুকোচুরি খেলছে এভাবে? তারপরনের কালো ব্লেজার আর মাথার কালো কাউবয় হ্যাট মার্কা টুপি চকচক করছে দূর থেকেও। এবার দৌড়তে শুরু করল মেয়েটা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেল ও একদম তার কাছাকাছি। আলতো করে পিঠে হাত রাখল তার।
ব্যস! ওমনি প্রতিবারের মতোই স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেল মেয়েটার। আবার উদাস হয়ে গেল ষোলো বছরের কিশোরী। কেন এমন হচ্ছে ওর সঙ্গে? কেন বার বার ফিরে ফিরে আসছে এই স্বপ্নটা? আর কেনই বা প্রতি বার ঠিক একই জায়গায় ভেঙ্গে যায় স্বপ্নটা? কেন সে আড়ালে থাকতে চায় এভাবে? কেন তার মুখটা কোনোবারই দেখতে পাচ্ছে না ও? আচ্ছা এই স্বপ্নটা কি ওর গত জন্মের সঙ্গে জড়িত, যেমন সিনেমায় দেখায়? না, কোনো উত্তর নেই আর হয়তো কোনোদিন উত্তর মিলবেও না।
বিছানায় ওপাশ ফিরে শুল এবার মেয়েটা। বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা কষ্ট হচ্ছে। দু-চোখ ভরে উঠেছে জলে। নিজের মনেই বলে উঠল অস্ফুটে, “চাই না আমি আর এ স্বপ্ন, প্লিজ ভগবান প্লিজ। আর আমায় ফিরিয়ে দিও না এই মায়াবী স্বপ্নের যন্ত্রণা”…।
(২)
জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটা সত্যি হয়ে গেলে যে ঠিক কতটা আনন্দ হয় সেটা বোধ হয় একমাত্র সেই বুঝতে পারে যে এটা প্রত্যক্ষ করেছে। সুদীপা আজ ঠিক সেই অনুভূতিটাই অনুভব করছে। নেট পরীক্ষার গুঁতো, কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার বেড়াজাল সবকিছু টপকে অবশেষে আজ ওর জীবনে এসেছে বহু প্রতীক্ষিত সেই দিন। হ্যাঁ, ফাইনালি কলেজের অধ্যাপিকা হতে চলেছে সুদীপা। অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার হাতে এসে গেছে আজ। কি ভীষণ যে আনন্দ হচ্ছে আজ ওর, সত্যি সেটা বোধ হয় ও বলে বোঝাতে পারবে না কাউকে। এতদিনে পেয়েছে ও নিজের সাধনার ফল। হ্যাঁ, সাধনাই তো। নিজের পড়াশুনাকে চিরকাল সাধনাই জ্ঞান করে এসেছে সুদীপা। যে বয়সে সব মেয়েরা বয়ফ্রেন্ড বা বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা, মজার স্রোতে ভেসে যায়, সেই বয়সে সুদীপা নিজেকে ডুবিয়ে রাখত বইপত্র আর পড়াশুনার জগতে। যখন কলেজ জীবনে বাকি বন্ধুরা ক্লাস শেষে বসে বসে আড্ডা দিত, তখন সুদীপা পড়ে থাকত লাইব্রেরিতে। ওর আড়ালে এমনকি সামনেও কলেজের অনেক মেয়েই ওকে ‘লেডি আইনস্টাইন’ বলে টিপ্পনী কাটত। কিন্তু সে সব কোনোদিনই গায়ে মাখত না সুদীপা। বড় কিছু পেতে গেলে এমন ছোটখাটো ব্যাপারকে পাত্তা দিতে নেই সেটা ভালোভাবে মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েছিল ও। কিন্তু ও যে প্রথম থেকেই পড়াশুনা নিয়ে এত মনোযোগী ছিল তা কিন্তু নয়। স্কুল লাইফে, বিশেষ করে নাইন-টেন-এ পড়ার সময় ওর মনও বেশ উড়ুউড়ু হয়েছিল বাকিদের মতোই। আর তার ফল ও পেয়েছিল হাতে হাতে। আই সি এস ই পরীক্ষার রেজাল্ট খুব খারাপ না হলেও মোটেই আশানুরূপ হয়নি। আর এই ধাক্কাটাই পুরো বদলে দিয়েছিল সুদীপাকে। বাবা-মা কেউ ওকে বকেননি। বাবা শুধু বলেছিলেন, “জীবনটা তোমার মা। তাই তুমি রাজা হয়ে বাঁচবে না প্রজা হয়ে বাঁচবে সেটাও তোমাকেই ঠিক করতে হবে। চলতি স্রোতে গা ভাসিয়ে তুমি আজ ক্ষণিকের আনন্দ নিয়ে খুশি হতেই পারো, কিন্তু এই খুশি তোমার কাছে যথেষ্ট নাকি তুমি সারা জীবনের সুখ আহ্লাদ, সম্মান বেছে নিতে চাও সেটা তুমি নিজেই ঠিক করে নাও। তোমায় বকে ধমকে আমি পরিবর্তন করতে পারব না, তোমায় বড়জোর ভয় দেখাতে পারি। কিন্তু তাতে কি লাভ বলো! তুমি তো আর ছোট খুকু নও, তাই তোমার জীবনে তুমি কোন পথ বাছবে সেটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে।” বাবার সেদিনের সেই কথাগুলো যেন ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ওকে। তারপর থেকে আর কোনোদিনই পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি সুদীপাকে। সব সময় টপ করেছে ও। প্রথাগত পড়াশুনা শেষ করার অল্প দিনের মধ্যেই স্কুল সার্ভিস কমিশনের গাঁট পেরিয়ে চাকরি আর তারপর আজ এই দিন! বাবা-মাও খুব খুশি আজ। তাদের সব স্যাক্রিফাইস, নিজেদের তৈরি করা সব অনুশাসন সব শেষ অবধি জিতে গেছে আজ। সবাইকে ফোন করে সুসংবাদটা জানাতে আজ খুব ব্যস্ত ওরা।
কিন্তু সুদীপার খবরটা এখনও জানানো হয়নি তাকে। কোনো ফোন-টোন নয়, মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে সশরীরে ও বাড়িতে গিয়ে খবরটা দেবে ও। বিশেষ করে অঙ্কিতকে তো বিশেষভাবে শুভ সংবাদটা দেওয়াই উচিত। যে ছেলেটা খুব শিগগির ওর জীবনের সিংহভাগ জুড়ে বসতে চলেছে তার তো জায়গাটা সবার থেকে আলাদা হবারই কথা। না, অঙ্কিত ওর কোন প্রেমিক-টেমিক নয়। একদম সনাতনী প্রথা মেনে খবরের কাগজ দেখে অঙ্কিতের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে ওর। সামনের মাসেই ওদের বিয়ে। ওর মনে আছে কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বহু বন্ধু ওকে বলত, “কিরে দীপা, সারাক্ষণ তো শুধু বইপত্তর, নোটস আর লাইব্রেরি নিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছিস দিনগুলো! প্রেম-টেম কাকে বলে সে সবের স্বাদ কি আর এ জীবনে নিবি না? কি বেরসিক রে তুই। কোনো ছেলেকে দেখেই কি ভালোও লাগে না ওর?”
এসব শুনে তখন মুচকি মুচকি হাসত সুদীপা আর মনে মনে বলত, “তোদের মতো দু-দিনের প্রেম আর মাঠে বসে হাওয়া খাওয়া আর দিনের শেষে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে মান অভিমানের প্যানপানানি করার জন্য আমি নই রে। আমার লক্ষ্য অন্য কিছু। অর্জুনের পাখির চোখের মতো আমি যে শুধু সেটাই দেখতে পাই।”
আর সত্যি বলতে কি প্রেম, ভালোবাসা, মোহ, ইনফ্যাচুয়েশন— এগুলো কোনোদিনই সেভাবে কাবু করতে পারেনি সুদীপাকে। ও ক্লাসের টপার, তাইতে আবার সুন্দরী ; তাই এ হেন মেয়ের পাশে যে একদম কোনো সাধারণ ছেলেকে মানায় না, সে ব্যাপারে একটা প্রচ্ছন্ন অহংকার বা স্পষ্ট সচেতনতা সর্বদাই ঘিরে রাখত ওকে। তাই হয়তো কোনোদিন সেভাবে কাউকে চোখেই পড়েনি ওর। অবশ্য এসব ভাবার জন্য সময় ও নিজেকে দিয়েছেই বা কোথায়? বাবা সব সময় বলতেন, “আমার মিতুল মায়ের বিয়ে হবে রাজপুত্রের সঙ্গে। আমি নিজে খুঁজে নিয়ে আসব তাকে।” সুদীপাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করত বাবার এই কথাগুলো। সত্যি তো, সুদীপা তো রাজরানী হবার যোগ্যই মেয়ে। অনেক খুঁজে পেতে তবেই না মিলবে তার দেখা। যাই হোক শেষ অবধি সেই রাজপুত্র অবতীর্ণ হয়েছে ওর জীবনে।
অঙ্কিত খুব বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ ইঞ্জিনিয়ার। মোটা মাইনের চাকরি শুধু তার পরিচয় নয়, সে উত্তর কলকাতার নাম করা বনেদি বাড়ির ছেলে। শিক্ষা আর আভিজাত্যের মেলবন্ধন বোধ হয় একেই বলে। মাস সাতেক আগে পাকা হয়েছে ওদের বিয়েটা। তারপর থেকে বেশ কয়েকবার দেখাও করেছে ওরা দু’জন। অঙ্কিত সত্যি ভীষণ ভালো। দায়িত্ববান, ভদ্র, রুচিশীল। সত্যি সুদীপার ভাগ্যটা খুবই ভালো এটা মানতেই হবে। কারণ ভাগ্যের জোর না থাকলে সেবার কি বাঁচতে পারত সুদীপা?
এই তো গত বছরেরই কথা। একটা বেশ নামজাদা ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট থেকে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছিল তপেন্দুর সঙ্গে। ডাক্তার দম্পতির ডাক্তার ছেলে। বিয়ে ঠিক হবার পর ফোনে টুকটাক কথাও বলত ওরা। তপেন্দুর প্রস্তাবেই একদিন বিকালে সুদীপা দেখা করতে গেছিল ওর সঙ্গে বাড়ির সকলের অনুমতি নিয়ে, যদিও বিয়ের তখনও মাস ছয় বাকি। একটা সিনেমার টিকিট কেটেছিল তপেন্দু। সুদীপাও হাসি মুখে ঢুকে গেছিল হলে। আর সেই অন্ধকার হলেই তপেন্দুর আসল রূপটা টের পেয়েছিল ও। অন্ধকার সিনেমা হলের সুযোগ নিয়ে জোর করে সুদীপাকে… ছিঃ! এখনও ভাবলে গা গুলিয়ে ওঠে ওর। কোনোমতে সেদিন পালিয়ে এসেছিল ও। তৎক্ষনাৎ ভেঙে দিয়েছিল বিয়ে। তপেন্দু যদিও ক্ষমা চেয়েছিল পরে ফোন করে, বলেছিল বিয়ে একেবারে সব ঠিকঠাক বলেই নাকি ও…
নাঃ, সুদীপার পক্ষে আর ওকে ক্ষমা করা সম্ভব হয়নি। ছেলেদের সঙ্গে কোনোদিনই সেভাবে তেমন মেশেনি সুদীপা। তাই তাদের সম্বন্ধে ধারণাও নেই বিশেষ। তাই এই ঘটনার পর মন খুব ভেঙে গেছিল ওর। মনে হয়েছিল সব ছেলেরাই বোধহয় এরকম। তাই বিয়ে না করাই ভালো। কিন্তু বাবা-মা অনেক বুঝিয়ে আবার বিয়েতে মত করান ওর। ওই মানুষ দুটোও বড্ড আঘাত পেয়েছিলেন বিয়েটা ঠিক হয়েও ভেঙে যাওয়ায়। যাই হোক, কথায় বলে যার শেষ ভালো, তার সব ভালো। অঙ্কিতের ওর জীবনে আসার ছিল বলেই বোধহয় বিয়েটা ভেঙেছিল সেদিন। আজ সুদীপা সত্যি পরিপূর্ণ। জীবনে যা কিছু সে চেয়েছিল তার সবটুকু আজ পেয়েছে ও। আঁচল ভরা সুখের আতর সারা গায়ে মেখে এবারে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে ও। উফফ! কে জানত আগে জীবন এত সুন্দর!
(২)
সুটকেসে ফর্দ মিলিয়ে একে একে সব জিনিসগুলো ভরে নিচ্ছিল সায়ন। না, খুব বেশি বড় ল্যাগেজ বানাবার ইচ্ছা ওর নেই ঠিকই কিন্তু এত দিনের কলকাতার পাঠ চুকিয়ে বরাবরের জন্য একটা অন্য শহরে চলে যাওয়া বলে কথা! তাই নেই নেই করেও গাব্দা দুটো সুটকেস হয়েই গেল। যাই হোক ফাইনালি গোছানোর পালা প্রায় শেষ। ঝট করে একবার ঘড়িটা দেখে নিল সায়ন। না, ছটা এখনও বাজেনি। সূর্যের আলোও এখনও বাইরে রয়েছে অল্প অল্প। তাহলে একবার বাপি, সুবলদের আড্ডা থেকে ঢুঁ মেরে আসাই যায়। আর তো হয়তো কোনোদিন হবে না এসব। মুম্বাই শহরটাকে কি আদৌ কোনো দিন ভালোবাসতে পারবে ও? অবশ্য এসব ভেবে আর কী লাভ! বড় কিছু পেতে গেলে অনেক কিছু তো জীবনে ছাড়তেই হয়। তবে সত্যি কি খুব বড় কিছু পাচ্ছে সায়ন? ও নিজেই তো সেটা জানে না। সবাই তো বলছে খুব জোর ভাগ্য সায়নের। হ্যাঁ সত্যি কপালজোর সবটাই। অবশ্য তা বলবে নাই বা কেন? সায়ন চিরকালই পড়াশুনায় বড্ড মাঝারি মানের ছেলে। দেখতে শুনতেও নেহাতই সাদামাটা। খুব শান্ত, চুপচাপ। একদমই চালাক চতুর, কেতাদুরস্ত বা তথাকথিত স্মার্ট নয়। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারও কিছু নয়। সাধারণ এম এস সি পাস। একটা অত্যন্ত মামুলি বেসরকারি অফিসের চাকরি ওর সম্বল। অথচ সেই সায়নই কিনা হুট করে একটা ইন্টারভিউ দিয়ে বেশ নামজাদা একটা কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেল। পোস্টিং কিনা তাও আবার মুম্বাইয়ের মতো শহরে! সায়নের মতো ছেলের এ হেন সাফল্যকে লোকে বরাত জোর ছাড়া আর কিই বা বলতে পারে। কিন্তু সায়ন শুধু একমাত্র জানে আসলে ঠিক কী কারণে ও ছাড়তে চাইছে এ শহর। আর তো মাত্র কটা দিনের মধ্যেই চিরতরে অন্য একজনের হয়ে যাবে সে, আর এই একই শহরে বসে কিছুতেই সেটা সহ্য করতে পারবে না ও। অন্যমন্যস্কভাবে নিজের ল্যাপটপ অন করে ফেসবুকে লগ ইন করল সায়ন। উফফ! নোটিফিকেশনের জ্বালায় অস্থির। রাশি রাশি শুভেচ্ছাবার্তা ওর নতুন কর্মজীবনের জন্য। সেগুলোকে সযত্নে এড়িয়ে তার ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলল ও। সেই ভুবন ভোলানো হাসি মাখা মুখ। যে মুখটা আজ অবধি ভুলতে পারেনি সায়ন। শুধু একটিবার তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য কি পাগলামিটাই না ও করেছে এক সময়। সে ভালো ছবি আঁকতে পারত না, আর সায়নের আঁকার হাত বরাবরই বেশ ভালো। নিজে যেচে তার বায়োলজির প্র্যাকটিকালের সব ছবি এঁকে দিয়েছে নিজের পড়া উপেক্ষা করে। নিজে দায়িত্ব নিয়ে দোকানে লাইন দিয়ে সব প্রয়োজনীয় নোটস জেরক্স করে এনে দিয়েছে অসংখ্যবার। শুধু তাকে একটিবার দেখেতে পাবার আশায় কত সন্ধ্যা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেয়েছে ওর কোচিংয়ের বাইরে। কিন্তু না, কিছুতেই লাভ হয়নি কোনোদিন। টুকরো হাসি বা শুকনো থ্যাঙ্কস ছাড়া জোটেনি আর কিছুই। তবুও সেটুকুও যেন কি ভীষণ দামি ছিল সেদিন। ইলেভেনে প্রথম কো-এড স্কুলে পড়তে এসেছিল সায়ন। অনেক মেয়ে ছিল ক্লাসে। কিন্তু ওর মন প্রথম থেকেই চুরি করে ওকে একদম নিঃস্ব করে দিয়েছিল সুদীপা। কেন যে এমন পাগলের মতো ভালো লাগত মেয়েটাকে কে জানে! অবশ্য লাগবে নাই বা কেন। সে যেমন সুন্দরী, তেমনই ব্যক্তিত্ব তার ওই কম বয়সেও। সবার থেকে একদম আলাদা ছিল মেয়েটা। পড়াশুনাতেও দারুণ ভালো। কোনো ছেলেকেই তেমন পাত্তা দিত না ও। মেয়ে বন্ধুও কম ছিল। আর ওর এই ব্যতিক্রমী স্বভাবটাই বোধ হয় পাগল করে দিয়েছিল সায়নকে। কিন্তু কোনোদিন সাহসই হয়নি ওর সঙ্গে ভালো করে কথা বলার। সায়ন সিদাসাধা, তাই নিজের মনের কথা বিশ্বাস করে বলে ফেলেছিল বন্ধু রাজিবকে। কিন্তু এত পাজি ছিল ছেলেটা, যে রটিয়ে দিয়েছিল সেটা গোটা ক্লাসে। তার কানেও কথাটা উঠেছিল বোধহয়। কিন্তু তবুও কোনো ভাবান্তর হয়নি তার। না তো সে সায়নকে ধমক দিতে এসেছে আর না তো একটুও নরম দৃষ্টিতে দেখেছে ওর দিকে। সে যেন পাথর কঠিন নিশ্চল প্রতিমা। টুয়েলভ-এ যেদিন শেষ ক্লাস ছিল সেদিন রাজিব বলেছিল ওকে, “যা ভাই আজই শেষ সুযোগ। তোর দিল কি ধড়কনকে বলে দে মনের কথা।”
— “চুপ কর। পাগল নাকি তুই?” — কেঁপে উঠেছিল সায়ন। কিন্তু রাজিব মানেনি। সেদিন ছুটির পর হঠাৎ ডেকেছিল তাকে।
— “দীপা একটু শোন…”
ভ্রূ তুলে তাকিয়েছিল সে রাজিবের দিকে। বুকে লক্ষ ধুকপুকানি নিয়ে পুরো ব্যাপারটাই আড়াল থেকে দেখছিল সায়ন।
— “দীপা, সায়ন মানে, আমাদের সায়ন, তুই তো জানিসই ও খুব ভালো ছেলে। ও পছন্দ করে তোকে। নিশ্চয় তুই বুঝতেই পারিস সেটা। তাই তুই…”
— “হ্যাঁ জানি”, রাজিবকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়েছিল সে। তারপর অল্প একটু ব্যঙ্গের হাসি হেসে খুব ঠান্ডা গলায় কেটে কেটে বলেছিল, “আমি জানি সায়ন খুব ভালো ছেলে। কিন্তু তাতে আমার কিছু তো যায় আসে না। আমার লক্ষ্য আকাশ ছোঁয়ার রে রাজিব। তাই মাটিতে ফুটে থাকা ঘাস ফুল যতই সুন্দর হোক তাতে আমার কিছু করার নেই রে। বেস্ট অফ লাক ফর এগজাম।”
কেমন ভেবলে গেছিল রাজিব। আর সেও বেরিয়ে গেছিল শেষবারের মতো সায়নের দৃষ্টিসীমার বাইরে। না, আর কোনোদিন দেখা হয়নি তার সঙ্গে। এমন কি আই সি এস ই পরীক্ষার সময়তেও না। এখন তো আবার সবাই ফেসবুক থেকে খুঁজে নিচ্ছে পুরোনো দিনের বন্ধুদের। সায়নও নিয়েছে অনেককে, কিন্তু তাকে যুক্ত করেনি নিজের বন্ধু তালিকায়। কিন্তু তা না করলেও মন থেকে তো তাকে সরাতে পারেনি আজও। সেইজন্যই তো প্রতিদিন একবার তার প্রোফাইলটা খুলে না দেখলে শান্তি হয় না সায়নের। কিন্তু না এই খেলাটাও শেষ করতে হবে এবার। বাকি কমন ফ্রেন্ডদের থেকে তো খবর পাওয়াই গেছে যে সে পরস্ত্রী হতে চলেছে শিগগির, তাই এখন কি আর শোভা পায় এটা? আজ শেষবারের মতো তার প্রোফাইলটা প্রাণ ভরে দেখে নিল সায়ন। তারপর নিয়মকানুন মেনে চিরতরে তাকে ব্লক করে দিল নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে।
কেমন যেন মোচড় দিচ্ছে সায়নের হৃদপিণ্ডটার কাছে। কিন্তু না, মনকে শক্ত করতেই হবে। মেনে নিতেই হবে ওকে যে এ জীবনে আর কখনও ও দেখতে পাবে না সুদীপার মুখ। এমনকি ছবিতেও না। সায়নের মতো চুনোপুঁটির তো অমন মেয়েকে দূর থেকে ভালোবাসারও যোগ্যতা থাকার কথা নয়, কিন্তু কী করবে সায়ন! ও যে বড্ড অসহায়। নিজের হৃদয়ে জড়িয়ে থাকা সুদীপার ছবিটা যে ও শত চেষ্টা করেও মুছতে পারবে না। অন্তত এ জন্মে তো পারবেই না।
(৩)
— “তা তুমি কী ভাবলে, কলেজের এই চাকরিটা নেবে তুমি?”
— “মানে? এসব কী বলছ তুমি?” অঙ্কিতের এ হেন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে প্রায় আকাশ থেকে পড়ল সুদীপা।
— “অঙ্কিত, তুমি তো জানো, শুধু এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করেছি আমি। আমার স্বপ্ন এটা। রীতিমতো সাধনা করেছি আমি।”
— “কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? তুমি মালদার কোন এক কলেজে পোস্টিং পেয়েছ আর আমার ফ্যামিলি, চাকরি সবই কলকাতায়। আমি নিশ্চয়ই সব ছেড়ে তোমার সঙ্গে মালদায় চলে যেতে পারব না। আবার তুমিও নিশ্চয়ই ওখান থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করতে পারবে না। সুতরাং…”
— “আমি ছুটি পেলেই আসব এখানে। কলেজের চাকরিতে তো অনেক ছুটি থাকে। তাছাড়া তোমার তো প্রতি সপ্তাহেই শনি-রবিবার ছুটি থাকে। তুমিও যাবে। বড় ভ্যাকেশনও তো থাকবে আমার। পূজার ছুটি, গরমের ছুটি।”
— “বাঃ! তুমি তো দেখছি সবটা নিজের মতো করেই ভেবে নিয়েছ। কিন্তু তোমার ভাবনা আর আমার ভাবনা তো মিলছে না। আমি তো রেগুলার সংসার করব বলে বিয়ে করছি। আমি একজন এমন স্ত্রী চাই যে প্রতিদিন আমার সঙ্গে থাকবে, আমার পাশে থাকবে। তাই তোমার এই ব্যবস্থা তো আমি মেনে নিতে পারব না” — বজ্র কঠিন স্বর এবার অঙ্কিতের।
— “প্লিজ অঙ্কিত প্লিজ এভাবে বোলো না। এটা তো মাত্র কয়েকটা বছরের ব্যাপার। এর পর তো আমি আবার পরীক্ষা দিয়ে চলেই আসতে পারব কলকাতার কোনো কলেজে।”
— “সরি সুদীপা। মানতে পারলাম না তোমার এই বোকা বোকা আর স্বার্থপর কথাগুলো” — এবার আরও কঠিন হল অঙ্কিতের স্বর।
— “আমাকে স্বার্থপর বলছ তুমি? স্বার্থপর তো তুমি। বিয়ে ঠিক হবার সময়তেই তো তুমি জানতে আমি কলেজে চাকরি নেব। এটাও তো জানতে যে সেই কলেজের পোস্টিং কলকাতায় নাও হতে পারে। তখন তাহলে এগিয়েছিলে কেন তোমরা?”, এবার স্বর চড়াল সুদীপাও।
এবার অদ্ভুত একটা শব্দ করে হাসল অঙ্কিত। বলল, “তোমাকে এই চাকরি নিতে দেব না আমি। এমন তো নয় যে তুমি চাকরি কর না। এই শহরে বসে স্কুলে তো ভালোই চাকরি করছ তুমি। সেটায় তো বাধা দিচ্ছে না কেউ তোমায়। আর তোমার টাকার তো কোনো দরকার নেই এ বাড়িতে। তাই বেশি মাইনের জন্য তোমায় কলেজের চাকরি নিতে হবে এমন তো নয়। তবুও যদি বেশি টাকা লাগে তোমার আমি দিতে পারব না এমন তো নিশ্চয়ই নয়!”
— “ব্যস! অনেক বলেছ, আর নয়। ভালো করে শুনে রাখো, তুমি যদি আমার কলেজের চাকরি না মেনে নিতে পারো, তাহলে আমিও এ বিয়ে করতে পারব না”, হিসহিসিয়ে বলল সুদীপা।
— “তুমি বুদ্ধিমান মেয়ে আমি ভেবেছিলাম। তাই আমি ভাবতেও পারিনি এমন ধরনের চাকরির প্রস্তাবে রাজি হতে পারো তুমি যাতে আমাদের সংসারটাই মিথ্যে হয়ে যেতে পারে। সত্যি সুদীপা, যদি তুমি এমন অবিবেচকের মতো কথা বলো, তাহলে আমিও চাই না এ বিয়ে।”
দু-চোখ এবার জলে ভরে উঠেছে সুদীপার। ভীষণ অচেনা লাগছে অঙ্কিতকে। কিন্তু এমন মানুষের সঙ্গে তো সারাজিবন কাটানো সম্ভবই নয়। অনেক কষ্টে চোখের জল সামলে কেটে কেটে বলল, “তাহলে ভেঙে যাক এ বিয়ে। একটা ভুল মানুষকে বেছে নিয়ে নিজের গোটা জীবনকে নরক বানাতে পারব না আমি।”
এটাই ছিল গতকাল সুদীপা আর অঙ্কিতের শেষ কথা। নিজের শেষ কঠিন বক্তব্য জানিয়ে দৌড়ে ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল সুদীপা। তারপর কাল সারারাত একটিবারের জন্যও দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি ও। বিয়ে ভেঙ্গে যাবার এই সাংঘাতিক দুঃসংবাদটা কীভাবে ও জানাবে বাবা-মাকে? কি ভীষণ খুশি আছে ওই মানুষ দুটো। আচ্ছা এতক্ষণে কি জেনে গেছে ওরা? বিয়ের তো আর মাত্র ছত্রিশ দিন বাকি ছিল। কার্ড ছাপা, নেমন্তন্ন সব হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বিয়ে ভাঙার এই শকটা কি সামলাতে পারবে বাবা-মা? সুদীপা নিজেই বা এই পরিস্থিতি সামলাবে কী করে? সেইবারে যখন তপেন্দুর সঙ্গে বিয়েটা ভেঙেছিল তখন তো প্রায় কিছুই হয়নি বিয়ের প্রস্তুতি, তাতেই তো যেন দুমড়ে গেছিল বাবা মা, এমনকি সুদীপা নিজেও। তাহলে এবার কী হবে? না আর ভাবতে পারছে না সুদীপা। স্কুল যাবার পথে ভিড় বাসটায় বসে বসে ঘামছে ও। আচ্ছা অঙ্কিতের বাড়ি থেকে কি ফোন করবে বাড়িতে? মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে সুদীপার। গলাটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। উফফ! কি অসহ্য জ্যাম যেন আজ রাস্তায়।
আচ্ছা কেন? কেন সুদীপার সঙ্গেই এমনটা হচ্ছে বারবার? সব ছেলেরাই কি এমন হয়? কিন্তু তাই বা হয় কি করে? ওর বন্ধুরা তো সবাই কি সুন্দর ঘর সংসার করছে বরসোহাগী হয়ে। সবার কপালেই তো জুটেছে ভালোবাসা। তাহলে সুদীপার কপালটাই এমন ব্রাত্য কেন? কেউ কি আছে পৃথিবীতে যে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসতে পারে সুদীপাকে? কেমন হয় স্বার্থহীন ভালোবাসার প্রকাশ? স্কুল লাইফের সেই বোকা বোকা ছেলে সায়নটার মতো? কেন কে জানে, হঠাৎ সুদীপার মনে পড়ল সেই ভাসা ভাসা চোখের বোকা বোকা ছেলেটার কথা। ওর বায়োলজি প্র্যাকটিকালের ছবি এঁকে দিত, তারপর আরও কত সব পাগলামি করত ওর জন্য।
পলকে মনকে শাসন করে শক্ত করল সুদীপা। এসব কি ছেলেমানুষি ভাবনা এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে। না সত্যি ওর মাথায় আসছে না কীভাবে এখন সামলাবে সব। উফফ! ভিড় বাসে আর গরমের মধ্যে শরীরটা বড্ড বেশি খারাপ লাগছে। বাস থেকে নেমে পড়ল সুদীপা।
ওপার থেকে অটো ধরে যাবে ও। সকালের কর্মব্যস্ত শহরটার বুক ধরে সাঁই সাঁই করে ছুটে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ গাড়ি। আনমনে রাস্তা পার হবার জন্য পা বাড়াল সুদীপা। লক্ষই করল না যে যম দূতের মতো ছুটে আসছে একটা বড় প্রাইভেট কার।
— “আ আ আ…” গাড়িটার ধাক্কায় ছিটকে ওদিকের রাস্তায় পড়ল সুদীপা। চোখের সামনে থেকে আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে আলো। সুদীপা বুঝতে পারছে মরে যাচ্ছে ও। অনেক লোক ছুটে আসছে এদিকে। এরা কি ওর বাড়িতে ওর মৃত্যু সংবাদটা পৌঁছে দিতে পারবে? ফিকে হয়ে আসা দৃষ্টিতে হঠাৎই ও দেখতে পেল একজোড়া ভাসা ভাসা চোখ। অনেকদিন আগেরকার একটা চেনা মুখ যেন ছুটে আসছে পাগলের মতো ওরই দিকে একরাশ অচেনা মানুষকে ঠেলে। নিজের রক্তাক্ত হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে দিতে চেষ্টা করল সুদীপা। কিন্তু পারল না। সেই মুহূর্তেই চোখের সামনে ঝুপ করে নেমে এল দুর্ভেদ্য অন্ধকারের একটা শক্ত কালো পাঁচিল।
(৪)
আবার অনেকদিন পর আবার ফিরে এসেছে সে। আবার বাঁশির ছন্দে তুলেছে সে সেই পাগল করা সুরের মূর্ছনা। আবার ছটফট করছে সেই মেয়েটা। কেন? কেন সে আজ ফিরে এল আবার এত বছর পরে? নিজেকে যথারীতি এবারও সামলাতে পারল না মেয়েটা প্রতিবারের মতোই। জোছনা মাখা গভীর রাতে দরজা খুলে রাস্তায় নেমে এল মেয়েটা। ঐ তো সে বাজাচ্ছে একমনে মাঠের পরের কদম গাছটার নীচে বসে। সেই পরিচিত পোশাক। কালো ব্লেজার আর কালো টুপি। দ্রুত পায়ে দৌড়তে শুরু করল মেয়েটা চাঁদের আলো ধোয়া সাদা রাতটাকে পায়ে মাড়িয়ে। না, আজ আর কোনোভাবেই পালাতে দেওয়া যাবে না একে।
তার একদম কাছে এখন মেয়েটা। কিন্তু তার হেলদোল নেই। সে বাজিয়ে যাচ্ছে একমনে। খুব সাবধানে পিছন থেকে আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরল মেয়েটা। পাগলের মতো ঠোঁট ঘষছে তার পিঠে।
“কেন? কেন তুমি এভাবে পালিয়ে বেড়াও আমার থেকে? কেন এত কষ্ট দাও আমায়?”, অস্থির ভাবে বলে চলেছে মেয়েটা। এবার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল সে। মেয়েটার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে চোখে চোখ রাখল নিঃশব্দে। মাথার টুপিটা নামাল স্মিত হেসে। খুব ধীর কণ্ঠে বলল, “আমি তো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি সেই আদি অনন্ত কাল থেকে। কিন্তু তুমি তো ডাকোনি আমায়, খুঁজে পাও নি আমায়।”
প্রথমবারের জন্য তার মুখ দেখেত পেল মেয়েটা। দেখেই ছিটকে গেল ও। বিস্মিত আর বিস্ফারিত চোখে বলে উঠল — “তু…তু…তুমি…?”
সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেল সুদীপার স্বপ্নটা। এত বছর পর আবার কেন ফিরে এল এই স্বপ্নটা? আর কার মুখ দেখল ও? ক্লাস ইলেভেনের ভাসা ভাসা চোখের বোকা টাইপের সেই সায়ন ছিল ওই স্বপ্নের আড়ালে? এও কি সম্ভব? কি হচ্ছে এগুলো আজকাল সুদীপার সঙ্গে।
আজ দশদিন হল সুদীপা নার্সিংহোমে। একটা বিচ্ছিরি পথ দুর্ঘটনা এর জন্য দায়ী। সুদীপার তো মনে হয়েছিল ও বুঝি আর বাঁচবেই না। না, এই দশদিনে অঙ্কিত আসেনি একবারও। বাবা মায়ের মুখের চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছে সুদীপা যে ওদের বাড়ি থেকে খবর পেয়ে গেছে তারা বিয়ে ভাঙার ব্যপারে। কি ভীষণ ভেঙে পড়েছে ওরা একের পর এক ধাক্কাগুলোতে। তবুও যথাসাধ্য হাসিমুখে থাকতে চেষ্টা করছেন ওরা সুদীপার সামনে। মুখ ফুটে বলছেন না কিছুই। কিন্তু সুদীপা যে বুঝতে পারে ওদের মনের কথা। কিন্তু আজকাল নিজের মনের তল কেন যেন খুঁজে পাচ্ছে না ও? কেন কে জানে, আজকাল সেই সায়ন বলে ছেলেটার কথা মনে হচ্ছে বড্ড বেশি। এমনকি অ্যাক্সিডেন্টের সময়তেও যেন আবছাভাবে ও দেখতে পেয়েছিল ওর অবয়ব। সেটা কি সত্যি ছিল না ভ্রম? বুঝতে পারছে না সুদীপা। হিসেব মতো তার তো এখন মুম্বাইতে থাকার কথা। হ্যাঁ সেটা জানে সুদীপা। আসলে সুদীপা আর সায়নের ফেসবুক প্রোফাইলের মাঝে বেশ কিছু মিউচুয়াল ফ্রেন্ড আছে। তাদের অনেকেই শুভেচ্ছা জানিয়েছিল লাস্ট কয়েকদিনে সায়নকে তার মুম্বাইয়ের চাকরির জন্য। আর সেই সূত্রেই কোনোভাবে বোধহয় সায়নের ফেসবুক স্টেটাসটা দেখাচ্ছিল সুদীপার ফেসবুকের নিউজ ফিডেও। যাইহোক, অনেক হয়েছে আর না। সায়নকে নিয়ে আর ভাববে না সুদীপা। কিন্তু কেন? কেন পারছে না এবার ও মনকে শাসনের শৃঙ্খল পরাতে?
আনমনে নিজের ফোন টেনে নিয়ে চালু করল ফেসবুক। খুঁজতে চেষ্টা করল সায়নকে। না, দেখা যাচ্ছে না। কী হল? অস্থির লাগছে সুদীপার। আচ্ছা স্নেহাকে একবার ফোন করে দেখলে কেমন হয়? স্নেহার সঙ্গে তো মোটামুটি যোগাযোগ আছে সুদীপার। আর স্নেহা তো সায়নের পাড়ার মেয়ে, ওকে তো ভাই ফোঁটাও দেয় নাকি। তাহলে স্নেহার কাছে তো পাওয়া যেতেই পারে সায়নের হদিশ। সাত-পাঁচ অনেককিছু ভেবে ফোনটা করেই ফেলল সুদীপা। রিং হচ্ছে ওপারে।
— “কি রে কেমন আছিস তুই? আমি তো আজই ভাবছিলাম যাব তোকে দেখতে। আটকে গেলাম বৃষ্টির জন্য।”
ভীষণ চমকে গেল সুদীপা। স্নেহা কীভাবে জানল ওর অ্যাক্সিডেন্টের কথা। ও তো জানায়নি খুব একটা কাউকে।
— “তুই কীভাবে জানলি এসব?”, বিস্ময় ভরা প্রশ্ন সুদীপার।
— “ছাড় না সে কথা। তুই বল কেমন আছিস এখন? ছাড়া পাচ্ছিস কবে?”
— “পরশু ছুটি। সে যাই হোক, আমার আসলে একজনকে একটু দরকার। মানে সায়নকে। যদিও আমি জানি ও এখন মুম্বাইতে তাও মানে যদি ওর নাম্বারটা…”
— “কী দরকার তোর সায়নকে?” — একটু রুক্ষ শোনাল স্নেহার স্বর।
— “না মানে আসলে”… যুতসই কোনো জবাব খুঁজে পেল না সুদীপা।
— “ও মুম্বাই যায়নি। মানে যেতে পারেনি। নিজের পুরোনো চাকরিটাই করছে।”
— “কেন? কী হয়েছে ওর?” — বিচলিত স্বর এবার সুদীপার।
— “কী করবি তুই জেনে?” — এবার স্বর রুক্ষতর স্নেহার।
— “প্লিজ স্নেহা। প্লিজ এমন করিস না। প্লিজ বল আমাকে” — এবার গলা কাঁপছে সুদীপার।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকল স্নেহা। তারপর স্বর নামিয়ে বলল, “যেদিন তোর অ্যাক্সিডেন্ট হয় সেদিন কাকতালীয়ভাবে সায়নও উপস্থিত ছিল ওই জায়গায় সেইসময়। তুই হয়তো জানিস না, সায়নের তৎপরতাতেই আজ সুস্থ আছিস তুই। ওই তোকে নার্সিংহোমে ঠিক সময় ভর্তি করে, তোর বাড়িতেও খবর দেয়। তোর বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করলেই জানতে পারবি সেটা। পাগলের মতো সব মন্দিরে ছুটে বেড়িয়েছে ও। বারবার দূর থেকেই খবর নিয়ে গেছে তোর। আর বলেছে সুদীপা যেখানে নার্সিং হোমের বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছে সেখানে এই সময় এই শহর ছেড়ে আমি দূরে চলে যেতে পারব না। পারব না ওকে ফেলে নিজের সাফল্য নিয়ে উৎসব করতে। আমি শান্তি পাব না এভাবে…”
আরও অনেক কথা বলছিল স্নেহা, কিন্তু কানে ঢুকছিল না আর কিছু সুদীপার। ওর দু-চোখ জুড়ে তখন শ্রাবণ মেঘের বর্ষা আর হৃদয় জুড়ে একটা অদ্ভুত অচেনা বাঁশির সুর ; যে সুরটা বহুযুগের চেনা ওর, যে সুরটা যেন গতজন্ম থেকে লুকোচুরি খেলে চলেছে ওর সঙ্গে। কিন্তু না, আর না। এবার আর ও হারিয়ে যেতে দেবে না সে সুরকে, কিছুতেই না।
(৫)
নিজের ঘরে বিছানার ওপরে উদাস হয়ে বসেছিল সুদীপা। ঘষা কাচে ঘেরা বন্ধ জানালাটার ওপার থেকে মরে আসা গোধূলির আবছা আলোটাকে একদৃষ্টে দেখছিল। আজ সকালেই সবে নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেয়েছে। শরীর এখনও বেশ দুর্বল। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত। জীবন সত্যি বড় বিচিত্র! কখনও কখনও জীবনের সব সুর-তাল-ছন্দ মিলেমিশে কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। পুরোনো সব চাওয়া পাওয়া আর তার হিসেব হঠাৎ কখনও কেন যে মিথ্যা লাগতে শুরু করে কে জানে!
“মিতুল এই দ্যাখ কে এসেছে…” মায়ের আচমকা পায়ের শব্দ আর গলার আওয়াজে হুঁশ এল যেন সুদীপার। মা ঘরে এসেছে, আর সঙ্গে রয়েছে সে। সেই একই রকম নিষ্পাপ হাসি আর আবেগ মাখা ভাসা ভাসা দুটো চোখ যেন বদলায়নি এত বছর পরেও। বেশ হাসিহাসি মুখেই সুদীপার দিকে এগিয়ে এল সে। হাতে একটা ছোট হলুদ গোলাপের তোড়া।
— “কিরে কেমন আছিস? ফিট তো?” — বেশ সপ্রতিভ সে। কিন্তু সুদীপা আজ কেমন যেন জড়সড়।
— “তোরা গল্প কর। আমি একটু খাবার আনছি তোদের জন্য” — দুজনকে একলা ঘরে বসিয়ে রেখে বেরিয়ে গেলেন আরতি দেবী, মানে সুদীপার মা।
সায়ন সুদীপার বিছানার সামনের চেয়ারটা টেনে বসল। দুজনেই নীরব রইল কয়েকটা মুহূর্ত।
— “কী ব্যাপার বলতো? স্নেহার থেকে আমার ফোন নম্বর নিয়ে আমায় তলব করলি কেন? তোকে নার্সিংহোমে ভর্তি করেছিলাম বলে থ্যাংকস জানাবি?” — খুব ধীর গলায় বলল সায়ন। সুদীপা তখনও চুপ। সব কথা ও ভুলে গেছে যেন।
সায়ন আবার বলল, “বিশ্বাস কর, সেদিন তোর জায়গায় যদি আমার অচেনা কেউও থাকত তাহলেও কিন্তু আমি একইভাবে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতাম একজন মানুষ হিসেবে। আর তাছাড়া…”
— “আমি যদি কিছু চাই আমায় দিবি সায়ন?” — এতক্ষণে মুখ খুলেছে সুদীপা, সায়নের কথা মাঝপথে থামিয়েই।
একরাশ জিজ্ঞাসা ফুটে উঠল সায়নের মায়াবী চোখ দুটোতে।
— “আমায় নিজের নামের সঙ্গে তোর নাম আর পদবীটা জুড়ে দেবার অধিকার দিবি সায়ন? বরাবরের জন্য?”
— “এসব কী বলছিস তুই?” — আঁতকে উঠেছে প্রায় ছেলেটা।
হঠাৎ এবার সায়নের একদম কাছ ঘেঁষে এগিয়ে এল সুদীপা। ওর একটা হাত শক্ত করে নিজের হাতে চেপে ধরে কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে। কাঁপা গলায় বলল, “আমারও যে বড্ড ইচ্ছা করে রে সায়ন সত্যিকারের ভালোবাসার সব রং আর গন্ধগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে। আমায় পাগলের মতো যে মানুষটা ভালোবাসে তার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত হতে আমারও যে খুব ইচ্ছে করে রে। বল তুই ধরবি না আমার হাত সারাজিবনের জন্য?”
ছোট বাচ্চা মেয়ের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সুদীপা। সায়ন যে বিশ্বাসই করতে পারছে না নিজের চোখকে। মেয়েটার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে উষ্ণতার হাল্কা চাপ দিল ও। অমনি নিমেষে সে দুহাতে আঁকড়ে ধরল সায়নকে। সায়নও নিজের সবটুকু জমানো ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়ে মুছিয়ে দিতে চাইল ওর সবটুকু কান্না, সবটুকু যন্ত্রণা।
দরজার অল্প ফাঁক দিয়ে দৃশ্যটা দেখলেন আরতি দেবী। এতদিন পর জীবনে সত্যিকারের ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়েছে মেয়েটা। আজ যে ওর পরিপূর্ণ হওয়ার দিন। দু-চোখ ভিজে এল তারও। ধীর পায়ে পাশের ঘরে গিয়ে মিউজিক সিস্টেমে উনি চালু করলেন মেয়ের প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতটা। সুরের ছোঁয়া লাগুক ওদের জীবনের প্রতি পরতে। গমগম করে উঠল সুদীপার প্রিয় গান, “আমারও পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই… তুমি তাই-ই গো… আমার ও পরাণ যাহা চায়…”।
