রাজা ইডিপাস – সফোক্লিস
রাজা ইডিপাস – সফোক্লিস
ভূমিকা ও অনুবাদ – কবীর চৌধুরী
বুকস্ ফেয়ার ॥ ঢাকা
প্রথম প্রকাশ – ডিসেম্বর ২০০৯, অগ্রহায়ণ ১৪১৬
প্রকাশক – মো. ফারুক হোসেন
প্রচ্ছদ – রাজিবুর রহমান রোমেল
KING OEDIPUS : (A drama) by sophocles Translated into Bangla by Kabir Chowdhury. Published by Md. Faruk Hossain of Books Fair, 37 / 1 Banglabazar, Dhaka-1100, Cover Designed Rajibur Rahman Romel, 2nd Edition : September 2013, Price : 100 Only
.
উৎসর্গ
আমার জৈষ্ঠ্য কন্যা
শাহীন কবীরকে
.
ভূমিকা – কবীর চৌধুরী
রচনার পর আড়াই হাজার বছরের বেশি কাল অতিক্রান্ত হলেও এখনো সফোক্লিসের ‘রাজা ইডিপাস’ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি বলে বিবেচিত হয়। সফোক্লিস জন্মগ্রহণ করেছিলেন এথেন্স নগরীর ঠিক বাইরে, কলোনাস-এ, খ্রীস্টপূর্ব ৪৯৬ সালে। তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন, মৃত্যুবরণ করেন খ্রী. পূ. ৪০৬ সালে। একশোটির মতো নাটক রচনা করলেও আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে তাঁর মাত্র সাতটি ট্র্যাজেডি : অ্যাজাক্স, আন্তিগোনি, রাজা ইডিপাস, থিবির রমণীগণ, ইলেক্ট্রা, ফিলেকটেটাস এবং কলোনাস-এ ইডিপাস।
সফোক্লিস এবং তাঁর অসাধারণ নাটক ‘রাজা ইডিপাস’ সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে আমরা প্রাচীন গ্রিক নাট্যকলা সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিতে পারি।
গ্রিক নাটক, বিশ্বের আরো প্রাচীন নাটকের মতোই, প্রথম বিকশিত হয়েছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। বস্তুতঃপক্ষে ধর্মের সঙ্গে তার যোগসূত্র কখনো সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়নি। গ্রিক নাটকের একেবারে আদিপর্বের কথা সুনিশ্চিত ও সুস্পষ্টভাবে আমাদের জানা নেই। সাহিত্যতত্ত্বের মহাগুরু অ্যারিস্টটলের মতে, গ্রিক দেবতা ডায়োনিসাসের উদ্দেশে যে নৃত্যগীত সংবলিত শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন উৎসবের আয়োজন করতো প্রাচীন গ্রিকগণ, তা থেকেই গ্রিক নাটকের উদ্ভব হয়। ডায়োনিসাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি, বসন্ত ঋতু, ঊর্বর ফলন, নবজন্ম এবং বিশেষভাবে সুরা। নৃত্যগীতের উৎসব নিবেদিত হতো সেই ডায়োনিসাসের উদ্দেশে। প্রথমে পঞ্চাশ জনের একটি দল এতে অংশ নিত, অর্ধ-মানব অর্ধ পশুর সাজে সজ্জিত হয়ে স্যাটির রূপে তারা মঞ্চে এসে দাঁড়াতো, সুরেলা গীত গাইতো, তাল ছন্দ লয় অনুসরণ করে তার সঙ্গে সঙ্গে নাচতো। এই লঘু কৌতুকোচ্ছল ঐতিহ্যের সঙ্গে ট্র্যাজেডির উৎসকে মিলিয়ে গ্রহণ করা একটু কষ্টসাধ্য মনে হয়, কিন্তু গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো সুসঙ্গত ব্যাখ্যাও আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। এই নৃত্যগীতোৎসব তথা স্যাটির ডিথিরাম্ব চলাকালেই হয়তো দলনেতা বা কোরাস-লিডারের সঙ্গে দলের অন্য কোনো সভ্য আলাপ করেছে, বাক্য বিনিময় করেছে, তখন শুধু সংগীত নয়, জন্ম নিয়েছে সংলাপ। হয়তো এক পর্যায়ে দলনেতা গান বা কবিতায় কাহিনী বর্ণনা করতে করতে নিজেই কাহিনীর চরিত্র সেজে নায়কের বক্তব্য পেশ করেছে : জন্ম নিয়েছে অভিনয়। এসব সিদ্ধান্ত অনেকটা অনুমাননির্ভর, কিন্তু সম্পূর্ণ মনগড়া নয়। অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি এইসব অনুমানের সত্যতার পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়।
যা আমরা জানি তা হলো এই যে, খ্রীস্ট-পূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সে প্রতি বছর দু’টি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দু’বার নাট্যোৎসব হতো। একটা হতো শীতকালে জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে। এই উৎসবের নাম ছিল “লেনা” কিংবা “সুরা-দলন উৎসব”। এটার গুরুত্ব ছিল অপেক্ষাকৃত কম। অপর বৃহত্তর উৎসবটি হতো বসন্তকালে, মার্চে অথবা এপ্রিলে। তার নাম ছিল “বৃহত্তর অথবা নগর-ডায়োনিসিয়া”। এই উৎসবটি চলতো পাঁচ ছয় দিন ধরে। নগরের প্রায় প্রত্যেক অধিবাসী আনন্দমুখর মন নিয়ে এই উৎসবে যোগ দিতো, নাটক দেখতো, খুশি হলে প্রচণ্ড করতালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, বিরক্ত হলে বিরাগ প্রদর্শনের জন্য কখনো কখনো মঞ্চের উদ্দেশ্যে ইটপাটকেল ছুঁড়তেও দ্বিধা করতো না। তবু মোটের উপর দর্শককুল আচার আচরণে সুশৃঙ্খল ও নিয়মানুবর্তীই ছিল। প্ৰথম দিকে নাটক দেখবার জন্য নাগরিকদের কোনো দর্শনী দিতে হতো না, কিন্তু শতাব্দীর শেষ দিকে টিকেটের ব্যবস্থা করা হয়, তবে কেউ যদি আর্থিক অনটনের কথা প্রতিষ্ঠিত করতে পারতো তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার টিকিট কিনে দেয়া হতো। মোটের ওপর নাটক দেখাটা ছিল সার্বজনীন একটা ব্যাপার। চিত্তবিনোদন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, শিক্ষাগ্রহণ সব উদ্দেশ্যই চরিতার্থ হতো নাটকের দর্শক হলে।
নগর-ডায়োনিসিয়া উৎসবে যে সব নাটক প্রদর্শিত হত তা পূর্বাহ্নেই নির্বাচিত করা হতো। তারপর এই নির্বাচিত নাটকগুলির মধ্য থেকে পুরস্কারের জন্য প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান রূপে বিচারকমণ্ডলী শ্রেষ্ঠ নাটক মনোনীত করতেন। প্রথম দিকে প্ৰতিযোগিতা হতো তিনটি শাখায় : কমেডি, ট্র্যাজেডি ও ডিথির্যাম্ব। পিলোপনেসীয় যুদ্ধের পূর্বে উৎসব চলতো ছ’দিন ধরে। প্রথম দিনে ছিল শুধু আনন্দমুখর আড়ম্বরপূর্ণ শোভাযাত্রা। দ্বিতীয় দিনে নৃত্যগীত অনুষ্ঠানের (ডিথিরাম্বিক কোরাসের) প্রতিযোগিতা। তৃতীয় দিনে হতো কমেডি বা মিলনান্তক নাটকের প্রতিযোগিতা আর শেষ তিন দিনে অনুষ্ঠিত হতো ট্রাজেডি বা বিয়োগান্তক নাটকের প্রতিযোগিতা। নৃত্যগীতের প্রতিযোগিতায় দশটি দল অংশ নিত, কমেডিতে পাঁচ জন কবি-নাট্যকার, ট্র্যাজেডিতে তিন জন। ট্র্যাজিক নাট্যকাররা প্রত্যেকে চারটি করে নাটক পরিবেশন করতেন। একই কেন্দ্রীয় বিষয় বা ভিন্ন ভিন্ন বিষয় অবলম্বন করে রচিত তিনটি বিয়োগান্তক নাটক এবং একটি লঘুরসের স্যাটির নাটক। পিলোপনেসীয় যুদ্ধের সময় (খ্রীস্টপূর্ব ৪৩১-৪০৪) উৎসবকাল ছয় দিন থেকে কমিয়ে পাঁচদিন করা হয়, সম্ভবত যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা হিসেবে। তখনই কমিক নাটকের প্রতিযোগীদের সংখ্যাও পাঁচ থেকে কমিয়ে তিন করা হয়। ওই সময় শেষ তিন দিনের প্রতিযোগিতায় প্রত্যেকদিন সকালে একজন ট্রাজিক নাট্যকারের চারটি নাটক ও অপরাহ্নে একটি করে কমেডি পরিবেশন করা হতো।
নাটক মঞ্চায়নের ব্যয় কিছুটা বহন করতো রাষ্ট্র আর কিছুটা বহন করতো বিত্তশালী কতিপয় নাগরিক। সেই নাগরিকদের চিহ্নিত করে দিতো রাষ্ট্রই। এই দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হওয়া ছিল আকাঙ্ক্ষিত সম্মানের বিষয়। নাট্যকার নাটক মঞ্চায়ন ও প্রযোজনার ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশ নিতেন। বস্তুতঃপক্ষে তিনিই নাটকের জন্য সংগীত রচনা করতেন, মঞ্চ নির্দেশক হিসেবে কাজ করতেন, অভিনেতাদের তালিম দিতেন এবং প্রায়ই নিজেও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতেন। কোরাসকে বাদ দিয়ে প্রায় কোনো নাটকেই তিন জনের বেশি অভিনেতা থাকতো না। তেমন প্রয়োজন পড়লে একজন অভিনেতা একাধিক ভূমিকায় অভিনয় করতেন। আর স্ত্রী চরিত্রেও পুরুষই অভিনয় করতেন, কোনো নারী নয়। যেমনটি ছিল বহু পরের শেক্সপিয়রের যুগেও। ট্র্যাজিক নাটকের প্রতিযোগিতায় তিনজন প্রতিযোগীই পুরস্কার পেতেন, একটি বাছাইয়ের মাধ্যমে। সেই বাছাই অবশ্য মঞ্চায়িত নাটক দেখে নয়, পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করে করা হতো। প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার জন্য নাট্যকার ও নাটকাবলি আগেই স্থিরীকৃত হতো বলে তিনজনকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি ছিলনা। তবে স্বাভাবিকভাবেই সর্বোচ্চ গৌরব বর্ষিত হতো প্রথম পুরস্কার যে নাট্যকার লাভ করতেন তাঁর উপর, এবং অনেক সময় তৃতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি ছিল বিতর্কিত সম্মানের বিষয়।
গ্রিক নাটক আজকের দিনের মতো কোনো প্রেক্ষাগৃহে সুসজ্জিত মঞ্চে অভিনীত হতো না। দর্শকমণ্ডলীর জন্য অবশ্যই আসনের ব্যবস্থা ছিল, অভিনয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট স্থানও সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু তার প্রকৃতি এবং আকৃতি ছিল ভিন্নতর। পাহাড়ের গায়ের ঢালু বেয়ে অনেকটা অর্ধবৃত্তের মতো ঘোড়ার নালের আকারে দর্শকদের জন্য পাথর কেটে কেটে আসনের ব্যবস্থা করা হতো। মাথার উপর কোনো ছাদ নেই, পেছনে উঁচু হয়ে উঠে গেছে পাহাড়ের প্রাচীর। স্তরবিন্যস্ত আসনরাজি প্রায় আমাদের আজকের দিনের খেলার স্টেডিয়ামের কথা মনে করিয়ে দেয়। এক একটা প্রাচীন থিয়েটার ছিল বিশাল আকৃতির, সেখানে পনেরো ষোল হাজার দর্শকের স্থান সঙ্কুলান হতো সহজেই। এথেন্সে অ্যাক্রোপলিসের দক্ষিণ দিকে “ডায়োনিসাস থিয়েটারের” আসন সংখ্যা ছিলো সতেরো হাজারের মতো। সে যুগের সব চাইতে বিখ্যাত যে থিয়েটারের ধ্বংসাবশেষ আমাদের চরম বিস্ময় হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে তা হলো “এপিডরাস থিয়েটার”। অর্ধবৃত্তাকারে স্তর বিন্যস্ত উপর থেকে নিচে নেমে আসা আসনরাজির একেবারে প্রথম সারির মধ্যবর্তী স্থানে ছিল একটি সিংহাসন। সেখানে আসন গ্রহণ করতেন ডায়োনিসাসের পুরোহিত। তার মুখোমুখি ছিল একটা গোলাকৃতি সমতল জায়গা যার কেন্দ্রস্থলে ছিল একটি যজ্ঞবেদী। এই যজ্ঞ বা পূজাবেদী প্রয়োজনবোধে নাটকের কাজে ব্যবহৃত হতো। আর গোলাকার সমতল স্থানটির নাম ছিল অর্কেস্ট্রা, প্রাচীন গ্রিক নাটকে যার গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক। এখানেই কোরাসদল তাদের নৃত্য-গীত পরিবেশন করতো, নাটকের ঘটনাবলিও কিছু কিছু এখানেই সংঘটিত হত। অর্কেস্ট্রার দু’পাশ দিয়ে ছিলো প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণের পথ, দর্শকবৃন্দ ও নাটকের কুশীলব উভয়েই যা ব্যবহার করতো। অর্কেস্ট্রার পরেই ছিলো দৃশ্য-দালান, প্রথমে যা ছিল কাঠের, পরে পাথর দিয়ে তৈরি। এই দৃশ্য দালান সাধারণত কোনো প্রাসাদের চত্বর, কিংবা কোনো সৌধের সম্মুখভাগ কিংবা কোনো মন্দিরের অলিন্দকে বোঝাতো। নাট্যকলার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেটা যথার্থই কিসের প্রতীক তা বোঝাবার জন্য বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করা হতো। সচরাচর এই দৃশ্য-দালানের তিন চারটি দরজা থাকতো। অভিনেতারা অতিরিক্ত প্রবেশ-নিষ্ক্রমণ পথরূপে এগুলি ব্যবহার করতো। দৃশ্য-দালান আর অর্কেস্ট্রার মাঝখানে ছিল অর্কেস্ট্রার চাইতে সামান্য একটু উঁচুতে একটি লম্বাটে ধরনের সমতল পাটাতন। পঞ্চম শতকের গ্রিক নাটকাবলির বেশির ভাগ অংশই এই স্থানটিতে অভিনীত হতো, যদিও নাটকের চরিত্রাবলি মাঝে মাঝে অভিনয়কালে সামনের গোলাকার অর্কেস্ট্রাতে নেমে আসতো। আবার কখনো কখনো পেছনের দৃশ্য- দালানের ছাদের উপরও তাদের আবির্ভাব ঘটতো।
অভিনেতার সংখ্যা ছিল সীমিত। কোরাসদল ছিলো প্রথমে পঞ্চাশ জনের। আমরা প্রথম যে গ্রিক নাট্যকারের নাম পাই তিনি হলেন থেসপিস। তার সময় অভিনেতা ছিল একজন মাত্র। কোরাসদল এবং একক অভিনেতা নিয়ে পরিবেশিত হয়েছিল তার নাটক। পঞ্চম শতকে এস্কাইলাসের অবিস্মরণীয় প্রতিভার স্পর্শে গ্রিক নাটক যেন অকস্মাৎ কালজয়ী শিল্পকলায় রূপান্তরিত হলো। এস্কাইলাস কোরাসের সংখ্যা কমিয়ে নিয়ে এলেন বারোতে, আর অভিনেতার সংখ্যা বাড়িয়ে করলেন দুই জন। গ্রিক নাটকের স্বর্ণযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, এস্কাইলাসের বয়োকনিষ্ঠ, অমর নাট্যকার সফোক্লিস কোরাসের সংখ্যা একটু বাড়িয়ে করলেন পনেরো, আর অভিনেতার সংখ্যাতে যোগ করলেন আরো একজন, অর্থাৎ সেটা এখন দাঁড়ালো গিয়ে তিনে। গ্রিক নাটকে প্রায় কখনোই আমরা তিন জনের বেশি অভিনেতাকে মঞ্চে বাক্যরত অবস্থায় পাই না, বেশির ভাগ সময়ই দুই জনের বেশি কেউ মঞ্চে উপস্থিত থেকে একই সঙ্গে সংলাপ উচ্চারণ করে না।
দৃশ্য-দালানের পটভূমিতে উন্মুক্ত মঞ্চে নাটক মঞ্চায়িত করবার জন্য গ্রিক নাট্যকারদের তাদের নাটকের দৃশ্য নির্বাচনের ব্যাপারে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হতো। স্বাভাবিকভাবে যেসব ঘটনা গৃহের বাইরে ঘটতে পারে, গৃহ-মন্দির বা প্রাসাদের সামনের চত্বরে অনুষ্ঠিত হতে পারে, তারা সেই সব ঘটনা ভিত্তি করেই তাদের নাটক রচনায় ব্রতী হতেন, সেইভাবেই তাদের নাটকের পাত্রপাত্রী ও আখ্যানভাগ পরিবেশন করতেন। তাদের বিশেষ মঞ্চব্যবস্থার জন্যই গৃহাভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত কোনো ঘটনা দর্শকবৃন্দের সামনে তুলে ধরার কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। এই অসুবিধা অতিক্রম করার জন্য তারা একটি বিশেষ চাকালাগানো পাটাতন ব্যবহার করতেন। খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতকেই প্রথম এর ব্যবহারের কথা আমরা জানতে পারি। দৃশ্য-দালান থেকে তারা এই ঢাকা-লাগানো পাটাতনটি বাইরের মঞ্চে গড়িয়ে নিয়ে আসতেন। এই পাটাতনের উপর অভিনীত সব ঘটনাবলীই বুঝতে হবে গৃহাভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রেষ্ঠ গ্রিক ট্র্যাজিক নাট্যকার ত্রয়ীর কনিষ্ঠতম ইউরিপাইডিস এবং গ্রিক কমিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফানিসই এই কৌশলটির অপেক্ষাকৃত বেশি সদ্ব্যবহার করেছেন। এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়েরও উল্লেখ করা সমীচীন। পঞ্চম শতকের গ্রিক নাট্যকাররা তাদের নাটকের প্রয়োজনে একটি ‘যন্ত্র’ ব্যবহার করতেন, অনেকটা মাল ওঠানো নামানোর জন্য ব্যবহৃত ক্রেনের মতো। গ্রিক নাটকে প্রায়ই নাটকের শেষ পর্যায়ে কোনো দেবতা বা দেবীর আবির্ভাব অনিবার্য হয়ে পড়তো। নাট্যকার এই অমানবীয় চরিত্রকে মঞ্চে উপস্থিত করার জন্য বিশেষ যন্ত্রটির সাহায্য নিতেন। অন্যান্য চরিত্রের মতো দেবতা বা দেবী পায়ে হেঁটে বা গাড়িতে করে মঞ্চে প্রবেশ করতেন না, তিনি উপর থেকে ওই যন্ত্রের সাহায্যে মঞ্চে আবির্ভূত হতেন। নাট্যসাহিত্যের অগ্রগতির সাথে পরবর্তীকালে অপটু নাট্যকার যখন কোনো আকস্মিক যোগাযোগ ঘটিয়ে নিজের সৃষ্ট নাটকের জটিল গ্রন্থিমোচন করতেন, তখন সাহিত্য সমালোচকরা নিন্দাসূচক উক্তি হিসাবে তাকে ‘মেশিনের দেবতা’ বলে অভিহিত করতেন। সে যাই হোক, এই মেশিন, চাকাবসানো পাটাতন এবং দ্রুত পরিবর্তনযোগ্য কিছু বোর্ডে আঁকা দৃশ্য-সজ্জা (যা অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালের সংযোজন) ব্যতীত প্রাচীন গ্রিক নাটকে আর কোনো মঞ্চ-উপকরণ ব্যবহৃত হতো না। অভিনেতারা মুখোশ পরে অভিনয় করতো, আজও যেমন জাপানের ঐতিহ্যবাহী থিয়েটারে দেখা যায়। পায়ে পরতো উঁচু গোড়ালির বুটজুতো। চরিত্রানুগ জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণাঢ্য পোশাক পরার রেওয়াজ ছিল তখন। নাটকে হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ প্রভৃতি সাধারণ ঘটনা ছিল, কিন্তু এগুলো ব্যতিক্রমহীনভাবে সংঘটিত হত নেপথ্যে, মঞ্চের বাইরে। কোনো দূত বা বার্তাবহ মঞ্চে এসে সেসব ঘটনার শক্তিশালী বর্ণনা প্রদান করতো। কোরাসের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নাটকের অপরিহার্য নৃত্যগীতাংশ সরবরাহ করা ছাড়াও প্রায়শঃই তারা কাহিনীর পটভূমি ও পূর্বকথা ব্যক্ত করতো, তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে আনন্দ উৎকণ্ঠা দুঃখ প্রভৃতি অনুভূতির প্রকাশ দ্বারা প্রয়োজনীয় আবহ ও পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করতো, নাটকের ঘটনাবলির উপর মন্তব্য করতো, তার ব্যাখ্যায় ব্রতী হতো, সর্বোপরি নাট্যকারের সামগ্রিক দার্শনিক জীবনদৃষ্টির অন্যতম উন্মোচক হয়ে উঠতো।
ট্র্যাজিক নাটকই গ্রিক নাট্যকলার শীর্ষে উপনীত হয়েছিল। এস্কাইলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপাইডিসের সৃষ্টি আজও আমাদের সবিস্ময় অপার শ্রদ্ধার উদ্রেক করে, যদিও তাদের সমগ্র সৃষ্টিকর্মের মাত্র অতি ক্ষুদ্র অংশ আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। এস্কাইলাস নব্বইটির মতো নাটক রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে মাত্র সাতটি। সফোক্লিস একশোটিরও বেশি নাটক রচনা করেছিলেন, কিন্তু তার ক্ষেত্রেও আমরা মাত্র সাতটি নাটকের সন্ধান পেয়েছি। এই ত্রয়ীর ভেতর কনিষ্ঠতম নাট্যকার ইউরিপাইডিস ছিলেন অন্তত পঁচাত্তরটির নাটকের রচয়িতা, যদিও আমরা পেয়েছি মাত্র তাঁর আঠারোটি নাটক। এঁদের ট্র্যাজিক নাটকগুলো একদিক থেকে সরল, সমকালীন মানুষের অতি পরিচিত কাহিনীর সহজ পরিবেশন, স্বল্পসংখ্যক চরিত্রের বিরল ঘটনাময় উপাখ্যানের অজটিল উপস্থাপন। অন্যদিক থেকে এগুলি অত্যন্ত নিপুণ, বহু আয়াসে নির্মিত, সূক্ষ্ম পরিমার্জিত ও পরিশীলিত শিল্পকর্ম। নানা ধরনের উপাদানে তারা সমৃদ্ধ, বিচিত্র ও বহুমাত্রিক তাদের আবেদন। সংগীত, কাব্যময় সংলাপ, নৃত্য, নাটকীয় ঘটনা, মনস্তাত্ত্বিক ঐশ্বর্যে পূর্ণ চরিত্র, দৈব ও নিয়তির অমোঘ উপস্থিতি, উজ্জ্বল নানা বর্ণের সমারোহ, ভাবগম্ভীর হৃদয়স্পর্শী দার্শনিক চিন্তাধারা ও জীবনের বহু বাস্তব মৌল জিজ্ঞাসার উত্থাপন, সব মিলে গ্রিক ট্র্যাজেডিতে আমরা যা পাই তা আজো পর্যন্ত অন্যত্র অনুপস্থিত।
এবার আমরা সফোক্লিসের অমর নাটক “রাজা ইডিপাস” সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করবো এবং এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো চরিত্র ও নিয়তির ভূমিকার উপর
নিয়তি আর পুরুষকারের দ্বন্দ্ব মানুষের ইতিহাসের আদি লগ্ন থেকেই আমরা লক্ষ করি। মানুষ কি সর্বতোভাবে তার ভাগ্যের নির্মাতা, নাকি নিয়তির হাতে সে অসহায় ক্রীড়ানক? এবং যদি দুটোর মধ্যেই অর্ধসত্য লুকানো থাকে তবে জীবনের প্রকৃত রূপ কি? তা কি সুখ ও আনন্দের, না কি ব্যথা ও বেদনার? প্রাচীন গ্রিক নাটকে আমরা ভাগ্যকে দেখি অপ্রতিরোধ্য, নিয়তি সেখানে সর্বশক্তিমান। যদিও তেমন মানুষের সাক্ষাও আমরা সেখানে পাই যে মোটেই দুর্বল নয়। বুদ্ধি, সাহস ও মমত্ববোধে যে পরম গৌরবদ্বীপ্ত। আর জীবনের রূপ? শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক ত্রয়ীনাট্যকার-এস্কাইলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপাইডিস, তিন জনই জীবনকে দেখেছেন বিষাদময়, করুণ, বেদনাহত। এস্কাইলাসের ‘অ্যাগামেমনন’ নাটকে আমরা ভাগ্যবিড়াম্বিতা দুঃখিনী কাসান্ড্রাকে বলতে শুনি :
Alas for human Destiny! Man’s happiest hours
Are pictures drawn in shadow. Then ill fortune comes
And with two strokes the wet sponge wipes the drawing out
And grief itself’s hardly more pitiable than joy.
সফোক্লিসের ‘রাজা ইডিপাসে’ আমরা কোরাসের কণ্ঠে শুনি অপরিসীম বেদনা ও নৈরাশ্যের বাণী :
Alas for the seed of men,
What measure shall I give these generations
That breathe on the void and are void
And exist and do not exist?
এবং ইউরিপাইডিসের ‘হিপোলিটাস’ নাটকের নার্স কি বলেছে শুনুন :
Man’s life from birth to death is sorrow and pain
With never pause or relief;
And when we are dead, is there a happier world?
Knowledge is hidden from us in clouds and darkness.
এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম নাট্যকাররা যদি জীবনের করুণ ও বিষণ্ণ রূপকেই শুধু চিত্রিত করেন এবং নিয়তির সর্বনাশা সর্বশক্তিমান রূপকেই শুধু প্রত্যক্ষ করেন তবে তাদের শিল্পকর্ম কেন এত দীর্ঘকাল ধরে মানুষকে আনন্দ দিয়ে আসছে? মানুষ কি স্বভাবতই বিষাদের অনুরাগী? নাকি এই ট্র্যাজিক শিল্প-কর্মের চিরন্তন জনপ্রিয়তার উৎস অন্য কোথাও নিহিত?
এ প্রশ্নের একরৈখিক সহজ কোনো উত্তর নেই। তবে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা তুলে ধরা যায়। দর্শক-পাঠকের উপর ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া চিত্তভারাক্রান্তকারী নয়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ট্র্যাজেডিগুলি মানুষের বিপর্যয়ের ছবি তুলে ধরেও তাকে হতাশায় নিমজ্জিত করে না, কারণ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি মানুষের সাহস, মহত্ত্ব ও অনমনীয় বীর্যের চিত্রও তা পরিবেশন করে। এবং বিশ্বের দুর্জ্জেয় সর্বব্যাপী রহস্যাবলি সম্পর্কে দর্শক-পাঠকের চেতনাকে তীক্ষ্ণতর ক’রে, সর্বনাশা নিয়তির সামনে মানুষের মহত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত ক’রে, এবং মানুষের দুর্ভাগ্যে দর্শক-পাঠকের মনে সমবেদনা, মমতা ও ভীতির উদ্রেক ক’রে ট্র্যাজেডি জীবনকে শেষ পর্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত করে না, বরং অধিকতর সহনীয়, এমনকি হয়তো আকর্ষণীয়ও, করে তোলে।
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক নাট্যকার সফোক্লিসের কালজয়ী নাটক ‘রাজা ইডিপাস’-এর বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের উপরের সাধারণীকৃত উক্তিগুলি স্পষ্টতর হয়ে উঠতে পারে।
‘ইডিপাস’ নাটকের পূর্বকথা এই রকম। থিবির রাজা লেয়াস এবং ইয়োকাস্তার একটি পুত্র সন্তান হলো। নবজাতকের নামকরণের পূর্বেই দৈববাণী শোনা গেল যে, এই সন্তান একদিন পিতৃঘাতক হবে এবং বিবাহ করবে আপন মাতাকে। লেয়াস ও ইয়োকাস্তা শিউরে উঠে শিশুপুত্রকে পর্বতপ্রান্তে ফেলে দিয়ে আসার জন্য নিজেদের এক মেষপালককে নির্দেশ দিলেন। শিশুর দুটো পা ফুটো করে গ্রন্থিবদ্ধ করে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেই জন্যই ইডিপাস নাম। তারপর এরকম ক্ষেত্রে প্রায়ই যেমন ঘটে থাকে, সেই মেষপালক দয়াপরবশ হয়ে শিশুকে তুলে দিল করিন্থের এক মেষপালকের হাতে। সে এই শিশুকে আবার তুলে দিল করিনথের সন্তানহীন রাজা পলিবাস ও রাণী মেরোপির হাতে। পলিবাস শিশুর নামকরণ করলেন ইডিপাস। পুত্রের মতো ইডিপাস বড় হয়ে উঠলো রাজা পলিবাসের গৃহে, সর্বত্র মান্য হলো করিন্থের যুবরাজ রূপে। একসময়ে যুবক ইডিপাস অ্যাপোলোর দৈববাণী শুনলো যে, সে পিতৃঘাতী হবে। দৈববাণীকে মিথ্যা করে দেবার জন্য পালক পিতাকে আপন পিতা ভেবে ইডিপাস করিন্থ ছেড়ে অন্যত্র গেলো। পথে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো এক অসহিষ্ণু বৃদ্ধের সঙ্গে। এই বৃদ্ধই রাজা লেয়াস, যদিও ইডিপাস তা জানতে পারে নি তখনো। বৃদ্ধ ইডিপাসকে পথ থেকে সরে দাঁড়াতে বললো। শুরু হলো ঝগড়া। উত্তেজনাপ্রবণ প্রখর আত্মসম্মান জ্ঞানের অধিকারী, অল্পতেই ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠা ইডিপাস সেই বৃদ্ধকে হত্যা করলো। তারপর সে এসে পৌঁছুলো থিবিতে। সেখানে এসে ইডিপাস দেখলো যে ওই দেশে তখন চলছে চরম দুঃখ-দুর্দশা ও বিপর্যয়ের পালা। অজ্ঞাত পথচারীর হাতে, নাকি দস্যুদলের হাতে, দেশের রাজা লেয়াসের মৃত্যু হয়েছে। তদুপরি স্ফিংসের ভয়ে সবাই সন্ত্রস্ত্র। এই ভয়ঙ্কর প্রাণীটির মাথা রমণীর, দেহ সিংহের, ডানা ঈগলের এবং পুচ্ছ নাগিণীর। প্রত্যেকের কাছে সে একটি প্রশ্ন রাখে : কোন প্রাণী প্রভাতে চার পায়ে, মধ্যাহ্নে দুইপায়ে এবং সায়াহ্নে তিন পায়ে হাঁটে। সবাই উত্তর দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং স্ফিংসের হাতে একে একে মৃত্যুবরণ করছে প্রত্যেকে। শেষে ইডিপাস, ধাঁধার সঠিক উত্তর দিলে স্ফিংস নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেললো। থিবি বিপদমুক্ত হলো। থিবির কৃতজ্ঞ জনগণ ইডিপাসকে রাজা বলে গ্রহণ করল এবং ইডিপাস রাজা হয়ে পত্নীত্বে বরণ করলো লেয়াসের বিধবা পত্নী ইয়োকাস্তাকে। দৈববাণী পূর্ণ হলো অক্ষরে অক্ষরে। ইডিপাসের জ্ঞাতসারে কিছুই ঘটলো না, কিন্তু প্রাক-নির্ধারিত নিষ্ঠুর নিয়তির জাল কেটে সে বেরিয়ে আসতে পারলো না তার ঐকান্তিক প্রয়াস সত্ত্বেও। ইয়োকাস্তার গর্ভে ইডিপাসের ঔরসে পুত্র-কন্যার জন্ম হলো। এইভাবে পনেরো বছর কেটে যাবার পর হঠাৎ সারা দেশে নেমে এল মহামারী ও মন্বন্তর। এইখান থেকেই সফোক্লিসের ‘রাজা ইডিপাস’ নাটকের শুরু।
এস্কাইলাস সম্ভবত এই ‘মিথ’টিকে সফোক্লিসের চাইতে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন। তাঁর চোখে দেবতা জিউসের বিচার নির্মম হতে পারে কিন্তু অন্যায় নয়। লেয়াস একটি ছেলেকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছিলেন অন্যায় ভাবে। সেই পাপের জন্য তাঁকে এবং তাঁর বংশকে মূল্য দিতে হবে। কিন্তু সফোক্লিসে এই যুক্তিসঙ্গত নৈতিকতার দিকটা উপস্থাপিত নয়। সফোক্লিসের পূর্ববর্তী কোনো কোনো ভাষ্যে আমরা দৈববাণীকে দেখি শর্তসাপেক্ষ। যদি লেয়াসের পুত্র সন্তান হয়, তবে সে হবে পিতার হত্যাকারী। সফোক্লিসের ‘রাজা ইডিপাসে’ এই জাতীয় যদির কোনো অবকাশ নেই। সেখানে লেয়াসে ওরা-এর (Oracle) পরামর্শ নিতে গেছেন, এবং স্পষ্ট শুনেছেন তাঁর নিয়তির কথা। হয়তো ইয়োকাস্তা তখনই সন্তান-সম্ভবা, কিংবা নিশ্চিতভাবেই সন্তানের জন্মদান করবেন তিনি। এখানে একটি মৌল প্রশ্নের সম্মুখীন হই আমরা। তাহলে কি ইডিপাস প্রাক-নির্ধারিত নিয়তির পরিচালনায় কতগুলি ঘৃণ্য গর্হিত অবৈধ কর্ম করতে বাধ্য হয়, নাকি তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছা ও প্রবণতা তাকে প্ররোচিত করে ওইসব কর্ম করতে? প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে সে নিরপরাধ, নিষ্পাপ, যে ক্ষেত্রে তার করুণ পরিণতির জন্য সে দায়ী নয়, এবং যে দেবতা বা নিয়তি এজন্য দায়ী তাকে কিছুতেই ন্যায় বিচারের ধারক-বাহক বলা যাবে না। অন্য ক্ষেত্রে ইডিপাস অপরাধী এবং সেজন্য অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। তবে জীবন এরকম চুলচেরা সাদায় কালোয় বিভক্ত নয়, এরকম দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন সরাসরি রায় দেওয়া যায় না মানুষের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষেত্রে। হয়তো সত্য এইখানে যে ইডিপাসের দোষ রয়েছে, কিন্তু দোষের তুলনায় তার সাজা মাত্রাহীন, এবং দৈবও এর মধ্যে নিঃসন্দেহে একটা ভূমিকা পালন করে।
অবশ্য অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও এই নাটকে মানুষের জীবনে নিয়তির স্থান নির্ধারণের চেষ্টা করা যায়। যেমন, আমরা ভাবতে পারি যে দৈব বা নিয়তি ইডিপাসকে দিয়ে জোর করে কিছু করিয়ে নেয় না, সে শুধু তার দিব্য দৃষ্টি দিয়ে পূর্বাহ্নেই জানে ইডিপাস তার নিজস্ব চারিত্রিক দোষগুণ নিয়ে অনিবার্যভাবে কি করবে। কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যেমন একটি শিশুর অকাল মৃত্যুর কথা পূর্বাহ্নে ঘোষণা করতে পারেন তাঁর জ্ঞানের ভিত্তিতে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সেই চিকিৎসকের ইচ্ছা বা নির্দেশে শিশুটির মৃত্যু হচ্ছে। ‘ইডিপাস’ নাটকের অনেক পাঠক-সমালোচকই মনে করেন যে; দেবতাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এর পাত্র-পাত্রী পুতুল হতে পারে, কিন্তু আমরা তাদের দেখি প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী রূপে
সফোক্লিস ইডিপাসের চরিত্র সৃষ্টি করেছেন অসামান্য নৈপুণ্যের সঙ্গে। একদিকে ইডিপাস হয়ে উঠেছে অতীতের সেই রহস্যময় ভীতিজাগানো চরিত্র যে মানবসমাজের পবিত্রতম সম্পর্ককে লাঞ্ছিত করেছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে সে হয়ে উঠেছে নাট্যকারের সমকালীন খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের একজন টিপিক্যাল এথেনীয় নাগরিক। বিখ্যাত ঐতিহাসিক থুসিডাইডিস স্পার্টাতে কোরিন্থীয় ভাষ্যকারের মুখে তখনকার এথেনীয়দের চরিত্র সম্পর্কে এই উক্তি পরিবেশন করেছেন :
“Athenians–[are] equally quick in the conception and in the execution of every new plan. They are bold beyond their strength; they run risks which prudence would condemn… in the midst of misfortune they are full of hope… When they do not carry out an intention which they have formed, they seem to have sustained a personal breavement…”
একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে উপরের প্রতিটি মন্তব্য ইডিপাসের ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে প্রযোজ্য। নিজের জীবন বিপন্ন হবার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ইডিপাস স্ফিংসের ধাঁধার উত্তর দেবার জন্য অকুতোভয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। ইডিপাস যখন শুনলো যে, সে পলিবাসের সন্তান নয়, যখন ইয়োকাস্তা উপলব্ধি করে ফেলেছে ইডিপাস কে, তখনো সে অন্ধের মতো নিজেকে অভিহিত করছে ‘ভাগ্যের বরপুত্র’ বলে। এসব ক্ষেত্রে সফোক্লিস যে শৈল্পিক পদ্ধতিতে নাটকীয় আয়রনিকে তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যবহার করেছেন তা অসামান্য। করিন্থ-এর বার্তাবহ যখন রাজা পলিবাসের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে থিবির রাজদরবারে এসে পৌঁছুলো তখনকার কথা স্মরণ করুন। ইয়োকাস্তা বার্তাবাহকে ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করছে :
কি বললে? পলিবাসের মৃত্যু ঘটেছে?
ইডিপাসের পিতার?
বার্তাবহ : ঠিক তাই।
ইয়োকাস্তা : [একজন সহচরীকে] দ্রুত তোমার প্রভুকে খবর দাও।
তাঁকে বার্তাবহের সংবাদ পৌঁছে দেবে। [সহচরীর প্রস্থান] কোথায় গেল দৈববাণী! পাছে তার হাতে মৃত্যু ঘটে সেই আশঙ্কায় ইডিপাস যাকে এতো বছর ধরে এড়িয়ে চলেছে স্বাভাবিক মৃত্যুই হলো তার, ইডিপাসের কোনো হাত ছিল না সেখানে।
কিন্তু এর একটু পরেই বার্তবহের কাছে আরো যে সব তথ্য জানা গেল তাতে ইয়োকাস্তা নিঃসন্দিগ্ধভাবে বুঝতে পারলো ইডিপাসের প্রকৃত পরিচয়। হতভাগ্য রমণী বেদনায় বিবর্ণ হয়ে ইডিপাসের উদ্দেশে চীৎকার করে উঠলো :
… আর কোনো প্রশ্ন কোরো না।
কিন্তু ইডিপাস থামতে পারে না। তাই তার কণ্ঠে আমরা শুনি : কী বাজে কথা বলছো! আমার জন্মরহস্য আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত আমাকে এই সূত্র ধরে অগ্রসর হতেই হবে।
রানী ইয়োকাস্তা .ততক্ষণে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন সামনে কী ভয়ানক পরিণতি অনিবার্যভাবে ঘনিয়ে আসছে। উন্মাদের মতো প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে করতে তিনি ইডিপাসকে লক্ষ্য করে চীৎকার করে ওঠেন :
হায় দুর্ভাগা! সত্য জানবার জন্য তুমি বেঁচে থেকো না যেন। রানীর এই উক্তিরও ভুল অর্থ করে ইডিপাস। সে ভাবে তার জন্ম কোনো নিচু ঘরে হতে পারে সেই আশঙ্কাতে বোধহয় অভিজাত বংশের রমণী এমন বেদনাহত। তাই ইডিপাস বলে :
আমার নিচু ঘরে জন্মগ্রহণের জন্য তিনি লজ্জা বোধ করছেন কিন্তু আমি সৌভাগ্যের বরপুত্র, আমি সকলের কল্যাণ সাধন করেছি, আমি কেন লজ্জার পাত্র হবো? ভাগ্য আমার জননী, ঋতুসকল আমার বোন। “আয়রনি”র এরকম শক্তিশালী সার্থক ব্যবহার সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে খুব বেশি নেই।
প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইডিপাসকে আমরা দেখি থুসিডাইডিস বর্ণিত টিপিক্যাল এথেনীয় রূপেই। মানুষের তথা নিজের বুদ্ধিমত্তার শক্তিতে সে অপরিসীম বিশ্বাসী। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রচণ্ড সাহস, সত্যানুসন্ধানে তার অক্লান্ত প্রয়াস্ত্র, গভীর দায়িত্ববোধ ও প্রজানুরাগ সবই যেন নিয়তির কারসাজিতে শুধু তার দুঃখের ভাণ্ড পূর্ণ করে তোলে। চরম সত্যের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত ইডিপাস থামতে পারে না, কারো অনুরোধ উপরোধে কর্ণপাত করে না সে। বীভৎস ভয়ঙ্কর তথ্যটি উদ্ঘাটনের মুহূর্তেও সে রাজকীয় মহিমায় অচঞ্চল। পলিবাসের হাতে যে শিশুটিকে মেষপালক তুলে দিয়েছিল সে সত্যি সত্যি কে, একথা যখন মেষপালক কিছুতেই বলতে চাইছে না তখনও ইডিপাস অসহিষ্ণু কন্ঠে তাকে ধমকে উঠছে : বলতেই হবে, আমি শুনবো। যদি তুমি সত্য কথা না বল তা হলে আমি তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবো।
‘ইডিপাস’ নাটকে সফোক্লিসের শিল্পকুশলতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য এখানে যে নাট্যকার একটি শক্তিশালী মহৎ চরিত্রের পতনের মূলে তার কোনো বৃহৎ চারিত্রিক ত্রুটি বা বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করেন নি, আবার তার ব্যক্তিগত চারিত্রিক দোষগুণের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্যুত নিছক দৈবের ক্রীড়ানক রূপেও তাকে চিহ্নিত করেন নি। বস্তুতঃপক্ষে রাজা ইডিপাসের সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব যা তাতে যে-পরিবেশে সে নিজেকে আবিষ্কার করে, সে- পরিস্থিতিতে তার পক্ষে এই রকম ট্র্যাজেডির নায়ক হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। লেয়াসের অজ্ঞাত হত্যাকারীকে কঠিন শাস্তি দেবার যে উদাত্ত ঘোষণা ইডিপাস নাটকের প্রথম দিকেই করে তা তার চরিত্রের সঙ্গে বিশেষ ভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। অথচ ওই : ঘোষণা না করলে তার নিজের চরম পরিণতি হয়তো অত কঠিন নাও হতে পারতো। পথ চলতে গিয়ে বিবাদমত্ত হয়ে ক্রোধের আতিশয্যে লেয়াসকে (অবশ্য তার পরিচয় না জেনেই) হত্যার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ক্রীয়নের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ ব্যতিরেকেই ষড়যন্ত্রের ক্রুদ্ধ অভিযোগ উত্থাপনের মিল নির্ভুল। যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি স্ফিংসের রহস্য উন্মোচনে সফল হয়েছিল সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিই একটি একটি করে সমস্ত জটিল জাল ছিন্ন করে নিজের জন্মরহস্যের ভয়াবহ উদ্ঘাটন অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। নাটকটিতে যেভাবে ইডিপাসের চরিত্র উন্মোচিত হয় তা একদিকে যেমন তার অতীতের পুনসৃষ্টি তেমনি তার ভবিষ্যত সম্পর্কিত দৈববাণীর নির্ভুল ব্যাখ্যাও। এক অর্থে ইডিপাসের চরিত্রই তার সর্বনাশা নিয়তি।
সফোক্লিস, অনেক সমালোচক মনে করেন, এই নাটকে একটি দার্শনিক তত্ত্বও পরোক্ষে তুলে ধরতে চেয়েছেন। সে তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে তার ট্র্যাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আমরা লক্ষ করি কোরাসের উক্তিতে :
মানুষের আনন্দ এক অবাস্তব বিকার
কত আশা আশ্বাস, অবশেষে চরম হতাশা।
হায়, ইডিপাস! গতকাল আপনি ছিলেন
আমার ঊষার আলো
আর আজ আমার অন্তহীন অন্ধকারের অমানিশা!
এই দৃষ্টিভঙ্গি কোরাস-উচ্চারিত ‘রাজা ইডিপাসের’ একেবারে শেষ বাক্যটিতে অত্যন্ত স্পষ্ট :
অতএব মরণশীল মানুষকে একটি জিনিস উপলব্ধি করতে হবে :
তাকে সব সময় তার শেষ মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে এবং যখন পর্যন্ত না একটি মানুষ শান্তিতে, তার সুখকে সঙ্গে নিয়ে, কবরে প্রবেশ করতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সুখী বলা যাবে না।
সফোক্লিস যেন সবাইকে উদ্দেশ করে বলতে চান যে, এই বিশ্ব চরাচরে এমন একটি শক্তি আছে যা সম্পূর্ণভাবে মানববুদ্ধির আয়ত্তাধীন নয়, মানুষ তার প্রকৃতি ও চরিত্রকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতেও সক্ষম নয়। কেবলমাত্র নিজের বুদ্ধি ও জ্ঞানের অহমিকায় মানুষ উদ্ধত হলে, নিজেকে অপরাজেয় ভাবলে, তার পরিণাম দুঃখবহ-ই হবে। এটা অংশত মেনে নিলেও কিন্তু বলতে হবে যে ‘রাজা ইডিপাস’ নাটক যখন শেষ হয় তখন আমরা ইডিপাসের জন্য গভীর সহানুভূতি এবং করুণা বোধ করি, পরম শক্তিশালী ও অসাধারণ বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও সীমাহীন দুর্ভাগ্যের সামনে তার চরম অসহায় রূপ প্রত্যক্ষ করে আতঙ্কিত হই। অ্যারিস্টটলের ভাষায় : “আমাদের মনে শুধু করুণা ও ভীতির বোধই জাগ্রত হয় না, এই দুটি অনুভূতির পার্গেশন বা বিমোক্ষণও ঘটে।”
ইডিপাস স্ফিংসের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়েছিল : “মানুষ”। মানুষ শৈশবে চার হাতে-পায়ে হামাগুড়ি দেয়, উন্নত শিরে জীবনের পথ পাড়ি দেয় যৌবনে, দু’পায়ের উপর সোজা দাঁড়িয়ে, আর বার্ধক্যে লাঠি সঙ্গে নিয়ে ঠুক ঠুক করে চলে দুর্বলভাবে, তিন পায়ে চলার মতো। ‘রাজা ইডিপাস’ নাটকে ইডিপাস স্ফিংসের রহস্য আবিষ্কারের পরবর্তী পর্যায়ে এক অর্থে আরো নিগূঢ় এক রহস্য আবিষ্কারে সক্ষম হয়। সে রহস্য মানুষ সম্পর্কে কিছুটা, এবং আরো বেশি পরিমাণে তার নিজের সম্পর্কে। ডি. কুইন্সি স্ফিংসের ধাঁধা এবং নাটকটির মধ্যে আরো একটি সম্পর্কসূত্র লক্ষ করেছেন : আত্মপ্রত্যয়ী আসন্ন সৌভাগ্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো ইডিপাস স্ফিংসের প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিয়েছিলো “মানুষ”। অনেকগুলি আনন্দময় সার্থক বছর কেটে যাবার পর, জীবন সায়াহ্নে, ডি. কুইন্সি বলেছেন, ইডিপাস হয়তো ওই একই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারতো ‘ইডিপাস’। কারণ তার মতো আর কে ছিল শৈশবে এত নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত, আত্মীয়-পরিজনহীন; যৌবনে এত ক্ষমতাবান, উচ্চ প্রশংসিত, সর্বজন-প্রীতিধন্য; আর বার্ধক্যে এত অসহায়, চক্ষুহীন ও পরনির্ভর?
কবীর চৌধুরী
ঢাকা
১১.১১.২০০৯





Leave a Reply