এক
বউবাজার স্ট্রিটে একটা পুরনো ধাঁচের তেতলা বাড়ির পুরোটা নিয়ে ‘দৈনিক প্রভাত’-এর অফিস। বাড়িটার আদি রং কী ছিল, বোঝার উপায় নেই। হয়তো গোলাপি বা হলুদ। যা-ই হোক না, বছরের পর বছর রোদে পুড়ে আর জলে ধুয়ে ধুয়ে এখন ধূসর হয়ে গেছে। তার ওপর বহুকালের শ্যাওলা শুকিয়ে কালচে কালচে ছোপ ধরেছে।
চল্লিশ বছর আগে এই কাগজের শুরুর সময় বাইরের মেন গেটের মাথায় যে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল সেটাও ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে। পত্রিকার নামটা পড়তে অবশ্য অসুবিধা হয় না।
একতলার একধারে গ্যারাজ এবং নিউজপ্রিন্টের গোডাউন। আরেক ধারে রিসেপশন আর বিজ্ঞাপন বিভাগ। পেছন দিকে প্রেস। প্রেসের লাগোয়া একটা বড় ঘরে কম্পোজ করার জন্য সারি সারি ডিটিপি মেশিন। দোতলায় অ্যাকাউন্টস ও সার্কুলেশন ডিপার্টমেন্ট, লাইব্রেরি, স্টুডিও, জেনারেল ম্যানেজার এবং পত্রিকার ডাইরেক্টরদের জন্য আলাদা আলাদা চেম্বার। আর আছে একটা কনফারেন্স রুম।
তেতলার সবটা জুড়ে সম্পদকীয় বিভাগ। এখানে একটা প্রকাণ্ড হলঘরের একপাশে বসে রিপোর্টাররা, আরেক পাশে সাব-এডিটর, স্পেশাল করেসপনডেন্ট এবং প্রুফ-রিডাররা হলটার দু’দিক ঘিরে সারি সারি চেম্বার। কোনোটা এডিটরের, কোনোটা নিউজ এডিটরের, কোনোটা চিফ রিপোর্টারের। তা ছাড়া বিভিন্ন বিভাগীয় সম্পাদকের জন্যও রয়েছে কাঠের পার্টিশন দেওয়া কয়েকটা কামরা। হলঘরের মাঝামাঝি জায়গায় আছে দু’টো টেলিপ্রিন্টার। দিবারাত্রি খটখট আওয়াজ তুলে তারা হিল্লি-দিল্লি লন্ডন-প্যারিসের খবর দিয়ে যাচ্ছে দোতলার মতো এখানেও রয়েছে একটা কনফারেন্স রুম। সম্পাদক বা বার্তা সম্পাদক রোজ ওখানে বসে তাঁদের সহকর্মীদের সঙ্গে কাগজের নানা খুঁটিনাটি ব্যাপার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। কাগজের সার্কুলেশন বা প্রচার কিভাবে বাড়ানো যায়, অন্য কাগজগুলো থেকে ‘দৈনিক প্রভাত’ কোথায় পিছিয়ে রয়েছে, কেন পিছিয়ে রয়েছে, কী পদ্ধতিতে নিজেদের ত্রুটি কিংবা দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা যায় তা নিয়ে চুলচেরা আলোচনা সেরে সম্পাদক নানারকম নির্দেশ দেন।
তেতলার ওপর ছাদ। তার এক অংশে ইটের দেওয়াল আর অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দিয়ে ক্যানটিন করা হয়েছে। আরেক অংশে আর্টিস্টদের বসে কাজ করার ব্যবস্থা।
একতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত এই অফিসের যেখানে যত চেয়ার, টেবিল, আলমারি কিংবা অন্যান্য আসবাবপত্র চোখে পড়ে সবই বেঢপ, সেকেলে ধরনের। টেবিলগুলোতে চায়ের চিরস্থায়ী দাগ, চেয়ারগুলোর বেশির ভাগই হাতল ভাঙা, আলমারিতে পুরু ময়লা ছোপ। বোঝা যায়, পুরনো চেয়ার-টেয়ার পাল্টে, বাড়িটা রংটং করে, ইনটেরিয়র ডেকরেটরকে দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে আধুনিক ঝকঝকে একটা অফিস যে করে তোলা হবে, তেমন টাকার জোর ‘দৈনিক প্রভাত’-এর নেই। আসলে চল্লিশ বছর বয়স হলেও এই কাগজ প্রচার বা ব্যবসার দিক থেকে খুব একটা এগিয়ে যেতে পারেনি।
.
এখন দুপুর।
‘দৈনিক প্রভাত’-এর অফিসে লিফট নেই। ঊর্ধ্বশ্বাসে একসঙ্গে দু’তিনটে করে সিঁড়ি টপকে ওপরে উঠতে উঠতে বাঁ হাতের ইলেকট্রনিক ঘড়িটার দিকে তাকাল রণেশ। দু’টো বেজে এক। তার মানে পুরো একত্রিশ মিনিট সে লেট। প্রচণ্ড অস্বস্তি হতে লাগল তার।
রোজ দেড়টায় তেতলার কনফারেন্স রুমে সম্পাদকীয় দপ্তরের মিটিং বসে। সেখানে কাগজের বিভিন্ন বিভাগের সম্পাদক ছাড়াও সিনিয়র সাংবাদিকদের হাজির থাকতে হয়। আজকেও নিয়ম অনুযায়ী ওখানে মিটিং বসবে, তবে সেটা অন্য সব দিনের মতো নয়। আজ স্বয়ং কাগজের সম্পাদক ভবতোষ সান্যাল বেছে বেছে কয়েকজন রিপোর্টারকে ডেকেছেন। বাকি সবাই বাদ। এই মিটিংটা নাকি ভীষণ জরুরি। কেন জরুরি সেটা অবশ্য আগে থেকে জানানো হয়নি।
কাল রাত্তিরে সাড়ে দশটায় রণেশ কাজ চুকিয়ে অফিস থেকে যখন বেরুতে যাচ্ছে, নিউজ এডিটর সুশোভন বসাক বার বার তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘জানি তুমি ভীষণ পাংচুয়াল। তবু বলছি, কাল ঠিক সময়ে মিটিংয়ে চলে আসবে। দিস ইজ ভেরি, ভেরি আর্জেন্ট।’
রণেশ বলেছিল, ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন সুশোভনদা—’
আজ একটা চারে কালীঘাট থেকে মেট্রো ধরেছিল সে। একটা চব্বিশে তার সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছবার কথা। সেখান থেকে মিনিট চারেক হাঁটলেই তাদের অফিস। দেড়টার আগেই কনফারেন্স রুমে চলে যেতে পারত রণেশ। কিন্তু পার্ক স্ট্রিট পেরুবার পর কী একটা যান্ত্রিক গোলমালে পাতাল রেল সুড়ঙ্গের ভেতর অনেকক্ষণ আটকে ছিল। তার দেরি হওয়ার কারণ হল এটাই।
রণেশ ‘দৈনিক প্রভাত’-এর নাম-করা ক্রাইম রিপোর্টার। যেমন দুঃসাহসী তেমনি বেপরোয়া। তার বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন অনেককে চমকে দিয়েছে। কিন্তু কাগজটা যেহেতু ‘দৈনিক প্রভাত’, সেজন্য ব্যাপকভাবে তেমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারেনি।
সাংবাদিক হিসেবে রণেশের গুরুত্ব কতখানি সেটা অন্য বড় কাগজগুলো ভালো করেই জানে। চার পাঁচ লাখের ওপর সার্কুলেশন, এমন দু’টো কাগজ তাকে অফার দিয়ে রেখেছে যেদিন ইচ্ছে সে তাদের ওখানে জয়েন করতে পারে। তার জন্য সবসময় ওদের দরজা খোলা। ‘দৈনিক প্রভাত’ তাকে যা দেয়, ওরা তার তিনগুণ মাইনে দেবে। সেই সঙ্গে সর্বক্ষণের গাড়ি। পার্কস, মেডিকেল অ্যালাওরেন্স, হাউস রেন্ট ইত্যাদি মিলিয়ে অঙ্কটা যা দাঁড়াবে তা মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো। তবু মাঝারি মাপের ‘দৈনিক প্রভাত’কে ছেড়ে যেতে পারেনি সে। কারণটা হল আবেগ এবং কৃতজ্ঞতা। হত্যা, ধর্ষণ, হাইওয়ে রবারি জাতীয় নানারকম দুঃসাহসিক ঘটনার পেছনে অনবরত দৌড়লেও রণেশ আসলে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। তার কৃতজ্ঞতাবোধের তুলনা নেই। অল্পবয়স থেকেই তার লক্ষ্য ছিল একজন সফল সাংবাদিক হওয়া। এর মধ্যে হয়তো চাপা কোনো আদর্শবাদ জড়ানো রয়েছে, আজকাল যাকে বলা হয় পাগলামো। সে ভাবত, স্বাধীনতার পর দুর্নীতি আর ভ্রষ্টাচারের দুর্গন্ধে সারা দেশ ছেয়ে গেছে। এসবের পেছনে যারা আছে তাদের আসল চেহারাগুলো মানুষকে দেখানো দরকার। একজন সৎ, সাহসী সাংবাদিকই সেটা করতে পারে।
ইউনিভার্সিটি থেকে বেরুবার পর খবরের কাগজের অফিসগুলোতে দিনের পর দিন ধরনা দিয়েছে সে, কিন্তু তার জন্য সব জায়গায় দরজা ছিল বন্ধ। এমনকি যে বড় কাগজ দু’টো আজ তার জন্য লাল কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে তারাও সেদিন রূঢ়ভাবে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
রণেশ সাধারণ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে। তার মামা, কাকা, পিসেমশাই বা জামাইবাবুদের কেউ মন্ত্রী, এম.পি কিংবা এম.এল.এ নন। চাকরিটা জুটবে কার সুপারিশে? কোন খুঁটির জোরে?
শেষ পর্যন্ত ‘দৈনিক প্রভাত’ই তার সামনে দরজা খুলে দিয়েছিল। প্রথম দিন কথা বলে রণেশের মধ্যে চাপা আগুন লক্ষ করেছিলেন সুশোভন। তিনিই ভবতোষ সান্যালের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। একমাসের মধ্যে প্রবেশনার হিসেবে জয়েন করে রণেশ। তারপর পাঁচটা বছর কেটে গেছে। ‘দৈনিক প্রভাত’-এর সে একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি। সাংবাদিক হিসেবে সে আজ যেখানে এসে পৌঁছেছে সেটা সুশোভন আর ভবতোষের জন্য। ওঁরা সুযোগ না দিলে তার ইচ্ছাপূরণ কোনোদিনই হত না। সুশোভনদের কাছে তাই তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এই পত্রিকা ছাড়ার কথা সে ভাবে না; ভাবতে পারে না।
রণেশের বয়স উনত্রিশ। হাইট ছ’ফিটের কাছাকাছি। নিয়মিত ব্যায়াম করার কারণে চমৎকার স্বাস্থ্য। গায়ের রং তামাটে। কোঁকড়ানো চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। লম্বাটে মুখ তার, চওড়া কপাল। চোখের দৃষ্টি শান্ত এবং গভীর। সে কারো দিকে তাকালে বুকের ভেতর অনেক দূর পর্যন্ত যেন দেখতে পায়। তার থুতনি আর নাক একটু মোটা ধরনের। সব মিলিয়ে রণেশের চেহারায় অটুট দৃঢ়তা রয়েছে। এই মুহূর্তে তার পরনে মোটা জিনস এবং ঢোলা শার্ট। সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে দ্রুত তেতলায় উঠতে হাঁফ ধরে গিয়েছিল। কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস টানল রণেশ। তারপর প্রায় দৌড়েই কনফারেন্স রুমে গিয়ে ঢুকল।
সেখানে ভবতোষ সান্যাল এবং সুশোভন বসাক একটা বড় টেবিলের ওধারে বসে ছিলেন। ভবতোষের বয়স পঞ্চান্ন ছাপ্পান্ন। গোলগাল ভারী চেহারা। গায়ের রং ধবধবে ফর্সা। এই বয়সেই মাথার সব চুল প্রায় সাদা হয়ে গেছে। চোখে পুরু লেন্সের বাই-ফোকাল চশমা। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। সুশোভনের বয়স পঞ্চাশের নিচে। লম্বা, টান-টান শরীরে এক ফোঁটা বাড়তি মেদ নেই। সামনের দিকে টাক পড়ায় কপালটা চওড়া মাঠ হয়ে গেছে। নাকমুখ বেশ ধারাল। এঁর চোখেও বেশি পাওয়ারের চশমা। মানুষটা মোটামুটি শৌখিন। পরনে দামি ট্রাউজার্স এবং বুশ শার্ট।
টেবিলের এধারে তিনজন সিনিয়র রিপোর্টার বসে আছে। নবারুণ সেন, সন্দীপ রাহা আর মণিময় শীল। এদের বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে।
রণেশ টের পেল, কনফারেন্স রুমের আবহাওয়া কেমন যেন থমথমে। কেউ কোনো কথা বলছে না। চোখের কোণ দিয়ে সে একবার ভবতোষ এবং সুশোভনকে দেখে নিল। ভবতোষ বরাবরই গম্ভীর, স্বল্পভাষী। মুখ দেখে সবসময় তাঁর মনোভাব বোঝার উপায় নেই। কিন্তু আজ মনে হল, ভেতরে ভেতরে চাপা উৎকণ্ঠা চলছে। সেটা বাইরে ফুটেও বেরিয়েছে। সুশোভন অবশ্য সর্বক্ষণ টেনশনে ভোগেন। এই মুহূর্তে তাঁকে ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।
রণেশকে দেখামাত্র সুশোভন হাত নেড়ে অসহিষ্ণুভাবে বললেন, ‘কী ব্যাপার বল তো! কাল এত করে বলে দিলাম, ঠিক দেড়টায় মিটিং শুরু হবে। আধ ঘণ্টা ধরে আমরা সবাই বসে আছি। তোমার পাত্তাই নেই।’ তাঁর কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ফুটে বেরোয়।
টেবিলের এধারে অন্য তিন রিপোর্টারের পাশে বসতে বসতে কাঁচুমাচু মুখে রণেশ বলল, ‘কী করব বলুন? ঠিক সময়েই তো মেট্রো ধরেছিলাম। কিন্তু—’ পাতাল রেলের সমস্যাটার কথা জানিয়ে দিল সে।
সুশোভন ফের কী বলতে যাচ্ছিলেন, তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ভবতোষ বললেন, ‘যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। তা নিয়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না।’ রণেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার জন্যে আমরা ওয়েট করছিলাম। এবার মিটিং শুরু করা যাক।’
অন্য কাগজের সম্পাদক একজন রিপোর্টারের জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করেন না। কী করতে হবে, নিউজ এডিটর চিফ রিপোর্টার মারফত তাঁর নির্দেশ পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ‘দৈনিক প্রভাত’-এর পরিবেশ একেবারে আলাদা। এখানে সম্পাদক থেকে প্রেসের সাধারণ একজন কম্পোজিটর বা প্রুফ রিডার, কারো মধ্যেই অদৃশ্য কোনো দেওয়াল তোলা নেই। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো অনেকটা পুরনো দিনের যৌথ পরিবারের মতো, যার মাথায় রয়েছেন ভবতোষ সান্যাল। বাইরে থেকে রাশভারি মনে হলেও তিনি খুবই আন্তরিক এবং হৃদয়বান। কাগজের উন্নতির জন্য সবার সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেন। নাক-উঁচু, দাম্ভিক সম্পাদকদের মতো-নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন না।
রণেশেরা কেউ কিছু বলল না, উৎসুক চোখে ভবতোষ সান্যালের দিকে তাকিয়ে রইল। ভবতোষ এবার বললেন, ‘তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, দিস ইজ অ্যান এক্সট্রা- অর্ডিনারি মিটিং অ্যান্ড ভেরি ভেরি ইমপর্টান্ট টু।’
এই কনফারেন্স রুমসমেত গোটা তেতলাটা এখন পুরোপুরি নিস্তব্ধ। বাইরের হলঘরে দু’-চারজন জুনিয়র সাব-এডিটর কি প্রুফ রিডার হয়তো ডিউটিতে এসেছে। কিন্তু তাদের গলা শোনা যাচ্ছে না। শুধু টেলিপ্রিন্টারের একঘেয়ে ক্লান্তিহীন খটখটানি ভেসে আসছে।
ভবতোষ বলতে লাগলেন, ‘আমাদের কাগজ চল্লিশ বছরে পড়েছে। প্রথম বছরে সার্কুলেশন ছিল পনেরো হাজার। নতুন কাগজের পক্ষে শুরুটা যথেষ্ট ভালো। তারপর সার্কুলেশন বেড়ে বেড়ে এক লাখের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। বিজ্ঞাপন অবশ্য সেই তুলনায় পাওয়া যাচ্ছিল না। কোনো বছর সামান্য লাভ, কোনো বছর কিছু লোকসান—এইভাবেই চলছিল। কিন্তু দু’বছর ধরে ট্রেন্ডটা খুব খারাপ দেখা যাচ্ছে। সার্কুলেশন প্রায় তিরিশ হাজার ফল করেছে। কাগজ ভালো না চললে যা হয়, বিজ্ঞাপনও অনেক কমে গেছে। বিজ্ঞাপন কমা মানে কোম্পানির আয় কমে যাওয়া। এদিকে কাগজ চালাতে ক্রমাগত খরচ বেড়ে চলেছে। গত চল্লিশ বছরে ছাপার কাগজ, কালি, পেট্রোল থেকে শুরু করে জার্নালিস্ট এবং অন্যান্য কর্মচারীদের মাইনে বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ফলে ‘দৈনিক-প্রভাত’-এর টিকে থাকাই মুশকিল। আমরা প্রচণ্ড ক্রাইসিসের মধ্যে এসে পড়েছি!’
টেবিলে কয়েক গেলাস জল ঢাকা দেওয়া ছিল। একটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে সবটা শেষ করে গেলাসটা নামিয়ে রাখতে রাখতে শ্রোতাদের দিকে তাকালেন ভবতোষ।
রণেশরা কিছুদিন ধরেই টের পাচ্ছিল, তাদের কাগজ সত্যিই একটা সংকটের মধ্যে দিয়ে চলেছে, কিন্তু সেটা যে এত গভীর, বোঝা যায়নি। কারো মুখ থেকে একটা শব্দও বেরুল না। ভবতোষের দিকে তাকিয়ে সবাই নীরবে বসে রইল।
ভবতোষ ফের শুরু করলেন, ‘লাস্ট পাঁচ-ছ’ বছরে তিন চারটে নতুন বাংলা কাগজ বেরিয়েছে। ওরা আমাদের সার্কুলেশন আর বিজ্ঞাপনে ভাগ বসিয়েছে। বুঝতেই পারছ কম্পিটিশনটা কী মারাত্মক ধরনের।’
এবারও রণেশরা কেউ কিছু বলল না।
ভবতোষ থামেননি, ‘পরশু আমাদের কাগজের মালিকরা আমাকে আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তাই আজ তোমাদের এই মিটিংয়ে ডাকিয়ে এনেছি। কাল অন্য সব ডিপার্টমেন্টের এডিটরদের সঙ্গে কথা বলব।’
রণেশরা চমকে উঠেছিল। শুকনো গলায় নবারুণ জিগ্যেস করল, ‘মালিকরা কি কাগজ বন্ধ করে দিতে চাইছেন?’
‘এক্ষুনি নয়।’
‘তবে?’
‘ওঁরা আমাদের এক বছর সময় দিয়েছেন। এর মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আর চালাবেন না।’
অবনীশ মল্লিক আর দেবাশিস মল্লিক, এই দুই ভাই হলেন ‘দৈনিক প্রভাত’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং স্বত্বাধিকারী। তাঁদের নানা ধরনের ব্যবসা আছে। যেমন ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট, স্টিল, ক্রকারি, ওষুধ ইত্যাদি। খবরের কাগজটা তাঁদের কাছে অনেকটা স্টেটাস সিম্বলের মতো। এতে নাম হয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। প্রচুর টাকা আসবে, এমন একটা চতুর ব্যবসাদারী চিন্তা মাথায় রেখে ওঁরা দৈনিক প্রভাত’ বের করেননি। যে টাকা লাগাবেন সেটা ফিরে এসে কিছু লাভ থাকবে, এতেই তাঁরা খুশি। কিন্তু ইদানীং ক’বছর যা লাগাচ্ছেন তার অর্ধেকও ফিরছে না। শুধু লোকসান আর লোকসান। অনবরত ঘরের পয়সা কত আর জলে ঢালা যায়? ভবতোষের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, খবরের কাগজ সম্পর্কে মল্লিকদের মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে।
ভবতোষ বলতে লাগলেন, ‘কিভাবে এখন থেকে কাগজ চালানো হবে, অবনীশবাবু আর দেবাশিসবাবু তার একটা গাইডলাইনও ঠিক করে দিয়েছেন।’
কনফারেন্স রুমের সবাই, বিশেষ করে রণেশ ভীষণ হকচকিয়ে যায়। কেননা মল্লিকরা অন্যান্য অনেক কাগজের মালিকের মতো কখনো সম্পাদকীয় দপ্তরের কাজে নাক গলান না। ভবতোষের প্রতি তাঁদের অটুট শ্রদ্ধা, অসীম বিশ্বাস। কাগজের ব্যাপারে তিনি যা সিদ্ধান্ত নেন, এতদিন সেটাই ছিল শেষ কথা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, মল্লিকরা তাঁর দিকে আঙুল তুলেছেন। ভবতোষের কর্মদক্ষতার ওপর ওঁরা কি ভরসা রাখতে পারছেন না?
চাপা গলায় রণেশ জিগ্যেস করল, ‘কী গাইডলাইন?’
ভবতোষ এবার যা বললেন তা এইরকম। শুরু থেকেই ‘দৈনিক প্রভাত’ খবর, সম্পাদকীয় এবং অন্যান্য ফিচার খুব শোভনভাবে প্রকাশ করে এসেছে। রগরগে, মশলাদার কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি যতটা সম্ভব গুরুত্ব না দিয়ে ছাপা হয়েছে। আধ-ন্যাংটো চিত্রতারকা বা মডেলদের ছবি কোনোদিনই এই কাগজে বেরোয়নি। রুচিশীল, পরিচ্ছন্ন পত্রিকা হিসেবে ‘দৈনিক প্রভাত’ অনেকের সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পেরেছে।
এই কাগজের প্রথম সম্পাদক ছিলেন একজন স্বাধীনতা-সংগ্রামী। তিনি মনে করতেন, খবরের কাগজ হবে পারিবারিক পত্রিকা। সেখানে নোংরা বা অস্বস্তিকর এমন কিছু ছাপা উচিত নয় যা মা বাবা ছেলে মেয়ে একসঙ্গে বসে পড়তে বা দেখতে পারবে না।
বছর পনেরো আগে প্রথম সম্পাদক মারা যান। তারপর দায়িত্ব নেন ভবতোষ। পুরনো ট্র্যাডিশন বরাবর বজায় রেখে গেছেন তিনি। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হবে না।
বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন ভবতোষ, মালিকরা এখন চাইছেন সেনসেশন। অন্য সব খবরের মধ্যে মার্ডার, রেপ, বড় বড় লোকেদের স্ক্যান্ডাল—এ জাতীয় ঘটনা বেশি বেশি করে প্রমিনেন্টলি ছাপতে হবে। খবরের নামে শুধু রহস্যকাহিনী আর পর্নোগ্রাফি। অশ্লীল স্টোরি দিয়ে কাগজ ভরাতে হবে। কারণ পাবলিক নাকি এসব পছন্দ করে।’ তাঁর কণ্ঠস্বর ক্রমশ উঁচুতে উঠতে থাকে।
ভবতোষ এমনিতে শান্ত, স্থির, গম্ভীর মানুষ। খুব ধীরে ধীরে কথা বলেন। তাঁকে কোনো দিন এভাবে চিৎকার করতে দেখেনি রণেশ। কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়ে গেল সে।
ভবতোষ আরো বললেন, ‘মালিকরা আমাকে বোঝালেন, মদ, গাঁজা বা ব্রাউন সুগার খেলে যেরকম এফেক্ট হয়, সকালে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে পাঠকের নার্ভে সেইরকম ধাক্কা যেন লাগে। সেক্স, ক্রাইম আর স্ক্যান্ডাল যতটা পার সাপ্লাই দিয়ে যাও।’
রণেশ ভীরু গলায় জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি ওঁদের কথায় রাজি হয়েছেন?’
ভবতোষ সোজা রণেশের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, হয়েছি। আমাদের এতদিনের এডিটোরিয়াল পলিশি না বদলে উপায় নেই।
ভবতোষকে সবাই পিউরিটান অর্থাৎ নীতিপরায়ণ সম্পাদক হিসেবে জানে। পাঠকের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে এমন কিছুই তিনি ‘দৈনিক প্রভাত’-এ ছাপেন না। নৈতিকতার প্রশ্নে কখনো কারো সঙ্গে আপস করেননি। সেই মানুষই যে এভাবে মালিকদের কাছে নতজানু হবেন, ভাবতে পারেনি রণেশ। সে শুধু তাকিয়েই রইল। কিছু বলল না।
ভবতোষ তীক্ষ্ণ গলায় এবার বললেন, ‘তোমরা হয়তো ভাবছ, কেন আমি রাজি হলাম? উত্তরটা শুনে নাও। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম না করলে কাগজ বন্ধ হয়ে যাবে। জার্নালিস্ট আর অন্যান্য ওয়ার্কার মিলিয়ে স্টাফ একশো জন। অফিসে ক্লোজার ডিক্লেয়ার করলে এতগুলো লোকের কী হবে? এরা আর কোথাও চাকরি-বাকরি জোগাড় করতে পারবে?’ একটু থেমে মুখ নিচু করে বললেন, ‘সব দিক বিবেচনা করে আমার মাথা নোয়াতে হয়েছে।’ তাঁর কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভারী হয়ে এল।
ভবতোষ যে মালিকদের প্রস্তাব বা হুকুমে খুবই অসম্মানিত বোধ করেছেন সেটা বোঝা যাচ্ছিল। রণেশ কী বলবে, ভেবে পেল না।
সন্দীপ অন্য দু’তিনটে চালু বাংলা কাগজের নাম করে বলল, ‘ওরা পলিটিক্যাল আর সেক্স স্ক্যান্ডাল ছেপে ছেপে বাজার গরম করে ফেলছে। আমরাও তাহলে সেই দলে নাম লেখালাম ভবেতোষদা!’
আস্তে আস্তে বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়লেন ভবতোষ।
অনেকক্ষণ নীরবতা।
এর মধ্যে খানিকটা সামলে নিয়েছেন ভবতোষ। মুখ তুলে রণেশদের দিকে তাকিয়ে মোটামুটি স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘আমরা কাগজে যে চেঞ্জটা আনতে যাচ্ছি তার শুরুটা করবে তোমরা। সেই জন্যে প্রথমেই তোমাদের ডেকেছি।’
টেবিলের এধারের চারজন প্রতিবেদক উদ্গ্রীব হয়ে রইল।
ভবতোষ সন্দীপকে বললেন, ‘তোমাকে যে দায়িত্বটা দিচ্ছি সেটা ভীষণ থ্রিলিং। আশা করি, ইউ উড লাইক ইট ইমেন্সলি। ফিল্মের একজন হিরোইন এবং গ্ল্যামার কুইন, যিনি একের পর এক সুপার ডুপার হিট বাংলা আর হিন্দি ছবিতে নায়িকার রোলে অভিনয় করে মুম্বই আর কলকাতা কাঁপিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে তোমাকে আঠার মতো লেগে থাকতে হবে।’
সন্দীপের শিরদাঁড়া টান টান হয়ে গিয়েছিল। সে বলল, ‘আপনি কি পুষ্পাঞ্জলির কথা বলছেন?
‘এগজ্যাক্টলি।’
মুম্বইয়ের একটা কাগজে পড়লাম, এই সুপার-হিরোইনটি খুব উড়ছেন। একজন কোটি কোটিপতি প্রোডিউসারের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছেন সে খুব শিগগিরই স্বামীকে ডিভোর্স করবেন। শোনা যাচ্ছে, লুকিয়ে লুকিয়ে প্রোডিউসারটির সঙ্গে ফাইভ-স্টার হোটেলে মাঝে মাঝেই রাত কাটান। এদের নিয়ে দারুণ একটা স্টোরি চাই, মিনিমাম সাত-আটদিন ধরে যেন চলে। লেখাটার মধ্যে ঝাঁঝাল সেক্সের গন্ধ যেন থাকে। ইট মাস্ট বি থ্রিলিং অ্যান্ড টিটিলেটিং। যৌন সুড়সুড়ি বলতে যা বোঝায় সেটা চাইছি।’
সন্দীপ বলল, ‘কিন্তু ভবতোষদা—’
ভবতোষ জিগ্যেস করলেন, ‘কী?’
‘পুষ্পাঞ্জলিকে চেজ করতে হলে অনেক টাকা দরকার। মুম্বই, কলকাতা, ফাইভ-স্টার হোটেল ছাড়া আরো কত জায়গায় হানা দিতে হবে তার ঠিক নেই। তাই—’
সন্দীপকে থামিয়ে দিয়ে ভবতোষ বললেন, ‘কাগজকে বাঁচানোর জন্যে এটাই হল আমাদের শেষ চেষ্টা। টাকার জন্যে চিন্তা নেই। কোম্পানি দেবে। আজ থেকেই কাজ করে দাও।’
‘আচ্ছা।’
‘কথা হয়ে গেল। এবার তুমি যেতে পার।’
সন্দীপ চলে গেলে নবারুণ আর মণিময়কে দু’টো দায়িত্ব দেওয়া হল। দু’তিনদিন আগে মধ্য কলকাতার এক বনেদি পরিবারের অবিবাহিতা যুবতি এক পরিচারিকা রহস্যময়ভাবে খুন হয়েছে। সে গর্ভবতী ছিল। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে পরিবারেরই ছেলে শিক্ষিত, সুদর্শন এক যুবককে। এই নিয়ে তদন্তমূলক একটা রিপোর্ট তৈরি করতে হবে নবারুণকে। এক বিখ্যাত মহিলা নৃত্যশিল্পীর অবৈধ সন্তান নিয়ে ইদানীং বাজার খুব সরগরম। এ সন্বন্ধে যাবতীয় তথ্য জোগাড় করে চমকপ্রদ প্রতিবেদন কয়েক কিস্তিতে লিখতে হবে মণিময়কে।
সন্দীপ, মণিময় এবং নবারুণ একে একে তিনজন দায়িত্ব বুঝে নিয়ে চলে যাবার পর ভবতোষ রণেশের দিকে তাকালেন।
রগেশ হাল্কা গলায় বলল, ‘হিরোইন, মার্ডার, ড্যান্সারের ইললেজিটিমেট চাইল্ড, এসব তো হয়ে গেল। আমার ভাগে কী পড়বে ভবতোষদা?’
ভবতোষ বললেন, ‘একটা লোকের পেছনে তুমি সারাক্ষণ লেগে থাকবে। আমি ওয়ান হান্ড্রেড পারসেন্ট নিশ্চিত নই, তবু আমার ধারণা দশটা পুষ্পাঞ্জলি আর বিশটা ড্যান্সারের পেছনে ঘুরলে যা পাওয়া যাবে, এই লোকটার মধ্যে তার একশো গুণ বেশি সেনসেশনাল মালমশলা আছে।
রণেশ অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘লোকটা কে?’
‘সুপ্রকাশ দত্ত’র নাম শুনেছ?’
‘যিনি বিখ্যাত সমাজসেবী?’
ইয়েস।’ আস্তে মাথা নাড়লেন ভবতোষ, ‘ফেমাস সোশাল ওয়ার্কার অ্যান্ডটপ বিজনেসম্যান!’
রণেশ দ্বিধান্বিতভাবে বলল, ‘কিন্তু তাঁর যথেষ্ট সুনাম। মানুষ তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করে।’ ভবতোষ বললেন, ‘একটা চান্স নাও না। কার ভেতর থেকে কী বেরিয়ে পড়বে, কেউ কি আগে থেকে বলতে পারে? যত তাড়াতাড়ি পার সুপ্রকাশ দত্ত সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু কর।’
রণেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘কাল থেকেই শুরু করব। কিন্তু—’
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন ভবতোষ, ‘সুপ্রকাশ দত্ত সম্পর্কে তোমার মধ্যে কোথাও একটা হেজিটেশন আছে, তাই না?’
রণেশ বলল, ‘আমি পাঁচ বছর কাগজে কাজ করছি। এখন পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে কোনোরকম স্ক্যান্ডাল শুনিনি। থাকলে এত দিনে নিশ্চয়ই কানে আসত। আনব্লেমিশড, মানে নিষ্কলঙ্ক চরিত্র বলেই জানি।
ভবতোষ বললেন, ‘আমারও সেইরকমই জানা ছিল। অত্যন্ত ভদ্র, অমায়িক, হৃদয়বান মানুষ। প্রচুর দানধ্যান আছে। কাগজে ছবি ছাড়া সামনাসামনি দেখার সুযোগ ঘটেনি। তবে ক’দিন আগে টিভির একটা প্রোগ্রামে ওঁকে দেখলাম। সুপ্রকাশের গলার স্বর আর হাঁটার ভঙ্গিটা চেনা চেনা মনে হল। বহুকাল আগে, আমার কম বয়সে একজন কারোকে জানতাম, তার সঙ্গে এর হাঁটার আর কথা বলার খুব মিল। সে ছিল ভীষণ নোটোরিয়াস টাইপের। অবশ্য আমার স্মৃতি গোলমাল করতে পারে। সেই বাজে লোকটার সঙ্গে সুপ্রকাশ দত্তকে হয়তো গুলিয়ে ফেলছি!’
রণেশ আগ্রহ বোধ করছিল। বলল, ‘যে খারাপ লোকটার কথা বললেন তার কী নাম?’
‘মনে নেই।’
‘তাকে কোথায় দেখেছিলেন?’
অনেকক্ষণ ভেবে আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন ভবতোষ। তারপর একটু হতাশভাবেই যেন বললেন, ‘বলতে পারব না। আমার বাবার ছিল বদলির চাকরি। দু’এক বছর পর পরই এক শহর থেকে আরেক শহরে আমাদের ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ঠিক কোথায় লোকটাকে দেখেছিলাম—নাঃ, স্মৃতির এই জায়গাটা একেবারে ব্ল্যাঙ্ক।’
রণেশ বলল, দু’জনের চেহারায় কি কোনো মিল আছে?’
‘বোধহয় না।’
‘একজনের গলার স্বর শুনে আরেকজনের কথা মনে পড়তেই পারে। তার মানে এই নয় যে দুজন একই লোক। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ। এমনও দেখা গেছে হুবহু একই চেহারার দু’টি লোকের একজন জন্মেছে বাংলাদেশে, আরেকজন গুজরাটে। অথচ তারা কেউ কারোকে চেনে না পর্যন্ত।’
‘ইউ আর রাইট। তবু আমার খটকাটা যাচ্ছে না।’
একটু চুপচাপ।
তারপর ভবতোষ বললেন, ‘সিমিলারিটির কথা বাদ দিলেও সাংবাদিক হিসেবে সুপ্রকাশ দত্ত সম্পর্কে একটা ভাইটাল পয়েন্ট তোমাকে মাথায় রাখতে হবে।’
উৎসুক সুরে রণেশ জানতে চাইল, ‘কী সেটা?’
টিভিতে দেখে মনে হয়েছে সুপ্রকাশের বয়স ছেষট্টি-সাতষট্টি। সমাজসেবাটা উনি কতদিন ধরে শুরু করেছেন বলে তোমার মনে হয়?’
‘খুব বেশিদিন না। ম্যাক্সিমাম তিন চার বছর, এরকম কানে আসছে।’
‘লক্ষ করেছ কি, যখনই উনি পভার্টি লাইনের নিচের গরিবদের জন্যে কিছু করেন, মিডিয়ার লোকদের নেমন্তন্ন করে নিয়ে যান। টিভিতে ইমপর্টান্স দিয়ে তাঁর সোশ্যাল সারভিসের ব্যাপারগুলো দেখানো হয়। খবরের কাগজে দাতাকর্ণ হিসেবে তাঁর ছবিসুদ্ধু বড় বড় রিপোর্ট বেরোয়। ‘
রণেশ আগে খেয়াল করেনি। তার মনে হল, ভবতোষ এটা ঠিকই বলছেন। সে কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে ভবতোষ বললেন, ‘হঠাৎ এই বয়েসে ভদ্রলোক হাত খুলে চ্যারিটি শুরু করে দিলেন কেন, সেটা একটু অস্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হয় না?’
রণেশ বলল, ‘হয়তো ওঁর গরিব মানুষের প্রতি দয়া-মায়া-করুণার ভাবটা বেশি বয়েসে দেখা দিয়েছে। কখন কার মনে কী পরিবর্তন ঘটবে, তা কি বলা যায়?’
ভবতোষ বললেন, ‘তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু ওই প্রচারের ব্যাপারটা?’
‘মানে?’
‘দানধ্যানের আয়োজন করে মিডিয়ার লোকেদের ডেকে আনা?’
‘আপনি বলতে চাইছেন সুপ্রকাশ দত্ত’র এই সব চারিটির পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে, তাই তো?’
‘এগ্জাক্টলি।’ মাথাটা একদিকে সামান্য হেলিয়ে দিলেন ভবতোষ।
রণেশ বলল, ‘ভবতোষদা, আপনি যদি রাগ না করেন, একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে।’
ভবতোষের চোখেমুখে কৌতুকের সূক্ষ্ম কয়েকটি রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। বললেন, ‘তুমি কী জানতে চাও, আমি তা জানি।’
‘জানেন!’
হ্যাঁ। ওই লোকটা, মানে সুপ্রকাশ দত্ত তো রাতারাতি বিখ্যাত সমাজসেবী হয়ে বসেননি। তা হলে এতদিন আমি চুপ করে বসে ছিলাম কেন? অনেক আগেই তাঁর পেছনে একজন তুখোড় রিপোর্টারকে লাগিয়ে না দেওয়ার কারণ কী—এটাই খুব সম্ভব তুমি জানতে চাইবে তাই না?’
অবাক বিস্ময়ে খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে রইল রণেশ। তারপর বলল, ‘ঠিক তাই। আপনি যে একজন দুর্দান্ত থট-রিডার আগে কখনো টের পাই নি।’
তার কথার উত্তর না দিয়ে ভবতোষ বললেন, ‘আসলে আগে কাদা ছোড়াছুড়ির ব্যাপারটা অ্যাভয়েড করতাম। উই হ্যাড আ ডিফারেন্ট পলিশি। এখন অন্য সবার মতো আবর্জনা ঘাঁটতে নেমে পড়েছি। যেখানে স্ক্যান্ডালের গন্ধ পাব সেখানেই হাত ঢুকিয়ে দেব। সুতরাং—’ রণেশ হেসে হেসে বলল, ‘সুতরাং হঠাৎ দানবীর হয়ে ওঠা সমাজসেবী-কাম- বিজনেসম্যান সুপ্রকাশ দত্তকে বেছে নেওয়া হয়েছে।’
‘ইউ আর অ্যাবসোলুটলি রাইট।’
একটুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ঘড়ি দেখে ভবতোষ বললেন, ‘নাউ গো অ্যাহেড। আমাদের নেক্সট মিটিংয়ের সময় হয়ে গেছে।
রণেশদের পর অন্য ডিপার্টমেন্টের লোকেদের নিয়ে বসবেন ভবতোষ। সেই অনুযায়ী কর্মসূচি ঠিক করা আছে। অগত্যা রণেশকে উঠে পড়তে হল। সে যখন দরজার কাছাকাছি চলে গেছে সেই সময় পেছন থেকে ভবতোষ ডাকলেন, ‘শোন—’
রণেশ ঘুরে দাঁড়াল।
ভবতোষ বললেন, ‘যতৄদর মনে পড়ছে, অনুপম সুপ্রকাশ দত্ত’র দু একটা সমাজসেবার ফাংশন কভার করেছিল। স্বপন না চিন্ময়, কে যেন তাঁর ছবিও তুলেছিল। তুমি ওদের সঙ্গে কথা বলে নিলে হয়তো কিছু ইনফরমেশন পেতেও পার।’
‘ঠিক আছে।’
কনফারেন্স রুম থেকে বাইরের হলঘরে চলে এল রণেশ।
