ভূতসমগ্র – শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
ভূতসমগ্র – শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ – মার্ছ ২০২১, ফাল্গুন ১৪২৭
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – মৃণাল শীল
.
ফ্ল্যাপের লেখা
শৈলজানন্দের স্বভাবসিদ্ধ, সহজসুন্দর গল্প বলার ধরনটাই তাঁর গল্পের মূল আকর্ষণী শক্তি। গল্প বলার কৌশলই সাদামাঠা গল্পকে অসামান্য করে তোলে। জীবনের পাওয়া না-পাওয়ার বেদনামধুর কালচক্রে শুধু মানুষ নয়, অশরীরী বিদেহী আত্মারাও যেন তৃষিত চাতকের মতো ঘুরে বেড়ায়।
ভূত ও আত্মাদের ক্রিয়াকলাপ, প্ল্যানচেট এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টিই তাঁর গল্পের মূল বিষয়। আবার বয়স্কদের ভয়জনিত জীবন-ট্রাজেডির পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের চিন্তাহীন সুষুপ্তিও তাঁর গল্পে স্থান পেয়েছে।
লেখক তাঁর গল্পে দেখিয়েছেন, ভূতেরাও মানুষের উপকার করে প্রাণ বাঁচায় এবং বিপদে মানুষের পাশে এসেও দাঁড়ায়। শৈলজানন্দের গল্প সমাজসচেতনতা ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দরদ ও সহানুভূতির ছোঁয়ায় এক অদ্ভুত ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করে।
লেখক নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে গল্প বলে যান। এতে গল্পগুলি অন্য মাত্রা পায়। শৈলজানন্দের গল্পের এটি একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
.
সম্পাদকের কথা
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬) বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তার রচিত উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় ২০০ এবং গল্পের সংখ্যা ৪০০-র বেশি। বিষয় অনুসারে শৈলজানন্দের গল্পগুলিকে বিভিন্ন ভাগে সাজানো যায়—
যেমন কয়লাখনি অঞ্চলের গল্প, গ্রামজীবনভিত্তিক গল্প, নাগরিকজীবনভিত্তিক গল্প, প্রেম-ভালোবাসাভিত্তিক গল্প, অনুবাদ গল্প, পশুপক্ষীপ্রীতিনির্ভর গল্প, বারোয়ারি গল্প, ভৌতিক বা অলৌকিক গল্প প্রভৃতি। এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত ভৌতিক গল্পগুলির মধ্যে ১৮টি গল্প নির্বাচিত করেছি। গল্পের বিষয়বস্তু একই হওয়ায় কয়েকটি গল্প দেওয়া হল না। গল্পগুলি একই সঙ্গে শিশু-কিশোর ও বড়রা সমানভাবে উপভোগ করতে পারবেন।
সজনীকান্ত দাস তাঁর ‘আত্মস্মৃতি-তে লিখেছেন শৈলজানন্দ সম্পর্কে : তুচ্ছ আর গম্ভীর গল্প বলিয়া এমন আসর জমাইতে আর কাহাকেও দেখি নাই। ভূতের গল্প, সাপুড়ের গল্প, খুনের গল্প—তাহার অফুরন্ত স্টক ছিল। তিনি জীবনকে নাড়িয়া চাড়িয়া নানাভাবে দেখিয়াছিলেন।
শৈলজানন্দের এই স্বভাব-সিদ্ধ, সহজ-সুন্দর গল্প বলার ধরনটাই তাঁর যে কোনো গল্পেরই মূল আকর্ষণী শক্তি। গল্প বলার কৌশলেই নিতান্ত সাদামাঠা গল্পও অসামান্য হয়ে ওঠে, যেমন : সামতা গ্রামের ন্যাড়া নন্দী ভূত নামাত। গ্রামের লোকেরা সেটা বিশ্বাস করত। সে গ্রামের লোকেদের শেকড়বাকড়, মাদুলি প্রভৃতি দিত। বিনিময়ে টাকাকড়ি, ফলমূল পেত। এই নিয়ে ন্যাড়ার সঙ্গে তার দু’ ছেলে শশী ও কাশীর ঝগড়া হল এবং ছেলেরা একদিন ন্যাড়া নন্দীকে মেরে ফেলল। গ্রামজীবনের লোকাচার, বিশ্বাস, ভয়, কুসংস্কার প্রভৃতিকে ভিত্তি করে ‘ন্যাড়া নন্দী’ গল্পটি গড়ে উঠেছে এবং অদ্ভুত এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
‘প্রেতিনী’ গল্পে বাসন্তী মৃত্যুর পর প্রেতিনী হয়ে তাঁর স্বামী শ্রীপতিকে তাড়া করে বেড়ায় কারণ, বাসন্তী আত্মহত্যা করেছিল জলে ঝাঁপ দিয়ে। শ্রীপতি তাকে নৌকা করে এনেছিল জলে ঠেলে ফেলে দেবার জন্য কিন্তু পারেনি। বাসন্তী তা বুঝতে পেরে নিজেই জলে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়। অন্য নারীর (কিশোরী) প্রতি আসক্ত হয়ে নিজের স্ত্রীর প্রতি শ্রীপতি যে চরম লজ্জাকর, বেদনাদায়ক ও নিষ্ঠুর আচরণ করেছে, তার ফল সে হাতে হাতে পেয়েছে। নিজের পাপের ছায়া তাকে তাড়া করে ফিরেছে।
জীবনের পাওয়া না-পাওয়ার বেদনামধুর কালচক্রে শুধু মানুষ নয়, অশরীরী বিদেহী আত্মারাও যেন তৃষিত চাতকের মতো ঘুরে বেড়ায়। পুষ্প, তার স্বামী হরলাল এবং পুষ্পর রূপমুগ্ধ হরিশ তিনজনেই মৃত। এই হরলালের গুলিতেই হরিশ ও পুষ্প মারা গিয়েছিল এবং হরলালও আত্মহত্যা করেছিল। এদের আত্মারা কলকাতার একটা বড় বাড়িতে থাকে। হরিশ ও হরলাল মুখোমুখি হলেই ঝগড়া লেগে যায়। হরলালের আত্মা মানুষের রূপ ধরে রাস্তা থেকে সাবিত্রী, গায়ত্রী, অবিনাশ ও গল্পকথককে ধরে এনেছিল এ বাড়িতে বাস করার জন্য। সাবিত্রীর মুখ দিয়েই পুষ্পর জীবনের গল্প বর্ণিত হয়েছে। ভূত ও আত্মাদের ক্রিয়াকলাপ, প্ল্যানচেট প্রভৃতি এক অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে ‘জীবন নদীর তীরে’ গল্পটিতে।
ভৌতিক গল্পগুলির মধ্যে ‘ভয়’ একটি সেরা গল্প। রেলস্টেশনের ফটকরক্ষী রাম সিং-এর ঘরে সন্ধেবেলা খালাসিদের মজলিশে রঞ্জন মজার মজার গল্প করে। সে নাকি ভূত দেখেছে। ভূতে তার ভয় নেই। রাম সিং হঠাৎ মারা যায় এবং রঞ্জন রাম সিং-এর চাকরিটা পায়। সে তার সাত বছরের নাতনি কালীকে নিয়ে আসে। কালি শুধু খায়দায় আর ঘুমোয়। রঞ্জনের ভয় লাগে। মনে হয় রাম সিং যেন আশেপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রামে কলেরা দেখা দিলে শহর থেকে ডাক্তার আসেন কিন্তু ডাক্তার নিজেই কলেরায় মারা যান। গ্রামের লোকেরা মাঝরাতে ডাক্তারের মৃতদেহটা রঞ্জনের বাড়ির সামনে ফেলে রেখে চলে যায়। তারপর রঞ্জনও সেই মৃতদেহের মুখের ঢাকা খুলে দেখতে গিয়ে আতঙ্কে হার্টফেল করে মারা গেল। নাতনি কালী তখনও ঘুমোচ্ছে। যে রঞ্জন ভূতের গল্প বলত এবং কালী শুধু ঘুমোন বলে তাঁর মৃত্যু কামনা করত সে নিজেই ভৌতিক আতঙ্কে মারা গেল। বয়স্কের ভয়জনিত জীবন-ট্রাজেডির পাশাপাশি বালিকার চিত্তাহীন সুবুপ্তি গল্পটিতে একটি বৈপরীত্যের চমক সৃষ্টি করেছে।
খাবারের দোকানকে কেন্দ্র করে অদ্ভূত স্বাদের একটি গল্প ‘যবনিকা’ কানা কাশীনাথ ও কালা শশীনাথ দু’বন্ধুর মিষ্টির দোকান। তারা পরস্পরকে হিংসা ও ঈর্ষা করে এবং একে অপরের ক্ষতির চিন্তা করে। শশীনাথ কাশীনাথের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকায় গুঁড়ো দুধের পেটি কিনল, তারপর বেশি দামে বেচে লাভ করল। কাশীনাথও ভেজাল মিল্ক ক্রিমের টিন বেচতে চাইল শশীকে, কিন্তু শশী কিনল না। শশী সব বুঝেতে পেরেছিল। কাশী ভয় পেয়ে রিভলবার নিয়ে শশীকে খুন করতে যাচ্ছিল কিন্তু পথে কাশী নিজেই অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল। তারপর কাশীর প্রেতাত্মা শশীর কাছে গিয়ে সব দোষ স্বীকার করল। মৃত্যুর পর প্রেতাত্মার মাধ্যমেই মনোমালিন্য, হিংসা-ঈর্ষার যবনিকাপাত হয়েছে।
‘ভয়ঙ্কর’ গল্পটি রেলের ফটকরক্ষী সুন্দর সিং-এর জীবন থেকে নেওয়া সুন্দর সিং তার বিহারের সংসার ছেড়ে মাধবপুর স্টেশনে পড়ে থাকে। মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠায়। এই সুন্দরের কাছেই থাকে দীননাথ। মরার আগে সুন্দর সিং তার সবকিছু দিয়ে যায় দীননাথকে। সুন্দর সিং মারা গেলেও দীননাথ তাকে ভুলতে পারে না। সবসময় মনে হয় সুন্দর সিং যেন তার পাশেই আছে। রাতের বেলাতেও সে যেন চারিদিকে ঘুরে বেড়ায়। শ্মশানে যেতেও তার ভয় করে না। তার বিশ্বাস সুন্দর একদিন ফিরে আসবেই। সব মিলে চমৎকার ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এই গল্পে।
লেখক তাঁর ভৌতিক গল্পগুলিতে দেখিয়েছেন ভূতেরাও মানুষের উপকার করে, মানুষের প্রাণ বাঁচায়, পূর্বঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং বিপদে মানুষের পাশেও দাঁড়ায়।
‘ভূতুড়ে বই’ গল্পে বক্তা একটা বই কিনতে বাধ্য হন কিন্তু তিনি বইটা রাস্তায় ফেলে দিলেন। হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলে এসে বইটা আবার তাঁর হাতে দিয়ে চলে গেল। বক্তা বইটাকে একটা বাড়ির পাঁচিলের ওপারে ফেলে দিয়ে হাঁটতে লাগলেন কিন্তু একটা মেয়ে এসে বইটা আবার তাঁকে ফেরত দিয়ে গেল। তখন বাধ্য হয়ে তিনি বইটাকে ঘরে এনে বইয়ের তাকে অন্য বইয়ের মধ্যে রেখে দিলেন। রাত্রে এ ঘরে এসে দেখলেন বইটা টেবিলের ওপর খোলা পড়ে আছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন এইমাত্র পড়ছিল বইটা। বক্তা দেখলেন একটা লাইনের ওপর লাল কালিতে দাগ টানা। সেখানে লেখা ছিল…. জীবনে কারও ধার বাকী রেখ না… জীবনে মৃত্যুর কোন স্থিরতা নেই, যে কোন মুহূর্তেই তুমি মরিয়া যাইতে পারো। তাই—’
বক্তার মনে পড়ল, বন্ধু অজিতের কাছে তাঁর পাঁচ টাকা ঋণ রয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বক্তা ছুটলেন অজিতের বাড়ি। অজিত অসুস্থ। টাকার জন্য ওষুধ কেনা যাচ্ছে না। বক্তা অজিতের দিদির হাতে পাঁচ টাকা দিয়ে এলেন। অজিত সুস্থ হয়ে গেল। বক্তা ভাবলেন এও সম্ভব? এটা কী করে হল? তাহলে কি বইটা…? কিন্তু লেখক বিশ্বাস করতেন এটাও সম্ভব, এরা উপকারী ভূত। লেখক নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে গল্প বলে যান, এতে ঘটনাগুলি অন্য মাত্রা পায়। শৈলজানন্দের গল্পের এটি একটি বৈশিষ্ট্য। ‘অসম্ভব গল্পে ভূতের ভয়ে বক্তা অস্থির। ভূতেরা তাদের রান্না করা খাবার খেয়ে নিচ্ছে, একদণ্ডও টিকতে দিচ্ছে না। এমনকী, বক্তার ভাই অরুণও ভূতের হাতে মারা গেল। বক্তা জানতে পারলেন ভূতের নাম গোপীনাথ। যারা ভূত নামাত, ভূতের মোকাবিলা করত তারাও গোপীনাথের সঙ্গে পেরে উঠছিল না। গোপীনাথ মরে ভূত হয়ে গেলেও স্ত্রীকে কিছু বলত না, কারণ বক্তার বন্ধু হেসে বললে, ‘না, হে! সে তার স্ত্রীকে বড় ভালবাসত যে, তাই সে তার অনিষ্ট কিছু করেনি।’ অদ্ভুত গল্প। লেখক দেখিয়েছেন, ভূতেদের মনেও প্রেম-ভালোবাসা আছে।
লেখক কয়লাকুঠিতে কাজ করেছেন। কয়লাখনির দৈনন্দিন জীবন, ঘটনা-দুর্ঘটনা সম্বন্ধে তিনি পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন। কয়লাখনির খাদের নিচে কত শ্রমিকই তো কয়লা চাপা পড়ে। খনিতে জল ঢুকে মারা যায়। তাদের আত্মারা সেই অন্ধকার খাদেই বাস করে। খনির মালিক ও ম্যানেজার শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে না। তাই সাঁওতাল শ্রমিক টুইল্যা মরার পর ভূত হয়ে ম্যানেজারকে মেরে প্রতিশোধ নেয়। ‘ভুতুড়ে খাদ’ গল্পটি কয়লাখনিভিত্তিক একটি সার্থক ভূতের গল্প।
‘কি?’ গল্পেও লেখক বক্তা হয়ে ঘটনা বর্ণনা করছেন। বস্তা গিয়েছিলেন কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ আনতে। কিন্তু সন্ধে হয়ে গেল ফিরতে ফিরতে। গ্রামের পথ, ঘন অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। শ্মশানের ওপর দিয়ে যাবার সময় বক্তা বুঝলেন কেউ একজন তার পাশে আছে। ভাবলেন, এ বোধহয় গ্রামেরই জটি-বুড়ি। বক্তা তাকে ধরে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। হঠাৎ মনে হল এ তো জটি-বুড়ি নয়, কোন যুবতীর শরীর। বক্তা তাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘তুই গেছিস তো পাগলি?’ জবাব এল, ‘হ্যাঁ, তুমি যাও।’ বা চমকে উঠলেন। এ তো তাঁর স্ত্রীর কণ্ঠস্বর, যে ক’দিন আগেই মারা গেছে। তারপর গ্রামে এসে শুনলেন জটি-পাগলি বেঁচে আছে। তাহলে গত রাত্রে কি তার স্ত্রী ভূত হয়ে তার সঙ্গে এসেছিল? লেখক বলতে চেয়েছেন বক্তার স্ত্রীই ভূত হয়ে তাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
সামান্য একটা ফোনেই আনন্দের জীবনে বিপদ নেমে এল। ফোন এল, মাসির অসুখ।-আনন্দ মাসিকে দেখতে গেল। একটা অন্ধকার ঘরে মুখ ঢেকে একজন শুয়ে ছিল। মাসি ভেবে মুখের ঢাকা খুলতেই দেখল একজন স্ত্রীলোক গলাকাটা অবস্থায় পড়ে আছে। পুলিশ আনন্দকে ধরে নিয়ে গেল; কিন্তু আনন্দের বন্ধু পুলিশ অফিসার মুকুন্দই আসল খুনিকে ধরে আনন্দকে বাঁচাল। জানল মাসি অন্য জায়গায় আছে, ভালো আছে, কোনো অসুখ করেনি। তাহলে ফোনটা করল কে? কে তাকে বিপদে ফেললো, মানুষ না ভূত?
‘ভীষণ কাণ্ড’ গল্পে লেখক আনন্দকে ভীষণ একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করিয়েও ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেননি।
‘কয়লাকুঠির’ গল্প শুনিয়েছেন লেখক ‘প্রেতপুরী’ রচনাটির মধ্যে কয়লাখাদের মধ্যে কয়লার চাঙড় ধসে পড়ে বা জল ঢুকে যায়। এতে খাদের মধ্যে কর্মরত গরিব শ্রমিকেরা মারা যায়। এদের আত্মারা এইসব খাদের মধ্যে থাকে। গোটা খাদটাই একটা প্রেতপুরী হয়ে ওঠে। শৈলজানন্দের সমাজসচেতনতা এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দরদ ও সহানুভূতির ছোঁয়া আমরা পাই এই গল্পে। একটা অদ্ভুত ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে গল্পটির কাহিনিতে, যা আমাদের মনে এক আশ্চর্য অনুভূতির ঢেউ তোলে।
শৈলজানন্দ বিশ্বাস করতেন, আমরা যে জগত্টাকে দেখতে পাচ্ছি তা যেমন সত্য, আবার যা আমরা দেখতে পাচ্ছি না তাও তেমনই সত্য। তাঁর গল্পের ভূত বা আত্মারাও আমাদের সাহায্য করে, বিপদ থেকে রক্ষা করে। ফেলে যাওয়া জীবনের প্রতি টান, সংসারের প্রতি মায়া থেকেই তিনি লিখেছেন অদ্ভুত সুন্দর গল্প ‘ঘরোয়া ভূত’। এই গল্পে তিনি গ্রামবাংলার দু’টি ভূতের গল্প বলেছেন। প্রথম গল্পে শ্যাম কবিরাজ রুগি দেখে রাত্রে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় বটগাছের তলায় দেখা হল রতন স্যাকরার সঙ্গে। আসলে সে ছিল রতনের ভূত। রতন ২০-২৫ দিন আগেই মারা গিয়েছিল। তাছাড়া রতন এই শ্যাম কবিরাজেরই ওষুধ খেয়েছিল কিন্তু বাঁচেনি। কবিরাজ তাকে দেখে ভয়ে রাম-রাম নাম করতে করতে ছুটলেন এবং কোনোক্রমে সে-যাত্রা তিনি রক্ষা পেলেন।
২য় গল্পে পিসেমশাই-এর অসুখ শুনে বক্তা তাঁকে দেখতে চললেন দূরের এক গ্রামে। পথে পিসেমশাইকে দেখে বক্তা অবাক হয়ে গেলেন। পিসেমশাই বললেন তাঁর কিছু হয়নি আসলে পিসিমারই শরীর খারাপ। তাই তিনি ডাক্তার আনতে যাচ্ছেন। বাড়ি গিয়ে বক্তা শুনলেন আগের দিনই পিসেমশাই মারা গেছেন। পিসিমাও খুব অসুস্থ, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। যাই হোক, বক্তা পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎ কে যেন লেপের মধ্যে তাঁকে ঠেলে জাগিয়ে দিল। বক্তা ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন এবং পাশের ঘরে গিয়ে দেখলেন পিসিমার জ্ঞান ফিরেছে এবং জল খেতে চাইছেন। এই সময় বক্তাকে কে জাগিয়ে দিল তা তিনি ভালোই বুঝতে পারলেন। অদ্ভুত দক্ষতায় লেখক ভৌতিক পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সাংসারিক জীবনের ভালোবাসা, মায়ামমতা ও স্নেহ-প্রীতির ছবি এঁকেছেন।
‘কে তুমি?’ গল্পে শৈলজানন্দ দেখিয়েছেন কীভাবে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা এবং সামাজিক অনুশাসনের বন্ধনে নারীজীবন তিলে-তিলে নিঃশেষ হয়ে যায়। সুন্দরী, অল্পবয়সি বিধবা সুবী মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আমগাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করল। সুবী-র লাশ কেউ পোড়াল না। শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলল সুবীকে। সুবী-র মাও রেললাইনে মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করল। এখন সুবী-র আত্মা সেই আমগাছটার চারপাশে, পোড়ো বাড়িটার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। লেখক দেখিয়েছেন মারা গেলেও মানুষের আত্মার মুক্তি সহজে হয় না।
‘আতঙ্ক’ গল্পে কোনো ভূত বা আত্মা নেই কিন্তু এক অদ্ভূত মৃত্যুভর আছে। প্রকাশ ব্যাধি ও মৃত্যুকে ভয় করত না। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে একে একে তার বাবা, দাদা, ভাইপো মারা গেল। তখন সে একটা বস্তিতে ঘর নিল স্ত্রী নীলিমাকে নিয়ে, কিন্তু নীলিমাও কলেরায় মারা গেল। বস্তিতে দু’একজন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এইসব দেখে প্রকাশও ভরে ভয়ে থাকে। যদি সে এই রোগে মারা যায়? বক্তা লক্ষ্য করলেন প্রকাশের চোখেমুখে মৃত্যুভয়ের আতঙ্ক। একদিকে বাঁচার ইচ্ছা অন্যদিকে মৃত্যুভয় এই দুইয়ে মিলে গল্পটিকে রসোত্তীর্ণ করেছে।
শৈলজানন্দের গল্পের একটি বিশেষ চরিত্র ঝুঁকোবাবু। সত্তর বছর বয়স। ঝুঁকে ঝুঁকে চলেন, তাই নাম ঝুঁকোবাবু। তিনি ছোটদের গল্প বলেন, ভূতের গল্প। অনন্ত বসাক বাড়িওলা। ওপরে থাকেন। কাশীশ্বর বিদ্যারত্নমশাই ব্রাহ্মণ, তান্ত্রিক ও ভাড়াটে। নিচের তলায় থাকেন। ভাড়া দেন না। কিন্তু অনন্ত বসাকের ঘরেই ঢিল পড়ে। সবাই ভাবে ভূতে ঢিল মারছে। পুলিশও কিছু করতে পারে না। শেষে জানা গেল ভূত নয় অনন্ত বসাকের ছেলের বউও নয়, যে গলায় দড়ি দিয়ে মরেছিল; আসলে ভূত হল কাশীশ্বর বিদ্যারত্নমশাই। সেই ঢিল ছোড়ে। আসলে মরা ভূত নয়, জ্যান্ত ভূত। হাসি, মজা, নানারকম ঘটনা মিলিয়ে ঝুঁকোবাবু বেশ সুন্দর কাহিনি শুনিয়েছেন ‘ভূতের গল্প’ নামক গল্পটিতে।
‘সত্যি নয়’ একটি রূপকথার গল্প। রাজা, রানি, রাজপুত্র, রাজকন্যা, কোটালপুত্রের কাহিনী ছাড়াও দৈত্যের দেশের ঘটনাও আছে। অনেক আশ্চর্য ঘটনা, অলৌকিক ঘটনার মোড়কে গল্পটি বেশ আকর্ষণীয়।
‘নমস্কার’ গল্পে বক্তা ট্রেনে চেপে নতুন কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। যে কাজে পদে পদে মৃত্যুভয় আছে কারণ, এর আগে আরও কয়েকজন এই চাকরিতে এসে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেননি। ট্রেনে একটা লম্বা রোগা লোকের সঙ্গে দেখা হল। মুখটা যার ছাগলের মতো। বক্তা লোকটাকে দেখে ভয়ে শিউরে উঠলেন। বক্তা লোকটাকে বললেন যে তাঁর কোনো উপায় নেই, বাড়িতে বাবা, মা, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, ভাগনা-ভাগনি সবাই আছে। বড় সংসার। তাই তিনি কাজটা নিচ্ছেন। তিনি ঐ লোকটাকে বিড়ি দেশলাই দিলেন। লোকটা ট্রেন থেকে নেমে গেল। দেশলাইটাও ফেরত দিল না।
কাজে যোগ দিয়েই বক্তা বিপদে পড়লেন। রাত্রিবেলা শিউশরণ ও রামলাল তাকে বেঁধে টাকাকড়ি লুঠ করে হত্যা করতে এল। কিন্তু হঠাৎ একটা লোক এসে এদের হাত থেকে বক্তাকে বাঁচাল। পুলিশ এসে বক্তাকে উদ্ধার করল, টাকাকড়িও খোয়া গেল না। শিউশরণ বলল একটা লম্বা ভূত এসে তাদের খুব মেরেছে। ঘর খুঁজতে খুঁজতে একটা দেশলাই পাওয়া গেল। তখন বক্তা বুঝতে পারলেন কে তাকে বাঁচিয়েছে। তিনি তাকে নমস্কার জানালেন। ট্রেনের সেই লম্বা ভূতটাই তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছে। বক্তার সাংসারিক অবস্থা শুনে ভূতটাও কষ্ট পেয়েছিল, কারণ সে বলেছিল তারও একটা ছেলে আছে কিন্তু এমন পাজি…। হয়তো ছেলের জন্যই সে মরে গেছে। তাই সে বক্তার প্রাণ বাঁচিয়ে নিজের আত্মার শান্তি খুঁজতে চেয়েছে। ভূত হলেও সে মানবিকতা ও সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের মতোই আচরণ করেছে।
শৈলজানন্দের যে কোনো গল্পের ভাষা এত সহজ, সরল, মিষ্টিমধুর এবং গতিশীল যে, মনেই হয় না তিনি গল্প লিখছেন। তাঁর গল্প মূলত চরিত্রপ্রধান এবং একের পর এক ঘটনার আবর্তে চরিত্রগুলি আলোকিত হয়ে ওঠে। তিনি কোনো চরিত্রের উপরই রং চড়ান না বা নিজের কোনো উদ্দেশ্য আরোপ করেন না। সংকলনের গল্পগুলি পড়লেই পাঠকেরা এই সত্য অনুধাবন করতে পারবেন।
শৈলজানন্দের বিশাল গল্পসম্ভার থেকে ভূত বা অলৌকিক গল্পগুলি খুঁজে বের করা, গল্পগুলিকে ভালোভাবে পাঠ করে তথ্যসংগ্রহ, প্রকাশকাল প্রভৃতি প্রকাশ করা খুব সহজ নয়। তবু লেখকের দৌহিত্র মিলন মুখোপাধ্যায়ের একান্ত ইচ্ছায় এই কাজটি সুসম্পন্ন করেছি। রচনাগুলিতে লেখকের ব্যবহৃত ভাষা ও বানানবিধি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
তাছাড়া বাংলার অন্যতম সেরা সারস্বত প্রতিষ্ঠান ‘দে’জ পাবলিশিং’-এর অন্যতম কর্ণধার ও সাহিত্যপ্রেমী অপু দে মহাশয়ের আন্তরিক সহযোগিতা না পেলে বাংলার এই মহান কথাসাহিত্যিকের গল্পগুলি প্রকাশ পেত না। এজন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
আশা করি, বাংলার সর্বস্তরের পাঠক-পাঠিকা, ছাত্র-ছাত্রী ও গবেষকেরা সংকলনটি পাঠ করে উপকৃত হবেন।
নমস্কারান্তে—
বিনীত—
বুদ্ধদেব দাশ
.
লেখক পরিচিতি
জন্ম ১৯০১ সালের ১৯ মার্চ বীরভূমের রূপসীপুর গ্রামে। শৈশবেই মাতৃহীন বলে তাঁর দাদামশাই তাঁকে নিজের কাছে বর্ধমানে নিয়ে আসেন। এইখানেই তাঁর নজরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে যান। অতঃপর ডাক্তারি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে সাহিত্যকর্মে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ। সাহিত্যজগতে তাঁর লেখাও বেরোতে শুরু করে। সে লেখায় কয়লাখনির শ্রমিকদের দুর্দশা ও অত্যাচারের কাহিনি প্রকাশিত হয়। খনির শ্রমিকদের নিয়ে লেখায় তিনিই হলেন পথিকৃৎ। এই ভাবেই সাহিত্যসমাজে তাঁর প্রবেশাধিকার ঘটে। কল্লোল, কালিকলম পত্রিকার সম্পাদনাও করেন।
আবার চিত্র পরিচালনায়ও তাঁর ঝোঁক দেখতে পাই। তাঁর পরিচালনায় নন্দিনী, মানে না মানা, শহর থেকে দূরে ইত্যাদি চলচ্চিত্র প্রভূত সাফল্য অর্জন করে।
তাঁর অমূল্য স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে।’
১৯৭৬ সালের ২ জানুয়ারি তিনি পরলোকযাত্রা করেন। তবে রেখে গেছেন মণিমুক্তার মতো শতাধিক গল্প ও উপন্যাস।


Good