দেশনায়ক : সুভাষচন্দ্র বসু ও ভারতের মুক্তি সংগ্রাম – সুগত বসু
দেশনায়ক : সুভাষচন্দ্র বসু ও ভারতের মুক্তি সংগ্রাম – সুগত বসু
বঙ্গানুবাদ: সেমন্তী ঘোষ
প্রথম প্রকাশ: ২০১১
প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড
প্রচ্ছদ: সৌরীশ মিত্র
.
শিশিরকুমার বসু (১৯২০-২০০০)
উদ্দেশে সশ্রদ্ধ নিবেদন
.
প্রাককথন
সুভাষচন্দ্র বসু আমার বাবা শিশিরকুমার বসুর কাকা, আমার পিতামহ শরৎচন্দ্র বসুর ছোট ভাই। সুভাষচন্দ্র বসু চলে যান ১৯৪৫ সালে, আমার জন্মের এগারো বছর আগে— সুতরাং তাঁকে সামনাসামনি দেখার সুযোগ আমার হয়নি। শরৎচন্দ্র বসুকেও আমি চোখে দেখিনি, তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৫০ সালে। স্বাধীন ভারতের প্রথম দশকগুলিতে কলকাতায় আমার বড় হয়ে ওঠা। এঁদের আমি নিজের আত্মীয়ের বদলে ঐতিহাসিক জননেতা হিসেবেই চিনতে শিখেছি। আরও লক্ষ-লক্ষ দক্ষিণ এশিয়াবাসীর মতো আমার চোখেও সুভাষচন্দ্র বসুর পরিচয়— ‘নেতাজি’ হিসেবে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান্ নেতা হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর মিত্র-নির্বাচনের কারণে যে পশ্চিমি দুনিয়ায় তিনি এক জন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, তাও জানতে পেরেছি। আমার বাবার মতে, নেতাজি বিশ্বাস করতেন, তাঁর দেশই তাঁর পরিবার। শৈশব থেকে তাই আমাকে শেখানো হয়েছিল, জন্মের আকস্মিকতার উপর ভিত্তি করে যেন তাঁর সঙ্গে কোনও বিশেষ আত্মীয়তার সম্পর্কের দাবি মনের মধ্যে পোষণ না করি।
যে প্রজন্মে আমার জন্ম, তার পক্ষে নেতাজিকে সরাসরি চেনার সুযোগ না থাকলেও তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন এমন বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমাদের পারিবারিক গৃহে অতিথি হিসেবে তাঁরা আসা-যাওয়া করতেন: প্রথমে ১ উডবার্ন পার্কের বাড়িতে, আর ১৯৭৪ সালের পর থেকে ৯০ শরৎ বসু রোডের বাড়িতে (যে বাড়িটির নাম “বসুন্ধরা”)। উডবার্ন পার্কের বারান্দায় বসে আবিদ হাসানের মুখে আমি সেই অবিশ্বাস্য যাত্রার কথা শুনেছি, নেতাজির সঙ্গে ১৯৪৩ সালে যে বিপদসঙ্কুল ডুবোজাহাজ যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন তিনি। সিঙ্গাপুরে থাকার সময়ে নেতাজির জীবনের নানা ঘটনাবলির কথা ছবির মতো ফুটে উঠেছে এস এ আইয়ারের কথায়, এমনকী সেই স্বাধীন ভারতের সাময়িক সরকার গঠনের ঘোষণাপত্র লেখার অভিজ্ঞতার কথাও। আর এক জন অতিথি, লক্ষ্মী সহগল, শুনিয়েছিলেন কী ভাবে ১৯৪৩ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির মহিলা বাহিনী তৈরি হয়েছিল, সেই কাহিনি। ১৯৪৫ সালে নেতাজির সঙ্গে তাঁর বাহিনী কেমন ভাবে বর্মা থেকে তাইল্যান্ডে পিছিয়ে যাচ্ছিল, সেই বর্ণনা শুনেছি জানকী থেবর আথিনাহাপ্পানের কাছে। প্রেমকুমার সহগল, গুরবক্স সিংহ ধিলোঁ, আবিদ হাসান, মেহবুব আহমেদ প্রমুখের কথা শুনতে শুনতে ইম্ফল, কোহিমা ও বর্মার যুদ্ধ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত। নেতাজির সম্পর্কে কথা বলতে গেলেই এই মানুষগুলির কণ্ঠস্বর আবেগে ভারী হয়ে আসত, প্রিয় নেতাকে হারানোর পর অতগুলি দশক কেটে গেলেও তাঁদের অশ্রুধারা বাঁধ মানত না।
১৯৪০ সালের ডিসেম্বরের গোড়ায় এক বিকেলে নেতাজি আমার বাবাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমার একটা কাজ করতে পারবে?” ‘কাজ’টা ছিল ‘রাঙাকাকাবাবু’কে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা। সেই দিন থেকে আমার বাবা নেতাজির হয়ে কাজ করা বন্ধ করেননি। দেশের অন্যতম অগ্রগণ্য শিশু-চিকিত্সক হিসেবে পেশাদারি ব্যস্ততার মধ্যেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান ঐতিহ্যগুলি তুলে ধরার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন সারা জীবন। ৩৮/২ এলগিন রোডে নেতাজির পৈতৃক বাড়িটিতে ১৯৫৭ সালে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, যে প্রতিষ্ঠানটি তখন থেকেই ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে আত্মনিয়োগ করে। এই প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়াতেই আমি বড় হয়ে উঠেছি। আমার বাবা তাঁর ছেলেমেয়েদের দিকে যতটা সময় ও মনোযোগ দিতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দিতেন এই প্রতিষ্ঠানের জন্য।
এই বই লেখার কাজ শুরু করার আগে পর্যন্তও আমি আমার বাবার এ সব কাজের পূর্ণ গুরুত্ব বুঝতে পারিনি। অর্ধশতকের অবিচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ে তিনি এশিয়া, ইউরোপের নানা অঞ্চল এবং আরও কত জায়গা থেকে নেতাজি এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কিত কত রকম মহামূল্যবান নথিপত্র যে সংগ্রহ করে গিয়েছেন— কত দলিল, চিঠিপত্র, পাণ্ডুলিপি, স্মারক, স্মৃতিকথা, ছবি, কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং কিংবা ফিল্ম ফুটেজ। লন্ডন, দিল্লি এবং অন্যত্র আর্কাইভস-এ বিস্তর সময় কাজ করেছি, কিন্তু বুঝতে বাকি থাকেনি যে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর এই অমূল্য ভাণ্ডার বাদ দিয়ে নেতাজির কোনও পূর্ণ জীবনী রচনা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই সংগ্রহশালার প্রথম সংগ্রাহক নাগা সুন্দরম্ ও বিনোদচন্দ্র চৌধুরির কথা। নাগা সুন্দরম্ প্রথম যৌবনে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সদস্য হিসেবে ইম্ফল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এন আর বি-র প্রথম দশকগুলিতে বিনোদচন্দ্র চৌধুরি এর প্রকাশনা বিভাগের কাজটি করে গিয়েছেন অদম্য উত্সাহে ভর করে। এই বই লেখার সময়ে গবেষণার কাজে আমার অফুরন্ত দাবি মেটাতে এন আর বি-র আর্কাইভস্ থেকে সদা-হাস্যমুখে যাবতীয় ধরনের নথিপত্র জুগিয়ে গিয়েছেন কার্তিক চক্রবর্তী, সুখময় চৌধুরি এবং মনোহর মণ্ডল। কলকাতায় বসে লেখা এটিই আমার প্রথম বই। দিনের বেলা ৩৮/২ এলগিন রোডে এবং রাতের বেলা ৯০ শরৎ বসু রোডের বাড়িতে লিখতাম আমি।
ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই যদিও এন আর বি-র সব রকম সেমিনার ও অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল, নেতাজির রচনা-সংকলনের কাজে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে আমার অন্তর্ভুক্তি কিন্তু পছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রয়োজনের ভিত্তিতেই ঘটে। ১৯৯২ সালের মধ্যে শিশিরকুমার বসু প্রথম পাঁচটি খণ্ড প্রকাশ করে ফেলেছিলেন, কিন্তু তার পর হঠাৎই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয়। সুতরাং পরের সাতটি খণ্ড সংকলনের কাজে আমি যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তাঁকে সাহায্য করতে আরম্ভ করি। এই কাজটি করতে গিয়ে নেতাজির নিজের লেখার সঙ্গে তো বটেই, তাঁর সম্পর্কে যত রকমের ঐতিহাসিক নথিপত্র রয়েছে, সব কিছুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য সপ্তম খণ্ডটির কথা, ১৯৯৩-৯৪ সালে লেটার্স টু এমিলি শেঙ্কল ১৯৩৪-৪২ নামে যে গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কেম্ব্রিজে ছাত্র ও ফেলো থাকাকালীন আমি বেশ কয়েক বার ভিয়েনা এবং অগ্সবুর্গ-এ গিয়ে আমার ঠাকুমা (বাবার কাকিমা) এমিলির সঙ্গে ছুটি কাটিয়েছি। তিনি আমার আত্মীয়, তাঁর স্বামী নেতাজির মতো বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র নন! তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা আমায় মুগ্ধ করত। অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে একাকী কন্যা অনিতাকে বড় করে তুলছেন যখন, তখনও তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রের কোনও সাহায্য গ্রহণ করেননি। তাঁর সমগ্র অস্তিত্বই অত্যন্ত মর্যাদাময়, ভারত দেশটিকে জীবনে কখনও চোখে না দেখেই ভারত সম্পর্কে জ্ঞানের আধার তিনি। স্নেহপ্রবণ মানুষটি আমাকে খুবই আদর করতেন। আমাদের দুজনের মিল ছিল এক জায়গায়— দুজনেই ভাল ‘ওয়াইন’ পছন্দ করতাম! ১৯৯৩-৯৪ সালে যখন তিনি এন আর বি-কে সুভাষ-এমিলি পত্রাবলি প্রকাশের অনুমতি দিলেন, সেই সময় বাধ্য হয়েই আমাকে ঐতিহাসিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হল, কতগুলি প্রশ্ন তাঁকে স্পষ্টাক্ষরে করতে হল। চরিত্রানুগ পরিশীলিত মর্যাদার সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। নেতাজির সঙ্গে সম্পর্কিত জায়গাগুলি ভ্রমণের সময় সবচেয়ে আনন্দের অভিজ্ঞতা হয় আমার পিসি অনিতা, পিসেমশাই মার্টিন, আমার মা কৃষ্ণা বসু এবং ভাই সুমন্ত্রর সঙ্গে এমিলি-সুভাষের প্রিয় শৈল-শহর বাডগাস্টাইনে গিয়ে। বাডগাস্টাইনে না গেলে বোধহয় বুঝতেই পারতাম না কেন এই জায়গাটি তাঁদের এত পছন্দের ছিল।
অনেক দিন পর্যন্ত এই বই লেখার বিষয়ে আমার এক গভীর দ্বিধা ছিল। তবে জানতাম, এক দিন না এক দিন আমাকে এই বই লিখতেই হবে। কয়েক বছর আগে, পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার তৎকালীন সম্পাদক নন্দিনী মেহতা বোঝালেন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে এ কাজে হাত দিতে, তাঁর মতে, সুভাষচন্দ্র বসুর উপর সবচেয়ে তথ্যনির্ভর জীবনী হতে চলেছে এই বইটিই। “হিজ ম্যাজেস্টি’জ অপোনেন্ট” নামে যে গ্রন্থ-প্রস্তাবনা লিখে ফেললাম এর পর, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের বিশেষ সম্পাদক জয়েস সেলজারের সেটি পছন্দ হল। প্রসঙ্গত, এই প্রকাশনা থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল আমার আ হান্ড্রেড হরাইজনস। সুতরাং, তার পর, ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে নেতাজি যেমন বলেছিলেন, সেই কথাটিই ধার করে বলা যায়: “কাজ শুরু করলাম।” পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সম্পাদক রঞ্জনা সেনগুপ্ত নন্দিনীর মতোই গভীর উত্সাহ নিলেন বইটির বিষয়ে, এবং হার্ভার্ড ইউনির্ভাসিটি প্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ায় এলেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় তাঁরাই বইটি প্রকাশ করবেন। বিশ্বজোড়া বিভিন্ন ধরনের পাঠকের জন্য এমন একটি বই লেখা বেশ দুরূহ কাজ। তবে মনে হল, চ্যালেঞ্জ নিতে হলে এমন কাজই হাতে নেওয়া উচিত।
এই শেষ ঝাঁপটা যে নিতে পারলাম, তার অন্যতম কারণ অবশ্যই একটি উপলব্ধি— এই উপলব্ধি যে, উপজীব্য বিষয়ের থেকে আমি এত দিনে প্রয়োজনীয় দূরত্বে পৌঁছতে পেরেছি, যে দূরত্বে যেতে পারলে তবেই এমন এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব— এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি দক্ষিণ এশিয়ায়, কিংবা তার বাইরেও, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখনও প্রবল আকর্ষণীয়— তাঁর সম্পর্কে বিশ্লেষণের কাজটি ঠিক ভাবে করা যায়। আরও একটি কথা বলা দরকার। নিজের গবেষণার ক্ষেত্রেও, আন্তঃ-মহাদেশ সম্পর্ক ও বিশ্ব-সভ্যতার সংযোগী ইতিহাসের বিষয়ে আমার কৌতূহল ক্রমশই অনেক গভীর হয়েছে। সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন আমার কাছে এই দিক থেক একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্পণের মতো, যার মধ্যে বিশ শতকের প্রথমার্ধে বিশ্ব-ইতিহাসের নানা পরস্পর-বিরোধী শক্তি ও ভাবধারার প্রতিফলন ও প্রতিসরণ দেখতে পাওয়া সম্ভব। ইউরোপ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরের ইতিহাসের প্রধান ধারাগুলি বিষয়ে সম্যক দখল ছাড়া সুভাষচন্দ্র বসুর এই বিশ্বব্যাপী মহা-অভিযানের প্রতি সুবিচার করতে পারতাম বলে মনে হয় না। এই জীবনী-রচনার মধ্যে নিভৃত একটি প্রয়াস রয়ে গিয়েছে: ইতিহাস-রচনাধারার সীমানাগুলি আরও খানিকটা প্রসারিত করার প্রয়াস। আশা থাকল, যে সব ইতিহাসের ছাত্রছাত্রী এই বই পড়বেন, তাঁরা সেই প্রয়াসটি বুঝতে পারবেন।
কলকাতায় বসে বই লেখার কাজ করলেও, বস্টন অঞ্চলের আন্তঃ-বিষয়ক (interdisciplinary) সারস্বতচর্চার ভুবনের কাছে আমি গভীর ভাবে ঋণী। হোমি ভাবা, লায়লা ফাওয়াজ, এমা রথস্চাইল্ড ও অমর্ত্য সেন-এর অনুপ্রেরণাময় সান্নিধ্য ও বন্ধুত্ব থেকে আমি সর্বদা উপকৃত হয়েছি। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে আমার প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা— ক্রিস মঞ্জাপ্রা, মঞ্জরী মিলার, ফয়জল চৌধুরি, সানা আইয়ার, অন্তরা দত্ত, স্যান্ডি পোলু, নিকো স্লেট, আলিয়া ইকবাল, তারিক আলি, জোহান ম্যাথু, গীতাঞ্জলি সুরেন্দ্রন, জুলিয়া স্টিফেনস, দিনইয়ার প্যাটেল এবং বেঞ্জামিন সিগেল— আমাকে মানসিক ভাবে সর্বক্ষণ সজাগ থাকতে সাহায্য করেছে। আটলান্টিকের অন্য পারে, ক্রিস বেইলির সমর্থন আমার কাছে সর্বদাই অমূল্য। ভিয়েনায় রণজিৎ গুহ আমার অনুপ্রেরণার বড় উৎস। সীমা আলভি, জয়তী ঘোষ ও ক্রিস মঞ্জাপ্রা প্রত্যেকেই পাণ্ডুলিপির কয়েকটি অধ্যায় পড়েছেন, জরুরি মন্তব্য করে সাহায্য করেছেন।
সমগ্র পাণ্ডুলিপিটি পড়েছেন মাত্র পাঁচ জন— কৃষ্ণা বসু, জয়েস সেলজার, আয়েশা জালাল এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের দুই পাণ্ডুলিপি-পাঠক। সুভাষচন্দ্র বসু বিষয়ে কৃষ্ণা বসু নিজেই এক জন চলমান তথ্যাধার, বিশেষত ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতাজির কার্যকলাপ বিষয়ে। বাংলায় এ বিষয়ে যে দুটি বই লিখেছেন তিনি— ইতিহাসের সন্ধানে এবং চরণরেখা তব— সেগুলি ইতিমধ্যেই পাঠকমহলে সুপরিচিত। গোটা পাণ্ডুলিপিটি দেখে দিয়েছেন তিনি, তথ্যগত ভাবে নির্ভুল রাখতে সাহায্য করেছেন, সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও সময়কাল জুড়ে নানাবিধ বিতর্কিত ঘটনাবলি বিষয়ে মরমি দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে সাহায্য করেছেন। জয়েস সেলজার খুঁটিয়ে পড়েছেন পাণ্ডুলিপিটি, মার্জিন-বরাবর পেনসিলে-লেখা তাঁর নানা মন্তব্যের জন্য এই বইয়ের বক্তব্য ও লিখনশৈলী অনেকখানি উপকৃত হয়েছে। আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই বই কেবল ইতিহাস-পাঠকদের জন্য নয়, সব রকমের পাঠকের জন্য, এবং ঐতিহাসিক গবেষণা-শৈলীর সঙ্গে সেই পাঠকদের দাবি মেটানোর বিষয়েও সচেতন হওয়া দরকার। এত বড় মাপের কোনও চরিত্রের মহত্ত্বের পাশাপাশি তাঁর মানবিক দুর্বলতা ও ব্যর্থতার দিকগুলিকেও ঠিকঠাক স্থান দেওয়ার বিষয়ে আমাকে সচেতন করে দিয়েছেন সেলজার। দুই পাণ্ডুলিপি-পাঠকের মন্তব্যে যে প্রশংসাবাক্য এবং সহায়ক মন্তব্য ছিল, চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি লেখার সময়ে সেগুলির বিরাট মূল্য অনুভব করেছি।
পাণ্ডুলিপিতে আয়েশা জালালের পার্শ্ব-মন্তব্যগুলি চিরকালই তাঁর মৌখিক সমালোচনার মতোই, অতীব তীক্ষ্ণ। তাঁর কাছ থেকে উত্সাহ ও সমর্থন পেয়েছি অনেক। ব্যক্তিবিশেষ ও বৃহত্তর ইতিহাসের সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর নিজের দৃষ্টান্তস্বরূপ গবেষণা আমার কাছে বিশেষ অনুপ্রেরণা। আশা রইল, আমার জীবনসঙ্গিনী আমাদের তিন দশকব্যাপী মানসিক ঘনিষ্ঠতা ও সারস্বত বন্ধুত্বের যোগ্য নির্মাণ বলে এই বইটিকে গ্রহণ করবেন।
এই বইটি বিদেশি ভাষায় রচিত। মাতৃভাষায় অনুবাদের কঠিন কাজটি আমার প্রাক্তন ছাত্রী, ইতিহাসবিদ ও সুলেখিকা সেমন্তী ঘোষ আশ্চর্যভাবে সাফল্যমণ্ডিত করেছেন। প্রকাশনার দায়িত্ব দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আনন্দ-র সুবীর মিত্র ও তাঁর সহকর্মীদের অশেষ ধন্যবাদ।





Leave a Reply