দশটি কিশোর উপন্যাস – বিমল কর
দশটি কিশোর উপন্যাস – বিমল কর
সংগ্রাহক – রঞ্জন মুখোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২৪
প্রচ্ছদ – নচিকেতা মাহাত
.
প্ৰণাম
অখণ্ড জীবন খণ্ড খণ্ড হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। প্রতিটি খণ্ড থেকেই অবিরত গল্প বেরিয়ে আসছে। সুখের, দুঃখের। শান্তির, অশান্তির। জীবন ছেড়ে ঘটনার ঘোর ঘনঘটা। ‘বিপুল তরঙ্গরে’। কুশীলবরা খেয়ালই করে না, কাগজ, কালি, কলম ছাড়াই তারা দিনের পর দিন জীবন দিয়ে জীবন লিখে চলেছে। সাহিত্য মানে ‘সহিত’। আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে পোশাকের মতো ঝুলে আছে। বিমল কর সেই সাহিত্যিক, যিনি কুলোয় ঢেলে জীবনের দানা বের করতেন। বেঁচে থাকার মহাযজ্ঞে জীবনের স্তোত্র পাঠ করতেন। অক্লান্ত এক পূজারি। নির্বিকার, নিরাসক্ত এক সাধকের মতো। আমার সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি পিতার আসন গ্রহণ করেছিলেন। আদর্শ এক পিতা। স্নেহের সঙ্গে শাসন। পবিত্র এক চালিকা শক্তি। আকাশের মতো, সাগরের মতো উদার। তাঁর সাহিত্য যেন অনুসন্ধানকারীর অনুসন্ধান। গভীর, গহন জীবন অরণ্যে খুঁজে চলেছেন মানুষ নামক প্রাণীটির রহস্যে ঢাকা স্বরূপ। গল্পের ভেতরে গুঁজে দিয়েছেন প্রশ্ন—মানুষ! তুমি কে! এক অর্থে তিনি ছিলেন বাউল। তাঁর একতারাতে বাজত একটিই আক্ষেপ—মানুষ তুমি তোমার স্বরূপ জানালে না। দারিদ্র, প্রাচুর্য, ক্ষমতাশালী, দুর্বল, অত্যাচার, অত্যাচারী, অত্যাচারিত, বঞ্চিত, জীবন এক জটিল জটলা, মাকড়সার জালের মতো।
বিমল কর এই জাল থেকে মুক্ত হতে চাননি। তিনি জীবনের ভেতরে বসেই বাস্তবকে ফুটিয়ে তুলেছেন নিপুণ দক্ষতায়। মেধার সঙ্গে হৃদয়ের যোগ। কোনও মতবাদের শরিক হতে চাননি। কোনও ‘স্লোগান’ নেই। উপদেশ নেই। তিনি দর্শক, দার্শনিক নন। ধর্মের কথা বলেননি। বেদ-বেদান্ত, ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা ইত্যাদি তাঁর কলমে আসেনি। তিনি বলতেন, জীবন দেখো, দেখা জীবনের কথা সাহিত্যের শর্ত মেনে অকপটে লিখে যাও। মশলা মিশিয়ে স্বাদু করার প্রয়োজন নেই। তাহলেই বাণিজ্যিক। কল্পনার জোর না থাকলে অদেখা জীবনের কথা লেখার চেষ্টা কোরো না। রক্ত মাংসের মানুষের কথা বলো। তুমি ফেরিঅলা নও, তুমি ‘আর্টিস্ট’। আমাকে একদিন খুব জোরের সঙ্গে বললেন, ‘তুই বাপের ব্যাটা লিখে যা, কে পড়ল না পড়ল গ্রাহ্য করার দরকার নেই।’ তাঁর অদ্ভুত বলিষ্ঠতা, সম্রাটের মতো বেপরোয়া একটা ভাব। অশ্লীলতার ঘোরতর বিরোধী। ভাষার শুদ্ধতা, শুচিতা সম্পর্কে ভীষণ সচেতন। তাঁর পড়াশোনার পরিধি ছিল বিরাট। আত্মপ্রচার, আস্ফালন ছিল না। তবে অত্যন্ত আত্মসচেতন ছিলেন। কোনও কারণেই মাথা নত করবেন না। নিজেকে কতটা ভালোবাসলে অমন এক মানুষ হওয়া যায়! সংসারে নিজেকে রেখেছিলেন কারুকার্যখচিত বহুমূল্য একটি পেয়ালার মতো। সাবধানে, অতি সাবধানে। সকলের খুব কাছে, কিন্তু বহু দূরে। তাঁর নিজস্ব একটা জগৎ ছিল, স্বপ্ন ছিল, আদর্শ ছিল। অভিজাত এবং শৌখিন। নিজেকে খুব গুছিয়ে রাখতেন। সাগরের মতো। গভীরে গম্ভীর। প্রকাশে, প্রকাশে প্রাণময়।
যে সময়ে কলম ধরেছিলেন সেই সময় বাংলার জন-জীবন, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে বিশাল একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল। পুরোনো ভাবনা-চিন্তা, ধরন-ধারণ পাল্টাচ্ছিল। মানব জীবনে এই যুগ পরিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, কল্লোল গোষ্ঠী চলমান যুগেরই পদক্ষেপ। পূর্ব আর পশ্চিমের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান। শিল্প সভ্যতার গতিময়তা। বেদ ও পুরাণের যুগ থেকে সরতে সরতে আমরা অনেকটা সরে এসেছি। ত্যাগ-বৈরাগ্যের কথা বলছি না। বলছি চূড়ান্ত ভোগের কথা। ফরাসি, রুশ ও আমেরিকার বিপ্লব নতুন রাষ্ট্র ও জীবনভাবনাকে উস্কে দিয়েছে। বিপ্লববাদ, সমাজবাদ, মার্কসবাদ একের পর এক আন্দোলন জীবন তটে আছড়ে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা আমাদের প্রাচীন চিন্তায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কোথায় শান্তি, কোথায় সৌহার্দ, কোথায় সহিষ্ণুতা! বিদ্বেষ, বিভাজন, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন। পথ? বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী, উগ্রবাম। সব ধ্বংস করে দেওয়ার বার্তা।
বিমল কর জীবন-পথের একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছেন মানুষের জান্তব আচরণ। তাঁর সাহিত্য হয়ে উঠেছে সময়ের দলিল। পাতার পর পাতা লিখছেন, পরক্ষণেই ছিঁড়ে ফেলছেন। হচ্ছে না, ধরতে পারছেন না, সমস্যার হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারছেন না। রক্ত-মাংসের মানুষ সৃষ্টি করতে পারছ না কেন? আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য হচ্ছে না কেন! ক্ল্যাসিক। নামের জন্যে, অর্থের জন্যে, মঞ্চ অথবা ছায়াছবির জন্যে ছকে বাঁধা, কান্না-হাসির মশলাদার ‘চাট’ তিনি বানাতে পারবেন না।
অথচ তাঁর কলমে কী না ছিল! হিউমারের রাজা। দুষ্টু-মিষ্টি প্রেম। গভীর রোমান্টিকতা। ভাঙা-বাসার শূন্যতা। বিধবার থান-কাপড়ের মতো আকাশ, এক ঘর নিঃসঙ্গতা, এক বাক্স স্মৃতি। অগ্রসর দুটি হাতের মাঝে একফালি শূন্যতা। হর্ষ আর বেদনা, মিলন আর বিচ্ছেদ, একই যানের যাত্রী। এই সাধনার ফাঁকে ফাঁকে এসেছে হালকা চালের গল্প, কিন্তু নিপুণ নির্মাণ। পাকা হাতের কেরামতি। সেই দশকে বিশ্ব-লেখনীতে গোয়েন্দা কাহিনি, ভূত-প্রেত, রূপকথা, কল্পবিজ্ঞান ইত্যাদি প্রাধান্য পেয়েছিল। সময় অতীত থেকে বর্তমানে পা রাখছে। মানুষ ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। সে এক উদ্বেল সময়। বিমল কর আপাত শান্ত, কিন্তু তাঁর মন অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে একটি সেতুর মতো অবস্থান করছে।
সাহিত্যে দু ধরনের লেখা আছে। এক, বাস্তবের হাত ধরে কল্পনায় প্রবেশ, দুই, কল্পনাকে নিয়ে বাস্তব-বিচরণ। বিমল কর এই দুটি ব্যাপারেই পারদর্শী ছিলেন। তরুণ লেখকদের তৈরি করতেন, কারণ তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সাংবাদিক ও দক্ষ সম্পাদক। কোন অর্থে সাংবাদিক? মানুষের ঘরের কথা মানুষেরই ঘরে পৌঁছে দিতেন সাহিত্যের মোড়কে। তিনি বলতেন, বাস্তবের শক্ত কাঠামোর ওপর কল্পনার প্রলেপ, তবেই প্রতিমাটি সুন্দর হবে। একটা সুগঠিত, সুচিন্তিত গল্প চাই। গদ্যের দৃঢ়তা। প্রাঞ্জল ভাষা। বর্ণনার দক্ষতা। তিনি ভাবতেন, লিখতেন স্বর্ণ শিল্পীর দক্ষতায়। এই সংকলনে তাঁর এমন কিছু রচনা রাখা হয়েছে, যা সহজ ও সুখপাঠ্য। তিনি ‘অকাল্ট’ নিয়ে চর্চা করতেন। প্রচুর পড়তেন, নানা দেশের নানা বই। তাঁর ‘আত্মাদের’ সঙ্গে বেদান্তের সম্পর্ক ছিল না। তাঁর আত্মারা সব প্রেতাত্মা। গোয়েন্দা গল্পের পরিবেশনাও অপূর্ব। পাঠক, পাঠিকাদের ধরে রাখতেন টান-টান আকর্ষণে।
কিছুক্ষণের জন্যে যাঁরা অন্য একটা জগতে চলে যেতে চান এই সংকলনটি তাঁদের ভালো লাগারই কথা। ধূপের ধর্ম জ্বলে ঘরের ভেতরে, গন্ধ ছড়ায় বাইরে। আমোদিত হয় সর্বজন। অনন্য সাহিত্যিক, জীবন-শিল্পী বিমল কর, আমাদের নিবেদিত সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন।
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
১২.১২.২০২৩





Leave a Reply