• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী : হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ! – অমিত দাশ

লাইব্রেরি » দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী : হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ! – অমিত দাশ
দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী
বইয়ের ধরন: প্রবন্ধ ও গবেষণা

দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী : হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ! – অমিত দাশ

Dustubuddhi Buddhijibi–Hindu-musalman Samparka O Sampradayik Rabindranath! by Amit Das

বিবেকানন্দ সাহিত্য কেন্দ্ৰ
প্রকাশ : অগাষ্ট, ২০০৬
প্রকাশক : অরুণ ঘোষ

.

উৎসর্গ

শ্রী নিত্যপ্রিয় ঘোষ
ও
স্বামী সোমেশ্বরানন্দ–কে

.

প্রস্তাবনা

ধর্ম নিয়ে মাথাব্যথা একবিংশশতকের সকালে যুক্তিশীল মানুষের একান্ত হতে পারে না। আমার ধর্মের রঙ লাল-সবুজ কিংবা কালো বজায় রইলো কিনা তা নিতান্তই আপতিক। তবুও নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে নিজেকে যে ‘হিন্দু’ বলে পরিচয় দিই, তা কোন ধর্মীয় পরিচয় বহন করে না।

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ-“হিন্দু শব্দে এবং মুসলমান শব্দে একই পর্যায়ের পরিচয় বুঝায় না। মুসলমান একটি বিশেষ ধর্ম কিন্তু হিন্দু কোনো একটি বিশেষ ধর্ম নয়। হিন্দু ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি জাতিগত পরিণাম। ইহা মানুষের শরীর মন হৃদয়ের নানা বিচিত্র ব্যাপারকে বহু সুদূর শতাব্দী হইতে এক আকাশ, এক আলোক, এক ভৌগোলিক নদনদী অরণ্য পর্বতের মধ্যে দিয়া, অন্তর ও বাহিরের বহুবিধ ঘাতপ্রতিঘাত পরম্পরায় একই ইতিহাসের ধারা দিয়া আজ আমাদের মধ্যে আসিয়া উত্তীর্ণ হইয়াছে।” (আত্মপরিচয়)

আস্তিক-নাস্তিক কিংবা নিতান্ত অজ্ঞেয়বাদী হলেও সমাজে আমার ‘হিন্দু’ পরিচয় গ্রাহ্য। চার্বাকপন্থীরাও বৃহত্তর হিন্দুসমাজের বাইরে নন।

ইদানীং অবশ্য ‘হিন্দু’ কথাটিই কেমনভাবে যেন প্রায় গালাগালির পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। যতই আমরা মুক্তমনা হই না কেন, সমাজে ‘অনাথ’ শিশুর মর্যাদা যেমন একান্তই তলানিতে অবস্থিত, একজন নির্দিষ্ট সর্বজনগ্রাহ্য প্রবক্তা বা গুরু না থাকায় “হিন্দু’র অবস্থাও সেইরকম। ফলে হিন্দু-মুসলমান, হিন্দু-খৃষ্টান মতান্তর-মনান্তরে তিরস্কারের সম্মার্জনী হিন্দুর উপরই বর্ষিত হয়। আর সকল হিন্দুই ‘আমি তো সম্মার্জনীর লক্ষ্য নই’ ভেবে আনন্দে উদ্বাহু হন।

অতীতে গোঁড়া হিন্দু আর বর্তমানে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যাঁকে কারণে-অকারণে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজেদের মতের চুড়ান্ততা প্রমাণে উৎসাহী সেই রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বহু আগেই বলেছেন :-“ হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের যদি বিরোধ হয়ে থাকে, তবে আমি হিন্দু নই বলিয়া সে বিরোধ মিটাইবার ইচ্ছা করাটা অত্যন্ত সহজ পরামর্শ বলিয়া শোনায়, তাহা সত্য পরামর্শ নহে। এই জন্যই সে পরামর্শে সত্যফল পাওয়া যায় না। কারণ আমি ‘হিন্দু’ নই বলিলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধটা যেমন তেমনই থাকিয়া যায়, কেবল আমিই তাহা হইতে একলা পাশ কাটাইয়া আসি।” (রবীন্দ্ররচনাবলী, জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ-১৬৭)

যাই হোক্, অন্তত ধৰ্মীয়, ক্ষেত্রে ‘কর্তাভজা’ না হওয়া, ‘গুরুবাদী’ না হওয়া, নানা বিচিত্রমুখী ভাবনায় ভাবিত হওয়া যে হিন্দু মুক্তসমাজের প্রধান শক্তি হওয়া উচিত ছিল, তা হিন্দুর দুর্বলতার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। হিন্দুর নিপীড়নে তাই সকলেই রবীন্দ্রনাথ যেমন বর্ণনা দিয়েছেন তেমনভাবে :-“উয়ো তো বেনিয়াকো লড়কী”* বলে পাশ কাটিয়ে যেতে তৎপর।

[* ……. “আমার কোনো বন্ধু ভারতের প্রত্যন্তবিভাগে ছিলেন। সেখানে পাঠান দস্যুরা মাঝে মাঝে হিন্দু-লোকালয়ে চড়াও হয়ে স্ত্রীহরণ করে থাকে। একবার এইরকম ঘটনায় আমার বন্ধু কোনো স্থানীয় হিন্দুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সমাজের উপর এমন অত্যাচার তোমরা সহ্য কর কেন?’ সে নিতান্ত উপেক্ষার সঙ্গে বললে, উয়ো তো বেনিয়াকী লড়কী।’বেনিয়াকো লড়কী’ হিন্দু আর যে ব্যক্তি তার হরণ ব্যাপারে উদাসীন সেও হিন্দু, উভয়ের মধ্যে শাস্ত্রগত যোগ থাকতে পারে, কিন্তু প্রাণগত যোগ নেই। (অ্যালফেড মঞ্চে পঠিত রবীন্দ্রনাথের এই লেখাটি প্রকাশিত হয় প্রবাসী, অগ্রহায়ণ, ১৩৩০ সংখ্যায়।)]

মুসলমান (একটি বড় অংশ) মানসিকতায় বিচ্ছিন্নতা (অন্তত ইসলাম বর্ণিত দার-উল-হারার্-ভারতবর্ষে) বীজের উপ্তিই ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান সুম্পর্কের প্রধানতম অন্তরায় এই সত্যটি মেনে নিতে অস্বীকৃত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বুদ্ধিজীবী। মুসলমানের বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতার জন্য যারা তথাকথিত “হিন্দু অসহিষ্ণুতাকে’ ডাইনী করে তুলেছেন তাদের কাছে আজ অন্তত এ প্রশ্ন রাখাই যায় যে কমিউনিষ্ট দেশ চীনে মুসলমানপ্রধান বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতা ও সন্ত্রাসের যে বাড়বাড়ন্ত, তা কোন চীনা ‘হিন্দু’র অত্যাচারের ফল?

সাংবাদিক সুমিত মিত্র ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখেছেন :-“ভারতে যে-ইসলামি মৌলবাদ অযোধ্যা-বাবরি ঘটনাবলীর পর মাথা চাড়া দিয়েছে তার অভিমুখ সম্পূর্ণ দেশজ। নরেন্দ্র মোদীর উপমাটি ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে বলা ভাল ওটি গেরুয়া ক্রিয়ার সবুজ প্ৰতিক্ৰিয়া।”

শ্রী মিত্র কিন্তু জানালেন না কাশ্মীরে কয়েকদশক ধরে যে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম কিংবা নিদেনপক্ষে বোম্বাই বিস্ফোরণ কোন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া?

আসলে ‘Pan-Islamism’ সম্বন্ধে যাদের ধারণাই নেই অথবা কৌশলগত কারণে এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে তা গোপন করতে চান;তারা আজ হিন্দুর ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে তো বটেই, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে মুসলমান চরিত্রের স্বল্পতায়, নন্দলাল বসুর আঁকা ছবিতে মুসলমান চরিত্রের অনুপস্থিতিতে, এমনকী ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে ‘হিন্দু’ আইকন ব্যবহারের বাড়াবাড়ি খুঁজে তথাকথিত আত্মসমালোচনার মহানুভবতার নামে যে আত্মঘাতে মেতে ওঠেন, তার পেছনে সাময়িক কোনো বিশেষ সম্ভাবনার হাতছানি প্রচ্ছন্ন আছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। এঁরাই ছৌ-নাচে গণেশ বন্দনায় আতঙ্কিত হন, মঙ্গলকাব্যে হিন্দু দেবদেবীর উপস্থিতিতে গেল-গেল রব তোলেন। যে মূঢ়তায় জাতির সংস্কৃতি, পৌরাণিক গাথা-গল্প এদের কাছে আঁস্তাকুড়ের জঞ্জাল বলে পরিগণিত হচ্ছে, সেই মূঢ়তা অবলম্বন করে কোন মূঢ়মতি ‘হিন্দু’ যদি একদিন ভেবে বসেন নজরুলের বিদ্রোহী কবিতায় ‘খোদা’ কথাটি রয়েছে বলে পরিত্যাজ্য, জসিমুদ্দিনের নকশীকাঁথার মাঠে যে কবরের কথা রয়েছে তা ইসলামগন্ধী কিংবা শামসুর রাহমানের ‘বাংলাভাষা উচ্চারিত হলে’ কবিতায় রোজার রাতের বর্ণনায় মুসলমান ‘আইকন’-এর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে কুলোর বাতাসে দূর করতে চান সেই সমস্ত অনবদ্য সাহিত্যসৃষ্টি, তাহলে আজকের ‘হিন্দু’ আইকন দূর করতে উৎসাহী নবনিরপেক্ষতাবাদীদের (Neo Secularist)প্রচেষ্টারই সম্প্রসারণ হবে মাত্র।

এদেশে মুসলমান বিচ্ছিন্নতা কারণ অনুসন্ধান করতে হলে যে সমস্ত তথাকথিত পবিত্র গ্রন্থারাজী ইসলামিক দর্শনের মূল উৎস, এখনও ইসলামী জীবনচর্চার প্রধানতম চালিকা শক্তি সেই বইগুলির গভীরে যাওয়া প্রয়োজন।

যে সমস্ত তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সমগ্র বিশ্বের যাবতীয় বিশ্বাসকে তরবারীর জোরে মুছে দিতে উৎসাহী ইসলামের, “……….বিধর্মীদের হয় ধর্মান্তরিত করবে, নয় কোতলে আম বা সমূলে নিপাত” (পশ্চিমবঙ্গ সরকার দ্বারা প্রদত্ত রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত নন্দগোপাল সেনগুপ্তের লেখা ‘বস্তুবাদীর ভারতজিজ্ঞাসা’, পৃ-৫৪) নীতিতে বিচ্ছিন্নতার উৎস খুঁজে না দেখে; সে বিষয়ে মুসলমান ধর্ম অবলম্বনকারী মুক্তমনা মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে যথার্থ কারণ ছাড়াও ‘হিন্দু’-কে গালি দিতে ব্যস্ত হয়ে এমনকী মিথ্যারও আশ্রয় নিতে সঙ্কোচ বোধ করেন না, তাদের সম্পর্কে সচেতন হবার দিন এসেছে।

মুক্তমনের অধিকারী মুসলমান লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা আজ সরব হচ্ছেন, এবিষয়ে আবদুল ওদুদ, রেজাউল করিম প্রমুখের পথ অবলম্বন করেই। শাহরীয়ার কবির, সালাম আজাদ কিংবা এপার বাংলার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মইনুল হাসান প্রমুখ এই উদ্যোগে যথার্থ নিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদীদের সঙ্গেই থাকবেন–এমন আশ্বাস তাদের লেখার মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।

ধর্মবিশ্বাস যা একান্ত ব্যক্তিগত তা জোর করে অপরের কাঁধে চাপালে তার মূল্য যে নিতান্ত তুচ্ছ হয়ে যায়, এ বোঝার শিক্ষা এই একবিংশশতকেও অর্জন করার পরিবর্তে নিজের বিশ্বাসেই বিশ্বকে অভিভূত করতে চাইলে তা প্রতিরোধ করাই সঙ্গত।

মুসলমান বিচ্ছিন্নতাবাদের কারণ খুঁজতে প্রায়শই হিন্দুদের মুসলমান সমাজের প্রতি মুখ ঘুরিয়ে থাকা, তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে অনীহার কথা বলা হয়েছে। ‘খাবলে নেওয়া’ এই ইতিহাসবোধ এ বিষয় ভেবে দেখতে চায়নি যে বস্তুত হিন্দুসমাজের, বিশেষত উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজের এই অনীহা মাত্র মুসলনামদের সম্পর্কেই প্রযোজ্য তা নয়। হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথার কদর্যতার বিরুদ্ধেই তো রাজা রামমোহন রায় থেকে আরম্ভ করে রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দের সাধনা। নিতান্ত ডোম কিংবা মেথরের জীবিকা যে মানুষেরা গ্রহণ করতেন তারা তো বটেই, ধনে ও মানে যথেষ্ট উন্নত সাহা, সুবর্ণবণিকেরা (বাংলায়) পর্যন্ত হিন্দুসমাজে অস্পৃশ্য বলে পরিগণিত হতেন। বিপিনচন্দ্ৰ পাল তাঁর আত্মজীবনী ‘সত্তর বৎসর’-এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

জাতের নামে বজ্জাতির শিকার সাধারণ হিন্দুর মতো মুসলমানও হয়েছেন–শুধুমাত্র মুসলমান হবার জন্যই নয়। তাছাড়া হিন্দুর এমন কোন সর্বজনগ্রাহ্য ধর্মগ্রন্থ নেই যেখানে হিন্দু ছাড়া অপর ধর্মে বিশ্বাসীর প্রতি ঘৃণার বাতাবরণ গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ হিন্দুর মুসলমান বিরোধিতা শাস্ত্রসম্মত নয় সামাজিক এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ হিন্দুর যথার্থ সমালোচনা করতে গিয়ে ‘জাজিম’ তুলে মুসলমানের বসার স্থান নির্দিষ্ট করার বিষয়ে যা বলেছেন শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে, ধর্মের বাধন আলগা হবার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু সমাজ তা সংশোধন করে নিচ্ছেন। হিন্দুর মেয়ে মুসলমান যুবককে বিবাহ করলে বহু হিন্দু হয়তো এখনও খুশি মনে তা মেনে নিচ্ছেন না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দ্বিধাও কেটে যাচ্ছে। মুসলমান সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের অন্দরমহলে খোঁজ নিলে জানা যাবে সেখানে হিন্দু ঘরের মেয়েদের সংখ্যা নেহাত অগ্রাহ্য করবার মতো নয়।

অপরপক্ষে মুসলমান সমাজে ‘কাফের’ হিন্দুর সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যযুগীয় মুসলমান বাধা আজও অক্ষুণ্ণ আছে একই ভাবে।

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর খুব বেশী রকম হিন্দু নির্যাতনকারী ছিলেন এমন নয়। হিন্দুর মন্দির এবং মূৰ্ত্তি কিছু ভাঙ্গলেও মোটামুটিভাবে হিন্দুদের সঙ্গে সম্ভাব বজার রেখে চলার বিষয়ে পিতা আকবর-এর নীতি মেনে চলতেন। এই রকম একজন তুলনামূলকভাবে মৃদু হিন্দু বিদ্বেষী মুসলমান সম্রাট তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন :-“শুক্রবার ৮ই রাজাউর-এ শিবির পড়েছিল। প্রাচীনকালে ওখানকার অধিবাসীরা ছিলেন হিন্দু………..। সুলতান ফিরুজ তাদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন।……….. হিন্দুদের সঙ্গে এদের খুব ঘনিষ্ঠতা এবং এই দুই সম্প্রদায়ে বিবাহাদি চলে। হিন্দু মেয়ে গ্রহণ করা যায়। কিন্তু হিন্দুর ঘরে কন্যা দান, আল্লা না করুন, তা একেবারেই চলে না। আমি হুকুম দিলাম যে তখন থেকে সেরকম কাজ অর্থাৎ হিন্দুকে কন্যা দান করা চলবে না। যদি কেউ করে তবে তার মৃত্যুদণ্ড হবে।” (তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী, কল্পন সংস্করণ, পৃ ৪৩৪-৪৩৫)

চারশো বছরের বেশী সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। গঙ্গা–যমুনা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। মুসলমান সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে কি? হিন্দু-মুসলমান যুবকদের এক সম্মেলনে মৈত্রেয়ী দেবী, গৌরকিশোর ঘোষ, গৌরী আইয়ুব, বিচারপতি মাসুদ, অধ্যাপক মামুদ সহ বহু বিশিষ্ট মানুষের উপস্থিতিতে বর্তমান গ্রন্থের লেখক হিন্দু-মুসলমান সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য একে অপরকে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে না রেখে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দিলে কিভাবে মুসলমান যুবকেরা (যারা প্রত্যেকেই ছিলেন প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত সকলে একসাথে উঠে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন, তার সাক্ষী এখনও দু-চারজন রয়েছেন। বুদ্ধিজীবীরা প্রায় সকলেই সমর্থন জানানোয় বর্তমান লেখকের মুখরক্ষা হয়েছিল সত্য। কিন্তু যে বাস্তব সত্য সেদিন প্রকাশ পেয়েছিল নানা তত্ব কথায় তা মিথ্যে হয়ে যাবে না। এমনকী চলচ্চিত্রেও মুসলমান ঘরের মেয়েকে হিন্দুযুবকের প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপিত করাতে বিক্ষোভের ফলে চলচ্চিত্রটিকেই প্রত্যাহার করতে হয়েছে এই অতি আধুনিককালেও!

ভারতবর্ষের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাষ্ট্রপতিও তাঁর নিজের পরিবারের এক কন্যার পাণিপ্রার্থী হিন্দু যুবককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার শর্ত জানাতে কুণ্ঠা বোধ করেননি।

আধুনিক বাংলার অতিআধুনিক ও প্রগতিমনস্ক গায়কের ধর্ম পরিবর্তন করে বিবাহ করার ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সমস্যার গভীরতা কতটা! একথা কি বিশ্বাস করতে হবে ঐ গায়ক বিশেষ ধর্মপ্রাণ অথবা ধর্মের তুলনামূলক (comparative) বিচার করেই মুসলমান হয়েছেন? জানা যাবেনা মুসলমান ধর্মের অন্যতম মৌলিক ক্রিয়া সুন্নৎ-এর পথপরিক্রমাও তাঁকে করতে হয়েছে কিনা।

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তথাকথিত ‘হিন্দু বিচ্ছিন্নতা’ সন্ধানী বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশ্য করে সহজেই একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া যায় এই বলে যে তাঁরা এদেশের দশজন প্রগতিশীল মুসলমান বুদ্ধিজীবীকে খুঁজে বের করুন যাঁরা প্রকাশ্যে সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে বলবেন যে হিন্দু পরিবারের মেয়েকে বিবাহ করতে মুসলমান যুবকের যেমন বাধা নেই, তেমনি মুসলমান মেয়েদের পক্ষেও হিন্দু যুবককে, ধর্মপরিবর্তনের শর্ত না রেখেই, বিবাহ করার বিষয়ে কোন আপত্তি থাকা উচিত নয়। কিংবা এমন পাঁচজন প্রগতিশীল মুসলমান বুদ্ধিজীবীকে খুঁজে বের করুন যাঁরা বলবেন সকল ধর্মের সকল মানুষই সমান এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সন্তান।

একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা এমন বিবৃতি দিতে সাহসী হবেন খুব কম সংখ্যক মুসলমান বুদ্ধিজীবী। কারণ ধর্মেই রয়েছে নিষেধের চোখ রাঙানী। “কোরান শরীফ’-এর আয়াতেই বলা হচ্ছে :-”অংশীবাদী রমণী যে পর্যন্ত না (ইসলাম ধর্মে) বিশ্বাস করে তোমরা বিবাহ করো না। অবিশ্বাসী নারী তোমাদের চমৎকৃত করলেও নিশ্চয় ধর্মে বিশ্বাসী ক্রীতদাসী তা অপেক্ষা উত্তম। ধর্মে বিশ্বাস না করা পর্যন্ত অংশীবাদী পুরুষের সাথে তোমাদের কন্যার বিবাহ দিও না, অংশীবাদী পুরুষ তোমাদের চমৎকৃত করলেও ধর্মে বিশ্বাসী ক্রীতদাস তা অপেক্ষা উত্তম।” (সূরা-বাকারাহ্, রুকূ-২৭, আয়াত-২২১)

কাজেই হিন্দু-মুসলমান মিলনের বাধা কোথায় তা জানার জন্য বহু গবেষণার কষ্টস্বীকার বৃথা। বুঝতে অসুবিধা হয় না কেন আধুনিক শর্মিলা ঠাকুরকে আয়েষা বেগম হতে হয় পতৌদির নবাব মনসূর আলি খানকে বিয়ে করবার জন্য, কেন অতি আধুনিক সুমন চট্টোপাধ্যায় হয়ে যান কবীর সুমন।

ভাগ্যের এমনই পরিহাস, এরাই দূরদর্শনে-সভায়-সমাবেশে আমাদের কাছে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে ভূরি ভূরি জ্ঞান বিতরণ করেন।

রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন :-“তাদের ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সঙ্গে মেলবার জন্য অন্য কোন উপায় নেই।” তখন সেই সত্যটি অপ্রিয় বলে আমাদের মন তা অস্বীকার করতে চায় ঠিকই, কিন্তু তাতে সত্যের বিশেষ পরিবর্তন সাধিত হয় কি?

এমন যদি মেনে নেওয়া যায় যে সবাই মিলে রাতারাতি পরিবর্তন করলেন ধর্ম। একটি নির্দিষ্ট রঙই না হয় লাগলো আধুনিক জীবনের এক অংশে। কিন্তু সমাজ?

আমাদের প্রত্যেক দিনের গুটি গুটি চলার পথে যে সমাজ আলোর দিকে একটু একটু করে এগিয়ে গেছে তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে?

সমগ্র পৃথিবীর যেখানেই ইসলাম তার সর্বগ্রাসী প্রভাব বিস্তার করেছে, সেখানেই সমাজ কোন চেহারায় এসে সামনে দাঁড়িয়েছে তা আমরা দেখছি না? পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির কথা না হয় বাদই দিলাম। ঘরের কাছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে কি চলছে? মেয়েদেরকে ‘বোরখা’র আড়ালে লুকোবার ফতোয়া দিয়ে যা শুরু হলো তার শেষ কোথায় কে জানে?

ভারতবর্ষেও স্মরণাতীত কাল থেকে বিদেশীরা এসেছেন কিন্তু মুসলমানরা এদেশে আসার ফলে যে রক্তপাত ঘটেছে তেমন উদাহরণ একান্তই নগণ্য। শুধুমাত্র অভিযোগকারী নেতার মনোভাবই রক্তপাতের কারণ, এর পিছনে কোনো বিশেষ দার্শনিক চিন্তা ক্রিয়াশীল ছিল না এ নিতান্তই সরলীকৃত ব্যাখ্যা।

নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে মুসলমানদের দৃঢ় বিশ্বাসের জন্যই ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দটি তাদের অভিধানে একান্তই অচল এই সত্য কিভাবে অস্বীকার করা যাবে? তথাকথিত বৃহত্তর হিন্দুসমাজের অন্তর্ভূক্ত হয়েও ‘যত মত তত পথ’-এর নীতিতে আস্থা স্থাপন যা ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ছাড়া আর কি? মুসলমান কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী তো দূরের কথা, সামাজিক কোনো গোষ্ঠীকেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যারা বলবেন ‘যত মত তত পথ’ যথার্থই মানবিক ভাবনার প্ৰতিফলন।

হিন্দু সমাজ পিছিয়ে নেই এমন নয়। কিন্তু এরই মধ্যে যারা এগোতে চাইছেন তারা কেন আবার ‘পিছনমুখী’ চলার সম্ভাবনাকে জিইয়ে তুলবেন?

হিন্দু-মুসলমান বিরোধের ব্যাখ্যায় যারা যথার্থ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে জলের উপর তল দেখেই গভীরতা মাপতে চান, তারা তা করেন নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য। একে দুষ্টবুদ্ধি বলা যাবে না কেন? এদেরই সাথে যুক্ত হন অপরিণামদর্শী কিছু বুদ্ধিজীবী। বহু বিষয়ে জাতির শিক্ষক হয়েও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনায় যুক্তি ও তথ্যে আস্থা রাখার পরিবর্তে আবেগে ভেসে যেতে অভ্যস্ত এই সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে গিরগিটির মতো রঙ বদলান তা আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি। বর্তমান আলোচনা এদের স্বরূপ সন্ধানেরই এক প্রচেষ্টা—প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার রোজনামচা।

Book Content

দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী – ১
দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী – ২
দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী – ৩
দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী – ৪
দুষ্টুবুদ্ধি বুদ্ধিজীবী – ৫
মনচোরা - শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

মনচোরা – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

ম্যাজিক মুনশি – হুমায়ূন আহমেদ

আমি ছিঁড়ে ফেলি ছন্দ, তন্তুজাল – শক্তি চট্টোপাধ্যায়

এম্পায়ার অভ দ্য মোগল ৫ (দ্য সার্পেন্টস্ টুথ) / অ্যালেক্স রাদারফোর্ড / অনুবাদ : জেসি মেরী কুইয়া

এম্পায়ার অভ দ্য মোগল : দ্য সার্পেন্টস্ টুথ – অ্যালেক্স রাদারফোর্ড

Reader Interactions

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.