শ্রীরামকৃষ্ণ ও সমকালীন কলকাতা – অভিজিৎ পাল
SRI RAMAKRISHNA O SAMAKALIN KOLKATA
by Avijit Pal
Published by ATMAJAA PUBLISHERS
প্রথম প্রকাশ: ভাদ্র ১৪২৬ (সেপ্টেম্বর ২০১৯)
প্রচ্ছদ: শিবনাথ
প্রকাশক – অনিতা চট্টোপাধ্যায়
আত্মজা পাবলিশার্স
বসন্ত কুসুম, আড়িয়াদহ, কলকাতা -৫৭
.
অঞ্জলি
স্বামী চৈতন্যানন্দ মহারাজ ও
স্বামী সুজ্ঞানানন্দ মহারাজ-এর
করকমলে…
.
ঈশ্বর মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেন কিনা তা নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু মানুষই যে নিজ কর্মগুণে দেবত্ব অর্জন করেন এই বিষয়ে অযথা দ্বিমত পোষণ করা চলে না। আমাদের ভারতীয় সভ্যতায় বহু মানবই অবতারত্ব লাভ করেছেন। এই সভ্যতায় মনে করা হয়, সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের মতো জন্মগ্রহণ করে স্বয়ং ঈশ্বর জনগণের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, মানুষ কীভাবে দেবত্ব অর্জন করেন, মানুষ কীভাবে পরমের অধিকারী হতে পারেন। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, মানুষ কীভাবে দেবতা হন। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর সহযোগীগণ পূর্ণাঙ্গ দেবতা ছিলেন, ঈশ্বরের অবতার ছিলেন, না সাধারণমানুষ ছিলেন, সেই বিতর্ক আজ অবান্তর। তবে এটুকু বলতে পারি, তাঁদের ঐশীত্ব দেবতাকেও ছাপিয়ে যায়। তাঁরা এক-একজন মূর্ত প্রমাণ, রক্ত-মাংসের মানুষই দেবতা হয়ে ওঠেন। তখন তাঁর আসন উচ্চে প্রথিত হয় এবং শালগ্রাম বা শিবলিঙ্গ শিলাময় হয়ে তাঁর নীচে অবস্থান করেন। একথা যেমন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের ক্ষেত্রেও সত্য, শ্রীরামকৃষ্ণের ক্ষেত্রেও সত্য। তাঁদের মূর্তি যেসব মন্দিরে দেখেছি, প্রায় প্রত্যেক স্থলেই দেখেছি একই দৃশ্য। এখানে শাস্ত্রীয় দেবতার অবমাননা নেই, বরং তৃপ্তি রয়েছে। গুরু যেমন তৃপ্তি পান শিষ্যের গুণাবলী তাঁকে অতিক্রম করে গেলে। তবে এই কথাও সত্য এই রূপ ‘শ্রীরামকৃষ্ণত্ব’ লাভ করা দীর্ঘ জীবনসাধনার ব্যাপার। তা একদিনে হয় না, হওয়ার কথাও নয়। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’-এ লিখেছিলেন, “অতি তরুণ অবস্থা হইতেই আমার মনে এই প্রশ্ন উদিত হইত, “এ জীবন লইয়া কি করিব?” “লইয়া কি করিতে হয়?” সমস্ত জীবন ইহারই উত্তর খুঁজিয়াছি। উত্তর খুঁজিতে খুঁজিতে জীবন প্রায় কাটিয়া গিয়াছে। অনেক প্রকার লোক-প্রচলিত উত্তর পাইয়াছি, তাহার সত্যাসত্য নিরূপণ জন্য অনেক ভোগ ভুগিয়াছি, অনেক কষ্ট পাইয়াছি। যথাসাধ্য পড়িয়াছি, অনেক লিখিয়াছি, অনেক লোকের সঙ্গে কথোপকথন করিয়াছি, এবং কার্য্যক্ষেত্রে মিলিত হইয়াছি। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, দেশী, বিদেশী শাস্ত্র যথাসাধ্য অধ্যয়ন করিয়াছি। জীবনের সার্থকতা সম্পাদন জন্য প্রাণপাত করিয়া পরিশ্রম করিয়াছি। এই পরিশ্রম, এই কষ্ট ভোগের ফলে এইটুকু শিখিয়াছি যে, সকল বৃত্তির ঈশ্বরানুবর্ত্তিতাই ভক্তি, এবং সেই ভক্তি ব্যতীত মনুষ্যত্ব নাই। “জীবন লইয়া কি করিব।” এ প্রশ্নের এই উত্তর পাইয়াছি। ইহাই যথার্থ উত্তর, আর সকল উত্তর অযথার্থ। লোকের সমস্ত জীবনের পরিশ্রমের এই শেষ ফল; এই এক মাত্র সুফল। তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছিলে, আমি এ তত্ত্ব কোথায় পাইলাম। সমস্ত জীবন ধরিয়া, আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজিয়া এত দিনে পাইয়াছি। তুমি এক দিনে ইহার কি বুঝিবে?” বঙ্কিমচন্দ্রের কথাগুলির সমর্থন করুন বা নাই করুন, কিন্তু এই কথাটি স্বীকার করতেই হবে, যে প্রশ্নের উত্তর ভারতীয় সাধকগণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে গুরুশিষ্য পরম্পরায় জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন, একদিনে তার সবটুকু বুঝে যাওয়া যাবে এই বাসনা তৈরি হওয়াই ভয়ঙ্কর। শুধু স্বপক্ষে এটুকুই বলতে চাই, আজ পর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে এমন কোনো কথাই লিখিনি, যেখানে আমার নিজস্ব কোনো উপলব্ধি নেই। এর বিপরীত করা হলে, মিথ্যাচার করা হতো।
আমাদের এই নিবেদনের নামটি ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ও সমকালীন কলকাতা’ হলেও এর অন্তরে রয়েছে দুটি ভিন্ন অংশ। প্রথম ভাগে রয়েছে উনিশ শতকের জড়বিজ্ঞানের পালনভূমি কলকাতায় শ্রীরামকৃষ্ণ-সংস্কৃতির বিশ্লেষণ ও দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ সংক্রান্ত কিছু কথা। আমাদের এই কাজের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীরামকৃষ্ণ-চর্চা। শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীরামকৃষ্ণ-বলয়কে নতুনভাবে চেনার জন্য এই অর্ঘ্যপাত্রের আয়োজন। যাঁরা এর পূর্বে আমাদের ‘শ্রীরামকৃষ্ণ : সাধনার ইতিবৃত্ত’ বইটি পড়েছেন, তাঁদের মনে হতে পারে এই বইটি উক্ত বই-এর উত্তরাংশ। পরবর্তীতে এই বই-এর পরিবর্ধনের ইচ্ছে রইল। আসলে শ্রীরামকৃষ্ণ আমার চোখের সামনে যেভাবে প্রতিদিন নানাভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছেন, একবারেই তাঁকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে ফেলতে পারব, এমন সাধ্য নেই আমার। এই বইটি স্বামী চৈতন্যানন্দ মহারাজ ও স্বামী সুজ্ঞানানন্দ মহারাজকে অঞ্জলি দিতে পেরে তৃপ্তি লাগছে। আমার এম. ফিলের গবেষণার সময় স্বামী চৈতন্যানন্দ মহারাজ নিঃস্বার্থে আমাকে নানাভাবে শ্রীরামকৃষ্ণ-চর্চায় সাহায্য করেছিলেন। তখন তিনি ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার সম্পাদক, কিন্তু মঠের প্রদত্ত দায়িত্ব সামলেও তিনি আমাকে বহুক্ষণ সময় দিয়েছেন। এই বরিষ্ঠ সন্ন্যাসীর পদকমলে আমার প্রণাম। আর স্বামী সুজ্ঞানানন্দ মহারাজ আমার সরিষা আশ্রমের দিনগুলিতে পাওয়া অন্যতম প্রিয় মেন্টর। শ্রীরামকৃষ্ণচর্চায় আমার ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছিলেন তো এই তরুণ সন্ন্যাসীই। এখনও তিনি যথেষ্ট সুপরামর্শ দিয়ে আমাকে ধন্য করেন। তাঁদের দুজনের কাছে আমার যে ঋণ, তা আমি শোধ করতে আমি অক্ষম। অবশ্য সন্ন্যাসীরা প্রতিদান চান না, তাঁদের এই ভাব স্বতঃ ও স্বাভাবিক। শ্রীরামকৃষ্ণ পরিবারের এই দুই সন্ন্যাসীকে আমার শত শত আভূমি প্রণাম। এছাড়া যাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎসাহে ও স্নেহে শ্রীরামকৃষ্ণচর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকার অনুপ্রেরণা পেয়ে চলেছি, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। বিশেষ ঋণ স্বীকার করছি, উদ্বোধন পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরের সকলের কাছে ও সরিষা রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের কাছে।
‘আত্মজা’র সৌজন্যে শ্রীরামকৃষ্ণচর্চায় এই যে আরেকটি বই-এর আয়োজন করা হলো, এর পিছনে অরুণাভদার অকৃত্রিম শুভেচ্ছা রয়েছে। আমার পরিবারবর্গ ও কলেজজীবনের শিক্ষকদের প্রশ্রয় এই গ্রন্থের সময়েও আমার অতিরিক্ত পাওনা হয়েছে। পৃথকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ত্যাগব্রতী অন্যান্য সন্ন্যাসীদের। এই বই-এর প্রচ্ছদশিল্পী‚ মুদ্রণশিল্পী ও প্রকাশককে তাঁদের অনাবিল পরিশ্রমের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার ইষ্ট ও তাঁর শক্তির কাছে সকলের মঙ্গল প্রার্থনা করি।
অভিজিৎ পাল
৺শ্রীশ্রীষোড়শী পূজা, ১৪২৬
কলকাতা


Leave a Reply