নক্ষত্রের চোখে জল (মুক্তগদ্য কবিতাগ্রন্থ) – কোয়েল তালুকদার
প্রথম প্রকাশ – জুন, ২০২৬ ইং
উৎসর্গ –
আমার বেয়াই ও বন্ধু –
নুরুল ইসলাম – কে এই গ্রন্থখানি উৎসর্গ
করলাম
১.
মনে হয়, জগতের সকল অন্ধকার দিয়ে তোমাকে আমি ঢেকে রাখি। রাখিও তাই। কিন্তু কখন যে তুমি শত সহস্র আলোকবর্তিকা হয়ে অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে ওঠো। আর মুহূর্তেই আমার অন্ধকার ঘরটি যেন আলোয় আলোয় আলোকিত হয়ে যায়।
২.
এখনও রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে, হঠাৎ মনে পড়ে যায়, কেউ একজন আসবে বলে আর আসেনি। কেউ একজন আসবে বলে আয়োজন করেছিলাম অনেক কিছুই। তার পুরোনো চিঠিগুলোতে আছে অনেক কবিতা, সুন্দরতম শব্দমালা। আছে মুগ্ধ করা অনেকগুলো মূহুর্ত। অনেক হৃৎস্পন্দনের অনুরণন…
কেমন যেন হাহাকার বুকের মাঝে। ঠিক কষ্টেরও না, কেমন যেন। সবাইকে লুকিয়ে একলা রাতে বালিশে মুখ গুঁজে রাখতে মন চায়। হাতের সব কাজ ফেলে দিয়ে মনে হয় স্টেশনের সেই কাঠের বেঞ্চিটাতে গিয়ে বসে থাকি। মনে হয় বসন্তের ঝরে যাওয়া পাতাগুলোর উপর মর্মর আওয়াজ তুলে হাঁটতে হাঁটতে দূরে কোথাও চলে যাই।
৩.
প্রায়শই পাশে থেকে অস্ফুট আর্তি শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায়। দেখি রাতভর সে নির্ঘুম। চোখে চোখ ছুঁই। কপালে কপাল রাখি। বুকে কান পেতে শুনি ভিতরের মর্মরিত কান্না। ওর ব্যথাগুলো নিয়ে নেবার চেষ্টা করি আমার শিরায়, আমার রক্ত কণিকায়।
৪.
সংসার ধর্ম আর ভালো লাগে না। বৈরাগ্যই শান্তি। এসো এই বসন্তেই আমরা পথে বেরিয়ে পড়ি। সামনের বসন্ত নাও পেতে পারি। বাকী জীবন পথে প্রান্তরে, আশ্রমে আর আখড়ায় কাটিয়ে দিই।
৫.
‘আমি তোমার জীবনেও আছি, মরণেও আছি।’
এই কথাটি যে বার বার বলত সে আজ আর জীবনে নেই।
মানুষ কখন যে জীবনে আসে, আর কখন চলে যায়। কেউ বলতে পারে না। যে থাকতে চেয়েছিল জীবনে, সে এখন রয়ে গেছে মনে।
৬.
নি:সঙ্গ নাভি দেখি, নিসর্গ শোভা দেখি, চুপচাপ পুষ্পবৃন্ত দেখি, তৃণভূমি দেখি । দুহাতে ধরেছি অরণ্য, মুঠোয় ভরি এর সুগন্ধ । ছিঁড়ে যাচ্ছে মায়ার টান। উল্টে যাচ্ছে যতিচিহ্ন। ঠোঁটের স্পর্শে জেগেছে প্রেম ,জ্বলছে বহ্নিশিখা। ছিনিয়ে নিচ্ছি তার শেষ আলোটুকু, নিঃশেষ হচ্ছে স্বেদ কণিকা।
৭.
আমি আমার শরীরের সকল নিয়ম কানুন মেনে চলি, তারপরও কি আমাকে যেতে হবে?
যদি অচিন কেউ এসে আমাকে নিয়ে যেতে চায়,
যাবে কি তুমি আমার সাথে ?
সেদিন তুমি আমায় কানে কানে বলেছিলে —
‘আমার সময় হয় নাই, সময় হয় নাই।’
৮.
এই সেদিনও শীতের সকালে রোদ্র খুঁজেছিলাম-
আজকের এই তপ্ত ফাল্গুনের খাঁখাঁ দুপুরে খুঁজি শীতল ছায়া।
৯.
কাল বিকালে দোয়েল চত্বর থেকে হেঁটে হেঁটে যখন বাংলা একাডেমির দিকে আসছিলাম, ঠিক তখনই ময়ুরাক্ষী বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঝমঝমিয়ে পড়ছিল আমার গায়ের উপর। ভিজে যাই কাকভেজার মতো। মেলায় আর প্রবেশ করা হলো না।
সন্ধ্যায় যখন উবারে করে বাড়ি ফিরছিলাম তখন ঢাকার অলিগলি রাজপথ জ্যাম্। গাড়ি যেন দাবার রাজার মতো স্টেলমেট হয়ে আছে। চাল দেওয়ার কোনো জায়গা নেই।
শীতে কাঁপছিলাম খুব। বুকের নীচে ভাঙ্গা হৃদয় চেপে আসছিল। হ্যাপি ওর বৃষ্টি ভেজা শাড়ির আঁচলখানি চিপে জড়িয়ে ধরছিল বারবার। যেন আমার বুকে ঠান্ডা না লাগে!
কেন জানি হ্যাপিকে কখনও কখনও আমার মায়ের মতো মনে হয়।
১০.
একটা স্বপ্ন দেখছিলাম।
কেমন কবরের মতো একটা ঘর। শুয়ে আছি চোখ মেলে। চারদিকে অন্ধকার। হঠাৎ দেখি, কে যেন দূর থেকে আলো হাতে এগিয়ে আসছে। যখন কাছে চলে আসে দেখতে পাই, সে একটি মেয়ে। চিনবার চেষ্টা করি কিন্তু চিনতে পারছিলাম না। ভেবেছিলাম মায়াবতী হবে। মেয়েটি তার হাতের আলোকবর্তিকাটি পাশে রেখে আমার বুকের উপর কপাল রেখে বলে – ‘স্পর্শটুকু মনে রেখ, ভুলে যেওনা।’
স্বপ্নটা ভেঙে যায়।
১১.
আমার চোখ সেই পথের দিকে চেয়ে থাকে, যে পথের সকল লতা গুল্ম ঘাস পায়ে মাড়িয়ে তুমি চলে গেছ।তারপর আকাশে জমেছে মেঘ, ঝরেছে জল, সব পথ কা্দাজলে ভেসে গেছে কিন্তু মেঘের নীচে সেই কাদা পথে হেঁটে কেউ আর ফিরে আসেনি । এই যে এত জল, এত মেঘ — যে জলে ভিজে ভিজে আমি একাই হাঁটছি, আমার এই বৃষ্টি ভেজা একাকী ভালোবাসা উপভোগ করল না কেউ।
১২.
এমন রাক্ষুসে জ্যোৎস্নার আলোর ঝর্ণাধারা এ জীবনে আর আসবে না।গৃহত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হওয়ার যে ক্ষণ আমি জীবনভোর খু্ঁজেছিলাম তা আজ রাতে আমারই দুয়ারের সামনে চলে এসেছিলো।কিন্তু সংসারের মানুষগুলোর মায়ার টানে আমার সেই লালিত গৃহত্যাগ করার স্বপ্ন আজ পূরণ হলোঁ না।
১৩.
মুহূর্তেই জীবন ফুরিয়ে গেল। আজ সকালে যে রং যে আভা দেখলাম, কাল সকালে তা খু্ঁজে পাওয়া যায় না।পলকেই সবকিছু বদলে যায়। জীবন যে রেখা থেকে শুরু হয়েছিল সে রেখায় ফিরে যাবার কোনো পথ নেই। চলতে চলতে পথের মাঝেই জীবন শেষ হয়ে গেল। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে পথের শেষ প্রান্তরেখাটি দেখা যায়।
১৪.
নদী যেমন চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে সরোবর হয়, তেমনি কোনও দেবতার মঙ্গল আলোকের মতো অসীম ভালোবাসা নিয়ে সে আমার কাছে এসে সরোবর হয়েছে। যেন পলাতকা কোনও ঝর্নার জল প্রতিদিন আঁজলায় ভরি। তার মনটি আজ সকালের শিশির ঝরার মতো ঝির্ ঝির্ করে কাঁপছে।
সবাইকে ভোরের শুভেচ্ছা।
১৫.
আমি তোমার সব দুঃখ মুছে ফেলতে চাই, কি্ন্তু কিছু দুঃখ আছে মানুষ চাইলেই মুছে ফেলতে পারে না। এই ক্ষমতাটা ঈশ্বর তার হাতে রেখে দিয়েছে।
আমি আমার অসীম ভালোবাসা দিয়ে তোমার জীবনটাকে ভরে তুলতে চাই। এটা আমি করতে পারব, কারণ এই ক্ষমতাটা ঈশ্বরের হাতে নেই, এই ক্ষমতা আমার হাতেই আছে।
১৬.
কি করে ভুলে থাকতে পারি এই আকাশ, ধরিত্রীর উষ্ণতা, বাতাসের সতেজতা, জলের ঝিকিমিকি। এই ধরিত্রীর প্রতিটি অংশই আমার কাছে সৌন্দর্যের — পাইন গাছের চকচকে ডগা, বালুকাময় সমুদ্রতট, অন্ধকার বনভূমিতে জমে থাকা কুয়াশা, আদিগন্ত ফসলের প্রান্তর, প্রতিটি পতঙ্গ, ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা ঝিলিমিলি বাতাস, অশোকের গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতার শব্দ। এই সবই দেখার জন্য আমাকে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে যায়।
১৭.
ঘর হতে বেরিয়ে আলোতে এসে দাঁড়াই। বাইরে এত আলোর ছ্বটা। ঝলমল করছে বৃক্ষরাজি, অ্ট্টালিকা, পশু, পাখী, পাহাড়, নদী, সাগর। মনে হচ্ছে এই আলো মেখে পরিপূর্ণ করি জীবন। আমাদের স্বপ্ন দেখা শেষ হয় নাই, জীবন পরিপূর্ণ হয় নাই। আমার সাথে তো একজন সাথী আছে, সে এখনও আমার হাত ধরে আছে। যে আলো আজ দেখছি সে আলোয় দু’জনে মিলে পথ চলে যেতে পারব অনেক দূর। জীবন কোথাও শেষ করতে চাই না। পথ চলাও না। এই জীবন, ‘এই পথ চলা যেন কোনো দিন শেষ না হয়।’
১৮.
আমার দায়ভার যখন শেষ হবে, তখন অপেক্ষাই বা কেন করব? সেই উদ্দাম, আনন্দময় জীবন যদি আর নাই থাকে, অক্ষম আর বোঝা হয়ে থাকা এই সুন্দর পৃথিবীর কাছে গ্লানিকর। সব সু্ন্দর শেষ হবার সন্ধিক্ষণেই ঘরের জানালা দরজা সব খুলে রাখতে চাই। আত্মার প্রস্থানের সাথে মানুষের সকল দুঃখের নাকি পরিসমাপ্তি ঘটে। পৃথিবী থেকে চলে যাবার আনন্দটাই তখন অন্যরকম হয় ।
১৯.
সৃষ্টিকর্তা পরম যত্ন সহকারে আমাকে অতি ক্ষুদ্র সময়ের জন্য একটি জীবন দিয়েছে। সেই জীবনে তুমিই আমার একমাত্র সহচরী হলে। যার এলমেল চুলে মুখ লুকিয়ে নিঃশ্বাস নেই প্রাণ ভরে। যার বুকের পাঁজরে লেগে থাকে মহাকালের যত সুখ দুঃখ। আমি তার কাছ থেকেই চলে যেতে চাই জীবন নদীর ওপারে — তাকেই ভালো বাসতে বাসতে।
২০.
যদি কোনো দিন পূর্ণিমা রাতে তুমি আর না থাকো, যদি আঁধার এসে ঘিরে ধরে আমাকে,
‘হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে’ আমাকে তখন কে আর ভালবাসবে?
২১.
মাঝে মাঝে শব্দহীন কোনো জগতে চলে যেতে ইচ্ছা করে। যেখানে মেঘের শব্দ নেই, ঝিঁঝি পোকাদের গান নেই, নদীর জলের ছলাৎছল শব্দ নেই, মানুষের কোলাহল নেই, নেই কোনো বঞ্চনার মর্মরধ্বনি। আছে কী সত্যিই এমন কোনো জগৎ?
বড়ই ক্লান্ত হয়ে সেই পথ ও সেই নিঃশব্দলোকের ঠিকানা খুঁজছি।
২২.
আমার জন্ম যদি ফকির লালন শাহ্ এর সময়কালে হতো, তহলে আমি লালনের শিষ্য হতাম। লালনের আখড়ায় যেতাম, গাঁজা টানতাম। গান করতাম। সংসার বৈরাগী হয়ে ঘরহীন জীবন যাপন করতাম। আহা! কী সুখ-ই-না পেতাম লালনীয় জীবন যাপনে !
২৩.
ভালোবাসায় অনিমেষ আর মাধবীলতা হতে হয়। দুজনেরই আরাধ্য ছিল একজন আরেকজনকে কাছে পাওয়া। পেয়েওছিল তারা। এর জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল তাদের। আসলে প্রেম এই রকমই হওয়া দরকার। একে অপরের বুক থেকে খুঁটে খুঁটে তুলে নিতে হয় আবেগ। আজন্ম ছিনিয়ে আনতে হয় কুসুমিত ভালোবাসা।
২৪.
মৃত্যুর জন্য কোন্ সময়টা শ্রেষ্ঠ সময় ? আমার কাছে সুবেহ্ সাদিক! একটা সময় আসবে আমি মরণেও থাকব না, জীবনেও থাকব না। ঐ মৃত্যু সন্ধিক্ষন সময়টুকুতে আমার স্ত্রী-সন্তানেরা আমার শয্যাপাশে বসা থাকবে। আমার নিষ্করুণ চোখ ওদেরকে দেখতে দেখতে বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর আমার আত্মা বেরিয়ে যাবে। দূরে মসজিদগুলোতে তখন ফজরের আযান ধ্বনিত হতে থাকবে।
২৫.
জীবন কাটে না এ জীবনে আর, জীবন ভরেও না এক জীবনে। একি তৃষ্ণা আমার । একি ক্লান্তি নিয়ে বসে থাকি। অনেক কাছে থেকে দেখি অনেক দূরের আশার বিন্দু! আজ দক্ষিণের দুয়ার খোলা আছে। আসুক বাতাস আজ দক্ষিণ থেকেই।
২৬.
আজ এই রাতে ঢাকার আকাশে মেঘ নেই। পশ্চিম দিকে রাস্তার উপর গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কুসুমপুরের মতো কোনও নিশাচর পাখিকে উড়ে যেতে দেখলাম না আলো অন্ধকারে। এই নিয়নের আলোর দেশে কোনও পাখির দেখা কী মেলে? তা না মিলুক। সামান্য পাখির জন্য মন খারাপ হয় নাকি কারোর?
ইউটিউবে শচীন দেব বর্মনের গান শুনছিলাম।
‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছো দোলা,/ রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে
একি তব হরি খেলা,/ তুমি যে ফাগুন রঙেরও আগুন তুমি যে রসেরও ধারা, /তোমার মাধুরী তোমার মদিরা করে মোরে দিশাহারা।’
আমি কী করতে পারি? উদাস মন হলে হাত পা অবশ হয়ে আসে। যা করতে চাই, তা করতে পারি না। কিছু না করি সেও কম ভালো, বেশি যেন না ভাবি। ভালোলাগা বেঁচে থাক আমার রাতের সঙ্গে। এও এক অবুঝ অবোধ সঙ্গ।
গান শোনা বন্ধ হয়ে গেছে। যদি মেঘ হতো তাহলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে আসত। এই ফাগুন ঋতু জানান দেয়, বৃষ্টি হতেও পারে। বারান্দায় হেঁটে হেঁটে ওপাশে চলে যাই। আকাশ দেখে ফিরে আসি আবার। আমি কী পেয়ে গেছিলাম নিরক্ষর চিরচেনা কোনো ফুলের গন্ধ?
তুমি কী উদ্বেলিত! আমি চন্দন যোগার করেছি ভালোবাসার জন্য। আমি গন্ধ বিলাব রাত্রি সহচরী রমণীর বুকে। পাখি হয়ে রোজ আকাশে উড়তে চাই। যেমন করে কোনো একলা যুবক অন্ধকারে ভালবেসে ভেসে যায়।
আমি নিমগ্নতা চাই। একজন রমণী এ ঘর ও ঘর হাঁটবে আমার সুখে সুখে। সে আনন্দ করুক রাতে ফুটে থাকা কোনো রক্ত করবীর মতো। সে যে নন্দিনী হবে আজ রাত্রিতে এই রঞ্জনের।
২৭.
ধূলো ঝর আজ এই শহরে,
উদ্বাহু বাতাস আসছে তুরাগের তীর থেকে-
সেই শৈশবে একবার ঝড়ে পড়েছিলাম এক সন্ধ্যায়-
শৈলাভিটা নদীর খেয়াঘাটে-
বাবা তার পাঞ্জাবীর নীচে আমার মাথা ঢেকে রেখেছিল
কি আপ্রাণ প্রচেষ্টা তার জল ঠেকাতে !
তারপরেও বাবার কন্ঠ বেয়ে
বুক গরিয়ে বৃষ্টির জলে ভিজে চুপসে গিয়েছিল
আমার মাথার চুল- বাড়ীতে যেয়ে দেখি-
লন্ঠণ জ্বালিয়ে নামাজ পড়ছেন মা।
মা সেই ঝড়ের রাতে নিশ্চয়ই আমার জন্য
আর বাবার জন্যে মঙ্গল প্রার্থনা করেছিলেন।
২৮.
যেদিন আকুল হয়ে বইবে বসন্ত বাতাস, যেদিন সবুজ বৃক্ষরাজির পল্লব ঝিরি ঝিরি করে দুলে উঠবে, যেদিন পূর্ণিমা রাতের ধূসর ছায়া পড়বে পদ্মপুকুর জলে —
সেদিন সেই দিনে, সেই রাত্রিতে আমি আসব তোমার কাছে, হাজার বছরের অন্ধকার রাত্রির পর হলেও আমি আসব।
২৯.
আমার নিজের ভিতরেই এক মহাবিশ্ব আছে। আর সেই মহাবিশ্বের নির্জন গভীরে মগ্নচারী হতে চাই। সেখানেই খুঁজব অনন্ত সুখ, সেখানেই হয়ত পাব এক আনন্দময় স্থিতি।
৩০.
আমার আছে ল্যাপটপ, কীবোর্ড, দুটো চোখ, আঙুল।
আছে ভাঁটফুল, আমি নিঃসঙ্গ হই নাই। সময় বহিয়া যাবে।
৩১.
তার প্রাণের কথা, মায়াবী কাজল চোখ , বহুদিনের চেনা গন্ধ, বালিশে লেগে থাকা সুগন্ধি, গল্প বলা অজস্র রাত্রি, অস্পষ্ট করে মনে পড়া কত ডাক নাম — আরও কত কিছু আষ্টেপৃষ্টে করে মনে জাগে , কত ভাবে যে প্রাণে জড়াতে চায় সারাক্ষণ —
‘দেহমনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে,
গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধ্বে ভাসে।’
সবই তোমার মায়ার টানে ……
৩২.
প্রেমে পড়া কাকে বলে? এই যে আৃমি-
এই শহরটাকে ভালোবেসে পৃথিবীর অন্য কোনো ঝলমলে শহরে থিতু হইনি,
সন্ধ্যাবেলা বের হলে কোনো না কোনো বাড়ি হতে ধুপের গন্ধ পাই,
কবরস্থানে দাঁড়িয়ে নীল আকাশ যেমন দেখি
আবার বুড়িগঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখি বিকালের বিষণ্ণ সূর্যাস্ত,
রেল স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেনের জানালা দিয়ে কেউ না কেউ অপলক চেয়ে থাকে,
সকাল বেলা হাঁটতে গিয়ে সিভিল অ্যাভিয়েশনের বড়ো পুকুরটাতে কস্তরি ফুল ফুটে থাকতে দেখি –
বাঁশঝাড়ের তলায় যত নিঃশব্দেই হাঁটি না কেন, শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি শুনতে পাই,
বাড়ির সম্নূখে পিচঢালা রাস্তাটাতে হাঁটার সময় মনে পড়ে এখানে আগে মেঠোপথ ছিল,
প্রাইমারি স্কুলে নতুনকুঁড়িরা যখন হেঁটে যায়, তখন মনে পড়ে আমার কৈশোর কথা!
আমি এইসবের প্রেমে পড়ি, এইসব কী প্রেম নয়?
৩৩.
আমার সমস্ত তৃপ্তি অতৃপ্তি, আমার প্রেম অপ্রেম, অপূর্ণ সুখ, আমার তৃষ্ণা, আমার সমস্ত উম্মাদনা তোমাকে ঘিরে। তুমি আমার চৈতন্যে অবচৈতন্যে। তোমাকে ছেড়ে আমি খুব বেশি দূরে কখনই যাব না।
৩৪.
জীবনের এই পথ চলতে কত বাঁক যে পেরুতে হয়। এক বাঁকে সুখ, আরেক বাঁকে দুঃখ। এক বাঁকে প্রেম, অন্য আরেক বাঁকে বিচ্ছেদ। বাঁকে বাঁকে কতো ব্যর্থতা, কতো গ্লানি, কত যে দীর্ঘশ্বাস।
কত ঘাত পেরিয়েই তবে এই জীবন। তবুও জীবনের জন্য কত মায়া, কত প্রবল আকুতি বেঁচে থাকার! এই পৃথিবীর ধূলোর উপরে পড়ে থাকবার কত যে প্রচেষ্টা।
অস্তাচলের শেষ আলোর উপর কোনও ধূসর ছায়া পড়ুক, তা চাই না। তারপরও আবছায়া এসে পড়ে অস্তযাত্রার পথের উপর। আমার যে পথ চলতে ইচ্ছে করে ঐ অস্তাচলের আঁধারের দিকেই।
৩৫.
ক্লান্তির শেষে, ধূসর এই সন্ধ্যার গোধূলির উপর পড়ে থাকা অকৃপণ আলো সব… আমাদের হোক। আমাদের হোক।
৩৬.
এইসব অন্ধকার দিন, এইসব নিবিড় তিমির রাত্রি পেরিয়ে একদিন ঠিক দেখা হবে চাঁপাগন্ধ কোনো বসন্ত দিনে। তখনই খোঁপায় বেঁধে দেব নিশি চন্দন। সেই অপার্থিব সাক্ষাৎ মূহুর্তে আমি স্থানু হয়ে গ্রহণ করব পার্থিব যত সুখ…..
৩৭.
অস্তরাগের সন্ধ্যায় তুমি এসো-
ধান ধূপে জ্বলবে প্রদীপ, জ্বলবে তারার বাতি
তারপর দোঁহা জ্বলব রাত ভর
কেউ নেভাতে আসবে না, ছাই ভস্ম হবো বর্বর আদি অনলে।
সে যে আমার নানা রঙ্গের দিনগুলি
তুমি যদি প্র্রেমহীন হয়ে থাকো, মেঘদূতের সম্ভোগের শ্লোক পড়েও যদি নির্বিকার থেকে যাও,যদি না থাকে তোমার রাগ-অনুরাগ-কস্তরীনাভি কোমলগান্ধার, যদি বিহব্বল না হয় তোমার শরীর, রক্তে শোনিতে যদি না ভেজে তোমার পড়নবাস, তাহলে তুমি আমার কবিতা পড়োনা।
৩৮.
কিছু স্বপ্ন আছে কাছে রাখতে নেই। কিছু স্বপ্ন আছে যা দেখতেও নেই। ভাবছি, এগুলো সব যমুনার জলে ভাসিয়ে দিয়ে আসবো। ওগুলো জলেই ভাসুক।
৩৯
কিছু মানুষ আলোর মতো তীব্র হয়, স্বচ্ছ হয়, পবিত্র হয়। কিন্তু কাছে গেলে তাদের অস্বচ্ছতা ধরা পড়ে। তাই তাদের ভেতর ডুবে যেতে হয় দূর থেকে, কাছে থেকে নয়…
৪০.
তুমি আমার কান্না নেবে? আমার মন বেদনার মর্মরতা নেবে, এবং মন খারাপের অশ্রু সিক্ত কমলগুলি? নাকি ভাসিয়ে দিয়ে আসব এই সব মর্মবেদনা দূরের কোনও স্তব্ধ নির্জরিনীতে? কিংবা শত প্রস্ফুটিত কোনও উৎপল দীঘিতে?
সব দুঃখ কষ্ট কী ভাসিয়ে দেওয়া যায়? সব প্রেম? ভালোবাসার মধুরতম স্মৃতি, সুখময় কোনও অভিজ্ঞান চিহ্ন?
না, যায় না।
৪১.
ঘেঁটু ফুল আর তারা ফুল দেখেছিলাম আমার গ্রামে। কিন্তু গাঁয়ের নামটা যে কী ভাবে হয়েছিল নওদাফুল কোচা, সে নামের ইতিহাস আমার জানা নেই। ইছামতীর একটি উপনদী বয়ে গেছে নওদাফুল কোচা গ্রামের উপর দিয়ে। একসময় সারাবছর জল থাকত এই নদীতে। এখন এই নদী পুরাটাই ফসলের ক্ষেত হয়ে গেছে।
এই এক গাঁও। যে গাঁয়ে দিনে দুপুরে ঝিঁঝিঁ পোকার গান শুনতাম। সন্ধ্যায় ৰাড়ির খোলা ভিটায় চিৎ হয়ে শুয়ে খোলা আকাশ দেখতাম। আকাশ থেকে তারা নেমে আসত চোখের তারায়। পাশের আঁড়াবনে পেঁচা ডাকত কোতঁ কোঁত করে। কামাল মুন্সী খোলা কন্ঠে এশার আযান দিত মসজিদে। মুসুল্লীরা সারি বেঁধে চলে যেত নামাজ পড়তে।
আমার গ্রামেই আছে মাঝি বাড়ি, ঘোষ বাড়ি। আছে ছোনগাছার হাট। পুঁজার মেলা আর চৈত্র সংক্রন্তির মেলা এই হাটেই বসে। মন্দিরও আছে। ঘটা করে দূর্গা পুজা, কালি পুজা এই গ্রামেই হয়।
আছে জারুল গাছের বন। বনের মাঝখানে খেলার মাঠ আছে। মাঠের ধারে কৃষ্ণচূড়া আর শিমুল গাছ আছে। বসন্ত অনুভব করতাম এই শিমুল কৃষ্ণচূড়া ফুলের দিকে চেয়ে থেকে। সন্ধ্যার বাতাসে মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে।
বাঁশ ঝাড়ের ঝিরিঝিরি পাতার ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতাম। আবার পুকুর পাড়ে যেয়ে ঘাটে বসে জলের ভিতরে চাঁদ ভাসতে দেখতাম। চাঁদও চেয়ে দেখত আমার গ্রামকে। এই গ্রামের উপরেই নীল আকাশ আছে। সবুজ ফসলের ক্ষেত আছে। জারি গান গায় কিষাণ ফসলের মাঠে। এই গ্রামের ছেলেরাই আলোমতি গানের দল বেঁধেছিল।
আবার কিছু স্মৃতি মর্মর বেদনাও আছে। একদিন সন্ধ্যায় জানালার শিকে কপাল ঠেকিয়ে দূরের প্রান্তরের দিকে তাকিয়েছিলাম। কোথা থেকে একটি ছোট্ট হলুদ প্রজাপতি আমার হাতে এসে পড়েছিল। এই রকম সুন্দর প্রাপ্তিতে মন ভাল হওয়ার কথা কিন্তু ভালো হয় নাই। সেইদিনই পৃথিবীর চেতনা থেকে আমার বাবা মুছে গিয়েছিল।
আজ কয়েকদিন ধরে এই শহরে থেকেও আমার গ্রামের মাটির গন্ধ পাচ্ছি। মহুয়ার গন্ধের মতো পাগল হয়ে থাকে মন। কেমন যেন কুসুম কুসুম সুবাস ভেসে আসে দূর বহুদূর থেকে। এই সুবাস অন্য কোথাও নেই। আছে আমার গ্রামেই। আজ কেন জানি আমার সেই গ্রামকে ‘কুসুমপুর’ নামে ডাকতে ইচ্ছা করছে।
হায়! কবে ফিরে যাব আমার সেই কুসুমপুরের মাটিতে।
ঐ মাটিতেই যে আমার মা ঘুমিয়ে আছে।
৪২.
তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো শিশির কনার মতো ক্ষণকালের।বহুকাল পর আবার তার সাথে দেখা হলো। এবার আমাদের সম্পর্ক সাগরের দিকে গড়াবে।
৪৩.
তার প্রাণের কথা, মায়াবী কাজল চোখ , বহুদিনের চেনা গন্ধ, বালিশে লেগে থাকা সুগন্ধি, গল্প বলা অজস্র রাত্রি, অস্পষ্ট করে মনে পড়া কত ডাক নাম — আরও কত কিছু আষ্টেপৃষ্টে করে মনে জাগে , কত ভাবে যে প্রাণে জড়াতে চায় সারাক্ষণ —
‘দেহমনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে,
গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধ্বে ভাসে। ‘
সবই তোমার মায়ার টানে ……
৪৪.
লেকের পাড়ে পথের ধারে এই কলাবতীকে আজ দেখে এলাম। সারারাত ব্রোথেল রমণীদের মতো বৃষ্টিতে ভিজে পাঁপড়িগুলো নুয়ে ফেলেছে। আমি ওকে স্পর্শও করিনি, গন্ধও নেইনি। জানি ওর গায়ে বুনো গন্ধ ছিল, তবুও এই অনাদরের ফুলটিকে আদর না করেই চলে এলাম।
৪৫.
বাংলাদেশে এত এত বর্ষার ফুল থাকতে মানুষ শুধু মাত্র কদম ফুল নিয়ে এত মেতে উঠেছে কেন? ফেসবুক ভরে গেছে কদম্বে কদম্বে। অথচ আরও কত বর্ষার ফুল আছে। যেমন: বকুল, কেয়া, কলাবতী, কেওড়া, গন্ধরাজ, কেন্দার, দোপাটি, সন্ধ্যামণি, মালতী, হাসনাহেনা, নীলপদ্ম, দোলনচাঁপা ও কামিণী। এইসব ফুলগুলি নিজ সৌন্দর্য আর সৌরভে অতুলনীয়। অথচ, আমরা শুধু মাত্র কদমফুলের সৌরভ নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে আছি।
কদমফুল বিরহের প্রতীক, এই জন্য? কবে কোন রাধিকা কৃষ্ণের বাঁশীর কলধ্বনিতে কদমগাছের তলে ছুটে গিয়েছিল, তা আজ আর কারোর জানা নেই। আজ আর সেই কৃষ্ণ নেই। সেই বাঁশীও নেই কিন্তু চির বিরহের হাহাকার আছে। আছে রাধাকৃষ্ণের নতুন সংস্করণ। আজও বর্ষায় কদমফুল বেয়ে যেন অশ্রু ঝরে। প্রেমিক প্রেমিকার মনেও যেন দোলা লাগে।
‘তখন কেবল ভরিছে গগন মেঘে/কদম-বোরক দুলিছে বাদল বাতাস লেগে।’
৪৬.
প্রতি বছর মেলা আসবে। ফেব্রুয়ারির হালকা রোদ, কচি পাতার সবুজ, বইয়ের গন্ধ আর মানুষের ঢল—সবই ঠিক আগের মতোই থাকবে। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ এই শহরের কোনো প্রান্ত থেকে আর কোনোদিন দূর্বাঘাসের পথ মাড়িয়ে হেঁটে হেঁটে মেলায় আসবেন না।
একসময় অমর একুশে গ্রন্থমেলা–র ভিড়ে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক মানুষকে ঘিরে যে উচ্ছ্বাস জমে উঠত, তা ছিল এক অদ্ভুত উৎসবের মতো। তিনি যেন ছিলেন মেলারই আরেকটি প্রিয় স্টল—যেখানে গল্প বিক্রি হতো না, বিক্রি হতো স্বপ্ন, মায়া, নীরব বিষণ্ণতা আর বেঁচে থাকার সাহস। পাঠকের হাতে বই তুলে দিয়ে তিনি আসলে তুলে দিতেন নিজের হৃদয়ের এক টুকরো আলো।
এখনও যখন ফেব্রুয়ারির বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে হাঁটি, মনে হয়—এই বুঝি তিনি এলেন। চশমার ফাঁক দিয়ে পরিচিত দৃষ্টিতে তাকালেন, হালকা হেসে কিছু বললেন, তারপর ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। কিন্তু না, সেই দৃশ্য আর সত্যি হয়ে ওঠে না। সময়ের ভিড়ে তিনি এখন অনুপস্থিতির এক গভীর নাম।
তবু তিনি পুরোপুরি অনুপস্থিত নন। তাঁর চরিত্ররা এখনো মেলায় আসে। হিমু হলুদ পাঞ্জাবি পরে একা একা হেঁটে যায়, মানুষের ভিড়ের মধ্যেও এক রহস্যময় নির্জনতায়। রূপা নীল শাড়ি পরে দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখে অনুচ্চারিত অপেক্ষা। শুভ্র হয়তো অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, ভিড়ের ভেতর কাউকে খুঁজে ফেরে। তাদের ভেতর দিয়েই যেন তিনি হেঁটে যান—নীরবে, অদৃশ্যভাবে।
মেলা প্রতি বছরই আসবে, বইয়ের নতুন মলাটে ভরে উঠবে প্রাঙ্গণ। নতুন লেখক আসবেন, নতুন গল্প জন্ম নেবে। কিন্তু যে মানুষটি আমাদের নিঃসঙ্গ দুপুরগুলোকে গল্পে ভরিয়ে দিতেন, রাত জাগা কিশোর বয়সকে স্বপ্নে রাঙাতেন, জীবনের সাধারণ মুহূর্তকে অসাধারণ করে তুলতেন—তিনি আর ফিরবেন না।
তবু দূর্বাঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে না এলেও, তিনি আছেন। আমাদের বুকের ভেতর, আমাদের ভাষার ভেতর, আমাদের নীরব কান্না আর গোপন হাসির ভেতর। মেলা যখনই বসবে, আমরা জানব—কোথাও না কোথাও, গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি এখনো হেঁটে চলেছেন।
৪৭.
কাল মেয়েকে নিয়ে নিলক্ষেত গিয়েছিলাম ওর একটি বই কিনতে। কি মনে করে ওর হাত ধরে হেঁটে হেঁটে চলে যাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। যে পথ দিয়ে ওকে নিয়ে হাঁটছিলাম সে পথগুলো দিয়ে একসময় আমি অনেক হেঁটেছি।
প্রথমেই মহসিন হলের মাঠের পশ্চিম পাশে রাউফুন বসুনিয়ার ছোট্ট মূর্তিটি দেখালাম, বললাম — এই ছেলেটি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়েছিল। তারপর চলে যাই কলাভবনের সামনে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। বললাম–এটি নির্মাণ করেছে ভাস্কর আব্দুল্লাহ খালিদ। এই ভাস্কর্যটি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি সেরা ভাস্কর্য। কলাভবনের দোতালায় হাত দেখিয়ে বললাম- ঐখানেই আমাদের বাংলা বিভাগ — যেখানে আমি পড়েছিলাম ছয় বছর। আমাদের শিক্ষক ছিলেন— ডঃ আহমদ শরীফ, ডঃ নীলিমা ইব্রাহীম, ডঃ মনিরজ্জামান, ডঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রমুখ। তাঁরা কেউ আর আজ বে্ঁচে নেই। কলাভবনের বটতলা দেখিয়ে বললাম, এখানেই একদিন আমাদের দেশের পতাকা প্রথম উত্তেলিত হয়েছিল।
তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে চলে যাই মধুর রেস্তোরার দিকে। ডানদিকে গুরুদ্বুয়ারা নানক সাঁইয়ের মন্দিরটি দেখিয়ে বলি, এটি একটি শিখ উপসানালয়। মধুর রেস্তোরার পুরানো একতলা বিল্ডিংটি দেখিয়ে বলি, এই সেই রেস্তোরা যেখান থেকে আমাদের দেশের সমস্ত আন্দোলনগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এটির মালিক ছিলেন, শহীদ মধু দে। তাকে বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল পাকসেনারা। ওখান থেকে হেঁটে হেঁটে লাইব্রেরীর দিকে চলে যাই। নভেরার তৈরী ভাসকর্যগুলো দেখিয়ে বলি, এই শিল্পীটি আর বেঁচে নেই। সুদূর ফরাসী দেশে নিঃসঙ্গ একাকী নির্বাসিত অবস্থায় মারা গেছেন। তারপর দুজন লাইব্রেরীর বারান্দায় এসে বসি। ভাষা ইনিস্টিউটের পূর্ব জায়গাটা দেখিয়ে বলি, এইখানে বা্ঁশের চালার শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন ছিল। একদিন গরম সিঙ্গারা খেতে যেয়ে আমি আমার জিহবা পুড়ে ফেলেছিলাম। বাম দিকের খালি ঘাসের চত্বরটি দেখিয়ে বলি, এটির নাম হাকিম চত্বর। ঐ যে কড়ই গাছটি দেখছ, ওখানে বসে হাকিম মিয়া চা বিক্রি করত। আমরা চা খেয়ে অনেক সময় পয়সা দিতাম না। বলতাম ‘আজ নেই।’ কিছুু বলত না হাকিম মিয়া। সেও আজ বেঁচে নেই। অনেকদিন পর হাকিম মিয়ার ছেলের কাছ থেকে আমরা দুজন চা খেলাম। মেয়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে টিএসসি র দিকে যাই, ডানদিকে রোকেয়া হলটি দেখিয়ে বলি— এই হলে তোমার বকুল ফুপি থাকত। সামনে পূর্ব দিকে এগিয়ে যেতেই বাম দিকের সৌধটি দেখিয়ে বললাম—এটি শহীদ ডাঃ মিলন স্মৃতি সৌধ। নব্বইয়ে গণআন্দোলনে ঠিক এই জায়গাটিতে তিনি শহীদ হয়েছিলেন।
তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মেয়েকে নিয়ে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা মূর্তির পাদদেশের কাছে যেয়ে দাঁড়াই। মূর্তির দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম—একাত্তরের অনেক নাম না জানা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হয়েছে। প্রখ্যাত ভাস্কর শিল্পী শামিম সিকদার এটি তৈরী করেছেন। আমি মেয়েকে নিয়ে ভা্স্কর্যের পাশে পাকা সোপানের উপর বসি।
নীরব হয়ে বসে আছি, কোনো কথা বলছিলাম না। মেয়ে একটু উদ্বেগের সহিত বলছিল— বাবা, তুমি কি ক্লান্ত ? আমি বললাম– না মা।
৪৮.
তোমার নীল নয়নে শ্রাবণ মেঘের বিদ্যুৎ ঝলক। কন্ঠে মধুমঞ্জরির মালা। দেহলতায় পদ্মদামের লাবণ্য। তোমার শরীর অমল ধবল জ্যোৎস্নায় স্নাত। চোখের পাতায় নাগকেশরের স্পর্শ। হে আমার প্রিয়ন্তী, তোমার কেশ কুন্তলের গন্ধে মদির এই ঘর। আমাকে তুমি দীপ্ত করো।
৪৯.
আজ এই হেমন্তের সকালে প্রথম মনে পড়ল – রাতের ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নের কথা। জ্যোৎস্নার আকাশ ভেসে গেছে অন্ধকারে। আমার গল্পের কথা বলা ছিল সেখানে। সেখানেই ছিলে তুমি বিরাজমান। খুঁজতে হয়নি দূরে কোথাও গিয়ে। যখন স্বপ্ন ভাঙ্গল- দেখি, তুমি দূরে চলে গেছ। কাছ থেকে তোমাকে খুঁজলাম, পেলাম না। দূরে তাকিয়ে দেখি – তুমি কাছেই আছ।
৫০.
সেই কবে অপ্রস্ফূটিত ফুলগুলি বিকশিত না হয়েই ঝরে গেছে,
যারা কলি মেলেছিল আমার প্রথম যৌবনের মৌবনে।
দখিনা বাতাসের কানে কানে তারা বলে গিয়েছিল চির বিরহিনীর নিশ্বাস ফেলে —
‘তোমার আছে বিশ্ব, আছে অনন্ত আকাশ। তুমি সেথায় নক্ষত্র হয়ে বিচরিত। তুমি সেথায় মুখরিত।’
কিন্তু, তারা দেখতে পায়নি, মুখরিত নক্ষত্রেরও চোখে জল আছে ।





Leave a Reply