অন্তিম পর্বের দুটি কবিতা
‘বোঝানোর দায়িত্ব নয় কবিতার, কবিতা কেবল প্রাণিত করতে জানে’— বলেছেন শঙ্খ ঘোষ,* রবীন্দ্রনাথের দোহাই পেড়ে। কবিতার সঙ্গে গদ্যের প্রভেদ একটা আছে নিশ্চয়ই; কিন্তু, প্রথমত, সে-প্রভেদ এই নয় যে কবিতা কিছু না বুঝিয়েই প্রাণিত করে, আর গদ্য বোঝায় কিন্তু প্রাণিত করে না কখনো। দ্বিতীয়ত, সাহিত্যের এই দুই বিভাগের মাঝখানে কোনো অলঙ্ঘ্য কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয় নি সর্বকালের মতো, সর্বাবস্থার জন্য, সর্বসম্মতিক্রমে। আনাগোনা, সীমানা-সরহদ্দের রদবদল চলছে হামেশাই। গদ্য দরকার পড়লে কাব্যধর্মী হয়ে ওঠে— যেমন উপনিষদে, প্লেটো আর বের্গসঁর দর্শনে, গিবন আর মসনের ইতিহাসে, তুর্গেনেভ, লরেন্স আর জয়েসের উপন্যাসে, মোপাসাঁ আর রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে। কবিতা আপন অন্তরের তাগিদেই গদ্যকে বুকে টেনে নেয়— তার উদাহরণ হোমর, ভার্জিল, ব্যাস, দান্তে, শেক্সপীয়র, গ্যেটে, এলিয়ট এবং রবীন্দ্রনাথে অজস্র ছড়ানো রয়েছে।
[* ভূমিকার শেষ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য]
বোঝানোর একটি অর্থ একজনের মনের কথা আর-একজনের মনের দেউড়িতে পৌঁছিয়ে দেওয়া। কথার শুধু হৃৎস্পন্দনটুকু নয়, বহির্জগতের যে-বস্তু বা অবস্থার অভিঘাতে সে-হৃদয়াবেগের জন্ম এবং যার বহমান চেতনার সঙ্গে তার পরিপুষ্টি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত সেই সমগ্র উপলব্ধির মন থেকে মনান্তরে সঞ্চার— এই অর্থে বোঝানোর দায়িত্ব কবি না নিলে আর কে নিতে পারে? অনুভূতি বাদ দিয়ে বিষয়ের যে নিরঞ্জন সত্তা তার যথাযথ সংবাদ-বহন বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান-সদৃশ গদ্যের কাজ; বিষয়টাকে উপেক্ষা ক’রে শুধুমাত্র তার অনুভূতিটুকু ছেঁকে নিয়ে সে-অনুভূতির বিস্তারিত অভিব্যঞ্জনা সংগীতে পাই আমরা। এ-দুয়ের মাঝখানে পড়েন কবি। এক দিককার দায়িত্ব এড়াতে গেলে তিনি বৈজ্ঞানিক (বা দার্শনিক কিংবা ঐতিহাসিক) হয়ে পড়বেন, পা ছেড়ে গদ্যের আশ্রয় গ্রহণ করবেন; অন্য দিককার দায়িত্ব থেকে মুক্তি চাইলে তাঁকে হতে হবে সংগীতকার, কলম ছেড়ে আঙুলে পরতে হবে মেজরাব।
কবিতার গভীর তলে যে-অর্থ লুকানো থাকে তার সন্ধানে ডুব দিতেই আমরা অভ্যস্ত ছিলাম; আজ শুনছি তার উপরিতলে যে স্বর ও ব্যঞ্জন ধ্বনির মোহিনী মায়া বিস্তৃত সেখানেই কবিতার সারাৎসার খুঁজতে হবে। আমরা ভুলতে বসেছি যে অর্থের গরবেই কথা গরবিনী। অবশ্য উঁচু দরের গাইয়েরা সে-গরব উপেক্ষা ক’রে যে-ক’টি কথার উপর রাগ-রাগিণীর বিস্তার করেন তার অর্থ যৎসামান্যই হয়, অনেক সময়ে কালোয়াতী গানের কথা ঠিকমতো বোঝাই যায় না। কিন্তু অর্থের দৈন্য ঘোচাবার জন্য থাকে কণ্ঠের ঐশ্বর্য আর আজীবন সুরের সাধনা। মালার্মে-ভালেরীর প্রদর্শিত পথে যদি কবিতাকে সংগীতের পর্যায়েই তুলতে চান আধুনিক কবিরা তা হলে সংগীতের বলিষ্ঠ পরিণত আঙ্গিকের চর্চা করতে হবে তাঁদের। শুধু কবিতার বাচ্যার্থের উপর কাঁচি চালালেই সাংগীতিক ব্যঞ্জনার জামা তৈরী হয়ে যাবে ভাবাটা আত্মপ্রবঞ্চনা এবং পাঠককে বঞ্চিত করা। ইতিমধ্যে শেক্সপীয়র কিংবা রবীন্দ্রনাথ কথার যে-অপরিমেয় শক্তি-উৎসের সন্ধান দিয়ে গেছেন তার ভগ্নাংশমাত্র বেছে নিয়ে শুচিবায়ুগ্রস্ত বিধবাদের মতো বলা কি সাজে— বাকীটা সক্ড়ি, ওতে গদ্যের ছোঁয়া লেগেছে? ধর্ম হৃদয়ের ব্যাপার, আচারের নয়; কবির ধর্মও তাই— কবির ধর্ম তো বিশেষ ক’রে। গদ্যের ছোঁয়া বাঁচাতে গিয়ে পাঠকের ছোঁয়ার বাইরে চ’লে যাচ্ছেন না কি আধুনিক কবিরা, বুঝিয়ে বলার ভয়ে কি নিজেকে স্ফিংক্স-এর মতো অনধিগম্য ক’রে তুলছেন না? আমি অবশ্য অকবি পাঠকের কথা ভাবছি। কবিরাই পরস্পরের কবিতা পড়বেন এবং তার মর্মোদঘাটন করবেন অর্থাৎ কবিতার উপর আর-একটি কবিতা লিখবেন— এটাকেই যদি স্বাভাবিক ঠাওরানো হয়, তা হলে কিছু বলবার নেই।
ভাষার এপারে আছেন লেখক, ওপারে পাঠক। মাঝখানে যদি বোঝাবুঝির সেতুবন্ধন না হয়, তবে বলতেই হবে একপক্ষের বা উভয়পক্ষের দোষ ঘটেছে: পাঠক আনাড়ি বা নির্বোধ হতে পারেন, লেখকও আনাড়ি বা একগুঁয়ে বা অসদ্গুরু-চালিত হতে পারেন; অথবা উভয়ত। কবি যখন ভাষাশিল্পী তখন বোঝানোর অর্থাৎ সম্পূর্ণ উপলব্ধিকে কমিউনিকেট করার দায়িত্ব কবিকর্মেরই অন্তর্গত। রবীন্দ্রনাথ কখনো এ-দায়িত্ব এড়ান নি। কিন্তু বোঝানো মানে প্রমাণ করা নয়। সে-ঝুঁকি বৈজ্ঞানিকের, ঐতিহাসিকের, দার্শনিকের। কেউ শেষ অবধি কিছুই তর্কাতীত রূপে প্রমাণ করতে পারেন না— প্রমাণ কাকে বলে সে-বিষয়েই অনেক মত। তবে চেষ্টার ত্রুটি নেই এঁদের। অণোরণীয়ান থেকে মহতো-মহীয়ান যাবতীয় বস্তুর মধ্যে তন্নতন্ন ক’রে খুঁজছেন গহবরেষ্ঠ তথ্য, বিশ্লেষণী ও সংশ্লেষণী, আরোহী ও অবরোহী যুক্তির সোপান বেয়ে উঠছেন প্রত্যক্ষ থেকে অপ্রত্যক্ষে, বিশেষ থেকে সামান্যে, বহু থেকে একে। কবি কিন্তু বলেই খালাস। কোনো প্রকার প্রমাণ উপস্থিত করার গরজ নেই তাঁর, কারণ প্রয়োজন নেই। প্রমাণ না দিয়েই মানিয়ে নেওয়ার অর্থাৎ মনে ধরাবার কৌশল তাঁর জানা আছে। তাকেই বলে কাব্যকৌশল। রবীন্দ্রনাথ যদি ব’লে থাকেন ‘বোঝানোর দায়িত্ব নয় কবিতার’, তবে নিশ্চয়ই এই অর্থেই বলেছিলেন।
নবজাতক-এর “প্রশ্ন” কবিতাটিতে কয়েকটি গদ্যধর্মী পঙক্তি আবিষ্কার ক’রে শঙ্খ ঘোষ রায় দিয়েছেন, ওটা কবিতাই নয়, শেষ লেখা-র ১৩ সংখ্যক কবিতার প্রাক্বচিত পদ্যভাষ্য। একদিন ছিল যখন অকবিজনোচিত শব্দ কবিতায় স্থান দেওয়ার কথা ভাবলে আঁতকে উঠতেন কবিরা। আজ শুধু অকবিজনোচিত নয়, রীতিমতো অভদ্রজনোচিত শব্দের উপর পক্ষপাত জন্মে গেছে কবিদের। কিন্তু কবিতার মধ্যে অকবিজনোচিত পঙক্তি, এমন পঙক্তি যা গদ্য ব’লে ভুল হতে পারে? সর্বনাশ, জাত যাবে যে!
বড় দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, শঙ্খ রবীন্দ্রনাথের শেষ দশ বছরের কবিতাকে এই কারণে প্রায় জাতিচ্যুত ব’লে বিচার দিয়েছেন। এমনি এক বিচার প্রত্যাসন্ন জেনে কি রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই বলেছিলেন, ‘আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন’? শেষ দশ বছরের রচনায় রবীন্দ্রপ্রতিভা এমন অমোঘ, এমন দুঃসাহসিক যে, কোনো শাস্ত্রের নির্দেশ, আচারের বাধা, গণ্ডির বেড়া মেনে চলার প্রয়োজন বোধ করেন নি তিনি; পদ্যে এনেছেন গদ্যের ঋজুতা, গদ্যে জাগিয়েছেন পদ্যের স্পন্দন, বোধিকে করেছেন বেদনাময়, তত্ত্বকে করেছেন প্রাণস্পন্দিত। বেদ-উপনিষদের, বাইবেলের, রুমীর মসনবীর, হাফিজের গজলের শ্রেষ্ঠ অংশ যেমন শুদ্ধ কবিতা হয়েও শুধু কবিতা নয়, রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের রচনার শ্রেষ্ঠ ভাগও তেমনি কবিতার চেয়ে বেশী হয়েও কবিতার চেয়ে কম নয়। শুধু বৈদিক গাথা বা উপনিষদের শ্লোকের সঙ্গে তুলনা করলে অবশ্য ভুল হবে। নিতান্ত মানুষী প্রেমের কবিতা ও রবীন্দ্রনাথের সত্তর থেকে আশি বছর বয়সের রচনাতে গুণে ও গণনায় বিস্ময়কর, অন্য কোনো দশকের সঞ্চিত ভাণ্ডার তাকে সহজে হার মানাতে পারবে ব’লে আমার মনে হয় না।
‘It seems, as one becomes older, that the past has another pattern and ceases to be a mere sequence or even development: the latter a partial fallacy encouraged by superficial notions of evolution, which becomes, in the popular mind, a means of disowning the past.’
উদ্ধৃত বাক্যটি কোনো জনপ্রিয় দার্শনিকের সুলিখিত প্রবন্ধ-সংকলনে পাওয়া যাবে না। গেলে একটুও বেমানান ঠেকত না, তবে পাঠকের চোখে তার গভীর কাব্যিক তাৎপর্য ধরা পড়ত না। টি. এস. এলিয়ট এই জটিল দীর্ঘ গদ্য বাক্যটিকে পাঁচটি পঙক্তিতে ভাগ ক’রে প্রত্যেক পক্তির গোড়ায় বড় অক্ষর বসিয়ে Four Quartets-এর ২৮ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত করেছেন। সেখানেও বেসুর বাজে নি। এমনি আরও গোটা পনেরো গদ্য বাক্য ছড়ানো রয়েছে ঐ নীতিদীর্ঘ কাব্যে। কোনো সুধী পাঠক বা কবিসমালোচক এই ‘অকবিতার অংশগুলিকে নির্মম ভাবে বাদ দিয়ে’ কাব্যখানিকে ‘শুদ্ধ’ করার প্রস্তাব তুলেছেন ব’লে তো শুনি নি।
‘তুমি যাকে বলো সুন্দর, তা বহুরূপী পঞ্চভূতে, চিত্রল উদ্ভিদে কিংবা সূর্যাস্তের বর্ণসমারোহে নেই, আছে শুধু আমারই অহমিকায়’—এই দৃষ্টিসৃষ্টিবাদী দার্শনিক গদ্য বাক্যে কয়েকটি শব্দের স্থান অদলবদল ক’রে বুদ্ধদেব বসু তাকে পদ্য করেছেন। সেটা কিছু নয়, যে-কোনো গদ্য বাক্যকে সামান্য বদলে দিলে তা পদ্য হতে পারে। আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই (কিন্তু কেনই বা আশ্চর্য হব?) যখন লক্ষ্য করি যে এই তত্ত্ববাক্য এবং এমনি আরো কয়েকটি বাক্য একটি সুন্দর কবিতা “মরত্ব-সংগীত”-এর অঙ্গীভূত। যা গদ্যে বলা যায়, যা ছন্দোবদ্ধ গদ্যেই বলা হয়েছে, এমন সমস্ত কথা কবিতা থেকে বাদ না দিলে আমাদের শ্রেষ্ঠ কবিদের রচনা জাতিচ্যুত ব’লে ধার্য হবে—সে অশুভ দিন আশা করি সাহিত্যে কখনো আসবে না। কোনো কবিতায় কয়েকটি গদ্য বা গদ্যধর্মী পঙক্তি থাকলেই তার মূল্যহানি ঘটে না। পঙক্তিগুলি কবির অক্ষমতাপ্রসূত, না বিশেষ অনুষঙ্গে বিশেষ উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য আনা হয়েছে, তারা কবিতাকে পূর্ণতা দান করছে না খণ্ডিত করছে— এটাই বিচার্য। পঙক্তিবিচার কাব্যবিচার নয়।
যে-পঙক্তিগুলিতে শঙ্খ ‘ছন্দ আর মিল ছাড়া’ আর কিছুই খুঁজে পান নি ‘যা কবিতা হিসাবে গ্রাহ্য, অনিবার্য, যা কেবলই গড়া নয়’, পূর্বানুষঙ্গসহ “প্রশ্ন” কবিতার সেই অংশটা উদ্ধৃত করছি:
বহু যুগে বহু দূরে স্মৃতি আর বিস্মৃতি বিস্তার,
যেন বাষ্পপরিবেশ তার
ইতিহাসে পিণ্ড বাঁধে রূপে-রূপান্তরে
‘আমি’ উঠে ঘনাইয়া কেন্দ্র-মাঝে অসংখ্য বৎসরে।
সুখদুঃখ ভালোমন্দ রাগদ্বেষ ভক্তি সখ্য স্নেহ
এই নিয়ে গড়া তার সত্তাদেহ;
এরা সব উপাদান ধাক্কা পায়, হয় আবর্তিত,
পুঞ্জিত, নর্তিত।
এরা সত্য কী যে
বুঝি নাই নিজে।
বলি তারে মায়া–
যাই বলি শব্দ সেটা, অব্যক্ত অর্থের উপচ্ছায়া!
এই ক’টি পঙক্তিতে রবীন্দ্রনাথ বহু দার্শনিক মত ও জিজ্ঞাসা সংহত করেছেন; সে-সব কথা গদ্যে বুঝিয়ে বলতে গেলে (যেভাবে বুঝিয়ে বলা গেছে সংগত ও প্রত্যাশিত) শতাধিক পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ রচনা করতে হয়। ‘আমি’র রহস্য সম্পর্কে উপনিষদকার এবং সক্রেটিসের সময় থেকে জিজ্ঞাসা ও গবেষণার শেষ নেই; কত মতবাদ গ’ড়ে উঠেছে ও ভেঙে গেছে বা ঈষৎ ভগ্ন দশায় এখনও টিকে আছে, মনের কত দিক, কত গ্রন্থি, কত স্তর উদ্ঘাটিত হয়েছে, অথচ কোনো সন্দেহ নেই যে অনুদঘাটিত সত্যের তা ভগ্নাংশমাত্র। জানা ও আধোজানা সব কথা বলার পরও আমাদের প্রত্যয় আরও দৃঢ় হয় যে কিছুই বলা হয় নি। সবচেয়ে সত্য যে-আমি, জ্ঞাতা বা সাক্ষী, ‘মনেরও মন’, তার সম্বন্ধে যে বলার মতো কিছু বলা হয় নি শুধু তাই নয়, কিছু বলা সম্ভবই নয়; সে-আমি আক্ষরিক অর্থে অনির্বচনীয়। আরও একটা কথা এবং এ-কবিতাটি বুঝতে হলে সেটাই বড় কথা। মনের অনেক কিছু জানা নেই যেমন, তেমনি অণুপরমাণুর, নক্ষত্র-নীহারিকারও অনেক কিছু জানা নেই। কিন্তু মস্ত প্রভেদ এই যে আত্মা সম্বন্ধে যখন কিছু বলি বা ভাবি তখন অজানা অংশ একেবারে বাদ যায় না: ‘আমি’ যে আমিই, তার চেয়ে নিকট, তার চেয়ে অন্তরঙ্গ, তার চেয়ে সত্য তো আর কিছু নেই। সুতরাং যা বলতে বা ভাবতেও পারি না, ‘আমি’র সেই বিরাট অব্যক্ত অর্থ যেন ছায়ার ছায়া হয়ে আমাদের ব্যঞ্জনা ও ভাবনার সঙ্গে লেগে থাকে। আমার তো মনে হয় “আমি” উঠে ঘনাইয়া কেন্দ্র মাঝে অসংখ্য বৎসরে’ কিংবা ‘যাই বলি শব্দ সেটা, অব্যক্ত অর্থের উপচ্ছায়া’— এমন অর্থঘন পঙক্তি ফোর কোয়ার্টেস-এর মতো কবিতায়ও দুর্লভ। আর যা-ই হোক, এই বাক্যগুলি বিশুদ্ধ গদ্য নয়, কারণ বিশুদ্ধ গদ্যে ঐ বক্তব্য একটি মাত্র পঙক্তিতে ব্যক্ত করা যায় না।
অবশ্য এগুলি বিশুদ্ধ কবিতার পঙক্তিও নয়— সেই অর্থে যে-অর্থে খেয়া বা গীতাঞ্জলির পঙক্তি বিশুদ্ধ কবিতা। সে-রকম কবিতা তো রবীন্দ্রনাথ কম লেখেন নি। শেষের কয়েকটি কাব্য-গ্রন্থে তিনি অন্য পথ কাটতে চেয়েছেন, কেটেছেন। একই মানদণ্ডে দুই বিভিন্ন কাব্যমার্গের বিচার সংগত নয়। এটাও ভেবে দেখা দরকার যে এই আপাত গদ্য বাক্যগুলিকে আরও আস্থালু করে উপমা-উৎপ্রেক্ষায় ঢেকে দিয়ে বলা কি রবীন্দ্রনাথের মতো কবির পক্ষে একটুও শক্ত ছিল? বরঞ্চ সেই অভ্যাস ও প্রলোভন ত্যাগ করতে হয়েছে কষ্ট করে, বহু যত্নে গদ্যের ঋজুতা ও অপরোক্ষতা তিনি এনেছেন শেষ পর্বের অনেক কবিতায়, কারণ এ-কবিতাগুলি ভিন্ন জাতের, ভিন্ন উপলব্ধি-সঞ্জাত।
নবজাতক-এর সূচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ভিতর থেকে মনন-জাত অভিজ্ঞতা এদের পেয়ে বসেছে।’ এই ‘মননজাত অভিজ্ঞতা’ আধুনিক বিজ্ঞান —পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান— থেকে লব্ধ। এমনতর বৈজ্ঞানিক মনন যে-হৃদয়াবেগ জাগিয়েছিল তাকে নিয়েই কবিতা। কিন্তু সে-কবিতা থেকে মননকে তো একেবারে ছাঁটাই করা যাবে না। আর মননকে ঠাঁই দিতে গেলে তার বাহন সেই ভাষা যা গদ্যের খুব কাছাকাছি তাকে খিড়কি দরজার ফাঁক দিয়ে কখনো ছন্দে সজ্জিত করে কখনো বা বিনা সাজে ঘরে ঢুকতে দিতে হবে। অথচ সেই গদ্যপ্রতিম পঙক্তিগুলিকে ধারণ করে আছে একটি নিঃসন্দিগ্ধ কাব্যানুভূতি, সমগ্র কবিতায় যা অভিব্যক্ত।
নবজাতক-এ রবীন্দ্রনাথ কবিতার পরিধিকে বিস্তৃত করেছেন, পা বাড়িয়েছেন বিজ্ঞানের খাসমহলে। এ-ধরনের মননজাত অভিজ্ঞতায় যাদের অরুচি, রবীন্দ্রকাব্যের শেষ পর্ব তাঁদের কাছে স্বভাবতই অপাঙক্তেয় ঠেকবে। তা নিয়ে কোনো পক্ষের নালিশ না থাকাই ভালো। ভিন্ন কারণে সোনার তরী ও চিত্রার অভিজ্ঞতাও একদিন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মতো সুকবির কাছে অনধিগম্য ছিল, কাজেই ঐ কাব্যগুলি হয়েছিল তাঁর শাণিত বিদ্রূপের লক্ষ্য।
.
২
প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে—
কে তুমি।
মেলে নি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেল,
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিমসাগরতীরে,
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়—
কে তুমি।
পেল না উত্তর। (শেষ লেখা)
উদ্ধৃত কবিতার প্রশ্ন (‘কে তুমি’) কার উদ্দেশে সেটা খুব স্পষ্ট নয়। প্রশ্ন করেছিল ‘প্রথম দিনের সূর্য’। সূর্যকে জ্ঞানস্বরূপ চৈতন্যের প্রতীক ধরা যেতে পারে, ধরা হয়েই থাকে; সব দেশেই জ্ঞানের উপমান আলো। প্রশ্ন করা হয়েছিল পরম সত্তাকেই, কবিতাটি যদি এইভাবে বুঝি তা হলে নূতন আবির্ভাবের মানে করতে হয়— যখন পরম সত্তা প্রথম আবির্ভূত হ’ল মানবচৈতন্যে। প্রশ্নের কি কোনো উত্তর নেই? কয়েকটি উত্তর তো কবিতার মধ্যেই দেওয়া হ’ল। পরম সত্তার আবির্ভাব ঘটে এবং অনাবির্ভূত বা আমাদের অজ্ঞাত রূপেও তা সত্য; বারে বারে আবির্ভাব ঘটে, নইলে ‘নূতন আবির্ভাব’ বলা হ’ল কেন? মানবচৈতন্য নির্বাপিত হলেও (‘দিবসের শেষ সূর্য’) পরম সত্তার বিনাশ নেই। এতগুলি উত্তর পাওয়ার পরও ‘মেলে নি উত্তর’ বলা এবং তার পুনরুক্তি ‘পেল না উত্তর’ কি সংগত? এর চেয়ে বেশী আর কী উত্তর প্রত্যাশিত ছিল, আর কী উত্তর দেওয়া হয়েছে উপনিষদে— পরম সত্তা ও সূর্যপ্রতিম চৈতন্যের ধারণা যেখান থেকে গৃহীত? আর-একটি উত্তর অবশ্য পাওয়া যায় সেখানে। পরম সত্তা উপনিষদের ভাষাতেই উত্তর করতে পারতেন— আমি তোমার মধ্যেও সত্য, অতএব নিজেকে জানো, (যো অসাবসৌ পুরুষঃ সোহমস্মি, আত্মানং বিদ্ধি, ইত্যাদি)। এই উত্তরকে রবীন্দ্রনাথ আজীবন সর্বান্তঃকরণে সত্য ব’লে জেনেছেন, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে হঠাৎ তার প্রতি একান্ত বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন এমন অনুমানের সমর্থন পাই না তাঁর শেষ বয়সের কাব্যে। না, কবিতাটিতে ব্রহ্ম-সংক্রান্ত কোনো জিজ্ঞাসা বা প্রত্যাখ্যান নেই— এ-বিষয়ে আমি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে একমত।
তবে কি প্রশ্ন করা হ’ল নূতন আবির্ভাবকেই— ‘আবির্ভাবে’ অর্থ আবির্ভাব-কালে নয়, আবির্ভাবকে? সত্তা এবং আবির্ভাব, reality এবং appearance, এই দ্বৈতের কথা তোলা হয়েছে তা হলে। নামরূপময় জড় ও শক্তির লীলাস্বরূপ প্রত্যক্ষ জগৎকেই (এবং তার অঙ্গীভূত মানবজীবনকে) কবি জিজ্ঞাসা করছেন— কে তুমি। প্রতীয়মান জগতের অনেকটা পরিচয় পাই আমরা প্রত্যক্ষ জ্ঞানে এবং সাধারণ মানুষের অনুমানে; সুষ্ঠুতর, পূর্ণতর পরিচয় পাই বিজ্ঞানে— জড়, জীব ও মনঃ বিজ্ঞানে। এ-পরিচয় পূর্ণাঙ্গ নয়, অভ্রান্ত নয়, সংশোধনীয়, আপন পরিধি ও গভীরতা যুগে যুগে বাড়িয়ে চললেও কোনোদিন সম্পূর্ণ বা সংশয়রহিত হবে না— এসব তো বিজ্ঞানের এবং দর্শনের জীর্ণতম উক্তি। রবীন্দ্রনাথ কি তারই পুনরুক্তি করতে চেয়েছেন, ‘মেলে নি উত্তর’ বলে? এই স্ফুলিঙ্গের মতো দীপ্তিমান কবিতার এমন চর্বিত তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আমার মন সায় দেয় না।
একটি কথা এ-কবিতার ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে অনেকে লক্ষ্য করেন নি বোধহয়। আলোচ্য প্রশ্ন ‘কী তুমি’ বা ‘কেন তুমি’ নয়, ‘কে তুমি’। ‘কী তুমি’ প্রশ্নটাতে জানতে চাওয়া হয় তোমার যাবতীয় গুণ ও ধর্ম, হেতু ও নিমিত্ত, আকার ও আয়তন, গঠনের উপাদান ও প্রণালী, ইত্যাদি। এ-প্রশ্ন সমগ্র বিশ্বজগতের উদ্দেশে তোলা যায়, দার্শনিকেরা তুলেই থাকেন, কবির মনেও উঠতে পারে অনায়াসে। কিন্তু কবিতায় এ-প্রশ্ন কেউ কাউকে করে নি। কবিতার প্রশ্নটি হ’ল ‘কে তুমি’। প্রশ্নটি সনাক্তের, আইডেন্টিটির— এতগুলো লোকের মধ্যে কোন্ বিশেষ লোকটি তুমি, এমন কী পরিচয় আছে তোমার যাতে অন্য দশজনের মধ্যে তোমাকে, একমাত্র তোমাকেই চেনা যায়? এ প্রশ্ন সমগ্র বিশ্বসত্তাকে করার কোনো মানে হয় না। করা যায় ব্যক্তিবিশেষকে; ব্যক্তি-বিশেষকেই করা হয়েছে কবিতাটিতে। সে-ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ছয়-সাত বছরের বালক খুব ভোরে উঠে জোড়াসাঁকোর বাড়ির বাগানে গিয়ে সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় বসে থাকত। সত্তার নূতন আবির্ভাব তখন বালকের মধ্যে, তার নবোন্মেষিত, উৎসুক, পিপাসিত চৈতন্যের মধ্যে। ব’সে ব’সে সে আনমনা হয়ে কত কী ভাবত, হঠাৎ এক সময়ে টের পেত নারকেল গাছের সারির উপর থেকে প্রথম দিনের সূর্য (চিত্তোন্মেষের দিক থেকে এই দিনগুলি তার জীবনে প্রথম) তার বালক মিতাটিকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করছে— কে তুমি? দেখে এসেছি লক্ষ লক্ষ ছেলে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে আছে, দাওয়ায় ব’সে গল্প করছে, উঠোনে ছুটোছুটি করছে। তোমার মধ্যে এমন কী আছে যাতে ক’রে এই লক্ষ ছেলের মধ্যে তোমাকে আলাদা ক’রে তুমি ব’লে চিনব? বালক রবি নিরুত্তর। কী তার আছে যে তার মিতা তাকে চিনে রাখবে?[১]
তার পরে পঁচাত্তর বছর কেটে গেল। কবির জীবনে অস্ত-গোধূলি। ডুবতে ডুবতে সেই প্রথম দিনের সূর্য আবার শেষ বারের মতো প্রশ্ন শুধালো, ‘কে তুমি?’ এই দীর্ঘ জীবনের অবিরাম অক্লান্ত সাধনায় হয়তো কিছু কাজের মতো কাজ করেছে সেই বালক, কিছু দিয়েছে পৃথিবীকে, চলতি কালের এমন কোনো বদল ঘটিয়েছে যা তাকে মহাকালের দরবারে (এবং মহাকালের প্রতীক নিত্য নব উদীয়মান ও অস্তমান রবির কাছে) চিনিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু কোন্ ভরসায় এ-কথা নিজের মুখে উচ্চারণ করবে সে; তার এই কীর্তিস্তম্ভ আজ যত উঁচুই দেখাক, তা কি সত্যি মহাকালে গণ্য হবার, সযত্নে রক্ষিত হবার, যোগ্য? চুপ ক’রে রইল বৃদ্ধবয়সে উপনীত সেই বালক। জীবনান্তের অন্তিম সূর্য ‘পেল না উত্তর’।
.
প্রশ্ন
চতুর্দিকে বহ্নিবাষ্প শূন্যাকাশে ধায় বহুদূরে
কেন্দ্রে তার তারাপুঞ্জ মহাকাল-চক্রপথে ঘুরে।
কত বেগ, কত তাপ, কত ভার, কত আয়তন,
সূক্ষ্ম অঙ্কে করেছে গণন
পণ্ডিতেরা, লক্ষ কোটি ক্রোশ দূর হতে
দুর্লক্ষ্য আলোতে
আপনার পানে চাই,
লেশমাত্র পরিচয় নাই।
এ কি কোনো দৃশ্যাতীত জ্যোতি?
কোন্ অজানারে ঘিরি এই অজানার নিত্য গতি?
বহু যুগে বহু দূরে স্মৃতি আর বিস্মৃতি-বিস্তার,
যেন বাষ্পপরিবেশ তার
ইতিহাসে পিণ্ড বাঁধে রূপে রূপান্তরে।
‘আমি’ উঠে ঘনাইয়া কেন্দ্র-মাঝে অসংখ্য বৎসরে।
সুখদুঃখ ভালোমন্দ রাগদ্বেষ ভক্তি সখ্য স্নেহ
এই নিয়ে গড়া তার সত্তাদেহ;
এরা সব উপাদান ধাক্কা পায়, হয় আবর্তিত,
পুঞ্জিত, নর্তিত।
এরা সত্য কী যে
বুঝি নাই নিজে।
বলি তারে মায়া—
যাই বলি শব্দ সেটা, অব্যক্ত অর্থের উপচ্ছায়া।
তার পরে ভাবি,
এ অজ্ঞেয় সৃষ্টি ‘আমি’ অজ্ঞেয় অদৃশ্যে যাবে নাবি।
অসীম রহস্য নিয়ে মুহূর্তের নিরর্থকতায়
লুপ্ত হবে নানারঙা জলবিম্ব প্রায়,
অসমাপ্ত রেখে যাবে তার শেষকথা
আত্মার বারতা।
তখনো সুদূরে ঐ নক্ষত্রের দূত
ছুটাবে অসংখ্য তার দীপ্ত পরমাণুর বিদ্যুৎ
অপার আকাশ মাঝে,
কিছুই জানি না কোন্ কাজে। (নবজাতক)
“প্রথম দিনের সূর্য” কবিতাটিতে সৃষ্টি বা স্রষ্টা বিষয়ে কোনো অজ্ঞেয়বাদ ব্যক্ত হয় নি, ব্যক্ত হয়েছে একজন ব্যক্তির অসম্পূর্ণ পরিচয়ের, অসমাপ্ত আত্মস্বরূপ-প্রতিষ্ঠার বেদনা। অবশ্য সেই একজনকে সর্বজনের প্রতিভূ মনে করা যেতে পারে, কিন্তু তেমন সার্বজনীনতার আভাস তো শিল্পমাত্রের পশ্চাৎপটে কম্পমান। কবিতাটি ব্যক্তিবিশেষের পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত। পক্ষান্তরে, নবজাতক-এর “প্রশ্ন” কবিতার পরিপ্রেক্ষিত আক্ষরিক এবং প্রত্যক্ষভাবে সার্বভৌম; একটি বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক চিন্তাকে কেন্দ্র ক’রেই তার ভাবলোক গ’ড়ে উঠেছে। দুটি কবিতার কেন্দ্রে আছে একটি প্রশ্ন, কিন্তু প্রশ্ন, প্রশ্নকর্তা ও প্রশ্নের বিষয় ভিন্ন। দ্বিতীয় কবিতায় প্রশ্ন ‘কে’ নয়, ‘কেন’। প্রশ্নকর্তা স্বয়ং কবি এবং আমরা সবাই। প্রশ্নের বিষয় নক্ষত্রজগৎ প্রথম স্তবকে, দ্বিতীয় স্তবকে মানবাত্মা। ‘কেন’ শব্দটি অবশ্য ব্যবহার করা হয় নি, ব্যবহার করা হয়েছে তার প্রতিশব্দ ‘কোন্ কাজে’, দ্বিতীয় স্তবকের উপান্তে। প্রথম স্তবকের শেষে প্রশ্নটি অনুচ্চারিত রয়েছে। পরের স্তবকটি এই অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর বহন করে, এবং সেই সঙ্গে অন্য প্রশ্নটি জাগিয়ে তোলে।
কেন এই তারাপুঞ্জ শূন্যাকাশে মহাকালচক্রপথে যুগের পর যুগ ঘুরছে; এত বেগ, এত তাপ, এত আলো কিসের জন্য? তার উত্তর— কোটি কোটি বৎসরের অসংখ্য ব্যর্থ প্রয়াস, ভুল-ভ্রান্তি ও বিচ্যুতির পর মানবাত্মাকে জন্ম দেবে ব’লেই এত আয়োজন ছিল। কিন্তু মানুষের ভিতর দিয়েও তো চলার শেষ নেই, তার শারীরিক ও মানসিক উপাদানগুলিও অবিরত ‘ধাক্কা পায়, হয় আবর্তিত, পুঞ্জিত, নর্তিত’। প্রশ্নের উত্তর যে এখনো অসমাপ্ত। মানুষ তার পূর্ববর্তী জান্তব স্তর থেকে সামান্যই উপরে উঠেছে, আরো অনেক ঊর্ধ্বে উঠতে হবে তাকে, হয়তো দেবতার সঙ্গে একাসনে বসবে সে একদিন। কিন্তু মানুষ গ্রহ-নক্ষত্রের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষীণায়ু, তার আত্মার বার্তা শেষ না হতেই, বলতে গেলে শুরু না হতেই, সে জলবিম্বের মতো লুপ্ত হয়ে যায়। তবে কেন এই নক্ষত্রলোক এবং তার ভিতর থেকে মানবাত্মার জন্ম? এই আর্ত প্রশ্নের ‘ধ্বনিবে না কোনোই উত্তর’।
একটি উত্তর অবশ্য রবীন্দ্রনাথের ভালোই জানা আছে, মানুষের ধর্ম-এ তার উল্লেখ রয়েছে। মানুষ অপূর্ণ, কিন্তু পূর্ণতার দিকে এগুচ্ছে অতি ধীর পদক্ষেপে। পঞ্চাশ হাজার বৎসর পূর্বে সে জন্তুর যত কাছাকাছি ছিল আজও সেখানেই আছে— একথা সত্য নয়। পঞ্চাশ হাজার বৎসর পরে দেবত্ব লাভ না করলেও দেবতার আরও কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছবে ভরসা করা যায়। তবে জীবজগতে বিবর্তন যেমন আপনিই ঘটে মানুষের বিবর্তন তেমন স্বতঃস্ফূর্ত বা অবধারিত নয়; তার জন্য তাকে অজস্র বিঘ্নের মধ্যে অবিরাম তপস্যা করতে হবে হাজার হাজার বছর ধরে, তবেই সে কয়েক ধাপ উপরে উঠতে পারবে। যদি শ্রেয়কে ছেড়ে প্রেয়কে বরণ করে তা হলে সে মনুষ্যত্বের প্রকৃত অর্থ থেকে পতিত হবে। মানুষের উন্নতির পথ বিপদ-সংকুল, ক্ষুরধার। কিন্তু এই বিপদের সম্মুখীন না হলে তার আত্মার বার্তা অভিব্যক্ত হবে কী ক’রে? ইত্যাদি।
এই উত্তর আজ আর রবীন্দ্রনাথকে তৃপ্তি দিচ্ছে না। মহামানবের হয়তো ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই; কিন্তু যে-কোটি কোটি ব্যক্তিমানুষ ইতিহাসের বন্ধুর পথে তাদের আত্মার বার্তা সামান্যতম উদ্বোধিত করতে না করতে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল, মানবিক অস্তিত্বের কতটুকু মূল্য তাদের কাছে সত্য হ’ল? বিবর্তনের রথ কি তাদের প্রত্যেকের বুকের উপর দিয়ে চ’লে গেল না? এই অসংখ্য, অপূর্ণ, চিরতরে বিভ্রংশ ব্যক্তিস্বরূপের বেদনাই কবিকে ব্যথিত করেছে এ-কবিতায়। যে-উত্তরে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ (শুধু ভবিষ্যৎ নয়) প্রত্যেকটি মানবাত্মার সার্থকতার বার্তা শোনা যাবে, এই মহাশূন্যে তেমন উত্তর কোনো দিক থেকে উচ্চারিত হবে না।
প্রথম স্তবকের জ্যোতির্বিজ্ঞানী পরিপ্রেক্ষিত অকস্মাৎ বদলে যায় দ্বিতীয় স্তবকে। এই পটপরিবর্তনের আকস্মিকতা দেখানো হয়েছে একটি অপ্রত্যাশিত ছোট সরল বাক্যে— ‘আপনার পানে চাই’। দ্বিতীয় স্তবকে চলল একটি তুলনা দুই অজানার নিত্য গতির মধ্যে— বহ্নিবাষ্প ঘনীভূত হয়ে তারাপুঞ্জের উদ্ভব ঘটে যেমন, ইতিহাসের বাষ্প-পরিবেশ থেকে ‘আমি’-পুঞ্জ তেমনি ঘনিয়ে ওঠে। তার পরে এই ‘আমি’র রহস্য নিয়ে কয়েকটি পঙক্তি; জটিল তার তত্ত্ব ধ্বনিগম্ভীর ভাষায় আভাসিত। আর একবার আমরা চমকে উঠি একটি অত্যন্ত আটপৌরে বাক্যে এসে, একটি বিষণ্ণ ক্লান্ত নিরুত্তর প্রশ্নে— “কিছুই জানি না কোন্ কাজে’। দ্রুত উচ্চারিত যুক্তাক্ষরবহুল পঙক্তিগুলির পরে এই অন্তরঙ্গ পঙক্তিটি দীর্ঘলয়ে খাটো গলায় পড়া দরকার। ‘তখনো সুদূরে ঐ নক্ষত্রের দূত’-এর একটি অব্যয়পদ ‘তখনো’-র উপর সমস্ত কবিতার ভার এসে পড়েছে। আজ জ্যোতির্বিজ্ঞান নাক্ষত্র-জগতের যে অত্যাশ্চর্য আলোকচিত্রটি আমাদের সামনে উদ্ঘাটিত করেছে তা সবই কালো হয়ে যায় যখন ভাবি যে প্রকৃতির অনন্ত শক্তিলীলার মধ্যে কোথাও কোনো ব্যবস্থা, কোনো ভরসা নেই, এই অজ্ঞেয় সৃষ্টি ‘আমি’কে তার ‘মুহূর্তের নিরর্থকতা’ থেকে বাঁচাবার।
মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ বলাকার ১৯ সংখ্যক কবিতার গদ্য-ব্যাখ্যায় বলেছিলেন: ‘অথচ কেন এই পৃথিবী স্যফোটা ফুলের মতো আমার সামনে রয়েছে? এই সৌন্দর্যের এম্ফ্যাসিসের মানেই হচ্ছে যে মৃত্যুই সর্বগ্রাসী অ্যাবিস্ নয়।’ কিন্তু নবজাতক-এ দেখি পূর্বের ভরসা তাঁর ভেঙে গেছে। পৃথিবীর সৌন্দর্যের তো কোনো ক্ষয় হয় নি, অথচ সেই সৌন্দর্যকে আজ আর মানুষের অবশ্যম্ভাবী সার্থকতার গ্যারান্টি মনে করতে পারছেন না রবীন্দ্রনাথ। উলটো প্রশ্ন করছেন: মানুষই যদি মুহূর্তের নিরর্থকতায় লুপ্ত হয় তবে নিখিলের এত আলো— ‘অসংখ্য তার পরমাণুর বিদ্যুৎ’— কোন্ কাজে লাগবে?
কয়েক বছর আগে লেখা শেষ সপ্তক-এও মানবাত্মার চূড়ান্ত বিনাশ রবীন্দ্রনাথের চোখে অবিশ্বাস্য ঠেকেছে; মনে সন্দেহ উপস্থিত হলেও সে-সন্দেহকে তিনি শক্ত হাতে উন্মুলিত করেছেন এই ব’লে যে সৃষ্টির তলে তলে এত বড় ছেলেমানুষির অস্তিত্ব ভাবাই যায় না।
এই অপরিণত অপ্রকাশিত আমি–
এ কার জন্যে, এ কিসের জন্যে।
যা নিয়ে এল কত সূচনা, কত ব্যঞ্জনা,
বহু বেদনায় বাঁধা হতে চলল যার ভাষা,
পৌঁছল না যা বাণীতে,
তার ধ্বংস হবে অকস্মাৎ নিরর্থকতার তলে—
সইবে না সৃষ্টির এ ছেলেমানুষি।
কিন্তু নবজাতক-এর কবি নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইছেন, প্রস্তুত করতে পেরেছেন, সৃষ্টির এই নির্দয় ছেলেমানুষিকে মেনে নেওয়ার জন্য; যা ‘সইবে না’, তাও যে সইতে হবে। “প্রশ্ন” কবিতাটির প্রশ্নে বেদনা প্রোজ্জ্বল কিন্তু আশার স্ফুলিঙ্গটুকুও দেখা যাচ্ছে না। যে-নৈরাশ্যের কুয়াশা মানসী থেকে কল্পনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তারই কালিমা আরও গাঢ় আরও নিশ্ছিদ্র হয়েছে অন্তিম পর্বের কাব্যে। তখন তাঁর মনে হয়েছিল: ‘এ আর্তস্বরের কাছে রহিবে অটুট / চৌদিকের চির-নীরবতা’। সে রোম্যান্টিক হতাশায় আজ ট্র্যাজিডির সুর লেগেছে, চৌদিকের চির-নীরবতা আরো নিষ্ঠুর শোনাচ্ছে।
প্রথম পর্বের পরিব্যাপ্ত বিষণ্ণতা থেকে নিষ্ক্রমণের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিতে ‘পরানসখা’র অভিসারে বেরিয়ে পড়ে। যদিও ঝড়ের রাতে গভীর কোন্ অন্ধকারে আকাশ কেঁদে উঠছিল, বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছিল না, তবু অন্তরে প্রত্যয় স্থির ছিল, যিনি ‘আলোয় আলোকময়’ তিনি গহন অরণ্য পার হয়ে আসবেনই, আসছেনই। সে উপশান্ত চিত্তের আলোক-বর্তিকা ঈষৎ কেঁপে উঠেছিল যখন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় প্রথম দেখলেন দুঃখের ‘অভ্রভেদী বিরাট স্বরূপ’। ক্রমশ রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পারলেন যে এ-আলো তাঁর অন্তরের আলো নয়, বাইরে থেকে জ্বালানো হয়েছিল পূজার মন্দিরে।
শুনেছি যার নাম মুখে মুখে,
পড়েছি যার কথা নানা ভাষায় নানা শাস্ত্রে,
কল্পনা করেছি তাঁকেই বুঝি মানি।
তিনিই আমার বরণীয় প্রমাণ করব ব’লে
পূজার প্রয়াস করেছি নিরন্তর।
আজ দেখেছি প্রমাণ হয় নি আমার জীবনে।
কেননা, আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন। (পত্রপুট— “পনেরো”)
এই নিভন্ত আলোর দিকে ইঙ্গিত করেই কি ব্রাত্য কবি জীবনের শেষ কবিতায় প্রকৃতিকে সম্বোধন ক’রে বললেন, ‘মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে / সরল জীবনে’? কিন্তু ঐতিহ্যবাহিত শাস্ত্রনির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসের পথ অন্ধকার হয়ে গেলেও নক্ষত্রখচিত আকাশ তাঁকে ‘আপন আলোকে ধৌত অন্তরের যে-পথ দেখাল ‘সে যে চিরস্বচ্ছ’। সেই পথ বেয়ে তিনি চলে গেলেন আট দিন পর, বাইশে শ্রাবণে।
.
১. ‘কে তুমি’ প্রশ্ন অবলম্বন ক’রে রবীন্দ্রনাথ আর-একটি কবিতা লিখেছেন— শেষ সপ্তক-এর শেষ কবিতা (৪৬ সংখ্যক)। কবিতাটি খুব রসোত্তীর্ণ হয় নি, কিন্তু ‘কে তুমি’ প্রশ্নটি যে রবীন্দ্রনাথের মনে বহু দিন থেকে আন্দোলিত ছিল এবং ঠিক কী অর্থ বহন করত তা এখান থেকে বোঝা যাবে।
২. ‘আমরা বাইরের শাস্ত্র থেকে যে-ধর্ম পাই সে কখনই আমার ধর্ম হয়ে ওঠে না। তার সঙ্গে কেবলমাত্র একটি অভ্যাসের যোগ জন্মে। ধর্মকে নিজের মধ্যে উদ্ভূত ক’রে তোলাই মানুষের চিরজীবনের সাধনা। চরম বেদনায় তাকে জন্মদান করতে হয়, নাড়ির শোণিত দিয়ে তাকে প্রাণদান করতে চাই, তার পরে জীবনে সুখ পাই আর না পাই, আনন্দে চরিতার্থ হয়ে মরতে পারি।’— আত্মপরিচয়
***
