অভিরামায়ণ – ১০০

১০০

সুতরাং চামড়া তোলার সাধু প্রস্তাব,
এবং হাড়গোড় ভাঙার পরিকল্পনা,
বুঝে সমবেত জনতার মনোভাব,
দুঃখ হলেও কার্যকর করা গেল না।
কিন্তু বিচার তো একটা করতে হয়,
আসামি যখন আনীত কাঠগড়ায়,
তখন সেখানে রাধিকাকে আনা হয়,
রবিকে দিয়ে ওকে সকলে মা ডাকায়।
ঈশ্বর মঙ্গলময় যাই বা করুন,
সাধুচরণ জেঠা হয়েছেন অখুশি
পেয়েছেন তিনি নাকের বদলে নরুণ,
বলেছেন অকৃতজ্ঞ সব প্রতিবেশী।
মাথা তোর যাক ল্যাজ বাঁচুক আমার,
লাগুক রোদ পিঠে বাঁচুক রং জামার।
১০১

ধনেশকাকা বাড়ি এলো পরে কী হল,
কিই বা জুটল ওই রাধিকার কপালে,
এসব কি আলোচনার বিষয় হল,
কী হয় দশটা ছাগল অকালে ম’লে।
কাকা রাধিকাকে কোনো কিছু বলেননি,
বরং একটু আদর তাকে করেছেন,
বলেছেন মা-রে কিছু মনে করিসনি,
তাঁর ইচ্ছা তিনি সব কিছু করেছেন।
এর পর বোধ হয় মাস দুই কাল,
ধনেশকাকা প্রাণটা রেখেছিলেন,
হঠাৎ একদিন তখনও সকাল,
রাধুর মা সশব্দে কেঁদে উঠেছিলেন।
হাসপাতালের বেডে রোগী বসে খায়,
বিড়ি মুখে মড়া টেনে সালাম গান গায়।
১০২

শ্মশান থেকে ফিরে কাকির গায়ে জ্বর,
চোখ লাল বমি বমি অসংলগ্ন কথা,
সারারাত তাঁর ছটফট ধড়ফড়,
ভোরবেলা সব শেষ কাত হল মাথা।
রাধিকা কাঁদেনি মূর্তিপ্রায় বসেছিল,
পাড়ার লোক দাঁড়ানো সকলে উঠানে,
জেঠা সাধুচরণ কী জানি বলেছিল,
ফণা ধরে উঠল পিসি পদ্মা ততক্ষণে।
শোনো সাধুচরণ মেয়েটা তো আভাগী
মা-বাপ দু-জনেই তো ওকে ছেড়ে গেল,
মেয়েটা অবলা কেউ মনে করো যদি,
তার ভালো হবে না একথা বুঝে ফেলো।
কার কখন কী হয় বোঝা বড়ো দায়,
রাজা হবে রামচন্দ্র দেখো বনে যায়।
১০৩

সেই থেকে পদিপিসি রাধুর বাপ-মা,
মেয়েকে আগলে রাখা তার হল কাজ,
একটা কথা কেউ বলতে পারবে না,
ক্যানক্যানিয়ে উঠে পিসির আওয়াজ।
সেই দু-মাসেই রাধু সাবালিকা হয়,
রবির ঘটনা আর মা বাপের অন্ত,
তার সত্তার মধ্যে ঘটে স্তব্ধ প্রলয়,
বিশ্রী ভাবে দোল খায় আত্মাটা পর্যন্ত।
পদি পিসির ভয়ে কেউ তো এগুল না,
‘রবির মা’ নামটা বহাল গেল হয়ে,
কোনো কিছু কাজ রাধুর আটকাল না,
বিশেষ নিজেদের কাজ হয় রাধুকে দিয়ে।
আপনার বিষয়টা পাগলেও বোঝে,
বৃষ্টি হলে আশ্রয় জানোয়ারেও খোঁজে।
১০৪

তারপর কত মাঘ আষাঢ় যে গেছে,
শীত কুয়াশা আর ভয়ংকর বৃষ্টিতে,
বটিটা মাথায় নিয়ে রাধিকা শুয়েছে,
কতজন বসতে চেয়েছে কাছটিতে।
ধীরে ধীরে রবির মা আসন পেতেছে,
তোয়াক্কাও করেনিকো জোয়ান মদ্দর,
সকলের সাহায্যে সে আগে আগে গেছে,
ভালো চিনেছে কে সভ্য আর ভদ্দর।
সংসারে গাঁটে গাঁটে আছে পাপ জমা,
তা বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই,
বিপদ-আপদ আছে চারিদিকে জমা,
লাফ দিয়ে ঘাড়ে পড়ে এক নিমেষেই।
বেড়াতে যায় যদি বাঘের পিঠে চড়ে,
ফিরে সে আসবে তবে তার পেটে করে।
১০৫

আমাদের বাড়ির একেবারে সীমানায়,
একটা বেশ বড়ো কাঁঠালের গাছ ছিল,
বুদ্ধু গাছ আইন-টাইন না জানায়,
বিনা উদবেগে দুই বাড়িতে ছড়িয়েছিল।
অগুনতি কাঁঠাল হত সেই গাছটায়,
তবে কাঁঠাল গাছ সকলেরই ছিল,
কাঁঠাল কেনার কে-ই ছিল দেশটায়,
কত যে কাঁঠাল গোরু-ছাগলে খাচ্ছিল।
কিন্তু ওই গাছটার কাঁঠালগুলি পেড়ে,
প্রায় ওজন করে দু-ভাগ করা হত
একটা কাঁঠাল যদি বেশি হত পরে,
কোষগুলি দুই ভাগে ভাগ করে নিত।
কতটা জমি লাগে ভাই একজনার,
সাড়ে তিন হাত, সেটা মনে থাকে কার?
১০৬

লোকে বলে শহরে লোকের প্রাণ নেই,
বিপদে-আপদে কেউ কাউকে দেখে না,
প্রাণ আছে গ্রামের হাওয়া বাতাসেই,
সেখানে একে অন্যকে না দেখে পারে না।
শোনা যায় বিলাত দেশটা স্বর্ণময়,
সোনার চুল মেম আর সাহেবদের,
নরম সোনা বিলাতি গাভির গোময়,
সোনার স্বভাব ওদেশের লোকদের।
এসব কিছুই সত্যি নয় গিয়ে দেখো,
শ্যামলারা স্যামুয়েল হয়ে হোথা আছে,
পৃথিবীটারে সকলে দেখতে শেখো,
মানুষের বেশে ছুঁচো সর্বত্রই আছে।
চক চক করলেই জেনো সোনা হয়,
চক চক না করলে সোনা কভু নয়।
১০৭

গ্রামও সেই ভাই স্বার্থে ধান্দায় অন্ধ,
মাৎস্যন্যায় গ্রামে আরও বেশি প্রকট,
একে অপরকে করে সদাই সন্দ,
বেশির ভাগ মানুষ গ্রামেতে কপট।
সাধারণ সময়ে আসে কালে ও ভদ্রে,
পান তামাক খায় গল্প করে ও হাসে,
কাজ যখন থাকে না পৌষ চৈত্র ভাদ্রে,
কত যে কয় কথা কত বা হাঁচে কাশে।
বাঁধা-ধরা কাজ কারো একেবারে নেই,
অলস মাথা শয়তানের কারখানা,
কোনো অভাগা হোথা বিপদে পড়লেই,
প্রতিবেশীর দল আনে কত বাহানা।
জ্যান্ত গোরু মাঠে চড়ে শকুনি না আসে,
একটা মরলেই শতটা এসে বসে।
১০৮

গ্রাম নগর সব মানুষ দিয়ে হয়,
অন্য প্রাণী উদ্ভিদে গড়ে উঠে জঙ্গল,
সত্য-মিথ্যা কিছুই মানুষ ছাড়া নয়,
মানুষের তুলনায় সকলে দুর্বল।
মানুষ মহান হয়, হয় সে মনীষী,
অন্য কেউ এমন বড়ো হতে পারে না,
মানুষ দুর্জন হয়ে হতে পারে নারকী,
অন্য প্রাণী এমন হতে কিন্তু জানে না।
উচ্চে বলো নীচে বলো মানুষই যায়,
কলোসাস হয়ে উঠে, হয় সরীসৃপ,
স্বর্গের অমৃত কিংবা নরক যন্ত্রণায়,
মানুষের বুক ফুলে অথবা নির্জীব।
কেবল মানুষ অন্যে অকারণে মারে,
ক্ষুধা ছাড়া খায় শুধু মাত্র এই নরে।
১০৯

এই নরসমাজের মধ্যে ছিল যত,
অভিরাম, রামু, মতি, কামিনী, বুধনা,
রবি, শ্যামল, বিমল, সুরেশরা কত,
শান্তিবুড়ো, মধু, গৌরাঙ্গ, সখীচরণরা।
এদেরই বাস ডুকলী ভইসখলা,
যোগেন্দ্রনগর আগরতলা, খাসভূম,
প্রতাপগড়, ঋষিরহাট, সাধুটিলা,
এদেরই যেতে হয় খোয়াই সাব্রুম।
এরা সব আমাদেরই মতো মানুষ,
এই স্থানগুলি আমাদের সব চেনা,
এদের কান্ডকারখানা কাগুজে ফানুস,
কখন কী করবে কিছু বোঝা যায় না।
চতুরঙ্গ খেলায় বোড়েরাই অধিক,
সংসার মেলায়ও অনামী সমধিক।
১১০

এদের নিয়ে লেখা এই অভিরামায়ণ,
পঞ্চবর্ষে একবার এরা বড়ো হয়,
এরা হয়ে উঠেন পূজ্য ভোটারগণ,
মন্ত্রীরা করজোড়ে এদের বাড়ি যায়।
বাকি কাল এরা সব একাকী কাটায়,
দুর ছাই শোনে গোরু-কুকুরের মতো,
কিছু মনে করে না, মন ওদের নাই,
ধনহীন হলে গো মানুষ জন্তু যত।
এদের নিয়ে লেখা অভিরামায়ণ এই,
এদেরকেই উৎসর্গ আমি করলাম,
লম্বায় বেড়েছি নিজে এদের মাঝেই,
এদের স্মরেই কর্তব্যটা সারলাম।
পিঁপড়ে ছোটো বলে অবহেলা কোরো না,
শর্করা খন্ড নিয়ে এদের আনাগোনা।

.

প্রসঙ্গ

৮/১০ লোটিলা : ভ্লাডিমির নবোকভের উপন্যাস
২৯/৬ টেনিসন : ইংরেজ কবি
৫৬/১ হেক্টর/আন্দ্রোমিদা : ইলিয়াদ-এর চরিত্র
৫৬/৪ হোমার : ইলিয়াদ-এর কবি
৫৭/১৪ মাকড়শার জালে : পয়গম্বরের জীবনী
৯৩/৬ বেইজিং : চিনের রাজধানী
৯৩/৬ বন : জার্মানির শহর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *