অধ্যায় ১ – রোলকল

অধ্যায় ১ রোলকল

নবম শ্রেণির ক্লাসরুমটি দেখতে খুব সাধারণ। দেয়ালের রং বহুদিনের পুরোনো, কোথাও কোথাও খসে পড়েছে। জানালার লোহার গ্রিলে আটকে আছে কাগজের টুকরো আর ধুলোর স্মৃতি। ছাদের পাখাটা ঘোরে, কিন্তু বাতাস ঠিকমতো নামে না। তবু এই ঘরেই প্রতিদিন সকালবেলা ত্রিশটি জীবন এসে বসে—কেউ চুপচাপ, কেউ উদাস, কেউ আবার কৃত্রিম চঞ্চলতায় নিজের ভয় ঢেকে রাখে।

ঘণ্টা বাজার শব্দটা থামতেই আনিসুর রহমান ক্লাসে ঢুকলেন। হাতে হাজিরা খাতা, চোখে পরিচিত এক ক্লান্তি। শিক্ষকতার এত বছর পেরিয়ে এসেও এই মুহূর্তটা তাঁর কাছে একই রকম লাগে—নাম ডাকা, উপস্থিতি লেখা, তারপর পড়ানো। নিয়মের বাইরে যাওয়ার সময় বা সুযোগ—কোনোটাই যেন নেই।

তিনি দাঁড়িয়ে বললেন,
—“সবাই চুপ।”

ক্লাসরুমে নীরবতা নামল। বেঞ্চে বসা ছেলেমেয়েগুলো চোখ তুলে তাকাল। কেউ জানালার বাইরে, কেউ বোর্ডের দিকে, কেউবা নিজের ভেতরের অদৃশ্য কোনো জায়গায়।

আনিসুর রহমান রোলকল শুরু করলেন।

—“রাশেদ আহমেদ?”

—“জি স্যার।”

রাশেদের গলা খুব নিচু। সে পেছনের বেঞ্চে বসে। বুকের ভেতরটা হালকা খালি লাগে তার—শুধু পেট নয়, মনটাও। সকালে ঘর থেকে বেরোনোর সময় মা বলেছিলেন, “আজ টাকা নাই রে বাবা।” এই কথাটা সে বইয়ের পাতার মতো ভাঁজ করে রেখে দিয়েছে মনে। প্রশ্ন এলে সে উত্তর দিতে ভয় পায় না, ভয় পায় নিজের পেটের শব্দে অন্য কেউ শুনে ফেলবে কিনা।

—“নিশাত জাহান?”

—“জি স্যার।”

নিশাতের কণ্ঠ পরিষ্কার। সে প্রথম সারিতে বসে। খাতাটা পরিপাটি, কলমের ঢাকনা ঠিকঠাক লাগানো। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবে না—এই মেয়েটার ভেতরে কত কথা জমে আছে। সে জানে, পড়াশোনায় ভালো করলে সবাই প্রশংসা করবে। কিন্তু প্রশংসার সেই জায়গাটুকু তাকে স্বপ্ন দেখানোর অনুমতি দেয় না।

—“তৌহিদ হাসান?”

—“জি স্যার।”

তৌহিদের গলায় আত্মবিশ্বাস। সে একটু হেসে তাকায়। ক্লাসে সে পরিচিত মুখ—সবাই জানে, পরীক্ষায় ভালো করে। কীভাবে ভালো করে, সে প্রশ্ন কেউ করে না। ফলটাই আসল।

—“আরিফ হোসেন?”

এক মুহূর্ত নীরবতা।

—“আরিফ?”

পাশের বেঞ্চ থেকে ধীরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
—“জি স্যার।”

আরিফ মাথা তোলে না। সে জানে, চোখে চোখ পড়লে প্রশ্ন আসতে পারে। প্রশ্ন মানে কথা বলা, কথা বলা মানে সামনে চলে আসা। আর সামনে আসা মানেই বিপদ—এটাই তার শেখা।

হাজিরা শেষ হতে হতে আনিসুর রহমান খাতার দিকে তাকালেন।
মোট শিক্ষার্থী: ৩০ জন। উপস্থিত: ৩০ জন।

সংখ্যাটা ঠিক আছে। তবু তাঁর ভেতরে কোথাও যেন একটা অস্বস্তি। মনে হচ্ছিল, সবাই এসেছে ঠিকই—কিন্তু সবাই উপস্থিত নয়। কেউ হয়তো ক্ষুধার কাছে আটকে আছে, কেউ ভয় আর স্বপ্নের মাঝখানে ঝুলে আছে, কেউ আবার নিজের অস্তিত্বটা গুটিয়ে রেখেছে নিরাপদ কোনো কোণে।

তিনি বোর্ডে চক দিয়ে লিখলেন—
বাংলা: রচনা

চকের শব্দে কয়েকজন নড়ে বসল। কেউ খাতা খুলল, কেউ কলম ঘোরাল। বাইরে মাঠে রোদ পড়ে ঝিলমিল করছে। দূরে কেউ ব্যাডমিন্টনের নেট টানাচ্ছে—স্কুলের পেছনের মাঠে জীবনের আরেক পাঠ প্রস্তুত।

—“আজ আমরা রচনা লিখব,” আনিসুর রহমান বললেন।
—“বিষয়: আমার জীবনের লক্ষ্য।”

শব্দগুলো বাতাসে ঝুলে রইল।

রাশেদ খাতার দিকে তাকাল। তার জীবনের লক্ষ্য কী? আজ দুপুরে ভাত জুটবে কিনা—এই প্রশ্নটাই তার কাছে সবচেয়ে বাস্তব।

নিশাত কলম ধরল। তার কলমের মাথায় ডাক্তার হওয়ার ছবি ভাসে—কিন্তু সেই ছবির চারপাশে অদ্ভুত এক কুয়াশা।

তৌহিদ হালকা হাসল। লক্ষ্য লিখতে তার সমস্যা নেই। সে জানে, কী লিখলে নাম্বার পাওয়া যায়।

আরিফ চুপচাপ খাতার পাতা খুলল। তার মাথার ভেতরে শব্দ আছে, বাক্য আছে, অনুভূতি আছে। কিন্তু সে জানে না—এগুলো লেখা নিরাপদ কিনা।

আনিসুর রহমান বেঞ্চের মাঝ দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। খাতার দিকে চোখ বুলোল। কোথাও সুন্দর হাতের লেখা, কোথাও অগোছালো, কোথাও আবার ফাঁকা পাতা। হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন। নিশাতের খাতায় চোখ আটকে গেল একটি লাইনে—

“আমার জীবনের লক্ষ্য আছে, কিন্তু সেটা সবাই মানতে চায় না।”

তিনি আর কিছু পড়লেন না। খাতা বন্ধ করে সামনে এগোলেন। কিন্তু ওই লাইনটা তাঁর ভেতরে কোথাও থেকে গেল—চকের দাগের মতো।

ঘণ্টা পড়ার সময় হয়ে এলে তিনি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আজ এতটুকুই।”

ছাত্রছাত্রীরা উঠতে শুরু করল। বেঞ্চের শব্দ, ব্যাগের চেইনের আওয়াজে ক্লাসরুম আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। কেউ বেরিয়ে গেল দ্রুত, কেউ ধীরে।

আনিসুর রহমান একা দাঁড়িয়ে রইলেন একটু। বোর্ডে তখনো লেখা—
আমার জীবনের লক্ষ্য।

তিনি হঠাৎ ভাবলেন,
এই ক্লাসরুমে কি সত্যিই কেউ নিজের লক্ষ্যটা নিরাপদে লিখতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই।
কিন্তু তিনি বুঝতে শুরু করেছেন—এই ক্লাসরুমে শুধু পড়া হয় না।
এখানে প্রতিদিন, নিঃশব্দে, যুদ্ধ চলে।


অধ্যায় ২ খালি টিফিন

টিফিনের ঘণ্টা বাজার শব্দটা রাশেদের কানে অন্য রকম লাগে। অন্যদের কাছে এটি বিশ্রামের ডাক, খাবারের আনন্দ, একটু হইচইয়ের সুযোগ। কিন্তু রাশেদের কাছে এই ঘণ্টা মানে এক ধরনের হিসাব—আজ নিজেকে কীভাবে আড়াল করবে।

ক্লাস শেষ হতেই সবাই ব্যাগ খুলে ফেলল। কেউ টিফিন বক্স বের করল, কেউ দোকানের দিকে ছুটল। বেঞ্চের ওপর কাগজ বিছিয়ে ভাত, ডিম, আলুভর্তা, কখনো পরোটা—ছোট ছোট আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। হাসি, ঠাট্টা, খাবারের গন্ধে ক্লাসরুম ভরে উঠল।

রাশেদ চুপচাপ বসে রইল।

তার ব্যাগে টিফিন বক্স আছে, কিন্তু খালি। সকালে বের হওয়ার সময় মা সেটা দিয়েই দিয়েছিলেন—অভ্যাসের মতো। দিয়েই আবার থমকে বলেছিলেন,
“আজ কিছু দিতে পারলাম না রে বাবা।”

মায়ের চোখে তখন লজ্জা ছিল না, ছিল অসহায়ত্ব। রাশেদ কিছু বলেনি। সে জানে, কথা বললে কষ্টটা বাড়ে।

সে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে রোদে মাঠ ঝলমল করছে। কয়েকজন ছেলে দৌড়াচ্ছে দোকানের দিকে—চানাচুর, বিস্কুট, সিঙ্গারা কিনবে। টাকা থাকলে এই দৌড়টা আনন্দের। টাকা না থাকলে, শুধু দেখার।

পেছন থেকে তৌহিদের গলা ভেসে এল,
—“রাশেদ, কী খাবি?”

রাশেদ হালকা হাসল।
—“না রে, ভালো আছি।”

এই “ভালো আছি” কথাটা সে অনেকদিন ধরে ব্যবহার করছে। ক্ষুধা ঢাকতে, লজ্জা ঢাকতে, নিজের অবস্থান ঢাকতে।

নিশাত তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হাতে টিফিন বক্স। সে একটু থেমে বলল,
—“আমারটা ভাগ করে নিস?”

রাশেদ মাথা নাড়ল।
—“না না, দরকার নাই।”

সে জানে, একবার নিলে আবার নিতে হবে। একবার দুর্বল হলে সবাই জেনে যাবে। তার কাছে সবচেয়ে বড় ভয় ক্ষুধা নয়—অভ্যাস হয়ে যাওয়া।

আনিসুর রহমান দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলেন। তিনি কিছু বলেননি। শিক্ষক হিসেবে এসব দৃশ্য তাঁর চোখ এড়িয়ে যায় না, কিন্তু তিনি অভ্যস্ত—দেখেও না দেখার মতো থাকতে। কারণ তিনি জানেন, একা একা সব সামলানো যায় না।

তবু আজ তাঁর চোখ আটকে গেল রাশেদের দিকে।

রাশেদ উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে তুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। মাঠের দিকে নয়, দোকানের দিকেও নয়। সে গেল স্কুলের পেছনের আমগাছটার নিচে। সেখানে ছায়া আছে, নীরবতা আছে। সেখানে বসে থাকলে কেউ জিজ্ঞেস করে না—“খাসনি কেন?”

সে মাটিতে বসে পায়ের দিকে তাকাল। জুতার সামনের অংশটা ফেটে গেছে। কয়েকদিন পর হয়তো পুরোটা খুলে যাবে। সে মনে মনে হিসাব করল—এই মাসে বাবার কাছ থেকে আর টাকা আসবে না। খাতা কিনতে হবে, ফি দিতে হবে। টিফিন—ওটা বিলাসিতা।

তার মনে পড়ল স্যারের প্রশ্ন—আমার জীবনের লক্ষ্য।
সে হেসে ফেলল।
লক্ষ্য?
আজ যদি দুপুরে কিছু খেতে পেত, সেটাই তো বড় লক্ষ্য।

এই সময় স্কুলের পেছনের রাস্তা দিয়ে একটা ভ্যান চলে গেল। ভ্যানে কাঠ বোঝাই। রাশেদের বাবা এমন ভ্যানই চালান। আজ কাজ পেয়েছেন কিনা, সে জানে না। জানে শুধু—কাজ না পেলে রাতে ভাত কম হবে।

ঘণ্টা আবার বাজল। টিফিন শেষ।

রাশেদ উঠে দাঁড়াল। পেটের ভেতরটা খালি, কিন্তু মুখে সে সেই পুরোনো মুখোশ পরে নিল—সব ঠিক আছে।

ক্লাসে ঢুকে সে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। খাতা খুলল। কলম ধরল। কলমের মাথা কাঁপছিল একটু। ক্ষুধা শরীরকে দুর্বল করে, কিন্তু মনটাকে কখনো কখনো আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।

আনিসুর রহমান ক্লাসে ঢুকেই লক্ষ্য করলেন—রাশেদের চোখ আজ অন্য রকম। তিনি বোর্ডে লেখা শুরু করলেন, কিন্তু একবার পেছনে তাকালেন।

তিনি বুঝলেন, এই ছেলেটা শুধু পড়াশোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছে না।
সে লড়ছে পেটের সঙ্গে, পরিস্থিতির সঙ্গে, নিজের মর্যাদার সঙ্গে।

তিনি মনে মনে প্রশ্ন করলেন—
এই যুদ্ধের নম্বর কত?

ক্লাস চলতে থাকল। শব্দ, লেখা, বোর্ড—সবই চলল নিয়মমাফিক। কিন্তু রাশেদের খাতার পাতায় আজ শব্দ কম, শ্বাস বেশি। তবু সে লিখছে। কারণ সে জানে—লেখা থামলে, যুদ্ধটা সে-ই হারবে।

আর ক্লাসরুমের ভেতরে, কারও অজান্তে, খালি টিফিনের যুদ্ধ আরও একদিন নীরবে চলল।

অধ্যায় ৩ প্রথম সারির স্বপ্ন

নিশাত সব সময় প্রথম সারিতে বসে। বেঞ্চের একদম সামনের কোণাটায়, বোর্ডের সবচেয়ে কাছের জায়গাটিতে। এই বসার জায়গাটা সে নিজেই বেছে নিয়েছে। এখানে বসলে স্যারের চোখে পড়া যায়, বোর্ডের লেখা পরিষ্কার দেখা যায়, আর সবচেয়ে বড় কথা—পেছনের ফিসফাস, হাসাহাসি, আলস্য এখানে এসে পৌঁছায় না।

প্রথম সারি নিশাতের কাছে শুধু বসার জায়গা নয়, এটা তার অবস্থান।

সে খাতা খুলে রাখে খুব যত্ন করে। পাতার ভাঁজ নেই, লেখার লাইনে কোনো তাড়াহুড়া নেই। কলম চালানোর সময় তার হাত কাঁপে না, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অদৃশ্য কাঁপুনি লেগেই থাকে—যেন কিছু একটা সব সময় ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।

আজ ক্লাসে বসে তার বারবার মনে পড়ছিল কাল রাতের কথাগুলো।

রাতে খাওয়া শেষে মা বলেছিলেন,
—“নিশাত, তোর খালার বাসা থেকে লোক এসেছিল।”

এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। নিশাত বুঝে গিয়েছিল।
লোক মানে কথা,
কথা মানে বিয়ে।

সে কিছু বলেনি। খালি থালাটা সরিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে ছিল। দূরে রাস্তার আলো জ্বলছিল, কুকুর ডাকছিল। সেই আলোয় সে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে কল্পনা করেছিল—হাসপাতালের করিডোরে হাঁটছে, সাদা অ্যাপ্রন পরে। রোগীর মা কাঁদছে, সে বলছে—“ভয় নেই, ঠিক হয়ে যাবে।”

এই কল্পনাটুকু তার সাহস।

কিন্তু সাহসেরও বয়স থাকে—এটা সে জানে।

পরদিন স্কুলে এসে সে আবার নিজের জায়গায় বসেছে। প্রথম সারিতে। এখানে বসলে মনে হয়, সে এখনো লড়াইয়ে আছে।

আনিসুর রহমান বোর্ডে প্রশ্ন লিখছিলেন। নিশাত খেয়াল করল, স্যার আজ একটু ধীর। যেন শব্দগুলো ভেবেচিন্তে লিখছেন। হঠাৎ তিনি বললেন,
—“নিশাত, তুমি পড়ে শোনাও।”

নিশাত দাঁড়াল। তার গলা পরিষ্কার, উচ্চারণ স্পষ্ট। লেখা পড়তে পড়তে সে নিজেই অবাক হলো—এই কথাগুলো কি সত্যিই তার লেখা?

সে পড়ল,
“আমার জীবনের লক্ষ্য শুধু নিজের জন্য নয়। আমি এমন কিছু হতে চাই, যাতে অন্যের জীবনও বদলায়।”

ক্লাসে হালকা নড়াচড়া হলো। কেউ কেউ তাকাল। কেউ হাসল না, কেউ বাহবা দিল না। নিশাত জানে, এসব কথা ক্লাসরুমে খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। এখানে নম্বরই সবচেয়ে বড় ভাষা।

সে বসে পড়ল। বুকের ভেতরে ধুকপুক করছে। সে জানে না, এই লেখার জন্য কত নম্বর পাওয়া যাবে। কিন্তু সে জানে, এই লেখাটা মিথ্যা নয়।

টিফিনের ঘণ্টা বাজলে সে রাশেদের দিকে তাকিয়েছিল। ছেলেটা তখনও চুপচাপ। নিশাতের বুকের ভেতরে হালকা একটা ব্যথা উঠেছিল। সে ভেবেছিল, সবাই কি নিজের নিজের যুদ্ধেই এত ব্যস্ত যে অন্যের যুদ্ধ দেখা যায় না?

স্কুল ছুটির পর নিশাত বাড়ি ফিরল। বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই খালার গলা শুনতে পেল।
—“মেয়েটা তো পড়াশোনায় ভালোই। কিন্তু বেশি পড়াশোনা করলে তো সমস্যা।”

এই “সমস্যা” শব্দটা নিশাতের কানে এসে আটকে গেল।

সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। খাতা খুলে বসল। পড়ার টেবিলে বসে সে বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু চোখে ভাসছিল অন্য ছবি—একটা ছোট মেয়ে, বই হাতে দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের সামনে। দেয়ালে লেখা—এখানেই শেষ

হঠাৎ তার চোখে পানি এসে গেল। কিন্তু সে কাঁদল না। নিশাত জানে, কান্না তার বিলাসিতা নয়। তাকে শক্ত থাকতে হয়।

পরদিন ক্লাসে এসে সে আবার প্রথম সারিতে বসল। কেউ জানল না, তার ভেতরে কী চলছে। আনিসুর রহমান শুধু লক্ষ্য করলেন—আজ নিশাত একটু বেশি চুপ।

ক্লাস শেষে তিনি খাতা দেখতে গিয়ে নিশাতের লেখার নিচে ছোট করে লিখলেন—
“ভালো লিখেছ। লেখা থামিও না।”

এই ছোট বাক্যটা নিশাতের কাছে অদ্ভুত এক আশ্বাস হয়ে উঠল। কেউ তাকে সরাসরি বলেনি—“তুমি পারবে।”
কিন্তু এই কথাটার ভেতরে সে সেই সম্ভাবনাটুকু খুঁজে পেল।

বাড়ি ফেরার পথে সে হেঁটে যাচ্ছিল ধীরে। রাস্তার ধুলো, বিকেলের আলো, সবকিছু আজ একটু আলাদা লাগছিল। সে জানে, যুদ্ধটা সহজ না। পরিবার, সমাজ, সময়—সব একসাথে দাঁড়িয়ে আছে তার বিপরীতে।

তবু নিশাত হাঁটছে।

কারণ প্রথম সারিতে বসা মানে শুধু বোর্ডের কাছে থাকা নয়—
এটা স্বপ্নের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা।

আর নিশাত এখনো হাল ছাড়েনি।

অধ্যায় ৪ নাম্বারের রাজনীতি

তৌহিদ হাসান ক্লাসে ঢুকল, পেছনের বেঞ্চে নয়, মাঝারি সারিতে। সে জানে, প্রথম সারিতে বসলে নাম্বারের সুবিধা আসে না—সবার চোখ পড়ে। পেছনে বসলে হ্যান্ডসেট সহজে বের হয়, চোখ ঘোরানো সহজ হয়, সহপাঠীর সঙ্গে সংকেত বিনিময়ও সহজ। মাঝারি সারি সবচেয়ে নিরাপদ।

সে ব্যাগ খুলল, খাতা বের করল। ক্লাসের আলো তার মুখে পড়ল—দেখলে মনে হয়, সে পরিপাটি, চঞ্চল নয়। কিন্তু চোখের ভেতরে লুকানো ছলনাটা কেউ ধরতে পারবে না। পরীক্ষা মানে তার কাছে এক ধরনের যুদ্ধ—যুদ্ধ নাম্বারের জন্য, যুদ্ধ সিস্টেমের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নিজেকে শীর্ষে রাখার জন্য।

“আজকের পাঠ,” আনিসুর রহমান বললেন, “রচনায় নিজের মূল্য। কিন্তু লক্ষ্য রাখ, সত্যিই লিখতে হবে।”

তৌহিদ হালকা হেসে চিন্তা করল—সত্য?
সে জানে, অনেকের কাছে পরীক্ষার মানে শুধু সংখ্যাই। আসল পাঠ্যবইয়ের কথা কেউ পরে না। যেই পড়াশোনা ফলাফল দেয় না, সেটি মানেই সময় নষ্ট। তাই সে নিজের কৌশল সাজাতে শুরু করল—কোথায় চোখ ঘুরবে, কোথায় খাতা ব্যবহার হবে।

শ্রেণিকক্ষের অদূরে আরিফ চুপচাপ বসে আছে। তৌহিদ তার দিকে তাকাল না। আরিফ যে নীরব, তার গোপন শক্তি বোঝা মুশকিল। নাম্বারের জন্য তৌহিদ লড়ছে, আরিফ লড়ছে আত্মপরিচয়ের জন্য।

পাশের বেঞ্চে রাশেদ ব্যস্ত—খালি টিফিন এবং ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই। তৌহিদ জানে, রাশেদের আজ পরীক্ষার নম্বর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সে নিজেকে প্রশ্ন করে না—কেন? কারণ সে জানে, সমাজে মানে শুধু জেতা। নৈতিকতা মানে না।

পরীক্ষার ঘণ্টা শুরু হলে সবাই খাতা খুলল। তৌহিদ হালকা নিশ্বাস ফেলল। চোখের কোণ দিয়ে সে দেখল—নিশাতের খাতায় পরিষ্কার লেখা, সুন্দর লেখা। সে বুঝল, মেয়েটি সত্যিই নিজের চিন্তা প্রকাশ করছে। কিন্তু তার নিজের খাতা? শূন্য নয়, কিন্তু সত্যও নয়।

প্রথম প্রশ্নে সে চোখ ঘুরিয়ে লিপি নকল করল। দ্বিতীয় প্রশ্নে হালকা পরিবর্তন করে লেখা। তৃতীয় প্রশ্ন—একটি কৌশলগত চুরি। তার মনের মধ্যে একাধিক হিসাব চলছে—কত নম্বর আসবে, কোথায় চোখ পড়ে গেলে বিপদ, কতটা রিস্ক নেওয়া যায়।

এই ক্লাসে নাম্বারের রাজনীতি চলছে। নাম্বার মানেই ক্ষমতা। নাম্বার মানেই নিরাপত্তা। নাম্বার মানেই স্বীকৃতি।

আনিসুর রহমান ঘুরে দেখলেন। তিনি তৌহিদের কৌশল ধরতে পারেন। কিন্তু কি বলেন? ক্লাসে কেউ নিজের সত্যিকারের নম্বর তো জানে না। তৌহিদ জিতে যাবে, কিন্তু নিজের দৃষ্টিকোণে হেরে যাবে।

ঘণ্টা শেষে খাতা জমা দিতে দিতে তৌহিদ মুখে হালকা হাসি দিল। অন্যেরা তাকাল, কেউ কিছু বলল না। সে জানে, আজ তার নাম্বার থাকবে শীর্ষে। কিন্তু সেই নাম্বারের মধ্যে তার নিজের চিন্তাভাবনা নেই—তাতে কি জয়?

দূরে নিশাত দাঁড়িয়ে নিজের খাতা গুছাচ্ছে। রাশেদ ব্যাগে কলম ফিরিয়ে দিচ্ছে। আরিফ চুপচাপ। তৌহিদ বুঝল—প্রতিটি লড়াই আলাদা। তার যুদ্ধ নাম্বারের জন্য। অন্যদের যুদ্ধ জীবন, স্বপ্ন, নৈতিকতা।

তার চোখে হালকা ধোঁয়া—একটি অদৃশ্য প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
আমি কি সত্যিই জিতেছি, নাকি শুধু সিস্টেমের খেলা খেলেছি?

ক্লাসরুমের বাতাস কিছুটা ভারী হলো। সবাই চলে গেল। কিন্তু তৌহিদের মনের মধ্যে নাম্বারের রাজনীতি এখনও চলতে থাকল। প্রতিটি সংখ্যা যেন এখন তার পরিচয়, প্রতিটি নম্বর যেন তার অস্তিত্বের প্রতীক।

আনিসুর রহমান বোর্ডে লেখা মুছে ফেললেন—নতুন পাঠ শুরু হবে। কিন্তু তার মনে হলো, এই ক্লাসে শুধুমাত্র পাঠ্যবই নয়, এখানে মহাসংগ্রাম চলছে—যেখানে কিছু জয়ী, কিছু পরাজিত, এবং কিছু লড়াই অসমাপ্ত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *