অমঙ্গলবোধ ও আধুনিক কবিতা
কাব্যের ইতিহাসে প্রগতির লক্ষণ স্পষ্ট দেখা যায় কিনা এ নিয়ে তর্ক উঠতে পারে। যারা বলেন ঋগ্বেদ-সংহিতা, কঠোপনিষদ্, কিংবা সং অব্সলোমনের তুল্য কবিতা পরবর্তীকালে আর রচিত হয় নি, তাঁদের কাব্যরসাস্বাদনে ভক্তিরসের আমেজ লেগেছে এমন সন্দেহের অবকাশ যদি-বা থাকে, বিশুদ্ধ কাব্যরসবিচারের উপর নির্ভর ক’রেই বহু দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন সমালোচক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ব্যাস, বাল্মীকি, হোমর, সফোক্লিস প্রভৃতি আড়াই-তিন হাজার বছর পূর্বে কবিকর্মকে সার্থকতার যে-স্তরে তুলে দিয়ে গেছেন, তার চেয়ে উচ্চতর শিখর-আরোহণ পরবর্তী কোনো কবির পক্ষে সম্ভব হয় নি আজও। কিন্তু কাব্যের প্রগতি তর্কাধীন হলেও তার গতি অনস্বীকার্য। নদীর মতো কবিতাও চলে এবং সিধে চলে না, কখনো হঠাৎ কখনো ধীরে-ধীরে বাঁক নেয়, কখনো-বা এমন মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় আপন আধারে, আধেয়তে, বা উভয়ত, যাকে ইতিহাসে যুগান্তব ব’লেই অভিহিত করতে হয়।
বাংলা কাব্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবির্ভাব তেমনি এক যুগান্তর। খুব বেশি দিনের কথা নয় সে, মানসীর কবিতাগুলি (যাতে সর্বপ্রথম নতুন যুগপ্রতিভার স্পষ্ট স্বাক্ষর পাওয়া যায়) রচিত হয়েছিল ১৮৮৭-১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে, আজ থেকে মাত্র আশি বৎসর পূর্বে। ইতিহাস-দেবতা কিন্তু এর মধ্যেই অধীর হয়ে উঠলেন। মানসী প্রকাশের পর অর্ধ শতাব্দী গত না হতেই রবীন্দ্রকাব্য-বিচারে খুব বড় রকমের পটপরিবর্তন দেখা গেল; কাব্যের মানদণ্ডই গেল পালটে। যদিও রোম্যান্টিসিজমের সব লক্ষণ এবং সন-তারিখ মিলিয়ে দেখতে গেলে খটকা লাগে একটু, তবু রবীন্দ্রনাথকে রোম্যান্টিক কবি বলতেই হয়, রোম্যান্টিকতার পরাকাষ্ঠা বললেও ভুল হয় না। (অথচ ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম মহাযুদ্ধের পর রোম্যান্টিক মনন ও সংবেদনা, বিচার ও রচনা-শৈলী খুব দ্রুতগতিতে অশ্রদ্ধেয় হয়ে পড়ে। ফলে যে-য়ে ১৯১২ সালে গীতাঞ্জলির ভূমিকায় লিখেছিলেন ‘these lyrics display in their thought a world I have dreamed of all my life,’ সেই য়ে জীবনের শেষ দশ-পনেরো বছর কাটালেন নিজের কবিকর্মকে রবীন্দ্রনাথের কবিমানস থেকে (অর্থাৎ যে-রবীন্দ্রমানসের সঙ্গে তিনি পরিচিত ছিলেন) যতটা পারেন দূরে, যতখানি সম্ভব বিপরীতে সংস্থাপিত করতে। এই শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মধ্যভাগে যে-মেজাজ ও রুচি ইংরেজি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হ’ল (ফ্রান্সে আরো আগে হয়েছিল) তার কাছে রবীন্দ্রনাথ অকস্মাৎ অত্যন্ত ছোটো হয়ে গেলেন, অন্যান্য রোম্যান্টিক কবিরা যতটা হয়েছিলেন তার চেয়েও যেন কিছুটা বেশি।
এই নব মূল্যায়নের ধাক্কা বাংলা দেশে এসে পৌঁছেছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। কল্লোল এবং পরিচয় গোষ্ঠীর কবিরাও এক হিসাবে রবীন্দ্র-বিদ্রোহী ছিলেন, কিন্তু সে-বিদ্রোহ অন্য জাতের। তাতে রবীন্দ্রনাথের গগনচুম্বী প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা-নিবেদনে কুণ্ঠা ছিল না। বরঞ্চ তার মর্মস্থলে এই কথাটাই নিহিত ছিল যে বাংলা কাব্যে এক নতুন মেজাজ ও আঙ্গিকের প্রবর্তক হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ বাংলা কাব্যকে তাঁর একক সাধনায় এমন পরোৎকর্ষে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেছেন যার নাগাল পাওয়া অনুজ কবিদের পক্ষে অভাবনীয়। অনুজ কবিরা রাজপথ বেয়ে কিছুদূর এগুতে-না-এগুতেই বুঝতে পারলেন ঐ পথে তাঁরা আর যা-ই পান, একান্ত নিজের গলার সুরটি খুঁজে পাবেন না।
কল্লোল ও পরিচয় যুগের কবিরা শিক্ষা পেয়েছিলেন ঐ কবি-গুরুর পাঠশালাতেই, তাঁদের চোখ, কান, কণ্ঠ ও মন তৈরি হয়েছিল তাঁরই সুরের ঝরনাতলায়। স্নাতকোত্তর কালে তাঁরা অবশ্য অনুভব করলেন রবিতন্ত্র থেকে মুক্তিলাভের প্রবল তাগিদ, একাধারে স্ব-তন্ত্রের প্রেরণা এবং (এ-কথাটা বিশেষরূপে পরিচয়-গোষ্ঠীর কবিদের সম্বন্ধে প্রযোজ্য) ‘আধুনিক’ অর্থাৎ প্রথম মহাযুদ্ধ-পরবর্তী পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যের আকর্ষণ। কিন্তু বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যাদের কবিজন্ম ঠিক রবীন্দ্র-বিদ্রোহী তাঁদের বলা যায় না, কারণ তাঁরা আদৌ ঐ কাব্যসাম্রাজ্যের রাজানুগত নাগরিক ছিলেন না। সাহিত্যের অন্য জগতে তাঁরা ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, অন্য ভাবধারায় পুষ্ট; যে-কাব্যানুশীলনে তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে তাঁদের রুচি ও রচনাশৈলী তা রবীন্দ্রকাব্যের অনুশীলন নয়। বোদলেয়র, র্যাবো, মালার্মে, ভালেরি, গটফ্রিড বেন, আঁদ্রে ব্রেত, স্যামুয়েল বেকেট, জাঁ জেনে, অ্যালেন গিন্স্বার্গ কাব্যের এই জগৎ রবীন্দ্রনাথের জগৎ থেকে বহুদূরে অবস্থিত। অবশ্য এঁরা পুষ্ট হয়েছেন কেবল বিদেশী সাহিত্যের কোলে এমন কথা আমি বলতে চাই না। বাংলা কাব্যের ঐতিহ্যও এঁদের লেখাকে স্পষ্টতই প্রভাবিত করেছে। তবে সে-ঐতিহ্য রবীন্দ্র-কাব্যবাহিত নয়; সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ এবং বোদলেয়র-অনুবাদক কিংবা ‘যে-আঁধার আলোর অধিক’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা বুদ্ধদেব বসুর উত্তরাধিকারী এঁরা। উত্তমর্ণদের মধ্যে যে-লক্ষণগুলি পরিমাণ ও সংযম রক্ষা ক’রে প্রকাশ পেয়েছিল সেই লক্ষণগুলিকে এই নবীন কবিরা উগ্র এবং বল্গাহীন ক’রে তুলেছেন তাঁদের প্যে ও গদ্যে। অমিয় চক্রবর্তী কিংবা বিষ্ণু দে-র প্রভাবও যথেষ্ট পড়েছে পঞ্চাশের কবিদের উপর, কিন্তু ধারা ঐ প্রভাব গ্রহণ করেছেন তাঁরা আমার এ-আলোচনার অন্তর্ভুক্ত নন। তাঁদের সাহিত্যচেতনায় অমঙ্গলবোধ এবং এই অমঙ্গলময় জগতের প্রতি ঘৃণার ভাব তেমন সর্বব্যাপী নয়।
এতে আপত্তি করবার কিছু নেই; সর্বত্র যেমন সাহিত্যেও তেমনি ভাব ও ভঙ্গি যুগে-যুগে বদলায়, সেটাই স্বাভাবিক, সেটাই প্রাণের লক্ষণ। কিন্তু সব পরিবর্তনেরই একটা সীমা আছে; ঐ সীমাটুকু ছাড়িয়ে গেলে মূল বস্তু আর সে-বস্তুই থাকে না। কাব্যসৃষ্টি ও কাব্যবিচারের ইতিহাস পরিবর্তনের যতই সাক্ষ্য দিক, সর্বদেশকালের কবিমানসের পরিচয়ে এমন কয়েকটি মূলসূত্র কি আজও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে নি যার উপলব্ধি আমাদের সাহিত্যচর্চাকে বিবেকজ্ঞানসম্পন্ন করতে পারে, অর্থাৎ কবির সঙ্গে অকবির, রসস্রষ্টার সঙ্গে কারুকর্মীর পার্থক্যনির্ণয়ের সহজ শক্তিটি জাগিয়ে দিতে পারে? কারণ আমার সন্দেহ ক্ৰমে বিশ্বাসে পরিণত হচ্ছে যে রোম্যান্টিকতার মোহ থেকে মুক্তি-লাভের ঐকান্তিক সাধনায় আধুনিক কবিরা এমন-কিছু থেকে নিজের মনকে বিমুক্ত করেছেন যাতে কবির চিরন্তন এবং অব্যর্থ পরিচয়। সব আধুনিক কবিদের সম্বন্ধে এ-কথা খাটে না, সম্মানিত ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছেন— বিদেশে এবং এদেশেও। আমি বলছি আধুনিকতার সাধারণ লক্ষণের কথা।
সেই সাধারণ লক্ষণাবলীর মধ্যে একটি বড় লক্ষণ হ’ল কবিচিত্তে বিস্ময়বোধের অসাড়তা। গ্রীকরা বলতেন বিস্ময়ে দর্শনের সূত্রপাত; কবিতারও শুরু সেইখানে। তবে বিস্ময় মানে উচ্ছ্বাস নয়, এবং শুরু যেখানে সেইখানে কবিতার পরিণতি দেখা যাবে এমন কোনো কথা নেই। পরিণত কাব্যের লক্ষ্য হয়তো শেপীয়র-কথিত সেই নৈর্ব্যক্তিক প্রশাস্তি যা জীবনমরণের সারাৎসার, অথবা এমন এক ট্র্যাজিক চেতনা যাতে বাহাত্তুরে বুড়োর মৃত্যুও হয়ে ওঠে মহান এবং কর্ডেলিয়ার নিহত দেহের সম্মুখে দাঁড়িয়েও মনে হয় না যে সমস্ত শুভশক্তির বিনাশ ঘটেছে; অথবা এমন শ্রেয়োবোধ যার কাছে শ্যামার প্রাণঘাতী কাম ক্ষমাই ঠেকে এবং বজ্রসেনের নীতিবিশুদ্ধ ক্ষমাহীনতা ক্ষমার অযোগ্য, অথবা অন্য কিছু। অবশ্য চামেলির গন্ধ, ঝরনার গান, ময়ুরের নৃত্য বা যুবতীর লাস্য নিয়ে হাজার হাজার বছর ধ’রে বিস্ময় বোধ করা কবির পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে; কিন্তু পৃথিবীটা তো খুব ছোটো নয়, আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার চেয়ে একটু বড়ো। এবং আইনস্টাইন যদি-বা ব’লে থাকেন জড়জগৎ সসীম, মনোলোকের সীমানার কথা বলতে সাহস পান নি কোনো ফ্রয়েড বা পালব। মানুষ যে কেবল জৈব জগতের অধিবাসী নয়, অধ্যাত্মলোকেরও পরিব্রাজক, তারই অভিজ্ঞান রয়েছে এই শাশ্বত বিস্ময়বোধে। বিস্ময়বোধের অবলুপ্তিকে তাই আমি কাব্যের প্রগতি ব’লে মেনে নিতে কুণ্ঠিত।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে / তুমি বিচিত্ররূপিণী’। আধুনিকরা সংক্ষেপের পক্ষপাতী, তাই তাঁদের উপলব্ধিও একটু সংক্ষিপ্ত— জগতের মাঝে দ্বিচিত্র তুমি হে / তুমি দ্বিচিত্ররূপিণী। চিত্রদুটির একটি চিত্র দুঃখের, অন্যটি পাপের। দুঃখ ও পাপের যুগ্ম সত্তাকে ইংরেজিতে evil ব’লে অভিহিত করা হয়, তারই বাংলা করেছি অমঙ্গল। দর্শনশাস্ত্রে ও ধর্মশাস্ত্রে প্রবলেম্ অব্ ইভিল এক বহু প্রাচীন এবং আজো পর্যন্ত নাছোড়বান্দা সমস্যা। ইদানীংকালে তা সাহিত্যকেও পেয়ে বসেছে—ঠিক দার্শনিক সমস্যাটি নয়, জগতের মধ্যে অমঙ্গলের একচ্ছত্র আধিপত্য। দুঃখ ও পাপের মাত্রা আধুনিক কালে আগের চেয়ে বেড়েছে কিনা এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে; কিন্তু আধুনিক সাহিত্যের উপর তার ছায়া যে অতি বৃহৎ আকার ধারণ করেছে তাতে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই। প্রতিবিম্ব বিম্বকে আয়তনে এবং বর্ণের কালিমায় বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে ব’লে আমার বিশ্বাস।
ফ্রান্সে ভিক্তর উগোর নেতৃত্বাধীন কবিদের মধ্যে এবং ইংলণ্ডে লেক স্কুলের কবিগোষ্ঠীর মধ্যে রোম্যান্টিকতা ষোলো কলায় পূর্ণ বিকশিত ছিল, তার অবসান ঘটল অমঙ্গলেরই প্রবল অভিঘাতে। ঘটালেন বোদলেয়র। বোদলেয়রকে বলা হয় প্রথম কাউণ্টর-রোম্যান্টিক এবং কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ। ঐ সময়ে এবং পরবর্তী কালে কাব্যের আঙ্গিকেও এক বিরাট পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। অনেকে বলতে লাগলেন, কবিতায় যে-ভাব প্রকাশ পায় তা’ যতই অকিঞ্চিৎকর, উদ্ভ্রান্ত বা উদ্ভট হোক্ তাতে কিছু আসে যায় না, এমন কি ভাবের অংশটা ‘পালাতে পালাতে একেবারে বুঁদ হয়ে গেলে, ঝিম হয়ে গেলে, ভোঁ হয়ে গেলে, তার মানে না হয়ে গেলে’ও ক্ষতি নেই, কারণ কবিতার ভঙ্গিটাই আসল, ভঙ্গিটাই পথ এবং লক্ষ্য, সাধনা এবং সিদ্ধি। এর বিস্তারিত আলোচনা এই গ্রন্থের অন্তিম দুটি অধ্যায়ে পাওয়া যাবে। আপাতত ভাবের দিক থেকে যে-বিপ্লব ঘটালেন বোদলেয়র, তার বিষয়েই কিছু বলতে চাই। পোল্ ভালেরীর মতে বোদলেয়র ফরাসী সাহিত্যের উপর সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি, তাঁর কবিতা আধুনিকতার প্রতিভূ। এই বাংলা দেশেও একজন কৃতী ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ প্রবীণ এবং পরীক্ষানিরত বহু নবীন কবির পক্ষে ‘এ কথাটা (কথাটা র্যাবোর) মেনে নেওয়া অত্যন্ত বেশি সহজ হয়ে গেছে যে তিনি (অর্থাৎ বোদলেয়র) “প্রথম দ্রষ্টা, কবিদের রাজা, সত্য দেবতা”।
.
রবীন্দ্রনাথ দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন— ‘এক-একটি জড়-প্রকৃতির লোক আছে জগতের খুব অল্প বিষয়েই যাহাদের হৃদয়ের ঔৎসুক্য, তাহারা জগতে জন্মগ্রহণ করিয়াও অধিকাংশ জগৎ হইতে বঞ্চিত। তাহাদের হৃদয়ের গবাক্ষগুলি সংখ্যায় অল্প ও বিস্তৃতিতে সংকীর্ণ বলিয়া বিশ্বের মাঝখানে তাহারা প্রবাসী হইয়া আছে।’ এমনি এক প্রবাসী—আজকালকার ভাষায় alienated — কবি বোদলেয়র। বোদলেয়র আপন হৃদয়ের গবাক্ষগুলিকে সম্পুর্ণ বন্ধ ক’রে অধিকাংশ নয় সমস্ত জগৎ থেকেই নিজেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিলেন। বর্ষার ধারা তাঁর কাছে নেমে আসে জেলখানার গরাদ হয়ে :
When the rain spreading its immense trails
Imitates a prison of bars.
আর আকাশ সেখানে নীল নয়, চটচটে কালো :
Can you illuminate a grimy, black sky? Can we pierce shadows denser than pitch, with no morning or evening, with no stars, without even gloomy flashes of lightning? Can you illuminate a grimy black sky? … The devil has snuffed the light at the windows of the Inn.
সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার জেলখানায় তাঁর কবিসত্তা বাস করত, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। এলিয়ট বলছেন, ‘যদিচ বোদলেয়রের পদ্যরীতি ও শব্দবিন্যাস বৈপ্লবিকভাবে নূতন, জীবনবোধে যে-নূতনত্ব তিনি এনেছিলেন তা আরো মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ।’ এই যুগান্তকারী জীবনবোধের মূলকথা হ’ল প্রত্যক্ষ জগতের প্রতি রোম্যান্টিক বিস্ময় ও উৎসাহের স্থলে এক সর্বগ্রাসী বিতৃষ্ণা ও নির্বেদের অভিষেক। বোদলেয়রীয় বিতৃষ্ণার চারটি কারণ নির্দেশ করা যেতে পারে, অন্তত এই চারটি কারণের কথা আমি এখানে তুলতে চাই :
১. প্রথম কারণটি মোটের উপর ঐতিহাসিক। বোদলেয়র যখন কবিতা লেখা আরম্ভ করেন তখন ফ্রান্সে রোম্যান্টিকতার সর্বত্র জয়জয়কার এবং রোম্যান্টিকদের রাজা ভিক্তর উগো গৌরবের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। রোম্যান্টিসিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বোদলেয়র স্বয়ং বলেছেন তা মূলত ‘একপ্রকার অনুভূতি’ এবং বিশেষত ‘অন্তরঙ্গতা, আধ্যাত্মিকতা, বর্ণ বৈভব, অসীমের উৎকাঙ্ক্ষা’। এ-সব ব্যাপারে রোম্যান্টিকদের কৃতিত্ব অস্বীকার করার তাঁর কোনো ইচ্ছা ছিল না; বরঞ্চ সৃজনী কল্পনার ক্ষেত্রে মহৎ পূর্বসূরিদের সমকক্ষ হতে পারবেন কিনা সে-বিষয়ে তাঁর নিজের মনে বেশ একটু সন্দেহ ছিল— লিখছেন আঁরি পের। ফ্ল্যর দ্যু মালের ভূমিকার খশড়ায় বোদলেয়র স্বয়ং ঘোষণা করছেন : ‘লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবিরা কাব্যরাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশগুলি নিজেদের মধ্যে ভাগ ক’রে নিয়েছেন বহুকাল পূর্বেই; সুতরাং আমাকে হতে হবে অন্য কিছু।’ তাঁর একটি মৌলিক প্রত্যয় ছিল যে মানুষের, এমন-কি শিশুরও, হৃদয়াবেগ-সমষ্টি দুটি সম্পূর্ণ পৃথক কক্ষে বিভক্ত— এক্সটেসি অব লাইফ ও হরর্ অব লাইফ। যেহেতু রোম্যান্টিকরা ছিলেন মাধুর্য ও প্রেমের কবি, তাই বোদলেয়রকে হতে হবে তিক্ততার ও ঘৃণার কবি। এককথায় তাঁর বিশ্ববিতৃষ্ণা ছিল তাঁর কাউন্টার-রোম্যান্টি-সিমের অঙ্গবিশেষ। সাধারণত বলা হয় যে এই কবির রচনায় রোম্যান্টিক ও ক্লাসিকের সমন্বয় ঘটেছে। আমার অবশ্য মনে হয় এলিয়টের উক্তিই অধিকতর সত্য : যদিও পরিবেশগুণে তিনি ছিলেন রোম্যান্টিসিজমের সন্তান, কিন্তু স্বভাবগুণে তাঁকে হতে হ’ল রোম্যান্টিসিজমের শত্রু।
২. দ্বিতীয় কারণটিকে বলা যাক বিষয়ীগত (সাবজেকটিভ), অর্থাৎ কবির দেহমনের মধ্যেই তাঁর জাগতিক বিতৃষ্ণার উপাদানগুলি খুঁজে পাওয়া যাবে। বোদলেয়র তরুণ বয়স থেকে, হয়তো-বা জন্মাবধি, এক অতিশয় পীড়াদায়ক, গ্লানিকর ও দুরারোগ্য রোগে ভুগতেন— সিফিলিস রোগে। উপরন্তু তাঁর মানসিক কষ্টেরও অবধি ছিল না। শৈশবকাল কেটেছিল মাতা ও মাতার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে নানারূপ সংঘর্ষের মধ্যে। স্কুলজীবন সম্পর্কে লিখেছেন: ‘হাতাহাতি, শিক্ষক এবং সহপাঠকদের সঙ্গে অনবরত বিরোধ ও সংগ্রাম, মাঝে-মাঝেই অবসন্ন বিষাদের ছায়া পড়ত মনের উপর।’ যদিও লেখাপড়ায় তিনি এগিয়েই ছিলেন তবু উচ্ছৃঙ্খলা ও স্বৈরাচারের জন্য তাঁকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রণয়পর্বের ইতিহাস— একাধিক যুবতীর প্রতি প্রবল কিন্তু সাময়িক আসক্তি এবং এক নীচস্বভাবা গণিকার অকাট্য মোহ-বন্ধন, ইত্যাদি—মোটেই সুখপাঠ্য নয়। তাঁর চরিত্র প্রসঙ্গে এলিয়ট লিখছেন : সমাজের চোখে এবং ব্যক্তিগত যাবতীয় ব্যাপারে বোদলেয়র ছিলেন অত্যন্ত বিকৃতস্বভাব, অসামাজিকতা ও অকৃতজ্ঞতার অসাধারণ ক্ষমতা নিয়েই জন্মেছিলেন; তাঁর মেজাজ যেমন তিরিক্ষি ছিল তেমনি যে-কোনো পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে নিজের পক্ষে অসহনীয় ক’রে তোলার জেদ ছিল অভ্রভেদী।
এহেন ব্যক্তির মন সুস্থ থাকার কথা নয়। বোদলেয়রের একাধিক গুণগ্রাহী সমালোচক যে-বিশেষণটি তাঁর সম্বন্ধে বার-বার প্রয়োগ না ক’রে পারেন নি সেটি হচ্ছে ‘আধিগ্রস্ত’। এলিয়ট তো তাঁকে ‘সিম্বল অব মর্বিডিটি’ আখ্যা দিয়েছেন; প্রতি-তুলনা করেছেন পূর্ণস্বাস্থ্যের প্রতীক গ্যেটের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও করলে পারতেন, কারণ এই বাঙালী কবিও অসাধারণ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন, বিশেষত অধিকারী ছিলেন সেই স্বাস্থ্যের যাকে বোদলেয়র স্বয়ং বলেছেন ‘পোয়েটিক হেল্থ’। অত্যন্ত কঠিন শারীরিক পীড়ার মধ্যেও তাঁর কাব্যিক স্বাস্থ্য অটুট ছিল। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপ্রেম যেমন ছিল তাঁর নিটোল মানসিক ও কাব্যিক স্বাস্থ্যের প্রকাশবিশেষ, তেমনি বোদলেয়রের বিশ্ব-বিতৃষ্ণাকে তাঁর ব্যাধিগ্রস্ত মনের অভিব্যক্তি জ্ঞান করা যেতে পারে। দুঃখের কথা এই যে বোদলেয়রের মন ব্যাধিগ্রস্ত ছিল কিনা এ নিয়ে তর্ক ওঠে না, গুণমুগ্ধ সমালোচকরা অসংকোচে মেনে নেন, তাঁদের প্রিয় কবি ছিলেন রীতিমতো একটি মেন্টাল কেস। মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে মানসিক ব্যাধিকেই মূল্যবান মনে করা হয় ইদানীং— তার কারণ কি এই যে আধুনিকেরা বিশ্বাস করেন লৌকিক ব্যাপারে চেতনা ও চরিত্র ওলট-পালট হয়ে গেলে লোকোত্তর জ্ঞানের তৃতীয় নয়ন খুলে যায়? কথাটা একটু পরেই আলোচিত হবে।
জীবন ও জগৎ বিষয়ে বোদলেয়রের এই নূতন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অস্বাস্থ্যপ্রসূত জ্ঞান করলেও তাঁর সৃজনী প্রতিভার মূল্য এবং সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর সর্বসম্মত গুরুত্ব কিছুমাত্র হ্রাস পায় না। শুধু ‘আঙ্গিকের অপূর্ব সৌষ্ঠব আর শব্দচয়নের অনবদ্যতা’ নয়, আরো দৃঢ়ভূমির উপর এই কবির বিরাট খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত। মানুষ স্বার্থান্বেষণে নির্বোধ এবং পরার্থহরণে নির্দয়, জাতি বর্ণ ও ধর্ম-বিদ্বেষে বিমূঢ়, মনস্তত্ত্ব ও শারীরবিজ্ঞানের বর্ণমালাও আয়ত্ত ক’রে ওঠে নি, ফলত নানাপ্রকার আধিব্যাধির দাস— ইত্যাদি বিবিধ কারণ যতদিন বর্তমান আছে ততদিন জীবনের দৈন্য আমাদের সকলকে মাঝে মাঝে পীড়া দেবেই। বিশেষত সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল মনের যাঁরা অধিকারী তাঁরা যখন মনুষ্যজীবনের এই অসহায় দশা কল্পনার চক্ষে দেখেন তখন এক অপার নৈরাশ্য ও বিষাদের ছায়া পড়ে তাঁদের মনের গভীরতলে। সেই ছায়াকে কায়া দিয়েছেন বোদলেয়র, তার অভূতপূর্ব প্রকাশ, প্রকাশের পরোৎকর্ষ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। এ-সবই স্বীকার্য। তবু বলবো বিশেষ একটি মুডের, বিশেষ একটি রসের অনন্য এবং অনবদ্য কবি বোদলেয়র তার বেশি কিছু নয়।
অবশ্য এইটুকু বলাও তো কম বলা নয়। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি দাবি করা হয়ে থাকে এবং সে-দাবি সাহিত্যের রাজধানীগুলি থেকে উত্থিত হয়ে বহুদূর প্রান্তে অবস্থিত কলকাতা নগরীতেও ব্যাপক,অন্তত জোরালো স্বীকৃতি লাভ করেছে ইদানীং। নইলে রবীন্দ্রনাথ-প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে বোদলেয়র সম্বন্ধে এত কথা বলার প্রয়োজন ছিল না। দাবি করা হয় যে ঐ বিশিষ্ট বোদলেয়রীয় রসটি সাময়িক কোনো চিত্তদৌর্বল্যের বা স্থায়ী একধরনের অস্বভাবী হৃদয়াবেগের প্রকাশ-মাত্র নয়, তার মধ্যে সেই শাশ্বত গুণটি রয়েছে যাকে বাস্তবানুগ, যথার্থ, সত্য, ইত্যাদি আখ্যা দেওয়া যায়। কোনো হৃদয়ানুভূতিকে ‘সত্য’ তখনই বলা সংগত যখন তা অনুভব-মাত্র নয়, যখন আমরা তাকে একটি পূর্ণ অভিজ্ঞতা বা সামগ্রিক উপলব্ধিরূপে অবাধে গ্রহণ করতে পারি। তার মানে, দাবি করা হয় যে বোদলেয়র শুধু আলংকারিক অর্থে কবি নন, বৈদিক অর্থে কবি, অর্থাৎ সত্যদ্রষ্টা : রোম্যান্টিক কল্পনার রঙিন আবরণ ছিঁড়ে ফেলে নির্ভীক চোখে বাস্তবের নগ্নরূপ দেখেছেন— দেখেছেন কী বীভৎস তার সেই সত্যিকার চেহারা।
৩. মোটকথা দাবি করা হয় যে বোদলেয়রের বিশ্ববিতৃষ্ণা কেবল সাবজেকটিভ নয়, অবজেকটিভও বটে। কবি স্বয়ং এই দাবি করেছেন, অবশ্য মাঝে মাঝে কবিসুলভ আত্মখণ্ডনপ্রবণতায় আবার উলটো কথাও বলেছেন। গুণী সমালোচকদের লেখনীতেই এমনতর দাবি সুসংবদ্ধ ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে। ‘পরিণত বয়সেও,’ বোদলেয়র বলেছেন, ‘এমন শৈশবের দিন মাঝে মাঝে ফিরে আসে যখন প্রকৃতি রঙে ও রেখায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং নানা প্রতিকূল শক্তির আঘাত-সংঘাতময় মনুষ্যলোকে দেখতে পাওয়া যায় দিগন্তের পর দিগন্তের বিস্তার, নিত্যনব মহিমায় ভাস্বর। এই বিরল দিন ও মুহূর্তগুলি কিন্তু বোদলেয়রের মতে কবির পক্ষে শুভদিন নয়, কারণ তা মিথ্যাশ্রয়ী; কবিকে নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, বাস করতে হবে ‘সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের ঘন কালিমার মধ্যে’।
৪. কিন্তু বোদলেয়র কি সত্যিই বাস্তব জগৎকে মোহমুক্ত দৃষ্টিতে দেখতে পেরেছিলেন, কিংবা দেখতে চেয়েছিলেন? ছেলে-বেলা থেকে তিনি খ্রীস্টধর্মাগত এই প্রাচীন সংস্কারের বশীভূত ছিলেন যে মানুষের সামনে দুটি মাত্র পথ খোলা আছে, তার একটি গেছে ভগবানের দিকে, অন্যটি শয়তানের দিকে। মনে মনে তিনি বরণ করলেন প্রথম পথটি, কিন্তু পা বাড়ালেন দ্বিতীয় পথে; রীতিমতো সাধনা করলেন পাপের, পঙ্কের। কারণ তাঁর আর-একটি মৌল প্রত্যয় ছিল যে, পাপের পথেই তিনি বুঝবেন বিশ্বজগৎ কত ন্যক্কারজনক এবং সে-ন্যক্কারবোধ যত দৃঢ় ও ব্যাপ্ত হবে ততই ভগবানকে কাছে পাবেন তিনি। পঙ্কের সাধনায় বোদলেয়র ভগবানকে পেলেন কিনা তা ভগবানই জানেন, আমরা অবশ্য পেলাম কয়েকটি অপূর্ব সুন্দর পঙ্কজাত পুষ্প— Fleurs du Mal। সে যা-ই হোক, আমার বক্তব্য এই যে জগতের কালিমা তাঁর সংকল্প ও সাধনার দ্বারা লব্ধ, প্ৰত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পাওয়া নয়। অর্থাৎ তাঁর বিখ্যাত ‘স্পীন’ সাব-জেকটিভ অনুভূতিরূপে যতই সত্য হোক, অবজেকটিভ উপলব্ধি-রূপে সত্যতার কোনো দাবি রাখতে পারে না। বোদলেয়র জগতের কালিমাই দেখলেন কারণ শুধু তাই দেখবেন ব’লে মনস্থির করেছিলেন। যা-কিছু শুভ্র সমুজ্জ্বল শুভ ও আনন্দময় তা তাঁর ক্যাথলিক বিশ্বাসমতে তাঁকে পথভ্রষ্ট করবে এই ভয়ে সে-দিক থেকে তিনি মুখ ফেরালেন জন্মের মতো, যেন ডান চোখটি নিজের হাতেই কানা ক’রে ফেললেন। আশ্চর্য কৃচ্ছ -সাধন, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল ফলল। বাঁ চোখ দিয়ে বোদলেয়র দেখতে পেলেন প্রকৃতি ও নারী— কাব্যের দুই চিরন্তন অফুরন্ত বিস্ময় ও রহস্য— উভয়ই ঘৃণ্য (‘abominable’); মানুষ, অধিকাংশ মানুষ, কশাঘাতের যোগ্য (‘most of humanity was created for the whip’)। ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ, তলস্তয় যে-সব নারী ও পুরুষের কথা লিখেছেন তারা কেউ কোনোদিন বোদলেয়রের দৃষ্টিগোচর হয় নি। দেশ-দেশান্তর ঘুরে এই কবি সর্বত্র শুধু দেখতে পেলেন :
Everywhere, without even looking for it, from top to bottom of the deadly scale, we saw the tedious sight of immortal sin : woman, that vile slave, proud and stupid, seriously adoring herself and loving herself without dis-gust; and man, that greedy tyrant, lewd, merciless, and grasping, the slave of a slave, the tributary of a sewer; the torturer enjoying himself, the martyr sobbing; the banquet seasoned and perfumed with blood; the poison of power exasperating the despot; the people enamoured of the stupefying lash; several religions like our own, so many ladders to heaven; saintliness finding a thrill in nails and hair-shirts, like an invalid snug in his feather-bed; chatter-ing mankind drunk with its own wit, as crazy today as it was in the past, shrieking to God in its insane agony, “O Thou, my likeness, my master, I curse Thee!”—and, least stupid of all, the dauntless lovers of madness, fleeing the Fate-guarded herd and taking refuge in the infinity of opium…Such is the eternal balance-sheet of the entire globe.[১]– Le Voyage.
রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন, ‘বিশ্বের প্রতি এই উদ্ধত অবিশ্বাস ও কুৎসা…এও একটা মোহ, এর মধ্যে শান্ত নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে সহজভাবে গ্রহণ করার গভীরতা নেই’।[২] মোহের ভিত্তি চারিত্র্যনীতির উপর স্থাপিত হোক (‘শুভাশুভের অত্যন্ত কঠিন বাস্তব সমস্যা নিয়ে বোদলেয়র সর্বদাই ব্যাপৃত ছিলেন’-বলছেন এলিয়ট), কিংবা ক্যাথলিক ধর্মশাস্ত্রের উপর, তা মোহ-ই।
(বিশ্বজগতের রঙটা ফুটফুটে গোলাপীও নয়, চটচটে কালোও নয়। যাঁরা সব-কিছুকে গোলাপ ফুলের মতো রূপবর্ণগন্ধের সুসমাযুক্ত দেখেন বা সৃষ্টিকে পরম করুণাময় ভগবানের অপার অবিমিশ্র কল্যাণশক্তির প্রকাশ ভাবেন তাঁরা নিজেকে ভোলান, তাঁদের আমরা ভাববিলাসী ব’লে জানি। কিন্তু যাঁরা সমস্ত জগৎটাকে নেকড়ে বাঘ বা পূতিগন্ধময় নর্দমা রূপে উপলব্ধি করেন তাঁরাও ভাববিলাসী : ‘পচা মাংসের বিলাসও বিলাস’। বিলাসিতার ফ্যাশন বদলেছে, এই পর্যন্ত। পূর্বযুগের ভাব-বিলাসীরা তবু সংযম রক্ষা ক’রে চলতেন তাঁদের লেখায়; কীট্স্, ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ, রিল্কে, ডিকেন্স্, জর্জ এলিয়ট, তলস্তয় —এঁরা কেউ সৃষ্টির কালো দিকটার বিষয়ে অনবহিত বা নীরব ছিলেন না। নব্য ভাববিলাসীরা— বোদলেয়র, কাফ্কা, ফকনার, নর্মান মেলার[৩], জাঁ জেনে (সার্ত্র, যাকে Saint Genet উপাধিদ্বারা বিভূষিত করেছেন) এবং স্বয়ং সার্ত্র—বিতৃষ্ণা বা বিবমিষার প্রকাশে এঁরা কেউ সংযমের ধার ধারেন না, কালোকে যত বেশি কালো এবং সাদাকে যত অদৃশ্য ক’রে দিতে পারেন তাঁদের সাহিত্যে ততই তাঁরা সত্যদ্রষ্টা ব’লে খ্যাতি লাভ করেন।
প্রাচীন পারস্য মতে এ-জগৎ শুভাশুভ শক্তিদ্বয়ের দ্বন্দ্বক্ষেত্র, মানুষকে তাঁরা আহ্বান করেছিলেন শুভদেবতার পক্ষে এই সৃষ্টিযুদ্ধে যোগ দেবার জন্য। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন— ব্রহ্মের কঠোর তপস্যা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে জড় থেকে প্রাণ ও মনের দিকে, অশুভ থেকে শুভের দিকে, অপূর্ণ থেকে পূর্ণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অনাদ্যন্ত কাল ধ’রে এই কঠিন বেদনাময় সৃষ্টিকার্য চলেছে ও চলবে, তার দিকে পিঠ না ফিরিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলছেন ‘হে রুদ্র, তোমারই দুঃখরূপ, তোমারই মৃত্যুরূপ দেখিলে আমরা দুঃখ ও মৃত্যুর মোহ হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া তোমাকেই লাভ করি। নতুবা ভয়ে ভয়ে তোমার বিশ্বজগতে কাপুরুষের মতো সংকুচিত হইয়া বেড়াইতে হয়— সত্যের নিকট নিঃসংশয়ে আপনাকে সমর্পণ করিতে পারি না।.. হে দারুণ, তুমিই আমার প্রিয়,…কম্পিত হৃৎপিণ্ড লইয়া অশ্রুসিক্ত নেত্রে তোমাকে দয়াময় বলিয়া নিজেকে ভুলাইব না’[৪]; বলছেন :
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
সত্য যে কঠিন
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।
চশমাটা কি খুব বেশি রঙিন ব’লে ঠাহর হচ্ছে? এর চেয়ে অনেক বেশি রঙিন নয় কি সেই চশমা যার ভিতর দিয়ে বোদলেয়র মনুষ্যলোক ও জড়-প্রকৃতিকে দেখেছেন ‘an oasis of horror in a desert of ennui’ রূপে!
যাঁরা বলেন বোদলেয়রের মনে লোকোত্তর পরোৎকর্ষের অথবা পরোৎকৃষ্ট সত্তার অর্থাৎ ভগবানের প্রতি নিবিড় ভক্তি ও প্রেম অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিল বলে তিনি এই দোষপাপপূর্ণ বিশ্ব-জগৎকে সইতে পারতেন না, তাঁদের সঙ্গে আমি একমত নই। বোদলেয়রের কবিতায় কোনো সদর্থক ভাব বা ইঙ্গিত আবিষ্কার করতে গেলে কষ্টকল্পনার উপর নির্ভর করতে হয়; নর্থক ভাবে তাঁর সমগ্র কাব্যসৃষ্টি এতই ভরপুর যে সেখানে অন্য-কিছুর স্থান আছে ব’লে ঠাহর হয় না। হাসপাতাল-বিষয়ক গদ্য কবিতাটিতে (হাসপাতাল সেখানে স্পষ্টতই সমস্ত পৃথিবীর প্রতীক) কবি তাঁর আত্মাকে জিজ্ঞাসা করছেন, এই হাসপাতালের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সে কোথায় যেতে চায়? নানা লোভনীয় জায়গা ও অবস্থার বর্ণনা ক’রে প্রশ্ন করছেন— সেখানে কি? আত্মা নীরব। অবশেষে ত্যক্ত হয়ে আত্মা চিৎকার ক’রে ওঠে, ‘Any-where! anywhere! As long as it be out of the world’। The Voyage-এর উপান্ত্য স্তবকে বোদলেয়র মৃত্যুকে সম্বোধন ক’রে বলছেন, ‘This country bores, O Death! Let us set sail’। কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি জীবনকে প্রত্যাখ্যান ক’রে? কোনো পারত্রিক পরম শুভ বা সুন্দর ভূখণ্ড কি তাঁকে আহ্বান করছে? না, তেমন কিছু নেই সংসারে বা সংসারের পরপারে; কী এসে যায় তাতে? গন্তব্য নয়, গতি অর্থাৎ পলায়নটাই শেষ কথা— যে-নতুন স্থানে পৌঁছোবেন সেটা আগের মতোই ন্যক্কারজনক হবে এ-কথা জেনেই তিনি নতুনের সন্ধানী :
To drive into the gulf, Hell or Heaven—
What matter? Into the Unknown in search
of the New!
পারলৌকিক কোনো-কিছুর তৃষ্ণা নয়, জাগতিক সর্ববিষয়ে বিতৃষ্ণাই বোদলেয়রীয় কাব্যের মূল এবং পরিব্যাপ্ত অনুভূতি।[৫]
বোদলেয়রের বিরুদ্ধে আমার সবচেয়ে বড়ো নালিশ এই যে তিনি প্রতিভাবান কবি অথচ তাঁর আশ্চর্য প্রতিভা ক্ষয় করেছেন নিজের এবং আমাদের সকলের সর্বনাশ ঘটাতে। বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, এমন-কি ধর্মপ্রচারক— এঁদের সকলের অপেক্ষা শিল্পীর ভাবনা ও বেদনা অনেক বেশি সংক্রামক। রোম্যান্টিকদের বলা হয় যৌবনের কবি; বোদলেয়র হলেন জরার কবি। আমাদের মনের যৌবন ততদিনই যতদিন ‘মনোবৃক্ষের ছড়িয়ে-পড়া রসলোলুপ পাতাগুলি’ জীবন্ত থাকে। সত্তর, কারো-বা আশি বছর বয়স পার হয়ে গেলে ঐ পাতাগুলির ঝ’রে পড়ার দিন অবশ্যই আসে; মন তখন আকুঞ্চিত, অসংবেদনশীল ও অসাড় হয়ে পড়ে, কাউকেই, কোনো-কিছুকেই, ভালোবাসতে পারে না, কিছুই ভালো লাগে না, কিছুই দেখতে ছুঁতে জানতে ইচ্ছে হয় না, মানবিক বা প্রাকৃতিক কোনো ব্যাপারই আর আশ্চর্য ঠেকে না, সবই তখন পুরোনো, পানসে, বিস্বাদ, একঘেয়ে। আঠারো বছর বয়স থেকেই যদি কারো মনের ঐ পাতা-ঝরা অবস্থা ঘ’টে যায় তবে একে তার সর্বনাশ ছাড়া আর কী বলব? এই অবস্থা কি ঘটবে না যদি আমাদের নিত্যসঙ্গী হন সেই শক্তিমান কবি যিনি সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিক্রমা ক’রে কিছুই দেখতে পেলেন না যাতে তাঁর মন সাড়া দিতে পারে, স্পন্দিত হতে পারে, বিস্ময়, আগ্রহ বা কৌতূহল বোধ করতে পারে; দেখলেন কেবল বীভৎস এক মরূদ্যানের চারিদিকে একঘেয়ে বিরক্তিকর মরুভূমির অনন্ত বিস্তার। জগতে নিছক ভালো কিছু আছে হয়তো, নিছক মন্দও কিছু থাকতে পারে, শতকরা নিরানব্বই ভাগ বস্তু ভালোয়-মন্দে সুন্দরে-কুৎসিতে সত্যানৃতে মিথুনীকৃত। কিন্তু যার মন সপ্রাণ ও সংবেদনশীল তাকে তৃণখণ্ড থেকে নীহারিকাপুঞ্জ পর্যন্ত প্রত্যেকটি বস্তু ও ব্যাপার ডেকে বলছে : আমার দিকে চেয়ে দেখো, আমাকে স্পর্শ করো, বুদ্ধি দয়ে বোঝো, হৃদয় দিয়ে বোধ করো— দেখবে আমার কোথাও শেষ নেই, তল নেই, সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এবং তদতিরিক্ত যদি কিছু থাকে তবে তারও অনন্ত রহস্যের আভাস আছে আমার মধ্যে। এই পরমাশ্চর্য জগৎকে বোদলেয়র কেমন ক’রে বললেন-– “মনোতোন এ পেতি”! এত বড়ো অনৃতবাক্য কি সাহিত্যে আর কোথাও উচ্চারিত হয়েছে? যদি বলেন এটা নৈর্ব্যক্তিক সত্য বা মিথ্যার প্রশ্ন নয়,৬ একঘেয়ে আর অকিঞ্চিৎকর জগৎটা কবিরই মনের প্রতিবিম্ব, তবে আমি তা মেনে নিয়ে শুধু একটি প্রশ্ন যোগ করব— যে-রসনায় সবই বিস্বাদ ঠেকে সে-রসনার আস্বাদনশক্তি কি অবশিষ্ট আছে, যে-মনের কাছে সবই একঘেয়ে সে-মন কি বুড়িয়ে যায় নি? বীভৎসকে দেখবার মতো নির্ভীক চোখ বোদলেয়রের ছিল, কিন্তু জগতের ও জীবনের পরম বিস্ময় বোধ করবার মতো মনের সজীবতা কোন্ ভূয়োদর্শনের বা আপ্তবাক্যের আওতায় প’ড়ে হারালেন তিনি? সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ এই যে বোদলেয়রীয় ‘আনুই’-এর তন্নিষ্ঠ চর্চা আমাদের যুবকদের মনকেও যৌবনের প্রারম্ভেই জরাগ্রস্ত করে দিচ্ছে।
.
বোদলেয়রের সাক্ষাৎ বা পরোক্ষ প্রভাব পাশ্চাত্য সাহিত্য-কর্মের উপর ও সাহিত্যিকদের জীবনবোধের উপর গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে চলল। সে-প্রভাব ফরাশি কাব্যে তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই পরিলক্ষ্য, যদিও চ্যানেল পার হতে তার দু-চার দশক সময় লেগেছিল। ফ্রান্সে বোদলেয়রের পরে যে-কাব্যশৈলী সবচেয়ে শক্তিমান কবিদের আনুগত্য লাভ করল তাকে ‘প্রতীকবাদ’ নামে অভিহিত করা হয়। প্রতীকী কবিদের কাছে এটা মোরসীসূত্রে পাওয়া, সুতরাং অবধারিত সত্য, যে জগৎ-ব্যাপারটা অতিশয় কদর্য এবং তার প্রতি একমাত্র সংগত ভাব বিতৃষ্ণা, একমাত্র উচিত কৃত্য মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। র্যাবো ইন্দ্রিয়জ্ঞানের শক্তিটাকে শুদ্ধ বিপর্যস্ত করতে উপদেশ দিলেন কারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুমাত্র তাঁর কাছে অবজ্ঞেয়; কবিতার ভাষায় যে-স্বাভাবিক পার্থিব সমাজবোধ্য অর্থব্যঞ্জনা থাকে তাকে প্রায় অবলুপ্ত করতে তৎপর হলেন এই ভরসায় যে তাতে ক’রে কবিতার অপার্থিব অর্থদ্যোতনা প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠবে, আবিষ্কার করতে চাইলেন এক অভিনব ভাষা যা ‘পরব্রহ্মের রূপায়ণে সক্ষম’।
এই পরব্রহ্ম বিষয়ে যোগী, মুনি, ঋষি প্রভৃতি আখ্যাবিশিষ্ট সিদ্ধপুরুষেরা বহুদীর্ঘ গুহ্য তপস্যার ফলে যদি-বা কোনো অতীন্দ্রিয় অনির্বচনীয় প্রত্যক্ষজ্ঞান লাভে সক্ষম হয়ে থাকেন, কবি লোকোত্তর রহস্য উপলব্ধি করেন বিশ্বলোকের মাঝখানেই, দৃশ্যরূপের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করেন অপরূপকে, দর্শনাতীতকে। এই কথাটা সুন্দর ক’রে বলেছেন জাক্ মারিত্যাঁ, আধুনিক কাব্য ও শিল্পকলার বোধকরি সবচেয়ে জ্ঞানী ও সহৃদয় অধিবক্তা : ‘কবির উপলব্ধি উপলব্ধ বস্তুগুলিকে প্রাণস্পন্দিত ও স্বচ্ছ ক’রে তোলে; সেই স্বচ্ছ আবরণের ওপারে আমরা দেখতে পাই দিগন্তের পর দিগন্তের বিস্তার।…কবি এক অসীম রহস্য অনুভব করেন বাস্তব জগতের রহস্যের মধ্যেই।’ এইসঙ্গে তিনি আরো একটি মত প্রকাশ করেছেন যা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
মারিত্যাঁ মনে করেন কবিতার ভাষা ছুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের অর্থ বহন করে। ক্ল্যাসিক্যাল কাব্য (তাঁর লেখায় এর মানে প্রাক্-বোদলেয়রীয় কাব্য) পাঠকের সামনে উপস্থাপিত করে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে গড়া যে-শিল্পরূপটি, তার প্রথম ইঙ্গিত অবশ্য কতগুলি সুনির্দিষ্ট চিত্তগ্রাহ্য বস্তুর দিকে। কিন্তু এটি উপলক্ষ্য মাত্র, আসল লক্ষ্য পরমসত্তার সেই ঝলকটুকু দেখিয়ে দেওয়া যা চিত্তের অগম্য, কনসেপ্টের সঙ্গে কনসেপ্ট যোগ ক’রে যার নাগাল পাওয়া যায় না, অর্থাৎ ভাষার সাধারণ এবং যুক্তি-বিদ্যানুমোদিত প্রয়োগ যেখানে ব্যর্থ। এ-পর্যন্ত যদি-বা মেনে নেওয়া যায়, মুশকিল বাধে যখন মারিত্যাঁ ঘোষণা করেন যে, কবিতার ভাষার দুইপ্রকার অর্থ কেবল ভিন্ন নয়, একেবারে পরস্পর-অনপেক্ষ— এতই অনপেক্ষ যে প্রথম অর্থ (প্রত্যক্ষ পার্থিব বস্তুসমূহের নির্দেশ) বর্জন ক’রেও কবিতার পক্ষে সম্ভব অর্থ (অতীন্দ্রিয় পরম রহস্যময় সত্তার ইঙ্গিত) বহন করা। উপরন্তু মারিত্যাঁ বলতে চান প্রতীকী কবিরা এহেন পূর্ণ-বিচ্ছেদ ঘটাতেই বদ্ধপরিকর।। কবিকৃত শব্দপরম্পরার এই যে মধ্যবর্তী অর্থ, যা আমাদের মনকে নিয়ে যায় প্রাকৃতিক বা মানবিক বাস্তবজগতে— এই বাড়িগুলির জটিল বোবা রেখা, ঐ জম্বুপুঞ্জে শ্যামবনান্ত, সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন মেয়েটির ব্যক্তিরূপ যে-মেয়ে তাগায় তাবিজে ভয়ে উদ্বেগে বেঁধে রেখেছে নিজে এবং আপন জনকে— আধুনিক কবিতা চায় এই বাস্তব অভিধেয়টিকে আবছা ক’রে দিতে, সম্ভব হলে একেবারেই মুছে ফেলতে। তার কারণ আধুনিক কবিরা বিশ্বাস করেন যে (এবং মারিত্যাঁ সে-বিশ্বাস সমর্থন করেন) বাস্তব জগতের অংশবিশেষ যদিও ভাষার স্বাভাবিক অভিধা, তবু তা আড়াল ক’রে রাখে সেই পরম সত্তাকে যার আভাটুকু প্রতিবিম্বিত করা কবিতার চরম লক্ষ্য। তাই চলিত কাব্যের দুই অর্থের মধ্যে প্রথমটিকে ছেঁটে ফেলতেই আধুনিক কবিরা কৃতসংকল্প।[৭]
কিন্তু কবি কেমন ক’রে এই অসাধ্যসাধন করবেন তা আমার ধারণার অতীত। তিনি নিজে যখন সেই পরম রহস্যঘন সত্তার আভাস পেয়েছেন প্রত্যক্ষ জগতের অন্তরঙ্গ হয়েই, তখন কোন জাদুকাঠির স্পর্শে পাঠককে এক লাফে এই দৃশ্য প্রপঞ্চ সম্পূর্ণ পার করিয়ে দিয়ে পরমের একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করাবেন? যে-পথে তিনি দৃশ্যলোক থেকে দৃশ্যাতীতে উত্তীর্ণ হয়েছেন, মর্ত্য ও অমর্ত্যের মধ্যে সেতুবন্ধন করেছেন, পাঠক সেই পথে তাঁর অনুগামী হতে পারেন, সহযাত্রী হতে পারেন, কিন্তু পথিকৃৎকে একেবারে টপকে যাবেন কোন্ মায়াবলে? এমনি এক আজগুবি কাণ্ড ঘটাতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন র্যাবো, উপলব্ধি করলেন তাঁর সাধ কবিমাত্রের সাধ্যাতীত; চোখের সামনে দেখতে পেলেন, কবিতাকে যে-পথে তিনি হাঁটাতে চান তা কোনো রাজপথ নয়, একটি অন্ধগলি। সেই প্রবীণ উপলব্ধির তরুণ বেদনা জানিয়ে গেলেন তাঁর A Season in Hell কাব্যগ্রন্থে। আমরা পাঠকরা বঞ্চিত হলাম না, তবে এই ভেবে প্রবঞ্চিত যেন না হই যে র্যাবো কবিতার সামনে নতুন কোনো পথ খুলে দিয়ে গেছেন। কোনো পথ খোলা নেই জেনেই কুড়িতে পা দিতে-না-দিতে এই ব্যর্থকাম কবি কবিতা লেখা একেবারে বন্ধ ক’রে দিলেন; বাকি জীবনটা তাঁর শুধু বন্ধ্যা নয়, বাউণ্ডুলে, ছন্নছাড়া, শোচনীয়।
দেবদত্ত শক্তিতে মালার্মে র্যাবোর সমকক্ষ ছিলেন না হয়তো, কিন্তু সাধনা তাঁর অতুলনীয়— অন্তত কাব্যের বহিরঙ্গ বিচারে বোদলেয়রের মতো তিনিও দৃঢ়প্রত্যয়ে মেনে নিয়েছিলেন যে কবির পক্ষে বহির্জগৎটা পরিহার্য। বরঞ্চ তাঁর পরিহরণ আরো’ চরমে পৌঁছেছিল, জগতের প্রতি কোনোরূপ বিক্ষোভ বা বিতৃষ্ণাও তাঁর মনে, অন্তত মনের অভিব্যক্তিতে স্থান পায় নি। আদৌ বহির্মুখী ছিল না ব’লে তাঁর কাব্য বোদলেয়রের মতো অন্তর্মু থী হবে, এ-প্রত্যাশাও কিন্তু ভ্রান্ত। মালার্মের কবিতা ছিল জ্ঞানত, নিকামত, সংকল্পত শূন্যমুখী। গোড়া থেকে অবশ্য তা ছিল না; প্রথম জীবনে তিনি পরোৎকর্ষের, সুন্দরের, শুভের— অথবা এ-সবের প্রতীক, নীলাকাশের— প্রবল আকর্ষণ অনুভব করতেন। পরম সুন্দরের আকর্ষণ কিন্তু তাঁকে শুধু বিক্ষুব্ধই করল; সেই আকর্ষণকে সমূলে বিনষ্ট করতে চাইলেন একটি স্মরণীয় কবিতায়, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদে যার শিরোনাম ‘নীলিমা’। নীলাকাশকে ঢেকে দিতে ব্যাকুল হলেন প্রভাতের কুয়াশায়, প্যারিসের চিমনির ধোয়ায়; সোল্লাসে ঘোষণা করলেন— ‘মরে গেছে মহাকাশ’। কিন্তু নীলিমা থেকে অব্যাহতি পাওয়া এত সহজ নয়, দীর্ঘতর তপস্যা-সাপেক্ষ। কাজেই ‘বৃথা অব্যাহতি ভিক্ষা। নীলিমাই আবার বিজয়ী’। কিন্তু শেষ অবধি নীলিমাও হার মানল এ-কবির একান্ত সাধনার কাছে, ‘সমুদ্রসমীর’ও স্তব্ধ হ’ল; নাবিকের গান আর মধুর শোনাল না, কোনো গানেই মাধুরীর লেশটুকু রইল না। ‘রিক্ত কাগজের শুক্ল স্বগত সংযম’ রইল কেবল তাঁর সম্মুখে প্রসারিত, কারণ তিনি সংকল্পবদ্ধ যে, তাঁর কবিতার খাতার শুভ্র পৃষ্ঠাকে কলঙ্কিত করবেন না বাস্তব কোনো-কিছুর উল্লেখে। লিখতে না পারার বিক্ষোভ নিয়ে অবশ্য কয়েকটি সুন্দর কবিতা লিখলেন তিনি। বস্তুতপক্ষে তাঁর অর্ধেক রচনার। প্রথম পর্বের সব কটি কবিতার) একমাত্র বিষয় তাঁর উষরতার বেদনা।
এই বেদনা কিঞ্চিৎ প্রশমিত হ’ল শেষ জীবনে, মালার্মে আবিষ্কার করলেন অপর একটি কাব্যবিষয়, সত্যি কথা বলতে কি একটি নতুন কাব্যকৌশল, যার পরাকাষ্ঠা দেখা গেল তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ঈষৎ দীর্ঘ রচনায়—’ফনের দিবাস্বপ্নে’। কবিতাটি আরম্ভই হয় বাস্তবের ক্ষীণতম পটভূমিতে, একটি পৌরাণিক কাহিনীতে, কাহিনী-বর্ণিত স্বপ্নে। চার লাইন পরেই কিন্তু সেই-টুকু বাস্তবের ছোঁয়াও আর থাকে না, স্বপ্নটা ভেঙে-ভেঙে যায়, ধরাছোঁয়ার বাইরে চ’লে যায় স্বপ্নের বস্তুগুলি, যেন তারা একে-বারেই কিছু না। শার্ল মোরঁ তাঁর ভূমিকায় বলেছেন, মালার্মে গদ্যেপদ্যে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন কবিকর্ম হচ্ছে যে-কোনো-কিছু থেকে একেবারে কিছু-না-এর দিকে ডানা মেলে উড়ে চ’লে যাওয়ার কৌশলবিশেষ। মারিত্যাঁর অভিমত, মালার্মের কবিতা হচ্ছে ‘an elaboration of pure artefact mirroring only the void’। এই অত্যাশ্চর্য কর্ম কিন্তু কেবল কাব্যরচনার মধ্যে সুসম্পন্ন হয় না; মালার্মেও তা করতে পারেন নি। টীকা ভাষ্য গৌরচন্দ্রিকা ইত্যাদি দ্বারা সংবলিত না হলে দু-চারটি বাদে এই অসাধারণ প্রতিপত্তিশালী কবির প্রায় সমস্ত রচনাই প্রহেলিকা থেকে যায়— গবেষণামূলক নিবন্ধ লেখার পক্ষে যতটা উপযুক্ত, রসাস্বাদনের পক্ষে তার সিকিভাগও নয়। শুনেছি মালার্মের এক-একটি ক্ষীণাঙ্গী কবিতার উপর মোটা-মোটা থিসিস রচনা ক’রে মার্কিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরেরা ডক্টরেট উপাধি পেয়ে থাকেন। ‘কোন্ হাটে তুই বিকোতে চাস, ওরে আমার গান?’
এলিয়ট বলেছিলেন আধুনিক কবিরা তাঁদের কবিতায় মামুলি অর্থটিকে ব্যবহার করেন পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য, যাতে বুদ্ধির পাহারা এড়িয়ে কবিতা সোজা হৃদয়ের গোপন কক্ষে প্রবেশ করতে পারে। ঘুম পাড়াবার শক্তি ছিল ভেলেনের,য়েসের, পাস্তেরনাকের কবিতায়। কিন্তু স্বয়ং এলিয়ট, মালার্মে কিংবা ভালেরির কবিতা বুদ্ধির কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জরূপে উপস্থিত হয়, অত্যন্ত সজাগ বুদ্ধিকে দুরূহ ও শ্রমসাধ্য গবেষণার কাজে ঠেলে দেয়; ততক্ষণ বরং হৃদয়বৃত্তিকেই ঘুমিয়ে থাকতে হয় বা একপাশে থমকে দাঁড়াতে হয়। বহুবিধ শাস্ত্র ঘেঁটে, অনেকদিন মগজ খাটিয়ে, শেষে যখন অর্থোদ্ধার হয় তখন ক্লান্ত কবিতার কি আর চলৎশক্তি অবশিষ্ট থাকে? কবিতা যদি প্রথম অভিঘাতেই পাঠকের হৃদয়ের সন্ধান না পায় তবে বুদ্ধি ও বিদ্যার অলিগলি ঘুরে শেষেও পাবে না।
কাবো আধুনিকতার পরবর্তী অধ্যায়টি আরো বিচিত্র। প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি অবজ্ঞা নিবিড়তর হ’ল, সর্বপ্রকার অভিধা পরিত্যাগ ক’রে কবিতার ভাষা আর ভাষাই রইল না, হয়ে উঠল বস্তুপুঞ্জ। এই বস্তুধর্মী অনচ্ছ ভাষা হবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য; বুদ্ধিগ্রাহ্য বা অবানসোগোচর কোনো কিছুর দিকে রসিক চিত্তকে ধাবিত হতে দেবে না, বন্দী ক’রে রাখবে আপন রূপের বৈভবে, অভিভূত করবে কবির অভূতপূর্ব রূপদক্ষতায়। বাহিকা-শক্তি কবিতা একেবারে হারাবে না অবশ্য, তবে বহন করবে একটি-মাত্র অভিজ্ঞতা— কবিকৃত পরমাশ্চর্য শব্দবিন্যাসকে সর্বান্তঃকরণে উপলব্ধি করবার অভিজ্ঞতা। ঐ অভিজ্ঞতাই পেতে চেয়েছিলেন কবি তাঁর সৃষ্টিকার্যে, সেই মূল্যবান অভিজ্ঞতাই তিনি পাঠককে উপহার দিতে চান তাঁর প্রকাশিত রচনার মাধ্যমে। আধুনিক কাব্যের এই আত্মবিলোপকারী প্রবণতার আলোচনা পাওয়া যাবে বইয়ের উপান্ত্য অধ্যায়ে।
আর-একটি প্রবণতা হ’ল সুর্রেয়ালিজ্ম, বাংলায় নাম দেওয়া যাক পরাবস্তুবাদ। এর প্রভাবও পড়েছে হালের বাঙালি কবিদের উপর, ফরাশি পরাবস্তুবাদীদের সাক্ষাৎ পরিচয়ে ততটা নয় যতটা মার্কিন বীটনিকদের মধ্যস্থতায়। এঁরা বুদ্ধির তথা চৈতন্যের সীমানা অতিক্রম ক’রে ভাঙ, হশীশ, মেস্কালিন, ইথরাদির সাহায্যে প্রবেশ করতে উদ্যত হলেন অবচেতনার গহন আদিম অরণ্যে; ভাবলেন সে-অরণ্য থেকে কবিতা বেরিয়ে আসবে বন্য হস্তীর মতো সামনে যা পাবে তাই ভেঙেচুরে— শুধু বুদ্ধি নয়, নীতি নয়, রীতি রুচি শালীনতা সব-কিছু তছনছ ক’রে। সন্দেহ করলেন না যে সবচেয়ে তলার যা, তার মূল্য সকলের উপরে হতে পারে না; জেনেও জানলেন না যে তুচ্ছই সহজ, মহতের জন্য দীর্ঘ কঠিন সাধনার প্রয়োজন। বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শক্তি যদি কারো থাকে তবে তিনি কোনো অজানা রহস্যলোকের সন্ধান পেতেও পারেন, কিন্তু বুদ্ধিকে এবং বুদ্ধিপ্রভব বিনয়কে (ডিসিপ্লিনকে) এড়িয়ে গেলে যা পাওয়া যাবে তা কবিতা নয়, কাকলি, অটোম্যাটিক রাইটিং— মনোরোগীর রোগনির্ণয়ার্থে তার মূল্য থাকতে পারে, রসের বিচারে তা অপাঙ্ক্তেয়।
ওয়ার্ড্সওয়ার্থ বলেছিলেন কোনো যুগের সমাদৃত সাহিত্যে যে-মিথ্যা ধারণাগুলি শিকড় গেড়ে থাকে তার মিথ্যাত্ব বিষয়ে অবহিত হওয়া সে-যুগের মানুষের পক্ষে বেশ একটু কঠিন। বর্তমান যুগের হৃদয়মন-গ্রাস-করা মিথ্যাটি হ’ল অমঙ্গলের এবং কদর্যতার সর্বব্যাপ্তি। বোদলেয়র-পরবর্তী অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় কবি, গল্প-কার ও ঔপন্যাসিকের রচনায় যা-কিছু ন্যক্কারজনক তার প্রতি অখণ্ড মনোনিবেশ দেখে মনে হয় এঁরা দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাচ্ছেন— “কদর্ষেণ” বাস্যম্ ইদম্ সর্বম্ জগত্যাম্ জগৎ’। রোম্যান্টিকদের প্রমাদ সম্পর্কে আমরা এতই সচেতন যে, বেচারি কীসের বহু-উদ্ধৃতি-জীর্ণ সত্য ও সুন্দরের সমীকরণ মন্ত্রটিকে সংশোধিত করতে চাই তাকে উলটে দিয়ে (মার্কস্ যেমন হেগেলদর্শনকে চাঙ্গা করতে চেয়েছিলেন তাকে মাথার উপর দাঁড় করিয়ে); বলি, যা কদর্য তাই সত্য, যা সত্য তাই কদৰ্য।
বর্তমানকালের চলতি মিথ্যা যেমন আমাদের চোখে সহজে ধরা দেয় না, তেমনি অতীত যুগের সাহিত্যসাধনা যে-সত্য থেকে শক্তি সঞ্চয় করত সে-বিষয়েও সাম্প্রতিক সাহিত্যের প্রভাব আমাদের মনকে অনেকখানি অসাড় ক’রে রাখে। সে-যুগটি যদি হয় দূর অতীতের তবে বাধা তত দুস্তর ঠেকে না, বরং দূরের বাদ্যি একটু মিষ্টি শোনায় বইকি। মনের ব্যবধানকে আমরা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করি ঐতিহাসিক কল্পনাশক্তির উপর ভর ক’রে, পরিশীলন করি এমন রুচির যার সাহায্যে দু-এক শতাব্দী এমনকি দু-এক সহস্রাব্দী পূর্বের ভাব ও রস গ্রহণ করতে বাধা থাকে না। রবীন্দ্রনাথের যুগ অতীত, কিন্তু মাত্র তিন-চার দশক পূর্বে তা খুবই বর্তমান ছিল। এই নিকট-অতীতকে নিয়ে বিপদ ঘটে সাহিত্যে। সাহিত্যভোগী খোঁজেন আধুনিকতম শৈলী ও মেজাজ; সাহিত্যকর্মীও চান একেবারে নতুন কিছু ক’রে দেখাতে, নইলে তাঁর শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের হাতে হাতে প্রমাণ দেওয়া হয় না। আর সদ্য-নতুনকে চালু করতে গেলে প্রয়োজন দেখা দেয় যা চ’লে আসছে, যা হৃদয়-মন-নয়নকে হরণ ক’রে রেখেছে এতদিন, তাকে সরিয়ে ফেলার, অন্ততপক্ষে তার সম্মানের উচ্চাসনটাকে নামিয়ে দেবার (প্রাকৃত ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ডিবাঙ্কিং’)। এটাকে কালের ধর্ম ব’লে মেনে নেওয়া যেত, বিশেষত এই ভরসায় যে রবীন্দ্রকাব্যের সত্য মূল্য বেশিদিন চাপা থাকবে না। কিন্তু আমার মন তাতে সায় দেয় না কারণ আমার বিশ্বাস, যদিও সর্বম্ ক্ষণিকম্ ক্ষণিকম্, তবু সৎসাহিত্যের মূল্যায়ন আর জড়োয়া গয়নার ফ্যাশানের অনিত্যতায় যে-জাতিভেদ আছে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখাই ভালো। বাজারী সাহিত্য তো রয়েছে, তার ফ্যাশান বদলাক, দাম উঠুক নামুক বছরে-বছরে। কিন্তু মহৎ সাহিত্যের মূল্যায়ন আরো তন্নিষ্ঠ এবং দূরপ্রসারিত স্থিরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া আবশ্যক।
.
১. বোদলেয়রের কবিতার আরো ভালো অনুবাদ রয়েছে। বাংলা ভাষাতেই বুদ্ধদেব বসুর অতি সুন্দর অনুবাদ হাতের কাছে ছিল। কিন্তু অনুবাদ সুন্দর হলে নিছক অনুবাদ থাকে না; হয়ে ওঠে অনুসৃষ্টি (trans-creation)। অথচ এই প্রবন্ধে উদ্ধৃতির উদ্দেশ্য একান্তরূপে বোদলেয়রেরই হার্দিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দেওয়া। তাই মূলের নিকটতম অনুবাদ খুঁজতে হয়েছে। উপরে উদ্ধৃত অংশের অনুবাদক ফ্র্যান্সিস স্কার্ফ।
২. সাহিত্যের পথে— ‘আধুনিক কাব্য’, পৃ ১৪৪
৩. ‘In effect, Hipster as Mailer describes him in The White Negro is a man who follows out the logic of the situation in which we are all presumably caught; a man who, faced with the threat of imminent extinction and unwilling to be a party to the forces pushing toward collective death, has the courage to make a life for himself in the only way that conditions permit by pursuing the immediate gratification of his strongest desires at every moment and by any means.’ (Norman Podhoretz in Partisan Review, Summer 1959) আশ্চর্য মন্তব্য! সম্ভাব্য সর্বনাশের মুখোমুখি দাড়িয়ে লেনিন, গান্ধী, শোয়াইসর অন্য এক জীবনের সন্ধান দিয়ে গেছেন। মেলারের গুণমুগ্ধ সমালোচকের দৃষ্টিতে এ-সব জীবনমার্গ বিবেচনার অযোগ্য ব’লে ঠাহর হ’ল কেন।–-ঠাহর হ’ল কেন–পথিকরা বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন না, অথবা তাঁদের চরিত্রে সৎসাহসের অভাব ছিল? মেলারের প্রিয়পাত্র হিস্টররা কি এঁদের তুলনায় অনেক বেশি সত্যদর্শী এবং বীরবাহু?
৪. রবীন্দ্র-রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড, পৃ ৬৬
৫. ‘Baudelaire invokes forces of faith or transcendence only in so far as they could be used as weapons against life or as symbols of escape.’ (Auerbach-The Aesthetic Dignity of Fleurs du Mal)
৬. কবিতায় সত্যাসত্যের অর্থ ও স্থান বিষয়ে পরবর্তী কোনো কোনো অধ্যায়ে (‘গীতাঞ্জলি বিষয়ে একটি ব্যক্তিগত সমস্যা’ এবং ‘সাহিত্যনীতি ও শ্রেয়োনীতি’) কিছু আলোচনা পাওয়া যাবে।
৭. ‘Modern poetry has undertaken completely to set free the poetic sense. In the double signification of the poem, it endeavours to extenuate, if possible, to abolish the inter-mediary signification, the definite set of things whose presence is due to the sovereignty of the logical requirements, of the social signs of language, and which is, as it were, a kind of wall of separation between the poetic intuition and the unconceptualizable flash of reality to which it points. The poem is intended to have, not a double, but a single significa-tion-only this flash of reality captured in things.’ (Jacque Maritain-Creative Intuition in Art and Poetry, Meridian paperback, p. 214)
৮. ‘Stephane Mallarmé was without the personal mys-ticism of Baudelaire and Rimbaud and concentrated on the word as something which has symbolic value and evocative power in itself. Whatever assessment the critics accord to his poetic creation, it was undoubtedly responsible for an important development in poetic theory. For the poem came to be regarded no longer simply as an instrument by which the poet communicated to other men an experience of mystical revelation, but was itself the source of the mystical experience and the revelation to poet and reader alike.’ (H. Osborne-Acsthetics and Criticism, Kegan Paul, p. 195)
