• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

যশোহর খুলনার ইতিহাস ২ – সতীশচন্দ্ৰ মিত্ৰ

লাইব্রেরি » সতীশচন্দ্র মিত্র » যশোহর খুলনার ইতিহাস ২ – সতীশচন্দ্ৰ মিত্ৰ
যশোহর খুলনার ইতিহাস ২ - সতীশচন্দ্ৰ মিত্ৰ
লেখক: সতীশচন্দ্র মিত্রবইয়ের ধরন: ইতিহাস ও সংস্কৃতি

যশোহর খুলনার ইতিহাস ২ (দ্বিতীয় খণ্ড) – সতীশচন্দ্ৰ মিত্ৰ

লেখক সমবায় প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ২০২৩, শ্রাবণ ১৪৩০
১ম সংস্করণ : ১৯২২
২য় সংস্করণ : ১৯৬৫

.

উৎসর্গ – পত্ৰ
আচার্য্য স্যর শ্রীযুক্ত প্রফুল্লচন্দ্র রায় মহোদয়
শ্রীশ্রীচরণকমলেষু

আচাৰ্য্যদেব!

আমার ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাসের’ প্রথম খণ্ডের মত এই দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশেরও সকল ব্যবস্থা আপনি করিয়াছেন, আমি গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা করিবার মত ভক্তিভরে ইহা আপনারই করপল্লবে সমর্পণ করিতেছি। দ্বাদশ বর্ষ পূর্ব্বে আপনি আমাকে যে উৎসাহবাণী দ্বারা উদ্বোধিত করিয়াছিলেন, তাহা এখনও আমার কর্ণে ঝঙ্কৃত হইতেছে; আমি তদনুসারে কার্য্য করিতে কোন প্রকার প্রাণপাতী পরিশ্রমে বা প্রাণ হাতে লইয়া দুৰ্গম স্থানে তথ্যানুসন্ধানে কাতর হই নাই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রকৃত সফলতা লাভের শক্তি আমার ছিল কিনা জানি না; আপনার কথার সার্থকতা আপনিই বিচার করিবেন। তবে এই মাত্র বলিতে পারি, আমার গ্রন্থে আর যাহা কিছুরই অভাব থাকুক, ইহাতে প্রাণের অভাব নাই, দেশ-মাতৃকার প্রতি ভক্তির অভাব নাই, কঠোর ন্যায়পরতার সঙ্গে সমদর্শিতার অভাব নাই। আপনি সৰ্ব্বজাতিতে সৰ্ব্বভূতে সমদর্শী; ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে আমিও সে নীতির অনুসরণ করিতে ত্রুটি করি নাই। আমি কোন স্থলে বোধ হয় অনাবশ্যক আবেগ বা উচ্ছ্বাসের প্রশ্রয় দেই নাই, ভাষাকে সরস করিতে গিয়াও সতর্কতা বা সত্যানুবর্তিতা হারাই নাই। আমি সর্ব্বত্র সংক্ষেপ ও সংকোচের জন্যই চেষ্টিত থাকিয়া অনর্থক অতিরঞ্জন পরিহার করিয়াছি। তবুও পুস্তক বড় হইয়াছে; হইয়াছেও আপনার কৃপায়; আপনি অনেক ছোটকেই বড় করিয়াছেন।

আপনি যশোহর-খুলনার গৌরব-স্তম্ভ। খুলনা আপনার জন্মগৌরবে পবিত্র, যশোহর আপনার বংশ-গৌরবে সুরভিত; সমগ্র বঙ্গ আপনার কর্ম্ম-গৌরবে সমুন্নত, ভারতবর্ষ আপনার কীৰ্ত্তি-কথায় মুখরিত; আর বিশ্বমানব আপনার জ্ঞান-গৌরবে উদ্ভাসিত। সকলেই আপনার নিকট ঋণগ্রস্ত, কিন্তু কেহই অঋণী হইতে চাহে না। আমার কথাও তাহাই। আপনি অর্থ আয় করেন ত্যাগের জন্য, ভোগের জন্য নহে, সে অর্থ নিত্য বঙ্গীয় যুবকের শিক্ষাদীক্ষায় এবং বিদ্যাপীঠের সাহায্য-কল্পে অবিরত ব্যয়িত হয়। শুধু তাহাই নহে, বঙ্গের অঙ্গ যেখানে ক্ষতবিক্ষত, যেখানে রোগগ্রস্ত, সেই স্থানে তাহার চিকিৎসার জন্য এ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতার চিরপরিচিত ‘ডাক্তার রায়’ অবতীর্ণ, আজ দুর্ভিক্ষে, কা’ল প্লাবনে, আজ নৈতিক সংস্কারে, কা’ল অন্ন বা বস্ত্র-সমস্যার সমাধানে, এখানে বিদ্যামন্দিরের সংগঠনে, সেখানে শিল্পশালার উদ্বোধনে, যেখানে যখন দুৰ্দ্দৈব, যেখানে যখন প্রয়োজন, সেইখানে আপনি কাণ্ডারী। আপনি দীনবাসপরিহিত জীর্ণ-তনু লইয়া চির-কুমার তাপস-মূর্তিতে বুক পাতিয়া দাঁড়াইলে, সমগ্র ভারতের ভক্তিবিশ্বাসের চাক্ষুষ নিদর্শনস্বরূপ আপনার নামে অজস্র অর্থবৃষ্টি হয় এবং আপনার আরব্ধ কার্য্যকে লক্ষ্মীযুক্ত জয়যুক্ত করিয়া দেয়।

পরোপচিকীর্ষাই আপনার ধর্ম্ম, উহাই আপনার যাবতীয় মতামত ও কর্ম্মকাণ্ডের ভিত্তি। আপনি কোন পক্ষ, সংঘ বা রাজনৈতিক সম্প্রদায়ভুক্ত নহেন। দীনার্ত্তসেবানিষ্ঠার কষ্টিপাথরে আপনার সকল কৰ্ম্ম পরীক্ষিত। আমাদের এই দুর্ভাগ্য দেশে নিত্য দুদৈবের পার নাই, আপনারও কর্মের শেষ নাই। সেই বিপুল কর্ম্মময়তার মধ্যেও আপনি একনিষ্ঠ সাধকের মত কিরূপে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিমগ্ন থাকিতে পারেন, তাহা লোকে শুনিয়া বিশ্বাস না করিলেও দেখিয়া বিস্মিত হয়। আরও আশ্চর্য্যের বিষয় এই, বিরাট কর্ম্মাড়ম্বরের মধ্যেও আপনি নিজ দেশের কথা, নিজ জন্মপল্লীর কথা শুনিতে সর্ব্বদা উৎকর্ণ। সেই জেলা বা সেই পল্লীর নাম করিয়া যে কেহ আপনার দ্বারস্থ হয়, সেই আশ্বস্ত হইয়া আশ্রয় পায়। আজ আমি আপনার সেই জন্মভূমির নূতন পুরাতন ননা কাহিনীর পুষ্পস্তবক লইয়া আপনার সমীপস্থ হইতেছি, আমার সাগ্রহ সভক্তি পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করিয়া কৃতার্থ করুন। আমি কর্ত্তব্যবুদ্ধির প্ররোচনায় এ পুস্তক রচনাকালে কাহারও তুষ্টির প্রতি দৃষ্টি রাখি নাই, কিন্তু ইহা পাঠ করিলে যদি আপনি কিছুমাত্র তুষ্টি অনুভব করেন, তাহা হইলেই আমার সকল শ্রম, সকল চেষ্টা সার্থক মনে করিব।

প্রণত দীনগ্রন্থকার
দৌলতপুর, খুলনা
রাস-পূর্ণিমা, ১৩২১

.

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

যশোহর-খুলনার ইতিহাসের প্রথম খণ্ড বাহির হইবার আট বৎসর পরে উহার দ্বিতীয় খণ্ড প্ৰকাশিত হইল। শ্রীভগবানের অপার করুণা এবং আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্রের দানশীলতাই এই পুস্তক প্রকাশের একমাত্র সহায়। ইষ্টকৃপা ব্যতীত আমার জীবনের আশা ছিল না; আচার্য্যদেবের কৃপা ব্যতীত পুস্তক ছাপিয়া বাহির করিবার ভরসা ছিল না। এই কথার সরল অভিব্যক্তি ব্যতীত আন্তরিক কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনের আর কি ভাষা থাকিতে পারে, আমি তাহা জানি না। ১৩২১ সালের আশ্বিন মাসে প্রথম খণ্ড সাধারণের হস্তে দিবার কয়েক মাস পরে, আমি সাতক্ষীরায় গিয়া ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের জন্য ভ্রমণফলে সাংঘাতিক বসন্ত রোগে আক্রান্ত হইয়া দৌলতপুরে ফিরিয়া আসি তেমন ভীষণ আক্রমণ আমার আত্মীয় বন্ধুরা কেহ কখনও দেখেন নাই; আমার জীবনের কিছুমাত্র আশা ছিল না, মৃত্যু-সংবাদও রটিয়াছিল। অবশেষে কৃপায় এবং শত শত পরিচিত বা অজ্ঞাত আত্মীয় বন্ধু ও দেশবাসীর অযাচিত আশীর্ব্বাদের ফলে আমি বাঁচিয়া উঠি। এমন বাঁচা কদাচিৎ লোকে বাঁচে; ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা তিনিই জানেন। রোগযন্ত্রণায় চৈতন্য-লোপের পূর্ব্বক্ষণ পর্য্যন্ত আমার চিন্তা ছিল, এই ইতিহাস সম্বন্ধীয় আমার দায়িত্ব বুঝি অপূর্ণ রহিয়া গেল। দৈব-কৃপা রোগমুক্তির পর পূর্ণ ভক্তিবিশ্বাসে ও দ্বিগুণ উৎসাহে আবার আরব্ধ কার্য্যে নিরত হইলাম। তবুও কত বাধা বিপত্তি ও ভাগ্যবিড়ম্বনা যে আমার পথের অন্তরায় হইয়াছে, ১৩২৫ সালে দারুণ ভ্রাতৃশোকে জর্জরিত হইয়া, পরবৎসর আকস্মিক ঝটিকাবর্ত্তে বিপন্ন ও আবাসশূন্য হইয়া যে কত অশান্তির মধ্যে কার্য্য করিয়া চলিয়াছি, তাহা বলিবার নহে। সে কার্য্যের ফলাফল আজ সাধারণের সমক্ষে উপস্থাপিত হইল, উহার বিচারক আমি নহি।

প্রথম খণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় খণ্ড যন্ত্রস্থ হইবার কথা ছিল, তাহা হয় নাই। বিলম্বের কারণ কতক পূৰ্ব্বে দিয়াছি; প্রথমতঃ আমি বৎসরাধিক কাল একপ্রকার অকর্ম্মণ্যই ছিলাম; দ্বিতীয়তঃ ইয়োরোপীয় মহাসমরের ফলে কাগজ প্রভৃতির অগ্নিমূল্য হইয়াছিল; তৃতীয়তঃ বৰ্ত্তমান পুস্তকের উপাদান যাহা সংগৃহীত ছিল, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তাহা পর্যাপ্ত নহে; আরও ভ্রমণ, অনুসন্ধান ও তথ্য-সংগ্রহের প্রয়োজন। একাগ্রভাবে তাহা করিয়াছি, শেষ পর্য্যন্ত সে কাৰ্য্য চলিয়াছে। পুস্তক ছাপা হইতে হইতেও কত নূতন কথা সংযোজিত হইয়াছে। দুই বৎসরের অধিক কাল পুস্তকখানি মুদ্রাযন্ত্রের কবলে ছিল, সমস্ত পুস্তকের পাণ্ডুলিপি শেষ করিয়া মুদ্রাঙ্কণ আরম্ভ করিতে পারি নাই, কতকাংশ যন্ত্রস্থ করিয়া আমার হস্ত অবিরত লেখনী চালনায় ব্যস্ত ছিল। সুবৃহৎ পুস্তকের আদ্যোপান্ত ঘটনাবলী ও চিন্তাপ্রণালীর সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া কার্য্য করিতে মস্তিষ্ককে যে কিরূপ প্রপীড়িত করিয়াছি, তাহা আমিই জানি। মফস্বলে বসিয়া সমগ্র পুস্তকের প্রুফ আমিই দেখিয়াছি, সমস্ত কপি আমিই লিখিয়াছি, সহায়ক কাহাকেও পাই নাই। দ্বিতীয় প্রুফের ভুল সংশোধনের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রণের অর্ডার দিতে হইয়াছে, সংশোধিত হইয়া মুদ্রিত হইল কিনা তাহা পরীক্ষার সুযোগ হয় নাই। তাই মুদ্রাযন্ত্রের চিরাচরিত প্রকৃতিবশে ভ্রমপ্রমাদ যে কিছু কিছু না রহিয়াছে, তাহা নহে। তজ্জন্য অবশ্য পাঠকবর্গ আমাকে ক্ষমা করিবেন। বিশেষতঃ উদরান্নের সংস্থান জন্য যথোপযুক্ত পরিশ্রম করিয়া যাহা কিছু অবসর ঘটিয়াছে, বা শরীরের দিকে না চাহিয়া সে অবসর কালকে বিনিদ্র রজনীতে যতটুকু দীর্ঘ করিতে পারিয়াছি, তাহাতে আমাকে এই ইতিহাসের জন্য নিযুক্ত থাকিতে হইয়াছে। এমনই আমার দুর্ভাগ্য, অন্য দেশে হয়ত যে কার্য্যের উৎসাহ জন্য বৃত্তিসহ দীর্ঘ অবকাশ জুটে, আমার বেলায় সে ত দূরের কথা, বরং যে দুই বৎসর কাল এই পুস্তকের রচনা ও মুদ্রাঙ্কণ লইয়া আমি একান্ত বিব্রত, সে সময়ে আমার স্কন্ধে নূতন কর্তব্যের গুরুভার চাপিয়া আমাকে একপ্রকার অনবসর করিয়া তুলিয়াছিল। সে দুঃখের কথা ইষ্ট-চরণে নিবেদন করা এবং অবস্থাকে ভাগ্যফলরূপে গ্রহণ করা ভিন্ন আমার মত দারিদ্র্যপীড়িত দায়গ্রস্ত ব্যক্তির গত্যন্তর ছিল না। আরব্ধ কার্য্যে আমার একাগ্রতার ফল ইহাই দাঁড়াইয়াছে যে, আমার নিজের যাহা সম্বল ছিল, সেই শরীরকে স্বাস্থ্যহীন ও জরাজীর্ণ করিয়া এই পুস্তক শেষ করিলাম, জীবনাবশেষের আর কয় দিন হাতে রহিল তাহা বলিতে পারি না। সহৃদয় পাঠকবর্গের নিকট হইতে সমবেদনা পাইব কিনা, জানি না; তবে আমার অনিবার্য্য অসংখ্য ভ্রমত্রুটির জন্য আমি সকলের নিকটেই করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।

এ গ্রন্থের জন্য আমি অসামান্য পরিশ্রম করিয়াছি; কোন কষ্টকে কষ্ট জ্ঞান করি নাই, বিপদে বিচলিত হই নাই, কোন চেষ্টা, যত্ন বা অর্থ ব্যয়ের ত্রুটি করি নাই। কত গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়াছি, দীর্ঘপথ অতি কষ্টে পদব্রজে অতিক্রম করিয়াছি, প্রাণের মমতা বিসর্জ্জন দিয়া পরমোৎসাহে দুর্গম স্থানে বা গহন বনে ভ্রমণ করিয়াছি; আর সন্ধানমত সকল স্থান দেখিয়া সকলের কথা শুনিয়া, তাহা হইতে সকল তথ্যের সমন্বয় করিয়া সত্যের উদ্ঘাটন ও সমস্যার সমাধান জন্য চিন্তা লইয়া দিনের পর দিনপাত করিয়াছি; কত শত শত পত্র দ্বারা অনুরক্তকে বিরক্ত করিয়াছি, বিরক্তকে অনুরাগী করিয়া লইয়াছি,–দেশমাতৃকার প্রতি পদরেণুর সহিত পরিচিত হইতে প্রাণপণ চেষ্টা ও প্রার্থনা করিয়াছি। আশা করি, নিবিষ্টচিত্ত পাঠক প্রতিপত্রে আমার গুরুশ্রমের পরিচয় প্রাপ্ত হইবেন। কার্য্যের অধিকার মাত্র নিজের ধরিয়া লইয়া ফলের আকাঙ্ক্ষা করি নাই। যদিও গ্রাসাচ্ছাদনের অনুদৃত্ত অর্থ ভ্রমণাদির জন্য ব্যয়িত করিয়া অভাবগ্রস্ত হইয়াছি, তবুও অর্থোপায়ের যাবতীয় অন্য চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়া এ পুস্তক রচনায় বিরত হই নাই। অর্থের প্রত্যাশায় এ গ্রন্থ লিখিত হয় নাই।

যশোহর-খুলনার ইতিহাসকে চারি অংশে বিভক্ত করিয়া উহার মধ্যে (১) প্রাকৃতিক এবং (২) ঐতিহাসিক অংশের প্রথম ভাগ অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাঠান আমলের ইতিহাস প্রথম খণ্ডে প্রকাশিত করিয়াছি। ঐতিহাসিক অংশের অপর ভাগ অর্থাৎ বৃহত্তর এবং সমগ্র পুস্তকের সর্ব্বপ্রধান অংশ এই দ্বিতীয় খণ্ডে প্রকাশিত করিতেছি। এক্ষণে খণ্ড-বিবরণী (Statistics) এবং আভিধানিক (Gazetteer) অংশ তৃতীয় বা পরিশিষ্ট খণ্ডের জন্য অবশিষ্ট রহিল। উহাতে জনসংখ্যা (Census Report) সম্বন্ধীয় সারতত্ত্ব, শাসনবিষয়ক তথ্যাবলী, প্রধান প্রধান ব্যক্তির জীবন-কথা এবং অবশিষ্ট কতকগুলি স্থান ও বংশের বিবরণী লিপিবদ্ধ করিবার বাসনা রহিল। সে খণ্ড কবে প্রকাশিত হইবে, তাহা বলিতে পারি না। জীবনে কুলাইবে কিনা এবং সুযোগ জুটিবে কিনা, তাহা শ্রীভগবানই জানেন। বিশেষতঃ দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের সময়ের যে আভাস দিয়াছিলাম, তাহা কাৰ্য্যকালে খাটে নাই, এবার সময় সম্বন্ধে কোন কথা না বলাই সঙ্গত মনে করিতেছি। তবে তৃতীয় খণ্ডে যে কয়েকজন প্রথিতনামা সাহিত্যিক এবং কৃতী পুরুষের জীবনবৃত্ত প্রধান বিষয় হইবে, তাহার অধিকাংশ উপাদানই আমার হস্তগত আছে; আর অবশিষ্ট যাহা সরকারী রিপোর্টের সারাংশ তাহা আমি প্রকাশিত না করিলেও ক্ষতি নাই। বংশবিবরণী সংগ্রহ করা যে কি দুরূহ ব্যাপার তাহা আমি পদে পদে অনুভব করিয়াছি। রাজনৈতিক ইতিহাসের সম্পর্কে যে সব বংশের বিবরণ দেওয়া প্রয়োজনীয়, তাহা বহুকষ্টে সংগ্রহ করিয়া দিয়াছি; প্রধান প্রধান বংশের ও খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের নামোল্লেখ ‘সমাজ ও আভিজাত্য’ শীর্ষক দীর্ঘ পরিচ্ছেদে (২য় অংশ; ১০ম পরিচ্ছেদ) দিয়াছি। উহার আর যতটুকু সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয়, তাহা তৃতীয় খণ্ডে দিবার ইচ্ছা রহিল। বংশবিবরণ পাইবার জন্য আমি বারংবার প্রকাশ্য সংবাদপত্রে সামাজিকবর্গের নিকট আবেদন নিবেদন করিয়াছি, তাহার সারাংশ স্থানীয় পত্রে প্রকাশ করিয়া তন্মধ্যে আমার অনিবার্য্য ভুলভ্রান্তির জন্য বারংবার ক্ষমা চাহিয়াছি, কিন্তু কাৰ্য্যতঃ দেখিয়াছি নিজ নিজ বংশেতিহাসে অধিকাংশ ব্যক্তিই অজ্ঞ বা উদাসীন; দুই চারিজন ভুল ধরিতেই ভালবাসেন, ভুল সংশোধন করিতে কিছুমাত্র উদ্যোগী নন; কেহ কেহ বা আত্মগৌরব প্রতিষ্ঠার প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা না করিয়া পরের অখ্যাতি কীর্তনে অধিক সমুৎসুক; যাঁহাদের নিকট পৈতৃক ঘটককারিকাদি পুঁথিপত্র আছে, তাঁহারা কেহ কেহ উহা আমার হস্তে দিতে চান নাই, পাছে আমাদ্বারা তাঁহাদের ব্যবসায় নষ্ট হয়; কিন্তু আমার ভুল যে ভুলই থাকিয়া বহাল রহিবে লুক্কায়িত পুঁথিতে সে ভুল সারিবার সুযোগ হইবে না, উহা তাঁহারা কখনও মনে করেন নাই। বোধ হয় যে রীতিতে বংশেতিহাস লিখিলে সামাজিকের রুচিকর হয়, আমি তাহারই অনুসরণ করিয়াছি। আশা করি, পরবর্ত্তী খণ্ডের জন্য এ বিষয়ে সাধারণের উৎসাহলাভে বঞ্চিত হইব না।

বৰ্ত্তমান খণ্ডে প্রতাপাদিত্য ও সীতারামের ইতিহাসই প্রধান বিষয়। যাঁহারা দূরে বসিয়া না দেখিয়া ইতিহাস বা উপন্যাস রচনা করেন, এরূপ শ্রমবিমুখ লেখকদিগের হস্তে উভয় বীরপুরুষের কাহিনী নানাভাবে বিকৃত এবং তাঁহাদের চরিত্র অযথা কলঙ্কিত হইয়া পড়িয়াছে এবং সেই চিত্র এমনভাবে সাধারণের চিত্তে দৃঢ়াঙ্কিত হইয়াছে যে উহা নিরসন করিতে না পারিলে অন্য মত মাথা তুলিতে পারিবে না। এজন্য আমি যথেষ্ট প্রমাণ প্রয়োগ করিয়াছি, সে প্রমাণ সংগ্রহে কোন প্রকার চেষ্টা বাদ পড়িয়াছে বলিয়া মনে হয় না। সেকালের ‘বঙ্গাধিপ পরাজয়ে’ প্রতাপের গৌরবকাহিনী প্রচারের জন্য যেমন সময়োচিত গবেষণার পরিচয় ছিল, তেমনই কতকগুলি ঐতিহাসিক অসামঞ্জস্যের অবতারণা এবং অমূলক কলঙ্কারোপ দ্বারা বীরচরিত্র কলঙ্কিত করা হইয়াছে, আধুনিক ‘রায়নন্দিনী’ নামক উপন্যাসে তাঁহার বা তদ্বংশীয়দিগের চরিত্র অখ্যাত করিবার জন্য সত্যই যেন কেমন অসুয়া এবং কুরুচির পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। সে সকল ভ্রান্তি বা সে জাতীয় চেষ্টার অসারতা, আমি যে সত্যোৎঘাটন করিয়াছি, তদ্বারা নিরাকৃত হইবে, আশা করি। ঔপন্যাসিক হইলেই যে নিরঙ্কুশ হইয়া সত্যের অপলাপ করা যায়, এমন কোন কথা নাই।

যশোহর-খুলনার ইতিহাস যতই নগণ্য হউক, তাহাকে প্রকৃত ঐতিহাসিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করাই আমার প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্য আমি সৰ্ব্বত্রই বঙ্গীয় এবং ভারতীয় ইতিহাসের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখিয়া সময় ও তথ্যের সমন্বয় করিয়া অগ্রসর হইয়াছি। জেলার ইতিহাস লিখিতে গিয়া কোথায়ও দেশের ইতিহাসকে দৃষ্টিছাড়া করি নাই, পুস্তকের আকারবৃদ্ধির ইহাই অন্যতম কারণ। বঙ্গের দুইটি প্রধান জেলা আমার গণ্ডীভুক্ত, বঙ্গের বীরপুত্রগণের মধ্যে সৰ্ব্বপ্ৰধান দুইজনেরই জীবনকথা আমার গ্রন্থের বিষয়ীভূত। তৎসম্পর্কে যশোহর-খুলনার ইতিবৃত্ত বঙ্গের, এমন কি, ভারতের ইতিহাসের অঙ্গাধীন। সেই সম্বন্ধ-সূত্র স্থাপনের জন্য প্রমাণ প্রয়োগ করিতে গিয়া বিষয়-বিস্তারের হাতে নিস্তার পাই নাই। ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফলে যে সত্য অবিসংবাদিতরূপে স্বতঃই প্রতিভাত হইয়াছে, আমি ঐকান্তিকতার সহিত তাহারই অনুবর্ত্তন করিয়াছি। ‘নহ্যমূলা জনশ্রুতিঃ’ এ কথা মানিয়া লইয়া চাক্ষুষ পরীক্ষার সঙ্গে প্রচলিত প্রবাদ বা লিখিত প্রমাণের একত্র সামঞ্জস্য করিয়া বহু গবেষণার পর নিজমত স্থিতীকৃত করিয়া লইয়াছি। সে মতে যে ভুল থাকিতে পারে না, তাহা আমি বলিতেছি না। যাহা ভুল আছে, তজ্জন্য আমিই অপরাধী। সুধীবর্গ বলবত্তর প্রমাণে উহা প্রদর্শন করিয়া দিলে, অবনত মস্তকে গ্রহণ করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিব। তবে এই মাত্র বলিতে পারি, না দেখিয়া, না বুঝিয়া বা ভাবিয়া, সত্য পরীক্ষা না করিয়া কোন কথা লিখি নাই। পারিপার্শ্বিক সকল অবস্থার একত্র সমাহার করিবার সুবিধা পাঠকবর্গের হইবে না, তাহা জান; এজন্য নিজের অভিজ্ঞতার ফল ও বিবেকবুদ্ধির হির ধারণা তাঁহাদিগকে উপহার দিয়াছি। প্রতাপাদিত্য অংশ কিছু দীর্ঘ হইয়াছে, তাহা আমি স্বীকার করিতে বাধ্য। কিন্তু তাঁহার কাহিনী বঙ্গেতিহাসের একটি প্রধান অংশ এবং ভারতীয় ইতিহাসের সহিতও উহা দৃঢ় সম্পর্কিত। সুতরাং ভিত্তি পত্তনের জন্য একটু বিস্তৃত আলোচনা অনুযোগ বা অসহিষ্ণুতার বিষয় হওয়া উচিত নহে। সৌধপ্রাচীরের ভিত্তি মৃত্তিকা-নিম্নে একটু বিস্তৃতই হইয়া থাকে।

আমার যশোহর-খুল্লার ইতিহাস প্রধানতঃ যশোহর-খুলনার লোকের জন্য লিখিত। তবে ইহার মধ্যে যে সব চরিত্র বা ঘটনা আছে, তাহা বঙ্গের সব জেলার অধিবাসীর নিকট প্রিয় বা পঠনীয় হইবার যোগ্য। যাঁহারা এই জাতীয় প্রাদেশিক ইতিহাস হইতে সার সংগ্রহ করিয়া বঙ্গের ইতিহাস গঠন করিবার প্রয়াসী, তাঁহারা এই সারটুকুই চান, অবশিষ্ট অংশ অনাবশ্যক মনে করেন। কিন্তু হয়ত স্থানীয় অধিবাসীর নিকট সেই অবশিষ্ট অংশই অধিকতর প্রয়োজনীয় ও লোভনীয়; উহা বাদ দিলে বিষয়টি নীরস হইয়া যায়, স্থানীয় পুরাতত্ত্বের দিকে অধিবাসীর চক্ষু খুলিয়া দেয় না, পুস্তকের সঙ্গে তাঁহাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা সংস্থাপন করায় না। তাহা হইলে, আমারও প্রকৃত উদ্দেশ্য বিনষ্ট হইয়া যায়। আমার ইতিহাস কিছু বড় হইয়াছে, কারণ আমার দেশকে আমি বড় করিতে চাহি, মায়ের সকল অঙ্গের রূপ ব্যাখ্যা না করিয়া নিরস্ত হইতে পারি নাই। আমার মায়ের যাহা ঐতিহাসিক সম্পদ আছে, তাহাতে তাঁহার বড় হইয়া দাঁড়াইবার দাবী অস্বীকৃত হইতে পারে না। যদি সে দাবি প্রতিষ্ঠিত করিতে আমি কিছুমাত্র সমর্থ হইয়া থাকি, তাহা হইলে আমার সকল শ্রম সফল মনে করিব। আশা করি, আমার স্বদেশীয় পাঠকমণ্ডলী পুস্তকের কলেবর দেখিয়া ভয় না পাইয়া গৰ্ব্বানুভব করিবেন, আর হিসাব করিয়া দেখিবেন, ইহার আকার বা সাজসরঞ্জামের অনুপাতে ইহার মূল্য যথাসাধ্য কমই ধার্য্য করা হইয়াছে।

এ পুস্তকে যাহা কিছু লিখিত হইয়াছে, তাহা ঐতিহাসিক মর্য্যাদা রক্ষার জন্য। কোন প্রকার স্বার্থ, স্বজাতিপ্রীতি, ভীতি বা অসূয়া আমাকে কর্তব্যভ্রষ্ট করিতে পারে নাই, ইহা সাহস করিয়া বলিতে পারি। আমাকে বহু প্রসঙ্গে বহু ব্যক্তি, বহু জাতি ও বর্ণের সমালোচনা করিতে হইয়াছে, তাহা বিবেকবুদ্ধিতে অকপটভাবেই করিয়াছি; প্রশংসা বা অপ্রশংসা কখনও স্বার্থ বা উদ্দেশ্যমূলক হয় নাই; কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের অযৌক্তিক নিন্দা দ্বারা গ্রন্থকে কলঙ্কিত করি নাই। গুণীর দোষাংশ যেমন বাদ পড়ে নাই, নিন্দিতের গুণের চিত্রও তেমনই উজ্জ্বল করিয়া দেখাইয়াছি। যে বিষয়ের আলোচনায় আমি অপটু বা অসমর্থ, অথবা যেখানে আমার সংগৃহীত উপাদান অপৰ্য্যাপ্ত, সেখানে আমার অভাব ও অজ্ঞতা সরলভাবে স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হই নাই। প্রতিভা বা সদ্‌গুণ কোন জাতি বা সম্প্রদায়ের একায়ত্ত নহে, তেমনই অখ্যাত চরিত্রও সকল সমাজে থাকিতে পারে; ব্যক্তিবিশেষের কুচরিত্রের নিন্দা করিলে কোন জাতির উপর কটাক্ষপাত করা হয় না। পীর পয়গম্বর বা দানবীরকে আমি সর্ব্বত্রই মুনি-ঋষির মত ভক্তিপুষ্পে পূজা করিয়াছি। প্ৰথম খণ্ড প্রকাশের পর, দুই একজন মুসলমান ভ্রাতা মনে করিয়াছিলেন, আমি বিদ্বেষবশে ‘যবন’ বলিয়া তাঁহাদের স্বজাতীয় কোন কোন ব্যক্তিকে অখ্যাত করিয়াছি সে ধারণা ভুল মাত্র। উঁহাদের দৃষ্ট পদার্থ নীল, কি চশমা নীল, তাহা পরীক্ষার বিষয়। ‘যবন’ শব্দ মুসলমান জাতির উদ্ভবের বহু পূর্ব্বের কথা, উহা দ্বারা যে প্রাচীন আইওনীয় (Ionian) গ্রীকদিগকে বুঝাইত, সে ইতিহাস আমি জানি। লক্ষ্য করিলে দেখিতে পাইবেন, আমি কাহাকেও যবন বলি নাই, হয় অন্যের কথা উদ্ধৃত বা অন্যের মনোভাব ব্যক্ত করিয়াছি মাত্র। মুসলমানেরা যেভাবে অন্যকে কাফের বলেন, সেই ভাবে প্রাচীন হিন্দুরা বহু বৈদেশিক জাতিপ্রসঙ্গে যবন বা ম্লেচ্ছ শব্দ ব্যবহার করিতেন; পাঠান যুগে,

মুসলমানদিগের স্ববলে ধর্মপ্রচার বা সংঘর্ষকালে সে ভাব জাগিয়াছিল, পরবর্ত্তী যুগে তাহা ছিল না। দ্বিতীয় খণ্ডে যবন শব্দ কোথায়ও প্রযুক্ত হইয়াছে বলিয়াও মনে পড়ে না। মুসলমান কেন, কোন জাতির প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নাই; যদি সে ভাবে কোথায়ও কিছু লক্ষ্যের বিষয় হয়, তবে জানিবেন উহা আমার অজ্ঞাতসারে ভ্রম মাত্র, সেজন্য আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমার উপাদান সংগ্রহের তারতম্য থাকিতে পারে, কিন্তু আমি সাধ করিয়া বা সাধ্যপক্ষে যশোহর অপেক্ষা খুলনার কথা, বৈদ্য অপেক্ষা কায়স্থের কথা অযথা বাড়াইয়া বলি নাই, অনুন্নত যে কোন জাতির প্রতি আমার বিরক্তি নাই, অধিক অনুরক্তিই আছে। এ কথা সত্য যে, এক জাতির পক্ষে অন্যের আভিজাত্য ব্যাখ্যা করা দুঃসাধ্য কার্য্য; কিন্তু আমার সে জাতীয় অজ্ঞতা দূরীকরণ করিতে যে আমি অত্যধিক চেষ্টা করিয়াছি, তাহার পরিচয় এ গ্রন্থে পাইবেন। তবুও আমার ভ্রম প্রমাদ আছে, স্বীকার করি; সে অজ্ঞানকৃত ভ্ৰম ক্ষমার্হ। কেহ কোন ভুল প্রদর্শন করিলে, তাহা সাদরে গ্রহণ করিব এবং পরবর্ত্তী সংস্করণে বা অন্য ভাবে উহার সংশোধন করিব। যেখানে সুযোগ পাইয়াছি, প্রথম খণ্ডের অনেক মতভ্রান্তি এই খণ্ডে সারিয়াছি; ঐতিহাসিক গবেষণাই সে দিকে আমাকে সাহায্য করিয়াছে। মত থাকিলেই পরিবর্ত্তন হয়, মত পরিবর্তনের জন্য আমি কিছুমাত্র ক্ষুব্ধ হই নাই। একমাত্র প্রার্থনা, কেহ দয়া করিয়া ভ্রম দেখাইয়া দিলে তাহা আমি নতশির হইয়া মানিয়া লইব; আমার ভিতর জাতিবিদ্বেষ বা পক্ষপাতিতার অনর্থক কল্পনা করিয়া অযথা গালিবর্ষণ করিলে, তাহাতে শুধু শ্রমক্লান্ত অকিঞ্চন সেবককে মনোকষ্টই দেওয়া হইবে।

যেখানেই কোন গ্রন্থকারের মতামত গ্রহণ বা বিচার করিয়াছি, পাদ-টীকায় স্পষ্টতঃ উহার উল্লেখ আছে। আমি প্রত্যেকের নিকট চিরঋণী। এ গ্রন্থ সঙ্কলনে আমি যে কাহার নিকট ঋণী নহি, তাহা বলিতে পারি না। কেহ বিবরণী লিখিয়া পাঠাইয়া, কেহ তথ্যানুসন্ধানে পথ দেখাইয়া, কেহ আমাদিগকে সবান্ধবে রাজোপচারে আতিথ্যসৎকারে আপ্যায়িত করিয়া, কেহ বা আশীৰ্ব্বাদে ও উৎসাহবাণী দ্বারা মহাপ্রাণতা জানাইয়া, আমাকে সর্ব্বদা প্রবুদ্ধ ও কৃতার্থ করিয়াছেন। ইহা ভিন্ন কত স্থানে আমার কত প্রিয়তম ছাত্র আমাকে কত ভাবে সাহায্য করিয়াছেন, তাহা আর কত বলিব? সকল ব্যক্তির নামোল্লেখ এখানে অসম্ভব। আমি সৰ্ব্বান্তঃকরণে তাঁহাদের সকলের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। আর যাঁহাদের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁহাদের কতকের কথা প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় লিখিয়াছি, এখানে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। এতদ্ভিন্ন এ খণ্ডের সঙ্গে যাঁহাদের নাম বিশিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট এবং যাঁহাদের কথা বাকী আছে বা স্মরণ করিতে পারি, তাঁহাদের কথা বলিয়া এখানে বক্তব্যের উপসংহার করিব। সর্ব্বাগ্রে আমার ঐতিহাসিক গুরুদেব, বিশ্ব-বিশ্রুত প্রত্নতাত্ত্বিক, অধ্যাপক শ্রীযুক্ত যদুনাথ সরকার মহোদয়ের চরণে প্রণাম করিতেছি; তিনি আমাকে নানাভাবে উপদেশ ও সাহায্যদান করিয়াছেন; বিশেষতঃ ‘বহারিস্তান’ প্রভৃতি দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের সন্ধান দিয়া, লুপ্ততথ্যের সমর্থন জন্য আমার সহিত আলোচনা করিয়া, আমাকে চিরঋণী করিয়া রাখিয়াছেন; ভাষায় সে ঋণের পরিশোধও হয় না, করিতেও চাহি না। তিনিই উদ্যোগ করিয়া ‘বহারিস্তানে’র একটি প্রামাণিক পৃষ্ঠার ব্লক প্রস্তুত করাইয়া দেন। প্রতাপাদিত্য প্রসঙ্গে অগ্রজকল্প রাজা যতীন্দ্রমোহন রায়, যশোরেশ্বরী দেবীর সেবায়ৎ পরমোৎসাহী শ্রীযুক্ত শ্রীশচন্দ্র অধিকারী, বন্ধুবর রাজা গিরীন্দ্রনাথ রায় ও শ্রীযুক্ত হিরণ্যকুমার সেনগুপ্ত এবং সীতারাম-প্রসঙ্গে স্বর্গগত যদুনাথ ভট্টাচার্য্য এবং বিনোদপুর স্কুলের খ্যাতনামা হেডমাষ্টার শ্রীযুক্ত হেমন্তকুমার মজুমদার, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট বাবু সত্যেন্দ্রনাথ দাস, পাবনার উকীল রায় সাহেব তারকনাথ মৈত্রেয় আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন। ভূষণা ভ্রমণকালে প্রখ্যাতনামা শ্রীযুক্ত ভুলুয়া বাবা আমার পথপ্রদর্শক হইয়া ও নানাস্থান হইতে গোসাঁই গোরাচাঁদের ‘সংকীর্ত্তন বন্দনা’র প্রতিলিপি সংগ্রহ করিয়া দিয়া এবং বড়গাতি নিবাসী পূজ্যপাদ ডাক্তার মোক্ষদাচরণ ভট্টাচার্য্য মহাশয় যশোহর কাহিনী ও নিরক্ষর কবি সম্বন্ধীয় কিছু কিছু তথ্যের সাহায্য করিয়া আমাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ রাখিয়াছেন। ভারতের পূর্ব্ব বিভাগীয় আর্কিওলজিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট সুপণ্ডিত ও সহৃদয় শ্রীযুক্ত কাশীনাথ দীক্ষিত এম, এ, মহোদয় আমার সঙ্গে নানা স্থানে ঘুরিয়া, প্রত্নতত্ত্বের আলোচনা দ্বারা কতকগুলি জটিল তত্ত্বে আলোকপাত করিয়াছেন এবং আমাকে কয়েকটি রিপোর্ট, ফটো ও মুদ্রার ছাঁচ তুলিয়া দিয়া সাহায্য করিয়াছেন, তজ্জন্য আমি তাঁহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ রহিলাম। আমার একান্ত সৌভাগ্যের ফলে বৈদেশিক মনীষীগণও আমার যথেষ্ট উৎসাহবর্দ্ধন করিয়াছেন; ইংলণ্ডের ঐতিহাসিককুলগৌরব, ‘আকবর নামা’ প্রভৃতির খ্যাতনামা অনুবাদক নবতিবৰ্ষদেশীয় মহামতি হেনরী বিভারিজ আমাকে যে কি স্নেহের চক্ষে দেখেন, তাহা বলিতে পারি না; এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ড তাঁহার হস্তগত হইবামাত্র তিনি উহা তন্ন তন্ন করিয়া আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া, বারংবার কত সুদীর্ঘ মন্তব্যলিপি দ্বারা গত কয়েক বৎসর ধরিয়া আমাকে নানা ভাবে উপদিষ্ট, উদ্বোধিত ও অনুগৃহীত করিয়া রাখিয়াছেন, তাঁহার ঋণ একেবারেই অপরিশোধ্য। তাঁহার জীবন-সন্ধ্যায় এই খণ্ড তাঁহার হস্তাপিত করিবার জন্য আমি একান্ত ব্যগ্ৰ রহিয়াছি। অধুনা পরলোকগত আর দুইজন মহাপণ্ডিতের কথাও আমি বলিতে বাধ্য, জগদ্বরেণ্য ঐতিহাসিক ডক্টর ভিনসেন্ট স্মিথ এবং অধ্যাপক জে, ডি, এণ্ডারসন আমাকে সময় সময় সারগর্ভ মন্তব্য ও অনুগ্রহ লিপি দ্বারা আরব্ধ কার্য্যে উৎসাহিত করিয়াছেন। খুলনার ভূতপূর্ব্ব কালেক্টর সদাশয় শ্রীযুক্ত জে, সি, ফ্রেন্স এবং পুলিস সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট শ্রীযুক্ত পি, লিও, ফনার উভয়ই প্রত্নতত্ত্বরসিক ছিলেন; উভয়ই আমার পুস্তক ও আমার সঙ্গে পরিচয় স্থাপন করিয়া খুলনার সৰ্ব্বত্র ভ্রমণ করেন এবং সময় সময় উহার ফল আমাকে জানাইয়াছেন; বিশেষতঃ মহাপ্রাণ ফনার প্রতাপাদিত্য বিষয়ে ‘ক্যালকাটা-রিভিউ’ প্রভৃতি পত্রে যে সকল প্রবন্ধ লিখিয়াছেন তাহাতে প্রকৃষ্ট ভাবে আমার মতের সমালোচনা ও কার্য্যের প্রশংসা করিয়া আমাকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন। আমি উভয়ের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। বহু ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লেখক, মদীয় ছাত্র ও একান্ত স্নেহের পাত্র, সেনহাটি নিবাসী শ্রীমান্ অশ্বিনীকুমার সেন এবং দৌলতপুর-কলেজ লাইব্রেরীতে আমার সহকারী শ্রীমান দাশুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, উভয়ে যখন তখন নানাভাবে আমার কার্য্যে সাহায্য করিয়াছেন, আমি কৃতজ্ঞ হৃদয়ে উভয়ের কল্যাণ কামনা করিব। আজ এই পুস্তক সমাপন কালে দুইজন যুবকের আকস্মিক অকালমৃত্যুর জন্য মর্মবেদনায় আমার নয়নদ্বয় অশ্রুসিক্ত হইতেছে, উভয়েই আমার কর্ম্মের সহায়ক এবং ভ্রমণের সহযাত্রী ছিলেন; একজনের কথা প্রথম খণ্ডের পাঠকবৃন্দ জানেন, তিনি স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্রের ভ্রাতুষ্পুত্র যামিনীকান্ত রায় চৌধুরী, অন্যজনও সেই একই বংশীয়, নওয়াপাড়া নিবাসী আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কালীকৃষ্ণ রায় চৌধুরী; আমি শ্রীভগবানের চরণে উভয়ের পরলোকগত আত্মার শান্তি ও সদগতি কামনা করিতেছি।

উপসংহারে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার মর্ম্মে আমি বলিতে চাই, আমি কুলি মজুরের মত দুর্গম সুন্দরবনপ্রদেশের লুপ্ত ইতিহাসের পথ খুলিয়া দিবার চেষ্টা করিলাম। আমার সে মজুরদারির ফল আজ প্রকাশিত হইল; কোন প্রত্নতত্ত্ববীর কি সসৈন্যে এ প্রদেশে পাদচারণা করিবেন না?

শ্রীসতীশচন্দ্র মিত্র
বেলফুলিয়া, খুলনা
লক্ষ্মীপূর্ণিমা
১৮ই আশ্বিন, ১৩২৯ সাল

.

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

বাঙলার ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাসে’র দ্বিতীয় খণ্ড অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ। বৰ্ত্তমান খণ্ডে আলোচিত বিষয়ের ব্যাপ্তিকাল মোগল ও ইংরাজ আমল। এই পর্ব্বদ্বয়ে যশোহর- খুলনার ইতিহাস বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে বঙ্গদেশ এমন কি ভারতবর্ষের ইতিহাসের সহিত ঘনিষ্ঠরূপে সংশ্লিষ্ট। অধিকন্তু, যে ইতিহাস-দর্শনে প্রবুদ্ধ হইয়া ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র এই সীমিত অঞ্চলের ইতিবৃত্তকে প্রকটিত করিয়াছেন, তাহাতে অনাগত কালের নবতর ইতিহাস চেতনাসম্পন্ন ঐতিহাসিকদের নিকট অন্যতম মূল উপাদান হিসাবে এই গ্রন্থ গৃহীত হইবে বলিয়া আশা করা অসমীচীন নহে।

‘রাজার ইতিহাস শুধু দেশ-শাসনের ইতিহাস-দেশের বাহ্যাবরণের ইতিহাস। প্রজাই দেশের প্রাণ; সে প্রাণের স্পন্দন ও অবস্থার ইতিবৃত্ত দেশের প্রকৃত ইতিহাস।’ (৩৩ পৃ)— ইতিহাসের এই প্রকৃত ব্যাখ্যা অঙ্গীকার করিয়া যেমন সতীশচন্দ্র এই বিরাট গ্রন্থের সূচনা করেন, তেমনি যশোহর- খুলনার প্রতি ধূলিকণার সঙ্গে মিশিয়া যেন মাটির উপর কান পাতিয়া সে স্পন্দনের রূপ-রেখা এই রচনার প্রতি পরিচ্ছেদে বিধৃত করিতে প্রয়াসী হইয়াছেন। অতএব, যুগে যুগে প্রজার ‘প্রাণের ‘স্পন্দন’ আগামী দিনে সে ঐতিহাসিকের প্রধান লক্ষ্যভুক্ত হইবে, তাঁহার নিকট এই প্রত্যন্ত সমতট অঞ্চলে দুর্গম সুন্দরবনপ্রদেশের মানবেতিহাসের বহু উপাদান এই অমূল্য গ্রন্থে সহজলভ্য হইয়া থাকিল।

প্রজার প্রাণের স্পন্দনের অভিব্যক্তি ছাড়াও বর্তমান গ্রন্থ কতকগুলি ঐতিহাসিক ঘটনা বা ঘটনা-পরম্পরার উপর অবিসম্বাদীরূপে আলোকপাত করিয়াছে। প্রথমতঃ, বঙ্গদেশের রাজবৃত্তে মহারাজ প্রতাপাদিত্য ও রাজা সীতারাম রায় অগ্রগণ্য নায়কদ্বয়, ইঁহাদের সম্পর্কে কিম্বদন্তীর গুরুভার হইতে অগণিত তথ্য ও প্রমাণের সাহায্যে সত্যোদ্ধার করিয়া এই গ্রন্থে তাঁহাদের চরিত্রের সবলতা ও দুর্ব্বলতা সহ প্রকৃত ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছে। এই তথ্য ও প্রমাণের ব্যাপকতা ও অকাট্যতায় মুগ্ধ হইয়াই স্যর যদুনাথ সরকার ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় (মার্চ, ১৯২৩) এই রচনার দীর্ঘ সমালোচনায় বলেন, ‘যশোহরের ইতিহাস চিরকালের মত লিখিত হইল।’

দ্বিতীয়তঃ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে মগ-ফিরিঙ্গির আনাগোনা সমগ্র সমতট অঞ্চলে এক মহা উৎপাতরূপে দেখা দেয়। এই উৎপাত কেবলমাত্র লুঠ, অত্যাচার ও যুদ্ধ-বিগ্রহে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইহাদের প্রভাব সমতটবাসী সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে কতদূর বিসর্পিত হইয়াছিল, তাহা এই গ্রন্থে সবিস্তারে তুলিয়া ধরা হইয়াছে। ইহাদের প্রভাবের মন্দের পাল্লা ভারি হইলেও, ভাল দিকগুলিও গ্রন্থকারের লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় নাই।

তৃতীয়তঃ, প্রতাপোত্তর কালে যশোহর-খুলনায় ‘প্রতাপময়তা’ দৃষ্টির মধ্যে না আনিলে এদেশের-মানুষের বা সামাজিক ইতিহাসের অনেক সূত্রই ছিন্ন থাকিয়া যায়। একথা মনে রাখা আবশ্যক যে, বালা-সমাজের আশগুহ বংশীয় সপ্তগ্রামে অবস্থিত সামান্য দরিদ্র মুহুরী রামচন্দ্র গুহ যশোর-রাজবংশের আদিপুরুষ। তাঁহারই পৌত্র বিক্রমাদিত্য যশোর-রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা তাঁহার পুত্র প্রতাপাদিত্য বিস্তীর্ণ এলাকা আয়ত্তে আনিয়া মধুমতী হইতে ভাগীরথী পৰ্য্যন্ত বিশাল রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং মগ-ফিরিঙ্গি দস্যুদের পর্যুদস্ত করিয়া মোগল বাদশাহের সহিত সম্মুখরণে প্রবৃত্ত হন। পাঠান-মোগল সংঘর্ষ ও তাহার আবর্তে গৌড়ের যে অপরিমিত ধন-সম্পদ বিক্রমাদিত্যের হস্তগত হয়, তাহারই বলে যে এমন শক্তিশালী যশোর-রাজ্যের সৃষ্টি সম্ভব হইয়াছিল তাহা অনস্বীকাৰ্য্য। কিন্তু কেবলমাত্র অর্থবলে শক্তিশালী রাজ্য গঠন সম্ভব নহে। যশোর- রাজ্যের স্থিতিকাল মাত্র পঁয়ত্রিশ বৎসর। সেইজন্য অল্পদিনের মধ্যে এবং অতিদ্রুত বিশাল সৈন্য- বাহিনী ও নৌ-বাহিনী, শক্তিশালী শাসন বিভাগ, ব্যাপক যশোহর-সমাজ, নানাবিধ কৰ্ম্মযজ্ঞ ও বৃত্তি সংগঠনের উদ্যোগ ও আয়োজন করিতে হইয়াছিল। এই বহুবিস্তৃত কর্মোদ্যমের আওতায় পড়িয়া দক্ষিণবঙ্গের হাজার হাজার মানুষের জীবনে বৃত্তি, পেশা ও মনোভাবের এক দ্রুত পরিবর্তন দেখা দেয়। ইহার পরিমাপ করাও গ্রন্থকারের অন্যতম প্রচেষ্টা হইয়াছে।

চতুর্থতঃ, ইতিহাসে দেখা যায়, যে-পর্ব্বে জমি ও লাঙল সমাজের জীবিকা আহরণের প্রধান উপায় হিসাবে ধীরে ধীরে দেখা দিল, অর্থাৎ উন্নত প্রণালীর কৃষি ও কুটিরশিল্প প্রধান উপজীবিকা হইয়া দাঁড়াইল, সেই পর্ব্বে রাজা ও প্রজা সম্পর্ক অর্থাৎ রাজতন্ত্রের আবির্ভাব। রাজতন্ত্র অবশ্য ভারতের পূর্বাঞ্চলে সৰ্ব্বত্র একই সঙ্গে অথবা একই রূপে দেখা দেয় নাই। অদ্যাবধি ইতিহাসে যতটুকু সাক্ষ্য-প্রমাণ বা ইঙ্গিত মিলিয়াছে, তাহাতে মৌর্য্য আমলের কিছু পূর্ব্ব হইতে ভারতের পূর্ব্বাঞ্চলে এই প্রক্রিয়ার শুরু বলিয়া অনুমিত হয়। একদিকে কৌমতন্ত্র ও কৌম চেতনা বা সত্তা, অন্যদিকে রাজতন্ত্র ও তাহার অনুগামী সামন্ততন্ত্র— এই দুইয়ের সংঘর্ষ এবং আদান-প্রদান প্রত্যন্ত বঙ্গদেশে দীর্ঘকাল ব্যাপী চলিতে থাকে। এমন অনুমান অসিদ্ধ হইবে না যে, এই দুইয়ের সংঘর্ষে ও মিলনে, গ্রহণ ও বর্জ্জনে বঙ্গদেশে অগুণতি ছোট ছোট রাজা এবং গ্রাম পঞ্চায়তের সহবাস ঘটে।

রাজতন্ত্রের ভিত্তি উন্নততর অর্থনীতি বা উন্নততর কৃষি ও শিল্পপদ্ধতি হইলেও জনপদের কৌম-সত্তাকে তাহা সহজে বাস করিতে পারে নাই। ইহাদের সংঘর্ষ-মিলন কাল এমন ভাবে দীর্ঘায়ত হইবার মূলতঃ দ্বিবিধ কারণ নির্দ্দিষ্ট করা যায়। (১) পূর্বাঞ্চলের জনপদগুলিতে তদানীন্তন লোকসংখ্যার তুলনায় ছিল অপরিমিত প্রান্তর, অনাবাদী জমি ও বন। (অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমেও নামমাত্র পেশে সীতারাম যে সনদ পান তাহার নাম ছিল, ‘আবাদী সনদ’) জমির প্রাচুর্য্যের ব্যাপারে প্রধান সহায়ক হইয়াছিল বঙ্গদেশের নদনদীর অসাধারণ দ্রুত ভূমি-গঠন ক্ষমতা। রাজতন্ত্র বিশেষ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিতে অগ্রসর হইলেই কৌমগোষ্টীর সহজতর পথ ও পন্থা ছিল দূরদূরান্তে অপসরণ করিয়া নূতন আবাদ ও জনপদ সৃষ্টি করা। (২) অগুণতি নদী- নালার দেশে সহসা বন্যা, প্লাবন ও অনাবৃষ্টির ফলে, বরাবরই কৃষিকাৰ্য্য ছিল মূলতঃ যৌথ প্রচেষ্টার উপর একান্ত নির্ভরশীল। খাল কাটাও যেমন এককভাবে সম্ভব নহে, নদীর বাঁধ রচনা বা রক্ষা করাও একজনের পক্ষে সম্ভব হইত না। অসংখ্য বন্যজন্তুর বিরুদ্ধে সংগ্রামও একই পর্যায়ভুক্ত। এমন পরিপ্রেক্ষিতে জনপদের কৌম-সত্তাকে নির্মূল করা যে দুরূহ হইবে, তাহাতে বিচিত্র কি! এমন কি, আধুনিক যুগেও বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে খুলনা জেলার দক্ষিণে দুরধিগম্য আবাদ অঞ্চলে এই কৌম-চেতনা কি প্রবল ভাবে বিদ্যমান ছিল, তাহা অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেরই জানা আছে। যৌথ-চাষ প্রথা না থাকিলেও সুন্দরবনের নৈকট্য এবং নদীর বাঁধের যৌথ- দায়িত্ব এই সত্তাকে এই অঞ্চলে এমন দীর্ঘজীবী করিয়াছে।

প্রধানতঃ এই কারণগুলির জন্যই বঙ্গদেশে ছোট ছোট এলাকায় কৌম-চেতনা সম্পন্ন গ্রাম- পঞ্চায়েতের স্বীকৃতির উপর ভিত্তি করিয়া অসংখ্য ছোট ছোট রাজার আবির্ভাব ঘটে। ‘যশোহর- খুলনার ইতিহাসে’ প্রতি ধাপে বা আমলে ইহাদের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করা হইয়াছে এবং হিসাব দিবার চেষ্টা হইয়াছে। ‘দুই চারিখানি গ্রাম লইয়া এইরূপ এক এক রাজচক্রবর্ত্তী জাগিয়া উঠিত। রাজবাড়ী ও রাজপাটে দেশ ভরিয়া গিয়াছিল’ (১ম খণ্ড, ১৫২ পৃ)। মাঝে মাঝে কেন্দ্রীয় রাজতন্ত্রের আধিপত্য যে হয় নাই, তাহা নহে। সাধারণ লোকের কিন্তু আনুগত্য ছিল এই ছোট ছোট রাজার প্রতি। অধ্যাপক ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায়— ‘দেশের বা প্রান্তের রাজা বা সম্রাট তাহাদের কাছে দূরাগত ধ্বনি মাত্র’ (বাঙালীর ইতিহাস, ৮৩২ পৃ)। এই সকল ক্ষুদ্র রাজাদের নিজস্ব দুর্গ, শাসন ও সৈন্য থাকিত। গ্রাম-পঞ্চায়েতগুলির উপর নির্ভর করিয়া ইহাদের শাসন চলিত। ইহার সহিত ইয়োরোপীয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রভেদ লক্ষণীয় এবং অনুসন্ধিৎসার বিষয়। মোগল আমলের প্রাক্কালে যে বারভুঞার আবির্ভাব, তাহারও সূত্রপাত দেশের এই পটভূমিতে। নামে বারভুঞা কিন্তু ‘এইরূপ কত ভুঞা যে দেশের কোণে সঙ্গোপনে ছিলেন, সকলে তাহার খোঁজ রাখিত না’ (২য় খণ্ড, ৩৭ পৃ)। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা সীতারাম রায়ের আবির্ভাবও একই কারণপ্রসূত। মহাশক্তিধর মোগল বাদশাহরাও ‘ফৌজদারী’ শাসনের মাধ্যমে এই অবস্থার পরিবর্তন সাধনে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষদিকে দূর দূর প্রান্তে তাহাও শ্লথ হইয়া আসে। কৌম-চেতনায় আবদ্ধ ছোট ছোট রাজা ও গ্রাম-পঞ্চায়েত ব্যবস্থাই সামান্য ইতর-বিশেষ পরিবর্তনে বঙ্গদেশে বাঁচিয়া ছিল একটানা প্রায় দুই হাজার বৎসর। অবশেষে ইংরাজ আসিয়া উন্নততর অর্থনীতি বা উন্নততর পণ্যোৎপাদন ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থায় ভাঙন ধরাইল। ইংরাজ আসিয়া কেমন করিয়া ছোট ছোট রাজাদের পুতুল-রাজা বানাইল এবং নব্য জমিদারকুলের আবির্ভাব ঘটাইল, তাহার ইতিবৃত্ত অদ্যাবধি পূর্ণ উদ্ধার হয় নাই। ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ এই ইতিবৃত্তের যে অন্যতম এবং প্রধান উপাদানগ্রন্থ, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা চলে। ইহা স্মরণীয় যে, যশোহরই ইংরাজ-শাসনের সর্ব্বপ্ৰথম জেলা এবং খুলনাই সর্বপ্রথম মহকুমা।

পঞ্চমতঃ, নীল-বিদ্রোহ আধুনিককালের ইতিহাসে একটি প্রধান ঘটনা। এই খণ্ডের নীলচাষ ও নীল-বিদ্রোহের পূর্ণাঙ্গ আলোচনাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নীল-বিদ্রোহের নেতা ও পরিচালকদের জীবনী এবং দ্বিতীয় নীল-বিদ্রোহের কাহিনীর বহু নূতন উপাদান ও তথ্য উদ্ঘাটিত হইয়াছে।

ষষ্ঠতঃ, সর্ব্বস্তরের উন্নত ও অনুন্নত সমাজের বিস্তৃত আলোচনা যেন অতীত ও বর্ত্তমানের সঙ্গে জীবন্ত যোগসূত্র স্থাপন করিয়াছে। যশোহর-খুলনা নদীমাতৃক দেশ, ‘নদীই এদেশের উন্নতির মূলীভূত’। সমাজ বিষয়ের আলোচনায় গ্রন্থকার দেখাইয়াছেন যে, যমুনা-ইচ্ছামতী, কপোতাক্ষী, ভৈরব, নবগঙ্গা-চিত্রা এবং মধুমতী— এই পাঁচটি নদীর ধারাই এই অঞ্চলের প্রতিভার বিকাশপথ। বঙ্গদেশে সভ্যতা বিকাশের ধারা নদীর ধারার সঙ্গে কতদূর ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেদিকে ইহা অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিতেছে।

সপ্তমতঃ, কোন অঞ্চলের নিরক্ষর কবিদের প্রসঙ্গে এমন সুদীর্ঘ আলোচনা কদাচিৎ দেখা যায়। ‘প্রজার প্রাণের স্পন্দনে’ যে ঐতিহাসিক অণুপ্রাণিত, তাঁহারাই উপযুক্ত অভিব্যক্তিতে এই শেষ পরিচ্ছদের মুখবন্ধ— ‘মাইকেল, দীনবন্ধু প্রভৃতি যাঁহারা আমার দেশের মুখোজ্জ্বলকারী, তাঁহাদের গুণগ্রামের কথা স্থগিত রাখিয়াও আমি এই সকল স্বল্প-শিক্ষিত বা নিরক্ষর কবির নাম ও কীর্তিকাহিনী চিরস্থায়িনী করিতে প্রয়াসী। আমার বিশ্বাস প্রাদেশিক ইতিহাসের সঙ্কলয়িতা ইহাদের নাম বিস্মৃত হইলে প্রত্যবায়গ্রস্ত হইতে পারেন।’ ভবিষ্যতে মানবপ্রেমিক প্রাদেশিক ইতিহাস রচয়িতার নিকট এই উক্তি আলোকবর্তিকা হইয়া থাকিবে।

আরেকটি দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া এই ক্ষুদ্র ভূমিকা শেষ করা যাইতে পারে। সমতটের ইতিহাসের উপরোক্ত প্রধান বিষয়গুলি ব্যতিরেকে এই গ্রন্থে অধিবাসীগণের প্রাত্যহিক জীবন ও সমাজ বিষয়ক এত অসংখ্য প্রশ্নের ঐতিহাসিক আলোচনা আছে যে এই রচনাকে জ্ঞান- কোষ বলিয়া অভিহিত করিলে অত্যুক্তি হয় না।

বঙ্গদেশের ইতিহাস-সাহিত্যে ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ একখানি মৌলিক গ্রন্থ হিসাবে সৰ্ব্বজন সমাদৃত। অতএব অপরিবর্তিতরূপেই ইহা উত্তরসূরীদের নিকট উপস্থিত করিবার গুরু- দায়িত্ব আছে। এই কথা স্মরণে রাখিয়া মূলগ্রন্থের কোথাও কোনও পরিবর্ত্তন করা হয় নাই। যাহা কিছু নূতন বিষয় বা তথ্য সন্নিবেশের আবশ্যক হইয়াছে, তাহা মাত্র পাদটীকায় তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে সম্পাদকের নামাঙ্কিত করিয়া উপস্থিত করা হইল। প্রথম সংস্করণে বহু উল্লেখিত ব্যক্তির নামের পূর্ব্বে ‘শ্রী’ বা ‘শ্রীযুক্ত’ শব্দের অধিক প্রয়োগ ছিল। আধুনিক রীতি অনুযায়ী ইতিহাসে উল্লেখিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিবর্গের জন্য এইরূপ সম্মান জ্ঞাপক শব্দ ব্যবহার বাহুল্য বলিয়াই স্বীকৃত। অতএব বর্ত্তমান সংস্করণে সম্ভাব্য স্থানগুলিতে উহা বর্জ্জন করা হইয়াছে। তবে কতকগুলি স্থানে অন্যভাবে সন-তারিখের নির্দ্দেশ না থাকাতে ‘শ্ৰী’ বা ‘ঁ’ চিহ্ন কতক পরিমাণে জীবিতকাল ইঙ্গিত করে বলিয়া উহা রক্ষিত হইয়াছে। ইহা ছাড়া, গ্রন্থকারের ব্যক্ত ইচ্ছানুযায়ী প্রথম খণ্ডের মত বৰ্ত্তমান খণ্ডেও কয়েকটি ক্রিয়াপদের সম্মানসূচক রূপ ব্যবহৃত হইয়াছে মাত্ৰ।

পরিচ্ছেদের সংখ্যায় বর্তমান সংস্করণে কিছু তারতম্য দৃষ্ট হইবে। ইহার কারণ, প্রথম সংস্করণে প্রতাপাদিত্য এবং সীতারামের ইতিবৃত্তের পর পুস্তকের মধ্যস্থলে উক্ত বিষয়দ্বয়ের ‘পরিশিষ্ট’ নামে একটি করিয়া অংশ সন্নিবিষ্ট ছিল। পূৰ্ব্বোক্ত মত মূলে কোনও পরিবর্তন না করিয়া কেবলমাত্র তিনটি পরিচ্ছেদ আখ্যা দিয়া যথাস্থানেই উক্ত পরিশিষ্টদ্বয় সংস্থিত হইল। এতদ্ব্যতীত গ্রন্থের শেষাংশে সাহিত্য বিষয়ক আলোচনাকে যথাস্থানে রাখিয়াই কেবলমাত্র ভিন্ন একটি পরিচ্ছেদের আকারে উপস্থিত করা হইয়াছে।

এই গ্রন্থের সম্পাদনা সম্পর্কে পরমশ্রদ্ধেয় স্যর যদুনাথ সরকার মহোদয়ের উপদেশ গ্রহণ করিবার সৌভাগ্য হইয়াছিল। তাঁহারই নির্দেশানুযায়ী প্রতাপাদিত্য বিষয়ক আলোচনায় প্রয়োজনীয় তথ্য পাদটীকায় সংযোজিত হইল এবং এই বিষয়ে তাঁহারই রচিত তিনটি প্ৰবন্ধ পরিশিষ্টে উদ্ধৃত হইল। এই প্রবন্ধ প্রকাশের অনুমতির জন্য ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক মহাশয়ের নিকট চির বাধিত রহিলাম।

বৰ্ত্তমান গ্রন্থ আদ্যোপান্ত পাঠের পর ঐতিহাসিক মহামতি বিভারিজ সাহেব একটি মাত্র ত্রুটির কথা গ্রন্থকারকে জানাইয়াছিলেন। তাঁহার মতে ইহাতে উইলিয়াম কেরীর বিষয় উল্লেখিত হওয়া উচিৎ ছিল। খুলনার সহিত সামান্য কিছুদিনের জন্য হইলেও কেরী সাহেবের যোগাযোগ ঘটে বলিয়াই বিষয়টি বিভারিজ সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বর্ত্তমান সংস্করণের শেষ পরিচ্ছেদে পাদটীকায় কেরী সাহেবের খুলনার সহিত সংশ্লিষ্ট বৃত্তান্তটি সংযোজিত হইল।

প্রথম খণ্ডের মত এই খণ্ডে যাহা কিছু প্রমাণস্বরূপ উল্লেখিত হইয়াছে, তাহার প্রায় সমুদয়ই পুনর্ব্বার পরীক্ষা করা হইয়াছে; এবং উদ্ধৃত অংশের পত্র-সংখ্যার মুদ্রণ-প্রমাদগুলিও সংস্কার করা হইয়াছে। একমাত্র পুরাতন কারিকা এবং আদি দানপত্রগুলির দুষ্প্রাপ্যতা হেতু পরীক্ষা করা সম্ভব হয় নাই।

চিত্রগুলি সম্পর্কে দুর্ভাবনার অন্ত ছিল না। মূল ছবি বা ব্লকগুলি না থাকায় পুস্তকের পূর্ব্ব সংস্করণে মুদ্রিত চিত্র হইতেই পুনরায় ব্লক করিতে হইয়াছে। ফলে বহু চেষ্টা ও অর্থব্যয় সত্ত্বেও কিছু ছবি আশানুরূপ হয় নাই। তেমন ছবিগুলির সাহায্যে প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে অসুবিধা হইলেও সাধারণ পাঠকের সামনে ইহা অস্পষ্ট আভাষে অতীতের অবয়ব তুলিয়া ধরিতে কতক পরিমাণে সাহায্য করে। তাহারও মূল্য কম নহে মনে করিয়া সেগুলি বর্জ্জন করা হয় নাই। বৰ্ত্তমান সংস্করণে অনেকগুলি নূতন ছবিও সংযুক্ত হইয়াছে।

পরিশিষ্টে গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং তাঁহার রচনাপঞ্জী সংযোজিত হইল। গ্রন্থকার ‘মিত্রবংশ মঙ্গল’ নামক পাণ্ডুলিপিতে আপন বংশের কারিকা ও ঘটনা পরম্পরা সঙ্কলন করিয়া রাখিয়াছিলেন। নানা বিপর্য্যয় ও দেশ-বিভাগ জনিত ঘূর্ণাবর্তেও এই পাণ্ডুলিপিখানি রক্ষা করিবার সৌভাগ্য হইয়াছিল। প্রধানতঃ তাহার উপর ভিত্তি করিয়াই সতীশচন্দ্রের জীবনী রচিত সতীশচন্দ্রের হস্তাক্ষরের নিদর্শনস্বরূপ এই পাণ্ডুলিপির এক পৃষ্ঠার প্রতিলিপিও প্রদত্ত হইল।

প্রথম সংস্করণের সূচীপত্রে এক-একটি পরিচ্ছেদের সহিত উহার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিষয়ের ক্রমিক আলোচনার একটি সুদীর্ঘ তালিকা সন্নিবিষ্ট ছিল। পরিচ্ছেদগুলির মোট পত্রাঙ্কের নির্দেশ থাকিলেও অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের তালিকাগুলিতে পৃথক পৃষ্ঠাঙ্কের উল্লেখ ছিল না। তাহা দিতে গেলে সূচীপত্র অযথা দীর্ঘ হইয়া পড়ে। সেইজন্য এই দীর্ঘ তালিকার বিষয়গুলি সূচীপত্রে না রাখিয়া এইবার নির্ঘণ্টে পৃষ্ঠাঙ্কসহ সংযুক্ত হইল। বৰ্ত্তমান সংস্করণে নির্ঘণ্ট বহু বিস্তারিত করা হইয়াছে। শুধু ব্যক্তি ও স্থানের নাম নহে, বিষয়ের নামও নির্ঘণ্টে বাদ পড়ে নাই এবং কোন বিষয়ের ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত আলোচনাও এইবার নির্ঘণ্টের সাহায্যে সহজলভ্য হইবে।

এই গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশনের কাজে কতজনে যে কতভাবে আমাকে উৎসাহিত ও সাহায্য করিয়াছেন তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। পুণ্যশ্লোক সতীশচন্দ্রের গুণমুগ্ধ সুধীজনের সংখ্যা আজও অসংখ্য। তাঁহাদের সকলের আশীর্ব্বাদ কুড়াইয়া এই সুবৃহৎ গ্রন্থ পুনরায় সকলের নিকট উপস্থিত করিতে সক্ষম হইয়াছি। তাহা না হইলে আমার পক্ষে ইহা প্রকাশ করা কখনই সম্ভব হইত না।

প্রত্যক্ষ সাহায্যের জন্য প্রথম খণ্ডের পুনর্মুদ্রণকালে যাঁহাদের কাছে অপরিশোধ্যভাবে ঋণী হইয়াছিলাম, এইবারও তাঁহাদের কাছে আমার ঋণের বোঝা দ্বিগুণতর হইয়া রহিল।

সম্পাদনা কেন, সৰ্ব্ব ব্যাপারে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় আমাকে যে উৎসাহ ও উপদেশ দিয়াছেন, তাহার তুলনা হয় না। অগণিত বৃক্ষের মেলায় বনানীকে দেখিবার এমন দৃষ্টি অতি কম শিক্ষকের নিকট পাওয়া যায়। সেইজন্যই হয়ত তাঁহার নিকট এমনভাবে ঋণী হইয়া পড়িয়াছি।

সম্পাদনার কাজে আমার কর্ম্মক্ষেত্র কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে গত দুই বৎসর অনুরোধ ও উপরোধের পাল্লা ক্রমেই ভারাক্রান্ত করিয়া আমার সহকর্মীদের যে কিরূপ বিব্ৰত করিয়াছি, তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। তাঁহাদের সকলের নিকট আমি চির-বাধিত হইয়া রহিলাম। বিশেষ করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক শ্রীপ্রমীলচন্দ্র বসু মহাশয় এবং অনুজোপম সহকৰ্ম্মী শ্রীশান্তিপদ ভট্টাচার্য্যের নিকট আমার ঋণ অপরিসীম।

নাভানা প্রকাশনের অন্যতম কর্ণধার কবি বিরাম মুখোপাধ্যায় এই ইতিহাস মুদ্রণের কাজে হাত দিয়া ইহার প্রতি পরিচ্ছেদের সঙ্গে যে-ভাবে একাত্ম হইয়াছিলেন, তাহা দেখিয়া বারম্বার মনে হইয়াছে— কবিমনের অন্তরালে মানবপ্রীতির ধারা না থাকিলে মানবেতিহাসের স্বাক্ষরকে এমন সুন্দরভাবে সজ্জিত করিবার অনুপ্রেরণা তাঁহার আসিত না। ইহার ফলে তিনি আমার দায়িত্ব যে কতভাবে লাঘব করিয়াছিলেন, তাহা বলিবার নহে। এবং তাঁহার নিকট আমার ঋণ অপরিশোধ্য।

শিবশঙ্কর মিত্র
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার
১৪ এপ্রিল, ১৯৬৫
১ বৈশাখ, ১৩৭২

Book Content

প্রথম অংশ : ঐতিহাসিক - ১. মোগল আমল
১. উপক্রমণিকা
২. পাঠান রাজত্বের শেষ
৩. বঙ্গে বারভুঞা
৪. প্রতাপাদিত্যের ইতিহাসের উপাদান
৫. পিতৃ-পরিচয়
৬. পাঠান রাজত্বের পরিণাম ও যশোর-রাজ্যের অভ্যুদয়
৭. যশোর-রাজ্য
৮. বসন্ত রায়
৯. যশোহর-সমাজ
১০. গোবিন্দদাস
১১. বংশ-কথা
১২. প্রতাপাদিত্যের বাল্যজীবন
১৩. আগ্রার রাজনীতি ক্ষেত্ৰ
১৪. প্রতাপের রাজ্যলাভ
১৫. যশোরেশ্বরী
১৬. প্রতাপাদিত্যের রাজধানী
১৭. প্রতাপের আয়োজন
১৮. মগ ও ফিরিঙ্গি
১৯. প্রতাপের দুর্গ-সংস্থান
২০. নৌ-বাহিনীর ব্যবস্থা
২১. লোক-নির্বাচন
২২. সৈন্যগঠন
২৩. প্রতাপের রাজত্ব
২৪. উড়িষ্যাভিযান ও বিগ্ৰহ-প্ৰতিষ্ঠা
২৫. বসন্ত রায়ের হত্যা
২৬. সন্ধি-বিগ্রহ
২৭. খৃষ্টান পাদরীগণ
২৮. কার্ভালো ও পাদ্রীগণের পরিণাম
২৯. রামচন্দ্রের বিবাহ
৩০. প্রথম মোগল-সংঘর্ষ : মানসিংহ
৩১. মানসিংহের সঙ্গে যুদ্ধ ও সন্ধি
৩২. দ্বিতীয় মোগল-সংঘর্ষ : ইসলাম খাঁ
৩৩. শেষ যুদ্ধ ও পতন
৩৪. প্রতাপাদিত্য সম্পর্কিত কয়েকটি বংশ
৩৫. যশোহর-রাজবংশ
৩৬. যশোহরের ফৌজদারগণ
৩৭. নলডাঙ্গা রাজবংশ
৩৮. চাঁচড়া রাজবংশ
৩৯. সৈয়দপুর জমিদারী
৪০. রাজা সীতারাম রায়
৪১. সীতারাম : বাল্যজীবন ও জমিদারী
৪২. সীতারাম : রাজ্য ও রাজধানী
৪৩. সীতারাম : রাজত্ব ও ধৰ্ম্মপ্রাণতা
৪৪. সীতারাম : মোগল সংঘর্ষ ও পতন
৪৫. সীতারাম : বংশ, রাজ্য ও কীর্ত্তির পরিণাম
৪৬. সীতারাম সম্পর্কিত কয়েকটি বংশ
৪৭. প্রাক্-ইংরাজ আমলে রাজন্য-বংশ
দ্বিতীয় অংশ : ঐতিহাসিক - ২. ইংরাজ আমল
১. বৃটিশ-শাসন ও হেঙ্কেলের কীৰ্ত্তি
২. যশোহর-খুলনা : গঠন ও বিস্তৃতি
৩. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
1 of 2
অদ্বৈতপ্রকাশ - ঈশান নাগর

অদ্বৈতপ্রকাশ – ঈশান নাগর

যশোহর খুলনার ইতিহাস ১

যশোহর খুলনার ইতিহাস ১ – সতীশচন্দ্ৰ মিত্ৰ

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.