নীল পাহাড় – ওবায়েদ হক
ভূমিকা
আমার শৈশব কেটেছে চাকমাদের সাথে। তারা পাহাড় থেকে বিতাড়িত হয়ে আমাদের শহরে আশ্রয় নিয়েছিল। বছরের প্রথমদিকে ক্যালেন্ডারের কিছু তারিখ গোল চিহ্ন দিয়ে রাখত তারা। সেই তারিখে তারা পাহাড়ে যেত। মেয়ে বড় হয়ে যাওয়ার কারণে পরে আর যাওয়ার সাহস করত না, বিরস মুখে আমাদের সাথেই ‘বিজু’ পালন করত। তাদের চোখে পাহাড়ের জন্য আকুতি দেখতাম। সেই আকুতিটা এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি, কতটুকু পেরেছি তা একমাত্র পাহাড়িরাই ভালো বলতে পারবে।
এই উপন্যাসটাকে রাজনৈতিক উপন্যাস বলা হলে ভুল হবে আর ঐতিহাসিক উপন্যাস বললে মহাভুল হবে। এটা শুধু এক বাঙালি ডাক্তারের গল্প, যে পাহাড়কে উপলদ্ধি করতে পেরেছে। কিন্তু গল্পটি একেবারে অবাস্তব নয়। পাহাড়ে ক্রাসিমা, মংতো, থুইনপ্রুরা আছে, হয়তো অন্য কোনো নামে।
ওবায়েদ হক
২৮/০৯/২০১৪
.
চাঁদটা ডুবে গেছে কিছুক্ষণ আগে, বাঁশের বেঁড়ার ফাঁক দিয়ে আর জোছনা ঢুকছে না। রাতজাগা পশুপাখিগুলোও এখন জেগে নেই। সেই আলো মানিক দেখতে পারবে কি না জানে না সে।
গহীন পাহাড়ে শুধুমাত্র এই সময়টাতেই সব কিছু শান্ত থাকে। বাতাসও কেমন যেন ক্লান্ত হয়ে যায়, গাছের পাতায় সুড়সুড়ি দেয় না, খিলখিল করে হেসে ঢলে পড়ে না। অজানা পাখিরাও কোলাহল করে না। শিকারি জন্তর ভয়ে আর্তনাদ করে না শিকারেরা। মানিক কান পেতে আছে, চোখ মেলে আছে। যাওয়ার আগে যা পারে সব চোখ ভরে দেখে নিতে চায়, সব শব্দ শুনে নিতে চায়। কিন্তু এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে একটুও আলোর রেখা অবশিষ্ট নেই, পৃথিবীরও হঠাৎ করে যেন যেন বোবা হয়ে গেছে। তাকে বিদায় দেয়ার আগে হয়তো আর মায়া বাড়াতে চায় না। মানিক অপেক্ষা করছে তার হত্যাকারীদের পদশব্দের জন্য। বাঁশের সিঁড়িতে মচমচ শব্দটা হয়তো শ্রুতিমধুর হবে, সে একটু শ্ৰুতিমধুর শব্দের জন্য কাঙ্গাল হয়ে আছে। তাকে পাহাড়া দেয়ার জন্য যেই লোকটাকে রাখা হয়েছিল সে তার কাজ ইস্তফা দিয়ে এখন নাক ডাকছে। মরার আগে নাক ডাকার শব্দ শুনে মরতে চায় না মানিক।
মানিকের হাত-পা বাঁধা আছে, যদিও হাত-পা বাঁধার প্রয়োজন ছিল না, ঘুমন্ত পাহারাদারের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও পাহাড়কে ফাঁকি দেয়া তার পক্ষে সম্ভব না। তার পায়ের জখমটা এখনো টাটকা, রক্তগুলো জমাট বেঁধে কালচে হয়ে গেছে, মাথার পেছনের দিকটাতে চুলগুলো জট পাকিয়ে গেছে জমাৎ বাঁধা রক্তে। মানিক নিজের হাতের মুঠোতে শক্ত করে ধরে রাখা চিঠিটি খুলল। এই চিঠিটি সে এর আগে হয়তো কয়েক শত বার পড়েছে, মনে মনে পড়েছে হয়তো হাজার বার। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষরের বাঁক তার মুখস্থ। তাই অন্ধকারে চিঠিটি পড়তে তার অসুবিধা হলো না। সারাজীবন যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে সে তা এই চিঠিতে আছে। সেই উত্তরটা তার পছন্দের নয়, তারপরও উত্তর আছে। চিঠিটা যতবার পড়েছে ততবার সে কেঁদেছে, স্বস্তিতে, কষ্টে কিংবা অপারগতায়।
একটা দিনের জন্য যদি মে মুক্তি পেত তবে এই মৃত্যুটাও হয়তো অনেক স্বস্তির হতো।
নাক ডাকার শব্দ ছাপিয়ে বেশ কিছু শব্দ একসাথে শুনল মানিক। ফিসফিস শব্দে মানুষের গলা শুনতে পেল সে। তারপর বাঁশের সিঁড়িতে কয়েকটা পায়ের শব্দ। মাঁচার উপরে বাঁশের ঘরটার দরজা খোলাই ছিল, অন্ধকারে বেশ কয়েকটা মূর্তি ঘরে ঢুকল।
মানিক চোখ বন্ধ করল, সে যেন তার সম্পূর্ণ জীবন দেখতে পেল কয়েক মুহূর্তে।



Good