শিখণ্ডী – দেবারতি মুখোপাধ্যায়
দীপ
SIKHANDI
by Debarati Mukhopadhyay
প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ২০২১
প্রচ্ছদ স্বর্ণাভ বেরা
অলংকরণ মৃণাল শীল
প্রকাশক দীপ্তাংশু মণ্ডল
.
বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথার জাদুকর,
যিনি এই উপন্যাস সম্পাদনার গুরুদায়িত্বও বহন করেছেন হাসিমুখে,
সেই সুরসিক, সুগায়ক ও সর্বগুণসম্পন্ন
রাজা ভট্টাচার্য (রাজা দা’কে)
রাজাদা! প্রণাম নিয়ো।
.
মহাভারত। সুবৃহৎ এই মহাকাব্যের প্রতিটি পর্বে, প্রতিটি শ্লোকে লুকিয়ে আছে বহু না-বলা আখ্যান, উপাখ্যান! স্রষ্টা ব্যাসদেব নিজেও এই মহাকাব্যের এক চরিত্র! যুগ যুগ ধরে বহু লেখক ‘মহাভারত’-এর নানা চরিত্রকে তুলে ধরেছেন নানা আঙ্গিকে, সম্পূর্ণ অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে! তাঁদের নিজস্ব কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন কোনো বাঁক। দ্রৌপদী, কর্ণ, অর্জুন কিংবা ভীষ্ম। সদর্পে বারবার তাঁদের পেয়েছি আমরা। জেনেছি নানা দিক থেকে।
কিন্তু পাদপ্রদীপের তলায় চাপা পড়ে গিয়েছেন এক অত্যন্ত যোগ্য ও বলিষ্ঠ চরিত্র। তিনি পাঞ্চাল প্রদেশের রাজা দ্রুপদের পুত্র, শিখণ্ডী। পূর্বজন্মে তিনিই ছিলেন কাশীর রাজকুমারী অম্বা। বাংলা প্রবাদে ‘শিখণ্ডী করে দাঁড় করানো’ অহরহ ব্যবহৃত হলেও ব্যক্তি শিখণ্ডীর দুঃখ হতাশা বেদনা যেন অনেকটাই অবহেলিত। আর সেই অবহেলা দ্বাপর যুগ পেরিয়ে একইভাবে প্রবহমান এই কলিযুগেও।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা আমাদের দেশে ‘হিজড়ে’ বলে পরিচিত। তাঁরা আমাদের সমাজে অস্পৃশ্য, অযাচিত ও কুৎসিত বলে এই একবিংশ শতাব্দীতেও অনাদৃত। অথচ আমাদের মতোই তাঁরাও মানুষ, আমাদেরই মতো তাঁদের খিদে পায়, ঘুম পায়। আমাদের মতোই তাঁদের সুখ ও দুঃখবোধও রয়েছে। আনন্দ ও যন্ত্রণার অভিব্যক্তিও বাদ নেই। তাঁদের যা নেই তা হল কর্মসংস্থানের সহজ সুযোগ, পুনর্বাসন, আবাসন অথবা স্থায়ী পল্লি এবং স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচার সহজ অধিকার। সরকার নানারকম আইন প্রণয়ন ও প্রকল্পের উদ্যোগ নিলেও তাঁদের প্রতি সাধারণ মানুষের আড়ষ্টতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। LGBTQ শব্দটি এখন বহুলপ্রচলিত। Lesbian, Gay, Bisexual, Transgender and Queer. শুধু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাই নন, সাধারণ যৌনতার মাপকাঠিতে যারা পড়েন না, সেই সমকামী, উভকামী বা রূপান্তরকামীরাও পড়েন এই দলে। আমাদের সমাজ যতই এগোক, এখনও তাঁদের প্রত্যেককেই জীবনে কখনও না কখনও নিজের ‘অ-সাধারণ’ sexual identity-র জন্য প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।
মহাভারত শুধুই অন্যতম বৃহৎ মহাকাব্য নয়, অনেকের কাছে মহাভারত হল ইতিহাস এবং নৃতত্ত্ব, আবার কারওর কাছে সর্বোচ্চ মাত্রার সাহিত্য। তবে যেহেতু তা চিরায়ত, তাই এ-যুগেও তার গভীর অন্তঃরহস্য বা ইন্দ্রজাল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। মহাভারতের শিক্ষা থেকে আজকের দিনের শিখণ্ডীদের দেখার প্রয়াস থেকেই আমার এই উপন্যাস লেখার ভাবনা। সেদিনের রাজ্য, রাষ্ট্রচরিত্র, কূটনীতি সবই তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি এই গ্রন্থে। শিখণ্ডীর মতো এক রূপান্তরকামী রাজকুমার, যিনি বারবার অপমানিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে বারবার তাঁর হাতেই মোড় ঘুরেছে মহাভারতের। তাঁর সেই রুদ্ধশ্বাস আখ্যান লিখেছি নিজের মতো করে। Epic Deconstruction এর সূত্র মেনে মহাভারতীয় আখ্যানে মিশিয়ে দিয়েছি ‘যোগ বশিষ্ঠ’, ‘শিব গীতা’র মতো প্রাচীন কাব্যকেও। সৌরাষ্ট্রের রাজকন্যা, যোগিনী চূড়ালা কোথায় যেন বাঁধা পড়েছেন শিখণ্ডীর সঙ্গে। সেই বন্ধন বন্ধুত্বের। যা হাজার হাজার বছর পেরিয়ে এসেও অটুট। সেই বন্ধুত্বের রক্ষাবন্ধনেই জড়িয়ে পড়ছে আজকের মিতু, সাহানা, পলি, ঊর্ণা, সিমিরা।
তথাকথিত ‘বাণিজ্যিক’ ঘরানার লেখার পরিধি থেকে বেরিয়ে এই উপন্যাস আমার ছক ভাঙা কাজ। শিখণ্ডীকে নিয়ে যে বাংলা সাহিত্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস নেই, সে-কথা আমায় প্রথম বলেন প্রখ্যাত সমালোচক ও লেখক ঋজু গঙ্গোপাধ্যায়। তিনিই উৎসাহ দেন এই আখ্যান রচনার। উপন্যাসটি লেখার পর মহাভারতীয় অধ্যায়গুলো সযত্নে সম্পাদনা করেছেন অগ্রজপ্রতিম লেখক রাজা ভট্টাচার্য। দুজনের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ। এছাড়া কৃতজ্ঞ শ্রদ্ধেয় লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কাছে, যাঁর ‘হলদে গোলাপ’ বাংলা সাহিত্যে LGBTQ সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার বিশেষ।
পরিবারের অসম্ভব সহযোগিতা ছাড়া বারোমাস সাহিত্যে ডুবে থাকতে পারতাম না। অফিসের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়ে সংসারে আমি নেহাতই অতিথি বিশেষ, লেখাপড়া নিয়েই ডুবে থাকি, তাতে তাঁরা বিরক্ত নন, গর্বিত। তাই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে তাঁদের ছোটো করব না।
শেষে যার কথা না বললেই নয়, সে আমার দু’বছরের শিশুপুত্র ঐতিহ্য। অফিস থেকে ফিরে মায়ের যে সময়টুকু একান্তই তার দাবি, সেই সময়ে সে আমাকে লিখতে দিয়েছে নির্দ্বিধায়। আমার ল্যাপটপের পাশে বসে সে কখনও আপনমনে খেলেছে, কখনও গান গেয়েছে। কিন্তু কখনও বিরক্ত করেনি। বিরক্ত করে না। আর সেইজন্যই সে ধরাধামে অবতীর্ণ হওয়ার পরেও আমি নিয়মিত লিখতে পারছি। শ্বাস নিতে পারছি। কারণ সাহিত্যই আমার অক্সিজেন। প্রতিটি শিশুর মধ্যে বিরাজমান ঈশ্বর। তাই ঐতিহ্যের ভেতরের সেই নির্মল ঈশ্বরের প্রতি রইল আমার প্রণাম।
পাঠকদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলাম। আমায় আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফেসবুকে ব্লু টিক ভেরিফায়েড পেজ Debarati Mukhopadhyay-তে। এছাড়া Instagram বা Youtube-এ।
এই উপন্যাস নিঃশর্ত বন্ধুতার কথা বলে, যার প্রাথমিক শর্ত সহমর্মিতা। আত্মকেন্দ্রিকতার এই যুগে সেই বোধ আরও বেশি করে জাগ্রত হোক সকলের মধ্যে, এই কামনা করি। ভালো থাকুন।
দেবারতি মুখোপাধ্যায়






Awesome
Darun lageche ak onno itihas jante parlam