মহাত্মা কবীর : জীবন ও দোঁহাবলি – পৃথ্বীরাজ সেন
মহাত্মা কবীর : জীবন ও দোঁহাবলি – পৃথ্বীরাজ সেন
প্রথম প্রকাশ : জুন, ২০১৮
প্রকাশক : শ্রীপ্রশান্ত চক্রবর্ত্তী
গিরিজা লাইব্রেরী
প্রচ্ছদ-শিল্পী : শ্রীসঞ্জয় মাইতি
.
উৎসর্গ
বিদগ্ধ চিন্তক ও গবেষক সুদীপ মজুমদারকে
আন্তরিক সারস্বত অভিনন্দনে
পৃথ্বীরাজ সেন
.
অবতরণিকা
মধ্যযুগকে আমরা অন্ধকার যুগ বলে থাকি। অথচ এই মধ্যযুগে ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক আকাশে এমন ক—টি নক্ষত্রের উদয় হয়েছে যাঁদের আলোকপ্রভায় আজও দশ দিক উদ্ভাসিত হয়ে আছে। মধ্যযুগীয় সংস্কারে আবদ্ধ না থেকে তাঁরা স্বাধীন জীবনের জয়গান গেয়েছেন। কোনো একটি ধর্মের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করেননি। তাঁরা চেয়েছেন পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের মনের বেদিতে যেন শুভবোধের অনির্বাণ দীপশিখা চির—প্রজ্জ্বলিত থাকে। এই তালিকাতে একদিকে আছেন অবিভক্ত বঙ্গদেশের অধ্যাত্ম যুগপুরুষ শ্রীশ্রীচৈতন্য। তিনি নাম, গান ও সংকীর্তনের মাধ্যমে সমাজের বুকে এক আধ্যাত্মিক সাম্যবাদের শুভ সূচনা করেন। ধনী—দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে তাঁকে অনুকরণ এবং অনুসরণ করেছিল। সংক্ষেপে বলা যেতে পারে চৈতন্যদেব বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে এক প্লাবন এনেছিলেন। বাংলার বৌদ্ধিক চেতনার আকাশকে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন রামধনুর সাতটি রঙে।
পশ্চিম ভারতে এলেন সাধিকা মীরাবাঈ। কৃষ্ণপ্রেমে হলেন মাতোয়ারা। পার্থিব জীবনের সমস্ত দুঃখ—জ্বালা ও যন্ত্রণাকে দূরে সরিয়ে রেখে এমন কিছু ভজন রচনা করলেন যার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করে আজও আমরা অনাস্বাদিত আনন্দে প্লাবিত হই। আজও সন্ধ্যা—সমাগমে যখন ভারতের মন্দিরে মন্দিরে মীরাবাঈ—এর ভজন গীত হয়, তখন সমস্ত পরিমণ্ডল জুড়ে এক অলৌকিক চেতনার জন্ম হয়।
এই তালিকাতে আছেন মহাত্মা নানক, তিনি হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের মধ্যে সংযুক্তি স্থাপনের জন্য সারা জীবন চেষ্টা করে গেছেন। এই দুটি ধর্মের মধ্যে যেসব মহৎ বৈশিষ্ট্যগুলি লুকিয়ে আছে তাদের একত্র করে নতুন একটি ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। মহাত্মা নানকের সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল ভারতবর্ষের বুকে যেন কোনোদিন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত না হয়!
মধ্যযুগের আর—এক মানবতাবাদী মহান সাধক হলেন সুরদাস। অসংখ্য ভজনের মাধ্যমে সুরদাস মানুষের মনের শুভ বোধকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। আজও ভারতবর্ষের অনেক গায়ক মহা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সহকারে সুরদাসের ভজন পরিবেশন করেন।
মধ্যযুগের আর এক মরমীয়া সাধক—কবির নাম হল কবীর। কবীর তাঁর জীবনব্যাপী সাধনায় মানুষকে সেই সত্যের পথ দেখিয়েছেন, যেখানে পৌঁছোতে পারলে মানুষের জীবন—উপত্যকা সহস্র সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে। কবীর তাঁর একাধিক দোঁহার মাধ্যমে মানুষের শুভবোধকে জাগ্রত করার চেষ্টা করে গেছেন। কালের যাত্রাপথে এই পৃথিবীর বুকে অনেক স্মরণযোগ্য পরিবর্তন ঘটে গেছে। মানুষের নৈতিকতার মান হয়েছে নিম্নগামী। মানুষ আজ বৈদ্যুতিন সভ্যতার কাছে নিজেকে বলি দিতে বাধ্য হয়েছে। তবু আজও আমরা পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সহকারে কবীরের অমূল্য দোঁহাগুলি পাঠ করে থাকি। প্রতিটি দোঁহার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত অর্থ আছে তা আমাদের হৃদয়—সরোবরে শতদলের মতো প্রস্ফুটিত হয়। যতদিন এই পৃথিবীতে মানব—সভ্যতা বর্তমান থাকবে, কবীরের মহান আকর্ষণ আমরা উপেক্ষা করতে পারব না।
গভীর পরিতাপের বিষয় বাংলা ভাষায় এখনও পর্যন্ত সেইভাবে মহাত্মা কবীর এবং তাঁর অনন্য দোঁহাগুলি সম্পর্কে কোনো প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। আপনাদের সকলের আশীর্বাদে এবং মাননীয় প্রকাশক শ্রীপ্রশান্ত চক্রবর্তীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি এই দুরূহ সারস্বত কাজে হাত দিয়েছি। যেহেতু কবীরের জীবন সম্পর্কে ইতিহাসনিষ্ঠ তথ্য পাওয়া খুব একটা সহজ নয়, তাই আমাকে অনেকাংশে জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কবীরের জীবনে এত বেশি ঘটনার ঘনঘটা যে, কোনটি সত্য আর কোনটি কল্পনা তা নির্ণয় করা খুব একটা সহজ নয়। তবে এর জন্য কবীরের মহান জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলি বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এই গ্রন্থের সবথেকে বড়ো আকর্ষণ হল কবীরের দোঁহা; তার গ্রন্থনা এবং অন্তর্নিহিত অর্থের সংযোজন। প্রতিটি দোঁহার শব্দগুলির মধ্যে যে অমৃতবার্তা লুকিয়ে আছে তা আমাদের হৃদয়কে প্রতি মুহূর্তে স্পর্শ করে। সমস্যা—বিদীর্ণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জর্জরিত এই পৃথিবীতে নেমে আসুক চিরশান্তির বাতাবরণ। মানুষ আবার সত্য, শিব এবং সুন্দরের পূজারী হয়ে উঠুক—এটিই হল আমাদের সকলের সমবেত প্রার্থনা।
আসুন, আমরা মহাত্মা কবীরের অলৌকিক জীবন কথা শুনে নিই এবং জেনে নিই কীভাবে তিনি তাঁর অসংখ্য দোঁহার মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার বিবর থেকে হাজার সূর্যের আলোয় আলোকিত উপত্যকায় নিয়ে যাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
ধন্যবাদান্তে
পৃথ্বীরাজ সেন।






Nice