মুঘল নারীর ফিস্যা কাহিনী – সহেলী চক্রবর্তী
Mughol Narir Kissa Kahini Written By: Saheli Chakraborty
প্রকাশকাল :- 15th of August, 2022
.
উৎসর্গ
পিতাশ্রী স্বর্গীয় তড়িৎ কুমার চক্রবর্তীকে
.
ভূমিকা
মুঘল নারীর কিস্যা কাহিনী আমার লেখা দ্বিতীয় বই। এর আগে আমার লেখা প্রথম বই “দাস্তান এ ইশক” প্রকাশিত হয়েছে। যা ছিল মূলত মধ্যযুগীয় প্রেমাখ্যান।
আমার দ্বিতীয় বই মুলত সেই সকল মুঘল বেগম ও শাহজাদীদের জীবন আলেখ্য যাঁদের নিয়ে সেভাবে কোথাও আলোচনা হয়না। যেমন সালিহা বানু বেগম ছিলেন জাহাঙ্গীরের প্রধান বেগম। তাঁর মৃত্যুর পরে নূরজাহান সেই স্থান লাভ করেন। কিন্তু কজন চেনে সালিহা বানু বেগমকে। আবার গওহর আরা বেগম ছিলেন মুমতাজ মহলের চোদ্দতম সন্তান, যাঁর জন্মের পরে মুমতাজের মৃত্যু হয়। কিন্তু গওহর আরাকে নিয়ে সেভাবে কোথাও উল্লেখ করা হয়না। অন্যদিকে মুহম্মদ শাহর কন্যা হযরত মহল ছিলেন আফগান শাসক আহমদ শাহ দুররানির প্রধান বেগম। রুকাইয়া সুলতানের জন্য আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে নির্মাণ করেছিলেন তুর্কী সুলতানার আবাস। কিন্তু তাঁদের মতো বহু মুঘল বেগম ও শাহজাদী আছেন যাঁরা সেভাবে কোথাও আলোচিত নন। মুঘল নারীর কিস্যা কাহিনী সেই সকল মুঘল নারীদের জীবন কাহিনী যাঁরা অন্ধকারে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছেন।
আমার প্রথম বইয়ের মতো আমার দ্বিতীয় বইটিও আমি আমার বাবা স্বর্গীয় তড়িৎ কুমার চক্রবর্তীকে উৎসর্গ করছি।
ইতি,
সহেলী চক্রবর্তী
.
শুভেচ্ছা বার্তা
সহেলী চক্রবর্তীকে আজ বেশ কয়েক বছর ধরে চিনি, প্রথম আলাপ হয়েছিল ফেসবুকে, আসলে সেখানে ওর মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাস সংক্রান্ত পোস্ট গুলি দেখে বেশ মুগ্ধ হতাম। তারপর একদিন বাস্তবেও দেখা হলো, জানলাম তাঁর মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে ভালো লাগার কথা, সেদিন বুঝেছিলাম একটা মানুষ কিভাবে ইতিহাসের সাথে নিজেকে গুলিয়ে নিতে পারে, সহেলীর দেহ মুর্শিদাবাদে পড়ে থাকলেও মন পড়ে থাকে মধ্যযুগের দিল্লীর অলিগলিতে। সহেলীর লেখার হাতও দূর্দান্ত, ওর লেখা পড়ে অতীত ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া যায়।
সহেলী ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেন, তাঁর প্রথম বই ” দাস্তান এ ইশক” মধ্যযুগের প্রেম কাহিনী নিয়ে লেখা, বইটি ইতিমধ্যেই পাঠক মহলে খুব সাড়া ফেলেছে। তাঁর আরও একটি বই আসতে চলেছে ” মুঘল নারীর কিসসা কাহিনী ” নামে। এই বইতে বিভিন্ন মুঘল নারীদের কথা লেখা হয়েছে, বইতে স্থান পেয়েছে কুদসিয়া বেগম, জিনাত মহল, মাহে চুচাক বেগম, গওহর আরা বেগম, বদর উন নিসা বেগম, হযরত মহল, গুলরুখ বেগম, বিবি মুবারিকা, পারহেজ বানু বেগম সহ আরও অনেকের কথা। বইটির জন্য সোহেলীকে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাই এবং আশা করি এই বইটিও সহেলীর প্রথম বইয়ের মতোই পাঠকদের তৃপ্ত করতে সক্ষম হবে।
– ফারুফ আব্দুল্লাহ (লেখক) ২৭/০৬/২০২২
.
লেখিকার পরিচয়
সহেলী চক্রবর্তীর অন্যতম ভালোলাগার বিষয় ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাস ঐতিহ্য। তিনি এই নিয়েই থাকতে ভালোবাসেন। তাঁর বাসস্থান বহরমপুর শহর হলেও দিল্লি আগ্রার অলিগলিতে তাঁর মনের নিত্য যাওয়া আসা। ইতিহাস প্রেমী লেখিকা তাঁর নিজের ভাব প্রকাশ করতেই কলম ধরেছেন। তাঁর কলমে উঠে আসে মধ্যযুগের সুলতান, বাদশা, বেগমদের জীবন যাপনের কথা। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে তিনি রাজ্যের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, দৈনিক সংবাদপত্রে নিয়মিত লিখে চলেছেন। তিনি প্রত্নচিহ্ন নামক একটি ইতিহাস ভিত্তিক পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। “দস্তান-এ-ইশক” তাঁর লেখা প্রথম বই। প্রথম বই প্রকাশের দুবছর পরে প্রকাশিত হলো তাঁর দ্বিতীয় বই “মুঘল নারীর কিস্যা কাহিনী”।
.
১। মুঘল হারেম
মুঘল হারেম ছিল আসলে সম্রাটদের বেগম ও অন্যান্য মহিলাদের জন্য অন্তঃপুর। হারেম অর্থাৎ পবিত্র, অলঙ্ঘনীয়, নিষিদ্ধ জায়গা। তুর্কী শব্দ “সেরাগ্লি” ও ফার্সি শব্দ “জেনানা” ও হারেমের প্রতিশব্দ। হারেম ছিল পুরোপুরি নারী বলয়। । এখানে পুরুষের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ স্থান হওয়ার কারণে হারেম নিয়ে জল্পনা ও কৌতূহলেরও শেষ ছিল না। হারেম ছিল মূলত সম্রাটের আমোদ প্রমোদের জায়গা।
হারেমগুলি মূলত সম্রাটের স্ত্রী ও মহিলা আত্মীয়স্বজন নিয়ে গঠিত ছিল। বেশিরভাগ মহিলাই বিবাহ, জন্মগত বা উপহার হিসেবে হারেমে প্রবেশ করতেন। নারীদের পর্দাপ্রথার কঠোর নিয়মে শাসন করা হতো। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছানুসারে হারেমের বাইরে যেতে পারতেননা। কিন্তু সম্রাটের কাছের কিছু মহিলা স্থানীয় উপাসনালয়, তীর্থযাত্রা, শিকার এবং সম্রাটের সঙ্গে ভ্রমণে যেতেন। তাঁরা সর্বদা পালকি বা হাতির পিঠে চড়ে বাইরে যেতেন।
হারেম ছিল মূলত বিলাসবহুল, আরামদায়ক জীবনযাপনের জায়গা। হারেমে বাগান, ফোয়ারা, জলের চ্যানেল ছিল। এখানকার বাসিন্দাদের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করা হত। রাজকীয় পাকশালা থেকে খাদ্য সরবরাহ করা হত। এছাড়া পানীয় জল, মদ, পোশাক, গহনা, গৃহস্থালী সামগ্রী, অভিনব জিনিসপত্র রাজকীয় ব্যবস্থাপনা দ্বারা সরবরাহ করা হত।
হারেমে নারীদের সাথে সাথে জন্ম নেওয়া শিশুরাও থাকতো। হারেমে একটি শ্রেণীবিন্যাস ছিল। এর প্রধান ছিলেন সম্রাটের বেগম। তাঁদের সঙ্গে থাকতেন মহিলা আত্মীয়রা। এঁদের নীচে থাকতেন উপপত্নীরা। মা, সৎ মা, মাসী, দাদী, সৎ বোন, কন্যা ও অন্যান্য মহিলা আত্মীয়রা ছিলেন হারেমের অংশ। এছাড়া চাকর, দাসী, বাবুর্চি, মহিলা কর্মকর্তা ও প্রহরীরাও হারেমে থাকতেন। মুঘল হারেম খোজাদের পাশাপাশি উর্দু বেগম নামক মহিলা যোদ্ধাদের দ্বারাও সুরক্ষিত ছিল। হারেমের আশেপাশে ছিল বাজার, লন্ড্রি, রান্নাঘর, খেলার মাঠ, স্কুল এবং স্নানঘর।
ফতেহপুর সিক্রি নির্মাণের সাথে সাথে আকবর জেনানার প্রশাসনকে সংগঠিত করার প্রয়োজন বোধ করেন। তখন প্রাসাদের এই অংশে ৫ হাজারের বেশি মহিলা বাস করতেন। আকবরনামায় বলা হয়েছে প্রতিটি নারীর জন্য নিজস্ব কক্ষ ছিল। হারেমে মহিলা দারোগা নিয়োগ করা হয় হারেমের শান্তি বজায় রাখার জন্য। অন্যদিকে তহবিলদার হারেমের মহিলাদের বেতন ও আর্থিক অনুদান দেখতেন। এছাড়া মহলদারদের হাতে দায়িত্ব ছিল গোয়েন্দা হিসেবে নিজের কাজ করা।
মুঘল নারীদের আর্থিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং তাঁরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কাজকর্মের সাথে যুক্ত থাকতেন। তাঁরা খোজাদের বাণিজ্যিক এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতেন। শাহজাহানের কন্যা জাহানারা বেগম দিল্লীর অনেক স্থাপত্য নির্মাণে অবদান রেখেছিলেন। অন্যদিকে রোশেনারা উচ্চ মনসবদারদের সমান বার্ষিক আয় করতেন। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের উপর হারেমের বাসিন্দাদের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকতো। এবং বিভিন্ন শহর থেকে তাঁরা প্রচুর আয় করতেন। জাহানারা সুরাট বন্দর থেকে প্রচুর রাজস্ব পেতেন। অন্যদিকে নূরজাহান অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য থেকে টোল বাবদ প্রচুর আয় করতেন।
মুঘল নারীরা কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, শিল্পকলা, সায়েন্স ও যুদ্ধবিদ্যায় খুব ভালো শিক্ষিত ছিলেন। মনসেরেট লিখেছেন যে আকবর নারী শিক্ষার প্রতি ও শাহজাদীদের শিক্ষার প্রতি খুবই আগ্রহী ও যত্নশীল ছিলেন। তাঁদের পড়তে ও লিখতে শেখানো হত। এছাড়া তাঁদের ব্যবহারের জন্য হারেমের ভিতর লাইব্রেরী থাকতো। হারেমের মহিলাদের মধ্যে অনেকেই দক্ষ লেখক ও কবি ছিলেন। মানুচির কথায় হারেমে চিকিৎসক প্রবেশ করলে খোজারা তাঁর মুখ লম্বা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিত। তারপর তাঁকে রুগীর কাছে নিয়ে যাওয়া হতো এবং একইভাবে চিকিৎসককে বাইরে নিয়ে আসা হতো।
হারেমের চারদেয়ালের ভিতর মনোরঞ্জনের দায়িত্ব মহিলাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। মাসে একবার তাঁরা খুশরোজ ও মীনাবাজারে অংশগ্রহণ করতেন। এটা ছিল একধরনের মেলা যেখানে মহিলারা স্টল বসাতেন এবং সম্রাট সেখানে উপস্থিত হতেন। এছাড়া ছিল সম্রাটের জন্য আয়োজিত নাচগানের আসর, যা বসতো হারেমের ভিতর। কিছু উপপত্নী ছিলেন দক্ষ গায়িকা ও নৃত্য পটিয়সী। রাজকুমারদের হারেমগুলিও তাঁদের সামর্থ্য ও মর্যাদা অনুসারে একই ধারায় কমবেশি সংগঠিত হতো।
হারেমের বাসিন্দারা ছিলেন বহুদেশের বাসিন্দা। ভারতীয়, আফগান, ইরানী, তুরাণী, উজবেক নারীদের নিয়ে হারেম ছিল একটি রঙীন জায়গা। এঁদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্যই ছিল সম্রাটের মন জয় করা। তারজন্য তাঁরা নাচগান, অঙ্কন সহ বিভিন্ন শিল্পকলায় দক্ষ ছিলেন। কোন মহিলা একবার হারেমে প্রবেশ করলে বাকী জীবন বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। বয়স্ক মহিলা বাসিন্দারা একাকিত্বের মধ্যে জীবন কাটাতেন। যদি তাঁরা সম্রাটের প্রিয় হতেন, তাহলে সম্রাট কালেভদ্রে এক আধদিন দেখা করতে আসতেন। বয়স্ক মহিলা বাসিন্দাদের মৃত্যুর পরেও তাঁদের দাসীরা ছাড়া কেউ শেষ দেখা দেখতেও আসতেননা। এমনই কঠোর ছিল হারেমের জীবনযাত্রা।
২। জীনাত মহল
বেগম সাহিবা জীনাত মহল ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সবচেয়ে প্রিয়তমা বেগম।বাহাদুর শাহ জাফর ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করলে, জিনাত বেগমের জীবনও তাতে জড়িয়ে যায়। বে
জীনাত মহল ছিলেন তৈমুর বংশীয় শাহজাদী। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮২৩ সালে। জিনাত তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের কারণে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন। ১৮৪০ সালের ২৯শে নভেম্বর জাফরের সাথে জিনাতের বিবাহ হয়। বাহাদুর শাহ জাফরের পিতা আকবর শাহ দ্বিতীয় সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসাবে মীর্জা জাহাঙ্গীরকে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। মীর্জা জাহাঙ্গীর ছিলেন জাফরের সৎ মা মমতাজ মহল দ্বিতীয়র পুত্র। কিন্তু ব্রিটিশরা আকবর শাহ দ্বিতীয়র নির্বাচন বাতিল করে দেয়। কারণ তারা জানায় মীর্জা জাহাঙ্গীর সম্রাট হওয়ার উপযুক্ত নয় এবং তার সাথে সাথে মাতালও। মীর্জা জাহাঙ্গীর অল্প বয়সে মারা গেলে জাফরের পথ পরিস্কার হয়। জাফর সম্রাট নির্বাচিত হলে জীনাত মহলের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায় মুঘল হারেম ও জাফরের জীবনে। .
জীনাত বাহাদুর শাহ জাফরের যাবতীয় কাজকর্মে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতেন। পরবর্তী সম্রাট হওয়ার দাবীদার মীর্জা দারা বক্ত মারা গেলে জীনাত নিজের পুত্র জওয়ান বক্তকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। জাফরের জ্যেষ্ঠ পুত্র মীর্জা ফৎ-উল-মুল্ক বাহাদুর থাকা সত্ত্বেও জীনাত মহলের এই প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ব্রিটিশরা জ্যেষ্ঠ পুত্র উত্তরাধিকার পাবে এই নীতি অবলম্বন করে জওয়ান বক্তের উত্তরাধিকারীর দাবী আটকে দেয়। জীনাত মহলের বিরুদ্ধে এও অভিযোগ আনা হয়েছিল যে রাজপ্রাসাদের কাজকর্মে বেশি হস্তক্ষেপ করায় তিনি ব্রিটিশ কর্মচারী থমাস মেটলকাফকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছেন।
দিল্লীর লাল কুয়ানে ছিল জীনাত মহলের হাভেলি। চাঁদনি চকের পিছনে ফতেহপুরী মসজিদ পার করে হাভেলিতে পৌঁছাতে হয়। মহলের প্রথম তলায় সূক্ষ্ম জালির কাজ আজও দেখার মতো। হাভেলির শুরু কোথায় আর শেষ কোথায়, কেউ জানেনা। কাঠামোর একটি অংশ আজ স্কুলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে পাতিয়ালার মহারাজ এই হাভেলি কিনে একে স্কুলে পরিণত করেন। মহলের গম্বুজ, জটিল ইঁটের কাজ, লোহার সর্পিল সিঁড়ি আজও মুগ্ধ করে। বর্তমানে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হাভেলি সকলের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু একসময় এই হাভেলি ছিল মল্লিকা -এ হিন্দুস্তানের হাভেলি। হাভেলির প্রবেশদ্বারের কাছে একজন ডঙ্কা বাজানোর লোক থাকতো। বাইরে থেকে কেউ এলে ডঙ্কা বাজিয়ে সে সকলকে সতর্ক করে দিত। বাহাদুর শাহ জাফর ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর তাঁর প্রিয় বেগম জীনাত মহলকে নিয়ে এই হাভেলিতে আশ্রয় নেন। ব্রিটিশরা হাভেলি আক্রমণ করলেও শক্ত কাঠের দরজা ভাঙতে অসমর্থ হয়। পরে দিল্লী পুনর্দখলের পর বেগমের প্রতি ক্রোধ থেকে ব্রিটিশরা হাভেলির অনেক ক্ষতি করে। দেশভাগের পর বহু শরণার্থী জিনাত মহলে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে প্রায় কেউই এখানে আসেনা জীনাত মহলের হাভেলি দেখতে। দেখাশোনার অভাবে এককালের মুঘল সম্রাজ্ঞীর হাভেলি আজ ধ্বংসের প্রহর গুনছে।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় জীনাত তাঁর পুত্র জওয়ান বক্তকে বিদ্রোহীদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখেন, যাতে সিংহাসন লাভে সুবিধা হয়। ব্রিটিশরা জয়লাভ করার পর বাহাদুর শাহের দুই পুত্র ও নাতিকে গুলি করে হত্যা করে। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশরা জাফরের সাথে জীনাত মহলকেও রেঙ্গুনে নির্বাসিত করে। যে জীনাত মহল একসময় সুবিশাল মহলে সবরকম আরামে থাকতে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁর ঠাঁই হয় রেঙ্গুনের একটি ছোট্ট আবাসনে। যেখানে মাত্র চারটি ঘর ছিল। একটায় বাহাদুর শাহ জাফর থাকতেন, বাকী তিনটেতে পরিবারের বাকী সদস্যরা থাকতেন। দেখাশোনার জন্য ছিল একজন করে চাপরাসি, জলবাহক, ধোপা ও ঝাড়ুদার। ১৮৬২ সালে বাহাদুর শাহ জাফরের মৃত্যু হয়। ব্রিটিশ সরকার রাজতন্ত্র বিলোপের জন্য আর কাউকে খেতাব দিতে অস্বীকার করে। ফলে জীনাত মহলের মনে জওয়ান বক্তের জন্য নির্বাসনের পরেও যে ক্ষীণ আশা বেঁচেছিল তাও শেষ হয়ে যায়।
১৮৬৭ সালের পর মুক্তিপ্রাপ্ত জাফর পরিবার রেঙ্গুন ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছিই বসবাস শুরু করেন। ১৮৮৬সালের ১৭ই জুলাই ৬২-৬৩ বছর বয়সে জীনাত মহল মারা যান। মৃত্যুর পরে তাঁকে জাফরের সমাধির পাশেই কবর দেওয়া হয়। মাঝে এক শতকের কিছু বেশি সময় পার করার পর ১৯৯১ সালে খননকার্য চলাকালীন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাহাদুর শাহ জাফর এবং তাঁর বেগম জীনাত মহলের সমাধিটি আবিষ্কৃত হয়।বর্তমানে এই স্থানটি বাহাদুর শাহ জাফরের দরগাহ নামে পরিচিত।
জীনাত মহলের জীবন চড়াই উৎরাই এ ভরা। মুঘল সম্রাজ্ঞী থেকে রেঙ্গুনে নির্বাসনে থাকাকালীন অতিসাধারণ জীবন যাপন দুইই তাঁর জীবনে এসেছে। সময়ের সাথে সাথে। তিনি ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী, চতুর এবং প্রভাবশালী। নারী। সম্রাট জাফরের জীবনে তাঁর প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। রেঙ্গুনে নির্বাসনে থাকাকালীন সম্রাজ্ঞীর পরিবর্তে একজন সাধারণ ব্যক্তির জীবনযাপনে বাধ্য হন। মনে অনেক যন্ত্রণা, হতাশা নিয়ে ১৮৮৬ সালে জীনাত মহল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তিনিই ছিলেন মুঘল ভারতের শেষ সম্রাজ্ঞী।
৩। কান্দাহারী বেগম
কান্দাহারী বেগম কান্দাহারী মহল নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর নামের অর্থ কান্দাহারের কন্যা। কা তিনি ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রথম বেগম এবং তাঁর প্রথম সন্তানের মা। তাঁদের একমাত্র সন্তান শাহজাদী পারহেজ বানু বেগম। জন্মসূত্রে কান্দাহারী ছিলেন পারস্যের বিখ্যাত সাফাভিদ রাজবংশের শাহজাদী।
কান্দাহারী বেগমের জন্ম হয়েছিল ১৫৯৩ সালে আফগানিস্তানের কান্দাহারে। তাঁর পিতা মুজাফফর হুসেইন মীর্জা সাফাভি ছিলেন শাহ ইসমাইলের নাতি সুলতান হুসেইন মীর্জার পুত্র। মীর্জা মুজফফরের সেইসময় সাফাভিদ শাসকদের সঙ্গে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অন্যদিকে উজবেকরা কান্দাহার দখলের পরিকল্পনা করায় মুজফফ্ফর সাফাভি মুঘলদের সাহায্য চেয়ে পাঠান। আকবর বহুদিন ধরেই কান্দাহার দখলের অপেক্ষা করছিলেন। তাই সুযোগ পেতেই তিনি বাংলার শাসক শাহ বেগ খান আরঘুনকে পাঠান কান্দাহার দখলের জন্য। উচ্চ বেতন ও উচ্চ পদের জন্য মীর্জা মুজফফর কান্দাহারের আধিপত্য আদান প্রদানে রাজী হন। আকবরের রাজত্বের শেষের দিকে ১৫৯৫ সালে কন্যা কান্দাহারী ও চার পুত্র এবং এক হাজার কাজিলবাশ সৈন্য নিয়ে তিনি ভারতে চলে আসেন। আকবর মীর্জা মুজফফরকে ফারজান্দ (পুত্র) উপাধি প্রদান করেন। তার সঙ্গে সম্ভলের পাঁচ হাজারী জায়গীর দেন। মীর্জা মুজফফর ভারতে আসার কিছুদিন পর শোক ও হতাশায় ডুবে যান। ১৬০৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
জাহাঙ্গীরের আমলে পারস্য নিয়ে ভাবনাচিন্তার সময় জাহাঙ্গীর বুঝতে পারেন আগ্রা ও ইস্পাহানের মধ্যে সংঘাত হলে তা মুঘলদের পক্ষে ক্ষতিকারক হবে।
তিনি বুঝতে পারেন বৈবাহিক চুক্তি এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। কালবিলম্ব না করে তিনি এর জন্য খুররমকে বেছে নেন। ১৮ বছর বয়সী খুররম এক পারসিক তরুণীকে বিবাহ করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কান্দাহারী-মেয়েদের ইচ্ছে অনিচ্ছা কবেই বা গুরুত্ব পেয়েছে! তাই সেদিনও পায়নি। রাজনৈতিক স্বার্থপূরণের জন্য দুজনের বিবাহ হয়। খুররমের এটা ছিল প্রথম বিবাহ। কান্দাহারী খুররমের প্রথম বেগম হলেও না তাঁর জীবনে, না দরবার ও হারেমে কোথাও মর্যাদা পাননি। ১৬০৯ সালের ১২ই ডিসেম্বর জাহাঙ্গীর বিবাহের প্রতিশ্রুতি স্বরূপ ৫০ হাজার টাকা পাঠান কান্দাহারী বেগমের বাড়ীতে। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মচরিতে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
কান্দাহারী বেগম এবং শাহজাদা খুররমের বিবাহ হয়েছিল ১৬০৯-এর ১২ই ডিসেম্বর আগ্রাতে। তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই কিছু পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। কান্দাহারীর সৎ মা খানুম সুলতান বেগম ছিলেন জাহাঙ্গীরের এক সৎ বোন। জ্যোতিষীদের দেখা শুভ মুহূর্তে বিবাহের আয়োজন সম্পন্ন হয়। আগ্রা দুর্গে ধুমধামের সঙ্গে বিবাহের আয়োজন করা হয়েছিল। ১৬১১ সালের ২১শে আগস্ট কান্দাহারী বেগম ও শাহজাদা খুররমের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। জাহাঙ্গীর তাঁর নাম রাখেন পারহেজ বানু বেগম। পারহেজ ছিলেন কান্দাহারী বেগমের একমাত্র সন্তান। মাসির-ই-আলমগিরীতে পারহেজকে পুরহুনার বানু বেগম বলা হয়েছে। শৈশবেই পারহেজকে কান্দাহারী বেগমের কাছ থেকে নিয়ে রুকাইয়া সুলতানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। রুকাইয়া ছিলেন আকবরের পাদশাহ বেগম।তিনি একসময় খুররমকেও দেখাশোনা করেছিলেন শৈশবে। সেই নিয়ম মেনে এবার পারহেজের দেখাশোনার ভারও তুলে দেওয়া হয় রুকাইয়া সুলতানের হাতে। অন্যদিকে কান্দাহারী বেগম আরো একা হয়ে গেলেন। খুররম তখন আরজুমান্দ বানু বেগমকে (মুমতাজ মহল) নিয়ে মেতে আছেন। অপরদিকে কান্দাহারী বেগম খুররমের জীবনে অপাংক্তেয় হয়ে গেলেন। রাজনৈতিক বিবাহ কোনদিন ভালোবাসা, মর্যাদা পেলনা। হারেমেও কান্দাহারীর স্থান নিম্ন থাকায় সেখানেও জুটলো অবহেলা।
কান্দাহারী বেগম ১৬৫০ সাল নাগাদ মারা যান। আগ্রার এক বিশাল বাগানে তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। শাহজাহান কালী মসজিদ কমপ্লেক্সে সমাধিসৌধটি নির্মাণ করেছিলেন । কান্দাহারী বেগম বিড়াল খুব ভালোবাসতেন। আজও নাকি সমাধিস্থলের আশপাশে প্রচুর বিড়াল ঘোরাফেরা করে। স্থানীয়দের বিশ্বাস বিড়াল তাদের দেওয়া খাবার খেলে নাকি মনোকামনা পূর্ণ হয়!সমাধির পাশে একটি তিন খিলান ও এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ ছিল। দুঃখের কথা কান্দাহারী বেগমের সমাধিটি আজ আর অবশিষ্ট নেই। ১৭০৭সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে অরাজক অবস্থায় সমাধিসৌধটি ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটিশ আমলে জায়গাটি ভরতপুরের রাজাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ভরতপুরের রাজা এখানে একটি আধুনিক ভবন নির্মাণ করেছিলেন। আজ শুধু একটি গেট ও কিছু বেঁচে যাওয়া ছত্রী জানান দেয় একসময় এখানেই ছিল পারস্যের বিখ্যাত রাজপরিবারের শাহজাদী কান্দাহারী বেগমের সমাধি।
৪। গওহর আরা বেগম
গওহর আরা বেগম ছিলেন শাহজাহান ও মুমতাজ মহলের চোদ্দতম ও শেষ সন্তান। মুঘল শাহজাদীর জন্ম হয় বুরহানপুরে ১৬৩১ সালের ১৭ই জুন। শাহজাদীর জন্মের পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য তাঁর মা মুমতাজ মহল মারা যান। গওহর জন্ম সূত্রে ছিলেন তৈমুর বংশীয় মুঘল শাহজাদী। জীবদ্দশায় দরবারী রাজনীতিতে নিজেকে গওহর সেভাবে কোনদিন যুক্ত করেননি। আর সেই কারণে ঔরঙ্গজেব কোনদিন তাঁর এই বোনের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেননি।
গওহর জন্মের সাথেই মাতৃহারা হন। মুঘল হারেমে তিনি প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করেন, যা একজন শাহজাদীর পক্ষে জানা দরকার। তবে দরবারী রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেই গওহর বেশি পছন্দ করতেন। তাই পিতা শাহজাহানের রাজত্বকালের শেষের বছরগুলিতে যখন তাঁর চার ভাইদের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধ প্রবল হয়ে ওঠে, গওহর তখনও নিজেকে এই সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তবে ধারণা করা হয় যে তিনি তাঁর চতুর্থ ভাই মুরাদ বখশের সিংহাসন লাভের পক্ষে ছিলেন। তবে এই ঘটনা যদি সত্যি হতো তাহলে সিংহাসন লাভের পর ঔরঙ্গজেব কর্তৃক তাঁর বন্দী হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। তাই মুরাদ বখশের প্রতি গওহর আরার সমর্থন ছিল কিনা তা সন্দেহাতীত নয়।
তাঁর অন্যান্য কন্যাদের মতো শাহজাহান গওহর আরার বিবাহ ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তাই বাকী বোনদের মতো গওহর ও আজীবন অবিবাহিতাই থেকে যান। তবে পিতার মৃত্যুর পরে শাহজাদী তাঁর আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ দেওয়া শুরু করেন। প্রথমেই তিনি তাঁর বড় ভাই দারা শিকোহর পুত্র সিপিওর শিকোহর সাথে ঔরঙ্গজেবের কন্যা জুবদাত -উন-নিসার বিবাহ সম্পন্ন করেন।
এই বিবাহের আয়োজন হয়েছিল ১৭৭৩ সালে। শাহজাদীর মামাতো বোন হামিদা বেগমও এই বিবাহে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। শাহজাদী গওহর আরা কর্তৃক আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিবাহ আয়োজন হলো দারা শিকোহর নাতনী সালিমা বানু বেগমের সঙ্গে ঔরঙ্গজেবের চতুর্থ পুত্র শাহজাদা মুহম্মদ আকবরের বিয়ে। সালিমা বানু বেগমকে গওহর আরা বেগম দত্তক নিয়েছিলেন। এবং নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে তাঁকে বড় করেছিলেন। তাই ১৬৭২ সালের এই বিবাহে গওহর আরা বেগম আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই বিশেষ বিবাহে সালিমা বানুর মায়ের স্থান নিয়েছিলেন। এই বিবাহ হয়েছিল প্রচুর জাঁকজমকপূর্ণ। দিল্লী গেট থেকে কনের বাসর অব্দি রাস্তার দুপাশে কাঠের কাঠামো আলো দিয়ে সাজানো হয়েছিল।
গওহর আরা বেগম মারা যান দিল্লীর, শাহজাহানাবাদে ১৭০৬ সালে, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫বছর। সেই সময় ঔরঙ্গজেব ছিলেন দাক্ষিণাত্যের মালভূমিতে। বয়সজনিত কারণে সম্রাট নিজেও তখন অসুস্থ। গওহর আরা বেগমের মৃত্যুতে তিনি প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি বৃদ্ধবয়সে প্রায়ই বলতেন “শাহজাহানের সন্তানদের মধ্যে ‘তিনি ‘আর আমি বেঁচে আছি।”
গওহর আরা বেগম তাঁর দুই বোন জাহানারা বেগম এবং রোশেনারা বেগমের মতো কোনদিন দরবারী রাজনীতিতে নিজেকে জড়াননি। শাহজাহান ও মুমতাজের সন্তান হয়েও তিনি কোনদিন প্রচারের আলো পাননি। বরং আজীবন প্রচার থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে থেকেই তিনি জীবন কাটান। আর এইভাবেই একদিন নীরবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ইতিহাসের পাতাও তাঁকে নিয়ে কোনদিন বিশেষ কালি খরচ করেনি।
৫। বিবি মুবাৱিকা
বিবি মুবারিকা ইউসুফজাই ছিলেন বাবরের পঞ্চম বেগম। তিনি জাতিতে ছিলেন পাশতুন। গুলবদন বেগম বহুবার হুমায়ুননামাতে বিবি মুবারিকার নাম উল্লেখ করেছেন। সেখানে গুলবদন বেগম তাঁকে “আফগান মহিলা ” বলে সম্ভাষণ করেছেন। আফগান হচ্ছে পাশতুন সম্প্রদায়ের জাতিগত নাম।
বিবি মুবারিকা ছিলেন মালিক শাহ মনসুরের কন্যা। মালিক শাহ মনসুর ছিলেন ইউসুফজাই জনজাতির প্রধান। বিবি মুবারিকার পিতামহ ছিলেন মালিক সুলেমান শাহ। মুবারিকার এক ভাই মীর শাহ জামাল বাবরের সঙ্গে ১৫২৬ সালে ভারতে আসেন। তিনি হুমায়ুন ও আকবরের আমলে বড় পদে আসীন ছিলেন।
বাবর বিবি মুবারিকাকে বিবাহ করেন ১৫১৯ সালের ৩০শে জানুয়ারী। এই বিবাহের দ্বারা মুঘল ও পাশতুন সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা স্নেহের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিবি মুবারিকা ছিলেন বুদ্ধিমতী নারী। তিনি মুঘল ও ইউসুফজাই সম্প্রদায়ের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাবর মুবারিকা বেগমকে খুব পছন্দ করতেন। তাই বাবরের সঙ্গে ভারতে প্রথম যে বাছাই করা বেগম ও হারেমের মহিলারা এসেছিলেন, সেই দলে বিবি মুবারিকা ছিলেন অন্যতম সদস্যা। বাবর ১৫২৬ সালে প্রথম পাণিপথের যুদ্ধে বিজয়ের পরে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত রাখেন, বাকীটা ইতিহাস।
বিবি মুবারিকা হুমায়ুনের রাজত্বকালে জীবিত ছিলেন। আকবরের রাজত্বের প্রথম দিকে তিনি মারা যান। পাশতুন জনজাতির নারী থেকে মুঘল বাদশা বাবরের বেগম, তাঁর উত্থান যথেষ্ট বিস্ময়কর ছিল। তিনি শুধু বেগমই ছিলেন
না, বাবরের প্রিয় বেগমদের মধ্যেও তাঁর স্থান ছিল। তবু আজ সেভাবে আলোচিত নয় বিবি মুবারিকা ইউসুফজাই এর নাম।
৬। গুলরুখ বেগম
গুলরুখ বেগম ছিলেন তৈমুর বংশীয় মুঘল শাহজাদী। তাঁর নামের অর্থ হল “যাঁর চিবুক গোলাপের ন্যায়”। গুলরুখ ছিলেন বাদশা আকবরের পিসি এবং হুমায়ুনের সৎ বোন। ধর্মের দিক থেকে ছিলেন সুন্নী মুসলিম।
গুলরুখ বেগমের অনেক নাম ছিল। যেমন গুলরঙ্গ, গুলবর্গ। তাঁর পিতা বাবর ছিলেন মুঘল সম্রাট এবং ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। গুলরুখের মা সলহা সুলতান বেগম ছিলেন তুর্কী বংশজাত।সেইজন্যই গুলরুখের নামগুলো সবই ছিল তুর্কী শব্দ থেকে। গুলরুখ বেগমের মাতৃকুলের পরিচয় বিতর্কিত। যেটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায় যে বাবরের সঙ্গে সলহা সুলতান বেগমের সম্পর্ক একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছিল। ১৫১১-১৫১৯ সালের ভিতর তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। বাবর এবং গুলবদন বেগম কেউই তাঁদের বইতে সলহা সুলতান বেগমের নামোল্লেখ করেননি। এমনকি বাবর তাঁর আত্মচরিতেও কন্যা গুলরুখ সম্পর্কে চুপ থেকেছেন। তিনি তাঁর অন্যান্য বেগম এবং সন্তানদের সম্পর্কে বইতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু গুলরুখের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকেন!
১৪৮৩ সালে গুলরুখের জন্ম হয়। বাবরনামায় বাবর গুলরুখ বেগমের বিবাহ সংক্রান্ত কোন তথ্য দেননি। তবে জানা যায় যে ফিরদৌস মাখানি গুলরুখ বেগমের বিবাহের আয়োজন করেন। গুলরুখ বেগমের বিবাহ হয় নূরউদ্দিন মহম্মদ মীর্জার সাথে। নূরউদ্দিন ছিলেন খাজা হাসান নক্সবন্দীর নাতি। তাঁরা ছিলেন বিখ্যাত খাজা নক্সবন্দী পরিবারের বংশ। গুলরুখ বেগম একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। যার নাম রাখা হয় সলিমা সুলতান। সলিমার প্রথমে বৈরাম খাঁর সাথে বিবাহ হয়। পরে বৈরাম খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর আকবরের সাথে বিবাহ হয়। সলিমার জন্মের পরে ১৫৩৯ সালে গুলরুখ বেগমের মৃত্যু হয়। তখন সলিমার বয়স মাত্র চার মাস।বাদশা বাবরের সন্তান হয়েও পিতামাতার মধ্যেকার তিক্ত সম্পর্কের কারণে বাবর বা গুলবদন বেগম কেউ কোথাও উল্লেখ করেননি শাহজাদী গুলরুখ বেগমের কথা।
৭। মাহে চুচাক বেগম
মাহে চুচাক বেগম ছিলেন বাদশা হুমায়ুনের স্ত্রী। তাঁর নামের অর্থ হলো “চাঁদের ফুল। অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী মহিলা। মাহে চুচাক বেগম একসময় কাবুলের নায়েব সুবেদারকে সরিয়ে দিয়ে স্বাধীনভাবে শাসন করতেন।
মাহে চুচাক বেগমের পিতামাতা সম্পর্কে কোথাও কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এটুকু জানা যায় যে তিনি ছিলেন বৈরাম অঘলান ও ফরিদুন খান কাবুলির বোন। হুমায়ুন ১৫৪৬সালে মাহে চুচাক বেগমকে বিবাহ করেন। তাঁদের পাঁচ সন্তান ছিল। দুই পুত্র মীর্জা হাকিম ও ফারুক ফল মীর্জা এবং তিন কন্যা বখত-উন-নিসা বেগম, সাকিনা বানু বেগম ও আমিনা বানু বেগম।
আকবরের রাজত্বের প্রথম দিকে যে কয়েকজন নারী তাঁকে সমস্যায় ফেলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মাহে চুচাক বেগম ছিলেন অন্যতম। হুমায়ুন ১৫৫৪ সালে মীর্জা হাকিমকে কাবুলের শাসক ঘোষণা করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র তিন বছর। ১৫৫৬ সালে আকবর মুনিম খানের তত্ত্বাবধানে এই নিযুক্তিকে নিশ্চিত করেন। মুনিম খান ১৫৬১ সালে মুঘল দরবারে নিযুক্ত হলে তাঁর পুত্র ঘানী তাঁর জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হন। মাহে চুচাক বেগম রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী ছিলেন। ফজিল বেগ ও তাঁর পুত্র আব্দুল ফৎ ঘানীকে অপছন্দ করতেন। তাঁরা মাহে চুচাক বেগমকে পরামর্শ দেয় যেন ঘানীর জন্য কাবুলের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘানী খান তাঁর হয়ে মাহে চুচাক বেগমের বিরুদ্ধে কথা বলার কাউকে না পেয়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পর ফজিল বেগকে ভকিল এবং আব্দুল ফৎ কে নায়েব নিযুক্ত করেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তাঁদের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট মাহে চুচাক বেগম দুজনকেই হত্যা করেন শাহ ওয়ালী নামক এক অভিজাতর পরামর্শ অনুসারে। আকবরের কানে এঘটণা পৌঁছালে তিনি সৈন্যবাহিনী সহ মুনিম খানকে কাবুলে পাঠান মাহে চুচাককে শায়েস্তা করার জন্য। কিন্তু জালালাবাদে মুনিম খান মাহে চুচাক বেগমের কাছে পরাজিত হন। মাহে চুচাক কাবুল শাসন করতেন তিনজন পরামর্শদাতার সাহায্যে। যাঁদের মধ্যে দুজনকে তিনি আগেই হত্যা করেন। পরে তৃতীয়জনকেও মাহে চুচাক দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেন। এরপর মাহে চুচাক হায়দার কাশিম কোহবুরকে ভকিল পদে নিযুক্ত করেন। এদিকে মুনিম খান লজ্জায় পালিয়ে যান এবং আকবরের সামনে আসতে দোনোমোনো করতে থাকেন।কারণ আকবর তাঁকে বড় দায়িত্ব দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি সেই সম্মান রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
সমসাময়িক সময়ে শাহ্ আবদুল মালী লাহোর জেল থেকে পালিয়ে কাবুলে এসে পৌঁছান। তিনি ছিলেন তারমেজের প্রখ্যাত সইদ পরিবারের সদস্য। মাহে চুচাক বেগম তাঁকে কাবুলে অভর্থনা জানান এবং কন্যা বখত-উন-নিসা বেগমের সাথে তাঁর বিবাহ দেন।
শাহ আবদুল মালী কিছুদিনের মধ্যেই মাহে চুচাক বেগমের আধিপত্য ও অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে ক্রমশ বিরক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি নিজের হাতে কাবুল দখলে উদ্যত হন। ১৫৬৪ সালে আবদুল মালী মাহে চুচাক বেগম এবং হায়দার কাশিমকে হত্যা করেন।
মাহে চুচাক বেগমের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা একসময় আকবরের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আকবর তাঁর শুরুর সময়ে তাঁর পিতার ফেলে যাওয়া সাম্রাজ্যকে যখন একত্র করতে ব্যস্ত তখন কাবুলে মাহে চুচাক বেগমের গতিবিধি তাঁর কাছে চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তব অল্প সময়েই আকবর মাহে চুচাক বেগমের আধিপত্য ও উচ্চাকাঙ্খা থেকে মুক্তি পান। ১৫৬৪ সালের ২৪শে মার্চ বালা হিসারে মাহে চুচাক বেগমের মৃত্যু হলেও, যেকয়েকজন নারী মুঘল সাম্রাজ্যে প্রভাবশালী ছিলেন তাঁদের মধ্যে মাহে চুচাক বেগম ছিলেন অন্যতম।
৮। বদর-উন-নিসা বেগম
দর-উন-নিসা বেগম ছিলেন তৈমুর বংশীয় মুঘল শাহজাদী। তাঁর নামের অর্থ “মহিলাদের মধ্যে পূর্ণ চাঁদ। ” বদর -উন -নিসা ছিলেন ঔরঙ্গজেবের তৃতীয় কন্যা। মুঘল শাহজাদী ছিলেন জ্ঞানী ও ধার্মিক। তিনি জনহিতকর কাজের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।
বদর-উন-নিসা বেগমের জন্ম হয় ১৭ই নভেম্বর ১৬৪৭ সালে। পিতা ঔরঙ্গজেব ও মা নবাব বাঈ। নবাব বাঈ ছিলেন কাশ্মীরের জারাল রাজপুত বংশজাত। বদর -উন -নিসা তাঁর পিতামাতার তৃতীয় সন্তান এবং মা নবাব বাঈ এর শেষ সন্তান। শাহজাদীর দুই বড় ভাই হলেন শাহজাদা মহম্মদ সুলতান এবং শাহজাদা মহম্মদ মুয়াজ্জম (যিনি পরে বাহাদুর শাহ প্রথম নামে দিল্লীর সিংহাসনে বসেন ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর)। বদর-উন-নিসার যখন জন্ম হয় তখন তাঁর পিতামহ শাহজাহানের শাসনকাল। ঔরঙ্গজেব ১৬৫৯ সালে রাজ্যাভিষেকের সময় বদর-উন-নিসাকে পুরস্কারস্বরূপ এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা উপহার দেন।
বদর-উন-নিসা বেগম সম্পর্কে বলা হয় তিনি তাঁর বাকী বোনদের থেকে বেশী শিক্ষিতা ছিলেন। শাহজাদী পবিত্র কুরান মুখস্থ করেছিলেন। তিনি প্রচুর ধর্মীয় বই পড়তেন। শাহজাদী যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর বিস্ময়কর চরিত্র, শান্ত স্বভাব এবং পাঠাভ্যাসের কারণে পিতা ঔরঙ্গজেব তাঁকে খুব স্নেহ করতেন।
কিন্তু এতকিছুর পরেও ঔরঙ্গজেবের সিংহাসন আরোহনের ১৩তম বর্ষে ৯ই এপ্রিল ১৬৭০ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে অবিবাহিতা অবস্থায় বদর-উন-নিসা বেগম দিল্লীতে মারা যান। ঔরঙ্গজেব তাঁর প্রিয় কন্যার এত স্বল্প বয়সে মৃত্যুর
কারণে গভীর শোক পেয়েছিলেন। বদর -উন-নিসা বেগম খুব কম সময় বেঁচেছিলেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, জনহিতকর কাজের জন্য মুঘল ইতিহাসে ছাপ রেখে যান। তবে বর্তমানে তাঁকে নিয়ে সেভাবে কোথাও কোন আলোচনা করা হয়না।
৯। বাহার বানু বেগম
বাহার বানু বেগম ছিলেন একজন মুঘল শাহজাদী। যাঁর নামের অর্থ হল “প্রস্ফুটিত নারী”। তিনি পিতার দিক থেকে ছিলেন মুঘল বংশজাত। অন্যদিকে মায়ের বা দিক থেকে ছিলেন রাজপুত।
বাহার বানু বেগমের জন্ম হয়েছিল ১৪ই সেপ্টেম্বর ১৫৯০ সালে। তখন তাঁর পিতামহ আকবরের রাজত্বকাল। জাহাঙ্গীরের রাজপুত স্ত্রী করমসির সন্তান হলেন বাহার বানু। করমসি বেগম ছিলেন রাঠোর পরিবারের রাজা কেশব দাসের কন্যা। যেদিন বাহার বানুর জন্ম হয় ঠিক সেইদিনই জাহাঙ্গীরের অপর রাজপুত স্ত্রী জগৎ গোঁসাইও এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। যাঁর নাম সুলতান বেগম। বাহার বানু ছিলেন জাহাঙ্গীরের ষষ্ঠ সন্তান এবং চতুর্থ কন্যা সন্তান। কিন্তু তাঁর মা করমসি বেগমের ছিলেন তিনি একমাত্র সন্তান।
১৬২৫ সালে প্রিন্স দানিয়েল মীর্জার জ্যেষ্ঠ পুত্র তাহমুরাস মীর্জা সম্রাট জাহাঙ্গীরকে শ্রদ্ধা প্রদান করতে দরবারে আসেন। তাহমুরাস ছিলেন মহামতি আকবরের পৌত্র। তাহমুরাসের পূর্বে হোসাং মীর্জাও দরবারে এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যান। জাহাঙ্গীর তাহমুরাস ও হোসাং মীর্জার সম্মানে বাহার বানুর সাথে তাহমুরাস মীর্জার বিবাহ দেন। অপর পক্ষে খসরু মীর্জার কন্যা হোশমান্দ বানু বেগমের সঙ্গে হোসাং মীর্জার বিবাহ দেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীর মারা যান ১৬২৭-এর ২৮শে অক্টোবর। তাঁর মৃত্যুর পরে বাহার বানুর সর্বকনিষ্ঠ ভাই শাহরিয়ার মীর্জা নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করে বসেন। ওদিকে খসরু মীর্জার পুত্র দাওর বকশ লাহোরে সিংহাসনে বসেন। শাহজাহান ১৬২৮এর ২৩শে জানুয়ারী সিংহাসনে আরোহন করেন। সিংহাসনে বসেই তিনি শাহরিয়ার, বাহার বানুর স্বামী তাহমুরাস মীর্জা, তাঁর ভাই হোসাং মীর্জা, দাওর বকশ ও গরসস্প মীর্জার মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রদান করেন।
বিবাহের তিন বছরের ভিতরেই বাহার বানু বেগম বিধবা হয়ে যান। পরবর্তী জীবন তিনি সৎ ভাই শাহজাহানের রাজত্বকালে কাটান। ১৬৫৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর ৬২ বছর বয়সে বাহার বানু বেগম আগ্রায় মারা যান। মৃত্যুর পর তাঁকে সিকান্দ্রায় মরিয়ম-উস-জামালীর সমাধি সৌধে সমাহিত করা হয়। বাহার বানু বেগম তাঁর মা করমসি বেগমের ন্যায় ইতিহাসের পাতায় প্রায় অনুল্লেখিতই থেকে যান আজীবন।
১০। কুদসিয়া বেগম
কুদসিয়া বেগম ছিলেন মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ তৃতীয়র বেগম এবং সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরের মা। তিনি ছিলেন আদতে একজন হিন্দু নর্তকী। তাঁর আসল নাম উধম বাঈ। পরে দরবারের নর্তকী থেকে তিনি সম্রাটের বেগম হলেন তাঁর আকর্ষণীয় চেহারা ও ব্যক্তিত্বের কারণে।
কুদসিয়া বেগম সম্পর্কে একটি তথ্যে বলা হয় তাঁর আসল নাম জয়নব। তাঁর পিতা সুজা-উদ-দৌলা তাঁকে খুব মঙ্গলজনক ভাবতেন। কারণ কুদসিয়ার জন্মের পর তিনি কোন যুদ্ধে হারেননি। ১৫-১৬ বছর বয়সে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। নবাব সুজা-উদ-দৌলা রাজনৈতিক লাভের জন্য তাঁকে মুঘল সম্রাটের সাথে বিবাহ দেন। পরে ১৭৭৪ সালে কুদসিয়া বেগম মারা গেলে তাঁকে কারবালায় সমাধি দেওয়া হয়। এই তথ্য একমাত্র তাজকিরাহ আলমের • কাছ থেকে পাওয়া যায়। এর সমর্থনে আর কোন তথ্য পাওয়া যায় না।
জনপ্রিয় তথ্যানুসারে কুদসিয়া বেগমের ১৭২৪ সালে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহর সাথে বিবাহ হয়েছিল। মহম্মদ শাহ ১৭ বছর বয়সে ১৭১৯ সালে সম্রাট হন। সম্রাট হওয়ার আগে ভবিষ্যতের শাসক হওয়ার জন্য যে যে জ্ঞান ও শিক্ষা গ্রহণ করা উচিৎ ছিল, তিনি তাঁর কিছুই করেননি। সম্রাট আফিম ও মদের নেশায় বুঁদ থাকতেন।
কুদসিয়া বেগম খুব দ্রুত সম্রাটের কাছের মানুষে পরিণত হন। মহম্মদ শাহ প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে তাঁকে মনসব প্রদান করেন। তাঁর নিজস্ব একটি অশ্বারোহী বাহিনী ছিল। ১৭৪৮ সালে মহম্মদ শাহ মারা গেলে কুদসিয়া বেগমের পুত্র আহমদ শাহ বাহাদুর সিংহাসনে বসেন। কিন্তু সমর্থন কম থাকায় আহমদ শাহ বাহাদুর ১৭৫৪ সালে সিংহাসন থেকে অপসারিত হন এবং ফিরোজ জং কর্তৃক বন্দী হন। কুদসিয়া বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তাঁর সাথে জাভেদ খানের সম্পর্ক ছিল। জাভেদ খানকে হত্যা করে আলীগঞ্জে দাফন করা হয়। অন্যদিকে আহমদ শাহ বাহাদুর বন্দী অবস্থায় মারা যান। তাঁর কোন সমাধি খুঁজে পাওয়া যায়না।
কুদসিয়া বেগম সুনহেরী মসজিদ, কুদসিয়া মসজিদ ও কুদসিয়া বাগ নির্মাণ করেছিলেন। সোনার গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি সুনহেরী মসজিদ নামে খ্যাত। এই মসজিদটি তিনি জাভেদ খানের জন্য তৈরী করেছিলেন। অন্যদিকে কুদসিয়া বাগ পুরনো দিল্লীর প্রান্তে একটি বৃহৎ উদ্যান। এটি ছিল একটি প্রাসাদ ও বাগান। বর্তমানে একটি সুন্দর মসজিদ, পশ্চিম গেট ও কয়েকটি কাঠামো বেঁচে আছে। কুদসিয়া বাগ পারসিক চার বাগ স্টাইলে নির্মিত। এখানকার কাঠামোগুলি নির্মাণে লাখোরি ইঁটের ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশাল প্রাচীর দিয়ে বাগটি ঘেরা ছিল। এখনো প্রাসাদের প্রবেশের মূল দরজা হাতী দরজা দেখতে পাওয়া যায়। কুদসিয়া বাগে একটি শাহী মসজিদ রয়েছে। মসজিদটি কুদসিয়া বেগম ও তাঁর কর্মচারীদের উপাসনালয় ছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় কুদসিয়া বাগ ও মসজিদটির ব্যাপক ক্ষতি হয়।অপরদিকে দরগাহ শাহ-ই মর্দান কমপ্লেক্সে একটি মসজিদ কুদসিয়া বেগম নির্মাণ করেন যা কুদসিয়া মসজিদ নামে পরিচিত। এই মসজিদটিও তিনি জাভেদ খানের সাহায্যে তৈরী করেছিলেন।
১৭৫৪ সালে কুদসিয়া বেগমের পুত্র সম্রাট আহমদ শাহ বাহাদুরের অপসারণের পর কুদসিয়া বেগম ও আহমদ শাহকে বন্দী করা হয়। কারাগারে বন্দী অবস্থায় ১৭৬৫সালে আগ্রায় কুদসিয়া বেগম মারা যান। কুদসিয়া বেগমের সমাধির কোন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁর পুত্রের মতোই। শুধুমাত্র কুদসিয়া বাগ, কুদসিয়া মসজিদে কুদসিয়া বেগমের স্মৃতি আজও বেঁচে আছে।
১১। আরাম বানু বেগম
আরাম বানু বেগম ছিলেন তৈমুর বংশীয় মুঘল শাহজাদী। পিতা আকবরের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান আ ছিলেন আরাম বানু। আর তাই তিনি ছিলেন পিতার খুব স্নেহের পাত্রী। তাঁর যাবতীয় ন্যায় অন্যায় দাবী তিনি মেনে নিতেন। মাত্র ৩৯ বছর তিনি বেঁচেছিলেন। কিন্তু যতদিন ছিলেন পিতা ও পিতার অবর্তমানে ভাই জাহাঙ্গীরের আমলে মুঘল হারেমে আরাম বানুর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল।
আরাম বানুর জন্ম হয়েছিল ১৫৮৪ সালের ২২শে ডিসেম্বর, ফতেহপুর সিক্রিতে। পিতা আকবর ও মা বিবি দৌলত শাদ। দৌলত শাদ ছিলেন আকবরের দ্বাদশতম বেগম। হারেমে তাঁর স্থান সেরকম উচ্চ ছিলনা, কারণ তিনি ছিলেন আকবরের চুক্তি ভিত্তিক স্ত্রী। কিন্তু আরাম বানু ছিলেন আকবরের খুব প্রিয় সন্তান। আরাম বানুর একজন বড় বোনও ছিল, তাঁর নাম শকরউন-নিসা বেগম।
আরাম বানু তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই জাহাঙ্গীরের প্রথম সন্তান সুলতান অল-নিসা বেগমের থেকে মাত্র দেড় বছরের বড় ছিলেন। আরাম বানুর জন্মের সময় আকবরের বয়স ছিল ৪২ বছর। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মচরিতে লিখেছেন তাঁর পিতা আকবরের আরাম বানুর প্রতি অতি গভীর স্নেহের কথা। আরাম বানু ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল ও বদ রাগী। আকবর তাঁর সমস্ত শোভন, অশোভন কাজ মেনে নিতেন। কোন বাধা দিতেন না। আরাম বানু তাঁর পিতার বিরোধিতা করতেও ভয় পেতেননা। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতেন এবং সরাসরি পিতা আকবরের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতেন যেকোনো বিষয়ে। আকবর তাঁকে এতোটাই ভালোবাসতেন যে তাঁকে লাডলী বলে ডাকতেন। অপরদিকে হারেমে তিনি পরিচিত ছিলেন প্রজাপতি বা তিতলি নামে।
জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মচরিতে লিখেছেন আকবর তাঁকে বলেছিলেন যে তাঁর অবর্তমানে তিনি যেন আরাম বানুর প্রতি যত্নবান থাকেন ও দয়ালু থাকেন, ঠিক তাঁর মতো। তিনি যেন আরাম বানুর সব ছোট বড় অপরাধ ক্ষমা করে দেন। অবশ্য আরাম বানু অপেক্ষা শকর-উন-নিসা বেগম জাহাঙ্গীরের বেশী কাছের ছিলেন।
আরাম বানু সম্পর্কে আকবরনামায় বা অন্যান্য মুঘল গ্রন্থে খুব বেশী বর্ণনা নেই। আরাম বানু কোনদিন বিবাহ করেননি। তিনি চাননি তাঁর স্বামী মুঘল সিংহাসনের দাবীদার হয়ে উঠুক। তিনি জানতেন আকবর তাঁর ভগ্নীপতিদ্বয় আবুল মালী ও শরিফুদ্দিনের কারণে বহু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এমনকি আরাম বানুর নিজের বোন শকর-উন-নিসার স্বামী ইব্রাহিম মীর্জাও নিজেকে সিংহাসনের দাবীদার হিসাবে উপস্থাপনা করেছিলেন। আবার অন্যদিকে আরাম বানু ছিলেন আকবরের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তাই আকবর ও চাননি আরাম বানুর বিবাহের পর তাঁর স্বামীও সিংহাসনের দাবীদার বলে নিজেকে ঘোষণা করুক এবং সিংহাসনের প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অংশগ্রহণ করুক। কিছু সূত্র থেকে জানা যায় যে আরাম বানুর মীর্জা আবদুর রহিমের সাথে বিবাহ হয়। তবে তুজুক -ই-জাহাঙ্গীরীতে বলা হয়েছে আরাম বানু জাহাঙ্গীরের শাসনকালে অবিবাহিতা অবস্থায় মারা যান।
আকবরের “লাডলী” আরাম বানু বেগম মারা যান ১৭ই জুন ১৬২৪ সালে মাত্র ৩৯বছর বয়সে। তাঁকে সিকান্দ্রায় তাঁর পিতার সমাধিস্থলেই সমাহিত করা হয়। আরাম বানু অত্যন্ত বদরাগী হলেও আকবরের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান ছিলেন। আকবর তাঁর সবকথা মেনে নিতেন। স্বল্পায়ু হলেও আরাম বানু সত্যিই ছিলেন একজন “প্রজাপতি” বা “তিতলি”।
১২। রুকাইয়া সুলতান
মধ্যযুগের উল্লেখযোগ্য নারীর কথা বললে আমাদের সাধারণত দুজন নারীর কথা সবার আগে মনে পড়ে, তাঁরা হলেন নূরজাহান ও মুমতাজ মহল। তাঁর বাইরে কেউ কেউ গুলবদন বেগম, জেবউন্নিসা বা যোধাবাঈ এর নাম শুনে থাকবে। কিন্তু আজ যাঁর কথা আলোচনা করবো তাঁকে আমরা সেইভাবে চিনিই না। যাঁর জন্য আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে তুর্কী সুলতানার আবাস নামক মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন, যিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের প্রধানা মহিষী, তিনি আর কেউ নন, তিনি রুকাইয়া সুলতান, আকবরের প্রথম বেগম এবং একমাত্র ভালোবাসা। আকবরের হারেমে ৫০০০ হাজারের বেশি মহিলা ছিল। তার মধ্যে প্রধান বেগম ছিলেন রুকাইয়া সুলতান, হরকা বাঈ বা মরিয়ম উস জামালি এবং সলিমা সুলতান। কিন্তু আকবরের জীবনে যদি কোন নারীর বিশাল প্রভাব থেকে থাকে, তিনি হলেন রুকাইয়া সুলতান, আর কেউ নন।
১৫৪২ সালে রুকাইয়ার জন্ম হয় মুঘল শাহজাদী রূপে। তিনি ছিলেন হিন্দল মীর্জার একমাত্র কন্যা। সেই সূত্রে বাবর ছিলেন তাঁর পিতামহ। জন্মসূত্রে রুকাইয়া ছিলেন তৈমুর বংশজাত। রুকাইয়া সেই যুগে যথেষ্ট শিক্ষিত মহিলা ছিলেন। তিনি ফারসী, আরবী, উর্দু ও চাঘতাই ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। পিতা হিন্দল মীর্জার আকস্মিক মৃত্যুর ফলে মাত্র নয় বছর বয়সে রুকাইয়ার বিবাহ হয় আকবরের সাথে যিনি ছিলেন সম্পর্কে রুকাইয়ার ভাই ও হুমায়ুনের পুত্র। ১৫৫১ সালের নভেম্বরে তাঁদের বিবাহ হয়। হুমায়ুন বিবাহের পর হিন্দল মীর্জার অর্থ, সামরিক বাহিনী ও গজনী আকবরকে প্রদান করেন, যা ছিল একসময় হিন্দল মীর্জার জাগির। আকবর এতদিন ছিলেন হিন্দল মীর্জার ভাইপো, এই বিবাহের পরে তিনি হলেন জামাতা।
রুকাইয়া পাদশাহ বেগম হন মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৫৫৬ সালে।রুকাইয়া সুলতান আজীবন সন্তানহীনা ছিলেন কিন্তু মুঘল হারেমে তাঁর এক নিজস্ব উচ্চ আসন ছিল। ১৫৯২ সালে খুররমের জন্মের পর আকবর ৬ দিনের শিশুকে রুকাইয়ার হাতে তুলে দেন যাতে ভবিষ্যতের সম্রাটের শিক্ষা দীক্ষায় কোন ফাঁক না থাকে। আকবর চেয়েছিলেন খুররমের প্রতিপালন যেন রুকাইয়া সুলতানের হাতেই হয়। আকবর শুধু শিক্ষা বা তেহজিব ই নয় আসলে তিনি রুকাইয়াকে মাতৃসুখ ও দিতে চেয়েছিলেন আর তাই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। খুররম ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত রুকাইয়ার কাছে থাকেন। এরপর তিনি পিতা জাহাঙ্গীরের কাছে ফিরে আসেন, তবু তাঁর শিক্ষার প্রতি ছিল রুকাইয়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। জাহাঙ্গীর স্বীকার করেছেন তিনি খুররমকে যতটা ভালোবাসতেন তার থেকে রুকাইয়া সুলতান হাজার গুণ বেশি ভালোবাসতেন। রুকাইয়া সুলতান যে শিক্ষা খুররমকে দিয়েছেন তা তিনি পিতা হয়েও দিতে পারতেন না।
আকবরের জীবনে রুকাইয়ার বিশাল প্রভাব ছিল। তিনি শুধু আকবরের প্রিয় বেগম ছিলেন না তিনি ছিলেন আকবরের বন্ধু, যার প্রভূত অধিকার ছিল আকবরের ওপরে। তাঁর স্থান আকবরের জীবনে সবচেয়ে ওপরে ছিল, তাঁর অন্যান্য বেগমদের তুলনায়। আকবর তাঁর জীবনে একজনকেই ভালোবেসেছিলেন তিনি হলেন রুকাইয়া সুলতান, তাঁর প্রথম স্ত্রী। আর তাই জীবনের মধ্যাহ্নে এসে নিঃসন্তান রুকাইয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ভবিষ্যৎ সম্রাট খুররমের দায়িত্ব, যিনি পরে শাহজাহান রূপে খ্যাত হন।
রুকাইয়া সুলতান শাসনকার্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। আকবরের সাথে জাহাঙ্গীরের সম্পর্ক খারাপ হলে রুকাইয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন এবং সিংহাসনে জাহাঙ্গীরের দাবীকে পোক্ত করেন। মেহেরউন্নিসাকে
মুঘল হারেমে নিরাপত্তা প্রদানে রুকাইয়া সুলতান বিশাল ভূমিকা পালন করেন। তাই মেহেরউন্নিসা থেকে নূরজাহান হওয়ার পরও রুকাইয়া সুলতানের সাথে তাঁর মধুর সম্পর্ক শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। রুকাইয়া নূরজাহানকে বাকী বেগমদের তুলনায় বেশি স্নেহ করতেন।
আকবরের মৃত্যুর ২১ বছর পর ৮৪ বছর বয়সে ১৬২৬ সালে রুকাইয়া সুলতান দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে কাবুলে বাগ-এ-বাবরে পিতা হিন্দল মীর্জার পাশে সমাধিস্থ করা হয়। শাহজাহান তাঁর সমাধি নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মচরিতে রুকাইয়া সুলতানকে তাঁর পিতা আকবরের প্রধানা মহিষী রূপে স্বীকার করে গেছেন। রুকাইয়া সুলতানের মুঘল হারেমে এবং আকবরের জীবনে অপরিসীম কর্তৃত্ব ছিল। আকবরের মৃত্যুর পরে জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের কাছ থেকে তিনি বিশেষ মর্যাদা পেয়ে এসেছেন। মুঘল হারেমের নারীদের মধ্যে খুব কমজনকে নিয়েই আলোচনা হয়। বাকীরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। রুকাইয়া সুলতান ও সেইরকমই এক নারী যিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেছেন কিন্তু মুঘল হরেমে ও বাদশা আকবরের জীবনে এই ব্যাক্তিত্বময়ী বেগমের অবদান অনস্বীকার্য।
১৩। উদয়পুরী মহল
উদয়পুরী মহল ছিলেন ঔরঙ্গজেবের বৃদ্ধবয়সের সবচেয়ে কাছের বেগম (উপপত্নী)। উদয়পুরী ছিলেন একজন জর্জিয়ান দাস কন্যা। প্রথমে তিনি দারাশিকোহর হারেমের অংশ ছিলেন, পরে ঔরঙ্গজেব দারাকে হত্যা করেন এবং উদয়পুরী ঔরঙ্গজেবের হারেমের অংশ হয়ে যান।
পরিব্রাজক মানুচি উদয়পুরী কে দারার হারেমের সদস্যা বলে উল্লেখ করেন। তিনি অল্পবয়সে অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন, এবং যে কারণে খুব কম সময়েই তিনি ঔরঙ্গজেবের প্রিয় হয়ে ওঠেন। ঔরঙ্গজেবের বয়স তখন পঞ্চাশের ঘর পার করেছে তখন উদয়পুরী বেগম একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। তাঁর নাম রাখা হয় কাম বখশ।
উদয়পুরী মহল সম্পর্কে একথাও প্রচলিত আছে যে তিনি ছিলেন রাজপুত রাজকন্যা, যাঁর সঙ্গে দারাশিকোহর বিয়ে হয়েছিল। সেই সময় মুঘল ও রাজপুতদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতির জন্য এরকম বিবাহের বহু উদাহরণ আছে। কিন্তু দারার মৃত্যুর পরে ঔরঙ্গজেবের উপপত্নী হয়ে কাটানো রাজপুত রাজকন্যার পক্ষে সম্ভব ছিল না, তাই মানুচির কথাই ঠিক। তিনি একজন দাস নর্তকী ছিলেন। এটা আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, কারণ কাম বখশের বিরুদ্ধে একটি চিঠিতে ঔরঙ্গজেব তাঁকে নর্তকী পুত্র বলে অভিহিত করছেন।
উদয়পুরী ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে মূলত রাজপুতানা ও দাক্ষিণাত্যে থেকেছেন। তিনি তাঁর সৌন্দর্য দিয়ে বহুবার কাম বখশকে বাঁচিয়েছিলেন ঔরঙ্গজেবের হাত থেকে। এমনকি উদয়পুরীর সুরার প্রতি টানও ঔরঙ্গজেব ক্ষমা করেন। জিনাত-উন-নিসা বেগমের পর উদয়পুরী মহল ই ছিলেন ঔরঙ্গজেবের আমলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাবশালী নারী।
ঔরঙ্গজেব যখন মারোয়ার অভিযান চালান অর্জিত সিং এর বিরুদ্ধে তখন তিনি নিজেই রাজপুতদের দ্বারা ঘেরাও হন। ঔরঙ্গজেবের প্রিয় উদয়পুরী মহল এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে রাণার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। রাণা তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। ওদিকে ঔরঙ্গজেব দুদিন খাবার ও জল ছাড়া ছিলেন। অবরোধ দীর্ঘতর হলে হয়তো ঔরঙ্গজেব না খেয়েই মারা যেতেন। রাণা ও ঔরঙ্গজেবের মধ্যে শর্তানুসারে চুক্তি হলে অবরোধ উঠে যায়। উদয়পুরী মহলকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কর্ণেল টড এই ঘটনার সমর্থনে বলেছিলেন মুঘল সিংহাসন প্রায় উল্টে যেতে বসেছিল ।
ঔরঙ্গজেব মৃত্যুর বিছানায় শুয়ে পুত্র কাম বখশকে চিঠিতে উদয়পুরী মহল সম্পর্কে লিখেছিলেন,”তোমার মা উদয়পুরী, যে আমার অসুস্থতার সময় আমার সঙ্গে ছিলেন, আমার মৃত্যুতে তাঁর (আমার) সাথে যেতে চান।” ঔরঙ্গজেব বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি মারা গেলে উদয়পুরী বেগম ও বেশীদিন বাঁচাবেন না। তাঁর আশঙ্কা সত্যি হয়েছিল। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে তিনি গভীর শোকে নিমজ্জিত হন এবং চারমাসের মধ্যে ১৭০৭ এর ৮ই জুন মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে মারা যান। বাহাদুর শাহ প্রথম দিল্লীর কুতুব মাজারের নিকট আল-আকতাবে উদয়পুরী বেগমকে সমাহিত করের।উদয়পুরী বেগমের মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয় একটি অধ্যায়ের। যার সূচনা হয়েছিল দারার হারেম থেকে আর শেষ হয়েছিল ঔরঙ্গজেবের বৃদ্ধবয়সের সবচেয়ে প্রিয় বেগম রূপে।
১৪। হযরত মহল
হযরত মহল ছিলেন মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহর কন্যা। সেইদিক থেকে তিনি ছিলেন একজন মুঘল শাহজাদী। অপরদিকে আহমদ শাহ দুররানির বেগম হওয়ার সুবাদে তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের দুররানি সাম্রাজ্যের প্রধানা সম্রাজ্ঞী।
হযরত মহলের জন্ম হয়েছিল ১৭৪১ সালের ৪ঠা নভেম্বর। পিতা সম্রাট মহম্মদ শাহ, যিনি মাত্র ১৭বছর বয়সে সম্রাট হন। কিন্তু রাজনীতির পরিবর্তে তিনি আফিম ও মদের নেশায় বুঁদ থাকতেন সবসময়। অপরদিকে হযরত মহলের মা হলেন সাহিবা মহল । মহম্মদ শাহর মৃত্যুর পরে তিনি দরবারী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। হযরত মহলের জোরপূর্বক বিবাহে তিনি অত্যন্ত মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন।
হযরত মহল ছিলেন অতুলনীয়া সুন্দরী। ছোট থেকেই তাঁর রূপের প্রশংসা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৭৪৮ সালে পিতা মহম্মদ শাহর মৃত্যু ও ১৭৫৬ সালে সৎ ভাই আহমদ শাহর বন্দী হওয়ার সুবাদে তৎকালীন মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর হযরত মহলকে বিবাহ করতে ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আলমগীর দ্বিতীয়র বয়স তখন ৬০বছর। অন্যদিকে হযরত মহল মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। আলমগীর হযরত মহলের মা সাহিবা মহল ও শাহজাদীর অভিভাবক সৎ মা বাদশা বেগমের ওপর প্রবল চাপ দিতে থাকেন। এমনকি হুমকি ও দেন হযরত মহলকে তাঁর হাতে তুলে দিতে হবে। শাহজাদী হযরত মৃত্যুকে মহল জানান ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ সম্রাটকে বিবাহ করার চেয়ে তিনি বেশি পছন্দ করেন। ফলে দ্বিতীয় আলমগীরের সব চেষ্টা বৃথা যায়। তিনি হযরত মহলকে বিয়ে করতে অসফল থাকেন।
১৭৫৭ সালের এপ্রিল মাস মুঘল সাম্রাজ্য তখন ক্রমশ দিল্লী ও তার আশপাশে সিমিত। বাকি জায়গা ক্রমণ মারাঠাদের হাতে চলে এসেছিল। ঠিক সেই সময় আফগান শাসক আহমদ পাত দুররানি দিল্লী এসে উপস্থিত হন। আহমদ শাহ দুররানিও হযরত মহলএর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিবাহ করতে চান। আহমদ পাতদুররানি ছিলেন হযরত মহলের দ্বিগুণ বয়সী। বাদশা বেগম রাজী ছিলেন না তাঁর কিশোরী সহ কন্যার সঙ্গে ৩৫ বছর বয়সী আফগান শাসকের বিয়ে দিতে। কিন্তু আহমদ শাহ দুররানি জোরপূর্বক ১৭৫৭ সালের ৫ই এপ্রিল হযরত মহল কে বিবাহ করেন। বাদশা বেগম বা সাহিবা মহল কেউই কোন বাধা দিতে পারেননি। হযরত মহলের তাঁর দ্বিগুণের বেশি বয়সী আহমদ শাহ দূররানির সঙ্গে বিবাহ হয়ে গেলো দিল্লীতে। বিবাহের পর আহমদ শাহ দুররানি নববধু কে নিয়ে আফগানিস্তানে ফিরে যান। আহমদ শাহ দুররানিকে আধুনিক আফগানিস্তানের জনক বলা হয়। ১৭৬১ সালে পাণিপথের তৃতীয় যুদ্ধে তিনি মারাঠাদের পরাজিত করেন। আহমদ শাহ দুররানি আহমদ শাহ আবদালি নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। হযরত মহলের বিবাহের পর আফগানিস্তানে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গি ছিলেন বাদশা বেগম, সাহিবা মহল এবং মুঘল হারেমের আরো কিছু মহিলা।
হযরত মহল বিবাহের পর দুররানি সাম্রাজ্যের প্রধানা বেগম ছিলেন ১৭৫৭ – ১৯৭৯ সাল হদি। ১৯৭১ সালে আহমদ শাহ দুররানি মারা যান। আনুমানিক ৩১-৩৩ বছর বয়সে হযরত মহলের মৃত্যু হয় আফগানিস্তানে। মৃত্যুর পরে দিল্লীতে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগার কাছে মহম্মদ শাহর সমাধির চত্তরে তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। হযরত মহলের বেড়ে ওঠা দিল্লীতে। মাঝে কিন্তু বছর আফগানিস্তানে কাটিয়ে মৃত্যুর পরে হযরত মহল পুনরায় দিল্লী আসেন শেষ আশ্রয়ের খোঁজে।
১৫। পাদশাহ বেগম সালিহা বানু
সালিহা বানু বেগম ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রধানা বেগম। তিনি বেঁচে থাকাকালীন নূরজাহান প্রধান বেগমের মর্যাদা পাননি। সালিহা বানু পাদশাহ বেগম এবং পাদশাহ মহল নামেও পরিচিত ছিলেন।
সালিহা বানু ছিলেন কাইম খানের কন্যা। কাইম খান ছিলেন মুঘল যুগের একজন অভিজাত।সালিহা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিতা ও উচ্চ সংস্কৃতি মনস্কা নারী। তিনি দরবারী ও হারেমের নিয়ম রীতিনীতি সম্পর্কে ছিলেন ওয়াকিবহাল। সালিহা বানুর ভাই তরবিয়াৎ খান উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। অপরদিকে তাঁর পিতামহ ছিলেন মুকিম খান।
জাহাঙ্গীর তাঁর সিংহাসন আরোহনের তিন বছরের মাথায় ১৬০৮ সালে সালিহা বানু বেগমকে বিবাহ করেন। বিবাহের সাথে সাথেই আব্দুর রহিমের পদমর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তিনি তরবিয়াৎ খান উপাধিতে ভূষিত হন। সালিহা বানু বিবাহের সম্রাজ্ঞী পরে প্রধানা বেগম বা পাদশাহ বেগমের স্বীকৃতি লাভ করেন। মুঘল রূপে তিনি পাদশাহ মহল নামেও পরিচিত ছিলেন। সালিহা বানু ছিলেন জাহাঙ্গীরের জীবনে এবং মুঘল হারেমে নূরজাহানের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন নূরজাহান অপেক্ষা সালিহা বানুই ছিলেন বেশী প্রভাবশালী। সালিহা বানু তাঁর ভাই আব্দুর রহিমের পুত্র মিয়ান জোহকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। কিন্তু মহাবৎ খাঁ তাঁকে ঝিলাম নদীর তীরে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু তখন সালিহা বানু জীবিত ছিলেন না। ফলে মহাবৎ খাঁ বেঁচে যান।
সালিহা বানু ১০ই জুন ১৬২০ সালে কাশ্মীরের শ্রীনগরে মারা যান। জ্যোতিষী জোটক রাই সালিহা বানুর মৃত্যুর বহু আগেই জাহাঙ্গীরের কুষ্ঠি বিচার করে হুবহু সালিহা বানুর মৃত্যুর ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন। জাহাঙ্গীর ভবিষ্যৎ বাণী মিলে যাওয়ায় যথেষ্ট অবাক হয়েছিলেন। সালিহা বানু বিবাহের পর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের পাদশাহ বেগম। সালিহা বানু নিঃসন্তান ছিলেন, তবু মুঘল হারেমে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ত্ব। কিন্তু আজ সালিহা বানু বেগমের কথা সেইভাবে কোথাও উচ্চারিত হয়না। আজ সবাই নূরজাহানের কথা জানে কিন্তু জাহাঙ্গীরের প্রথম পাদশাহ বেগমকে কেউ সেভাবে চেনেই না। তাই একসময় মুঘল হারেমে নূরজাহানের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী আজ ইতিহাসের পাতায় প্রায় অনুচ্চারিত।
১৭। কুলসুম জামানী বেগম
কু লসুম জামানী বেগম ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট আবু জাফর বাহাদুর শাহের কন্যা। তিনি ছিলেন খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার একনিষ্ঠ ভক্ত। সময় পেলেই তিনি দরগায় আসতেন।
কুলসুম জামানীর জন্ম হয় তৈমুর বংশীয় মুঘল শাহজাদী রূপে। শাহজাদী হওয়ার সুবাদে শৈশব কালে যথেষ্ট শৌখিনতার মধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। বাহাদুর শাহ জাফরের বাইশ সন্তানের মধ্যে কুলসুম ছিলেন অন্যতম। জাফরের সময় মুঘল জাঁকজমক অনেক কমে এসেছিল, তবু বাদশাহের কন্যা হওয়ার সুবাদে কুলসুমের প্রথম জীবন কেটেছিল রাজকীয় সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে। কুলসুম জামানী বেগমের বিবাহ হয়েছিল মীর্জা জিয়াউদ্দিনের সাথে।
মুঘল পরিবারে অন্ধকার নেমে আসে মহাবিদ্রোহে পরাজয়ের সাথে সাথেই। যেহেতু বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন বিদ্রোহীদের চয়ণ করা বিদ্রোহের প্রধান নেতা। তাই ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহীদের মনোবল চূর্ণ করার জন্য বাদশাহের পরিবারের প্রতি আরো নির্মম আচরণ করে। একদিনের নোটিশে কুলসুম জামানী পরিবার সহ লালকিলা ছাড়তে বাধ্য হন। তখন তাঁর কন্যা জয়নব জামালীর বয়স মাত্র দেড় বছর। জাফর কুলসুম কে আলাদা ভাবে চলে যেতে বলেন। কুলসুম যখন বাদশাহর কাছে এসে পৌঁছান তখন তিনি প্রার্থনা করছিলেন। তিনি বলেন তিনি কুলসুমকে ঈশ্বরের হাতে সমর্পণ করেছেন এবং তিনি চাননা কুলসুম তাঁদের সাথে যান। বাহাদুর শাহ ভেবেছিলেন তাঁদের সাথে থাকলে হয়তো তাঁর আদরের কন্যাকে আরও কষ্ট ভোগ করতে হবে।
ভোরবেলা কুলসুম জামানী, তাঁর স্বামী মীর্জা জিয়াউদ্দিন, বাদশাহের শ্যালক নবাব নুরমহল ও হাফিজা সুলতান রওনা দেওয়ার জন্য ষাঁড়ের গাড়ীতে উঠলেন লাল কেল্লাকে চিরবিদায় জানিয়ে। তখনও সম্পূর্ণ ভোর হয়নি, আকাশে ইতিউতি নক্ষত্র দেখা যাচ্ছিল। লালকেল্লা থেকে তাঁরা কুড়ালি গ্রামে এসে পৌঁছান। বিশ্রামের অবসরে কিছু সামান্য বাজরার রুটি ও বাটার মিল্ক খেয়ে সেখানেই রাত কাটান। কিন্তু পরের দিন কাছাকাছি অঞ্চল থেকে একদল লুটেরা তাঁদের যাবতীয় গহনা ও দামী কাপড় কেড়ে নেয়। তাঁদের কাছে তখন খাওয়ার মতো অর্থও ছিলনা। কুড়ালির এক বাসিন্দার সহযোগিতায় কুলসুম পরিবার সহ মীর ফয়জ আলীর বাসগৃহে উপস্থিত হন। মীর ফয়জ আলী ছিলেন শাহী হাকিম এবং বাদশাহর পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এই ঘোর অসময়ে তিনি কুলসুমের পরিবারকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেন। তিনি স্পষ্ট জানান তাঁদের আশ্রয় দিয়ে তিনি নিজের ক্ষতি করতে পারবেননা।
একসময় যাঁরা তাঁদের কাছের মানুষ ছিল আজ তাঁরাই শাহজাদীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। কুলসুম জামানী ব্রিটিশদের চোখ বাঁচিয়ে হায়দ্রাবাদ এসে পৌঁছান। এইসময় তাঁর স্বামী মীর্জা জিয়াউদ্দিন কোরাণ পড়িয়ে ও কালিগ্রাফিক টুকরো তৈরী করে দিন গুজরান করছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ প্রভাব হায়দ্রাবাদে বৃদ্ধি পেলে কুলসুম জামানী আবার হায়দ্রাবাদ ছাড়তে বাধ্য হন। বাহাদুর শাহ জাফরের আধ্যাত্মিক গুরু কালের মিয়া সাহেব চিশতী নিজামী ফখরি কুলসুম জামানীকে পরিবার সহ মক্কায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
পুনরায় দিল্লীতে ফিরে আসার পর ব্রিটিশ সরকার শাহী পরিবারের জন্য প্রতি মাসে দশটাকা পেনশন ধার্য করে। কুলসুম জামানী এক জায়গায় বলছেন “যারা তাঁর বাবার সাম্রাজ্য কেড়ে নিয়ছিল, আজ তারা দশটাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছে!”
মুঘল শাহজাদী থেকে বস্তিবাসী, কুলসুম জীবনের দুটো দিকই কাছ থেকে দেখেছিলেন। মুঘল বাদশার কন্যা যিনি কষ্ট, ক্ষুধার জ্বালা কাকে বলে তাই জানতেন না। তাঁকে খালি পায়ে হাঁটতে হয়েছে, কতো সময় না খেয়ে থাকতে হয়েছে। ব্রিটিশদের ভয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। পরিচিতরাও অসময়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। একসময় সারা ভারত যাঁর পিতৃপুরুষদের সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, তাঁকেই একসময় দশটাকা পেনশন দেওয়ার কথা হয়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, একসময়ের শাহজাদী পরে ফকির হয়ে হারিয়ে গেলেন জনারণ্যে।
***


Leave a Reply