অধ্যায় ৫ যে প্রশ্ন করে না
আরিফ হোসনের খাতায় চোখ রাখল শিক্ষক। ক্লাসে সে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার উপস্থিতি যেন বাতাসের মতো—মৃদু, অদৃশ্য, কেউ পাত্তা দেয় না। হাত তোলে না, প্রশ্ন করে না, কোনো বিতর্কে অংশ নেয় না। সে জানে, বেশি দৃশ্যমান হলে প্রশ্ন আসে, প্রশ্ন মানে বাধ্যবাধকতা, বাধ্যবাধকতা মানে ঝুঁকি।
তবে খাতার পাতা খালি নয়। প্রতিটি লাইনে লেখা আছে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, ভাবনার স্তর, ছলনা নয়, চিন্তার নীড়। যেসব লেখা আরিফ লিখে, সেগুলোকে কেউ সহজে পড়তে পারে না। শব্দগুলো যেন আত্মার কণ্ঠ, লুকানো বার্তা, নীরব শিক্ষার নিঃশব্দ পাঠ।
ক্লাসে আনিসুর রহমান খাতা যাচাই করতে করতে থমকে দাঁড়ালেন। আরিফের লেখা চোখে পড়ল—সরাসরি নয়, কিন্তু স্পষ্ট। প্রশ্ন আসে—এই ছেলেটি কি শুধুই নীরব, নাকি সে জানে, তার অদৃশ্যতা শক্তি?
পরীক্ষার সময়, যখন সবাই খাতায় চোখ রাখে, আরিফ নিজের ভিতরে এক পৃথিবী সাজিয়ে রাখে। অন্যরা ঘড়ির কাঁটা মতো দৌড়ায়—প্রশ্ন-উত্তর, নকল, কৌশল। আরিফ দাঁড়িয়ে নেই, দৌড়াচ্ছে না, চোখও ঘুরছে না। সে শুধু লিখছে। সে নিজের নিয়মে লিখছে।
রাশেদ আজও টিফিনের অভাব নিয়ে ব্যস্ত। নিশাত ভাবছে, তার স্বপ্ন কবে পূর্ণ হবে। তৌহিদ নাম্বারের রাজনীতিতে ব্যস্ত। আর আরিফ? সে তাদের সবকিছু দেখছে—চুপচাপ, নিঃশব্দে।
ক্লাস শেষে শিক্ষক বললেন,
—“আরিফ, তুমি কি আজ পড়তে চাও?”
আরিফ মাথা নিল। সে জানে, নিজের কথা বলার মানে ভয় এবং আঘাত। সে ধীরে কলম ধরল। খাতায় লেখা শুরু হলো—
“আমি দেখি। আমি শোনি। কিন্তু আমি অংশ নেই। এটাই আমার পথ। অদৃশ্য থাকা, দেখলে হেরে যাওয়া না।”
আনিসুর রহমান বুঝলেন—এই নীরবতা একটা প্রতিভার আড়াল। যে প্রশ্ন করেনা, যে হাত তোলে না, তার ভিতরে লুকানো শক্তি হয়তো বড়। কিন্তু সমাজ তাকে দেখে না। শিক্ষার সিস্টেম তাকে তুলে ধরে না। নাম্বারও আসে না।
ক্লাসরুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অন্যরা খাতা জমা দিল। আরিফ ধীরে ধীরে খাতা বন্ধ করল। সে দাঁড়াল, ব্যাগ বন্ধ করল। চুপচাপ, নিঃশব্দে বাইরে চলে গেল।
আনিসুর রহমান একা দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি জানেন, এই ছেলেটি তার চোখে সবচেয়ে বড় পাঠ। নীরবতা যে কখনো শক্তি হয়ে যায়, এটাই সে বুঝতে শুরু করেছেন। কিন্তু এই ক্লাসরুমে কতজন বুঝবে? সে জানে না।
রাস্তায় তাকিয়ে আরিফ হাঁটছে। পেছনের আলোয় তার ছায়া লম্বা। কেউ লক্ষ্য করবে না। কেউ প্রশ্ন করবে না। কিন্তু ভিতরে তার যুদ্ধ চলছে—নিজেকে বোঝা, নিজেকে সংরক্ষণ করা, নিজেকে নিরাপদ রাখা।
ক্লাসরুমের বাইরে, যেখানে রোদের আলো, ব্যাডমিন্টনের শব্দ, দোকানের হট্টগোল—সবকিছু চলছে। আরিফ তার অদৃশ্য পৃথিবীতে। সে জানে, এই নীরব যুদ্ধই একমাত্র যে তার নিজের।
অধ্যায় ৬ সিলেবাস বনাম জীবন
ঘণ্টা বাজল। ক্লাসরুমে নীরবতা নেমে এল। আনিসুর রহমান বোর্ডের দিকে তাকালেন। আজকের পাঠ—ব্যাকরণ, রচনা, কবিতা—সবই সূচিপত্রে ঠিকমতো লেখা আছে। কিন্তু তার চোখে কিছু অদৃশ্য দাগ পড়ল।
ত্রিশটি বেঞ্চ, ত্রিশটি শিশু। কিন্তু শিক্ষকের চোখে আজ সবাই শুধু সংখ্যা নয়। কেউ ক্ষুধার কাছে আটকে আছে, কেউ সমাজের মানসিকতার বাঁধনেই বেঁধে আছে, কেউ নিজের অস্তিত্বটুকু লুকিয়ে রাখছে। আর সবকিছুর মাঝে শিক্ষক নিজেকে প্রশ্ন করছে—আমি কি সত্যিই পড়াচ্ছি, নাকি শুধু সংখ্যা পূরণ করছি?
রাশেদের চোখে ক্ষুধা, নিশাতের চোখে স্বপ্নের লুকানো ব্যথা, তৌহিদের চোখে সংখ্যা ও কৌশল—সব কিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, এই ক্লাসরুমের সিলেবাস কেবল নাম্বারের জন্য নয়। জীবন শিখানোও সমান জরুরি। কিন্তু সিস্টেম কি এই পাঠকে অনুমোদন দেয়?
আনিসুর রহমান হাঁটতে লাগলেন। পেছনের বেঞ্চে রাশেদ চুপচাপ বসে আছে। টিফিন খালি, পেট খালি, কিন্তু চোখে এক ধরনের শক্তি। প্রথম সারিতে নিশাত বসে। খাতার পাতায় লেখা আছে—স্বপ্ন লুকানো, কিন্তু অদম্য। আরিফ চুপচাপ, নাম্বারের বাইরের জগতটা নিজের মধ্যে ধারণ করেছে।
সে বোঝেন, ক্লাসরুমে প্রতিটি ছাত্রের যুদ্ধ বইয়ের বাইরে। পাঠ্যবইয়ের নিয়মে সব লেখা আছে, কিন্তু জীবনের পাঠ লেখা নেই। সেই পাঠ শিখাতে হলে শিক্ষককে নিজের দৃষ্টিকোণ বদলাতে হবে।
আনিসুর রহমান বোর্ডে লেখা শুরু করলেন—
“আজকের পাঠ: জীবন। পাঠ্যবইয়ের বাইরে।”
শব্দগুলো ঝুলে রইল। ক্লাসে হালকা নড়াচড়া হলো। কেউ হাত তুলল না। কেউ বুঝল না। কিন্তু বাতাস বদলেছে।
তিনি রাশেদের দিকে তাকালেন। পেছনের বেঞ্চে বসা ছেলেটির চোখে ক্ষুধা, লজ্জা, বীরত্ব—সব মিলেমিশে তার দিকে তাকাচ্ছে। “কীভাবে পড়াশোনা সম্ভব, যদি পেট ভরা না থাকে?”—এই প্রশ্নটি শিক্ষকের মনে প্রবেশ করল।
নিশাতের খাতার দিকে তাকালেন। লেখা পড়তে পড়তে বোঝা গেল, স্বপ্নের পথের বাধা শুধু বই নয়, সামাজিক অনুমতি। সেই বাধা কেটে লেখা সম্ভব, কিন্তু নাম্বারে নয়।
তৌহিদের দিকে চোখ গেল। সে জিতছে নাম্বারে। কিন্তু নিজের জন্য জিতছে না। নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে না। তার কাছে সাফল্য মানে সংখ্যা। শিক্ষকের কাছে সাফল্য মানে মানুষ।
আরিফ? সে অদৃশ্য। সে দেখছে, অনুভব করছে, কিন্তু শব্দ নেই। তাকে বুঝতে হলে শিক্ষককে চোখ খুলতে হবে।
ঘণ্টা শেষ হলো। খাতা জমা হলো। ক্লাসে সবাই উঠে গেল। কিন্তু আনিসুর রহমান বোঝেন—আজ তিনি পাঠ্যবই পড়ালেন ঠিকই। কিন্তু তিনি আরও বড় কিছু শিখলেন—শিক্ষার সিলেবাস হলো জীবন বোঝার এক ছোট অংশ, আর শ্রেণিকক্ষের যুদ্ধ হলো জীবনের পাঠশালা।
ঘরের বাইরে রোদে ছায়া পড়ছে। প্রতিটি ছাত্র বেরিয়ে গেল। তবু শিক্ষক দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে আজকের ক্লাস শুধু নাম্বারের সংগ্রাম নয়। এটি ছিল, ত্রিশটি যুদ্ধের সঙ্গে দেখা, ত্রিশটি জীবন বোঝার চেষ্টা।
হঠাৎ তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন—
আমি কি শুধু পড়াচ্ছি, নাকি জীবন শেখাচ্ছি?
এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। ক্লাসরুমের দেয়ালে আজও লেখা আছে—
আজকের পাঠ: জীবন। পাঠ্যবইয়ের বাইরে।
এটাই নতুন পাঠ।
অধ্যায় ৭ অভিভাবক সভা
স্কুলের হলঘরে হালকা আলো, বেঞ্চগুলো সাজানো। বোর্ডে লেখা: “অভিভাবক-শিক্ষক সভা”। প্রার্থীদের তালিকা, ফলাফল খাতা, উপস্থিতির কাগজ—সবই প্রস্তুত। আনিসুর রহমান বসে রয়েছেন। তিনি জানেন, আজকের দিনটা শুধু শিক্ষার হিসাবের নয়। এটা হলো একটি পরীক্ষা—কতটা সমাজ দায়িত্বশীল, কতটা দায় এড়ানো চলেছে।
ঘণ্টা বাজল। শিক্ষকরা সবাই সাজগোজে দাঁড়ালেন। অভিভাবকরা আসবেন, প্রশ্ন করবেন, হয়তো কিছু অভিযোগ করবেন। কিন্তু আসেননি। তালিকায় যে ত্রিশজনের জন্য সভা ডাকা হয়েছে, তার মধ্যে উপস্থিত হলো পাঁচজন। বাকি বিশজন? কেউ অন্য কাজের কথা বলল, কেউ সময় হয়নি, কেউ বলেনি—“আমার সন্তান তো ঠিকই আছে।”
আনিসুর রহমান বুঝতে পারলেন, শিক্ষার সঙ্গে দায় ভাগাভাগি করার ধারণা গ্রামে নতুন নয়। অভিভাবকেরা দায় সিস্টেমের বাইরে রাখতে চায়। সন্তান ফেল করল—শিক্ষক দায়ী। পাশ করল—শিশু ও পরিবারই গর্বিত। কিন্তু এ দায়িত্বের ভার ভাগ করে নেওয়া—তা কেউ চায় না।
এক অভিভাবক, যিনি নিজেই দোকান চালান, বললেন—
—“স্যার, আমরা তো সব সময় চেষ্টা করি। পড়াশোনার জন্য সময় নেই। টিফিন, দোকান, ঘর। সব দায়িত্ব আমাদের।”
আনিসুর রহমান চুপ। সে জানেন—এটি একটি সাধারণ ব্যাখ্যা, কিন্তু সত্যিকার দায় এড়ানোর সংস্কৃতির অংশ।
আরেকজন বলল,
—“স্যার, ফলাফল খারাপ হলে আমরা তো অবাক। সবই শিক্ষকেই দায়ী।”
এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আনিসুর রহমানের মনে হল, সমস্যার মূল—শুধু বই, পরীক্ষা, শিক্ষক নয়। সমাজের এই দায় এড়ানোর মানসিকতা শিক্ষা ব্যবস্থার সবকিছুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
ত্রিশজনের মধ্যে অনুপস্থিত ২৩ জনের তালিকা তাঁর হাতে। নামগুলো চোখে পড়ল—বয়স, পেশা, অবস্থান। কেউ শ্রমিক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ গৃহিণী। কিন্তু সবাই এক কথায় ‘অসামর্থ্য’ বা ‘ব্যস্ত’। তাঁরা নিজেদের ব্যস্ততা দেখিয়ে শিক্ষকের ওপর চাপ ফেলে।
সভা শেষ হলো। শিক্ষকরা ক্লাসরুমে ফিরে আসলেন। আনিসুর রহমান জানেন, আজকের দিনটি শুধুই সংখ্যা বা উপস্থাপনার জন্য নয়। এটি ছিল শিক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—কতটা সমাজ দায়শীল, কতটা শিশুদের পাশে আছে।
রাশেদ, নিশাত, তৌহিদ, আরিফ—কেউ কিছু জানে না। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে এই সভার অনুপস্থিতি, এই দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতি।
আনিসুর রহমান বোঝেন, ক্লাসরুমে পাঠ্যবই পড়ানোই যথেষ্ট নয়। তাকে পড়াতে হবে জবাবদিহি, দায়িত্ব, মানবিকতা। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে এটি কঠিন। কারণ শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য অদৃশ্য বাধা—দরিদ্রতা, সামাজিক নিয়ম, অভিভাবকের উদাসীনতা।
সে জানেন, এই সভা শেষে সে ফিরে যাবে তার দপ্তরে। খাতা দেখবে, উপস্থিতি নোট করবে, ত্রুটিগুলো লিখবে। কিন্তু এই বিষয়গুলো শুধুই সংখ্যার খেলা। মূল সমস্যা—দায়িত্ব এড়ানো—এটা কাটানো সম্ভব নয় একদিনে।
তবু সে স্থির করল—পরবর্তী বছর থেকে প্রতিটি ছাত্রের পিছনে শুধু শিক্ষক নয়, শিক্ষক-সমাজ একসাথে কাজ করবে। হয়তো অসম্ভব, কিন্তু চেষ্টা করবে।
ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে সূর্যের শেষ রশ্মি ভেতরে ঢুকল। বেঞ্চে ফেলে রাখা খাতা, টিফিন, কলম—সব আজও একই অবস্থায়। কিন্তু শিক্ষক জানেন, এই ক্লাসরুম শুধু পড়াশোনার স্থান নয়। এটি হলো সচেতন হওয়ার স্থান, যেখানে শুধু ছাত্র নয়, সমাজকেও শেখার দরকার।
এই অভিভাবক সভা ছিল সেই দিনটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা—দায়িত্ব এড়ানো সংস্কৃতি কিভাবে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করে, তা চোখে আনা।
অধ্যায় ৮ স্কুলের রাজনীতি
স্কুলের বারান্দায় সকাল। আনিসুর রহমান ধীরে ধীরে পা বাড়ালেন। চোখ পড়ে হলঘরের দিকে—বেঞ্চগুলো সাজানো, খাতা, টিফিন, কলম—সব একই অবস্থায়। কিন্তু আজ তার মন ভারী। শুধু শিক্ষার্থীর সমস্যাই নয়, শিক্ষক সমাজের রাজনীতি আর দ্বন্দ্বও তার মাথায় ঘুরছে।
তিনি জানেন, স্কুলে বারোজন শিক্ষক আছে। কেউ সকাল বাজার সামলে স্কুল আসে, বিকেলে আবার দোকান দেখবে। কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, এমনকি রাজনৈতিক দলে সক্রিয়। কেউ থাকে হাইপোক্রিট—মুখে বলে “শিক্ষার্থীর জন্য”, বাস্তবে অন্য কাজে ব্যস্ত।
আজ সকালে তিনি দেখতে পেলেন—ক্লাসরুমের পাশের অফিসে দুই শিক্ষক একে অপরের দিকে চেয়েছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে। একে বলা যায় পরিকল্পনা, অন্যকে বলা যায় ষড়যন্ত্র। কেউ কেউ নিজেদের সুবিধার জন্য স্কুলের রেকর্ড মেলাচ্ছে না, কেউ সরকারি নিয়মকানুনে হাত দেয়নি। দায়িত্ব আছে, কিন্তু কেউ তা নিতে চায় না।
আনিসুর রহমান নিজেকে প্রশ্ন করলেন—এই পরিবেশে আমি কি ভালো শিক্ষক হতে পারব? ক্লাসরুমে নাম্বার, সিলেবাস, জীবনের পাঠ—সবকিছু পড়ালেও বাইরে এই রাজনীতি সবকিছুকে অকার্যকর করে দেয়।
তিনি অফিসে বসে খাতা দেখলেন। একদিকে ছাত্রছাত্রীরা লড়ছে জীবন আর স্বপ্নের জন্য, অন্যদিকে সহকর্মীরা লড়ছে নিজের সুবিধা ও চেয়ারের জন্য। কেউ ছাত্রের জন্য আসে না, আসে নিজের সুবিধার জন্য। কেউ ভালো কাজ করে না, শুধু দেখিয়ে দেয় যে করছে।
একজন শিক্ষক এলো। মুখে হাসি, চোখে আগুন। সে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত। অন্য শিক্ষককে বোঝাচ্ছে, কোন ছাত্রকে পরীক্ষা দেবে, কোনকে নকশা দেখাবে, কোন ফলাফল “সঠিক” হবে। আনিসুর রহমান বুঝলেন—এখানে কোনো ন্যায্যতা নেই। সব কিছুই ব্যক্তিগত স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত।
তিনি মনে মনে ভেঙে পড়লেন। সমাজের চাপ, অভিভাবকের উদাসীনতা, শিক্ষার্থীর সমস্যা—সব কিছু তার কাঁধে। সহকর্মীদের রাজনীতি সেই ভারকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কখনো মনে হয়, শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পড়ানো নয়, সংগ্রাম চালানো, কিন্তু তা করতে গিয়ে নিজের শক্তি শেষ হয়ে যায়।
ক্লাসরুমে ফিরে তাকালেন। রাশেদ, নিশাত, তৌহিদ, আরিফ—সবাই তাদের নিজস্ব যুদ্ধ চালাচ্ছে। আর শিক্ষক? তাকে এই যুদ্ধের সঙ্গে লড়াই করতে হবে, নিজের শক্তি, সহকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ আর সিস্টেমের অমানবিকতা—সবকিছুর বিরুদ্ধে।
ঘণ্টা শেষে আনিসুর রহমান জানালার পাশে দাঁড়ালেন। দূরে গ্রামজুড়ে রোদের আলো, শিশুদের খেলা, লোকজনের হট্টগোল। ক্লাসরুমে সব নাম্বার, সব খাতা, সব সিলেবাস—এগুলো তো মাত্র ছাঁচ। বাস্তব যুদ্ধ তো চলছেই।
তিনি নিজের বুকের মধ্যে অনুভব করলেন—এই স্কুলের রাজনীতি শুধুমাত্র শিক্ষক সমাজের নয়। এটি সমাজের প্রতিফলন। যে সমাজ দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, সে সমাজ স্কুলকেও এভাবে রাজনীতি দ্বারা বন্দি করে।
আজ আনিসুর রহমান স্থির করলেন—তিনি নিজের শিক্ষকের দায়িত্ব অক্ষুণ্ণ রাখবেন। সহকর্মীরা যা করবে, রাজনীতি যা করবে—তার দৃষ্টিতে শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এবং যুদ্ধই প্রধান। নাম্বার, ফলাফল, সিলেবাস—সব কিছুই আসল যুদ্ধের তুলনায় ছোট।
স্কুলের রাজনীতি কঠিন, অমানবিক, দায়িত্বহীন। কিন্তু ক্লাসরুমের ছোট ছোট জীবন—এই সব রাজনীতি, সব অনুপস্থিতি, সব দ্বন্দ্বের বাইরে তাদের যুদ্ধ চলছে। আর শিক্ষক? সে আজও সেই লড়াইয়ের সঙ্গে নিজের মানসিক যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
অধ্যায় ৯ প্রধান শিক্ষকের চেয়ার
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাদেরের অফিসে বাতাস ভারী। জানালার বাইরে সূর্যের আলো খণ্ডিত, বারান্দায় পা ফেলে তিনি দাঁড়িয়ে। চোখে হালকা ক্লান্তি, মুখে ধীর হাসি। এই হাসি কিন্তু ভেতরে লুকানো এক গোপন ব্যথার আভাস দিচ্ছে—চেয়ার, দায়িত্ব, সমাজের চাপ, সব মিলিয়ে একটি অব্যক্ত যুদ্ধ।
কাদের এই চেয়ার পেলেন অনেক বছর আগে। তখন তিনি নতুন শিক্ষক, একদম তরুণ। অভিজ্ঞতা কম, জ্ঞান কম, কিন্তু উদ্যম বেশি। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করেছিল, তিনি আসলে দায়িত্বশীল। তিনি নিজেও বিশ্বাস করেছিলেন—এই পদ তার শিক্ষকদের জন্যও, ছাত্রছাত্রীদের জন্যও হবে এক প্রতীক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সাথী হলো বাস্তবতা। গ্রামের মানুষ, অভিভাবক, রাজনীতি—সবাইই শিখিয়েছিল, দায়িত্ব মানে শুধু দায়িত্ব নয়; এটি আপসের খেলা। প্রতিটি পদক্ষেপে ভাবতে হয়—কোথায় হেঁটেছি, কী বলেছি, কার সাথে আপস করেছি।
সে জানে, স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষক নিজ দায়িত্ব এড়াতে বা নিজেদের সুবিধা বাড়াতে আপস করে। কাদেরও করেছে। ছোট ছোট আপস—শিক্ষককে চোখে না দেখা, ফলাফলের সাথে ছাড়, অভিভাবকের চাপ মেনে নেওয়া—সবই তাকে সহায়ক করে। কিন্তু এই আপসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি চ্যালেঞ্জ: নিজের নৈতিকতার সীমা।
আজকে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে মনে মনে হিসাব করছে। কয়েকজন শিক্ষক, যারা দোকান, ব্যবসা, রাজনৈতিক দলে ব্যস্ত, তাদের জন্য স্কুল শুধু একটি অবস্থান। সেখানে দায়িত্ব নেই, মানসিকতা নেই। তিনি চুপচাপ দেখছেন—চেয়ার ধরে থাকা মানে সবকিছু সহ্য করা, সব আপস করা।
কাদেরের চোখ পড়ল ক্লাসরুমের দিকে। রাশেদ, নিশাত, তৌহিদ, আরিফ—সবাই তাদের নিজস্ব যুদ্ধ করছে। তিনি জানেন, এই শিক্ষার্থীদের জন্য তার আপস মানে সীমিত প্রভাব। নাম্বার, ফলাফল, সিলেবাস—সবই রাজনীতির ছায়ায়।
কিছু অভিভাবক আসেন, কিছু আসে না। কিছু শিক্ষক সময় মতো আসে, কেউ আসে না। দায়িত্বহীনতা, অমনোযোগ, রাজনীতি—সবই প্রধান শিক্ষকের কাঁধে চাপিয়ে দেয়।
কাদের জানেন, এই চেয়ারে বসে সে সব কিছু সহ্য করছে—শিক্ষকের অসহায়তা, শিক্ষার্থীর ক্ষুধা, অভিভাবকের উদাসীনতা, সমাজের বিচারবুদ্ধি। কিন্তু একই সঙ্গে এই চেয়ার তাকে একটি ক্ষমতা দেয়—যদিও সীমিত। তিনি চাইলে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোনো পরিবর্তন আনতে পারেন। কিন্তু যেসব পরিবর্তন আসলে প্রয়োজন, সেগুলো সমাজ ও রাজনীতির প্রাচীরে আটকে থাকে।
তিনি স্মৃতির ভেতরে ফিরে যাচ্ছেন—কত আপস করতে হয়েছে, কতবার চোখ বন্ধ করতে হয়েছে। শুরুর দিনগুলো, যখন শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সমাজ বলে দিয়েছে, “আপনি অল্প।” তারপর ধীরে ধীরে সব আপস হয়ে গেছে বাস্তবতার অংশ।
কাদের বোঝেন, তার চেয়ারের ইতিহাস শুধু ক্ষমতার নয়—এটি হলো যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে যুদ্ধ হলো আপস, নৈতিকতা, দায়িত্ব, ভেতরের দ্বন্দ্ব। এই চেয়ার মানে শুধু অফিসে বসা নয়। এটি মানে প্রতিদিন লড়াই করা—ছাত্র, শিক্ষক, সমাজ এবং নিজের মধ্যে।
আজও তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। দূরে মাঠে কিশোররা খেলছে, হাসছে, জীবন কাটাচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎকে যারা তৈরি করবে—শুধু নাম্বার দিয়ে নয়। অথচ এই নাম্বারের ছায়ায় কতটা নীরব লড়াই, কতটা সমাজের চাপ, কতটা অভিভাবকের উদাসীনতা—সবই প্রধান শিক্ষকের চোখে পড়ে।
কাদের নিজেকে প্রশ্ন করলেন—
আমি কি সত্যিই তাদের জন্য যথেষ্ট করছি? নাকি আমি শুধু চেয়ারের আপসের ভার বহন করছি?
চেয়ার স্থির, কিন্তু দায়িত্ব স্থির নয়। সমাজের চাপে, শিক্ষক সমাজের দ্বন্দ্বে, অভিভাবকের উদাসীনতায়—এই চেয়ার তার জন্য এক ধরনের নিঃশব্দ যুদ্ধক্ষেত্র।
আজও তিনি বসবেন, আপস করবেন, দেখবেন, সহ্য করবেন। কারণ এই চেয়ারে বসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একমাত্র ক্ষমতা—কিছু ছাত্রের ভবিষ্যতের জন্য একটি ক্ষুদ্র পরিবর্তন আনা।
