রবীন্দ্রসাহিত্যে রামায়ণ ও মহাভারত – নিতাই মল্লিক
প্রথম প্রকাশ : কলকাতা বইমেলা, ২০১৮
প্রকাশক : প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী, গিরিজা লাইব্রেরী
প্রচ্ছদ-শিল্পী : সঞ্জয় মাইতি
.
উৎসর্গ
ভালো-মন্দ মিশিয়ে জীবনের
চল্লিশটা বছর যাঁর সঙ্গে কেটেছে
আমার সেই স্ত্রী আভা মল্লিককে
.
লেখকের নিবেদন
ভারতবর্ষের দুই শ্রেষ্ঠ সম্পদ রামায়ণ ও মহাভারত। এই দুই মহাগ্রন্থের প্রতি রবীন্দ্রনাথ অকৃত্রিম শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন। সুবিশাল রবীন্দ্রসাহিত্যের বহু জায়গাতেই রামায়ণ-মহাভারতের প্রসঙ্গ এসেছে। মহাভারতে আছে—”যেমন মেঘ সকলের উপজীব্য, তাদৃশ এই অক্ষয় ভারতবৃক্ষ উত্তরকালে সকল কবিকুলের উপজীব্য হইবে।”—এই কথাগুলি যে কতখানি সত্য সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতবর্ষের প্রায় সব বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকই রামায়ণ-মহাভারতের বিষয় তাঁদের রচনার মধ্যে এনেছেন। রবীন্দ্রনাথও তার ব্যতিক্রম নন।
এই দুই মহাগ্রন্থের মহাকাব্যিক উৎকর্ষতা তো তিনি স্বীকার করেইছেন, সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রন্থদুটিকে তিনি ভারতবর্ষের ইতিহাসের মান্যতা দিয়েছেন। ‘রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।’ প্রাচীন ভারতবর্ষের মানুষেরা দেশের ইতিহাস লেখাতে উৎসাহী ছিলেন না আর তাই ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস বহু জায়গাতেই অনুমান-নির্ভর। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন রামায়ণ মহাভারতে ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে এবং সেই ইতিহাস তিনি কিছুটা উদঘাটনেরও চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে মহাভারত না পড়লে কোনো ভারতবাসীর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। তিনি তাঁর শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের অল্পবয়সী ছাত্রদেরকে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী শোনাতেন।
বিপুল রবীন্দ্রসাহিত্যের যেখানে যেখানে রামায়ণ-মহাভারতের কথা এসেছে সেগুলি সবই আমি প্রসঙ্গসহ এই গ্রন্থে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। আমার মতো অনধিকারীর পক্ষে এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক। তবে আমি মহাভারত ভালোবাসি, রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসি—আর সেই ভালোবাসার অধিকারেই আমার এই অনধিকার চর্চা। আশা করি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি পাঠক-পাঠিকাদের সহৃদয় মার্জনা পাবে।
আমার মতো অনামী লেখকের এই বইটি প্রকাশের দায়িত্ব নিয়ে গিরিজা লাইব্রেরীর কর্ণধার শ্রীপ্রশান্ত চক্রবর্তী মহাশয় আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। বন্ধুবর শ্রীসুপ্রিয় গুপ্ত মহাশয় বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে সাহায্য করেছেন। তাঁকে আমার ধন্যবাদ।
নিতাই মল্লিক
.
ভূমিকা
”রামায়ণ-মহাভারতকে যখন জগতের অন্যান্য কাব্যের সহিত তুলনা করিয়া শ্রেণীবদ্ধ করা হয় নাই তখন তাহাদের নাম ছিল ইতিহাস। এখন বিদেশীয় সাহিত্যভাণ্ডারে যাচাই করিয়া তাহাদের নাম দেওয়া হইয়াছে—’এপিক’। আমরা এপিক শব্দের বাংলা নামকরণ করিয়াছি মহাকাব্য। এখন আমরা রামায়ণ মহাভারতকে মহাকাব্যই বলিয়া থাকি।” লিখেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থের ‘রামায়ণ’ প্রবন্ধে। ‘সাহিত্য সৃষ্টি’ প্রবন্ধেও কবি রামায়ণ-মহাভারতকে মহাকাব্য বলেছেন—”মহাকাব্যও আমাদের জানা সাহিত্যের মধ্যে কেবল চারিটি মাত্র আছে। ইলিয়াড অডেসি রামায়ণ ও মহাভারত।” অন্যত্র কবি মহাভারতকে ঐতিহাসিক কাব্য বলেছেন—”আমরা মহাভারতকে ঐতিহাসিক কাব্য বলিয়া গণ্য করি।” (আধুনিক সাহিত্য, কৃষ্ণচরিত্র; সুলভ ৫ম খণ্ড)। ‘জাতীয় সাহিত্য’ প্রবন্ধে (সুলভ ষোড়শ খণ্ড) শব্দকল্পদ্রুম অভিধান, সাহিত্য প্রভৃতি আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন—’এমন কি রামায়ণ-মহাভারতও সাহিত্যের মধ্যে গণ্য হয় নাই, তাহা ইতিহাসরূপে খ্যাত ছিল।’ অন্যত্র তিনি লিখেছেন—’রামায়ণ-মহাভারতকে কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে। ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে;….রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।’ (প্রাচীনসাহিত্য,রামায়ণ)।
মহাভারতে আছে—’যেমন মেঘ সকলের উপজীব্য, তাদৃশ এই অক্ষয় ভারতবৃক্ষ (মহাভারত) উত্তরকালে সকল কবিকুলের উপজীব্য হইবে।’ (মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহকৃত অনুবাদ; ১ম খণ্ড, পৃ-৪)। এই বাক্য যে কতখানি সত্য সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলা সাহিত্যের আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত রামায়ণ-মহাভারত নিয়ে লেখার কোনো বিরাম নেই। আধুনিক লেখকদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও তাঁর মৃত্যুর পূর্বে আনন্দমেলা পত্রিকাতে ছোটদের মহাভারত লেখা শুরু করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ এই দুই মহাগ্রন্থ, রামায়ণ ও মহাভারতের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন এবং তাঁর রচনাতে বহু জায়গাতেই রামায়ণ/মহাভারতের প্রসঙ্গ এনেছেন। সেখানে অতি দীর্ঘ আলোচনাও যেমন আছে, তেমনি আছে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনীর সঙ্গে কবিকল্পনা মিশিয়ে অনবদ্য নতুন সৃষ্টি। ছোটো আলোচনা, উদাহরণ হিসাবে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী বা চরিত্রের উল্লেখ, প্রভৃতি তো অজস্র। রামায়ণ-মহাভারতের প্রতি তিনি যে কতটা শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন সেটা দেখাবার জন্য পূর্বোক্ত রামায়ণ প্রবন্ধ থেকে একটু উদ্ধৃতি দিচ্ছি। কবি লিখেছেন—’রামায়ণ-মহাভারতের যে সমালোচনা তাহা অন্য কাব্য সমালোচনার আদর্শ হইতে স্বতন্ত্র। রামের চরিত্র উচ্চ কি নীচ, লক্ষ্মণের চরিত্র আমার ভালো লাগে কি মন্দ লাগে, এই আলোচনাই যথেষ্ট নহে। স্তব্ধ হইয়া শ্রদ্ধার সহিত বিচার করিতে হইবে, সমস্ত ভারতবর্ষ, অনেক সহস্র বৎসর ইহাদিগকে কিরূপভাবে গ্রহণ করিয়াছে। ‘শতাব্দীর পর শতাব্দী যাইতেছে কিন্তু রামায়ণ-মহাভারতের স্রোত ভারতবর্ষে আর লেশমাত্র শুষ্ক হইতেছে না। প্রতিদিন গ্রামে-গ্রামে ঘরে-ঘরে তাহা পঠিত হইতেছে, মুদির দোকান হইতে রাজার প্রাসাদ পর্যন্ত সর্বত্রই তাহার সমান সমাদর। ধন্য সেই কবি যুগলকে, কালের মহাপ্রান্তরের মধ্যে যাঁহাদের নাম হারাইয়া গিয়াছে, কিন্তু যাঁহাদের বাণী বহুকোটি নরনারীর দ্বারে দ্বারে আজিও অজস্রধারায় শক্তি ও শান্তি বহন করিতেছে, শতশত প্রাচীন শতাব্দীর পলিমৃত্তিকা অহরহ আনয়ন করিয়া ভারতবর্ষের চিত্তভূমিকে আজিও উর্বরা করিয়া রাখিতেছে।
‘এমন অবস্থায়, রামায়ণ-মহাভারতকে কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে; ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে, কারণ সেরূপ ইতিহাস সময়-বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে—রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।…ভারতবর্ষের যাহা সাধনা, যাহা আরাধনা, যাহা সংকল্প, তাহারই ইতিহাস এই দুই বিপুল কাব্যহর্ম্যের মধ্যে চিরকালের সিংহাসনে বিরাজমান।’
কবির কথায়, রামায়ণ দেবতার অবতারলীলার বর্ণনা নয়—আদিকবি বাল্মীকি মানুষ রামের কথা বলেছেন। ‘আদিকাণ্ডের প্রথম সর্গে বাল্মীকি তাহার কাব্যের উপযুক্ত নায়ক সন্ধান করিয়া যখন বহুগুণের উল্লেখ করিয়া নারদকে জিজ্ঞাসা করিলেন—
সমগ্রারূপিণী লক্ষ্মীঃ কমেকং সংশ্রিতা নরম্।
কোন একটিমাত্র ‘নর’কে আশ্রয় করিয়া সমগ্র লক্ষ্মী রূপগ্রহণ করিয়াছেন? তখন নারদ কহিলেন—
দেবেষ্বপি ন পশ্যামি কশ্চিদেভির্গুনৈরযুতম।
শ্রুয়তাং তু গুনৈরেভির্যোযুক্ত নরচন্দ্রমাঃ।।
এত গুণযুক্ত পুরুষ তো দেবতাদের মধ্যেও দেখিনা, তবে যে নরচন্দ্রমার মধ্যে এই সকল গুণ আছে তাহার কথা শুন। এই বর্ণনা নিয়ে কবি ‘ভাষা ও ছন্দ’ নামক সেই বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেছিলেন (কাহিনী কাব্যগ্রন্থ, সুলভ ৩য় খণ্ড)।
”কহ মোরে সর্বদর্শী হে দেবর্ষি তাঁর পুণ্য নাম।
নারদ কহিলা ধীরে, ‘অযোধ্যার রঘুপতি রাম”
‘সাহিত্য সমালোচনা’, প্রবন্ধেও (সুলভ ১২শ খণ্ড) কবি রামায়ণ-মহাভারতের কথা বলেছেন—”রামায়ণ-মহাভারত ভারতবাসী হিন্দুকে বহু যুগ থেকে মানুষ করে এসেছে। একদা ভারতবর্ষ যে আদর্শ কামনা করেছে তা ঐ দুই কাব্যে চিরজীবি হয়ে গেল।” ‘মহাত্মা গান্ধী’ প্রবন্ধে (সুলভ চতুর্দশ খণ্ড) কবি লিখেছেন—”মহাভারতের প্রশস্ত ক্ষেত্রে একটা মুক্তির হাওয়া আছে। এই মহাকাব্যের বিরাট প্রাঙ্গণে মনস্তত্ত্বের কত পরীক্ষা। যাকে আমরা সাধারণত নিন্দনীয় বলি, সেও এখানে স্থান পেয়েছে। যদি আমাদের মন প্রস্তুত থাকে তবে অপরাধ দোষ সমস্ত অতিক্রম করে মহাভারতের বাণী উপলব্ধি করা যেতে পারে। মহাভারতে একটা উদাত্ত শিক্ষা আছে; সেটা নঞর্থক নয়, সদর্থক, অর্থাৎ তার মধ্যে একটা হাঁ আছে। বড় বড় সব বীরপুরুষ আপন মাহাত্ম্যের গৌরবে উন্নতশির, তাঁদেরও দোষ-ত্রুটি রয়েছে, কিন্তু সেই সমস্ত দোষ-ত্রুটিকে আত্মসাৎ করেই তাঁরা বড় হয়ে উঠেছেন। মানুষকে যথার্থভাবে বিচার করবার এই প্রকাণ্ড শিক্ষা আমরা মহাভারত থেকে পাই।” ‘বাংলাভাষা পরিচয়’ গ্রন্থে কবি লিখেছেন—”মহাভারতের অনেক কিছু আমার কাছে সত্য; তার সত্যতা সম্বন্ধে ঐতিহাসিক এমন কি প্রাকৃতিক কোনো প্রমাণ না থাকতে পারে, এবং কোনো প্রমাণ আমি তলব করতেই চাইনে, তাকে সত্য বলে অনুভব করেছি এই যথেষ্ট।” বিদেশী সাহিত্যের সঙ্গে ভারতীয় সাহিত্যের পার্থক্য কোথায় সেটা কবি রামায়ণ-মহাভারত থেকে উদাহরণসহ স্পষ্ট করে বলেছেন। চিঠিপত্রে (সুলভ ১ম খণ্ড) কবি লিখেছেন—’হিংসা অপেক্ষা ক্ষমায় যে অধিক বীরত্ব, গ্রহণের অপেক্ষা ত্যাগে অধিক বীরত্ব, এই কথাই আমাদের কাব্যে ও শাস্ত্রে বলিতেছে।…এইজন্য বাল্মীকির রাম রাবণকে পরাজিত করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, রাবণকে ক্ষমা করিয়াছেন।…হোমরের একিলিস পরাভূত হেকটরের মৃতদেহ ঘোড়ার লেজে বাঁধিয়া শহর প্রদক্ষিণ করিয়াছিলেন—রামে একিলিসে তুলনা করা! যুরোপীয় মহাকবি হইলে পাণ্ডবদের যুদ্ধ জয়েই মহাভারত শেষ করিতেন। কিন্তু আমাদের ব্যাস বলিলেন রাজ্য গ্রহণ করায় শেষ নহে, রাজ্য ত্যাগ করায় শেষ।”
রামায়ণ-মহাভারতকে ইতিহাসের স্বীকৃতি দিলেও তিনি সর্বক্ষেত্রে এর আক্ষরিক সত্যতা মেনে নেননি। তাঁর মতে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনীসমূহ ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে ভারতবর্ষের প্রকৃত ইতিহাস বেরিয়ে আসে। ভারতবর্ষে আর্য-অনার্য বিরোধের ইতিহাস এই গ্রন্থদ্বয়ে গুপ্ত হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের ধারণা অনুসারে এগুলো ব্যাখ্যা করেছেন যদিও তাঁর বিশ্লেষণের সঙ্গে সবাই একমত না-ও হতে পারেন। রামায়ণকে তিনি বলেছেন কর্ষণজীবি সভ্যতার সঙ্গে আকর্ষণজীবি সভ্যতার দ্বন্দ্ব। ‘পরিচয়’ গ্রন্থে (সুলভ নবম খণ্ড) ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ নামে একটা খুব মূল্যবান প্রবন্ধ আছে। এই প্রবন্ধে ভারতবর্ষে আর্য অনুপ্রবেশ বা Aryan lnvasion নিয়েও কথা আছে। এই Aryan lnvasion ব্যাপারটা খুব গোলমেলে—মতপার্থক্য আছে। অনেকেই বলেন যে ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতাকে হেয় প্রতিপন্ন করার এই ধারণা (concept) ইউরোপীয়ানদের সৃষ্ট। (উৎসাহী পাঠক Dr. N.S.Rajaram এর লেখা search for the Historical krishna বইটি পড়ে দেখতে পারেন)। যাই হোক রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, আর্যশক্তির প্রতিভূ হিসাবে রামচন্দ্র আর্য-অনার্যের মিলনের জন্য বহু ক্ষেত্রেই মিত্রতা বা বন্ধুত্বের আদর্শে বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি চণ্ডাল গুহকের সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন, বানর-রাজ সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন। রাবণকে পরাজিত করে তিনি লঙ্কা অধিকার করেননি। রাবণের ভাই বিভীষণকে সেখানকার রাজা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—”মহাভারত আলোচনা করিলে স্পষ্টই দেখা যায় বিরোধের মধ্য দিয়াও আর্যদের সহিত অনার্যদের রক্তের মিলন ও ধর্মের মিলন ঘটিতেছিল।” ”মহাভারত সংগ্রহের দিনে আর্যজাতির ইতিহাস আর্যজাতির স্মৃতিপটে যেরূপ রেখায় আঁকা ছিল, তাহার মধ্যে কিছু-বা স্পষ্ট কিছু বা লুপ্ত, কিছু-বা সুসংগত কিছু-বা পরস্পর-বিরুদ্ধ, মহাভারতে সেই সমস্তেরই প্রতিলিপি একত্র করিয়া রক্ষিত হইয়াছে।”
রামায়ণ-মহাভারতে আসল ইতিহাস রূপকের আড়ালে লুকিয়ে আছে, এটা মনে করলেও রবীন্দ্রনাথ এই মহাগ্রন্থদ্বয়ের সাহিত্যিক-মূল্যকে অস্বীকার করেননি। রামায়ণ প্রবন্ধে কবি লিখেছেন—”এই রামায়ণ কথা হইতে ভারতবর্ষের আবালবৃদ্ধবনিতা আপামর সাধারণ কেবল যে শিক্ষা পাইয়াছে তাহা নহে, আনন্দ পাইয়াছে; কেবল যে ইহাকে শিরোধার্য করিয়াছে তাহা নহে, ইহাকে হৃদয়ের মধ্যে রাখিয়াছে; ইহা যে কেবল তাহাদের ধর্মশাস্ত্র তাহা নহে, ইহা তাহাদের কাব্য।”
রামায়ণ রূপক কি রূপক নয়, এই ব্যাপারে কবি একটু অন্যরকম কথা বলেছেন রক্তকরবী নাটকের প্রসঙ্গে—”হঠাৎ মনে হতে পারে রামায়ণটা রূপক কথা। বিশেষত যখন দেখি রাম রাবণ দুই নামের দুই বিপরীত অর্থ। রাম হল আরাম, শান্তি; রাবণ হল চীৎকার, অশান্তি।…কিন্তু তৎসত্বেও রামায়ণ রূপক নয়, ….। রামায়ণ মুখ্যত মানুষের সুখদুঃখ বিরহমিলন ভালোমন্দ নিয়ে বিরোধের কথা; মানুষের মহিমা উজ্জ্বল করে ধরবার জন্যেই চিত্রপটে দানবের পটভূমিকা। এই বিরোধ একদিকে ব্যক্তিগত মানুষের, আরেক দিকে শ্রেণীগত মানুষের; রাম ও রাবণ একদিকে দুই মানুষের ব্যক্তিগত রূপ, আরেক দিকে মানুষের দুই শ্রেণীগত রূপ।”
রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী যে কবির পছন্দ তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন লেখায়। ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের ‘পুরস্কার’ কবিতাটির একটুখানি অংশ—
শুধু সেদিনের একখানি সুর
চিরদিন ধরে বহু বহু দূর
কাঁদিয়া হৃদয় করিছে বিধুর
মধুর করুণ তানে,
সে মহাপ্রয়াণের মাঝখানটিতে
যে মহারাগিণী আছিল ধ্বনিতে
আজিও সে গীত মহাসঙ্গীতে
বাজে মানবের কানে।
যথার্থ ট্রাজেডি বলতে কী বোঝায় সেটা কবি মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র সমালোচনা প্রসঙ্গে (সুলভ পঞ্চদশ খণ্ড)— আমরা যতগুলি ট্রাজেডি দেখিয়াছি সকলগুলিতেই প্রায় শেষ কালে একটা না একটা মৃত্যু আছে। তাহা হইতেই সাধারণত লোকে সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছে, শেষকালে মরণ না থাকিলে আর ট্রাজেডি হইল না। ….মহাভারতের অপেক্ষা মহান ট্রাজেডি কে কোথায় দেখিয়াছে? স্বর্গারোহণকালে দ্রৌপদী ও ভীমার্জুন প্রভৃতির মৃত্যু হইয়াছিল বলিয়াই যে মহাভারত ট্রাজেডি তাহা নহে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যখন পাণ্ডবদিগের জয় হইল তখনি মহাভারতের যথার্থ ট্রাজেডি আরম্ভ হইল। তাঁহারা দেখিলেন জয়ের মধ্যেই পরাজয়। এত দুঃখ, এত যুদ্ধ, এত রক্তপাতের পর দেখিলেন হাতে পাইয়া কোনো সুখ নাই, পাইবার জন্য উদ্যমেই সমস্ত সুখ,….কয়েক হস্ত জমি মিলিল বটে, কিন্তু হৃদয়ের দাঁড়াইবার স্থান তাহার পদতল হইতে ধসিয়া গেল, বিশাল জগতে এমন স্থান সে দেখিতে পাইল না যেখানে সে তাহার উপার্জিত উদ্যম নিক্ষেপ করিয়া সুস্থ হইতে পারে। ইহাকেই বলে ট্রাজেডি।
রামায়ণ-মহাভারতের কোনো কোনো চরিত্র নিয়েও তিনি বিভিন্ন জায়গায় মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে কর্ণের চারিত্রশক্তি যুধিষ্ঠিরের চাইতে বেশী; তাঁর সমস্ত লোভ, ক্ষোভ, অসহায়তা, দোলাচলচিত্ততা নিয়েও সাহিত্যের দরবারে ধৃতরাষ্ট্রের আসন চিরস্থায়ী হয়ে গেছে—বিদূর বা ভীষ্মের নয়। ”আধুনিক… অনেক আর্য বাঙালী লেখকই সরলা বিমলা দামিনী যামিনী-নামধেয়া এমন-সকল সতী চরিত্রের সৃষ্টি করিতে পারেন যাঁহারা আদ্যোপান্তসুসংগত অপূর্ব নৈতিকগুণে দ্রৌপদীকে পদে পদে পরাভূত করিতে পারেন, কিন্তু তথাপি, মহাভারতের দ্রৌপদী তাঁহার সমস্ত অপূর্ণতা অসংকোচে বক্ষে বহন করিয়া এই সমস্ত নব্য বল্মীকরচিত ক্ষুদ্র নীতিস্তূপগুলির বহু ঊর্ধ্বে উদার আদিম অপর্যাপ্ত প্রবল মাহাত্ম্যে নিত্যকাল বিরাজ করিতে থাকিবেন।” রামলক্ষ্মণের প্রসঙ্গে তিনি লিখলেন—”রামচন্দ্রের ভক্তদের আমি ভয় করি; তাই খুব চুপি চুপি বলছি, সাহিত্যে রামের চেয়ে লক্ষ্মণ বড়ো।” রামায়ণে গৃহধর্মের যে আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে সেটাই মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। হিংসা অপেক্ষা ক্ষমাতে যে অধিক বীরত্ব, গ্রহণের অপেক্ষা ত্যাগ যে অনেক ভালো এই কথাই আমাদের কাব্যে এবং শাস্ত্রে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সর্বতোভাবে মানুষকে মানুষ করিবার উপযোগী এমন শিক্ষা আর কোনো দেশে কোনো সাহিত্যে নাই।’
রবীন্দ্ররচনাবলীর সুলভ সংস্করণে অন্তত চারটি জায়গায় দেখতে পাচ্ছি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে তিনি তাঁর শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে বালকদেরকে রামায়ণ-মহাভারত পড়িয়েছিলেন। ”আমি সন্ধ্যাবেলায় তাদের নিয়ে রামায়ণ-মহাভারত পড়িয়েছি, হাস্য-করুণ রসের উদ্রেক করে তাদের হাসিয়েছি কাঁদিয়েছি। তা ছাড়া নানা গল্প বানিয়ে বলতাম,…এমনি ভাবে ছেলেদের মন যাতে অভিনয়ে গল্পে গানে, রামায়ণ-মহাভারত পাঠে সরস হয়ে ওঠে তার চেষ্টা করেছি।” রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিতভাবেই একজন সর্বতোভাবে অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি তাঁর স্কুলের ছেলেদের রামায়ণ মহাভারত পড়িয়েছিলেন তার অর্থ তিনি নিশ্চয় বুঝেছিলেন যে রামায়ণ-মহাভারতের শিক্ষা কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এই মহাগ্রন্থদুটি সমস্ত মানবজাতির সম্পদ।
এবার শ্রীমদ্ভগবদগীতার কথা একটু বলা যাক। আপনারা হয়তো জানেন যে, গীতা কোনো স্বতন্ত্র গ্রন্থ নয়। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের পঁচিশ থেকে বিয়াল্লিশ—এই আঠারোটি অধ্যায় নিয়ে সাতশত শ্লোক বা মন্ত্রই ‘গীতা’। অনেকেই অবশ্য গীতাকে আলাদা গ্রন্থ বলে মনে করেন। জ্ঞানী মানুষদের মুখে শুনেছি যে গীতার প্রচারের ব্যাপারে কোনো রাষ্ট্রীয় আনুকুল্য না থাকলেও সারা পৃথিবীতে ধর্মীয় পুস্তক হিসাবে বিক্রির ব্যাপারে বাইবেলের পরেই গীতার স্থান। বাইবেল প্রচার যে অনেক রাষ্ট্রশক্তির সমর্থনপুষ্ট সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে গীতাকে শুধুমাত্র হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বললে কথাটা ঠিক বলা হয় না। সমগ্র গীতার মধ্যে কোথাও ‘হিন্দু’ শব্দটি নেই। গীতার উপদেশ সকল মানুষের জন্য। জীবনযন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত মানুষকে উত্তরণের পথ দেখায় গীতা। এই গীতার প্রতিও রবীন্দ্রনাথ সশ্রদ্ধই ছিলেন। গীতার কথা তাঁর রচনায় কবি বহু জায়গাতেই উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রমানসে উপনিষদের স্থান অবশ্যই সর্বাগ্রে, তবে গীতা তো উপনিষদেরই সারাৎসার। গীতার মঙ্গলাচরণের সেই শ্লোকটি—
সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ।
পার্থো বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ।।
অধ্যাপিকা পম্পা মজুমদারের লেখা একটা অতি মূল্যবান বই ”রবীন্দ্রসংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস।’ এই গ্রন্থে অধ্যাপিকা মজুমদার এরকম মত প্রকাশ করেছেন যে গীতা হচ্ছে মহাভারতীয় সংস্কৃতির ‘সংহততম’ প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথও তাঁর ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ নামক বিখ্যাত প্রবন্ধে (সুলভ অষ্টম খণ্ড, পরিচয়) লিখেছেন—”আতসকাচের একপিঠে যেমন ব্যাপ্ত সূর্যালোক এবং আর এক পিঠে যেমন তাহারই সংহত দীপ্তিরশ্মি, মহাভারতেও তেমনি একদিকে ব্যাপক জনশ্রুতিরাশি আর এক দিকে তাহারই সমস্তটির একটি সংহত জ্যোতি—সেই জ্যোতিটিই ভগবদগীতা।” গীতার মধ্যে একটা সমন্বয়ের ভাব আছে। অধ্যাপিকা মজুমদার উল্লেখ করেছেন, বৌদ্ধগ্রন্থ ‘ধম্মপদ’-এর সঙ্গে গীতার আশ্চর্য মিল দেখা যায়, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সদধর্মপুণ্ডরীক গীতার দ্বারা প্রভাবিত। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ গীতার প্রতি আগ্রহান্বিত ছিলেন। ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় দেবেন্দ্রনাথের ভগবদগীতা বিষয়ে লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ স্বকৃত অনুবাদ ও ব্যাখ্যাসহ গীতা প্রকাশ করেছিলেন। বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ গীতার দার্শনিক দিক নিয়ে আলোচনাসহ তাঁর গীতাপাঠ গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। কবির আদরের জ্যোতিদাদা লোকমান্য তিলকের সুবৃহৎ গ্রন্থ গীতারহস্যের অনুবাদ করেছিলেন। এই পারিবারিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্রনাথও যে গীতার প্রতি আকর্ষণ বোধ করবেন এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। গীতার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে involved হলেন মহর্ষির জন্যই। রবীন্দ্রনাথ উপনয়নের পর (যখন তাঁর বয়স বারো বছরের কম) পিতার সঙ্গে হিমালয়ে গিয়েছিলেন। জীবনস্মৃতিতে কবি লিখেছেন—”ভগবদগীতায় পিতার মনের মতো শ্লোকগুলি চিহ্নিত করা ছিল। সেইগুলি বাংলা অনুবাদ সমেত আমাকে কাপি করিতে দিয়াছিলেন।” পম্পা মজুমদার অনুমান করেছেন, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় মহর্ষির নির্বাচিত গীতার যে শ্লোকগুলি প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলিই হতে পারে মহর্ষির ‘মনের মতো’ শ্লোক। এই শ্লোকগুলির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে বাল্যকালেই।
অধ্যাপিকা মজুমদারের গ্রন্থে দেখা যায় শ্রদ্ধেয় ডঃ নীহাররঞ্জন রায় লিখেছিলেন—‘I can not help pointing out in this connection that Tagore’s voluminous writings do not contain more than half-a-dozen references to the Gita.’ কীসের ভিত্তিতে ডঃ রায় এরকম মন্তব্য করেছিলেন বোঝা গেল না। অধ্যাপিকা মজুমদার লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ সারাজীবনে তাঁর লেখায় অন্তত ঊননব্বইবার গীতার শ্লোককে নানাভাবে স্মরণ করেছিলেন। আমি রবীন্দ্ররচনায় গীতার শ্লোকের ‘ও’ শ্লোকাংশের উল্লেখ এবং সাধারণভাবে গীতার কথা বা ‘গীতা’ শব্দের উল্লেখ অনেক বেশি পেয়েছি।
গীতার শ্লোকের যে সমস্ত উল্লেখ রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচনায় করেছেন সেখানে সম্পূর্ণ শ্লোকটির উদ্ধৃতি খুব কম। বেশিরভাগ সময়ই তিনি উল্লেখ করেছেন শ্লোকাংশ—আধখানা শ্লোক বা কখনো কখনো মাত্র দুটো-তিনটে শব্দ। রবীন্দ্ররচনাবলীর সুলভ সংস্করণের আঠারোটি খণ্ডে আমি যা পেয়েছি তাতে দেখা যাচ্ছে যে তিনি সবচেয়ে বেশি মনে করেছেন গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৭ এবং ৪৮ সংখ্যক শ্লোক, যেখানে আসক্তিহীন কর্মের কথা বলা হয়েছে—
‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্ব কর্মনি (৪৭)
যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ধনঞ্জয়।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোঃ সমো ভূত্বা সমত্বং যোগ উচ্যতে (৪৮)
কবি কিন্তু কোথাও সম্পূর্ণ শ্লোকটি উদ্ধৃত করেননি—লিখেছেন প্রথম লাইনটা বা শুধু ‘মা ফলেষু কদাচন’ বা অনাসক্ত কর্ম বা ওইরকম কিছু। তাঁর আর একটি পছন্দের শ্লোক মনে হয় তৃতীয় অধ্যায় (কর্মযোগঃ) অন্তর্গত এই শ্লোকটি—
শ্রেয়ান স্বধর্ম্মো বিগুণ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ (৩৫)
এই শ্লোকটিও কবি কোথাও সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করেননি।
কবির কাছে স্বধর্ম বলতে ব্রাহ্মণের ধর্ম, বৈশ্যের ধর্ম, শূদ্রের ধর্ম বা হিন্দুর ধর্ম, মুসলমানের ধর্ম—এরকম কিছু নয়। স্বধর্ম হচ্ছে তাঁর কাছে মানুষের ব্যক্তিগত স্বভাব, তার মনুষ্যত্ব; আর পরধর্ম হচ্ছে পরের অন্ধ অনুকরণ। ভারতবর্ষ গ্রন্থে ‘চীনেম্যানের চিঠি’তে তিনি লিখেছেন—’আত্মানং বিদ্ধি, আপনাকে জানো—ইহাই মুক্তির উপায়। পরধর্মো ভয়াবহঃ, পরের অনুকরণেই বিনাশ।’ (সুলভ ৩য় খণ্ড)। অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেছেন—”মানুষ নিজের জগতে বিহার করতে না পারলে, পরান্নভোজী পরাবশথশায়ী হলে, তার আর দুঃখের অন্ত থাকে না। তাই তো কথা আছে : স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ। আমার যা ধর্ম তাই আমার সৃষ্টির মূ)লশক্তি, আমিই স্বয়ং আমার আশ্রয়স্থল তৈরী করে তার মধ্যে বিরাজ করব।” (সুলভ দ্বাদশ খণ্ড)। ‘পশ্চিমযাত্রীর ডায়ারী’ গ্রন্থে কবি এটা আরো সহজ করে লিখেছেন—”এক এক সময়ে বাহিরের কল্লোলে উদভ্রান্ত হয়ে স্বধর্মের বাণী স্পষ্ট করে শোনা যায় না। তখন কর্তব্য নামক ….একটি শব্দের হুঙ্কারে মন অভিভূত হয়ে যায়, ভুলে যাই যে কর্তব্য বলে অবচ্ছিন্ন পদার্থ নেই, আমার ‘কর্তব্য’ই হচ্ছে আমার পক্ষে কর্তব্য। …ঘোড়া যদি বলে ‘আমি সারথির কর্তব্য করব’ বা চাকা বলে ‘ঘোড়ার কর্তব্য করব’ তার সেই কর্তব্যই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।” গীতায় কবির আর একটি প্রিয় শ্লোক হচ্ছে—
নেহাভিক্রমনাশোহস্তি প্রত্যবায়ো ন বিদ্যতে।
স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ
স্বল্প পরিমাণ ধর্মও বৃহৎ ভয়ের থেকে রক্ষা করে। এই শ্লোকটির দ্বিতীয় লাইনটি কবি একাধিক জায়গায় ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়াও আরো শ্লোক বা শ্লোকাংশ আছে যেগুলো বিভিন্নক্ষেত্রে কবি ব্যবহার করেছেন।
গীতার ব্যাপারে সাধারণভাবে সপ্রশংস হলেও কবি এর সমালোচনাও করেছেন। প্রাচীন সাহিত্য গ্রন্থের ‘কাদম্বরী চিত্র’ প্রবন্ধে (সুলভ ৩য় খণ্ড) তিনি লিখেছেন—”ভগবদ গীতার মাহাত্ম্য কেহ অস্বীকার করিতে পারিবে না। কিন্তু যখন কুরুক্ষেত্রের তুমুল যুদ্ধ আসন্ন তখন সমস্ত ভগবদগীতা অবহিত হইয়া শ্রবণ করিতে পারে, ভারতবর্ষ ছাড়া এমন দেশ জগতে আর নাই।” কবির ধারণা ভগবদগীতা মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত।
গীতা মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত কি প্রক্ষিপ্ত নয়—এই নিয়ে বিতণ্ডা বহুদিন ধরে চলে আসছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি গীতাকে মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত বা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করি না।
অধ্যাপিকা পম্পা মজুমদার তাঁর গ্রন্থে এরকম মত প্রকাশ করেছেন যে গীতার ব্যাপারে সাধারণভাবে শ্রদ্ধাশীল হলেও গীতাকে কবি অভ্রান্তভাবে মেনে নেননি। যে সব মন্ত্র বা শ্লোকগুলিকে তাঁর পছন্দ হয়েছে সেগুলোকে বিভিন্ন সময়ে কবি তাঁর রচনার মধ্যে এনেছেন। তবুও গীতার ব্যাপারে শেষ কথাও তিনিই বলেছেন—
‘ভগবদগীতা আজও পুরাতন হয়নি, হয়তো কোনোকালেই পুরাতন হবে না।’ (সাহিত্যের স্বরূপ : সাহিত্যের মাত্রা : সুলভ চতুর্দশখণ্ড)
আমরা দেখেছি যে স্বয়ং মহর্ষিই বালক রবিকে গীতার কাজে যুক্ত করে দিয়েছিলেন। রামায়ণ-মহাভারতের সঙ্গেও কবির পরিচয় ঘটেছিল শিশুবয়সেই। জীবনস্মৃতিতে কবি লিখেছেন—’কান্নার জোরে ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে অকালে ভর্তি হইলাম।…চাকরদের মহলে যে সব বই প্রচলিত ছিল তাহা লইয়াই আমার সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। তাহার মধ্যে চাণক্যশ্লোকের বাংলা অনুবাদ ও কৃত্তিবাস—রামায়ণই প্রধান। সেই রামায়ণ পড়ার একটা দিনের ছবি মনে স্পষ্ট জাগিতেছে।’ কবি লিখেছেন যে এক মেঘলা দিনের বিকালে কবির ভাগিনেয় সত্যপ্রসাদ (কবির চাইতে বয়সে অল্প বড়ো) তাকে ভয় দেখাবার জন্য হঠাৎ ‘পুলিশম্যান’ ‘পুলিশম্যান’ বলে ডাকতে লাগলো। বালক রবি ভয়ে দৌড়িয়ে একেবারে অন্তঃপুরে মায়ের কাছে উপস্থিত হলেন এবং ভয়ে আর বাইরেই বেরোলেন না। ”দিদিমা, আমার মাতার কোনো-এক সম্পর্কে খুড়ী, যে কৃত্তিবাসের রামায়ণ পড়তেন সেই মার্বেল কাগজমণ্ডিত কোণ ছেঁড়া—মলাটওয়ালা মলিন বইখানি কোলে লইয়া মায়ের ঘরের দ্বারের কাছে পড়িতে বসিয়া গেলাম।…রামায়ণের কোনো একটা করুণ বর্ণনায় আমার চোখ দিয়া জল পড়িতেছে দেখিয়া দিদিমা জোর করিয়া আমার হাত হইতে বইটা কাড়িয়া লইয়া গেলেন।” যে বয়সে বালক পুলিশের নাম শুনলেই ভয়ে ঘরের মধ্যে পালিয়ে আসে সেই বয়সে কবি শুধু যে রামায়ণ পড়েছিলেন তাই নয়, করুণ বর্ণনায় তিনি অশ্রুপাত করেছিলেন অর্থাৎ চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। বর্ণনা পড়ে মনে হয় যে এটাই প্রথমদিন নয়, এর আগেও তিনি দিদিমার এই কৃত্তিবাসী রামায়ণ গ্রন্থখানি পড়েছেন। বালক বয়সে কবি এবং অন্যান্য ছোটরা যখন চাকরদের তত্বাবধানে থাকতেন তখন একজন ভৃত্য ঈশ্বর সন্ধ্যাবেলায় তাঁদেরকে রামায়ণ-মহাভারত পড়ে শোনাতো। এইভাবে কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারতের সঙ্গে কবির পরিচয় ঘটে গিয়েছিল বাল্যকালেই। এরপর তো কবির পিতার সঙ্গে হিমালয় যাত্রা। পিতার সঙ্গে যতদিন তিনি ছিলেন সেখানে কবিকে একটু-আধটু পড়াশোনাও করতে হতো। আগেই আমরা দেখেছি যে দেবেন্দ্রনাথ রবিকে ভগবদগীতার কিছু নির্বাচিত শ্লোক কপি করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই ভ্রমণকালেই কবি তাঁর পিতার কাছে পড়লেন মহর্ষি বাল্মীকি রচিত সংস্কৃত রামায়ণের অংশবিশেষ যা তিনি ফিরে এসে মাকে শুনিয়েছিলেন।
অধ্যাপিকা মজুমদার তাঁর গ্রন্থে এইরকম মত প্রকাশ করেছেন যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ কবির ভালোভাবে জানা থাকলেও তিনি বাল্মীকির মূল সংস্কৃত রামায়ণের সঙ্গে কতখানি পরিচিত ছিলেন সেটা জানা যায় না। তেমনি ঋষিশ্রেষ্ঠ বেদব্যাস রচিত সংস্কৃত মহাভারতের সঙ্গে কবির কতখানি পরিচয় ছিল সেটা নিঃসংশয়ে বলা যাবে না। উপরে উল্লিখিত মহর্ষির কাছে সংস্কৃত রামায়ণের অংশবিশেষ পড়া ছাড়া রামায়ণ নিয়ে প্রাসঙ্গিক আরো কিছু কথা এই প্রসঙ্গে বলা যায়—
(১) ১২৮৪ সালে অর্থাৎ কবির ষোলো বৎসর বয়সে মেঘনাদবধ কাব্যের যে সমালোচনা তিনি করেছিলেন, সেখানে হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য কর্তৃক বাল্মীকি রামায়ণের অনুবাদ থেকে তিনি সমুদ্রবর্ণনা বিষয়ক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। (সুলভ ১৭শ খণ্ড; পৃ-১৩৫)। অন্যত্রও তিনি হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনুবাদ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
(২) ঐ একই সমালোচনা প্রবন্ধে কবি নিজকৃত বাল্মীকি রামায়ণের কিছুটা অনুবাদ সন্নিবিষ্ট করেছেন—’বাল্মীকির রামায়ণে শোকের সময় রাবণের কিরূপ অবস্থা বর্ণিত আছে, এ স্থলে তাহা অনুবাদ করিয়া পাঠকদের গোচরার্থে লিখিলাম, ইহাতে পাঠকেরা দেখিবেন বাল্মীকির রাবণ হইতে মেঘনাদবধের রাবণের কত বিভিন্নতা।” এর পরে কবিকৃত অনুবাদ অংশটি দেওয়া হয়েছে।
বাল্মীকি রামায়ণের কবিকৃত অনুবাদ এই সমালোচনা প্রবন্ধে অন্যত্রও আছে। (সুলভ ১৭শ খণ্ড; পৃঃ ১৬০-১৬১)। ”ইন্দ্রজিতের সহিত যুদ্ধে প্রেরণ করিবার সময় সংস্কৃত রামায়ণের রাম লক্ষ্মণকে কহিতেছেন—” এরপরে অনেকটা কবিকৃত অনুবাদ দেওয়া হয়েছে। কবির নিজকৃত অনুবাদ আরো আছে (সুলভ-১৭; পৃ-১৬৪)। ”মূল রামায়ণে ইন্দ্রজিতের সহিত লক্ষ্মণের যেরূপ যুদ্ধবর্ণনা আছে তাহার কিয়দংশ আমরা পাঠকদিগের গোচরার্থে এইখানে অনুবাদ করিয়া দিয়েছি।” এরপরে অনেকটা অনুবাদ দেওয়া হয়েছে।
একজন প্রথিতযশা কবির (মাইকেল মধুসূদন দত্ত) রামায়ণ-আশ্রিত একটি কাব্যের তিনি সমালোচনা করছেন,বাল্মীকি রামায়ণের বিভিন্ন অংশ নিজে অনুবাদ করে সমালোচনা প্রবন্ধে সন্নিবেশিত করছেন—এক্ষেত্রে খুবই সম্ভব যে সম্পূর্ণ বাল্মীকি-রামায়ণটি রবীন্দ্রনাথ আগেই পড়ে নিয়েছিলেন।
১২৮৯ সালেও (অর্থাৎ কবির বয়স যখন একুশ বছর) কবি মেঘনাদবধ কাব্যের আর একটি সমালোচনা লিখেছিলেন। সেখানে মেঘনাদবধ কাব্যের ভাষার সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন—”একবার বাল্মীকির ভাষা পড়িয়া দেখো দেখি, বুঝিতে পারিবে মহাকবির ভাষা কিরূপ হওয়া উচিৎ, হৃদয়ের সহজ ভাষা কাহাকে বলে।” (সুলভ ১৫শ; পৃ-৭০)। বাল্মীকির ভাষা নিজে না পড়ে তিনি কি অপরকে এরকম উপদেশ দিতে পারেন?
শান্তিনিকেতন পর্যায়ের প্রবন্ধগুলির মধ্যে একটি প্রবন্ধ ‘তপোবন’। এখানে কবি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ড থেকে তিনটি সংস্কৃত উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তার মধ্যে একটি উদ্ধৃতি বেশ বড়ো। উদ্ধৃতিগুলির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অনেক কথাও বলেছেন। (সুলভ ৭ম খণ্ড; পৃ-৬৯৭)। ‘প্রাচীন সাহিত্য’ গ্রন্থের রামায়ণ রচনাটিতেও কবি বাল্মীকি-রামায়ণের আদিপর্ব থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন (সুলভ ৩য় খণ্ড; পৃ-৭১৩)। বাল্মীকি তাঁর কাব্যে উপযুক্ত নায়কের জন্য যখন দেবর্ষি নারদকে জিজ্ঞাসা করছেন সেই প্রসঙ্গেই এই শ্লোকদুটি (একটি অর্ধশ্লোক)—
”সমগ্রারূপিণী লক্ষ্মীঃ কমেকং সংশ্রিতা নরম্।
”দেবেষ্যপি ন পশ্যামি কশ্চিদেভিরগুণৈরযুতম।
শ্রূয়তাং তু গুণৈরেভির্যোযুক্তো নরচন্দ্রমাঃ।।”
শ্লোকদুটি নিয়ে একটু আলোচনাও তিনি করেছেন।
‘হিন্দু বিবাহ’ প্রবন্ধে (পরিশিষ্ট সমাজ; সুলভ যষ্ঠ খণ্ড; পৃ-৬৬৫)
একজায়গায় কবি লিখেছেন—”বাল্মীকির রামায়ণে কী আছে স্মরণ নাই, কিন্তু সাধারণে প্রচলিত গান এবং উপাখ্যানে শোনা যায় সীতা রামকে বলিতেছেন, পরজন্মে যেন তোমার মতো স্বামী পাই—” ‘স্মরণ নাই’ কথাটির যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা তো এটাই মনে হয় যে আগে জানতেন, কিন্তু যখন কথাটি লিখছেন তখন সেটি তিনি ভুলে গেছেন।
রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর মা মৃণালিনীদেবীর স্মৃতিচারণে লিখেছেন (চিঠিপত্র ১ম খণ্ড; পৃ-১৫৭) ”বাবা মনে করতেন—রামায়ণ মহাভারত ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে পরিচয় শিক্ষার একটি প্রধান অঙ্গ হওয়া উচিত। কিন্তু ছেলেদের পড়ে শোনানো যায় বা তাদের হাতে পড়তে দেওয়া যায় এমন কোনো বই তখন ছিল না। ভাষার বিশেষ পরিবর্তন করে, প্রক্ষিপ্ত ও অবান্তর ঘটনা বাদ দিয়ে মূল গল্প দুটি অটুট রেখে রামায়ণ ও মহাভারতের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করার আগ্রহ তাঁর এই সময়ে দেখা গেল। রামায়ণ সংক্ষিপ্ত করার ভার দিলেন মাকে আর মহাভারত সুরেনদাদাকে। …রামায়ণ সম্বন্ধে কিন্তু মাকে বললেন মূল সংস্কৃত থেকে সংক্ষেপ করে তর্জমা করতে। পণ্ডিত হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের সাহায্যে মা আগাগোড়া রামায়ণ পড়ে নিয়ে তর্জমা করতে লাগলেন। প্রয়োজনমতো বাবা পরিবর্তন বা সংশোধন করে দিতেন। একটি বাঁধানো খাতাতে কপি করে রেখেছিলেন—তার থেকে মাঝে মাঝে আমাদের পড়ে শোনাতেন। মৃত্যুর পূর্বে মা এ কাজটি করে যেতে পারেননি, তবে অল্পই বাকি ছিল। দুঃখের বিষয় বাবার মৃত্যুর পর যখন তাঁর সমস্ত কাগজপত্র রবীন্দ্র সদনে দেওয়া হল তখন এই খাতাটি পাওয়া গেল না।” এই লেখাটি পড়লে মনেই হয় না যে বাল্মীকির রামায়ণ কবির অপরিচিত ছিল।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এটাই আমার সিদ্ধান্ত যে কবি বাল্মীকি-রচিত সংস্কৃত রামায়ণ নিশ্চিতভাবেই পড়েছিলেন। ছোটোবেলায় যে বাংলা রামায়ণ পড়ে তাঁর চোখে জল আসতো, যে রামায়ণের প্রতি তিনি এত শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন—ভারতবর্ষের সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ মহর্ষি বাল্মীকি রচিত রামায়ণ—সেটা তিনি পড়বেন না, এটা ভাবতেও কেমন লাগে, বিশেষ করে বই পড়ার ব্যাপারে যিনি ক্লান্তিহীন। ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ প্রবন্ধে (সুলভ ৯ম খণ্ড; পৃ-৬৯৭) তিনি লিখেছিলেন—
”যখন আমার বয়স তেরো, তখন এডুকেশন-বিভাগীয় দাঁড়ের শিকল ছিন্ন করে বেরিয়ে পড়েছিলেম। তার পর থেকে যে বিদ্যালয়ে হলেম ভর্তি তাকে যথার্থই বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে আমার ছুটি ছিল না, কেননা অবিশ্রাম কাজের মধ্যেই পেয়েছি ছুটি। কোনো কোনো দিন পড়েছি রাত দুটো পর্যন্ত। তখনকার অপ্রখর আলোকের যুগে রাত্রে সমস্ত পাড়া নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে শোনা যেত ‘হরিবোল’ শ্মশান যাত্রীদের কণ্ঠ থেকে। ভেরেণ্ডা তেলের সেজের প্রদীপে দুটো সলতের মধ্যে একটা সলতে নিবিয়ে দিতুম, তাতে শিখার তেজ হ্রাস হত কিন্তু হত আয়ুবৃদ্ধি। মাঝে মাঝে অন্তঃপুর থেকে বড়দিদি এসে জোর করে আমার বই কেড়ে নিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিতেন বিছানায়। তখন আমি যে-সব বই পড়বার চেষ্টা করেছি কোনো কোনো গুরুজন তা আমার হাতে দেখে মনে করেছেন স্পর্ধা। শিক্ষার কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে যখন শিক্ষার স্বাধীনতা পেলুম তখন কাজ বেড়ে গেল অনেক বেশি, অথচ ভার গেল কমে।”
এবারে মহাভারতের বিষয়টা একটু দেখা যাক। জীবনস্মৃতি এবং অন্য লেখা থেকে জানা যায় যে কৃত্তিবাসের রামায়ণের মতো কাশীরাম দাসের বাংলা মহাভারতের সঙ্গেও কবির বাল্যকালেই পরিচয় ঘটেছিল। মহাভারত তিনি যে খুব ভালোভাবেই পড়েছিলেন সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ‘স্বদেশ’ গ্রন্থের ‘নূতন ও পুরাতন’ প্রবন্ধে (সুলভ ষষ্ঠ খণ্ড; পৃ-৫০৭) তিনি লিখেছিলেন—
”এক মহাভারত পড়লেই দেখতে পাওয়া যায় আমাদের তখনকার সভ্যতার মধ্যে জীবনের আবেগ কত বলবান ছিল। তার মধ্যে কত পরিবর্তন, কত সমাজবিপ্লব, কত বিরোধী শক্তির সংঘর্ষ দেখতে পাওয়া যায়। সে সমাজ কোনো-একজন পরম বুদ্ধিমান শিল্পচতুর লোকের স্বহস্তরচিত অতি সুচারু পরিপাটি সমভাববিশিষ্ট কলের সমাজ ছিল না। সে সমাজে এক দিকে লোভ হিংসা ভয় দ্বেষ অসংযত অহংকার, অন্য দিকে বিনয় বীরত্ব আত্মবিসর্জন উদার মহত্ত্ব এবং অপূর্ব সাধুভাব মনুষ্যচরিত্রকে সর্বদা মথিত করে জাগ্রত করে রেখেছিল। সে সমাজে সকল পুরুষ সাধু, সকল স্ত্রী সতী, সকল ব্রাহ্মণ তপঃপরায়ণ ছিলেন না। সে সমাজে বিশ্বামিত্র ক্ষত্রিয় ছিলেন, দ্রোণ কৃপ পরশুরাম ব্রাহ্মণ ছিলেন, কুন্তী সতী ছিলেন, ক্ষমাপরায়ণ যুধিষ্ঠির ক্ষত্রিয় পুরুষ ছিলেন এবং শত্রুরক্তলোলুপা তেজস্বিনী দ্রৌপদী রমণী ছিলেন। তখনকার সমাজ ভালোয়-মন্দয় আলোকে-অন্ধকারে জীবনলক্ষণাক্রান্ত ছিল; মানবসমাজ চিহ্নিত বিভক্ত সংযত সমাহিত কারুকার্যের মতো ছিল না। এবং সেই বিপ্লবসংক্ষুদ্ধ বিচিত্র মানববৃত্তির সংঘাত দ্বারা সর্বদা জাগ্রতশক্তিপূর্ণ সমাজের মধ্যে আমাদের প্রাচীন ব্যূঢ়োরস্ক শালপ্রাংশু সভ্যতা উন্নতমস্তকে বিহার করত।”
মহাত্মা কালীপ্রসাদ সিংহ অনুদিত বাংলা মহাভারত তো তিনি পড়েইছেন তবে ঋষিশ্রেষ্ঠ বেদব্যাস রচিত সম্পূর্ণ সংস্কৃত মহাভারত তিনি পড়েছেন কী না সেটা নিয়েই পণ্ডিতেরা সন্দেহ প্রকাশ করেন। গীতা তো মহাভারতেরই অংশ। আমরা আগে আলোচনা করেছি যে গীতার অনেক শ্লোক বা শ্লোকাংশ কবি তাঁর রচনার বিভিন্ন জায়গায় উদ্ধৃত করেছেন। গীতা ছাড়া মহাভারতের অন্য জায়গা থেকেও তিনি শ্লোক বা শ্লোকাংশ তাঁর রচনায় উদ্ধৃত করেছেন। ‘রূপান্তর’ গ্রন্থে মহাভারতের দুটো শ্লোক রয়েছে যে দুটো কবি পদ্যে অনুবাদ করেছিলেন (সুলভ ষোড়শ খণ্ড; পৃ-১১২, ১১৩)। গ্রন্থমধ্যে আমি উল্লেখ করেছি ‘রোগশয্যায়’ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা (১৪ সংখ্যক; সুলভ ত্রয়োদশ খণ্ড) আমার মনে হয়েছে মহাভারতের শান্তিপর্বের দুটো শ্লোকের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্ররচনাবলীর ৩২তম খণ্ডে রবীন্দ্রনাথকৃত একটি গ্রন্থসমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে ‘একখানি মহাভারত’ নামে। কবি লিখেছেন যে শ্রীযুক্ত পণ্ডিত হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয় সম্পাদিত মহাভারতের সতেরো খণ্ড তাঁর (কবির) হাতে এসেছে। হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয় সংকলিত ‘সম্পূর্ণ মহাভারতম’ (প্রায় বাইশ হাজার পৃষ্ঠা) এখন ৪৩ খণ্ডে লব্ধ। কিন্তু যখন এই মহাগ্রন্থ প্রকাশ হচ্ছিল তখন সম্ভবত ১২৮ পৃষ্ঠাতে এক একটা খণ্ড প্রকাশিত হতো। সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয় ‘মহাভারতের ইতিহাস’ পুস্তিকাতে লিখেছেন—’১৩৩৬ সালের শ্রাবণ মাসের প্রথমে আরম্ভ করিয়া ১৩৪৬ সালের ফাল্গুন মাস পর্য্যন্ত প্রায় এগারো বৎসর নির্বিঘ্নে মহাভারতের ১০৩ খণ্ড পর্যন্ত প্রকাশিত হইল। ইহাতে সৌপ্তিক পর্ব পর্য্যন্ত ১০টি পর্বই প্রকাশিত হইল।” বাকি খণ্ডগুলো প্রকাশিত হতে আরো দশবছর লেগে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—’ইহার সতেরো খণ্ড আমার হাতে আসিয়াছে। আদিপর্ব শেষ করিয়া সভাপর্ব আরম্ভ হইল।…পণ্ডিত মহাশয়ের এই অধ্যবসায়ে আমি নিজে তাঁহার নিকট বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। আমার অল্পবয়স হইতেই মহাভারত আমাকে বিস্মিত করিয়াছে। ইহা ভারতবর্ষের হিমালয়েরই মতো যেমন উত্তুঙ্গ তেমনি সুদূর প্রসারিত,… একাধারে এমন বিপুল বিচিত্র সাহিত্য আর কোনো ভাষায় নাই। অন্য দেশের কথা বলিবার প্রয়োজন নাই, কিন্তু ইহা নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারি যে মহাভারত না পড়িলে আমাদের দেশের কাহারও শিক্ষা সম্পুর্ণ হইতে পারে না।”—’সতেরো খণ্ড আমার হাতে আসিয়াছে’—কথাটির অর্থ হয় এক থেকে সতেরো সবগুলো খণ্ডই তিনি পেয়েছিলেন এবং সেগুলি তিনি পড়েছিলেন।
এই গ্রন্থ সমালোচনার তারিখ দেওয়া হয়েছে ১৫ আশ্বিন, ১৩৩৮। এর পর রবীন্দ্রনাথ আরো বছরদশেক বেঁচেছিলেন। এই দশবছরে সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয় মহাভারতের আরো অনেকগুলো খণ্ড প্রকাশ করেছেন এবং অনুমান করা যায় যে সেগুলোও রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছেছে আর সম্ভবত তিনি সেগুলো পড়েওছেন। মহাভারতের প্রতি যিনি এত বেশী শ্রদ্ধাসম্পন্ন, তিনি শুধু কাশীরাম দাস এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ পড়ে সন্তুষ্ট থাকবেন এটা ভাবতে কেমন লাগে বিশেষত তাঁর মতো একজন পড়ুয়া যাঁর সম্বন্ধে Voracious Reader কথাটা ব্যবহার করাই যায়।
৫ মার্চ, ১৯৩৮ তারিখে কবি একটি চিঠিতে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে লিখেছিলেন ‘মহাভারত লেখার ভার স্বীকার করে নিয়েছি—অবিলম্বে শুরু করতে হবে। (চিঠিপত্র তয় খণ্ড, ৮৯ সংখ্যক পত্র) গ্রন্থপরিচয় অংশে লেখা হয়েছে (চিঠিপত্র তয় খণ্ড, পৃ-২২২-২২৩) যে কবি ২৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লিখেছিলেন—’সকলের চেয়ে বিরাট একটা তাগিদ আমার মাথার উপর ঝুলচে—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে স্বীকার করেছি মহাভারতের উপর একখানা বই লিখব।’ প্রতিমা দেবীকে ৮৯ সংখ্যক চিঠি লেখার প্রায় দেড় বৎসর পর মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে কবি লিখেছিলেন—’ও (মহাভারত) এক সমুদ্র। ওর মধ্যে যে কত কি আছে তার অন্ত নেই। একদিকে যেমন চিন্তা সুদূরপ্রসারী, গভীর, অন্যদিকে তেমনি অগাধ ছেলেমানুষি।’ সুধীরচন্দ্র কর মহাশয়কে ওইসময়ে কবি লিখেছিলেন—’চোখের দুর্বলতার জন্য কোমর বেঁধে লিখতে পারছি নে—ছোটো অক্ষরের মহাভারত যেন কাঁকর বিছানো রাস্তা, তার উপর দিয়ে চোখ চালানো আরামের নয়।’—শারীরিক কারণে মহাভারত নিয়ে কবি এই বই লিখে উঠতে পারেন নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে কবি এই বই লেখার কাজ স্বীকার করে নিয়েছিলেন মূল মহাভারত গ্রন্থ না পড়েই শুধুমাত্র কাশীরাম দাস বা কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ গ্রন্থ সম্বল করে, এটা বিশ্বাস করতে মন চায় না। মূল সংস্কৃত মহাভারত গ্রন্থ তিনি পড়েছিলেন এটাই আমার ধারণা—সম্পূর্ণ না হলেও অধিকাংশই।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর কোনো লেখাতে রামায়ণ-মহাভারতের যুগের কোনো সময়কাল নির্দেশ করেন নি। তিনি লিখেছেন—’মহাভারতের যুগ…কবে আরম্ভ তাহা স্থির করিয়া বলিলে ভুল বলা হইবে।’ (পরিচয়; ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা; সুলভ নবম খণ্ড)। তবে রামায়ণ-মহাভারতের মধ্যে তিনি আর্য-অনার্য সংঘাতের ইতিহাস এবং পরবর্তীতে একটা সমন্বয়ের প্রয়াস লক্ষ করেছেন। ‘আর্যরা কালে কালে ও দলে দলে প্রবেশ করিতেছিলেন” যার ফলশ্রুতিতে স্থানীয় অনার্যদের সঙ্গে তাদের সংঘাত বাধে। এই যে আর্য অনুপ্রবেশ বা Aryan lnvasion—এই ধারণা অনেকেই বলেন যে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সৃষ্টি ভারতের প্রাচীন সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করার উদ্দেশ্যে। এই ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা এবং তাঁদের ভারতীয় সমর্থকেরা আর্য অনুপ্রবেশের ব্যাপারটা মোটামুটি ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ সময় নাগাদ ঘটেছিল বলে প্রচার করেন। ঋগবেদের রচনাকাল হিসাবে তাঁরা চিহ্নিত করেন ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ১০০০ খ্রিঃ পূঃ সময়টাকে। রামায়ণ-মহাভারতের রচনাকাল তাঁদের মতে আরো অনেক পরে—গৌতমবুদ্ধের আশপাশ সময়ে। রবীন্দ্রনাথ আর্য অনুপ্রবেশের তত্বকে যদিও মেনে নিয়েছেন, বেদের সময়কাল, তিনি বলেছেন এখন থেকে চারহাজার বৎসর পূর্বে। ‘নিরাকার উপাসনা’ প্রবন্ধে (সুলভ ৫ম খণ্ড, পৃ-৬১৮) তিনি লিখেছেন—”চারি সহস্র বৎসর পূর্বে ভারতে প্রশ্ন উঠিয়াছিল—অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ং তথারসং নিত্যমগন্ধবচ্চ যৎ—যাঁহাতে শব্দ নাই, স্পর্শ নাই, রূপ নাই, রস নাই, গন্ধ নাই, এমন যে নিত্য পরব্রহ্ম, তাঁহাকে আমরা শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধের মধ্যে থাকিয়া লাভ করিতে পারি কি না? তপোবনে অরণ্যচ্ছায়াতলে সেদিন তাহার এক সুগম্ভীর উত্তর ধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছিল—বেদাহমেতাং পুরুষং মহান্তং, আমি সেই মহান পুরুষকে জানিয়াছি।”
২৫শে শ্রাবণ, ১৩৩৬ কবি নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লিখেছিলেন চিঠি (সুলভ চতুর্দশ খণ্ড; পৃ-৮৪৬)—’আজ সুরুলে হলচালন উৎসব হবে। লাঙল ধরতে হবে আমাকে। বৈদিক মন্ত্র-যোগে কাজটা করতে হবে ব’লে এর অসম্মানের অনেকটা হ্রাস হবে। বহু হাজার বৎসর পূর্বে এমন একদিন ছিল যখন হাল-লাঙল কাঁধে করে মানুষে মাটিকে জয় করতে বেরিয়েছিল, তখন হলধরকে দেবতা বলে দেখেছে, তার নাম দিয়েছে বলরাম।’—মহাভারত অনুসারে বলরাম শ্রীকৃষ্ণের বৈমাত্রেয় দাদা। তাঁর সময়টা মহাভারতের সময়। বহুহাজার বৎসর বলতে আড়াই হাজার বৎসর বোঝায় না তার অনেক বেশি বোঝায় সেটি পাঠকেরা বিবেচনা করে দেখবেন। আগে দেখানো হয়েছে যে, রামায়ণ প্রসঙ্গে কবি অনেক সহস্র বৎসর’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। শ্রদ্ধেয় শ্রীহরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ তাঁর সংকলিত ‘মহাভারতম’ এর প্রথম খণ্ডে মহাভারতের সময়কাল মোটামুটি পাঁচহাজার বৎসর পূর্বে বলেছেন। Dr. N,S. Rajaram তাঁর Search for the Histotical krishna গ্রন্থে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে মোটামুটি পাঁচহাজার বৎসর আগের সময়টাই ঠিক বলেছেন।
রামায়ণ-মহাভারতের যে-সমস্ত কথা বা প্রসঙ্গ কবি তাঁর রচনাতে উল্লেখ করেছেন বা আলোচনা করেছেন সেগুলো সব এই গ্রন্থে সংকলিত করার চেষ্টা করেছি বা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। এই বৃত্তের মধ্যে এসেছে
(১) রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী নিয়ে যে সমস্ত কবিতা/নাটক/নাটিকা ইত্যাদি রচনা করেছেন—মূল কাহিনী কিছুটা অনুসরণ করছেন এবং কখনো কখনো মূল কাহিনী থেকে সরে এসে নিজের কল্পনা মিশিয়েছেন। যেমন,কর্ণ-কুন্তী সংবাদ, গান্ধারীর আবেদন, বিদায়-অভিশাপ, ইত্যাদি।
(২) রামায়ণ-মহাভারত থেকে কাহিনীর সূত্র নিয়ে বা নামটুকু নিয়ে নিজের কল্পনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে-সব অন্যবদ্য কবিতা বা নাটক-নাটিকা। যেমন—বাল্মীকি-প্রতিভা, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি।
(৩) সাধারণভাবে রামায়ণ-মহাভারত নিয়ে বা কোনো কাহিনী নিয়ে বা কোনো চরিত্র নিয়ে কোনো প্রবন্ধে যে-সব আলোচনা করেছেন। যেমন, দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের ‘রামায়ণী কথা’র ভূমিকা হিসাবে ‘রামায়ণ’ নামে যে লেখা লিখেছেন বা ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধে রামায়ণ-মহাভারত নিয়ে যে-সব আলোচনা করেছেন ইত্যাদি।
(৪) অন্য কোনো রচনার মধ্যে বা চিঠিপত্রে রামায়ণ-মহাভারতের কথা, গ্রন্থদ্বয়ের কোনো কাহিনী উল্লেখ বা চরিত্রের উল্লেখ বা এই সমস্ত বিষয়ে কোনো আলোচনা।
(৫) কোনো বিষয়কে পরিস্ফুট করতে উদাহরণ বা উপমা হিসাবে রামায়ণ-মহাভারতের উল্লেখ, গ্রন্থদ্বয়ের কোনো কাহিনী বা চরিত্রের উল্লেখ।
(৬) casual comment বা তির্যক মন্তব্য বা কৌতুক হিসাবে রামায়ণ-মহাভারত গ্রন্থ, গ্রন্থদ্বয়ের কোনো চরিত্র বা কাহিনীর উল্লেখ।
(৭) রামায়ণ-মহাভারত গ্রন্থদ্বয়ের কোনো শ্লোক বা শ্লোকাংশ বা গ্রন্থদ্বয়ের অনুবাদের কোনো অংশ যা তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর রচনায়।
(৮) রামায়ণ-মহাভারত রচনাকারদের বা অনুবাদক/ভাবানুবাদকদের যেমন আদিকবি বাল্মীকি, কবিশ্রেষ্ঠ বেদব্যাস, পণ্ডিত কৃত্তিবাস ওঝা, পণ্ডিত কাশীরাম দাস, ভক্তকবি তুলসীদাস—এঁদের নামের উল্লেখ বা তাঁদের নিয়ে কোনো আলোচনা।
কিছু কিছু বিষয় আমি এই গ্রন্থে আলোচনার মধ্যে আনিনি। শ্রীকৃষ্ণ নিঃসন্দেহে মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিন্তু তাঁর বাল্যলীলা বা বৃন্দাবনলীলা, গোপিনীবিলাস প্রভৃতি মহাভারতের কাহিনীর সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত নয়। এই সমস্ত বিষয় প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীমতী রাধিকার উল্লেখ রবীন্দ্রসাহিত্যে বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও এইগুলো আলোচনার জন্য এই গ্রন্থ আনিনি। ভগবান শিবের উল্লেখ রামায়ণ-মহাভারতের বহু জায়গায় আছে। তবে উমার তপস্যা, মদনভস্ম প্রভৃতি ব্যাপারগুলো মহাভারতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই এই সমস্ত বর্ণনাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি আলোচনার জন্য গ্রহণ করিনি। সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কথা রামায়ণ-মহাভারতে অনেক জায়গাতেই আছে কিন্তু রামায়ণের বা মহাভারতের ঘটনাপ্রবাহে তাঁর সেরকম কোনো বড়ো ভূমিকা নেই।
পূর্ববর্ণিত বিষয়সমূহ রবীন্দ্ররচনাতে যেখানে যেখানে পেয়েছি সেগুলি রবীন্দ্ররচনাবলীর খণ্ড অনুযায়ী উদ্ধৃত করেছি। বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্ররচনাবলীর সুলভ সংস্করণের ১৮টি খণ্ড আমার প্রধান অবলম্বন এবং এটা বোঝাতে শুধু ‘সুলভ’ কথাটি ব্যবহার করে খণ্ড উল্লেখ করেছি। তবে এই গ্রন্থটি শুধুমাত্র রবীন্দ্ররচনায় উল্লিখিত রামায়ণ-মহাভারত কথার সংকলন নয়। বইটি পড়ার সময়ে যাতে একঘেঁয়ে মনে না হয় সেই জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবি বর্ণিত অংশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছি। যেখানে যেখানে রামায়ণ-মহাভারত কাহিনীর আভাস আছে, সেই সমস্ত কাহিনীগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করেছি। যাঁরা রামায়ণ-মহাভারত পড়েননি বা পড়লেও ভুলে গিয়েছেন, এই উল্লেখে তাঁদের সুবিধা হবে বলে মনে হয়। যেখানে কবি শুধুমাত্র রামায়ণ-মহাভারতের কোনো চরিত্রের নাম উল্লেখ করেছেন, সেখানে সেইসব চরিত্রের সংক্ষেপে পরিচয় দিয়েছি। তবে এটা সবসময় repeat করিনি। যেমন, বশিষ্ঠ নামের উল্লেখ কবির লেখাতে বহু জায়গায় আছে। আমি প্রথমে দু’একবার বশিষ্ঠের পরিচয় লিখেছি—পরের দিকে আর লিখিনি। কবির কবিতা নাটক/নাটিকা ইত্যাদিতে যেখানে যেখানে মূল রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী থেকে তিনি সরে এসেছেন, সেই জায়গাগুলো বিশদে আলোচনা করেছি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখায় বহু জায়গাতেই রামায়ণ-মহাভারতের (গীতা সহ) শ্লোক, শ্লোকাংশ বা মাত্র কয়েকটি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করেছেন। সম্পূর্ণ শ্লোক তিনি উদ্ধৃত করেছেন কদাচিৎ—অধিকাংশ সময়েই ব্যবহার করেছেন মাত্র কয়েকটি শব্দ যেমন, মা ফলেষু কদাচন, পরধর্ম ভয়াবহ, স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য প্রভৃতি । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি এর উৎস উল্লেখ করেননি বা অর্থও লেখেননি। যথাসম্ভব এই সমস্ত সংস্কৃত কথাগুলির সঙ্গে যুক্ত সম্পূর্ণ শ্লোকটি উদ্ধার করে তার উল্লেখ করেছি, অর্থ দিয়েছি এবং সংক্ষেপে প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছি। আমি চেষ্টা করেছি রবীন্দ্রসাহিত্যে রামায়ণ-মহাভারত কথার সবই (কিছু কিছু খুবই নগণ্য) এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করতে। তবে সুবিশাল রবীন্দ্রসাহিত্যের মধ্যে দু’চারটি বর্ণনা আমার দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে বা আমার বুঝতে ভুল হওয়ার জন্যও একটা/দুটো বর্ণনা বাদ পড়ে যেতে পারে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের সঙ্গে আমি সহমত হতে পারিনি। সেই সমস্ত ক্ষেত্রে আমার যুক্তি দিয়ে মতানৈক্যের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। এটা অবশ্যই আমার মতো সামান্য মানুষের পক্ষে ধৃষ্টতা, তবে গ্রন্থের প্রয়োজনে আমার মতামত ব্যক্ত করতে হয়েছে। আমি খুব আন্তরিকভাবেই আশা করি যে এই বইটি পাঠ করলে পাঠক/পাঠিকার মনে রবীন্দ্রভাবনায় রামায়ণ-মহাভারতের ছবিটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে আর সেই আশা নিয়েই আমি আমার প্রারম্ভিক বক্তব্যের উপসংহার করছি।




Leave a Reply