• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সন্ধানে – রণবীর চক্রবর্তী

লাইব্রেরি » প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সন্ধানে – রণবীর চক্রবর্তী
প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সন্ধানে - রণবীর চক্রবর্তী
বইয়ের ধরন: ইতিহাস ও সংস্কৃতি

প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সন্ধানে – রণবীর চক্রবর্তী

প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সন্ধানে – রণবীর চক্রবর্তী
প্রথম সংস্করণ: বৈশাখ ১৩৯৮
প্রচ্ছদ: প্রবীর সেন

.

প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসচর্চায় অন্যতম পথিকৃৎ ও পুরোধা
উপেন্দ্রনাথ ঘোষালের স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদিত

.

সম্পাদকের ভূমিকা

বিগত কয়েক দশকে ভারত ইতিহাস নিয়ে গবেষণা অনেক অগ্রসর হয়ে গেছে। রাজকাহিনী ছেড়ে এখন অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতির সমস্যাগুলি, এমনকি মানুষের চৈতন্য ও বিশ্বাসের নানা জটিলতা, ক্রমশই ঐতিহাসিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন তথ্যে, নতুন তত্ত্বে, বিশ্লেষণের উৎকর্ষতায় ও নানা বিতর্কে ভারত ইতিহাস চর্চা আজ সমৃদ্ধ। কিন্তু নতুন গবেষণার ফলাফল প্রায় সব সময়ই প্রকাশ হয় ইংরেজিতে। ফলে সেগুলি অনেক সময়ই সাধারণ পাঠক ও ছাত্র-ছাত্রীদের আওতার বাইরে থাকে। ভারত ইতিহাস চর্চাকে এই গণ্ডীর বাইরে এনে বাঙালী পাঠক সমাজের কাছে আধুনিক গবেষণালব্ধ ইতিহাস উপস্থিত করার উদ্দেশ্যেই এই গ্রন্থমালার পরিকল্পনা।

এই পরিকল্পনা দুটি স্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তরে কয়েকটি খণ্ডে পুরা-ইতিহাস, প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক ভারত ইতিহাসের ধারাবাহিক বিশ্লেষণ থাকবে। এর পাশাপাশি থাকবে অন্য স্তরে, বিশেষ কিছু বিষয়ের ওপর সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল। যে সব বিশিষ্ট ঐতিহাসিকরা এই গ্রন্থমালায় লেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন শ্রী দিলীপ চক্রবর্তী, শ্রী ব্রতীন মুখোপাধ্যায়, শ্রী কুণাল চক্রবর্তী, শ্রী ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়, শ্রী দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, শ্রী তপন রায়চৌধুরী, শ্রী রজত রায়, শ্রী সৌমেন মুখোপাধ্যায়, শ্ৰীমতী তনিকা সরকার, শ্রী দীপেশ চক্রবর্তী ও শ্রী পার্থসারথি গুপ্ত।

বাঙালী ছাত্র-ছাত্রীরা এবং সাধারণ পাঠক-পাঠিকারা যাঁরা ইতিহাস সম্বন্ধে উৎসাহী তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনীয় বই এই গ্রন্থমালায় খুঁজে পাবেন। এই গ্রন্থমালার সাহায্যে বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চার একটি নতুন মান সৃষ্টি হবে।

.

দ্বিতীয় সংস্করণের নিবেদন

কিছুটা বিস্মিতই হই, যখন আনন্দ পাবলিশার্স থেকে আমাকে জানানো হল এই বইয়ের প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত। তখন নিছক পুনর্মুদ্রণ না করে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম এই কারণে যে, বিগত এক দশকে প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চায় নানাবিধ বদল ঘটেছে। আবিষ্কৃত হয়েছে নূতন নূতন তথ্য। তার ফলে প্রাচীন যুগের অর্থনৈতিক জীবনের সম্পর্কে ধারণা যে শুধু সমৃদ্ধ হয়েছে তা-ই নয়, উঠে এসেছে বেশ কিছু অভিনব প্রশ্ন, সমস্যা ও সমাধান। লেখকের নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে বিগত দশ বছরে। দ্বিতীয় সংস্করণে তাই যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি নূতন তথ্যাদি সন্নিবিষ্ট করতে, প্রয়োজনমতো বক্তব্যকে পরিমার্জিত ও সংশোধন করতে। বইটির খোল-নলচে বদল করতে গেলে বহু সময় লেগে যেত। তাই মূল গ্রন্থ প্রায় অবিকৃত রেখে নূতন ভাবনা চিন্তাগুলি দেওয়া হল বই-এর শেষে–—‘সংযোজন’ রূপে। ‘সংযোজন’ অংশের একটি নিজস্ব গ্রন্থ/প্রবন্ধ তালিকাও দেওয়া আছে, যা মূল গ্রন্থের গ্রন্থপঞ্জি থেকে আলাদা। পাঠক দেখবেন যে সংযোজন অংশে কোনও কোনও প্রাচীন শব্দের বানানে মূল গ্রন্থের বানান থেকে বদল করা হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকেই এই পরিবর্তন করা হল।

দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরিতে অবিরাম উৎসাহ দিয়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সুভাষরঞ্জন চক্রবর্তী। এই সংস্করণের প্রুফ দেখার ব্যাপারে নিরন্তর সাহায্য করেছেন আনন্দ পাবলিশার্সের সুদক্ষ কর্মীবৃন্দ; তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমার ছাত্র ও গোবরডাঙা হিন্দু কলেজের অধ্যাপক শ্রীকৃষ্ণেন্দু রায় দ্বিতীয় সংস্করণ প্রস্তুতিতে বিশেষ সাহায্য করেছেন; তাঁকেও সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

‘সংযোজন’সহ এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরি করার সময় বারবার বেদনাপ্লুত হয়েছি এই ভেবে যে, এবারে পরামর্শ পাবার জন্য এই গ্রন্থমালার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অধ্যাপক অশীন দাশগুপ্তের দ্বারস্থ হবার কোনও উপায়ই মহাকাল আর রাখেননি।

বিনীত
রণবীর চক্রবর্তী

.

প্রথম সংস্করণের নিবেদন

সময়সীমা খানিকটা পেরিয়ে গেলেও শেষ অবধি বইটি যে সম্পূর্ণ হল তার জন্য লেখক নিশ্চিন্ত ও আশ্বস্ত। বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ও আনুকূল্য এই বই লেখায় প্রেরণা দিয়েছে। প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স শুধুমাত্র লেখকের নয়, বাংলাভাষী ইতিহাসপ্রেমী মানুষের কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয়ে থাকবেন; কারণ বাংলাভাষায় ইতিহাসচর্চা যে আশু প্রয়োজন ও জরুরী, সেই ব্যাপারে তাঁরা সচেতন ও সক্রিয় পদক্ষেপ নিলেন।

যাঁকে বাদ দিয়ে এই গ্রন্থের অস্তিত্বই চিন্তার অতীত, তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্য অধ্যাপক অশীন দাশগুপ্ত। বর্তমান লেখকের মত স্বল্পপ্রতিষ্ঠিত ও অর্বাচীন ব্যক্তিকে দিয়ে এই গ্রন্থ লেখানোর যে ঝুঁকি তিনি নিয়েছিলেন, তা ঠিক হয়েছিল কি না, ইতিহাসই তার বিচার করবে। ১৯৮৬ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক আলোচনাচক্রে যোগ দিতে এসে এমন একটা প্রস্তাব যখন তিনি রেখেছিলেন, তখন নানা কারণে আমি কর্মজীবনে খানিকটা বিক্ষিপ্ত ও বিভ্রান্ত অবস্থায়। এমন একটি গুরুদায়িত্ব দিয়ে তিনি গ্রন্থকারের অবসন্নতার অবসান ঘটিয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস বিষয়ে আমার শিক্ষক অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য; বহু ভুল শুধরিয়ে, বহু অজানা তথ্য জানিয়ে, অবলীলায় অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করতে দিয়ে তিনি প্রতি পদে আমার ইতিহাসচর্চায় সাহায্য করেছেন। একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা জানাই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়কে, যাঁর ইতিহাসচর্চার রীতিপদ্ধতি বারবার আমার সশ্রদ্ধ বিস্ময় উদ্রেক করেছে। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান হবিব ও অধ্যাপক ইক্‌তিদার আলম খানের সঙ্গে নানা সময়ে দীর্ঘ আলোচনা যে কতটা মূল্যবান হয়েছিল, তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অভ ওরিয়েন্টাল অ্যাণ্ড আফ্রিকান স্টাডিজ-এর অধ্যাপক কীৰ্ত্তিনারায়ণ চৌধুরী মশাই যেভাবে তাঁর বহুমূল্য সময় আমার জন্য অক্লেশে ব্যয় করেছেন, তা কখনও ভোলার নয়। অকৃপণ উৎসাহ যুগিয়েছিলেন বর্দ্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপ্তেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতীয় ইতিহাস, সমাজ নিয়ে বর্দ্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রনীতি বিভাগের শ্রী অভিজিৎ মিত্রের সঙ্গে যে আড্ডা ও বিতর্ক চলত, তার স্মৃতি যেমন সততই সুখের, তেমনই তা আমার দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করেছিল।

অধ্যাপকসুলভ নাতিদ্রুত গতিতে চলা সত্ত্বেও এই বই যে শেষ হল, তার অনেকখানি কৃতিত্ব আমার স্ত্রী টুটুলের প্রাপ্য; সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় ও অনেক বেশী কাজের চাপের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও আমার বই লেখার ব্যাপারে তাঁর যে আগ্রহ ও নজর ছিল, তার প্রতি আংশিক সুবিচার করতে পেরেও আমি খুশী।

আমার দুই ছাত্রছাত্রী, শ্ৰী শুদ্ধব্রত দেব প্রুফ সংশোধনে ও শ্রীমতী সংযুক্তা দত্ত বিষয়সূচী তৈরী করায় প্রভূত সাহায্য করেছেন। আরও অনেক ব্যক্তির কাছ থেকে এই বই লেখার সময়ে নিয়মিত সাহায্য পেয়েছি; পূর্বসূরী ঐতিহাসিকদের শ্রমসাধ্য গবেষণা আমার কাজ অনেকাংশে সহজ করে দিয়েছে। এতৎসত্ত্বেও গ্রন্থটিতে নানা ঘাটতি ও বিচ্যুতি রয়ে গেল–—যার দায় অবশ্যই আমার। কারণ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অনুসরণে বলতে পারি “আমি অন্ধকারে বদ্ধমূল, আলোর দিকে উঠছি।”

রণবীর চক্রবর্তী
প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

.

কথামুখ

মানুষ অতীতের কথা বলতে ও শুনতে ভালবাসে; সেই অতীতের ঘটনা তার নিজের জীবনের হতে পারে, অথবা তার পরিবার বা পরিচিত মানুষের অতীত কাহিনীও হতে পারে। একই সঙ্গে মানুষ তার নিজের দেশের এবং অন্য দেশের পুরনো দিনগুলির প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। স্মৃতিকে ধরে রাখা ও ইচ্ছেমত তাকে পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা কেবল মানুষেরই আছে। অতীত সম্বন্ধে মানুষের আকর্ষণ ও আগ্রহ থেকে জন্ম নিয়েছে এক বিশেষ জ্ঞান যা সাধারণভাবে ইতিহাস বলে আখ্যাত; অতীতের ঘটনাই যে ইতিহাসের উপজীব্য, তা বিশদ ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না।

অতীতকে জানার উৎসাহ পৃথিবীর আর সব মানুষের মত ভারতবাসীর মধ্যেও দেখা দিয়েছিল সুপ্রাচীন কালে। ‘ইতিহাস’ কথাটির ব্যুৎপত্তি ‘ইতি হ আস’, অর্থাৎ অতীতে ঠিক যেমনটি ঘটেছিল। অতীতচর্চার বিশেষ বিদ্যাটিকে ‘ইতিহাস’ সংজ্ঞা দ্বারা চিহ্নিত করার কৃতিত্ব প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাবিদদের অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও আধুনিক আমলের আগে ভারতের ইতিহাস প্রায় অজানাই ছিল। ইতিহাস বলতে আধুনিক মানুষের কাছে অতীতাশ্রয়ী ঘটনার আলোতে সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে এক বিশেষ বিদ্যাকে বোঝায়। প্রাচীন ভারতীয়রা ‘ইতিহাস’ শব্দটি তৈরী করতে পেরেছিলেন, কিন্তু অতীত ঘটনার পৌর্বাপর্য বজায় রেখে তথ্যনিষ্ঠ নিরাবেগ বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করার প্রবণতা প্রাচীন ভারতে নিতান্ত বিরল। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম কলহণ রচিত কাশ্মীরের ইতিহাস রাজতরঙ্গিণী; এই গ্রন্থে কলহণ যেভাবে অতীতের তথ্য ও তথ্যসূত্রগুলিকে ঝাড়াইবাছাই করে, নিজস্ব মতামত সহ ও ‘রাগদ্বেষবিবর্জিতম্‌’ হয়ে কাশ্মীরের অতীত ইতিহাস দ্বাদশ শতকে লিখেছিলেন, তা রীতিমত বিস্ময়কর। অতীত ঘটনা লিপিবদ্ধ করায় অনীহা, প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে কল্পনা, অতিকথা, লোকগাথার যথেচ্ছ মিশেল এবং দেশকালের সুনির্দিষ্ট ধারণা বিষয়ে অভাব–—এই কারণগুলির জন্য প্রাচীন ভারতে ইতিহাসচর্চা এক অবহেলিত বিষয়।

ভারতে জ্ঞানের বিবিধ চর্চার মত ইতিহাস অনুসন্ধিৎসার সূচনাও ঔপনিবেশিক আমলে। প্রথমে ব্যবসা বাণিজ্য বিস্তারের জন্য ও পরে দেশ শাসনের প্রয়োজনে ইওরোপীয়দের ও প্রধানত ব্রিটিশদের পক্ষে অপরিহার্য ছিল এই বিশাল দেশটির স্বরূপ বুঝে নেওয়া। ইওরোপের সঙ্গে ভারতের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিগত দুস্তর ব্যবধান থাকার দরুন এই প্রয়োজন আরও বেশী অনুভূত হয়। যেহেতু ভারতে আধুনিক রীতিপদ্ধতিতে ইতিহাস চর্চার কোনও রেওয়াজ ছিল না, অথচ ভারতের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অনেকাংশেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী, তাই ভারতের অতীত পুনরুদ্ধারের জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি সচেষ্ট ছিল। ঔপনিবেশিক স্বার্থই যে ইওরোপীয় তথা ব্রিটিশদের ভারতের অতীত চর্চায় প্রণোদিত করেছিল, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু ভারত ইতিহাসের চর্চায় পথিকৃতের গৌরব ও মর্যাদা তাঁদের অবশ্যই প্রাপ্য। প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের ভারতের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল নির্দিষ্ট কালানুক্রমের অভাব; ইওরোপীয় ঐতিহাসিকরা ও তাঁদের অনুসরণে ভারতীয়রা তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনরুদ্ধার করতে প্রথমে প্রয়াসী হন। কারণ রাজনৈতিক ইতিহাস স্পষ্ট হলে একটি দেশের অতীত ঘটনার কালগত কাঠামোটি পরিষ্কার হয়। এমতাবস্থায়, বুঝতে অসুবিধে হয় না, ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে ভারতের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের বর্ণনা ও ব্যাখ্যার প্রতি মূল নজর ছিল না। বিশেষত প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস ছিল প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন।

এই বিষয়ে প্রথম পদক্ষেপ রেখেছিলেন জর্মন পণ্ডিত ক্রিশ্চিয়ান লাস্‌সেন তাঁর ইণ্ডিশে আলটারটুমস্‌কুণ্ডে নামক গ্রন্থে। চার খণ্ডে বিভক্ত ও ১৮৪৭ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত চৌদ্দ বছর ধরে প্রকাশিত এই বিশাল বইতে লাস্‌সেন স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ আলোচনা করেছেন; কিন্তু তুলনায় অপ্রতুল হলেও কারিগরী বৃত্তি ও ব্যবসা বাণিজ্য সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ লক্ষ্য করার মত। তিনি বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত প্রাচীন ভারতের সীমারেখা টেনেছিলেন। উনিশ শতকের মধ্যভাগে প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চার যে গোড়াপত্তন ঘটল, তার পরে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন ঘটে ঐ শতাব্দীর একেবারে শেষে। ১৮৯৭ সালে আর এক জর্মন পণ্ডিত রিচার্ড ফিক প্রধানত বৌদ্ধ জাতক গ্রন্থগুলিকে ভিত্তি করে বুদ্ধের সমসাময়িক উত্তর-পূর্ব ভারতের সামাজিক অবস্থা বিষয়ে যে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশ করেন (ইংরেজী অনুবাদ ১৯২০-তে প্রকাশিত), তাতে অর্থনৈতিক ইতিহাসের বহু অজানা তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। প্রায় একই সময়ে (১৯০১) শ্ৰীমতী রিস ডেভিড্‌স প্রায় অনুরূপ বিষয়ে গবেষণা করেছিলেন। তবে খেয়াল রাখা দরকার যে লাস্‌সেন, ফিক ও শ্ৰীমতী রিস ডেভিড্‌স প্রত্যেকেই ছিলেন প্রধানত ভাষাবিদ্যাবিশারদ; তাঁদের মূল উৎসাহ ছিল তুলনামূলক ভাষাচর্চায়, অর্থনৈতিক ইতিহাস তাঁদের প্রাথমিক আকর্ষণের বিষয় ছিল না। অবশ্যই একথা মানতে হবে যে, প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চার শৈশব এঁদের পরিচর্যায় কেটেছিল।

বিশ শতকের গোড়ায় (১৯০৪) প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস চর্চা ও ঔপনিবেশিক স্বার্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মূৰ্ত্ত হয়: ঐ বছর প্রকাশিত হয়েছিল প্রসিদ্ধ প্রশাসক-ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথ-এর আর্লি হিস্ট্রি অভ ইণ্ডিয়া। তাঁর ইতিহাস রচনার রীতিপদ্ধতি পূর্বসূরীদের তুলনায় উন্নত ছিল। যদিও তিনি প্রধানত প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের একটি সামগ্রিক রূপরেখা দেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারই মধ্যে তিনি অর্থনৈতিক ইতিহাস বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন: প্রাচীন ভারতে জমির মালিক ছিলেন রাজা এই মত প্রতিষ্ঠা করতে তিনি প্রয়াসী হন। এই সময় ব্রিটিশ সরকার কৃষি অর্থনীতি ও ভূমিব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট ছিলেন; এই অবস্থায় ভারতে ভূমি ব্যবস্থায় রাজকীয় মালিকানা ও আধিপত্যের এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে, এ কথা প্রমাণ করলে কার্যতঃ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক দাপটেরই মদত দেওয়া হয়।

অন্যদিকে এইচ. জি. রলিনসনের ইন্টারকোর্স বিটুইন ইণ্ডিয়া অ্যাণ্ড দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ড (১৯১৬) ও ই. এইচ. ওয়ার্মিংটনের কমার্স বিটুইন ইণ্ডিয়া অ্যাণ্ড দ্য রোমান এম্পায়ার (১৯২৮)–—এই দুই বইতে ভারতের সঙ্গে পাশ্চাত্ত্যের দূরপাল্লার ব্যবসাবাণিজ্য–—বিশেষত সমুদ্রবাণিজ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা দেখা যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতের বিশেষ ভূমিকা স্বীকৃত হয়। কিন্তু এই দুই গ্রন্থে এইরকম আভাস দেওয়া হয়েছে যে ভারতীয় পণ্য বিদেশে বহু সমাদৃত হলেও ভারতীয়রা সরাসরি বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশ নিত না; পশ্চিমের বণিকরাই আসলে বাণিজ্যে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। রলিনসন ও ওয়ার্মিংটন সম্ভবত প্রচ্ছন্নভাবে এই মতই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, অতি প্রাচীন কাল থেকেই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদেশীদেরই প্রাধান্য ছিল। এই প্রাধান্যের ঐতিহ্যের ধারণাকে ব্রিটিশ শক্তি নিজস্ব ঔপনিবেশিক স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতীয়দের তুলনায় পশ্চিমী ব্যবসায়ীদের অগ্রণী ভূমিকার ধারণা বলবৎ ছিল দীর্ঘকাল–—যার প্রমাণ পাওয়া যাবে এম. পি. চার্লসওয়ার্থ (‘রোমান ট্রেড উইথ ইণ্ডিয়া: এ রিসার্ভে’, পি. আর. কোলম্যান–—নর্টন সম্পাদিত, স্টাডিজ ইন রোমান ইকনমিক অ্যাণ্ড সোশ্যাল হিস্ট্রি, প্রিন্সটন, ১৯৫১) ও স্যার মর্টিমার হুইলারের (রোম বিয়ণ্ড দ্য ইম্পিরিয়াল ফ্রন্টিয়ার্স, লণ্ডন, ১৯৫৪) গবেষণায়। একই সঙ্গে ইওরোপীয় লেখকদের রচনায় নির্দেশ করা হতে থাকে যে ভারতের সমাজ ও অর্থনীতি সুদূর অতীত থেকেই গতিহীন, পরিবর্তনবিহীন ও জড়ত্বগ্রস্ত। তার উদ্ভাবনী শক্তি ও জীবনী শক্তি প্রায় নেই বললেই চলে। এই সনাতন আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পাশ্চাত্যের উন্নততর অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার প্রভাব ভারতের উপর পড়ে ও ভারতীয় আর্থ-সামাজিক জীবনে প্রাণসঞ্চার হয়। অর্থাৎ এই জাতীয় ধারণার দ্বারা কার্যত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্বার্থের ও শাসনের জয়গান গাওয়া হয়েছিল।

এর প্রতিবাদে ধীরে ধীরে দেশীয় পণ্ডিতসমাজ সক্রিয় হন। বিশ শতকের গোড়ায় বঙ্গভঙ্গের ফলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্বদেশকে সম্যকভাবে জানার আগ্রহ বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ভারতের অতীত দিনের গৌরবময় ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে ঐতিহাসিকরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তাগিদ অনুভব করেছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে দাদাভাই নওরোজী ও রমেশচন্দ্র দত্তের গবেষণা ব্রিটিশ শোষণের রূপকে প্রকট করেছিল। বিংশ শতাব্দীর দশের দশকে কাশীপ্রসাদ জয়সওয়াল মডার্ণ রিভিয়ু পত্রিকায় ও পরে (১৯২৪) তার বিখ্যাত গ্রন্থ হিন্দু পলিটি-তে দৃঢ়ভাবে ভিনসেন্ট স্মিথ-এর প্রাচীন ভারতীয় ভূমিব্যবস্থার ধারণাকে খণ্ডন করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন প্রাচীন ভারতে জমির মালিকানা ছিল ব্যক্তিগত, রাজকীয় নয়। অন্যদিকে রাধাকুমুদ মুখার্জী ভারতীয়দের সমুদ্রবাণিজ্যে নিয়মিত অংশগ্রহণকে ভারতীয় তথ্যসূত্রের সাহায্যে প্রমাণ করতে প্রয়াসী হন (ইণ্ডিয়ান শিপিং অ্যাণ্ড ম্যারিটাইম এ্যাকটিভিটি, ১৯১২)। ১৯১৮ সালে রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর কর্পোরেট লাইফ ইন এনশেন্ট ইণ্ডিয়া বইতে দেখিয়েছিলেন গিল্ড বা বৃত্তিধারী সংগঠনগুলি প্রাচীন ভারতে কি রকম সক্রিয় ছিল; রিস ডেভিড্‌স যে এই জাতীয় কোনও সংগঠনকে জাতক কাহিনীগুলিতে দেখতে পাননি, এই মতের অসারতাও প্রতিপন্ন হয়। প্রায় অনুরূপভাবেই দক্ষিণ ভারতের গিল্ডগুলির পরিচয় তুলে ধরেছিলেন রাধাকুমুদ মুখার্জী তাঁর লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট ইন এনশেন্ট ইণ্ডিয়া (১৯২০)-তে; এই বইতে তিনি দক্ষিণ ভারতের লেখমালার বহুল ব্যবহার করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে জে. এন. সমাদ্দার, এম. এ. বাখ, প্রাণনাথ, এস. কে. দাস ও এন. সি. বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতির নানা দিক তুলে ধরেন; তার মধ্যে বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইকনমিক লাইফ অ্যাণ্ড প্রগ্রেস ইন এনশেন্ট ইণ্ডিয়া, প্রথম খণ্ড, (১৯২৫) বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে।

বিংশ শতকের প্রথম দিকে প্রাচীন ভারতীয় অর্থনৈতিক ইতিহাস রচনায় আগ্রহ বৃদ্ধি পাবার অন্যতম কারণ কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র-এর আবিষ্কার। ১৯০৯ সালে এই প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থের সম্পাদিত রূপ প্রকাশিত হয়, পূণাঙ্গ অনুবাদ বার হয় ১৯১৫–—দুই-ই করেন শ্যামশাস্ত্রী। প্রাচীন ভারতে অর্থনীতি বিষয়ক চিন্তা যে কত উন্নত ছিল, তা বারবার তুলে ধরতে থাকেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক। এর মধ্যে হেমচন্দ্র রায়ের কথা বলা উচিত; তিনি অর্থশাস্ত্রের ভিত্তিতে দেখাবার চেষ্টা করেছিলেন (১৯২২, ১৯২৬) বিসমার্কের আমলে জামনিীতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমাজতান্ত্রিক যে পদক্ষেপগুলি নেওয়া হয়, তার অনেক প্রাচীন রূপ অর্থশাস্ত্রে পাওয়া যাবে। রাও বাহাদুর রঙ্গস্বামী আয়াঙ্গারের বক্তব্যও প্রায় একইরকম (আসপেক্টস্ অভ এনশেন্ট ইণ্ডিয়ান থট, ১৯২৭), তবে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেন যে প্রাচীন ভারতে অর্থনীতির ধারণা যেখানে এতই উন্নত সেখানে পাশ্চাত্যের সমাজতান্ত্রিক ধারণা ধার করার কোনও দরকার নেই। সমকালীন ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে আকর তথ্যের নিপুণতম ব্যবহার ও বিশ্লেষণ দ্বারা প্রাচীন ভারতের অর্থনীতি বিষয়ে যাঁর গবেষণা এখনও অপরিহার্য তিনি উপেন্দ্রনাথ ঘোষাল। তাঁর এ্যাগ্রেরিয়ান সিস্টেম ইন এনশেন্ট ইণ্ডিয়া-তে (১৯৩০) তিনি প্রাচীন ভারতে ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণাকে তর্কাতীতভাবে উপস্থাপিত করেন; একই সঙ্গে বৈদেশিক বিবরণ আশ্রয় করে তিনি দেখিয়েছিলেন যে প্রাচীন ভারতের কৃষিজীবী মানুষ সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাত। তাঁর অপর বিখ্যাত গ্রন্থ কন্ট্রিবিউশনস টু দ্য হিস্ট্রি অভ হিন্দু রেভিন্যু সিস্টেম (১৯২৯)-এ তিনি বৈদিক আমল থেকে ১২০০ খ্রীঃ পর্যন্ত রাজস্ব ব্যবস্থার বিবরণ দিয়েছিলেন। ঘোষাল দেখাতে চেয়েছিলেন যে প্রাচীন ভারতে রাজা রাজস্বের অধিকারী ছিলেন কারণ তিনি প্রজাদের রক্ষণ ও পালন করতেন; এই মন্তব্য দ্বারা ঘোষাল সম্ভবত ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সপ্তদশ শতকে ইওরোপে সামাজিক চুক্তির যে রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, অনুরূপ ধারণা ভারতে অনেক প্রাচীনতর আমলে বিদ্যমান ছিল। ঘোষাল সহ বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের নিরলস গবেষণা প্রাচীন ভারতের ভূমিব্যবস্থা, কৃষি অর্থনীতি, কারিগরী বৃত্তি ও বৃত্তিধারী সংগঠন, ঋণব্যবস্থা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বহু অজ্ঞাত তথ্যকে অবিসংবাদীভাবে প্রমাণ করে। তাঁরা মূলত প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার সুখকর ও শান্তিপ্রদ চেহারা প্রমাণ করতে প্রয়াসী ছিলেন। তাঁদের গবেষণার ফল নিঃসন্দেহে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মদত দেয়। কিন্তু প্রাচীন ভারতের অর্থনীতির জয়গান করতে গিয়ে তাঁরা বহু ক্ষেত্রেই তার ত্রুটি–—বিশেষত সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অসাম্য ও দুর্বলতর গোষ্ঠীর নিপীড়িত অবস্থা বিষয়ে–—সম্বন্ধে নীরব ছিলেন; অথবা সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যকে নানা দার্শনিক তত্ত্ব দ্বারা দোহাই দেবার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়া বিদেশী ঐতিহাসিকদের মতই ভারতীয় ঐতিহাসিকদের রচনাতেও প্রাচীন ভারতীয় অর্থনৈতিক অবস্থার ধারাবাহিকতার উপরই অতিরিক্ত জোর দেখা যাবে।

বিশ শতকের তিন ও চারের দশকে প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা আগ্রহী হন। তার ফলে এ. এস. আলটেকরের দ্য রাষ্ট্রকূটস অ্যাণ্ড দেয়ার টাইমস (১৯২৭) ও কে. এ. নীলকান্ত শাস্ত্রীর দ্য চোলস (১৯৩৫) গ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হয়। যদিও রাজনৈতিক ঘটনা বর্ণনাতেই এই দুই লেখকের প্রধান আগ্রহ ছিল, তবুও প্রাসঙ্গিক অধ্যায়ে তাঁরা দাক্ষিণাত্য ও দক্ষিণ ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার আলোচনা করেন। এই জাতীয় রচনাতেও অতীতস্তুতির লক্ষণ আমাদের নজরে পড়ে। দক্ষিণ ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস বিষয়ে তথ্যনিষ্ঠ ও প্রামাণ্য গ্রন্থের মধ্যে এ. আপ্পাদোরাই-এর ইকনমিক কণ্ডিশনস্‌ ইন সাউদার্ন ইণ্ডিয়া (১৯৩৬)-র উল্লেখ অবশ্যই করা দরকার। দক্ষিণ ভারতের অর্থনৈতিক জীবনে মন্দিরগুলির তাৎপর্যময় ভূমিকা নিয়ে চারের দশকে তথ্যনিষ্ঠ গবেষণা করেন কুমুদরঞ্জন চ্যাটার্জী (‘টেম্পল অফারিংস এণ্ড টেম্পল সার্ভেন্টস ইন সাউথ ইণ্ডিয়া’, প্র. ই. হি. ক., ১৯৪০: ১৫৬-৬৮), এম. ভেক্টটেশ্বরালু (‘ল্যাণ্ড গ্রান্টস ইন মিডিভ্যাল অন্ধ্র’, জ. অ. হি. রি. সো., ২১, ১৯৪৯: ১২-১৬)।

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস তথা অর্থনৈতিক ইতিহাসের গবেষণায় মার্ক্সীয় চিন্তাধারার অবদান অনস্বীকার্য। প্রাক আধুনিক আমলের ভারতীয় অর্থনীতিকে মার্ক্স এশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার তত্ত্ব দ্বারা বিচার করেছিলেন। তাঁর ধারণা অনুযায়ী প্রাক-আধুনিক ভারতীয় সমাজ পরিবর্তনবিমুখ, আবদ্ধ ও জড়বৎ; এশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার প্রভাবে ভারতে স্বনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাধান্য ছিল অবিসংবাদিত; জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা অনুপস্থিত ও রাষ্ট্রের দ্বারা গ্রাম সমাজ পুরোপুরি অবদমিত। লক্ষ্যণীয় যে ইংরেজ ও ইওরোপীয় ঐতিহাসিকদের মত কার্ল মার্ক্সও ভারতীয় অর্থনীতি ও সমাজের অপরিবর্তিত চরিত্রের তত্ত্বে আস্থাবান ছিলেন। মার্ক্সীয় চিন্তাধারার প্রভাবে ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার দিকে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের নজর পড়েছিল। ভারতের মার্ক্সীয় ঐতিহাসিকদের অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত-র রচনায় (স্টাডিজ ইন ইণ্ডিয়ান সোশ্যাল পলিটি, কলকাতা, ১৯৪৪; ডায়ালেকটিকস অভ ল্যাণ্ড-ইকনমিকস ইন ইণ্ডিয়া, কলকাতা, ১৯৫২)। প্রাচীন ভারত তাঁর গবেষণার নির্দিষ্ট বিষয় না হলেও, শ্রেণী সংঘর্ষ সামন্ত প্রথার উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে তাঁর বক্তব্য পরবর্তী মার্ক্সীয় লেখকদের কাছে বিশেষ মূল্যবান হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে অন্যতম প্রথম লেখক অতীন্দ্রনাথ বসু (সোশ্যাল এণ্ড রুরাল ইকনমি অভ নর্দার্ণ ইণ্ডিয়া, কলকাতা ১৯৪২-৪৫, দুই খণ্ডে সমাপ্ত)। তিনি তাঁর গ্রন্থে খোলাখুলি মার্ক্সীয় চিন্তার উল্লেখ না করলেও উপসংহারে যখন শ্রেণী ও শ্রেণীচেতনা, শ্রেণী সংঘর্ষ ও সমঝোতা প্রভৃতি বিষয়ের উত্থাপন করেন, তখন আন্দাজ করা যায় যে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীসুলভ ইতিহাস চর্চার পদ্ধতি সম্বন্ধে তিনি সম্যক অবহিত ছিলেন। এস. এ. ডাঙ্গের ইণ্ডিয়া ফ্রম প্রিমিটিভ কম্যুনিজম টু স্লেভারি-তে (১৯৪৯) কিছুটা গোঁড়াভাবেই মার্ক্সীয় পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়। মার্ক্সীয় পদ্ধতিতে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে প্রাণপুরুষ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বী, যাঁর কাছে সকল ইতিহাসই ছিল মূলত অর্থনীতির ইতিহাস। উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুগে যুগে যে বদল ঘটে তা-ই কোসাম্বীর কাছে ইতিহাস; অর্থাৎ কোসাম্বী শুধু মার্ক্সীয় পদ্ধতিতে ইতিহাসকে দেখলেন না, তিনি প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের পরিবর্তনশীল চরিত্রকেও তুলে ধরলেন। বহু ক্ষেত্রে তিনি নৃতত্ত্ব, গণিত, সংখ্যাতত্ত্বের প্রয়োগ দ্বারা ভারতীয় ইতিহাসের বস্তুবাদী বিশ্লেষণ করেছিলেন। কোসাম্বী ভারত ইতিহাসে সামন্ত প্রথা সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে পাওয়া যায় রামশরণ শর্মার বিখ্যাত গ্রন্থ ইণ্ডিয়ান ফিউডালিজম (প্রথম সংস্করণ ১৯৬৫, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৮০)। ভারতীয় অর্থনীতি প্রাচীন আমলে গতিহীন যে ছিল না, তাতে উত্থান পতন ও বিকাশ এবং অবক্ষয় যে উপস্থিত ছিল তা প্রধানত কোসাম্বী ও শর্মার অবদান। সামন্তপ্রথার উদ্ভব, শর্মার বিচারে, ভারতীয় ইতিহাসে আদি পর্বের অবসান ঘটিয়ে আদি মধ্যযুগের আবির্ভাব ঘটায়। এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে এই বই এর অষ্টম অধ্যায়ে; তাই তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন। মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে ইতিহাস চর্চা ভারত ইতিহাসের ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের পথ প্রশস্ত করেছে। মার্ক্সীয় ঐতিহাসিকদের সিদ্ধান্তগুলিতে আপত্তি কোনও কোনও পণ্ডিত জানালেও একথা অস্বীকার করা অসম্ভব যে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মাধ্যমে তাঁরা সার্থকভাবে প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিতে নানা পরিবর্তনের প্রমাণ দাখিল করেছেন এবং পরিবর্তন ঘটার পিছনে কার্যকারণ সম্পর্ক দেখাতে প্রয়াসী হয়েছেন।

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে পরিবর্তনের ধারণা এখন অধিকাংশ ঐতিহাসিকের দ্বারাই সমর্থিত। গত তিন দশকে প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের নানা দিক নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে গবেষণা চলছে। সংখ্যাতত্ত্বের প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন জাপানী পণ্ডিত নোবুরু কারাশিমা (সাউথ ইণ্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড সোসাইটী, ১৯৮৬)। নৃতাত্ত্বিক ধারণা ও ছক ব্যবহারের দ্বারা প্রাচীন ভারতের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ব্যবস্থার ব্যাখ্যা দেবার প্রয়াসও চোখে পড়ে (রোমিলা থাপার দ্বারা দান ও দক্ষিণার মাধ্যমে লেনদেনের সম্পর্ক বিচার; এনশেন্ট ইণ্ডিয়ান সোশ্যাল হিস্ট্রি, দিল্লী, ১৯৭৮; ঐ, ফ্রম লিনিয়েজ টু স্টেট, দিল্লী, ১৯৮৪)। তবে তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে কখনও কখনও হয়তো তথ্যসংগ্রহের প্রতি যথাযথ সুবিচার করা হচ্ছে না; তার ফলে ইদানীং বেশ কিছু গবেষণা অতিরিক্ত তত্ত্বঘেঁষা হয়ে পড়ছে, এবং সবক্ষেত্রে আকর তথ্যের শক্ত জমিতে তত্ত্বগুলিকে দাঁড় করানো যাচ্ছে না। তবে নতুন তথ্য আবিষ্কার ও গবেষণার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বৈচিত্র্য ও বিতর্কের দরুণ প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চা ক্রমেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। এখানে একটি নতুন ধরনের গবেষণার কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। রাজনৈতিক ঘটনাবলীর পিছনে অর্থনৈতিক কারণগুলি যে নানা সময় সক্রিয় ভূমিকা নিত, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক মহলে সচেতনতা লক্ষ্য করার মত। হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী ও দামোদর ধমানন্দ কোসাম্বী তাঁদের রচনায় রাজনৈতিক ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা সার্থকভাবে রেখেছিলেন। এই বিষয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই রচনা করেন ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় (দ্য ইকনমিক ফ্যাক্টরস ইন কুষাণ হিস্ট্রি, ১৯৭০)। প্রাচীন ভারতে রাজনৈতিক উত্থান-পতন সংঘর্ষ-বিরোধ ইত্যাদি বুঝবার জন্যও যে অর্থনৈতিক ইতিহাস যথাযথ অনুধাবন করা দরকার, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক মহলে বিশেষ দ্বিমত নেই।

আলোচ্য গ্রন্থে খ্রীঃ পূঃ ২৩০০ থেকে খ্ৰীষ্টীয় ১২০০ পর্যন্ত প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতির যে রূপরেখা উপস্থাপিত, তা বহু ঐতিহাসিকের অনলস সাধনার ফসল। প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় যুগবিভাগের ক্ষেত্রে এই বইতে চিরাচরিত রাজনৈতিক যুগবিভাগ অনুসরণ করা হয়নি। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে এক-একটি আমলের স্বকীয়তা তুলে ধরার প্রয়াস এখানে আছে, এবং তদনুসারে যুগবিভাগ করা হয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের ভিত্তিতে যুগবিভাগ না করেও যে প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিরই পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতির নিরিখে বিভিন্ন পর্ব নির্দেশ করা সম্ভব, এই ধারণাটি প্রধানত রামশরণ শর্মার গবেষণা থেকে পাওয়া। অবশ্য পাঠক বুঝতে পারবেন, এই বইতে রামশরণ শর্মা ও তাঁর অনুগামীদের ছক ও দৃষ্টিভঙ্গী সর্বত্র অনুসৃত হয়নি।

প্রাচীন ভারতীয় অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার সূচনা নিঃসন্দেহে ২৩০০ খ্রীঃ পূঃ-এর আগেই ঘটেছিল; কিন্তু অর্থনৈতিক জীবনের ন্যূনতম তথ্য ২৩০০ খ্রীঃ পূঃ আগে বেশী পাওয়া যায় না। তাই ২৩০০ খ্রীঃ পূঃ থেকেই এই বই-এর পরিক্রমা শুরু। নগরাশ্রয়ী হরপ্পা সভ্যতার অর্থনৈতিক জীবন সম্বন্ধে আলোচনা আরও বিস্তৃত করা যেত; কিন্তু এই বিষয়টিতে পুরাতাত্ত্বিকদেরই অধিকতর অধিকার। এই গ্রন্থমালার অন্য খণ্ডে উৎসাহী পাঠক উপযুক্ত পুরাতাত্ত্বিকের লেখনীতে নগরাশ্রয়ী হরপ্পীয় অর্থনীতির সম্বন্ধে আরও বেশী জানতে পারবেন। প্রাচীন ভারত কথাটি এই গ্রন্থে ইংরেজী ‘আর্লি ইণ্ডিয়া’র সমার্থক; খ্রীঃ পূঃ ২৩০০-৬৫০ খ্রীঃ পর্যন্ত আদি পর্ব (এনশেন্ট), ৬৫০-১২০০ খ্রীঃ আদি মধ্যযুগ (আর্লি মিডিভ্যাল) হিসেবে চিহ্নিত।

পাঠকের বুঝতে নিশ্চয়ই অসুবিধা হবে না যে প্রাচীন ভারত বলতে যে ভূখণ্ডকে বোঝানো হয়েছে তা কেবলমাত্র আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক সীমানার ভিতর আবদ্ধ নয়। ভারতীয় উপমহাদেশ অথাৎ ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ জুড়ে থাকা ভূখণ্ডই আলোচ্য কাহিনীর স্থান। প্রয়োজনমত নিকট প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের প্রসঙ্গও এই বইতে আনা হয়েছে।

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস তথা অর্থনৈতিক ইতিহাস রচনার পক্ষে সবচেয়ে বড় বাধা তথ্যাল্পতা। প্রাচীন ভারতে আধুনিক অর্থে ইতিহাস চেতনার অভাবের কথা আগেই বলা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় তথ্য মুষ্টিমেয়। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য আয়তনে বিশাল, তার বৈচিত্র্যও যথেষ্ট। কিন্তু সমকালীন অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার প্রসঙ্গ বিশেষ নেই, যতটুকু আছে তা নিতান্তই পার্শমন্তব্য হিসেবে। অর্থনৈতিক জীবনের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তার উপযোগিতা নিয়েও পণ্ডিতমহলে বিতর্ক আছে; কারণ বহু ক্ষেত্রেই সাহিত্যগত বর্ণনায় দরবারী জীবনযাত্রা বা সম্পন্ন মানুষের কথাই স্থান পেয়েছে; সামগ্রিক অর্থনৈতিক জীবনের ছবি সেখানে অস্পষ্ট। দরবারী সাহিত্য বহু ক্ষেত্রে প্রথাগত হওয়ায় ঐ সাহিত্যের থেকে আহৃত তথ্যগুলির সীমাবদ্ধতা বিষয়ে ঐতিহাসিককে সচেতন থাকতেই হয়। সৃজনশীল সাহিত্য ছাড়াও প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের এক বিশাল অংশ শাস্ত্রগ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত। শাস্ত্রগ্রন্থতে অর্থনৈতিক জীবন বিষয়ে দরকারী তথ্য নিশ্চয়ই আছে, এবং সেই সব তথ্য এই বইতে যথাসাধ্য ব্যবহারও করা হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে শাস্ত্রকাররা আদর্শ সমাজের কথাই ভেবেছিলেন; তাঁদের বিধি বিধানগুলি উপদেশাত্মক এবং বাস্তব অবস্থার প্রকৃত পরিচয় সবক্ষেত্রে দেয় না। আলোচ্য গ্রন্থে বহু জায়গাতেই দেখানো হয়েছে শাস্ত্রবাক্য অক্ষরে অক্ষরে পালিত হত না।

বাস্তব অবস্থার কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায় বিদেশী আগন্তুকদের রচনায় ও লেখমালায় (এখানে পরিষ্কার করা উচিত যে ইংরেজী ‘ইনস্ক্রিপশন’ শব্দের সমার্থক কথা ‘লেখ’; লিপি কথাটি ‘স্ক্রিপ্ট’ বা হরফে বোঝাতে এই বইতে ব্যবহৃত)। প্রাচীন ভারতীয় অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা বুঝবার পক্ষে অপরিহার্য ও বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান লেখমালা। লেখমালা সাধারণ পাথরে বা তাম্রপট্টে উৎকীর্ণ বলে দীর্ঘস্থায়ী; রাজকীয়/ প্রশাসনিক দলিল হিসেবে তাদের ঐতিহাসিকতা অনস্বীকার্য এবং লেখমালার কাল নির্ধারণ করা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের তুলনায় কম বিতর্কসাপেক্ষ (লেখমালাতে বহু ক্ষেত্রে সম্বৎ উল্লিখিত থাকে; নির্দিষ্ট সন তারিখ জানা না গেলেও লেখমালার হরফ থেকে তার কাল নির্ধারণ করা যায়)। তবে লেখমালাও বহু ক্ষেত্রেই রাজদরবারের দৃষ্টিভঙ্গীই তুলে ধরে; ফলে তার থেকে সামগ্রিক জীবনযাত্রার পরিচয় পাওয়া শক্ত। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রাচীন ভারতীয় অর্থনৈতিক ইতিহাস পুনরুদ্ধার করতে লেখমালা কতটা জরুরী, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে ভারতীয় পুরালেখবিদ্যার কিংবদন্তীপুরুষ দীনেশচন্দ্র সরকারের বহু লেখায়। লেখমালা ও তাম্রশাসনে ভূমিব্যবস্থা, কৃষি অর্থনীতি, রাজস্ব ব্যবস্থা সহ অর্থনৈতিক জীবনের নানা দিকের যে ছবি পাওয়া যায়, তার জন্য দীনেশচন্দ্র সরকারের কাছে আমাদের ঋণ অপরিশোধ্য (বি. এন. মুখার্জী ও অন্যান্যদের দ্বারা সম্পাদিত, দীনেশচন্দ্রিকা, দিল্লী, ১৯৮৩: দীনেশচন্দ্র সরকারের রচনাপঞ্জী দ্রষ্টব্য)।

আর্থনীতিক অবস্থার আলোচনায় মুদ্রার সাক্ষ্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এতাবৎ ভারত ইতিহাসের রাজনৈতিক পালাবদল ও মূৰ্তিতত্ত্বের নানা দিক চর্চার জন্য মুদ্রার উপযোগিতা প্রমাণিত হয়েছে। কিছুকাল হল অর্থনৈতিক ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব সম্যকভাবে অনুভূত হচ্ছে। কারণ মুদ্রাপ্রধানত বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যম; ব্যবসা বাণিজ্য ও মুদ্রাব্যবস্থা ওতপ্রোত জড়িত। এই বিষয়ে ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণা বিশেষ উল্লেখের দাবী রাখে। কুষাণ আমল ও আদি মধ্যযুগে বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাস উদ্ধার করার জন্য তিনি মুদ্রার সাক্ষ্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন (ষষ্ঠ ও অষ্টম অধ্যায়ের গ্রন্থপঞ্জী দ্রষ্টব্য)। একইভাবে দক্ষিণ ভারতের মুদ্রা ও মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের রচনা (কয়েনস অ্যান্ড কারেন্সী সিসটেমস ইন সাউথ ইন্ডিয়া, দিল্লী, ১৯৭৭) বিশেষ প্রয়োজনীয়।

প্রাচীন ভারতীয় আর্থ-সামাজিক অবস্থার চাক্ষুষ পরিচয় পাবার কিছুটা নির্ভরযোগ্য উপকরণ প্রত্নবস্তু। বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও উৎখনন চালিয়ে পুরাতাত্ত্বিকরা যে সব নিদর্শন উদ্ধার করেন তাতে অনেক সময়ই অর্থনৈতিক অবস্থার বাস্তব চেহারা ধরা পড়ে। বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিকই চাক্ষুষ পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ থাকলে তবেই সমকালীন লেখমালা ও সাহিত্যগত সাক্ষ্যের উপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন। নগরায়নের আলোচনায় প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করা যায়। (তৃতীয় থেকে সপ্তম অধ্যায়ের গ্রন্থপঞ্জী দ্রষ্টব্য। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা উচিত অমলানন্দ ঘোষ সম্পাদিত, এ্যান এনসাইক্লোপিডিয়া অভ ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজি, (দুই খণ্ডে) নামক সদ্য প্রকাশিত বইটির কথা। বর্ত্তমান লেখক অবশ্য পাণ্ডুলিপি তৈরী করার সময় এই কোষগ্রন্থ ব্যবহারের সুযোগ পাননি।) ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় যে জীবনের ছবি পাওয়া যায় তা-ও ঐতিহাসিককে কখনও কখনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

এই বইতে ব্যবহৃত তথ্য তাই কেবলমাত্র অল্প তা নয়, তা খণ্ডিতও বটে। এই সামান্য সংখ্যক তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ সাড়ে তিন হাজার বছর ব্যাপী অর্থনৈতিক জীবনের নানা ছবি তুলে ধরতে লেখক সচেষ্ট। এই ইতিহাস রচনার জন্য কালের পরিসর যেমন দীর্ঘ, এলাকাটিও বৃহদায়তন: সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ। এই বিশাল ভূখণ্ডে এত দীর্ঘ সময়ে অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় স্থানগত বৈচিত্র্য থাকবেই, এবং কোনও সর্বভারতীয় একরৈখিক ছক খুঁজে পাওয়া কার্যতঃ অসম্ভব। তাই এই গ্রন্থে আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের বিষয় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়েছে। কিন্তু লেখক একই সঙ্গে সচেতন থেকেছেন যে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্যের সন্ধান করতে গিয়ে বক্তব্য যেন আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট না হয়। তাই এই গ্রন্থে আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের আলোচনা করা হয়েছে উপমহাদেশের সামগ্রিক পটভূমিতে। বহু ক্ষেত্রেই নানা বিষয়ে আলোচনা বিস্তৃততর করা যেত; কিন্তু এই বই-এর অন্যতম লক্ষ্য প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক জীবনের একটি রূপরেখা দেখানো। তাই অনেক সময়ই লোভ সংবরণ করতে হয়েছে। এই বই-এর অন্য উদ্দেশ্য প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক জীবনের গতিময়তাকে ফুটিয়ে তোলা। প্রাচীন ভারতীয় অর্থনৈতিক জীবন ও ক্রিয়াকলাপ যে অনড়, অটল, জগদ্দল কোনও বস্তু নয়; তাতে পরম্পরা পরিবর্তনের টানাপোড়েন আছে, সেখানে উত্থান ও পতন, বিকাশ ও অবক্ষয়ের ধারা যে যথেষ্ট সক্রিয়—ভারতীয় অর্থনীতির আদি পর্বের পরিবর্তনশীল রূপটিকে পাঠকের সামনে হাজির করাই লেখকের অন্বিষ্ট।

Book Content

প্রথম অধ্যায়: অর্থনৈতিক জীবনের উন্মেষ ও প্রথম নগরায়ন (খ্রীঃ পূঃ আঃ ১৭৫০ অবধি)
দ্বিতীয় অধ্যায়: পশুচারণের অর্থনীতি (খ্রীঃ পূঃ ১৫০০-খ্রীঃ পূঃ ১০০০)
তৃতীয় অধ্যায়: কৃষি অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা (খ্রীঃ পূঃ ১০০০-খ্রীঃ পূঃ ৬০০)
চতুর্থ অধ্যায়: মধ্যগাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ও নগরজীবনের পুনরাবির্ভাব (খ্রীঃ পূঃ ৬০০-৩২৫)
পঞ্চম অধ্যায়: রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি (খ্রীঃ পূঃ ৩২৫-খ্রীঃ পূঃ ১৭৫)
ষষ্ঠ অধ্যায়: কৃষি ও বাণিজ্যিক অর্থনীতির বিস্তার (খ্রীঃ পূঃ ১৭৫-খ্রীঃ ৩০০)
সপ্তম অধ্যায়: অগ্রহার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন (৩০০-৬৫০ খ্রীষ্টাব্দ)
অষ্টম অধ্যায়: অর্থনীতির অবক্ষয়, না কৃষি অর্থনীতির বিস্তার: ভারতীয সামন্তপ্রথার ধারণা ও সংশ্লিষ্ট বিতর্ক (৬৫০-১২০০ খ্রীঃ)
নবম অধ্যায়: কথান্ত
গ্রন্থপঞ্জী, গ্রন্থ-প্রবন্ধাদির তালিকা, সংক্ষেপিত শব্দের তালিকা
মাসুদ রানা ২৮৮ তুরুপের তাস

মাসুদ রানা ২৮৮ – তুরুপের তাস

পলাশির অজানা কাহিনী – সুশীল চৌধুরী

পলাশির অজানা কাহিনী – সুশীল চৌধুরী

কালীগুণীন ও চতুরঙ্গের ফাঁদ - সৌমিক দে

কালীগুণীন ও চতুরঙ্গের ফাঁদ – সৌমিক দে

আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে - তসলিমা নাসরিন

আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে – তসলিমা নাসরিন

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.