• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

ফ্যাসিবাদ – অনিল বিশ্বাস

লাইব্রেরি » অনিল বিশ্বাস » ফ্যাসিবাদ – অনিল বিশ্বাস
ফ্যাসিবাদ - অনিল বিশ্বাস
লেখক: অনিল বিশ্বাসবইয়ের ধরন: প্রবন্ধ ও গবেষণা
Current Status
Not Enrolled
Price
Free
Get Started
Log In to Enroll

সূচিপত্র

  1. পুঁজিবাদের সঙ্কট
  2. সঙ্কট মোকাবিলায় ফ্যাসিবাদী পথে
  3. ইতালি
  4. জার্মানি
  5. সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি ও ফ্যাসিবাদ
  6. যুদ্ধপর্ব
  7. ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম ও স্তালিন
  8. যুদ্ধের পর
  9. ইন্দোনেশিয়া ও চিলির অভিজ্ঞতা
  10. নয়া ফ্যাসিবাদ
  11. জার্মানির নয়া নাৎসিরা
  12. সরকারে নয়া ফ্যাসিবাদীরা
  13. চাই সচেতনতা

ফ্যাসিবাদ – অনিল বিশ্বাস

এন.বি.এ. – ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড

প্রথম মুদ্রণ : ১০ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫
পরিসংশোধিত দ্বিতীয় মুদ্রণ : ১লা মে, ২০০৫
 দশম মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর, ২০১৩
একাদশ মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর, ২০১৮

প্রকাশক : অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড
মুদ্রক : জয়ন্ত শীল
গণশক্তি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেড
৩৩ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট
কলকাতা-৭০০ ০১৬

.

ভূমিকা

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৬০তম বার্ষিকী পৃথিবী জুড়ে পালিত হচ্ছে। ৯ই মে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের দিন হিসেবে ৬০ বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ পরিচালনা করে প্রধান ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের ইতিহাসে অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মিত্রশক্তি গঠন করে, তার অন্যতম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর পৃথিবীর শান্তি ও স্বাধীনতাকামী মানুষের পয়লা নম্বরের দুশমনে পরিণত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর বিশ্ব কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ গত দেড় দশক ধরে আরও হিংস্র আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর দেশে দেশে নয়া-ফ্যাসিবাদী শক্তিও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গত কয়েক বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামও নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছে।

এই পটভূমিকায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে মতাদর্শগত প্রচার গুরুত্বপূর্ণ। মতাদর্শগত প্রচারে এই পুস্তিকা খুবই সহায়ক হবে।

গ্রেট ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষারত অবস্থায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই গত শতাব্দীর তিনের দশকে আমার ও আমাদের সহপাঠী ভারতীয়দের রাজনৈতিক জীবনের শুরু। কারণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিষয়টিও গোটা ইউরোপ তখন ফ্যাসিস্ত অভিযানের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামে উত্তাল। দেশে ফিরে স্বাধীনতা সংগ্রামকে ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সারা জীবনের জন্য আত্মনিয়োগের কাজ শুরু করি। ফ্যাসিস্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্ব কখনও ফুরোয়নি।

আমাদের পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক অনিল বিশ্বাসের ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে’ পুস্তিকাটি দশ বছর আগে প্রকাশিত। সময়োপযোগী করে তার পুনঃপ্রকাশ হচ্ছে। এই পুস্তিকায় ফ্যাসিবাদের উদ্ভব, বিকাশ, পরিণাম, নয়া-ফ্যাসিবাদের বিপদ, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সংক্ষেপে ও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী প্রত্যেকের কাছেই এই পুস্তিকা গুরুত্ব বহন করে।

জ্যোতি বসু
কলকাতা,
১লা মে, ২০০৫

.

৯ই মে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ত অক্ষজোটের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৬০তম বর্ষপূর্তি বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ত শক্তির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দেশে দেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম দুর্বার হয়ে ওঠে। ভারতসহ একে একে পৃথিবীর প্রায় সবদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। শুধু তাই নয়, যুগান্তকারী চীনের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়। ১৪টি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কারণে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রামের গুরুত্ব আমাদের ভারতেও অপরিসীম।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বের শান্তি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সামনে নতুন বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধান কাণ্ডারী কমরেড স্তালিন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট এই বিপদ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। আজ ৬০ বছর পর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষ দেখতে পাচ্ছেন, এই সতর্কবাণী কতটা বর্ণে বর্ণে সত্য ও জাজ্বল্যমান। এককেন্দ্রিক পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে যখন সর্বাত্মক অভিযান চলছে, তখন ফ্যাসিবাদের উদ্ভব, তার স্বরূপ, নয়া- ফ্যাসিবাদী তৎপরতা এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামের গুরুত্বের বিষয় উপলব্ধি করার আবশ্যিকতা বিশদ ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। এটাও উল্লেখ্য, মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সংগ্রামকে শ্রেণীসংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে।

‘ফ্যাসিজম’ বা ফ্যাসিবাদ ইতালীয় ভাষায় ‘ফ্যাসিসমো’ শব্দটি এসেছে ইতালীয় শব্দ ‘ফ্যাসিসকো’ থেকে। এর অর্থ দাঁড়ায় বান্ডিল বা গোছা। যা আবার এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘ফ্যাসইস’ থেকে। আসলে প্রাচীন রোমে এক গোছা লোহার দণ্ডকে জড়িয়ে বাঁধা হতো একটি কুঠারের গায়ে। এর মাধ্যমে বোঝানো হতো কৰ্তৃত্ব বা ক্ষমতাকে। ফ্যাসিবাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় যে দেশে প্রথম সেই ইতালিতে মুসোলিনী ক্ষমতায় আসার আগে, প্রাক্-মহাযুদ্ধকালেই কিছু কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে বলা হতো ‘ফ্যাসিই’। তবে ‘ফ্যাসিস্‌মো’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মুসোলিনী, ১৯১৯ সালে। তাঁর দলের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয় লৌহ দণ্ড সজ্জিত কুঠারকে। ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের ভ্রূণ দেখা গেলেও ফ্যাসিবাদ প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইতালিতে। ১৯২২-র অক্টোবরে মুসোলিনীর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। এর পরবর্তী সময়ে জার্মানিতে নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের ফলে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের থাবা হিংস্র রূপ নেয়।

ফ্যাসিবাদের বিপদ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যে দেশে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল সে দেশগুলি নিয়ে মাথা ঘামালেই চলবে না, বহু দেশেই ফ্যাসিস্ত গোষ্ঠীগুলি সক্রিয় ছিল এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে হস্তক্ষেপ করার মতো শক্তি অর্জন করতে পেরেছিল। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির এক উল্লেখযোগ্য অংশকেই তারা নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পেরেছিল। সেই সঙ্গে ছিল সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিকদের ন্যক্কারজনক ভূমিকা।

আসলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ও তৎপরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদের নিজস্ব সঙ্কটই ফ্যাসিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবার জমি তৈরি করেছিল; পুঁজিবাদ যখন তার সর্বোচ্চরূপ সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের চরিত্র নির্ণয়ে বুর্জোয়া তাত্ত্বিকদের মতো ভাসা ভাসা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী চলে না মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা। তৃতীয় আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্ন ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা চিহ্নিত করতে গিয়ে সঠিকভাবেই বলেছিল যে, ‘ফ্যাসিবাদ হলো লগ্নি (ফিনান্স) পুঁজির সব চাইতে প্রতিক্রিয়াশীল, সব চাইতে উগ্রজাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী অংশের সর্বাধিক প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব। কমিন্টার্নের বিশিষ্ট নেতা জর্জি ডিমিট্রভের ভাষায় : ‘ফ্যাসিবাদ হচ্ছে লগ্নি পুঁজিরই ক্ষমতা। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী প্রতিহিংসা নেবার সংগঠন।”

বুর্জোয়া ব্যবস্থার সঙ্কট থেকেই ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয় ঠিকই, কিন্তু ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের অর্থ এক বুর্জোয়া সরকারের সাধারণ ক্ষমতারোহণ নয়। তা হচ্ছে বুর্জোয়াদের শ্রেণী আধিপত্যের এক বিশেষ রাষ্ট্রীয় রূপের অর্থাৎ বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বদলে অন্য আর এক রূপের (ফরম) ক্ষমতা দখল। এটা ঠিকই যে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং তার জাতীয় বৈশিষ্ট্য ও আন্তর্জাতিক অবস্থান অনুযায়ী ফ্যাসিবাদের বিকাশ ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব এক এক দেশে এক এক ফরম বা রূপ নিয়েছিল। ইতালির ফ্যাসিবাদ এবং জার্মানি-অস্ট্রিয়ার ফ্যাসিবাদ নাৎসিবাদ অভিন্ন ছিল না। এক এক দেশে এক এক স্লোগানকে সামনে রেখে ফ্যাসিস্তরা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে গেছে জনগণকে। কিন্তু ফরম বা রূপের পার্থক্য থাকলেও, সাধারণভাবে ফ্যাসিবাদের কতগুলির অভিন্ন চরিত্র লক্ষণ রয়েছে। এই লক্ষণগুলি চিহ্নিত করতে গিয়ে ১৯৩৫ সালের কমিন্টার্নের সপ্তম কংগ্রেসে তাঁর বিখ্যাত ভাষণে ডিমিট্রভ বলেছিলেন :

(১) ফ্যাসিবাদ হলো শ্রমজীবী জনতার উপর পুঁজির সব চেয়ে হিংস্র আক্রমণ।

(২) ফ্যাসিবাদ হচ্ছে বেপরোয়া উগ্র জাত্যভিমান এবং পররাজ্যগ্রাসী যুদ্ধ।

(৩) ফ্যাসিবাদ হচ্ছে বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবিপ্লব।

(৪) ফ্যাসিবাদ শ্রমিকশ্রেণী ও সমস্ত শ্রমজীবী জনগণের সবচেয়ে মারাত্মক শত্রু। বিখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক কমরেড রজনী পাম দত্ত তাঁর ‘ফ্যাসিজম অ্যান্ড সোস্যাল রেভলিউশন’ গ্রন্থে সঠিকভাবেই বলেছিলেন যে, ধনতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন, নিরপেক্ষ তত্ত্ব ও ব্যবস্থা নয়। বরং চূড়ান্ত অবক্ষয়জনিত কিছু কিছু অবস্থায় আধুনিক ধনতন্ত্রের একেবারে নিজস্ব প্রবণতা ও নীতিগুলির সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারাবাহিক পর্যায় হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। কমরেড দত্ত ‘মাত্রার পার্থক্য সাপেক্ষে’ আধুনিক ধনতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে অভিন্ন চরিত্র লক্ষণগুলিকে এভাবে নির্দিষ্ট করেছেন— তাদের উভয়ের লক্ষণই হচ্ছে (১) উৎপাদন পদ্ধতির বিকাশ ও শ্রেণীবৈরিতার অগ্রগতিতে বিপন্ন ধনতন্ত্রকে বজায় রাখা (২) ধনতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের তীব্রতা বৃদ্ধি করা (৩) শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব আন্দোলনকে সঙ্কুচিত করা, নির্যাতন চালানো এবং শ্রেণী সহযোগিতার সংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। (৪) সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন চালানো। (৫) শিল্প ও লগ্নির রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া সংগঠনের সম্প্রসারণ ঘটানো। (৬) প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদী ব্লকের ঘনিষ্ঠতর একীকরণের মাধ্যমে এক অর্থে-রাজনৈতিক ইউনিট গড়ে তোলা। এবং (৭) ক্রমধমান আশু সাম্রাজ্যবাদী বৈরিতার প্রয়োজনীয় সহযোগী হিসেবে যুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলা।

এই প্রেক্ষাপট থেকেই ফ্যাসিবাদের বিকাশের আবশ্যিক শর্তগুলিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। এই লক্ষণগুলি বিশ্লেষণের মাধ্যমেই আমরা ফ্যাসিবাদের সাংগঠনিক ও তত্ত্বগত বিকাশের পটভূমি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারি।

আগেই বলা হয়েছে যে, ধনতন্ত্রের নিজস্ব সঙ্কট থেকেই ফ্যাসিবাদের উদ্ভব। ফ্যাসিবাদের বিকাশ প্রসঙ্গে কমরেড রজনীপাম দত্ত অন্তত চারটি শর্তের উল্লেখ করেছিলেন, যেগুলি আজকের পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা দেখতে পারি যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সঙ্কট ও শ্রেণীসংগ্রামের তীব্রতা; সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে মোহভঙ্গ; ব্যাপক অংশের পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী, প্রলেতারিয়েতসহ শ্রমিকশ্রেণীর একটি অংশের উপর পুঁজিবাদী প্রভাব এবং শ্রমিকশ্রেণীর মূল অংশের একটি স্বতন্ত্র শ্রেণীসচেতন বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব। যে কোনো দেশে ফ্যাসিবাদের উদ্ভবের পিছনে এই লক্ষণগুলিকে স্পষ্ট হয়ে উঠতে আমরা দেখেছি। ফ্যাসিবাদের উত্থানে বুর্জোয়া শ্রেণীর দুর্বলতাকে স্পষ্টভাষায় চিহ্নিত করেছিলেন জোসেফ স্তালিনও। ১৯৩৪ সালের জানুয়ারি মাসে কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তদশ কংগ্রেসে ভাষণ দিতে গিয়ে স্তালিন বলেছিলেন—

“জার্মানিতে ফ্যাসিজমের জয়কে শুধুমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর দৌর্বল্যের লক্ষণ এবং যে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি ফ্যাসিজমের পথ প্রস্তুত করিয়াছে, শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি সেই পার্টির বিশ্বাসঘাতকতার ফল বলিয়া মনে করিলেই চলিবে না; ইহাকে বুর্জোয়া শ্রেণীর দৌর্বল্যের লক্ষণ বলিয়াও মনে করিতে হইবে। বুর্জোয়ারা যে আর পুরাতন পার্লামেন্টারি ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসন চালাইতে পারে না এবং ফলে বাধ্য হইয়া স্বরাষ্ট্র ব্যাপারে সন্ত্রাসবাদী শাসন পদ্ধতি অবলম্বন করে, তাহারও লক্ষণ বলিয়া মনে করিতে হইবে।”

বস্তুত এই সূত্রায়ন থেকেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে ফ্যাসিবাদের রমরমা অবস্থার কারণগুলিকে সহজে বোঝা সম্ভব।

পুঁজিবাদের সঙ্কট

ইতিহাসের সাধারণ পাঠকমাত্রই জানেন যে, ঊনবিংশ শতকে পুঁজিবাদের অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক বিকাশের পর, সাম্রাজ্যবাদী স্তরে পুঁজিবাদ প্রবেশ করে সাধারণ সঙ্কটের মধ্যে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, এই পর্বে বিশ্বপুঁজিবাদের সঙ্কট হয়েছিল তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে। এর প্রথম পর্যায়টি ছিল ১৯২৩-২৪ সাল পর্যন্ত, দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিল ১৯২৪ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত, যখন সঙ্কট থেকে পুঁজিবাদের আংশিক পুনরুদ্ধার ঘটে। এ সময়টা ছিল পুঁজিবাদের অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীলতার সময়। তৃতীয় পর্যায়, অর্থাৎ ১৯২৯-৩৩, এই সময় চলে পুঁজিবাদী বিশ্বে মহামন্দার পর্যায়। গভীর সঙ্কটের মধ্যে প্রবেশ করে পুঁজিবাদ, যার জের পড়ে প্রায় সর্বত্র।

পুঁজিবাদের সাধারণ সঙ্কট উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ও প্রচলিত উৎপাদন সঙ্কটের মধ্যে দ্বন্দ্বের তীব্রতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৮৩৫ সাল থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রশক্তির পরিমাণ ৬.৫ লক্ষ অশ্বশক্তি থেকে বেড়ে ৩৯ কোটি অশ্বশক্তিতে পৌঁছেছিল। কেবল ১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট ২০০ বিলিয়ন ইউনিটে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সব রকম শক্তি মেলালে ১৯২৭ সালের বিশ্বের মোট শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি অশ্বশক্তির সমান। এক অশ্বশক্তি মানে প্রায় ছয়জন মানুষের পেশি শক্তির সমান ধরে নিয়ে দেখা যাচ্ছে দুনিয়ার আবালবৃদ্ধবনিতা প্রত্যেকটি মানুষ পিছু পাঁচজন ক্রীতদাসের শক্তি মজুত ছিল। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব কমেনি। ১৯১৩ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা মাত্র ১১.৬ শতাংশ বাড়লেও খাদ্যের রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১৪৭ শতাংশ। তবু অনাহার ও বেকারী এই সময়কালে বেড়েছে বই কমেনি। ১৯১৯ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা আমেরিকায় ৯.০৩ লক্ষ থেকে ৮.৭৪ লক্ষে নেমে এসেছে। ব্রিটেনে ১৯২৩-এর মধ্যে এটা ৮.৩৬ লক্ষ থেকে ৭.৮৯ লক্ষ কমে গিয়েছে। লক্ষ্য করা দরকার, এসব হলো ১৯২৯-৩৩-এর বিশ্ব পুঁজিবাদী সঙ্কটের শুরু হওয়ার আগের কথা। ১৯৩৩ সালের সারা পুঁজিবাদী দুনিয়ায় বেকার সংখ্যা ৫ কোটিতে এসে ঠেকেছিল। ১৯১৩ থেকে ১৯২৮-এর মধ্যে সারা পুঁজিবাদী দুনিয়ার জাতীয় আয়ের যে অংশটা মজুরির জন্য তার পরিমাণ কমতে লাগল। মুদ্রাস্ফীতি শ্রমজীবী মানুষের এই আয়টুকুও শুষে নেয়। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সঙ্কুচিত। প্রথম মহাযুদ্ধের বাজার ভাগাভাগি করে নেওয়ার পর বাইরের বাজারও সীমিত হয়ে যায়। নভেম্বর বিপ্লবের ফলে পৃথিবীর ছয়ভাগের এক ভাগ অংশ পুঁজিবাদের হাতছাড়া। ফলে সঙ্কট তীব্রতর হলো। ১৯২৯ সালে সঙ্কট এবং যুদ্ধ ও পররাজ্য গ্রাসের সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী অভিযানের মধ্য দিয়ে তার সমাধানের প্রচেষ্টা থেকে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হলো সেই বিবরণের যাওয়ায় আগে ১৯২৪-২৯-এর সাময়িক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার আসল চরিত্রটা বোঝা দরকার।

এই সময়টা ছিল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের আগেকার অবস্থা পুনরুদ্ধার করার জন্য বিশ্ব পুঁজিবাদের শেষ ও মরিয়া প্রচেষ্টার সময়। প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পর দ্বন্দ্বগুলির তীব্রতা বৃদ্ধি ইউরোপ-এর কয়েকটি দেশে বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। রুশ বিপ্লব সম্পন্ন হলেও জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি ইত্যাদি দেশে বিপ্লব পরাস্ত হলো। বিপ্লবের আতঙ্কের খাঁড়া শাসকশ্রেণীর মাথার উপর ঝুলে থাকলো। এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরিস্থিতি এবং দেশে দেশে সম্ভাব্য সর্বহারা বিপ্লব মোকাবিলার জন্য পুঁজিবাদ মূলত তিনটি অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল।

প্রথমটি হলো রুশ দেশে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ ও গৃহযুদ্ধ বাধানো ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রতিবিপ্লব সঙ্ঘটিত করার চেষ্টার পাশাপাশি দেশে শ্বেত সন্ত্রাস ও সশস্ত্র প্রতিবিপ্লবী অভিযান চালু করা।

দ্বিতীয় অস্ত্রটি হলো সোস্যাল ডেমোক্র্যাসিকে ব্যবহার করে সর্বহারা বিপ্লবে অন্তর্ঘাত সংগঠিত করা। সর্বহারা বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটদের মন্ত্রিসভায় যোগদান ও তাদের প্রভাবাধীন শ্রমিকশ্রেণীকে কিছু সাময়িক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বশীভূত করা একই এই কৌশলের অঙ্গ।

তৃতীয়টি হলো মার্কিন সাহায্য। মার্কিন পুঁজিবাদ এই সময়টায় অপেক্ষাকৃত সঙ্কটমুক্ত ছিল। প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে তাদের ক্ষতির বদলে লাভই হয়েছিল। ইউরোপে বলশেভিক বিপ্লব ঠেকানোর জন্য ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে ১৩.৭ কোটি পাউন্ড মূল্যের মার্কিন ত্রাণ ও খাদ্য সাহায্য, অন্যান্য ঋণ দিয়ে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে অবস্থা সামাল দেওয়া হলো। পরে পরে ডয়েশ পরিকল্পনা, ইয়ং পরিকল্পনা ইত্যাদির মাধ্যমে এবং মার্কিন ঋণ ও সাহায্যের মাধ্যমে ইউরোপে পুঁজিবাদের পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়ে গেল। প্রথম মহাযুদ্ধের প্রায় দশ বছর পরে পুঁজিবাদ তার প্রাকযুদ্ধ সীমা ছাড়িয়ে গেল। ১৯১৩ সালের তুলনায় ১৯২৭ সালে বিশ্বে খনিজ তেলের উৎপাদন ৩০০%, লোহা ১২%, ইস্পাত ১২৭%, তুলা ১২৫%, গম ১০০%, বেড়ে গেল। ১৯২৭-২৮ সালে খানিকটা তেজীভাব দেখা গেলো। কিন্তু দেখতে না দেখতে এই তিন অস্ত্রই অকার্যকর হয়ে পড়লো। প্রতিবিপ্লব ও শ্বেত সন্ত্রাসের স্থায়িত্ব এত সঙ্কুচিত গণভিত্তির ওপর সংগঠিত করা মুশকিল। সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির অস্ত্রটাও বার বার ব্যবহার করার ফলে ভোঁতা হয়ে যাচ্ছিল। তাদের আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়ার ফলে মানুষের মোহমুক্তি ঘটছিল এবং ইউরোপে তাদের ভোট কমার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিস্টদের ভোট বাড়ছিল।

সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক সঙ্কট মার্কিন মূলুকে হানা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব সম্পর্কে জের ধরে তা সারা পুঁজিবাদী দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়লো। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের আগেকার পুঁজিবাদে ফিরে যাওয়াও অসম্ভব ছিল। ফিনান্স পুঁজির একচেটিয়া কর্তৃত্বের জন্য বেশি বেশি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, অর্থনেতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করা, ঋণ ও উপনিবেশ সংক্রান্ত নীতি, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক, ভরতুকি, কোটা, লাইসেন্স ইত্যাদির ক্রমবর্ধমান বেড়াজালে যুদ্ধের আগেকার কায়দায় সঙ্কট মোকাবিলা করা অসম্ভব ছিল। চাহিদা ও সরবরাহের বাজারি নিয়ন্ত্রণ, স্বনিয়ন্ত্রিত স্বর্ণমান ইত্যাদির যুগে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা সঙ্কটের তীব্রতাকেই বাড়িয়ে তুলেছিল। মার্কিনী পুঁজিবাদ সঙ্কটমুক্ত এবং নতুন এক পুঁজিবাদী প্রচার ছিল পুঁজিবাদী মডেল, যেখানে মুনাফার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান নাকি বেড়ে চলে। বিশিষ্ট মার্কিন অর্থনীতিবদ্ কেইনস্ তাকে মার্কসবাদের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করিয়েছিলেন। সোস্যাল ডেমোক্র্যাটরাও গদ গদ হয়ে পড়েছিল এবং কাউটস্কি ‘অতি সাম্রাজ্যবাদ’ (আলট্রা-ইমপিরিয়ালিজম)-এর তত্ত্ব চালু করেছিলেন। কিন্তু ১৯২৯ সালের সঙ্কট এই সমস্ত বিভ্রান্তির ফানুসটাকে ফাটিয়ে দিয়েছিল। ঐ বছরের শরৎকালে মার্কিন শেয়ার বাজারের সঙ্কটকে প্রথমে স্টক এক্সচেঞ্জে—ফটকাবাজির ফলশ্রুতি হিসাবে চালানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ক্রমশ সঙ্কটের কদর্য রূপ প্রকাশিত হয়ে পড়লো। পুরানো কায়দায় সঙ্কটের মোকাবিলায় অক্ষম পুঁজিবাদ তাই এবার ফিনান্স পুঁজির সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল, সব চাইতে উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী অংশের প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্বের পথে অগ্রসর হলো।

সঙ্কট মোকাবিলায় ফ্যাসিবাদী পথে

প্রথমত, উৎপাদিত সামগ্রী ধ্বংস করে এবং মূল্যস্তর চড়া রাখার পদ্ধতি দিয়ে তথাকথিত ‘অতি উৎপাদনের সঙ্কট’ মোকাবিলা শুরু হলো। সঙ্কট উৎপাদিত সামগ্রীর ভোগের ক্ষেত্রকে ক্রমশ সঙ্কুচিত করে ফেলেছিল। ডেনমার্কে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক সরকার প্রতি সপ্তাহে ৫০০০ গবাদি পশু হত্যা করে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলার ব্যবস্থা করার জন্য সংসদে বাড়তি ঋণ বরাদ্দ চেয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তুলো চাষ নষ্ট করে ফেলার জন্য একর পিছু ৭ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত সাহায্য ঘোষণা করা হয়েছিল। মার্কিন কৃষি দপ্তরের এই কর্মসূচীর ফলে মোট তুলো চাষের এলাকা ৪ কোটি একরের মধ্যে ১.১ কোটি একরের চাষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো। পৃথিবীর মোট কফির দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদক ব্রাজিলের ১৯৩১-৩৩ সালের মধ্যে ২ কোটি ২০ লক্ষ ব্যাগ কফি পুড়িয়ে ফেলা বা সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হলো। কফি কিনে নষ্ট করে ফেলার খরচ যোগাড় করতে বসানো হলো জরুরী ট্যাক্স। গম্ ও তামাক চাষের বেলায়ও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলো। দুনিয়ার তামা উৎপাদকরা ব্রাসেলসে বসে ১৯৩১ সালে ডিসেম্বরে স্থির করলো পরবর্তী বছরে খনি থেকে তামা তোলার কাজ মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২৬ শতাংশ নামিয়ে আনতে হবে। উৎপাদন যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা বা ব্যবহার কমিয়ে ফেলার জন্য সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া শুরু হলো। ফ্যাসিস্ত দার্শনিক স্পেঙ্গলারের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো যন্ত্র সভ্যতার বিরুদ্ধে আর্তনাদ। যন্ত্র ব্যবহারের বিরোধিতা করার জন্য আগেকার মতো আর শ্রমিকশ্রেণী নয়, পুঁজিবাদের পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হলো। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলো। বুর্জোয়া বিজ্ঞানীকুলের মধ্যে ‘আধ্যাত্মিক জগৎ’ এবং ‘সৃষ্টি কর্তার’ অস্তিত্বে বিশ্বাসীদের সংখ্যা (রয়াল সোসাইটির ফেলোদের ২০০ জনের মধ্যে যথাক্রমে ১২১ ও ১৪২ জন) বেড়ে চললো। শিক্ষা, বিশেষত বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ও নারী শিক্ষার ওপর খড়গ নেমে এলো। বই পোড়ানোর বহ্ন্যুৎসব শুরু হয়ে গেলো। জার্মানির ঘটনা নিশ্চয়ই সবার জানা আছে। এক কথায় উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সঙ্গে অসঙ্গতির চরম পর্যায়ে সবচাইতে প্রতিক্রিয়াশীল ফিনান্স পুঁজির স্বেচ্ছাচারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা হলো।

দ্বিতীয়ত, এই পথ ধরেই এলো ফিনান্স পুঁজির চরম সঙ্কীর্ণ ও উগ্র-জাতীয়তাবাদী পথ পরিক্রমা। ইহুদি বিদ্বেষ, ও আর্যজাতির শ্রেষ্ঠত্ব, অপমানজনক ভার্সাই চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তোলার মধ্যেই তা কিন্তু সীমাবদ্ধ থাকেনি। সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকগুলির পাশাপাশি এই পথ পরিক্রমার অর্থনৈতিক রূপটির বিচারও সমানভাবে জরুরী। ‘লিগ অফ নেশনস’ ও বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনগুলি পরিত্যক্ত হলো। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে এই দ্বন্দ্ব নিরসনে এগুলিকে অকার্যকর বলে মনে করা হলো। “জাতীয় পরিকল্পনা অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ” (অটার্কি), ‘জাতীয় স্বনির্ভরতা’, ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’ ইত্যাদি স্লোগানের আড়ালে ফিনান্স পুঁজির বিশ্ববাজার দখল করা, রক্ষা করা এবং নতুন করে ভাগাভাগি করার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণের যে প্রক্রিয়া কমিউনিস্ট ইশতেহারে উল্লিখিত হয়েছিল, ফিনান্স পুঁজির উদ্ভব সেই প্রতিক্রিয়াতে বাড়তি গতিবেগ সঞ্চার করেছিল। কিন্তু সঙ্কট এবং আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্ববাজারে ফিনান্স পুঁজির অবাধ চলাচল তার এই নতুন চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হয়ে পড়ল। কেবল শুল্ক প্রাচীর নয়, মুহূর্তে পরিবর্তনযোগ্য সারচার্জ, এম্বার্গো বা নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিধিনিষেধ আরোপ, মুদ্রা বিনিময় নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় ভরতুকি, ডাম্পিং ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বাজার ও কাঁচামাল দখলের নতুন নতুন হাতিয়ার যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু হয়ে গেল। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতার তত্ত্ব পরিত্যাগ করে একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করল। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তা কেইনস্ ১৯৩৩ সালে ভোল বদলে স্বনির্ভরতার এই তত্ত্বের সপক্ষে কলম ধরলেন। ১৯৩১ সালে বেলফাস্ট ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে সোস্যাল ডেমোক্রাটরাও ‘সংগঠিত পুঁজিবাদের’ মতো ‘পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত জাতীয় অর্থনীতির দিকে এগিয়ে চলার এই প্রবণতাকে স্বাগত জানালো।

তৃতীয়ত, এসবের স্বাভাবিক পরিণতি হলো সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও পররাজ্য গ্রাসের জন্য সমরসজ্জা। ফিনান্স পুঁজির সব চাইতে সাম্রাজ্যবাদী অংশ এই কাজে নেতৃত্ব দিল। কারণ আর একটা বিশ্বযুদ্ধই তাদের কাছে সঙ্কটের একমাত্র সমাধান হিসেবে মনে হয়েছিল। এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিল্প ও অর্থনীতির সামরিকীকরণ অনিবার্য ছিল। ১৯১৩ সালের তুলনায় ১৯৩৪ সালে সারা দুনিয়ার অস্ত্রসজ্জা বাবদ ব্যয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২৫০০ মিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছল। ১৯৩৫ সালের পর তা আরও দ্রুতবেগে বেড়ে চললো। ১৯৩৩ সালে সঙ্কট শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছানোর পর ১৯৩৪ সালে কিছুটা পুনরুদ্ধার শুরু হওয়ার যে লক্ষণ চোখে পড়েছিল তা ছিল আসলে বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির এই অভুতপূর্ব সামরিকীকরণের প্রতিফলন।

চতুর্থত, ফিনান্স পুঁজির সব চাইতে প্রকাশ্য সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্বের আর্থ- সামাজিক ভিত্তি ও রূপটিও এ প্রসঙ্গে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। পুঁজিবাদের সঙ্কট পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্বের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। উইলিয়াম জেড ফস্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯২৯-৩২ সালের মধ্যে ১৫টি পুঁজিবাদী দেশে মোট ১৮,৭৯৪টি ধর্মঘট হয়েছিল। সর্বমোট ৮৫ লক্ষ ১৫ হাজার শ্রমিক এই ধর্মঘটগুলিতে শামিল হয়েছিলন। এই দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য ইতালিতে কর্পোরেট রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। সেই সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব সংগঠন তৈরির ও ধর্মঘট করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জার্মান লেবার কোড ঐ একই উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল। শিল্পের মালিক, শ্রমিক, সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে পরিচালন ব্যবস্থা কায়েম করার মধ্য দিয়ে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বের সমাধান বাতলে দিতে চাওয়া হয়েছিল। আসলে এই সব পক্ষের প্রতিনিধিরাই হলো ফ্যাসিস্তদের প্রতিনিধি। ফ্যাসিবাদ, তা ইতালি বা জার্মান যে ধরনেরই হোক না কেন, নিজেকে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ উভয়ের বিকল্প হিসাবে হাজির করেছিল। ফিনান্স পুঁজির কাছে তারা কমিউনিস্ট-বিরোধী এবং শ্রমিকদের কাছে পুঁজিবাদ-বিরোধী। নাৎসিরা এমনকি জাতীয় সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিতেও কার্পণ্য করেনি। শ্রমিকদের একটা অংশ ও লুম্পেনদের পাশাপাশি, ফিনান্স পুঁজির একনায়কত্বের সামাজিক ভিত্তি প্রসারের জন্য পাতিবুর্জোয়া ও মধ্যশ্রেণীকে সমবেত করাটাও জরুরী ছিল। মধ্যশ্রেণীর দেউলিয়াগ্রস্ত হওয়ার প্রক্রিয়া ও হতাশাজনিত বেপরোয়া মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হলো। জার্মানিতে ৩০ থেকে ৫০ হাজার মার্ক মূল্যের সম্পত্তির মালিকদের সংখ্যা ১৯৯৩ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে ৫ লক্ষ থেকে ২.১৬ লক্ষে নেমে এসেছিল। ৫০ হাজার থেকে এক লক্ষ মার্ক মূল্যের সম্পত্তির মালিকদের সংখ্যা একই সময়কালে ৪ লক্ষ থেকে ১.৩৬ লক্ষ-এ কমে যায়। বহু মর্টগেজ বা ব্যাঙ্ক ডিপোজিট হিসাবে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় সঙ্কট ও মুদ্রাস্ফীতির আবর্তে ধুয়ে মুছে শেষ হয়ে যাচ্ছিল। পোস্টাল ‘স্বল্প সঞ্চয়, সরকারী সিকিউরিটি বাবদ সঞ্চয়ের মোট পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল। ১৯৩১-৩২ সালে জার্মানিতে ৮০০০ টেকনিক্যাল গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে মাত্র ১০০০ জন কাজ পেয়েছিল। ইঞ্জিনিয়াররা মজুরি শ্রমে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়েছিল। ২২ হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের মধ্যে ঐ বছর মাত্র ৯৯০ জন নিয়োগপত্র পেলো। এসবের ফলে ফ্যাসিবাদের মজুদবাহিনী সংগঠনের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হলো। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ফিনান্স পুঁজির মালিকরা সংসদীয় গণতন্ত্র ধ্বংস করার জন্য নাৎসিদের অকাতরে অর্থ যুগিয়েছিল। ফিনান্স পুঁজির একনায়কত্বের চরিত্রটা পরিষ্কার করে বোঝার জন্য নাৎসি সরকারের সুপ্রিম ইকনমিক কাউন্সিলের সদস্যদের পরিচিতিই যথেষ্ট হবে। যেমন অস্ত্র শিল্পের সম্রাট হের ক্রপ ভন বহলেন, ইস্পাত শিল্পের সম্রাট হের ফ্রিজ থাইসেন, বিদ্যুৎ শিল্পের সম্রাট সিমেন্স ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে থাইসেন একাই ১৯৩২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় নাৎসি পার্টির নির্বাচনী তহবিলে দান করেছিলেন ৩০ লক্ষ মার্ক। এদের আর্থিক মদত ছাড়া হিটলারের ক্ষমতা দখল অসম্ভব হয়ে পড়তো। মুসোলিনীর রোম অভিযানের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। সঙ্কটমুক্তির পন্থা হিসাবে বুর্জোয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের উচ্ছেদ হয়েছিল এভাবেই।

ইতালি

ইতালির আগে ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও জার্মানিতেই ফ্যাসিবাদের ভ্রূণ দেখা গেলেও ইতালিতেই প্রথম ফ্যাসিবাদ পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিপ্লবী জনজাগরণ দেখা দেয়। সোস্যাল ডেমোক্র্যাটরা এ সময় গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব হারিয়েছিল। ইতালি দ্রুত এগোচ্ছিল বিপ্লবের দিকে। বুর্জোয়াদের লক্ষ্য ছিল সর্বহারা বিপ্লবকে ঠেকানো। এক্ষেত্রে শ্রমিক শক্তিকে ধাক্কা দিতে পারে সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি। তাই শ্রমিকদের শক্তিকে পিষে (smash) দিতেই দরকার হয়ে পড়ছিল ফ্যাসিবাদ। ইতালীয় ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদকে প্ৰতিষেধমূলক প্রতিবিপ্লব হিসেবে দৃষ্টান্তিত করেছে (আর পি দত্ত)। ১৯২২-র অক্টোবরে মুসোলিনী ক্ষমতায় বসে।

ইতালিতে ফ্যাসিস্তদের ক্ষমতায় আসার কারণ ছিল এরকম—

(১) বৈপ্লবিক গণজাগরণ ভেঙে দেওয়া হয়। তা বুর্জোয়ারা ভাঙেনি, ফ্যাসিস্তরা নয়, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এ বৈপ্লবিক নেতৃত্বের অভাবে সংস্কারবাদীরা তা ভাঙে।

(২) সর্বহারাদের অগ্রগতি ভেঙে যাবার পরই ফ্যাসিস্তরা সামনে চলে আসে।

(৩) ফ্যাসিবাদ আসে বুর্জোয়া নীতির ধারাবাহিকতায়, তবে নতুন ফরমে। মুসোলিনী তৎকালীন পরিস্থিতিকে ব্যবহার করেছিলেন।

জার্মানি

জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের বিজয় ফ্যাসিবাদের সামগ্রিক বিকাশে নতুন পর্ব শুরু করে।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পরিণতিতে ১৯১৮ সালের নভেম্বরে জার্মানি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অস্ত্রসংবরণ চুক্তি করতেও তারা বাধ্য হয়—এর পরিণতিতেই হয় ভার্সাই চুক্তি। পরিণতি রাজতন্ত্রের পতন। কাইজার পালান হল্যান্ডে। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ছোট উপনিবেশগুলিও বিজয়ীরা কেড়ে নেয়, কেড়ে নেয় মূল জার্মানির শিল্পসমৃদ্ধ কয়েকটি অঞ্চল। চাপিয়ে দেয় বিরাট এক ক্ষতিপূরণের বোঝা। এর ফলে জার্মানির জাতীয় জীবন সঙ্কটে ভরে উঠেছিল। এ হলো জার্মানির ‘জাতীয় অবমাননার’ যুগ। কিন্তু এই সঙ্গেই এসেছিল বিপ্লবের জোয়ার। পরাজিত রাজতন্ত্র বিপর্যস্ত সামরিকবাহিনীর বিকল্প হিসাবে এগিয়ে এলো শ্রমিকশ্রেণী। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের চেষ্টাও হলো। রুশ বিপ্লবের ঝড় জার্মানিতেও পৌঁছেছিল। কিন্তু আতঙ্কগ্রস্ত সোস্যাল ডেমোক্র্যাটরা নির্লজ্জভাবে প্রতিবিপ্লবের সঙ্গে হাত মেলায়। নেমে আসে ব্যাপক শ্বেতসন্ত্রাস। কার্ল লেবনেখট, রোজা লুক্সেমবার্গসহ বহু নেতা ও অসংখ্য শ্রমিকের রক্তের বন্যা সত্ত্বেও বিপ্লব ব্যর্থ হলো। এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ই পরবর্তীকালে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করেছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর সীমান্ত ছিল, সেগুলি ছিল দুর্বল। যেমন— ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি। সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিপাকে ফেলার মতন ক্ষমতা শুধু ছিল জার্মানির। জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীরা জার্মানির দিকেই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিল। ১৯২৯ সালের সঙ্কট ও অনিশ্চয়তার সুযোগে নাৎসি মতবাদ জার্মানির সামাজিক শেকড়ে পৌঁছে গেল। শ্রমিকশ্রেণী দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

পরিস্থিতি কীভাবে এগোচ্ছিল তা বোঝা যাবে জার্মানির ভোটের ফল থেকে। যেমন ১৯২৪ সালের ভোটের ফল :-

সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি – ৬০ লক্ষ
কমিউনিস্ট পার্টি – ৩০ লক্ষ ৬০ হাজার
নাৎসি দল – ১০ লক্ষ ৯০ হাজার

কিন্তু ১৯২৯ সালের পর সঙ্কটের আবর্তে অবস্থা পালটাতে লাগলো। ১৯৩০ সালের ভোটের ফল :–

সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি – ৮০ লক্ষ ৫০ হাজার
কমিউনিস্ট পার্টি – ৪০ লক্ষ ৫০ হাজার
নাৎসি দল – ৬০ লক্ষ ৪০ হাজার

১৯৩২ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেখা গেল ভোটের শতকরা হার :-

 মার্চএপ্রিল
হিন্ডেনবার্গ৪৯.৩৫৩
হিটলার৩০.১৩৬.৮
থেলম্যান (কমিউনিস্ট প্রার্থী)১৩.২১০.২
ডুয়েন্টটরেবার্গ৬.৮১০.২

জার্মান সংসদ বা রাইখস্টাগে তখনও পর্যন্ত নাৎসিদের চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টির আসন সংখ্যা ছিল ১০০, নাৎসিদের আর তাদের সহযোগীদের ২৪৭। মোট আসন ৫৮৩।

এই পরিস্থিতিতে হিটলার জার্মানির প্রথম সারির শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক করলেন। তাদের মধ্যমণি ক্রুপ যিনি কিছুদিন আগেও নাৎসিদের বিরোধিতা করেছিলেন কিন্তু এখন অন্ধ ভক্ত। গোয়েরিং নাৎসিদের উদ্দেশ্য সরাসরি বোঝালেন তাঁরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির পক্ষে। কমিউনিস্টদের হাত থেকে ট্রেড ইউনিয়ন ছিনিয়ে নিয়ে তাঁরা শিল্পে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। শিল্পপতিরা তাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসলেন হিটলারের কাছে। এসবেরই ফলশ্রুতিতে আঘাত শুরু হয় গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার উপর। কমিউনিস্ট পার্টি চেষ্টা করেছিল স্যোসাল ডেমোক্র্যাটিক দলকে সর্বনাশের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার। ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে কমিউনিস্টরা যুক্ত শ্রমিক আন্দোলনের ডাক দেয়। ১৯৩২ সালের ২০শে জুলাই আবার যুক্তফ্রন্টের ডাক দেয়। ১৯৩৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে বসানোর প্রতিবাদে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে আবার আবেদন করে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের জন্য। ১৯৩৩ সালের ১লা মার্চ রাইখস্টাগের অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর পরিস্থিতি ভয়ঙ্করভাবে মোড় নেয়।

তারপরের ইতিহাস হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণ। ফ্যাসিবাদ কখনও আগুয়ান শ্রমিক আন্দোলনের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে ক্ষমতায় আসেনি। শ্রমিকশ্রেণী যখন দ্বিধাবিভক্ত, সংস্কারবাদ ও বিভ্রান্তিতে আবদ্ধ, প্রতিক্রিয়ার সমস্ত শক্তি একজোট হয়ে তখন হিটলারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। সমারিক বাহিনী, একচেটিয়া পুঁজি, উগ্র- জাতীয়তাবাদী ক্রুপ-শ্লিচার-পাপেন-হিন্ডেনবার্গের দল নিজেরাই হিটলারের মাথায় বিজয়ের মুকুট পরিয়ে দিয়েছিল।

সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি ও ফ্যাসিবাদ

ফ্যাসিবাদের উদ্ভব ও ক্ষমতাবৃদ্ধি নিয়ে যে কোনো আলোচনা সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির ভূমিকাকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ হতে পারে না। কারণ, ফ্যাসিবাদের উদ্ভবের ক্ষেত্রে সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কমরেড রজনীপাম দত্তের ভাষায় ‘নির্ধারক’ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো ১৯১৪ সাল থেকেই সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি সরাসরি মার্কসবাদ ও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদকে পরিত্যাগ করে। এবং সেখান থেকেই ফ্যাসিবাদের অনুরূপ মতাদর্শের পথে তার যাত্রা শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বেই আমরা লক্ষ্য করেছিলাম যে, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলি সুবিধাবাদী ও সামাজিক জাতিদম্ভী হিসেবে নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়াদের লেজুড়ে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে লেনিনের নেতৃত্বে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতির ভিত্তিতে সংগ্রামের মধ্যে থেকেই তৃতীয় আন্তর্জাতিক বা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের জন্ম। সোস্যাল ডেমোক্র্যাসিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চালিয়ে যাবার ব্যাপারে নিজ নিজ সাম্রাজ্যবাদী সরকারকে সমর্থন জানিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকরা করেছিল। তারপর থেকে সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি পুঁজিবাদী শাসনকে বজায় রাখা এবং শ্রমিকশ্রেণীকে বিভক্ত করার লক্ষ্যেই কাজ করে গেছে। একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখবো, সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি ইতিপূর্বেই যে সমস্ত রাজনৈতিক-মতাদর্শগত লাইন পেশ করেছিলে তার থেকেই ফ্যাসিবাদ গঠন করেছে নিজস্ব মতাদর্শগত অবস্থান। এইভাবে ফ্যাসিবাদের পথ বাঁধিয়ে দেবার কাজে সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি তার ভূমিকা পালন করেছে। সে কারণেই ১৯২৪ সালে স্তালিন বলেছিলেন : “সঠিক কারণেই বলা যায় যে সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি ফ্যাসিবাদের নরমপন্থী শাখার প্রতিনিধিত্ব করে।”

সম্ভবত এই কারণেই আমরা লক্ষ্য করি যে, ফ্যাসিবাদের একাধিক মূখ্য প্রবক্তার রাজনীতিতে হাতে খড়ি সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির মধ্যে। যেমন, স্বয়ং মুসোলিনী প্রথমে ছিলেন ইতালীয় সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক মুখপত্র ‘অবন্তি’-র সম্পাদক, পোলান্ডের ফ্যাসিস্ত নেতা পিলুদস্তি আগে ছিলেন পোলিশ সোস্যালিস্ট পার্টির নেতা; ব্রিটেনের কুখ্যাত ফ্যাসিস্ত মোজলে তো প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকারের মন্ত্রী পর্যন্ত ছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যায় যে, বিশেষ ভাবে দুটি লক্ষণ-এর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, নিজেদের ‘জাতীয়’ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিটি সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ঘনিষ্ঠ একীকরণ এবং আনুষ্ঠানিকভাবেও আন্তর্জাতিকতাবাদকে বর্জন করা; দ্বিতীয়ত, কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগতভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে শ্রেণীসহযোগিতা গড়ে তোলা এবং শ্রমিকশ্রেণীর উন্নতির নামে পুঁজিবাদের স্বার্থ বিকাশে সাহায্য করা। এটা বোঝা মোটেই শক্ত নয় যে, সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির এই নীতিগুলি ‘জাতীয় সোস্যালিজম’-র মূল নীতিরই অনুরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আসলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে পুঁজিবাদের সঙ্কট ও শ্রমিকশ্রেণীর ক্রমশক্তিবৃদ্ধি মোকাবিলায় সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি দুটি কর্তব্য সাধন করতে ব্রতী হয়েছিল। প্রথমত, তা ছিল শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লব প্রচেষ্টাকে পরাস্ত করা। দ্বিতীয়ত, বিধ্বস্ত পুঁজিবাদকে পুনর্গঠনে সাহায্য করা। প্রথম কর্তব্যটি সমাধা করতে গিয়ে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্ব চরম প্রতিক্রিয়াশীল সামরিকবাদী এবং শ্বেতরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। আর সরাসরি গৃহযুদ্ধের পর্ব সমাপ্ত হবার পর পুঁজিবাদী পুনর্গঠনের কাজে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর সহযোগিতার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল সোস্যাল ডেমোক্র্যাসির। এবং এই ‘কর্তব্য’ সমাধানে উপযুক্ত মতাদর্শেরও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই অবস্থান থেকেই যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, সমাজতন্ত্রের পতনে শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা হবে না, ‘সমাজতন্ত্র’কে এগিয়ে নিয়ে যেতে শ্রমিকশ্রেণীর দরকার ধনতন্ত্রের উন্নতি। সে কারণেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের শক্তিবৃদ্ধি ও তার স্বৈরতন্ত্রকে চিহ্নিত করা হলো ‘সমাজতন্ত্রের’ অগ্রগতি হিসেবে। তাই অবাক লাগে না, যখন ১৯৩১ সালে জার্মান সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির লিপজিগ কংগ্রেসে বলা হয় ‘আমাদেরকেই রু পুঁজিবাদের চিকিৎসক হতে হবে।’

এ প্রসঙ্গেই আমরা স্মরণ করতে পারি মুসোলিনীর কথা। ১৯২১ সালেই তিনি সংস্কারবাদী সোস্যাল ডেমোক্র্যাসি এবং ফ্যাসিবাদের মধ্যে সম্ভাব্য জোট গঠনের সুপারিশ করতে গিয়ে বলেছিলেন “সামাজিক আইন গ্রহণ এবং শ্রমিকশ্রেণীর জীবনযাত্রার মানের উন্নতির ক্ষেত্রে সোস্যালিস্টরা অভাবিত সহযোগীর খোঁজ পেতে পারে ফ্যাসিবাদের মধ্যে। ফ্যাসিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদের মধ্যে অ্যান্টিথিসিসকে চাপা দিয়ে নয়, সংসদের মধ্যে তাদের সমঝোতার মাধ্যমেই দেশের উন্নতি ‘সুনিশ্চিত করা সম্ভব।” অন্তত এক্ষেত্রে মুসোলিনী যে যথেষ্ট দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন, পরবর্তী অভিজ্ঞতায় তা প্রমাণিত।

যুদ্ধপর্ব

১৯৩৬-এ স্পেনে যখন গণ-আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিতে ইতালি ও জার্মানির প্রত্যক্ষ সাহায্যে জেনারেল ফ্রাঙ্কো ক্ষমতা কবজা করে তখনও প্রসন্নচিত্তে থেকেছে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স। আশ্চর্য নয়, এই ফ্রাঙ্কোর স্পেনই ১৯৪৮ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য হয়। ১৯৩৫-র অক্টোবরে আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় যখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে ফ্যাসিস্ত ইতালি, তখনও এগিয়ে আসেনি পশ্চিমী কেউ। অথচ, ঠাণ্ডাযুদ্ধ মিটে যাবার দোহাই দিয়ে এই সেদিন ইথিওপিয়ার বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করে দেশটিকে দু’টুকরো করেছে পশ্চিমী শিবির।

পশ্চিমীরা আশ্বস্ত বোধ করেছিল, যখন, ১৯৩৬-র নভেম্বরে কমিন্টার্ন-বিরোধী চুক্তিতে মিলিত হয় জার্মানি ও জাপান। এক বছরের মধ্যে এতে যোগ করে দেয় ইতালি। সত্যি কথা বলতে কি অক্ষশক্তিভুক্ত এই তিন দেশের প্রথম যৌথ চুক্তিই ছিল এই কমিন্টার্ন-বিরোধী চুক্তি। এরই পর ১৯৩৮ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন ও ফ্রান্সের ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রপতি দালাদিয়ের মিউনিখে গিয়ে হিটলারের কাছে মুচলেকা দিয়ে আসেন চেকোশ্লোভাকিয়াকে নাৎসি দখলে নিয়ে আসার পক্ষে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯-র ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানি যখন পোল্যান্ড আক্রমণ করে তখন বিপদ যে তাদের নিজেদেরও, একথা উপলব্ধি করে পশ্চিমীরা। সমগ্র পুঁজিবাদী ইউরোপ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল ফ্যাসিস্তদের সামনে। ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা চেম্বারলিনকে সরিয়ে চার্চিলকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসিয়ে অবস্থাটা সামাল দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ফরাসী বুর্জোয়ারা ছিল একান্তই বেসামাল। মিউনিখে দস্তখত ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিশ্চিহ্ন করার কাজটা দালাদিয়ের সরকার একসঙ্গে শুরু করেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৪০-র ১৪ই জুন নাৎসিরা প্যারিস ঘিরে ফেলতে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করে নেপোলিয়নের উত্তরসুরিরা। এর তিনদিন পর মার্শাল পেতার নেতৃত্বে কট্টর-রক্ষণশীলদের যে সরকার ক্ষমতায় বসে, তার কাজই ছিল হিটলারের হুকুম তামিল করা। হাজার হাজার ফরাসী ইহুদিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা করার জন্য জার্মানদের হাতে তুলে দিয়েছিল পেত্যাঁ সরকার। এভাবে পশ্চিমী মদতে পরিস্থিতিকে অনুকূলে এনেই হিটলার তার পয়লা নম্বর শত্রু সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে “সমর” প্রস্তুতি নেয়।

হিটলার সোভিয়েত-আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন ১৯৪০-র ডিসেম্বরে। সেই পরিকল্পনার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বারবোসা’। দ্বাদশ শতকের এক যুদ্ধবাজ জার্মান সম্রাটের নামে। এ পরিকল্পনার তিনমাস আগেই স্বাক্ষরিত হয়েছে জার্মানি-ইতালি-জাপান ত্রিপক্ষ চুক্তি। ১৯৪০-র সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪১-র মার্চের মধ্যে হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া ও বুলগেরিয়ার সরকারগুলিকে এই চুক্তির শরিক করতে পেরেছিল জার্মানি। তারপর একে একে যুগোস্লাভিয়া, গ্রিস। এক বছর আগেই নাৎসিদের দখলে এসেছে ডেনমার্ক-হল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম। ১৯৪১-র মে মাস নাগাদ মূল ইউরোপীয় ভূখন্ডের কার্যত পুরোটাই চলে গিয়েছিল জার্মানির দখলে। এবং এই অবস্থাতেই মাত্র ৮ সপ্তাহের মধ্যে ‘অভিযান শেষ করে দেবার বাসনা নিয়ে ১৯৪১-র ২২শে জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছিল হিটলার বাহিনী। ঠিক তখনই সোভিয়েতের পূর্বপ্রান্তে তৈরি হয়ে রয়েছে জাপ যুদ্ধবাজরা।

কিন্তু কী ভূমিকা ছিল ব্রিটিশ ও মার্কিন সরকারের? আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েতের পক্ষে তারা সমর্থন জানিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে? ব্রিটেন ও মার্কিন সরকার অক্ষশক্তির বিরোধিতায় ততটাই এসেছিল যতটা তাদের নিজেদের স্বার্থে দরকার ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মূল রণক্ষেত্র ছিল সোভিয়েত-জার্মান সীমান্ত। সেখানেই নির্ধারণ হচ্ছিল যুদ্ধের আসল ফলাফল। দেশে দেশে ফ্যাসিবিরোধী গণআন্দোলন তাই সোভিয়েতের দিকেই তাকিয়েছিল।

সোভিয়েত ভূখণ্ডে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে নাৎসিদের পরাস্ত করে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি অনেকটাই নির্ধারণ করে দিয়েছিল লালফৌজ। প্রথমত, মস্কোর যুদ্ধে। যুদ্ধে নাৎসিদের প্রথম পরাজয় এখানেই। দ্বিতীয়ত, স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ। ১৯৪২-র সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪৩-র ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লড়াই করে স্তালিনগ্রাদকে নাৎসি অবরোধ মুক্ত করেছিল লালফৌজ। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে সংঘটিত এ যুদ্ধ, স্বয়ং মার্কিন রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের ভাষায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। তৃতীয়ত, ১৯৪৩-র জানুয়ারিতে নাৎসি অবরোধ থেকে লেনিনগ্রাদের (সেন্ট পিটার্সবুর্গ) মুক্তি। এই তিনটি ক্ষেত্রেই সোভিয়েতের সাফল্যের তাৎপর্য অসাধারণ। যেহেতু জার্মানি ও তার সহযোগীরা সমস্ত শক্তি সংহত করতে পেরেছিল এবং সোভিয়েতকে লড়তে হয়েছিল একেবারে এককভাবে।

পশ্চিমীদের যা কিছু সেনা অভিযান সে তো সোভিয়েত ভূখন্ড থেকে নাৎসিদের তাড়িয়ে দেবার পরেই। সোভিয়েত নেতৃত্ব তার দু’বছর আগে থেকে ইউরোপে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমীরা অপেক্ষা করেছে, যদি নাৎসিরা শায়েস্তা করতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়নকে। স্তালিনগ্রাদের পর এক আফ্রিকায় জার্মানি ও ইতালি আত্মসমর্পণ করেছে ১৯৪৩-র মে মাসে। আর, দু’মাস বাদে ইতালিতে ঢুকেছে ব্রিটিশ-মার্কিন সেনা। তখনও পর্যন্ত কিন্তু তারা ইউরোপে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার নাম করেনি। ফলে ইউরোপের বুকে অন্যত্র কোথাও জার্মানিকে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকতে হয়নি। পুরো শক্তি তারা প্রয়োগ করতে পেরেছিল সোভিয়েতের বিরুদ্ধে। শেষমেশ ১৯৪৪-র ৬ই জুন উত্তর ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে নামে ব্রিটিশ ও মার্কিন ফৌজ। নাৎসিদের পুরোপুরি ঘায়েল করার কাজ তখন লালফৌজ অনেকটাই করে দিয়েছে। নাৎসিদের পরাস্ত করার মূল দায়িত্ব তাই পালন করতে হয়েছিল বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকেই।

পূর্ব ইউরোপ তো বটেই ইউরোপের অন্যত্রও যে ফ্যাসিবিরোধী গণআন্দোলন শেষপর্যন্ত পুঁজিবাদকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল। চার্চিল সাহেব যে পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্টদের সাফল্যকে ‘লৌহ যবনিকা পতনের সঙ্গে তুলনা করেছিল তার মূলে ছিল তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধিতা ও যুদ্ধের গতি নির্ধারণে ব্যর্থতাজাত হতাশা। আশ্চর্য নয় যে, প্রায় সেই সময়ই, হাউস অব্ কমনসের বক্তৃতায় চার্চিল ভারতকে স্বাধীনতা দেবার প্রস্তাব সাম্রাজ্যবাদী দম্ভে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কী ছিল ব্রিটিশ জনতার মেজাজ? যুদ্ধ-বিজয়ের উৎসব উদ্যাপন তখনও শেষ হয়নি, ১৯৪৫-র নির্বাচনে চার্চিলের রক্ষণশীল দলকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছিল।

হিটলার ও তার ফ্যাসিস্ত সঙ্গীরা পশ্চিমী-মার্কিন শিবিরের মনের কথাটা বুঝতেন। দোষের মধ্যে ছিল, উচ্চাশা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতকে হিটলার পয়লা নম্বর ‘শত্রু’ চিহ্নিত করেছিলেন সঠিকভাবেই। তাই আমরা দেখি একেবারে শেষপর্বে সোভিয়েত লালফৌজ যখন বার্লিন ঘিরে ফেলেছে তখন, হিটলার বলেছিলেন, ‘রুশদের ঢুকতে দিয়ো না, বরং মার্কিনী ও ব্রিটিশদের কাছে বার্লিনকে সমর্পণ কর। নাৎসিদের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিনবাহিনী না পৌঁছনো পর্যন্ত বার্লিনের পতন কোনক্রমে ঠেকিয়ে রাখা। তারপর, সোভিয়েতকে এড়িয়ে ব্রিটেন বা আমেরিকার সঙ্গে পৃথক বোঝাপড়ায় পৌঁছানো। বলা বাহুল্য, লাল ফৌজ তা হতে দেয়নি।

বার্লিন দখলে আনা সহজ কাজ ছিল না। ৩০শে এপ্রিল (১৯৪৫) সকালে লাল ফৌজ রাইখস্ট্যাগ ভবনের প্রবেশ পথ দখল করে নেয়। আর ঐ দিন দুপুর তিনটের আগেই লালফৌজের দুই সার্জেন্ট ইয়েগোরভ এবং কালতারিয়া রাইখস্টাগ ভবনের মাথায় উড়িয়ে দেন লালপতাকা।

৩০শে এপ্রিলই দুপুরে তিনটে পঞ্চাশে হিটলার ও তাঁর প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস সপরিবারে আত্মহত্যা করেছিলেন। তার আগের দিনই হিটলার উইল করে যান, যাতে নিজের উত্তরসুরি হিসেবে তিনি গ্রান্ড অ্যাডমিরাল ডোনিৎসের নাম করেছিলেন। ক্ষমতায় বসার আট দিনের মধ্যেই অবশ্য তাঁকে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। ৯ই মে (১৯৪৫) বার্লিনে আত্মসমর্পণ করে নাৎসি জার্মানি।

৯ই মে মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৪৫ সালের ১লা মে সোভিয়েত লালফৌজ এবং মিত্রবাহিনীর কাছে হিটলারের ফ্যাসিস্ত বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর ঐ বছরের ৯ই মে (৮ই মে গভীর রাতে) সম্মিলিত মিত্রবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জার্মান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক উইলহেলম্ কাইটেল আত্মসমর্পণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ফ্যাসিস্ত শক্তির নৃশংস তান্ডব থেকে বিশ্বসভ্যতা মুক্তি পায়। সারা বিশ্ব উন্নত সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাবার নিশানা পায়।

ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম ও স্তালিন

ফ্যাসিস্তদের কবল থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার যে মরণজয়ী সংগ্রাম সংগঠিত হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি সেই সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন কমরেড জে ভি স্তালিন। আজ যখন আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৬০তম বার্ষিকী উদ্যাপন করছি তখন ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে এই মহান নেতা ও সেনাপতি কমরেড স্তালিনকে একইসঙ্গে স্মরণ করা আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য। কমরেড স্তালিনের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, কূটনৈতিক রণকৌশল এবং সামরিক রণরীতি কেবল যে বিশ্ববাসীকে ফ্যাসিস্ত শক্তির কবল থেকে মুক্ত করেছিল তাই নয়, যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়েছিল তা ফ্যাসিস্ত সাম্রাজ্যবাদের মূলে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রামের সঙ্গে কমরেড স্তালিনের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। স্তালিনের ভূমিকাকে বাদ দিয়ে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধের মূল্যায়ন অবাস্তব ও অসম্ভব। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়টা ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের শক্তির বিজয়। এই বিজয় ছিল ফ্যাসিস্ত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও প্রগতিশীলতার বিজয়। কমরেড স্তালিন ছিলেন এই মহান বিজয়ের অন্যতম রূপকার। তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান, সোভিয়েত সরকারের প্রধান, ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধের প্রতিরক্ষা কমিশনের প্রধান কমরেড স্তালিন শুরু থেকে ফ্যাসিস্ত শক্তির আত্মসমর্পণ না করা অবধি অকুতোভয়ে এবং নির্ভুলভাবে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একইসঙ্গে সোভিয়েত রাষ্ট্রকে দুর্ভিক্ষ এবং অনাহারের কবল থেকে রক্ষা করেছেন।

আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্ত এবং বিভিন্ন ঘটনাবলী পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাবো কমরেড স্তালিন কত নির্ভুল এবং নিখুঁতভাবে রণকৌশল নির্ধারণ করেছেন। ১৯৪১ সালের ২২শে জুন হিটলারের ফ্যাসিস্তবাহিনী রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি ভঙ্গ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর হিংস্র আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণ এতটা আকস্মিক ছিল যে সমগ্র সোভিয়েত জনগণ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি এবং স্বয়ং কমরেড স্তালিন হতচকিত হয়ে পড়েন। কিন্তু এই বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠতে কমরেড স্তালিনের কয়েক ঘন্টাও সময় লাগেনি। তিনি সমগ্র দেশবাসীকে এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে দেন, ঘটনাসমূহের গভীর বিশ্লেষণ করেন এবং আহ্বান জানান, “আত্মপ্রসাদ এবং অসতর্কতাকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে, যদি লালফৌজকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হতে হয় তাহলে সে অবস্থায় এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে একটিও ইঞ্জিন বা রেলওয়ে গাড়ি, এক পাউন্ড খাদ্যশস্য বা এক গ্যালন তেল শত্রুর জন্য ফেলে রেখে না আসা হয়।” যুদ্ধের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণ করে তিনি আহ্বান জানালেন যে, “এই যুদ্ধ হচ্ছে সমগ্র সোভিয়েত জনগণের যুদ্ধ।” মুক্তি ফৌজ কোন অঞ্চল থেকে পশ্চাদপসরণ করার অর্থ এই নয় যে, ফ্যাসিবিরোধী অভিযান স্তব্ধ হয়ে গেল। যে অঞ্চল থেকে মুক্তি ফৌজ পশ্চাদপসরণ করলো সেই অঞ্চলের জনগণের ঐতিহাসিক কর্তব্য হলো শত্রু অধিকৃত এলাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া যেমন, সেতু উড়িয়ে দেওয়া, টেলিফোনের তার কেটে দেওয়া, শত্রু যে জঙ্গলে অবস্থান করছে তাকে চিহ্নিত করে জঙ্গল ঘিরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এককথায় সেই মুহূর্তে কমরেড স্তালিনের নির্দেশ ছিল, শত্রুকে ছায়ার মতো ঘিরে রাখতে হবে এবং শত্রু-অধিকৃত এলাকাতেই তাকে নিধন করতে হবে। সে যেন এক পা-ও নিজ অধিকৃত এলাকা থেকে অগ্রসর হতে না পারে। কমরেড স্তালিনের এই রণনীতি কেবল যে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে লালফৌজকে অনুপ্রাণিত করেছে, নতুন রণনীতি সমৃদ্ধ করেছে তাই নয়, আমরা পরবর্তীকালে লক্ষ্য করি ১৯৫৩ সালে ভিয়েতনামে যে মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ভো নগুয়েন গিয়াপ স্তালিনের উদ্ধৃতি দিয়ে এই একই কৌশল ভিয়েতনাম মুক্তিযুদ্ধে প্রয়োগ করেন। আমরা আরো লক্ষ্য করি, কোরিয়ার মুক্তিযুদ্ধে এই একই নীতি গৃহীত হয়। ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে সমগ্র জনগণকে অনুপ্রাণিত করবার কমরেড স্তালিনের এই নীতি বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষায় শিক্ষিত করে এবং নতুন ধরনের সামরিক কৌশল রপ্ত করতে সাহায্য করে। কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বাধীন লালফৌজের এই সঠিক রণকৌশলের ফলশ্রুতিতে আমরা লক্ষ্য করি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই (মস্কো অবরোধের পূর্বেই) আঠারো হাজার শত্রু সৈন্য নিহত হয়, ২২২টি জার্মান ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয় এবং ২৯টি যুদ্ধ বিমান ভূপাপিত হয়।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই স্তালিন এই সত্যে উপনীত হন যে, ফ্যাসিস্ত সাম্রাজ্যবাদী এই যুদ্ধ কেবল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা সোভিয়েত জনগণকে ধ্বংস করবার যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধে যদি ফ্যাসিস্ত শক্তি জয়যুক্ত হয় তাহলে পরে ফ্যাসিস্ত সাম্রাজ্যবাদ একদিকে যেমন পদানত উপনিবেশগুলিতে নতুন ধরনের সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও শাসন ব্যবস্থা কায়েম করবে, অন্যদিকে পূর্বতন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতেও ফ্যাসিস্ত শক্তির অভ্যুত্থান ঘটে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলিকে ধ্বংস করবে। এ হেন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক মুক্তিযুদ্ধের চরিত্রে রূপান্তরিত করবার লক্ষ্য নিয়ে তিনি আহ্বান জানালেন, “ফ্যাসিস্ত নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে এই জাতীয় দেশপ্রেমিক যুদ্ধের লক্ষ্য হলো কেবলমাত্র আমাদের দেশকে ফ্যাসিবাদের বিপদ থেকে মুক্ত করা নয়, এর লক্ষ্য হলো ইউরোপের অন্যান্য দেশে যেখানে জনগণ জার্মান ফ্যাসিবাদের শিকার হয়েছেন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। এই মুক্তি যুদ্ধে আমরা একা চলতে পারি না, এই মহান যুদ্ধে আমাদের ইউরোপ এবং আমেরিকার বুকে যারা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন তাদেরও সঙ্গে নিতে হবে। যে সমস্ত জনগণ স্বাধীনতার জন্য এবং হিটলারের ফ্যাসিস্ত শক্তির দাসত্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছেন তাঁদের নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে।”

ইতোমধ্যে গ্রেট ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মান ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করবার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাহায্যের কথা ঘোষণা করে। সেই ঘোষণার সূত্র ধরে কমরেড স্তালিন সোভিয়েত জনগণের প্রতি এক বেতার ভাষণে বলেন, “ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাহায্য করবার ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছেন। একই ধরনের ঘোষণা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। জার্মান ফ্যাসিস্ত শক্তিকে পরাজিত করতে তাদের এই সাহায্য ও সহযোগিতা আমরা অন্তরের সাথে গ্রহণ করছি।” কমরেড স্তালিনের এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শক্তিসমূহের ভারসাম্যের গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়। ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে। কমরেড স্তালিনের এই কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

ফ্যাসিবিরোধী ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট গঠনের পাশাপাশি কমরেড স্তালিন কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য মনে করেননি যে এই ফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে মিত্র শক্তির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব রয়েছে তার অবসান ঘটে যাবে। আর যেহেতু এই দ্বন্দ্বের মধ্যে অবস্থান করেই যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে তাই ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনার দিনগুলিতে সেই দ্বন্দ্বগুলি বার বার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। কিন্তু এটা সোভিয়েত ইউনিয়নেরই ঐতিহাসিক দায়িত্ব যে এই দ্বন্দ্বগুলি যেন ফ্যাসিবিরোধী ঐক্যের শক্তিকে দুর্বল করে না দেয় এবং এই যুদ্ধের গতিবেগকে শ্লথ করে না দেয়। স্তালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি ফ্যাসিবিরোধী কোয়ালিশনের শরিকদের সম্পর্কে দ্বৈত মনোভাব গ্রহণ করে।

(১) রণাঙ্গনে যাতে মিত্রবাহিনী সুশৃঙ্খলদৃঢ় ঐক্যবদ্ধ এবং অখণ্ড কমান্ডের ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিচালনা করে সেদিকে সুতীক্ষ্ণ নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে, কোন অবস্থাতেই লালফৌজের প্রধানদের মর্যাদার প্রশ্নটাকে বড় করে দেখা উচিত হবে না; (২) আলোচনার টেবিলে মিত্রবাহিনীর শরিকদের দোদুল্যমানতা, অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ এবং সর্বোপরি তাদের শ্রেণী নীতিগুলি বার বার তুলে ধরতে হবে এবং তা বিশ্বে জনগণের সামনে প্রচার করতে হবে।

মিত্রশক্তির অন্যান্য শরিকদের সাথে, বিশেষ করে ব্রিটেন এবং আমেরিকার সাথে স্তালিনের যে প্রশ্ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি মতানৈক্য দেখা দেয় সে প্রশ্নটি হলো দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের বিষয়। ১৯৪১ সালের নভেম্বর মাসেই স্তালিন এই সত্যে উপনীত হন যে একক ফ্রন্টের ওপর দাঁড়িয়ে শক্তিধর জার্মান ফ্যাসিস্তদের পরাজিত করা যাবে না। তাই কালবিলম্ব না করে ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠন করা একান্ত অপরিহার্য এবং জরুরী। ১৯৪১ সালের ৬ই নভেম্বর তিনি সোভিয়েত জনগণের উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে বলেন, “লালফৌজকে যে একের পর এক পশ্চাদপসরণ করতে হচ্ছে তার অন্যতম কারণ হলো ইউরোপীয় ভূখণ্ডে জার্মানবাহিনীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ফ্রন্টের অনুপস্থিতি। আরো বাস্তব ঘটনা হলো, এই মুহূর্তে ইউরোপীয় মহাদেশে জার্মান ফ্যাসিস্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য গ্রেট ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন সৈন্যবাহিনী নেই। এজন্য জার্মানবাহিনী তাদের সমস্ত শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নকে লক্ষ্য করেই সৈন্য মোতায়েন করছে। ইউরোপের বুকে জার্মানের মিত্রশক্তি সোভিয়েতকে লক্ষ্য করেই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। বর্তমান পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্য হলো যে সোভিয়েত লালফৌজকে এককভাবে লড়াই করতে হচ্ছে জার্মান, ফিনল্যান্ড, রোমানিয়া, ইতালি এবং হাঙ্গেরির সম্মিলিত ফ্যাসিস্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে।” এই একক লড়াইয়ের ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ৩ লক্ষ ৫০ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছেন, ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার সৈন্য নিখোঁজ হয়েছেন এবং ১০ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য আহত হয়েছেন। তথাপি লালফৌজের বীরত্ব এখানেই যে এই সময়ের মধ্যে শত্রুপক্ষের ৪৫ লক্ষের বেশি সৈন্য হয় নিহত না হয় আহত হয়েছেন। ঐ সময়কালে সব থেকে মারাত্মক ঘটনা ছিল জার্মান ফ্যাসিস্তবাহিনী ইউক্রেন, মোল্ডাভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া এবং এস্তোনিয়া অবরুদ্ধ করে ঐ অঞ্চলের জনগণের ওপর নৃশংস অত্যাচার চালাতে আরম্ভ করে। এই সমস্ত অঞ্চলের জনগণের স্বার্থে স্তালিন ১৯৪২ সালের ৬ই নভেম্বর দ্বিতীয়বারের জন্য দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের আহ্বান জানান। তিনি আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না, তদানীন্তন সোভিয়েত কমিশনার ফর ফরেন এফেয়ার্স মলোটভকে ওয়াশিংটন এবং ব্রিটেনে পাঠান। মলোটভ লন্ডনে এক সাংবাদিক বৈঠকে ঘোষণাও করেন যে, অবিলম্বে দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকা ও ব্রিটিশ সরকারের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়ে গেছে। কিন্তু মলোটভ লন্ডন ত্যাগ করার অব্যবহিত পরেই চার্চিল ঘোষণা করেন যে, এই মুহূর্তে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না। ওয়াশিংটন থেকে রুজভেল্টও একই ধরনের ঘোষণা করেন। কমরেড স্তালিন বিষয়টিকে আদৌ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ব্রিটেন এবং মার্কিন সরকারের কাছে এই মর্মে তারবার্তা প্রেরণ করেন যে “পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সোভিয়েত সরকার আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে আপনারা ১৯৪৩ সাল অবধি দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব স্থগিত রাখার যে ঘোষণা করেছেন আমরা তা মেনে নিতে পারি না।”

১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসে মস্কোয় ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয় স্তালিনের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেন। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে মিত্রশক্তির তিন নেতা তেহরানে এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। মস্কো বৈঠকে স্তালিন তেহরান বৈঠকে সূত্র ধরে পুনরায় অবিলম্বে দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের আবেদন জানান। কিন্তু ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের পরিবর্তে বলকান পরিকল্পনার কথা বলেন। এই পরিকল্পনার মূল কথা ছিল যে, ব্রিটিশ এবং আমেরিকার সৈন্যরা ফ্রান্সের পরিবর্তে বলকান অঞ্চলে অবস্থান করবে। এর আসল রহস্য ছিল যে, মিত্রবাহিনী যতটা না জার্মান ফ্যাসিস্তদের প্রতিহত করতে উৎসুক তার চাইতে বেশি উৎসুক বলকান অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যেমন, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া প্রভৃতি স্থানে লালফৌজ অবস্থান করতে না পারে। কমরেড স্তালিন এক মিনিটের মধ্যে এই বলকান পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন যে, দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠন ব্যতিরেকে অন্য কোন প্রস্তাব এলে তিনি শীর্ষবৈঠক ছেড়ে চলে যাবেন। অবশেষে দীর্ঘ বাগবিতণ্ডার পর আমেরিকা, ব্রিটেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৪৪ সালের জুনমাসে এই দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়। কমরেড স্তালিন এই ফ্রন্টকে স্বাগত জানিয়ে ঘোষণা করেন যে, যুদ্ধের শুরুতে জার্মান ফ্যাসিস্ত বাহিনীর যে ৭৫ ডিভিসন সৈন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল সোভিয়েতের বীর লালফৌজ সেই অবরোধ বহুলাংশে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। আজ দ্বিতীয় ফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর লালফৌজের মহান দায়িত্ব হলো ফ্যাসিস্ত বাহিনীকে কেবলমাত্র সোভিয়েত ভূখণ্ড থেকে বিতাড়ন করা নয়, ইউরোপীয় ভূখণ্ডে যে সমস্ত অঞ্চলে ফ্যাসিস্ত শক্তি জনগণের উপর অকথ্য অত্যাচার চালাচ্ছে সেখান থেকেও জার্মান ফ্যাসিস্তদের বিতাড়ন করা। ১৯৪৫ সালের ৬ই জানুয়ারি চার্চিল স্তালিনকে লিখিত এক তারবার্তায় স্তালিনের এই নিখুঁত রণকৌশলের প্রশংসা করে তাঁকে অভিনন্দন জানান। এবং বলেন প্রতি আক্রমণ চালাতে কোন কোন অঞ্চলের ব্রিটিশ সৈন্যদের সোভিয়েত সেনাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। স্তালিন চার্চিলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই আবেদনই করেন, পূর্বাঞ্চলের ভূখণ্ড নিয়ে লালফৌজের দুশ্চিন্তা নেই। আপনারা পশ্চিম অঞ্চলের ভূখণ্ডে (বর্তমানে পূর্ব ইউরোপ বলে পরিচিত দেশগুলি) আপনাদের শক্তি নিয়োজিত করুন।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মহান যুদ্ধে কমরেড স্তালিনের নেতৃত্ব নিছক কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব ছিল না। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নীতির ভিত্তিতে সমগ্র পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করে তিনি এই মহান যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। আর যে বিষয়গুলির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন সেগুলি হলো (১) এই মহান যুদ্ধে যে কোন পদ্ধতিই হোক না কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমগ্র জনগণকে সমবেত করা; (২) লালফৌজকে যথার্থ অর্থে শক্তিধর ফৌজে রূপান্তরিত করা এবং (৩) ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলা।

যুদ্ধ ঘোষিত হবার অব্যবহিত পরেই কমরেড স্তালিন জনগণের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলেন, লালফৌজের সাফল্য অসম্ভব হয়ে পড়বে যদি না এই কর্মকাণ্ডে সোভিয়েত জনগণের সব রকমের সমর্থন সংগঠিত করা যায়। কলে-কারখানায়, কোলিয়ারি খনি, পরিবহন এবং কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত প্রতিটি শ্রমিক এবং কৃষক আজকের এই মহান যুদ্ধের সৈনিক। সীমান্তে যুদ্ধরত লালফৌজ যে আত্মত্যাগ করছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত প্রতিটি সোভিয়েত নাগরিককে একই ধরনের আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। এটা খুবই আনন্দের কথা যে, আমাদের দেশের দক্ষ শ্রমিককেরা অতি অল্প সময়ের মধ্যে যে ধরনের উন্নতমানের যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তত করতে সক্ষম হয়েছে যার ফলশ্রুতিতে ফ্যাসিস্ত বাহিনীর যুদ্ধাস্ত্র বহুলাংশে ভোঁতা হয়ে গেছে। দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ শ্রমিকশ্রেণী ব্যতিরেকে এ ধরনের আত্মত্যাগ আর কেউ করতে পারে না। সেজন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের লালফৌজের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামী ভূমিকা, সোভিয়েত শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ফ্যাসিবিরোধী দেশপ্রেমিক যুদ্ধে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় স্তালিনগ্রাদ-কুরস্কের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে জানতে পারি, এই দুই যুদ্ধে লালফৌজের পাশাপাশি আট বছরের শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত সোভিয়েত মাতৃভূমি রক্ষায় জীবনমরণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

১৯৪১ সালের জুন মাসে যখন জার্মান ফ্যাসিস্তবাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে তখন লালফৌজ ছিল যথার্থই অবিন্যস্ত। কিন্তু আট মাস পরে ১৯৪২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ জার্মান বাহিনী মস্কোয় পরাজিত হবার অব্যবহিত পরেই স্তালিন ঘোষণা করেন, “যে দক্ষতা নিয়ে জার্মান ফ্যাসিস্ত শক্তি বিশ্বাসঘাতকতা করে আকস্মিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছিল, জার্মান ফাসিস্ত বাহিনী সেই দক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে। আজ লালফৌজের দক্ষতা ফ্যাসিস্তবাহিনীর দক্ষতা অপেক্ষা অনেক বেশি। লালফৌজের নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ হানার ক্ষমতা, মুক্ত অঞ্চলকে রক্ষা করার ক্ষমতা, ডিভিসনগুলির গুণগতমান, সৈন্যদের নৈতিক চেতনা এবং সর্বোপরি নির্দেশ দেবার সুনিপুণ কৌশল লালফৌজকে বিশ্বের অন্যতম সুশৃঙ্খল এবং শক্তিশালী ফৌজে রূপান্তরিত করেছে।”

সমাজতন্ত্র রক্ষা সম্পর্কে কমিউনিস্টদের কর্তব্য সম্পর্কিত লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই লালফৌজকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে। তাদের মধ্যে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটায়। তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কমরেড স্তালিন লেনিনবাদের ভাণ্ডারে নতুন নতুন উপাদান সৃষ্টি করেন। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সপক্ষে এবং ফ্যাসিস্ত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সেদিন যেভাবে বিশ্ব জনমত সংগঠিত হয়েছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। স্তালিন নিজেই বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আজ যে আন্তর্জাতিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে তা আর পূর্বে লক্ষ্য করা যায়নি। এই যোগসূত্র দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্বের সকল স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ আজ জার্মান ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বের প্রতিটি শান্তিপ্রিয় মানুষের দৃষ্টি আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে। স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার জন্য সমস্ত সোভিয়েত জনগণ যে মরণজয়ী সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন সেই সংগ্রাম আজ বিশ্বের সকল প্রগতিশীল মানুষের কাছে প্রশংসিত। এই সংগ্রামের বিজয় বিশ্বে স্বাধীনতা এবং প্রগতির শক্তিকে উৎসাহিত করবে, উদ্দীপিত করবে।

১৯৪৫ সালের ৯ই মে যখন কমরেড স্তালিন ঘোষণা করেন যে, ফ্যাসিবাদী জার্মানি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে তখন সঠিকভাবে সমগ্র বিশ্ব উল্লসিত হয়ে ওঠে। সে উল্লাস ছিল মেহনতী মানুষের উল্লাস, সে উল্লাস ছিল স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের উল্লাস। বিশ্বব্যাপী প্রগতি শক্তির এই বিজয় উৎসব প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশবাদের ভিতকে কাঁপিয়ে তোলে।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা মিত্রবাহিনীর বিজয় ছিল কমরেড স্তালিনের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিজয়। এই বিজয় ছিল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিজয়। ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধের অবসানের পর যে নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি আত্মপ্রকাশ করে তাতে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার রাষ্ট্রনায়কেরা হতচকিত হয়ে পড়েন। আমেরিকার ইতিহাসবিদরা একথা ব্যক্ত করতে দ্বিধাবোধ করেন না যে, ব্রিটেন এবং আমেরিকার দুই রাষ্ট্রনায়ক স্তালিন প্রতিভার কাছে বা উদ্ভাবনী শক্তির কাছে পরাজিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের মধ্য দিয়ে কেবল জার্মান ফ্যাসিস্ত শক্তি এবং সহযোগীরা ক্ষমতাচ্যুত হন না, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবনতি ঘটে। রুজভেল্ট চেয়েছিলেন, চীনকে পদানত করতে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের চার বছরের মাথায় চীনে বিপ্লব সংগঠিত হয়। জার্মান ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নির্মূল নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। কিন্তু ইতিহাসের গতিপ্রবাহে আমরা লক্ষ্য করি যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউয়িনের নেতৃত্বে গঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক শিবির। যদিও আজ বর্তমানে সেই শিবির (সমাজতান্ত্রিক শিবির) নেই।

কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে সংগঠিত নভেম্বর বিপ্লব দেশে দেশে সমাজতন্ত্র এবং স্বাধীনতা শক্তির উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করেছিল। আর কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে পরিচালিত জার্মান ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে বিজয় দেশে দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিজয়শীর্ষে উন্নীত করেছিল। বিশ্বের শোষিত, নিপীড়িত মানুষকে সমাজচেতনায় সমৃদ্ধ করেছিল। আজ নানা কৌশলে ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে স্তালিনের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। একথাও বলা হচ্ছে যে, স্তালিন মার্কসবাদের বিকৃতি ঘটিয়েছেন, সমাজতন্ত্রের মৌলনীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছেন।

ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে স্তালিনের সফল নেতৃত্ব আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, সেদিন ফ্যাসিবাদের পরাজয় না ঘটলে আজ ইতিহাসের গতিধারা চরম প্রতিক্রিয়ার পথ গ্রহণ করতে বাধ্য হতো। ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধে স্তালিনের ভূমিকা ও কীর্তি বিশাল এবং বিপুল। বিশ্বখ্যাত লেখক মিখাইল শলোখভ ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামে স্তালিনের ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছেন, “সেইসময় স্তালিনের কাজকর্মকে ছোট করে দেখানো, বা সেটাকে হেয় প্রতিপন্ন করা, আমাদের নিশ্চয়ই উচিত নয়। প্রথমত, সেটা হবে অসাধুতা এবং দ্বিতীয়ত সেটা আমাদের দেশের পক্ষে, সোভিয়েত জনগণের পক্ষে ক্ষতিকর এবং সেটা এ কারণে নয় যে, কেউ কখনো সাফল্যের উপরে দোষারোপ করে না, সেটা সর্বোপরি এই কারণে যে, ঐরকম এজাহার সত্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর সংগ্রামে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং স্তালিনের সুযোগ্য নেতৃত্বকে অস্বীকার করার অর্থ সেই মহান গণসংগ্রামকে অস্বীকার করা। স্তালিনের প্রেরণাদায়ী নেতৃত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছিল সত্য। কিন্তু আংশিক সত্য। কিন্তু পূর্ণতর সত্য হলো মানবসভ্যতাকে ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছিল স্তালিনের প্রখর রণকৌশল। আজও ভাবলে অবাক হতে হয়, কি প্রখর প্রজ্ঞার সঙ্গে যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া আগামী সময়ের গতিধারাকেও স্তালিন বুঝে নিতে পেরেছিলেন।

আজ আমরা যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মরণ করছি, তখন সেই সংগ্রামে স্তালিনের ভূমিকাকে স্মরণ করতেই হবে। এ স্মরণ ব্যক্তি স্তালিনকে স্মরণ করার জন্য নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তার ফলাফল ও ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্যই। আজকের তথাকথিত ‘সমাজতন্ত্র-উত্তর’ পর্বে এই তাৎপর্য আত্মস্থ করা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য মহান গণসংগ্রামের মধ্যেই স্তালিনের ভূমিকা প্রোথিত।

যুদ্ধের পর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গেই যে ফ্যাসিবাদের বিপদের অবসান ঘটেছিল তা নয়। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বারংবার দেখা গেছে সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদতে শ্রমজীবী জনতার আন্দোলনের উপর ফ্যাসিস্ত সুলভ আক্রমণ নেমে এসেছে নানাভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরই গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশে ফ্যাসিস্ত একনায়কতন্ত্রীদের মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শিবির মদত দিয়েছিল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের বিজয় সম্ভাবনাকে দমন করতে। লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে সামরিক স্বৈরশাহীগুলিকে আমেরিকা যেভাবে লালন করেছে তাও এ প্রসঙ্গে ভুলে গেলে চলবে না।

সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর থেকে গত দেড়দশকে নতুন পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত সঙ্কট সামলাতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীরা বেপরোয়া অভিযান চালাচ্ছে। তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলির ওপর সাম্রাজ্যবাদীদের চাপ সব চেয়ে বেশি। এর ফলে তৃতীয় দুনিয়ার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বের রূপ সবচেয়ে তীব্রতা লাভ করছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের চাপ ও ষড়যন্ত্র বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যেক তৃতীয় দুনিয়ার দেশের সার্বভৌমত্ব বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে। সমসাময়িককালে আফগানিস্তান, ইরাক ও প্যালেস্তাইনের জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন সারা পৃথিবীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। আরো কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন হুমকি আরোপ করেছে।

এর বিরুদ্ধে গত পাঁচ বছরে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামও তীব্রতা লাভ করেছে। ভিয়েতনামের জনগণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মহান যুদ্ধ চালিয়ে অবর্ণনীয় আত্মত্যাগ করে ইতিহাস গড়েছেন। ইরাকে, প্যালেস্তাইনে চলছে প্রতিরোধ যুদ্ধ। নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলির বিরুদ্ধেও মানুষ সংগ্রামরত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-সহ সমস্ত শিল্পোন্নত দেশের জনগণও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে বিরাট সংখ্যায় শামিল হচ্ছেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মতাদৰ্শগত লড়াই এই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ফ্যাসিস্তবাহিনীর কমিউনিস্ট-বিরোধী তাণ্ডবের প্রসঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া এবং চিলির অভিজ্ঞতাও বিশেষভাবে স্মরণ করার মতন।

ইন্দোনেশিয়া ও চিলির অভিজ্ঞতা

ইন্দোনেশিয়া : ৬০-র দশকে যে সমস্ত দেশে কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে সামরিকবাহিনী ও ফাসিস্ত শাসক গোষ্ঠী হিংস্র অভিযান সংগঠিত করে, তার মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও চিলি অন্যতম। ১৯৬৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। সেই সূত্র ধরে কমিউনিস্ট পার্টির উপর যে নৃশংস আক্রমণ নেমে আসে, তা নজিরবিহীন ঘটনা।

ঐ সময় ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টি। সে সময় বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি। তখন ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য সংখ্যা ছিল ৩০ লক্ষ। আর পার্টি-সমর্থিত বিভিন্ন গণসংগঠনের সভ্য সংখ্যা ছিল ২ কোটি। এতবড় শক্তিশালী পার্টির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভুলের অনিবার্য পরিণতিতে সেদেশে সামরিকবাহিনীর ফাসিস্ত অভ্যুত্থান ঘটে। সামরিকবাহিনীর সাহায্যে ক্ষমতা দখল করবার পর সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান ডি এন আইদিতকে ১৯৬৫ সালের ২১শে নভেম্বর গোপনে ফাঁসি দেওয়া হয়। আজো ইন্দোনেশিয়ার সরকার আইদিতকে কোন্ অপরাধে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা কী ছিল তা প্রকাশ করেনি। কিন্তু আইদিত নিহত হওয়ার পর ইন্দোনেশিয়ার গ্রাম-শহর ঘিরে যে কমিউনিস্ট নিধন শুরু হয় তা ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন ঘটনা। মধ্য জাভা থেকে বালি, আর সুমাত্রা থেকে তিমর সর্বত্র সামরিকবাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। আর কমিউনিস্টদের ধরে ধরে হত্যা করা হয়। সেদিন ইন্দোনেশিয়ার বুকে কতজন কমিউনিস্টকে হত্যা করা হয়েছিল, তার প্রকৃত তথ্য কোনদিনই পাওয়া যাবে না। তবে তদানীন্তন ইন্দোনেশিয়ার সামরিক জুন্টা নিজেদের ইশতেহারেই ঘোষণা করেছিল, একদিনে ১ লক্ষ ৫০ হাজার কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যকে তারা হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। সামরিকবাহিনীর একটি সার্ভে রিপোর্টে প্রকাশ যে, ১৯৬৫ সালের ৩০ শে সেপ্টেম্বরের পর ইন্দোনেশিয়ার বুকে নিহত কমিউনিস্টদের সংখ্যা হবে ৫ লক্ষ। ইন্দোনেশিয়ার তদানীন্তন কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর অধিকাংশ সদস্যই সেদিন এই হত্যালীলার শিকার হয়েছিলেন। তদানীন্তন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদম মালিকের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ইন্দোনেশিয়ার জেলগুলিতে যে পরিমাণ কয়েদি থাকার কথা, ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তার চেয়ে দশগুণ বেশি কয়েদি সেই সমস্ত জেলে বন্দী ছিল। আর তাঁদের অধিকাংশই কমিউনিস্ট রাজনৈতিক বন্দী।

ইন্দোনেশিয়ার বুকে এই ফ্যাসিস্ত অভ্যুত্থানের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল তদানীন্তন ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির হঠকারী কার্যকলাপ। আবার এই কার্যকলাপের উৎস ছিল সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সংশোধনবাদী ভূমিকা। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি সে সময় তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি সুকর্ণের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছিল। সুকর্ণ ছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা। ভূমি সংস্কারের প্রশ্নটাকে বাদ দিয়েই তিনি ‘নৈতিকতার’ পথে ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়ন ঘটাতে চেয়েছিলেন। আর কমিউনিস্ট পার্টি সুকর্ণের সেই নীতিকে কেবল সমর্থন জানিয়েছিল তাই নয়, সুকর্ণের উন্নয়নের পথের প্রতি কেবল যে আনুগত্য প্রকাশ করেছিল তাও নয়, সেই নীতিকে কার্যকর করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচীতে ‘ইঁদুর মারার অভিযান’ কর্মসূচী পরবর্তীকালে এক হাস্যকর ঘটনায় পর্যবসিত হয়। কী ছিল, সেই বিষয়টা? সুকর্ণ অধিক ফসল উৎপাদনের আহ্বান জানালেন। কমিউনিস্ট পার্টির কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে কৃষকদের আহ্বান জানানো হলো, ‘বেশি ফসল ফলাও’। কৃষকরা কমিউনিস্ট পার্টির এই নির্দেশ পালনে মাঠে নেমে পড়লো। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো ইঁদুর। একরের পর একর জমিতে ফলল নষ্ট হতে থাকলো ইঁদুরের উপদ্রবে। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ অধিবেশন ডাকা হলো। সিদ্ধান্ত হলো, ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিটি সভ্যের ছ’মাসের একমাত্র কাজ হবে ইঁদুর মারা। পার্টির প্রতিটি সভ্যকে, তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য হোন আর শাখা কমিটির সভ্য হোন পাঁচটা করে ইঁদুর মারতে হবে। কমিউনিস্টরা দলে দলে মাঠে ছুটলেন ইঁদুর মারতে। কিন্তু দেড়মাসের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। গ্রামে গ্রামে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লো। আবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ অধিবেশন ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ইঁদুর মারা বন্ধ করার। একটি জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য পার্টির সাধারণ সভ্যদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি করেছিল। সেই হতাশার প্রতিফলন ঘটলো ১৯৬৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর। কয়েকজন উগ্রপন্থী যুবক ছ’জন দক্ষিণপন্থী জেনারেলকে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ডের পরই মধ্য জাভাতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এটা ছিল একেবারেই অনভিপ্রেত। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কোন সিদ্ধান্ত ছিল না এ ধরনের গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার। কিন্তু সব দায়িত্ব বর্তালো কমিউনিস্ট পার্টির উপর। হত্যা-অভিযান শুরু হয়ে গেল। ৩রা অক্টোবর থেকে ১৫ই অক্টোবরের মধ্যে জাভার মোট জনসংখ্যার ৭শতাংশ নিহত হন। এই জাভাই ছিল ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি। পরবর্তীকালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়, জাভা ও বালির প্রতি তিনটি পরিবারের একজন করে নিহত হয়েছেন পনেরো দিনের ব্যবধানে। ঐ একই রিপোর্টে জানা যায়, জাভা এবং বালির অন্তত ৫,০০০ পরিবারকে সবংশে নিধন করা হয়েছে। সেই সমস্ত পরিবার ইতিহাসের পাতা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বড় বড় অট্টালিকাকে কারাগারে রূপান্তরিত করা হয়। এই ধরনের একটি অট্টালিকা নেগারা শহরে অবস্থিত। সেই অট্টালিকায় ৩০০কমিউনিস্ট বন্দীকে আটকে রাখা হয় একটি ঘরে। এবং একরাতে ঐ ৩০০ কমিউনিস্ট-এর শিরশ্ছেদ ঘটানো হয় ঐ ঘরে।

বালিতে হত্যা-অভিযান শুরু হয় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে। চলে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। দু’মাসের ব্যবধানে ৫০হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। বালির মোট জনসংখ্যা ২০লক্ষ। এখানকার সেনাপ্রধানরা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের তালিকা সংগ্রহ করে। এবং তালিকা ধরে ধরে তাঁদের গ্রেপ্তার করে হত্যা করে। মৃতদেহগুলি সরাবার কোন ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বালিতে মহামারী দেখা দেয়। সেই মহামারীতে সমান সংখ্যক মানুষ মারা যান। কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কমিউনিস্টরা সেদিন আত্মসমর্পণ না করে, আত্মহত্যাও করেছিলেন। এই ধরনের কমিউনিস্টদের সংখ্যাও কম নয়। তদানীন্তন সেনাবাহিনী থেকে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে জানা যায়, আত্মহননের পথ নিয়ে ৩,০০০-এর বেশি কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মী প্রাণত্যাগ করেন। এই হত্যা অভিযান থেকে শিক্ষায়তনগুলিও রেহাই পায়নি। কেদিরি জেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী ঢুকে ছাত্র-ছাত্রীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কোন সংগঠন ছিল না। যে সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কাজ পরিচালনা করতো, তাঁর নাম ‘মোসলেম স্কলার পার্টি। এই পার্টির নেতারা যখন জানতে চেয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী প্রবেশ করলো কেন? উত্তরে বলা হয়েছিল, ‘ঈশ্বরের নির্দেশ’।

১৯৬৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বরের পর একটানা আটমাস ধরে ইন্দোনেশিয়ার বুকে এই ফ্যাসিস্ত অভিযান চলে। যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৬৬ সালের ১২ই মার্চ সুহার্তোর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে। আর এই হত্যা-অভিযানের পরিণতিতে বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ কমিউনিস্ট পার্টি বলতে গেলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইন্দোনেশিয়ার ফ্যাসিস্ত অভ্যুত্থানের ৩০ বছর অতিক্রান্ত হলো। এই ৩০ বছরের মধ্যে অনেক দেশের কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান হয়েছে, পতন হয়েছে, পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্টদের সেদিন যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা আজো অপূরণীয় রয়েছে। এবং বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বুকে কেবল কমিউনিস্ট পার্টি নয়, সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাই নিষিদ্ধ। চলছে সামরিক শাসন।

একইভাবে আমরা স্মরণ করতে পারি লাতিন আমেরিকার দেশ চিলির ঘটনা। ১৯৭৩-র ১১ই সেপ্টেম্বর চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থান কোন ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। সামরিক জেনালেরদের ক্ষমতা দখল মোটামুটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু চিলির ঘটনা কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন সৈন্যাধ্যক্ষের ষড়যন্ত্রের মতো সাধারণ ঘটনা নয়। চিলির সামরিক অভ্যুত্থান জনগণের অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এক গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর দেশের চরম প্রতিক্রিয়াশীল অশুভ শক্তির নির্মম নিষ্ঠুর কদর্য আক্রমণ। চিলির দেশপ্রেমিক শ্রমিকশ্রেণী আর তার সহযোদ্ধাদের নির্বিচার গণহত্যা করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার ঘটনার পর কমিউনিস্ট বিরোধিতার স্লোগান দিয়ে কোন দেশের সৈন্যবাহিনী নিজের দেশের মানুষের উপর এমন হিংস্র যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। ১৯৭৩-র ১১ই সেপ্টেম্বর চিলির সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ অগাস্টে পিনোচেতের নেতৃত্বে চিলির সামরিকবাহিনী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত পপুলার ইউনিটি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি ভবনের উপর গোলাবর্ষণ করে। চিলির জনপ্রিয়তম নেতা রাষ্ট্রপতি সালভাদর আয়েন্দে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। সারাদিন ধরে রাজধানী সান্তিয়াগো, ভালপারাইসো, সেরেন, আরও সব শহরে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে চলে সেনাবাহিনীর তাণ্ডবলীলা। এলাকার পর এলাকা গোলাবাহিনী দিয়ে বিধ্বস্ত করা হয়। বিশেষত শ্রমিক অঞ্চলে। ফলে খুন হয়েছিল গোটা পরিবার সমেত ছয় হাজার শ্রমিক। চিলির সবচেয়ে বড় কাপড়ের কারখানা একসসুমারে শ্রমিকদের এক সঙ্গে দাঁড় করিয়ে মেশিনগান চালিয়ে খুন করা হয়। ‘নিউজ উইকে’র সাংবাদিকের রিপোর্টে জানা যায় সামরিক জুন্টা প্রথম সপ্তাহে পাঁচ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল। প্রথম মাসে সারা চিলিতে দিনে গড়ে ছশো জন দেশপ্রেমিককে হত্যা করা হয়। পিনোচেত সদম্ভে ঘোষণা করেছিল, চিলিতে কমপক্ষে পাঁচ হাজার মার্কসবাদীকে তাঁরা খুন করেছিলেন। হিটলারী কায়দায় রাস্তার মোড়ে বইয়ের বহ্ন্যুৎসব করা হয়। এই আগুনে শুধু মার্কসবাদী সাহিত্যকেই পোড়ানো হয়নি তার সঙ্গে সহমরণে গিয়েছিল মার্কটোয়েন, শেকসপীয়র এবং চিলির বিবেক বলে কথিত মহান কবি নেরুদার অমর সৃষ্টি। এমন কী গ্যালব্রেথের অর্থনীতির বইও। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা ছাড়াও প্রায় দশ হাজার মানুষকে সান্তিয়াগোর বিরাট স্পোর্টস স্টেডিয়ামে বন্দী করে রাখা হয় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। এই সমস্ত ঘটনা বা দুর্ঘটনার পিছনে চক্রান্ত ছিল মার্কিনী মদতের—সি আই এ-র ‘অপারেশন চিলি’র জন্য মার্কিনীরা দশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। আজ আর কারও অজানা নেই সমস্ত পরিকল্পনার মূল উপদেষ্টা ছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ড. হেনরি কিসিংগার। মার্কিন সাংবাদিক জ্যাক এন্ডারসন আয়েন্দে সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্তের দলিল ফাঁস করে দিয়েছেন।

পিনোচেত সরকারের পিছনে মদত দিচ্ছিল কুখ্যাত ফ্যাসিস্ত পার্টি ‘মাদারল্যান্ড অ্যান্ড ফ্রিডম মুভমেন্ট’। তারা ক্রমাগত শ্রমিক-কৃষকদের উপর প্রকাশ্য হামলা চালাত, দিনের আলোয় গণহত্যা চলত। এই ফ্যাসিস্ত দলই এতদিন ছিল পিনোচেতের বল ভরসা।

কেন এই চক্রান্ত? বামপন্থী আয়েন্দে সরকার সাম্রাজ্যবাদের এতদিনের মৌরসীপাট্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তাঁরা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তামা খনির রাষ্ট্রীয়করণ করেন। এতদিনের মার্কিনী মালিকানায় হাত পড়েছিল। প্রথম আঠারো মাসে দুশোটির উপর প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ দেশের প্রায় সত্তর ভাগ সম্পত্তিকে জাতীয়করণ করে মার্কিন একচেটিয়া মালিকানার অবসানের দিকে চিলি দৃঢ়পদে এগিয়ে যাচ্ছিল। অপরদিকে জমির মালিকানাও বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছিল চিলির গরিব কৃষকদের মধ্যে, চিলির উর্বরতম জমি ল্যাটিফ্যান্ডাস আউলের জমি প্রাচীন আধিবাসী ‘ইন্ডিয়ান’ বর্গাদারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই জমি তারা জুন্টা সরকারের সময়ও আঁকড়ে রাখতে পেরেছিল, শত নির্যাতন উপেক্ষা করেও। ফলে এই. ফ্যাসিস্ত আক্রমণ এই কমিউনিস্ট গণহত্যা, এই সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত।

বহু সংগ্রাম-বহুরক্ত ঝরার পর আজ চিলিতে আবার গণতন্ত্রের মুক্ত বাতাস। পিনোচেতকে গদি ছাড়তে হয়েছে। যদিও মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদের ঘৃণ্য নিঃশ্বাস আজও চিলির কাঁধে। যদিও সাধারণ মানুষ জাগ্রত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তাঁরা আর হতে দেবেন না।

নয়া ফ্যাসিবাদ

তবে, এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন দেশে আজ নয়া ফ্যাসিবাদের বিপদের প্রশ্নটিও উল্লেখ্য। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হিটলার বা মুসোলিনীর আদর্শে উত্তরসুরির দাবিদার হিসেবে অনেকগুলি গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে। নিও-ফ্যাসিস্ত বা পোস্ট-ফ্যাসিস্ত নামে তারা নিজেদের মতাদর্শকে জাহির করছে। প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দল হিসাবে এ জাতীয় যেসব পার্টি অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি (এফ পি ও) ডেনমার্কের প্রগ্রেস পার্টি, নরওয়ের প্রগ্রেস পার্টি, বেলজিয়ামের ডমলাস (ফ্লেমিশ) ব্লক, ইতালির ইতালিয়ান লিগ, সোস্যাল মুভমেন্ট ন্যাশনাল রাইট, লম্বার্ডি লিগ, ফ্রান্সের জোঁ-মেরি লা পেঁর ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এফ এন), জার্মানির দ্য রিপাবলিকানস, দ্য ন্যাশনাল ফ্রন্ট, দ্য ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টি অব জার্মানি ও জার্মান পিপলস ইউনিয়ন, নেদারল্যান্ডসের সেন্টার ডেমোক্র্যাটস ও সেন্টার পার্টি-৮৬, সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাকশন ও সুইস ডেমোক্র্যাট, ব্রিটেনে ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি ও প্রো-ফ্যাসিস্ত অ্যাকশন, পোলান্ডকে ভিত্তি করে ক্রিশ্চিয়ান ইউরোপস ইউনিয়ন অব নেশানস (সি ই ইউ এন) ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, লিথুয়ানিয়া প্রভৃতি দেশে, রাশিয়াতে ভলাদিমির জিরিনভস্কি ‘রাশিয়ান চয়েজ’ সংগঠন প্রভৃতিকে নয়া ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশগুলির বাস্তবতা ও পরিস্থিতি মতন এদের ভূমিকার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সাধারণভাবে স্বস্তিকা চিহ্ন ধারণ বা পতাকা ব্যবহার, জুতোর মোজায় ট্রাউজার গুঁজে রাস্তায় জঙ্গী প্যারেড, ফ্যাসিস্ত নীতি চালু করার দাবি, ফ্যাসিস্ত কায়দায় স্যালুট, প্রাক্তন ফ্যাসিস্ত নেতাদের বক্তৃতার ক্যাসেট বাজানো, পত্রিকা প্রকাশ, হামলা চালানো প্রভৃতি অতীতের অনুকরণমূলক তৎপরতা এদের রয়েছে। বিদেশী বিতাড়ন ও বিদেশী আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য আইন বাতিলের দাবি, বর্ণবিদ্বেষবাদ, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলগুলির সাথে সহযোগিতা, কমিউনিস্ট পার্টি-বিদ্বেষ অ্যান্টি-সেমিটিজম প্রভৃতি হলো ইউরোপ ভূখণ্ডে আধুনিক ফ্যাসিবাদ-প্রবণতার অন্যতম উপাদান। এর পাশাপাশি আমেরিকা ও ইউরোপে ফ্যাসিবাদী- প্রবণতাসম্পন্ন উগ্র-খ্রীষ্টান সাম্প্রদায়িকতার আবির্ভাব ঘটেছে। ১৯৬৮ সালে ভ্যাটিকানের পোপ ষষ্ঠ পল তাঁর ‘হিউম্যানেই ভিয়েই” অনুশাসনে গর্ভপাত ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতাসহ গোঁড়া খ্রীষ্টীয় ব্যবস্থার যে সব নির্দেশ দেন এবং ১৯৮৩ সালে পোপ দ্বিতীয় জন ভ্যাটিকানের নির্দেশ হিসাবে পূর্বোক্তটিকে সমর্থন করে যে ‘দ্য কোড অব ক্যানন ল’ পাস করেন তা নয়া ফ্যাসিস্ত শক্তিগুলির অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। পূর্বোক্ত সংগঠনগুলির অধিকাংশই এইসব কুযুক্তির সমর্থনে ও সেগুলি রাষ্ট্রীয় আইনে পরিণত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে। আমেরিকাতে গড়ে উঠেছে ‘নিউক্রিশ্চিয়ান রাইট’, ‘প্যাস্টোরাল প্ল্যান ফর প্রো-লাইফ’ প্রভৃতি নামে সংগঠন। নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ করার অধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবিও উঠেছে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এইসব ক্যানন ল অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্কুলে ধর্ম বিষয়ক নিয়মিত আলোচনার দাবিতে কোন কোন দেশে আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপ ভুখণ্ডে এশীয় ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালাবার জন্য নানা নামে গড়ে উঠেছে ‘বহুবিধ সংগঠন। সর্বত্রই নয়া ফ্যাসিস্ত সংগঠনগুলি খুন, সন্ত্রাস, অগ্নি-সংযোগ, লুঠ, নারী ধর্ষণ প্রভৃতি পন্থা বেশি করে গ্রহণ করছে। এদের চাপ ও হুমকিতে ইতোমধ্যেই কতকগুলি দেশ কিছু দাবি সরকারীভাবে মেনে নিয়েছে, পুরনো আইন বাতিল করেছে।

এছাড়া লক্ষ্য করা যায় বহু দেশে ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলি ক্রমশ ফ্যাসিস্ত চরিত্র নিচ্ছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এইসব ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী সংগঠনগুলির সক্রিয় আবির্ভাব ঘটছিল বিশের দশকেই – ঠিক যখন ইউরোপে ফ্যাসিবাদ মাথা তুলছে।

একথা অস্বীকার করা যায় না যে নয়া ফ্যাসিবাদের এই রমরমার পিছনেও আছে বিশ্ব পুঁজিবাদের সঙ্কট। জার্মানিতে রাজনৈতিক স্রোত ও সামাজিক ধারা হিসাবেই নয়া ফ্যাসিবাদের উপস্থিতি প্রকট। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী পর্যায়ে ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি (সাবেক পশ্চিম জার্মানি) গঠনের সময় থেকেই নয়া ফ্যাসিবাদ মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছিল। ইউরোপে ষাটের দশকে এবং আমেরিকায় তারও আগে নয়া ফ্যাসিবাদী আদর্শের ভিত্তিতে বেশ কিছু সংগঠন তৈরি হয়েছিল। ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময়ে রক্ষণশীল বুর্জোয়ারা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পরিচালিত কমিউনিস্ট-বিরোধী জিগির নয়া ফ্যাসিবাদী ঐসব শক্তিতে মদত দিয়েছে। তিরিশের দশকে ফ্যাসিবাদের যে চেহারা আত্মপ্রকাশ করেছিল, নয়া ফ্যাসিবাদের চরিত্রেও তার অনেক মিল রয়েছে। নয়া ফ্যাসিবাদও কমিউনিজম-বিরোধী এবং জাতিবিদ্বেষী। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাজনীতিতে নয়া ফ্যাসিবাদী সংগঠনগুলির বিশেষ সক্রিয়তা দেখা যায়নি। তাদের প্রতি সামাজিক সমর্থনও তেমন ছিল না।

১৯৭৩-৭৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী সঙ্কট আরো তীব্র হয়। সঙ্গে সঙ্গে নয়া ফ্যাসিবাদী সংগঠনগুলি আরো উগ্র চেহারা নেওয়ার সুযোগ পায়। ইউরোপীয় রাজনীতিতে তাদের উত্থান ও আগ্রাসনের পথ প্রশস্ত হয়। তার আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় কুড়ি বছর বাদে ষাটের দশকে অর্থনীতিতে কিছুটা সমৃদ্ধি দেখা দেয়। জার্মানি ও ইউরোপের বেশ কিছু দেশে তখন চলছিল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। সে সময় লক্ষ লক্ষ বিদেশীকে ঐসব দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিক হিসাবে। তাঁদের কাজ ছিল পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিকে সস্তা শ্রমের রসদ যোগানো ও গতিশীল করা। শুধু জার্মানিতেই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার শ্রমিক গিয়েছিলেন। সত্তরের দশকে ইউরোপীয় অর্থনীতি ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুঁজিবাদী সমৃদ্ধির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছিল ঐ অভিবাসী শ্রমশক্তি। কিন্তু সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পুঁজিবাদী সঙ্কট আবার তীব্র হলে হাজার হাজার ‘অতিথি শ্রমিক’ ছাঁটাই হয়েছিলেন ও তাঁদের ফিরে যেতে বলা হয়েছিল। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ্য, সুইজারল্যান্ডের মতো একটি ছোট্ট দেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ায় ১৯৭৪-৭৫ সালে অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার শ্রমিককে ঐ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল। পুঁজিবাদী দেশগুলিতে ক্রমবর্ধমান বেকারী, মুদ্রাস্ফীতি ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা দক্ষিণপন্থী ও নয়া ফ্যাসিস্ত শক্তির উত্থানে সহায়তা করে। আর বুর্জোয়ারা ঐ সব শক্তিকে মদত দেয় শাসকশ্রেণীর প্রতি জনগণের ক্ষোভকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। এভাবেই নয়া ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলির নতুন শত্রুতে পরিণত হন তুরস্ক, আফ্রিকা, এশিয়া ও সাধারণভাবে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকরা। নয়া ফ্যাসিবাদী ও কট্টর দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলি তাদের সমর্থন বাড়াতে বর্ণবিদ্বেষকে প্ররলভাবে ব্যবহার করছে।

জার্মানির নয়া নাৎসিরা

ইউরোপের সরথেকে শক্তিশালী দেশ পশ্চিম জার্মানিতে ১৯৮৫ সালের সরকারী তথ্য অনুযায়ী, জার্মানিতে ৮০টিরও বেশি নয়া নাৎসি ইউনিয়ন ও গোষ্ঠী ছিল। বেআইনী কার্যকলাপ ও অপরাধমূলক হিংসাত্মক ঘটনার জন্য ঐসব গোষ্ঠী কুখ্যাত। ১৯৭৮ সালে তাদের মোট অপরাধের সংখ্যা ছিল ৯৮২। ১৯৮১ সালে অর্থাৎ ৩ বছরের মধ্যে তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে হয় ১৮২৪। এরাই ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে মিউনিখে একটি পার্কে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৩ জনকে হত্যা করেছিল। সে সময় ঐ পার্কে একটি জনপ্রিয় উৎসব চলছিল। নয়া নাৎসিদের দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে এটিকে জঘন্যতম হত্যাকান্ড বলেই অভিহিত করা যেতে পারে। ঐ সময়ে প্রধান নয়া ফ্যাসিবাদী দল ছিল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। পূর্ব প্রুশিয়া, সাইলেসিয়া ও সুদেটেনল্যান্ডের জার্মানদের ‘ফেলো কান্‌ট্রমেনস অ্যাসোসিয়েশন’-এর মতো সংগঠনগুলির মধ্যে নয়া নাৎসিবাদ ও প্রতিশোধবাদ ব্যাপক ভিত্তি পেয়েছিল। সব মিলিয়ে ঐ অ্যাসোসিয়েশনগুলির মোট সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লক্ষ। একই সময়ে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটদের মতো রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলিও তাদের কার্যকলাপকে মদত দেয়। এই সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে কাজে লাগিয়ে নব্বই-এর দশকে জার্মানির বিভিন্ন প্রদেশে নির্বাচনে শক্তি বাড়াতে সক্ষম হয় নয়া নাৎসিরা। ঐসব নির্বাচনে তাদের অনেক প্রতিনিধি জয়লাভও করে।

জার্মানির মতো ফ্রান্স, ইতালি ও অস্ট্রিয়াতেও নয়া ফ্যাসিবাদী ও কট্টর দক্ষিণপন্থী বিভিন্ন পার্টির উত্থান ঘটেছিল। ফ্রান্সে লি পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট অন্য দেশ থেকে আসা মানুষের বিরুদ্ধে মারাত্মক বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার চালিয়ে এবং বর্ণবিদ্বেষী বক্তব্যের মাধ্যমে জনসমর্থন পেতে শুরু করে। ইতালিতে প্রায় একইভাবে রাজনৈতিক কার্যকলাপকে জোরদার করে ইতালীয়- সোস্যাল মুভমেন্ট (এম এস আই)। তারা হিংসাত্মক পথও বেছে নেয়। এম এস আই খোলাখুলিভাবে মুসোলিনী ও তার ফ্যাসিবাদী শাসনকে সমর্থন করে, ও তার জন্য গর্ব প্রকাশ করে। তারা ফ্যাসিবাদের ঐ দিনগুলি ফিরিয়ে আনার কথাও বলে। অস্ট্রিয়াতে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিই হলো কট্টর দক্ষিণপন্থী দল। জার্মানির মতো অস্ট্রিয়াতেও এই পার্টি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত সংগঠন থেকে সমর্থন পেয়েছে। এখনো সমস্ত নয়া ফ্যাসিবাদী দল পেটি বুর্জোয়া ও শ্রমজীবী মানুষের সমর্থন পেয়ে অ-শ্বেতাঙ্গ অভিবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে লিপ্ত। বর্ণগত ও জাতীয় শুদ্ধত’ বজায় রাখার কথা বলে এই সমর্থন আদায়ে তারা সচেষ্ট।

আশির দশকে রেগানবাদ ও থ্যাচারদের মাধ্যমে দক্ষিণপন্থীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এরফলে ইউরোপ ও আমেরিকার শাসকশ্রেণী আরো দক্ষিণপন্থী অরস্থান নেয় সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা ছাঁটাই হয়। শ্রমজীবী মানুষের আয়ের ওপর আক্রমণ বাড়ে। বাড়তে থাকে বেকারী। বেশি বেশি করে আক্রমণের শিকার হন অসংগঠিত ও অরক্ষিত অভিবাসী শ্রমিকরা।

১৯৯০ সালে বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ফের মন্দা দেখা দেয় এবং একটানা ৪ বছর তা চলতে থাকে, যা নয়া ফ্যাসিবাদ সামনে রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশের পথ সহজ করে দিয়েছিল এবং আরো বেশি নির্বাচনী সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। পেটি বুর্জোয়ারা ও শ্রমজীবী জনগণের বেশ কিছু অংশ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, ফ্যাসিবাদের মতো নয়া ফ্যাসিবাদও সেই ভয়কেই কাজে লাগিয়েছে ঐ সময়। বেকারী, শ্রেণীগত ও সাংস্কৃতিক অবনমন নয়া ফ্যাসিবাদী স্রোতের অনকূল শর্ত হিসাবে কাজ করেছে। কমিউনিজমের বিরোধিতা সব সময়েই আদর্শগত সমর্থনের উৎস ছিল। পরবর্তী সময়ে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিপর্যয় ও আরো পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি অসহায় বিদেশী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নয়া ফ্যাসিবাদের আক্রমণকে আরো তীব্র করেছে।

পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে বিপর্যয়ের ফলশ্রুতিতে দুই জার্মানির সংযুক্তিকরণ ঘটে। এই সংযুক্তির ফলে বেকারী ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়। সেই প্রথম জার্মানিতে মন্দা দেখা দেয় ও উৎপাদন হ্রাস পায়। ঠিক ঐ সময়ে নয়া ফ্যাসিবাদ তার কুৎসিত চেহারা নিয়ে প্রবলভাবে আত্মপ্রকাশ করে। শুধু ১৯৯২ সালেই জার্মানিতে বিদেশী ও অন্যান্যদের উপর নয়া ফ্যাসিবাদী ও কট্টর দক্ষিণপন্থীরা ২২৮৫ বার আক্রমণ চালায়। ১৯৯১ সালের তুলনায় ঐ সংখ্যা ছিল ৫১ শতাংশ বেশি। সংখ্যাটি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে তা আরো বাড়ে। তুরস্কের অভিবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারগুলিকে লুঠপাট ও হত্যা, তাঁদের বাসস্থানে অগ্নিসংযোগ, শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের শিবিরে আগুন লাগানো, ইহুদীদের কবরখানা, তাঁদের উপাসনার স্থান ও বাসস্থানের উপর আক্রমণ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ফিরে আসে নাৎসি জার্মানির পুরনো চেহারা। একটি ঘটনায় মোলন শহরে তুরস্কের এক মহিলা ও দুই যুবতীকে পুড়িয়ে মারা হয়। ১৯৯৪ সালের মে মাসে মাগদেবুর্গে ৫ জন তুর্কীকে ৪০ জন নয়া নাৎসি আক্রমণ করে। ঐ ঘটনার পরে ব্রিটেনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় লেখা হয় : “১৯৪৫ সালের পরে এই প্রথম কট্টর দক্ষিণপন্থীরা খোলাখুলি, দিনের আলোয় অ-জার্মানদের আক্রমণ করল। পুলিস বা জনগণ কেউ তাদের বাধা দিল না।”

জার্মান শাসকগোষ্ঠী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটরা নয়া ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে কোন কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমেরিকার সাহায্য ও সমর্থন নিয়ে বহু প্রাক্তন নাৎসিকে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠীতেও তাদের নেওয়া হয়েছিল। কট্টর দক্ষিণপন্থীদের কমিউনিজমের বিরুদ্ধে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সৈনিক হিসাবে গণ্য হয়েছে। একই সময়ে কোন সরকারী চাকরিতে কমিউনিস্টদের নিয়োগ করা হয়নি। নাৎসিদের প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত করার এই ব্যর্থতাই নয়া ফ্যাসিবাদের উত্থানের জমিকে উর্বর করেছে।

সরকারে নয়া ফ্যাসিবাদীরা

সাম্প্রতিককালে কয়েকটি দেশে কট্টর দক্ষিণপন্থী ও নয়া-ফ্যাসিস্তরা এমনকি সরকারে পর্যন্ত চলে যেতে পেরেছে। ইতালিতে নয়া ফ্যাসিবাদী জোট এম এস আই নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (এ এন) হয়েছে। কিছু নির্বাচনী সাফল্যের পরে ১৯৯৪ সালে এ এন অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলগুলির সঙ্গে জোট গঠন করে। সিলভিও বারলুসকোনির নেতৃত্বাধনী ঐ জোট সংসদ নির্বাচনে জয়ীও হয়। যুদ্ধের পরে সেই প্রথম ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে নয়া ফ্যাসিবাদীরা সরকারে আসে। নয়া ফ্যাসিবাদী দলের ৫জনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে মে মাসে ইতালির সংসদে এ এন সদস্যরা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ঐ প্রস্তাবে মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদী দলকে নিষিদ্ধ করে ১৯৪৮ সালে যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, তা বাতিলের কথা বলা হয়। ঐ নয়া দক্ষিণপন্থী জোটের শরিক ছিল বড় বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বকারী বারলুসকোনির দল ফোর্জা ইতালিয়া, ফ্যাসিবাদী ও উগ্র-জাতীয়তাবাদী ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী নর্দার্ন লিগ। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে কীভাবে নয়া ফ্যাসিবাদ সাফল্যের সঙ্গে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারে ও ইউরোপের একটি দেশের সরকারের অংশ হতে পারে, ইতালির ঐ ঘটনা তার প্রমাণ। বারলুসকোনির সরকারের স্থায়িত্ব অবশ্য বেশিদিন ছিল না। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জন্য ঐ সরকারের পতন হয়। তবে এই ঘটনা থেকে গণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদ- বিরোধী শক্তিগুলিকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে।

ফ্রান্সে লি পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রতি সমর্থন প্রায় প্রত্যেক নির্বাচনেই বাড়ছে। দ্যগলপন্থীদের মতো রক্ষণশীল দলগুলিকে প্রভাবিত করার মতো জায়গায়ও পৌঁছে গেছে ফ্রন্ট। ‘ইতোমধ্যেই ফ্রন্টের অভিবাসন-বিরোধী বেশ কিছু নীতি মেনে নেওয়া হয়েছে এবং ফ্রান্সের বর্তমান দক্ষিণপন্থী সরকার সেগুলিকে রূপায়িত করছে। সম্প্রতি ঐ দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটে ন্যাশনাল ফ্রন্ট ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থীরা পেয়েছে ১৩ শতাংশ ভোট। ১৯৯৫-র ৭ই মে ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৫২.৩১% ভোট পেয়ে জিতেছেন রক্ষণশীল প্রার্থী চিরাক। সোস্যালিস্ট প্রার্থী লিওলেন জনাপিন পেয়েছেন ৪৭.৬৯% ভোট। অস্ট্রিয়া ও বেলজিয়ামেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দক্ষিণপন্থী ও ‘নয়া ফ্যাসিবাদী দলগুলির প্রাপ্ত ভোটের হার বেড়েছে।

নয়া ফ্যাসিবাদ আমেরিকায় সর্বদাই নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে। সি আই এ এবং আমেরিকার শাসকশ্রেণীর নাৎসি নেতাদের ঐ দেশে ডেকে নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দিয়েছে। পাশাপাশি ঐ দেশে বর্ণবাদকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে কু ক্লক্স ক্লান, জন রার্চ সোসাইটি এবং আরো বহু কট্টর দক্ষিণপন্থী সংগঠন। আমেরিকার ওকলাহোমার সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্ফোরণের সঙ্গে একটি কট্টর দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ এমনকি রিপাবলিকান দলের যোগাযোগও খুঁজে পাওয়া: গেছে। বস্তুতপক্ষে দেশের মধ্যেই হোক কিংবা বিদেশেই হোক, কমিউনিজম ও শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকা সরসময়েই দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলিকে উৎসাহ দিয়েছে, ব্যবহার করেছে। চিলির ফ্যাসিবাদী শাসন এবং নিকারাগুয়া এবং এল সালভাদোরের নয়া ফ্যাসিবাদীদের প্রতি আমেরিকার সমর্থন তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

চাই সচেতনতা

এ প্রসঙ্গে, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় পরবর্তীকালে ‘ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিগুলির পেশি প্রদর্শনও নজর কাড়ছে। প্রায় সবক’টি মহাদেশেই এই বিপদ লক্ষ্য করার মতো। শুধু আমাদের দেশে নয়, আলজিরিয়া, তুরস্কের মতো সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে এমন সব দেশেও মৌলবাদীরা উল্লেখযোগ্য শক্তিতে পরিণত। পুঁজিবাদের সঙ্কট এবং অস্থিরতাকেও কাজে লাগিয়েই অনেক ক্ষেত্রে সংসদীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই ‘ তারা ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পেরেছে। এভাবেই গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিগুলির পক্ষে মারাত্মক বিপদে পরিণত হচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদ ও নয়া ফ্যাসিবাদ। আসলে এরা সঙ্কটাপন্ন শাসকশ্রেণীর টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সঙ্কটের সময়ে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার প্রতি জনগণের যে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধের সৃষ্টি হয়, মৌলবাদ ও নয়া ফ্যাসিবাদ তাকে ব্যবহার করে। পুঁজিবাদের সঙ্কটে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁরাই নয়া ফ্যাসিবাদের সহজ শিকার হন। নয়া ফ্যাসিবাদ যেমন শেখানোর চেষ্টা করে যে, অভিবাসী শ্রমিক বা বিদেশীরাই আসল শত্রু। এঁদের জন্যই যাবতীয় সঙ্কটের সৃষ্টি। অথচ বাস্তবে ঐ অভিবাসী শ্রমিক বা বিদেশীরাও সমাজের আরেকটি নিপীড়িত অংশ। এভাবেই জনগণের প্রকৃত শত্রু শাসকশ্রেণী নিজেকে আড়াল করে। নয়া ফ্যাসিবাদ ও মৌলবাদ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন। নয়া ফ্যাসিবাদ সামাজিক প্রতিবাদের ধরনের পরিবর্তনে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের সাহায্য করে, যাতে উলটে সেই প্রতিবাদ বুর্জোয়াদের পক্ষে যায়। তবে, পুঁজিবাদী শাসন কাঠামোয় অস্থিরতা কোনোরকমে যদি আরও গুরুতর রূপ নেয়, তাহলে নয়া ফ্যাসিবাদ, মৌলবাদ ‘বিপজ্জনকভাবে আগ্রাসী হয়ে উঠবে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিও তা থেকে রেহাই পাবে কি? প্রগতিকামী জনগণকে এ বিপদ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। আজকের সময়ে একচেটিয়া পুঁজি আর কোনও ইতিবাচক অগ্রগতির উপাদান হতে পারে না। বর্ণবাদ, জাতি’ বিদ্বেষ, মৌলবাদ, উগ্রজাতীয়তাবাদ ও কমিউনিজম বিরোধিতার আদর্শগত উপাদান সেই তৈরি করছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি যে, সাম্রাজ্যবাদ তার কর্তৃত্ব ধরে রাখতে সর্বাত্মক আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে। পুঁজিবাদ কোনক্রমেই তার অভ্যন্তরীণ বিরোধের মীমাংসা করতে পারছে না। এই অবস্থায় শ্রমজীবী জনগণের শ্রেণী আন্দোলনকে সফলভাবে সংগঠিত করার উপরই সর্বাধিক জোর দিতে হবে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংহতি ও সম্প্রসারণের সেটাই সবচেয়ে বড় ভিত্তি। এই আলোকেই আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও তার গুরুত্বকে বিবেচনা করি।

***

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.